১.১ প্রকৃতিতে অবস্থান: মুক্ত অবস্থা বনাম যৌগ অবস্থা
কার্বন (প্রতীক $\text{C}$, পরমাণু ক্রমাঙ্ক ৬, ভর সংখ্যা ১২) পর্যায় সারণির ১৪ নং শ্রেণির অধাতব মৌল। প্রকৃতিতে কার্বন দুটি প্রধান অবস্থায় বিদ্যমান:
- মুক্ত অবস্থা (Free / Native State): প্রকৃতিতে বিশুদ্ধ মৌলিক কার্বন হিসেবে হিরে (Diamond), গ্রাফাইট (Graphite) এবং ফুলারিন ($\text{C}_{60}$) পাওয়া যায়।
- যৌগ অবস্থা (Combined State):
- কার্বনেট খনিজ: চুনাপাথর, মার্বেল ও চকে ক্যালসিয়াম কার্বনেট ($\text{CaCO}_3$); ডলোমাইট ($\text{CaCO}_3 \cdot \text{MgCO}_3$)।
- জীবাশ্ম জ্বালানি: কয়লা (Coal), পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস ($\text{CH}_4$)।
- বায়ুমণ্ডল ও জলমণ্ডল: গ্যাসীয় কার্বন ডাইঅক্সাইড ($\text{CO}_2$, প্রায় ০.০৪%) এবং সমুদ্রের জলে দ্রবীভূত বাইকার্বনেট।
- জীবজগৎ: সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহকোষ (কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ডিএনএ/আরএনএ)।
১.২ কেলাসাকার রূপভেদ: হিরে (Diamond)
রূপভেদতার সংজ্ঞা (Allotropy): একই মৌল যখন ভিন্ন ভিন্ন ভৌত রূপ ধারণ করে অথচ তাদের রাসায়নিক ধর্ম প্রায় একই থাকে, তখন মৌলের এই বিশেষ ধর্মকে রূপভেদতা এবং রূপগুলোকে রূপভেদ বলে।
হিরের গঠনগত বৈশিষ্ট্য:
- চতুস্তলকীয় ত্রিমাত্রিক জালক ($sp^3$): হিরেতে প্রতিটি কার্বন পরমাণু সমযোজী একক বন্ধন দ্বারা চারটি নিকটবর্তী কার্বন পরমাণুর সাথে চতুস্তলকীয়ভাবে আবদ্ধ থাকে ($\text{C}-\text{C}$ বন্ধন দৈর্ঘ্য ১.৫৪ Å বা ০.১৫৪ ন্যানোমিটার)। এটি একটি দৃঢ় ও অবিচ্ছেদ্য ত্রিমাত্রিক জালক তৈরি করে।
- কঠিনতম পদার্থ: চারটি যোজ্যতা ইলেকট্রনই অত্যন্ত শক্তিশালী সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ থাকায় হিরে হলো প্রকৃতির কঠিনতম প্রাকৃতিক পদার্থ (মোহ স্কেলে এর কাঠিন্য মান ১০/১০)। কাচ কাটতে এবং পাথরে ড্রিল করতে হিরের গুঁড়ো ব্যবহৃত হয়।
- তড়িৎ অপরিবাহী: হিরের কেলাসে কোনো মুক্ত বা ভ্রাম্যমাণ ইলেকট্রন থাকে না, তাই হিরে বিদ্যুতের সম্পূর্ণ কুপরিবাহী বা অন্তরক।
- অতুলনীয় দ্যুতি বা ঝিলিক: হিরের প্রতিসরাঙ্ক অত্যন্ত বেশি (২.৪২) এবং সংকট কোণ অত্যন্ত কম (২৪.৪°)। কাটা হিরের ভেতর আলো প্রবেশ করলে তা বারবার অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন (Total Internal Reflection) ঘটিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে, যার ফলে হিরে এত অপূর্ব দ্যুতি ছড়ায়।
১.৩ কেলাসাকার রূপভেদ: গ্রাফাইট (Graphite)
গ্রাফাইটের গঠনগত বৈশিষ্ট্য:
- ষড়ভুজীয় স্তরিত কাঠামো ($sp^2$): প্রতিটি কার্বন পরমাণু অন্য তিনটি কার্বন পরমাণুর সাথে সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সমতলীয় ষড়ভুজাকার জালক গঠন করে ($\text{C}-\text{C}$ বন্ধন দৈর্ঘ্য ১.৪২ Å)।
- দুর্বল ভ্যান ডার ওয়ালস বল ও পিচ্ছিলতা: এই ষড়ভুজাকার স্তরগুলো পরস্পরের থেকে বেশ দূরে (৩.৩৫ Å) থাকে এবং এদের মধ্যে কেবল দুর্বল ভ্যান ডার ওয়ালস আকর্ষণ বল ক্রিয়া করে। ফলে স্তরগুলো একে অপরের ওপর সহজে পিছলে যেতে পারে। এই কারণে গ্রাফাইট নরম, মসৃণ ও পিচ্ছিল এবং ভারী যন্ত্রাংশে উচ্চ তাপমাত্রায় শুষ্ক পিচ্ছিলকারক (Solid Lubricant) হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- তড়িৎ পরিবাহিতা: গ্রাফাইটের প্রতিটি কার্বন পরমাণু ৪টি যোজ্যতা ইলেকট্রনের মধ্যে ৩টি বন্ধন গঠনে ব্যবহার করে। ফলে প্রতিটি কার্বনের একটি মুক্ত পাই ($\pi$) ইলেকট্রন স্তরের মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে। এই ভ্রাম্যমাণ ইলেকট্রনের উপস্থিতির জন্যই গ্রাফাইট বিদ্যুতের উত্তম সুপরিবাহী (শুষ্ক ব্যাটারির তড়িদ্দ্বার বা ইলেকট্রোড তৈরিতে ব্যবহৃত হয়)।
১.৪ ফুলারিন (Fullerene — $\text{C}_{60}$)
১৯৮৫ সালে বিজ্ঞানী হ্যারল্ড ক্রোটো, রিচার্ড স্মলি ও রবার্ট কার্ল কৃত্রিমভাবে লেসার রশ্মি দ্বারা গ্রাফাইটকে বাষ্পীভূত করে বাকমিনস্টারফুলারিন ($\text{C}_{60}$) আবিষ্কার করেন। এর গঠন ফুটবল বা বাকিবলের মতো, যাতে ৬০টি কার্বন পরমাণু যুক্ত থাকে। এতে ২০টি ষড়ভুজীয় এবং ১২টি পঞ্চভুজীয় বলয় থাকে। ন্যানোপ্রযুক্তি, ওষুধ পরিবহন ও ক্যান্সারের গবেষণায় ফুলারিন অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।
১.৫ অকেলাসাকার রূপভেদ ও সক্রিয় চারকোলের শোষণ
অকেলাসাকার বা আণুবীক্ষণিক রূপভেদগুলো নির্দিষ্ট জ্যামিতিক কেলাস গঠন করে না:
- কয়লা (Coal): প্রাগৈতিহাসিক অরণ্য ভূগর্ভস্থ প্রচণ্ড তাপ ও চাপে বায়ুর অনুপস্থিতিতে লক্ষ লক্ষ বছরে কয়লায় রূপান্তরিত হয়েছে। কার্বনের পরিমাণের ভিত্তিতে ক্রম: অ্যানথ্রাসাইট ($>৯০\%$) > বিটুমিনাস ($৭৫-৮৫\%$) > লিগনাইট ($৬০-৭০\%$) > পিট ($<৬০\%$)।
- কোক (Coke): বিটুমিনাস কয়লাকে বায়ুর অনুপস্থিতিতে উত্তপ্ত (অন্তর্ধুম পাতন) করলে কোক পাওয়া যায়। এটি ধাতু নিষ্কাশনে বিজারক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- কাষ্ঠ চারকোল ও জান্তব চারকোল: কাঠ বা প্রাণীর হাড় বায়ুর অনুপস্থিতিতে পুড়িয়ে তৈরি হয়।
- কাজল (Lampblack) ও গ্যাস কার্বন: কেরোসিন বা পেট্রোলিয়ামের অসম্পূর্ণ দহনে তৈরি হয়; ছাপার কালি, জুতোর কালি ও গাড়ির টায়ার তৈরিতে লাগে।
- সক্রিয় চারকোলের পৃষ্ঠতলীয় শোষণ (Adsorption): চারকোলকে উচ্চ তাপমাত্রায় বাষ্প দিয়ে সক্রিয় করলে এর মধ্যে অসংখ্য অতিসূক্ষ্ম ছিদ্র সৃষ্টি হয় এবং এর কার্যকরী ক্ষেত্রফল বিপুল বৃদ্ধি পায় (১ গ্রাম চারকোলের ক্ষেত্রফল ১০০০ বর্গমিটারেরও বেশি)। এটি তার পৃষ্ঠতলে বিষাক্ত গ্যাস, দুর্গন্ধ ও বর্ণময় রঞ্জক পদার্থকে শক্তভাবে আটকে রাখে (অধিActive শোষণ করে)। এই কারণে সক্রিয় চারকোল যুদ্ধক্ষেত্রের গ্যাস মাস্ক, জল বিশুদ্ধিকরণ ফিল্টার এবং চিনি পরিষ্কারের কারখানায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।