Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 7 • Geography & Environment (আমাদের পৃথিবী) • অধ্যায় 8
আনুমানিক সময়: 50 মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

মাটিদূষণ

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) সপ্তম শ্রেণির "আমাদের পৃথিবী" (ভূগোল ও পরিবেশ) পাঠ্যক্রমের নবম অধ্যায় "মাটি দূষণ" (Soil Pollution)-এ স্বাগত। মাটি হলো আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি এবং স্থলভাগের সমস্ত প্রাণের ধাত্রী। এই অধ্যায়ে মাটি দূষণের সঠিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা, উর্বর মাটির আদর্শ গঠন, দূষণের বহুমুখী উৎসমুখ (প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য, অপরিমিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, কলকারখানার বিষাক্ত ভারী ধাতু যেমন সিসা, ক্যাডমিয়াম ও পারদ), মাটির প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের বিনাশ (কৃষকের বন্ধু কেঁচোর মৃত্যু, উপকারী ব্যাকটিরিয়ার ধ্বংস ও মাটির বন্ধ্যাত্ব), খোলা ডাম্পিং গ্রাউন্ড থেকে সৃষ্ট মারাত্মক বিষাক্ত লিচেট (Leachate) দ্বারা ভূগর্ভস্থ জল দূষণ, খাদ্যশৃঙ্খলে বিষের প্রবেশ ও মানবদেহের জটিল রোগব্যাধি, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক ৪R নীতি (Refuse, Reduce, Reuse, Recycle), ভার্মিকম্পোস্ট (কেঁচো সার), ফাইটোরিমিডিয়েশন (সূর্যমুখী ও সরিষা গাছ দ্বারা মাটি শোধন) এবং সমোন্নতি ও ধাপ চাষের মাধ্যমে আধুনিক মৃত্তিকা সংরক্ষণের কৌশল বিশদভাবে পরিবেশন করা হয়েছে।

🌱 এক চামচ উর্বর মাটিতে সারা পৃথিবীর মোট মানুষের চেয়েও বেশি অণুজীব বাস করে!

আপনি কি জানেন—এক চা চামচ সুস্থ উর্বর বাগানের মাটিতে প্রায় ৮০০ কোটি অণুজীব জীবিত থাকে, যা সমগ্র পৃথিবীর মোট মানব জনসংখ্যার চেয়েও বেশি?

অথচ আমরা যখন জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক বিষ স্প্রে করি কিংবা মাটিতে একটি প্লাস্টিকের প্যাকেট বা ব্যাটারি ছুড়ে ফেলি, তখন মুহূর্তের মধ্যে নিঃশব্দে কোটি কোটি উপকারী জীবাণু ও মাটির বন্ধু কেঁচো পুড়ে ছাই হয়ে যায়! মাটির নিচ দিয়ে চুইয়ে তৈরি হয় বিষাক্ত কালো রস লিচেট (Leachate), যা আমাদের নলকূপের পানীয় জলকেও বিষাক্ত করে তোলে।

যে মাটি আমাদের অন্ন জোগায়, সেই মাটি কীভাবে বিষাক্ত হচ্ছে এবং কীভাবে সূর্যমুখী গাছ আর ছোট্ট কেঁচো সেই মাটিকে আবার নতুন জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে—আসুন জেনে নিই এই প্রাণবন্ত অধ্যায়ে।

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) সপ্তম শ্রেণির "আমাদের পৃথিবী" (ভূগোল ও পরিবেশ) পাঠ্যক্রমের নবম অধ্যায় "মাটি দূষণ" (Soil Pollution)-এ স্বাগত। মাটি হলো আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি এবং স্থলভাগের সমস্ত প্রাণের ধাত্রী। এই অধ্যায়ে মাটি দূষণের সঠিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা, উর্বর মাটির আদর্শ গঠন, দূষণের বহুমুখী উৎসমুখ (প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য, অপরিমিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, কলকারখানার বিষাক্ত ভারী ধাতু যেমন সিসা, ক্যাডমিয়াম ও পারদ), মাটির প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের বিনাশ (কৃষকের বন্ধু কেঁচোর মৃত্যু, উপকারী ব্যাকটিরিয়ার ধ্বংস ও মাটির বন্ধ্যাত্ব), খোলা ডাম্পিং গ্রাউন্ড থেকে সৃষ্ট মারাত্মক বিষাক্ত লিচেট (Leachate) দ্বারা ভূগর্ভস্থ জল দূষণ, খাদ্যশৃঙ্খলে বিষের প্রবেশ ও মানবদেহের জটিল রোগব্যাধি, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক ৪R নীতি (Refuse, Reduce, Reuse, Recycle), ভার্মিকম্পোস্ট (কেঁচো সার), ফাইটোরিমিডিয়েশন (সূর্যমুখী ও সরিষা গাছ দ্বারা মাটি শোধন) এবং সমোন্নতি ও ধাপ চাষের মাধ্যমে আধুনিক মৃত্তিকা সংরক্ষণের কৌশল বিশদভাবে পরিবেশন করা হয়েছে।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • শিলা ও মাটির সৃষ্টি (আবহবিকার ও রেগোলিথ) এবং মাটির বিভিন্ন স্তর (Soil Horizons) সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান।
  • উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান (নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম) এবং কৃষিকাজে সারের সাধারণ ব্যবহার।
  • পরিবেশে পচনশীল (জৈবভঙ্গুর) ও অপচনশীল (অজৈবভঙ্গুর) বর্জ্যের পার্থক্য।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • মাটি দূষণের সঠিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা দেওয়া এবং মৃত্তিকা ক্ষয় ও মাটি দূষণের মৌলিক পার্থক্য ব্যাখ্যা করা।
  • প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য, কৃষি রাসায়নিক ও শিল্পজাত ভারী ধাতু কীভাবে মাটিকে দূষিত করে তা বিশ্লেষণ করা।
  • মাটি দূষণের ফলে কেঁচো, উপকারী জীবাণু ও মাটির প্রাকৃতিক হিউমাসের ক্ষয়ক্ষতির প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করা।
  • খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে ফসলে বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রবেশ এবং মানুষের অঙ্গহানি ও ক্যান্সারের কারণ বিশ্লেষণ করা।
  • ৪R নীতি, ভার্মিকম্পোস্টিং, ফাইটোরিমিডিয়েশন এবং সমোন্নতি চাষের মাধ্যমে মাটির পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. মাটি দূষণের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা, উর...
2 ২. মাটি দূষণের প্রধান উৎসমুখ: প্লাস...
3 ৩. বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয়: কেঁচোর...
4 ৪. খাদ্যশৃঙ্খলে বিষক্রিয়া: শস্যে ব...
5 ৫. প্রতিকার ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. মাটি দূষণের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা, উর্বর মাটির গঠন ও ক্ষয় বনাম দূষণ

