Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 7 • Geography & Environment (আমাদের পৃথিবী) • অধ্যায় 5
আনুমানিক সময়: ৪৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

নদী

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) সপ্তম শ্রেণির "আমাদের পৃথিবী" পাঠ্যক্রম অনুযায়ী নদীর জন্ম, গতিপথ, তিনটি প্রবাহ বা গতির (উচ্চগতি, মধ্যগতি ও নিম্নগতি) ক্ষয়, বহন ও সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ, নদীর ষষ্ঠঘাতের সূত্র, মিয়েন্ডার ও অশ্বখুরাকৃতি হ্রদের বিজ্ঞান এবং মানবসভ্যতায় নদীর অবদান ও নদীদূষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

কখনও কি ভেবে দেখেছেন?

তোমরা কি জানো, নদীর স্রোতের গতিবেগ যদি কোনো কারণে মাত্র দ্বিগুণ বেড়ে যায়, তবে তার পাথর-বালি বয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ২ গুণ বা ৪ গুণ নয়, এক লাফে ৬৪ গুণ ($2^6$) বৃদ্ধি পায়? একেই বলে নদীর "ষষ্ঠঘাতের সূত্র"! নদীর এই অবিশ্বাস্য শক্তি ও সৃষ্টির রহস্য উন্মোচিত হবে এই অধ্যায়ে।

অধ্যায়টির গুরুত্ব

নদী হলো প্রকৃতির চিরন্তন ভাস্কর। উঁচু পর্বতকে কেটে সুগভীর গিরিখাত ও ক্যানিয়ন তৈরি করা থেকে শুরু করে সমভূমিতে আঁকাবাঁকা মিয়েন্ডার ও সমুদ্রের মোহনায় উর্বর বদ্বীপ সৃষ্টি করা—নদীর প্রতিটি প্রবাহ অনন্য। পৃথিবীর প্রাচীন মানবসভ্যতাগুলি কেন নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল এবং বর্তমান নদীদূষণ কীভাবে আমাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করছে, তা জানা অত্যন্ত জরুরি।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • জলচক্রের মূল পর্যায়সমূহ (বাষ্পীভবন, ঘনীভবন ও বৃষ্টিপাত) সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা।
  • ভূমির স্বাভাবিক ঢাল এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে জলের নিম্নমুখী প্রবাহের নিয়ম।
  • শিলার আবহবিকার, ক্ষয়ীভবন ও পরিবহন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধারণা।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • নদীর উৎস, মোহনা, জলবিভাজিকা, নদী অববাহিকা ও দোয়াবের সঠিক সংজ্ঞা দেওয়া।
  • উচ্চগতি, মধ্যগতি ও নিম্নগতির প্রধান কাজ এবং গঠিত ভূমিরূপের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা।
  • হপকিন্সের ষষ্ঠঘাতের সূত্র প্রয়োগ করে বহন ক্ষমতার নাটকীয় বৃদ্ধি গণনা করা।
  • সর্পিল নদীবাঁক (মিয়েন্ডার) ও অশ্বখুরাকৃতি হ্রদের সৃষ্টিপ্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করা।
  • বদ্বীপ গঠনের অনুকূল ভৌগোলিক শর্তাবলি এবং নদীদূষণ রোধের উপায় চিহ্নিত করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. নদীর জন্ম, প্রবাহ ও মৌলিক পরিভাষ...
2 ২. উচ্চগতি বা পার্বত্য প্রবাহ: ক্ষয...
3 ৩. মধ্যগতি বা সমভূমি প্রবাহ: নদীবাঁ...
4 ৪. নিম্নগতি বা বদ্বীপ প্রবাহ: সঞ্চয...
5 ৫. মানবসভ্যতায় নদীর ভূমিকা: আশীর্ব...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. নদীর জন্ম, প্রবাহ ও মৌলিক পরিভাষা

উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল বা কোনো প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভূমির স্বাভাবিক ঢাল অনুসারে মাধ্যাকর্ষণের টানে নির্দিষ্ট খাতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কোনো সাগর, মহাসাগর বা হ্রদে পতিত হওয়া স্বাভাবিক জলস্রোতকে নদী (River) বলা হয়। নদী সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক পরিভাষাগুলি নিচে আলোচিত হলো।

১

উৎস ও মোহনা (Source & Mouth)

  • উৎস (Source): যে স্থান থেকে নদীর জন্ম হয়, তাকে নদীর উৎস বলে। যেমন—উত্তরাখণ্ডের গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ গুহা হলো ভারতের প্রধান নদী গঙ্গার উৎস। নদী সাধারণত উঁচু পাহাড়ের বরফগলা জল, প্রস্রবণ বা বৃষ্টিবহুল হ্রদ থেকে উৎপন্ন হয়।
  • মোহনা (Mouth): নদী তার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে যেখানে কোনো সাগর, মহাসাগর, উপসাগর বা হ্রদে গিয়ে মেশে, তাকে নদীর মোহনা বলে। যেমন—বঙ্গোপসাগরে গঙ্গা নদীর মোহনা অবস্থিত।
২

উপনদী ও শাখানদী (Tributaries & Distributaries)

  • উপনদী (Tributary): যে সমস্ত ছোট ছোট নদী অন্য কোনো উচ্চভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে মূল নদীতে এসে মিলিত হয় এবং মূল নদীর জলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, তাদের উপনদী বলে। যেমন—যমুনা, ঘর্ঘরা, কোশী ও সোন হলো গঙ্গার প্রধান উপনদী।
  • শাখানদী (Distributary): মোহনার কাছাকাছি সমভূমিতে মূল নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হলে বা নদীর জল বহন ক্ষমতা হ্রাস পেলে মূল নদী থেকে যে শাখাগুলি বিভক্ত হয়ে ভিন্ন পথে সাগরে গিয়ে পড়ে, তাদের শাখানদী বলে। যেমন—পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের কাছে গঙ্গা বিভক্ত হয়ে ভাগীরথী-হুগলী এবং বাংলাদেশে পদ্মা নামে দুটি প্রধান শাখানদীতে পরিণত হয়েছে।
৩

