Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 9 • Social Science • অধ্যায় 6
আনুমানিক সময়: ৬০ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

The Second World War and Its Aftermath

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের নবম শ্রেণির ইতিহাস ও পরিবেশ পাঠ্যক্রমের প্রথম অধ্যায় 'ফরাসি বিপ্লবের কয়েকটি দিক' (Some Aspects of the French Revolution)-এর সম্পূর্ণ প্রামাণ্য ও বিস্তৃত অধ্যায়ন নির্দেশিকায় স্বাগত। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লব ছিল আধুনিক মানব ইতিহাসের অন্যতম সুদূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী ঘটনা, যা ইউরোপের শত শত বছরের অচলায়তন সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ও স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের ভিত চিরতরে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই নির্দেশিকায় বিপ্লব-পূর্ব ফ্রান্সের 'পুরাতন ব্যবস্থা' (Ancien Régime)-র চরম সামাজিক শোষণ, যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের করমুক্ত বিশেষাধিকারের বিপরীতে জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশ তৃতীয় সম্প্রদায়—বুর্জোয়া, কৃষক ও শ্রমজীবী সাঁ-কুলোৎদের দুঃসহ বঞ্চনা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফ্রান্সের চরম অর্থনৈতিক সংকট, সীমাহীন জাতীয় ঋণ, গ্যাবেল ও টেইলির মতো অন্যায় কর এবং রাজকোষ সংস্কারে অর্থমন্ত্রীদের ব্যর্থতার রাজনৈতিক পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে। মন্তেস্কুর ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি, ভলতেয়ারের গির্জাবিরোধী যুক্তি এবং রুশোর সামাজিক চুক্তি ও সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্বের বৈপ্লবিক প্রভাব এখানে নিখুঁতভাবে উপস্থাপিত। এছাড়া ১৭৫ বছর পর স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন, ঐতিহাসিক টেনিস কোর্টের শপথ, ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গের পতন, মহাভীতি, ৪ আগস্ট সামন্ততন্ত্রের উচ্ছেদ এবং যুগান্তকারী 'ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র' এই অধ্যায়ে পর্যায়ক্রমে সাজানো হয়েছে। সংবিধান সভার সংস্কার, ধর্মযাজকদের সিভিল কনস্টিটিউশন, রাজতন্ত্রের পতন এবং রোবসপিয়রের নেতৃত্বে জ্যাকোবিন দলের সন্ত্রাসের রাজত্ব (১৭৯৩-১৭৯৪) ও থার্মিডোরীয় প্রতিক্রিয়ার বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ত্রয়ী আদর্শ—স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রীর বিশ্বজনীন বিজয়বার্তা এই পাঠে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

কখনও কি ভেবে দেখেছেন?

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের বসন্তে ইউরোপের পরাক্রমশালী ফরাসি বুরবোঁ রাজতন্ত্র যখন নিজেকে ভেবেছিল অপরাজেয় এবং রাজপ্রাসাদ ভার্সাই যখন ডুবিয়ে রেখেছিল নিজেকে অপার্থিব বিলাসিতায়, ঠিক তখনই ফ্রান্সের খেটে খাওয়া ৯৮ শতাংশ মানুষ এক অমোঘ চিৎকারে গর্জে উঠেছিল। কেন মাত্র এক টুকরো রুটির চড়া দামে উত্তাল হয়ে উঠেছিল সমগ্র প্যারিস, কেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শোষিত কৃষকেরা সামন্তপ্রভুদের দুর্গে আগুন দিয়ে করের দলিল পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল, আর কীভাবে রাজকীয় স্বৈরাচারের লৌহকঠিন দুর্গ 'বাস্তিল' ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষ লিখেছিল আধুনিক মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ত্রয়ী অমর বাণী—'স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী'?

অধ্যায়টির গুরুত্ব

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ফরাসি বিপ্লব অধ্যায়টি অনুধাবন করা অপরিহার্য, কারণ এটি নিছক একটি দেশের পুরনো রাজতন্ত্রের পতনের কাহিনী নয়, বরং এটি আধুনিক গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বের জন্মলগ্নের ইতিহাস। আজকের পৃথিবীতে আমরা যে ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা, মত প্রকাশের অধিকার এবং ভোটাধিকারকে স্বতঃসিদ্ধ নাগরিক অধিকার হিসেবে গণ্য করি, তার প্রতিটি ধারণার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক জন্ম হয়েছিল এই ফরাসি বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এই অধ্যায়টি পাঠ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে কীভাবে একটি চরম বৈষম্যমূলক সমাজে অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং দার্শনিক যুক্তিবাদী চেতনার মেলবন্ধন ঘটলে প্রচলিত অচলায়তন ভেঙে নতুন মানবিক সমাজ গড়ে ওঠে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সম্মিলিত শক্তির পরাক্রম যেমন বাস্তিল দুর্গ পতনে স্পষ্ট হয়, তেমনি অতিরিক্ত চরমপন্থা ও সন্ত্রাসের ধ্বংসাত্মক পরিণতি রোবসপিয়রের পতনের শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীরা আয়ত্ত করতে পারে। সংক্ষেপে, আধুনিক সংবিধান, মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের ভিত্তিপ্রস্তর অনুধাবন করতে এই অধ্যায়ের ঐতিহাসিক উপলব্ধি অনন্য।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • ইউরোপীয় মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজ কাঠামো, জমিদার ও ভূমিদাস প্রথা এবং রাজাদের 'ঐশ্বরিক অধিকার তত্ত্ব' (Divine Right Theory)-র সাধারণ ধারণা।
  • সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লব (১৬৮৮) এবং আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৭৭৬)-এর মাধ্যমে আধুনিক গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক চেতনার প্রাথমিক রূপরেখা।
  • ইউরোপের জ্ঞানদীপ্তি (Enlightenment) বা যুক্তিবাদের যুগ এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপরীতে মানবতাবাদী ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সাধারণ ধারণা।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • বিপ্লব-পূর্ব ফ্রান্সের 'পুরাতন ব্যবস্থা' (Ancien Régime)-র ত্রুটিপূর্ণ সামাজিক স্তরবিন্যাস (যাজক, অভিজাত ও তৃতীয় সম্প্রদায়) এবং সামন্ততান্ত্রিক করব্যবস্থার চরম বৈষম্য বিশদভাবে ব্যাখ্যা করতে পারা।
  • ফরাসি রাজকোষের ভয়াবহ দেউলিয়াত্ব, জাতীয় ঋণের সংকট, 'ফার্ম জেনারেল' দ্বারা কর শোষণ এবং অর্থমন্ত্রীদের সংস্কারের ব্যর্থতা ও অভিজাত বিদ্রোহের কারণ বিশ্লেষণ করতে পারা।
  • ফরাসি বিপ্লবের বৌদ্ধিক পটভূমি রচনায় মন্তেস্কু, ভলতেয়ার, রুশো, বিশ্বকোষবিদ এবং ফিজিওক্র্যাট দার্শনিকদের চিন্তাধারার বৈপ্লবিক প্রভাব বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়ন করতে পারা।
  • ১৭৫ বছর পর স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন (১৭৮৯), টেনিস কোর্টের শপথ, বাস্তিল দুর্গের পতন, গ্রামাঞ্চলে মহাভীতি ও ৪ আগস্ট সামন্ততন্ত্র বিলোপের ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিক তাৎপর্য তুলে ধরতে পারা।
  • 'ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র' (১৭৮৯), গির্জার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও অ্যাসাইনেট নোট, ধর্মযাজকদের সিভিল কনস্টিটিউশন এবং ১৭৯১ সালের সংবিধানের সীমাবদ্ধতা (সক্রিয় বনাম নিষ্ক্রিয় নাগরিক) বিচার করতে পারা।
  • চরমপন্থী সাধারণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, ষোড়শ লুইয়ের মৃত্যুদণ্ড, রোবসপিয়রের নেতৃত্বে জ্যাকোবিন দলের 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' (১৭৯৩-১৭৯৪)-এর দ্বিমুখী স্বরূপ এবং বিপ্লবের বৈশ্বিক মূলমন্ত্র 'স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী'-র ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ব্যাখ্যা করতে পারা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 মডিউল ১: পুরাতন ব্যবস্থা (Ancien Ré...
2 মডিউল ২: দেউলিয়া রাজকোষ ও বৈষম্যমূ...
3 মডিউল ৩: জ্ঞানদীপ্তি ও বৌদ্ধিক জাগর...
4 মডিউল ৪: ১৭৮৯-এর বিপ্লবের মহাবিস্ফো...
5 মডিউল ৫: সংবিধান সভার সংস্কার ও ১৭৯...
6 মডিউল ৬: চরমপন্থী প্রজাতন্ত্র, সন্ত...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

মডিউল ১: পুরাতন ব্যবস্থা (Ancien Régime) ও ত্রিস্তরীয় সামাজিক বৈষম্য

১.১ 'পুরাতন ব্যবস্থা' (Ancien Régime) প্রত্যয়টির অর্থ ও প্রেক্ষাপট

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লবের পূর্ববর্তী ফ্রান্স তথা সমগ্র ইউরোপের প্রচলিত রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে ঐতিহাসিক পরিভাষায় 'পুরাতন ব্যবস্থা' (Ancien Régime / আঁসিয়াঁ রেজিম) বলা হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা ছিল চরম স্বৈরাচারী ও ঈশ্বরপ্রদত্ত রাজকীয় ক্ষমতায় (Divine Right of Kings) বিশ্বাসী। চতুর্দশ লুইয়ের দম্ভোক্তি "আমিই রাষ্ট্র" (L'état, c'est moi) এবং পঞ্চদশ লুইয়ের "আমার ইচ্ছাই আইন" ছিল এই ব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর। অপরদিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুরাতন ব্যবস্থা ছিল মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক শোষণ, অন্যায্য সুযোগ-সুবিধা ও চরম বৈষম্যের প্রতীক।

১.২ ত্রিস্তরীয় ফরাসি সমাজ (The Three Estates)

বিপ্লব-পূর্ব ফরাসি সমাজ আইনগতভাবে তিনটি সুনির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা স্টেটে (Estates) বিভক্ত ছিল:

১. প্রথম সম্প্রদায় (যাজক - Clergy):
ফ্রান্সের প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ক্যাথলিক গির্জার যাজক সম্প্রদায়ের মোট সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ১ লক্ষ ৩০ হাজার (জনসংখ্যার মাত্র ০.৫%)। কিন্তু এই মুষ্টিমেয় সম্প্রদায়ের হাতে ছিল দেশের মোট কৃষিজমির ১০ শতাংশ। তারা সম্পূর্ণভাবে সব ধরনের সরকারি প্রত্যক্ষ কর (যেমন ভূমিকর বা টেইলি) থেকে অব্যাহতি পেত। উল্টে তারা সাধারণ কৃষকদের ওপর 'টাইথ' (Tithe) নামক ধর্মকর চাপিয়ে দিত, যার পরিমাণ ছিল বার্ষিক উৎপাদিত ফসলের এক-দশমাংশ (১০%)। গির্জা বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির মালিক হলেও রাজকোষে কোনো কর দিত না; কেবল রাজাকে সন্তুষ্ট রাখতে ইচ্ছামাফিক নামমাত্র স্বেচ্ছাকর (Don gratuit) প্রদান করত।

যাজক সম্প্রদায়ের ভেতরেই বিদ্যমান ছিল তীব্র শ্রেণীদ্বন্দ্ব:

  • উচ্চতর যাজক (বিশপ, আর্চবিশপ, কার্ডিনাল ও মঠাধ্যক্ষ/অ্যাবট): এঁরা উচ্চ বংশজাত অভিজাত পরিবার থেকে মনোনীত হতেন। এঁরা রাজপ্রাসাদ ভার্সাই ও প্যারিসে বিপুল আয়, ভোগবিলাস ও নৈতিক স্খলনে গা ভাসিয়ে দিতেন। ধর্মীয় কর্তব্যের সঙ্গে এঁদের কোনো প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিল না।
  • নিম্নতর যাজক (দরিদ্র গ্রাম্য পুরোহিত বা কিউরে - Curés): এঁরা আসতেন সাধারণ কৃষক ও মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। এঁদের বার্ষিক আয় ছিল মাত্র কয়েক শত লিভ্র (Livre), যা দিয়ে কোনোমতে জীবিকা নির্বাহ হতো। এঁরা প্রত্যহ সাধারণ কৃষক ও দরিদ্র প্রজাদের দুঃখ-কষ্টের সাক্ষী হতেন এবং তাদের প্রতি গভীর সহানুভূতিশীল ছিলেন। ফলে ১৭৮৯ সালে বিপ্লব শুরু হলে এই নিম্ন যাজকেরা দ্বিতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে না থেকে সাধারণ তৃতীয় সম্প্রদায়ের পক্ষ গ্রহণ করেন।

২. দ্বিতীয় সম্প্রদায় (অভিজাত - Nobility):
ফরাসি সমাজের দ্বিতীয় সুবিধাভোগী সম্প্রদায় ছিল অভিজাতরা। এদের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লক্ষ ৫০ হাজার (জনসংখ্যার মাত্র ১.৫%)। কিন্তু এদের দখলে ছিল ফ্রান্সের মোট উর্বর ভূমির ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। সরকারের সমস্ত উচ্চ সামরিক পদ, সেনাবাহিনীর প্রধান পদমর্যাদা, বিচারালয়ের বিচারক পদ এবং কূটনৈতিক পদগুলি অভিজাতদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। যাজকদের মতো অভিজাতরাও সমস্ত ধরনের প্রত্যক্ষ কর প্রদান থেকে মুক্ত ছিল।

অভিজাতদের প্রধান দুটি ধারা ছিল:

  • জন্মগত বা তরবারিধারী অভিজাত (Nobles of the Sword / Noblesse d'épée): প্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক যোদ্ধা বংশের উত্তরাধিকারী। এঁরা বংশকৌলীন্যের অহংকারে মত্ত থাকতেন এবং রাজদরবারের সর্বোচ্চ পদে একচেটিয়া প্রভাব বজায় রাখতেন।
  • পোশাকী অভিজাত (Nobles of the Robe / Noblesse de Robe): সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে যেসমস্ত ধনী বুর্জোয়া বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিচার বিভাগীয় (পার্লেমন্ট) বা প্রশাসনিক উচ্চপদ ক্রয় করে আভিজাত্যের মর্যাদা লাভ করেছিলেন, তাদের পোশাকী অভিজাত বলা হতো। প্রাচীন তরবারিধারী অভিজাতরা এদের হেয় চোখে দেখলেও এরা অধিকতর ক্ষমতাশালী ও রাজকীয় সংস্কারের তীব্র বিরোধী হয়ে উঠেছিল।

অভিজাতদের নির্মম সামন্ততান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম ছিল শিকারের একচেটিয়া অধিকার। অভিজাতরা ঘোড়া ও শিকারি কুকুর ছুটিয়ে কৃষকদের আবাদি জমির ফসল নষ্ট করলেও কৃষকদের আত্মরক্ষার্থে বুনো শুয়োর, হরিণ বা পাখি শিকার বা তাড়ানোর কোনো আইনি অধিকার ছিল না।

৩. তৃতীয় সম্প্রদায় (Third Estate / Tiers État):
ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশই (প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ) ছিল তৃতীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। এই সম্প্রদায় ছিল ভীষণভাবে অসম ও বৈচিত্র্যময়:

  • বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত (Bourgeoisie): এদের মধ্যে ছিলেন ধনী বণিক, শিল্পপতি, ব্যাংকার, জাহাজমালিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, বিচারক, অধ্যাপক ও সরকারি কর্মচারী। আর্থিক সচ্ছলতা ও বৌদ্ধিক যোগ্যতায় তারা প্রথম দুই সম্প্রদায়ের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে থাকলেও সমাজে তাদের কোনো রাজনৈতিক অধিকার বা সম্মান ছিল না। বংশকৌলীন্যের অভাবে সমস্ত উচ্চ প্রশাসনিক ও সামরিক পদ থেকে তারা বঞ্চিত হতেন। এই অমর্যাদাই বুর্জোয়াদের বিপ্লবের নেতৃত্ব গ্রহণের প্রেরণা জোগায়।
  • কৃষক সম্প্রদায় (Peasants): কৃষকরা ছিল ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ (প্রায় ৮০ শতাংশ বা ২ কোটি)। তারা মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্রের নির্মম যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল। ভূমিহীন ভাগচাষী ও ক্ষুদ্র কৃষকদের নিজেদের আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ বিভিন্ন কর হিসেবে দিতে হতো। তাদের ওপর চাপানো সামন্ততান্ত্রিক বোঝাগুলি ছিল:
    • কর্ভি (Corvée): বিনা পারিশ্রমিকে বাধ্যতামূলক বেগার শ্রম (জমিদারের জমিতে কাজ করা, রাজকীয় সামরিক সড়ক ও দুর্গ মেরামত)।
    • বানালিতে (Banalités): জমিদারের নিজস্ব জাঁতাকলে গম ভাঙানো, জমিদারের উনুনে রুটি সেঁকা এবং জমিদারের প্রেসে আঙুরের রস তৈরি করতে বাধ্য করা এবং এর জন্য চড়া মাশুল প্রদান।
    • শাঁপার (Champart): উৎপাদিত ফসলের একটি বাধ্যতামূলক অংশ জমিদারের গোলায় জমা দেওয়া।
    • সেন্স (Cens): জমিদারকে দেওয়া বার্ষিক নগদ খাজনা।
  • শহুরে দিনমজুর, কারিগর ও ভবঘুরে (সাঁ-কুলোৎ - Sans-culottes): প্যারিস ও অন্যান্য প্রধান শহরের ক্ষুদ্র কারিগর, রাজমিস্ত্রি, দোকান কর্মচারী, কুলি ও দিনমজুর। অভিজাতদের মতো হাঁটু পর্যন্ত আঁটো ব্রিচেস (Culottes) না পরে এরা দীর্ঘ ঢোলা প্যান্ট পরত বলে এদের উপহাস করে 'সাঁ-কুলোৎ' (কুলোৎ-হীন) বলা হতো। অস্বাভাবিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কালোবাজারি ও খাদ্যাভাবে জর্জরিত এই শ্রেণীটিই ছিল ফরাসি বিপ্লবের সবচেয়ে লড়াকু ও চরমপন্থী পদাতিক বাহিনী।
সম্প্রদায় জনসংখ্যার অনুপাত জমির মালিকানা করের বোঝা রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার
১ম সম্প্রদায় (যাজক) ১,৩০,০০০ (০.৫%) ১০% উর্বর জমি সম্পূর্ণ প্রত্যক্ষ করমুক্ত; কৃষকদের থেকে টাইথ (১০%) আদায়কারী সর্বোচ্চ সামাজিক প্রতিপত্তি, নিজস্ব বিচারালয় ও রাজকীয় প্রভাব
২য় সম্প্রদায় (অভিজাত) ৩,৫০,০০০ (১.৫%) ২০-২৫% জমি সম্পূর্ণ প্রত্যক্ষ করমুক্ত; বানালিতে ও শাঁপার আদায়কারী সেনাবাহিনী, বিচারালয় ও প্রশাসনের সমস্ত উচ্চপদে একচেটিয়া অধিকার
৩য় সম্প্রদায় (বুর্জোয়া, কৃষক, সাঁ-কুলোৎ) ২ কোটি ৫০ লক্ষ (৯৮%) ৬৫-৭০% জমি (ক্ষুদ্র জোতে বিভক্ত) জাতীয় ও সামন্ত করের ১০০% বোঝা (টেইলি, ক্যাপিটেশন, গ্যাবেল) সম্পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকারহীন, পদমর্যাদাহীন ও বিচারিক শোষণের শিকার
সমসাময়িক ফরাসি সমাজের জ্বলন্ত ব্যঙ্গোক্তি:

অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সে একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিল—"যাজকরা সমাজকে ঈশ্বরের অনুগ্রহ পাইয়ে দিতে প্রার্থনা করে, অভিজাতরা তরবারি দিয়ে রাজ্য রক্ষা করতে যুদ্ধ করে, আর তৃতীয় সম্প্রদায় তাদের রক্তজল করা পরিশ্রমে কর দিয়ে উভয়ের বিলাসিতা বজায় রাখে।" এই ভয়াবহ শোষণ ও বৈষম্যই ১৭৮৯ সালের মহাবিস্ফোরণের মূল সামাজিক বারুদ তৈরি করেছিল।

মডিউল ২: দেউলিয়া রাজকোষ ও বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থা: অর্থমন্ত্রীদের সংস্কারের ব্যর্থতা

২.১ রাজকোষের দেউলিয়াত্ব ও আর্থিক রক্তক্ষরণ

১৭৮৯ সালের প্রাক্কালে ফ্রান্স এক অভাবনীয় অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি হয়েছিল। প্রখ্যাত ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ তৎকালীন ফ্রান্সকে 'অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অবিচারের এক অদ্ভুত কারখানা' বলে অভিহিত করেছিলেন। এই আর্থিক সংকটের প্রধান কারণগুলি ছিল:

  1. ধারাবাহিক সাম্রাজ্যিক যুদ্ধব্যয়: চতুর্দশ লুইয়ের ইউরোপীয় সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি, পঞ্চদশ লুইয়ের অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধ (১৭৪০-৪৮) এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সপ্তবর্ষীয় যুদ্ধ (১৭৫৬-১৭৬৩)-এ ফ্রান্স বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
  2. আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ (১৭৭৫-১৭৮৩): ইংল্যান্ডকে শিক্ষা দিতে গিয়ে ষোড়শ লুই আমেরিকার বিদ্রোহীদের সহায়তায় নৌবাহিনী ও সৈন্য প্রেরণ করেন। এতে ফ্রান্সের অতিরিক্ত ১০০ কোটি লিভ্র নতুন ঋণ হয়। ফলে ফ্রান্সের মোট জাতীয় ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২০০ কোটি লিভ্রেরও বেশি।
  3. ঋণের সুদের ফাঁদ: ১৭৮৮ সালের রাজকীয় বাজেটের মোট ব্যয়ের ৫০ শতাংশেরও বেশি (অর্ধেক) ব্যয় হতো কেবল পূর্ববর্তী ঋণের সুদ পরিশোধ করতে! নতুন ঋণ দেওয়ার মতো কোনো আন্তর্জাতিক ব্যাংকার আর ফ্রান্সে অবশিষ্ট ছিল না।
  4. ভার্সাইয়ের রাজদরবারের অমিতব্যয়িতা: ভার্সাই প্রাসাদে প্রায় ১৮,০০০ রাজকর্মচারী ও তোষামোদকারী অভিজাতদের বিলাসবহুল ভাতার পেছনে বাজেটের ১০% অপচয় হতো। বিশেষত অস্ট্রিয়ান রাজকন্যা তথা রানী মারি আঁতোয়ানেত (Marie Antoinette)-এর বেহিসাবি অপচয় ও রত্নালঙ্কারের মোহের কারণে ক্ষুব্ধ ফরাসিরা তাঁকে উপহাস করে নাম দিয়েছিল 'মাদাম ডেফিসিট' (Madame Déficit বা ঘাটতির রানী)।
২.২ বৈষম্যমূলক ও অত্যাচারী কর ব্যবস্থা

ফরাসি কর ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অভিশাপ ছিল—যারা সবচেয়ে ধনী ও কর প্রদানে সক্ষম (যাজক ও অভিজাত), তারা আইনত সম্পূর্ণ করমুক্ত ছিল; আর যারা সবচেয়ে দরিদ্র ও অনাহারে থাকত (তৃতীয় সম্প্রদায়), তাদের ওপর করের পাহাড় চাপানো হয়েছিল। করগুলি ছিল দ্বিবিধ:

ক. প্রত্যক্ষ কর (Direct Taxes):

  • টেইলি (Taille): অত্যন্ত ঘৃণ্য প্রত্যক্ষ ভূমিকর। এই করের সম্পূর্ণ বোঝা বহন করত তৃতীয় সম্প্রদায়ের কৃষকরা। ধনী অভিজাত ও যাজকদের জমি এই করের বাইরে ছিল।
  • ক্যাপিটেশন (Capitation): মাথাপিছু কর বা আয়ের ওপর ধার্য কর। তাত্ত্বিকভাবে সকলের দেওয়ার কথা থাকলেও ধনীরা ঘুষ দিয়ে এর হাত থেকে অব্যাহতি পেত।
  • ভিংতিয়েম (Vingtième): আয়ের ওপর ৫% হারে ধার্য অস্থাবর সম্পত্তি কর। অভিজাতরা নিজেদের প্রতিপত্তি খাটিয়ে নামমাত্র কর দিত।

খ. পরোক্ষ কর (Indirect Taxes):

  • গ্যাবেল (Gabelle): ফ্রান্সের সবচেয়ে কুখ্যাত ও নিপীড়নমূলক লবণ কর। আইন অনুসারে ৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রতিটি ফরাসি নাগরিককে সরকার নির্ধারিত গুদাম থেকে চড়া মূল্যে বছরে অন্তত ৭ পাউন্ড লবণ কিনতে বাধ্য করা হতো। লবণের চোরাচালান রোধে কঠোর শাস্তির বিধান ছিল এবং প্রতি বছর সহস্রাধিক মানুষকে গ্যাবেল ফাঁকির অভিযোগে গ্যালি জাহাজের দাস বানানো হতো।
  • এইডস (Aides): মদ, ওয়াইন, তেল ও মোমবাতির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের ওপর আরোপিত পরোক্ষ কর।
  • ত্রেত (Traites): অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য শুল্ক। ফ্রান্সের এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে পণ্য পরিবহনের সময় সীমান্তে চড়া হারে শুল্ক দিতে হতো, যা দেশীয় ব্যবসা-বাণিজ্যকে ধ্বংস করে ফেলেছিল।

ফার্ম জেনারেল (Ferme Générale / ইজারাদারি ব্যবস্থা):
সরকার সরাসরি পরোক্ষ কর আদায় না করে একদল বিত্তশালী বেসরকারি ব্যবসায়ী সংস্থার (ট্যাক্স ফার্মার) হাতে কর আদায়ের দায়িত্ব ইজারা দিত। এই ইজারাদাররা রাজকোষে অগ্রিম নির্দিষ্ট টাকা জমা দিয়ে প্রজাদের কাছ থেকে দ্বিগুণ-তিনগুণ কর নির্মম অত্যাচার চালিয়ে আদায় করত। ফলে করদাতাদের রক্তক্ষরণ হলেও রাজকোষে তার সামান্য অংশই জমা পড়ত।

২.৩ অর্থমন্ত্রীদের ব্যর্থতা ও অভিজাত বিদ্রোহ (১৭৮৭-১৭৮৮)

দেউলিয়া রাজকোষকে বাঁচাতে ষোড়শ লুই একের পর এক দক্ষ অর্থমন্ত্রী নিয়োগ করেন, কিন্তু কোনো সংস্কারই টেকেনি:

  • তুর্গো (Turgot, ১৭৭৪-১৭৭৬): ফিজিওক্র্যাট অর্থনীতিবিদ তুর্গো রাজদরবারের ব্যয় সংকোচন, কৃষিপণ্যের অবাধ বাণিজ্য এবং সামন্ত কর্ভি বিলোপের প্রস্তাব দেন। সুবিধাবাদী রাজপরিবার ও অভিজাতদের চাপে রাজা তাঁকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হন।
  • জাক নেকার (Jacques Necker, ১৭৭৬-১৭৮১): সুইস ব্যাংকার নেকার নতুন কর না চাপিয়ে ঋণ নিয়ে যুদ্ধের খরচ চালান। ১৭৮১ সালে তিনি ফরাসি ইতিহাসের প্রথম সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব 'কোঁত রঁদু' (Compte Rendu au Roi) প্রকাশ করে রাজদরবারের নির্লজ্জ অপব্যয় জনগণের সামনে ফাঁস করে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রানী ও অভিজাতরা নেকারকে তাড়িয়ে দেন।
  • ক্যালোঁ (Calonne, ১৭৮৩-১৭৮৭): ক্যালোঁ বুঝতে পারেন যে প্রত্যক্ষ করমুক্ত যাজক ও অভিজাতদের ওপর কর না বসালে ফ্রান্স বাঁচবে না। ১৭৮৬ সালে তিনি এক বৈপ্লবিক প্রস্তাব দেন—যাজক ও অভিজাতদের বিশেষাধিকার কেড়ে নিয়ে সমগ্র জমির ওপর একটি সার্বজনীন ভূমি কর আরোপ করতে হবে।
অভিজাত বিদ্রোহ (Revolt of the Nobles - ১৭৮৭-৮৮): বিপ্লবের প্রথম মহড়া:

ক্যালোঁ তাঁর কর প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য ১৭৮৭ সালে অভিজাতদের নিয়ে 'বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সভা' (Assembly of Notables) আহ্বান করেন। অভিজাতরা স্পষ্টভাবে নতুন কর দিতে অস্বীকার করে এবং ক্যালোঁকে পদচ্যুত করায়। পরবর্তী অর্থমন্ত্রী ব্রিয়ার (Brienne)-এর সংস্কার প্রস্তাব প্যারিসের অভিজাত বিচারালয় (পার্লেমন্ট) খারিজ করে দেয়। অভিজাতরা ঘোষণা করে যে জাতীয় প্রতিনিধি সভা 'স্টেটস জেনারেল' (Estates-General) ছাড়া কোনো নতুন কর ধার্য করার বৈধ ক্ষমতা রাজার নেই। ঐতিহাসিকরা একেই 'অভিজাত বিদ্রোহ' বলে চিহ্নিত করেছেন। নিজেদের করমুক্ত বিশেষাধিকার রক্ষা করতে গিয়ে অভিজাতরা অজান্তেই রাজকীয় স্বৈরতন্ত্রের শিকড় কেটে দিয়ে ফরাসি বিপ্লবের প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।

