Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 7 • History & Environment (অতীত ও ঐতিহ্য) • অধ্যায় 8
আনুমানিক সময়: 50 মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) সপ্তম শ্রেণির "অতীত ও ঐতিহ্য" পাঠ্যপুস্তকের পঞ্চম অধ্যায় "মুঘল সাম্রাজ্য (১৫২৬–১৭০৭ খ্রি.)"। এই অধ্যায়ে তৈমুর ও চেঙ্গিজ খানের বংশধর জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর কর্তৃক ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ ও ১৫২৭ সালে খানুয়ার যুদ্ধের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন, বাবরনামা, নাসিরউদ্দিন হুমায়ুনের সিংহাসন লাভ, ভ্রাতৃবিরোধ ও শের শাহ সুরির কাছে চৌসা (১৫৩৯) ও কনৌজের যুদ্ধে (১৫৪০) পরাজয়ের পর সুদূর পারস্যে ১৫ বছরের নির্বাসন, শের শাহ সুরির প্রশাসনিক বিপ্লব (সরকার ও পরগনা বিভাজন, পাট্টা ও কবুলিয়ত প্রথা, খাঁটি রূপার 'রুপিয়া' ও তামার 'দাম' মুদ্রা, সড়ক-ই-আজম বা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণ ও ঘোড়ার ডাকে ডাক-চৌকি ব্যবস্থা), হুমায়ুনের প্রত্যাবর্তন ও ১৫৫৬ সালে দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে বৈরাম খাঁর নেতৃত্বে হিমুর পরাজয় এবং আকবরের সিংহাসন আরোহণ, আকবরের মনসবদারি প্রথা (জাত ও সওয়ার পদমর্যাদা, দাগ ও চেহরা), রাজা টোডরমলের দশশালা বন্দোবস্ত (জবতি ব্যবস্থা, উৎপন্ন ফসলের ১/৩ অংশ কর ও জমির ৪ প্রকার শ্রেণিবিভাগ—পোলজ, পরৌতি, চাচর, বাঞ্জার), সুবা প্রশাসন, আকবরের উদার ধর্মনীতি ও রাজপুত মৈত্রী (তীর্থকর ও জিজিয়া কর বিলোপ), ফতেহপুর সিক্রির ইবাদত খানা, মহজরনামা ঘোষণা, সুলহ-ই-কুল ও দ্বীন-ই-ইলাহির আদর্শ, রাজদরবারের নবরত্ন (বীরবল, টোডরমল, মানসিংহ, আবুল ফজল, ফৈজি, তানসেন প্রমুখ), জাহাঙ্গীরের ন্যায়বিচারের শিকল ও নূরজাহান চক্র, স্যার টমাস রোর আগমন, শাহজাহানের স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ (তাজমহল, লালকেল্লা, ময়ূর সিংহাসন), উত্তরাধিকার যুদ্ধ এবং অবশেষে ঔরঙ্গজেব আলমগীরের গোঁড়া নীতি, জিজিয়া পুনঃপ্রবর্তন, শিখ ও মারাঠাদের (শিবাজী মহারাজ) সাথে সংঘাত এবং দীর্ঘ ২৬ বছরের রক্তক্ষয়ী 'দাক্ষিণাত্যের ক্ষত' (Deccan Ulcer)-এর মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের সূচনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচিত হয়েছে।

কীভাবে মাত্র ৫ বছরের শাসনে এক পাঠান রাজা আধুনিক ভারতের রূপোর 'টাকা' এবং আড়াই হাজার কিমি দীর্ঘ 'জিটি রোড' তৈরি করে দিলেন?

ভাবুন তো এমন এক রাজকীয় নাটকের কথা, যেখানে এক মুঘল সম্রাটকে নিজের প্রাণ বাঁচাতে গঙ্গার তোড়ে ভেসে যেতে হয়েছিল এবং এক সাধারণ ভিস্তিওয়ালা (জলবাহক) তাঁকে ডুবন্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করায় তাকে একদিনের জন্য দিল্লির সিংহাসনে বসিয়ে চামড়ার মুদ্রা চালু করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল! সেই মুঘল সম্রাটকে তাড়িয়ে সিংহাসন দখল করেছিলেন এক অসামান্য আফগান বীর—শের শাহ সুরি! তিনি মাত্র পাঁচ বছরে এমন মুদ্রা তৈরি করলেন যার নাম দিলেন 'রুপিয়া'—যা আজও আমাদের পকেটের টাকার মূল ভিত্তি! আবার তাঁরই তৈরি করা 'সড়ক-ই-আজম' ধরে শত শত বছর ধরে বাঙালিরা সোনারগাঁও থেকে সুদূর পেশোয়ার পর্যন্ত পায়ে হেঁটে পাড়ি দিত!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

মুঘল সাম্রাজ্য ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল ও সমৃদ্ধশালী অধ্যায়। তাদের প্রবর্তিত মুদ্রা ব্যবস্থা ('রুপিয়া'), আধুনিক সড়ক যোগাযোগ ('গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড'), ভূমি জরিপ ও কর ব্যবস্থা ('টোডরমলের বন্দোবস্ত'), এবং ধর্মনিরপেক্ষ সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি ('সুলহ-ই-কুল') আজও আমাদের আধুনিক ভারতের প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে টিকে রয়েছে।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • দিল্লি সুলতানির পতন এবং ১৫২৬ সালের পানিপথের প্রথম যুদ্ধের প্রেক্ষাপট।
  • মধ্যযুগীয় ভারতের ভৌগোলিক মানচিত্র, আঞ্চলিক রাজ্য ও বাণিজ্য পথের জ্ঞান।
  • মনসব, জায়গির, সুবা ও জিজিয়ার মতো মৌলিক ঐতিহাসিক পরিভাষার ধারণা।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • বাবর ও হুমায়ুনের প্রাথমিক সংগ্রাম এবং মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক ধাপসমূহ বিশ্লেষণ করা।
  • শের শাহ সুরির ভূমি সংস্কার (পাট্টা ও কবুলিয়ত), মুদ্রা (রুপিয়া) ও যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী গুরুত্ব মূল্যায়ন করা।
  • আকবরের মনসবদারি প্রথা (জাত ও সওয়ার) এবং রাজা টোডরমলের দশশালা ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যা করা।
  • আকবরের ধর্মীয় সমন্বয়বাদ (সুলহ-ই-কুল, ইবাদত খানা ও দ্বীন-ই-ইলাহি) এবং নবরত্ন সভার ভূমিকা নিরূপণ করা।
  • শাহজাহানের স্থাপত্যকৃতি এবং ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতির ব্যর্থতা ('দাক্ষিণাত্যের ক্ষত') পর্যালোচনা করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা: বাবর...
2 ২. সুর সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী শাসন:...
3 ৩. আকবর দ্য গ্রেট: বৈরাম খাঁ, দ্বিত...
4 ৪. আকবরের উদার ধর্মনীতি, সুলহ-ই-কুল...
5 ৫. পরবর্তী মুঘল: জাহাঙ্গীর, শাহজাহা...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা: বাবর ও হুমায়ুনের সংগ্রাম, কনৌজের যুদ্ধ এবং নির্বাসন

পদক্ষেপ ১: 👁️ পর্যবেক্ষণ ও আবিষ্কার

মধ্য এশিয়ার ফারগানার এক রাজ্যহারা কিশোর কীভাবে ভাগ্যের সন্ধানে হিন্দুকুশ পর্বতমালা পেরিয়ে ভারতে এসে মুঘল সাম্রাজ্যের মতো এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের বীজ বপন করলেন?

পদক্ষেপ ২: 🧠 মূল ধারণার অনুধাবন

জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর (১৫২৬–১৫৩০ খ্রি.):
মুঘল শব্দটি এসেছে 'মঙ্গোল' শব্দ থেকে। বাবর ছিলেন পিতৃসূত্রে তৈমুর লঙের পঞ্চম বংশধর এবং মাতৃসূত্রে চেঙ্গিজ খানের চতুর্দশ বংশধর। মধ্য এশিয়ার ফারগানার সিংহাসন হারিয়ে এবং সমরখন্দ পুনর্দখলে ব্যর্থ হয়ে তিনি কাবুলের শাসক হন। ভারতীয় আমির দৌলত খাঁ লোদি ও রানা সঙ্গের আমন্ত্রণে তিনি ভারত অভিযান করেন:
১. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ (১৫২৬ খ্রি.): ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে দিল্লি ও আগ্রা অধিকার করেন।
২. খানুয়ার যুদ্ধ (১৫২৭ খ্রি.): মেবারের বীর রাজপুত রানা সঙ্গের বিশাল সম্মিলিত বাহিনীকে বাবর তোপখানা ও তুলঘুমা কৌশলে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে বাবর 'জেহাদ' ঘোষণা করেন এবং বিজয়ের পর 'গাজি' (ধর্মযোদ্ধা) উপাধি গ্রহণ করেন।
৩. চান্দেরির যুদ্ধ (১৫২৮ খ্রি.) ও ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রি.): মেদিনী রাই এবং আফগান জোটকে পরাস্ত করে উত্তর ভারতে মুঘল শাসন নিরঙ্কুশ করেন।
বাবর চাগতাই তুর্কি ভাষায় তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনী 'বাবরনামা' (Tuzuk-i-Baburi) রচনা করেন, যেখানে ভারতের উদ্ভিদ, প্রাণী, জলবায়ু ও সমাজজীবনের চমৎকার বিবরণ রয়েছে। ১৫৩০ সালে আগ্রায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

নাসিরউদ্দিন হুমায়ুন (১৫৩০–১৫৪০ ও ১৫৫৫–১৫৫৬ খ্রি.):
হুমায়ুন কথার অর্থ 'ভাগ্যবান', কিন্তু তিনি ছিলেন মুঘল ইতিহাসের অন্যতম দুর্ভাগা শাসক। বাবার নির্দেশে তিনি সাম্রাজ্যকে তিন ভাই কামরান, আসকারি ও হিন্দালের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েন।
• শের শাহের সাথে সংঘাত: বিহারের আফগান নেতা শের খাঁ (শের শাহ সুরি)-র সাথে সংঘাতে লিপ্ত হন। ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে চৌসার যুদ্ধ-এ শের খাঁ রাতে অতর্কিতে আক্রমণ করে হুমায়ুনকে পরাজিত করেন। প্রাণ বাঁচাতে হুমায়ুন ঘোড়া নিয়ে গঙ্গায় ঝাঁপ দেন এবং নিজাম নামক এক ভিস্তিওয়ালার (জলবাহক) সাহায্যে বেঁচে যান।
• ১৫৪০ সালে বিলগ্রাম বা কনৌজের যুদ্ধ-এ শের শাহের কাছে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়ে হুমায়ুন সিংহাসন হারান এবং নিঃস্ব অবস্থায় সিন্ধু ও পারস্যে প্রায় ১৫ বছর যাযাবরের মতো নির্বাসিত জীবন কাটান। পারস্যের সাফাবিদ শাহ তাহমাস্পের সামরিক সহায়তায় তিনি পরবর্তীতে ১৫৫৫ সালে দিল্লি পুনর্দখল করেন।

পদক্ষেপ ৩: 🔍 প্রমাণের সাথে সংযোগ

হুমায়ুনের বোন গুলবদন বেগমের লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ 'হুমায়ুননামা'-তে ভাইদের মধ্যকার বিবাদ, চৌসার যুদ্ধে নদীর জলে ভেসে যাওয়া এবং দীর্ঘ নির্বাসনের মর্মস্পর্শী বিবরণ প্রত্যক্ষ প্রামাণ্য হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে।

পদক্ষেপ ৪: 💡 ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

বাবরের ক্ষিপ্র সামরিক প্রতিভা মুঘলদের ভারতে প্রবেশের পথ খুলে দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর অকালমৃত্যু সাম্রাজ্যকে স্থায়ী রূপ দিতে পারেনি। হুমায়ুনের ব্যক্তিগত দয়াশীলতা ও চারিত্রিক অস্থিরতা আফগানদের পুনরুত্থান ডেকে আনে।

পদক্ষেপ ৫: 🎯 স্ব-মূল্যায়ন ও সারসংক্ষেপ

মনে রাখুন: বাবর তুর্কি ভাষায় বাবরনামা লেখেন এবং খানুয়ার যুদ্ধে গাজি উপাধি নেন। হুমায়ুন ১৫৩৯ সালে চৌসা এবং ১৫৪০ সালে কনৌজের যুদ্ধে শের শাহের কাছে পরাজিত হয়ে ১৫ বছর নির্বাসিত ছিলেন।

২. সুর সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী শাসন: শের শাহ সুরির প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব (১৫৪০–১৫৪৫ খ্রি.)

পদক্ষেপ ১: 👁️ পর্যবেক্ষণ ও আবিষ্কার

মাত্র পাঁচ বছর দিল্লির সিংহাসনে বসে একজন শাসক কীভাবে এমন এক শাসনকাঠামো উপহার দিলেন যা পরবর্তীতে পরাক্রমশালী সম্রাট আকবর এবং ব্রিটিশ সরকার প্রায় হুবহু অনুকরণ করেছিল?

পদক্ষেপ ২: 🧠 মূল ধারণার অনুধাবন

ফরিদ খাঁ থেকে শের শাহ সুরি:
শের শাহের আসল নাম ছিল ফরিদ খাঁ। বিহারের আফগান শাসক বাহার খাঁ লোহানীকে বাঘের হাত থেকে এক কোপে রক্ষা করায় তিনি 'শের খাঁ' উপাধি পান। কনৌজের যুদ্ধে হুমায়ুনকে তাড়িয়ে তিনি দিল্লির মসনদে বসেন এবং 'সুর বংশ' প্রতিষ্ঠা করেন।

ভূমি রাজস্ব সংস্কার (Agrarian Reforms):
শের শাহ কৃষকদের সাথে রাষ্ট্রের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করেন:
• পাট্টা (Patta): কৃষকের জমিতে অধিকারের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার কর্তৃক কৃষককে দেওয়া দলিল, যাতে জমির সীমা, স্বত্ব এবং দেয় খাজনার পরিমাণ স্পষ্টভাবে লেখা থাকত।
• কবুলিয়ত (Qabuliyat): কৃষক নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিতে সম্মত হয়ে সরকারকে যে চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করে দিত, তাকে কবুলিয়ত বলা হতো।
উৎপন্ন ফসলের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ অংশ) কর হিসেবে নগদ বা শস্যে আদায় করা হতো। দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কৃষকদের ঋণ দেওয়ার রেওয়াজ চালু হয়।

মুদ্রা ব্যবস্থার সংস্কার (Currency System):
শের শাহ প্রাচীন আমলের সমস্ত ভেজাল ও ত্রুটিপূর্ণ মুদ্রা বাতিল করে বিশুদ্ধ ধাতুর মুদ্রা চালু করেন:
১. খাঁটি রূপার মুদ্রা 'রুপিয়া' (Rupiya - ১৭৮ গ্রেন)—যা আধুনিক ভারতীয় 'টাকা/রুপি'-র প্রত্যক্ষ পূর্বসূরি।
২. তামার মুদ্রা 'দাম' (Dam - ৩৮০ গ্রেন)। ১টি রূপার রুপিয়ার বিনিময় মূল্য ছিল ৪০টি তামার দামের সমান।