জলবিভাজিকা (Water Divide / Watershed)

যে উচ্চ শৈলশিরা বা পর্বতমালা পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ভিন্ন নদী অববাহিকাকে পৃথক করে রাখে, তাকে জলবিভাজিকা (Water Divide) বলা হয়। জলবিভাজিকার ওপর যে বৃষ্টিপাত হয়, তার জল দুই বিপরীত ঢালে গড়িয়ে দুটি ভিন্ন নদী ব্যবস্থার সৃষ্টি করে।

উদাহরণ: ভারতের বিন্ধ্য ও সাতপুরা পর্বতমালা উত্তর ভারতের গঙ্গা নদী অববাহিকা এবং দক্ষিণ ভারতের নর্মদা ও তাপ্তি নদী অববাহিকাকে পৃথককারী একটি সুবিশাল প্রাকৃতিক জলবিভাজিকা। বৈশ্বিক স্তরে মধ্য এশিয়ার পর্বতগ্রন্থিগুলি এক বিশাল জলবিভাজিকা।

৪

নদী অববাহিকা ও ধারণ অববাহিকা (Drainage Basin & Catchment Area)

  • নদী অববাহিকা (River Basin): একটি মূল নদী এবং তার সমস্ত উপনদী ও শাখানদী সম্মিলিতভাবে যে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং সেই অঞ্চলের জল নিষ্কাশন করে, তাকে নদী অববাহিকা বলে। আমাজন নদীর অববাহিকা পৃথিবীর বৃহত্তম (প্রায় ৭০ লক্ষ বর্গকিমি)।
  • ধারণ অববাহিকা (Catchment Area): পার্বত্য অঞ্চলে যে উচ্চভূমির ওপর বৃষ্টি ও বরফগলা জল বিভিন্ন জলধারার মাধ্যমে একত্রিত হয়ে মূল নদীতে এসে মেশে, সেই পার্বত্য জলসংগ্রহ ক্ষেত্রকে ধারণ অববাহিকা বলে।
৫

নদী উপত্যকা, নদীসঙ্গম ও দোয়াব (Valley, Confluence & Doab)

নদীর দুপাশের পাড় বা তটের মধ্যবর্তী যে দীর্ঘ নিম্নভূমির মধ্য দিয়ে জল প্রবাহিত হয়, তাকে নদী উপত্যকা (River Valley) বলে। দুটি নদীর মিলনস্থলকে নদীসঙ্গম (Confluence) বলে (যেমন প্রয়াগরাজে গঙ্গা ও যমুনার সঙ্গম)। আর দুটি পরস্পর মিলিত নদীর মধ্যবর্তী অত্যন্ত উর্বর স্থলভাগকে দোয়াব (Doab) বলা হয় (ফার্সি শব্দ 'দো' অর্থ দুই এবং 'আব' অর্থ জল বা নদী; যেমন গঙ্গা-যমুনা দোয়াব)।

২. উচ্চগতি বা পার্বত্য প্রবাহ: ক্ষয়কাজ ও গঠিত ভূমিরূপ

উৎস থেকে পর্বতের পাদদেশ পর্যন্ত নদীর গতিপথকে উচ্চগতি বা পার্বত্য প্রবাহ (Upper / Mountain Course) বলা হয়। এই অংশে ভূমির ঢাল অত্যন্ত খাড়া থাকে, ফলে নদীর জলের গতিবেগ ও স্রোত থাকে প্রচণ্ড। এখানে নদীর প্রধান কাজ হলো ক্ষয়সাধন (Erosion) এবং ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাখণ্ড দ্রুত নিচে বহন (Transportation) করা।

১

নদীর ক্ষয়কার্যের ৪টি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া

  • জলপ্রবাহ ক্ষয় (Hydraulic Action): প্রবল বেগে ধাবমান জলের ধাক্কায় নদীর তলদেশ ও তীরের আলগা পাথর ও শিলাস্তর ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হওয়া।
  • অবঘর্ষ ক্ষয় (Abrasion / Corrasion): নদীর স্রোতের সাথে বাহিত নুড়ি, পাথর ও বালুকণা নদীর তলদেশ ও দুই পাড়ে হাতুড়ি বা বাটালের মতো অবিরাম আঘাত করে গর্ত ও খাত তৈরি করে।
  • ঘর্ষণ ক্ষয় (Attrition): নদীগর্ভে বাহিত বড় বড় পাথরখণ্ড পরস্পরের সাথে ধাক্কা লেগে ভেঙে গিয়ে ক্রমশ ছোট, মসৃণ ও গোল নুড়িতে পরিণত হয়।
  • দ্রবণ ক্ষয় (Corrosion / Solution): নদীর জল চুনাপাথর, ডলোমাইট বা লবণজাতীয় শিলাকে দ্রবীভূত করে রাসায়নিকভাবে ক্ষয় করে নিয়ে যায়।
২

'V' ও 'I' আকৃতির উপত্যকা এবং গিরিখাত (Gorge)

পার্বত্য প্রবাহে নদীর জলের তীব্র বেগ প্রধানত নদীর তলদেশে ক্রিয়াশীল থাকে। পার্শ্বক্ষয়ের তুলনায় নিম্নক্ষয় বহুগুণ বেশি হওয়ায় নদী উপত্যকা ইংরেজি 'V' অক্ষরের মতো গভীর ও সংকীর্ণ রূপ ধারণ করে।

বৃষ্টিবহুল পার্বত্য অঞ্চলে বা অত্যন্ত কঠিন শিলাস্তরের ওপর দিয়ে নদী প্রবাহিত হলে পার্শ্বক্ষয় প্রায় হয় না বললেই চলে, কিন্তু প্রবল নিম্নক্ষয়ের কারণে উপত্যকাটি খাড়া দেওয়ালের মতো গভীর খাদে পরিণত হয়। একে ইংরেজি 'I' অক্ষরের মতো গিরিখাত (Gorge) বলে। নেপালের কালী গণ্ডকী নদীর গিরিখাত এবং তিব্বতের সাংপো গিরিখাত বিশ্বের অন্যতম গভীর গিরিখাত।

৩

ক্যানিয়ন (Canyon): শুষ্ক অঞ্চলের বিস্ময়

বৃষ্টিহীন বা শুষ্ক মরুপ্রায় মালভূমি অঞ্চলের ওপর দিয়ে কোনো নদী প্রবাহিত হলে সেখানে বৃষ্টির অভাবে উপত্যকার দুই পাশের পাথর ক্ষয় হয় না (পার্শ্বক্ষয় শূন্য)। ফলে নদী কেবল নিচের দিকেই গভীর খাত কেটে এগিয়ে যায়। এই অত্যন্ত গভীর, সংকীর্ণ, খাড়া পার্শ্বঢালযুক্ত ও দীর্ঘ গিরিখাতকে ক্যানিয়ন (Canyon) বলে।

বিশ্ববিখ্যাত উদাহরণ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো নদী দ্বারা শুষ্ক কলোরাডো মালভূমি কেটে তৈরি হওয়া গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন (Grand Canyon) বিশ্বের বৃহত্তম ও গভীরতম ক্যানিয়ন (দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৪৬ কিমি এবং গভীরতা কোথাও কোথাও ১.৮ কিমির বেশি)।

৪

জলপ্রপাত, খরস্রোত ও মন্থকূপ (Waterfall, Rapid & Potholes)

  • জলপ্রপাত (Waterfall): নদীর গতিপথে আড়াআড়িভাবে কঠিন ও কোমল শিলা অবস্থান করলে কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, কিন্তু কঠিন শিলা অনড় থাকে। ফলে নদী খাড়া পাহাড়ের খাঁদ থেকে সটান নিচে গভীর খাদে আছড়ে পড়ে। ভেনেজুয়েলার অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাত (৯৭৯ মিটার) বিশ্বের সর্বোচ্চ জলপ্রপাত। ভারতে কর্ণাটকের শরাবতী নদীর যোগ জলপ্রপাত (বা গেরসোপ্পা) বিখ্যাত।
  • প্রপাতকূপ ও মন্থকূপ (Plunge Pool & Potholes): জলপ্রপাতের তলদেশে জলের প্রচণ্ড আঘাতে যে সুবিশাল গর্ত সৃষ্টি হয়, তাকে প্রপাতকূপ বলে। আর অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় নদীগর্ভে নুড়ি ঘূর্ণির মতো ঘুরে ঘুরে ছোট-বড় বৃত্তাকার হাঁড়ির মতো যে মসৃণ গর্ত তৈরি করে, তাদের মন্থকূপ (Potholes) বলে।
  • খরস্রোত (Rapids): কঠিন ও নরম শিলা পর্যায়ক্রমে অবস্থান করলে নদীর জল ধাপে ধাপে লাফিয়ে প্রবাহিত হয়, একে খরস্রোত বলে।
৫

নদীর বহন ক্ষমতা ও ষষ্ঠঘাতের সূত্র (Hopkins' Sixth Power Law)

নদীর বহন ক্ষমতা তার গতিবেগের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। বিজ্ঞানী হপকিন্স প্রমাণ করেন যে, নদীর গতিবেগ বৃদ্ধি পেলে তার বহন ক্ষমতা গতিবেগের ষষ্ঠ ঘাতের সমানুপাতিক হারে ($C \propto V^6$) বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, বর্ষাকালে ঢাল বা জলের পরিমাণ বেড়ে নদীর বেগ যদি দ্বিগুণ ($2$) হয়, তবে তার শিলাখণ্ড বহনের শক্তি $2^6 = 64$ গুণ বৃদ্ধি পাবে! বেগ তিনগুণ হলে শক্তি $3^6 = 729$ গুণ বাড়ে!

৩. মধ্যগতি বা সমভূমি প্রবাহ: নদীবাঁক ও অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ

পর্বতের পাদদেশ থেকে সমভূমির ওপর দিয়ে বদ্বীপের সূচনা পর্যন্ত অংশকে নদীর মধ্যগতি বা সমভূমি প্রবাহ (Middle / Valley Course) বলে। এখানে ভূমির ঢাল কমে যায়, নদীর জলস্ফীতি ঘটে এবং উপত্যকাটি চওড়া হয়ে ইংরেজি 'U' অক্ষরের আকার নেয়। এই গতিতে নিম্নক্ষয় কমে গিয়ে পার্শ্বক্ষয় (Lateral Erosion) ও বহন-সঞ্চয় কাজ (Transportation & Deposition) প্রধান হয়ে ওঠে।

১

পলিব্যজনী ও পলিকোন (Alluvial Fan & Cone)

নদী যখন পাহাড়ি ঢাল ছেড়ে হঠাৎ সমভূমিতে এসে পৌঁছায়, তখন ভূমির ঢাল হঠাৎ কমে যাওয়ায় নদীর গতিবেগ তাৎক্ষণিকভাবে হ্রাস পায়। ফলে নদী আর বড় বড় শিলাখণ্ড ও পাথর বহন করতে পারে না। পর্বতের পাদদেশে নদী বাহিত নুড়ি, পাথর ও বালি হাতপাখার মতো অর্ধ-বৃত্তাকার বা শঙ্কু আকারে সঞ্চিত হয়ে যে ভূমিরূপ গঠন করে, তাকে পলিব্যজনী (Alluvial Fan) বা পলিকোন (Alluvial Cone) বলে। হিমালয়ের পাদদেশে তরাই অঞ্চলে বহু পলিব্যজনী দেখা যায়।

২

সর্পিল নদীবাঁক বা মিয়েন্ডার (River Meanders)

সমভূমিতে নদীর বেগ অত্যন্ত কমে যায় এবং সামান্য বাধা পেলেই নদী পাশ কাটিয়ে সর্পিল গতিতে এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়। নদীর এই আঁকাবাঁকা গতিপথকে মিয়েন্ডার বা নদীবাঁক (Meander) বলে। তুরস্কের অত্যন্ত সর্পিল 'মিয়েনড্রেস' (Menderes) নদীর নামানুসারে বিশ্বজুড়ে নদীবাঁককে মিয়েন্ডার বলা হয়।

