১২০৬ খ্রিস্টাব্দে মুহম্মদ ঘোরির মৃত্যুর পর উত্তর ভারতে কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। কীভাবে একজন সাধারণ দাস বা মামলুক দিল্লির বুকে ৩২০ বছর স্থায়ী এক পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের বীজ বপন করেছিলেন?
দিল্লি সুলতানির প্রতিষ্ঠা ও মামলুক বংশ (১২০৬–১২৯০ খ্রি.):
আরবি শব্দ 'মামলুক' (Mamluk) অর্থ 'ক্রীতদাস'। সুলতান কুতবউদ্দিন আইবক ছিলেন মুহম্মদ ঘোরির বিশ্বস্ত তুর্কি দাস সেনাপতি। ১২০৬ সালে তিনি লাহোরে স্বাধীন দিল্লি সুলতানি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রচুর দান করতেন বলে তাঁকে 'লাখবখশ' (Lakhbaksh) বা লক্ষ্যদাতা বলা হতো। তিনি দিল্লির কুতুব মিনারের নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং ১২১০ সালে চৌগান (পোলো) খেলতে গিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মারা যান।
শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ (১২১১–১২৩৬ খ্রি.) — সুলতানির প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা:
১. ১২২৯ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফার কাছ থেকে সুলতান হিসেবে স্বীকৃতিপত্র (মনসুর) ও সম্মানসূচক পোশাক (খিলয়াত) লাভ করে নিজের শাসনকে বৈধতা দেন।
২. শাসনকাজ পরিচালনার জন্য ৪০ জন অনুগত তুর্কি ক্রীতদাস আমীরকে নিয়ে গড়ে তোলেন 'বন্দেগান-ই-চিহিলগানি' বা 'চল্লিশ চক্র' (Turkan-i-Chahalgani)।
৩. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিশুদ্ধ রুপোর 'টঙ্কা' (Tanka - ১৭৫ গ্রেন) এবং তামার 'জিতল' (Jital) মুদ্রা চালু করেন। মঙ্গোল বীর চেঙ্গিজ খানের আক্রমণ থেকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে দিল্লিকে রক্ষা করেন।
সুলতানা রাজিয়া (১২৩৬–১২৪০ খ্রি.) — প্রথম নারী শাসক:
ইলতুৎমিশ যোগ্যতার ভিত্তিতে তাঁর কন্যা রাজিয়াকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। রাজিয়া ছিলেন দিল্লি সুলতানির একমাত্র নারী শাসক। তিনি পর্দা প্রথা বর্জন করে পুরুষদের মতো কুবা (পোশাক) ও কুলাহ (টুপি) পরে প্রকাশ্য দরবারে বসতেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতেন। কিন্তু গোঁড়া তুর্কি আমীর ও চল্লিশ চক্র নারী শাসন মেনে নিতে না পেরে ষড়যন্ত্র করে ভাতিন্ডার শাসক আলতুনিয়ার সাথে সংঘাতে তাঁকে হত্যা করে।
গিয়াসউদ্দিন বলবান (১২৬৬–১২৮৭ খ্রি.) — কঠোর রাজতান্ত্রিক সুদৃঢ়করণ:
বলবান চল্লিশ চক্রের উদ্ধত ক্ষমতা চূর্ণ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন সুলতান ঈশ্বরের প্রতিনিধি বা 'নিয়াবত-ই-খুদাই' এবং ঈশ্বরের ছায়া বা 'জিল-ই-ইলাহি'। রাজদরবারে গাম্ভীর্য প্রতিষ্ঠা করতে তিনি পারস্যের অনুকরণে 'সিজদা' (Sijdah - সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত) এবং 'পাইবস' (Paibos - সুলতানের পদযুগল চুম্বন) প্রথা বাধ্যতামূলক করেন। মেওয়াতি দস্যু দমন এবং বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তিনি প্রয়োগ করেন নির্মম 'রক্ত ও লৌহ নীতি' (Blood and Iron Policy)।
সমকালীন ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানির 'তারিখ-ই-ফিরোজশাহী' এবং মিনহাজ-উস-সিরাজের 'তবকাত-ই-নাসিরি' গ্রন্থে রাজিয়ার অনন্য প্রশাসনিক দূরদর্শিতা এবং বলবানের রাজদরবারের পিনপতন নীরবতার বিস্তারিত সাক্ষ্য পাওয়া যায়।
মামলুক যুগ প্রমাণ করে যে মধ্যযুগে বংশমর্যাদার চেয়ে ব্যক্তিগত শৌর্য ও সামরিক দক্ষতাই ক্ষমতার আসল ভিত্তি ছিল। তবে তুর্কি অভিজাতদের চক্রান্ত দিল্লির সিংহাসনকে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিতিশীল রেখেছিল, যা বলবানের কঠোর স্বৈরতান্ত্রিক নীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
মনে রাখুন: কুতবউদ্দিন লাখবখশ নামে পরিচিত ছিলেন; ইলতুৎমিশ রূপার টঙ্কা ও তামার জিতল চালু করেন এবং খলিফার মনসুর পান; রাজিয়া ছিলেন একমাত্র নারী সুলতান; বলবান সিজদা ও পাইবস প্রথা চালু করেন এবং চল্লিশ চক্র ধ্বংস করেন।