Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 9 • Science • অধ্যায় 4
আনুমানিক সময়: ৭০ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

Biology and Human Welfare

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের নবম শ্রেণির জীবন বিজ্ঞান ও পরিবেশ পাঠ্যক্রমের প্রথম অধ্যায় 'জীবন ও তার বৈচিত্র্য' (Life and Its Diversity)-এর সম্পূর্ণ প্রামাণ্য ও বিস্তৃত অধ্যায়ন নির্দেশিকায় স্বাগত। এই অধ্যায়ে জীবনের ভৌত ভিত্তি প্রোটোপ্লাজমের গঠন থেকে শুরু করে বিপাকের দ্বিমুখী রূপ—গঠনমূলক উপচিতি বিপাক (সালোকসংশ্লেষ) এবং ভাঙনমূলক অপচিতি বিপাক (শ্বসন ও রেচন)—বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর সৃষ্টির পর আদিম বিজারণধর্মী পরিবেশে ওপারিন ও হ্যালডেনের রাসায়নিক বিবর্তন তত্ত্ব এবং ১৯৫৩ সালে স্ট্যানলি মিলার ও হ্যারল্ড উরের কৃত্রিম স্পার্ক ডিসচার্জ পরীক্ষার মাধ্যমে অ্যামিনো অ্যাসিড সংশ্লেষের প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখানে প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এছাড়া জীববৈচিত্র্যের তিনটি স্তর (জিনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতান্ত্রিক), জীবনদায়ী ভেষজ ওষুধের উৎস (কুইনাইন, রেসারপিন, ভিনব্লাস্টিন, পেনিসিলিন), জীববৈচিত্র্য হ্রাসের কারণ এবং নরম্যান মায়ার্সের হটস্পটের শর্তাবলী আলোচনা করা হয়েছে। ট্যাক্সোনমির জনক ক্যারোলাস লিনিয়াসের লিনিয়ান হায়ারার্কির সাতটি ধাপ এবং দ্বিপদ নামকরণের আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী (ICBN ও ICZN) নিখুঁতভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে। পরিশেষে, আর. এইচ. হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাস (মনেরা, প্রোটিস্টা, ছত্রাক, প্ল্যান্টি ও অ্যানিম্যালিয়া), উদ্ভিদ রাজ্যের প্রধান বিভাগসমূহ (শৈবাল, ব্রায়োফাইটা, টেরিডোফাইটা, ব্যক্তবীজী, গুপ্তবীজী এবং একবীজপত্রী বনাম দ্বিবীজপত্রী) এবং প্রাণী রাজ্যের অমেরুদণ্ডী পর্বসমূহ ও মেরুদণ্ডী কর্ডাটার ছয়টি শ্রেণির সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য ও বিজ্ঞানসম্মত উদাহরণ এই সামগ্রিক পাঠকে সমৃদ্ধ করেছে।

কখনও কি ভেবে দেখেছেন?

আজ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর পূর্বে মহাজাগতিক ধূলিকণা ও গ্যাসীয় মেঘ ঘনীভূত হয়ে যখন আমাদের এই উত্তপ্ত পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল, তখন সেখানে প্রাণের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। আদিম উত্তাল মহাসমুদ্রের ফুটন্ত লঘু স্যুপে সরল রাসায়নিক অণু মিথেন, অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন থেকে কীভাবে সূচিত হলো জীবনের প্রথম স্পন্দন? কীভাবে আদিমতম এককোষী আণুবীক্ষণিক জীব থেকে বিবর্তনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে কোটি কোটি প্রজাতির চোখজুড়ানো বৈচিত্র্য—অতি ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে নীল তিমি আর বিশালাকার বটগাছ? জীবনের সংজ্ঞা কী, কীভাবে জীব নিজেকে জড় থেকে আলাদা রাখে বিপাকের আশ্চর্য রসায়নে, আর বিজ্ঞানীরাই বা কীভাবে এই বিপুল জীবজগৎকে এক সুশৃঙ্খল নিয়মে শ্রেণিবদ্ধ করলেন—তা জানার এক অপূর্ব বৈজ্ঞানিক রোমাঞ্চকর যাত্রা হলো এই অধ্যায়।

অধ্যায়টির গুরুত্ব

নবম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য 'জীবন ও তার বৈচিত্র্য' অধ্যায়টি অনুধাবন করা অপরিহার্য, কারণ এটি সমগ্র জীববিজ্ঞানের প্রবেশদ্বার ও ভিত্তিপ্রস্তর। পৃথিবীজুড়ে বিদ্যমান লক্ষ লক্ষ প্রজাতির জীব কীভাবে পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত, কীভাবে জড় উপাদান থেকে প্রাণের রাসায়নিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে এবং কীভাবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া থেকে বিশালাকার স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিকাশ ঘটেছে—তা না জানলে আধুনিক জিনতত্ত্ব, চিকিৎসা বিজ্ঞান, কৃষি প্রযুক্তি বা পরিবেশবিদ্যার কোনো পাঠই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। ক্যান্সার নিরাময়ে নয়নতারা গাছের অ্যালকালয়েড কিংবা ম্যালেরিয়া দমনে সিনকোনা গাছের ছালের ব্যবহার আমাদের শেখায় মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কতটা জরুরি। পাশাপাশি, দ্বিপদ নামকরণ ও শ্রেণিবিন্যাসের নিয়ম জানা শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানচর্চায় নির্ভুলভাবে ভাব বিনিময়ে সক্ষম করে তোলে। সংক্ষেপে, প্রকৃতিকে জানা, ভালোবাসার দৃষ্টিতে সংরক্ষণ করা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের যুক্তিনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনে এই অধ্যায়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • সজীব ও নির্জীবের প্রাথমিক পার্থক্য এবং জীবের বৃদ্ধি, পুষ্টি, শ্বসন ও রেচনের মৌলিক ধারণা (পূর্ববর্তী ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণি)।
  • উদ্ভিদ ও প্রাণী কোষের সাধারণ গঠন—কোষপ্রাচীর, কোষপর্দা, সাইটোপ্লাজম, নিউক্লিয়াস ও বিভিন্ন অঙ্গাণুর প্রাথমিক জ্ঞান।
  • আমাদের চারপাশের পরিচিত পরিবেশের বিভিন্ন জীব, তাদের বাসস্থান ও বাহ্যিক গঠনের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • জীবনের সংজ্ঞা ও মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ (বৃদ্ধি, প্রজনন, সংবেদনশীলতা, হোমিওস্ট্যাসিস) বিশদভাবে ব্যাখ্যা করতে পারা এবং প্রোটোপ্লাজমকে জীবনের ভৌত ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা।
  • উপচিতি বিপাক ও অপচিতি বিপাকের মধ্যে রাসায়নিক ও শারীরবৃত্তীয় পার্থক্য নিরূপণ করতে পারা এবং সংশ্লিষ্ট সমীকরণসহ উদাহরণ উপস্থাপন করা।
  • আদিম পৃথিবীর পরিবেশ, ওপারিন ও হ্যালডেনের রাসায়নিক বিবর্তন তত্ত্ব এবং মিলার ও উরের ঐতিহাসিক পরীক্ষার (১৯৫৩) কার্যপদ্ধতি ও সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করতে পারা।
  • জীববৈচিত্র্যের তিনটি স্তর (জিনগত, প্রজাতিগত, বাস্তুতান্ত্রিক), এর অপরিসীম অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব এবং সংরক্ষণের আবশ্যকতা ও হটস্পটের শর্ত ব্যাখ্যা করতে পারা।
  • ট্যাক্সোনমির পরিধি, লিনিয়ান হায়ারার্কির ৭টি ধাপ এবং ICBN ও ICZN-এর নিয়ম মেনে দ্বিপদ নামকরণের সঠিক লিখনরীতি প্রয়োগ করতে পারা।
  • হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসের (মনেরা, প্রোটিস্টা, ছত্রাক, প্ল্যান্টি, অ্যানিম্যালিয়া) বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি ও সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য তুলনা করতে পারা।
  • উদ্ভিদ রাজ্যের প্রধান বিভাগসমূহ (থ্যালোফাইটা, ব্রায়োফাইটা, টেরিডোফাইটা, ব্যক্তবীজী, গুপ্তবীজী) এবং একবীজপত্রী ও দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের সুস্পষ্ট পার্থক্য নিরূপণ করতে পারা।
  • অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের ৯টি প্রধান পর্ব ও মেরুদণ্ডী কর্ডাটার ৬টি শ্রেণির সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য ও বিজ্ঞানসম্মত নামসহ উদাহরণ নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে পারা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 মডিউল ১: জীবনের ধারণা, মৌলিক বৈশিষ্...
2 মডিউল ২: জীবনের উৎপত্তি ও জৈব অভিব্...
3 মডিউল ৩: জীববৈচিত্র্য ও তার সংরক্ষণ...
4 মডিউল ৪: ট্যাক্সোনমি, সিস্টেমেটিক্স...
5 মডিউল ৫: হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রে...
6 মডিউল ৬: উদ্ভিদ রাজ্যের প্রধান বিভা...
7 মডিউল ৭: প্রাণী রাজ্যের প্রধান পর্ব...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

মডিউল ১: জীবনের ধারণা, মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও বিপাক (Concept of Life, Characteristics & Metabolism)

১.১ জীবনের সংজ্ঞা ও প্রোটোপ্লাজমীয় ভিত্তি

জীববিজ্ঞানীদের মতে, জীবন (Life) হলো স্ব-প্রজননশীল, পরিবর্তনশীল, স্বনিয়ন্ত্রিত, সুসংগঠিত এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনায় সুনির্দিষ্ট সাড়া প্রদানকারী প্রোটোপ্লাজমীয় উপাদানের এক বিশেষ জটিল ও গতিশীল প্রকাশ। বিজ্ঞানী টমাস হেনরি হাক্সলে (T. H. Huxley, 1868) প্রোটোপ্লাজমের অনন্য ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করে একে "জীবনের ভৌত ভিত্তি" (Protoplasm is the physical basis of life) হিসেবে অভিহিত করেন।

একটি সজীব কোষের কোষপর্দা দ্বারা পরিবেষ্টিত যাবতীয় নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমীয় অংশকে একত্রে প্রোটোপ্লাজম বলে। এটি মূলত জল (৭০-৮৫%), প্রোটিন (১০-১৫%), লিপিড (২-৩%), কার্বোহাইড্রেট (১%) এবং অজৈব খনিজ লবণের এক সমসত্ত্ব-অসমসত্ত্ব মিশ্র কলয়েডীয় অবস্থা (Colloidal Sol-Gel State)। প্রোটোপ্লাজমের মধ্যেই সংঘটিত হয় যাবতীয় জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া, যা বন্ধ হয়ে গেলে জীবের মৃত্যু ঘটে।

১.২ বিপাক (Metabolism): উপচিতি বনাম অপচিতি বিপাক

জীবদেহের প্রতিটি সজীব কোষে অবিরাম যে সমস্ত গঠনমূলক ও ভাঙনমূলক জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটে চলেছে এবং যার মাধ্যমে জীবদেহের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, শক্তি উৎপাদন ও জীবনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাদের সামগ্রিক রূপকে বিপাক (Metabolism) বলে। বিপাক মূলত দুই প্রকার:

১. উপচিতি বিপাক (Anabolism):
এটি হলো জীবদেহের গঠনমূলক বিপাকীয় ক্রিয়া (Constructive Metabolism)। এই প্রক্রিয়ায় সরল উপাদান থেকে জটিল জৈব যৌগ সংশ্লেষিত হয়। এতে শক্তি শোষিত বা সঞ্চিত হয় (Endergonic / Endothermic Reaction) এবং জীবের শুষ্ক ওজন (Dry Weight) বৃদ্ধি পায়।
প্রধান উদাহরণসমূহ:

  • সালোকসংশ্লেষ (Photosynthesis): উদ্ভিদ কোষে সূর্যালোক ও ক্লোরোফিলের উপস্থিতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলের রাসায়নিক সংযোগে গ্লুকোজ সংশ্লেষিত হয় এবং সৌরশক্তি রাসায়নিক স্থৈতিক শক্তি হিসেবে আবদ্ধ হয়:
    6CO₂ + 12H₂O + আলোকশক্তি ➔ C₆H₁₂O₆ + 6O₂ + 6H₂O
  • প্রোটিন সংশ্লেষ (Protein Synthesis): অ্যামিনো অ্যাসিড যুক্ত হয়ে পেপটাইড বন্ধন গঠনের মাধ্যমে জটিল প্রোটিন অণু তৈরি।
  • স্নেহপদার্থ ও গ্লাইকোজেন সংশ্লেষ: যথাক্রমে ফ্যাটি অ্যাসিড-গ্লিসারল এবং গ্লুকোজ থেকে সঞ্চিত খাদ্য তৈরি।

২. অপচিতি বিপাক (Catabolism):
এটি হলো জীবদেহের ভাঙনমূলক বা ধ্বংসাত্মক বিপাকীয় ক্রিয়া (Destructive Metabolism)। এই প্রক্রিয়ায় জটিল জৈব যৌগ জারিত বা বিশ্লিষ্ট হয়ে সরল জৈব বা অজৈব উপাদানে পরিণত হয়। এতে স্থিতিশক্তি গতিশক্তিতে বা তাপে রূপান্তরিত হয়ে মুক্ত হয় (Exergonic / Exothermic Reaction) এবং জীবের শুষ্ক ওজন হ্রাস পায়।
প্রধান উদাহরণসমূহ:

  • শ্বসন (Cellular Respiration): কোষে কোষে গ্লুকোজের জারণ ঘটিয়ে উচ্চশক্তি সম্পন্ন এটিপি (ATP) ও তাপশক্তি উৎপাদন:
    C₆H₁₂O₆ + 6O₂ + 6H₂O ➔ 6CO₂ + 12H₂O + শক্তি (৩৮ ATP / ৬৮৬ kcal)
  • রেচন (Excretion): প্রোটিন ও নিউক্লিক অ্যাসিড ভেঙে ক্ষতিকর নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য (ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া) তৈরি ও দেহ থেকে নিষ্কাশন।

তুলনার বিষয় উপচিতি বিপাক (Anabolism) অপচিতি বিপাক (Catabolism)
১. প্রক্রিয়ার প্রকৃতি গঠনমূলক বা সংশ্লেষীয় প্রক্রিয়া (সরল থেকে জটিল)। ভাঙনমূলক বা বিশ্লিষ্টকরণ প্রক্রিয়া (জটিল থেকে সরল)।
২. শুষ্ক ওজনের পরিবর্তন জীবদেহের শুষ্ক ওজন বৃদ্ধি পায়। জীবদেহের শুষ্ক ওজন হ্রাস পায়।
৩. শক্তির রূপান্তর শক্তি আবদ্ধ বা শোষিত হয় (গতিশক্তি স্থৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত)। শক্তি নির্গত বা মুক্ত হয় (স্থৈতিক শক্তি গতিশক্তি ও তাপে রূপান্তরিত)।
৪. প্রধান উদাহরণ সালোকসংশ্লেষ, প্রোটিন সংশ্লেষ, গ্লাইকোজেনেসিস। শ্বসন, রেচন, স্নেহপদার্থের বিশ্লেষণ।
৫. বৃদ্ধির সাথে সম্পর্ক উপচিতি > অপচিতি হলে জীবের সামগ্রিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটে। অপচিতি > উপচিতি হলে জীবদেহে বার্ধক্য, শীর্ণতা ও অবক্ষয় দেখা দেয়।
১.৩ সজীব বস্তুর অন্যান্য প্রধান মৌলিক লক্ষণসমূহ
  • বৃদ্ধি (Growth): প্রোটোপ্লাজমীয় পদার্থের বৃদ্ধির মাধ্যমে জীবের আকার, আয়তন ও শুষ্ক ওজনের চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় বৃদ্ধি ঘটে।
  • উত্তেজিতা ও সাড়া প্রদান (Irritability & Sensitivity): পরিবেশের কোনো পরিবর্তন বা উদ্দীপকের (আলোক, উত্তাপ, স্পর্শ, রাসায়নিক পদার্থ) প্রভাবে জীবদেহে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা। যেমন—লজ্জাবতীর পাতা স্পর্শ করলে বুজে যাওয়া, আলোর দিকে উদ্ভিদের কাণ্ডের চলন।
  • হোমিওস্ট্যাসিস (Homeostasis): পরিবেশের পরিবর্তন সত্ত্বেও জীবদেহের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে (যেমন—দেহের তাপমাত্রা, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা, pH, জলের ভারসাম্য) সর্বদা একটি নির্দিষ্ট সুস্থির স্বাভাবিক অবস্থায় বজায় রাখার ক্ষমতা। ফরাসি শারীরবৃত্তবিদ ক্লদ বার্নার্ড (Claude Bernard) অভ্যন্তরীণ পরিবেশের ধারণাকে 'Milieu Intérieur' বলেন এবং বিজ্ঞানী ওয়াল্টার বি. ক্যানন (Walter Cannon, 1926) একে 'হোমিওস্ট্যাসিস' নাম দেন।
  • প্রজনন (Reproduction): নিজ প্রজাতির অস্তিত্ব ও ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে অপত্য জীব সৃষ্টি করার জৈবিক ক্ষমতা।
  • চলন ও গমন (Movement & Locomotion): নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালনকে চলন বলে (অধিকাংশ উদ্ভিদে দেখা যায়) এবং স্থান পরিবর্তনকে গমন বলে (অধিকাংশ প্রাণীতে খাদ্যগ্রহণ ও সুরক্ষার জন্য ঘটে)।
  • জীবনচক্র, বার্ধক্য ও অবধারিত মৃত্যু (Life Cycle & Death): জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজননক্ষম পূর্ণাঙ্গ দশা, বার্ধক্য এবং পরিশেষে কোষীয় ক্রিয়াকলাপের চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া অর্থাৎ মৃত্যু।

