আধুনিক অর্থনীতিতে রাশিবিজ্ঞান (Statistics) শব্দটি দুটি সুস্পষ্ট অর্থে ব্যবহৃত হয়: বহুবচন অর্থে (পরিসংখ্যানীয় তথ্য বা সমঙ্ক) এবং একবচন অর্থে (রাশিবিজ্ঞান পদ্ধতি বা বিজ্ঞান)।
- বহুবচন অর্থে রাশিবিজ্ঞান (Statistical Data): বিশিষ্ট পরিসংখ্যানবিদ হোরেস সেক্রিস্টের (Horace Secrist) ধ্রুপদী সংজ্ঞানুযায়ী, রাশিবিজ্ঞান হলো "বহুবিধ কারণ দ্বারা লক্ষণীয়ভাবে প্রভাবিত, সংখ্যায় প্রকাশিত, যুক্তিসঙ্গত নির্ভুলতার মানদণ্ডে পরিগণিত বা আনুমানিক, একটি পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্যে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংগৃহীত এবং পরস্পরের সাথে তুলনামূলক সম্পর্কের ভিত্তিতে উপস্থাপিত তথ্যাবলীর সমষ্টি।" এই সংজ্ঞা অনুসারে, কোনো একক বিচ্ছিন্ন সংখ্যা (যেমন—"রহিমের মাসিক আয় ২৫,০০০ টাকা") রাশিবিজ্ঞান নয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার কৃষিশ্রমিকদের গড় দৈনিক মজুরির তুলনামূলক তালিকা হলো রাশিবিজ্ঞান, কারণ এটি তথ্যের সমষ্টি এবং তুলনার যোগ্য।
- একবচন অর্থে রাশিবিজ্ঞান (Statistical Methods): এটি সংখ্যাগত তথ্য সংগ্রহ, বিন্যাস, উপস্থাপন, বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ব্যবহৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও কলাকৌশলকে নির্দেশ করে। এটি মূলত তথ্য বিশ্লেষণের প্রযুক্তিগত হাতিয়ার।
অর্থনীতিবিদ্যায় সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাশিবিজ্ঞান তত্ত্ব ও বাস্তব জগতের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে:
| অর্থনৈতিক ক্ষেত্র | রাশিবিজ্ঞানের ভূমিকা ও প্রয়োগ | বাস্তব উদাহরণ |
|---|---|---|
| ভোগ বিশ্লেষণ | ভোক্তার চাহিদা বিশ্লেষণ, আয়ের স্থিতিস্থাপকতা পরিমাপ এবং এঙ্গেলের পারিবারিক ব্যয় বিধি যাচাইকরণ। | NSSO-এর পারিবারিক ভোগব্যয় সমীক্ষা যা প্রমাণ করে যে আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্যের আনুপাতিক ব্যয় হ্রাস পায়। |
| উৎপাদন পরিকল্পনা | উপাদান ও উৎপাদনের সম্পর্ক নির্ণয়, শ্রম ও পুঁজির প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা হিসাব এবং বাজারের ভবিষ্যৎ চাহিদা পূর্বাভাস। | বার্ষিক শিল্প সমীক্ষা (ASI)-এর তথ্য ব্যবহার করে কারখানাগুলির উৎপাদন ক্ষমতা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত। |
| বাজার ও মূল্য নির্ধারণ | চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য বিশ্লেষণ, কৃষি পণ্যের মূল্য স্থিতিস্থাপকতা এবং ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) নির্ধারণ। | নিয়ন্ত্রিত কৃষি বাজার (Mandi) থেকে প্রাপ্ত পাইকারি মূল্যের ভিত্তিতে মূল্য কমিশনের সুপারিশ। |
| সামষ্টিক নীতি ও পরিকল্পনা | জাতীয় বাজেট প্রণয়ন, মুদ্রাস্ফীতি পরিমাপ, কর রাজস্বের পূর্বাভাস এবং মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (GDP) হিসাবায়ন। | RBI-এর মুদ্রানীতি কমিটি ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রেপো রেট নির্ধারণ করে। |
| দারিদ্র্য ও সামাজিক কল্যাণ | দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারের অনুপাত নির্ধারণ এবং কর্মসংস্থান প্রকল্পের কার্যকারিতা যাচাই। | সাময়িক শ্রমশক্তি সমীক্ষা (PLFS)-এর তথ্যের ভিত্তিতে ১০০ দিনের কাজ (MGNREGA)-এর তহবিল বরাদ্দ। |
রাশিবিজ্ঞান অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হলেও এর কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে যা জানা অত্যন্ত জরুরি:
- কেবল পরিমাণগত তথ্যের আলোচনা করে: রাশিবিজ্ঞান কোনো মানবিক বা গুণগত বৈশিষ্ট্য (যেমন—সততা, বুদ্ধিমত্তা, দেশপ্রেম বা সুস্থতা) সরাসরি পরিমাপ করতে পারে না, যতক্ষণ না সেগুলিকে কোনো সংখ্যাগত স্কেলে রূপান্তরিত করা হয়।
- একক বিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়: এটি কেবলমাত্র সমষ্টিগত তথ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে রাশিবিজ্ঞান সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে পারে না।
- রাশিবিজ্ঞানের সিদ্ধান্তসমূহ কেবল গড়ে সত্য (True on Average): প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের (যেমন পদার্থবিজ্ঞান) নিয়মের মতো রাশিবিজ্ঞানের সূত্রগুলি পরম সত্য নয়; এগুলি সম্ভাব্যতামূলক এবং কেবল বৃহৎ সমষ্টির ক্ষেত্রে গড়ে সত্য প্রমাণিত হয়।
- অপব্যবহারের ঝুঁকি: অদক্ষ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গবেষক ভুল নমুনা নির্বাচন করে বা তথ্যের বিকৃতি ঘটিয়ে বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত তৈরি করতে পারেন। প্রবাদ আছে, "রাশিবিজ্ঞান হলো কাদামাটির মতো, যা দিয়ে দেবতা বা শয়তান উভয়ই গড়া যায়।"