Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Science • অধ্যায় 10
আনুমানিক সময়: ৫৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ সংকট ও বিপন্ন প্রাণীদের সংরক্ষণ

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অনুমোদিত অষ্টম শ্রেণির "পরিবেশ ও বিজ্ঞান" পাঠ্যসূচির দশম অধ্যায় "জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ সংকট ও বিপন্ন প্রাণীদের সংরক্ষণ" (Biodiversity, Environmental Crisis and Conservation of Endangered Animals)-এর পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য ডিজিটাল স্টাডি মেটেরিয়াল। সুন্দরবনের শ্বাসমূল ঘেরা লবণাক্ত কাদায় রাজকীয় পদচারণায় ঘুরে বেড়ানো রয়েল বেঙ্গল টাইগার থেকে শুরু করে সিঙ্গালীলার কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি বাঁশবনের লাজুক রেড পান্ডা, ডুয়ার্সের শাল-সেগুনের অরণ্যে বুনো হাতির করিডোর এবং বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে ডিম পাড়তে আসা লাখ লাখ অলিভ রিডলে কচ্ছপের পদচিহ্ন—আমাদের পৃথিবী জীববৈচিত্র্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি। কিন্তু অপরিকল্পিত অরণ্য নিধন, চোরাশিকার, রাসায়নিক দূষণ এবং ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের এই জাল আজ দ্রুত ছিঁড়ে যাচ্ছে, যা ডেকে এনেছে ইতিহাসের ষষ্ঠ গণবিলুপ্তি। এই অধ্যায়টি ৫টি সুসংহত শিক্ষণ এককে বিভক্ত: (১) জীববৈচিত্র্যের মৌলিক ধারণা, বাস্তুতান্ত্রিক স্তর ও হটস্পট — জীববৈচিত্র্যের ৩টি স্তর (জিনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য), আলফা/বিটা/গামা বৈচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্রের অমূল্য পরিষেবা, নরম্যান মায়ার্সের হটস্পট নির্ধারণের কঠোর মাপকাঠি এবং ভারতের ৪টি জীববৈচিত্র্য হটস্পট (পূর্ব হিমালয়, ইন্দো-বার্মা, পশ্চিমঘাট ও সুন্দাল্যান্ড); (২) বৈশ্বিক পরিবেশ সংকট ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয় — মেরু অঞ্চলের বরফ গলনে মেরু ভাল্লুক (Ursus maritimus) ও পেঙ্গুইনের প্রজনন সংকট, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে জুওক্সানথেলি শৈবালের বিতাড়ন ও কোরাল ব্লিচিং (প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস), কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণে সমুদ্রের অম্লীকরণ (Ocean Acidification) ও খোলস দ্রবীভবন, নিউরোটক্সিক কীটনাশকে মৌমাছির কলোনি ধ্বংস (Colony Collapse Disorder - CCD), এবং সামুদ্রিক মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ; (৩) পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের আঞ্চলিক বিপন্ন বন্যপ্রাণী — সুন্দরবনের শীর্ষ শিকারি ও খাদ্যশৃঙ্খলের নিয়ন্ত্রক রয়েল বেঙ্গল টাইগার (Panthera tigris tigris) ও প্রজেক্ট টাইগার ১৯৭৩, জলদাপাড়া ও গরুমারার একশৃঙ্গ গণ্ডারের (Rhinoceros unicornis) কেরাটিন খড়্গ চোরাশিকার ও ইন্ডিয়ান রাইনো ভিশন, সিঙ্গালীলার রেড পান্ডা (Ailurus fulgens) ও দার্জিলিং পদ্মজা নাইডু চিড়িয়াখানার সফল ক্যাপটিভ প্রজনন, গঙ্গার দৃষ্টিহীন জাতীয় জলচর প্রাণী শুশুক (Platanista gangetica)-এর বায়োসোনার ইকোলোকেশন, অলিভ রিডলে সামুদ্রিক কচ্ছপের গণ-ডিম্বপ্রসব (অরিবাডা), এবং গবাদি পশুর ব্যথানাশক ডাইক্লোফেনাক (Diclofenac) ওষুধে শকুনের ভিসেরাল গাউটে ৯৯.৯% মহাবিলুপ্তি ও বক্সার রাজাভাতখাওয়া শকুন প্রজনন কেন্দ্র; (৪) পরিবেশ সংকটের প্রধান চালিকাশক্তি: HIPPO রূপরেখা — আবাসস্থল ধ্বংস ও ডুয়ার্সে রেলপথে হাতির মৃত্যু (H), ক্ষতিকর বহিরাগত আগ্রাসী প্রজাতি (Parthenium, Lantana, আফ্রিকান মাগুর) (I), পরিবেশ দূষণ ও খাদ্যশৃঙ্খলে DDT-র ক্ষতিকর জৈব বিবর্ধন (Biomagnification) (P), মানব জনসংখ্যা বিস্ফোরণ (P) এবং চোরাশিকার ও বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য (O); এবং (৫) সংরক্ষণ পদ্ধতি, সুরক্ষিত বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী আইন — IUCN রেড ডাটা বুকের বিভিন্ন শ্রেণি (বিলুপ্ত, চরম বিপন্ন, বিপন্ন, সংকটাসন্ন), স্ব-স্থানে (In-situ) সংরক্ষণ: পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জাতীয় উদ্যান (সুন্দরবন, জলদাপাড়া, গরুমারা, সিঙ্গালীলা, নেওড়া ভ্যালি, বক্সা) ও অভয়ারণ্য, বহিঃ-স্থানে (Ex-situ) সংরক্ষণ: আলিপুর ও দার্জিলিং চিড়িয়াখানা ও তরল নাইট্রোজেনে ক্রায়োপ্রিজারভেশন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ১৯৭২, প্রজেক্ট টাইগার ও প্রজেক্ট এলিফ্যান্ট, এবং ১৯৭১-৭২ সালে পশ্চিম মেদিনীপুরের আড়াবাড়িতে ড. অজিত কুমার ব্যানার্জির নেতৃত্বে সূচিত ঐতিহাসিক যৌথ বন পরিচালন ব্যবস্থা (JFM) যেখানে গ্রামবাসীদের ২৫% রাজস্ব অংশীদারিত্ব দিয়ে শালবন পুনরুদ্ধার করা হয়। ২৫টি উপ-অনুচ্ছেদ, ভেক্টর এসভিজি কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি বৈজ্ঞানিক নীতি ও সূত্র কার্ড, ৮টি আদর্শ সমাধানকৃত উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষকের ফাঁদ ও সাধারণ ভুলত্রুটি, ৮টি সারসংক্ষেপ, ৮টি মূল শিক্ষণীয় পয়েন্ট, ৫টি আত্মমূল্যায়ন প্রশ্ন ও ৫টি সিবিটি ডায়াগনস্টিক মক প্রশ্ন সহকারে নির্মিত।

🌍 নীরব বিলুপ্তি: পৃথিবীর জীবন্ত জাল কেন ছিঁড়ে যাচ্ছে এবং আমরা কীভাবে তা বাঁচাতে পারি?

ভাবো তো, মাঝ আকাশে উড়ন্ত একটা বিমানের ডানা থেকে যদি কেউ একটা একটা করে নাট-বল্টু খুলে ফেলতে থাকে, তবে কী ঘটবে? প্রথমে হয়তো কিছু বোঝা যাবে না, কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ বল্টু খসলেই পুরো ডানা ভেঙে বিমান মাটিতে আছড়ে পড়বে!

পৃথিবীর প্রতিটি জীব—সুন্দরবনের কাদার ওপর গর্জন করা রয়েল বেঙ্গল টাইগার থেকে শুরু করে সর্ষে ক্ষেতে পরাগমিলন ঘটানো ছোট্ট মৌমাছিটি—আমাদের জীবমণ্ডলের সেই এক-একটি অত্যাবশ্যকীয় নাট-বল্টু। তোমরা কি জানো, গরুর ব্যথার একটা সাধারণ ওষুধের কারণে মাত্র কয়েক বছরে ভারতের কোটি কোটি শকুন মারা গিয়ে বিলুপ্তির মুখে পৌঁছাল কীভাবে? ঘোলাটে নদীর জলে চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়া গঙ্গার শুশুক কীভাবে শব্দতরঙ্গের প্রতিধ্বনি শুনে শিকার ধরে?

আর দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে বাঁশবন বাঁচানোর সাথে কীভাবে জড়িয়ে আছে ফুটফুটে রেড পান্ডার ভবিষ্যৎ? এসো জেনে নিই জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ সংকট ও বিপন্ন প্রাণীদের সংরক্ষণ-এর এই অত্যন্ত জরুরি ও রোমাঞ্চকর পাঠে!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অনুমোদিত অষ্টম শ্রেণির "পরিবেশ ও বিজ্ঞান" পাঠ্যসূচির দশম অধ্যায় "জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ সংকট ও বিপন্ন প্রাণীদের সংরক্ষণ" (Biodiversity, Environmental Crisis and Conservation of Endangered Animals)-এর পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য ডিজিটাল স্টাডি মেটেরিয়াল। সুন্দরবনের শ্বাসমূল ঘেরা লবণাক্ত কাদায় রাজকীয় পদচারণায় ঘুরে বেড়ানো রয়েল বেঙ্গল টাইগার থেকে শুরু করে সিঙ্গালীলার কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি বাঁশবনের লাজুক রেড পান্ডা, ডুয়ার্সের শাল-সেগুনের অরণ্যে বুনো হাতির করিডোর এবং বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে ডিম পাড়তে আসা লাখ লাখ অলিভ রিডলে কচ্ছপের পদচিহ্ন—আমাদের পৃথিবী জীববৈচিত্র্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি। কিন্তু অপরিকল্পিত অরণ্য নিধন, চোরাশিকার, রাসায়নিক দূষণ এবং ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের এই জাল আজ দ্রুত ছিঁড়ে যাচ্ছে, যা ডেকে এনেছে ইতিহাসের ষষ্ঠ গণবিলুপ্তি। এই অধ্যায়টি ৫টি সুসংহত শিক্ষণ এককে বিভক্ত: (১) জীববৈচিত্র্যের মৌলিক ধারণা, বাস্তুতান্ত্রিক স্তর ও হটস্পট — জীববৈচিত্র্যের ৩টি স্তর (জিনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য), আলফা/বিটা/গামা বৈচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্রের অমূল্য পরিষেবা, নরম্যান মায়ার্সের হটস্পট নির্ধারণের কঠোর মাপকাঠি এবং ভারতের ৪টি জীববৈচিত্র্য হটস্পট (পূর্ব হিমালয়, ইন্দো-বার্মা, পশ্চিমঘাট ও সুন্দাল্যান্ড); (২) বৈশ্বিক পরিবেশ সংকট ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয় — মেরু অঞ্চলের বরফ গলনে মেরু ভাল্লুক (Ursus maritimus) ও পেঙ্গুইনের প্রজনন সংকট, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে জুওক্সানথেলি শৈবালের বিতাড়ন ও কোরাল ব্লিচিং (প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস), কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণে সমুদ্রের অম্লীকরণ (Ocean Acidification) ও খোলস দ্রবীভবন, নিউরোটক্সিক কীটনাশকে মৌমাছির কলোনি ধ্বংস (Colony Collapse Disorder - CCD), এবং সামুদ্রিক মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ; (৩) পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের আঞ্চলিক বিপন্ন বন্যপ্রাণী — সুন্দরবনের শীর্ষ শিকারি ও খাদ্যশৃঙ্খলের নিয়ন্ত্রক রয়েল বেঙ্গল টাইগার (Panthera tigris tigris) ও প্রজেক্ট টাইগার ১৯৭৩, জলদাপাড়া ও গরুমারার একশৃঙ্গ গণ্ডারের (Rhinoceros unicornis) কেরাটিন খড়্গ চোরাশিকার ও ইন্ডিয়ান রাইনো ভিশন, সিঙ্গালীলার রেড পান্ডা (Ailurus fulgens) ও দার্জিলিং পদ্মজা নাইডু চিড়িয়াখানার সফল ক্যাপটিভ প্রজনন, গঙ্গার দৃষ্টিহীন জাতীয় জলচর প্রাণী শুশুক (Platanista gangetica)-এর বায়োসোনার ইকোলোকেশন, অলিভ রিডলে সামুদ্রিক কচ্ছপের গণ-ডিম্বপ্রসব (অরিবাডা), এবং গবাদি পশুর ব্যথানাশক ডাইক্লোফেনাক (Diclofenac) ওষুধে শকুনের ভিসেরাল গাউটে ৯৯.৯% মহাবিলুপ্তি ও বক্সার রাজাভাতখাওয়া শকুন প্রজনন কেন্দ্র; (৪) পরিবেশ সংকটের প্রধান চালিকাশক্তি: HIPPO রূপরেখা — আবাসস্থল ধ্বংস ও ডুয়ার্সে রেলপথে হাতির মৃত্যু (H), ক্ষতিকর বহিরাগত আগ্রাসী প্রজাতি (Parthenium, Lantana, আফ্রিকান মাগুর) (I), পরিবেশ দূষণ ও খাদ্যশৃঙ্খলে DDT-র ক্ষতিকর জৈব বিবর্ধন (Biomagnification) (P), মানব জনসংখ্যা বিস্ফোরণ (P) এবং চোরাশিকার ও বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য (O); এবং (৫) সংরক্ষণ পদ্ধতি, সুরক্ষিত বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী আইন — IUCN রেড ডাটা বুকের বিভিন্ন শ্রেণি (বিলুপ্ত, চরম বিপন্ন, বিপন্ন, সংকটাসন্ন), স্ব-স্থানে (In-situ) সংরক্ষণ: পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জাতীয় উদ্যান (সুন্দরবন, জলদাপাড়া, গরুমারা, সিঙ্গালীলা, নেওড়া ভ্যালি, বক্সা) ও অভয়ারণ্য, বহিঃ-স্থানে (Ex-situ) সংরক্ষণ: আলিপুর ও দার্জিলিং চিড়িয়াখানা ও তরল নাইট্রোজেনে ক্রায়োপ্রিজারভেশন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ১৯৭২, প্রজেক্ট টাইগার ও প্রজেক্ট এলিফ্যান্ট, এবং ১৯৭১-৭২ সালে পশ্চিম মেদিনীপুরের আড়াবাড়িতে ড. অজিত কুমার ব্যানার্জির নেতৃত্বে সূচিত ঐতিহাসিক যৌথ বন পরিচালন ব্যবস্থা (JFM) যেখানে গ্রামবাসীদের ২৫% রাজস্ব অংশীদারিত্ব দিয়ে শালবন পুনরুদ্ধার করা হয়। ২৫টি উপ-অনুচ্ছেদ, ভেক্টর এসভিজি কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি বৈজ্ঞানিক নীতি ও সূত্র কার্ড, ৮টি আদর্শ সমাধানকৃত উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষকের ফাঁদ ও সাধারণ ভুলত্রুটি, ৮টি সারসংক্ষেপ, ৮টি মূল শিক্ষণীয় পয়েন্ট, ৫টি আত্মমূল্যায়ন প্রশ্ন ও ৫টি সিবিটি ডায়াগনস্টিক মক প্রশ্ন সহকারে নির্মিত।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • বাস্তুতন্ত্র, খাদ্যশৃঙ্খল, খাদ্যজাল ও পুষ্টিস্তর (Trophic levels) সম্পর্কিত প্রাথমিক ধারণা।
  • পৃথিবীর বিভিন্ন জলবায়ু অঞ্চল (ক্রান্তীয়, মেরু, নাতিশীতোষ্ণ) সম্পর্কে ভৌগোলিক জ্ঞান।
  • পশ্চিমবঙ্গের বনাঞ্চল (সুন্দরবন, ডুয়ার্স, দার্জিলিং পাহাড় ও জঙ্গলমহল) সংক্রান্ত সাধারণ পরিচয়।
  • পরিবেশ দূষণ, কীটনাশক ও মানবজাতির পরিবেশীয় প্রভাব সম্পর্কিত সাধারণ ধারণা।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • জীববৈচিত্র্যের সংজ্ঞা এবং এর তিনটি প্রধান সাংগঠনিক স্তর (জিনগত, প্রজাতিগত, বাস্তুতান্ত্রিক) নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • নরম্যান মায়ার্সের হটস্পট নির্ধারণের মাপকাঠি বিশ্লেষণ করতে পারবে এবং ভারতের ৪টি জীববৈচিত্র্য হটস্পট শনাক্ত করতে পারবে।
  • বৈশ্বিক পরিবেশ সংকটসমূহ (মেরু বরফ গলন, প্রবাল প্রাচীরের ব্লিচিং, সমুদ্রের অম্লীকরণ, মৌমাছি সংকট) শারীরবৃত্তীয় ও রাসায়নিক প্রক্রিয়াসহ বর্ণনা করতে পারবে।
  • পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের বিপন্ন প্রাণীদের (বাঘ, গণ্ডার, রেড পান্ডা, শুশুক, শকুন, অলিভ রিডলে) সংকট ও তাদের সংরক্ষণ প্রকল্প মূল্যায়ন করতে পারবে।
  • HIPPO রূপরেখার আলোকে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মূল কারণসমূহ (আবাস বিনাশ, আগ্রাসী প্রজাতি, DDT-র জৈব বিবর্ধন, চোরাশিকার) বিশ্লেষণ করতে পারবে।
  • স্ব-স্থানে (In-situ) ও বহিঃ-স্থানে (Ex-situ) সংরক্ষণের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারবে এবং পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণী আইন ১৯৭২ ও আড়াবাড়ি যৌথ বন পরিচালন (JFM)-এর ঐতিহাসিক ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে পারবে।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. জীববৈচিত্র্যের ধারণা, বাস্তুতান্...
2 ২. বিশ্ব পরিবেশ সংকট ও সামুদ্রিক বা...
3 ৩. পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের আঞ্চলিক বিপন...
4 ৪. পরিবেশ সংকটের চালিকাশক্তি: HIPPO...
5 ৫. সংরক্ষণ পদ্ধতি, সুরক্ষিত বনাঞ্চল...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. জীববৈচিত্র্যের ধারণা, বাস্তুতান্ত্রিক স্তর ও হটস্পট

১.১ জীববৈচিত্র্য কী? জীবনের তিনটি প্রধান স্তর

জীববৈচিত্র্য (Biodiversity) শব্দটি ১৯৮৫ সালে বিজ্ঞানী ওয়াল্টার জি. রোজেন প্রথম ব্যবহার করেন এবং বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড ও. উইলসন এটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। সহজ কথায়, জল, স্থল ও অন্তরীক্ষে বসবাসকারী সমস্ত জীব প্রজাতির জিনগত, প্রজাতিগত ও তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থানের সামগ্রিক বৈচিত্র্যকেই জীববৈচিত্র্য বলে।

  • ১. জিনগত বৈচিত্র্য (Genetic Diversity): একই প্রজাতির বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে জিন বা অ্যালিলের ভিন্নতার কারণে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়। যেমন—ভারতে দেশি ধানের (Oryza sativa) প্রায় ৫০,০০০-এর বেশি জিনগত প্রকারভেদ এবং আমের ১,০০০-এর বেশি জাত রয়েছে। জিনগত বৈচিত্র্য বেশি থাকলে প্রজাতিটি পরিবর্তিত জলবায়ু বা নতুন রোগবালাইয়ের আক্রমণ সহজেই প্রতিরোধ করতে পারে।
  • ২. প্রজাতিগত বৈচিত্র্য (Species Diversity): একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাচুর্য ও অনুপাত। এটি দুটি উপাদানে গঠিত:
    • প্রজাতির প্রাচুর্য (Species Richness): একটি অঞ্চলে মোট কত ভিন্ন প্রজাতির জীব রয়েছে তার সংখ্যা।
    • প্রজাতির আপেক্ষিক সমতা (Species Evenness): সেই অঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির মোট সদস্য সংখ্যার তুলনামূলক অনুপাত।
  • ৩. বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য (Ecosystem Diversity): কোনো বৃহৎ ভৌগোলিক অঞ্চলে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রকার বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য। স্থানভেদে এটি তিন প্রকার:
    • আলফা ($\alpha$) বৈচিত্র্য: একটি নির্দিষ্ট স্থানীয় বাসস্থান বা জীবগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য।
    • বিটা ($\beta$) বৈচিত্র্য: পাশাপাশি দুটি ভিন্ন বাসস্থানের পরিবেশীয় ঢাল বরাবর প্রজাতির প্রতিস্থাপনের হার।
    • গামা ($\gamma$) বৈচিত্র্য: একটি সম্পূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চলের একাধিক বাস্তুতন্ত্রের সম্মিলিত সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য।

১.২ জীববৈচিত্র্যের অমূল্য বাস্তুতান্ত্রিক পরিষেবা

প্রকৃতি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য যেসব নিঃশুল্ক পরিষেবা প্রদান করে, জীববৈচিত্র্য হলো তার মূল কারিগর:

বাস্তুতান্ত্রিক পরিষেবার ধরন প্রাকৃতিক ভূমিকা ও কার্যপদ্ধতি বাস্তব উদাহরণ
উৎপাদনগত পরিষেবা (Provisioning) বাস্তুতন্ত্র থেকে সরাসরি খাদ্য, ওষুধ, বস্ত্র ও জ্বালানি কাঁচামাল আহরণ। খাদ্যশস্য, ভোজ্য মাছ, জীবনদায়ী ওষুধ (কুইনাইন, ভিনক্রিস্টিন), কাষ্ঠ ও পানীয় জল।
নিয়ন্ত্রণকারী পরিষেবা (Regulating) জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, বন্যা ও ঝড় প্রতিরোধ, এবং বর্জ্য শোধন। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ৬০-৬৬% কমিয়ে দেয়; অরণ্য কোটি কোটি টন কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে।
সহায়ক পরিষেবা (Supporting) অন্যান্য সমস্ত পরিষেবা চালু রাখার জন্য মৌলিক জৈব-ভূরাসায়নিক চক্র সচল রাখা। সালোকসংশ্লেষে অক্সিজেন উৎপাদন, মাটিতে নাইট্রোজেন ও ফসফরাস চক্র সচল রাখা, মাটি গঠন।
পরাগমিলন ও জৈব নিয়ন্ত্রণ শস্যের ফলন নিশ্চিতকরণ ও প্রাকৃতিক উপায়ে ক্ষতিকর পোকা দমন। মৌমাছি দ্বারা বিশ্বের ৭৫% ফসলের পরাগায়ন; পেঁচা ও বাদুড় দ্বারা প্রতি রাতে ক্ষতিকর ইঁদুর ও পোকা শিকার।

১.৩ জীববৈচিত্র্য হটস্পট (Biodiversity Hotspots)

ব্রিটিশ বাস্তুবিদ নরম্যান মায়ার্স ১৯৮৮ সালে প্রথম "বায়োডাইভার্সিটি হটস্পট" ধারণাটি প্রবর্তন করেন। এটি হলো পৃথিবীর এমন কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল ভৌগোলিক অঞ্চল যেখানে প্রচুর পরিমাণে অনন্য প্রজাতির জীব বাস করে কিন্তু তাদের বাসস্থান আজ চরম ধ্বংসের মুখে।

  • হটস্পট ঘোষণার দুটি বাধ্যতামূলক বৈজ্ঞানিক শর্ত:
    1. অঞ্চলটিতে অন্তত ১,৫০০ প্রজাতির সংবাহী উদ্ভিদকে স্থানীয় বা এন্ডেমিক (Endemic) হতে হবে (অর্থাৎ এরা পৃথিবীর অন্য কোথাও প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় না)।
    2. অঞ্চলটির মূল আদিম প্রাকৃতিক বাসস্থানের অন্তত ৭০% অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে (অর্থাৎ বর্তমানে মাত্র ৩০% বা তার কম বাসস্থান অবশিষ্ট রয়েছে)।
  • ভারতের ৪টি জীববৈচিত্র্য হটস্পট:

    বিশ্বে বর্তমানে ৩৬টি স্বীকৃত হটস্পট রয়েছে, যার মধ্যে ৪টি অংশত বা পূর্ণাঙ্গভাবে ভারতে অবস্থিত:

    হটস্পটের নাম ভৌগোলিক বিস্তার উল্লেখযোগ্য এন্ডেমিক ও বিপন্ন প্রজাতি
    ১. পূর্ব হিমালয় (Eastern Himalaya) পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও কালিম্পং, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ, ভুটান ও পূর্ব নেপাল। রেড পান্ডা (Ailurus fulgens), তুষার চিতা (Snow Leopard), রক্তিম রডোডেনড্রন, পাহাড়ি অর্কিড।
    ২. ইন্দো-বার্মা (Indo-Burma) ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণের উত্তর-পূর্ব ভারত (আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম) থেকে মায়ানমার। হুলক গিবন (ভারতের একমাত্র বনমানুষ), সোনালী বানর, পিগমি হগ, একশৃঙ্গ গণ্ডার।
    ৩. পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ও শ্রীলঙ্কা ভারতের পশ্চিম উপকূল ঘেঁষা পর্বতমালা (মহারাষ্ট্র, গোয়া, কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ু)। সিংহ-পুচ্ছ বানর (Lion-tailed Macaque), নীলগিরি তাহর, মালাবার উড়ুক্কু ব্যাঙ, বুনো মসলা।
    ৪. সুন্দাল্যান্ড (Sundaland) ভারতের নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বোর্নিও অঞ্চল। নিকোবর মেগাপড পাখি, মোহনার কুমির, লেদারব্যাক সামুদ্রিক কচ্ছপ, প্রবাল প্রাচীর।

১.৪ ষষ্ঠ গণবিলুপ্তি (The Sixth Mass Extinction): মানবসৃষ্ট বিপর্যয়

পৃথিবীর ভৌগোলিক ইতিহাসে আজ পর্যন্ত পাঁচটি বড় গণবিলুপ্তি (Big Five Extinctions) ঘটেছে, যার মধ্যে শেষটি ছিল প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে এক দানবীয় উল্কাপাতের ফলে ডাইনোসরদের সম্পূর্ণ ধ্বংস। বর্তমানে পৃথিবী প্রবেশ করেছে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির (Sixth Mass Extinction বা অ্যানথ্রোপোসিন সংকট) যুগে। পূর্বের সবকটি বিলুপ্তি ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগঘটিত, কিন্তু এই প্রথম একটিমাত্র প্রজাতি—হোমো সেপিয়েন্স (মানুষ)-এর কর্মকাণ্ডের কারণে প্রজাতির বিলুপ্তির হার প্রাকৃতিক হারের চেয়ে ১০০ থেকে ১,০০০ গুণ বেশি গতিতে ত্বরান্বিত হচ্ছে!

২. বিশ্ব পরিবেশ সংকট ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয়

২.১ মেরু অঞ্চলের সংকট: বরফ গলে বাসস্থান ধ্বংস

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বরফ পৃথিবীর অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে প্রায় তিন গুণ দ্রুত গতিতে গলছে (Polar Amplification)।

  • আর্কটিক সাগরের বরফ ও মেরু ভাল্লুক (Ursus maritimus):

    মেরু ভাল্লুকরা ভেসে থাকা বরফের চাদরকে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে সিল মাছ শিকার করে। গ্রীষ্মকালে সাগরের বরফ দ্রুত গলে ছোট হয়ে যাওয়ায় খাবার খুঁজতে এদের শত শত কিলোমিটার সাঁতার কাটতে হয়। ফলে ক্লান্তি ও ঝড়ে ডুবে বহু মেরু ভাল্লুক ও তাদের শাবক মারা যাচ্ছে, শিকারের অভাবে অনাহারে তাদের ওজন বিপজ্জনকভাবে কমে যাচ্ছে এবং প্রজনন হ্রাস পাচ্ছে।

  • অ্যান্টার্কটিকার বরফ চাঙ্গড় ও সম্রাট পেঙ্গুইন (Aptenodytes forsteri):

    সম্রাট পেঙ্গুইনরা উপকূলীয় স্থায়ী বরফের ওপর ডিম পাড়ে ও শাবক লালন-পালন করে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অসময়ে সমুদ্রের বরফের তাক ভেঙে যাওয়ায় কচি পেঙ্গুইন ছানারা, যাদের গায়ে তখনও জলরোধী পালক গজায়নি, তারা জমাট বরফজলে পড়ে গিয়ে শীতে জমে মারা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু কলোনিতে প্রায় ১০০% ছানাই মারা গেছে!

২.২ প্রবাল প্রাচীরের সংকট: কোরাল ব্লিচিং (Coral Bleaching)

প্রবাল প্রাচীর সমুদ্রের মোট আয়তনের মাত্র ০.১% স্থান দখল করে রাখলেও এরা সমগ্র সামুদ্রিক প্রজাতির ২৫%-এর বেশি জীবের আশ্রয়স্থল, তাই এদের "সমুদ্রের রেইনফরেস্ট" বলা হয়।

  • মিথোজীবী সম্পর্ক: নিডারিয়া পর্বের প্রবাল পতঙ্গ বা পলিপ (Polyps) তাদের স্বচ্ছ কলার ভেতর আণুবীক্ষণিক এককোষী শৈবাল জুওক্সানথেলি (Zooxanthellae)-কে আশ্রয় দেয়। এর বিনিময়ে এই শৈবাল সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে প্রবালের শক্তির ৯০% জোগান দেয় এবং প্রবালকে তার চমৎকার উজ্জ্বল বর্ণ দান করে।
  • উষ্ণায়ন ও ব্লিচিং: সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্র ১° থেকে ২° সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলেই শৈবালের সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া বিষাক্ত রাসায়নিক তৈরি করতে শুরু করে। তখন প্রবাল পলিপ তার শরীর থেকে জুওক্সানথেলি শৈবালকে জোর করে বাইরে বের করে দেয়। শৈবালহীন প্রবালের স্বচ্ছ চামড়ার নিচে সাদা ক্যালসিয়াম কার্বনেট কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ে, একে কোরাল ব্লিচিং বলে। তাপমাত্রা দ্রুত স্বাভাবিক না হলে অনাহারে পুরো প্রবাল প্রাচীর মরে সাদা শ্মশানে পরিণত হয়।

২.৩ সমুদ্রের অম্লীকরণ (Ocean Acidification): খোলস গলে যাওয়ার বিপদ

শিল্পবিপ্লবের পর থেকে বাতাসে নির্গত মোট কার্বন ডাইঅক্সাইডের প্রায় ৩০% সাগর শুষে নিয়েছে:

  • বাতাসের $CO_2$ সাগরের জলের সাথে বিক্রিয়া করে তৈরি করে কার্বনিক অ্যাসিড ($H_2CO_3$), যা ভেঙে গিয়ে প্রচুর হাইড্রোজেন আয়ন ($H^+$) মুক্ত করে।
  • এই মুক্ত $H^+$ আয়ন সাগরে থাকা কার্বনেট আয়নের ($CO_3^{2-}$) সাথে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে প্রবাল, ঝিনুক, শামুক ও কাঁকড়ার মতো প্রাণীরা খোলস বা কঙ্কাল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম কার্বনেট ($\text{CaCO}_3$) পায় না।
  • সাগরের অম্লত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্রের শামুক ও প্রবালের শক্ত খোলস পাতলা হয়ে অ্যাসিডে ক্ষয়ে গলে যেতে শুরু করেছে, যা সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের গোড়াতেই আঘাত হানছে।

২.৪ মৌমাছি সংকট ও কলোনি পতন (Colony Collapse Disorder - CCD)

আমাদের প্রতিদিনের ভোজ্য শস্য, ডাল, শাকসবজি ও ফলের প্রায় ৭৫%-এর পরাগায়ন ঘটে মৌমাছির মাধ্যমে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে মৌমাছিরা এক রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হচ্ছে যাকে বলে কলোনি কলাপস ডিজঅর্ডার (CCD)। ফসলে নির্বিচারে স্প্রে করা নিওনিকোটিনয়েড (Neonicotinoid) শ্রেণির স্নায়ুবিষ কীটনাশক মৌমাছির মস্তিষ্কের স্মৃতি ও দিকনির্ণয় ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ফলে দূরবর্তী ক্ষেতে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে শ্রমিক মৌমাছিরা আর নিজেদের মৌচাকে ফিরে আসার পথ খুঁজে পায় না এবং বাইরে মারা যায়, যার ফলে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২.৫ সামুদ্রিক প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিষাক্ত জাল

প্রতি বছর ১ কোটি ১০ লক্ষ টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরে ফেলা হচ্ছে। রোদের তেজ ও ঢেউয়ের ধাক্কায় প্লাস্টিক ভেঙে ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। মাছ, চিংড়ি ও তিমিরা খাবারের সাথে এই বিষাক্ত প্লাস্টিক খেয়ে ফেলছে, যা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত আমাদের ভাতের পাতে পৌঁছে ক্যানসার ও হরমোনের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

৩. পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের আঞ্চলিক বিপন্ন বন্যপ্রাণী

৩.১ রয়েল বেঙ্গল টাইগার (Panthera tigris tigris): সুন্দরবনের অধিপতি

ভারতের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের নোনা ম্যানগ্রোভ বাদাবনের শীর্ষ শিকারি (Apex Predator)।

  • বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্ব: বাঘ হলো বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যরক্ষক বা কি-স্টোন প্রজাতি। হরিণ ও বুনো শুয়োরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে বাঘ বনাঞ্চলের উদ্ভিদ ধ্বংস হওয়া ঠেকায়।
  • সংকটের কারণ: চামড়া ও হাড়ের জন্য আন্তর্জাতিক চোরাশিকার, মিষ্টি জলের প্রবাহ কমে সুন্দরবনের পানীয় জলে অতিরিক্ত লবণাক্ততা, সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধিতে নিচু দ্বীপ ডুবে যাওয়া, এবং লোকালয়ে ঢুকে মানুষের সাথে সংঘাত।
  • সংরক্ষণ (প্রজেক্ট টাইগার ১৯৭৩): ১৯৭৩ সালে ভারত সরকার বাঘ রক্ষায় \'প্রজেক্ট টাইগার\' চালু করে। সুন্দরবন ও বক্সাকে ব্যাঘ্র প্রকল্প ঘোষণা করে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে।

৩.২ ভারতীয় একশৃঙ্গ গণ্ডার (Rhinoceros unicornis): ডুয়ার্সের তৃণভূমির গৌরব

উত্তরবঙ্গের জলদাপাড়া ও গরুমারা জাতীয় উদ্যানের জলাভূমি ও লম্বা নলখাগড়ার তৃণভূমিতে বাস করে ভারতের বিখ্যাত একশৃঙ্গ গণ্ডার।