মাটি হলো পৃথিবীর স্থলভাগের সবচেয়ে অমূল্য পাতলা সজীব ত্বক। এটি কেবল ধূলিকণার সমষ্টি নয়, বরং কোটি কোটি জীবিত অণুজীব, কেঁচো, জল, বাতাস ও হিউমাসের এক গতিশীল জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। প্রাকৃতিকভাবে এক ইঞ্চি উর্বর শীর্ষ মৃত্তিকা (Topsoil) গঠিত হতে প্রায় ৫০০ থেকে ১০০০ বছর সময় লাগে। অথচ মানবজাতির অবিবেচক কার্যকলাপের কারণে এই মহামূল্যবান সম্পদ আজ মারাত্মকভাবে দূষিত ও বিনষ্ট হচ্ছে।

1

মাটি দূষণের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা

বিভিন্ন ক্ষতিকারক কঠিন, তরল ও রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থ মাটিতে সঞ্চিত হয়ে মাটির স্বাভাবিক ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণমান নষ্ট করলে এবং তা উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে উঠলে তাকে মাটি দূষণ (Soil Pollution) বলে।

2

আদর্শ উর্বর মাটির অনুপাত

একটি স্বাস্থ্যকর পরিণত মাটির মোট আয়তনের প্রায় ৪৫% খনিজ কণা, ৫% জৈব উপাদান বা হিউমাস, ২৫% মাটির জল এবং ২৫% মাটির বায়ু থাকা আবশ্যক। দূষণের ফলে এই ভারসাম্যে চরম বিপর্যয় ঘটে।

3

মৃত্তিকা ক্ষয় বনাম মাটি দূষণ

বায়ু ও জলের প্রবাহে মাটির ওপরের উর্বর স্তর অপসারিত হওয়া হলো মৃত্তিকা ক্ষয় (Soil Erosion)। অন্যদিকে মাটিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ও অপচনশীল বর্জ্য মিশে উর্বরতা ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়া হলো মাটি দূষণ।

4

অনবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ

মানব ইতিহাসের সময়সীমার বিচারে মাটি একটি অনবায়নযোগ্য সম্পদ। একবার এক হেক্টর জমির উর্বর শীর্ষ মৃত্তিকা বিষাক্ত বা ধ্বংস হয়ে গেলে জীবদ্দশায় তা পুনরায় প্রাকৃতিক উপায়ে ফিরে পাওয়া অসম্ভব।

5

সপ্তম শ্রেণির ভূগোলে প্রাসঙ্গিকতা

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পরিবেশ সুরক্ষায় মাটির স্বাস্থ্য ও জৈব কৃষির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে, যাতে ছাত্রছাত্রীরা মৃত্তিকা সংরক্ষণে সচেতন নাগরিক হয়ে ওঠে।

২. মাটি দূষণের প্রধান উৎসমুখ: প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য, কৃষি রাসায়নিক ও ভারী ধাতু

মাটি দূষণের উৎসমুখগুলো মূলত আধুনিক শিল্পায়ন, ত্রুটিপূর্ণ নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক নির্ভর কৃষিব্যবস্থার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। এই উৎসমুখগুলো অবিরাম বিষাক্ত পদার্থ মাটির স্তরে ঢেলে চলেছে।

1

প্লাস্টিক ও গৃহস্থালির অপচনশীল বর্জ্য

একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ক্যারিব্যাগ ও প্লাস্টিক বোতল শত শত বছর মাটিতে অবিকৃত অবস্থায় থাকে। এগুলো মাটির প্রাকৃতিক ছিদ্রগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, ফলে শিকড়ের গভীরে বাতাস চলাচল ও বৃষ্টির জলের স্বাভাবিক রিচার্জ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