যোগাযোগ ব্যবস্থা ও গণপূর্ত কাজ (Public Works):
• সড়ক-ই-আজম (Sadak-e-Azam): পূর্ববঙ্গের সোনারগাঁও থেকে শুরু করে দিল্লি, লাহোর হয়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের সিন্ধু নদের তীরের আটক (পেশোয়ার) পর্যন্ত প্রায় ২,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সুপ্রশস্ত রাজপথ নির্মাণ করেন। ব্রিটিশ আমলে এই রাজপথটির নাম দেওয়া হয় 'গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড' (GT Road)। এছাড়া আগ্রা থেকে বুরহানপুর এবং আগ্রা থেকে যোধপুর পর্যন্ত সড়ক তৈরি করেন।
• সড়কের ধারে প্রতি ২ ক্রোশ (প্রায় ৪ মাইল) অন্তর মোট ১,৭০০টি 'সরাই' (পান্থশালা বা সরাইখানা) তৈরি করান, যেখানে যাত্রী ও বণিকদের বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া এবং হিন্দু-মুসলমানদের পৃথক আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল।
• দ্রুত খবর আদান-প্রদানের জন্য তিনি দুটি তাজি ঘোড়া প্রস্তুত রেখে 'ডাক-চৌকি' (ঘোড়ার পিঠে ডাক ব্যবস্থা) চালু করেন।

প্রশাসনিক বিভাজন:
সাম্রাজ্যকে ৪৭টি 'সরকার' (জেলা) এবং সরকারগুলোকে একাধিক 'পরগনা'-তে ভাগ করা হয়। ১৫৪৫ সালে কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধকালে বারুদ বিস্ফোরণে শের শাহের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। বিহারের সাসারামে তাঁর অপরূপ সমাধি আজও অবস্থিত।

পদক্ষেপ ৩: 🔍 প্রমাণের সাথে সংযোগ

আব্বাস খাঁ সারওয়ানির লেখা 'তারিখ-ই-শেরশাহী' গ্রন্থে শের শাহের কড়া শাসনব্যবস্থা ও কৃষকবান্ধব নীতির বিশদ বিবরণ সংরক্ষিত আছে।

পদক্ষেপ ৪: 💡 ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

শের শাহ ছিলেন মধ্যযুগীয় ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ দূরদর্শী জাতীয় সংস্কারক। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে সাম্রাজ্য টেকানোর জন্য অন্ধ ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, বরং কৃষকতুষ্টি, নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছতাই শেষ কথা। আকবরের শাসন মূলত শের শাহের ভিত্তির ওপরই গড়ে উঠেছিল।

পদক্ষেপ ৫: 🎯 স্ব-মূল্যায়ন ও সারসংক্ষেপ

মনে রাখুন: শের শাহ পাট্টা ও কবুলিয়ত প্রথা প্রবর্তন করেন; রূপার রুপিয়া ও তামার দাম চালু করেন; সড়ক-ই-আজম (জিটি রোড) এবং সরাইখানা ও ডাক-চৌকি স্থাপন করেন। সাসারামে তাঁর সমাধি অবস্থিত।

৩. আকবর দ্য গ্রেট: বৈরাম খাঁ, দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ, মনসবদারি প্রথা ও টোডরমলের দশশালা বন্দোবস্ত

পদক্ষেপ ১: 👁️ পর্যবেক্ষণ ও আবিষ্কার

মাত্র ১৩ বছর বয়সে এক বালকের কাঁধে বিশাল সাম্রাজ্যের দায়িত্ব এসে পড়েছিল। তিনি কীভাবে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল, সুসংহত ও ধর্মনিরপেক্ষ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে 'আকবর দ্য গ্রেট' নামে অমর হয়ে রইলেন?

পদক্ষেপ ২: 🧠 মূল ধারণার অনুধাবন

আকবরের সিংহাসন আরোহণ (১৫৫৬ খ্রি.):
১৫৫৬ সালে দিল্লির শের মণ্ডলের পাঠাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যু হয়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পাঞ্জাবের কালানৌরে আকবরের রাজ্যাভিষেক হয়। তাঁর বিশ্বস্ত অভিভাবক বৈরাম খাঁ (খান-ই-খানান) অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন।
• দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ (৫ নভেম্বর ১৫৫৬ খ্রি.): আফগান সেনাপতি হিমু (হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য) দিল্লি ও আগ্রা দখল করে নিজেকে স্বাধীন রাজা ঘোষণা করেছিলেন। পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে মুঘল সেনাপতি বৈরাম খাঁর সাথে হিমুর বাহিনীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। হিমুর চোখে আকস্মিক একটি তীর বিদ্ধ হলে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন এবং তাঁর বিশাল সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। বৈরাম খাঁ হিমুকে বন্দী করে হত্যা করেন এবং দিল্লিতে মুঘল শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৫৬০ সালে বৈরাম খাঁকে সরিয়ে আকবর নিজে সমস্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

মনসবদারি প্রথা (The Mansabdari System - ১৫৭১ খ্রি.):
আকবর তাঁর সামরিক ও অসামরিক প্রশাসন পরিচালনার জন্য এক বৈপ্লবিক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো চালু করেন, যাকে 'মনসবদারি প্রথা' বলা হয়। আরবি শব্দ 'মনসব' অর্থ পদমর্যাদা বা স্থান।
• জাত ও সওয়ার (Zat and Sawar): প্রতিটি মনসবদারের দুটি সংখ্যা দ্বারা পদমর্যাদা প্রকাশ করা হতো:
১. জাত (Zat): মনসবদারের ব্যক্তিগত মর্যাদা, রাজদরবারে তাঁর আসন এবং বাৎসরিক নগদ বেতন নির্ধারণ করত।
২. সওয়ার (Sawar): মনসবদারকে সম্রাটের সেবায় কতজন সুসজ্জিত অশ্বারোহী সৈন্য এবং ঘোড়া প্রস্তুত রাখতে হবে, তা নির্দেশ করত (সওয়ার সংখ্যা কখনোই জাত সংখ্যার চেয়ে বেশি হতে পারত না)।
• মনসবদারদের বেতন নগদ অর্থে অথবা সাময়িক রাজস্ব বরাদ্দের জমি বা 'জায়গির' হিসেবে দেওয়া হতো। মনসব বংশানুক্রমিক ছিল না; মনসবদারের মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তি রাজকোষে বাজেয়াপ্ত হতো। ঘোড়ায় 'দাগ' এবং সেনার 'চেহরা' কঠোরভাবে বজায় রাখা হতো।

রাজা টোডরমলের দশশালা বন্দোবস্ত (Dahsala Bandobast - ১৫৮০ খ্রি.):
আকবরের অর্থ ও রাজস্বমন্ত্রী রাজা টোডরমল ভূমি রাজস্বের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক 'জবতি ব্যবস্থা' বা 'দশশালা বন্দোবস্ত' প্রবর্তন করেন:
• জমি পরিমাপের জন্য লোহার আংটাযুক্ত বাঁশের কাঠি বা 'তানাব' ব্যবহার করা হতো।
• বিগত ১০ বছরের (১৫৭১–১৫৮০ খ্রি.) উৎপন্ন ফসলের গড় ফলন এবং বিগত ১০ বছরের বাজারমূল্যের গড় হিসাব করে রাজস্ব নির্ধারিত হয়।
• রাষ্ট্রীয় রাজস্বের হার ধার্য করা হয় উৎপন্ন ফসলের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ অংশ বা ৩৩.৩৩%), যা কৃষককে সাধারণত নগদ অর্থে পরিশোধ করতে হতো।
• জমির ৪টি শ্রেণিবিভাগ:
১. পোলজ (Polaj): সবচেয়ে উর্বর জমি, যেখানে প্রতি বছর নিয়মিত চাষ হতো।
২. পরৌতি (Parauti): উর্বরতা ফিরে পাওয়ার জন্য মাঝে ১-২ বছর অনাবাদী ফেলে রাখা জমি।
৩. চাচর (Chachar): পরপর ৩-৪ বছর অনাবাদী থাকা জমি।
৪. বাঞ্জার (Banjar): ৫ বা ততোধিক বছর চাষ না হওয়া সম্পূর্ণ পতিত জমি।

