১.১ জীববৈচিত্র্য কী? জীবনের তিনটি প্রধান স্তর
জীববৈচিত্র্য (Biodiversity) শব্দটি ১৯৮৫ সালে বিজ্ঞানী ওয়াল্টার জি. রোজেন প্রথম ব্যবহার করেন এবং বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড ও. উইলসন এটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। সহজ কথায়, জল, স্থল ও অন্তরীক্ষে বসবাসকারী সমস্ত জীব প্রজাতির জিনগত, প্রজাতিগত ও তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থানের সামগ্রিক বৈচিত্র্যকেই জীববৈচিত্র্য বলে।
- ১. জিনগত বৈচিত্র্য (Genetic Diversity): একই প্রজাতির বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে জিন বা অ্যালিলের ভিন্নতার কারণে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়। যেমন—ভারতে দেশি ধানের (Oryza sativa) প্রায় ৫০,০০০-এর বেশি জিনগত প্রকারভেদ এবং আমের ১,০০০-এর বেশি জাত রয়েছে। জিনগত বৈচিত্র্য বেশি থাকলে প্রজাতিটি পরিবর্তিত জলবায়ু বা নতুন রোগবালাইয়ের আক্রমণ সহজেই প্রতিরোধ করতে পারে।
- ২. প্রজাতিগত বৈচিত্র্য (Species Diversity): একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাচুর্য ও অনুপাত। এটি দুটি উপাদানে গঠিত:
- প্রজাতির প্রাচুর্য (Species Richness): একটি অঞ্চলে মোট কত ভিন্ন প্রজাতির জীব রয়েছে তার সংখ্যা।
- প্রজাতির আপেক্ষিক সমতা (Species Evenness): সেই অঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির মোট সদস্য সংখ্যার তুলনামূলক অনুপাত।
- ৩. বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য (Ecosystem Diversity): কোনো বৃহৎ ভৌগোলিক অঞ্চলে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রকার বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য। স্থানভেদে এটি তিন প্রকার:
- আলফা ($\alpha$) বৈচিত্র্য: একটি নির্দিষ্ট স্থানীয় বাসস্থান বা জীবগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য।
- বিটা ($\beta$) বৈচিত্র্য: পাশাপাশি দুটি ভিন্ন বাসস্থানের পরিবেশীয় ঢাল বরাবর প্রজাতির প্রতিস্থাপনের হার।
- গামা ($\gamma$) বৈচিত্র্য: একটি সম্পূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চলের একাধিক বাস্তুতন্ত্রের সম্মিলিত সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য।
১.২ জীববৈচিত্র্যের অমূল্য বাস্তুতান্ত্রিক পরিষেবা
প্রকৃতি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য যেসব নিঃশুল্ক পরিষেবা প্রদান করে, জীববৈচিত্র্য হলো তার মূল কারিগর:
| বাস্তুতান্ত্রিক পরিষেবার ধরন | প্রাকৃতিক ভূমিকা ও কার্যপদ্ধতি | বাস্তব উদাহরণ |
|---|---|---|
| উৎপাদনগত পরিষেবা (Provisioning) | বাস্তুতন্ত্র থেকে সরাসরি খাদ্য, ওষুধ, বস্ত্র ও জ্বালানি কাঁচামাল আহরণ। | খাদ্যশস্য, ভোজ্য মাছ, জীবনদায়ী ওষুধ (কুইনাইন, ভিনক্রিস্টিন), কাষ্ঠ ও পানীয় জল। |
| নিয়ন্ত্রণকারী পরিষেবা (Regulating) | জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, বন্যা ও ঝড় প্রতিরোধ, এবং বর্জ্য শোধন। | সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ৬০-৬৬% কমিয়ে দেয়; অরণ্য কোটি কোটি টন কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে। |
| সহায়ক পরিষেবা (Supporting) | অন্যান্য সমস্ত পরিষেবা চালু রাখার জন্য মৌলিক জৈব-ভূরাসায়নিক চক্র সচল রাখা। | সালোকসংশ্লেষে অক্সিজেন উৎপাদন, মাটিতে নাইট্রোজেন ও ফসফরাস চক্র সচল রাখা, মাটি গঠন। |
| পরাগমিলন ও জৈব নিয়ন্ত্রণ | শস্যের ফলন নিশ্চিতকরণ ও প্রাকৃতিক উপায়ে ক্ষতিকর পোকা দমন। | মৌমাছি দ্বারা বিশ্বের ৭৫% ফসলের পরাগায়ন; পেঁচা ও বাদুড় দ্বারা প্রতি রাতে ক্ষতিকর ইঁদুর ও পোকা শিকার। |
১.৩ জীববৈচিত্র্য হটস্পট (Biodiversity Hotspots)
ব্রিটিশ বাস্তুবিদ নরম্যান মায়ার্স ১৯৮৮ সালে প্রথম "বায়োডাইভার্সিটি হটস্পট" ধারণাটি প্রবর্তন করেন। এটি হলো পৃথিবীর এমন কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল ভৌগোলিক অঞ্চল যেখানে প্রচুর পরিমাণে অনন্য প্রজাতির জীব বাস করে কিন্তু তাদের বাসস্থান আজ চরম ধ্বংসের মুখে।
- হটস্পট ঘোষণার দুটি বাধ্যতামূলক বৈজ্ঞানিক শর্ত:
- অঞ্চলটিতে অন্তত ১,৫০০ প্রজাতির সংবাহী উদ্ভিদকে স্থানীয় বা এন্ডেমিক (Endemic) হতে হবে (অর্থাৎ এরা পৃথিবীর অন্য কোথাও প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় না)।
- অঞ্চলটির মূল আদিম প্রাকৃতিক বাসস্থানের অন্তত ৭০% অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে (অর্থাৎ বর্তমানে মাত্র ৩০% বা তার কম বাসস্থান অবশিষ্ট রয়েছে)।
- ভারতের ৪টি জীববৈচিত্র্য হটস্পট:
বিশ্বে বর্তমানে ৩৬টি স্বীকৃত হটস্পট রয়েছে, যার মধ্যে ৪টি অংশত বা পূর্ণাঙ্গভাবে ভারতে অবস্থিত:
হটস্পটের নাম ভৌগোলিক বিস্তার উল্লেখযোগ্য এন্ডেমিক ও বিপন্ন প্রজাতি ১. পূর্ব হিমালয় (Eastern Himalaya) পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও কালিম্পং, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ, ভুটান ও পূর্ব নেপাল। রেড পান্ডা (Ailurus fulgens), তুষার চিতা (Snow Leopard), রক্তিম রডোডেনড্রন, পাহাড়ি অর্কিড। ২. ইন্দো-বার্মা (Indo-Burma) ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণের উত্তর-পূর্ব ভারত (আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম) থেকে মায়ানমার। হুলক গিবন (ভারতের একমাত্র বনমানুষ), সোনালী বানর, পিগমি হগ, একশৃঙ্গ গণ্ডার। ৩. পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ও শ্রীলঙ্কা ভারতের পশ্চিম উপকূল ঘেঁষা পর্বতমালা (মহারাষ্ট্র, গোয়া, কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ু)। সিংহ-পুচ্ছ বানর (Lion-tailed Macaque), নীলগিরি তাহর, মালাবার উড়ুক্কু ব্যাঙ, বুনো মসলা। ৪. সুন্দাল্যান্ড (Sundaland) ভারতের নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বোর্নিও অঞ্চল। নিকোবর মেগাপড পাখি, মোহনার কুমির, লেদারব্যাক সামুদ্রিক কচ্ছপ, প্রবাল প্রাচীর।
১.৪ ষষ্ঠ গণবিলুপ্তি (The Sixth Mass Extinction): মানবসৃষ্ট বিপর্যয়
পৃথিবীর ভৌগোলিক ইতিহাসে আজ পর্যন্ত পাঁচটি বড় গণবিলুপ্তি (Big Five Extinctions) ঘটেছে, যার মধ্যে শেষটি ছিল প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে এক দানবীয় উল্কাপাতের ফলে ডাইনোসরদের সম্পূর্ণ ধ্বংস। বর্তমানে পৃথিবী প্রবেশ করেছে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির (Sixth Mass Extinction বা অ্যানথ্রোপোসিন সংকট) যুগে। পূর্বের সবকটি বিলুপ্তি ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগঘটিত, কিন্তু এই প্রথম একটিমাত্র প্রজাতি—হোমো সেপিয়েন্স (মানুষ)-এর কর্মকাণ্ডের কারণে প্রজাতির বিলুপ্তির হার প্রাকৃতিক হারের চেয়ে ১০০ থেকে ১,০০০ গুণ বেশি গতিতে ত্বরান্বিত হচ্ছে!