মডিউল ৩: জ্ঞানদীপ্তি ও বৌদ্ধিক জাগরণ: দার্শনিকদের বৈপ্লবিক ভূমিকা

৩.১ বিপ্লবে দার্শনিকদের ভূমিকার ঐতিহাসিক বিতর্ক

ফরাসি বিপ্লব কোনো আকস্মিক দাঙ্গা ছিল না; এর পেছনে ছিল একটি সুদৃঢ় বৌদ্ধিক প্রস্তুতি। অষ্টাদশ শতকের যুক্তিবাদী দার্শনিকদের আন্দোলন ইউরোপের ইতিহাসে 'জ্ঞানদীপ্তি' (Enlightenment / অ্যানলাইটেনমেন্ট) নামে খ্যাত। ঐতিহাসিক আর্নেস্ট লাব্রুস এবং জর্জেস লেফেভর যথার্থই দেখিয়েছেন যে দার্শনিকরা নিজেরা রাজপথে নেমে লাঠি বা বন্দুক ধরেননি, এমনকি বিপ্লবের মূল দার্শনিকরা (মন্তেস্কু, ভলতেয়ার, রুশো) ১৭৮৯ সালের বিপ্লব দেখেও যাননি (তাঁরা আগেই মৃত্যুবরণ করেন)। কিন্তু তাঁরা যা করেছিলেন তা হলো—শতাব্দীপ্রাচীন স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র, গির্জার ভণ্ডামি ও সামন্ততান্ত্রিক অসাম্যের বিরুদ্ধে মানুষের মনে যৌক্তিক অনাস্থা তৈরি করে বিপ্লবের মতাদর্শগত ভিত রচনা করেছিলেন।

৩.২ মন্তেস্কু (Montesquieu, ১৬৮৯-১৭৫৫): ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি

চার্লস লুই দ্য মন্তেস্কু ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজীবী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

  • 'পারসিক চিঠিপত্র' (Persian Letters / Lettres persanes, ১৭২১): এই গ্রন্থে দুই কাল্পনিক পারস্যদেশীয় পর্যটকের দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে মন্তেস্কু ফরাসি সমাজ, পোপের অন্ধ ক্ষমতা ও চতুর্দশ লুইয়ের রাজকীয় স্বৈরাচারকে তীব্র শ্লেষাত্মক ব্যঙ্গে ক্ষতবিক্ষত করেন।
  • 'আইনের ভাবধারা' (The Spirit of the Laws / De l'esprit des lois, ১৭৪৮): মন্তেস্কুর সর্বশ্রেষ্ঠ কালজয়ী গ্রন্থ। এতে তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার জন্য তাঁর বিখ্যাত 'ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি' (Separation of Powers) উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সরকারের তিনটি প্রধান অঙ্গ—আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ যদি একক কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তবে সেখানে স্বৈরাচার অবশ্যম্ভাবী এবং নাগরিক স্বাধীনতা অসম্ভব।
  • তিনি ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার অনুকরণে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং ফ্রান্সে একটি নিয়মতান্ত্রিক বা সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী ছিলেন।
৩.৩ ভলতেয়ার (Voltaire, ১৬৯৪-১৭৭৮): গির্জার গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যুদ্ধ

ফরাসি সাহিত্যের অপরাজেয় সম্রাট ফ্রাঁসোয়া মারি আরুয়ে, যিনি ভলতেয়ার ছদ্মনামে বিশ্বখ্যাত, ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও ঐতিহাসিক।

  • ক্যাথলিক গির্জার সমালোচনা: ভলতেয়ার ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন (দেবাদিবাদী / Deist), কিন্তু রোমান ক্যাথলিক চার্চের শোষণ, ভণ্ডামি, অন্ধ কুসংস্কার এবং ধর্মান্ধতাকে তিনি তীব্র ঘৃণা করতেন। ক্যাথলিক চার্চের উদ্দেশ্যে তাঁর বিখ্যাত স্লোগান ছিল: "Écrasez l'infâme!" (কুখ্যাত প্রতিষ্ঠানটিকে / কুসংস্কারের দানবকে চূর্ণ করো!)।
  • 'দার্শনিক চিঠিপত্র' (Philosophic Letters / Lettres philosophiques, ১৭৩৪): ইংল্যান্ডে নির্বাসিত থাকার অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত এই গ্রন্থে তিনি ইংরেজ সমাজের বাক-স্বাধীনতা, ধর্মীয় পরমতসহিষ্ণুতা এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করে সমকালীন ফ্রান্সের অন্ধকারের সাথে তুলনা করেন। ফরাসি সংসদ এই বই নিষিদ্ধ করে এবং পুড়িয়ে দেয়।
  • বাক-স্বাধীনতার আদর্শ: পরমতসহিষ্ণুতা ও মুক্তচিন্তার পক্ষে ভলতেয়ারের অমর অঙ্গীকার: "তুমি যা বলছ আমি তা সর্বান্তঃকরণে অসমর্থন করতে পারি, কিন্তু তোমার সেই কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য আমি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করব।"
৩.৪ জাঁ জাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau, ১৭১২-১৭৭৮): বিপ্লবের আধ্যাত্মিক জনক

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জন্মগ্রহণকারী রুশোকে ফরাসি বিপ্লবের 'আধ্যাত্মিক জনক' (Spiritual Father) বলা হয়। তিনি যুক্তিবাদের পাশাপাশি মানব হৃদয়ের অনুভূতি ও আবেগকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

  • 'সামাজিক চুক্তি' (The Social Contract / Du contrat social, ১৭৬২): এই কালজয়ী গ্রন্থের প্রথম বাক্যটি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক উক্তি: "মানুষ জন্মায় স্বাধীন, কিন্তু সর্বত্রই সে শৃঙ্খলিত" (Man is born free, and everywhere he is in chains)।
  • জনগণের সার্বভৌমিকতা ও সাধারণ ইচ্ছা (General Will): রুশো রাজাদের ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতার তত্ত্বকে ধূলিসাৎ করে দেন। তিনি প্রচার করেন যে রাষ্ট্র কোনো অলৌকিক সৃষ্টি নয়, বরং সমাজের সকল মানুষের মধ্যে এক পারস্পরিক চুক্তির ফসল। সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত অধিকারী কোনো রাজা নন, বরং দেশের সমগ্র জনগণ। সরকার হলো জনগণের সেবক মাত্র। যদি কোনো সরকার জনগণের সার্বিক কল্যাণকামী 'সাধারণ ইচ্ছা' (General Will) পদদলিত করে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে, তবে সেই সরকারকে উৎখাত করে নতুন সরকার গড়ার জন্মগত অধিকার জনগণের আছে।
  • 'অসাম্যের সূত্রপাত' (Discourse on Inequality, ১৭৫৪): এই গ্রন্থে রুশো প্রমাণ করেন যে আদিম প্রাকৃতিক সমাজে মানুষ সুখী ও সমান ছিল; কিন্তু যেদিন প্রথম কোনো স্বার্থপর ব্যক্তি একখণ্ড জমি ঘিরে বলেছিল "এটা আমার", সেদিন থেকেই সমাজে ব্যক্তিগত সম্পত্তি, লোভ, শোষণ ও কৃত্রিম সামাজিক বৈষম্যের জন্ম হয়েছিল।
  • রুশোর এই গণসার্বভৌমত্ব ও সাম্যবাদী তত্ত্বই পরবর্তীকালে রোবসপিয়র ও জ্যাকোবিনদের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছিল। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন: "রুশো না থাকলে ফরাসি বিপ্লবই ঘটত না।"
৩.৫ বিশ্বকোষবিদ (Encyclopédistes) ও ফিজিওক্র্যাট অর্থনীতিবিদগণ

বিশ্বকোষ প্রণেতা দল:
দার্শনিক দেনিস দিদেরো (Denis Diderot) এবং গণিতজ্ঞ জাঁ লে রোঁ দ'আলেমবার্ট (Jean le Rond d'Alembert)-এর যৌথ সম্পাদনায় ১৭৫১ থেকে ১৭৭২ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয় ৩৫ খণ্ডের বিশাল 'এনসাইক্লোপিডিয়া' (Encyclopédie বা বিজ্ঞান, শিল্প ও বৃত্তির বিশ্লেষণমূলক বিশ্বকোষ)। এতে ভলতেয়ার, রুশো, মন্তেস্কুসহ সমকালের সেরা পণ্ডিতরা নিবন্ধ লেখেন। এই বিশ্বকোষ ফরাসিদের মধ্যযুগীয় ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস কাটিয়ে বৈজ্ঞানিক কৌতূহল, মানবতাবাদ, যুক্তি এবং রাজনৈতিক অধিকার সচেতনতায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।

ফিজিওক্র্যাট বা অর্থনীতিবিদ গোষ্ঠী:
ফ্রাঁসোয়া কুয়েশনে (François Quesnay) এবং তুর্গোর মতো অর্থনীতিবিদরা ফ্রান্সে মধ্যযুগীয় বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও গিল্ড ব্যবস্থার বিরোধিতা করেন। তাঁরা 'ল্যাসে ফেয়ার' (Laissez-faire / অবাধ বাণিজ্য ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য) নীতির পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন এবং দাবি জানান যে কৃষির ওপর থেকে সমস্ত সামন্ততান্ত্রিক বাধানিষেধ তুলে নেওয়া হোক।

বৌদ্ধিক জাগরণের ঐতিহাসিক প্রভাব:

ফরাসি দার্শনিকরা কোনো রাজনৈতিক দল বা সশস্ত্র ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন না। কিন্তু তাঁদের ক্ষুরধার লেখালেখি ফরাসি জাতির মনের বন্দিদশা ঘুচিয়ে দিয়েছিল। ফ্রান্সের মানুষ যখন দেখল যে রাজতন্ত্র কোনো ঐশ্বরিক পবিত্র বিধান নয় এবং সামন্ত শোষকদের অত্যাচার কোনো বিধাতার বিধান নয়, তখনই ১৭৮৯ সালে সেই শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার সম্মিলিত সাহস তাঁদের মধ্যে জাগ্রত হয়েছিল।

মডিউল ৪: ১৭৮৯-এর বিপ্লবের মহাবিস্ফোট: স্টেটস জেনারেল, টেনিস কোর্টের শপথ ও বাস্তিল পতন

৪.১ স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন (৫ মে ১৭৮৯) ও ভোটদান বিতর্ক

অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে এবং অর্থমন্ত্রী নেকারের পরামর্শে রাজা ষোড়শ লুই বাধ্য হয়ে ১৬১৪ খ্রিস্টাব্দের পর দীর্ঘ ১৭৫ বছর পর ফ্রান্সের প্রাচীন জাতীয় প্রতিনিধি সভা 'স্টেটস জেনারেল' (Estates-General) আহ্বান করেন। ১৭৮৯ সালের ৫ মে ভার্সাইয়ের রাজপ্রাসাদে এই ঐতিহাসিক অধিবেশন শুরু হয়।

ভোটদান পদ্ধতি নিয়ে ঐতিহাসিক সংঘাত:

  • প্রতিনিধি সংখ্যা: প্রথম সম্প্রদায় (যাজক) পাঠিয়েছিল ৩০০ জন, দ্বিতীয় সম্প্রদায় (অভিজাত) ৩০০ জন এবং তৃতীয় সম্প্রদায় পাঠিয়েছিল ৬০০ জন প্রতিনিধি (যাঁদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন আইনজীবী ও বুর্জোয়া)।
  • প্রথাগত ভোট বনাম মাথাপিছু ভোট: পুরাতন নিয়ম অনুযায়ী তিনটি কক্ষ পৃথকভাবে বসত এবং প্রতিটি সম্প্রদায়ের ছিল একটি করে ভোট (Vote by Estate / Order)। এতে যাজক ও অভিজাতরা হাত মিলিয়ে ২-১ ভোটে সর্বদা তৃতীয় সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করে রাখত। তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা দাবি তোলেন যে পৃথক কক্ষের বদলে সমস্ত প্রতিনিধির যৌথ সাধারণ অধিবেশন ডাকতে হবে এবং প্রতিটি প্রতিনিধির মাথাপিছু একক ভোট (Vote by Head) গণনা করতে হবে। এতে তৃতীয় সম্প্রদায় (৬০০ জন) সংস্কারকামী নিম্ন যাজক ও উদার অভিজাতদের সমর্থনে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত।
  • আবে সিয়েস (Abbé Sieyès)-এর অবিস্মরণীয় পুস্তিকা: এই সময় পাদ্রি আবে সিয়েস প্রকাশ করেন তাঁর ঐতিহাসিক পুস্তিকা 'তৃতীয় সম্প্রদায় কি?' (Qu'est-ce que le Tiers-État?)। এতে তিনি তিনটি অমর প্রশ্ন ও উত্তর রাখেন:
    ১. তৃতীয় সম্প্রদায় কি? —সবকিছু।
    ২. এযাবৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তার স্থান কি ছিল? —কিছুই নয়।
    ৩. সে কি হতে চায়? —কিছু একটা হতে চায়।
৪.২ জাতীয় সভা গঠন ও টেনিস কোর্টের শপথ (২০ জুন ১৭৮৯)

রাজা ও প্রথম দুই সম্প্রদায় মাথাপিছু ভোটের দাবি নাকচ করে দিলে তৃতীয় সম্প্রদায়ের নেতারা চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন:

  1. জাতীয় সভা ঘোষণা (১৭ জুন ১৭৮৯): আবে সিয়েস ও মিরাবোর নেতৃত্বে তৃতীয় সম্প্রদায় নিজেদের সমগ্র ফরাসি জাতির ৯৮% মানুষের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে ঘোষণা করে এবং এককভাবে 'জাতীয় সভা' (National Assembly) প্রতিষ্ঠা করে। তারা কর আদায়ের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি জানায়।
  2. রুদ্ধ কক্ষ ও টেনিস কোর্টের শপথ (২০ জুন ১৭৮৯): ২০ জুন সকালে তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা তাঁদের অধিবেশন কক্ষে (মেনু প্লিজির) গিয়ে দেখেন যে রাজকীয় সৈন্য দিয়ে দরজা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। অজুহাত দেওয়া হয় যে রাজা সংস্কারের জন্য কক্ষ বন্ধ রেখেছেন। প্রতিনিধিরা দমে না গিয়ে সভাপতি জাঁ সিলভ্যাঁ বেইলি (Jean Sylvain Bailly)-র নেতৃত্বে নিকটবর্তী একটি ইনডোর টেনিস খেলার মাঠে (Jeu de Paume) সমবেত হন। সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁরা সম্মিলিত কণ্ঠে এক ঐতিহাসিক শপথ নেন:
    "যতদিন না ফ্রান্সের জন্য একটি সুস্থির ও লিখিত সংবিধান রচিত ও কার্যকর হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত আমরা কোনো অবস্থাতেই বিচ্ছিন্ন হব না এবং যেখানেই পরিস্থিতি দাবি করবে সেখানেই আমাদের অধিবেশন চালিয়ে যাব।"
  3. মিরাবোর প্রত্যয়দীপ্ত হুঙ্কার (২৩ জুন): ২৩ জুন রাজা তিন সম্প্রদায়ের যৌথ সভায় এসে জাতীয় সভা ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেন। সভা শেষে রাজকীয় বার্তাবাহক মারকুইস দ্যু ব্রেজ সভাকক্ষ ত্যাগ করার আদেশ দিলে তৃতীয় সম্প্রদায়ের তেজস্বী নেতা কাউন্ট মিরাবো (Mirabeau) উঠে দাঁড়িয়ে গর্জে ওঠেন: "যান, আপনার প্রভুকে বলুন যে আমরা এখানে সমবেত হয়েছি জনগণের নির্দেশে, আর বেয়োনেটের আঘাত ছাড়া আমাদের এখান থেকে সরানো যাবে না!"
  4. পরাজয় স্বীকার করে রাজা ২৭ জুন বাধ্য হয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় সম্প্রদায়কে জাতীয় সভায় যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং এই সভা ফ্রান্সের নতুন সংবিধান রচনার জন্য 'সংবিধান সভা' (Constituent Assembly)-তে রূপান্তরিত হয়।
৪.৩ বাস্তিল দুর্গের ঐতিহাসিক পতন (১৪ জুলাই ১৭৮৯)

