Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 7 • History & Environment (অতীত ও ঐতিহ্য) • অধ্যায় 2
আনুমানিক সময়: 50 মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি ধারা: খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতক

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) সপ্তম শ্রেণির "অতীত ও ঐতিহ্য" পাঠ্যপুস্তকের দ্বিতীয় অধ্যায় "ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি ধারা: খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতক"। এই অধ্যায়ে প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল (পুণ্ড্রবর্ধন, বরেন্দ্র, বঙ্গ, রাঢ়, সুহ্ম, গৌড়, সমতট ও হরিকেল), গৌড়রাজ শশাঙ্কের শাসন ও তাঁর রাজধানী কর্ণসুবর্ণ, শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় এক শতাব্দীর চরম নৈরাজ্য বা মাৎস্যন্যায় (আনু. ৬৩৭–৭৫০ খ্রি.), ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা গোপালের ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক নির্বাচন ও পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা, ধর্মপাল ও দেবপালের নেতৃত্বে সাম্রাজ্য বিস্তার, কৈবর্ত বিদ্রোহ ও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত, কনৌজ অধিকারকে কেন্দ্র করে পাল-প্রতিহার-রাষ্ট্রকূটদের মধ্যে ২০০ বছরের ত্রিশক্তি সংগ্রাম, দক্ষিণ ভারতে রাজেন্দ্র চোলের গঙ্গাইকোণ্ডচোল উপাধি এবং কর্ণাটক থেকে বাংলায় আগত সেন বংশের বিজয়সেন, বল্লালসেনের কৌলীন্য প্রথা ও লক্ষণসেনের রাজসভার পঞ্চরত্ন এবং ১২০৪/১২০৫ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজির নদিয়া আক্রমণের মাধ্যমে তুর্কি শাসনের সূচনা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে।

১২৫০ বছর আগে কোনো রাজা বা সম্রাট ছাড়া একটি গোটা অঞ্চলের মানুষ কীভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের শাসক মনোনীত করেছিল?

ভাবুন তো এমন এক বাংলার কথা, যেখানে কোনো পুলিশ নেই, আদালত নেই, সরকার নেই—শক্তিশালী জোতদাররা দুর্বল সাধারণ মানুষদের জোর করে জমি কেড়ে নিচ্ছে, যেমন বড় মাছেরা গিলে খায় ছোট মাছকে! এই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে বলা হতো 'মাৎস্যন্যায়'। ঠিক সেই চরম অরাজকতার হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার বিশিষ্ট নাগরিকরা সমবেত হয়ে ভোট দিয়ে একজন সাধারণ সেনাপতি গোপালকে তাদের রাজা বানিয়েছিলেন! সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল চারশত বছরের সুবিখ্যাত পাল সাম্রাজ্য। আর ঠিক এই যুগেই কনৌজ শহর দখল করতে ভারতের তিন প্রান্তের তিনটি বিশাল সাম্রাজ্য ২০০ বছর ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত ছিল!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

এই অধ্যায়টি জানা আমাদের জন্য অত্যন্ত রোমাঞ্চকর, কারণ এই যুগেই বিচ্ছিন্ন জনপদগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রথম স্বাধীন বাংলার রাজনৈতিক সত্ত্বা লাভ করে। রাজা ছাড়া চরম অরাজকতা (মাৎস্যন্যায়) রোধে সাধারণ প্রজাদের ভোটে গোপালকে নির্বাচিত করার ঘটনা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য গণতান্ত্রিক নজির। একই সাথে পাল ও সেন রাজাদের শাসনকালে বাংলার সীমানা হিমালয় থেকে সাগর এবং কনৌজ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • ইতিহাসের বিভিন্ন উপাদান (শিলালিপি, তাম্রশাসন, প্রাচীন মুদ্রা) সম্পর্কে ধারণা।
  • ভারতের মানচিত্রে বাংলা, উত্তর ভারত ও দক্ষিণ ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান।
  • খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের সময়রেখা বা শতাব্দীর গণনা।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন ভৌগোলিক জনপদের সীমানা ও বৈশিষ্ট্য মানচিত্রে চিহ্নিত করা।
  • গৌড়রাজ শশাঙ্কের রাজনৈতিক অবদান এবং কর্ণসুবর্ণের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা।
  • মাৎস্যন্যায়ের সংজ্ঞা, কারণ ও গোপালের নির্বাচনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা।
  • ধর্মপাল ও দেবপালের সামরিক কৃতিত্ব এবং দিব্য ও ভীমের নেতৃত্বে কৈবর্ত বিদ্রোহের গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করা।
  • কনৌজকে কেন্দ্র করে পাল, প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূটের ত্রিশক্তি সংগ্রামের পটভূমি ও ফলাফল মূল্যায়ন করা।
  • সেন রাজাদের কৃতিত্ব (বল্লালসেনের গ্রন্থ ও লক্ষণসেনের পঞ্চরত্ন) এবং ১২০৪/০৫ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি অভিযানের প্রভাব ব্যাখ্যা করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. প্রাচীন বাংলার ভৌগোলিক পরিচয় এব...
2 ২. মাৎস্যন্যায় (বিশৃঙ্খলা ও অরাজকত...
3 ৩. পাল সাম্রাজ্যের বিস্তার, পরাক্রম...
4 ৪. কনৌজকে কেন্দ্র করে ২০০ বছরের ত্র...
5 ৫. সেন বংশের উত্থান, কৌলীন্য প্রথা...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. প্রাচীন বাংলার ভৌগোলিক পরিচয় এবং গৌড়রাজ শশাঙ্কের উত্থান

পদক্ষেপ ১: 👁️ পর্যবেক্ষণ ও আবিষ্কার

আজকের যে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ—প্রাচীনকালে কিন্তু এই নামে কোনো একক অবিভক্ত রাজ্য ছিল না। ভাগীরথী, পদ্মা, মেঘনা ইত্যাদি নদী ও জলাভূমি বাংলাকে ছোট ছোট প্রাকৃতিক অঞ্চলে বিভক্ত করে রেখেছিল।

পদক্ষেপ ২: 🧠 মূল ধারণার অনুধাবন

প্রাচীন বাংলার প্রধান ভৌগোলিক জনপদসমূহ:
• পুণ্ড্রবর্ধন ও বরেন্দ্র: উত্তরবঙ্গের বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলা নিয়ে গঠিত। গঙ্গা ও মহানন্দা নদীর মধ্যবর্তী উর্বর পলল সমভূমি হলো বরেন্দ্র।
• গৌড় (Gauda): মুর্শিদাবাদ, মালদা ও বীরভূমের অংশবিশেষ। সপ্তম শতকে গৌড়কে কেন্দ্র করে প্রথম সুসংহত রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।
• বঙ্গ (Vanga): বর্তমান বাংলাদেশের ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী ত্রিভুজাকার বদ্বীপ অঞ্চল।
• রাঢ় (Rarh): ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরের ভূখণ্ড। অজয় নদী দ্বারা এটি দুই ভাগে বিভক্ত—উত্তর রাঢ় (মুর্শিদাবাদ-বীরভূম) এবং দক্ষিণ রাঢ় (বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া)।
• সমতট ও হরিকেল: মেঘনা নদীর পূর্বদিকের জেলাসমূহ (কুমিল্লা, নোয়াখালী) ছিল সমতট; এবং দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলবর্তী চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চল ছিল হরিকেল।

গৌড়রাজ শশাঙ্ক (আনু. ৬০৬–৬৩৭ খ্রি.):
শশাঙ্ক ছিলেন প্রাচীন বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম নরপতি। তিনি দুর্বল মৌখরি ও পরবর্তী গুপ্তদের সরিয়ে গৌড়ের সিংহাসনে বসেন। মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ (রাঙামাটি) ছিল তাঁর রাজধানী। তিনি মগধ, ওড়িশা (উৎকল) ও কঙ্গোদ জয় করে বাংলাকে এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। শশাঙ্কের সাথে থানেশ্বরের পুষ্যভূতি বংশের হর্ষবর্ধন ও কামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মণের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চলেছিল।

পদক্ষেপ ৩: 🔍 প্রমাণের সাথে সংযোগ

চীনা তীর্থযাত্রী হিউয়েন সাঙ (Xuanzang) সপ্তম শতকে কর্ণসুবর্ণ ভ্রমণ করে লিখেছিলেন যে কর্ণসুবর্ণ ছিল এক সমৃদ্ধ বাণিজ্যনগরী এবং এর উপকণ্ঠে 'রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার' (লো-তো-মো-চি) নামক বিশাল বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র অবস্থিত ছিল। বানভট্টের 'হর্ষচরিত' এবং আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প গ্রন্থেও শশাঙ্কের বিশদ উল্লেখ রয়েছে।

পদক্ষেপ ৪: 💡 ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

হিউয়েন সাঙ ও বানভট্ট উভয়েই ছিলেন হর্ষবর্ধনের অনুগত, তাই তাঁদের লেখায় শশাঙ্ককে গোঁড়া শৈব এবং বৌদ্ধধর্মবিদ্বেষী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে (যেমন বোধিবৃক্ষ কাটার অভিযোগ)। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন যে শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণের রক্তমৃত্তিকা বিহারে শত শত বৌদ্ধ ভিক্ষু নিরাপদে বসবাস করতেন; অতএব শশাঙ্কের বিরুদ্ধে বৌদ্ধ নিগ্রহের অভিযোগ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয় বরং রাজনৈতিক পক্ষপাতের ফসল।

পদক্ষেপ ৫: 🎯 স্ব-মূল্যায়ন ও সারসংক্ষেপ

মনে রাখুন: প্রাচীন বাংলা পুণ্ড্রবর্ধন, গৌড়, বঙ্গ, রাঢ়, সমতট ও হরিকেলে বিভক্ত ছিল। শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার প্রথম সার্বভৌম নরপতি এবং কর্ণসুবর্ণ ছিল তাঁর রাজধানী।

২. মাৎস্যন্যায় (বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার যুগ) এবং গোপালের ঐতিহাসিক নির্বাচন (আনু. ৭৫০ খ্রি.)

পদক্ষেপ ১: 👁️ পর্যবেক্ষণ ও আবিষ্কার

একটি পুকুরে যদি কোনো রাখোয়াল বা প্রহরী না থাকে, তবে বড় রাঘববোয়ালরা কীভাবে ছোট ছোট চুনোপুঁটি মাছদের তাড়া করে গিলে ফেলে? রাষ্ট্রে কোনো কেন্দ্রীয় শাসক না থাকলে সমাজের অবস্থাও কি অবিকল তেমনই হয়?

