ভোক্তার আচরণ বিশ্লেষণের সনাতন বা পরিমাণগত তত্ত্বটি নব্য-চিরায়ত অর্থনীতিবিদ অ্যালফ্রেড মার্শাল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Principles of Economics (1890)-এ প্রণালীবদ্ধভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। এই তত্ত্ব অনুসারে, উপযোগিতা (Utility)—অর্থাৎ কোনো দ্রব্যের মানুষের অভাব মোচনের ক্ষমতা—সংখ্যা বা পরিমাণের দ্বারা পরিমাপযোগ্য। এই পরিমাপের কাল্পনিক একককে বলা হয় 'ইউটিলস' (Utils) (যেমন ১, ২, ৩ ইত্যাদি ইউটিল)।
ভোক্তার মানসিক তৃপ্তির গাণিতিক মূল্যায়নের জন্য মার্শাল দুটি প্রধান প্রত্যয় পৃথক করেছেন:
- মোট উপযোগিতা (Total Utility - $TU$): কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দ্রব্যের বিভিন্ন একক ভোগ করে একজন ভোক্তা সর্বমোট যে মানসিক তৃপ্তি লাভ করেন, তার সমষ্টিকে মোট উপযোগিতা বলে:
$$TU_n = U_1 + U_2 + \dots + U_n = \sum_{i=1}^{n} MU_i$$
- প্রান্তিক উপযোগিতা (Marginal Utility - $MU$): কোনো দ্রব্যের ভোগের পরিমাণ এক একক বৃদ্ধি করলে মোট উপযোগিতায় যে অতিরিক্ত উপযোগিতা যুক্ত হয়, তাকে প্রান্তিক উপযোগিতা বলে:
$$MU_n = TU_n - TU_{n-1} \quad \text{বা} \quad MU = \frac{\Delta TU}{\Delta Q}$$অবিচ্ছিন্ন অপেক্ষকের ক্ষেত্রে: $MU = \frac{d(TU)}{dQ}$।
জার্মান অর্থনীতিবিদ এইচ. এইচ. গসেনের নামানুসারে পরিচিত ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগিতা বিধিটি মার্শাল জনপ্রিয় করে তোলেন। বিধিটির বিবৃতি হলো: "অন্যান্য সকল অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো ভোক্তা যখন কোনো একটি দ্রব্যের ভোগের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়াতে থাকেন, তখন প্রতিটি অতিরিক্ত একক থেকে প্রাপ্ত প্রান্তিক উপযোগিতা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে।"
বিধির মূল অনুমিতি বা শর্তাবলি:
- পরিমাণগত পরিমাপযোগ্যতা: উপযোগিতা সংখ্যার সাহায্যে পরিমাপযোগ্য ও যোগযোগ্য।
- সমজাতীয় একক: দ্রব্যের প্রতিটি একক গুণগত মান, আকার ও স্বাদের দিক থেকে পুরোপুরি একরকম হবে।
- পরিমিত একক: দ্রব্যের একক উপযুক্ত বা পরিমিত হতে হবে (যেমন এক গ্লাস জল, চামচ নয়)।
- ধারাবাহিক ভোগ: ভোগের প্রক্রিয়ায় কোনো দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান থাকা চলবে না।
- অর্থের প্রান্তিক উপযোগিতা স্থির ($MU_m$ স্থির): পরিমাপের মাধ্যম অর্থের প্রান্তিক উপযোগিতা অপরিবর্তিত থাকবে।
- ভোক্তার যুক্তিবাদিতা: ভোক্তা যুক্তিবাদী এবং সীমিত আয় থেকে সর্বোচ্চ তৃপ্তি পেতে চান।
- রুচি, পছন্দ ও আয়ের স্থিরতা: ভোগের সময় ভোক্তার আয়, অভ্যাস ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা অপরিবর্তিত থাকবে।
| ভোগের একক ($Q$) | মোট উপযোগিতা ($TU$ ইউটিলে) | প্রান্তিক উপযোগিতা ($MU$ ইউটিলে) | উপযোগিতার পর্যায় |
|---|---|---|---|
| ১ | ২০ | ২০ | $TU$ বৃদ্ধি পায়; $MU > 0$ |
| ২ | ৩৬ | ১৬ | $TU$ ক্রমহ্রাসমান হারে বাড়ে |
| ৩ | ৪৬ | ১০ | $MU$ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে |
| ৪ | ৫০ | ৪ | তৃপ্তির সীমার নিকটে |
| ৫ | ৫০ (সর্বোচ্চ) | ০ | পরিতৃপ্তির বিন্দু ($MU = 0$, $TU$ সর্বাধিক) |
| ৬ | ৪৪ | -৬ | ঋণাত্মক উপযোগিতা বা অতৃপ্তি ($MU < 0$) |
- যখন প্রান্তিক উপযোগিতা ধনাত্মক ($MU > 0$): মোট উপযোগিতা ($TU$) ক্রমহ্রাসমান হারে বৃদ্ধি পায়। $TU$ রেখার ঢাল ধনাত্মক কিন্তু নিম্নাভিমুখী।
- যখন প্রান্তিক উপযোগিতা শূন্য ($MU = 0$): মোট উপযোগিতা ($TU$) তার পরম সর্বোচ্চ মানে পৌঁছায়। এই অবস্থাকে পরিতৃপ্তির বিন্দু (Point of Satiety) বা পূর্ণ তৃপ্তির বিন্দু বলে।
- যখন প্রান্তিক উপযোগিতা ঋণাত্মক ($MU < 0$): মোট উপযোগিতা হ্রাস পেতে থাকে। এই অবস্থায় ভোগ চালনা করলে অতৃপ্তি সৃষ্টি হয়।
ভোক্তা যখন তার সীমিত আর্থিক আয় বিভিন্ন দ্রব্যের মধ্যে এমনভাবে ব্যয় করেন যাতে মোট উপযোগিতা সর্বাধিক হয় এবং আয়ের পুনর্বণ্টন দ্বারা তৃপ্তি বাড়ানো সম্ভব হয় না, তখন তাকে ভোক্তার ভারসাম্য বলা হয়:
- এক দ্রব্যের ক্ষেত্রে ভারসাম্য: ভোক্তা ততক্ষণ পর্যন্ত দ্রব্য ক্রয় করবেন যতক্ষণ পর্যন্ত দ্রব্যের প্রান্তিক উপযোগিতা তার দামের সমান না হয়:
$$\frac{MU_x}{P_x} = MU_m \quad \iff \quad MU_x = P_x \times MU_m$$যদি অর্থের প্রান্তিক উপযোগিতা $MU_m = 1$ ধরা হয়, তবে ভারসাম্য শর্ত: $MU_x = P_x$।
- বহু দ্রব্যের ক্ষেত্রে ভারসাম্য (সম-প্রান্তিক উপযোগিতা বিধি বা গসেনের দ্বিতীয় সূত্র): একাধিক দ্রব্যের ক্ষেত্রে প্রতি টাকায় ব্যয়িত অর্থের প্রান্তিক উপযোগিতা সকল দ্রব্যের জন্য সমান হতে হবে:
$$\frac{MU_x}{P_x} = \frac{MU_y}{P_y} = MU_m \quad \text{এবং বাজেট সমীকরণ:} \quad P_x X + P_y Y = M$$