  • অবতল পাড় ও ক্ষয় (Concave Bank): নদীবাঁকের বাইরের বাঁকা তটে জলের স্রোত সরাসরি সজোরে ধাক্কা মারে। ফলে সেখানে তীব্র ক্ষয় হয়ে খাড়া পাড় সৃষ্টি হয়।
  • উত্তল পাড় ও সঞ্চয় (Convex Bank): নদীবাঁকের ভেতরের অংশে জলের বেগ কম থাকায় পলি, বালি জমা হয়ে মৃদু ঢালযুক্ত চড়া বা পয়েন্ট বার (Point Bar) গড়ে তোলে।
৩

অশ্বখুরাকৃতি হ্রদের উৎপত্তি (Oxbow Lake Formation)

নদীবাঁকের বাইরের দিকে ক্ষয় এবং ভেতরের দিকে সঞ্চয় ক্রমাগত চলতে থাকলে বাঁকের দুপাশের ফাঁক বা গ্রীবা (Neck) ক্রমশ সংকীর্ণ হতে থাকে। একসময় বর্ষার প্রবল বন্যার তোড়ে নদী অতিরিক্ত জল নিয়ে সোজা পথে বাঁকের গ্রীবা কেটে প্রবাহিত হতে শুরু করে।

এর ফলে পুরোনো ঘোড়ার নালের মতো বাঁকা অংশটি মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন অংশের দুই মুখে পলি জমে বন্ধ হয়ে গিয়ে যে অশ্বের ক্ষুরের মতো বাঁকানো হ্রদ তৈরি হয়, তাকে অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ (Oxbow Lake) বলে। পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী-হুগলী নদীর অববাহিকায় নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলায় (যেমন নবদ্বীপ ও কাটোয়ার কাছে) অসংখ্য অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ দেখা যায়, যা স্থানীয়ভাবে 'বাঁওড়' নামে পরিচিত।

৪

নদীচরে বালুকা সঞ্চয় ও নদীদ্বীপ

মধ্যগতিতে নদীগর্ভে বালি ও পলি জমে জমে নদীচড়া বা নদীদ্বীপ সৃষ্টি হয়। যখন নদীর গতিবেগ পলি বহনে অক্ষম হয়, তখন নদী নিজের খাতের মধ্যেই শাখাপ্রশাখায় বিনুনি করা চুলের মতো বিভক্ত হয়ে যায়, যাকে বিনুনি নদী (Braided River) বলে। আসামের ব্রহ্মপুত্র নদে মাজুলী দ্বীপ এবং পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় বহু নদীচর এর আদর্শ উদাহরণ।

৫

মধ্যগতির সারসংক্ষেপ সংকেত

মনে রাখবে: উচ্চগতিতে নদী কেবল কাটে (ক্ষয়), নিম্নগতিতে কেবল ভরাট করে (সঞ্চয়), কিন্তু মধ্যগতি হলো নদীর সেই ভারসাম্যপূর্ণ পর্যায় যেখানে নদী একই সাথে ক্ষয়, বহন ও সঞ্চয় তিনটি কাজই সমান্তরালে সম্পাদন করে।

৪. নিম্নগতি বা বদ্বীপ প্রবাহ: সঞ্চয়কাজ ও মোহনা

সমভূমি প্রবাহের শেষ প্রান্ত থেকে মোহনা পর্যন্ত অংশকে নদীর নিম্নগতি বা বদ্বীপ প্রবাহ (Lower / Plain / Delta Course) বলে। এখানে ভূমির ঢাল প্রতি কিলোমিটারে মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার, নদীর গতিবেগ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে, অথচ নদীর দুই পাড় উপচে ওঠা বিপুল জল ও পলির বোঝা থাকে। তাই নিম্নগতিতে নদীর একমাত্র প্রধান কাজ হলো সঞ্চয়সাধন (Deposition)।

১

প্লাবনভূমি (Floodplain) ও স্বাভাবিক বাঁধ (Natural Levee)

  • প্লাবনভূমি (Floodplain): বর্ষাকালে নদীর অগভীর খাত অতিরিক্ত জল ধারণ করতে পারে না। ফলে দুই কূল ছাপিয়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়। বন্যার জল যখন কয়েক সপ্তাহ পর ধীরে ধীরে সাগরে নেমে যায়, তখন দূরদূরান্তের নিম্নাঞ্চলে উর্বর সূক্ষ্ম পলিমাটির পুরু স্তর জমা পড়ে। প্রতি বছর বন্যার সঞ্চয়ে তৈরি হওয়া এই বিস্তীর্ণ উর্বর সমতল ভূমিকে প্লাবনভূমি বলে।
  • স্বাভাবিক বাঁধ (Natural Levee): বন্যার জল যখন তীর উপচে বাইরে ছড়ায়, তখন ভারী ও মোটা বালুকণা নদীর একদম পাড়ের ওপরেই আগে থিতিয়ে পড়ে। ফলে নদীর দুই পাড় প্রাকৃতিক প্রাচীরের মতো স্বাভাবিকভাবেই উঁচু হয়ে বাঁধের রূপ নেয়। একে স্বাভাবিক বাঁধ বলে।
২

বদ্বীপের গঠন ও বিজ্ঞান (Delta Formation)

নদীর মোহনায় যখন নদীর মিষ্টি জল সমুদ্রের নোনা জলের সাথে মেশে, তখন সমুদ্রের লবণাক্ত জলের সংস্পর্শে নদীর জলের কাদামাটি ও পলির সূক্ষ্ম কণাগুলি জমাট বাঁধে (কোলয়েড তঞ্চন বা Coagulation)। স্রোতের বেগ না থাকায় মোহনার অগভীর সাগরে এই পলি জমতে জমতে চর তৈরি করে। নদী তখন একাধিক শাখানদীতে বিভক্ত হয়ে এই চরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়।

ফলে মোহনায় গ্রিক বর্ণমালার চতুর্থ অক্ষর ডেল্টা ($\Delta$) কিংবা বাংলা বর্ণমালার মাত্রা ছাড়া 'ব' অক্ষরের মতো যে ত্রিকোণাকার পলল ভূখণ্ড গড়ে ওঠে, তাকে বদ্বীপ (Delta) বলা হয়।

৩

বদ্বীপ গঠনের অনুকূল ভৌগোলিক শর্তাবলি

সব নদীর মোহনায় কিন্তু বদ্বীপ গড়ে ওঠে না! বদ্বীপ গঠনের জন্য প্রধান শর্তগুলি হলো:

  • নদীর গতিপথ দীর্ঘ হতে হবে এবং মধ্য ও উচ্চগতিতে প্রচুর পলি বহন করে আনতে হবে।
  • মোহনায় নদীর গতিবেগ অত্যন্ত ধীর ও মৃদু হতে হবে।
  • মোহনার সমুদ্র অগভীর ও শান্ত হতে হবে, যাতে জোয়ার-ভাটা বা সামুদ্রিক তীব্র স্রোত পলি ভাসিয়ে দূরে নিয়ে না যেতে পারে।
  • মোহনার বিপরীত দিক থেকে কোনো জোরালো বাতাস বা সমুদ্রস্রোত থাকা চলবে না।
৪

বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ: গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ (সুন্দরবন)

গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর যৌথ পলি সঞ্চয়ের ফলে ভারত ও বাংলাদেশ জুড়ে গড়ে উঠেছে বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ—গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ। এর দক্ষিণভাগের লবণাক্ত জোয়ার-ভাটা যুক্ত ম্যানগ্রোভ বনভূমি অঞ্চলকে সুন্দরবন বলা হয়। এই বদ্বীপের আয়তন প্রায় ১ লক্ষ বর্গকিলোমিটার।

৫

খাঁড়ি (Estuary): যেখানে বদ্বীপ গড়ে ওঠে না

যেসব নদীর মোহনা অত্যন্ত গভীর এবং যেখানে প্রবল জোয়ার-ভাটা ও তীব্র সামুদ্রিক স্রোত ক্রিয়াশীল থাকে, সেখানে নদী বাহিত পলি মোহনায় জমতে পারে না; জোয়ারের টানে সমুদ্রের গভীরে ভেসে যায়। নদীর মোহনাটি তখন একটি উন্মুক্ত, চওড়া ফানেল আকৃতির জলভাগে পরিণত হয়। একে খাঁড়ি (Estuary) বলা হয়।

উদাহরণ: ভারতের পশ্চিমবাহিনী নদী নর্মদা ও তাপ্তি খাড়া ঢালে প্রবাহিত হওয়ায় এবং আরব সাগরের মোহনায় তীব্র জোয়ার থাকায় এদের মোহনায় কোনো বদ্বীপ গড়ে ওঠেনি, বরং সুগভীর খাঁড়ি তৈরি হয়েছে। ইংল্যান্ডের টেমস নদীর মোহনাও একটি সুবিখ্যাত খাঁড়ি।

৫. মানবসভ্যতায় নদীর ভূমিকা: আশীর্বাদ, বিপর্যয় ও সংরক্ষণ

নদী কেবল একটি প্রাকৃতিক জলধারা নয়, মানবজাতির সামগ্রিক বিকাশ, সমৃদ্ধি ও সভ্যতার বিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। আবার মানুষের অবিবেচকের মতো কর্মকাণ্ডের ফলে আজ সেই নদীই দূষণ ও বন্যার তীব্র সংকটে জর্জরিত।

১

নদীমাতৃক মানবসভ্যতা (Cradles of Civilization)

পৃথিবীর সব প্রাচীন মানবসভ্যতা নদীর তীরেই আত্মপ্রকাশ করেছিল:

  • সিন্ধু নদের অববাহিকায়—হরপ্পা ও সিন্ধু সভ্যতা।
  • নীল নদের উর্বর তীরে—মিশরীয় সভ্যতা (হেরোডোটাস বলেছিলেন, "মিশর হলো নীল নদের দান")।
  • টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী দোয়াবে—মেসোপটেমিয়া সভ্যতা।
  • হোয়াংহো ও ইয়াংসিকিয়াং নদীর তীরে—চিনা সভ্যতা।

নদীর মিষ্টি পানীয় জল, পলিমাটির উর্বর জমিতে প্রচুর শস্য উৎপাদন এবং নৌকার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য যাতায়াতই নদী অববাহিকায় মানুষে মানুষে সমাজ গঠনে সাহায্য করেছিল।

২

বহুমুখী নদী পরিকল্পনা ও আধুনিক অর্থনীতি

স্বাধীন ভারতে নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলসেচ খাল খনন, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, মাছ চাষ এবং জলপথ পরিবহনের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে বহুমুখী নদী উপত্যকা পরিকল্পনা (Multipurpose River Valley Projects)। যেমন—দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (DVC), ভাকরা-নাঙ্গাল প্রকল্প এবং হিরাকুঁদ বাঁধ। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এই সুবিশাল নদী বাঁধগুলিকে "আধুনিক ভারতের মন্দির" বলে অভিহিত করেছিলেন।

৩

নদীদূষণ (River Pollution): একটি মারাত্মক পরিবেশগত অভিশাপ

বর্তমানে অতিরিক্ত নগরায়ন ও শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্যে নদীগুলি মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছে। নদীদূষণের প্রধান কারণগুলি হলো:

  • কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক ও ভারী ধাতু মিশ্রিত অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা।
  • শহর ও পৌরসভার অপরিশোধিত পয়ঃপ্রণালীর ময়লা জল, প্লাস্টিক ও আবর্জনা নিকাশি।
  • কৃষিজমিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির জলে ধুয়ে নদীতে মেশা (Eutrophication)।
  • নদীতে মৃতদেহ, পশুপাখি ফেলা এবং প্রতিমা বিসর্জনের রাসায়নিক রঙের বিষক্রিয়া।

