অর্থনীতিবিদ্যায় উৎপাদন (Production) বলতে কোনো নতুন পদার্থ সৃষ্টি করা বোঝায় না (কারণ ভরের নিত্যতা সূত্রানুযায়ী মানুষ কোনো বস্তু সৃষ্টি বা ধ্বংস করতে পারে না)। অর্থনীতিতে উৎপাদন হলো উপযোগের সৃষ্টি বা উপযোগের সংযোজন (Creation or Addition of Utility)। অর্থাৎ প্রাকৃতিক বা অপ্রক্রিয়াজাত উপকরণসমূহকে রূপান্তরের মাধ্যমে মানুষের অভাব মোচনের উপযোগী করে তোলাই হলো উৎপাদন।
উপযোগ প্রধানত চারটি উপায়ে সৃষ্টি হয়:
- আকারগত উপযোগ (Form Utility): কাঁচামালের বাহ্যিক রূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে উপযোগ বৃদ্ধি (যেমন—কাঁচা পাট থেকে বস্তা বা লোহা থেকে ইস্পাতের যন্ত্রপাতি তৈরি)।
- স্থানগত উপযোগ (Place Utility): কোনো দ্রব্যকে প্রাচুর্যের অঞ্চল থেকে অভাবের অঞ্চলে পরিবহনের মাধ্যমে উপযোগ তৈরি (যেমন—দার্জিলিংয়ের চা কলকাতায় এনে বিক্রি করা)।
- সময়গত উপযোগ (Time Utility): ফসল ওঠার মরশুমে পণ্য সংগ্রহ করে গুদামজাত বা হিমাগারে রেখে অফ-সিজনে চাহিদা মেটানো (যেমন—হুগলির আলুর কোল্ড স্টোরেজ সংরক্ষণ)।
- সেবাগত উপযোগ (Service Utility): শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, ব্যাংকার ও আইনজীবীর প্রত্যক্ষ মানসিক ও কায়িক শ্রমের মাধ্যমে সেবা সৃষ্টি।
কোনো নির্দিষ্ট কারিগরি জ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রেক্ষিতে ব্যবহৃত উৎপাদনের উপকরণসমূহ (Inputs) এবং প্রাপ্ত সম্ভাব্য সর্বোচ্চ উৎপাদনের পরিমাণের (Output) মধ্যকার গাণিতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ককে উৎপাদন অপেক্ষক বলা হয়:
$$Q = f(L, K, N, E)$$
যেখানে $Q$ হলো মোট উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণ, $L$ হলো শ্রম, $K$ হলো পুঁজি বা যন্ত্রপাতি, $N$ হলো জমি এবং $E$ হলো সংগঠন বা উদ্যোক্তা। সাধারণ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে জমি ও সংগঠন স্থির ধরে দুটি প্রধান উপকরণ—শ্রম ($L$) ও পুঁজি ($K$)-র নিরিখে অপেক্ষকটি লেখা হয়: $Q = f(L, K)$।
উপকরণের পরিবর্তনের স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে আলফ্রেড মার্শাল সময়কালকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন:
| পার্থক্যকারী বিষয় | স্বল্পকাল (Short Run) | দীর্ঘকাল (Long Run) |
|---|---|---|
| উপকরণের প্রকৃতি | উৎপাদনের অন্তত একটি উপকরণ স্থির (Fixed) থাকে এবং অন্যান্য উপকরণ পরিবর্তনশীল (Variable) হয়। | উৎপাদনের সকল উপকরণই পরিবর্তনশীল; কোনো স্থির উপকরণ থাকে না। |
| স্থির উপকরণসমূহ | কারখানার জমি, বিশাল ভারী যন্ত্রপাতি, বিল্ডিং, স্থায়ী আধিকারিকদের বেতন। | কোনো স্থির উপকরণ নেই; সমগ্র প্ল্যান্ট ও কারখানার আকার পরিবর্তন করা যায়। |
| পরিবর্তনশীল উপকরণ | দৈনিক শ্রমিক, কাঁচামাল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ। | শ্রম, মূলধন, প্ল্যান্টের আয়তন, প্রযুক্তি—সবকিছুই পরিবর্তনশীল। |
| উৎপাদন পরিবর্তনের উপায় | বিদ্যমান স্থির প্ল্যান্টে কেবল পরিবর্তনশীল শ্রমিকের সংখ্যা বাড়িয়ে উৎপাদন পরিবর্তন সম্ভব। | নতুন কারখানা স্থাপন বা পুরোনো কারখানা সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি। |
| প্রযোজ্য অর্থনৈতিক নিয়ম | পরিবর্তনশীল অনুপাতের বিধি (Law of Variable Proportions)। | মাত্রাবৃদ্ধির প্রতিদান বিধি (Laws of Returns to Scale)। |
স্বল্পকালীন উৎপাদন অপেক্ষকে পুঁজি স্থির ($ar{K}$) এবং শ্রম পরিবর্তনশীল ($L$) হলে তিনটি মৌলিক উৎপন্নের ধারণা উদ্ভূত হয়:
- মোট উৎপাদন (Total Product - TP): নির্দিষ্ট পরিমাণ স্থির উপকরণের সাথে পরিবর্তনশীল উপকরণ (শ্রম)-এর বিভিন্ন একক নিয়োগ করে মোট যে পরিমাণ বাস্তব পণ্য উৎপাদিত হয়।
- গড় উৎপাদন (Average Product - AP): পরিবর্তনশীল উপকরণের প্রতি এককে গড়ে যে পরিমাণ পণ্য উৎপাদিত হয়: $$AP_L = \frac{TP}{L}$$ এটি শ্রমিকের গড় উৎপাদনশীলতা নির্দেশ করে।
- প্রান্তিক উৎপাদন (Marginal Product - MP): স্থির উপকরণ অপরিবর্তিত রেখে পরিবর্তনশীল উপকরণের অতিরিক্ত এক একক বেশি নিয়োগের ফলে মোট উৎপাদনে যে অতিরিক্ত সংযোজন ঘটে: $$MP_L = \frac{\Delta TP}{\Delta L} = TP_n - TP_{n-1} \quad \text{অথবা} \quad MP_L = \frac{d(TP)}{dL}$$ জ্যামিতিক দৃষ্টিতে, $TP$ রেখার যেকোনো বিন্দুতে অঙ্কিত স্পর্শকের ঢালই হলো ওই বিন্দুর প্রান্তিক উৎপাদন ($MP$)।