ইউরোপ হলো অস্ট্রেলিয়ার পর পৃথিবীর দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম মহাদেশ (আয়তন প্রায় ১ কোটি ১ লক্ষ ৮০ হাজার বর্গকিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় ৬.৮%)। তবে আয়তনে ছোট হলেও মানব সভ্যতার আধুনিক ইতিহাস, শিল্পবিপ্লব, জ্ঞানবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ইউরোপের অবদান সর্বাধিক। তিনটি দিক মহাসাগর ও সাগর দিয়ে ঘেরা এবং নিজে অসংখ্য ছোট-বড় উপদ্বীপ নিয়ে গঠিত হওয়ায় ভূগোলবিদরা একে যথার্থভাবেই 'উপদ্বীপের উপদ্বীপ' (Peninsula of Peninsulas) আখ্যা দিয়েছেন।
ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা
ইউরোপ ৩৬° উত্তর অক্ষাংশ (স্পেনের তারিফা অন্তরীপ) থেকে ৭১° উত্তর অক্ষাংশ (নরওয়ের নর্ডকিন অন্তরীপ) এবং পশ্চিমে ১০° পশ্চিম দ্রাঘিমাংশ থেকে পূর্বে ৬৬° পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। ইউরোপের উত্তরে উত্তর মহাসাগর, পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর, দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণ সাগর; আর পূর্বে ইউরাল পর্বতমালা, ইউরাল নদী ও কাস্পিয়ান সাগর ইউরোপকে এশিয়া থেকে সুস্পষ্টভাবে পৃথক করেছে। ইউরেশিয়ার এই পশ্চিম প্রান্তীয় অংশটিই ইউরোপ মহাদেশ।
'উপদ্বীপের উপদ্বীপ' নামকরণের বিজ্ঞানসম্মত কারণ
যে ভূখণ্ড তিন দিকে জলভাগ এবং একদিকে স্থলভাগ দ্বারা যুক্ত থাকে তাকে উপদ্বীপ (Peninsula) বলে। সমগ্র ইউরোপ মহাদেশটি নিজে এশিয়া মহাদেশের সাথে যুক্ত থেকে তিন দিক জলবেষ্টিত হয়ে একটি বিশালাকার উপদ্বীপ গঠন করেছে। আবার এই মহাদেশটির শরীর থেকে আটলান্টিক ও ভূমধ্যসাগরের দিকে বেরিয়ে এসেছে একাধিক সুবৃহৎ উপদ্বীপ: ১) উত্তরে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান উপদ্বীপ (নরওয়ে ও সুইডেন); ২) দক্ষিণ-পশ্চিমে আইবেরিয়ান উপদ্বীপ (স্পেন ও পর্তুগাল); ৩) দক্ষিণে ইতালীয় উপদ্বীপ; ৪) দক্ষিণ-পূর্বে বলকান উপদ্বীপ (গ্রিস); ৫) ডেনমার্কের জুটল্যান্ড উপদ্বীপ। এইজন্য ইউরোপকে 'উপদ্বীপের উপদ্বীপ' বলা হয়।
নরওয়ের ফিয়র্ড (Fiord) উপকূল ও মধ্যরাতের সূর্যের দেশ
১) ফিয়র্ড (Fiord): তুষারযুগে প্রাচীন হিমবাহের অবঘর্ষ ক্ষয়ের ফলে নরওয়ের উপকূলে খাড়া প্রাচীরযুক্ত গভীর 'U' আকৃতির উপত্যকা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পেয়ে এই হিমবাহ উপত্যকাগুলো প্লাবিত হয়ে গভীর, শান্ত ও সংকীর্ণ খাঁড়িতে পরিণত হয়েছে। একে ফিয়র্ড (Fiord) বলে। বিখ্যাত সোগনে ফিয়র্ড (Sognefjord) ২০৪ কিমি দীর্ঘ ও ১,৩০৮ মিটার গভীর।
২) মধ্যরাতের সূর্যের দেশ (Land of the Midnight Sun): সুমেরুবৃত্তের উত্তরে অবস্থিত হওয়ায় মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত নরওয়ের হ্যামারফেস্ট ও উত্তর কেপ অঞ্চলে সূর্য কখনও দিগন্তের নিচে সম্পূর্ণ অস্ত যায় না—মধ্যরাতেও আকাশে সূর্যের মিষ্টি আলো দেখা যায়।
উত্তর আটলান্টিক উষ্ণ স্রোত (North Atlantic Drift)
ইউরোপের উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম উপকূল চরম শৈত্যের হাত থেকে রক্ষা পায়। মেক্সিকো উপসাগর থেকে উৎপন্ন উপসাগরীয় উষ্ণ স্রোতের প্রসারিত শাখা—উত্তর আটলান্টিক উষ্ণ স্রোত (North Atlantic Drift) ইউরোপের পশ্চিম উপকূল দিয়ে প্রবাহিত হয়। এই উষ্ণ জলের কারণে রাশিয়ার সুমেরুবৃত্তের ভেতরে অবস্থিত মারমানস্ক (Murmansk) বন্দর এবং নরওয়ের বার্গেন বন্দর চরম শীতেও সারাবছর সম্পূর্ণ বরফমুক্ত থাকে এবং নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল করতে পারে।
ভগ্ন উপকূলরেখা ও উন্নত সামুদ্রিক বাণিজ্য
ইউরোপের উপকূলরেখা পৃথিবীর যেকোনো মহাদেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি ভগ্ন, খাঁজকাটা ও আঁকাবাঁকা (মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৭,৯০০ কিমি)। এর ফলে হাজার হাজার নিরাপদ প্রাকৃতিক পোতাশ্রয় গড়ে উঠেছে। মহাদেশের কোনো স্থানই সমুদ্র থেকে খুব বেশি দূরে নয়, যা প্রাচীনকাল থেকেই ইউরোপীয়দের দুর্দান্ত নাবিক, সামুদ্রিক অনুসন্ধানকারী এবং বিশ্ব বাণিজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হতে সহায়তা করেছে।