ইংরেজি Economics শব্দটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ Oikonomia থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এটি মূলত Oikos (যার অর্থ গৃহ বা পরিবার) এবং Nemein (যার অর্থ পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনা) শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। কালক্রমে গৃহস্থালির সীমাবদ্ধ সম্পদ বণ্টনের বিদ্যা থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজবিজ্ঞানে রূপান্তরিত হতে অর্থনীতিকে চারটি বিখ্যাত সংজ্ঞার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছে:
- সম্পদভিত্তিক সংজ্ঞা (অ্যাডাম স্মিথ, ১৭৭৬): আধুনিক অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations"-এ অর্থনীতিকে সম্পদের বিজ্ঞান বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর মতে, জাতীয় সম্পদ সৃষ্টি, বৃদ্ধি এবং সঞ্চয়ই অর্থনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয়। সীমাবদ্ধতা: জন রাস্কিন ও কার্লাইলের মতো চিন্তাবিদরা মানুষকে উপেক্ষা করে কেবল অর্থ-সম্পদকে গুরুত্ব দেওয়ায় একে "হৃদয়হীন বিদ্যা" (Dismal Science) বলে সমালোচনা করেছিলেন।
- কল্যাণভিত্তিক সংজ্ঞা (আলফ্রেড মার্শাল, ১৮৯০): অধ্যাপক আলফ্রেড মার্শাল তাঁর রচিত "Principles of Economics" গ্রন্থে বলেন: "অর্থনীতি হলো মানবজাতির দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কার্যাবলির পাঠ; এটি মানব কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত উপায়সমূহের অর্জন ও ব্যবহারের দিকটি পরীক্ষা করে।" মার্শাল প্রমাণ করেন যে সম্পদ মানুষের জন্য, মানুষ সম্পদের জন্য নয়; মানবকল্যাণই অর্থনীতির মূল লক্ষ্য।
- দুষ্প্রাপ্যতা ও নির্বাচনভিত্তিক সংজ্ঞা (লায়নেল রবিন্স, ১৯৩২): অধ্যাপক রবিন্স তাঁর "An Essay on the Nature and Significance of Economic Science" গ্রন্থে অর্থনীতির সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক ও সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা দেন: "অর্থনীতি হলো সেই বিজ্ঞান যা মানুষের অসীম উদ্দেশ্য এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য দুষ্প্রাপ্য উপায়ের মধ্যকার সম্পর্ক হিসেবে মানব আচরণকে পর্যালোচনা করে।" রবিন্সের চারটি স্তম্ভ: (ক) মানুষের অভাব অসীম, (খ) অভাব পূরণের সম্পদ সীমিত বা দুষ্প্রাপ্য, (গ) সম্পদের একাধিক বিকল্প ব্যবহার রয়েছে, এবং (ঘ) অভাবসমূহের গুরুত্বের তীব্রতা ভিন্ন ভিন্ন।
- প্রবৃদ্ধিভিত্তিক আধুনিক সংজ্ঞা (পল স্যামুয়েলসন): নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসন রবিন্সের দুষ্প্রাপ্যতার ধারণার সঙ্গে সময়ের সাথে সাথে জাতীয় প্রবৃদ্ধির সম্পর্ক যুক্ত করে আধুনিক সংজ্ঞা নিরূপণ করেন।
১৯৩৩ সালে নরওয়ের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ র্যাগনার ফ্রিশ (প্রথম অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী) অর্থনীতিকে প্রধান দুটি শাখায় বিভক্ত করেন:
| তুলনার ক্ষেত্র | ব্যষ্টিগত অর্থনীতি (Microeconomics) | সমষ্টিগত অর্থনীতি (Macroeconomics) |