রাজা মুখে জাতীয় সভা মেনে নিলেও গোপনে বিপ্লব ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র আঁটছিলেন।

  • উত্তেজনার পটভূমি: রাজা জনপ্রিয় উদারপন্থী অর্থমন্ত্রী নেকারকে পদচ্যুত করেন এবং প্যারিস ও ভার্সাইয়ের চারিপাশে ২০,০০০ বিদেশি জার্মান ও সুইস ভাড়াটে সেনা মোতায়েন করেন। একই সাথে প্যারিসে ভয়াবহ খাদ্যসংকট দেখা দেয় এবং রুটির দাম আকাশচুম্বী হয়। চারদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে রাজকীয় বাহিনী নিরীহ প্রজাদের গণহত্যা করতে আসছে।
  • জনগণের প্রতিরোধ ও জাতীয় রক্ষীবাহিনী: ক্ষুব্ধ প্যারিসবাসী নিজেদের হাতে শাসনভার তুলে নিয়ে 'প্যারিস কমিউন' (Paris Commune) গঠন করে। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর ফরাসি সেনাপতি মারকুইস দ্য লাফায়েত (Lafayette)-এর নেতৃত্বে গঠিত হয় বিপ্লবী নাগরিকদের সেনাবাহিনী 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' (National Guard)। প্যারিসের পতাকায় যুক্ত হয় বিপ্লবী তিন রং (Tricolour: লাল, সাদা ও নীল)।
  • বাস্তিল আক্রমণ (১৪ জুলাই ১৭৮৯): ১৪ জুলাই সকালে হাজার হাজার উত্তেজিত সাধারণ মানুষ ও সাঁ-কুলোৎ অস্ত্রশস্ত্রের খোঁজে ইনভ্যালিডস অস্ত্রাগার দখল করে এবং সেখান থেকে রাজকীয় স্বৈরাচারের সবচেয়ে ঘৃণ্য প্রতীক বাস্তিল দুর্গ (Bastille) আক্রমণ করে। দীর্ঘ চার ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দুর্গের পতন ঘটে। দুর্গের গভর্নর দ্য লনে (De Launay) নিহত হন এবং উত্তেজিত জনতা সাতজন রাজবন্দিকে মুক্ত করে দুর্গটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে মাটিতে মিশিয়ে দেয়।
  • ঐতিহাসিক তাৎপর্য: বাস্তিল দুর্গ ছিল বুরবোঁ রাজতন্ত্রের স্বৈরাচার ও অন্যায়ের মূর্ত প্রতীক। এর পতনের মধ্য দিয়ে রাজকীয় স্বৈরাচারের মেরুদণ্ড চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং জনগণই যে প্রকৃত সার্বভৌম শক্তি, তা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ১৪ জুলাই ফ্রান্সের জাতীয় দিবস (Bastille Day) হিসেবে পালিত হয়।
৪.৪ 'মহাভীতি' (La Grande Peur) ও ৪ আগস্টের রাত

মহাভীতি (জুলাই-আগস্ট ১৭৮৯):
বাস্তিল দুর্গের পতনের খবর দাবানলের মতো ফরাসি গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে রটে যায় এক ভয়াবহ গুজব—অভিজাতরা নাকি সশস্ত্র ডাকাতদল ও বিদেশি সৈন্য ভাড়া করে কৃষকদের মাঠের পাকা ফসল কেটে ফেলতে এবং তাদের হত্যা করতে পাঠাচ্ছে। এই আতঙ্ক ফরাসি ইতিহাসে 'মহাভীতি' (La Grande Peur / Great Fear) নামে পরিচিত। আতঙ্কে ক্ষিপ্ত হাজার হাজার কৃষক কুঠার, কাস্তে ও লাঠিসোটা নিয়ে সামন্তপ্রভুদের দুর্গ (Châteaux) আক্রমণ করে, শস্যভাণ্ডার লুট করে এবং সামন্ত কর ও দেনার প্রাচীন নথি (Terriers) আগুনে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে। বহু অভিজাত প্রাণভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান (এদের 'এমিগ্রে' বা Émigrés বলা হয়)।

৪ আগস্ট ১৭৮৯-এর ঐতিহাসিক রাত্রি: সামন্ততন্ত্রের চিরন্তন উচ্ছেদ:
কৃষকদের এই ভয়াল রুদ্রমূর্তি দেখে ভীতসন্ত্রস্ত সংবিধান সভা ১৭৮৯ সালের ৪ আগস্ট রাতে এক দীর্ঘ উত্তাল অধিবেশনে মিলিত হয়। উদার অভিজাত নোয়াইলে ও এগুইলনের প্রস্তাবে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এক রাতের ঘোষণায় শতাব্দীপ্রাচীন সামন্ততন্ত্র, কর্ভি, বানালিতে, অভিজাতদের শিকারের বিশেষাধিকার, বিচারালয়ের পদের ক্রয়-বিক্রয় এবং গির্জার 'টাইথ' (Tithe) ধর্মকর চিরতরে বিলুপ্ত করা হয়। এর ফলে ফ্রান্সে সামন্ততান্ত্রিক সমাজের অবসান ঘটে এবং আইনের দৃষ্টিতে সাম্যের ভিত্তি রচিত হয়।

৪.৫ ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র (২৬ আগস্ট ১৭৮৯)

১৭৮৯ সালের ২৬ আগস্ট ফরাসি সংবিধান সভা এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক দলিল রচনা করে, যার নাম 'ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র' (Declaration of the Rights of Man and of the Citizen)। লাফায়েত কর্তৃক খসড়াকৃত এবং রুশোর ভাবধারায় রচিত এই সনদের মূল নীতিগুলি ছিল:

  • জন্মগত সাম্য ও স্বাধীনতা: "মানুষ জন্মায় স্বাধীন এবং অধিকারের দিক থেকে সে সর্বদা সমান থাকে।" সমাজে সুযোগ-সুবিধার ভিত্তি হবে একমাত্র সামাজিক উপযোগিতা, কোনো জন্মগত বংশকৌলীন্য নয়।
  • জনগণের সার্বভৌমিকতা: সমস্ত সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস নিহিত রয়েছে সমগ্র জাতির মধ্যে। জনগণের স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃত্ব চালাতে পারে না।
  • মৌলিক স্বাধীনতা: চিন্তা, বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র অধিকার।
  • আইনের দৃষ্টিতে সমতা: আইন হলো জনগণের সাধারণ ইচ্ছার প্রকাশ। আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান এবং যোগ্যতা অনুসারে প্রত্যেকে সরকারি পদ পাওয়ার অধিকারী। বিনা বিচারে কাউকে গ্রেফতার বা বন্দি করা যাবে না।
  • সম্পত্তির অধিকার: ব্যক্তিগত সম্পত্তি হলো এক অলঙ্ঘনীয় ও পবিত্র অধিকার; জাতীয় স্বার্থ ছাড়া এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান ছাড়া কাউকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
৪.৬ মহিলাদের ভার্সাই অভিযান (৫-৬ অক্টোবর ১৭৮৯)

রাজা ষোড়শ লুই ৪ আগস্টের সামন্ততন্ত্র বিলোপ এবং ২৬ আগস্টের মানবাধিকার ঘোষণাপত্র অনুমোদন করতে গড়িমসি করছিলেন। এদিকে প্যারিসে রুটির আকাল চরম রূপ ধারণ করে। ১৭৮৯ সালের ৫ অক্টোবর ভোরে প্রায় ৭,০০০ ক্ষুধার্ত মহিলা বৃষ্টির মধ্যে প্যারিস থেকে ১২ মাইল পথ হেঁটে স্লোগান দিতে দিতে ভার্সাই প্রাসাদ ঘেরাও করেন। তাদের বিখ্যাত স্লোগান ছিল: "আমরা রুটিওয়ালা (রাজা), রুটিওয়ালী (রানী) ও রুটিওয়ালার ছানাকে (যুবরাজ) প্যারিসে নিয়ে যেতে এসেছি।" পরদিন রাজা বাধ্য হয়ে জনদাবি মেনে নেন এবং রাজপরিবারকে প্যারিসের তুইলারিজ (Tuileries) প্রাসাদে নিয়ে আসা হয়, যেখানে তারা সার্বক্ষণিক বিপ্লবী জনতার নজরদারিতে বন্দিদশায় পরিণত হন।

মডিউল ৫: সংবিধান সভার সংস্কার ও ১৭৯১ সালের সংবিধান: সংকট ও উত্তরণ

৫.১ সংবিধান সভার শাসনতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন

১৭৮৯ থেকে ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ফরাসি সংবিধান সভা ফ্রান্সে এক সর্বাত্মক প্রশাসনিক ও সামাজিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করে:

  • ৮৩টি ডিপার্টমেন্টে বিভক্তীকরণ: প্রাচীন জটিল ও অসমান সামন্ততান্ত্রিক প্রদেশগুলিকে বিলুপ্ত করে সমগ্র ফ্রান্সকে ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক সমতার ভিত্তিতে ৮৩টি সমমাত্রিক 'ডিপার্টমেন্ট' (Department বা জেলা)-এ বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট আবার ডিস্ট্রিক্ট, ক্যান্টন ও কমিউনে বিভক্ত হয়। স্থানীয় শাসন পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত হয় স্থানীয় জনগণের দ্বারা নির্বাচিত কর্মকর্তাদের ওপর।
  • দশমিক পদ্ধতির প্রবর্তন: বাণিজ্য ও প্রাত্যহিক জীবনে জটিলতা দূর করতে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত মেট্রিক বা দশমিক পরিমাপ পদ্ধতি (মিটার, লিটার, কিলোগ্রাম) চালুর ঐতিহাসিক ভিত্তি রচিত হয়।
  • বিচার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার: বিচারালয়ের পদ ক্রয়-বিক্রয় এবং পার্লেমন্ট প্রথা বাতিল করা হয়। সমস্ত ধরনের নির্মম শারীরিক নির্যাতন ও অত্যাচার নিষিদ্ধ করা হয়। ফৌজদারি মামলায় নিরপেক্ষতার জন্য জুরি প্রথা চালু করা হয় এবং বিচারকদের জনগণের দ্বারা নির্বাচনের নিয়ম হয়।
  • অর্থনৈতিক উদারীকরণ: প্রাচীন গিল্ড ব্যবস্থার একচেটিয়া অধিকার এবং দেশের অভ্যন্তরে পণ্য চলাচলের সমস্ত অভ্যন্তরীণ শুল্ক প্রাচীর (Internal Customs/Traites) চিরতরে তুলে দিয়ে অবাধ অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়।
৫.২ গির্জার সম্পত্তি জাতীয়করণ ও 'অ্যাসাইনেট' (Assignats) নোট

জাতীয় ঋণ ও দেউলিয়াত্ব মেটাতে সংবিধান সভা এক সাহসী আর্থিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে:

  1. সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত: ১৭৮৯ সালের নভেম্বর মাসে বিশপ ত্যালেরাঁর (Talleyrand) প্রস্তাবে সংবিধান সভা ফ্রান্সের ক্যাথলিক গির্জার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর জমি ও সম্পত্তি (যার আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় ৪০০ কোটি লিভ্র) বাজেয়াপ্ত ও জাতীয়করণ করে।
  2. অ্যাসাইনেট কাগজের নোট: এই বাজেয়াপ্ত গির্জার জমির মূল্যের জামানতের ওপর ভিত্তি করে সরকার ১৭৮৯ সালের ডিসেম্বরে 'অ্যাসাইনেট' (Assignats) নামক সরকারি ঋণপত্র বা বন্ড চালু করে, যা পরবর্তীতে কাগজের মুদ্রায় রূপান্তরিত হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে সরকারের অতিরিক্ত অপরিণামদর্শী নোট ছাপানোর ফলে অ্যাসাইনেটের দ্রুত অবমূল্যায়ন ঘটে এবং ফ্রান্সে মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। তবে এটি সাময়িকভাবে রাজকোষকে দেউলিয়াত্বের হাত থেকে রক্ষা করেছিল এবং বাজেয়াপ্ত জমি বিক্রির ফলে ফ্রান্সে এক বিশাল নতুন ক্ষুদ্র কৃষক শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছিল।
৫.৩ ধর্মযাজকদের সিভিল কনস্টিটিউশন (Civil Constitution of the Clergy - ১৭৯০)

ফরাসি বিপ্লবের সবচেয়ে বিতর্কিত ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার ছিল ১৭৯০ সালের ১২ জুলাই পাস হওয়া 'ধর্মযাজকদের সিভিল কনস্টিটিউশন' (Constitution civile du clergé) আইন:

  • আইনের মূল বক্তব্য: রোমান ক্যাথলিক চার্চকে সম্পূর্ণভাবে ফরাসি রাষ্ট্রের অধীনস্থ করা হয়। পোপের যাজক নিয়োগ ও বিচারিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। বিশপ ও পুরোহিতদের নির্বাচনের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় সাধারণ নাগরিকদের ওপর এবং তাঁদের সরকারের বেতনভুক সিভিল সার্ভেন্টে পরিণত করা হয়।
  • আনুগত্যের বাধ্যতামূলক শপথ: ১৭৯০ সালের নভেম্বর মাসে নির্দেশ দেওয়া হয় যে ফ্রান্সের সমস্ত পুরোহিত ও বিশপকে নতুন রাষ্ট্রীয় সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ্য শপথ গ্রহণ করতে হবে।
  • যাজক সমাজের বিভাজন: এই আইনের ফলে ফরাসি যাজকরা দুটি চরম বৈরী শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েন:
    ১. জ্যুরিং যাজক (Juring Clergy / সাংবিধানিক পুরোহিত): যারা রাষ্ট্রীয় সংবিধানে আনুগত্যের শপথ নেন (প্রায় অর্ধেক নিম্ন যাজক এবং ৭ জন বিশপ)।
    ২. নন-জ্যুরিং বা রিফ্র্যাক্টরি যাজক (Refractory Clergy): যারা পোপ ষষ্ঠ পায়াসের সমর্থনে শপথ নিতে অস্বীকার করেন।
  • ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবিপ্লব: পোপ ষষ্ঠ পায়াস এই আইনকে ধর্মদ্রোহী ঘোষণা করে তীব্র নিন্দা জানান। এর ফলে ফ্রান্সের লক্ষ লক্ষ নিষ্ঠাবান ধর্মভীরু ক্যাথলিক কৃষক বিপ্লবের বিরুদ্ধে চলে যায়। পশ্চিমাঞ্চলীয় ভেন্দি (Vendée) প্রদেশে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী ক্যাথলিক কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়, যা বিপ্লবের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লবী গৃহযুদ্ধের রূপ ধারণ করে।
৫.৪ ১৭৯১ সালের সংবিধান: নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র ও বুর্জোয়া আধিপত্য

১৭৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংবিধান সভা ফ্রান্সের প্রথম লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল:

  • নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র (Constitutional Monarchy): রাজার ঐশ্বরিক অধিকার চিরতরে বাতিল করে তাঁকে 'ফরাসিদের রাজা' (King of the French) ঘোষণা করা হয়। তিনি সংবিধানে বাধ্য থাকেন এবং আইন প্রণয়নে কেবল চার বছরের জন্য সাময়িক স্থগিতকারী ভেটো (Suspensive Veto) ক্ষমতা পান।
  • এক-কক্ষবিশিষ্ট আইন সভা (Legislative Assembly): ৭৪৫ সদস্যের আইন সভাকে সর্বোচ্চ আইন প্রণয়ন, যুদ্ধ ঘোষণা ও রাজস্ব নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
  • নাগরিকদের বৈষম্যমূলক বিভাজন (বুর্জোয়া পক্ষপাতিত্ব): মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে সাম্যের কথা বলা হলেও ভোটাধিকারের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য তৈরি করা হয়:
    • সক্রিয় নাগরিক (Active Citizens): ২৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী পুরুষ, যারা বছরে অন্তত তিন দিনের অদক্ষ শ্রমিকের মজুরির সমান প্রত্যক্ষ কর প্রদান করতেন। কেবল এদেরই ভোটাধিকার ছিল (মোট সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৩ লক্ষ)।
    • নিষ্ক্রিয় নাগরিক (Passive Citizens): দরিদ্র কৃষক, দিনমজুর, কাজের লোক এবং সমস্ত নারী সমাজ—যাঁরা কর দিতে পারতেন না, তাঁদের কোনো ভোটাধিকার ছিল না (প্রায় ৩০ লক্ষ পুরুষ এবং সমস্ত নারী)।
  • ওলাঁ দো গুজ ও নারী অধিকারের সংগ্রাম: নারীদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার তীব্র প্রতিবাদে বিদুষী লেখিকা ওলাঁ দো গুজ (Olympe de Gouges) ১৭৯১ সালে রচনা করেন তাঁর ঐতিহাসিক দলিল 'নারী ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র' (Declaration of the Rights of Woman and of the Female Citizen)। তিনি দাবি তোলেন: "নারীর যদি ফাঁসির মঞ্চে চড়ার অধিকার থাকে, তবে আইন সভায় দাঁড়িয়ে কথা বলার সমান অধিকারও তার থাকতে হবে।"
৫.৫ ভারেনের পলায়ন (Flight to Varennes - ২০-২১ জুন ১৭৯১)

রাজা ষোড়শ লুই বিপ্লবের সমস্ত সংস্কারকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। তিনি অস্ট্রিয়ার সম্রাট তথা তাঁর শ্যালক লিওপোল্ডের সাথে গোপনে ষড়যন্ত্র করে বিদেশি সেনাবাহিনীর সাহায্যে বিপ্লব ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেন।

  • ১৭৯১ সালের ২০ জুন গভীর রাতে রাজপরিবার ছদ্মবেশে তুইলারিজ প্রাসাদ থেকে একটি দ্রুতগামী ঘোড়ার গাড়িতে করে পূর্ব সীমান্ত অতিক্রমের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
  • কিন্তু অস্ট্রিয়ান সীমান্তের কাছে ভারেন (Varennes) নামক ছোট্ট শহরে স্থানীয় পোস্টমাস্টার দ্রুয়ে (Drouet) মুদ্রায় আঁকা ছবির সাথে মিলিয়ে রাজাকে চিনে ফেলেন। রাজপরিবারকে পাকড়াও করে সশস্ত্র পাহারায় প্যারিসে ফিরিয়ে আনা হয়।
  • তাৎপর্য: ভারেনের পলায়ন ষোড়শ লুইয়ের রাজনৈতিক মৃত্যুর ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। রাজার দেশপ্রেমের মিথ্যার মুখোশ চিরতরে খসে পড়ে এবং প্রমাণিত হয় যে তিনি নিজ দেশের বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির সাথে আঁতাত করেছেন। ফরাসি জনতার মন থেকে রাজতন্ত্রের মোহ সম্পূর্ণ মুছে যায় এবং কর্ডেলিয়ার ও জ্যাকোবিন ক্লাবের নেতৃত্বে 'রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র' প্রতিষ্ঠার দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়।

মডিউল ৬: চরমপন্থী প্রজাতন্ত্র, সন্ত্রাসের রাজত্ব (১৭৯২-১৭৯৪) ও বিপ্লবের বিশ্বঐতিহাসিক উত্তরাধিকার

৬.১ বহিরাক্রমণ ও বিপ্লবী যুদ্ধের সূচনা (১৭৯২)

ফরাসি বিপ্লবের গণতান্ত্রিক তরঙ্গ ইউরোপের অন্যান্য স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রগুলির সিংহাসন কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

  • পিলনিজের ঘোষণা (Declaration of Pillnitz - আগস্ট ১৭৯১): অস্ট্রিয়ার সম্রাট এবং প্রুশিয়ার রাজা যৌথ ঘোষণায় ফরাসি রাজতন্ত্রের মর্যাদা পুনরুদ্ধারে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেন।
  • যুদ্ধ ঘোষণা (২০ এপ্রিল ১৭৯২): ফ্রান্সের আইন সভা অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। প্রুশিয়া অস্ট্রিয়ার সঙ্গে যোগ দেয়।
  • ব্রান্সউইক ঘোষণাপত্র (Brunswick Manifesto - জুলাই ১৭৯২): প্রুশিয়ার সেনাপতি ডিউক অব ব্রান্সউইক চরমপত্র দেন যে রাজপরিবারের সামান্যতম ক্ষতি হলে প্যারিস শহর ধ্বংস করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হবে। এই ঘোষণায় ফরাসি দেশপ্রেমিকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
  • 'লা মার্সেইলেজ' (La Marseillaise): মাতৃভূমি রক্ষার ডাকে হাজার হাজার ফরাসি যুবক যুদ্ধে যোগ দেয়। ফরাসি কবি ও সেনা প্রকৌশলী রুজে দ্য লাইল (Rouget de Lisle) রচনা করেন তাঁর অবিস্মরণীয় যুদ্ধসঙ্গীত। মার্সেই শহরের একদল স্বেচ্ছাসেবক প্যারিসে পদযাত্রার সময় এই গানটি প্রথম গায় বলে এর নাম হয় 'লা মার্সেইলেজ'। পরবর্তীকালে এটি ফ্রান্সের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয়।
৬.২ তুইলারিজ প্রাসাদে আক্রমণ ও ফরাসি প্রজাতন্ত্রের জন্ম
  1. ১০ আগস্ট ১৭৯২-এর দ্বিতীয় বিপ্লব: বিপ্লবী সাঁ-কুলোৎ ও সশস্ত্র জনতা রাজার তুইলারিজ প্রাসাদ আক্রমণ করে রাজার সুইস রক্ষীবাহিনীকে পরাজিত করে রাজাকে বন্দি করে। আইন সভা রাজতন্ত্র স্থগিত ঘোষণা করে।
  2. সেপ্টেম্বর হত্যাকাণ্ড (September Massacres - সেপ্টেম্বর ১৭৯২): প্রুশিয়ানরা প্যারিসের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এই আতঙ্কে জেলখানায় থাকা প্রতিবিপ্লবী সন্দেহে প্রায় ১,২০০ বন্দিকে জনতা হত্যা করে। ২০ সেপ্টেম্বর ভালমির যুদ্ধে (Battle of Valmy) ফরাসি বিপ্লবী সেনার ঐতিহাসিক জয় প্যারিসকে বিদেশি আগ্রাসন থেকে রক্ষা করে।
  3. ফরাসি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা (২১ সেপ্টেম্বর ১৭৯২): সর্বজনীন পুরুষ ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত নতুন বিপ্লবী সংসদ 'জাতীয় কনভেনশন' (National Convention) ২১ সেপ্টেম্বর এক ঐতিহাসিক ঘোষণায় ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের চিরন্তন বিলোপ ঘটিয়ে 'প্রথম ফরাসি প্রজাতন্ত্র' (First French Republic) প্রতিষ্ঠা করে।
  4. ষোড়শ লুইয়ের মৃত্যুদণ্ড (২১ জানুয়ারি ১৭৯৩): তুইলারিজের এক লোহার সিন্দুকে রাজার গোপন দেশদ্রোহী চিঠিপত্র ফাঁস হয়ে যায়। জাতীয় কনভেনশনে দেশদ্রোহিতার দায়ে রাজাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি প্যারিসের রেভোলিউশন স্কোয়ারে ডক্টর গিলোটিনের উদ্ভাবিত শিরচ্ছেদ যন্ত্র 'গিলোটিন' (Guillotine)-এ ষোড়শ লুইয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। একই বছরের ১৬ অক্টোবর রানী মারি আঁতোয়ানেতকেও গিলোটিনে হত্যা করা হয়।
৬.৩ রাজনৈতিক সংঘাত: গিরন্দিন বনাম জ্যাকোবিন

কনভেনশনের ভেতরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ে দুটি প্রধান বিপ্লবী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়:

  • গিরন্দিন দল (Girondins): দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের গিরোন্দ প্রদেশ থেকে আগত ধনী বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি। নেতা ছিলেন ব্রিসো, ভার্নিয়ো এবং বিদুষী মাদাম রোল্যাঁ। এঁরা ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী এবং রাজার চরম মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী। এঁরা প্যারিসের চরমপন্থী সাঁ-কুলোৎ জনতাকে ঘৃণা করতেন।
  • জ্যাকোবিন দল বা পর্বতের দল (Jacobins / The Mountain): কনভেনশন ভবনের উঁচু বেঞ্চে বসতেন বলে এদের 'পর্বতের দল' বলা হতো। নেতা ছিলেন ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবসপিয়র (Maximilien Robespierre), জর্জ দাঁতোঁ (Georges Danton), জঁ-পল মারা (Jean-Paul Marat) এবং সেন্ট-জাস্ট (Saint-Just)। এঁরা ছিলেন কট্টর গণতন্ত্রী ও সাঁ-কুলোৎদের স্বার্থের পরম সমর্থক। মাতৃভূমি রক্ষার জন্য যে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নিতে এঁরা দ্বিধাহীন ছিলেন।
  • ১৭৯৩ সালের মে-জুন মাসে সাঁ-কুলোৎদের সশস্ত্র অভ্যুত্থানে গিরন্দিন নেতাদের বন্দি করা হয় এবং জ্যাকোবিনরা একচ্ছত্র রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে।
৬.৪ সন্ত্রাসের রাজত্ব (Reign of Terror - ২ জুন ১৭৯৩ থেকে ২৭ জুলাই ১৭৯৪)

১৭৯৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে ফ্রান্স চতুর্দিক থেকে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েছিল: ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, প্রুশিয়া, স্পেনসহ ইউরোপীয় শক্তির মহাজোট (First Coalition) সীমান্ত আক্রমণ করছিল এবং ভেতরে ৬০টি ডিপার্টমেন্টে গৃহযুদ্ধ ও ভেন্দি বিদ্রোহ চলছিল। এই চরম জাতীয় সংকটের মুহূর্তে রোবসপিয়রের নেতৃত্বে জ্যাকোবিনরা 'সন্ত্রাসই রাষ্ট্রের নীতি' (Terror is the order of the day) ঘোষণা করে।

সন্ত্রাসের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো:

  • জননিরাপত্তা সমিতি (Committee of Public Safety): ১২ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি রোবসপিয়রের নেতৃত্বে কার্যত এক সর্বময় একনায়কতান্ত্রিক যুদ্ধকালীন সরকারে পরিণত হয়। দাঁতোঁ, সেন্ট-জাস্ট ও কার্নো ছিলেন এর প্রধান চালিকাশক্তি।
  • সন্দেহভাজনদের আইন (Law of Suspects - ১৭ সেপ্টেম্বর ১৭৯৩): যে কোনো ব্যক্তি, যাঁর আচরণ বা কথা বিপ্লবের প্রতি সামান্যতম অনুৎসাহী মনে হতো, তাঁকেই বিনা বিচারে বন্দি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়।
  • বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল (Revolutionary Tribunal): বিচারের নামে প্রহসনের আদালত। আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো উকিল বা সাক্ষীর অধিকার ছিল না; রায় হতো মাত্র দুটি—মুক্তি অথবা গিলোটিনে শিরচ্ছেদ।
  • গিলোটিনের তাণ্ডব: এই ১৪ মাসের সন্ত্রাসের রাজত্বে প্রায় ৪০,০০০ মানুষকে গিলোটিনে ও গণফায়ারিংয়ে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন গিরন্দিন নেতৃবৃন্দ, দাঁতোঁ ও তাঁর সহচররা, এমনকি আধুনিক রসায়নবিদ্যার জনক ল্যাভয়সিয়েরে। নিহতদের সিংহভাগ (প্রায় ৭০-৮০%) ছিল সাধারণ কৃষক ও শ্রমিক, যারা বিদ্রোহ বা মুদ্রাস্ফীতির সাথে জড়িত ছিল।

সন্ত্রাসের প্রগতিশীল ও অর্থনৈতিক সংস্কার:
সন্ত্রাস কেবলমাত্র রক্তপাত ছিল না, এর পেছনে ছিল ফ্রান্সকে রক্ষার এক অভূতপূর্ব প্রচেষ্টা:

  1. সর্বোচ্চ মূল্য নিয়ন্ত্রণ আইন (Law of the Maximum): দরিদ্র সাঁ-কুলোৎদের বাঁচাতে রুটি, আটা, তেল ও মাংসের মতো ৩৯টি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সর্বোচ্চ দাম বেঁধে দেওয়া হয় এবং মজুরি বৃদ্ধি করা হয়। কালোবাজারি ও মজুতদারদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের আইন হয়।
  2. সার্বজনীন সামরিক নিয়োগ (Levée en Masse): ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী সমস্ত অবিবাহিত সক্ষম পুরুষকে বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়। ল্যাজার কার্নোর নেতৃত্বে প্রায় ১০ লক্ষ সেনার এক বিশাল দেশপ্রেমিক গণবাহিনী গড়ে ওঠে, যা ইউরোপের সম্মিলিত রাজতান্ত্রিক জোটকে পরাজিত করে ফ্রান্সের সীমান্ত রক্ষা করে।
  3. দাসপ্রথা বিলোপ: ১৭৯৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফরাসি উপনিবেশগুলিতে কৃষ্ণাঙ্গ দাসপ্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
  4. নতুন বিপ্লবী ক্যালেন্ডার ও পরম সত্তার উপাসনা: খ্রিস্টান বর্ষপঞ্জি বাতিল করে ১৭৯২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন ফরাসি বিপ্লবী পঞ্জিকা চালু করা হয় (যেমন থার্মিডোর, ব্রুমায়ার ইত্যাদি)। খ্রিস্টধর্মের প্রভাব মুছে দিতে রোবসপিয়র যুক্তি ও নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত 'পরম সত্তার উপাসনা' (Cult of the Supreme Being) প্রবর্তন করেন।
৬.৫ থার্মিডোরীয় প্রতিক্রিয়া ও সন্ত্রাসের অবসান (জুলাই ১৭৯৪)

বিদেশি আক্রমণ প্রতিহত হওয়ার পর সন্ত্রাসের কোনো যৌক্তিকতাই আর অবশিষ্ট ছিল না। রোবসপিয়র যখন দাঁতোঁ এবং দেমুল্যার মতো চরম জনপ্রিয় বিপ্লবী নেতাদেরও গিলোটিনে পাঠালেন, তখন কনভেনশনের সদস্যদের মনে ধারণা জন্মাল যে কেউই আর নিরাপদ নয়।

  • ৯ থার্মিডোর (২৭ জুলাই ১৭৯৪): ন্যাশনাল কনভেনশনে রোবসপিয়র নতুন করে সন্দেহভাজনদের তালিকা প্রকাশের হুমকি দিলে ভীত সদস্যরা তাঁর বিরুদ্ধে একজোট হয়ে চিৎকার করে ওঠেন: "স্বৈরাচারী নিপাত যাক!" রোবসপিয়র ও তাঁর অনুগামী সেন্ট-জাস্টকে কনভেনশনেই বন্দি করা হয়।
  • ১০ থার্মিডোর (২৮ জুলাই ১৭৯৪): রোবসপিয়র, সেন্ট-জাস্ট এবং ২২ জন জ্যাকোবিন নেতাকে কোনো বিচার ছাড়াই গিলোটিনে শিরচ্ছেদ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ১৪ মাসের রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটে। এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে বলা হয় 'থার্মিডোরীয় প্রতিক্রিয়া' (Thermidorian Reaction)।
  • সন্ত্রাসের অবসানের পর জ্যাকোবিন ক্লাব বন্ধ করে দেওয়া হয়, প্যারিস কমিউন বিলুপ্ত হয় এবং ক্ষমতায় আসে বুর্জোয়া ধনিক শ্রেণীর পরিচালিত পাঁচ সদস্যের 'ডিরেক্টরি শাসন' (Directory, ১৭৯৫-১৭৯৯), যার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ১৭৯৯ সালে মহাবীর নেপোলিয়ন বোনাপার্ট রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।
৬.৬ ফরাসি বিপ্লবের বিশ্বঐতিহাসিক আদর্শ ও চিরন্তন প্রভাব

ফরাসি বিপ্লব ছিল বিশ্ব ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় সন্ধিক্ষণ। এই বিপ্লব সমগ্র মানবজাতিকে তিনটি কালজয়ী অমর আদর্শ উপহার দিয়েছে:

বিপ্লবের মূলমন্ত্র ফরাসি পরিভাষা ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও বাস্তব রূপায়ন
স্বাধীনতা Liberté (লিবের্তে) রাজকীয় স্বৈরাচার ও সামন্ত শৃঙ্খল থেকে মুক্তি; ব্যক্তি স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন ধর্মাচরণের সাংবিধানিক স্বীকৃতি।
সাম্য Égalité (এগেলিতে) জন্মগত আভিজাত্য ও বিশেষাধিকারের চিরন্তন বিলোপ; আইনের চোখে সকলের সমান অধিকার; সমানুপাতিক করব্যবস্থা এবং যোগ্যতা অনুসারে সমস্ত নাগরিকের সমান সুযোগ।
মৈত্রী Fraternité (ফ্রাতের্নীতে) সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক জাতীয় সংহতি ও ঐক্যবোধ; সংকীর্ণ প্রাদেশিকতার অবসান ঘটিয়ে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের উন্মেষ এবং বিশ্বমানবতাবোধ।
বিশ্ব ইতিহাসে যুগান্তকারী উত্তরাধিকার:

ফরাসি বিপ্লব কেবল ফ্রান্সে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি গোটা ইউরোপ জুড়ে শত শত বছরের সামন্ততন্ত্র ও ঐশ্বরিক রাজতন্ত্রের ভিত ধসিয়ে দিয়েছিল। নেপোলিয়নের অভিযানের মাধ্যমে এই বিপ্লবের আদর্শ ইতালি, জার্মানি ও স্পেনে ছড়িয়ে পড়ে এবং ঊনবিংশ শতকের জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করে। ১৮৪৮-এর ইউরোপীয় বিপ্লব, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং আধুনিক রাষ্ট্রগুলির মানবাধিকার সনদের আদি উৎস হলো ১৭৮৯-এর এই মহান ফরাসি বিপ্লব।

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিভাষা, সময়কাল ও প্রশাসনিক নীতি

১৭৪৮: ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি (Separation of Powers)
মন্তেস্কুর 'দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ' (১৭৪৮)
মন্তেস্কু ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার অনুকরণে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র সমর্থন করেছিলেন।
১৭৬২: সামাজিক চুক্তি ও সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্ব (General Will)
রুশোর 'দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' (১৭৬২)
রুশোকে ফরাসি বিপ্লবের আধ্যাত্মিক জনক বলা হয়।
৫ মে ১৭৮৯: স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন আহ্বান
মাথাপিছু একক ভোট (Vote by head) বনাম প্রথাগত সম্প্রদায়ভিত্তিক ভোট (Vote by order)
আবে সিয়েসের পুস্তিকা: 'তৃতীয় সম্প্রদায় কি? —সবকিছু।'
২০ জুন ১৭৮৯: ঐতিহাসিক টেনিস কোর্টের শপথ (Tennis Court Oath)
সভাপতি বেইলি ও কাউন্ট মিরাবোর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব
১৭ জুন তৃতীয় সম্প্রদায় নিজেদের সমগ্র ফ্রান্সের প্রতিনিধি 'জাতীয় সভা' ঘোষণা করেছিল।
১৪ জুলাই ১৭৮৯: বাস্তিল দুর্গের পতন (Fall of the Bastille)
গভর্নর দ্য লনে নিহত, ফ্রান্সে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর উত্থান
১৪ জুলাই ফ্রান্সের জাতীয় দিবস (Bastille Day) হিসেবে উদযাপিত হয়।
৪ আগস্ট ১৭৮৯: সামন্ততন্ত্র ও বিশেষাধিকারের চিরন্তন বিলোপ
সংবিধান সভার ৪ আগস্টের নৈশ অধিবেশনের ঐতিহাসিক ডিক্রি
কৃষকদের দুর্গ আক্রমণ ও তেরিয়ে (সামন্ত করের দলিল) পোড়ানোর ফলে এই ডিক্রি কার্যকর হয়।
২৬ আগস্ট ১৭৮৯: ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র
লাফায়েত কর্তৃক রচিত ও রুশোর দর্শনে পুষ্ট ঐতিহাসিক সনদ
আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও রুশোর চিন্তা এর মূল অনুপ্রেরণা।
১২ জুলাই ১৭৯০: ধর্মযাজকদের সিভিল কনস্টিটিউশন
জ্যুরিং যাজক (শপথ গ্রহণকারী) বনাম নন-জ্যুরিং যাজক (অস্বীকারকারী)
গির্জার ৪০০ কোটি লিভ্র মূল্যের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে 'অ্যাসাইনেট' কাগজের নোট চালু হয়।
২১ সেপ্টেম্বর ১৭৯২: প্রথম ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা
২১ জানুয়ারি ১৭৯৩: দেশদ্রোহিতার অভিযোগে ষোড়শ লুইয়ের গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড
রুজে দ্য লাইলের যুদ্ধসঙ্গীত 'লা মার্সেইলেজ' জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হয়।
১৭৯৩-১৭৯৪: জ্যাকোবিন সন্ত্রাসের রাজত্ব ও থার্মিডোরীয় প্রতিক্রিয়া
রোবসপিয়রের মৃত্যুদণ্ড (২৮ জুলাই ১৭৯৪) এবং সন্ত্রাসের অবসান
সর্বোচ্চ মূল্য নিয়ন্ত্রণ আইন এবং ১০ লক্ষ সেনার লেভি এন মাস ছিল ইতিবাচক পদক্ষেপ।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে ফরাসি সমাজ কীভাবে বিভক্ত ছিল? সামাজিক বৈষম্য কীভাবে বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

বিপ্লব-পূর্ব ফ্রান্সের সামাজিক কাঠামো ছিল চরম বৈষম্যমূলক ও সামন্ততান্ত্রিক, যা ইতিহাসে 'পুরাতন ব্যবস্থা' (Ancien Régime) নামে পরিচিত। আইনত ফরাসি সমাজ তিনটি প্রধান সম্প্রদায় বা স্টেটে (Estates) বিভক্ত ছিল:

১. প্রথম সম্প্রদায় (যাজক - Clergy):

  • জনসংখ্যার মাত্র ০.৫% (প্রায় ১,৩০,০০০ জন) হলেও এরা দেশের মোট উর্বর জমির ১০ শতাংশের মালিক ছিল।
  • এরা সম্পূর্ণ প্রত্যক্ষ করমুক্ত ছিল এবং উল্টে সাধারণ কৃষকদের ওপর 'টাইথ' (Tithe) নামক ধর্মকর (ফসলের ১০%) আদায় করত।
  • যাজক সমাজের মধ্যে উচ্চ যাজকরা (বিশপ, অ্যাবট) ভার্সাই রাজপ্রাসাদে ভোগবিলাসে মগ্ন থাকতেন, আর দরিদ্র গ্রাম্য পুরোহিতরা (কিউরে) অভাবের মধ্যে কৃষকদের সমব্যথী ছিলেন।

২. দ্বিতীয় সম্প্রদায় (অভিজাত - Nobility):

  • জনসংখ্যার ১.৫% (প্রায় ৩,৫০,০০০ জন) এবং দেশের ২০-২৫% জমির মালিক।
  • এরা সমস্ত প্রত্যক্ষ কর থেকে মুক্ত ছিল। সরকারের সমস্ত উচ্চ সামরিক, কূটনৈতিক ও বিচার বিভাগের পদ এদের জন্য একচেটিয়া সংরক্ষিত ছিল।
  • জন্মগত তরবারিধারী অভিজাত এবং পদবী কেনা পোশাকী অভিজাত—উভয়েই কৃষকদের থেকে বেগার শ্রম (কর্ভি), শাঁপার ও বানালিতে আদায় করত এবং একচেটিয়া শিকারের অধিকার ভোগ করত।

৩. তৃতীয় সম্প্রদায় (Third Estate - Tiers État):

  • এরা ছিল ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশ (প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ)। অথচ এদের কোনো রাজনৈতিক অধিকার বা সামাজিক মর্যাদা ছিল না।
  • বুর্জোয়া: অর্থবান বণিক, শিল্পপতি, ব্যাংকার ও আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও বংশকৌলীন্য না থাকায় এরা প্রশাসনের উচ্চপদ থেকে বঞ্চিত হতো।
  • কৃষক (৮০%): কর্ভি (বিনা বেতনে বেগার শ্রম), বানালিতে (জমিদারের কল ও উনুন ব্যবহারের চড়া মাশুল), টেইলি (ভূমিকর) ও গ্যাবেল (লবণ কর) দিতে গিয়ে আয়ের ৮০ ভাগই এদের কর দিতে হতো।
  • সাঁ-কুলোৎ: শহরের দিনমজুর ও কারিগর, যারা চড়া দ্রব্যমূল্য ও অনাহারে ভুগছিল।

বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুতি: সমাজের এই চরম বৈষম্যের কারণেই ফরাসিদের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল। ৯৮% মানুষ যখন দেখল যে তাদের রক্তজল করা করের টাকায় মাত্র ২% সুবিধাবাদী যাজক ও অভিজাতরা চরম বিলাসিতা করছে, তখন তারা প্রচলিত সামন্ততান্ত্রিক সমাজকে সমূলে উপড়ে ফেলে সাম্য ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য ১৭৮৯ সালে বিপ্লবের পথে পা বাড়ায়।

উদাহরণ 2
অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সের করব্যবস্থার স্বরূপ কেমন ছিল? একে 'অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অবিচারের জ্বলন্ত কারখানা' বলা হয় কেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

অষ্টাদশ শতকে ফরাসি কর ব্যবস্থা ছিল চরম ত্রুটিপূর্ণ, নিপীড়নমূলক ও অবৈজ্ঞানিক। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ একে যথার্থই 'অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অবিচারের অদ্ভুত কারখানা' বলে উল্লেখ করেছিলেন। এর প্রধান কারণগুলি নিম্নরূপ:

১. কর প্রদানের চরম বৈষম্য:

  • কর ব্যবস্থার সবচেয়ে অন্যায় দিক ছিল—যাঁদের কর দেওয়ার সর্বাধিক সামর্থ্য ছিল (যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়), তাঁরা আইনত সম্পূর্ণ প্রত্যক্ষ করমুক্ত ছিলেন।
  • অপরদিকে যে কৃষকদের দু-বেলা অন্ন জুটত না, সেই তৃতীয় সম্প্রদায়ের ওপর রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় ও সামন্ততান্ত্রিক করের পর্বত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

২. প্রত্যক্ষ করের নির্মম বোঝা:

  • টেইলি (Taille): অত্যন্ত বৈষম্যমূলক প্রত্যক্ষ ভূমিকর, যা কেবল তৃতীয় সম্প্রদায়ের কৃষকদের দিতে হতো।
  • ক্যাপিটেশন (Capitation): মাথাপিছু উৎপাদন কর, যা থেকে ধনীরা ঘুষ দিয়ে বেঁচে যেত।
  • ভিংতিয়েম (Vingtième): আয়ের ৫% হারে প্রদেয় আয়কর, যা অভিজাতরা নানা কারসাজিতে ফাঁকি দিত।

৩. পরোক্ষ করের নিষ্ঠুরতা:

  • গ্যাবেল (Gabelle): ফ্রান্সের সবচেয়ে ঘৃণ্য লবণ কর। ৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রতিটি নাগরিককে সরকার নির্ধারিত চড়া মূল্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ লবণ কিনতে হতো। লবণ ফাঁকি দিলে গ্যালি জাহাজের দাস বানিয়ে নির্মম শাস্তি দেওয়া হতো।
  • এইডস (Aides): মদ, ওয়াইন ও তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর আরোপিত কর।
  • ত্রেত (Traites): অভ্যন্তরীণ প্রদেশগুলির মধ্যে চলাচলের সময় আরোপিত বাণিজ্য শুল্ক, যা শিল্প ও বাণিজ্য ধ্বংস করেছিল।

৪. ফার্ম জেনারেল (ইজারাদার)-এর শোষণ:

  • সরকার সরাসরি কর আদায় না করে 'ফার্ম জেনারেল' নামক একদল ধনিক ইজারাদারের হাতে কর আদায়ের ঠিকা দিত।
  • এই ইজারাদাররা রাজকোষে চুক্তিমাফিক টাকা জমা দিয়ে সাধারণ প্রজাদের ওপর দ্বিগুণ-তিনগুণ কর আদায় করত এবং সামান্য বিলম্ব হলে লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে কৃষকের ঘটিবাটি ক্রোক করত।

এইভাবে অন্যায্য ও বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থা ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে এবং ১৭৮৯ সালের মহাবিস্ফোরণকে অনিবার্য করে তোলে।

উদাহরণ 3
ফরাসি বিপ্লবের বৌদ্ধিক পটভূমি রচনায় দার্শনিকদের (মন্তেস্কু, ভলতেয়ার ও রুশো) অবদান আলোচনা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

অষ্টাদশ শতকের ফরাসি দার্শনিকরা সশস্ত্র বিপ্লব করেননি, কিন্তু তাঁদের লেখনী ফরাসি জনগণের মনের অন্ধকার ও কুসংস্কার দূর করে বিপ্লবের মতাদর্শগত ভিত রচনা করেছিল:

১. মন্তেস্কু (Montesquieu):

  • তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ 'আইনের ভাবধারা' (The Spirit of the Laws - ১৭৪৮)-তে তিনি স্বৈরাচার রোধে বিখ্যাত 'ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি' (Separation of Powers) প্রচার করেন।
  • তিনি বলেন, আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ এক ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত থাকলে ব্যক্তিস্বাধীনতা ধ্বংস হয়।
  • ইংল্যান্ডের অনুকরণে তিনি ফ্রান্সে একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি জানান, যা বুরবোঁ রাজাদের নিরঙ্কুশ স্বৈরাচারের মূলে আঘাত হানে।

২. ভলতেয়ার (Voltaire):

  • ফরাসি রোমান ক্যাথলিক চার্চের শোষণ, ভণ্ডামি ও অন্ধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র ব্যঙ্গাত্মক আক্রমণ শানান।
  • গির্জার কুসংস্কার নির্মূল করতে তাঁর বিখ্যাত রণহুঙ্কার ছিল: "Écrasez l'infâme!" (কুখ্যাত প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংস করো!)।
  • তিনি বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও পরমতসহিষ্ণুতার আজীবন সমর্থক ছিলেন। তিনি মানুষকে অন্ধভক্তি ছেড়ে যুক্তিবাদী হতে শিখিয়েছিলেন।

৩. জাঁ জাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau):

  • রুশোকে ফরাসি বিপ্লবের 'আধ্যাত্মিক জনক' বলা হয়।
  • তাঁর অমর গ্রন্থ 'সামাজিক চুক্তি' (The Social Contract - ১৭৬২)-র মূল বাণী: "মানুষ জন্মায় স্বাধীন, কিন্তু সর্বত্রই সে শৃঙ্খলিত।"
  • তিনি প্রচার করেন 'জনগণের সার্বভৌমিকতা' (Popular Sovereignty) এবং 'সাধারণ ইচ্ছা' (General Will) তত্ত্ব।
  • রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি নন, বরং জনগণের চুক্তির অধীন সেবকমাত্র। সরকার গণকল্যাণে ব্যর্থ হলে তাকে উৎখাত করার অধিকার জনগণের রয়েছে।

৪. এনসাইক্লোপিডিস্ট ও ফিজিওক্র্যাটগণ:

  • দিদেরো ও দ'আলেমবার্টের ৩৫ খণ্ডের 'বিশ্বকোষ' (Encyclopédie) ফরাসিদের বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী ভাবনায় উদ্দীপিত করে। ফিজিওক্র্যাটরা অবাধ বাণিজ্যের (Laissez-faire) দাবি তোলেন।

মূল্যায়ন: দার্শনিকরা সরাসরি বিপ্লব না ঘটালেও, প্রচলিত রাজতন্ত্র ও সামন্ত ব্যবস্থার অসারতা সাধারণ মানুষের সামনে উন্মোচন করে বিপ্লবের আগুন জ্বালানোর মূল বারুদ তৈরি করেছিলেন। নেপোলিয়ন যথার্থই বলেছিলেন: "রুশো না থাকলে ফরাসি বিপ্লবই হতো না।"

উদাহরণ 4
বাস্তিল দুর্গের পতনের (১৪ জুলাই ১৭৮৯) পটভূমি ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গের পতন ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও যুগান্তকারী ঘটনা:

১. বাস্তিল পতনের পটভূমি:

  • রাজকীয় ষড়যন্ত্র ও সৈন্য সমাবেশ: জাতীয় সভা গঠনের পর রাজা ষোড়শ লুই প্যারিস ও ভার্সাই ঘিরে ২০,০০০ বিদেশি জার্মান ও সুইস সেনা মোতায়েন করেন।
  • নেকারের বরখাস্ত: ১১ জুলাই জনপ্রিয় অর্থমন্ত্রী জাক নেকারকে রাজা বরখাস্ত করলে প্যারিসবাসী নিশ্চিত হয় যে রাজা বিপ্লবীদের ওপর গণহত্যা চালাতে আসছেন।
  • খাদ্যসংকট ও জনরোষ: রুটির আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি ও অনাহারে ক্ষুব্ধ সাধারণ সাঁ-কুলোৎ জনতা সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়।
  • জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন: প্যারিসবাসী কমিউন গঠন করে এবং মারকুইস দ্য লাফায়েতের নেতৃত্বে বিপ্লবী 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' গড়ে তোলে।

২. দুর্গ আক্রমণ ও পতন (১৪ জুলাই):

  • ১৪ জুলাই সকালে অস্ত্রশস্ত্র ও বারুদের খোঁজে কয়েক হাজার উত্তেজিত বিপ্লবী প্যারিসের কুখ্যাত রাজকীয় কারাগার 'বাস্তিল দুর্গ' (Bastille) ঘেরাও করে।
  • প্রায় চার ঘণ্টা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিপ্লবী জনতা দুর্গ দখল করে। দুর্গের গভর্নর দ্য লনে (De Launay) নিহত হন। বন্দিদের মুক্ত করে জনতা এই ঘৃণ্য দুর্গটিকে হাতুড়ি-শাবল দিয়ে গুঁড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেয়।

৩. ঐতিহাসিক তাৎপর্য:

  • স্বৈরাচারের পতন: বাস্তিল দুর্গ ছিল শত শত বছর ধরে বুরবোঁ রাজাদের নিরঙ্কুশ স্বৈরাচার ও বিনা বিচারে বন্দি রাখার (লেত্র দ্য কাশে) প্রতীক। এর পতন মানে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের নৈতিক পরাজয়।
  • জনগণের সার্বভৌমত্বের জয়: বাস্তিল পতনের ফলে প্রমাণিত হয় যে ফ্রান্সে আর রাজার হুকুম নয়, বরং প্যারিসের সাধারণ জনতার ইচ্ছা ও শক্তিই প্রধান চালিকাশক্তি।
  • জাতীয় দিবস: এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে প্রতি বছর ১৪ জুলাই ফ্রান্সের জাতীয় দিবস (Bastille Day) হিসেবে সাড়ম্বরে পালিত হয়।
উদাহরণ 5
ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র (২৬ আগস্ট ১৭৮৯)-এর মূল নীতিগুলি কী কী ছিল? এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব মূল্যায়ন করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ আগস্ট ফরাসি সংবিধান সভা কর্তৃক গৃহীত 'ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র' (Declaration of the Rights of Man and of the Citizen) ছিল আধুনিক বিশ্ব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সনদ। মারকুইস দ্য লাফায়েত কর্তৃক খসড়াকৃত এবং রুশোর ভাবধারায় পুষ্ট এই সনদের মূল নীতিগুলি নিম্নরূপ:

১. ঘোষণাপত্রের প্রধান নীতিসমূহ:

  • জন্মগত সাম্য ও স্বাধীনতা: "সকল মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে এবং আজীবন সম-অধিকারের অধিকারী থাকে।" জন্মগত আভিজাত্যের বিলোপ সাধন করা হয়।
  • জনগণের সার্বভৌমিকতা: সমস্ত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম ক্ষমতার একক উৎস সমগ্র জাতি। জনগণের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা রাজা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না।
  • নাগরিকের মৌলিক অধিকার: স্বাধীনতা, সম্পত্তি রক্ষা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং অন্যায্য অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়া মানুষের জন্মগত অলঙ্ঘনীয় অধিকার।
  • আইনের দৃষ্টিতে সমতা: "আইন হলো জনগণের সাধারণ ইচ্ছার প্রকাশ।" আইনের চোখে প্রতিটি নাগরিক সমান এবং যোগ্যতা অনুসারে প্রত্যেকে সমস্ত সরকারি চাকরি ও সম্মান পাওয়ার অধিকারী।
  • মৌলিক স্বাধীনতা: চিন্তা, বাক-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করা হয়।
  • সম্পত্তির পবিত্রতা: ব্যক্তিগত সম্পত্তি একটি অলঙ্ঘনীয় ও পবিত্র অধিকার। একমাত্র গণস্বার্থে এবং আইনসম্মত উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ছাড়া কাউকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

২. ঐতিহাসিক গুরুত্ব:

  • সামন্ততন্ত্রের চিরন্তন মৃত্যু: এই ঘোষণা সামন্ততান্ত্রিক স্তরভেদ ও বিশেষাধিকারের কফিনে শেষ পেরেক পোঁতে।
  • আধুনিক সংবিধানের ভিত্তি: পরবর্তীকালে বিশ্বের বহু দেশের লিখিত সংবিধান এবং ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের 'সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ' (UDHR)-এর মূল প্রেরণা ছিল এই ঘোষণাপত্র।
  • সীমাবদ্ধতা: সাম্যের কথা ঘোষণা করা হলেও নারীদের এবং দরিদ্র নিষ্ক্রিয় নাগরিকদের সমান ভোটাধিকার প্রদান করা হয়নি—যা বুর্জোয়া শ্রেণীর সংকীর্ণতাকে চিহ্নিত করেছিল।
উদাহরণ 6
জ্যাকোবিন দলের সন্ত্রাসের রাজত্বের (১৭৯৩-১৭৯৪) কারণ ও স্বরূপ আলোচনা করো। এই সন্ত্রাস কি বিপ্লবকে রক্ষা করতে পেরেছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১৭৯৩ সালের ২ জুন থেকে ১৭৯৪ সালের ২৭ জুলাই (৯ থার্মিডোর) পর্যন্ত সময়কালে ফ্রান্সে ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবসপিয়রের নেতৃত্বে জ্যাকোবিন দলের শাসন 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' (Reign of Terror) নামে পরিচিত।

১. সন্ত্রাস প্রবর্তনের কারণ:

  • বিদেশি রাজতান্ত্রিক আক্রমণ: ষোড়শ লুইয়ের মৃত্যুদণ্ডের পর ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, প্রুশিয়া, স্পেনসহ ইউরোপের দেশগুলি 'প্রথম ফরাসি-বিরোধী মহাজোট' গড়ে চারদিক থেকে ফ্রান্স আক্রমণ করে।
  • অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লব: ক্যাথলিক চার্চের প্ররোচনায় ফ্রান্সের ভেন্দি প্রদেশে ভয়াবহ কৃষক বিদ্রোহ এবং গিরন্দিনদের প্ররোচনায় ৬০টি জেলায় কনভেনশনের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
  • অর্থনৈতিক সংকট: তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, অ্যাসাইনেট নোটের অবমূল্যায়ন এবং প্যারিসে চরম খাদ্যাভাব দেখা দেয়।
  • এই অবস্থায় চরম কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া মাতৃভূমি ও বিপ্লবকে বাঁচানো অসম্ভব ছিল।

২. সন্ত্রাসের স্বরূপ ও দমনমূলক ব্যবস্থা:

  • জননিরাপত্তা সমিতি: ১২ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি রোবসপিয়রের নেতৃত্বে যুদ্ধকালীন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়।
  • সন্দেহভাজনদের আইন (Law of Suspects): যে কাউকে বিপ্লবের শত্রু সন্দেহে বিনা প্রমাণে বন্দি করা হতো।
  • বিপ্লবী ট্রাইব্যুনাল ও গিলোটিন: বিচারের নামে প্রহসন করে প্রায় ৪০,০০০ মানুষকে গিলোটিনে ও গণফায়ারিংয়ে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন মাদাম রোল্যাঁ, দাঁতোঁ এবং এমনকি রসায়নবিদ ল্যাভয়সিয়েরে।

৩. সন্ত্রাসের প্রগতিশীল ও গঠনমূলক দিক:

  • সর্বোচ্চ মূল্য নিয়ন্ত্রণ আইন (Law of the Maximum): গরিব সাঁ-কুলোৎদের বাঁচাতে রুটি, আটা ও মাংসের সর্বোচ্চ দাম বেঁধে দেওয়া হয় এবং মজুতদারদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
  • সার্বজনীন বাধ্যতামূলক নিয়োগ (Levée en Masse): ল্যাজার কার্নোর নেতৃত্বে ১০ লক্ষ সেনার দেশপ্রেমিক গণবাহিনী তৈরি করে বিদেশি হানাদারদের ফরাসি সীমান্ত থেকে সম্পূর্ণ বিতাড়িত করা হয়।
  • দাসপ্রথা সাময়িক বিলোপ: ফরাসি উপনিবেশে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করা হয়।

৪. উপসংহার ও সন্ত্রাস কি সফল ছিল? সন্ত্রাসের ভয়াবহ রক্তপাত অমানবিক হলেও ঐতিহাসিক দিক থেকে তা ফ্রান্সকে দ্বিমুখী ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। এটি বহিরাক্রমণ ঠেকিয়েছিল এবং অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ দমন করেছিল। কিন্তু যখন সংকট কেটে গেল, তখন সন্ত্রাসের মাত্রা বাড়তে থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে ১৭৯৪ সালের ৯ থার্মিডোর রোবসপিয়রকে বন্দি করে গিলোটিনে দেওয়া হয় এবং সন্ত্রাসের অবসান ঘটে।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে ভলতেয়ার এবং রুশো ১৭৮৯ সালের বিপ্লবে সশরীরে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বা বাস্তিল আক্রমণে ছিলেন।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ভলতেয়ার ও রুশো—উভয়েই বিপ্লব শুরু হওয়ার ১১ বছর আগে ১৭৭৮ সালে মৃত্যুবরণ করেছিলেন! তাঁরা বিপ্লবে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না; তাঁরা তাঁদের লেখনী ও দর্শনের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা জগতে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।

সাধারণ ভুল ধারণা

টাইথ (Tithe) এবং টেইলি (Taille) করের প্রকৃতি গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

টাইথ (Tithe) ছিল ক্যাথলিক গির্জাকে দেওয়া বাধ্যতামূলক ধর্মকর (উৎপাদিত ফসলের এক-দশমাংশ বা ১০%)। আর টেইলি (Taille) ছিল ফরাসি বুরবোঁ রাজাকে দেওয়া অত্যন্ত বৈষম্যমূলক প্রত্যক্ষ ভূমিকর।

সাধারণ ভুল ধারণা

টেনিস কোর্টের শপথের তারিখ ও বাস্তিল দুর্গের পতনের তারিখ অদলবদল করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

২০ জুন ১৭৮৯ তারিখে তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা টেনিস কোর্টের শপথ নেন। আর ১৪ জুলাই ১৭৮৯ তারিখে প্যারিসের উত্তেজিত জনতা বাস্তিল দুর্গ ধ্বংস করে।

সাধারণ ভুল ধারণা

পোশাকী অভিজাত (Nobles of the Robe) এবং জন্মগত তরবারিধারী অভিজাত (Nobles of the Sword)-এর উৎপত্তি ভুল বোঝা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

পোশাকী অভিজাতরা প্রাচীন সামন্ত পরিবার থেকে আসেননি। এঁরা ছিলেন ধনী বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত, যাঁরা বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিচার বিভাগীয় (পার্লেমন্ট) বা প্রশাসনিক উচ্চপদ কিনে আভিজাত্যের মর্যাদা লাভ করেছিলেন।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে ১৭৯১ সালের সংবিধান ফ্রান্সে সবাইকে (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) ভোটাধিকার দিয়েছিল।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