সুবা প্রশাসন: সাম্রাজ্যকে ১২টি প্রশাসনিক প্রদেশে বা 'সুবা' (Subah)-তে বিভক্ত করা হয় (পরে দাক্ষিণাত্য জয়ের পর সংখ্যা বেড়ে হয় ১৫)। সুবার প্রধান ছিলেন 'সুবেদার' (সামরিক ও শাসন) এবং 'দেওয়ান' (রাজস্ব)।

পদক্ষেপ ৩: 🔍 প্রমাণের সাথে সংযোগ

আবুল ফজলের অমর বিশ্বকোষীয় গ্রন্থ 'আইন-ই-আকবরি' এবং 'আকবরনামা'-তে প্রতিটি সুবার করের খতিয়ান, মনসবদারদের তালিকা এবং জমির পরিমাপ পদ্ধতির গাণিতিক প্রমাণ নিখুঁতভাবে বিধৃত রয়েছে।

পদক্ষেপ ৪: 💡 ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

মনসবদারি ব্যবস্থা মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক অভিজাতদের একক জাতিভিত্তিক (কেবল তুর্কি বা মঙ্গোল) না রেখে রাজপুত, ভারতীয় মুসলিম, ইরানি ও তুরানিদের নিয়ে এক সর্বভারতীয় মিশ্র আনুগত্য তৈরি করেছিল। টোডরমলের দশশালা বন্দোবস্ত কৃষককে ফাটকাবাজির হাত থেকে রক্ষা করে রাষ্ট্রীয় আয়ের স্থিতিশীলতা এনেছিল।

পদক্ষেপ ৫: 🎯 স্ব-মূল্যায়ন ও সারসংক্ষেপ

মনে রাখুন: ১৫৫৬ সালে দ্বিতীয় পানিপথে বৈরাম খাঁ হিমুকে পরাজিত করেন। মনসবদারি প্রথায় 'জাত' হলো ব্যক্তিগত মর্যাদা ও 'সওয়ার' হলো অশ্বারোহী সৈন্যের সংখ্যা। টোডরমল ১৫৮০ সালে দশশালা প্রথা চালু করেন (১/৩ অংশ রাজস্ব)। জমি ছিল চার প্রকার: পোলজ, পরৌতি, চাচর, বাঞ্জার।

৪. আকবরের উদার ধর্মনীতি, সুলহ-ই-কুল, ইবাদত খানা, দ্বীন-ই-ইলাহি ও নবরত্ন সভা

পদক্ষেপ ১: 👁️ পর্যবেক্ষণ ও আবিষ্কার

যে যুগে ইউরোপে ধর্মের নামে মানুষ পোড়ানো হচ্ছিল এবং ধর্মযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছিল, সেই ষোড়শ শতকে ভারতবর্ষের সম্রাট কীভাবে সমস্ত ধর্মের মানুষকে এক ছাদের তলায় বসিয়ে সত্যের অনুসন্ধান করেছিলেন?

পদক্ষেপ ২: 🧠 মূল ধারণার অনুধাবন

উদার ধর্মনীতি ও রাজপুত মৈত্রী:
আকবর উপলব্ধি করেছিলেন যে সংখ্যাগুরু হিন্দু প্রজাদের আস্থা ও রাজপুত বীরদের সহায়তা ছাড়া ভারতে কোনো সাম্রাজ্য স্থায়ী হতে পারে না। তিনি অম্বরের (জয়পুর) রাজা ভারমলের কন্যা হরখা বাঈকে (যিনি ইতিহাসে যোধাবাঈ নামেও পরিচিত) বিবাহ করেন এবং অন্দরে তাঁর ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রাখেন।
• ১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি অমানবিক 'তীর্থকর' (Pilgrim Tax) এবং ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে অমুসলিমদের ওপর ধার্য 'জিজিয়া কর' (Jizya) সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করেন।
• অযোগ্যতার বদলে যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে রাজা ভগবান দাস, রাজা মানসিংহ এবং রাজা টোডরমলকে সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ মনসবদার ও সেনাপতি পদে নিযুক্ত করেন।

ইবাদত খানা ও মহজরনামা (১৫৭৫ ও ১৫৭৯ খ্রি.):
১৫৭৫ সালে নতুন রাজধানী ফতেহপুর সিক্রি-তে তিনি 'ইবাদত খানা' (প্রার্থনা গৃহ) প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে কেবল মুসলিম আলেমদের ডাকা হলেও তাঁদের পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি দেখে ক্ষুব্ধ আকবর ১৫৭৮ সালে সমস্ত ধর্মের পণ্ডিতদের জন্য ইবাদত খানার দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। হিন্দু পণ্ডিত পুরুষোত্তম ও দেবী, জৈন আচার্য হরিবিজয় সুরি, পারসিক পুরোহিত দস্তুর মেহেরজি রানা এবং গোয়া থেকে আসা পর্তুগিজ খ্রিস্টান জেসুইট পাদ্রি ফাদার আকোয়াভিভা ও মনসারেট সেখানে ধর্মালোচনায় অংশ নেন।
১৫৭৯ সালে তিনি 'মহজরনামা' (Mahzar - অভ্রান্ততার ফরমান) জারি করে ধর্মীয় আইনের যেকোনো দ্বিমতের ক্ষেত্রে নিজেকে চূড়ান্ত বিচারক বা 'ইমাম-ই-আদিল' হিসেবে ঘোষণা করেন।

সুলহ-ই-কুল ও দ্বীন-ই-ইলাহি (১৫৮২ খ্রি.):
• সুলহ-ই-কুল (Sulh-i-Kul): এর অর্থ 'পরম পরমতসহিষ্ণুতা' বা 'সকলের জন্য সর্বজনীন শান্তি'। কোনো ধর্মকে ছোট না করে ঈশ্বরকে এক বলে মান্য করা এবং জীবের প্রতি অহিংসা পোষণ করা ছিল এর মূল সুর।
• দ্বীন-ই-ইলাহি বা তৌহিদ-ই-ইলাহি: ১৫৮২ সালে আকবর কোনো নতুন ধর্ম নয়, বরং সমস্ত ধর্মের সারবস্তু নিয়ে এক উদার নৈতিক আদর্শ বা সুফি ভ্রাতৃসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করেন। এতে ছিল না কোনো উপাসনালয়, পুরোহিত বা পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। রবিবারে সম্রাটের সামনে মাথা নত করে শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে হতো, যেখানে সম্রাট 'আল্লাহু আকবর' লেখা পাগড়ি দিতেন। এই দলের সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ১৮ জনের মতো; হিন্দুদের মধ্যে একমাত্র বীরবল এটি গ্রহণ করেছিলেন।

আকবরের নবরত্ন সভা (The Nine Gems):
আকবরের রাজদরবার আলো করে রেখেছিলেন ৯ জন ক্ষণজন্মা মনীষী:
১. বীরবল (মহেশ দাস): প্রধান পরামর্শদাতা ও বিদূষক, যাঁর প্রখর রসবোধ ও তাৎক্ষণিক বুদ্ধি কিংবদন্তি।
২. রাজা টোডরমল: প্রখ্যাত অর্থ ও রাজস্বমন্ত্রী।
৩. রাজা মানসিংহ: প্রধান সেনাপতি, যিনি বাংলা ও আফগানিস্তান জয় করেন।
৪. আবুল ফজল: প্রধান সচিব ও ঐতিহাসিক, 'আকবরনামা' ও 'আইন-ই-আকবরি'-র লেখক।
৫. ফৈজি: রাজকবি ও অনুবাদক (আবুল ফজলের ভাই)।
৬. মিঞা তানসেন: হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের যাদুকর (ধ্রুপদের প্রবক্তা, তানসেনের মেঘমল্লার ও দীপক রাগ বিশ্ববিখ্যাত)।
৭. আব্দুল রহিম খান-ই-খানান: বীর যোদ্ধা ও বিখ্যাত হিন্দি দোহা রচয়িতা (বৈরাম খাঁর পুত্র)।
৮. ফকির আজিজউদ্দিন: সম্রাটের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা।
৯. মোল্লা দো-পিয়াজা: প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন উপদেষ্টা।
১৫৭৩ সালে গুজরাট জয়ের স্মৃতিতে আকবর ফতেহপুর সিক্রিতে এশিয়ার উচ্চতম প্রবেশদ্বার 'বুলন্দ দরওয়াজা' (Buland Darwaza - ১৭৬ ফুট) নির্মাণ করেন।

পদক্ষেপ ৩: 🔍 প্রমাণের সাথে সংযোগ

আব্দুল কাদির বাদায়ুনির 'মুন্তাখাব-উত-তাওয়ারিখ' গ্রন্থে গোঁড়া উলেমাদের পক্ষ থেকে আকবরের উদার ধর্মীয় নীতি ও ইবাদত খানার আলোচনার তীব্র সমালোচনা লিপিবদ্ধ আছে, যা প্রমাণ করে যে আকবরের ধর্মনীতি কোনো লোকদেখানো প্রচার ছিল না।

পদক্ষেপ ৪: 💡 ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

সুলহ-ই-কুল মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতার অন্ধকারে এক আধুনিক প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা ছিল। আকবরের এই ধর্মনিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় ঐক্যের নীতিই মুঘল সাম্রাজ্যকে সর্বভারতীয় স্থায়িত্ব দান করেছিল।

পদক্ষেপ ৫: 🎯 স্ব-মূল্যায়ন ও সারসংক্ষেপ

মনে রাখুন: আকবর ১৫৬৩-তে তীর্থকর ও ১৫৬৪-তে জিজিয়া কর বিলোপ করেন। ফতেহপুর সিক্রিতে ইবাদত খানা (১৫৭৫), মহজরনামা (১৫৭৯), সুলহ-ই-কুল ও দ্বীন-ই-ইলাহি (১৫৮২) প্রবর্তন করেন। বীরবল ছিলেন নবরত্নের অন্যতম। বুলন্দ দরওয়াজা গুজরাট বিজয়ের স্মারক।

৫. পরবর্তী মুঘল: জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, উত্তরাধিকার যুদ্ধ এবং ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্যের ক্ষত

পদক্ষেপ ১: 👁️ পর্যবেক্ষণ ও আবিষ্কার

যে সাম্রাজ্যের রাজকোষে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনরত্ন ছিল, যে সম্রাটের আমলে তাজমহল আর ময়ূর সিংহাসন তৈরি হয়েছিল—সেই মুঘল সাম্রাজ্য কীভাবে ঔরঙ্গজেবের শাসনামলে গভীর সংকটে নিমজ্জিত হলো? 'দাক্ষিণাত্যের ক্ষত' কীভাবে এই সাম্রাজ্যকে কুরে কুরে খেয়েছিল?

পদক্ষেপ ২: 🧠 মূল ধারণার অনুধাবন

নূরউদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গীর (১৬০৫–১৬২৭ খ্রি.):
আকবরের পুত্র সেলিম 'জাহাঙ্গীর' (বিশ্বজয়ী) নাম নিয়ে সিংহাসনে বসেন।
• ন্যায়বিচারের শিকল (Zanjir-i-Adl): আগ্রার দুর্গে তিনি ৬০টি ঘণ্টাযুক্ত এক সুবিশাল সোনার ন্যায়বিচারের শিকল লাগিয়ে দেন, যাতে যেকোনো নির্যাতিত প্রজা তা টেনে সরাসরি সম্রাটের সাহায্য চাইতে পারে।
• নূরজাহান চক্র (Junta): ১৬১১ সালে মেহেরুন্নিসাকে বিবাহ করে 'নূরজাহান' (জগতের আলো) উপাধি দেন। নূরজাহান সম্রাটের অসুস্থতার সুযোগে রাজকীয় মুদ্রায় নিজের নাম খোদাই করিয়ে প্রায় ১৬ বছর সাম্রাজ্যের সমস্ত নেপথ্য ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেন।
• গুরু অর্জুন দেবের প্রাণদণ্ড (১৬০৬ খ্রি.): বিদ্রোহী পুত্র খসরুকে আশীর্বাদ ও আর্থিক সাহায্য করায় পঞ্চম শিখ গুরু অর্জুন দেবকে জাহাঙ্গীর মৃত্যুদণ্ড দেন, যা মুঘল-শিখ বৈরিতার সূত্রপাত ঘটায়।
• ইউরোপীয়দের আগমন: ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের দূত ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিং (১৬০৮ খ্রি.) এবং স্যার টমাস রো (১৬১৫ খ্রি.) জাহাঙ্গীরের দরবারে আসেন এবং সুরাটে বাণিজ্যিক কুঠি নির্মাণের রাজকীয় ফরমান আদায় করেন।

শাহজাহান (১৬২৮–১৬৫৮ খ্রি.) — স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ:
খুররম ১৬২৮ সালে 'শাহজাহান' (জগতের রাজা) নাম নিয়ে বসেন। তাঁর শাসনকালকে মুঘল স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ (Golden Age of Mughal Architecture) বলা হয়:
১. আগ্রায় যমুনা তীরে প্রিয়তমা পত্নী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে শ্বেতপাথরের বিশ্ববিস্ময় তাজমহল নির্মাণ করান (প্রধান স্থপতি ওস্তাদ আহমদ লাহোরি)।
২. দিল্লিতে লাল কেল্লা (Lal Qila), জামা মসজিদ এবং ঐতিহাসিক ময়ূর সিংহাসন (Takht-i-Taus) নির্মাণ করেন যাতে বিশ্ববিখ্যাত 'কোহিনূর' হীরা বসানো ছিল।
• উত্তরাধিকার যুদ্ধ (১৬৫৭–১৬৫৮ খ্রি.): শাহজাহানের অসুস্থতার পর চার পুত্র—দারুণ বিদ্বান ও উদারপন্থী দারা শিকোহ, বাংলার সুবেদার সুজা, ঔরঙ্গজেব এবং মুরাদের মধ্যে ভাতৃঘাতী যুদ্ধ শুরু হয়। ধর্মতের যুদ্ধ ও সামুগড়ের যুদ্ধে দারাকে পরাজিত ও হত্যা করে ঔরঙ্গজেব বৃদ্ধ পিতা শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে বন্দী করে সিংহাসন দখল করেন।