পদক্ষেপ ২: 🧠 মূল ধারণার অনুধাবন

মাৎস্যন্যায় (Matsyanyaya) কী?
আনুমানিক ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে গৌড়রাজ শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসক ছিল না। প্রায় এক শতক ধরে (আনু. ৬৫০–৭৫০ খ্রি.) বাংলায় তীব্র অরাজকতা, গৃহযুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল। সামন্ত প্রভু ও ধনী ভূস্বামীরা যার যার এলাকায় স্বেচ্ছাচারিতা চালাত এবং দুর্বল সাধারণ প্রজাদের শোষণ করত। প্রাচীন কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বর্ণিত বড় মাছের ছোট মাছকে গিলে খাওয়ার রূপক দিয়ে এই ঘোরতর অরাজক সময়কে বলা হয় মাৎস্যন্যায়। এই সুযোগে যশোবর্মা ও ললিতাদিত্যের মতো বহিরাগত রাজারা বাংলাকে বারবার আক্রমণ ও লুণ্ঠন করেন।

পদক্ষেপ ৩: 🔍 প্রমাণের সাথে সংযোগ

ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসন (Khalimpur Copper Plate)-এ স্পষ্টভাবে খোদাই করা রয়েছে:
"মৎস্যন্যায়মপোহিতুং প্রকৃতিভির্লক্ষ্ম্যাঃ করং গ্রাহিতঃ শ্রীগোপাল ইতি..."
অর্থাৎ, মাৎস্যন্যায়ের ভয়াবহ পরিস্থিতি দূর করার জন্য প্রকৃতির সাধারণ প্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ (প্রকৃতিপুঞ্জ) একমত হয়ে প্রজাবৎসল গোপালকে রাজলক্ষ্মীর কর (রাজসিংহাসন) গ্রহণ করতে অনুরোধ জানান। তিব্বতীয় ঐতিহাসিক লামা তারানাথের বিবরণীতেও গোপালের এই গণতান্ত্রিক নির্বাচনের উল্লেখ পাওয়া যায়।

পদক্ষেপ ৪: 💡 ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

মধ্যযুগীয় ভারতে যেখানে রাজতন্ত্র ছিল কঠোর বংশানুক্রমিক ও তরবারির জোরে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকে বাংলায় প্রজাদের প্রত্যক্ষ সমর্থনের ভিত্তিতে গোপালের রাজপদে বরণ ভারতীয় ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। গোপাল (আনু. ৭৫০–৭৭০ খ্রি.) সিংহাসনে বসে অভ্যন্তরীণ শান্তি ফিরিয়ে আনেন এবং বাংলায় সুবিখ্যাত পাল সাম্রাজ্যের সূচনা করেন।

পদক্ষেপ ৫: 🎯 স্ব-মূল্যায়ন ও সারসংক্ষেপ

মনে রাখুন: শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় প্রায় ১০০ বছরের অরাজকতাকে 'মাৎস্যন্যায়' বলে। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রকৃতিপুঞ্জ গোপালকে নির্বাচিত করে মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটায় এবং পাল বংশের সূচনা করে।

৩. পাল সাম্রাজ্যের বিস্তার, পরাক্রম ও কৈবর্ত বিদ্রোহ

পদক্ষেপ ১: 👁️ পর্যবেক্ষণ ও আবিষ্কার

গোপালের পর তাঁর পুত্র ধর্মপাল কীভাবে বাংলাকে এক প্রান্তিক শক্তি থেকে ভারতবর্ষের প্রধান সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত করলেন? আর পাল রাজাদের শেষভাগে বরেন্দ্র অঞ্চলে সাধারণ মৎস্যজীবী কৈবর্তরা কীভাবে পরাক্রমশালী রাজাকে পরাজিত করে সিংহাসন দখল করেছিল?

পদক্ষেপ ২: 🧠 মূল ধারণার অনুধাবন

পাল সাম্রাজ্যের গৌরবময় অধ্যায়:
১. ধর্মপাল (আনু. ৭৭০–৮১০ খ্রি.): পাল বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যনির্মাতা। তিনি কনৌজে এক বিশাল রাজদরবার আহ্বান করে উত্তর ভারতের সার্বভৌম শাসক হিসেবে স্বীকৃতি পান। তিনি 'পরমভট্টারক পরমেশ্বর মহারাজাধিরাজ' উপাধি নেন এবং বিহারে বিশ্ববিখ্যাত বিক্রমশীলা মহাবিহার ও পাহাড়পুরে সোমপুর মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন।
২. দেবপাল (আনু. ৮১০–৮৫০ খ্রি.): ধর্মপালের সুযোগ্য পুত্র। তাঁর আমলে পাল সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তার লাভ করে। তিনি প্রাগজ্যোতিষপুর (আসাম) এবং উৎকল (ওড়িশা) জয় করেন। জাভার শৈলেন্দ্র বংশীয় রাজা বালপুত্রদেবকে নালন্দায় মঠ নির্মাণের জন্য পাঁচটি গ্রাম দান করেছিলেন।

কৈবর্ত বিদ্রোহ (Kaivarta Rebellion):
পাল বংশের দ্বিতীয় মহীপালের দুর্বল ও অত্যাচারী শাসনামলে (একাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ) উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলে এক ভয়াবহ বিদ্রোহ ঘটে। বরেন্দ্রের স্থানীয় কৈবর্ত প্রধান দিব্য (Divya) মহীপালকে যুদ্ধে হত্যা করে বরেন্দ্রের সিংহাসন দখল করেন। এরপর দিব্যের ভাই রুদোক এবং ভাইপো ভীম (Bhima) জনপ্রিয়তার সাথে শাসন করেন। পরবর্তীতে মহীপালের ভাই রামপাল (Ramapala) বিভিন্ন সামন্তদের জমি ও অর্থ দিয়ে জোটবদ্ধ করে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ভীমকে পরাজিত ও হত্যা করে বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেন। রামপাল 'রামাবতী' নামে নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন।