|---|---|---|
| উৎপত্তি ও অর্থ | গ্রিক শব্দ Mikros (ক্ষুদ্র) থেকে উদ্ভূত। এটি অর্থনীতির পৃথক বা স্বতন্ত্র একককে বিশ্লেষণ করে। | গ্রিক শব্দ Makros (বৃহৎ) থেকে উদ্ভূত। এটি সমগ্র জাতীয় অর্থনীতিকে একটি সামগ্রিক কাঠামোয় বিশ্লেষণ করে। |
| আলোচ্য একক | একজন ভোক্তা, একটি পরিবার, একটি নির্দিষ্ট ফার্ম বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কোনো একটি পণ্যের বাজার। | সমগ্র দেশ, জাতীয় আয়, মোট কর্মসংস্থান, সাধারণ মূল্যস্তর, সামগ্রিক চাহিদা ও সামগ্রিক জোগান। |
| মূল তাত্ত্বিক নাম | দাম তত্ত্ব (Price Theory): কারণ পণ্যের ও উৎপাদনের উপাদানের আপেক্ষিক দাম নির্ধারণই এর মূল লক্ষ্য। | আয় ও কর্মসংস্থান তত্ত্ব (Income and Employment Theory): কারণ জাতীয় আয় নির্ধারণ ও পূর্ণনিয়োগ আনয়ন এর মূল লক্ষ্য। |
| মূল চালিকাশক্তি | বাজার দাম ব্যবস্থা (Price Mechanism) এবং চাহিদা ও জোগানের ঘাত-প্রতিঘাত। | সরকারি রাজস্ব নীতি (Fiscal Policy), আর্থিক নীতি (Monetary Policy) এবং মোট সরকারি ব্যয়। |
| গৃহীত অনুমান | ধরে নেওয়া হয় যে সমষ্টিগত চলকসমূহ (যেমন জাতীয় আয় বা পূর্ণনিয়োগ) স্থির রয়েছে (Ceteris Paribus)। | ধরে নেওয়া হয় যে ব্যষ্টিগত সম্পদ বণ্টন ইতিমধ্যে নির্ধারিত রয়েছে। |
| ভারসাম্যের পদ্ধতি | আংশিক ভারসাম্য বিশ্লেষণ (Partial Equilibrium): মার্শালীয় পদ্ধতিতে অন্যান্য বাজার অপরিবর্তিত ধরে একটি নির্দিষ্ট বাজারের বিশ্লেষণ। | সাধারণ ভারসাম্য বিশ্লেষণ (General Equilibrium): ওয়ালরাসীয় পদ্ধতিতে সমস্ত পারস্পরিক নির্ভরশীল বাজারের এককালীন ভারসাম্য বিশ্লেষণ। |
| অর্থনৈতিক বৈপরীত্য | ব্যক্তিগত সঞ্চয় আর্থিক সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রতীক। | মিতব্যয়িতার হেঁয়ালি (Paradox of Thrift): সমাজের সবাই যদি একসঙ্গে সঞ্চয় বৃদ্ধি করে, তবে সামগ্রিক চাহিদা হ্রাস পেয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে মহামন্দা নেমে আসে! |
অর্থনৈতিক বক্তব্য ও সিদ্ধান্তসমূহকে প্রধান দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়:
- সদর্থক অর্থনীতি (Positive Economics): এটি কোনো বিষয়ের বাস্তব সত্য বা কার্যকারণ সম্পর্কের বস্তুনিষ্ঠ বিচার করে—অর্থাৎ "বাস্তবে কী ঘটছে বা ঘটবে" (What is/was/will be)। এতে কোনো ব্যক্তিগত বা নৈতিক মতামত থাকে না এবং পরিসংখ্যান দিয়ে এর সত্যতা যাচাই করা যায়।
উদাহরণ: "পেট্রোলের উপর কর বৃদ্ধি করলে তার বাজার দাম বৃদ্ধি পাবে এবং চাহিদার পরিমাণ কমবে।" - আদর্শনিষ্ঠ অর্থনীতি (Normative Economics): এটি সমাজে "কী হওয়া উচিত বা বাঞ্ছনীয়" (What ought to be) তা নিয়ে আলোচনা করে। এটি নৈতিক ও ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর, যার সত্যতা কোনো তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সরাসরি প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
উদাহরণ: "সরকারের উচিত সমস্ত দরিদ্র মানুষকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উচ্চমানের চিকিৎসা ও শিক্ষা প্রদান করা।"