ঔরঙ্গজেব আলমগীর (১৬৫৮–১৭০৭ খ্রি.) — সাম্রাজ্যের বিস্তার ও অবক্ষয়:
ঔরঙ্গজেব ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও ধর্মপ্রাণ সুন্নি মুসলিম (তাঁকে 'জিন্দা পীর' বলা হতো)। তিনি আকবরের সমস্ত উদার নীতি উল্টে দেন:
• রাজদরবারে গান-বাজনা, জ্যোতিষচর্চা ও ঝরোখা দর্শন নিষিদ্ধ করেন। ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি পুনরায় জিজিয়া কর এবং তীর্থকর চাপিয়ে দেন। নবম শিখ গুরু তেগ বাহাদুর-কে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে ১৬৭৫ সালে দিল্লিতে হত্যা করান, যার ফলে শিখরা গুরু গোবিন্দ সিংহের নেতৃত্বে সামরিক খালসা বাহিনী গড়ে তোলে। রাজপুতদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে মেবার ও মারওয়ারকে শত্রু বানান।

ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ ও মারাঠা প্রতিরোধ:
মহারাষ্ট্রের পার্বত্য অঞ্চলে শিবাজী মহারাজ 'বর্গী' ও 'গণিমী কাওয়া' (গেরিলা রণকৌশল)-র মাধ্যমে মুঘলদের নাস্তানাবুদ করেন। ১৬৬৫ সালে ঔরঙ্গজেবের সেনাপতি জয়সিংহের সাথে শিবাজীর পুরন্দরের সন্ধি হয়। শিবাজী আগ্রায় বন্দীদশা থেকে মিষ্টির ঝুড়িতে লুকিয়ে পালিয়ে আসেন এবং ১৬৭৪ সালে রায়গড় দুর্গে নিজেকে স্বাধীন 'ছত্রপতি' হিসেবে অভিষেক করান।

দাক্ষিণাত্যের ক্ষত (The Deccan Ulcer):
ঔরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের শিয়া রাজ্য বিজাপুর (১৬৮৬ খ্রি.) ও গোলকুণ্ডা (১৬৮৭ খ্রি.) জয় করেন। কিন্তু মারাঠাদের গেরিলা প্রতিরোধ দমন করতে গিয়ে তিনি জীবনের শেষ দীর্ঘ ২৬ বছর (১৬৮১–১৭০৭ খ্রি.) রাজধানী দিল্লি ছেড়ে দাক্ষিণাত্যের তাঁবুতে কাটাতে বাধ্য হন।
• ইতিহাসবিদ ভি. এ. স্মিথের মতে: "স্পেনীয় ক্ষত যেমন নেপোলিয়নকে ধ্বংস করেছিল, তেমনই দাক্ষিণাত্যের ক্ষত ঔরঙ্গজেবকে ধ্বংস করেছিল।"
• এই দীর্ঘ যুদ্ধে মুঘল রাজকোষ সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যায়, লক্ষ লক্ষ সৈন্যের মৃত্যু ঘটে এবং উত্তরে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। ১৭০৭ সালে আহমেদনগরে হতাশায় জর্জরিত হয়ে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর সাথে সাথেই মহান মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ঘণ্টা বেজে ওঠে।

পদক্ষেপ ৩: 🔍 প্রমাণের সাথে সংযোগ

ঔরঙ্গজেবের শেষ জীবনের পারসিক চিঠি 'রুকাত-ই-আলমগিরি'-তে তাঁর অন্তিম জীবনের একাকীত্ব, পুত্রদের প্রতি অনাস্থা এবং দাক্ষিণাত্যের রণক্ষেত্রে সর্বস্ব হারানোর অনুশোচনার প্রামাণ্য প্রমাণ পাওয়া যায়।

পদক্ষেপ ৪: 💡 ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

মুঘল সাম্রাজ্যের পতন কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল না। ভৌগোলিক সীমার অতিরিক্ত বিস্তার, মারাঠাদের জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ, মনসবদারি ও জায়গিরদারি সংকট এবং ঔরঙ্গজেবের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত ধর্মান্ধ নীতি এই সুবিশাল সাম্রাজ্যের ভিতকে ধসিয়ে দিয়েছিল।

পদক্ষেপ ৫: 🎯 স্ব-মূল্যায়ন ও সারসংক্ষেপ

মনে রাখুন: জাহাঙ্গীর ন্যায়ের শিকল স্থাপন করেন এবং স্যার টমাস রো তাঁর দরবারে আসেন; শাহজাহানের যুগ মুঘল স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ (তাজমহল, ময়ূর সিংহাসন); ঔরঙ্গজেব ১৬৭৯ সালে জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন করেন। ২৬ বছরের দাক্ষিণাত্যের ক্ষতের ফলে ১৭০৭ সালে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুতে সাম্রাজ্য পতনের মুখে পড়ে।

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিভাষা, সময়কাল ও প্রশাসনিক নীতি

