আফ্রিকা হলো এশিয়ার পরে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ও দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল মহাদেশ। পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় ২০.৪% অংশ (আয়তন প্রায় ৩ কোটি ৩ লক্ষ বর্গকিলোমিটার) এবং প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের বাসভূমি এই বিশাল ভূখণ্ড। এটি পৃথিবীর একমাত্র মহাদেশ যার প্রায় ঠিক মাঝখান দিয়ে নিরক্ষরেখা (০°), উত্তর অংশ দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা (২৩½° উত্তর), দক্ষিণ অংশ দিয়ে মকরক্রান্তি রেখা (২৩½° দক্ষিণ) এবং মূল মধ্যরেখা (০° দ্রাঘিমা) অতিক্রম করেছে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা
আফ্রিকার উত্তরে রয়েছে ভূমধ্যসাগর ও জিব্রাল্টার প্রণালী (যা একে ইউরোপ থেকে পৃথক করেছে); উত্তর-পূর্বে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল (যা একে এশিয়া থেকে পৃথক করেছে); পূর্বে ভারত মহাসাগর এবং পশ্চিমে সুবিশাল আটলান্টিক মহাসাগর। আফ্রিকার উত্তরতম বিন্দু তিউনিসিয়ার রাস বেন সাক্কা (৩৭° উত্তর) এবং দক্ষিণতম বিন্দু দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অগালহাস (৩৪°৫১' দক্ষিণ)।
'অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ' নামকরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত আফ্রিকার অভ্যন্তরভাগ বিশ্বের কাছে প্রায় সম্পূর্ণ অজানা ছিল। এই কারণে ইউরোপীয়রা আফ্রিকাকে 'অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ' (Dark Continent) আখ্যা দিয়েছিল। এর মূল কারণ ছিল আফ্রিকার প্রতিকূল ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা—না-জানা কোনো রহস্য নয়।
অভ্যন্তরভাগে প্রবেশের ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা
১) অনতিক্রম্য প্রাকৃতিক বাধা: উত্তরের সুবিশাল ও রুক্ষ সাহারা মরুভূমি এবং মধ্যভাগের গহিন, স্যাঁতসেঁতে ও সূর্যহীন কঙ্গো অববাহিকার নিরক্ষীয় চিরহরিৎ বৃষ্টিঅরণ্য।
২) নদীজলপ্রপাত: আফ্রিকার নদীগুলো উপকূলীয় মালভূমির খাড়া ঢাল বেয়ে নামার সময় একের পর এক খরস্রোতা জলপ্রপাত ও ক্যাটারাক্ট সৃষ্টি করে, ফলে সমুদ্র উপকূল থেকে জাহাজে করে নদীপথে মহাদেশের ভেতরে ঢোকা অসম্ভব ছিল।
৩) ভগ্নাংশহীন উপকূল: আফ্রিকার উপকূলরেখা অত্যন্ত সোজা ও খাঁজহীন হওয়ায় প্রাকৃতিক পোতাশ্রয়ের অভাব ছিল।
৪) মারাত্মক ক্রান্তীয় রোগব্যাধি: ম্যালেরিয়া, পীতজ্বর এবং সেৎসি মাছির (Tsetse fly) কামড়ে ছড়ানো প্রাণঘাতী ঘুমরোগ (Sleeping Sickness)।
সুয়েজ খালের বৈশ্বিক কৌশলগত গুরুত্ব
১৮৬৯ সালে ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরের মধ্যবর্তী সুয়েজ যোজক কেটে সুয়েজ খাল (Suez Canal) খনন করা হয়। এই খাল খোলার ফলে ইউরোপ থেকে ভারতকে কেন্দ্র করে গোটা এশিয়ায় যাওয়ার জন্য আফ্রিকাকে ঘুরে উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে প্রায় ৭,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিপজ্জনক জলপথ পাড়ি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা দূর হয়।
উপকূলীয় দ্বীপসমূহ ও মাদাগাস্কার
আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত মাদাগাস্কার (Madagascar) হলো পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম দ্বীপ। মোজাম্বিক প্রণালী দ্বারা এটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। দীর্ঘ লক্ষ লক্ষ বছর মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় এখানে লেমুরসহ পৃথিবীর অন্যতম অনন্য জীববৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে।