অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হলো এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যার মাধ্যমে একটি সমাজ উৎপাদন পরিচালনা করে এবং সম্পদ বণ্টন করে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর ভারত মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (Mixed Economy) গ্রহণ করে, যেখানে ব্যক্তি খাতের মুনাফা অর্জন ও দক্ষতার সাথে রাষ্ট্রীয় খাতের সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতাভিত্তিক উন্নয়নের সমন্বয় ঘটানো হয়।
- বেসরকারি ক্ষেত্র (Private Sector): যেসব কারবার ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের মালিকানা, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে গড়ে ওঠে, সেগুলিকে বেসরকারি ক্ষেত্র বলা হয়। এর মূল চালিকাশক্তি হলো মুনাফা অর্জন ও মূলধন বৃদ্ধি। উদাহরণ: একমালিকানা, অংশীদারি কারবার, হিন্দু যৌথ পরিবার কারবার, সমবায় সমিতি এবং টাটা, রিলায়েন্স বা ইনফোসিসের মতো প্রাইভেট ও পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি।
- সরকারি ক্ষেত্র (Public Sector): যেসব উদ্যোগ কেন্দ্র সরকার, এক বা একাধিক রাজ্য সরকার অথবা যৌথভাবে উভয় সরকারের প্রত্যক্ষ মালিকানা, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেগুলিকে সরকারি ক্ষেত্র বলে। এর মূল লক্ষ্য জনকল্যাণ, সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং সাশ্রয়ী মূল্যে মৌলিক পরিষেবা প্রদান। উদাহরণ: ভারতীয় রেল, সেইল (SAIL), কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড ইত্যাদি।
স্বাধীনতার সময় ভারতে চরম দারিদ্র্য, মূলধনের অভাব এবং ভারী শিল্প ও পরিকাঠামোর শোচনীয় দৈন্যদশা ছিল। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশের নির্দেশনায় দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ১৯৫৬ সালের শিল্পনীতি প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই নীতিতে সরকারি ক্ষেত্রকে "অর্থনীতির সর্বোচ্চ শিখরে" (Commanding Heights of the Economy) স্থাপন করা হয়।
সেই যুগে সরকারি ক্ষেত্রের প্রধান দায়িত্ব ছিল:
- মৌলিক ও ভারী পরিকাঠামো নির্মাণ: ইস্পাত কারখানা (দুর্গাপুর, ভিলাই, রৌরকেল্লা), ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, বাঁধ ও রেললাইন তৈরিতে বিপুল মূলধন ও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতো, যা তৎকালীন বেসরকারি ব্যবসায়ীদের পক্ষে যোগান দেওয়া অসম্ভব ছিল।
- সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন: পশ্চাৎপদ ও আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে (যেমন দুর্গাপুর, বোকারো) কারখানা স্থাপন করে রাস্তাঘাট, স্কুল, হাসপাতাল ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করা।
- অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন রোধ: দেশের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, তেল ও আর্থিক সম্পদ যাতে গুটিকয়েক ধনী শিল্পপতির কবলে না চলে যায়, তা নিশ্চিত করা।
- আমদানি প্রতিস্থাপন ও আত্মনির্ভরতা: বিদেশি মুদ্রার সঙ্কট কাটাতে দেশেই ভারী যন্ত্রপাতি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করা।
চার দশক ধরে সরকারি ক্ষেত্র বিশাল শিল্পভিত্তি তৈরি করলেও সময়ের সাথে সাথে এটি অদক্ষতা, অতিরিক্ত কর্মচারী, আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতের ফাঁস, দুর্নীতি ও লাগাতার আর্থিক ক্ষতির কবলে পড়ে। ১৯৯১ সালে ভারতের তীব্র বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের মুখে শুরু হয় উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ ও বিশ্বায়ন (LPG) সংস্কার।
১৯৯১ সালের সংস্কারে সরকারি ক্ষেত্রের ভূমিকা ঢেলে সাজানো হয়:
- সংরক্ষিত শিল্পের সংখ্যা হ্রাস: ১৯৫৬ সালে যে ১৭টি শিল্প শুধু সরকারি ক্ষেত্রের জন্য সংরক্ষিত ছিল, ১৯৯১ সালে তা কমিয়ে ৮টি করা হয় এবং বর্তমানে মাত্র ২টি কৌশলগত ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে: (১) পরমাণু শক্তি ও নির্দিষ্ট তেজস্ক্রিয় খনিজ, এবং (২) রেল পরিবহন পরিচালনা।
- বিলগ্নিকরণ (Disinvestment): সরকারি উদ্যোগগুলির কিছু অংশের শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে সরকারের রাজকোষীয় ঘাটতি কমানো এবং বাজারে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা তৈরি করা হয়।
- রুগ্ণ উদ্যোগ পুনর্গঠন: লোকসানে চলা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে বিআইএফআর (BIFR)-এ পাঠানো হয় এবং কর্মীদের জন্য স্বেচ্ছাবসর প্রকল্প (VRS) চালু হয়।
- সমঝোতা স্মারক (MoU) ও পরিচালন স্বায়ত্তশাসন: লাভজনক সরকারি সংস্থাগুলিকে আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করতে তাদের মহারত্ন (Maharatna) (যেমন কোল ইন্ডিয়া, ওএনজিসি, সেইল), নবরত্ন (Navratna) এবং মিনিরত্ন মর্যাদা দেওয়া হয়, যার ফলে তাদের পরিচালনা পর্ষদ মন্ত্রকের অনুমতি ছাড়াই কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।