শের শাহের দ্বিধাতব মুদ্রা ব্যবস্থা মান
১টি রৌপ্য রুপিয়া (১৭৮ গ্রেন) = ৪০টি তামার দাম (৩৮০ গ্রেন)
খাঁটি রৌপ্যমুদ্রা: স্বাধীন ভারতের আধুনিক 'রুপি/টাকা'-র সরাসরি ঐতিহাসিক উৎস
শের শাহ প্রবর্তিত খাঁটি রৌপ্যমুদ্রা 'রুপিয়া' ব্রিটিশ আমল পেরিয়ে আধুনিক ভারতের জাতীয় মুদ্রা 'রুপি/টাকা'-র ভিত্তি তৈরি করে।
টোডরমলের দশশালা রাজস্ব ব্যবস্থা (১৫৮০ খ্রি.)
৩৩.৩% (⅓ অংশ) বিগত ১০ বছরের গড় উৎপাদন ও বাজারদরের রাজস্ব
১৫৭০–১৫৮০ খ্রিস্টাব্দের তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত এবং নগদে (মাল) পরিশোধযোগ্য
রাজা টোডরমল প্রবর্তিত এই বৈজ্ঞানিক রাজস্ব ব্যবস্থা বার্ষিক অস্থিরতা দূর করে কৃষক ও রাষ্ট্র উভয়ের আর্থিক নিরাপত্তা দেয়।
আকবরের মনসবদারি পদমর্যাদা কাঠামো (জাত ও সওয়ার)
জাত (ব্যক্তিগত মর্যাদা ও মূল বেতন স্তর) + সওয়ার (রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য অশ্বারোহী সৈন্য সংখ্যা)
পদমর্যাদা স্তর: ১০ থেকে ১০,০০০ | বংশানুক্রমিক নয়, সম্রাটের সরাসরি নিয়োগ
মনসবদারদের পদ ও দায়িত্ব সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও অ-বংশানুক্রমিক ছিল এবং সম্রাট নিজ বিবেচনায় পদোন্নতি বা বদলি করতেন।
জবতি ব্যবস্থার চার শ্রেণির ভূমি বিন্যাস
পোলাজ (প্রতি বছর চাষযোগ্য জমি) পরৌতি (১–২ বছর অনাবাদী) চাচর (৩–৪ বছর অনাবাদী) বাঞ্জর (৫ বা ততোধিক বছর অনাবাদী)
ভূমির প্রকৃত উর্বরতা ও উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে বৈজ্ঞানিক কর নির্ধারণ
উর্বরতা ও উৎপাদনের নিয়মিততা অনুযায়ী জমি চার ভাগে ভাগ করে ন্যায্য রাজস্ব হার ধার্য করা হতো।
আকবরের রাষ্ট্রীয় আদর্শ: সুলহ-ই কুল
সুলহ-ই কুল (পরম পরধর্মসহিষ্ণুতা ও সার্বজনীন শান্তি)
আবুল ফজলের সহায়তায় প্রণীত: সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের প্রতি সমান রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার
ধর্মান্ধ গোঁড়ামি বর্জন করে বিশাল বৈচিত্র্যপূর্ণ ভারতবর্ষে রাজনৈতিক ঐক্য ও সম্প্রীতি স্থাপনে আকবরের শ্রেষ্ঠ অবদান।
শের শাহের ভূমি অধিকারপত্র: পাট্টা ও কবুলিয়ত
পাট্টা (জমির স্বত্বাধিকার ও করের দলিল) ⇄ কবুলিয়ত (কর প্রদানের শর্তে কৃষকের চুক্তিপত্র)
শের শাহের দ্বিপাক্ষিক আইনি চুক্তি যা কৃষকের জমি সুরক্ষা ও অতিরিক্ত কর আদায় রোধ করত
কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে এবং কর্মচারীদের জোরজুলুম আটকাতে এই দ্বিপাক্ষিক সরকারি চুক্তিপত্র চালু করা হয়।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
শের শাহ সুরির ভূমি সংস্কারে 'পাট্টা' ও 'কবুলিয়ত' প্রথার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী ছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
শের শাহের ভূমি সংস্কার ও পাট্টা-কবুলিয়তের গুরুত্ব:
১. পাট্টা (Patta): সরকার প্রতিটি কৃষককে একটি সরকারি দলিল বা পাট্টা প্রদান করত, যাতে কৃষকের জমির সঠিক চৌহদ্দি, জমির শ্রেণি এবং বাৎসরিক নির্দিষ্ট করের পরিমাণ লিপিবদ্ধ থাকত। এর ফলে অসৎ কর্মচারীদের অবৈধ কর আদায় বন্ধ হয়।
২. কবুলিয়ত (Qabuliyat): পাট্টা পাওয়ার পর কৃষক নির্ধারিত রাজস্ব পরিশোধের অঙ্গীকার করে সরকারকে একটি লিখিত চুক্তিপত্র বা কবুলিয়ত সম্পাদন করে দিত।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য: এই দ্বিমুখী চুক্তির মাধ্যমে কৃষক ও রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হয়, মধ্যস্বত্বভোগী সামন্তদের অত্যাচার বন্ধ হয় এবং কৃষকদের ভূমিস্বত্ব প্রথমবারের মতো সুরক্ষিত হয়।
উদাহরণ 2
আকবরের মনসবদারি প্রথায় 'জাত' এবং 'সওয়ার'-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী ছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
জাত ও সওয়ারের দ্বৈত পদমর্যাদার বিশ্লেষণ:
১. জাত (Zat): মনসবদারের ব্যক্তিগত মর্যাদা নির্দেশ করত। রাজদরবারে মনসবদারের আসন কোথায় হবে এবং তিনি রাষ্ট্র থেকে কত নগদ বেতন বা জায়গির পাবেন, তা জাত সংখ্যা দ্বারা স্থির হতো।
২. সওয়ার (Sawar): মনসবদারকে সম্রাটের প্রয়োজনে যুদ্ধক্ষেত্রে কতজন সুসজ্জিত অশ্বারোহী সৈন্য এবং ঘোড়া প্রস্তুত রাখতে হবে, তা নির্দেশ করত।
নিয়ম: সওয়ারের সংখ্যা কখনোই জাতের সংখ্যার চেয়ে বেশি হতে পারত না। উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন মনসবদারের পদমর্যাদা '৫০০০ জাত / ৩০০০ সওয়ার' হয়, তবে তাঁর ব্যক্তিগত বেতন ৫০০০ শ্রেণির সমান হলেও তাঁকে ৩০০০ অশ্বারোহী লালন-পালন করতে হতো।
উদাহরণ 3
ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতিকে কেন 'দাক্ষিণাত্যের ক্ষত' (Deccan Ulcer) বলা হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
দাক্ষিণাত্যের ক্ষতের ঐতিহাসিক অভিঘাত:
১. সময় ও সম্পদের অপচয়: ১৬৮১ থেকে ১৭০৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৬ বছর ঔরঙ্গজেব রাজধানী দিল্লি ছেড়ে দাক্ষিণাত্যের তাঁবুতে পড়ে ছিলেন। বিজাপুর ও গোলকুণ্ডা দখল করলেও মারাঠাদের গেরিলা যুদ্ধকে তিনি কখনো দমন করতে পারেননি।
২. রাজকোষ দেউলিয়া: সুদূর দাক্ষিণাত্যে লক্ষ লক্ষ সৈন্যের রসদ ও যুদ্ধের খরচ জোগাতে মুঘল সাম্রাজ্যের শতবর্ষের সঞ্চিত কোষাগার শূন্য হয়ে যায়।
৩. প্রশাসনিক পক্ষাঘাত: সম্রাটের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে উত্তর ভারতে আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, সুবেদাররা স্বাধীন আচরণ শুরু করে এবং বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ১৭০৭ সালে আহমেদনগরে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর সাথে সাথেই মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয়।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে দ্বীন-ই-ইলাহি ছিল আকবর কর্তৃক প্রবর্তিত একটি নতুন কট্টর ধর্ম যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ দীক্ষিত হয়েছিল।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

দ্বীন-ই-ইলাহি কোনো স্বতন্ত্র ধর্ম ছিল না; এতে কোনো উপাসনালয়, পুরোহিত বা ধর্মগ্রন্থ ছিল না। এটি ছিল সমস্ত ধর্মের মিলনাত্মক এক নৈতিক আদর্শ ও সুফি আধ্যাত্মিক ভ্রাতৃসঙ্ঘ। আকবর কাউকে এটি গ্রহণে বাধ্য করেননি; তাঁর জীবদ্দশায় বীরবলসহ মাত্র ১৮-১৯ জন রাজপুরুষ এটি গ্রহণ করেছিলেন।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে আধুনিক ভারতের টাকা বা 'রুপি'র প্রবর্তক ছিলেন ব্রিটিশরা বা মুঘল সম্রাট আকবর।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

খাঁটি রূপার মুদ্রা 'রুপিয়া' (১৭৮ গ্রেন) সর্বপ্রথম প্রবর্তন করেছিলেন সুর সম্রাট শের শাহ সুরি (১৫৪০–১৫৪৫ খ্রি.)। ব্রিটিশ ও স্বাধীন ভারত সেই শের শাহের রুপিয়াকেই আধুনিক 'টাকা/রুপি' হিসেবে গ্রহণ করেছে।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে মনসবদারি পদমর্যাদা পিতার মৃত্যুর পর পুত্রের কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হস্তান্তরিত হতো।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

মনসবদারি প্রথা কখনোই বংশানুক্রমিক ছিল না। মনসবদারের মৃত্যুর পর তাঁর মনসব বাতিল হতো এবং সমস্ত ধনসম্পত্তি রাজকোষে বাজেয়াপ্ত হতো (জবতি প্রথা)। তাঁর পুত্রকে নিজস্ব যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে নতুন মনসব অর্জন করতে হতো।

মুঘল সাম্রাজ্য: শাসকপরিক্রমা, শেরশাহের সংস্কার, মনসবদারি ও দাক্ষিণাত্যের ক্ষত (Visual Model)