2

রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিব্যবহার

অতিরিক্ত ফলনের লোভে জমিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ইউরিয়া, অ্যামোনিয়াম সালফেট ও সুপারফসফেট ছিটানো হয়। এর সাথে বিষাক্ত কীটনাশক (যেমন—DDT, বিএইচসি, এন্ডোসালফান) মাটির স্বাভাবিক রাসায়নিক গঠন বিকৃত করে তোলে।

3

শিল্পজাত বিষাক্ত ভারী ধাতু

ধাতু পরিশোধন কারখানা, চামড়া শিল্প (ট্যানারি), ব্যাটারি কারখানা ও রঙ কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত সিসা (Lead - Pb), ক্যাডমিয়াম (Cd), পারদ (Hg) ও ক্রোমিয়াম (Cr) মাটিতে মিশে মাটিকে স্থায়ীভাবে বিষাক্ত করে।

4

ইলেকট্রনিক বর্জ্য (E-Waste)

ফেলে দেওয়া ভাঙা মোবাইল, কম্পিউটার, সার্কিট বোর্ড ও ব্যাটারি থেকে ক্ষতিকারক আর্সেনিক, সীসা ও বেরিলিয়াম চুইয়ে সরাসরি মাটির ভেতর প্রবেশ করে মাটির জৈব শক্তি বিনষ্ট করে।

5

ইটভাটা ও অবৈজ্ঞানিক খননকার্য

পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে শত শত ইটভাটা নদীর পার ও উর্বর কৃষিজমির ওপরের সর্বশ্রেষ্ঠ পলিমাটি কেটে ইট তৈরি করছে। পাশাপাশি খোলা মুখ কয়লা খনি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শীর্ষ মাটিকে স্থায়ীভাবে মরুভূমিতে পরিণত করছে।

৩. বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয়: কেঁচোর বিনাশ, উপকারী অণুজীব হ্রাস ও বিষাক্ত লিচেট

মাটিতে যখন বিষাক্ত রাসায়নিক মেশে, তখন মাটির অদৃশ্য জীবজগতে নেমে আসে মহাপ্রলয়। মাটি কেবল পাথরচূর্ণ নয়—মাটি হলো লক্ষ কোটি উপকারী ব্যাকটিরিয়া, ছত্রাক ও কেঁচোর নিরাপদ বাসস্থান।

1

কেঁচোর গণমৃত্যু ও জৈব চাষের পতন

কেঁচোকে বলা হয় 'প্রকৃতির লাঙল' (Nature's Ploughman) বা 'কৃষকের অকৃত্রিম বন্ধু'। কেঁচো মাটি খুঁড়ে নরম করে এবং বায়ু চলাচলের সুড়ঙ্গ তৈরি করে। রাসায়নিক কীটনাশক ও অম্লত্ব কেঁচোর পাতলা চামড়া পুড়িয়ে তাদের গণহারে ধ্বংস করে দেয়।

2

উপকারী নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী জীবাণু বিনাশ

মাটির উর্বরতার মূল স্তম্ভ হলো Rhizobium (শিম্বগোত্রীয় উদ্ভিদের শিকড়ের ব্যাকটিরিয়া), Azotobacter ও নীল-সবুজ শৈবাল। বিষাক্ত কীটনাশকের প্রভাবে এই অণুজীবগুলো বিলুপ্ত হয়ে বাতাস থেকে মাটিতে প্রাকৃতিক নাইট্রোজেন সংবন্ধন চিরতরে থমকে যায়।

3

মাটির তীব্র অম্লত্ব ও ক্ষারত্ব বৃদ্ধি

অতিরিক্ত রাসায়নিক অ্যামোনিয়াম সার ব্যবহারের ফলে মাটিতে মুক্ত হাইড্রোজেন আয়নের সংখ্যা বাড়ে এবং মাটির $pH$ মাত্রা কমে ৫.৫-এর নিচে নেমে যায় (তীব্র অম্লত্ব)। ফলে মাটিতে বিষাক্ত অ্যালুমিনিয়াম ($Al^{3+}$) আয়ন মুক্ত হয়ে শিকড়ের বৃদ্ধি রোধ করে।

4

বিষাক্ত লিচেট ও ভূগর্ভস্থ জলের বিষক্রিয়া

শহরের উন্মুক্ত আবর্জনার স্তূপের (Landfill) ওপর যখন বৃষ্টির জল পড়ে, তখন তা সমস্ত পচা জৈব এসিড ও ভারী ধাতুর সাথে মিশে এক কুচকুচে কালো দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত রস তৈরি করে, একে লিচেট (Leachate) বলে। এই লিচেট মাটির স্তর ভেদ করে চুইয়ে ভূগর্ভস্থ পানীয় জলকে আর্সেনিক ও সীসায় বিষাক্ত করে।

5

মাটির হিউমাস হ্রাস ও বন্ধ্যাত্ব

জৈব উপাদান পচে তৈরি হওয়া কালো বাদামি পুষ্টিস্তর হলো হিউমাস। রাসায়নিক সারের বিষে পচনকারী ছত্রাক মরে যাওয়ায় হিউমাস তৈরি বন্ধ হয়ে যায় এবং এককালের সোনার ফসল ফলানো জমি বন্ধ্যা পাথুরে চাতালে পরিণত হয়।

৪. খাদ্যশৃঙ্খলে বিষক্রিয়া: শস্যে বিষ শোষণ, জৈব বিবর্ধন ও মানবদেহের রোগব্যাধি

মাটি দূষণের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—মাটির বিষ মাটিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। মাটির সেই বিষ উদ্ভিদ তার মূল দিয়ে টেনে নেয় এবং ধাপে ধাপে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে আমাদের ডিনারের থালায় এসে পৌঁছায়।

