Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Science • অধ্যায় 4
আনুমানিক সময়: ৫৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

প্রকৃতিতে কার্বন ও তার যৌগ

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির "পরিবেশ ও বিজ্ঞান" পাঠ্যক্রমের অধ্যায়: "প্রকৃতিতে কার্বন ও তার যৌগ"-এর সম্পূর্ণ প্রামাণ্য মাস্টার স্টাডি গাইড। কার্বন হলো সমস্ত জীবদেহের এবং জৈব রসায়নের মূল প্রাণভোমরা। এই অধ্যায়ে মুক্ত ও যৌগ অবস্থায় কার্বনের উপস্থিতি, কার্বনের কেলাসাকার রূপভেদ (হিরে, গ্রাফাইট ও ফুলারিন C₆₀) ও অকেলাসাকার রূপভেদের সক্রিয় চারকোলের পৃষ্ঠতলীয় শোষণ, কার্বনের অক্সাইডসমূহ—বিষাক্ত "নীরব ঘাতক" কার্বন মনোক্সাইড (কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন গঠন) বনাম আম্লিক কার্বন ডাইঅক্সাইড, জৈব রসায়নের সূচনায় ভোহলারের ইউরিয়া সংশ্লেষণ দ্বারা প্রাণশক্তি তত্ত্বের অবসান, কার্বনের চতুর্যোয্যতা ও ক্যাটিনেশন ধর্ম, বিভিন্ন হাইড্রোকার্বন (মিথেন, ইথেন, ইথিলিন ও অ্যাসিটিলিন), জ্বালানির তাপনমূল্য, মোমবাতির শিখার ৪টি অঞ্চল এবং বৈশ্বিক কার্বন চক্র ও পরিবেশীয় উষ্ণায়নের প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। অধ্যায়টিতে রয়েছে ২৫টি শিক্ষণীয় ধাপ, ভেক্টর কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি সুষম রাসায়নিক সমীকরণ কার্ড, ৮টি আদর্শ সমাধানকৃত উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষক সতর্কবার্তা, ৮টি টেক-অ্যাওয়ে ও অনলাইন সিবিটি মক টেস্ট অনুশীলন।

💎 একই মৌলের বহুরূপ: পৃথিবীর কঠিনতম হিরে থেকে নরম পেন্সিলের গ্রাফাইট

কীভাবে পৃথিবীর কঠিনতম প্রাকৃতিক রত্ন স্বচ্ছ হিরে—যা দিয়ে কঠিন পাথরও কেটে ফেলা যায়—আর পেন্সিলের ভেতরের নরম পিচ্ছিল কালো গ্রাফাইট একই মৌল কার্বন দ্বারা গঠিত হতে পারে?

একটি বন্ধ ঘরে জ্বলন্ত কয়লার উনুন রেখে ঘুমালে কেন রক্তে অক্সিজেনের চেয়ে ৩০০ গুণ দ্রুত বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড মিশে মানুষ চিরতরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে? আর কীভাবে ১৮২৮ সালে একটিমাত্র ল্যাবরেটরি পরীক্ষা জীবনের "অলৌকিক প্রাণশক্তি তত্ত্ব"-কে চিরতরে ভেঙে দিয়ে আধুনিক জৈব রসায়নের জন্ম দিয়েছিল?

এই সমস্ত রোমাঞ্চকর প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতিতে কার্বন ও তার যৌগ অধ্যায়ে: কার্বনের ক্যাটিনেশন ধর্ম, চতুর্যোয্যতা, রূপভেদতা এবং জীবমণ্ডলে কার্বন চক্রের ভারসাম্য। এসো, ধাপে ধাপে এই চমৎকার বিজ্ঞান আমরা আয়ত্ত করি!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির "পরিবেশ ও বিজ্ঞান" পাঠ্যক্রমের অধ্যায়: "প্রকৃতিতে কার্বন ও তার যৌগ"-এর সম্পূর্ণ প্রামাণ্য মাস্টার স্টাডি গাইড। কার্বন হলো সমস্ত জীবদেহের এবং জৈব রসায়নের মূল প্রাণভোমরা। এই অধ্যায়ে মুক্ত ও যৌগ অবস্থায় কার্বনের উপস্থিতি, কার্বনের কেলাসাকার রূপভেদ (হিরে, গ্রাফাইট ও ফুলারিন C₆₀) ও অকেলাসাকার রূপভেদের সক্রিয় চারকোলের পৃষ্ঠতলীয় শোষণ, কার্বনের অক্সাইডসমূহ—বিষাক্ত "নীরব ঘাতক" কার্বন মনোক্সাইড (কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন গঠন) বনাম আম্লিক কার্বন ডাইঅক্সাইড, জৈব রসায়নের সূচনায় ভোহলারের ইউরিয়া সংশ্লেষণ দ্বারা প্রাণশক্তি তত্ত্বের অবসান, কার্বনের চতুর্যোয্যতা ও ক্যাটিনেশন ধর্ম, বিভিন্ন হাইড্রোকার্বন (মিথেন, ইথেন, ইথিলিন ও অ্যাসিটিলিন), জ্বালানির তাপনমূল্য, মোমবাতির শিখার ৪টি অঞ্চল এবং বৈশ্বিক কার্বন চক্র ও পরিবেশীয় উষ্ণায়নের প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। অধ্যায়টিতে রয়েছে ২৫টি শিক্ষণীয় ধাপ, ভেক্টর কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি সুষম রাসায়নিক সমীকরণ কার্ড, ৮টি আদর্শ সমাধানকৃত উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষক সতর্কবার্তা, ৮টি টেক-অ্যাওয়ে ও অনলাইন সিবিটি মক টেস্ট অনুশীলন।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • পরমাণুর গঠন এবং কার্বনের ইলেকট্রন বিন্যাস (পরমাণু ক্রমাঙ্ক ৬, বিন্যাস ২, ৪)।
  • সপ্তম শ্রেণির ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তন এবং অণু-পরমাণুর প্রাথমিক ধারণা।
  • দহন, তাপের প্রভাব এবং পদার্থের অবস্থার রূপান্তর সংক্রান্ত জ্ঞান।
  • অ্যাসিড, ক্ষারক ও নির্দেশক সম্পর্কিত মৌলিক পরিচয়।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • হিরে, গ্রাফাইট ও ফুলারিনের আণবিক গঠন, বন্ধন এবং বিদ্যুৎ পরিবাহিতার পার্থক্য বিশ্লেষণ করতে পারবে।
  • সক্রিয় চারকোলের পৃষ্ঠতলীয় শোষণ ধর্ম ও এর বহুমুখী ব্যবহার ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • কার্বন মনোক্সাইডের বিষাক্ততা ও কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন গঠনের শারীরবৃত্তীয় কারণ বুঝতে পারবে।
  • কার্বনের চতুর্যোয্যতা ও ক্যাটিনেশন ধর্ম কীভাবে লক্ষ লক্ষ জৈব যৌগ সৃষ্টি করে তা ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • মোমবাতির শিখার ৪টি অঞ্চল চিহ্নিত করতে পারবে এবং জ্বালানির তাপনমূল্য (kJ/kg) তুলনা করতে পারবে।
  • বৈশ্বিক কার্বন চক্র এবং অতিরিক্ত গ্রিনহাউস গ্যাসের কুফল (বিশ্ব উষ্ণায়ন ও সমুদ্রের অম্লীকরণ) বিশ্লেষণ করতে পারবে।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. প্রকৃতিতে কার্বনের অবস্থান ও রূপ...
2 ২. কার্বনের অক্সাইডসমূহ — বিষাক্ত ক...
3 ৩. জৈব রসায়ন, কার্বনের চতুর্যোয্যত...
4 ৪. জ্বালানি, তাপনমূল্য, দহন ও মোমবা...
5 ৫. বৈশ্বিক কার্বন চক্র, পরিবেশীয় ভ...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. প্রকৃতিতে কার্বনের অবস্থান ও রূপভেদতা (হিরে, গ্রাফাইট ও ফুলারিন)

১.১ প্রকৃতিতে অবস্থান: মুক্ত অবস্থা বনাম যৌগ অবস্থা

কার্বন (প্রতীক $\text{C}$, পরমাণু ক্রমাঙ্ক ৬, ভর সংখ্যা ১২) পর্যায় সারণির ১৪ নং শ্রেণির অধাতব মৌল। প্রকৃতিতে কার্বন দুটি প্রধান অবস্থায় বিদ্যমান:

  • মুক্ত অবস্থা (Free / Native State): প্রকৃতিতে বিশুদ্ধ মৌলিক কার্বন হিসেবে হিরে (Diamond), গ্রাফাইট (Graphite) এবং ফুলারিন ($\text{C}_{60}$) পাওয়া যায়।
  • যৌগ অবস্থা (Combined State):
    • কার্বনেট খনিজ: চুনাপাথর, মার্বেল ও চকে ক্যালসিয়াম কার্বনেট ($\text{CaCO}_3$); ডলোমাইট ($\text{CaCO}_3 \cdot \text{MgCO}_3$)।
    • জীবাশ্ম জ্বালানি: কয়লা (Coal), পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস ($\text{CH}_4$)।
    • বায়ুমণ্ডল ও জলমণ্ডল: গ্যাসীয় কার্বন ডাইঅক্সাইড ($\text{CO}_2$, প্রায় ০.০৪%) এবং সমুদ্রের জলে দ্রবীভূত বাইকার্বনেট।
    • জীবজগৎ: সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহকোষ (কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ডিএনএ/আরএনএ)।

১.২ কেলাসাকার রূপভেদ: হিরে (Diamond)

রূপভেদতার সংজ্ঞা (Allotropy): একই মৌল যখন ভিন্ন ভিন্ন ভৌত রূপ ধারণ করে অথচ তাদের রাসায়নিক ধর্ম প্রায় একই থাকে, তখন মৌলের এই বিশেষ ধর্মকে রূপভেদতা এবং রূপগুলোকে রূপভেদ বলে।

হিরের গঠনগত বৈশিষ্ট্য:

  • চতুস্তলকীয় ত্রিমাত্রিক জালক ($sp^3$): হিরেতে প্রতিটি কার্বন পরমাণু সমযোজী একক বন্ধন দ্বারা চারটি নিকটবর্তী কার্বন পরমাণুর সাথে চতুস্তলকীয়ভাবে আবদ্ধ থাকে ($\text{C}-\text{C}$ বন্ধন দৈর্ঘ্য ১.৫৪ Å বা ০.১৫৪ ন্যানোমিটার)। এটি একটি দৃঢ় ও অবিচ্ছেদ্য ত্রিমাত্রিক জালক তৈরি করে।
  • কঠিনতম পদার্থ: চারটি যোজ্যতা ইলেকট্রনই অত্যন্ত শক্তিশালী সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ থাকায় হিরে হলো প্রকৃতির কঠিনতম প্রাকৃতিক পদার্থ (মোহ স্কেলে এর কাঠিন্য মান ১০/১০)। কাচ কাটতে এবং পাথরে ড্রিল করতে হিরের গুঁড়ো ব্যবহৃত হয়।
  • তড়িৎ অপরিবাহী: হিরের কেলাসে কোনো মুক্ত বা ভ্রাম্যমাণ ইলেকট্রন থাকে না, তাই হিরে বিদ্যুতের সম্পূর্ণ কুপরিবাহী বা অন্তরক।
  • অতুলনীয় দ্যুতি বা ঝিলিক: হিরের প্রতিসরাঙ্ক অত্যন্ত বেশি (২.৪২) এবং সংকট কোণ অত্যন্ত কম (২৪.৪°)। কাটা হিরের ভেতর আলো প্রবেশ করলে তা বারবার অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন (Total Internal Reflection) ঘটিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে, যার ফলে হিরে এত অপূর্ব দ্যুতি ছড়ায়।

১.৩ কেলাসাকার রূপভেদ: গ্রাফাইট (Graphite)

গ্রাফাইটের গঠনগত বৈশিষ্ট্য:

  • ষড়ভুজীয় স্তরিত কাঠামো ($sp^2$): প্রতিটি কার্বন পরমাণু অন্য তিনটি কার্বন পরমাণুর সাথে সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সমতলীয় ষড়ভুজাকার জালক গঠন করে ($\text{C}-\text{C}$ বন্ধন দৈর্ঘ্য ১.৪২ Å)।
  • দুর্বল ভ্যান ডার ওয়ালস বল ও পিচ্ছিলতা: এই ষড়ভুজাকার স্তরগুলো পরস্পরের থেকে বেশ দূরে (৩.৩৫ Å) থাকে এবং এদের মধ্যে কেবল দুর্বল ভ্যান ডার ওয়ালস আকর্ষণ বল ক্রিয়া করে। ফলে স্তরগুলো একে অপরের ওপর সহজে পিছলে যেতে পারে। এই কারণে গ্রাফাইট নরম, মসৃণ ও পিচ্ছিল এবং ভারী যন্ত্রাংশে উচ্চ তাপমাত্রায় শুষ্ক পিচ্ছিলকারক (Solid Lubricant) হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • তড়িৎ পরিবাহিতা: গ্রাফাইটের প্রতিটি কার্বন পরমাণু ৪টি যোজ্যতা ইলেকট্রনের মধ্যে ৩টি বন্ধন গঠনে ব্যবহার করে। ফলে প্রতিটি কার্বনের একটি মুক্ত পাই ($\pi$) ইলেকট্রন স্তরের মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে। এই ভ্রাম্যমাণ ইলেকট্রনের উপস্থিতির জন্যই গ্রাফাইট বিদ্যুতের উত্তম সুপরিবাহী (শুষ্ক ব্যাটারির তড়িদ্দ্বার বা ইলেকট্রোড তৈরিতে ব্যবহৃত হয়)।

১.৪ ফুলারিন (Fullerene — $\text{C}_{60}$)

১৯৮৫ সালে বিজ্ঞানী হ্যারল্ড ক্রোটো, রিচার্ড স্মলি ও রবার্ট কার্ল কৃত্রিমভাবে লেসার রশ্মি দ্বারা গ্রাফাইটকে বাষ্পীভূত করে বাকমিনস্টারফুলারিন ($\text{C}_{60}$) আবিষ্কার করেন। এর গঠন ফুটবল বা বাকিবলের মতো, যাতে ৬০টি কার্বন পরমাণু যুক্ত থাকে। এতে ২০টি ষড়ভুজীয় এবং ১২টি পঞ্চভুজীয় বলয় থাকে। ন্যানোপ্রযুক্তি, ওষুধ পরিবহন ও ক্যান্সারের গবেষণায় ফুলারিন অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।

১.৫ অকেলাসাকার রূপভেদ ও সক্রিয় চারকোলের শোষণ

অকেলাসাকার বা আণুবীক্ষণিক রূপভেদগুলো নির্দিষ্ট জ্যামিতিক কেলাস গঠন করে না:

  • কয়লা (Coal): প্রাগৈতিহাসিক অরণ্য ভূগর্ভস্থ প্রচণ্ড তাপ ও চাপে বায়ুর অনুপস্থিতিতে লক্ষ লক্ষ বছরে কয়লায় রূপান্তরিত হয়েছে। কার্বনের পরিমাণের ভিত্তিতে ক্রম: অ্যানথ্রাসাইট ($>৯০\%$) > বিটুমিনাস ($৭৫-৮৫\%$) > লিগনাইট ($৬০-৭০\%$) > পিট ($<৬০\%$)।
  • কোক (Coke): বিটুমিনাস কয়লাকে বায়ুর অনুপস্থিতিতে উত্তপ্ত (অন্তর্ধুম পাতন) করলে কোক পাওয়া যায়। এটি ধাতু নিষ্কাশনে বিজারক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  • কাষ্ঠ চারকোল ও জান্তব চারকোল: কাঠ বা প্রাণীর হাড় বায়ুর অনুপস্থিতিতে পুড়িয়ে তৈরি হয়।
  • কাজল (Lampblack) ও গ্যাস কার্বন: কেরোসিন বা পেট্রোলিয়ামের অসম্পূর্ণ দহনে তৈরি হয়; ছাপার কালি, জুতোর কালি ও গাড়ির টায়ার তৈরিতে লাগে।
  • সক্রিয় চারকোলের পৃষ্ঠতলীয় শোষণ (Adsorption): চারকোলকে উচ্চ তাপমাত্রায় বাষ্প দিয়ে সক্রিয় করলে এর মধ্যে অসংখ্য অতিসূক্ষ্ম ছিদ্র সৃষ্টি হয় এবং এর কার্যকরী ক্ষেত্রফল বিপুল বৃদ্ধি পায় (১ গ্রাম চারকোলের ক্ষেত্রফল ১০০০ বর্গমিটারেরও বেশি)। এটি তার পৃষ্ঠতলে বিষাক্ত গ্যাস, দুর্গন্ধ ও বর্ণময় রঞ্জক পদার্থকে শক্তভাবে আটকে রাখে (অধিActive শোষণ করে)। এই কারণে সক্রিয় চারকোল যুদ্ধক্ষেত্রের গ্যাস মাস্ক, জল বিশুদ্ধিকরণ ফিল্টার এবং চিনি পরিষ্কারের কারখানায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

২. কার্বনের অক্সাইডসমূহ — বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড বনাম আম্লিক কার্বন ডাইঅক্সাইড

২.১ কার্বন মনোক্সাইড (CO) — উৎপত্তি ও ভৌত ধর্ম

সীমিত বা অপর্যাপ্ত বায়ুর উপস্থিতিতে কার্বন বা যেকোনো কার্বনযুক্ত জ্বালানির অসম্পূর্ণ দহন (Incomplete Combustion) ঘটালে কার্বন মনোক্সাইড ($\text{CO}$) গ্যাস উৎপন্ন হয়:

$$\mathbf{2\text{C} + \text{O}_2\text{ (সীমিত বাতাস)} \longrightarrow 2\text{CO}\uparrow}$$

ভৌত ধর্ম: বর্ণহীন, গন্ধহীন, স্বাদহীন এবং বায়ুর চেয়ে সামান্য হালকা (বাষ্প ঘনত্ব ১৪, বাতাসের ১৪.৪)। এটি প্রশম গ্যাস (লিটমাসে নিরপেক্ষ) এবং জলে প্রায় অদ্রাব্য। বাতাসে এটি হালকা নীল শিখায় পুড়ে কার্বন ডাইঅক্সাইডে পরিণত হয়: $2\text{CO} + \text{O}_2 \to 2\text{CO}_2$।

২.২ কার্বন মনোক্সাইডের তীব্র বিষাক্ততা ("নীরব ঘাতক")

কার্বন মনোক্সাইডকে বিজ্ঞানে "নীরব ঘাতক" (Silent Killer) বলা হয়, কারণ কোনো বর্ণ বা গন্ধ না থাকায় মানুষ এটি শ্বাস নেওয়ার সময় টেরই পায় না। এর বিষক্রিয়ার শারীরবৃত্তীয় কারণ:

  • হিমোগ্লোবিনের প্রতি প্রচণ্ড আসক্তি: মানবদেহের রক্তরসের হিমোগ্লোবিনের ($\text{Hb}$) সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কার্বন মনোক্সাইডের আসক্তি অক্সিজেনের চেয়ে ২৫০ থেকে ৩০০ গুণ বেশি।
  • কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন গঠন: প্রশ্বাসের সাথে $\text{CO}$ ফুসফুসে প্রবেশ করামাত্র এটি অক্সিজেনের স্থান দখল করে হিমোগ্লোবিনের সাথে একটি অত্যন্ত সুদৃঢ় লালচে যৌগ গঠন করে, যার নাম কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন ($\text{CO-Hb}$): $$\text{Hb} + \text{CO} \longrightarrow \mathbf{\text{CO-Hb}}\quad\text{(কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন)}$$
  • কোষীয় শ্বাসরোধ ও মৃত্যু: ফলে রক্ত দেহের কোষ ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন পরিবহনের ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলে। মানুষ মাথাঘোরা, বমিভাব ও পেশি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে, এবং ধীরে ধীরে গভীর সংজ্ঞাহীনতায় চলে গিয়ে শ্বাসরোধে মারা যায়।
⚠️ গৃহস্থালির জরুরি সতর্কতা: শীতকালে সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ করে শোবার ঘরে কখনোই কয়লার উনুন বা কেরোসিনের হিটার জ্বালিয়ে রাখা উচিত নয়! অক্সিজেন কমে গেলেই বিষাক্ত $\text{CO}$ তৈরি হয়ে ঘুমের মধ্যেই নিঃশব্দে মৃত্যু ডেকে আনে।

২.৩ ধাতু নিষ্কাশনে বিজারক হিসেবে CO-এর ভূমিকা

উচ্চ তাপমাত্রায় কার্বন মনোক্সাইড তীব্র বিজারক পদার্থ হিসেবে কাজ করে। ব্লাস্ট ফার্নেসে লোহা নিষ্কাশনের সময় এটি হেমাটাইট আকরিক ($\text{Fe}_2\text{O}_3$) থেকে অক্সিজেন কেড়ে নিয়ে তাকে গলিত ধাতব লোহায় বিজারিত করে:

$$\mathbf{\text{Fe}_2\text{O}_3 + 3\text{CO} \\\\xrightarrow{৬০০^\circ\text{সে}-৮০০^\circ\text{সে}} 2\text{Fe} + 3\text{CO}_2\uparrow}$$

২.৪ কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) — সম্পূর্ণ দহন ও আম্লিক ধর্ম

পর্যাপ্ত বাতাসের উপস্থিতিতে কার্বনের সম্পূর্ণ দহন (Complete Combustion) ঘটালে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস তৈরি হয় এবং প্রচুর তাপ নির্গত হয়:

$$\mathbf{\text{C} + \text{O}_2\text{ (পর্যাপ্ত বাতাস)} \longrightarrow \text{CO}_2\uparrow + ৩৯৩.৫\text{ কিলোজুল}}$$

রাসায়নিক বিক্রিয়া:

  • আম্লিক অক্সাইড: জলে দ্রবীভূত হয়ে মৃদু কার্বনিক অ্যাসিড গঠন করে, ফলে আর্দ্র নীল লিটমাস লাল হয়: $$\text{CO}_2 + \text{H}_2\text{O} \rightleftharpoons \mathbf{\text{H}_2\text{CO}_3}\text{ (কার্বনিক অ্যাসিড)}$$
  • ক্ষারের সাথে বিক্রিয়া: সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড দ্রবণে শোষিত হয়ে সোডিয়াম কার্বনেট তৈরি করে: $$2\text{NaOH} + \text{CO}_2 \longrightarrow \text{Na}_2\text{CO}_3 + \text{H}_2\text{O}$$

২.৫ তুলনামূলক পার্থক্য: CO বনাম CO₂

বৈশিষ্ট্য / পরীক্ষাকার্বন মনোক্সাইড ($\text{CO}$)কার্বন ডাইঅক্সাইড ($\text{CO}_2$)
উৎপত্তিঅসম্পূর্ণ দহনে (সীমিত বাতাস)সম্পূর্ণ দহনে (পর্যাপ্ত বাতাস)
লিটমাসে প্রকৃতিপ্রশম (কোনো বর্ণ পরিবর্তন নেই)মৃদু আম্লিক (নীল লিটমাস লাল হয়)
শারীরবৃত্তীয় প্রভাবমারাত্মক বিষাক্ত (কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন গঠন)অবিষাক্ত (কেবল অতি উচ্চ ঘনত্বে শ্বাসরোধক)
দাহ্যতাহালকা নীল শিখায় নিজে জ্বলেনিজে জ্বলে না এবং আগুন নিভিয়ে দেয়
স্বচ্ছ চুনজল পরীক্ষাকোনো পরিবর্তন হয় নাদুধের মতো ঘোলা করে ($\text{CaCO}_3\downarrow$)
অ্যামোনিয়াকাল $\text{Cu}_2\text{Cl}_2$শোষিত হয়ে যুত যৌগ গঠন করেকোনো বিক্রিয়া নেই / শোষিত হয় না

৩. জৈব রসায়ন, কার্বনের চতুর্যোয্যতা, ক্যাটিনেশন ও হাইড্রোকার্বন

৩.১ জৈব রসায়নের সূচনা ও প্রাণশক্তি তত্ত্বের অবসান

ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্যন্ত সুইডিশ বিজ্ঞানী বার্জেলিয়াস বিশ্বাস করতেন যে জৈব যৌগগুলো কেবলমাত্র জীবদেহের ভেতরে এক অলৌকিক রহস্যাবৃত "প্রাণশক্তি" (Vital Force)-এর প্রভাবেই তৈরি হতে পারে এবং গবেষণাগারে এদের কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করা অসম্ভব। একে প্রাণশক্তি তত্ত্ব (Vital Force Theory) বলা হতো।

ভোহলারের যুগান্তকারী সংশ্লেষণ (১৮২৮): ১৮২৮ সালে জার্মান রসায়নবিদ ফ্রেডরিখ ভোহলার (Friedrich Wöhler) পরীক্ষাগারে সম্পূর্ণ অজৈব খনিজ লবণ অ্যামোনিয়াম সায়ানেট ($\text{NH}_4\text{CNO}$) দ্রবণকে উত্তপ্ত করে অপ্রত্যাশিতভাবে স্তন্যপায়ী প্রাণীর মূত্রে প্রাপ্ত জৈব পদার্থ ইউরিয়া [$\text{CO(NH}_2)_2$] তৈরি করে ফেলেন:

$$\mathbf{\text{NH}_4\text{CNO}\text{ (অজৈব লবণ)} \\\\xrightarrow{\\\\Delta} \text{CO(NH}_2)_2\text{ (ইউরিয়া, জৈব যৌগ)}}$$

এই একটিমাত্র ঐতিহাসিক আবিষ্কার প্রমাণ করে দেয় যে জৈব যৌগের জন্যও কোনো রহস্যময় শক্তির প্রয়োজন নেই; জৈব যৌগ আসলে কার্বনেরই যৌগ। এর মাধ্যমেই কৃত্রিম জৈব রসায়নের স্বর্ণযুগের সূচনা হয়।

৩.২ কার্বনের লক্ষ লক্ষ যৌগ গঠনের রহস্য: চতুর্যোয্যতা ও ক্যাটিনেশন

পর্যায় সারণির অন্য সমস্ত মৌলের মিলিত যৌগের সংখ্যার চেয়েও কেবল কার্বনের যৌগের সংখ্যা অনেক বেশি (কোটি ছাড়িয়ে গেছে)। এর পেছনে কার্বনের দুটি অনন্য বৈশিষ্ট্য কাজ করে:

  1. কার্বনের চতুর্যোয্যতা (Tetravalency of Carbon): কার্বনের পরমাণু ক্রমাঙ্ক ৬, ইলেকট্রন বিন্যাস (২, ৪)। সর্ববহিঃস্থ কক্ষে ৪টি যোজ্যতা ইলেকট্রন থাকে। অষ্টক পূর্ণ করতে কার্বন অন্য চারটি পরমাণুর সাথে ৪ জোড়া ইলেকট্রন শেয়ার করে ৪টি শক্তিশালী সমযোজী একক বন্ধন গঠন করে, যা একটি সুষম চতুস্তলকের চার কোণার দিকে বিস্তৃত থাকে (বন্ধন কোণ ১০৯.৫°)।
  2. ক্যাটিনেশন ধর্ম (Catenation Power): একই মৌলের একাধিক পরমাণু পরস্পরের সাথে সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দীর্ঘ সরল শৃঙ্খল, শাখাযুক্ত শৃঙ্খল কিংবা আবদ্ধ বলয় গঠন করার ক্ষমতাকে ক্যাটিনেশন ধর্ম বলে: $$-\text{C}-\text{C}-\text{C}-\text{C}-\quad\text{অথবা}\quad\begin{array}{c}\text{C}\\ |\\ -\text{C}-\text{C}-\text{C}-\end{array}\quad\text{অথবা আবদ্ধ বলয়}$$ কার্বনের পারমাণবিক ব্যাসার্ধ খুব ছোট (৭৭ পিকোমিটার) হওয়ায় এর নিউক্লিয়াস শেয়ার করা ইলেকট্রন জোড়কে অত্যন্ত শক্তভাবে ধরে রাখে, যার ফলে $\text{C}-\text{C}$ সমযোজী বন্ধনের স্থায়িত্ব (বন্ধন শক্তি ৩৪৮ kJ/mol) অপরিসীম হয়।

৩.৩ পরিচিত হাইড্রোকার্বনের পরিচয় (Hydrocarbons)

কেবলমাত্র কার্বন এবং হাইড্রোজেন দ্বারা গঠিত যৌগসমূহকে হাইড্রোকার্বন বলা হয়। এরা সমস্ত জৈব যৌগের মূল ভিত্তি।

হাইড্রোকার্বনসংকেতবন্ধনের প্রকৃতিউৎস ও ব্যবহারিক গুরুত্ব
মিথেন (Methane) $\text{CH}_4$ একক সমযোজী বন্ধন (সম্পৃক্ত) জলাভূমির "মার্শ গ্যাস"; গোবর গ্যাস বা বায়োগ্যাসের মূল উপাদান (৬৫%); যানবাহনের সিএনজি (CNG, $>৯০\%$)।
ইথেন (Ethane) $\text{C}_2\text{H}_6$ একক সমযোজী বন্ধন (সম্পৃক্ত) প্রাকৃতিক গ্যাসের অন্যতম উপাদান ও পেট্রোলিয়াম সংশ্লেষে ব্যবহৃত।
ইথিলিন (Ethene) $\text{C}_2\text{H}_4$ দ্বিবন্ধন $\text{C}=\text{C}$ (অসম্পৃক্ত) উদ্ভিজ্জ হরমোন; কৃত্রিম উপায়ে কাঁচা ফল দ্রুত পাকাতে ব্যবহৃত হয়; পলিথিন প্লাস্টিক তৈরির মনোমার।
অ্যাসিটিলিন (Ethyne) $\text{C}_2\text{H}_2$ ত্রিবন্ধন $\text{C}\equiv\text{C}$ (অসম্পৃক্ত) অক্সি-অ্যাসিটিলিন শিখা তৈরি করে ধাতু ঝালাইয়ে (Welding) ব্যবহৃত হয়; এর শিখার তাপমাত্রা ৩০০০°সে ছাড়িয়ে যায়।

৪. জ্বালানি, তাপনমূল্য, দহন ও মোমবাতির শিখার চারটি অঞ্চল

৪.১ জ্বালানির শ্রেণিবিভাগ ও তাপনমূল্য (Calorific Value)

যে সমস্ত দাহ্য পদার্থ বাতাসে পুড়ে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহারযোগ্য তাপশক্তি উৎপাদন করে, তাদের জ্বালানি (Fuel) বলে।

জ্বালানির তাপনমূল্য: প্রমাণ অবস্থায় ১ কিলোগ্রাম (বা একক ভর) কোনো জ্বালানির সম্পূর্ণ দহনে যে পরিমাণ তাপশক্তি উৎপন্ন হয়, তাকে ওই জ্বালানির তাপনমূল্য বলে। এর একক হলো কিলোজুল/কিলোগ্রাম ($\text{kJ/kg}$)।

জ্বালানিভৌত অবস্থাতাপনমূল্য ($\text{kJ/kg}$)পরিবেশীয় মূল্যায়ন
হাইড্রোজেন ($\text{H}_2$)গ্যাস১৫০,০০০সর্বোচ্চ তাপনমূল্য; শূন্য দূষণ (শুধু জল উৎপন্ন হয়)
মিথেন / সিএনজি (CNG)গ্যাস৫৫,০০০পরিবেশবান্ধব পরিচ্ছন্ন জ্বালানি; ধোঁয়াহীন
এলপিজি (LPG — রান্নার গ্যাস)তরলীকৃত গ্যাস৫০,০০০উচ্চ দক্ষতাযুক্ত গৃহস্থালির আদর্শ জ্বালানি
পেট্রোল / ডিজেলতরল৪৫,০০০যানবাহনের জ্বালানি; $\text{CO}_2, \text{NO}_x$ ও ধোঁয়া নির্গমন ঘটায়
কয়লা (Anthracite/Bituminous)কঠিন২৫,০০০ – ৩৩,০০০তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান জ্বালানি; ছাই ও $\text{SO}_2$ তৈরি করে
শুষ্ক কাঠ (Wood)কঠিন১৭,০০০প্রচুর ধোঁয়া ও কার্বন কণা ছড়ায়; বন ধ্বংস করে
ঘুঁটে (Cow Dung Cake)কঠিন৬,০০০ – ৮,০০০সবচেয়ে কম তাপনমূল্য; ঘরের ভেতর চরম বায়ু দূষণ ঘটায়

৪.২ দহনের তিনটি অপরিহার্য শর্ত (Fire Triangle)

দহন হলো একটি দ্রুত তাপমোচী জারণ প্রক্রিয়া। আগুন লাগা এবং দহন অবিচ্ছিন্ন থাকার জন্য তিনটি শর্ত একই সাথে পূরণ হতে হয়:

  1. দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি: যে বস্তু পুড়তে সক্ষম (কাঠ, কয়লা, গ্যাস)।
  2. দহন সহায়কের উপস্থিতি: অক্সিজেন বা বায়ুমণ্ডলের পর্যাপ্ত বাতাস।
  3. প্রজ্বলন উষ্ণতা অর্জন (Ignition Temperature): যে ন্যূনতম তাপমাত্রায় কোনো দাহ্য পদার্থকে উত্তপ্ত করলে তা বাতাসে আগুন ধরে জ্বলতে শুরু করে, তাকে ওই পদার্থের প্রজ্বলন উষ্ণতা বলে। জল ঢাললে বস্তু প্রজ্বলন উষ্ণতার নিচে নেমে আসে এবং আগুন নিভে যায়।

৪.৩ মোমবাতির শিখার চারটি অঞ্চল (Zones of a Candle Flame)

মোমবাতির শিখা হলো বাষ্পীভূত মোমের ব্যাপন শিখা। এর গঠন বিশ্লেষণ করলে চারটি সমকেন্দ্রিক অঞ্চল দেখা যায়:

অঞ্চলের নামদৃশ্যমান রূপদহনের মাত্রাউষ্ণতা ও প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. অদগ্ধ বাষ্পের অন্ধকার মণ্ডল (Innermost Dark Zone) সলের চারপাশে কালো অংশ কোনো দহন হয় না (বাতাস পৌঁছায় না) শিখার শীতলতম অংশ ($\sim ৬০০^\circ\text{সে}$)। এখানে কেবল বাষ্পীভূত মোম থাকে। কাচের নল প্রবেশ করালে অন্য প্রান্তে মোমবাষ্প টেনে নিয়ে পুনরায় পোড়ানো যায়।
২. উজ্জ্বল বা দীপ্তিমান মণ্ডল (Luminous Middle Zone) উজ্জ্বল হলুদ বর্ণযুক্ত বৃহৎ অংশ অসম্পূর্ণ দহন (সীমিত বাতাস) মাঝারি উষ্ণতা ($\sim ১০০০^\circ\text{সে}$)। মোমবাষ্প ভেঙে গিয়ে সূক্ষ্ম কার্বন কণা তৈরি হয়। এই তপ্ত কার্বন কণাগুলো উজ্জ্বল হলুদ আলো বিকিরণ করে। এখানে কাচের প্লেট ধরলে কালো ভুসোকালির দাগ পড়ে।
৩. অনোজ্জ্বল বা নীল মণ্ডল (Non-luminous Outer Zone) পাতলা অস্পষ্ট নীলচে বহিরাবরণ সম্পূর্ণ দহন (প্রচুর অক্সিজেন পায়) শিখার উষ্ণতম অংশ ($>১৪০০^\circ\text{সে}$)। এখানে কার্বন ও হাইড্রোজেন সম্পূর্ণ জারিত হয়ে $\text{CO}_2$ ও জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়। স্বর্ণকারেরা ফুঁকনলের সাহায্যে এই বাইরের অংশটি সোনা বা রূপা গলাতে ব্যবহার করেন।
৪. নীল অঞ্চল (Blue Base Zone) সলতের গোড়ায় ছোট নীল অর্ধচন্দ্র কার্বন মনোক্সাইডের দহন সলতের নিচের অংশে তাজা বাতাস সরাসরি প্রবেশ করায় উৎপন্ন $\text{CO}$ সম্পূর্ণ পুড়ে নীল শিখা তৈরি করে।

৫. বৈশ্বিক কার্বন চক্র, পরিবেশীয় ভারসাম্যহীনতা ও টেকসই শক্তি

৫.১ প্রাকৃতিক কার্বন চক্র (The Global Carbon Cycle)

বায়ুমণ্ডল, জলমণ্ডল, শিলামণ্ডল এবং জীবমণ্ডলের মধ্যে কার্বনের অবিরাম আবর্তনকে কার্বন চক্র (Carbon Cycle) বলে:

  • বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন গ্রহণ (Carbon Sink):
    • উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ: সবুজ উদ্ভিদ সৌরশক্তির সাহায্যে বায়ুমণ্ডলের $\text{CO}_2$ শোষণ করে গ্লুকোজ তৈরি করে এবং অক্সিজেন নির্গত করে: $$6\text{CO}_2 + 6\text{H}_2\text{O} \\\\xrightarrow{\\text{সূর্যালোক, ক্লোরোফিল}} \text{C}_6\text{H}_{12}\text{O}_6 + 6\text{O}_2$$
    • সমুদ্রে দ্রবীভবন: সামুদ্রিক শৈবাল প্রচুর কার্বন শোষণ করে; ঝিনুক ও প্রবাল ক্যালসিয়াম কার্বনেটের খোলস তৈরি করে, যা পরে চুনাপাথরের স্তরে পরিণত হয়।
  • বায়ুমণ্ডলে কার্বন ত্যাগ (Carbon Release):
    • শ্বসন প্রক্রিয়া: সমস্ত প্রাণী ও উদ্ভিদের কোষীয় শ্বসনে কার্বোহাইড্রেট জারিত হয়ে $\text{CO}_2$ নির্গত হয়: $$\text{C}_6\text{H}_{12}\text{O}_6 + 6\text{O}_2 \longrightarrow 6\text{CO}_2\uparrow + 6\text{H}_2\text{O} + \text{শক্তি}$$
    • বিয়োজন: মৃত জীবদেহ পচনের সময় ব্যাকটিরিয়া $\text{CO}_2$ ও মিথেন ত্যাগ করে।
    • আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত: ভূগর্ভের কার্বনেট শিলা গলে গিয়ে নির্গত হয়।

৫.২ মানুষের হস্তক্ষেপে কার্বন চক্রের ভারসাম্যহীনতা

শিল্পবিপ্লবের পূর্বে বায়ুমণ্ডলে $\text{CO}_2$-এর মাত্রা প্রায় ২৮০ পিপিএমে সুষম ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে:

  • জীবাশ্ম জ্বালানির মাত্রাতিরিক্ত দহন: কোটি কোটি বছর ধরে মাটির নিচে জমে থাকা কয়লা ও খনিজ তেল পুড়িয়ে বিপুল কার্বন বায়ুতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
  • নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস: পৃথিবীর প্রাকৃতিক ফুসফুস চিরহরিৎ অরণ্য ধ্বংস করার ফলে প্রাকৃতিক সালোকসংশ্লেষ কমে গেছে।
  • CO₂-এর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি: বায়ুমণ্ডলে $\text{CO}_2$-এর ঘনত্ব বর্তমানে ৪২০ পিপিএম ছাড়িয়ে গেছে। ফলে বাড়তি তাপ অবলোহিত রশ্মি হিসেবে মহাশূন্যে ফিরে যেতে পারছে না।

ভয়াবহ পরিণতি: মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি, সুন্দরবনের মতো দ্বীপভূমির নিমজ্জন, তীব্র সাইক্লোন ও খরা, এবং সমুদ্রের অম্লীকরণ (Ocean Acidification) যেখানে জলে $\text{H}_2\text{CO}_3$ বেড়ে গিয়ে প্রবাল ও সামুদ্রিক প্রাণীদের খোলস ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।

৫.৩ টেকসই ভবিষ্যৎ ও কার্বন প্রশমন

পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষায় আধুনিক বিজ্ঞান কার্বন নিরপেক্ষতার (Carbon Neutrality) ওপর জোর দিচ্ছে:

  • সবুজ শক্তির প্রসার: কয়লা ও পেট্রোলের পরিবর্তে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও গ্রিন হাইড্রোজেন ব্যবহার।
  • বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি: ব্যাপক হারে অরণ্যায়ন সৃষ্টি করে প্রাকৃতিক কার্বন শোষক বাড়ানো।
  • কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ (CCS): কলকারখানার ধোঁয়া থেকে $\text{CO}_2$ পৃথক করে ভূগর্ভে নিরাপদে বন্দি রাখা।
  • 4R নীতি: অপচয় হ্রাস (Reduce), পুনর্ব্যবহার (Reuse), পুনর্নবীকরণ (Recycle) এবং প্লাস্টিক প্রত্যাখ্যান (Refuse)।

গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সমীকরণ, বিক্রিয়া ও সূত্র

ভোহলারের ঐতিহাসিক ইউরিয়া সংশ্লেষণ (১৮২৮)
$$NH_4CNO (অ্যামোনিয়াম সায়ানেট) \→{ Delta} CO(NH_2)_2 (ইউরিয়া)$$
প্রথম ল্যাবরেটরিতে অজৈব লবণ থেকে জৈব যৌগ প্রস্তুতি; প্রাণশক্তি তত্ত্বের অবসান ঘটায়।
কার্বন মনোক্সাইডের অসম্পূর্ণ দহন প্রস্তুতি
$$2C + O_2 (সীমিত বাতাস) 2CO$$
বাতাসের অপ্রতুলতায় ঘটে; বর্ণহীন, গন্ধহীন মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাস।
কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিনের প্রাণঘাতী বিক্রিয়া
$$Hb + CO CO-Hb (কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন)$$
হিমোগ্লোবিনের সাথে CO-এর আকর্ষণ অক্সিজেনের চেয়ে ২৫০-৩০০ গুণ তীব্র, ফলে রক্তে শ্বাসরোধ ঘটে।
ব্লাস্ট ফার্নেসে লোহা আকরিকের বিজারণ
$$\text{Fe}_2\text{O}_3 + 3\text{CO} \\xrightarrow{\\Delta} 2\text{Fe} + 3\text{CO}_2\uparrow$$
উচ্চ তাপমাত্রায় CO-এর শক্তিশালী বিজারক ধর্মের প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
কার্বনের সম্পূর্ণ দহন সমীকরণ
$$C + O_2 (পর্যাপ্ত বাতাস) CO_2 + ৩৯৩.৫ kJ$$
তীব্র তাপমোচী বিক্রিয়া; উৎপন্ন গ্যাস আম্লিক ও চুনজল ঘোলা করে।
কার্বনিক অ্যাসিড গঠন (আম্লিক অক্সাইড)
$$CO_2 + H_2O H_2CO_3 (কার্বনিক অ্যাসিড)$$
মৃদু দ্বি-ক্ষারকীয় অ্যাসিড যা নীল লিটমাস লাল করে এবং সমুদ্রের জলের অম্লীকরণ ঘটায়।
সালোকসংশ্লেষের প্রাকৃতিক কার্বন শোষণ
$$6CO_2 + 6H_2O \→{আলো, ক্লোরোফিল} C_6H_{12}O_6 + 6O_2$$
পৃথিবীর প্রধান জৈব প্রক্রিয়া যা বায়ুর কার্বন হ্রাস করে পরিবেশীয় ভারসাম্য রক্ষা করে।
জ্বালানির তাপনমূল্যের শক্তি সমীকরণ
$$Q = m × তাপনমূল্য (kJ = kg × kJ/kg)$$
হাইড্রোজেনের তাপনমূল্য সর্বোচ্চ (১৫০,০০০ kJ/kg), মিথেন (৫৫,০০০) ও এলপিজি (৫০,০০০)।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
হিরে ও গ্রাফাইট উভয়ই কেবল কার্বন পরমাণু দ্বারা গঠিত হওয়া সত্ত্বেও গ্রাফাইট বিদ্যুতের সুপরিবাহী কিন্তু হিরে সম্পূর্ণ অপরিবাহী কেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

আণবিক বন্ধনের বিজ্ঞানসম্মত কারণ:

  1. হিরের চতুস্তলকীয় কাঠামো ($sp^3$): হিরের কেলাসে প্রতিটি কার্বন পরমাণু তার চারটি যোজ্যতা ইলেকট্রন ব্যবহার করে পাশের চারটি কার্বন পরমাণুর সাথে শক্তিশালী সমযোজী একক বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। ফলে হিরের কাঠামোর মধ্যে কোনো মুক্ত বা ভ্রাম্যমাণ ইলেকট্রন থাকে না। তড়িৎ পরিবহনের মতো কোনো বাহক না থাকায় হিরে বিদ্যুতের সম্পূর্ণ অপরিবাহী বা অন্তরক।
  2. গ্রাফাইটের স্তরিত কাঠামো ($sp^2$): গ্রাফাইটে প্রতিটি কার্বন পরমাণু অন্য তিনটি কার্বন পরমাণুর সাথে সমযোজী বন্ধনে যুক্ত হয়ে ষড়ভুজাকার স্তর তৈরি করে। ফলে প্রতিটি কার্বনের চতুর্থ যোজ্যতা ইলেকট্রনটি বন্ধনমুক্ত থাকে এবং স্তরের মধ্যে মুক্ত পাই ($\pi$) ইলেকট্রন হিসেবে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। এই ভ্রাম্যমাণ ইলেকট্রনগুলোর কারণেই গ্রাফাইট বিদ্যুতের উত্তম সুপরিবাহী।
উদাহরণ 2
শীতকালে সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ করে শোবার ঘরে জ্বলন্ত কয়লার উনুন (আঙিঠি) রেখে ঘুমানো প্রাণঘাতী কেন? ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

চিকিৎসা ও রাসায়নিক ব্যাখ্যা:

  1. অসম্পূর্ণ দহন: একটি বন্ধ ঘরের সমস্ত দরজা-জানালা বন্ধ থাকলে ঘরের ভেতরের বাতাস থেকে জ্বলন্ত কয়লা দ্রুত অক্সিজেন শেষ করে ফেলে। অক্সিজেনের জোগান কমে গেলেই কয়লার অসম্পূর্ণ দহন শুরু হয় এবং প্রচুর পরিমাণে কার্বন মনোক্সাইড ($ ext{CO}$) গ্যাস উৎপন্ন হয়: $2 ext{C} + ext{O}_2 o 2 ext{CO}$।
  2. কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন সৃষ্টি: $ ext{CO}$ একটি বর্ণহীন ও গন্ধহীন গ্যাস, তাই মানুষ ঘুমের মধ্যে বুঝতেই পারে না। রক্তের লোহিত কণিকায় থাকা হিমোগ্লোবিনের সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে $ ext{CO}$-এর আকর্ষণ অক্সিজেনের চেয়ে ২৫০ থেকে ৩০০ গুণ বেশি। ফলে প্রশ্বাসে গৃহীত $ ext{CO}$ অতি দ্রুত রক্তের সাথে মিশে অত্যন্ত স্থায়ী কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন ($ ext{CO-Hb}$) তৈরি করে।
  3. শ্বাসরোধে মৃত্যু: এর ফলে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনের ক্ষমতা বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ গভীর অচেতনতায় চলে যায়, পেশি অবশ হয়ে যাওয়ার কারণে ঘুম থেকে ওঠার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে এবং নিঃশব্দে শ্বাসরোধে মারা যায়।
উদাহরণ 3
কার্বনের ক্যাটিনেশন ধর্ম বলতে কী বোঝায়? সিলিকনের চেয়ে কার্বন কেন এই ধর্ম অনেক বেশি দৃঢ়ভাবে প্রদর্শন করে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

উত্তর:

ক্যাটিনেশন ধর্ম: যে ধর্মের জন্য কোনো মৌলের পরমাণুসমূহ পরস্পরের সাথে সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দীর্ঘ অবিচ্ছিন্ন সরল শৃঙ্খল, শাখাযুক্ত শৃঙ্খল বা বলয় গঠন করতে পারে, তাকে ক্যাটিনেশন বলে।

সিলিকনের চেয়ে কার্বনের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ:

  • ক্ষুদ্র পারমাণবিক আকার: কার্বনের পরমাণুর আকার খুব ছোট (ব্যাসার্ধ ৭৭ পিকোমিটার)। ফলে দুটি কার্বন পরমাণুর নিউক্লিয়াস তাদের মধ্যবর্তী শেয়ার করা ইলেকট্রন জোড়কে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আকর্ষণ করে ধরে রাখে এবং $ ext{C}- ext{C}$ বন্ধনের শক্তি অপরিসীম হয় (৩৪৮ kJ/mol)।
  • সিলিকনের দুর্বল বন্ধন: সিলিকনের পরমাণুর আকার বেশ বড় (১১৮ পিকোমিটার)। ফলে $ ext{Si}- ext{Si}$ বন্ধন দৈর্ঘ্য বেশি ও বন্ধন শক্তি দুর্বল হয় (২২২ kJ/mol)। তাই সিলিকন ৭-৮টির বেশি পরমাণুর শৃঙ্খল গঠন করতে পারে না, অথচ কার্বন হাজার হাজার পরমাণু যুক্ত করে সুস্থিত পলিমার ও দীর্ঘ জৈব অণু গঠন করতে পারে।
উদাহরণ 4
মোমবাতির শিখার গঠন সংক্ষেপে বর্ণনা করো। স্বর্ণকারেরা সোনা গলাতে কোন অঞ্চলটি ব্যবহার করেন এবং কেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

মোমবাতির শিখার চারটি অঞ্চল:

  1. অদগ্ধ বাষ্পের অন্ধকার মণ্ডল: সলতের একদম গোড়ার কালো অংশ; কোনো দহন হয় না; শীতলতম ($\sim ৬০০^\circ ext{সে}$)।
  2. দীপ্তিমান মণ্ডল: হলুদ ও উজ্জ্বল অংশ; অসম্পূর্ণ দহনের ফলে তপ্ত কার্বন কণা হলুদ আলো ছড়ায়; মাঝারি গরম ($\sim ১০০০^\circ ext{সে}$)।
  3. অনোজ্জ্বল বহিরাঞ্চল: বাইরের পাতলা নীল আবরণ; সম্পূর্ণ দহন ঘটে; শিখার উষ্ণতম অংশ ($>১৪০০^\circ ext{সে}$)।
  4. নীল অঞ্চল: সলতের তলদেশের অংশ যেখানে কার্বন মনোক্সাইড পুড়ে নীল শিখা তৈরি করে।

স্বর্ণকারদের ব্যবহার: স্বর্ণকারেরা ধাতুর তৈরি ফুঁকনলের সাহায্যে শিখার বাইরের অনোজ্জ্বল নীল মণ্ডলটিকে সোনা ও রূপার ওপর পরিচালিত করেন। কারণ এটি পর্যাপ্ত বাতাসের উপস্থিতিতে সম্পূর্ণ দহন ঘটায় বলে কোনো ভুসোকালি ফেলে না এবং এটিই শিখার সর্বোচ্চ তাপমাত্রাযুক্ত জারণ অংশ, যা সোনা ও রূপার মতো উচ্চ গলনাঙ্কের ধাতুকে দ্রুত গলিয়ে ফেলতে সক্ষম।

উদাহরণ 5
৪ কিলোগ্রাম এলপিজি (LPG) সম্পূর্ণ পুড়িয়ে কত পরিমাণ তাপশক্তি পাওয়া যাবে? (এলপিজির তাপনমূল্য ৫০,০০০ কিলোজুল/কেজি)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

গাণিতিক সমাধান:

আমরা জানি,

$$ ext{মোট উৎপন্ন তাপশক্তি } (Q) = ext{জ্বালানির ভর } (m) imes ext{জ্বালানির তাপনমূল্য}$$

প্রদত্ত:
জ্বালানির ভর $m = ৪ ext{ কেজি}$
এলপিজির তাপনমূল্য $= ৫০,০০০ ext{ kJ/kg}$

$$Q = ৪ ext{ কেজি} imes ৫০,০০০ ext{ kJ/kg} = \mathbf{২,০০,০০০ ext{ কিলোজুল}} = \mathbf{২ imes ১০^৫ ext{ kJ}}$$

অতএব, ৪ কেজি এলপিজি সম্পূর্ণ পুড়লে ২,০০,০০০ কিলোজুল তাপশক্তি পাওয়া যাবে।

উদাহরণ 6
প্রাণশক্তি তত্ত্ব কী ছিল? ১৮২৮ সালে ফ্রেডরিখ ভোহলার কীভাবে এই তত্ত্ব ভুল প্রমাণ করেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ঐতিহাসিক পটভূমি ও পরীক্ষা:

প্রাণশক্তি তত্ত্ব: বিজ্ঞানী বার্জেলিয়াসের মতে, জৈব যৌগগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়; এগুলো কেবলমাত্র জীবিত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহের ভেতরে এক অলৌকিক "প্রাণশক্তি" (Vital Force)-এর প্রভাবেই তৈরি হতে পারে।

ভোহলারের আবিষ্কার (১৮২৮): জার্মান রসায়নবিদ ফ্রেডরিখ ভোহলার পরীক্ষাগারে পটাশিয়াম সায়ানেট ও অ্যামোনিয়াম সালফেট মিশিয়ে অজৈব খনিজ লবণ অ্যামোনিয়াম সায়ানেট ($ ext{NH}_4 ext{CNO}$) দ্রবণকে বাষ্পীভূত করতে গিয়ে দেখেন যে পরমাণুগুলোর পুনর্বিন্যাস ঘটে জীবদেহের মূত্রে প্রাপ্ত সুপরিচিত জৈব পদার্থ ইউরিয়া [$ ext{CO(NH}_2)_2$] তৈরি হয়ে গেছে:

$$\mathbf{ ext{NH}_4 ext{CNO} ext{ (অজৈব লবণ)} \\xrightarrow{\\Delta} ext{CO(NH}_2)_2 ext{ (ইউরিয়া, জৈব যৌগ)}}$$

সম্পূর্ণ নির্জীব অজৈব পদার্থ থেকে পরীক্ষাগারে একটি জৈব যৌগ সংশ্লেষিত হওয়ায় প্রাণশক্তি তত্ত্বের অবসান ঘটে এবং প্রমাণিত হয় যে জৈব রসায়ন মূলত কার্বন যৌগেরই রসায়ন।

উদাহরণ 7
সক্রিয় চারকোল কী? গ্যাস মাস্ক, জল ফিল্টার ও চিনির কারখানায় এটি কেন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ:

সক্রিয় চারকোল: কাঠকয়লাকে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় ($৮০০-১০০০^\circ ext{সে}$) বাষ্প বা বাতাসের সাহায্যে উত্তপ্ত করলে এর অভ্যন্তরীণ ছিদ্রগুলো পরিষ্কার হয়ে যায় এবং এর কার্যকরী ক্ষেত্রফল বিপুল বৃদ্ধি পায় (১ গ্রাম চারকোলের ক্ষেত্রফল ১০০০ বর্গমিটারেরও বেশি হয়)। একে সক্রিয় চারকোল বলে।

ব্যবহারের কারণ:

  • পৃষ্ঠতলীয় শোষণ (Adsorption): এর বিপুল পৃষ্ঠতলে ভ্যান ডার ওয়ালস বলের মাধ্যমে বিষাক্ত গ্যাস, দুর্গন্ধ ও রঙিন পদার্থ শক্তভাবে আটকে থাকে।
  • প্রয়োগ: গ্যাস মাস্কে এটি ক্লোরিন, ফসজিনের মতো বিষাক্ত গ্যাস আটকে দিয়ে সেনাসদস্যদের জীবন রক্ষা করে। জল ফিল্টারে এটি জলের অতিরিক্ত ক্লোরিন, কীটনাশক ও দুর্গন্ধ দূর করে। চিনির কারখানায় এটি লালচে-বাদামি গুড়ের রঙ শুষে নিয়ে খাঁটি সাদা চিনি তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ 8
বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত কার্বন ডাইঅক্সাইড কীভাবে "সমুদ্রের অম্লীকরণ" ঘটায়? সমীকরণসহ আলোচনা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

সমুদ্র রসায়নের প্রক্রিয়া:

বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত $ ext{CO}_2$-এর প্রায় ৩০% সমুদ্রের জলে দ্রবীভূত হয়। দ্রবীভূত $ ext{CO}_2$ জলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে মৃদু কার্বনিক অ্যাসিড গঠন করে:

$$\mathbf{ ext{CO}_2 + ext{H}_2 ext{O} ightleftharpoons ext{H}_2 ext{CO}_3 ext{ (কার্বনিক অ্যাসিড)}}$$

কার্বনিক অ্যাসিড বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন ($ ext{H}^+$) মুক্ত করে, যা সমুদ্রের জলের $ ext{pH}$ মান কমিয়ে দেয় (জলকে আম্লিক করে তোলে):

$$ ext{H}_2 ext{CO}_3 ightleftharpoons ext{H}^+ + ext{HCO}_3^-$$

এই অতিরিক্ত মুক্ত $ ext{H}^+$ আয়ন জলে থাকা কার্বনেট আয়নের ($ ext{CO}_3^{2-}$) সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে সামুদ্রিক প্রাণী (শামুক, ঝিনুক, প্রবাল) তাদের খোলস গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম কার্বনেট ($ ext{CaCO}_3$) তৈরি করতে পারে না এবং বিদ্যমান প্রবাল প্রাচীর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ধ্বংসের মুখে পড়ে। একেই সমুদ্রের অম্লীকরণ (Ocean Acidification) বলে।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

হিরে এবং গ্রাফাইটকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মৌল মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

হিরে ও গ্রাফাইট দুটিই একই মৌলিক পদার্থ কার্বনের ভিন্ন রূপভেদ। সমান ভরের হিরে ও গ্রাফাইটকে অক্সিজেনে সম্পূর্ণ পোড়ালে উভয় ক্ষেত্র থেকেই কেবলমাত্র সমান ভরের বিশুদ্ধ $ ext{CO}_2$ উৎপন্ন হয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

অধাতু মাত্রেই বিদ্যুতের অপরিবাহী ভাবা এবং গ্রাফাইটকেও অপরিবাহী মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

গ্রাফাইট হলো একটি ব্যতিক্রমী অধাতু যা বিদ্যুতের উত্তম সুপরিবাহী। এর স্তরিত গঠনের প্রতি কার্বনে একটি করে মুক্ত পাই ($\pi$) ইলেকট্রন স্বাধীনভাবে বিদ্যুৎ বহন করে।

সাধারণ ভুল ধারণা

পেন্সিলের শিষের মধ্যে ধাতব সিসা (Lead) থাকে বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

পেন্সিলের শিষে এক ফোঁটাও ধাতব সিসা থাকে না। এটি হলো খাঁটি গ্রাফাইট গুঁড়ো এবং নরম কাদার (Clay) মিশ্রণ পুড়িয়ে তৈরি অবিষাক্ত উপাদান।

সাধারণ ভুল ধারণা

কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) ও কার্বন মনোক্সাইডের (CO) বিষাক্ততাকে গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

$ ext{CO}_2$ অবিষাক্ত (সোডা ওয়াটার ও আমাদের প্রশ্বাসে থাকে)। কিন্তু কার্বন মনোক্সাইড ($ ext{CO}$) একটি মারাত্মক রক্তবিষ যা কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন তৈরি করে মানুষকে নিঃশব্দে মেরে ফেলে।

সাধারণ ভুল ধারণা

মোমবাতির উজ্জ্বল হলুদ অংশটিকে সবচেয়ে গরম অঞ্চল মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

শিখার বাইরের অনোজ্জ্বল নীল মণ্ডলটি হলো উষ্ণতম অঞ্চল ($>১৪০০^\circ ext{সে}$)। হলুদ অংশটি মাঝারি গরম ($\sim ১০০০^\circ ext{সে}$); এর আলো আসে জ্বলন্ত অপূর্ণ কার্বন কণার দ্যুতি থেকে।

সাধারণ ভুল ধারণা

জৈব যৌগ কেবল জীবদেহ থেকেই পাওয়া সম্ভব বলে বিশ্বাস করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

১৮২৮ সালে ফ্রেডরিখ ভোহলার অজৈব খনিজ লবণ অ্যামোনিয়াম সায়ানেট থেকে ইউরিয়া সংশ্লেষণ করে প্রমাণ করেন যে পরীক্ষাগারে কৃত্রিমভাবে জৈব যৌগ তৈরি করা সম্ভব।

সাধারণ ভুল ধারণা

চারকোলের পৃষ্ঠতলীয় শোষণকে (Adsorption) সাধারণ শোষণ (Absorption) মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সাধারণ শোষণ (Absorption) হলো বস্তুর ভেতরের সমগ্র আয়তনে প্রবেশ করা (যেমন স্পঞ্জে জল ঢোকা)। অধিActive শোষণ বা পৃষ্ঠতলীয় শোষণ (Adsorption) কেবল কঠিনের বহিরাবরণ ও ছিদ্রের গায়ে কণা আটকে থাকা।

প্রকৃতিতে কার্বন ও তার যৌগ — ৪-কোয়াড্র্যান্ট কনসেপ্ট ম্যাপ

প্রকৃতিতে কার্বন ও তার যৌগ (Occurrence of Carbon & Its Compounds) – WBBSE Class 8 চারটি মূল স্তম্ভ: কার্বনের রূপভেদতা • কার্বনের অক্সাইড (CO ও CO₂) • ক্যাটিনেশন ও হাইড্রোকার্বন • জ্বালানি, শিখা ও কার্বন চক্র ১. কার্বনের রূপভেদতা (Allotropes of Carbon) হিরে (Diamond): ত্রিমাত্রিক চতুস্তলকীয় (sp³); কঠিনতম প্রাকৃতিক পদার্থ; অন্তরক গ্রাফাইট (Graphite): ষড়ভুজীয় স্তরিত (sp²); মুক্ত π-ইলেকট্রন (সুপরিবাহী); পিচ্ছিলকারক ফুলারিন ও অকেলাসাকার: C₆₀ বাকিবল; কয়লা, কোক, চারকোল (অধিActive শোষণ) ★ তড়িৎ পরিবাহী অধাতু: গ্রাফাইট • হিরের উজ্জ্বল ঝিলিক: প্রতিসরাঙ্ক ২.৪২ ২. কার্বনের অক্সাইডসমূহ: বিষাক্ত CO বনাম আম্লিক CO₂ কার্বন মনোক্সাইড (CO): অসম্পূর্ণ দহনে সৃষ্টি; নীরব ঘাতক; হিমোগ্লোবিনে ২৫০ গুণ আসক্তি কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন: রক্তে অক্সিজেন পরিবহন চিরতরে রুদ্ধ করে শ্বাসরোধ ও মৃত্যু ঘটায় কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂): সম্পূর্ণ দহনে তৈরি; চুনজল ঘোলা করে; শুষ্ক বরফ (-৭৮.৫°C) ★ বদ্ধ ঘরে জ্বলন্ত কয়লার উনুন রেখে ঘুমানো প্রাণঘাতী (CO বিষক্রিয়া) ৩. চতুর্যোয্যতা, ক্যাটিনেশন ও হাইড্রোকার্বন চতুর্যোয্যতা ও ক্যাটিনেশন: ৪টি সমযোজী বন্ধন; স্ব-সংযোজনে দীর্ঘ শৃঙ্খল ও বলয় গঠন ভোহলারের সংশ্লেষণ (১৮২৮): NH₄CNO ➔ CO(NH₂)₂ (ইউরিয়া); প্রাণশক্তি তত্ত্বের অবসান পরিচিত হাইড্রোকার্বন: মিথেন (CH₄, সিএনজি), ইথেন (C₂H₆), অ্যাসিটিলিন (C₂H₂) ★ ক্যাটিনেশন ও চতুর্যোয্যতার জন্যই প্রকৃতিতে লক্ষ লক্ষ কার্বন যৌগ সৃষ্টি হয় ৪. জ্বালানি, মোমবাতির শিখা ও বৈশ্বিক কার্বন চক্র জ্বালানির তাপনমূল্য (kJ/kg): H₂ (১৫০k) > CH₄/CNG (৫৫k) > LPG (৫০k) > কয়লা (৩০k) মোমবাতির শিখা (৪টি মণ্ডল): অদগ্ধ বাষ্পের মণ্ডল (শীতল) • দীপ্তিমান (হলুদ) • অনোজ্জ্বল (উষ্ণতম) কার্বন চক্রের ভারসাম্য: সালোকসংশ্লেষে CO₂ গ্রহণ; শ্বসন ও জীবাশ্ম জ্বালানিতে CO₂ ত্যাগ ★ বাইরের অনোজ্জ্বল নীল মণ্ডলটি সম্পূর্ণ দহনের উষ্ণতম জারণ শিখা

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
কার্বনের উপস্থিতি: মুক্ত অবস্থায় হিরে, গ্রাফাইট ও ফুলারিন; যৌগ অবস্থায় কার্বনেট শিলা, জীবাশ্ম জ্বালানি, জৈব অণু ও বায়ুর CO₂।
মূল বিষয় 2
হিরে বনাম গ্রাফাইট: হিরে চতুস্তলকীয় ত্রিমাত্রিক sp³ জালক, কঠিনতম পদার্থ, তড়িৎ অপরিবাহী; গ্রাফাইট ষড়ভুজীয় sp² স্তরিত কাঠামো, পিচ্ছিলকারক, মুক্ত পাই ইলেকট্রনের জন্য সুপরিবাহী।
মূল বিষয় 3
সক্রিয় চারকোল: বিপুল পৃষ্ঠতলযুক্ত অকেলাসাকার কার্বন; পৃষ্ঠতলীয় শোষণের মাধ্যমে বিষাক্ত গ্যাস, দুর্গন্ধ ও রঙ দূর করে।
মূল বিষয় 4
কার্বন মনোক্সাইড (CO): অসম্পূর্ণ দহনে তৈরি "নীরব ঘাতক"; হিমোগ্লোবিনের সাথে ২৫০-৩০০ গুণ বেশি শক্তিতে যুক্ত হয়ে কার্বক্সি-হিমোগ্লোবিন গঠন করে শ্বাসরোধ ঘটায়।
মূল বিষয় 5
জৈব রসায়ন ও ভোহলার: ১৮২৮ সালে অ্যামোনিয়াম সায়ানেট থেকে ইউরিয়া সংশ্লেষণ করে প্রাণশক্তি তত্ত্বের অবসান ঘটান। কার্বনের চতুর্যোয্যতা ও ক্যাটিনেশন ধর্ম লক্ষ লক্ষ যৌগ সৃষ্টি করে।
মূল বিষয় 6
হাইড্রোকার্বন: সম্পৃক্ত মিথেন (CH₄, সিএনজি) ও ইথেন; অসম্পৃক্ত ইথিলিন (C₂H₄, ফল পাকানো) ও অ্যাসিটিলিন (C₂H₂, ৩০০০°সে ঝালাই শিখা)।
মূল বিষয় 7
জ্বালানি ও শিখা: হাইড্রোজেনের তাপনমূল্য সর্বোচ্চ (১৫০,০০০ kJ/kg), মিথেন (৫৫,০০০) ও এলপিজি (৫০,০০০)। মোমবাতির শিখার বাইরের অনোজ্জ্বল নীল মণ্ডলটি উষ্ণতম।
মূল বিষয় 8
কার্বন চক্র: সালোকসংশ্লেষ কার্বন শোষণ করে এবং শ্বসন/দহন কার্বন ত্যাগ করে; অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি দহন বিশ্ব উষ্ণায়ন ও সমুদ্রের অম্লীকরণ ঘটাচ্ছে।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
ভারী যন্ত্রপাতিতে সাধারণ পিচ্ছিলকারক তেলের পরিবর্তে গ্রাফাইটকে কঠিন পিচ্ছিলকারক (Solid Lubricant) হিসেবে ব্যবহার করা হয় কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

গ্রাফাইটের কেলাসে কার্বন পরমাণুগুলো সমতলীয় ষড়ভুজাকার স্তর গঠন করে, কিন্তু স্তরগুলো পরস্পরের সাথে অত্যন্ত দুর্বল ভ্যান ডার ওয়ালস আকর্ষণ বল দ্বারা যুক্ত থাকে। ফলে সামান্য চাপেই স্তরগুলো একে অপরের ওপর মসৃণভাবে পিছলে যায়, যা চমৎকার পিচ্ছিলকারক ভাব এনে দেয়। তাছাড়া উচ্চ তাপমাত্রায় সাধারণ তৈলাক্ত তেল পুড়ে বাষ্পীভূত হয়ে বা ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু গ্রাফাইট ৬০০°সে-এর বেশি তাপমাত্রাতেও কেলাস গঠন অক্ষুণ্ণ রেখে কার্যকর পিচ্ছিলকারক হিসেবে কাজ করে যেতে পারে।


2
সম্পৃক্ত ও অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বনের মধ্যে কাঠামোগত পার্থক্য কী? প্রতিটির একটি করে উদাহরণ দাও।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন (অ্যালকেন): যে সমস্ত হাইড্রোকার্বনে কার্বন পরমাণুগুলো পরস্পরের সাথে কেবল একক সমযোজী বন্ধন ($ ext{C}- ext{C}$) দ্বারা যুক্ত থাকে এবং অবশিষ্ট যোজ্যতা হাইড্রোজেন দ্বারা পূর্ণ থাকে, তাদের সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন বলে। উদাহরণ: মিথেন ($ ext{CH}_4$) বা ইথেন ($ ext{C}_2 ext{H}_6$)।

অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন (অ্যালকিন ও অ্যালকাইন): যে সমস্ত হাইড্রোকার্বনে অন্তত দুটি কার্বন পরমাণু পরস্পরের সাথে দ্বিবন্ধন ($ ext{C}= ext{C}$) বা ত্রিবন্ধন ($ ext{C}\equiv ext{C}$) দ্বারা আবদ্ধ থাকে, তাদের অসম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন বলে। উদাহরণ: ইথিলিন ($ ext{C}_2 ext{H}_4$) বা অ্যাসিটিলিন ($ ext{C}_2 ext{H}_2$)।


3
মোমবাতির শিখার দীপ্তিমান অঞ্চলে একটি পরিষ্কার কাচের প্লেট কিছুক্ষণ ধরলে কালো দাগ পড়ে, কিন্তু বাইরের অনোজ্জ্বল অঞ্চলে ধরলে কোনো দাগ পড়ে না কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

দীপ্তিমান মধ্যমঞ্চলে অক্সিজেনের অভাবের কারণে মোমবাষ্পের অসম্পূর্ণ দহন ঘটে এবং বাষ্প ভেঙে গিয়ে অতিক্ষুদ্র কঠিন কার্বন কণা তৈরি হয়। কাচের ঠান্ডা প্লেট ধরলে এই অপূর্ণ দগ্ধ তপ্ত কার্বন কণাগুলো প্লেটের গায়ে ঠান্ডা হয়ে কালো ভুসোকালি (Lampblack) হিসেবে জমা হয়। অন্যদিকে অনোজ্জ্বল বহিরাঞ্চলে পর্যাপ্ত বাতাসের অক্সিজেন পাওয়ার ফলে সমস্ত কার্বন ও মোমবাষ্প সম্পূর্ণ পুড়ে গিয়ে গ্যাসীয় $ ext{CO}_2$ ও জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়, তাই কোনো অকালে পুড়ে যাওয়া কার্বন কণা অবশিষ্ট থাকে না এবং কাচের প্লেটে কোনো দাগ পড়ে না।


4
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা পোড়ানো কীভাবে বিশ্ব উষ্ণায়ন ও অ্যাসিড বৃষ্টি উভয়ের জন্যই দায়ী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

কয়লা মূলত কার্বন দ্বারা গঠিত হলেও এতে সামান্য সালফার ও নাইট্রোজেন মিশ্রিত থাকে। কয়লার সম্পূর্ণ দহনে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড ($ ext{CO}_2$) নির্গত হয়, যা মুখ্য গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে নির্গত অবলোহিত রশ্মি শোষণ করে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটায়। একই সাথে কয়লায় থাকা সালফার ও নাইট্রোজেন পুড়ে সালফার ডাইঅক্সাইড ($ ext{SO}_2$) ও নাইট্রোজেনের অক্সাইড ($ ext{NO}_x$) উৎপন্ন করে। এই গ্যাসগুলো বৃষ্টির জলে জারিত হয়ে সালফিউরিক ও নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে অ্যাসিড বৃষ্টি ঘটায়।


5
কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে জৈব রসায়নের "প্রাণশক্তি তত্ত্ব" অপ্রমাণিত হয়েছিল? বিজ্ঞানীর নাম, সাল ও সমীকরণটি লেখো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

জার্মান রসায়নবিদ ফ্রেডরিখ ভোহলার (Friedrich Wöhler) ১৮২৮ সালে অজৈব খনিজ লবণ অ্যামোনিয়াম সায়ানেট ($ ext{NH}_4 ext{CNO}$)-কে উত্তপ্ত করে স্তন্যপায়ী প্রাণীর মূত্রে প্রাপ্ত সুপরিচিত জৈব পদার্থ ইউরিয়া [$ ext{CO(NH}_2)_2$] সংশ্লেষণ করে প্রাণশক্তি তত্ত্ব ভুল প্রমাণ করেন:

$$\mathbf{ ext{NH}_4 ext{CNO} ext{ (অ্যামোনিয়াম সায়ানেট)} \\xrightarrow{\\Delta} \text{CO(NH}_2)_2\text{ (ইউরিয়া)}}$$


অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

প্রকৃতিতে কার্বন ও তার যৌগ অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।