হিসাবরক্ষণের সূচনা প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, মিশর এবং ভারতে চাণক্যের অর্থশাস্ত্র-এ বর্ণিত রাজকোষ ব্যবস্থাপনা থেকে হলেও, আধুনিক দু-তরফা দাখিলা পদ্ধতির (Double-Entry Book-keeping) বিজ্ঞানসম্মত আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৪৯৪ সালে ইতালির ভেনিস শহরে ফ্রান্সিসকান সন্ন্যাসী ও গণিতবিদ ফ্রা লুকা প্যাসিওলির (Fra Luca Pacioli) হাত ধরে। তাঁর রচিত সুবিখ্যাত গণিত গ্রন্থ Summa de Arithmetica, Geometria, Proportioni et Proportionalita (বিশেষত এর অন্তর্ভুক্ত Particularis de Computis et Scripturis অধ্যায়)-এ তিনি ভেনিসীয় বণিকদের জাবেদা ও খতিয়ান ব্যবহারের নিয়ম সংকলন করেন এবং ঘোষণা করেন: "প্রতিটি ডেবিটের জন্য একটি সমপরিমাণ ক্রেডিট থাকা আবশ্যক।"
শিল্প বিপ্লব ও সীমিত দায়বিশিষ্ট যৌথ মূলধনী কোম্পানির উৎপত্তির ফলে হিসাববিজ্ঞান কেবল সম্পদের রক্ষনাবেক্ষণকারী (Stewardship) ভূমিকা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে আধুনিক আর্থিক তথ্য ব্যবস্থা (Financial Information System)-এ পরিণত হয়েছে।
আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব সার্টিফায়েড পাবলিক অ্যাকাউন্ট্যান্টস (AICPA, 1941)-এর প্রামাণ্য সংজ্ঞা অনুযায়ী:
হিসাবরক্ষণ প্রক্রিয়াটি সাতটি সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিক ধাপে সম্পাদিত হয় (হিসাব চক্র):
- ১. লেনদেন শনাক্তকরণ (Identification): কারবারের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক ঘটনার মধ্য থেকে অর্থের অঙ্কে পরিমাপযোগ্য লেনদেনসমূহকে প্রমাণক বা ভাউচারের সাহায্যে চিহ্নিত করা।
- ২. আর্থিক মূল্যে পরিমাপ (Measurement in Money): দেশের সরকারি মুদ্রা (যেমন ভারতীয় টাকা - ₹)-এর নিরিখে প্রতিটি লেনদেনের সঠিক অর্থমূল্য নির্ধারণ করা। গুণগত তথ্য (যেমন ধর্মঘট, কর্মচারীর দক্ষতা) বাদ দেওয়া হয়।
- ৩. লিপিবদ্ধকরণ (Recording in Journal): শনাক্তকৃত লেনদেনগুলোকে প্রাথমিক হিসাবের বই বা জাবেদায় (Journal) তারিখের ক্রমানুসারে দু-তরফা দাখিলা নিয়মে লিখে রাখা।
- ৪. শ্রেণিবিন্যাসকরণ (Classification into Ledger): জাবেদা থেকে সমজাতীয় লেনদেনগুলোকে আলাদা আলাদা শিরোনামের অধীনে খতিয়ান (Ledger) হিসাবে স্থানান্তর বা পোস্টিং করা।
- ৫. সংক্ষিপ্তকরণ (Summarization): খতিয়ান উদ্বৃত্ত দিয়ে রেওয়ামিল (Trial Balance) প্রস্তুত করে গাণিতিক নির্ভুলতা যাচাই করা এবং এরপর আয় বিবরণী (Trading and P&L Account) ও উদ্বৃত্তপত্র (Balance Sheet) তৈরি করা।
- ৬. বিশ্লেষণ ও ফলাফল নির্ণয় (Analysis & Interpretation): আর্থিক অনুপাত ও তুলনামূলক বিবৃতির সাহায্যে প্রতিষ্ঠানের তরলতা, ঋণ পরিশোধ ক্ষমতা ও লাভজনকতা পর্যালোচনা করা।
- ৭. তথ্য জ্ঞাপন (Communication): অডিটর কর্তৃক প্রত্যয়িত চূড়ান্ত হিসাব বিবরণী ও ব্যাখ্যামূলক টীকা কারবারের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত ব্যবহারকারীদের কাছে পেশ করা।
| তুলনার ভিত্তি | বুক-কিপিং (Book-keeping) | অ্যাকাউন্টিং (Accounting) | অ্যাকাউন্ট্যান্সি (Accountancy) |
|---|---|---|---|
| ক্ষেত্র ও স্তর | হিসাবের প্রাথমিক স্তর; লেনদেন শনাক্তকরণ, জাবেদাভুক্তকরণ ও খতিয়ানে তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ। | দ্বিতীয় স্তর; বুক-কিপিং যেখানে শেষ হয় অ্যাকাউন্টিং সেখান থেকে শুরু হয়। রেওয়ামিল, চূড়ান্ত হিসাব তৈরি ও বিশ্লেষণ এর কাজ। | হিসাববিজ্ঞানের সামগ্রিক তাত্ত্বিক জ্ঞানভাণ্ডার, বিধিবদ্ধ নিয়মাবলী, তত্ত্ব ও দর্শনের সমাহার। |
| কাজের প্রকৃতি | দৈনন্দিন, নিয়মিত ও কেরানিধর্মী যান্ত্রিক কাজ। | বিশ্লেষণাত্মক, বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ও গতিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ। | তাত্ত্বিক ও পেশাগত গবেষণা এবং মানদণ্ড নির্ধারণের ক্ষেত্র। |