পদক্ষেপ ৩: 🔍 প্রমাণের সাথে সংযোগ

রামপালের সভাকবি সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত ঐতিহাসিক কাব্য 'রামচরিত' (Ramacharita) এই বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ দলিল। গ্রন্থটি দ্বি-অর্থবোধক (শ্লেষ অলংকার) শৈলীতে রচিত—একই শ্লোকে একদিকে রামায়ণের রামচন্দ্র ও অন্যদিকে গৌড়ের পালরাজা রামপালের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। সন্ধ্যাকর নন্দী বরেন্দ্রীকে পাল রাজাদের 'জনকভূঃ' (পিতৃভূমি) বলে অভিহিত করেছেন।

পদক্ষেপ ৪: 💡 ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

কৈবর্ত বিদ্রোহ ছিল মধ্যযুগীয় ভারতের প্রথম সফল আঞ্চলিক কৃষক-জনগোষ্ঠী ও সামন্ত বিদ্রোহ। দিব্য ও ভীম সাধারণ প্রজাদের ওপর পাল রাজাদের অন্যায় কর ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন। ভীমের জনকল্যাণমূলক কাজের স্মৃতি আজও উত্তরবঙ্গে 'ভীমের পান্টি' ও 'ভীমের জাঙ্গাল' নামে অক্ষয় রয়েছে।

পদক্ষেপ ৫: 🎯 স্ব-মূল্যায়ন ও সারসংক্ষেপ

মনে রাখুন: ধর্মপাল বিক্রমশীলা মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন; দেবপালের সময় পাল সাম্রাজ্যের চরম বিস্তার ঘটে। দ্বিতীয় মহীপালের সময় কৈবর্ত নেতা দিব্য বরেন্দ্র দখল করেন; পরে রামপাল ভীমকে পরাজিত করে রামচরিতের কাহিনী অনুসারে পিতৃভূমি উদ্ধার করেন।

৪. কনৌজকে কেন্দ্র করে ২০০ বছরের ত্রিশক্তি সংগ্রাম ও চোল সাম্রাজ্য

পদক্ষেপ ১: 👁️ পর্যবেক্ষণ ও আবিষ্কার

হর্ষবর্ধনের রাজধানী কনৌজ (উত্তর প্রদেশ) দখল করার জন্য দূরবর্তী তিনটি সাম্রাজ্য—বাংলার পাল, রাজস্থানের গুর্জর-প্রতিহার এবং দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূটরা কেন দুই শতক ধরে একটানা যুদ্ধ চালিয়েছিল?

পদক্ষেপ ২: 🧠 মূল ধারণার অনুধাবন

ত্রিশক্তি সংগ্রামের পটভূমি:
গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে অবস্থিত কনৌজ ছিল উত্তর ভারতের রাজনৈতিক প্রভুত্ব ও বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। তৎকালীন বিশ্বাস ছিল—যে রাজা কনৌজ শাসন করবেন, তিনিই সমগ্র ভারতের 'চক্রবর্তী রাজা' বা সম্রাট হিসেবে গণ্য হবেন। অষ্টম থেকে দশম শতক পর্যন্ত প্রায় ২০০ বছর ধরে কনৌজ দখলের উদ্দেশ্যে তিনটি বৃহৎ রাজবংশ দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল:
১. বাংলার পাল বংশ: ধর্মপাল ও দেবপাল কনৌজে নিজ অনুগত পুতুল রাজা (যেমন চক্রায়ুধ) বসাতে সচেষ্ট ছিলেন।
২. পশ্চিম ভারতের গুর্জর-প্রতিহার বংশ: বৎসরাজ, দ্বিতীয় নাগভট ও মিহিরভোজ।
৩. দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট বংশ: ধ্রুব, তৃতীয় গোবিন্দ ও প্রথম অমোঘবর্ষ।

সংগ্রামের ফলাফল: রাষ্ট্রকূট রাজারা সামরিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হলেও দাক্ষিণাত্যের গৃহবিবাদের কারণে বারবার যুদ্ধ জিতেও নিজেদের অঞ্চলে ফিরে যেতে বাধ্য হতেন। শেষপর্যন্ত গুর্জর-প্রতিহাররা কনৌজে আধিপত্য স্থাপন করে, কিন্তু ২০০ বছরের অবিরাম যুদ্ধের ফলে তিনটি সাম্রাজ্যেরই অর্থনীতি ও সামরিক শক্তি ধ্বংস হয়ে যায়।

দক্ষিণ ভারতে চোল শক্তির উত্থান:
এই একই যুগে দক্ষিণ ভারতে চোল সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। প্রথম রাজরাজ (৯৮৫–১০১৪ খ্রি.) তাঞ্জাভুরে রাজরাজেশ্বর বা বৃহদীশ্বর মন্দির নির্মাণ করেন। তাঁর পুত্র প্রথম রাজেন্দ্র চোল (১০১৪–১০৪৪ খ্রি.) ১০২২ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব উপকূল ধরে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে গঙ্গা অববাহিকা অভিযান চালান এবং পাল রাজা প্রথম মহীপালকে পরাজিত করেন। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের স্মারক হিসেবে তিনি 'গঙ্গাইকোণ্ডচোল' (গঙ্গাবিজয়ী চোল) উপাধি নেন এবং গঙ্গাইকোণ্ডচোলপুরম নগর ও এক বিশাল কৃত্রিম হ্রদ প্রতিষ্ঠা করেন। চোলদের অপরাজেয় নৌবাহিনী মালাক্কা প্রণালী ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত।