মডিউল ২: জীবনের উৎপত্তি ও জৈব অভিব্যক্তির আদি পর্যায় (Origin of Life & Early Evolution)

২.১ মহাজাগতিক পটভূমি ও আদিম পৃথিবীর পরিবেশ

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, আজ থেকে প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর পূর্বে (13.8 Billion Years Ago) 'বিগ ব্যাং' (Big Bang) বা মহা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল। প্রায় ৪৬০ কোটি বছর পূর্বে (4.6 Billion Years Ago) সৌরজগৎ ও আমাদের পৃথিবী সৃষ্টি হয়। সৃষ্টির সময় পৃথিবী ছিল এক উত্তপ্ত জ্বলন্ত গ্যাসীয় পিণ্ড যার তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৫,০০০°C থেকে ৬,০০০°C।

ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে পৃথিবী শীতল হতে থাকে। আদিম পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বর্তমান বায়ুমণ্ডলের মতো ছিল না; সেখানে কোনো মুক্ত অক্সিজেন (Free Molecular Oxygen - O₂) ছিল না। ফলে আদিম বায়ুমণ্ডল ছিল অত্যন্ত বিজারণধর্মী (Reducing Atmosphere)। সেই সময় বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে মিথেন (CH₄), অ্যামোনিয়া (NH₃), আণবিক হাইড্রোজেন (H₂) এবং অতি উত্তপ্ত জলীয় বাষ্প (H₂O) বিদ্যমান ছিল। অতিবেগুনি রশ্মি (UV Radiation), মহাজাগতিক রশ্মি, তীব্র বজ্রপাত এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ছিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার বিপুল শক্তির উৎস।

২.২ ওপারিন ও হ্যালডেনের রাসায়নিক বিবর্তন তত্ত্ব (Chemosynthetic Theory)

১৯২৪ সালে রাশিয়ান জৈবরসায়নবিদ আলেকজান্ডার আইভানভিচ ওপারিন (A. I. Oparin) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'The Origin of Life'-এ এবং ১৯২৯ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জে. বি. এস. হ্যালডেন (J. B. S. Haldane) স্বতন্ত্রভাবে জড় রাসায়নিক পদার্থ থেকে প্রাণের উৎপত্তির বৈজ্ঞানিক রূপরেখা প্রস্তাব করেন, যা 'রাসায়নিক বিবর্তন' (Chemosynthesis) বা অ্যাবায়োজেনেসিস (Abiogenesis) নামে পরিচিত:

  1. সরল জৈব যৌগের উদ্ভব: আদিম বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় উপাদানগুলি (CH₄, NH₃, H₂, H₂O) বজ্রপাত ও অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে পরস্পর বিক্রিয়া করে সরল হাইড্রোকার্বন, অ্যালকোহল, অ্যালডিহাইড, কিটোন, ফ্যাটি অ্যাসিড, গ্লিসারল, অ্যামিনো অ্যাসিড এবং নাইট্রোজেনাস ক্ষারক (পিউরিন ও পিরিমিডিন) তৈরি করে।
  2. তপ্ত লঘু স্যুপ (Hot Dilute Soup): মেঘ ঘনীভূত হয়ে পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অবিরাম বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টির জলে এই সরল জৈব অণুগুলি ধুয়ে নেমে এসে সমুদ্রের উত্তপ্ত জলে জমা হয়। বিজ্ঞানী হ্যালডেন আদিম সমুদ্রের এই জৈব যৌগসমৃদ্ধ ফুটন্ত পুষ্টিকর তরলকে 'তপ্ত লঘু স্যুপ' (Hot Dilute Soup) বা প্রিবায়োটিক স্যুপ (Prebiotic Soup) বলে অভিহিত করেন।
  3. জটিল জৈব অণু বা ম্যাক্রোমলিকিউলের সৃষ্টি: তপ্ত সমুদ্রে পলিমারাইজেশন প্রক্রিয়ায় অ্যামিনো অ্যাসিড যুক্ত হয়ে প্রোটিন, শর্করা যুক্ত হয়ে পলিস্যাকারাইড এবং নিউক্লিওটাইড যুক্ত হয়ে নিউক্লিক অ্যাসিড (RNA ও DNA) গঠন করে।
  4. আদি কোষ বা প্রোটোবায়োন্টের মডেল:
    • ওপারিনের কোয়াসারভেট (Coacervates): ওপারিনের মতে, প্রোটিন, লিপিড ও পলিস্যাকারাইডের জটিল কোলয়েড কণাগুলি একত্রিত হয়ে জলীয় আবরণে ঘেরা গোলাকার কোলয়েডীয় বিন্দু তৈরি করে, যার নাম 'কোয়াসারভেট'। এটি চারপাশের পরিবেশ থেকে পদার্থ শোষণ করতে এবং বিভাজিত হতে পারত।
    • সিডনি ফক্সের মাইক্রোস্ফিয়ার (Microspheres): বিজ্ঞানী সিডনি ফক্স (Sidney Fox) দেখান যে শুষ্ক অ্যামিনো অ্যাসিডকে ১৩০-১৮০°C তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে যে প্রোটিন সদৃশ পলিমার (প্রোটিনয়েড - Proteinoid) তৈরি হয়, তা জলে দ্রবীভূত করলে দ্বিস্তরীয় আবরণযুক্ত ক্ষুদ্র গোলকাকার 'মাইক্রোস্ফিয়ার' গঠিত হয়, যাতে অভিস্রবণ ও মুকুলোদগম ক্ষমতা দেখা যায়।
২.৩ মিলার ও উরের ঐতিহাসিক পরীক্ষা (Miller-Urey Experiment, 1953)

১৯৫৩ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যারল্ড উরে (Harold Urey) এবং তাঁর তরুণ গবেষক ছাত্র স্ট্যানলি মিলার (Stanley Miller) পরীক্ষাগারে কাঁচের বিশেষ স্পার্ক-ডিসচার্জ যন্ত্র তৈরি করে আদিম পৃথিবীর বিজারণধর্মী পরিবেশের কৃত্রিম অনুকরণ করেন এবং ওপারিন-হ্যালডেন তত্ত্বের অকাট্য পরীক্ষামূলক প্রমাণ প্রদান করেন:

মিলার-উরের পরীক্ষার যান্ত্রিক বিন্যাস ও কার্যপ্রণালী:
  • গ্যাসীয় মিশ্রণ: একটি বৃহৎ গোলাকার কাঁচের ফ্লাস্কে আদিম বায়ুমণ্ডলের গ্যাসসমূহ—মিথেন (CH₄), অ্যামোনিয়া (NH₃) এবং হাইড্রোজেন (H₂) ঠিক ২ : ২ : ১ অনুপাতে নেওয়া হয়। কোনো অক্সিজেন রাখা হয়নি।
  • জলীয় বাষ্প সরবরাহ: নিচে থাকা অপর একটি ছোট ফ্লাস্কে জল ফুটিয়ে অবিরাম বাষ্প নলের মাধ্যমে প্রধান ফ্লাস্কে পাঠানো হয়।
  • বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ: আদিম বজ্রপাতের অনুকরণে বৃহৎ ফ্লাস্কে দুটি টাংস্টেন ইলেকট্রোডের মাধ্যমে প্রায় ৬০,০০০ ভোল্টের (বা ৬,০০০-৮,০০০ ভোল্ট অবিরাম) উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ টানা ৭ দিন ধরে প্রবাহিত করা হয়।
  • শীতলীকরণ ও সংগ্রহ: গ্যাসীয় মিশ্রণটিকে কনডেন্সার বা শীতক যন্ত্রের মধ্য দিয়ে চালনা করে ঘনীভূত তরলে পরিণত করা হয় এবং একটি U-আকৃতির নলের ফাঁদে আটকে সংগ্রহ করা হয়।
ফলাফল ও তাৎপর্য: ৭ দিন পর সংগৃহীত লালচে-বাদামী তরলকে কাগজ ক্রোমাটোগ্রাফি (Paper Chromatography) পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে সেখানে কৃত্রিমভাবে অজৈব উপাদান থেকে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন জৈব অ্যামিনো অ্যাসিড—যেমন গ্লাইসিন (Glycine), অ্যালানিন (Alanine), অ্যাসপার্টিক অ্যাসিড (Aspartic acid) এবং বিভিন্ন সরল জৈব অ্যাসিড (গ্লাইকোলিক অ্যাসিড, ল্যাকটিক অ্যাসিড) ও ইউরিয়া। এই পরীক্ষা প্রমাণ করে যে আদিম পৃথিবীতে অজৈব উপাদান থেকে জীবনের রাসায়নিক অণু সৃষ্টি হওয়া সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব ছিল।
২.৪ জীবনের আদি পর্যায় ও গ্রেট অক্সিডেশন ইভেন্ট

প্রায় ৩৭০ থেকে ৩৮০ কোটি বছর আগে (3.7-3.8 Billion Years Ago) প্রাচীন সমুদ্রে প্রথম স্বপ্রজননশীল আদিম এককোষী জীবের উৎপত্তি ঘটে। প্রাথমিক পর্যায়ে বংশগতির ধারক ও বাহক হিসেবে 'আরএনএ ওয়ার্ল্ড' (RNA World)-এর উদ্ভব হয়, কারণ আরএনএ একই সাথে তথ্য জমা রাখতে এবং উৎসেচক বা রাইবোজাইম (Ribozyme) হিসেবে অনুঘটকের কাজ করতে পারত।

প্রথম উৎপন্ন জীবগুলি ছিল পরভোজী (Heterotroph) এবং বাতাবকাশহীন বা অবাত (Anaerobic) প্রোক্যারিওট। পরবর্তীতে অবাত সালোকসংশ্লেষকারী ব্যাকটেরিয়া এবং তারপর অক্সিজেনীয় সালোকসংশ্লেষকারী সায়ানোব্যাকটেরিয়া (Cyanobacteria বা নীল-সবুজ শৈবাল)-এর আবির্ভাব ঘটে। সায়ানোব্যাকটেরিয়ার অবিরাম সালোকসংশ্লেষের ফলে প্রায় ২৪০ কোটি বছর আগে আদিম বায়ুমণ্ডলে প্রথম মুক্ত আণবিক অক্সিজেনের বিপুল বিস্ফোরণ ঘটে, যাকে ভূ-তাত্ত্বিক বিজ্ঞানে 'গ্রেট অক্সিডেশন ইভেন্ট' (Great Oxidation Event - GOE) বা অক্সিজেন বিপ্লব বলা হয়। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তর (Ozone Layer - O₃) গড়ে ওঠে এবং সুকেন্দ্রিক বা ইউক্যারিওটিক কোষের বিবর্তনের পথ প্রশস্ত হয়। বিজ্ঞানী লিন মারগুলিস (Lynn Margulis)-এর এন্ডোসিমবায়োটিক তত্ত্ব (Endosymbiotic Theory) অনুসারে, অবাত পোষক কোষে সবাত ব্যাকটেরিয়া ও সায়ানোব্যাকটেরিয়া স্থায়ী সহবাসী হিসেবে প্রবেশ করে যথাক্রমে মাইটোকনড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্টে রূপান্তরিত হয়।

মডিউল ৩: জীববৈচিত্র্য ও তার সংরক্ষণ (Biodiversity and Conservation)

৩.১ জীববৈচিত্র্যের সংজ্ঞা ও তিনটি প্রধান স্তর

১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী ওয়াল্টার জি. রোজেন (Walter G. Rosen) সর্বপ্রথম 'Biological Diversity' শব্দটিকে সংক্ষেপ করে 'Biodiversity' (জীববৈচিত্র্য) শব্দটি ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে জীববিজ্ঞানী এডওয়ার্ড ও. উইলসন (Edward O. Wilson) একে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তোলেন, যার কারণে তাঁকে 'জীববৈচিত্র্যের জনক' (Father of Biodiversity) বলা হয়। কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারী সমস্ত উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবের প্রজাতিগত প্রাচুর্য, জিনগত ভিন্নতা এবং তাদের বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্যের সামগ্রিক সমাহারকে জীববৈচিত্র্য বলে।

জীববৈচিত্র্য মূলত তিনটি স্তরে বিন্যস্ত থাকে:

  • ১. জিনগত বৈচিত্র্য (Genetic Diversity): একই প্রজাতির বিভিন্ন সদস্য বা পপুলেশনের মধ্যে জিনের গঠনগত ও অ্যালিলীয় ভিন্নতার কারণে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ—ভারতে ধানের ৫০,০০০-এর বেশি জাত (বাসমতী, গোবিন্দভোগ, তুলাইপাঞ্জি, স্বর্ণা, আইআর-৩৬) এবং ১,০০০-এর বেশি আমের প্রজাতি রয়েছে। মানুষের ত্বকের রঙের বা রক্তের গ্রুপের বৈচিত্র্যও এর উদাহরণ।
  • ২. প্রজাতিগত বৈচিত্র্য (Species Diversity): কোনো নির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্র বা ভৌগোলিক অঞ্চলে উপস্থিত বিভিন্ন প্রজাতির জীবের প্রাচুর্য ও সমাহারের মাত্রা। যেমন—সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, কুমির, গোলপাতা, সুন্দরী, গরান ইত্যাদি বহু প্রজাতির উদ্ভিদের সহাবস্থান।
  • ৩. বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য (Ecosystem Diversity): একটি বায়োস্ফিয়ার বা বৃহত্তর ভৌগোলিক অঞ্চলে বিভিন্ন প্রকৃতির বাস্তুতন্ত্রের (বনভূমি, তৃণভূমি, মরুভূমি, হ্রদ, মোহনা, প্রবাল প্রাচীর) উপস্থিতি। বিজ্ঞানী আর. এইচ. হুইটেকার (R. H. Whittaker, 1972) একে তিন ভাগে ভাগ করেন:
    • আলফা (α) বৈচিত্র্য: একটি নির্দিষ্ট বাসস্থান বা একই ধরনের ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরে প্রজাতির বৈচিত্র্য।
    • বিটা (β) বৈচিত্র্য: দুটি সংলগ্ন ভিন্ন ভিন্ন বাসস্থানের মধ্যে প্রজাতি প্রতিস্থাপনের হার বা পার্থক্যের বৈচিত্র্য।
    • গামা (γ) বৈচিত্র্য: সমগ্র ভৌগোলিক এলাকার বা ল্যান্ডস্কেপের আওতাধীন সমস্ত বাসস্থানের সামগ্রিক প্রজাতি বৈচিত্র্য।
৩.২ জীববৈচিত্র্যের অর্থনৈতিক ব্যবহার ও জীবনদায়ী ভেষজ ওষুধ

মানবজাতির বেঁচে থাকা ও সভ্যতার অগ্রগতি সম্পূর্ণভাবে জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্যশস্য, ফলমূল, কাঠ, রেশম, মধু ও প্রাকৃতিক রজন ছাড়াও জীববৈচিত্র্য হলো অমূল্য আধুনিক জীবনদায়ী ওষুধের প্রধান ভাণ্ডার:

ওষুধ / উপক্ষার (Alkaloid) উৎস উদ্ভিদ / জীব ব্যবহৃত উদ্ভিদাংশ চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহার ও রোগের নাম
কুইনাইন (Quinine) Cinchona calisaya / officinalis (সিনকোনা) গাছের ছাল (Bark) ম্যালেরিয়া রোগের অব্যর্থ জীবনদায়ী ওষুধ।
রেসারপিন (Reserpine) Rauvolfia serpentina (সর্পগন্ধা) মূল বা শিকড় (Root) উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure) ও মানসিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ।
ভিনব্লাস্টিন ও ভিনক্রিস্টিন Catharanthus roseus (নয়নতারা) পাতা ও মূল ব্লাড ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া এবং হপকিন্স লিম্ফোমা নিরাময়।
পেনিসিলিন (Penicillin) Penicillium notatum / chrysogenum (ছত্রাক) ছত্রাকের মাইসেলিয়াম ক্ষরণ প্রথম আধুনিক অ্যান্টিবায়োটিক; ব্যাকটিরিয়া সংক্রমণ নিরাময়।
মরফিন ও কোডাইন Papaver somniferum (আফিম পপি) কাঁচা ফলের ত্বক নিঃসৃত তরুক্ষীর তীব্র ব্যথানাশক (Sedative/Analgesic) ও চেতনানাশক।
ডাটুরিন (Daturine) Datura stramonium (ধুতুরা) পাতা ও ফলবীজ হাঁপানি (Asthma) ও শ্বাসকষ্ট উপশমকারী ওষুধ।
৩.৩ জীববৈচিত্র্য হ্রাসের কারণ: "The Evil Quartet" (চার শয়তান)

প্রখ্যাত বিজ্ঞানী জ্যারেড ডায়মন্ড জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের প্রধান চারটি ঘাতক কারণকে 'দ্য ইভিল কোয়ার্টেট' (The Evil Quartet) নামে চিহ্নিত করেছেন:

  1. বাসস্থানের ধ্বংস ও খণ্ডীকরণ (Habitat Loss and Fragmentation): এটি জীববিলুপ্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক কারণ। ক্রান্তীয় বৃষ্টিঅরণ্য ও বনভূমি কেটে কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও নগরায়ণ করার ফলে জীবের প্রাকৃতিক বাসস্থান চিরতরে ধ্বংস ও খণ্ডিত হয়ে যায় (যেমন—আমাজন অরণ্য ধ্বংস)।
  2. অতি-ব্যবহার ও বেপরোয়া শিকার (Over-exploitation): মানুষের সীমাহীন লোভের কারণে নির্বিচারে শিকার ও অতিরিক্ত মৎস্য আহরণের ফলে বহু প্রজাতি হারিয়ে গেছে। যেমন—অতি-শোষণের ফলে স্টেলার্স সি কাউ (Steller's Sea Cow) এবং প্যাসেঞ্জার পায়রা (Passenger Pigeon) সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে।
  3. বহিরাগত প্রজাতির অনুপ্রবেশ (Alien / Invasive Species Invasions): অন্য পরিবেশ থেকে অসাবধানতাবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে আনা বহিরাগত প্রজাতি স্থানীয় প্রজাতিকে বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দেয়। উদাহরণ:
    • কচুরিপানা (Eichhornia crassipes): দক্ষিণ আমেরিকা থেকে শোভা বৃদ্ধির জন্য এনে আমাদের জলাশয়ে ছাড়া হয়। দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে এটি জলাশয়ের সমস্ত দ্রবীভূত অক্সিজেন শোষণ করে দেশীয় মাছদের মেরে ফেলে। এজন্য একে 'বাংলার সন্ত্রাস' (Terror of Bengal) বলা হয়।
    • পার্থেনিয়াম (Parthenium hysterophorus): গমের সাথে অনুপ্রবেশকারী পার্থেনিয়াম ঘাস স্থানীয় ভেষজ উদ্ভিদকে নষ্ট করে এবং মানুষের অ্যালার্জি ও হাঁপানি সৃষ্টি করে।
    • তেলাপিয়া মাছ ও আফ্রিকান মাগুর (Clarias gariepinus): জলাশয়ে স্থানীয় দেশি চুনো ও মাগুর মাছের অস্তিত্ব বিপন্ন করছে।
  4. সহ-বিলুপ্তি (Co-extinctions): প্রকৃতিতে কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির বিলুপ্তির ফলে তার ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল পোষক উদ্ভিদ বা মিথোজীবী অপর প্রজাতিরও অনিবার্যভাবে বিলুপ্তি ঘটে। যেমন—নির্দিষ্ট পরাগসংযোগী পতঙ্গ বিলুপ্ত হলে নির্দিষ্ট অর্কিড বা ডুমুর গাছের বংশবিস্তার বন্ধ হয়ে তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়।
৩.৪ জীববৈচিত্র্যের হটস্পট (Biodiversity Hotspots)

১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ বাস্তুবিজ্ঞানী নরম্যান মায়ার্স (Norman Myers) সর্বপ্রথম 'বায়োডাইভারসিটি হটস্পট' (Biodiversity Hotspot) ধারণার প্রবর্তন করেন। যেসব অঞ্চলে প্রজাতি বৈচিত্র্য ও এন্ডেমিক প্রজাতির সংখ্যা অত্যন্ত বেশি কিন্তু তীব্র মানবীয় হস্তক্ষেপে বাসস্থান ধ্বংসের কারণে জীবজগৎ চরম বিপন্ন, তাদের হটস্পট বলে।

নরম্যান মায়ার্স অনুসারে কোনো অঞ্চলকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করার দুটি অপরিহার্য শর্ত রয়েছে:

  • শর্ত ১: এন্ডেমিজম (Endemism): অঞ্চলটিতে অন্তত ১,৫০০টি এন্ডেমিক (স্থানীয়) সংবহনকলাযুক্ত উদ্ভিদ প্রজাতি (Vascular Plants) থাকতে হবে—যা সমগ্র বিশ্বের মোট উদ্ভিদ প্রজাতির ০.৫ শতাংশের বেশি। এন্ডেমিক জীব হলো তারাই, যারা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোথাও প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় না।
  • শর্ত ২: চরম বিপন্নতার মাত্রা (Degree of Threat): অঞ্চলটির আদিম স্বাভাবিক বাসস্থানের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ (70%) ইতিমধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত বা বিনষ্ট হয়েছে (অর্থাৎ মাত্র ৩০% বা তার কম আদিম বাসস্থান অবশিষ্ট রয়েছে)।

বর্তমানে বিশ্বে মোট ৩৬টি হটস্পট স্বীকৃত। এদের মধ্যে ভারতে ৪টি প্রধান হটস্পট বিস্তৃত রয়েছে:

  1. পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ও শ্রীলঙ্কা (Western Ghats & Sri Lanka): মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও কেরলের চিরহরিৎ অরণ্য। গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি: সিংহপুচ্ছ বানর (Lion-tailed Macaque), নীলগিরি তাহর।
  2. পূর্ব হিমালয় (Eastern Himalayas): সিকিম, দার্জিলিং, ভুটান ও অরুণাচল প্রদেশ। গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি: রেড পান্ডা (Red Panda), স্নো লেপার্ড, গোল্ডেন লাঙ্গুর।
  3. ইন্দো-বার্মা (Indo-Burma): আসাম, মেঘালয় ও উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল যা মায়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত।
  4. সুন্দাল্যান্ড (Sundaland): ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণাংশ (গ্রেট নিকোবর) যা ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার অংশ।

মডিউল ৪: ট্যাক্সোনমি, সিস্টেমেটিক্স ও লিনিয়ান হায়ারার্কি (Taxonomy & Linnaean Hierarchy)

৪.১ ট্যাক্সোনমির পরিধি ও মূল ভিত্তি

গ্রিক শব্দ 'Taxis' (বিন্যাস বা শৃঙ্খলা) এবং 'Nomos' (নিয়ম বা বিধি) থেকে 'Taxonomy' (ট্যাক্সোনমি বা বিন্যাসবিধি) শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি উদ্ভিদবিজ্ঞানী অগাস্টিন পিরামাস দ্য কঁদোল (A. P. de Candolle) তাঁর রচিত 'Théorie élémentaire de la botanique' গ্রন্থে সর্বপ্রথম 'ট্যাক্সোনমি' শব্দটি ব্যবহার করেন।

জীববিজ্ঞানের যে শাখায় নির্দিষ্ট বিজ্ঞানসম্মত নীতি মেনে জীবের সনাক্তকরণ, নামকরণ ও শ্রেণিবিন্যাস করা হয়, তাকে ট্যাক্সোনমি বলে। ট্যাক্সোনমির প্রধান তিনটি মৌলিক উপাদান বা ভিত্তি হলো:

  • ১. সনাক্তকরণ (Identification): বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ গঠনমূলক বৈশিষ্ট্যের নিরিখে নতুন কোনো জীবকে অন্য পরিচিত জীবের সাথে তুলনা করে তার সঠিক পরিচয় নির্ধারণ করা।
  • ২. নামকরণ (Nomenclature): আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানসম্মত সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে প্রতিটি সনাক্তকৃত জীবের একটি বিশ্বজনীন লাতিন নাম প্রদান করা।
  • ৩. শ্রেণিবিন্যাস (Classification): জীবের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে তাদেরকে বিভিন্ন বিজ্ঞানসম্মত দল বা ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা।

সিস্টেমেটিক্স (Systematics): ট্যাক্সোনমির সাথে জীবের তুলনামূলক বিবর্তনীয় ও জাতিজনি সম্পর্ক (Phylogenetic relationships) যুক্ত করে জীবজগতের বৈচিত্র্যের যে সার্বিক বিজ্ঞানসম্মত অধ্যায়ন করা হয়, তাকে সিস্টেমেটিক্স বলা হয়।

৪.২ ক্যারোলাস লিনিয়াস ও লিনিয়ান হায়ারার্কির ৭টি ধাপ

সুইডিশ প্রকৃতিবিদ ক্যারোলাস লিনিয়াস (Carolus Linnaeus, 1707–1778)-কে 'ট্যাক্সোনমির জনক' (Father of Taxonomy) বলা হয়। তাঁর রচিত দুটি কালজয়ী গ্রন্থ হলো—'Systema Naturae' (১৭৫৮, ১০ম সংস্করণ, প্রাণী নামকরণের ভিত্তি) এবং 'Species Plantarum' (১৭৫৩, উদ্ভিদ নামকরণের ভিত্তি)।

লিনিয়াস বিভিন্ন স্তরবিশিষ্ট এমন এক অবরোহী শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি প্রবর্তন করেন যেখানে জীবজগৎকে বিভিন্ন ধাপে সাজানো যায়। এই আরোহী-অবরোহী ক্রমান্বয়িক বিন্যাসকে লিনিয়ান হায়ারার্কি (Linnaean Hierarchy) বলে। লিনিয়ান হায়ারার্কিতে ৭টি বাধ্যতামূলক ধাপ (Obligate Taxonomic Categories) রয়েছে:

জগৎ (Kingdom) ➔ পর্ব / বিভাগ (Phylum / Division) ➔ শ্রেণি (Class) ➔ বর্গ (Order) ➔ গোত্র (Family) ➔ গণ (Genus) ➔ প্রজাতি (Species)
  • জগৎ (Kingdom): শ্রেণিবিন্যাসের সর্বোচ্চ স্তর (যেমন—Animalia বা Plantae)।
  • পর্ব বা বিভাগ (Phylum / Division): কয়েকটি সম্পর্কিত শ্রেণির সমন্বয়ে গঠিত ধাপ। প্রাণীর ক্ষেত্রে 'পর্ব' (Phylum) এবং উদ্ভিদের ক্ষেত্রে 'বিভাগ' (Division) ব্যবহৃত হয়।
  • শ্রেণি (Class): সম্পর্কিত কতগুলি বর্গের সমাহার।
  • বর্গ (Order): ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত কতগুলি গোত্রের সমাহার।
  • গোত্র (Family): সাদৃশ্যযুক্ত কতগুলি গণের সমাহার।
  • গণ (Genus): পরস্পর ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্যযুক্ত কতগুলি প্রজাতির সমাহার।
  • প্রজাতি (Species): শ্রেণিবিন্যাসের সবচেয়ে মৌলিক, ক্ষুদ্রতম ও বাস্তব জৈবিক একক (Basic Unit of Classification)। প্রজাতি হলো এমন একদল পারস্পরিক প্রজননক্ষম জীব, যারা নিজেদের মধ্যে জনন ঘটিয়ে উর্বর অপত্য সৃষ্টি করতে সক্ষম।
৪.৩ লিনিয়ান হায়ারার্কির দুটি আদর্শ উদাহরণ: মানুষ ও আম গাছ
হায়ারার্কির ধাপ মানুষ (Human) আম গাছ (Mango)
১. জগৎ (Kingdom) Animalia (বহুকোষী পরভোজী প্রাণী) Plantae (বহুকোষী স্বভোজী উদ্ভিদ)
২. পর্ব / বিভাগ Chordata (নটোকর্ড ও স্নায়ুরজ্জুযুক্ত) Angiospermae / Tracheophyta (গুপ্তবীজী)
৩. শ্রেণি (Class) Mammalia (স্তনগ্রন্থি ও লোমযুক্ত) Dicotyledonae (দ্বিবীজপত্রী)
৪. বর্গ (Order) Primates (অগ্রসর মস্তিষ্ক ও হাত) Sapindales
৫. গোত্র (Family) Hominidae (দ্বিপদ চলনক্ষম) Anacardiaceae
৬. গণ (Genus) Homo Mangifera
৭. প্রজাতি (Species) Homo sapiens Mangifera indica
৪.৪ দ্বিপদ নামকরণ (Binomial Nomenclature) ও আইসিবিএন/আইসিজেডএন বিধিমালা

প্রতিটি জীবের বিজ্ঞানসম্মত নামকরণের ক্ষেত্রে দুটি পদ—প্রথমটি গণের নাম (Generic Name) এবং দ্বিতীয়টি প্রজাতির নাম (Specific Epithet) যুক্ত করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করার পদ্ধতিকে দ্বিপদ নামকরণ (Binomial Nomenclature) বলে। লিনিয়াস ১৭৫৩ সালে এই পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। উদ্ভিদের নামকরণের নিয়ম স্থির করে ICBN / ICN (International Code of Nomenclature for algae, fungi, and plants) এবং প্রাণীদের নিয়ম স্থির করে ICZN (International Code of Zoological Nomenclature)।

দ্বিপদ নামকরণের প্রধান আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী:

  1. বিজ্ঞানসম্মত নামটি অবশ্যই লাতিন (Latin) ভাষা বা লাতিনিকৃত শব্দে হতে হবে, কারণ লাতিন একটি অপরিবর্তনশীল মৃত ভাষা (Dead Language)।
  2. প্রতিটি নামের দুটি অংশ থাকবে—প্রথমটি গণ এবং দ্বিতীয়টি প্রজাতি।
  3. হাতের লেখার নিয়ম: হাতে লিখলে গণ ও প্রজাতির পদের নিচে পৃথকভাবে দাগ (Separate Underline) দিতে হবে (যেমন—Homo sapiens)।
  4. মুদ্রণের নিয়ম: ছাপার হরফে বিজ্ঞানসম্মত নামটি সর্বদা বাঁকা হরফে বা ইটালিক্সে (Italics) লিখতে হবে (যেমন—Panthera tigris)।
  5. গণের নামের প্রথম অক্ষরটি সর্বদা ইংরেজি বড় হাতের (Capital Letter) হবে, কিন্তু প্রজাতির নামটি সর্বদা ছোট হাতের (Small Letter) অক্ষরে শুরু হবে।
  6. প্রজাতির নামের শেষে আবিষ্কারক বিজ্ঞানীর নাম সংক্ষেপে যোগ করা যায় এবং তা সোজা হরফে লেখা হয় (যেমন—Mangifera indica Linn.)।
  7. অগ্রাধিকারের নিয়ম (Law of Priority): কোনো জীবের যদি ভিন্ন ভিন্ন বিজ্ঞানী পৃথক নাম দেন, তবে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে প্রকাশিত নামটিই বৈধ বলে গণ্য হবে।
  8. টোটোনিম (Tautonym): গণ ও প্রজাতির পদ যদি হুবহু একই হয়, তাকে টোটোনিম বলে। প্রাণীদের ক্ষেত্রে টোটোনিম সম্পূর্ণ বৈধ (যেমন—Catla catla, Naja naja), কিন্তু উদ্ভিদের ক্ষেত্রে টোটোনিম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও অবৈধ।
৪.৫ পাঠ্যক্রমের অতি-গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত নামসমূহ
  • বাঘ: Panthera tigris
  • সিংহ: Panthera leo
  • ময়ূর: Pavo cristatus
  • রুই মাছ: Labeo rohita
  • কাতলা মাছ: Catla catla
  • কুনোব্যাঙ: Duttaphrynus melanostictus (পূর্বে Bufo melanostictus)
  • পায়রা: Columba livia
  • মানুষ: Homo sapiens
  • বটগাছ: Ficus benghalensis
  • ধান: Oryza sativa
  • মটরগাছ: Pisum sativum
  • আম গাছ: Mangifera indica

মডিউল ৫: হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাস (Whittaker's Five-Kingdom Classification, 1969)

৫.১ শ্রেণিবিন্যাসের ইতিহাস ও হুইটেকারের ৫টি মূল বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি

জীবজগতের প্রাথমিক শ্রেণিবিন্যাসে ক্যারোলাস লিনিয়াস সমগ্র জীবজগৎকে দুটি রাজ্যে (Plantae ও Animalia) ভাগ করেছিলেন। পরবর্তীতে আর্নস্ট হেকেল ১৮৬৬ সালে তিন রাজ্য (Protista যোগ করে) এবং হার্বার্ট কোপল্যান্ড ১৯৫৬ সালে চার রাজ্য (Monera যোগ করে) প্রবর্তন করেন।

১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন বাস্তুবিজ্ঞানী রবার্ট এইচ. হুইটেকার (R. H. Whittaker) জীবজগতের সবচেয়ে যুক্তিগ্রাহ্য ও আধুনিক 'পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাস' (Five-Kingdom Classification System) প্রস্তাব করেন। তিনি ৫টি সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তির ওপর এই শ্রেণিবিন্যাস দাঁড় করিয়েছিলেন:

  1. কোষীয় জটিলতা (Complexity of Cell Structure): জীবটি প্রোক্যারিওটিক (আদিকোষী) না ইউক্যারিওটিক (সুকেন্দ্রিক)?
  2. দৈহিক গঠনের জটিলতা (Complexity of Body Organization): জীবটি এককোষী (Unicellular) না বহুকোষী (Multicellular)? বহুকোষী হলে কলা ও অঙ্গতন্ত্রের মাত্রা কেমন?
  3. পুষ্টির ধরন (Mode of Nutrition): জীবটি স্বভোজী (Autotrophic - সালোকসংশ্লেষীয়) নাকি পরভোজী (Heterotrophic)? পরভোজী হলে তা কি পরজীবী, বিশোষণকারী মৃতজীবী (Absorptive / Saprophytic) নাকি গিলে খাওয়ার মতো হলোজোয়িক (Holozoic / Ingestive)?
  4. বাস্তুতান্ত্রিক ভূমিকা ও জীবনপ্রণালী (Ecological Role): বাস্তুতন্ত্রে জীবটির ভূমিকা কী—উৎপাদক (Producer - উদ্ভিদ), খাদক (Consumer - প্রাণী) নাকি বিয়োজক (Decomposer - ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া)?
  5. জাতিজনি বা বিবর্তনীয় সম্পর্ক (Phylogenetic Relationships): সরল আদিম রূপ থেকে ধাপে ধাপে জটিল রূপে রূপান্তরের বিবর্তনীয় যোগসূত্র।
৫.২ পাঁচটি রাজ্যের সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য ও উদাহরণ

১. রাজ্য মনেরা (Monera - আদিকোষী জীব):

  • এরা এককোষী, অণুবীক্ষণিক এবং প্রোক্যারিওটিক (Prokaryotic) জীব।
  • সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে না; নিউক্লিয় পর্দা ও নিউক্লিওলাসবিহীন নগ্ন বৃত্তাকার ডিএনএ থাকে, যাকে নিউক্লিওয়েড (Nucleoid) বলে।
  • ঝিল্লিবেষ্টিত কোনো কোষ অঙ্গাণু (মাইটোকনড্রিয়া, গলগি বডি, প্লাস্টিড, এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা) অনুপস্থিত।
  • কোষপ্রাচীর মূলত পলিস্যাকারাইড ও অ্যামিনো অ্যাসিডের মিশ্র পলিমার পেপটাইডোগ্লাইক্যান বা মিউরিন (Peptidoglycan / Murein) দ্বারা গঠিত।
  • কোষে ৭০S (70S) প্রকৃতির রাইবোজোম থাকে। কোষ বিভাজন প্রত্যক্ষ অ্যামাইটোসিস পদ্ধতিতে ঘটে।
  • পুষ্টি প্রধানত পরভোজী (মৃতজীবী বা পরজীবী); তবে কিছু সায়ানোব্যাকটেরিয়া সালোকসংশ্লেষকারী স্বভোজী এবং কেমোসিন্থেটিক।
  • উদাহরণ: Escherichia coli (ব্যাকটেরিয়া), Nostoc, Anabaena (সায়ানোব্যাকটেরিয়া), Mycoplasma (কোষপ্রাচীরবিহীন ক্ষুদ্রতম জীব)।

২. রাজ্য প্রোটিস্টা (Protista - এককোষী সুকেন্দ্রিক জীব):

  • এরা মূলত এককোষী বা দলবদ্ধ (Colonial) কিন্তু সুস্পষ্ট ইউক্যারিওটিক (Eukaryotic) জীব।
  • কোষে সুগঠিত পর্দাঘেরা নিউক্লিয়াস এবং সমস্ত ঝিল্লিবেষ্টিত অঙ্গাণু (মাইটোকনড্রিয়া, গলগি বডি ইত্যাদি) উপস্থিত। কোষে ৮০S (80S) রাইবোজোম থাকে।
  • গমনাঙ্গ বিভিন্ন ধরনের: ক্ষণপদ বা সিউডোপোডিয়া (অ্যামিবা), সিলিয়া (প্যারামেসিয়াম), ফ্ল্যাজেলা (ইউগ্লিনা)।
  • পুষ্টি স্বভোজী (শৈবালজাতীয় প্রোটিস্ট) অথবা পরভোজী/হলোজোয়িক (প্রোটোজোয়া)। Euglena একই সাথে আলো থাকলে স্বভোজী এবং অন্ধকারে পরভোজী পুষ্টি সম্পন্ন করে (মিক্সোট্রফিক পুষ্টি)।
  • উদাহরণ: Amoeba proteus, Paramecium caudatum, Euglena viridis, Plasmodium vivax (ম্যালেরিয়ার পরজীবী), ডায়াটম (Diatoms)।

৩. রাজ্য ছত্রাক বা ফাঞ্জাই (Fungi):

  • এরা ক্লোরোফিলবিহীন, এককোষী (ইস্ট) বা বহুকোষী সূত্রাকার ইউক্যারিওটিক অ-সবুজ জীব।
  • দেহ অসংখ্য সূক্ষ্ম সুতোর মতো অনুসূত্র বা হাইফা (Hyphae) দ্বারা গঠিত; হাইফার জালককে মাইসেলিয়াম (Mycelium) বলে।
  • কোষপ্রাচীর সেলুলোজ দিয়ে গঠিত নয়, বরং নাইট্রোজেনঘটিত জটিল পলিস্যাকারাইড কাইটিন (Chitin) দ্বারা গঠিত।
  • ক্লোরোফিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, তাই এরা কখনোই খাদ্য তৈরি করতে পারে না। পুষ্টি শোষণভিত্তিক মৃতজীবী (Saprophytic), পরজীবী বা শৈবালের সাথে মিথোজীবী (লাইকেন)।
  • সঞ্চিত খাদ্য হিসেবে কোষে গ্লাইকোজেন (Glycogen) ও তেলবিন্দু থাকে; কখনো শ্বেতসার থাকে না।
  • উদাহরণ: Saccharomyces cerevisiae (ইস্ট), Rhizopus (পাউরুটির ছত্রাক), Penicillium notatum, Agaricus campestris (ব্যাঙের ছাতা)।

৪. রাজ্য প্ল্যান্টি (Plantae - উদ্ভিদ জগৎ):

  • এরা বহুকোষী, ইউক্যারিওটিক, জটিল কলাতন্ত্রে সুগঠিত জীব।
  • কোষের বাইরে পেকটিন ও সেলুলোজ (Cellulose) নির্মিত সুদৃঢ় কোষপ্রাচীর থাকে।
  • কোষে প্লাস্টিড থাকে যার মধ্যে সালোকসংশ্লেষীয় রঞ্জক (ক্লোরোফিল a, b, ক্যারোটিনয়েড) থাকে। ফলে এরা স্বভোজী (Autotrophic) এবং বাস্তুতন্ত্রের প্রধান উৎপাদক (Producers)।
  • সঞ্চিত খাদ্য প্রধানত শ্বেতসার বা স্টার্চ (Starch)। গমন ক্ষমতা সাধারণত নেই।
  • উদাহরণ: স্পাইরোগাইরা, মস, ফার্ন, পাইন, আম গাছ ইত্যাদি।

৫. রাজ্য অ্যানিম্যালিয়া (Animalia - প্রাণী জগৎ):

  • এরা বহুকোষী, সুগঠিত কলা, অঙ্গ ও তন্ত্র বিশিষ্ট ইউক্যারিওটিক জীব।
  • কোষে কোনো কোষপ্রাচীর থাকে না এবং প্লাস্টিড সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। কোষে সেন্ট্রোজোম উপস্থিত।
  • পুষ্টি হলোজোয়িক (Holozoic) অর্থাৎ খাদ্য কঠিন বা তরল আকারে মুখ দিয়ে গলধঃকরণ ও পরিপাক করে। এরা বাস্তুতন্ত্রের খাদক (Consumers)।
  • সঞ্চিত খাদ্য প্রধানত গ্লাইকোজেন ও চর্বি।
  • অধিকাংশ প্রাণী গমনক্ষম এবং সুসংগঠিত স্নায়ুতন্ত্র ও পেশিতন্ত্রের সাহায্যে পরিবেশের উদ্দীপনায় দ্রুত সাড়া দেয়।
  • উদাহরণ: হাইড্রা, কেঁচো, প্রজাপতি, রুই মাছ, মানুষ।

৫.৩ হুইটেকার পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা

হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
১. ভাইরাস (Virus), ভিরয়েড (Viroid) ও প্রিয়ন (Prion)-এর মতো অকোষীয় সত্ত্বাকে কোনো রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
২. প্রোটিস্টা রাজ্যে অত্যন্ত বিচিত্র ও অসদৃশ জীবদের (যেমন এককোষী শৈবাল ও পরজীবী প্রোটোজোয়া) একত্রে রাখা হয়েছে।
৩. পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে কার্ল ওউস (Carl Woese) ১৬S রাইবোজোমাল আরএনএ (16S rRNA) বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সমগ্র জীবজগতকে তিনটি ডোমেনে (Archaea, Bacteria, Eukarya) এবং ছয়টি রাজ্যে বিভক্ত করেন।

মডিউল ৬: উদ্ভিদ রাজ্যের প্রধান বিভাগসমূহ (Major Plant Divisions)

৬.১ উদ্ভিদ রাজ্যের শ্রেণিবিভাগের রূপরেখা

উদ্ভিদ জগৎকে প্রাথমিকভাবে ফুল ও বীজ সৃষ্টির ক্ষমতার ভিত্তিতে দুটি প্রধান উপজগতে ভাগ করা হয়:
ক. অপুষ্পক উদ্ভিদ (Cryptogams): ফুল ও বীজ হয় না (থ্যালোফাইটা, ব্রায়োফাইটা, টেরিডোফাইটা)।
খ. সপুষ্পক বা বীজযুক্ত উদ্ভিদ (Phanerogams / Spermatophyta): ফুল ও বীজ উৎপন্ন হয় (ব্যক্তবীজী ও গুপ্তবীজী)।

৬.২ পাঁচটি প্রধান উদ্ভিদ বিভাগের তুলনামূলক আলোচনা

১. থ্যালোফাইটা বা সমাঙ্গদেহী (Thallophyta - শৈবাল/Algae):

  • দেহটি মূল, কাণ্ড ও পাতায় বিভক্ত নয়; দেহটি সমাঙ্গ বা থ্যালয়েড (Thalloid)।
  • কোনো সংবহনকলা (জাইলেম ও ফ্লোয়েম) থাকে না। জননাঙ্গ এককোষী এবং নিষেকের পর ভ্রূণ গঠিত হয় না।
  • এরা মূলত জলজ এবং কোষে ক্লোরোফিল থাকায় স্বভোজী।
  • উদাহরণ: Spirogyra (সূত্রাকার সবুজ শৈবাল বা 'Water Silk'), Chlamydomonas (এককোষী চলনশীল শৈবাল), Volvox।

২. ব্রায়োফাইটা বা মস (Bryophyta - "উদ্ভিদ রাজ্যের উভচর"):

  • উদ্ভিদ রাজ্যের উভচর বলার কারণ: ব্রায়োফাইটা জাতীয় উদ্ভিদরা আর্দ্র ডাঙ্গায় বা মাটিতে বসবাস করে, কিন্তু এদের যৌন জনন এবং ফ্ল্যাজেলাযুক্ত পুংজননকোষের নিষেকের জন্য জলের উপস্থিতি অপরিহার্য। ব্যাঙ যেমন ডাঙ্গায় থেকেও জলে বংশবৃদ্ধি করে, ঠিক তেমনি মস মাটিতে থেকেও জলের সাহায্য ছাড়া নিষেক সম্পন্ন করতে পারে না। এজন্য ব্রায়োফাইটাকে 'উদ্ভিদ রাজ্যের উভচর' (Amphibians of the Plant Kingdom) বলা হয়।
  • দেহে প্রকৃত মূল থাকে না; মূলের পরিবর্তে এককোষী বা বহুকোষী রোমশ রাইজয়েড (Rhizoids) থাকে যা মাটিকে আঁকড়ে ধরে জল শোষণ করে।
  • দেহে কোনো সংবহনকলা (জাইলেম ও ফ্লোয়েম) থাকে না। প্রধান দেহটি লিঙ্গধর (Gametophyte - n)।
  • উদাহরণ: Riccia, Marchantia (লিভারওয়ার্ট), Funaria (মস), Sphagnum (পিট মস)।

৩. টেরিডোফাইটা বা ফার্ন (Pteridophyta - সংবহনকলাযুক্ত অপুষ্পক):

  • এদের দেহ সুস্পষ্টভাবে মূল, কাণ্ড ও পাতায় বিভক্ত। প্রধান উদ্ভিদদেহটি রেণুধর (Sporophyte - 2n)।
  • এরাই উদ্ভিদ জগতের প্রথম সংবহনকলাযুক্ত (জাইলেম ও ফ্লোয়েম বিশিষ্ট) উদ্ভিদ (First Vascular Land Plants)। তবে জাইলেমে প্রকৃত বাহিকা (Vessel) এবং ফ্লোয়েমে সঙ্গীকোষ (Companion cell) সাধারণত থাকে না।
  • পাতার নিচের পিঠে রেণুস্থলীগুচ্ছ বা সোরাস (Sorus) উৎপন্ন হয়। কচি পাতা স্প্রিংয়ের মতো পেঁচানো থাকে, যাকে সারসিনেট ভার্নেশন (Circinate Vernation) বলে।
  • উদাহরণ: Dryopteris (ঢেঁকিশাক), Marsilea (শুশনি শাক), Lycopodium (ক্লাব মস), Selaginella।

৪. ব্যক্তবীজী বা জিম্নোস্পার্ম (Gymnosperms - নগ্নবীজী উদ্ভিদ):

  • গ্রিক শব্দ Gymnos (নগ্ন) ও Sperma (বীজ) থেকে নামটি এসেছে। এদের কোনো গর্ভাশয় বা ফল হয় না।
  • ডিম্বকগুলি মেগাস্পোরোফিলের ওপর উন্মুক্ত বা নগ্ন থাকে, ফলে নিষেকের পর বীজ সম্পূর্ণ নগ্ন বা অনাবৃত অবস্থায় থাকে।
  • কাঠে রজননালী থাকে। পাতা সাধারণত সূঁচালো (জেরোফাইটিক অভিযোজন)। কাঠে জাইলেম বাহিকা ও ফ্লোয়েম সঙ্গীকোষ থাকে না (ব্যতিক্রম: নিটাম বা Gnetum)।
  • এদের ফুল হয় না, কিন্তু পুং ও স্ত্রী শঙ্কু বা কোণ (Cones / Strobili) গঠিত হয়।
  • উদাহরণ: Pinus (পাইন গাছ), Cycas (সাইকাস), Ginkgo biloba (জীবন্ত জীবাশ্ম)।

৫. গুপ্তবীজী বা অ্যানজিওস্পার্ম (Angiosperms - আবৃতবীজী উদ্ভিদ):

  • উদ্ভিদ জগতের সর্বাধিক উন্নত ও প্রভাবশালী বিভাগ। প্রকৃত ফুল, ফল ও বীজ উৎপন্ন হয়।
  • স্ত্রীস্তবকে গর্ভাশয় (Ovary) উপস্থিত। নিষেকের পর ডিম্বক বীজে এবং গর্ভাশয় ফলে রূপান্তরিত হয়, ফলে বীজ সর্বদা ফলের অভ্যন্তরে আবৃত বা গুপ্ত থাকে।
  • সংবহনকলা অত্যন্ত উন্নত—জাইলেমে প্রকৃত বাহিকা এবং ফ্লোয়েমে সঙ্গীকোষ উপস্থিত থাকে।
  • এদের জীবনচক্রে দ্বিনিষেক (Double Fertilization) ঘটে এবং তার ফলে উৎপন্ন সস্যটি ট্রিপ্লয়েড (3n) প্রকৃতির হয়।

৬.৩ একবীজপত্রী বনাম দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের বিস্তারিত তুলনামূলক ছক
বৈশিষ্ট্য একবীজপত্রী উদ্ভিদ (Monocotyledon) দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ (Dicotyledon)
১. বীজপত্রের সংখ্যা বীজে মাত্র ১টি বীজপত্র থাকে (যেমন—ধানের স্কুটেলাম)। বীজে সুস্পষ্ট ২টি বীজপত্র পাশাপাশি অবস্থান করে।
২. মূলের প্রকৃতি স্থানিক প্রধান মূল নষ্ট হয়ে গিয়ে গুচ্ছমূল (Fibrous Root System) গঠিত হয়। স্থায়ী প্রধান মূলতন্ত্র (Tap Root System) ও শাখা-প্রশাখা থাকে।
৩. পাতার শিরাবিন্যাস পাতায় সমান্তরাল শিরাবিন্যাস (Parallel Venation) দেখা যায় (ব্যতিক্রম: কচু, স্মাইলাক্স)। পাতায় জালের মতো জালকাকার শিরাবিন্যাস (Reticulate Venation) দেখা যায়।
৪. ফুলের স্তবকের সংখ্যা পুষ্পপত্র ৩ বা ৩-এর গুণিতক অর্থাৎ ত্রয়ী বা ট্রাইমেরাস (Trimerous)। পুষ্পপত্র ৪ বা ৫ বা তাদের গুণিতক অর্থাৎ টেট্রামেরাস বা পেন্টামেরাস (Pentamerous)।
৫. সংবহন বান্ডিল ও বৃদ্ধি কাণ্ডে সংবহন বান্ডিল বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো এবং বদ্ধ (Closed - ক্যাম্বিয়ামহীন); ফলে কোনো গৌণ বৃদ্ধি হয় না। কাণ্ডে সংবহন বান্ডিল বলয়াকারে সাজানো এবং মুক্ত (Open - ক্যাম্বিয়ামযুক্ত); কাণ্ডে কাষ্ঠল গৌণ বৃদ্ধি ঘটে।
৬. পরিচিত উদাহরণ ধান (Oryza sativa), গম, ভুট্টা, কলা, নারকেল, বাঁশ। আম (Mangifera indica), মটর (Pisum sativum), ছোলা, জবা, বট।