1

শিকড় দ্বারা ভারী ধাতু শোষণ

ফসলের শিকড় মাটির জল ও খনিজের সাথে সাথে অনিচ্ছাকৃতভাবে মাটিতে উপস্থিত দ্রবীভূত সীসা, ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিক শোষণ করে কাণ্ড ও পাতায় পাঠায়।

2

খাদ্যশস্যে বিষাক্ত উপাদানের জমা হওয়া

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় দেখা গেছে—আর্সেনিক ও কীটনাশকযুক্ত মাটিতে চাষ করা ধানগাছের ধানের খোসা এবং ভাতের চালে মারাত্মক মাত্রায় আর্সেনিক জমা হয়। পালং শাক, বাঁধাকপি ও মুলোর মতো সবজিতে সীসা ও নাইট্রেট জমা হয়।

3

জৈব বিবর্ধন ও মানবদেহে বিষক্রিয়া

ঘাস ও শস্য থেকে গৃহপালিত গরু-ছাগলের দুধ ও মাংসে বিষাক্ত ডিডিটি বহুগুণ ঘনীভূত হয়। খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা মানুষের শরীরে এই বিষ সবচেয়ে বেশি মাত্রায় সঞ্চিত হয়।

4

মারাত্মক রোগব্যাধি ও শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি

মাটির ভারী ধাতু থেকে মানুষের শরীরে নানাবিধ জটিল রোগ দেখা দেয়: সিসা (Pb) শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ও বুদ্ধি নষ্ট করে; ক্যাডমিয়াম (Cd) হাড়কে নরম ও ভঙ্গুর করে (ইতাই-ইতাই রোগ); আর্সেনিক (As) ত্বকের ক্যান্সার ও ব্ল্যাক ফুট রোগ ঘটায়।

5

হরমোন বিপর্যয় ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংকট

মাটিতে জমে থাকা কীটনাশক মানবদেহের হরমোন নিঃসরণ প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করে (Endocrine disruption), যার ফলে বন্ধ্যাত্ব, অকাল প্রসব এবং জন্মগত শারীরিক ত্রুটিযুক্ত শিশুর জন্ম হয়।

৫. প্রতিকার ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা: ৪R নীতি, ভার্মিকম্পোস্ট, ফাইটোরিমিডিয়েশন ও সংরক্ষণ

মাটি দূষণ রোধ করা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের বেঁচে থাকার লড়াই। মাটিকে রক্ষা করতে হলে বৈজ্ঞানিক মৃত্তিকা সংরক্ষণ, পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ৪R নীতি মেনে চলা অপরিহার্য।

1

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৪R (4Rs) নীতি

১) Refuse (প্রত্যাখ্যান): একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণ বর্জন করা; ২) Reduce (হ্রাস): বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো; ৩) Reuse (পুনর্ব্যবহার): কাচের বোতল বা ব্যাগ বারবার ব্যবহার; ৪) Recycle (পুনর্ব্যবহারযোগ্য রূপান্তর): কাগজ ও প্লাস্টিক গলিয়ে নতুন দরকারী জিনিস তৈরি।

2

ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচো সার প্রয়োগ

বিশেষ প্রজাতির কেঁচো (যেমন—Eisenia fetida) ব্যবহার করে রান্নাঘরের তরিতরকারির খোসা, খড় ও গোবর পচিয়ে উৎকৃষ্ট ভার্মিকম্পোস্ট (কেঁচো সার) তৈরি করা হয়। এটি মাটির জলধারণ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়ায় এবং মাটিকে প্রাকৃতিক হিউমাসে ভরিয়ে তোলে।

3

ফাইটোরিমিডিয়েশন (উদ্ভিদ দ্বারা মাটি শোধন)

কিছু বিশেষ উদ্ভিদ মাটি থেকে ভারী ধাতু শুষে নিয়ে মাটিকে বিষমুক্ত করে। একে ফাইটোরিমিডিয়েশন (Phytoremediation) বলে। যেমন—সূর্যমুখী গাছ সীসা ও আর্সেনিক শোষণ করে এবং সরিষা গাছ ক্যাডমিয়াম ও নিকেল শুষে নেয়।

4

বৈজ্ঞানিক মৃত্তিকা সংরক্ষণ কৌশল

পাহাড়ের ঢালে ধাপ চাষ (Terrace farming) ও সমোন্নতি রেখা বরাবর চাষ (Contour ploughing) এবং উন্মুক্ত জমিতে বায়ু প্রতিরোধক বেষ্টনী (Shelter belts) তৈরি করে মাটির উর্বর শীর্ষ স্তরের ক্ষয় রোধ করা হয়।

5

আইন প্রয়োগ ও সরকারি উদ্যোগ

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আইন, জৈব সার ব্যবহারে সরকারি অনুদান এবং পশ্চিমবঙ্গে 'নির্মল বাংলা' অভিযানের মাধ্যমে মাটিকে পরিষ্কার ও দূষণমুক্ত রাখার গণ-উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক পরিভাষা, সূত্র ও পরিমাপক

আদর্শ উর্বর মৃত্তিকার ভারসাম্য অনুপাত (Ideal Soil Balance Law)
৪৫% খনিজ কণা + ৫% হিউমাস (জৈব পদার্থ) + ২৫% জল + ২৫% বাতাস
যেকোনো উপাদানের অনুপাত বিঘ্নিত হলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ও রন্ধ্রতা বিনষ্ট হয়।
মাটির অম্লত্ব বৃদ্ধি ও বিষাক্ত অ্যালুমিনিয়াম মুক্তি সমীকরণ (Acidification Index)
অতিরিক্ত অ্যামোনিয়াম সার -> হাইড্রোজেন আয়ন বৃদ্ধি -> pH < 5.5 -> বিষাক্ত Al³⁺ ও Mn²⁺ মুক্তি
তীব্র অম্লীয় মাটিতে বিষাক্ত অ্যালুমিনিয়াম শোষিত হয়ে ফসলের শিকড়ের বৃদ্ধি সম্পূর্ণ আটকে দেয়।
বিষাক্ত লিচেট সৃষ্টি ও ভূগর্ভস্থ দূষণ প্রক্রিয়া (Leachate Generation Flow)
খোলা ল্যান্ডফিল + বৃষ্টির জল -> জৈব এসিড ও ভারী ধাতুর দ্রবণ (লিচেট) -> চুইয়ে ভূগর্ভস্থ জলে প্রবেশ
শহরের আবর্জনা ডাম্পিং গ্রাউন্ড সংলগ্ন গভীর ও অগভীর নলকূপের জল স্থায়ীভাবে বিষাক্ত হয়।
খাদ্যশৃঙ্খলে মাটির বিষের জৈব বিবর্ধন মাত্রা (Soil-to-Human Trophic Transfer)
দূষিত মাটি -> উদ্ভিদের মূল শোষণ -> ভোজ্য অংশ (চাল/সবজি) -> গবাদি পশু -> মানবদেহে অঙ্গহানি
সিসা, ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতু কখনো হজম হয় না; শরীরে জমে থাকে।
কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ৪R ক্রমপরম্পরা নীতি (The 4Rs Hierarchy)
Refuse (প্রত্যাখ্যান) > Reduce (হ্রাস) > Reuse (পুনর্ব্যবহার) > Recycle (রিসাইক্লিং)
মাটিতে প্লাস্টিক ও বর্জ্যের প্রবেশ ঠেকাতে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে সফল বৈজ্ঞানিক পরিবেশ নীতি।
উদ্ভিদ দ্বারা মাটি শোধন বা ফাইটোরিমিডিয়েশন সূত্র (Phytoremediation Model)
হাইপারঅ্যাকিউমুলেটর উদ্ভিদ (সূর্যমুখী / সরিষা) + দূষিত মাটি -> মূল দ্বারা ভারী ধাতু শোষণ -> মাটির বিষমুক্তি
কম খরচে রাসায়নিক ব্যবহার না করে কারখানা এলাকার মাটি শোধনের সবুজ বিপ্লব।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
একটি কৃষিজমিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কীটনাশক স্প্রে করার পর দেখা গেল জমির সমস্ত কেঁচো মারা গেছে এবং কয়েক মাস পর জমিটি শক্ত পাথরের মতো হয়ে গেছে। এর বৈজ্ঞানিক কারণ কী?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
বাস্তুতান্ত্রিক ও মৃত্তিকা কারণ:
১) কেঁচো হলো মাটির প্রাকৃতিক প্রকৌশলী। তারা মাটির ভেতর ক্রমাগত চলাচলের মাধ্যমে বাতাস চলাচলের ছিদ্র এবং জল নিষ্কাশনের পথ তৈরি করে।
২) রাসায়নিক কীটনাশকের বিষাক্ত রাসায়নিক কেঁচোর সংবেদনশীল ভেজা ত্বক দিয়ে প্রবেশ করে তাদের স্নায়ু বিকল করে গণহারে হত্যা করে।
৩) কেঁচো না থাকায় মাটির প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, মাটির কণাগুলো জমাট বাঁধে এবং মাটির রন্ধ্রতা (Porosity) নষ্ট হয়ে মাটি শক্ত ও পাথুরে হয়ে যায়।
৪) উপরন্তু কেঁচোর মল বা ভার্মিকাস্ট মাটিতে হিউমাস ও পুষ্টি যোগাত; তা বন্ধ হওয়ায় মাটির জৈব শক্তি সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়।
উদাহরণ 2
মাটিতে ফেলা প্লাস্টিক ও পলিথিন কেন মাটির সবচেয়ে মারাত্মক শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
কারণসমূহ:
১) প্লাস্টিক ও পলিথিন কৃত্রিম পেট্রোকেমিক্যাল পলিমার দিয়ে তৈরি, যা জৈব অভঙ্গুর (Non-biodegradable); অর্থাৎ মাটির কোনো ব্যাকটিরিয়া বা ছত্রাক একে পচাতে পারে না (৪০০-৫০০ বছর অবিকৃত থাকে)।
২) মাটিতে জমে থাকা প্লাস্টিক মাটির রন্ধ্র বা ছিদ্রগুলো সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়, ফলে বৃষ্টির জল মাটির ভেতরে চুইয়ে প্রবেশ করতে পারে না এবং ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্সঞ্চয় থমকে যায়।
৩) উদ্ভিদের সূক্ষ্ম শিকড় মাটির গভীরে ঢুকতে গিয়ে প্লাস্টিকের প্রতিবন্ধকতায় আটকে যায় এবং উদ্ভিদের বিকাশ থমকে যায়।
৪) মাটিতে বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাটির অবাত পচন ঘটে দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস তৈরি হয়।
উদাহরণ 3
ধানগাছের মাধ্যমে মাটির আর্সেনিক কীভাবে মানবদেহে প্রবেশ করে এবং এর কী ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
প্রক্রিয়া ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতি:
