পৃথিবীর উপরিতল সর্বত্র মসৃণ বা একরকম নয়। কোথাও রয়েছে সুউচ্চ শৃঙ্গ, কোথাও মালভূমি, আবার কোথাও সমতল ভূমি। ভূ-পৃষ্ঠের এই বৈচিত্র্যময় রূপকেই ভূমিরূপ (Landform) বলা হয়। পৃথিবীর এই ভূমিরূপসমূহ প্রধানত দুটি বিপরীতধর্মী প্রাকৃতিক শক্তির পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয়েছে: (১) ভূ-অভ্যন্তরীণ বা অন্তর্জাত শক্তি এবং (২) ভূপৃষ্ঠস্থ বা বহির্জাত শক্তি।
অন্তর্জাত প্রক্রিয়া (Endogenic Processes) ও ভূ-আন্দোলন
পৃথিবীর অভ্যন্তরে তেজস্ক্রিয় পদার্থের ভাঙ্গন ও ভূগর্ভস্থ অতিরিক্ত তাপের কারণে গুরুমণ্ডলের অ্যাসথেনোস্ফিয়ারে পরিচলন স্রোত সৃষ্টি হয়। এই অভ্যন্তরীণ শক্তির প্রভাবে ভূত্বকের পাতগুলি সঞ্চালিত হয়। অন্তর্জাত প্রক্রিয়ার দুটি প্রধান রূপ:
- ধীর ভূ-আলোড়ন (Slow Movements): কোটি কোটি বছর ধরে শান্তভাবে ঘটে। এটি আবার দুই প্রকার—গিরিজনি আলোড়ন (Orogenic movement, যা অনুভূমিকভাবে পাললিক শিলাস্তরে ভাঁজ ফেলে ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টি করে) এবং মহীভাবক আলোড়ন (Epeirogenic movement, যা উল্লম্বভাবে কাজ করে মহাদেশের উত্থান বা নিমজ্জন ঘটায়)।
- আকস্মিক ভূ-আলোড়ন (Sudden Movements): অতি দ্রুত কয়েক সেকেন্ড বা ঘণ্টার মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়; যেমন—ভূমিকম্প (Earthquake) এবং অগ্ন্যুৎপাত (Volcanism)।
বহির্জাত প্রক্রিয়া (Exogenic Processes) ও সমতাকরণ
সৌরশক্তি ও পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে যে পরিবর্তন ঘটে, তাকে বহির্জাত প্রক্রিয়া বলে। বায়ুপ্রবাহ, নদী, হিমবাহ, সমুদ্রতরঙ্গ ও আবহবিকার হলো প্রধান বহির্জাত শক্তি। এরা উচ্চস্থানকে ক্ষয় করে নিচু করে (অবরোহণ বা Degradation) এবং ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থ নিচু জায়গায় জমা করে ভরাট করে (আরোহণ বা Aggradation)। এই দুইয়ের যৌথ ফলাফলকে পর্যায়ন বা সমতাকরণ (Gradation) বলা হয়।
উচ্চতামূলক ভূমিরূপ শ্রেণিবিভাগ (Hypsometric Classification)
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা, ভূমির ঢাল ও বন্ধুরতার ভিত্তিতে ভূপৃষ্ঠের ভূমিরূপকে প্রধান তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়:
- পর্বত (Mountain): সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯০০ মিটারের বেশি উচ্চতাযুক্ত, খাড়া ঢাল ও সূচালো শৃঙ্গ বিশিষ্ট সুবিস্তৃত শিলাময় উচ্চভূমি।
- মালভূমি (Plateau): সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাধারণত ৩০০ থেকে ৯০০ মিটার উঁচু, চারপাশ খাড়া ঢালযুক্ত এবং শীর্ষদেশ চওড়া ও প্রায় সমতল শিলাময় অঞ্চল (টেবিল ল্যান্ড)।
- সমভূমি (Plain): সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০০ মিটারের কম উচ্চতায় অবস্থিত প্রায় সমতল বা মৃদু তরঙ্গায়িত বিস্তীর্ণ ভূমিভাগ।
পাত সংস্থান তত্ত্ব ও ভূমিরূপের রূপান্তর (Plate Tectonics)
বিজ্ঞানী পিচো ও মরগানের পাত সংস্থান তত্ত্ব অনুযায়ী সমগ্র ভূতৃক কতগুলি বড় ও ছোট শক্ত ও চলমান পাতের সমন্বয়ে গঠিত। দুটি পাতের পরস্পরের অভিমুখে চলন (অভিসারী পাত সীমানা) ঘটলে সেখানে শিলাস্তরে সংনমন বলের কারণে ভঙ্গিল পর্বতমালা গড়ে ওঠে। বিপরীতমুখী চলনে (প্রতিসারী পাত সীমানা) ভূত্বকে ফাটল ও গ্রস্ত উপত্যকা তৈরি হয়।
পরীক্ষার্থী সংকেত ও সারসংক্ষেপ
পরীক্ষায় প্রায়ই অন্তর্জাত ও বহির্জাত শক্তির পার্থক্য আসে। মনে রাখবে: অন্তর্জাত শক্তি ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি করে বৈচিত্র্য আনে (Primary Landforms), আর বহির্জাত শক্তি ক্ষয় ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে ভূমিকে মসৃণ ও সমতল করতে সচেষ্ট থাকে (Secondary Landforms)।