পদক্ষেপ ৩: 🔍 প্রমাণের সাথে সংযোগ

তিরুভালাঙ্গাড়ু তাম্রশাসন (Tiruvalangadu Plates) এবং তাঞ্জাভুরের শিলালিপিতে রাজেন্দ্র চোলের বাংলা বিজয়ের এবং গঙ্গা নদীর পবিত্র জল কলসে ভরে চোল রাজধানীতে নিয়ে যাওয়ার বিবরণ খোদাই করা আছে।

পদক্ষেপ ৪: 💡 ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

ত্রিশক্তি সংগ্রাম প্রমাণ করে যে আঞ্চলিক শক্তিগুলো তখন সর্বভারতীয় আধিপত্য বিস্তারের স্বপ্ন দেখত। কিন্তু কোনো পক্ষই দীর্ঘমেয়াদে কনৌজে স্থায়ী প্রভুত্ব বজায় রাখতে পারেনি, যা পরবর্তীতে উত্তর ভারতে রাজনৈতিক অনৈক্য ও বিদেশি তুর্কি আক্রমণের পথ প্রশস্ত করেছিল।

পদক্ষেপ ৫: 🎯 স্ব-মূলয়ায়ন ও সারসংক্ষেপ

মনে রাখুন: কনৌজ দখলের লড়াই ছিল পাল, প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূটদের মধ্যে। চোল রাজা প্রথম রাজেন্দ্র চোল মহীপালকে হারিয়ে 'গঙ্গাইকোণ্ডচোল' উপাধি নেন।

৫. সেন বংশের উত্থান, কৌলীন্য প্রথা এবং তুর্কি অভিযানের সূচনা (১২০৪/০৫ খ্রি.)

পদক্ষেপ ১: 👁️ পর্যবেক্ষণ ও আবিষ্কার

দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আসা একটি ক্ষত্রী-ব্রাহ্মণ পরিবার কীভাবে বাংলায় পালদের উচ্ছেদ করে সেন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করল? আর মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে নদিয়ায় বখতিয়ার খলজির আগমন কীভাবে বাংলার ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করল?

পদক্ষেপ ২: 🧠 মূল ধারণার অনুধাবন

সেন বংশের রাজত্বকাল (আনু. ১০৯৫–১২০৫ খ্রি.):
সেনদের আদি বাসস্থান ছিল দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক (কর্ণাটক্ষত্রিয়)। বাংলায় পাল রাজাদের অধীনে সামন্ত হিসেবে তারা রাঢ় অঞ্চলে বসবাস শুরু করে।
১. সামন্তসেন ও হেমন্তসেন: বংশের প্রতিষ্ঠাতা সামন্তসেন শেষ বয়সে কাশীতে বাস করেন; হেমন্তসেন প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
২. বিজয়সেন (আনু. ১০৯৬–১১৫৯ খ্রি.): সেন বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। তিনি পালদের কাছ থেকে গৌড় ও বরেন্দ্র কেড়ে নেন এবং সমগ্র বাংলায় সেন আধিপত্য কায়েম করেন। দেওপাড়া প্রশস্তিতে তাঁর বিজয়গাথা খোদাই করা আছে।
৩. বল্লালসেন (আনু. ১১৫৯–১১৭৯ খ্রি.): তিনি সমাজে ব্রাহ্মণ ও কায়স্থদের মধ্যে সামাজিক আভিজাত্যের নিয়ম হিসেবে কৌলীন্য প্রথা (Kulinism) প্রবর্তন করেন। তিনি নিজে ছিলেন পণ্ডিত ব্যক্তি এবং 'দানসাগর' ও 'অদ্ভুতসাগর' নামে দুটি বিখ্যাত স্মৃতি ও জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গ্রন্থ রচনা করেন।
৪. লক্ষণসেন (আনু. ১১৭৯–১২০৫ খ্রি.): তিনি প্রয়াগ ও বেনারস পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। তাঁর রাজসভা অলংকৃত করেছিলেন পঞ্চরত্ন—জয়দেব (গীতগোবিন্দম্-এর রচয়িতা), ধোয়ী (পবনদূত-এর রচয়িতা), শরণ, গোবর্ধন ও উমাপতিধর। লক্ষণসেনের প্রধান ধর্মাধিকারিক ছিলেন হলায়ুধ (ব্রাহ্মণসর্বস্ব-এর রচয়িতা)।

তুর্কি অভিযান ও নদিয়ার পতন (১২০৪/১২০৫ খ্রি.):
সুলতান মুহাম্মদ ঘুরির সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি বিহারের নালন্দা ও ওদণ্ডপুরী ধ্বংস করে ১২০৪ বা ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে শীতকালে ঝাড়খণ্ডের দুর্গম অরণ্য পথ দিয়ে আচমকা লক্ষণসেনের শীতকালীন রাজধানী নদিয়া (নবদ্বীপ) আক্রমণ করেন। খলজির অগ্রবর্তী দলে মাত্র ১৮ জন ক্ষিপ্রগতির অশ্বারোহী ছিল, ফলে নগরবাসীরা তাদের ঘোড়ার ব্যবসায়ী মনে করে ভুল করেছিল। অতর্কিত আক্রমণে অপ্রস্তুত বৃদ্ধ রাজা লক্ষণসেন মধ্যাহ্নভোজনের সময় খিড়কি দরজা দিয়ে নৌকাযোগে পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে চলে যান। বখতিয়ার খলজি নদিয়া লুণ্ঠন করে গৌড়ে (লখনৌতি) রাজধানী স্থাপন করেন।

পদক্ষেপ ৩: 🔍 প্রমাণের সাথে সংযোগ

তুর্কি ঐতিহাসিক মিনহাজ-উদ্দিন সিরাজ রচিত সুবিখ্যাত ফারসি গ্রন্থ 'তবকাৎ-ই-নাসিরী' (Tabaqat-i-Nasiri)-তে বখতিয়ার খলজির নদিয়া জয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রত্যক্ষ বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে।