এর ফলে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ (DO) মারাত্মক কমে যাচ্ছে এবং বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (BOD) বৃদ্ধি পেয়ে মাছ ও জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে।

৪

নদীর গতিপথের রূপরেখা ও তুলনামূলক ছক

পর্যায়উচ্চগতি (পার্বত্য)মধ্যগতি (সমভূমি)নিম্নগতি (বদ্বীপ)
প্রধান কাজক্ষয় ও বহনবহন ও সঞ্চয়একচেটিয়া সঞ্চয়
উপত্যকার রূপসংকীর্ণ ও গভীর 'V' ও 'I'চওড়া 'U' আকৃতিঅত্যন্ত অগভীর ও বিস্তৃত
গঠিত ভূমিরূপগিরিখাত, ক্যানিয়ন, জলপ্রপাত, মন্থকূপপলিব্যজনী, মিয়েন্ডার, অশ্বখুরাকৃতি হ্রদপ্লাবনভূমি, স্বাভাবিক বাঁধ, বদ্বীপ, খাঁড়ি
জলের বেগসর্বাধিক তীব্র খরস্রোতমাঝারি বা ধীরপ্রায় স্থির ও অতি ধীর
মানব ব্যবহারজলবিদ্যুৎ উৎপাদন, পর্যটনসেচ খাল, কৃষি, মাঝারি শহরউর্বর কৃষিক্ষেত্র, নৌ-পরিবহন, মেগাসিটি
৫

নদী সংরক্ষণ ও আমাদের আশু কর্তব্য

ভারতের গঙ্গা নদীকে বাঁচাতে নমামী গঙ্গে (Namami Gange) এবং জাতীয় নদী সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নদীর দুই তীরে বনসৃজন করে ভূমিক্ষয় রোধ, শিল্পবর্জ্য শোধনাগার (ETP) বাধ্যতামূলক করা, নদীতে প্লাস্টিক ও প্রতিমা বিসর্জন নিষিদ্ধ করা এবং নদীর স্বাভাবিক প্লাবনভূমিকে দখলমুক্ত করাই পারে আমাদের জীবনদায়ী নদীগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে।

গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক পরিভাষা, সূত্র ও পরিমাপক

হপকিন্সের ষষ্ঠঘাতের সূত্র (Sixth Power Law)
বহন ক্ষমতা অনুপাত: C ∝ V⁶ ⇒ বেগ ২ গুণ হলে বহন শক্তি ৬৪ গুণ বাড়ে!
নদীর গতিবেগ (V) বৃদ্ধির সাথে শিলা বহন ক্ষমতার (C) সূচকীয় বৃদ্ধির সূত্র।
গিরিখাত বনাম ক্যানিয়ন রূপতত্ত্ব (Gorge vs Canyon)
খাত রূপ: গিরিখাত = আর্দ্র অঞ্চল + I-খাত | ক্যানিয়ন = শুষ্ক অঞ্চল + স্টেপ-খাত
উচ্চগতিতে পার্শ্বক্ষয়ের অনুপস্থিতি ও তীব্র উল্লম্ব নিম্নক্ষয়ের রূপভেদ।
মিয়েন্ডার ও ক্ষয়-সঞ্চয় ভারসাম্য (Meander Dynamics)
নদীবাঁক বল: অবতল পাড় = তীব্র ক্ষয় | উত্তল পাড় = পলি সঞ্চয় (পয়েন্ট বার)
অপকেন্দ্র বলের কারণে নদীবাঁকের দুই পাড়ে অসম জলের বেগ ও ভূমিরূপ গঠন।
অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ বিচ্ছিন্নকরণ (Oxbow Cutoff)
বিচ্ছিন্নতা: বাঁকের গ্রীবা ক্ষয় + বন্যার সোজা প্রবাহ ⇒ ঘোড়ার নাল সদৃশ হ্রদ
নদী সোজা পথে বইতে শুরু করলে পুরোনো বাঁকটি পলি জমে হ্রদে রূপ নেয়।
বদ্বীপ গঠন ও কোলয়েড তঞ্চন (Delta Coagulation)
রাসায়নিক তঞ্চন: নদীর কাদা পলি + সমুদ্রের লবণাক্ত ক্ষারীয় জল ⇒ জমাট পলি (Δ)
মিষ্টি ও লবণাক্ত জলের মিলনে পলির তঞ্চন ঘটে বদ্বীপের সৃষ্টি হয়।
নদী অববাহিকা ও জলবিভাজিকা জ্যামিতি
জলনিকাশ ব্যবস্থা: মূল নদী + সমস্ত উপনদী-শাখানদী = নিষ্কাশন অববাহিকা
একটি উচ্চ শৈলশিরা দুটি স্বাধীন নদী অববাহিকাকে ভৌগোলিকভাবে পৃথক রাখে।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
গাণিতিক ও ভৌগোলিক প্রয়োগ ১: বর্ষাকালে পাহাড়ি নদীর জলের বেগ স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ গুণ বৃদ্ধি পেলে, নদীর পাথর-নুড়ি বহন করার ক্ষমতা কত গুণ বৃদ্ধি পাবে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
হপকিন্সের ষষ্ঠঘাত সূত্রের প্রয়োগ:
আমরা জানি, নদীর বহন ক্ষমতা ($C$) তার গতিবেগের ($V$) ষষ্ঠ ঘাতের সাথে সরল সমানুপাতিক, অর্থাৎ $C \propto V^6$।
যদি গতিবেগ $V_1 = 1$ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে $V_2 = 3$ হয়, তবে:
বহন ক্ষমতার অনুপাত $= \frac{C_2}{C_1} = \left(\frac{V_2}{V_1}\right)^6 = 3^6 = 3 \times 3 \times 3 \times 3 \times 3 \times 3 = 729$ গুণ!
উত্তর: নদীর গতিবেগ ৩ গুণ বাড়লে তার পাথর বহন করার ক্ষমতা অবিশ্বাস্যভাবে ৭২৯ গুণ বৃদ্ধি পাবে। এই কারণেই বর্ষাকালে পাহাড়ি নদীতে ভয়াবহ বন্যা ও বিশালাকার বোল্ডার ভেসে আসে।
উদাহরণ 2
ভৌগোলিক প্রয়োগ ২: সব নদীর মোহনায় বদ্বীপ গড়ে ওঠে না কেন? ভারতের নর্মদা ও তাপ্তি নদীর মোহনায় বদ্বীপ নেই কেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
বদ্বীপ গঠনের শর্ত ও কারণ বিশ্লেষণ:
১) নদীর গতিপথ ও পলির অভাব: নর্মদা ও তাপ্তি নদী দুটি কঠিন লাভা ও রূপান্তরিত শিলাগঠিত সংকীর্ণ গ্রস্ত উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে এদের ক্ষয়কাজ ও পলি বহনের পরিমাণ গঙ্গা বা ব্রহ্মপুত্রের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
২) তীব্র জোয়ার-ভাটা ও গভীর মোহনা: খাম্বাত উপসাগরে আরব সাগরের জোয়ারের তীব্রতা অত্যন্ত বেশি। মোহনায় যে সামান্য পলি এসে পৌঁছায়, তা জোয়ারের টানে সমুদ্রের গভীরে ভেসে যায়।
৩) উপসংহার: ফলে নর্মদা ও তাপ্তির মোহনায় কোনো ত্রিকোণাকার বদ্বীপ গঠিত না হয়ে ফানেল আকৃতির সুগভীর খাঁড়ি (Estuary) তৈরি হয়েছে।
উদাহরণ 3
ভৌগোলিক প্রয়োগ ৩: অশ্বখুরাকৃতি হ্রদের বাঁকটি কেন একসময় মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
নদীবাঁকের পরিবর্তনশীলতা:
১) মিয়েন্ডারের অবতল পাড়ে ক্রমাগত তীব্র ধাক্কায় ক্ষয় হয় এবং উত্তল পাড়ে পলি সঞ্চিত হয়। এর ফলে বাঁকের দুই প্রান্ত বা গ্রীবা (Neck) দিন দিন পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসে।
২) বর্ষাকালে যখন নদীতে প্রচণ্ড জলের তোড় আসে, তখন নদী অতিরিক্ত জল নিয়ে সেই সংকীর্ণ গ্রীবাটি সোজাসুজি কেটে এক সরলরেখায় প্রবাহিত হতে শুরু করে।
৩) মূল নদীর জলধারা সোজা পথে চলতে থাকলে পরিত্যক্ত বাঁকের মুখ দুটিতে পলি জমে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং সেটি ঘোড়ার নালের মতো অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ হিসেবে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

ভুল ধারণা: নদীর উচ্চগতিতে গতিবেগ বেশি থাকে বলে সেখানে পলি সবচেয়ে বেশি জমে।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সঠিক তথ্য: নদীর উচ্চগতিতে তীব্র ঢাল ও ক্ষিপ্র স্রোতের কারণে কোনো পলি জমা হতে পারে না; সেখানে কেবল ক্ষয়কাজ এবং বহনকাজ ঘটে। পলি সঞ্চয় ঘটে মূলত নিম্নগতি ও মোহনায় যেখানে গতিবেগ প্রায় শূন্য হয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভুল ধারণা: উপনদী ও শাখানদী দুটি একই জিনিস।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সঠিক তথ্য: দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ধারা! উপনদী মূল নদীতে জল এনে দেয় (যেমন যমুনা গঙ্গায় মেশে), আর শাখানদী মোহনার কাছে মূল নদী থেকে বিভক্ত হয়ে জল বের করে নিয়ে যায় (যেমন ভাগীরথী-হুগলী গঙ্গা থেকে বেরিয়ে সাগরে গেছে)।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভুল ধারণা: ক্যানিয়ন এবং গিরিখাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সঠিক তথ্য: দুটি ভিন্ন জলবায়ু অঞ্চলে গঠিত হয়। গিরিখাত আর্দ্র বা বৃষ্টিবহুল পার্বত্য অঞ্চলে খাড়া 'I' আকৃতির খাদ হিসেবে গঠিত হয়, আর ক্যানিয়ন বৃষ্টিহীন শুষ্ক মরুপ্রায় মালভূমিতে দীর্ঘায়িত শুষ্ক ধাপযুক্ত খাদ হিসেবে সৃষ্টি হয় (যেমন কলোরাডোর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন)।

৪-কোয়াড্রন্ট ভৌগোলিক মডেল: নদীর তিনটি গতি ও ভূমিরূপ

নদীর তিনটি গতি ও গঠিত ভূমিরূপের ভূ-প্রাকৃতিক চিত্র ১. নদীর উৎস, অববাহিকা ও জলবিভাজিকা উচ্চভূমির জলবিভাজিকা ও উপনদী সমন্বিত নদী অববাহিকা জলবিভাজিকা (উচ্চ শৈলশিরা) উৎস (হিমবাহ / পর্বত) Confluence (সঙ্গম) Main River Basin (নদী অববাহিকা) ২. উচ্চগতি / পার্বত্য প্রবাহ (ক্ষয়কাজ) 'V' ও 'I' উপত্যকা, গিরিখাত, ক্যানিয়ন ও জলপ্রপাত 'V' আকৃতির গিরিখাত ও জলপ্রপাত মন্থকূপ (অবঘর্ষজনিত গর্ত) ৩. মধ্যগতি / সমভূমি প্রবাহ (বহন ও সঞ্চয়) সর্পিল নদীবাঁক (মিয়েন্ডার) ও অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ সর্পিল নদীবাঁক (মিয়েন্ডার) অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ (বিচ্ছিন্ন বাঁক) ৪. নিম্নগতি / বদ্বীপ প্রবাহ (সঞ্চয়কাজ) প্লাবনভূমি, স্বাভাবিক বাঁধ, খাঁড়ি ও বদ্বীপ (Δ) Δ বদ্বীপ / মোহনা (সমুদ্রে মিলন)