| মুখ্য উদ্দেশ্য | সমস্ত আর্থিক লেনদেনের যথাযথ ও ধারাবাহিক হিসাবের রেকর্ড বজায় রাখা। | কারবারের প্রকৃত লাভ/ক্ষতি ও উদ্বৃত্তপত্রের মাধ্যমে সঠিক আর্থিক অবস্থা নির্ণয় ও তথ্য জ্ঞাপন। | হিসাবরক্ষণ চর্চাকে সুশৃঙ্খল ও সর্বজনগ্রাহ্য নীতিমালার কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করা। |
| কর্মী স্তর | কনিষ্ঠ বা সাধারণ শিক্ষাপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষণ কর্মীদের দ্বারা সম্পাদিত হয়। | উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ হিসাববিদ ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট দ্বারা সম্পাদিত হয়। | পেশাদার প্রতিষ্ঠান (যেমন ICAI) এবং গবেষকদের দ্বারা পরিচালিত ও গঠিত হয়। |
- আর্থিক হিসাববিজ্ঞান (Financial Accounting): ঐতিহাসিক লেনদেন রেকর্ড করে আইনসম্মত চূড়ান্ত আর্থিক বিবরণী (লাভ-ক্ষতির হিসাব ও ব্যালান্স শিট) প্রস্তুতের মূল শাখা।
- উৎপাদন ব্যয় হিসাববিজ্ঞান (Cost Accounting): কোনো পণ্য বা পরিষেবা উৎপাদনে ব্যবহৃত উপাদানসমূহের (কাঁচামাল, মজুরি, উপরিব্যয়) খরচ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ করার শাখা।
- ব্যবস্থাপকীয় হিসাববিজ্ঞান (Management Accounting): সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্বাহী ব্যবস্থাপকদের বাজেট ও পূর্বাভাসভিত্তিক বিশেষ তথ্য প্রদানকারী শাখা।
- সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসাববিজ্ঞান (Social Responsibility Accounting): কারবারের কারণে সমাজের ওপর পরিবেশ দূষণ ও সামাজিক কল্যাণের আর্থিক প্রভাব পরিমাপ করার শাখা।
- মানবসম্পদ হিসাববিজ্ঞান (Human Resource Accounting): প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের দক্ষতা, নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে ব্যয়িত অর্থকে সম্পদ রূপে পরিমাপ করার আধুনিক শাখা।
- ১. নির্ভরযোগ্যতা (Reliability): তথ্য বস্তুনিষ্ঠ ভাউচারের ভিত্তিতে তৈরি হতে হবে, যা যে কোনো নিরপেক্ষ নিরীক্ষক দ্বারা যাচাইযোগ্য।
- ২. প্রাসঙ্গিকতা (Relevance): তথ্য এমন হতে হবে যা ব্যবহারকারীদের অতীত পর্যালোচনা ও ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
- ৩. বোধগম্যতা (Understandability): আর্থিক বিবরণী এতই প্রাঞ্জল ও সুশৃঙ্খল হতে হবে যাতে সাধারণ বাণিজ্যিক জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি তা সহজে বুঝতে পারেন।
- ৪. তুলনাবোধযোগ্যতা (Comparability): বছরের পর বছর একই নীতি অনুসরণের ফলে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিগত বছরের সাথে (Intra-firm) এবং অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সাথে (Inter-firm) তুলনা করা সম্ভব হয়।
- অভ্যন্তরীণ ব্যবহারকারী:
- মালিক / শেয়ারহোল্ডার: বিনিয়োগকৃত মূলধনের নিরাপত্তা, মুনাফার হার ও ডিভিডেন্ড জানতে।
- ব্যবস্থাপনা পর্ষদ: দৈনিক কার্যক্রম পরিচালনা, পণ্যের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ ও সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিতে।
- শ্রমিক ও কর্মচারী: বোনাস দাবি, মহার্ঘ ভাতা ও চাকরির নিরাপত্তা পর্যালোচনা করতে।
- বহিরাগত ব্যবহারকারী:
- ঋণদাতা ও ব্যাংক: চলতি দায় ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা (সলভেন্সি) মূল্যায়ন করতে।
- সরকার ও কর কর্তৃপক্ষ (Income Tax & GST): সঠিক বিক্রয় ও নীট আয়ের ওপর ভিত্তি করে কর ধার্য করতে।
- সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী: শেয়ারের বাজারদর ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতা বিচার করতে।