মধ্য এশিয়ার ফারগানার এক রাজ্যহারা কিশোর কীভাবে ভাগ্যের সন্ধানে হিন্দুকুশ পর্বতমালা পেরিয়ে ভারতে এসে মুঘল সাম্রাজ্যের মতো এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের বীজ বপন করলেন?
জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর (১৫২৬–১৫৩০ খ্রি.):
মুঘল শব্দটি এসেছে 'মঙ্গোল' শব্দ থেকে। বাবর ছিলেন পিতৃসূত্রে তৈমুর লঙের পঞ্চম বংশধর এবং মাতৃসূত্রে চেঙ্গিজ খানের চতুর্দশ বংশধর। মধ্য এশিয়ার ফারগানার সিংহাসন হারিয়ে এবং সমরখন্দ পুনর্দখলে ব্যর্থ হয়ে তিনি কাবুলের শাসক হন। ভারতীয় আমির দৌলত খাঁ লোদি ও রানা সঙ্গের আমন্ত্রণে তিনি ভারত অভিযান করেন:
১. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ (১৫২৬ খ্রি.): ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে দিল্লি ও আগ্রা অধিকার করেন।
২. খানুয়ার যুদ্ধ (১৫২৭ খ্রি.): মেবারের বীর রাজপুত রানা সঙ্গের বিশাল সম্মিলিত বাহিনীকে বাবর তোপখানা ও তুলঘুমা কৌশলে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে বাবর 'জেহাদ' ঘোষণা করেন এবং বিজয়ের পর 'গাজি' (ধর্মযোদ্ধা) উপাধি গ্রহণ করেন।
৩. চান্দেরির যুদ্ধ (১৫২৮ খ্রি.) ও ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রি.): মেদিনী রাই এবং আফগান জোটকে পরাস্ত করে উত্তর ভারতে মুঘল শাসন নিরঙ্কুশ করেন।
বাবর চাগতাই তুর্কি ভাষায় তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনী 'বাবরনামা' (Tuzuk-i-Baburi) রচনা করেন, যেখানে ভারতের উদ্ভিদ, প্রাণী, জলবায়ু ও সমাজজীবনের চমৎকার বিবরণ রয়েছে। ১৫৩০ সালে আগ্রায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
নাসিরউদ্দিন হুমায়ুন (১৫৩০–১৫৪০ ও ১৫৫৫–১৫৫৬ খ্রি.):
হুমায়ুন কথার অর্থ 'ভাগ্যবান', কিন্তু তিনি ছিলেন মুঘল ইতিহাসের অন্যতম দুর্ভাগা শাসক। বাবার নির্দেশে তিনি সাম্রাজ্যকে তিন ভাই কামরান, আসকারি ও হিন্দালের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েন।
• শের শাহের সাথে সংঘাত: বিহারের আফগান নেতা শের খাঁ (শের শাহ সুরি)-র সাথে সংঘাতে লিপ্ত হন। ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে চৌসার যুদ্ধ-এ শের খাঁ রাতে অতর্কিতে আক্রমণ করে হুমায়ুনকে পরাজিত করেন। প্রাণ বাঁচাতে হুমায়ুন ঘোড়া নিয়ে গঙ্গায় ঝাঁপ দেন এবং নিজাম নামক এক ভিস্তিওয়ালার (জলবাহক) সাহায্যে বেঁচে যান।
• ১৫৪০ সালে বিলগ্রাম বা কনৌজের যুদ্ধ-এ শের শাহের কাছে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়ে হুমায়ুন সিংহাসন হারান এবং নিঃস্ব অবস্থায় সিন্ধু ও পারস্যে প্রায় ১৫ বছর যাযাবরের মতো নির্বাসিত জীবন কাটান। পারস্যের সাফাবিদ শাহ তাহমাস্পের সামরিক সহায়তায় তিনি পরবর্তীতে ১৫৫৫ সালে দিল্লি পুনর্দখল করেন।
হুমায়ুনের বোন গুলবদন বেগমের লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ 'হুমায়ুননামা'-তে ভাইদের মধ্যকার বিবাদ, চৌসার যুদ্ধে নদীর জলে ভেসে যাওয়া এবং দীর্ঘ নির্বাসনের মর্মস্পর্শী বিবরণ প্রত্যক্ষ প্রামাণ্য হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে।
বাবরের ক্ষিপ্র সামরিক প্রতিভা মুঘলদের ভারতে প্রবেশের পথ খুলে দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর অকালমৃত্যু সাম্রাজ্যকে স্থায়ী রূপ দিতে পারেনি। হুমায়ুনের ব্যক্তিগত দয়াশীলতা ও চারিত্রিক অস্থিরতা আফগানদের পুনরুত্থান ডেকে আনে।
মনে রাখুন: বাবর তুর্কি ভাষায় বাবরনামা লেখেন এবং খানুয়ার যুদ্ধে গাজি উপাধি নেন। হুমায়ুন ১৫৩৯ সালে চৌসা এবং ১৫৪০ সালে কনৌজের যুদ্ধে শের শাহের কাছে পরাজিত হয়ে ১৫ বছর নির্বাসিত ছিলেন।