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
নদী হলো উচ্চভূমি থেকে ঢাল বেয়ে নেমে সাগরে পতিত হওয়া একটি প্রাকৃতিক গতিশীল জলধারা।
মূল বিষয় 2
জলবিভাজিকা (উচ্চ শৈলশিরা) দুটি ভিন্ন নদী অববাহিকার জল নিষ্কাশন প্রণালীকে পৃথক করে।
মূল বিষয় 3
উচ্চগতিতে (পার্বত্য প্রবাহ) তীব্র নিম্নক্ষয়ের ফলে 'V' ও 'I' উপত্যকা, গিরিখাত, ক্যানিয়ন, জলপ্রপাত ও মন্থকূপ গঠিত হয়।
মূল বিষয় 4
হপকিন্সের ষষ্ঠঘাতের সূত্রানুসারে নদীর গতিবেগ দ্বিগুণ হলে তার শিলা বহন ক্ষমতা $2^6 = 64$ গুণ বৃদ্ধি পায়।
মূল বিষয় 5
মধ্যগতিতে (সমভূমি প্রবাহ) নদীর বেগ কমে যাওয়ায় সর্পিল নদীবাঁক (মিয়েন্ডার) এবং পরবর্তীতে পরিত্যক্ত বাঁক থেকে অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ তৈরি হয়।
মূল বিষয় 6
নিম্নগতিতে (বদ্বীপ প্রবাহ) নদী পলি সঞ্চয় করে প্লাবনভূমি, স্বাভাবিক বাঁধ এবং মোহনায় গ্রিক ডেল্টা ($\Delta$) আকৃতির উর্বর বদ্বীপ সৃষ্টি করে।
মূল বিষয় 7
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপ বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ; কিন্তু তীব্র জোয়ার ও পলির অভাবে নর্মদা-তাপ্তির মোহনায় বদ্বীপ না হয়ে খাঁড়ি সৃষ্টি হয়েছে।
মূল বিষয় 8
সিন্ধু, মিশর, মেসোপটেমিয়ার মতো মানবসভ্যতাগুলি নদীর বুকেই গড়ে উঠেছিল; আজ নদী সংরক্ষণ ও দূষণমুক্ত প্লাবনভূমি রক্ষা করাই প্রধান দায়িত্ব।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
১. উপনদী এবং শাখানদীর মধ্যে দুটি মৌলিক পার্থক্য উদাহরণসহ লেখো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ১) উপনদী অন্য উৎস থেকে উৎপন্ন হয়ে মূল নদীতে এসে মিলিত হয় এবং জলের পরিমাণ বাড়ায় (যেমন গঙ্গার উপনদী যমুনা)। ২) শাখানদী মোহনার কাছে মূল নদী থেকে বিভক্ত হয়ে ভিন্ন পথে সাগরে গিয়ে পড়ে (যেমন গঙ্গার শাখানদী ভাগীরথী-হুগলী)।
একটি নদী জল যোগ করে, অন্যটি নদী থেকে জল বের করে নেয়।
2
২. হপকিন্সের ষষ্ঠঘাতের সূত্রটি কী বোঝায়? একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: হপকিন্সের সূত্র অনুযায়ী নদীর গতিবেগ বাড়লে তার পাথর-নুড়ি বহন করার ক্ষমতা গতিবেগের ষষ্ঠ ঘাতের সমানুপাতিক হারে ($C \propto V^6$) বাড়ে। যেমন—নদীর বেগ যদি ২ গুণ বাড়ে, তার বহন ক্ষমতা $2^6 = 64$ গুণ বৃদ্ধি পাবে।
গতিবেগের ষষ্ঠ ঘাতে বহন ক্ষমতার নাটকীয় বৃদ্ধির কথা মনে করো।
3
৩. গিরিখাত এবং ক্যানিয়নের মধ্যে প্রধান ভৌগোলিক পার্থক্যটি কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: গিরিখাত বৃষ্টিবহুল আর্দ্র পার্বত্য অঞ্চলে নদীর প্রবল নিম্নক্ষয়ে সৃষ্টি হয় (যেমন কালী গণ্ডকী গিরিখাত)। অন্যদিকে ক্যানিয়ন বৃষ্টিহীন শুষ্ক মরুপ্রায় মালভূমি অঞ্চলে পার্শ্বক্ষয়ের অনুপস্থিতিতে নদীর গভীর নিম্নক্ষয়ের ফলে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে (যেমন কলোরাডোর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন)।
আর্দ্র অঞ্চল বনাম শুষ্ক মরু মালভূমির জলবায়ুগত পার্থক্য।
4
৪. অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ কীভাবে গঠিত হয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: সমভূমিতে নদী সর্পিল বাঁকে (মিয়েন্ডার) প্রবাহিত হওয়ার সময় অবতল পাড়ে ক্রমাগত ক্ষয় এবং উত্তল পাড়ে পলি সঞ্চয়ের ফলে বাঁকের গ্রীবা সংকীর্ণ হয়। বর্ষার বন্যায় নদী সোজা পথে গ্রীবা কেটে বইতে শুরু করলে পুরোনো ঘোড়ার নাল সদৃশ বাঁকটি মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ গঠন করে।
নদীবাঁকের গ্রীবা কেটে সোজা প্রবাহের পর পুরোনো বাঁকটি বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া।
5
৫. বদ্বীপ গঠনের জন্য মোহনায় কী কী অনুকূল শর্ত থাকা প্রয়োজন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ১) নদীর দীর্ঘ গতিপথ ও বিপুল পলি বহন, ২) মোহনায় অত্যন্ত ধীর গতিবেগ, ৩) অগভীর ও শান্ত সমুদ্র, এবং ৪) মোহনায় পলি ভাসিয়ে নেওয়ার মতো তীব্র জোয়ার-ভাটা বা শক্তিশালী সমুদ্রস্রোতের অনুপস্থিতি।
পলির পরিমাণ, জলের শান্ত অবস্থা এবং সাগরের অগভীরতার কথা ভাবো।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।