জীববিজ্ঞানীদের মতে, জীবন (Life) হলো স্ব-প্রজননশীল, পরিবর্তনশীল, স্বনিয়ন্ত্রিত, সুসংগঠিত এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনায় সুনির্দিষ্ট সাড়া প্রদানকারী প্রোটোপ্লাজমীয় উপাদানের এক বিশেষ জটিল ও গতিশীল প্রকাশ। বিজ্ঞানী টমাস হেনরি হাক্সলে (T. H. Huxley, 1868) প্রোটোপ্লাজমের অনন্য ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করে একে "জীবনের ভৌত ভিত্তি" (Protoplasm is the physical basis of life) হিসেবে অভিহিত করেন।
একটি সজীব কোষের কোষপর্দা দ্বারা পরিবেষ্টিত যাবতীয় নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমীয় অংশকে একত্রে প্রোটোপ্লাজম বলে। এটি মূলত জল (৭০-৮৫%), প্রোটিন (১০-১৫%), লিপিড (২-৩%), কার্বোহাইড্রেট (১%) এবং অজৈব খনিজ লবণের এক সমসত্ত্ব-অসমসত্ত্ব মিশ্র কলয়েডীয় অবস্থা (Colloidal Sol-Gel State)। প্রোটোপ্লাজমের মধ্যেই সংঘটিত হয় যাবতীয় জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া, যা বন্ধ হয়ে গেলে জীবের মৃত্যু ঘটে।
জীবদেহের প্রতিটি সজীব কোষে অবিরাম যে সমস্ত গঠনমূলক ও ভাঙনমূলক জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটে চলেছে এবং যার মাধ্যমে জীবদেহের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, শক্তি উৎপাদন ও জীবনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাদের সামগ্রিক রূপকে বিপাক (Metabolism) বলে। বিপাক মূলত দুই প্রকার:
১. উপচিতি বিপাক (Anabolism):
এটি হলো জীবদেহের গঠনমূলক বিপাকীয় ক্রিয়া (Constructive Metabolism)। এই প্রক্রিয়ায় সরল উপাদান থেকে জটিল জৈব যৌগ সংশ্লেষিত হয়। এতে শক্তি শোষিত বা সঞ্চিত হয় (Endergonic / Endothermic Reaction) এবং জীবের শুষ্ক ওজন (Dry Weight) বৃদ্ধি পায়।
প্রধান উদাহরণসমূহ:
- সালোকসংশ্লেষ (Photosynthesis): উদ্ভিদ কোষে সূর্যালোক ও ক্লোরোফিলের উপস্থিতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলের রাসায়নিক সংযোগে গ্লুকোজ সংশ্লেষিত হয় এবং সৌরশক্তি রাসায়নিক স্থৈতিক শক্তি হিসেবে আবদ্ধ হয়:
6CO₂ + 12H₂O + আলোকশক্তি ➔ C₆H₁₂O₆ + 6O₂ + 6H₂O - প্রোটিন সংশ্লেষ (Protein Synthesis): অ্যামিনো অ্যাসিড যুক্ত হয়ে পেপটাইড বন্ধন গঠনের মাধ্যমে জটিল প্রোটিন অণু তৈরি।
- স্নেহপদার্থ ও গ্লাইকোজেন সংশ্লেষ: যথাক্রমে ফ্যাটি অ্যাসিড-গ্লিসারল এবং গ্লুকোজ থেকে সঞ্চিত খাদ্য তৈরি।
২. অপচিতি বিপাক (Catabolism):
এটি হলো জীবদেহের ভাঙনমূলক বা ধ্বংসাত্মক বিপাকীয় ক্রিয়া (Destructive Metabolism)। এই প্রক্রিয়ায় জটিল জৈব যৌগ জারিত বা বিশ্লিষ্ট হয়ে সরল জৈব বা অজৈব উপাদানে পরিণত হয়। এতে স্থিতিশক্তি গতিশক্তিতে বা তাপে রূপান্তরিত হয়ে মুক্ত হয় (Exergonic / Exothermic Reaction) এবং জীবের শুষ্ক ওজন হ্রাস পায়।
প্রধান উদাহরণসমূহ:
- শ্বসন (Cellular Respiration): কোষে কোষে গ্লুকোজের জারণ ঘটিয়ে উচ্চশক্তি সম্পন্ন এটিপি (ATP) ও তাপশক্তি উৎপাদন:
C₆H₁₂O₆ + 6O₂ + 6H₂O ➔ 6CO₂ + 12H₂O + শক্তি (৩৮ ATP / ৬৮৬ kcal) - রেচন (Excretion): প্রোটিন ও নিউক্লিক অ্যাসিড ভেঙে ক্ষতিকর নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য (ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া) তৈরি ও দেহ থেকে নিষ্কাশন।
| তুলনার বিষয় | উপচিতি বিপাক (Anabolism) | অপচিতি বিপাক (Catabolism) |
|---|---|---|
| ১. প্রক্রিয়ার প্রকৃতি | গঠনমূলক বা সংশ্লেষীয় প্রক্রিয়া (সরল থেকে জটিল)। | ভাঙনমূলক বা বিশ্লিষ্টকরণ প্রক্রিয়া (জটিল থেকে সরল)। |
| ২. শুষ্ক ওজনের পরিবর্তন | জীবদেহের শুষ্ক ওজন বৃদ্ধি পায়। | জীবদেহের শুষ্ক ওজন হ্রাস পায়। |
| ৩. শক্তির রূপান্তর | শক্তি আবদ্ধ বা শোষিত হয় (গতিশক্তি স্থৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত)। | শক্তি নির্গত বা মুক্ত হয় (স্থৈতিক শক্তি গতিশক্তি ও তাপে রূপান্তরিত)। |
| ৪. প্রধান উদাহরণ | সালোকসংশ্লেষ, প্রোটিন সংশ্লেষ, গ্লাইকোজেনেসিস। | শ্বসন, রেচন, স্নেহপদার্থের বিশ্লেষণ। |
| ৫. বৃদ্ধির সাথে সম্পর্ক | উপচিতি > অপচিতি হলে জীবের সামগ্রিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটে। | অপচিতি > উপচিতি হলে জীবদেহে বার্ধক্য, শীর্ণতা ও অবক্ষয় দেখা দেয়। |
- বৃদ্ধি (Growth): প্রোটোপ্লাজমীয় পদার্থের বৃদ্ধির মাধ্যমে জীবের আকার, আয়তন ও শুষ্ক ওজনের চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় বৃদ্ধি ঘটে।
- উত্তেজিতা ও সাড়া প্রদান (Irritability & Sensitivity): পরিবেশের কোনো পরিবর্তন বা উদ্দীপকের (আলোক, উত্তাপ, স্পর্শ, রাসায়নিক পদার্থ) প্রভাবে জীবদেহে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা। যেমন—লজ্জাবতীর পাতা স্পর্শ করলে বুজে যাওয়া, আলোর দিকে উদ্ভিদের কাণ্ডের চলন।
- হোমিওস্ট্যাসিস (Homeostasis): পরিবেশের পরিবর্তন সত্ত্বেও জীবদেহের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে (যেমন—দেহের তাপমাত্রা, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা, pH, জলের ভারসাম্য) সর্বদা একটি নির্দিষ্ট সুস্থির স্বাভাবিক অবস্থায় বজায় রাখার ক্ষমতা। ফরাসি শারীরবৃত্তবিদ ক্লদ বার্নার্ড (Claude Bernard) অভ্যন্তরীণ পরিবেশের ধারণাকে 'Milieu Intérieur' বলেন এবং বিজ্ঞানী ওয়াল্টার বি. ক্যানন (Walter Cannon, 1926) একে 'হোমিওস্ট্যাসিস' নাম দেন।
- প্রজনন (Reproduction): নিজ প্রজাতির অস্তিত্ব ও ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে অপত্য জীব সৃষ্টি করার জৈবিক ক্ষমতা।
- চলন ও গমন (Movement & Locomotion): নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালনকে চলন বলে (অধিকাংশ উদ্ভিদে দেখা যায়) এবং স্থান পরিবর্তনকে গমন বলে (অধিকাংশ প্রাণীতে খাদ্যগ্রহণ ও সুরক্ষার জন্য ঘটে)।
- জীবনচক্র, বার্ধক্য ও অবধারিত মৃত্যু (Life Cycle & Death): জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজননক্ষম পূর্ণাঙ্গ দশা, বার্ধক্য এবং পরিশেষে কোষীয় ক্রিয়াকলাপের চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া অর্থাৎ মৃত্যু।