১) পশ্চিমবঙ্গের আর্সেনিকপ্রবণ অঞ্চলে বোরো ধানের জমিতে ভূগর্ভস্থ জল ও আর্সেনিকযুক্ত পলিমাটি ব্যবহৃত হয়।
২) ধানগাছের শিকড় জল ও পুষ্টি শোষণের সাথে সাথে দ্রবীভূত অজৈব আর্সেনিক (Inorganic Arsenic) শোষণ করে কাণ্ড ও চালের দানার ভেতর জমা করে।
৩) সেই বিষাক্ত চালের ভাত প্রতিদিন খাওয়ার ফলে মানুষের শরীরে আর্সেনিকের বিষক্রিয়া ঘটে (আর্সেনিকোসিস)।
৪) এর প্রভাবে হাতের তালু ও পায়ের তলায় কালো দাগ (Melanosis), শক্ত কড়া (Keratosis), পচনশীল ঘা এবং পরবর্তীতে মরণব্যাধি ক্যান্সার ও ব্ল্যাক ফুট রোগ সৃষ্টি হয়।
উদাহরণ 4
শহরের উন্মুক্ত ডাম্পিং গ্রাউন্ডের বর্জ্য থেকে কীভাবে মারাত্মক বিষাক্ত তরল লিচেট (Leachate) তৈরি হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
লিচেট সৃষ্টির প্রক্রিয়া:
১) পৌরসভা ও শহরের গৃহস্থালির বর্জ্য যখন কোনো প্লাস্টিক আস্তরণহীন খোলা মাঠে স্তূপাকারে ফেলা হয়, তখন বৃষ্টির জল সেই আবর্জনার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে চুইয়ে প্রবেশ করে।
২) বৃষ্টির জল পচনশীল জৈব বর্জ্য, ক্ষার, শিল্পজাত ভারী ধাতু (সিসা, পারদ), এবং ক্ষতিকর অম্লের সাথে বিক্রিয়া করে একটি ঘন, কালো, পচা দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত তরলে রূপ নেয়—একে লিচেট বলে।
৩) এই লিচেট মাটির স্তর ভেদ করে প্রাকৃতিক জলবাহী স্তর বা অ্যাকুইফারে (Aquifer) গিয়ে মেশে, ফলে সংলগ্ন এলাকার গভীর ও অগভীর নলকূপের পানীয় জল স্থায়ীভাবে বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
উদাহরণ 5
রাসায়নিক সার ও জৈব সারের (ভার্মিকম্পোস্ট) মধ্যে মাটির স্বাস্থ্যের ওপর তুলনামূলক প্রভাব বিশ্লেষণ করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
তুলনামূলক বিশ্লেষণ:
১) রাসায়নিক সার: জমিতে তাৎক্ষণিক পুষ্টি দেয় ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাভাবিক অম্লত্ব-ক্ষারত্ব ভারসাম্য নষ্ট করে, উপকারী অণুজীব ও কেঁচো মেরে ফেলে এবং মাটির গঠন শক্ত করে ফেলে।
২) ভার্মিকম্পোস্ট (কেঁচো সার): এটি ১০০% প্রাকৃতিক ও জৈবভঙ্গুর। এটি মাটিতে প্রচুর হিউমাস যোগ করে, মাটির জলধারণ ক্ষমতা ও বায়ু চলাচল বহুগুণ বাড়ায় এবং মাটিতে কোটি কোটি উপকারী জীবাণুকে বাঁচিয়ে রেখে মাটির উর্বরতাকে বহু বছর অক্ষুণ্ণ রাখে।
উদাহরণ 6
শিল্পাঞ্চলের ভারী ধাতু দ্বারা দূষিত মাটিকে উদ্ভিদ কীভাবে পরিষ্কার করতে পারে (ফাইটোরিমিডিয়েশন)?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
ফাইটোরিমিডিয়েশন কৌশল:
১) ফাইটোরিমিডিয়েশন হলো বিশেষ উদ্ভিদের সাহায্যে মাটি থেকে বিষাক্ত দূষক নিষ্কাশন করার একটি সবুজ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি।
২) সূর্যমুখী গাছ (Sunflower): মাটি থেকে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর সিসা (Pb), আর্সেনিক ও দস্তা শোষণ করে নিজের কাণ্ড ও পাতায় জমা করে মাটিকে বিষমুক্ত করে।
৩) ভারতীয় সরিষা গাছ (Brassica juncea): মাটি থেকে বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম ও নিকেল শুষে নেয়।
৪) পরবর্তীতে এই উদ্ভিদগুলোকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কেটে সাবধানে পুড়িয়ে বা স্তূপ করে বিষাক্ত ধাতুগুলোকে আলাদা করে ফেলা হয়, ফলে মাটি সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ ও নিরাপদ হয়ে ওঠে।
উদাহরণ 7
পাহাড়ি অঞ্চলে মাটির ক্ষয় ও উর্বরতা রক্ষায় ধাপ চাষ ও সমোন্নতি চাষ কীভাবে সাহায্য করে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
পাহাড়ি মৃত্তিকা সংরক্ষণ:
১) পাহাড়ের ঢালে বৃষ্টির জল প্রবল বেগে নিচের দিকে নেমে আসে এবং মাটির সবচেয়ে উর্বর উপরিভাগকে ধুয়ে নিয়ে যায়।
২) ধাপ চাষ (Terrace Farming): পাহাড়ের খাড়া ঢালকে সিড়ির মতো ধাপে ধাপে কেটে সমতল চাতাল তৈরি করা হয়, ফলে জলের বেগ নাটকীয়ভাবে কমে যায় এবং মাটি ক্ষয় বন্ধ হয়।
৩) সমোন্নতি রেখা চাষ (Contour Ploughing): পাহাড়ের সমান উচ্চতাযুক্ত রেখা বরাবর আড়াআড়িভাবে লাঙল দিয়ে আল বেঁধে চাষ করা হয়, যা বৃষ্টির জল ও মাটির ক্ষয়কে প্রাকৃতিক বাঁধের মতো আটকে রাখে।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