পদক্ষেপ ৪: 💡 ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

লক্ষণসেন নদিয়া ত্যাগ করলেও সমগ্র বাংলা সাথে সাথে তুর্কিদের অধিকারে আসেনি। পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায় লক্ষণসেনের পুত্র বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন আরও কয়েক দশক স্বাধীনভাবে শাসন করেছিলেন। তবে নদিয়ার পতন পশ্চিম ও উত্তর বাংলায় প্রাচীন হিন্দু-বৌদ্ধ যুগের অবসান ঘটিয়ে সুলতানি শাসনের দ্বার উন্মোচন করে।

পদক্ষেপ ৫: 🎯 স্ব-মূল্যায়ন ও সারসংক্ষেপ

মনে রাখুন: সেনদের আদি নিবাস ছিল কর্ণাটক। বিজয়সেন সেন শাসনের প্রতিষ্ঠাতা, বল্লালসেন কৌলীন্য প্রথা ও দানসাগরের রচয়িতা, লক্ষণসেনের সভায় জয়দেব গীতগোবিন্দম্ রচনা করেন। ১২০৪/০৫ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজি নদিয়া আক্রমণ করেন।

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিভাষা, সময়কাল ও প্রশাসনিক নীতি

মাৎস্যন্যায়ের স্থায়িত্বকাল
আনু. ৬৩৭ – ৭৫০ খ্রি. প্রায় ১১৩ বছরের চরম অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতা
শশাঙ্কের মৃত্যুর পর গোপালের নির্বাচন পর্যন্ত বাংলায় কোনো কেন্দ্রীয় শাসক ছিল না
বাংলার প্রকৃতিপুঞ্জ বা গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এই অরাজকতার অবসান ঘটাতে গোপালকে সিংহাসনে নির্বাচিত করেন।
কনৌজকে কেন্দ্র করে ত্রিশক্তি সংগ্রাম
পাল (পূর্ব ভারত / বাংলা) ⚔ গুর্জর-প্রতিহার (পশ্চিম) ⚔ রাষ্ট্রকূট (দাক্ষিণাত্য)
গঙ্গা অববাহিকার উর্বর ভূমি ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ দখলের জন্য ২০০ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম
গঙ্গা দোয়াবের বাণিজ্য ও রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য অষ্টম থেকে দশম শতক পর্যন্ত এই সংঘর্ষ চলে।
পাল সাম্রাজ্যের চরম বিস্তার (ধর্মপাল ও দেবপাল)
গৌড় বঙ্গ মগধ কনৌজের অধীশ্বর
উপাধি: পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ
ধর্মপাল কনৌজে দরবার ডেকে উত্তর ভারতের রাজাদের ওপর স্বীয় প্রাধান্য ঘোষণা করেন।
রাজেন্দ্র চোলের গঙ্গাতীর অভিযান (১০২২ খ্রি.)
তাঞ্জোর রাজধানী প্রথম মহীপালকে পরাস্ত গঙ্গাইকোণ্ডচোল উপাধি
১৫০০ কিমি দূরবর্তী অভিযান চালিয়ে পবিত্র গঙ্গাজল নতুন রাজধানীতে নিয়ে আসেন
দক্ষিণ ভারতের পরাক্রমশালী চোল নরপতি পাল রাজা প্রথম মহীপালকে যুদ্ধে পরাজিত করেন।
পাল থেকে সেন রাজবংশের রূপান্তর
পাল বংশ (আনু. ৭৫০–১১৬১ খ্রি.) সেন বংশ (আনু. ১০৯৫–১২০৫ খ্রি.)
বৌদ্ধ রাজধর্ম থেকে গোঁড়া অর্থোডক্স ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মে রূপান্তর
কর্ণাট থেকে আগত সামন্ত সেন ও বিজয় সেন বাংলায় পালদের উৎখাত করে সেন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
শাস্ত্রীয় কৃষি রাজস্ব মান (ভাগ কর)
১৬.৬% (⅙ অংশ) জমির উৎপন্ন মোট ফসলের ঐতিহ্যবাহী রাজাংশ
প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র ও কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র নির্দেশিত বাধ্যতামূলক কর
প্রজাদের সুরক্ষার বিনিময়ে রাজা উৎপন্ন শস্যের ষষ্ঠাংশ বা এক-ষষ্ঠাংশ গ্রহণের অধিকারী হতেন।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসনে উল্লিখিত "মাৎস্যন্যায়" শব্দটি দ্বারা তৎকালীন বাংলার কী ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থাকে নির্দেশ করা হয়েছে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
মাৎস্যন্যায়ের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য:
১. আক্ষরিক অর্থ: সংস্কৃত কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র অনুসারে, পুকুরে প্রহরীর অভাবে বড় মাছ যেমন ছোট দুর্বল মাছকে অনায়াসে খেয়ে ফেলে, তেমনই শাসকের অভাবে সমাজে বলবানের দ্বারা দুর্বলের নিগ্রহই হলো 'মাৎস্যন্যায়'।
২. তৎকালীন বাংলার অবস্থা: আনুমানিক ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে গৌড়রাজ শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় কোনো সর্বসম্মত কেন্দ্রীয় শাসক ছিল না। প্রায় ১০০ বছর ধরে (আনু. ৬৫০–৭৫০ খ্রি.) সামন্ত প্রভু, ভূম্যধিকারী ও দস্যুদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ প্রজাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
৩. অবসান: ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার বিশিষ্ট নেতৃবর্গ ও জনগণ (প্রকৃতিপুঞ্জ) সমবেত হয়ে রক্তপাতহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গোপালকে রাজা নির্বাচিত করে এই নৈরাজ্যের অবসান ঘটান।
উদাহরণ 2
ত্রিশক্তি সংগ্রাম কী? কোন তিনটি শক্তি কেন এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি কী হয়েছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
ত্রিশক্তি সংগ্রামের বিশ্লেষণ:
১. সংজ্ঞা: খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দশম শতক পর্যন্ত উত্তর ভারতের প্রাণকেন্দ্র কনৌজ শহর দখলকে কেন্দ্র করে ভারতের তিনটি মহাশক্তির মধ্যে প্রায় ২০০ বছর ধরে চলা সংঘাতকে 'ত্রিশক্তি সংগ্রাম' বলা হয়।
২. তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি:
• পূর্ব ভারত: বাংলার পাল বংশ (ধর্মপাল, দেবপাল)।
• পশ্চিম ও মধ্য ভারত: রাজস্থানের গুর্জর-প্রতিহার বংশ (বৎসরাজ, দ্বিতীয় নাগভট, ভোজ)।
• দক্ষিণ ভারত: দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট বংশ (ধ্রুব, তৃতীয় গোবিন্দ)।
৩. লড়াইয়ের কারণ: গঙ্গা অববাহিকার অত্যন্ত উর্বর কৃষিজমি ও বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাচীন ভারতের সার্বভৌম 'চক্রবর্তী' সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ।
৪. পরিণতি: দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধে তিনটি মহাশক্তিরই আর্থিক ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং উত্তর ভারতে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
উদাহরণ 3
লক্ষণসেনের রাজসভার সাংস্কৃতিক পরিবেশ কেমন ছিল? তাঁর রাজসভাকে কেন সাহিত্যচর্চার এক স্বর্ণযুগ বলা হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
লক্ষণসেনের রাজসভা ও সাহিত্যের বিকাশ:
সেন বংশের শেষ শক্তিশালী রাজা লক্ষণসেন নিজে একজন বিদ্যানুরাগী ও কবি ছিলেন। তাঁর রাজসভায় পাঁচজন বিখ্যাত পণ্ডিত কবি সমবেত হয়েছিলেন, যাঁদের একত্রে 'পঞ্চরত্ন' বলা হয়:
১. জয়দেব: অমর সংস্কৃত গীতিগ্রন্থ 'গীতগোবিন্দম্'-এর রচয়িতা, যেখানে রাধাকৃষ্ণের প্রেমকথা ছন্দোবদ্ধভাবে বর্ণিত।
২. ধোয়ী: মহাকবি কালিদাসের মেঘদূতের অনুকরণে 'পবনদূত' কাব্য রচনা করেন।
৩. শরণ, গোবর্ধন ও উমাপতিধর: সমসাময়িক বিশিষ্ট কবি ও শাস্ত্রকার।
এছাড়া লক্ষণসেনের প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান ধর্মাধিকারিক হলায়ুধ বৈদিক রীতিনীতি সংক্রান্ত আকর গ্রন্থ 'ব্রাহ্মণসর্বস্ব' রচনা করেন। এজন্য লক্ষণসেনের যুগকে প্রাচীন বাংলার সংস্কৃত সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে বখতিয়ার খলজির মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী দিয়েই সমগ্র বাংলা তুর্কিদের দখলে চলে গিয়েছিল।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