মডিউল ৭: প্রাণী রাজ্যের প্রধান পর্বসমূহ ও মেরুদণ্ডী শ্রেণিবিভাগ (Major Animal Phyla & Vertebrates)

৭.১ অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের (Non-Chordata) ৯টি প্রধান পর্ব

প্রাণী জগতের যে সমস্ত প্রাণীর দেহে জীবনের কোনো দশাতেই নটোকর্ড বা মেরুদণ্ড গঠিত হয় না, তাদের অমেরুদণ্ডী প্রাণী বলে। প্রধান ৯টি পর্বের সনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:

  1. পরিফেরা (Porifera - ছিদ্রাল প্রাণী):
    • দেহকোষগুলি কোনো সুগঠিত কলা গঠন করে না (কোষীয় মাত্রার সংগঠন বা Cellular Grade)।
    • দেহে অসংখ্য আণুবীক্ষণিক অন্তঃপ্রবাহী ছিদ্র থাকে যাদের অস্টিয়া (Ostia) বলে এবং শীর্ষে একটি বড় নির্গম ছিদ্র অসক্যুলাম (Osculum) থাকে।
    • দেহের অভ্যন্তরে জলপ্রবাহের জন্য একটি জটিল নালিকাতন্ত্র (Canal System) থাকে এবং অভ্যন্তরীণ গহ্বরটি বিশেষ ফ্ল্যাজেলাযুক্ত কোয়ানোসাইট কোষ (Choanocyte Cells) দ্বারা আবৃত থাকে। অন্তকঙ্কাল স্পিকিউল বা স্পঞ্জিন তন্তু দিয়ে তৈরি।
    • উদাহরণ: Sycon (সাইকন), Spongilla (মিঠাজলের স্পঞ্জ), Euspongia (স্নানের স্পঞ্জ)।
  2. নিডারিয়া (Cnidaria / Coelenterata):
    • দেহ দ্বিস্তরীয় (Diploblastic)—বাইরে এক্টোডার্ম ও ভেতরে এন্ডোডার্ম এবং মাঝে অকোষীয় মেসোগ্লিয়া থাকে।
    • দেহে একটিমাত্র ফাঁপা কেন্দ্রীয় গহ্বর থাকে যা একই সাথে পরিপাক ও সংবহনের কাজ করে, একে সিলেন্টেরন (Coelenteron) বা গ্যাস্ট্রোভাস্কুলার গহ্বর বলে।
    • দেহের কর্ষিকা ও বহিঃত্বকে শিকার ধরা ও আত্মরক্ষার জন্য বিশেষ দংশক অঙ্গাণু (নেমাটোসিস্ট) যুক্ত নিডোব্লাস্ট কোষ (Cnidoblast Cells) থাকে।
    • উদাহরণ: Hydra (হাইড্রা), Aurelia (জেলিফিশ), Metridium (সমুদ্র অ্যানিমোন)।
  3. টিনোফোরা (Ctenophora - চিরুনি জেলি):
    • দেহ স্বচ্ছ, অরীয় প্রতিসম এবং ত্রিস্তরীয়।
    • গমনাঙ্গ হিসেবে দেহের বাইরে ৮টি চিরুনির মতো রোমশ সিলিয়াযুক্ত পাত থাকে, যাদের কম্ব প্লেট (Comb Plates / চিরুনি পাত) বলে।
    • শিকার ধরার জন্য কর্ষিকায় বিশেষ আঠালো কোষ কলব্লাস্ট বা ল্যাসো কোষ (Colloblast Cells) থাকে (নিডোব্লাস্ট অনুপস্থিত)। এরা সুন্দর আলো বিচ্ছুরণ বা বায়োলুমিনেসেন্স (Bioluminescence) প্রদর্শন করে।
    • উদাহরণ: Pleurobrachia, Beroe।
  4. প্লাটিহেলমিনথিস (Platyhelminthes - চ্যাপ্টাকৃমি):
    • দেহ ত্রিস্তরীয় (Triploblastic) হলেও কোনো দেহগহ্বর বা সিলোম থাকে না (সিলোমহীন বা Acoelomate)।
    • দেহ উপর-নিচে অত্যন্ত চ্যাপ্টা বা ফিতার মতো (Dorsoventrally Flattened)।
    • প্রধান রেচন অঙ্গ হলো বিশেষায়িত শিখাকোষ বা ফ্লেম সেল (Flame Cells / Solenocytes)। খাদ্যনালী শাখান্বিত কিন্তু পায়ুছিদ্র থাকে না।
    • উদাহরণ: Taenia solium (ফিতাকৃমি), Fasciola hepatica (যকৃৎ কৃমি), Planaria।
  5. নেমাটোডা বা অ্যাসকেলমিনথিস (Nematoda - গোলকৃমি):
    • দেহ নলাকার, দুই প্রান্ত সুঁচালো এবং অখণ্ডায়িত। দেহ পুরু কিউটিকল দ্বারা আবৃত।
    • প্রকৃত সিলোম নেই, বরং ভ্রূণীয় ব্লাস্টোসিল থেকে সৃষ্ট ছদ্ম-সিলোম বা সিউডোসিলোম (Pseudocoelom) উপস্থিত।
    • পৌষ্টিকনালী সম্পূর্ণ—মুখছিদ্র থেকে পায়ুছিদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। যৌন দ্বিরূপতা দেখা যায় (স্ত্রী কৃমি সাধারণত পুরুষ অপেক্ষা দীর্ঘ)।
    • উদাহরণ: Ascaris lumbricoides (মানুষের পেটের গোলকৃমি), Wuchereria bancrofti (ফাইলেরিয়া রোগের কৃমি)।
  6. অ্যানেলিডা (Annelida - অঙ্গুরীমাল):
    • দেহ আংটির মতো সমআকারের বহু আংটির মতো খণ্ডে গঠিত (Metameric Segmentation)।
    • এরাই প্রাণী জগতের প্রথম প্রকৃত সিলোমযুক্ত (True Coelom / Eucoelomate) প্রাণী।
    • প্রধান রেচন অঙ্গ হলো প্রতিটি খণ্ডে জোড়ায় জোড়ায় সাজানো কুণ্ডলীকৃত নেফ্রিডিয়া (Nephridia)।
    • গমনাঙ্গ কাইটিনময় সিটা (Setae) অথবা মাংসল প্যারাপোডিয়া (Parapodia)। সংবহনতন্ত্র বদ্ধ প্রকৃতির এবং রক্তে হিমোগ্লোবিন বা এরিথ্রোক্রুওরিন থাকে।
    • উদাহরণ: Pheretima posthuma (কেঁচো), Hirudinaria granulosa (জোঁক), Nereis।
  7. আর্থ্রোপোডা (Arthropoda - সন্ধিপদী - প্রাণী জগতের বৃহত্তম পর্ব):
    • সমগ্র জীবজগতের প্রায় ৮০% প্রাণী এই পর্বের অন্তর্ভুক্ত। গমনাঙ্গ হলো জোড়াবদ্ধ সন্ধিল উপাঙ্গ (Jointed Appendages)।
    • দেহ কাইটিন (Chitin) নির্মিত কঠিন বহিঃকঙ্কাল দ্বারা আবৃত, যা বৃদ্ধির সময় নির্দিষ্ট সময় অন্তর মোচনের (Moulting / Ecdysis) মাধ্যমে পরিত্যক্ত হয়।
    • মুক্ত সংবহনতন্ত্র দেখা যায় এবং রক্তে পূর্ণ প্রধান দেহগহ্বরকে হিমোসিল (Haemocoel) বলে। রক্ত বর্ণহীন (হিমোলিম্ফ)।
    • শ্বাস অঙ্গ: পতঙ্গদের ট্রাকিয়া (Trachea), জলজদের ফুলকা, কাঁকড়াবিছার বুক লাং (Book Lung) এবং রাজকাঁকড়ার বুক গিল। রেচন অঙ্গ: পতঙ্গদের ম্যালপিজিয়ান নালিকা (Malpighian Tubules) এবং চিংড়ির সবুজ গ্রন্থি (Green Gland)। মাথায় একজোড়া যৌগিক চোখ বা পুঞ্জাক্ষি (Compound Eyes) থাকে।
    • উদাহরণ: Periplaneta americana (আরশোলা), Palaemon (চিংড়ি), Apis indica (মৌমাছি), Limulus (রাজকাঁকড়া - জীবন্ত জীবাশ্ম)।
  8. মলাস্কা (Mollusca - কম্বোজ বা নরমদেহী - দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্ব):
    • দেহ কোমল, নরম, মাংসল এবং অখণ্ডায়িত।
    • দেহকে ঘিরে একটি পাতলা মাংসল পর্দার মতো আবরণ থাকে, একে ম্যান্টল (Mantle) বলে। ম্যান্টল থেকে ক্ষরিত চুন বা ক্যালসিয়াম কার্বনেটের শক্ত খোলক (Shell) দ্বারা দেহ আবৃত থাকে (অক্টোপাসে খোলক থাকে না)।
    • গমনাঙ্গ একটি সুগঠিত মাংসল পেশিময় পদ (Muscular Foot)।
    • মুখগহ্বরে কাইটিনযুক্ত দাঁত বিশিষ্ট করাতের মতো বিশেষ রেতি-জিহ্বা বা র‍্যা ডুলা (Radula) থাকে। রক্তে তাম্রঘটিত নীল বর্ণের শ্বাসরঞ্জক হিমোসায়ানিন থাকে।
    • উদাহরণ: Pila globosa (আপেল শামুক), Sepia (কাটল ফিশ), Octopus (অক্টোপাস)।
  9. একাইনোডার্মাটা (Echinodermata - কণ্টকত্বকী):
    • দেহের ত্বক চুনময় ক্যালকেরিয়াস অসিকল ও কাঁটার মতো স্পাইন (Spines) দ্বারা আবৃত।
    • পূর্ণাঙ্গ প্রাণী পঞ্চ-অরীয় প্রতিসম (Pentamerous Radial) হলেও মুক্ত সাঁতারু লার্ভা দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম।
    • এদের সবচেয়ে অনন্য গঠন হলো সিলিয়ারি জলসংবহন তন্ত্র (Water Vascular System / Ambulacral System)।
    • গমনাঙ্গ এবং খাদ্যগ্রহণের অঙ্গ হলো জলসংবহন তন্ত্রের সাথে যুক্ত অসংখ্য ছোট ছোট স্থিতিস্থাপক নালীপদ বা টিউব ফিট (Tube Feet)। এরা সকলেই সামুদ্রিক। কোনো রেচন অঙ্গ থাকে না।
    • উদাহরণ: Asterias (তারামাছ বা স্টারফিশ), Echinus (সি আর্চিন), Holothuria (সমুদ্র শসা)।
৭.২ পর্ব কর্ডাটা (Chordata)-র ৪টি মৌলিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

জীবনের যেকোনো দশায় (ভ্রূণাবস্থায় অথবা আজীবন) নিম্নলিখিত চারটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকলে সেই প্রাণীকে পর্ব কর্ডাটা-র অন্তর্ভুক্ত করা হয়:

  • ১. নটোকর্ড (Notochord): দেহের পৃষ্ঠীয় মধ্যরেখা বরাবর একটি স্থিতিস্থাপক, নমনীয় ও অবিভক্ত নিরেট দণ্ডাকার অক্ষ উপস্থিত থাকে। মেরুদণ্ডী প্রাণীদের ক্ষেত্রে এটি পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় অস্থিময় বা তরুণাস্থিময় মেরুদণ্ড (Vertebral Column) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।
  • ২. পৃষ্ঠীয় ফাঁপা স্নায়ুরজ্জু (Dorsal Tubular Nerve Cord): নটোকর্ডের ঠিক উপরে দেহের পৃষ্ঠদেশে একটি ফাঁপা নলাকার স্নায়ুরজ্জু থাকে, যা পরবর্তীতে মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ডে রূপান্তরিত হয়।
  • ৩. গলবিলীয় ফুলকাছিদ্র (Pharyngeal Gill Slits): জীবনের কোনো না কোনো দশায় গলবিলের দুপাশে জোড়াবদ্ধ ফুলকাছিদ্র উপস্থিত থাকে (জলজদের ক্ষেত্রে সারাজীবন থাকে এবং ডাঙ্গার মেরুদণ্ডীদের ক্ষেত্রে কেবল ভ্রূণাবস্থায় দেখা যায়)।
  • ৪. পায়ু-পরবর্তী পেশিময় পুচ্ছ (Post-anal Tail): পায়ুর ঠিক পশ্চাতে পেশিযুক্ত একটি লেজ বর্তমান থাকে (মানুষের ক্ষেত্রে এটি ভেস্টিজিয়াল কক্কিক্সে রূপান্তরিত)।
৭.৩ উপপর্ব ভার্টিব্রাটা বা মেরুদণ্ডী প্রাণীদের ৬টি শ্রেণির তুলনামূলক বিশ্লেষণ

কর্ডাটা পর্বের অন্তর্ভুক্ত যেসব প্রাণীর নটোকর্ড পূর্ণাঙ্গ দশায় তরুণাস্থি বা অস্থিময় মেরুদণ্ডে রূপান্তরিত হয়, তাদের ভার্টিব্রাটা (Vertebrata) বলে। এজন্য প্রচলিত উক্তি হলো: "সকল মেরুদণ্ডীই কর্ডাটা, কিন্তু সকল কর্ডাটা মেরুদণ্ডী নয়।" মেরুদণ্ডীদের প্রধান ৬টি শ্রেণি নিম্নরূপ:

শ্রেণি (Class) কঙ্কাল ও বহিঃআবরণ হৃদপিণ্ড ও রক্ত শ্বাস অঙ্গ ও বিশেষ লক্ষণ উদাহরণ
১. কনড্রিকথিস (তরুণাস্থিময় মাছ) অন্তকঙ্কাল সম্পূর্ণ তরুণাস্থিময়; ত্বক কণ্টকাকীর্ণ আণুবীক্ষণিক প্লাকয়েড আঁশ যুক্ত। ২ প্রকোষ্ঠযুক্ত (১ অলিন্দ + ১ নিলয়); ভেনাস হৃদপিণ্ড; শীতলরক্তীয়। ৫-৭ জোড়া উন্মুক্ত ফুলকাছিদ্র (কানকো নেই); পটকা অনুপস্থিত (ভাসতে হলে অবিরাম সাঁতার কাটতে হয়); অসম হেটারোসার্কাল পুচ্ছপাখনা। হাঙর বা কামট (Scoliodon sorrakowah), করাত মাছ (Pristis), ইলেকট্রিক রে।
২. অস্টিকথিস (অস্থিময় মাছ) অন্তকঙ্কাল প্রধানত অস্থিময়; ত্বক মসৃণ সাইক্লয়েড, টিনয়েড বা গ্যানয়েড আঁশ যুক্ত। ২ প্রকোষ্ঠযুক্ত ভেনাস হৃদপিণ্ড; শীতলরক্তীয় (Poikilothermic)। ৪ জোড়া ফুলকা যা চ্যাপ্টা কানকো (Operculum) দ্বারা ঢাকা থাকে; প্লবতা রক্ষাকারী বায়ুথলি বা পটকা (Swim Bladder) উপস্থিত; পুচ্ছপাখনা সম হোমোসার্কাল। রুই (Labeo rohita), কাতলা (Catla catla), ইলিশ (Tenualosa ilisha), কৈ।
৩. অ্যাম্ফিবিয়া (উভচর) অন্তকঙ্কাল অস্থিময়; ত্বক সর্বদা নগ্ন, ভিজা, পিচ্ছিল ও গ্রন্থিময় (কোনো আঁশ থাকে না)। ৩ প্রকোষ্ঠযুক্ত (২টি অলিন্দ ও ১টি নিলয়); মিশ্র রক্ত সংবহন; শীতলরক্তীয়। জীবনচক্রে জলজ লার্ভা (ব্যাঙাচি) দশা থাকে যা রূপান্তরের মাধ্যমে ডাঙ্গার জীবে পরিণত হয়; লার্ভায় ফুলকা, পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় ফুসফুস ও সিক্ত ত্বক দিয়ে শ্বাসকার্য চলে। কুনোব্যাঙ (Duttaphrynus melanostictus), সোনা ব্যাঙ, স্যালামান্ডার (Salamandra)।
৪. রেপটিলিয়া (সরীসৃপ) ত্বক শুষ্ক, অ-গ্রন্থিময় এবং এপিডার্মিস জাত শক্ত ক্যারাটিনযুক্ত আঁশ বা স্কুট দ্বারা আবৃত। অসম্পূর্ণ ৪ প্রকোষ্ঠযুক্ত (২ অলিন্দ + অসম্পূর্ণ বিভক্ত নিলয়); তবে ব্যতিক্রম: কুমিরের হৃদপিণ্ড সম্পূর্ণ ৪ প্রকোষ্ঠযুক্ত; শীতলরক্তীয়। বুকে ভর দিয়ে গমন করে (উভচরের মতো রূপান্তর নেই); ফুসফুসের মাধ্যমে শ্বাসকার্য চালায়; ডিম্ব শক্ত চুনময় খোলসযুক্ত (Cleidoic Egg)। গোখরো সাপ (Naja naja), গিরগিটি (Calotes versicolor), কুমির, কচ্ছপ।
৫. অ্যাভিস (পক্ষী) সমগ্র দেহ ক্যারাটিন নির্মিত পালক (Feathers) দ্বারা আবৃত; চোয়াল দাঁতহীন শক্ত চঞ্চু বা ঠোঁটে রূপান্তরিত। সম্পূর্ণ ৪ প্রকোষ্ঠযুক্ত (২ অলিন্দ ও ২ নিলয়); ডান মহাধমনী ধনুক বর্তমান; উষ্ণরক্তীয় (Homeothermic)। অগ্রপদ দুটি উড্ডয়নের জন্য ডানায় রূপান্তরিত; অস্থিগুলি হালকা ও ফাঁপা বায়ুপূর্ণ (নিউমেটিক অস্থি - Pneumatic Bones); ফুসফুসের সাথে অতিরিক্ত ৯টি বায়ুথলি (Air Sacs) যুক্ত যা ওড়ার সময় দ্বৈত শ্বসনে সাহায্য করে। পায়রা (Columba livia), ময়ূর (Pavo cristatus), কাক, উটপাখি।
৬. ম্যামালিয়া (স্তন্যপায়ী) ত্বক লোম (Hair) দ্বারা আবৃত; ত্বকে ঘর্মগ্রন্থি ও তৈলগ্রন্থি থাকে; করণে মাংসল বহিঃকর্ণ বা পিনা (Pinna) থাকে। সম্পূর্ণ ৪ প্রকোষ্ঠযুক্ত; কেবল বাম মহাধমনী ধনুক (Left Systemic Arch) বর্তমান; উষ্ণরক্তীয় (Homeothermic)। স্ত্রীদেহে সক্রিয় স্তনগ্রন্থি (Mammary Glands) থাকে যা থেকে নিঃসৃত দুগ্ধ পান করে শাবক প্রতিপালিত হয়; পরিণত লোহিত রক্তকণিকায় নিউক্লিয়াস থাকে না (ব্যতিক্রম: উট ও লামা); বক্ষ ও উদর গহ্বরের মাঝে পেশিময় ডায়াফ্রাম (Diaphragm) থাকে; সাধারণত সজীব শাবক প্রসব করে (ব্যতিক্রম: প্লাটিপাস ডিম পাড়ে)। মানুষ (Homo sapiens), বাঘ (Panthera tigris), নীল তিমি, বাদুড়, প্লাটিপাস।

গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সমীকরণ, বিক্রিয়া ও সূত্র

উপচিতি বিপাক সমীকরণ: সালোকসংশ্লেষ (Photosynthesis)
গ্লুকোজ অণুর সংশ্লেষ ও সৌরশক্তির রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তর
উপচিতি বিপাকে গতিশক্তি স্থৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে কোষে আবদ্ধ হয়।
অপচিতি বিপাক সমীকরণ: শ্বসন (Cellular Respiration)
জটিল জৈব খাদ্যের জারণে জৈব রাসায়নিক গতিশক্তি (ATP) ও তাপ উৎপাদন
কোষীয় শ্বসন হলো প্রধান অপচিতি বিপাক যা জীবের যাবতীয় কাজের শক্তি জোগায়।
মিলার-উরের পরীক্ষার গ্যাসীয় অনুপাত ও পরিবেশ (Miller-Urey Setup, 1953)
৬০,০০০ ভোল্ট বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ (টানা ৭ দিন) ➔ অ্যামিনো অ্যাসিড (গ্লাইসিন, অ্যালানিন) সংশ্লেষ
আদিম বায়ুমণ্ডল ছিল মুক্ত অক্সিজেনহীন বিজারণধর্মী (Reducing Atmosphere)।
বায়োডাইভারসিটি হটস্পট সনাক্তকরণের দ্বৈত শর্ত (নরম্যান মায়ার্স, ১৯৮৮)
বিশ্বে মোট স্বীকৃত হটস্পট = ৩৬টি; ভারতে বিস্তৃত হটস্পট = ৪টি
ভারতের ৪টি হটস্পট: পশ্চিমঘাট-শ্রীলঙ্কা, পূর্ব হিমালয়, ইন্দো-বার্মা এবং সুন্দাল্যান্ড।
লিনিয়ান হায়ারার্কির ৭টি বাধ্যতামূলক ক্রমিক ধাপ (Linnaean Hierarchy)
সর্বোচ্চ ধাপ: জগৎ (Kingdom) | সর্বনিম্ন ও ক্ষুদ্রতম বাস্তব একক: প্রজাতি (Species)
উদ্ভিদের ক্ষেত্রে 'পর্ব' (Phylum)-এর পরিবর্তে 'বিভাগ' (Division) শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
দ্বিপদ নামকরণের আন্তর্জাতিক গঠনরীতি (ICBN & ICZN Rules)
উদাহরণ: মানুষ = Homo sapiens, বাঘ = Panthera tigris, আম = Mangifera indica
প্রাণীতে টোটোনিম (যেমন—Catla catla) বৈধ, কিন্তু উদ্ভিদে টোটোনিম সম্পূর্ণ অবৈধ।
হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসের ৫টি মৌলিক নির্ণায়ক (Whittaker, 1969)
৫টি রাজ্য: ১. মনেরা (Monera), ২. প্রোটিস্টা (Protista), ৩. ছত্রাক (Fungi), ৪. প্ল্যান্টি (Plantae), ৫. অ্যানিম্যালিয়া (Animalia)
অকোষীয় ভাইরাস, ভিরয়েড ও প্রিয়নকে পাঁচ রাজ্যে স্থান দেওয়া হয়নি।
উদ্ভিদের প্রধান পাঁচ বিভাগের বিবর্তনীয় রূপরেখা
অপুষ্পক (ক্রিপ্টোগ্যাম) থেকে উন্নত সপুষ্পক (ফ্যানেরোগ্যাম) উদ্ভিদের ক্রমবিকাশ
ব্রায়োফাইটাতে নিষেকের জন্য জলের প্রয়োজন হওয়ায় এরা 'উদ্ভিদ রাজ্যের উভচর'।
একবীজপত্রী বনাম দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের অঙ্গসংস্থানিক নির্ণায়ক সূত্র
দ্বিবীজপত্রী = ২টি বীজপত্র + জালকাকার শিরাবিন্যাস + প্রধান মূল + ৪/৫ স্তবকী ফুল + বলয়াকার মুক্ত বান্ডিল
একবীজপত্রী কাণ্ডে ক্যাম্বিয়াম না থাকায় গৌণ কাষ্ঠল বৃদ্ধি হয় না (যেমন—ঘাস, ধান, গম, বাঁশ)।
কর্ডাটা পর্বের ৪টি মৌলিক চারিত্রিক নির্ণায়ক
জীবনের যেকোনো দশায় এই চারটি অক্ষীয় বৈশিষ্ট্যের যুগপৎ বা ক্রমান্বয়িক উপস্থিতি
মেরুদণ্ডীদের ক্ষেত্রে হৃদপিণ্ড অঙ্কীয়দেশে অবস্থিত এবং লোহিত রক্তকণিকায় হিমোগ্লোবিন থাকে।
মেরুদণ্ডী ৬টি শ্রেণির হৃদপিণ্ড ও রক্তসংবহন নির্ণায়ক
শীতলরক্তীয় (মৎস্য, উভচর, সরীসৃপ) বনাম উষ্ণরক্তীয় (পক্ষী ও স্তন্যপায়ী)
স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র বাম মহাধমনী ধনুক (Left Systemic Arch) বর্তমান থাকে।
অতি-গুরুত্বপূর্ণ জীবনদায়ী উপক্ষার ও ভেষজ উৎস
যথাক্রমে: ম্যালেরিয়া নিরাময় + উচ্চ রক্তচাপ হ্রাস + ব্লাড ক্যান্সার প্রতিরোধ + অ্যান্টিবায়োটিক + ব্যথানাশক
নয়নতারা থেকে প্রাপ্ত ভিনব্লাস্টিন ও ভিনক্রিস্টিন শিশুদের লিউকেমিয়া চিকিৎসায় বৈপ্লবিক সাফল্য এনেছে।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
উপচিতি ও অপচিতি বিপাকের মধ্যে চারটি প্রধান পার্থক্য নির্দেশ করো। 'বিপাকই জীবনের মূল ভিত্তি'—উক্তিটির যথার্থতা ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১. উপচিতি বিপাক ও অপচিতি বিপাকের তুলনামূলক পার্থক্য:
তুলনার বিষয় উপচিতি বিপাক (Anabolism) অপচিতি বিপাক (Catabolism)
ক. প্রক্রিয়ার রূপ এটি গঠনমূলক বা সংশ্লেষীয় জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া। এটি ভাঙনমূলক বা বিশ্লিষ্টকরণ জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া।
খ. শুষ্ক ওজন জীবদেহের শুষ্ক ওজন চিরস্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পায়। জীবদেহের শুষ্ক ওজন হ্রাস পায়।
গ. শক্তির পরিবর্তন শক্তি আবদ্ধ বা শোষিত হয় (Endergonic)। শক্তি তাপ ও এটিপি রূপে নির্গত বা মুক্ত হয় (Exergonic)।
ঘ. উদাহরণ সালোকসংশ্লেষ, প্রোটিন সংশ্লেষ। শ্বসন, রেচন প্রক্রিয়া।
২. 'বিপাকই জীবনের মূল ভিত্তি'—উক্তিটির যথার্থতা:
  • জীবদেহের প্রতিটি সজীব কোষে প্রতি মুহূর্তে অবিরাম হাজার হাজার রাসায়নিক ক্রিয়া সংঘটিত হচ্ছে। এই সমস্ত ক্রিয়ার সমষ্টিই হলো বিপাক।
  • উপচিতি বিপাকের মাধ্যমে কোষে খাদ্য, উৎসেচক, হরমোন এবং নতুন প্রোটোপ্লাজম তৈরি হয়, যার ফলে জীবদেহের সামগ্রিক বৃদ্ধি, বিকাশ এবং ক্ষতস্থানের ক্ষয়পূরণ সম্ভব হয়।
  • অপরদিকে অপচিতি বিপাকের (শ্বসন) মাধ্যমে কোষীয় গ্লুকোজ জারিত হয়ে সার্বজনীন শক্তি মুদ্রা এটিপি (ATP) উৎপন্ন হয়, যা জীবের চলন-গমন, সংবেদনশীলতা, প্রজনন এবং স্নায়বিক সংকেত পরিবহনের মতো যাবতীয় জৈবনিক কাজের রসদ জোগায়।
  • কোনো জীবের বিপাকক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো সেই জীবের তাৎক্ষণিক জৈবিক মৃত্যু। নির্জীব বস্তুতে কোনো বিপাক ঘটে না। তাই বিজ্ঞানী হাক্সলে ও আধুনিক জীববিজ্ঞানীদের মতে, বিপাকই সজীবতার প্রধানতম ও অনস্বীকার্য লক্ষণ।
উদাহরণ 2
মিলার ও উরের পরীক্ষার (১৯৫৩) উদ্দেশ্য, ব্যবহৃত গ্যাসসমূহের অনুপাত, পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা এবং প্রধান পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত আলোচনা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১৯৫৩ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলার ও হ্যারল্ড উরে আদিম পৃথিবীর পরিবেশে জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তির সপক্ষে এক যুগান্তকারী পরীক্ষা সম্পন্ন করেন: ১. পরীক্ষার উদ্দেশ্য: ওপারিন ও হ্যালডেন প্রস্তাবিত তত্ত্ব অনুসারে—আদিম বিজারণ বায়ুমণ্ডলের অজৈব গ্যাসসমূহ থেকে রাসায়নিক বিবর্তনের মাধ্যমে জীবনের আদি উপাদান (অ্যামিনো অ্যাসিড ও প্রোটিন) তৈরি হওয়া সম্ভব কিনা, তা পরীক্ষাগারে কৃত্রিমভাবে প্রমাণ করা। ২. গ্যাসীয় মিশ্রণ ও অনুপাত: একটি কাঁচের ফ্লাস্কে আদিম বায়ুমণ্ডলের গ্যাসসমূহ—মিথেন (CH₄), অ্যামোনিয়া (NH₃) এবং হাইড্রোজেন (H₂) ঠিক ২ : ২ : ১ অনুপাতে নেওয়া হয়। আদিম বায়ুমণ্ডলে কোনো মুক্ত অক্সিজেন না থাকায় ফ্লাস্কটিকে সম্পূর্ণ বাতাসশূন্য করে অক্সিজেনমুক্ত রাখা হয়। ৩. পরীক্ষামূলক কার্যপদ্ধতি:
  • একটি ছোট ফ্লাস্কে জল ফুটিয়ে অবিরাম জলীয় বাষ্প সরবরাহ করা হয়।
  • বৃহৎ কাঁচের ফ্লাস্কে দুটি টাংস্টেন ইলেকট্রোডের মাধ্যমে প্রায় ৬০,০০০ ভোল্টের (বা ৬০০০-৮০০০ ভোল্ট অবিরাম) বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ ঘটানো হয়, যা আদিম পৃথিবীর তীব্র বজ্রপাত ও অতিবেগুনি বিকিরণের অনুকৃতি ছিল।
  • এই প্রক্রিয়া টানা সাত (৭) দিন ধরে অবিরাম চালানো হয় এবং উৎপন্ন গ্যাসকে কনডেনসারের মাধ্যমে ঘনীভূত করে তরল হিসেবে U-নলে জমা করা হয়।
৪. পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত:
  • সাত দিন পর সংগৃহীত লালচে-বাদামী তরলটিকে পেপার ক্রোমাটোগ্রাফির সাহায্যে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে সেখানে তৈরি হয়েছে একাধিক অতি গুরুত্বপূর্ণ অ্যামিনো অ্যাসিড—যেমন গ্লাইসিন (Glycine), অ্যালানিন (Alanine), অ্যাসপার্টিক অ্যাসিড (Aspartic acid) এবং বিভিন্ন জৈব অ্যাসিড (গ্লাইকোলিক ও ল্যাকটিক অ্যাসিড) ও ইউরিয়া।
  • সিদ্ধান্ত: এই পরীক্ষার মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে আদিম পৃথিবীর বিজারণ বায়ুমণ্ডলে অজৈব উপাদানের পারস্পরিক মিলনে অজৈব থেকে সরল জৈব যৌগের স্বতঃস্ফূর্ত সংশ্লেষ (Abiotic Synthesis) এবং রাসায়নিক বিবর্তনের মাধ্যমে জীবনের সৃষ্টি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক সত্য।
উদাহরণ 3
দ্বিপদ নামকরণের প্রবক্তা কে? ICBN ও ICZN অনুসারে দ্বিপদ নামকরণের প্রধান চারটি নিয়ম উদাহরণসহ লেখো। টোটোনিম কাকে বলে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১. দ্বিপদ নামকরণের প্রবক্তা: সুইডিশ প্রকৃতিবিদ ও শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যার জনক ক্যারোলাস লিনিয়াস (Carolus Linnaeus) ১৭৫৩ সালে তাঁর 'Species Plantarum' গ্রন্থে দ্বিপদ নামকরণের প্রবর্তন করেন। ২. দ্বিপদ নামকরণের প্রধান আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী (ICBN ও ICZN অনুসারে):
  • ক. দুটি লাতিন পদ: প্রতিটি বিজ্ঞানসম্মত নামের দুটি পদ থাকবে। প্রথম পদটি গণের নাম (Generic Name) এবং দ্বিতীয় পদটি প্রজাতির নাম (Specific Epithet)। ভাষাটি সর্বদা লাতিন বা লাতিনিকৃত হতে হবে। যেমন—মানুষের বিজ্ঞানসম্মত নাম Homo sapiens; এখানে Homo হলো গণ এবং sapiens হলো প্রজাতি।
  • খ. হরফের ব্যবহার: গণের নামের প্রথম অক্ষরটি সর্বদা ইংরেজি বড় হাতের (Capital Letter) হবে, কিন্তু প্রজাতির নামটি সর্বদা ছোট হাতের অক্ষরে (Small Letter) লিখতে হবে। যেমন—Panthera tigris (বাঘ)।
  • গ. ছাপার ও হাতের লেখার নিয়ম: ছাপাখানায় মুদ্রণের সময় বিজ্ঞানসম্মত নামটি সর্বদা বাঁকা হরফে (Italics) ছাপতে হবে। কিন্তু খাতায় হাতে লেখার সময় গণ ও প্রজাতির পদের নিচে পৃথকভাবে নিম্নরেখা (Separate Underline) টানতে হবে। যেমন—Panthera leo (সিংহ)।
  • ঘ. বিজ্ঞানীর নাম সংক্ষেপণ ও অগ্রাধিকার নীতি: প্রজাতির নামের শেষে আবিষ্কারক বিজ্ঞানীর নাম সংক্ষেপে সোজা হরফে যুক্ত করা যায় (যেমন—Pisum sativum L.)। একাধিক নাম প্রস্তাবিত হলে সর্বপ্রথম নিয়ম মেনে প্রকাশিত নামটিই আন্তর্জাতিকভাবে বৈধ হবে (Law of Priority)।
৩. টোটোনিম (Tautonym): যে বিজ্ঞানসম্মত নামে গণের নাম এবং প্রজাতির নাম হুবহু এক ও অভিন্ন হয়, তাকে টোটোনিম বলে।
  • প্রাণীবিজ্ঞানে (ICZN): টোটোনিম সম্পূর্ণ বৈধ। যেমন—কাতলা মাছ (Catla catla), ভারতীয় গোখরো সাপ (Naja naja)।
  • উদ্ভিদবিজ্ঞানে (ICBN / ICN): টোটোনিম সম্পূর্ণ অবৈধ ও নিষিদ্ধ। যেমন—আপেলের বিজ্ঞানসম্মত নাম কখনোই Malus malus হতে পারে না, তা হবে Malus domestica।
উদাহরণ 4
হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসের বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তিগুলি কী কী? মনেরা ও প্রোটিস্টা রাজ্যের মধ্যে তিনটি মৌলিক পার্থক্য লেখো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১. হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসের (১৯৬৯) প্রধান ভিত্তিগুলি: আমেরিকান বাস্তুবিজ্ঞানী আর. এইচ. হুইটেকার পাঁচটি সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তির ওপর নির্ভর করে জীবজগৎকে ভাগ করেন:
  • ক. কোষীয় জটিলতা: কোষটি প্রোক্যারিওটিক (আদিকোষী) নাকি ইউক্যারিওটিক (সুকেন্দ্রিক)।
  • খ. দৈহিক সংগঠনের জটিলতা: জীবদেহ এককোষী নাকি বহুকোষী; বহুকোষী হলে কলা ও অঙ্গতন্ত্রের বিকাশ কতটা উন্নত।
  • গ. পুষ্টির পদ্ধতি: পুষ্টি প্রক্রিয়াটি স্বভোজী (সালোকসংশ্লেষীয়) নাকি পরভোজী (মৃতজীবী বিশোষণীয় নাকি প্রাণীসুলভ হলোজোয়িক গিলে খাওয়া)।
  • ঘ. বাস্তুতান্ত্রিক ভূমিকা: পরিবেশের খাদ্যশৃঙ্খলে জীবটির প্রধান ভূমিকা—উৎপাদক (প্ল্যান্টি), খাদক (অ্যানিম্যালিয়া) নাকি বিয়োজক (ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া)।
  • ঙ. জাতিজনি সম্পর্ক: সরল জীব থেকে জটিল জীবের বিবর্তনীয় বা জাতিজনি যোগসূত্র।
২. মনেরা বনাম প্রোটিস্টা রাজ্যের তুলনামূলক পার্থক্য:
তুলনার বিষয় রাজ্য মনেরা (Monera) রাজ্য প্রোটিস্টা (Protista)
১. নিউক্লিয়াসের প্রকৃতি এরা প্রোক্যারিওটিক; কোনো নিউক্লিয় পর্দা থাকে না, নগ্ন ডিএনএ যুক্ত নিউক্লিওয়েড থাকে। এরা ইউক্যারিওটিক; নিউক্লিয় পর্দা, নিউক্লিওলাস ও ক্রোমাটিন জালিকাযুক্ত সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে।
২. কোষ অঙ্গাণু ও রাইবোজোম ঝিল্লিবেষ্টিত কোনো অঙ্গাণু (মাইটোকনড্রিয়া, গলগি বডি) থাকে না; রাইবোজোম ৭০S (70S) প্রকৃতির। পর্দাঘেরা সমস্ত অঙ্গাণু (মাইটোকনড্রিয়া, ইআর ইত্যাদি) উপস্থিত; রাইবোজোম ৮০S (80S) প্রকৃতির।
৩. কোষপ্রাচীরের উপাদান কোষপ্রাচীর পলিস্যাকারাইড ও অ্যামিনো অ্যাসিডের মিশ্র পলিমার পেপটাইডোগ্লাইক্যান দ্বারা গঠিত। প্রোটোজোয়াদের কোষে প্রাচীর থাকে না; শৈবালজাতীয় প্রোটিস্টে থাকলে তা সেলুলোজ নির্মিত।
৪. পরিচিত উদাহরণ Escherichia coli (ব্যাকটেরিয়া), Nostoc, Anabaena। Amoeba proteus, Paramecium, Euglena, ডায়াটম।
উদাহরণ 5
ব্রায়োফাইটাকে 'উদ্ভিদ রাজ্যের উভচর' বলা হয় কেন? একবীজপত্রী ও দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের মধ্যে মূল, পাতা, ফুল ও বীজের ভিত্তিতে পার্থক্য নির্দেশ করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১. ব্রায়োফাইটাকে 'উদ্ভিদ রাজ্যের উভচর' বলার বৈজ্ঞানিক কারণ:
  • প্রাণীজগতের উভচর প্রাণীরা (যেমন ব্যাঙ) বসবাস করার জন্য প্রধানত ডাঙ্গার পরিবেশ বেছে নিলেও ডিম পাড়া, শুক্রাণুর চলন ও নিষেকের জন্য তাদের জলে প্রবেশ করতে হয়।
  • ঠিক একইভাবে, মস বা ব্রায়োফাইটা জাতীয় উদ্ভিদরা আর্দ্র ছায়াঘেরা ডাঙ্গায় জন্মায় এবং শারীরবৃত্তীয় জীবন অতিবাহিত করে। কিন্তু তাদের যৌন জননের সময় পুংজননাঙ্গ (অ্যান্থেরিডিয়াম) থেকে উৎপন্ন দ্বি-ফ্ল্যাজেলাযুক্ত চলনশীল শুক্রাণুগুলি (অ্যান্থেরোজয়েড) সাঁতার কেটে স্ত্রীজননাঙ্গে (আর্কিগোনিয়াম) পৌঁছানোর জন্য এবং নিষেকের জন্য জলের উপস্থিতি অপরিহার্য।
  • জল ছাড়া এদের নিষেক এবং জীবনচক্র সম্পূর্ণ হওয়া অসম্ভব। যেহেতু এদের স্বাভাবিক বাসস্থান ডাঙ্গায় কিন্তু প্রজনন ও নিষেক জলের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল, তাই বিজ্ঞানী ও পাঠ্যপুস্তকে ব্রায়োফাইটাকে যথার্থই 'উদ্ভিদ রাজ্যের উভচর' (Amphibians of the Plant Kingdom) বলা হয়। উদাহরণ: Riccia, Funaria।
২. একবীজপত্রী ও দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য:
তুলনার ভিত্তি একবীজপত্রী উদ্ভিদ (Monocot) দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদ (Dicot)
ক. বীজ (Seed) বীজে মাত্র ১টি বীজপত্র থাকে। যেমন—ধান, ভুট্টা। বীজে স্পষ্টভাবে ২টি বীজপত্র থাকে। যেমন—মটর, আম।
খ. মূলতন্ত্র (Root) প্রাথমিক মূল স্বল্পস্থায়ী; কাণ্ডের গোড়া থেকে গুচ্ছমূল (Fibrous Root) বের হয়। ভ্রূণমূল থেকে দীর্ঘস্থায়ী শক্তিশালী প্রধান মূল (Tap Root) ও শাখা মূল গঠিত হয়।
গ. পাতা (Leaf) পাতায় সমান্তরাল শিরাবিন্যাস (Parallel Venation) দেখা যায়। পাতায় জালের মতো ছড়ানো জালকাকার শিরাবিন্যাস (Reticulate Venation) থাকে।
ঘ. ফুল (Flower) ফুলের অংশগুলি ৩ বা ৩-এর গুণিতক অর্থাৎ ত্রয়ী বা ট্রাইমেরাস। ফুলের অংশগুলি ৪ বা ৫ বা তাদের গুণিতক অর্থাৎ টেট্রামেরাস বা পেন্টামেরাস।
ঙ. কাণ্ড ও বান্ডিল সংবহন বান্ডিল কাণ্ডে বিক্ষিপ্ত এবং বদ্ধ (ক্যাম্বিয়ামহীন); গৌণ বৃদ্ধি হয় না। সংবহন বান্ডিল বলয়াকারে সাজানো এবং মুক্ত (ক্যাম্বিয়ামযুক্ত); কাষ্ঠল গৌণ বৃদ্ধি ঘটে।
উদাহরণ 6
সন্ধিপদী বা আর্থ্রোপোডা পর্বকে প্রাণীজগতের বৃহত্তম পর্ব বলা হয় কেন? আর্থ্রোপোডা ও অ্যানেলিডা পর্বের মধ্যে তিনটি প্রধান পার্থক্য লেখো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১. আর্থ্রোপোডাকে প্রাণীজগতের বৃহত্তম পর্ব বলার কারণ: প্রাণীজগতের মোট জ্ঞাত প্রজাতির প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি (প্রায় ১০ লক্ষাধিক প্রজাতি) আর্থ্রোপোডা পর্বের অন্তর্ভুক্ত। এদের এমন বিপুল বৈচিত্র্য ও সাফল্যের কারণ:
  • কাইটিনাস বহিঃকঙ্কাল: এদের দেহ জলরোধী ও শক্ত কাইটিন নির্মিত বহিঃকঙ্কাল দ্বারা ঢাকা থাকায় জলবায়ুর শুষ্কতা থেকে রক্ষা পায়।
  • সন্ধিল উপাঙ্গ: জোড়াবদ্ধ ও সন্ধিযুক্ত পায়ের সাহায্যে এরা দ্রুত দৌড়াতে, উড়তে বা সাঁতার কাটতে পারে।
  • উন্নত শ্বাস ও রেচনতন্ত্র: অতি দক্ষ ট্রাকিয়া এবং ম্যালপিজিয়ান নালিকা দ্বারা কম জল খরচ করে রেচন পদার্থ ইউরিক অ্যাসিড ত্যাগ করতে পারে। ফলে এরা বরফাবৃত মেরু থেকে উত্তপ্ত মরুভূমি—পৃথিবীর সর্বত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে।
২. অ্যানেলিডা বনাম আর্থ্রোপোডা পর্বের তুলনামূলক পার্থক্য:
তুলনার বিষয় পর্ব অ্যানেলিডা (Annelida) পর্ব আর্থ্রোপোডা (Arthropoda)
১. গমনাঙ্গ ও উপাঙ্গ গমনাঙ্গ কাইটিনময় সিটা (Setae) অথবা মাংসল প্যারাপোডিয়া; কোনো সন্ধিল পদ থাকে না। গমনাঙ্গ জোড়াবদ্ধ সন্ধিল উপাঙ্গ বা সন্ধিযুক্ত পদ (Jointed Appendages); অনেকের ডানা থাকে।
২. সংবহনতন্ত্র ও দেহগহ্বর সংবহনতন্ত্র বদ্ধ (Closed) প্রকৃতির; সিলোম রক্তহীন এবং রক্ত রঞ্জক রক্তরসে দ্রবীভূত থাকে। সংবহনতন্ত্র মুক্ত (Open) প্রকৃতির; প্রধান দেহগহ্বর রক্তে পূর্ণ হিমোসিল (Haemocoel)।
৩. রেচন অঙ্গ প্রধান রেচন অঙ্গ হলো প্রতিটি খণ্ডে জোড়ায় সজ্জিত নেফ্রিডিয়া (Nephridia)। প্রধান রেচন অঙ্গ ম্যালপিজিয়ান নালিকা (পতঙ্গ) অথবা সবুজ গ্রন্থি (চিংড়ি)।
৪. চোখ ও সংবেদী অঙ্গ সরল আলোকসংবেদী বিন্দু থাকে; পুঞ্জাক্ষি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। মাথায় একজোড়া জটিল যৌগিক চক্ষু বা পুঞ্জাক্ষি (Compound Eyes) থাকে।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে উপচিতি ও অপচিতি উভয় বিপাকেই জীবদেহের শুষ্ক ওজন বৃদ্ধি পায় বা একই থাকে।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