মৃত্তিকা ক্ষয় (Soil Erosion) এবং মাটি দূষণকে (Soil Pollution) একই মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

মৃত্তিকা ক্ষয় হলো বায়ু বা জলের তোড়ে মাটির ভৌত অপসারণ; কিন্তু মাটি দূষণ হলো মাটিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও প্লাস্টিক মিশে মাটির গুণমান নষ্ট হওয়া।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে যত বেশি রাসায়নিক সার জমিতে দেওয়া হবে, ফসলের ফলন তত বাড়বে।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অতিরিক্ত সার দিলে মাটির অম্লত্ব বাড়ে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়, শিকড় পুড়ে যায় এবং উপকারী জীবাণু মারা গিয়ে জমি চিরতরে অনুর্বর হয়ে যায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

মাটির প্লাস্টিক ও বর্জ্য পুড়িয়ে ছাই করে দিলে মাটি দূষণ বন্ধ হয় বলে ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

প্লাস্টিক পোড়ালে মারাত্মক বিষাক্ত ডাইঅক্সিন ও ফিউরান গ্যাস বাতাসে মেশে এবং অবশিষ্ট বিষাক্ত ছাই মাটিতে মিশে মাটিকে আরও মারাত্মকভাবে বিষাক্ত করে।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভারী ধাতু (সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম) কিছুদিন পর মাটিতে পচে নষ্ট হয়ে যায় বলে ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ভারী ধাতুগুলো মৌলিক পদার্থ (Chemical elements); এরা কখনো পচে বা ভেঙে নষ্ট হয় না, বরং হাজার বছর ধরে মাটিতে স্থায়ী বিষ হিসেবে রয়ে যায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

মাটির রাসায়নিক বিষ কেবল কেঁচো ও গাছের ক্ষতি করে, মানুষের কোনো ক্ষতি করে না মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

মাটির বিষ ফসলের শিকড় দিয়ে শোষিত হয়ে চাল ও শাকসবজির মাধ্যমে মানবদেহে ঢুকে কিডনি বিকল, ক্যান্সার ও বুদ্ধিহীনতার মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভার্মিকম্পোস্টকে সাধারণ রাসায়নিক সারের আরেকটি রূপ মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ভার্মিকম্পোস্ট হলো কেঁচোর দ্বারা পচিয়ে তৈরি ১০০% সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক জৈব সার, যার কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

সাধারণ ভুল ধারণা

অম্লীয় মাটিতে কেবল প্রচুর জল ঢাললেই মাটির বিষাক্ততা সম্পূর্ণ চলে যায় বলে ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অতিরিক্ত জল ঢাললে মাটিতে জল জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়; অম্লীয় মাটির প্রতিকারে চুন ($CaCO_3$) বা ডলোমাইট প্রয়োগ করতে হয়।

চিত্রগত ব্যাখ্যা ও মডেল

🌱 মাটি দূষণের উৎসমুখ, ক্ষয়ক্ষতি ও বিজ্ঞানসম্মত প্রতিকার WBBSE Class 7 Geography (আমাদের পৃথিবী) • TargetExams Gold Standard Chapter 9 Notes ১. মাটি দূষণের প্রধান উৎসমুখ প্লাস্টিক ও ই-বর্জ্য, রাসায়নিক সার-কীটনাশক এবং বিষাক্ত ভারী ধাতু 🛍️ Non-Biodegradable Plastics প্লাস্টিক ও পলিথিন (ছিদ্র বন্ধ করে) 🧪 Agrochemical Overdose রাসায়নিক সার (ইউরিয়া) ও কীটনাশক (DDT) 🏭 Industrial Heavy Metals শিল্পের ভারী ধাতু (লেড, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক) Alters Soil pH, Destroys Micro-Structure & Blocks Air Porosity ২. বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয় মাটির অম্লত্ব বৃদ্ধি, কেঁচো ও উপকারী জীবাণু বিনাশ, এবং বিষাক্ত লিচেট 📉 Loss of Organic Fertility মাটির উর্বরতা ও হিউমাস হ্রাস 🪱 Biota & Earthworm Death কেঁচো (কৃষকের বন্ধু) ও রাইজোবিয়ামের মৃত্যু ☠️ 💧 Black Toxic Leachate বিষাক্ত লিচেট চুইয়ে ভূগর্ভস্থ জলে প্রবেশ Accelerates Soil Acidification, Salinization & Irreversible Desertification ৩. খাদ্যশৃঙ্খলে বিষক্রিয়া মাটি থেকে শস্যে বিষ শোষণ এবং মানবদেহে রোগব্যাধি ১. মাটি থেকে শিকড়ে বিষ শোষণ ২. ধান, গম ও শাকসবজিতে বিষ জমা ৩. মানুষের শরীরে কিডনি ও স্নায়ুরোগ Cadmium (Itai-Itai) • Lead (Nervous Damage) • Arsenic (Carcinogenic) ৪. মাটির পুনরুদ্ধার ও 4R নীতি ভার্মিকম্পোস্ট, ফাইটোরিমিডিয়েশন ও বৈজ্ঞানিক মৃত্তিকা সংরক্ষণ ♻️ 4R নীতি: Refuse, Reduce, Reuse, Recycle 🪱 ভার্মিকম্পোস্ট (কেঁচো সার) ও জৈব কৃষি 🌻 ফাইটোরিমিডিয়েশন (উদ্ভিদ দ্বারা ধাতু শোষণ) Terrace Farming • Contour Ploughing • Shelter Belts Green Manure (Dhaincha) & Bio-Pesticides (Neem Extract)

