কেন্দ্রীয় প্রবণতার পরিমাপসমূহ (যৌগিক গড়, মধ্যমা, সংখ্যাগুরু মান) একটি রাশিমালার সামগ্রিক চরিত্রকে একটিমাত্র প্রতিনিধিত্বমূলক সংখ্যার মাধ্যমে প্রকাশ করে। কিন্তু শুধুমাত্র গড়ের সাহায্যে কোনো রাশিমালার সম্পূর্ণ রূপ বোঝা অসম্ভব। গড় মান কেবল কেন্দ্রটির অবস্থান নির্দেশ করে, তথ্যের ছড়ানোর মাত্রা জানায় না।
একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক। ধরা যাক তিনটি ভিন্ন কারখানায় ৫ জন করে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি (টাকায়) নিম্নরূপ:
- ক কারখানা: ৫০, ৫০, ৫০, ৫০, ৫০ $\implies \text{গড় } (\bar{X}) = ₹৫০$
- খ কারখানা: ৪৫, ৪৮, ৫০, ৫২, ৫৫ $\implies \text{গড় } (\bar{X}) = ₹৫০$
- গ কারখানা: ১০, ২০, ৫০, ৮০, ৯০ $\implies \text{গড় } (\bar{X}) = ₹৫০$
উভয় কারখানার গড় মজুরি হুবহু সমান (₹৫০)। কিন্তু 'ক' কারখানায় মজুরির কোনো তারতম্য নেই (পরিপূর্ণ সমসত্ত্বতা); 'খ' কারখানায় সামান্য ব্যবধান রয়েছে (উচ্চ স্থিতিশীলতা); আর 'গ' কারখানায় চরম ব্যবধান ও বৈষম্য বিদ্যমান। তথ্যের এই তারতম্য বা ছড়ানোর মাত্রাকেই রাশিবিজ্ঞানে বিস্তার বা অপকিরণ (Dispersion) বলা হয়।
- আর্থার এল. বোলি (A. L. Bowley): "বিস্তার হলো রাশিমালার অন্তর্গত পদসমূহের পরিবর্তনের পরিমাপ।"
- ব্রুকস ও ডিক (Brooks & Dick): "একটি কেন্দ্রীয় মানের চারিপাশে চলকের মানসমূহের ছড়িয়ে পড়ার বা পরিবর্তনের মাত্রাই হলো বিস্তার।"
- সিম্পসন ও কাফকা (Simpson & Kafka): "একটি গড়ের চারিপাশে রাশি তথ্যের পুঞ্জের বিক্ষিপ্ততার পরিমাপকে বিস্তার পরিমাপ বলা হয়।"
যেহেতু কেন্দ্রীয় প্রবণতা হলো মূল তথ্যের প্রত্যক্ষ গড় (প্রথম ক্রমের গড়), তাই বিস্তারের পরিমাপকে—যা গড় থেকে দূরত্বের গড় বোঝায়—রাশিবিজ্ঞানে দ্বিতীয় ক্রমের গড় (Averages of the second order) বলা হয়।
- গড় মানের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই: যদি বিস্তার কম হয়, তবে গড় মানটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও প্রতিনিধিত্বশীল। বিস্তার খুব বেশি হলে গড় মানটি অবাস্তব ও বিভ্রান্তিকর হয়।
- স্থায়িত্ব বা সমসত্ত্বতার তুলনা: দুই বা ততোধিক রাশিমালার মধ্যে কোনটি বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ, সুসংগত বা ধারাবাহিক তা তুলনা করা (যেমন দুই ক্রিকেটারের স্কোরের ধারাবাহিকতা বা দুটি উৎপাদন ইউনিটের মান তুলনা)।
- উৎপাদন ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনশীলতা নিয়ন্ত্রণ: শিল্প কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের নিখুঁত মান বজায় রাখতে বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা।
- উচ্চতর পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের ভিত্তি: সহসম্বন্ধ, নির্ভরণ, নমুনা তত্ত্ব এবং অর্থনৈতিক সূচক সংখ্যা গণনায় বিস্তার হলো প্রধান উপাদান।
| তুলনার ভিত্তি | পরম বিস্তার (Absolute Dispersion) | আপেক্ষিক বিস্তার বা বিস্তার গুণাঙ্ক (Relative Dispersion) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | যে পরিমাপ মূল তথ্যের পরিমাপের ভৌত এককে প্রকাশিত বিচ্যুতির বাস্তব মান তুলে ধরে। | কেন্দ্রীয় গড়ের সাপেক্ষে বিচ্যুতির মানকে খাঁটি এককহীন অনুপাত বা শতকরা হারে প্রকাশ করে। |
| পরিমাপের একক | মূল তথ্যের এককে ব্যক্ত হয়: টাকা, কিলোগ্রাম, মিটার, কুইন্টাল। | বিশুদ্ধ এককহীন সংখ্যা বা শতকরা মান (যেমন ০.২৫ বা ২৫%)। |
| তুলনার উপযোগিতা | ভিন্ন এককযুক্ত (যেমন উচ্চতা বনাম ওজন) বা ব্যাপকভাবে ভিন্ন গড়যুক্ত দুটি রাশিমালার মধ্যে তুলনা করতে পারে না। | যেকোনো ভিন্ন এককযুক্ত বা ভিন্ন স্কেলের রাশিমালার তুলনামূলক বিশ্লেষণে আদর্শ। |
| প্রধান পরিমাপসমূহ | প্রসার, চতুর্থক বিচ্যুতি, গড় বিচ্যুতি, সমক বিচ্যুতি। | প্রসার গুণাঙ্ক, চতুর্থক বিচ্যুতি গুণাঙ্ক, গড় বিচ্যুতি গুণাঙ্ক, বিভেদাঙ্ক (CV)। |
রাশিবিজ্ঞানী জি. উদনি ইউল (G. Udny Yule)-এর মতে একটি আদর্শ বিস্তার পরিমাপের ছয়টি শর্ত পূরণ করা আবশ্যক:
- এটি একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্রের দ্বারা দৃঢ়ভাবে সংজ্ঞায়িত হতে হবে।
- এটি রাশিমালার সকল পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হতে হবে।
- এটি সাধারণ মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য হতে হবে।
- এর গণনা পদ্ধতি সহজ ও সরল হতে হবে।
- এটি আরও উচ্চতর বীজগণিতীয় প্রয়োগের উপযোগী হতে হবে (যেমন যৌথ সমক বিচ্যুতি নির্ণয়)।
- এটি নমুনার ওঠানামা দ্বারা সবচেয়ে কম প্রভাবিত হতে হবে (নমুনাগত স্থায়িত্ব)।