১৭৯১ সালের সংবিধান ছিল মূলত ধনী বুর্জোয়াদের স্বার্থবাহী। এতে নাগরিকদের 'সক্রিয়' (করদাতা পুরুষ) ও 'নিষ্ক্রিয়' (দরিদ্র ও সকল নারী) ভাগে ভাগ করে কেবল সক্রিয় নাগরিকদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়েছিল। ওলাঁ দো গুজ এর বিরুদ্ধেই নারী অধিকারের সনদ লেখেন।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে সন্ত্রাসের রাজত্ব কেবলই রক্তপিপাসু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ছিল, এর কোনো গঠনমূলক দিক ছিল না।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সন্ত্রাসের একটি চরম অন্ধকার দিক থাকলেও এর কিছু অপরিহার্য গঠনমূলক অবদান ছিল। যেমন—১০ লক্ষ সৈন্যের লেভি এন মাস গঠন করে বিদেশি হানাদারদের বিতাড়ন, সর্বোচ্চ মূল্য নিয়ন্ত্রণ আইন দিয়ে দ্রব্যমূল্য দমন এবং দাসপ্রথা সাময়িক বিলোপ।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে ডক্টর গিলোটিন নিজেই গিলোটিন যন্ত্রে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

এটি একটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক মিথ্যা বা কিংবদন্তি। ডক্টর গিলোটিন সন্ত্রাসের সময় গিলোটিনে মারা যাননি; তিনি স্বাভাবিকভাবেই ১৮১৪ সালে বৃদ্ধ বয়সে স্বাভাবিক কারণে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

ফরাসি বিপ্লবের যুগান্তকারী গতিধারা ও ধারণাগত রূপরেখা (WBBSE Class 9 Chapter 1)

1789 — 1799 ERA Some Aspects of the French Revolution: Core Architecture & Timeline (1789–1799) West Bengal Board of Secondary Education (WBBSE) • Class IX Social Science (History) I 1. The Ancien Régime (Social & Financial Crisis) First Estate: Clergy (~0.5% pop, collected Tithe, tax exempt) Second Estate: Nobility (~1.5% pop, feudal dues, monopolies) Third Estate: Bourgeoisie, Peasants & Urban Poor (~98% carrying all taxes) Fiscal Bankruptcy: War debts, Taille, Gabelle & feudal exploitation II 2. Intellectual Catalyst: The Philosophers Montesquieu: 'Spirit of the Laws' (Separation of Powers) Voltaire: Crusaded against church fanaticism, despotism & privilege Rousseau: 'Social Contract' (Popular Sovereignty & General Will) Encyclopaedists & Physiocrats: Diderot, rationalism & free enterprise III 3. Outbreak & Constitutional Monarchy (1789–1792) Estates-General (5 May 1789): Voting dispute (order vs. head) Tennis Court Oath (20 June): National Assembly resolves constitution Storming of the Bastille (14 July 1789): Shattered Bourbon absolutism Declaration of the Rights of Man (26 Aug) & Constitution of 1791 IV 4. The Radical Republic & Reign of Terror (1792–1794) Fall of Monarchy: Tuileries stormed, First Republic (21 Sept 1792) Execution of King Louis XVI (21 Jan 1793) & Foreign Coalitions Jacobins vs. Girondins; Committee of Public Safety formed Reign of Terror (Robespierre), Law of Suspects & Thermidorian Reaction Enduring Ideals: Liberty (Liberté) • Equality (Égalité) • Fraternity (Fraternité) • Feudalism Abolished

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
১. পুরাতন ব্যবস্থা ও সামাজিক অসাম্য: ১৭৮৯ পূর্ববর্তী ফ্রান্সে যাজক (১ম) ও অভিজাতরা (২য়) মাত্র ২% জনসংখ্যা হয়েও ৩৫% জমির মালিক এবং সম্পূর্ণ প্রত্যক্ষ করমুক্ত ছিল। অপরদিকে ৯৮% তৃতীয় সম্প্রদায় (বুর্জোয়া, কৃষক ও সাঁ-কুলোৎ) সমস্ত করের বোঝা বহন করত কিন্তু রাজনৈতিক অধিকারহীন ছিল।
মূল বিষয় 2
২. অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও করের বৈষম্য: সপ্তবর্ষীয় ও আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের বিশাল ব্যয়ভার (২০০ কোটি লিভ্র ঋণ) এবং বাজেটের ৫০% ঋণের সুদ মেটাতে ব্যয় হওয়ায় রাজকোষ দেউলিয়া হয়ে পড়ে। টেইলি, গ্যাবেল ও সামন্ত শোষণে কৃষকরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল।
মূল বিষয় 3
৩. অর্থমন্ত্রীদের ব্যর্থতা ও অভিজাত বিদ্রোহ: তুর্গো, নেকার ও ক্যালোঁর সার্বজনীন ভূমি করের প্রস্তাব অভিজাতরা নাকচ করে দেয় এবং ১৭৮৭-৮৮ সালে 'অভিজাত বিদ্রোহ' করে রাজার স্বৈরতন্ত্রের শিকড় উপড়ে ফেলে স্টেটস জেনারেল ডাকার ক্ষেত্র তৈরি করে।
মূল বিষয় 4
৪. দার্শনিকদের বৌদ্ধিক জাগরণ: মন্তেস্কুর ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি, ভলতেয়ারের চার্চবিরোধী যুক্তি এবং রুশোর সামাজিক চুক্তি ও জনগণের সার্বভৌমিকতা তত্ত্ব ফরাসি জাতির মনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
মূল বিষয় 5
৫. ১৭৮৯-এর বিপ্লবের মহাবিস্ফোট: ৫ মে স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন, মাথাপিছু ভোটের দাবিতে ১৭ জুন জাতীয় সভা গঠন, ২০ জুন ঐতিহাসিক টেনিস কোর্টের শপথ এবং ১৪ জুলাই স্বৈরাচারের প্রতীক বাস্তিল দুর্গের পতনের মাধ্যমে বিপ্লবের চূড়ান্ত সূচনা ঘটে।
মূল বিষয় 6
৬. ৪ আগস্ট ও মানবাধিকার ঘোষণা: ৪ আগস্ট রাতে সামন্ততন্ত্র ও টাইথ করের চিরন্তন বিলোপ ঘটে এবং ২৬ আগস্ট 'ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণাপত্র' গ্রহণের মাধ্যমে জন্মগত সাম্য, স্বাধীনতা ও আইনের সমতা ঘোষিত হয়। ৫ অক্টোবর মহিলাদের ভার্সাই অভিযানের ফলে রাজা প্যারিসে বন্দি হন।
মূল বিষয় 7
৭. সংবিধান সভার সংস্কার: ফ্রান্সকে ৮৩টি সমমাত্রিক ডিপার্টমেন্টে ভাগ, মেট্রিক দশমিক পদ্ধতির প্রবর্তন, গির্জার ৪০০ কোটি লিভ্র সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে 'অ্যাসাইনেট' নোট চালু এবং ধর্মযাজকদের সিভিল কনস্টিটিউশন প্রণয়ন।
মূল বিষয় 8
৮. ১৭৯১ সালের সংবিধান ও রাজার পলায়ন: নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র ও আইন সভা গঠিত হলেও সক্রিয় বনাম নিষ্ক্রিয় নাগরিকের ভোটাধিকারের বৈষম্য রয়ে যায়। ২০-২১ জুন ১৭৯১ রাজার ভারেনে পালানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে রাজার দেশপ্রেমের মুখোশ খুলে দেয়।
মূল বিষয় 9
৯. প্রথম ফরাসি প্রজাতন্ত্র ও লুইয়ের মৃত্যুদণ্ড: ১৭৯২ সালে বিদেশী যুদ্ধ শুরু ও লা মার্সেইলেজ সঙ্গীতের জন্ম। ১০ আগস্ট তুইলারিজ আক্রমণের পর ২১ সেপ্টেম্বর ১৭৯২ প্রথম ফরাসি প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হয় এবং ২১ জানুয়ারি ১৭৯৩ দেশদ্রোহিতার দায়ে ষোড়শ লুইকে গিলোটিনে শিরচ্ছেদ করা হয়।
মূল বিষয় 10
১০. সন্ত্রাসের রাজত্ব ও বিপ্লবের অমর আদর্শ: বহিরাক্রমণ ও গৃহযুদ্ধ দমনে ১৭৯৩-৯৪ সালে রোবসপিয়রের নেতৃত্বে জ্যাকোবিন সন্ত্রাসে ৪০,০০০ মানুষ নিহত হয়। ১০ লক্ষ সেনার প্রতিরোধ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও অতি-সন্ত্রাসে রোবসপিয়র নিজেই গিলোটিনে যান (৯ থার্মিডোর)। ফরাসি বিপ্লব সমগ্র বিশ্বকে উপহার দেয় 'স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী'-র চিরন্তন আদর্শ।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
বিপ্লব-পূর্ব ফ্রান্সে উচ্চতর যাজক ও নিম্নতর যাজকদের মধ্যে মূল সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য কী ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: উচ্চতর যাজকরা আসতেন অভিজাত পরিবার থেকে, তাঁরা বিপুল আয়ে ভার্সাই রাজপ্রাসাদে চরম ভোগবিলাসে গা ভাসিয়ে দিতেন। অপরদিকে নিম্নতর গ্রাম্য পুরোহিতরা (কিউরে) আসতেন দরিদ্র কৃষক সমাজ থেকে, সামান্য আয়ে জীবন কাটাতেন এবং কৃষকদের দুঃখকষ্টের সমব্যথী ছিলেন। ফলে ১৭৮৯ সালে বিপ্লব শুরু হলে নিম্ন যাজকেরা অভিজাতদের পক্ষ ত্যাগ করে তৃতীয় সম্প্রদায়ের সাধারণ গণপ্রতিনিধিদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন。
অভিজাত উৎস ও রাজদরবারের ভোগবিলাস বনাম গ্রাম্য দরিদ্র পুরোহিতদের কৃষকদের প্রতি সহমর্মিতার কথা ভাবো।
2
১৭৮৭-৮৮ খ্রিস্টাব্দের 'অভিজাত বিদ্রোহ' কেন ঘটেছিল এবং কীভাবে তা রাজার ক্ষমতার মূল ভিত্তি ভেঙে দেয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: অর্থমন্ত্রী ক্যালোঁ দেউলিয়া রাজকোষ বাঁচাতে অভিজাতদের করমুক্ত সুবিধা কেড়ে নিয়ে তাঁদের জমির ওপর সার্বজনীন ভূমি কর বসানোর প্রস্তাব দেন। এর প্রতিবাদে অভিজাতদের 'বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সভা' এবং প্যারিস পার্লেমন্ট নতুন কর দিতে অস্বীকার করে এবং দাবি তোলে যে কেবল স্টেটস জেনারেলই কর অনুমোদন করতে পারে। অভিজাতদের এই প্রতিরোধ রাজার নিরঙ্কুশ ক্ষমতার ভিত্তি চূর্ণ করে এবং রাজাকে ১৭৫ বছর পর স্টেটস জেনারেল ডাকতে বাধ্য করে।
ক্যালোঁর সার্বজনীন ভূমি করের প্রস্তাব এবং অভিজাতদের কর দিতে অস্বীকৃতি ও স্টেটস জেনারেলের দাবির কথা স্মরণ করো।
3
মন্তেস্কুর 'ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি' (Separation of Powers)-র মূল তাৎপর্য কী ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: মন্তেস্কু তাঁর 'দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ' গ্রন্থে দেখান যে সরকারের তিনটি অঙ্গ—আইন প্রণয়ন, শাসন পরিচালনা ও বিচার বিভাগ যদি একই স্বৈরাচারী রাজা বা সংস্থার হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তবে ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা অসম্ভব। এই তিনটি বিভাগ সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বাধীন সংস্থার হাতে ন্যস্ত থাকলেই কেবল নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষিত হতে পারে।
আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ একই ব্যক্তির হাতে থাকলে যে স্বৈরাচার ঘটে, তা প্রতিহত করার নীতির কথা ভাবো।
4
স্টেটস জেনারেলের অধিবেশনে 'মাথাপিছু ভোট' (Vote by head) নিয়ে তৃতীয় সম্প্রদায়ের দাবির পেছনে কী যুক্তি ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: প্রথাগতভাবে প্রতিটি সম্প্রদায়ের ছিল একটি করে ভোট (১ম ও ২য় মিলে ২-১ ভোটে ৩য় সম্প্রদায়কে পরাজিত করত)। কিন্তু তৃতীয় সম্প্রদায়ের সদস্য সংখ্যা ছিল দ্বিগুণ (৬০০ জন)। যৌথ অধিবেশন ও মাথাপিছু একক ভোট হলে তৃতীয় সম্প্রদায় কিছু সংস্কারকামী নিম্ন যাজক ও উদার অভিজাতদের সমর্থনে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত এবং দেশের ৯৮% মানুষের সত্যিকারের দাবি কার্যকর করতে পারত।
প্রথাগত ২-১ ভোটে পরাজয় বনাম যৌথ কক্ষে ৬০০ বুর্জোয়া ও প্রগতিশীলদের একত্রিত গরিষ্ঠতার কথা মনে করো।
5
১৭৯১ সালের সংবিধানে 'সক্রিয় নাগরিক' ও 'নিষ্ক্রিয় নাগরিক'-এর মধ্যে কী বৈষম্যমূলক পার্থক্য করা হয়েছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: সক্রিয় নাগরিক ছিলেন সেই সমস্ত ২৫ বছর বা তদূর্ধ্ব পুরুষ, যাঁরা অন্তত তিন দিনের অদক্ষ শ্রমিকের মজুরির সমতুল্য প্রত্যক্ষ কর দিতেন। কেবল তাঁদেরই ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছিল (প্রায় ৪৩ লক্ষ)। অপরদিকে দরিদ্র কৃষক, দিনমজুর এবং সকল নারীকে 'নিষ্ক্রিয় নাগরিক' আখ্যা দিয়ে ভোটাধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রাখা হয়েছিল।
তিন দিনের মজুরির সমান প্রত্যক্ষ কর প্রদানকারী বনাম কর প্রদানে অক্ষম দরিদ্র ও নারী সমাজের অধিকারহীনতা।
6
সন্ত্রাসের রাজত্বে গৃহীত 'লেভি এন মাস' (Levée en Masse) এবং 'সর্বোচ্চ মূল্য নিয়ন্ত্রণ আইন'-এর ঐতিহাসিক উপযোগিতা কী ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: 'লেভি এন মাস' বা সার্বজনীন সামরিক নিয়োগের মাধ্যমে ফ্রান্সে প্রায় ১০ লক্ষ দেশপ্রেমিক নাগরিকের এক বিশাল গণবাহিনী গড়ে ওঠে, যা সম্মিলিত ইউরোপীয় বিদেশি হানাদার রাজশক্তিকে পরাজিত করে ফ্রান্সের সীমান্ত রক্ষা করে। অপরদিকে সর্বোচ্চ মূল্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মাধ্যমে রুটি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেঁধে দিয়ে গরিব সাঁ-কুলোৎদের অনাহারের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল।
১০ লক্ষ সেনার গণবাহিনী দ্বারা বহিরাক্রমণ প্রতিহত এবং গরিবের নিত্যপণ্যের দাম বাঁধার ইতিবাচক প্রভাবের কথা ভাবো।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

The Second World War and Its Aftermath অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।