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
কেঁচোকে কেন "কৃষকের অকৃত্রিম বন্ধু" এবং "প্রকৃতির লাঙল" বলা হয়? মাটি দূষণে এদের কী ক্ষতি হয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: কেঁচো মাটির ভেতর অবিরাম সুড়ঙ্গ তৈরি করে চলাফেরা করে মাটিকে নরম ও আলগা করে, যার ফলে মাটির গভীরে বাতাস ও জল সহজেই চলাচল করতে পারে। এছাড়া কেঁচো জৈব বর্জ্য খেয়ে মল হিসেবে যে কাস্ট ত্যাগ করে, তা পুষ্টিকর হিউমাসে সমৃদ্ধ। রাসায়নিক কীটনাশক ও এসিডের বিষাক্ততায় কেঁচোর সংবেদনশীল ত্বক পুড়ে গিয়ে তারা গণহারে মারা যায়, ফলে মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা ধ্বংস হয়।
2
লিচেট (Leachate) কী এবং এটি কীভাবে গ্রামাঞ্চলের পানীয় জলকে বিষাক্ত করে তোলে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: শহরের খোলা আবর্জনার ভাগাড়ে বৃষ্টির জল জমলে তা পচা আবর্জনা, এসিড ও কারখানার বিষাক্ত ভারী ধাতুর সাথে বিক্রিয়া করে যে কালো দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত তরল তৈরি করে, তাকে লিচেট বলে। এই লিচেট মাটির নিচের স্তর দিয়ে চুইয়ে ভূগর্ভস্থ পানীয় জলের স্তরে (Aquifer) মিশে যায়, যার ফলে আশেপাশের সমস্ত গভীর ও অগভীর নলকূপের জল মারাত্মকভাবে বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
3
ফাইটোরিমিডিয়েশন (Phytoremediation) কাকে বলে? দুটি উদাহরণ দাও।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: যে জৈব প্রযুক্তির সাহায্যে কিছু বিশেষ উদ্ভিদের মূল দ্বারা মাটি থেকে বিষাক্ত ভারী ধাতু ও ক্ষতিকারক রাসায়নিক শুষে নিয়ে মাটিকে দূষণমুক্ত ও বিশুদ্ধ করা হয়, তাকে ফাইটোরিমিডিয়েশন বলে। উদাহরণ: ১) সূর্যমুখী গাছ মাটি থেকে ক্ষতিকারক সীসা ও আর্সেনিক শুষে নেয়; ২) ভারতীয় সরিষা গাছ মাটি থেকে বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম ও নিকেল নিষ্কাশন করে।
4
কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় "৪R" (4Rs) নীতির প্রতিটি ধাপ সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ৪R নীতির চারটি ধাপ হলো:
১) Refuse (প্রত্যাখ্যান): ক্ষতিকারক পরিবেশবিরোধী জিনিস (যেমন—একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ) সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করা।
২) Reduce (হ্রাস): বর্জ্যের পরিমাণ ও বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে আনা।
৩) Reuse (পুনর্ব্যবহার): ফেলে না দিয়ে কোনো জিনিসকে বারবার ব্যবহার করা (যেমন কাচের বয়াম)।
৪) Recycle (রিসাইক্লিং): বাতিল প্লাস্টিক, লোহা বা কাগজ কারখানায় প্রক্রিয়াকরণ করে নতুন দরকারি জিনিস তৈরি করা।
5
মাটিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ফসলের ক্ষেত্রে কী ধরনের ক্ষতিকর বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: অতিরিক্ত সার ব্যবহারে মাটির স্বাভাবিক পিএইচ ($pH$) মারাত্মকভাবে কমে গিয়ে মাটি তীব্র অম্লীয় হয়ে ওঠে। এর ফলে মাটিতে বিষাক্ত অ্যালুমিনিয়াম আয়ন উন্মুক্ত হয়ে শিকড়কে নষ্ট করে দেয়। উপরন্তু উপকারী নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটিরিয়া ধ্বংস হয়, মাটির জৈব উপাদান কমে জমি পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায় এবং শস্যের ফলন সাময়িক বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ীভাবে বন্ধ্যা হয়ে যায়।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।