শ্বসন একটি অপচিতি বিপাক। এতে জটিল জৈব অণু বিশ্লিষ্ট হয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প হিসেবে দেহ থেকে নির্গত হয়, ফলে শুষ্ক ওজন সর্বদা হ্রাস পায়। একমাত্র গঠনমূলক উপচিতি বিপাকেই (যেমন সালোকসংশ্লেষ) শুষ্ক ওজন বৃদ্ধি পায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

মিলার ও উরের পরীক্ষায় ব্যবহৃত গ্যাসগুলির অনুপাতে অক্সিজেন অন্তর্ভুক্ত করা বা ভুল অনুপাত লেখা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

আদিম পৃথিবীতে কোনো মুক্ত অক্সিজেন ছিল না। মিলার ও উরে মিথেন (CH₄), অ্যামোনিয়া (NH₃) এবং হাইড্রোজেন (H₂) গ্যাস ঠিক ২ : ২ : ১ অনুপাতে কাঁচের ফ্লাস্কে নিয়েছিলেন এবং তাতে ফুটন্ত জলীয় বাষ্প যোগ করেছিলেন। মুক্ত অক্সিজেন বিন্দুমাত্র ছিল না।

সাধারণ ভুল ধারণা

ব্রায়োফাইটা এবং টেরিডোফাইটার সংবহনকলা সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যের গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ব্রায়োফাইটা (মস) হলো সম্পূর্ণ সংবহনকলাবিহীন অপুষ্পক উদ্ভিদ (Non-vascular Cryptogams)। পক্ষান্তরে, টেরিডোফাইটা (ফার্ন) হলো উদ্ভিদ জগতের প্রথম সংবহনকলাযুক্ত অপুষ্পক উদ্ভিদ (Vascular Cryptogams)।

সাধারণ ভুল ধারণা

দ্বিপদ নামকরণে হাতের লেখার সঠিক নিয়ম না মানা (নিচে আন্ডারলাইন না করা বা ভুল অক্ষরে লেখা)।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

হাতে লেখার সময় গণের প্রথম অক্ষর বড়হাতে (H) এবং প্রজাতির প্রথম অক্ষর ছোটহাতে (s) লিখতে হবে এবং উভয়ের নিচে অবশ্যই পৃথকভাবে দাগ টানতে হবে: Homo sapiens। দাগ না দিলে বোর্ড পরীক্ষায় সরাসরি পূর্ণ নম্বর কাটা যায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে ছত্রাকের কোষপ্রাচীর উদ্ভিদের মতো সেলুলোজ দিয়ে গঠিত এবং এদের সঞ্চিত খাদ্য শ্বেতসার।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ছত্রাকের কোষপ্রাচীর উদ্ভিদের মতো সেলুলোজ দিয়ে তৈরি নয়; এটি নাইট্রোজেনঘটিত পলিস্যাকারাইড কাইটিন (Chitin) দিয়ে গঠিত। এছাড়া এদের কোষে কখনোই শ্বেতসার থাকে না, এদের সঞ্চিত খাদ্য হলো প্রাণীদেহের মতো গ্লাইকোজেন (Glycogen) ও তেলবিন্দু।

সাধারণ ভুল ধারণা

'সকল কর্ডাটাই মেরুদণ্ডী'—এই বাক্যটিকে সঠিক বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

উক্তিটি সম্পূর্ণ ভুল। সঠিক উক্তিটি হলো: 'সকল মেরুদণ্ডীই কর্ডাটা, কিন্তু সকল কর্ডাটা মেরুদণ্ডী নয়'। কারণ কর্ডাটা পর্বের প্রোটোকর্ডাটা উপপর্বের প্রাণীদের (যেমন অ্যাসিডিয়া, অ্যাম্ফিঅক্সাস) দেহে কেবল নটোকর্ড থাকে, তা কখনোই মেরুদণ্ডে রূপান্তরিত হয় না। কেবলমাত্র ভার্টিব্রাটা উপপর্বের প্রাণীদের নটোকর্ড মেরুদণ্ডে পরিণত হয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

তিমি মাছকে জলজ প্রাণী দেখে 'মৎস্য' (Pisces) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

তিমি কোনো মাছ নয়, এটি একটি প্রকৃত স্তন্যপায়ী (Mammalia) শ্রেণির প্রাণী। মাছের মতো এদের ফুলকা বা পটকা থাকে না; এরা ফুসফুস দিয়ে শ্বাস নেয়, সরাসরি বাচ্চা প্রসব করে এবং শাবককে স্তনগ্রন্থির দুধ পান করিয়ে প্রতিপালন করে। এদের হৃদপিণ্ড ৪ প্রকোষ্ঠযুক্ত এবং উষ্ণরক্তীয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

সরীসৃপের হৃদপিণ্ডের প্রকোষ্ঠ লেখার সময় কুমিরের ব্যতিক্রম ভুলে যাওয়া।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অধিকাংশ সরীসৃপের (যেমন সাপ, গিরগিটি) হৃদপিণ্ড অসম্পূর্ণ চার প্রকোষ্ঠযুক্ত হলেও 'কুমির' এর একমাত্র উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। কুমিরের নিলয় প্রাচীর সম্পূর্ণভাবে বিভক্ত হওয়ায় এর হৃদপিণ্ড সুনির্দিষ্টভাবে ৪ প্রকোষ্ঠযুক্ত (২টি অলিন্দ ও ২টি নিলয়)।

জীবন ও তার বৈচিত্র্য: ধারণাগত রূপরেখা ও শ্রেণিবিন্যাস কাঠামো (WBBSE Class 9 Chapter 1)

WBBSE CLASS IX SCIENCE জীবন ও তার বৈচিত্র্য: মূল রূপরেখা ও শ্রেণিবিন্যাস (WBBSE নবম শ্রেণি জীবন বিজ্ঞান) জীবনের উৎপত্তি • হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য • উদ্ভিদ ও প্রাণী রাজ্যের শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যা I ১. জীবনের উৎপত্তি ও মিলার-উরের পরীক্ষা ওপারিন-হ্যালডেন তত্ত্ব: আদিম বিজারণমূলক পরিবেশ ও তপ্ত লঘু সুপ রাসায়নিক বিবর্তন: মিথেন, অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন (২:২:১) ও বাষ্প মিলার ও উরের পরীক্ষা (১৯৫৩): অ্যামিনো অ্যাসিডের জৈব সংশ্লেষ প্রোটোবায়োন্ট: ওপারিনের কোয়াসারভেট ও ফক্সের মাইক্রোস্ফিয়ার II ২. ট্যাক্সোনমি ও দ্বিপদ নামকরণ ক্যারোলাস লিনিয়াস: দ্বিপদ নামকরণের জনক (Systema Naturae) লিনীয় হায়ারার্কি: রাজ্য -> পর্ব -> শ্রেণি -> বর্গ -> গোত্র -> গণ -> প্রজাতি ICBN ও ICZN নিয়মাবলী: গণ (বড় হাত) ও প্রজাতি (ছোট হাত) ল্যাটিন পদ জীববৈচিত্র্যের স্তর: জিনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য III ৩. হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাস মনেরা: প্রোক্যারিওটিক, এককোষী, পেপটিডোগ্লাইকান প্রাচীর (ব্যাকটেরিয়া) প্রোটিস্টা: ইউক্যারিওটিক, এককোষী (অ্যামিবা, প্যারামিসিয়াম) ফাঞ্জাই: কাইটিন প্রাচীরযুক্ত হেটারোট্রফিক মৃতজীবী ছত্রাক (মিউকর) প্ল্যান্টি (উদ্ভিদ) ও অ্যানিম্যালিয়া (প্রাণী) বহুমুখী কোষীয় সংগঠন IV ৪. উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের বৈচিত্র্য উদ্ভিদ: সমাঙ্গদেহী, ব্রায়োফাইটা (উভচর), টেরিডোফাইটা, ব্যক্তবীজী ও গুপ্তবীজী অমেরুদণ্ডী: পরিফেরা, নিডারিয়া, প্লাটিহেলমিনথিস, অ্যানেলিডা, আর্থ্রোপোডা, মলাস্কা কর্ডাটা: নটোকর্ড, পৃষ্ঠীয় স্নায়ুরজ্জু ও গলবিলীয় ফুলকা ছিদ্রের উপস্থিতি ভার্টিব্রাটা: মৎস (কনড্রিকথিস, অস্টিকথিস), উভচর, সরীসৃপ, পক্ষী ও স্তন্যপায়ী জীবনের সার্বজনীন ভিত্তি: প্রোটোপ্লাজমীয় সংগঠন • উপচিতি ও অপচিতি বিপাক • বংশগতি • অভিযোজন

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
১. জীবনের ভিত্তি ও প্রোটোপ্লাজম: জীবন হলো প্রোটোপ্লাজমের স্বনিয়ন্ত্রিত, সংবেদনশীল ও স্বপ্রজননশীল জটিল প্রকাশ। বিজ্ঞানী টি. এইচ. হাক্সলে যথার্থই প্রোটোপ্লাজমকে 'জীবনের ভৌত ভিত্তি' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
মূল বিষয় 2
২. উপচিতি বনাম অপচিতি বিপাক: জীবদেহের গঠনমূলক, শক্তি সঞ্চয়কারী ও শুষ্ক ওজন বৃদ্ধিকারী বিপাক হলো উপচিতি (যেমন সালোকসংশ্লেষ)। অপরদিকে ভাঙনমূলক, শক্তি নির্গমনকারী ও শুষ্ক ওজন হ্রাসকারী বিপাক হলো অপচিতি (যেমন শ্বসন ও রেচন)। ক্লদ বার্নার্ড ও ক্যানন প্রবর্তিত হোমিওস্ট্যাসিস অভ্যন্তরীণ পরিবেশের সাম্য বজায় রাখে।
মূল বিষয় 3
৩. আদিম পৃথিবী ও ওপারিন-হ্যালডেন তত্ত্ব: প্রায় ৪৬০ কোটি বছর পূর্বে সৃষ্ট আদিম পৃথিবী ছিল মুক্ত অক্সিজেনহীন ও বিজারণধর্মী। ওপারিন ও হ্যালডেনের তত্ত্বানুসারে আদিম উত্তপ্ত সমুদ্রে অজৈব উপাদান থেকে সরল জৈব অণু সৃষ্টি হয়ে 'তপ্ত লঘু স্যুপ' (Hot Dilute Soup) গড়ে ওঠে এবং ওপারিনের কোয়াসারভেট ও ফক্সের মাইক্রোস্ফিয়ার থেকে আদি কোষের সূচনা ঘটে।
মূল বিষয় 4
৪. মিলার ও উরের ঐতিহাসিক পরীক্ষা (১৯৫৩): কাঁচের কৃত্রিম স্পার্ক ডিসচার্জ যন্ত্রে মিথেন, অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন (২:২:১) এবং ফুটন্ত জলীয় বাষ্পে ৬০,০০০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ টানা ৭ দিন চালনা করে মিলার ও উরে কৃত্রিমভাবে গ্লাইসিন, অ্যালানিন প্রভৃতি অ্যামিনো অ্যাসিড ও জৈব অ্যাসিড সংশ্লেষ করে ওপারিন-হ্যালডেন তত্ত্বের অকাট্য প্রমাণ দেন।
মূল বিষয় 5
৫. জীববৈচিত্র্য ও জীবনদায়ী ওষুধ: জীববৈচিত্র্যের তিনটি স্তর—জিনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতান্ত্রিক (আলফা, বিটা, গামা)। জীববৈচিত্র্য আমাদের জীবনদায়ী ওষুধের প্রধান উৎস: সিনকোনার ছাল থেকে ম্যালেরিয়ার কুইনাইন, সর্পগন্ধার মূল থেকে উচ্চ রক্তচাপের রেসারপিন, নয়নতারা থেকে লিউকেমিয়ার ভিনব্লাস্টিন ও ভিনক্রিস্টিন এবং পেনিসিলিয়াম থেকে অ্যান্টিবায়োটিক পেনিসিলিন।
মূল বিষয় 6
৬. জীববৈচিত্র্যের সংকট ও হটস্পট: বাসস্থান ধ্বংস, অতি-শোষণ, বহিরাগত প্রজাতি (কচুরিপানা—বাংলার সন্ত্রাস) ও সহ-বিলুপ্তি হলো জীববৈচিত্র্য হ্রাসের 'দ্য ইভিল কোয়ার্টেট'। নরম্যান মায়ার্স প্রবর্তিত হটস্পট ঘোষণার দুটি শর্ত: অন্তত ১৫০০ এন্ডেমিক সংবহনকলাযুক্ত উদ্ভিদ ও ৭০% বাসস্থানের বিনাশ। ভারতে ৪টি হটস্পট: পশ্চিমঘাট-শ্রীলঙ্কা, পূর্ব হিমালয়, ইন্দো-বার্মা ও সুন্দাল্যান্ড।
মূল বিষয় 7
৭. ট্যাক্সোনমি ও দ্বিপদ নামকরণ: অগাস্টিন দ্য কঁদোল ট্যাক্সোনমি শব্দটির প্রবর্তন করেন। ট্যাক্সোনমির জনক ক্যারোলাস লিনিয়াসের লিনিয়ান হায়ারার্কির বাধ্যতামূলক ৭টি ধাপ: জগৎ ➔ পর্ব ➔ শ্রেণি ➔ বর্গ ➔ গোত্র ➔ গণ ➔ প্রজাতি (শ্রেণিবিন্যাসের মৌলিক একক)। ICBN ও ICZN-এর নিয়ম মেনে লাতিন ভাষায় দ্বিপদ নামকরণ লেখা হয় (যেমন মানুষ: Homo sapiens, বাঘ: Panthera tigris)।
মূল বিষয় 8
৮. হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাস (১৯৬৯): কোষীয় গঠন, দৈহিক জটিলতা, পুষ্টির ধরন, বাস্তুতান্ত্রিক ভূমিকা ও জাতিজনির ভিত্তিতে হুইটেকার জীবজগৎকে ৫টি রাজ্যে ভাগ করেন: মনেরা (প্রোক্যারিওটিক পেপটাইডোগ্লাইক্যান প্রাচীরযুক্ত ব্যাকটেরিয়া), প্রোটিস্টা (এককোষী ইউক্যারিওট), ছত্রাক (কাইটিন প্রাচীরযুক্ত মৃতজীবী), প্ল্যান্টি (সেলুলোজ প্রাচীরযুক্ত উৎপাদক) এবং অ্যানিম্যালিয়া (কোষপ্রাচীরহীন হলোজোয়িক খাদক)।
মূল বিষয় 9
৯. উদ্ভিদ রাজ্যের প্রধান বিভাগসমূহ: থ্যালোফাইটা (শৈবাল, সমাঙ্গদেহী), ব্রায়োফাইটা (মস, নিষেকের জন্য জলের আবশ্যকতায় 'উদ্ভিদ রাজ্যের উভচর'), টেরিডোফাইটা (ফার্ন, প্রথম সংবহনকলাযুক্ত অপুষ্পক), ব্যক্তবীজী (পাইন, ফলবিহীন নগ্নবীজ) এবং গুপ্তবীজী (ফল দ্বারা আবৃতবীজ ও দ্বিনিষেকযুক্ত)। গুপ্তবীজীর দুটি শ্রেণি: একবীজপত্রী (গুচ্ছমূল, সমান্তরাল শিরাবিন্যাস) ও দ্বিবীজপত্রী (প্রধান মূল, জালকাকার শিরাবিন্যাস)।
মূল বিষয় 10
১০. প্রাণী রাজ্যের পর্ব ও ভার্টিব্রাটার ৬টি শ্রেণি: অমেরুদণ্ডী প্রধান পর্ব—পরিফেরা (অস্টিয়া, কোয়ানোসাইট), নিডারিয়া (নিডোব্লাস্ট, সিলেন্টেরন), টিনোফোরা (চিরুনি পাত, কলব্লাস্ট), প্লাটিহেলমিনথিস (শিখাকোষ), নেমাটোডা (ছদ্ম-সিলোম), অ্যানেলিডা (নেফ্রিডিয়া, সিটা), আর্থ্রোপোডা (বৃহত্তম পর্ব, সন্ধিল পদ, কাইটিনাস কঙ্কাল, হিমোসিল, ম্যালপিজিয়ান নালিকা), মলাস্কা (ম্যান্টল, খোলক, র‍্যা ডুলা) ও একাইনোডার্মাটা (জলসংবহন তন্ত্র, নালীপদ)। কর্ডাটার প্রধান ৪টি লক্ষণ (নটোকর্ড, পৃষ্ঠীয় স্নায়ুরজ্জু, ফুলকাছিদ্র, পায়ু-পশ্চাৎ পুচ্ছ) এবং ভার্টিব্রাটার ৬টি শ্রেণি: কনড্রিকথিস, অস্টিকথিস, অ্যাম্ফিবিয়া, রেপটিলিয়া, অ্যাভিস ও ম্যামালিয়া।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
একটি জীবদেহে যদি দীর্ঘদিন ধরে উপচিতি বিপাকের তুলনায় অপচিতি বিপাকের হার বেশি থাকে, তবে জীবটির দৈহিক পরিবর্তনে কী ঘটবে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: উপচিতি বিপাকের চেয়ে অপচিতি বিপাকের হার বেশি হলে কোষে নতুন প্রোটোপ্লাজম গঠনের তুলনায় খাদ্য বিশ্লিষ্ট হয়ে শক্তি ও বর্জ্য তৈরির হার বেশি হয়। এর ফলে জীবদেহের শুষ্ক ওজন ক্রমাগত হ্রাস পাবে, দেহ শীর্ণ ও দুর্বল হয়ে পড়বে, কোষীয় ক্ষয়পূরণ বন্ধ হবে এবং জীবদেহে দ্রুত বার্ধক্য ও অবধারিত অবক্ষয় নেমে আসবে।
ভাঙনমূলক বিপাকে শুষ্ক ওজন কমে যাওয়া এবং বার্ধক্যের শারীরিক লক্ষণটির কথা ভাবো।
2
মিলার ও উরের পরীক্ষায় কেন কোনো আণবিক অক্সিজেন (O₂) গ্যাস ব্যবহার করা হয়নি?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: আদিম পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ছিল সম্পূর্ণ মুক্ত অক্সিজেনবিহীন এবং তীব্র বিজারণধর্মী (Reducing Atmosphere)। মিলার ও উরে সেই আদিম পরিবেশের কৃত্রিম অনুকৃতি করেছিলেন। মুক্ত অক্সিজেন থাকলে মিথেন ও অ্যামোনিয়া জারিত হয়ে পুড়ে যেত এবং নবগঠিত সরল জৈব অ্যামিনো অ্যাসিডগুলি জারিত হয়ে বিনষ্ট হয়ে যেত, ফলে জীবনের রাসায়নিক সংশ্লেষ সম্ভব হতো না।
আদিম বিজারণ বায়ুমণ্ডলের প্রকৃতি এবং অক্সিজেনের উপস্থিতিতে অ্যামিনো অ্যাসিড জারিত হওয়ার ঝুঁকির কথা স্মরণ করো।
3
কচুরিপানাকে কেন 'বাংলার সন্ত্রাস' (Terror of Bengal) বলা হয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: কচুরিপানা (Eichhornia crassipes) দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আনা একটি বহিরাগত আক্রমণাত্মক জলজ উদ্ভিদ। এটি পশ্চিমবঙ্গের মিষ্টি জলের জলাশয়ে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে অঙ্গজ জননের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে সমগ্র জলতল ঢেকে ফেলে। এর ফলে সূর্যালোক পৌঁছাতে পারে না এবং এটি জল থেকে বিপুল পরিমাণ দ্রবীভূত অক্সিজেন শোষণ করে নেয়, ফলে মাছসহ দেশীয় জলজ প্রাণীরা শ্বাসকষ্টে মারা যায় এবং জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়।
বহিরাগত প্রজাতির দ্রুত বংশবৃদ্ধি এবং জলাশয়ের দ্রবীভূত অক্সিজেন নিঃশেষ করে মাছের মৃত্যুর কথা ভাবো।
4
উদ্ভিদের ক্ষেত্রে টোটোনিম (Tautonym) কেন ব্যবহার করা যায় না?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: টোটোনিম হলো এমন দ্বিপদ নাম যেখানে গণ ও প্রজাতির নাম হুবহু একই হয়। আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ নামকরণ বিধিমালা (ICBN / ICN) অনুসারে উদ্ভিদের নামকরণে টোটোনিম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ও অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, যাতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়। তাই কোনো উদ্ভিদের গণ ও প্রজাতি এক হতে পারে না (যদিও প্রাণীবিজ্ঞানে ICZN এটি অনুমোদন করে, যেমন Catla catla)।
ICBN/ICN আন্তর্জাতিক কোডের নিষেধাজ্ঞার কথা মনে করো।
5
ফার্ন বা টেরিডোফাইটাকে কেন 'ভাস্কুলার ক্রিপ্টোগ্যাম' (Vascular Cryptogam) বলা হয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: টেরিডোফাইটা হলো অপুষ্পক উদ্ভিদ অর্থাৎ এদের কোনো ফুল বা বীজ হয় না (Cryptogam)। কিন্তু শৈবাল বা মসদের মতো এরা সংবহনকলাহীন নয়; এদের দেহে জল ও খাদ্য পরিবহনের জন্য সুস্পষ্ট সংবহনকলা (জাইলেম ও ফ্লোয়েম) উপস্থিত থাকে (Vascular)। তাই উদ্ভিদ জগতে প্রথম সংবহনকলাযুক্ত অপুষ্পক উদ্ভিদ হিসেবে এদের 'ভাস্কুলার ক্রিপ্টোগ্যাম' বলা হয়।
সংবহনকলাযুক্ত (জাইলেম-ফ্লোয়েম) কিন্তু ফুল ও বীজহীন অপুষ্পক উদ্ভিদের যুগপৎ বৈশিষ্ট্যের কথা ভাবো।
6
কুমিরের হৃদপিণ্ড মেরুদণ্ডী সরীসৃপ শ্রেণির সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: সাধারণভাবে সরীসৃপ (Reptilia) শ্রেণির প্রাণীদের হৃদপিণ্ড অসম্পূর্ণভাবে চার প্রকোষ্ঠযুক্ত হয়—অর্থাৎ দুটি অলিন্দ থাকে কিন্তু নিচের নিলয়টি একটি অসম্পূর্ণ পর্দা দ্বারা অর্ধ-বিভক্ত থাকে, ফলে মিশ্র রক্ত সঞ্চালিত হয়। কিন্তু কুমিরের ক্ষেত্রে নিলয় মধ্যস্থ পর্দাটি সম্পূর্ণভাবে গঠিত হওয়ায় এর হৃদপিণ্ড সুনির্দিষ্টভাবে চারটি প্রকোষ্ঠে (২টি অলিন্দ ও ২টি নিলয়) বিভক্ত, যা উচ্চতর পক্ষী ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর অনুরূপ।
সাধারণ সরীসৃপের অসম্পূর্ণ নিলয় প্রাচীর বনাম কুমিরের সম্পূর্ণ নিলয় বিভাজনের কথা স্মরণ করো।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।