১৮ জন অশ্বারোহী ছিল বখতিয়ার খলজির অগ্রবর্তী দ্রুতগামী ছদ্মবেশী দল যারা কেবল নদিয়া নগর আক্রমণ করেছিল; মূল বিশাল তুর্কি সৈন্যবাহিনী পেছনে ছিল। তাছাড়া নদিয়ার পতনের পরও পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায় লক্ষণসেনের বংশধররা (বিশ্বরূপসেন, কেশবসেন) আরও কয়েক দশক স্বাধীনভাবে শাসন করেছিলেন।

সাধারণ ভুল ধারণা

মাৎস্যন্যায়কে একটি সাধারণ মাছ চাষের প্রথা মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

মাৎস্যন্যায় কোনো জলজ জীববৈচিত্র্যের বিষয় নয়; এটি রাজনীতি বিজ্ঞানের একটি শাস্ত্রীয় রূপক যার অর্থ হলো রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিতে শক্তিমানদের দ্বারা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার ও শোষণ।

সাধারণ ভুল ধারণা

ধর্মপাল ও দেবপালের কৃতিত্ব গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ধর্মপাল বিক্রমশীলা ও সোমপুর মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন এবং কনৌজে সভা ডেকেছিলেন; অন্যদিকে দেবপালের সময় পাল সাম্রাজ্যের সামরিক সীমানা কামরূপ (আসাম) থেকে উৎকল (ওড়িশা) পর্যন্ত সর্বাধিক বিস্তার লাভ করেছিল।

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারা: প্রাচীন বাংলা, মাৎস্যন্যায়, পাল, ত্রিশক্তি সংগ্রাম ও সেন যুগ (Visual Model)