THE MUGHAL EMPIRE (1526 – 1707 CE) WBBSE CLASS 7 HISTORY • BABUR • SHER SHAH • AKBAR • MANSABDARI • DAHSALA • SULH-I-KUL • AURANGZEB 1. Mughal Imperial Dynastic Succession Babur (1526–30) & Humayun (1530–40, 55–56): Panipat (1526), Khanwa (1527) • Baburnama Sher Shah Suri Interregnum (1540–1545 CE): Grand Trunk Road • Rupiya • Patta/Qabuliyat Akbar the Great (1556–1605 CE): 2nd Panipat • Haldighati • Mansabdari • Sulh-i-Kul Jahangir (1605–27) & Shah Jahan (1628–58): Golden Age of Architecture (Taj Mahal) Aurangzeb Alamgir (1658–1707 CE): Reimposed Jizya (1679) • Deccan Campaign 2. Sher Shah Suri's Administrative Renaissance GRAND TRUNK ROAD (সড়ক-ই-আজম / Sadak-i-Azam) • Built from Sonargaon (Bengal) to Peshawar (over 2,500 km). • Lined with shade trees, wells, and 1,700 Sarais (inns) for travelers & trade. Standardized Coinage • Silver Rupiya: 178 grains (Ancestor of modern Rupee) • Copper Dam: Exchange ratio: 1 Rupiya = 40 Dams Abolished corrupted debased coins Patta & Qabuliyat (পাট্টা ও কবুলিয়ত) • Patta: Royal title deed specifying peasant's land & tax dues • Qabuliyat: Signed bond where peasant agreed to pay revenue Horse-courier postal system (Dak-Chauki) 3. Akbar's Mansabdari & Todar Mal's Dahsala Mansabdari Framework • Mansab = Official rank / status • Dual Rank Hierarchy: - Zat (জাত): Personal rank & salary - Sawar (সওয়ার): Number of troopers • Two Modes of Salary: - Naqdi: Direct cash from treasury - Jagir: Revenue land assignment Merged Rajputs into imperial governance Todar Mal's Dahsala (1580) • 10-Year Average: Produce & price averaged across 1570–1580 CE • State Demand: 1/3rd in cash • Four Land Classifications: 1. Polaj: Cultivated every year 2. Parauti: Fallowed 1–2 years 3. Chachar: Fallowed 3–4 years 4. Banjar: Uncultivated for 5+ years Land measured with bamboo-ring rods (Tanab) 4. Sulh-i-Kul, Navaratna & Imperial Climax Akbar's Religious Syncretism: Sulh-i-Kul & Din-i-Ilahi • Abolished Pilgrim Tax (1563) & Jizya (1564); constructed Ibadat Khana in 1575. • Sulh-i-Kul (সুলহ্-ই-কুল): Universal Peace with All faiths. • Din-i-Ilahi (1582): Ethical spiritual code of divine monotheism (Birbal joined). The Imperial Court & Later Climax • Navaratna (নবরত্ন): Abul Fazl (Akbarnama/Ain-i-Akbari), Birbal, Tansen, Todar Mal, Man Singh. • Shah Jahan: Golden Age of Architecture (Taj Mahal, Red Fort, Peacock Throne). • Aurangzeb: Reimposition of Jizya (1679); 25-year draining Deccan campaign. Deccan Ulcer ruined imperial finances, precipitating the 18th-century crisis.

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
১৫২৬ সালে বাবর পানিপথের প্রথম যুদ্ধে এবং ১৫২৭ সালে খানুয়ার যুদ্ধে তোপখানা ও তুলঘুমা রণকৌশলে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।
মূল বিষয় 2
হুমায়ুন শের শাহের কাছে ১৫৩৯-এ চৌসা এবং ১৫৪০-এ কনৌজের যুদ্ধে হেরে ১৫ বছর পারস্যে নির্বাসিত ছিলেন।
মূল বিষয় 3
শের শাহ সুরি পাট্টা ও কবুলিয়ত প্রথা, রূপার রুপিয়া (১৭৮ গ্রেন), তামার দাম, সড়ক-ই-আজম (জিটি রোড) এবং ডাক-চৌকি প্রবর্তন করেন।
মূল বিষয় 4
১৫৫৬ সালে দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে বৈরাম খাঁ হিমুকে পরাজিত করে আকবরের পক্ষে মুঘল শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
মূল বিষয় 5
আকবর মনসবদারি প্রথা (জাত ও সওয়ার) এবং রাজা টোডরমলের মাধ্যমে ১৫৮০ সালে দশশালা বন্দোবস্ত (১/৩ অংশ রাজস্ব) চালু করেন।
মূল বিষয় 6
আকবর তীর্থকর ও জিজিয়া কর বিলোপ করেন, ফতেহপুর সিক্রিতে ইবাদত খানা, মহজরনামা এবং সর্বজনীন শান্তির 'সুলহ-ই-কুল' ও দ্বীন-ই-ইলাহি প্রবর্তন করেন।
মূল বিষয় 7
জাহাঙ্গীরের আমলে ন্যায়বিচারের শিকল ও টমাস রোর আগমন ঘটে; শাহজাহানের আমল ছিল মুঘল স্থাপত্যের স্বর্ণযুগ (তাজমহল, লালকেল্লা)।
মূল বিষয় 8
ঔরঙ্গজেবের জিজিয়া পুনঃপ্রবর্তন এবং ২৬ বছরের রক্তক্ষয়ী 'দাক্ষিণাত্যের ক্ষত' মুঘল সাম্রাজ্যের দ্রুত পতন ত্বরান্বিত করে।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
শের শাহ সুরির প্রবর্তিত ভূমি ব্যবস্থার দুটি প্রধান দলিলের নাম কী এবং সেগুলোর কাজ কী ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: দলিল দুটির নাম 'পাট্টা' (সরকার কর্তৃক কৃষককে প্রদত্ত জমির অধিকার ও রাজস্বের দলিল) এবং 'কবুলিয়ত' (কৃষক কর্তৃক নির্দিষ্ট কর প্রদানে সম্মত হয়ে সরকারকে প্রদত্ত চুক্তিপত্র)।
একটি দলিল দিত সরকার, অন্যটি দিত কৃষক।
2
আকবরের মনসবদারি প্রথায় 'জাত' এবং 'সওয়ার' বলতে কী বোঝাত?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: 'জাত' দ্বারা মনসবদারের ব্যক্তিগত সামাজিক পদমর্যাদা ও বেতন বোঝাত; এবং 'সওয়ার' দ্বারা মনসবদারকে কতজন অশ্বারোহী সৈন্য ও ঘোড়া রাখতে হবে তার সংখ্যা বোঝাত।
একটি ব্যক্তিগত পদমর্যাদা, অন্যটি অশ্বারোহী সৈন্যের সংখ্যা।
3
আকবরের অর্থ ও রাজস্বমন্ত্রী রাজা টোডরমল ১৫৮০ সালে কোন ঐতিহাসিক ভূমি বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন এবং রাষ্ট্রীয় করের হার কত ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: তিনি 'দশশালা বন্দোবস্ত' (বা জবতি ব্যবস্থা) প্রবর্তন করেন এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্বের হার ছিল উৎপন্ন ফসলের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩ অংশ বা ৩৩.৩৩%)।
এটি বিগত ১০ বছরের গড় ফলন ও মূল্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল।
4
আকবর ধর্মীয় সহনশীলতার উদ্দেশ্যে কোন সর্বজনীন শান্তির আদর্শ প্রচার করেছিলেন এবং ফতেহপুর সিক্রিতে কোন ধর্মালোচনা গৃহ নির্মাণ করেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: তিনি 'সুলহ-ই-কুল' (সর্বজনীন শান্তি ও সহনশীলতা) আদর্শ প্রচার করেন এবং ১৫৭৫ সালে ধর্মালোচনার জন্য 'ইবাদত খানা' প্রতিষ্ঠা করেন।
এর অর্থ সকলের জন্য শান্তি, এবং গৃহটির নাম ইবাদত খানা।
5
ঔরঙ্গজেব জীবনের শেষ ২৬ বছর কোন অঞ্চলে যুদ্ধ করতে বাধ্য হন এবং এই দীর্ঘ যুদ্ধকে ঐতিহাসিকরা কী নামে অভিহিত করেছেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ঔরঙ্গজেব জীবনের শেষ ২৬ বছর দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, যাকে ঐতিহাসিকরা 'দাক্ষিণাত্যের ক্ষত' (Deccan Ulcer) নামে অভিহিত করেছেন।
এটি নেপোলিয়নের স্পেনীয় ক্ষতের সাথে তুলনীয়।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।