আজকের যে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ—প্রাচীনকালে কিন্তু এই নামে কোনো একক অবিভক্ত রাজ্য ছিল না। ভাগীরথী, পদ্মা, মেঘনা ইত্যাদি নদী ও জলাভূমি বাংলাকে ছোট ছোট প্রাকৃতিক অঞ্চলে বিভক্ত করে রেখেছিল।
প্রাচীন বাংলার প্রধান ভৌগোলিক জনপদসমূহ:
• পুণ্ড্রবর্ধন ও বরেন্দ্র: উত্তরবঙ্গের বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলা নিয়ে গঠিত। গঙ্গা ও মহানন্দা নদীর মধ্যবর্তী উর্বর পলল সমভূমি হলো বরেন্দ্র।
• গৌড় (Gauda): মুর্শিদাবাদ, মালদা ও বীরভূমের অংশবিশেষ। সপ্তম শতকে গৌড়কে কেন্দ্র করে প্রথম সুসংহত রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।
• বঙ্গ (Vanga): বর্তমান বাংলাদেশের ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী ত্রিভুজাকার বদ্বীপ অঞ্চল।
• রাঢ় (Rarh): ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরের ভূখণ্ড। অজয় নদী দ্বারা এটি দুই ভাগে বিভক্ত—উত্তর রাঢ় (মুর্শিদাবাদ-বীরভূম) এবং দক্ষিণ রাঢ় (বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া)।
• সমতট ও হরিকেল: মেঘনা নদীর পূর্বদিকের জেলাসমূহ (কুমিল্লা, নোয়াখালী) ছিল সমতট; এবং দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলবর্তী চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চল ছিল হরিকেল।
গৌড়রাজ শশাঙ্ক (আনু. ৬০৬–৬৩৭ খ্রি.):
শশাঙ্ক ছিলেন প্রাচীন বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম নরপতি। তিনি দুর্বল মৌখরি ও পরবর্তী গুপ্তদের সরিয়ে গৌড়ের সিংহাসনে বসেন। মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ (রাঙামাটি) ছিল তাঁর রাজধানী। তিনি মগধ, ওড়িশা (উৎকল) ও কঙ্গোদ জয় করে বাংলাকে এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করেন। শশাঙ্কের সাথে থানেশ্বরের পুষ্যভূতি বংশের হর্ষবর্ধন ও কামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মণের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চলেছিল।
চীনা তীর্থযাত্রী হিউয়েন সাঙ (Xuanzang) সপ্তম শতকে কর্ণসুবর্ণ ভ্রমণ করে লিখেছিলেন যে কর্ণসুবর্ণ ছিল এক সমৃদ্ধ বাণিজ্যনগরী এবং এর উপকণ্ঠে 'রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার' (লো-তো-মো-চি) নামক বিশাল বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র অবস্থিত ছিল। বানভট্টের 'হর্ষচরিত' এবং আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প গ্রন্থেও শশাঙ্কের বিশদ উল্লেখ রয়েছে।
হিউয়েন সাঙ ও বানভট্ট উভয়েই ছিলেন হর্ষবর্ধনের অনুগত, তাই তাঁদের লেখায় শশাঙ্ককে গোঁড়া শৈব এবং বৌদ্ধধর্মবিদ্বেষী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে (যেমন বোধিবৃক্ষ কাটার অভিযোগ)। কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন যে শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণের রক্তমৃত্তিকা বিহারে শত শত বৌদ্ধ ভিক্ষু নিরাপদে বসবাস করতেন; অতএব শশাঙ্কের বিরুদ্ধে বৌদ্ধ নিগ্রহের অভিযোগ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয় বরং রাজনৈতিক পক্ষপাতের ফসল।
মনে রাখুন: প্রাচীন বাংলা পুণ্ড্রবর্ধন, গৌড়, বঙ্গ, রাঢ়, সমতট ও হরিকেলে বিভক্ত ছিল। শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার প্রথম সার্বভৌম নরপতি এবং কর্ণসুবর্ণ ছিল তাঁর রাজধানী।