উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল বা কোনো প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভূমির স্বাভাবিক ঢাল অনুসারে মাধ্যাকর্ষণের টানে নির্দিষ্ট খাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কোনো সাগর, মহাসাগর বা হ্রদে পতিত হওয়া স্বাভাবিক জলস্রোতকে নদী (River) বলা হয়। নদী সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক পরিভাষাগুলি নিচে আলোচিত হলো।
উৎস ও মোহনা (Source & Mouth)
- উৎস (Source): যে স্থান থেকে নদীর জন্ম হয়, তাকে নদীর উৎস বলে। যেমন—উত্তরাখণ্ডের গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ গুহা হলো ভারতের প্রধান নদী গঙ্গার উৎস। নদী সাধারণত উঁচু পাহাড়ের বরফগলা জল, প্রস্রবণ বা বৃষ্টিবহুল হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়।
- মোহনা (Mouth): নদী তার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে যেখানে কোনো সাগর, মহাসাগর, উপসাগর বা হ্রদে গিয়ে মেশে, তাকে নদীর মোহনা বলে। যেমন—বঙ্গোপসাগরে গঙ্গা নদীর মোহনা অবস্থিত।
উপনদী ও শাখানদী (Tributaries & Distributaries)
- উপনদী (Tributary): যে সমস্ত ছোট ছোট নদী অন্য কোনো উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে মূল নদীতে এসে মিলিত হয় এবং মূল নদীর জলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, তাদের উপনদী বলে। যেমন—যমুনা, ঘর্ঘরা, কোশী ও সোন হলো গঙ্গার প্রধান উপনদী।
- শাখানদী (Distributary): মোহনার কাছাকাছি সমভূমিতে মূল নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হলে বা নদীর জল বহন ক্ষমতা হ্রাস পেলে মূল নদী থেকে যে শাখাগুলি বিভক্ত হয়ে ভিন্ন পথে সাগরে গিয়ে পড়ে, তাদের শাখানদী বলে। যেমন—পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের কাছে গঙ্গা বিভক্ত হয়ে ভাগীরথী-হুগলী এবং বাংলাদেশে পদ্মা নামে দুটি প্রধান শাখানদীতে পরিণত হয়েছে।
জলবিভাজিকা (Water Divide / Watershed)
যে উচ্চ শৈলশিরা বা পর্বতমালা পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ভিন্ন নদী অববাহিকাকে পৃথক করে রাখে, তাকে জলবিভাজিকা (Water Divide) বলা হয়। জলবিভাজিকার ওপর যে বৃষ্টিপাত হয়, তার জল দুই বিপরীত ঢালে গড়িয়ে দুটি ভিন্ন নদী ব্যবস্থার সৃষ্টি করে।
উদাহরণ: ভারতের বিন্ধ্য ও সাতপুরা পর্বতমালা উত্তর ভারতের গঙ্গা নদী অববাহিকা এবং দক্ষিণ ভারতের নর্মদা ও তাপ্তি নদী অববাহিকাকে পৃথককারী একটি সুবিশাল প্রাকৃতিক জলবিভাজিকা। বৈশ্বিক স্তরে মধ্য এশিয়ার পর্বতগ্রন্থিগুলি এক বিশাল জলবিভাজিকা।
নদী অববাহিকা ও ধারণ অববাহিকা (Drainage Basin & Catchment Area)
- নদী অববাহিকা (River Basin): একটি মূল নদী এবং তার সমস্ত উপনদী ও শাখানদী সম্মিলিতভাবে যে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং সেই অঞ্চলের জল নিষ্কাশন করে, তাকে নদী অববাহিকা বলে। আমাজন নদীর অববাহিকা পৃথিবীর বৃহত্তম (প্রায় ৭০ লক্ষ বর্গকিমি)।
- ধারণ অববাহিকা (Catchment Area): পার্বত্য অঞ্চলে যে উচ্চভূমির ওপর বৃষ্টি ও বরফগলা জল বিভিন্ন জলধারার মাধ্যমে একত্রিত হয়ে মূল নদীতে এসে মেশে, সেই পার্বত্য জলসংগ্রহ ক্ষেত্রকে ধারণ অববাহিকা বলে।
নদী উপত্যকা, নদীসঙ্গম ও দোয়াব (Valley, Confluence & Doab)
নদীর দুপাশের পাড় বা তটের মধ্যবর্তী যে দীর্ঘ নিম্নভূমির মধ্য দিয়ে জল প্রবাহিত হয়, তাকে নদী উপত্যকা (River Valley) বলে। দুটি নদীর মিলনস্থলকে নদীসঙ্গম (Confluence) বলে (যেমন প্রয়াগরাজে গঙ্গা ও যমুনার সঙ্গম)। আর দুটি পরস্পর মিলিত নদীর মধ্যবর্তী অত্যন্ত উর্বর স্থলভাগকে দোয়াব (Doab) বলা হয় (ফার্সি শব্দ 'দো' অর্থ দুই এবং 'আব' অর্থ জল বা নদী; যেমন গঙ্গা-যমুনা দোয়াব)।