SOME STREAMS OF INDIAN POLITICAL HISTORY (7th – 12th CENTURY CE) WBBSE CLASS 7 HISTORY • ANCIENT BENGAL • SHASHANKA • MATSYANYAYA • PALAS • TRIPARTITE STRUGGLE • SENAS 1. Ancient Bengal Geopolitical Units & Shashanka GAUDA (গৌড়) • Central Power Ruler: Shashanka (c. 606–637 CE) Capital: Karnasuvarna (Murshidabad) Opposed Harsha (Thaneswar) & Kamrupa Pundravardhana & Varendra • North Bengal (Bogra, Rajshahi, Dinajpur) • Between Ganga & Mahananda rivers Hub of early urban culture & trade Vanga & Rarh (বঙ্গ ও রাঢ়) • Vanga: Bhagirathi & Padma delta • Rarh: West of Bhagirathi (Uttara/Dakshina) Divided naturally by the Ajay river Samatata & Harikela (সমতট ও হরিকেল) • Samatata: East of Meghna river • Harikela: Coastal Chittagong littoral Key maritime sea-trade gateway 2. Matsyanyaya (মাৎস্যন্যায়) to Gopala's Election The Century of Anarchy (c. 637 – 750 CE) • Following Shashanka's death, central governance collapsed completely in Bengal. • Matsyanyaya: Big fish preying on small fish (rule of brute force by warlords). Documented in Taranatha's Tibetan chronicles & Khalimpur copper plate Popular Election of Gopala (c. 750 CE) • The Pala Dawn • Citizens and feudal chiefs (Prakriti-punja) united to elect Gopala as king. • Terminated 113 years of lawlessness and founded the celebrated Pala Dynasty. Source: Dharmapala's Khalimpur Copper Plate ("মৎস্যন্যায়মপোহিতুং প্রকৃতিভিঃ...") 3. The 200-Year Tripartite Struggle for Kannauj KANNAUJ Imperial Hub Gangetic Trade PALAS (East) Bengal & Bihar Dharmapala / Devapala PRATIHARAS (West) Rajasthan & Malwa Vatsaraja / Nagabhata II RASHTRAKUTAS (Deccan/South) Dhruva / Govinda III (Invaded & Returned) 4. Imperial Cholas, Sena Era & 1204/05 CE 1022 CE: Rajendra Chola I's Northern Expedition • Marched from Thanjavur to Ganges; defeated Mahipala I; took title Gangaikondachola. • Built Gangaikondacholapuram; pioneered maritime trade dominance in SE Asia. Sena Dynasty (Karnataka Origin • c. 1095–1205 CE) • Vijayasena: Ousted Palas; Ballalasena: Danasagara & Adbhutasagara (Kulinism). • Lakshmanasena: Court Pancharatna (Jayadeva, Dhoyi, Sharan, Govardhana, Umapati). Shifted court from Gauda to Nadia (Navadvipa) & Vikramapura 1204/1205 CE: Bakhtiyar Khalji's Cavalry Strike on Nadia • 18 horsemen surprise raid; Lakshmanasena retreated to East Bengal (Sena sunset; Turko-Afghan era began).

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
প্রাচীন বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম নরপতি কে ছিলেন এবং তাঁর রাজধানী কোথায় অবস্থিত ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: গৌড়রাজ শশাঙ্ক (Shashanka); তাঁর রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ (Karnasuvarna)।
সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে তিনি গৌড়, মগধ ও ওড়িশা শাসন করেন এবং হর্ষবর্ধনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধে লিপ্ত হন।
2
ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসনে উল্লিখিত "মাৎস্যন্যায়" কথাটির তাৎপর্য কী এবং এর অবসান কীভাবে ঘটেছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: মাৎস্যন্যায় হলো প্রবল ব্যক্তি কর্তৃক দুর্বলকে গ্রাস করার চরম অরাজকতা ও আইনহীনতার যুগ। আনুমানিক ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রজাদের প্রতিনিধিরা (প্রকৃতিপুঞ্জ) সমবেত হয়ে গোপালকে রাজা নির্বাচন করে এর অবসান ঘটান।
৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে শশাঙ্কের মৃত্যুর পর প্রায় এক শতক ধরে বাংলায় কোনো স্থায়ী কেন্দ্রীয় শাসন ছিল না।
3
কৈবর্ত বিদ্রোহের নায়ক কে ছিলেন এবং কোন ঐতিহাসিক সংস্কৃত গ্রন্থে এই বিদ্রোহের বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: কৈবর্ত বিদ্রোহের প্রধান নেতা ছিলেন দিব্য (Divya) এবং পরবর্তীতে ভীম (Bhima); কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিত' (Ramacharita) গ্রন্থে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।
পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপালের সময় বরেন্দ্র অঞ্চলে এই বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এবং রামপাল ভীমকে পরাজিত করে পিতৃভূমি উদ্ধার করেন।
4
কনৌজকে কেন্দ্র করে সংঘটিত "ত্রিশক্তি সংগ্রাম"-এ কোন তিনটি ভারতীয় সাম্রাজ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ১. বাংলার পাল বংশ, ২. পশ্চিম ভারতের গুর্জর-প্রতিহার বংশ এবং ৩. দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট বংশ।
গঙ্গা-যমুনা দোয়াবের নিয়ন্ত্রণ ও উত্তর ভারতের সার্বভৌম চক্রবর্তিত্ব প্রমাণের জন্য এই যুদ্ধ ২০০ বছর স্থায়ী হয়েছিল।
5
সেন রাজা লক্ষণসেনের রাজসভার "পঞ্চরত্ন" কবিদের নাম উল্লেখ করুন এবং গীতগোবিন্দম্ কাব্য কে রচনা করেছিলেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: পঞ্চরত্ন কবিরা হলেন: জয়দেব, ধোয়ী, শরণ, গোবর্ধন এবং উমাপতিধর। সুবিখ্যাত 'গীতগোবিন্দম্' রচনা করেছিলেন মহাকবি জয়দেব।
লক্ষণসেনের নদিয়ার রাজসভা দ্বাদশ শতকে সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক কেন্দ্র ছিল।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি ধারা: খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতক অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।