কম্পিউটার নেটওয়ার্ক হলো একাধিক স্বায়ত্তশাসিত (autonomous) কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের পরস্পরের সাথে এমন এক সংযোগ ব্যবস্থা, যা তারযুক্ত (guided) বা তারবিহীন (unguided) মাধ্যমের সাহায্যে নির্দিষ্ট নিয়মাবলী (প্রোটোকল) অনুসরণ করে পারস্পরিক ডেটা বিনিময় ও সংস্থান (resource) ভাগাভাগি করতে পারে।
কম্পিউটার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্যগুলি হলো:
- রিসোর্স শেয়ারিং (Resource Sharing): নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকার ফলে ব্যয়বহুল প্রিন্টার, স্ক্যানার, অপটিক্যাল স্টোরেজ বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্লাউড সার্ভার একাধিক ব্যবহারকারী একসাথে ভাগ করে ব্যবহার করতে পারে।
- উচ্চ নির্ভরযোগ্যতা ও রিডানড্যান্সি (High Reliability): গুরুত্বপূর্ণ ফাইল বা ডেটাবেস নেটওয়ার্কের একাধিক সার্ভারে কপি (replicate) করে রাখা যায়। কোনো একটি কম্পিউটার বিকল হলেও কাজ বন্ধ হয় না।
- খরচ কমানো (Cost Reduction): প্রতিটি কর্মীর জন্য আলাদা আলাদা হার্ডওয়্যার ও লাইসেন্সকৃত সফটওয়্যার না কিনে কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া যায়।
- দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ (High-Speed Communication): ইমেইল, মেসেজিং, ভয়েস কল ও ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করে নিমেষে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়।
- লোড শেয়ারিং ও ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটিং (Load Balancing): বড় কোনো জটিল গাণিতিক সমস্যা বা প্রক্রিয়াকরণকে নেটওয়ার্কভুক্ত একাধিক কম্পিউটারের মধ্যে ভাগ করে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব।
কম্পিউটারগুলির ভূমিকা ও কার্যকারিতার ভিত্তিতে নেটওয়ার্ক মূলত দুই ধরনের আর্কিটেকচারে বিভক্ত:
| বৈশিষ্ট্য | ক্লায়েন্ট-সার্ভার (Client-Server) | পিয়ার-টু-পিয়ার (Peer-to-Peer / P2P) |
|---|---|---|
| নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা | কেন্দ্রীভূত (Centralized) সার্ভার দ্বারা সমস্ত সম্পদ ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রিত হয়। | বিকেন্দ্রীভূত (Decentralized); কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় সার্ভার থাকে না। |
| ভূমিকা | ক্লায়েন্ট রিকোয়েস্ট পাঠায়, ডেডিকেটেড সার্ভার সেই রিকোয়েস্ট প্রসেস করে সেবা দেয়। | প্রতিটি নোড একই সাথে ক্লায়েন্ট ও সার্ভার উভয় হিসেবে কাজ করে (সমান মর্যাদা)। |
| ডেটা নিরাপত্তা ও ব্যাকআপ | অত্যন্ত উচ্চ; কেন্দ্রীয় সার্ভারেই সমস্ত ডেটার ব্যাকআপ ও অ্যাক্সেস কন্ট্রোল থাকে। | কম; প্রতিটি কম্পিউটারকে নিজের ডেটা ব্যাকআপ ও সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে হয়। |
| খরচ ও বাস্তবায়ন | উচ্চমানের সার্ভার ও দক্ষ নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনিস্ট্রেটর প্রয়োজন হওয়ায় ব্যয়বহুল। | কম ব্যয়বহুল এবং খুব সহজেই ছোট পরিসরে বাস্তবায়ন করা যায়। |
| স্কেলেবিলিটি | সহজেই নতুন ক্লায়েন্ট নোড যুক্ত করে সম্প্রসারণ করা যায়। | নোডের সংখ্যা ১০-১২ ছাড়িয়ে গেলে নেটওয়ার্কের গতি কমে ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। |
| বাস্তব উদাহরণ | ওয়েব ব্রাউজিং (HTTP/Web Server), ব্যাঙ্কিং ডেটাবেস, ইমেইল সিস্টেম। | BitTorrent ফাইল শেয়ারিং, ছোট অফিস বা বাড়িতে হোম ল্যান। |
কভারেজ এরিয়া বা ভৌগোলিক সীমার ওপর ভিত্তি করে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক প্রধানত চার ভাগে বিভক্ত:
- PAN (Personal Area Network): একক ব্যক্তির চারপাশে সাধারণত ১ থেকে ১০ মিটারের মধ্যে গঠিত ক্ষুদ্র নেটওয়ার্ক। এটি মূলত ব্লুটুথ, Zigbee বা USB কেবলের সাহায্যে ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ওয়্যারলেস হেডফোন ও স্মার্টওয়াচের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। ডেটা ট্রান্সমিশন রেট সাধারণত ১-৩ Mbps।
- LAN (Local Area Network): একটি নির্দিষ্ট কক্ষ, বাড়ি, অফিস ভবন বা স্কুল ক্যাম্পাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ (সাধারণত ১০ মিটার থেকে ১ কিলোমিটার পর্যন্ত)। উচ্চ গতিসম্পন্ন টুইস্টেড পেয়ার কেবল (Cat6) বা Wi-Fi (IEEE 802.11) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ট্রান্সমিশন রেট ১০০ Mbps থেকে ১০ Gbps পর্যন্ত হতে পারে। এর মালিকানা ব্যক্তিগত বা একক প্রাতিষ্ঠানিক এবং ডেটা ট্রান্সমিশনে ভুলের হার (error rate) অত্যন্ত কম।
- MAN (Metropolitan Area Network): একটি সম্পূর্ণ শহর বা পৌর এলাকার বিস্তৃতিতে গঠিত নেটওয়ার্ক (পরিসর ৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার)। যেমন—শহরের কেবল টিভি নেটওয়ার্ক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সব শাখার আন্তঃসংযোগ। এটি একাধিক LAN-কে অপটিক্যাল ফাইবার বা মাইক্রোওয়েভ লিঙ্কের মাধ্যমে যুক্ত করে।
- WAN (Wide Area Network): ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে সমগ্র দেশ, মহাদেশ বা বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক (১০০ কিমি থেকে হাজার হাজার কিমি)। এর সর্বোত্তম উদাহরণ হলো ইন্টারনেট (Internet)। এতে সাবমেরিন অপটিক্যাল ফাইবার কেবল, ভূ-উপগ্রহ (Satellite) লিঙ্ক ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টেলিফোন ব্যাকবোন ব্যবহৃত হয়। এর মালিকানা কোনো একক ব্যক্তি বা সংস্থার হাতে থাকে না এবং এতে ডেটা ট্রান্সফার রেট ও ত্রুটির সম্ভাবনা পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল।