একচলক রাশিবিজ্ঞানে আমরা একটিমাত্র চলকের (যেমন জাতীয় আয়, শ্রমিকের মজুরি বা চালের দাম) বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করি। কিন্তু বাস্তব অর্থনৈতিক জীবনে চলকসমূহ কখনোই একক বা বিচ্ছিন্ন থাকে না। যখন দুটি চলক এমনভাবে সম্পর্কিত থাকে যে একটির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপর চলকটিতেও একটি নির্দিষ্ট বা নিয়মানুগ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, তখন চলক দুটিকে সহসম্বন্ধযুক্ত (Correlated) বলা হয়।
বিখ্যাত রাশিবিজ্ঞানীদের প্রদত্ত সংজ্ঞা:
- ক্রক্সটন ও কাউডেন (Croxton & Cowden): "যখন দুটি চলকের সম্পর্ক পরিমাণগত প্রকৃতির হয়, তখন সেই সম্পর্ক আবিষ্কার ও পরিমাপ করার এবং একটি সংক্ষিপ্ত সূত্রে প্রকাশ করার রাশিবিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিকে সহসম্বন্ধ বলে।"
- এ. এম. টাটল (A. M. Tuttle): "দুই বা ততোধিক চলকের মধ্যে সহ-পরিবর্তন (covariation) বিশ্লেষণকেই সহসম্বন্ধ বলা হয়।"
- বডিংটন (Boddington): "যখন দুই বা ততোধিক রাশিমালার মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট সংযোগ বা সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে, তখন তাদের মধ্যে সহসম্বন্ধ রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।"
একই পর্যবেক্ষণ এককের দুটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের যুগপৎ সংগৃহীত তথ্যকে (যেমন একজন ব্যক্তির উচ্চতা ও ওজন, দ্রব্যের মূল্য ও চাহিদার পরিমাণ, জমিতে সারের পরিমাণ ও ধান উৎপাদন) দ্বিচলক রাশিমালা বলা হয়। একে জোড়া মান হিসেবে $(x_1, y_1), (x_2, y_2), \dots, (x_n, y_n)$ আকারে প্রকাশ করা হয়।
সহসম্বন্ধকে মূলত তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়:
| শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তি | সহসম্বন্ধের প্রকার | সম্পর্কের প্রকৃতি | বাস্তব অর্থনৈতিক উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| ১. পরিবর্তনের দিক (Direction) | ধনাত্মক বা প্রত্যক্ষ সহসম্বন্ধ (Positive Correlation) | উভয় চলক একই দিকে পরিবর্তিত হয়: একটি বাড়লে অপরটিও বাড়ে, বা একটি কমলে অপরটিও কমে। | দ্রব্যের মূল্য ও জোগানের পরিমাণ ($P \uparrow, Q_S \uparrow$); পরিবারের আয় ও ভোগব্যয় ($Y \uparrow, C \uparrow$); বিজ্ঞাপনী ব্যয় ও বিক্রয়লব্ধ আয়। |
| ঋণাত্মক বা বিপরীতমুখী সহসম্বন্ধ (Negative Correlation) | চলক দুটি পরস্পর বিপরীতমুখী অভিমুখে পরিবর্তিত হয়: একটি বাড়লে অপরটি কমে, এবং তদ্বিপরীত। | দ্রব্যের মূল্য ও চাহিদার পরিমাণ ($P \uparrow, Q_D \downarrow$); শীতকালীন তাপমাত্রা ও গরম পোশাকের বিক্রয়; উৎপাদনের গতি ও পণ্য সরবরাহের সময়। | |
| ২. পরিবর্তনের অনুপাত (Ratio of Change) | রৈখিক সহসম্বন্ধ (Linear Correlation) | একটি চলকের পরিবর্তনের পরিমাণের সাথে অপর চলকের পরিবর্তনের অনুপাত সর্বদা নির্দিষ্ট বা ধ্রুবক থাকে। লেখচিত্রে বসালে বিন্দুগুলি একটি সরলরেখা গঠন করে ($Y = a + bX$)। | কাঁচামালের স্থির মূল্যে ক্রয় (প্রতি অতিরিক্ত কেজির জন্য মোট ব্যয় ঠিক ₹৫০ হারে বৃদ্ধি পাওয়া)। |
| বক্ররৈখিক বা অরৈখিক সহসম্বন্ধ (Curvilinear Correlation) | চলকদ্বয়ের পরিবর্তনের অনুপাত স্থির থাকে না, পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। লেখচিত্রে বসালে বিন্দুগুলি বক্ররেখা সৃষ্টি করে। | পরিবর্তনশীল অনুপাতের বিধি (শ্রম নিয়োগের সাথে মোট উৎপাদন প্রথমে দ্রুত বাড়ে, পরে হ্রাসমান হারে বাড়ে এবং শেষে হ্রাস পায়); আয় ও খাদ্য ব্যয়ের সম্পর্ক (এঞ্জেল রেখা)। | |
| ৩. চলকের সংখ্যা (Number of Variables) | সরল সহসম্বন্ধ (Simple Correlation) | কেবলমাত্র দুটি চলকের ($X$ ও $Y$) পারস্পরিক সম্পর্কের বিশ্লেষণ। | অর্থের জোগান ও পাইকারি মূল্যস্তরের পারস্পরিক সম্পর্ক। |
| বহুচলকীয় সহসম্বন্ধ (Multiple Correlation) | একসঙ্গে তিন বা ততোধিক চলকের পারস্পরিক সম্পর্কের যুগপৎ বিশ্লেষণ। | ধানের মোট ফলন ($Y$), বৃষ্টিপাত ($X_1$), সার প্রয়োগ ($X_2$) এবং উন্নত বীজের ($X_3$) যৌথ প্রভাব। | |
| আংশিক সহসম্বন্ধ (Partial Correlation) | অন্যান্য সংশ্লিষ্ট চলকের প্রভাব স্থির রেখে যেকোনো দুটি নির্দিষ্ট চলকের সম্পর্ক পরিমাপ। | সার প্রয়োগের মাত্রা ($X_2$) স্থির রেখে কেবল বৃষ্টিপাত ($X_1$) ও ফলনের ($Y$) সম্পর্ক নিরূপণ। |
দুটি চলকের মধ্যে উচ্চ সহসম্বন্ধ থাকার অর্থ এই নয় যে তাদের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চ গাণিতিক সহসম্বন্ধ নিম্নোক্ত চারটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে সৃষ্টি হতে পারে:
- প্রত্যক্ষ কার্যকারণ সম্পর্ক: একটি চলকের পরিবর্তন সরাসরি অন্য চলকের পরিবর্তনের কারণ (যেমন অর্থের জোগান বৃদ্ধি সরাসরি মুদ্রাস্ফীতির কারণ)।
- পারস্পরিক বা দ্বিমুখী সম্পর্ক: দুটি চলক একে অপরকে প্রভাবিত করে (যেমন বাজারে মূল্য ও চাহিদার সাধারণ ভারসাম্য, বা আয় ও বিনিয়োগের গুণক-ত্বরক সম্পর্ক)।
- সাধারণ তৃতীয় চলকের প্রভাব (Lurking Variable): একটি সাধারণ বাহ্যিক চলকের প্রভাবে উভয় চলক যুগপৎ পরিবর্তিত হয় (যেমন তীব্র গ্রীষ্মের কারণে আইসক্রিমের বিক্রি এবং হাসপাতালে সানস্ট্রোকের রোগীর সংখ্যা উভয়ই বৃদ্ধি পায়)।
- ভ্রান্ত বা অবাস্তব সহসম্বন্ধ (Spurious / Nonsense Correlation): সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন দুটি ঘটনার দীর্ঘকালীন যুগপৎ বৃদ্ধির ফলে কাকতালীয়ভাবে উচ্চ সহসম্বন্ধ দেখা যায় (যেমন ভারতের কোনো রাজ্যে বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং ইউরোপে জনসংখ্যা বৃদ্ধি)। এটি অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ অর্থহীন।