  • খড়্গের রহস্য ও চোরাশিকার: গণ্ডারের খড়্গটি কিন্তু কোনো অস্থি বা হাড় নয়! এটি মানুষের চুল ও নখের মতো কেরাটিন (Keratin) প্রোটিন জমাট বেঁধে গঠিত এক ধরণের শক্ত উপবৃদ্ধি। কুসংস্কারমূলক ভুয়া ওষুধ তৈরির জন্য চোরাশিকারিরা নির্মমভাবে গণ্ডার হত্যা করে খড়্গ কেটে নেয়।
  • সংরক্ষণ উদ্যোগ: সিসিটিভি, ড্রোন ও সশস্ত্র বনরক্ষীদের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা পাহারা এবং \'ইন্ডিয়ান রাইনো ভিশন\' (IRV)-এর আওতায় উপযুক্ত তৃণভূমি রক্ষা করায় জলদাপাড়ায় গণ্ডারের সংখ্যা অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে।

৩.৩ রেড পান্ডা (Ailurus fulgens): হিমালয়ের লাল মানিক

দার্জিলিংয়ের সিঙ্গালীলা জাতীয় উদ্যান ও কালিম্পংয়ের নেওড়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যানের উচ্চ পাহাড়ি (২,২০০-৪,০০০ মিটার) ওক ও বাঁশবনের বাসিন্দা এই লাজুক প্রাণীটি।

  • খাদ্যাভ্যাস ও বিশেষত্ব: মাংসাশী বর্গের প্রাণী হলেও এদের খাদ্যের ৯৫%-ই হলো পাহাড়ি কচি বাঁশের পাতা ও অঙ্কুর। বাঁশের ডাল সহজে শক্ত করে ধরার জন্য এদের সামনের থাবায় কবজির হাড় বেড়ে গিয়ে একটি \'নকল বুড়ো আঙুল\' (False thumb) তৈরি হয়েছে।
  • সংরক্ষণ সাফল্য: দার্জিলিংয়ের পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক বিশ্বজুড়ে রেড পান্ডার সফল কৃত্রিম প্রজনন ও সিঙ্গালীলার বনাঞ্চলে পুনর্বাসনের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে।

৩.৪ গঙ্গার শুশুক বা নদী ডলফিন (Platanista gangetica)

২০০৯ সালে ভারত সরকার গঙ্গার শুশুককে "ভারতের জাতীয় জলচর প্রাণী" (National Aquatic Animal of India) হিসেবে ঘোষণা করেছে।

  • শ্রবণনির্ভর শিকার (Echolocation): গঙ্গার ঘোলা পলিযুক্ত জলে বাস করতে করতে এদের চোখের লেন্স নষ্ট হয়ে গেছে, এরা কার্যত অন্ধ। শুশুক কপাল থেকে উচ্চ কম্পাঙ্কের আল্ট্রাসনিক শব্দ তরঙ্গ (শব্দোত্তর তরঙ্গ) নির্গত করে এবং জলের তলায় মাছ বা বাধার গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসা প্রতিধ্বনি শুনে দিক নির্ণয় ও শিকার ধরে।
  • সংকট: ফারাক্কার মতো ব্যারেজ ও বাঁধ নির্মাণের ফলে এদের বিচরণক্ষেত্র খণ্ডিত হয়ে গেছে; তাছাড়া মাছ ধরার নাইলনের কারেন্ট জালে জড়িয়ে বাতাস নিতে না পেরে এরা জলে ডুবে মারা যায়।

৩.৫ অলিভ রিডলে সামুদ্রিক কচ্ছপ ও ভারতীয় শকুন সংকট

  • অলিভ রিডলে কচ্ছপ (Lepidochelys olivacea):

    বঙ্গোপসাগরের পূর্ব উপকূলে হাজার হাজার স্ত্রী কচ্ছপ জোয়ারের রাতে একসাথে বালুকাবেলায় উঠে এসে ডিম পাড়ে, এই গণ-ডিম্বপ্রসবকে স্প্যানিশ ভাষায় অরিবাডা (Arribada) বলে। মাছ ধরার ট্রলারে কচ্ছপ-রোধী জাল (TED) না থাকা এবং উপকূলের উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোর কারণে সদ্যোজাত কচ্ছপ ছানারা সাগরের দিক ভুল করে বালিতে মারা যায়।

  • শকুনের ডাইক্লোফেনাক বিপর্যয় (Vulture Crisis):

    প্রকৃতির মৃতদেহ অপসারক বা ঝাড়ুদার পাখি হিসেবে শকুন অ্যানথ্রাক্স বা জলাতঙ্কের মতো মারাত্মক রোগ ছড়ানো রোধ করত। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকে ভারতে শকুনের সংখ্যা ৯৯.৯% হ্রাস পায়।

    কারণ: অসুস্থ গবাদি পশুর চিকিৎসার জন্য ডাইক্লোফেনাক (Diclofenac) নামক এক ধরণের সস্তা ব্যথানাশক ওষুধ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। সেই ওষুধ প্রয়োগ করা পশু মারা যাওয়ার পর শকুন যখন তার মাংস খেত, শকুনের শরীর ডাইক্লোফেনাক সহ্য করতে পারত না। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শকুনের দুটি বৃক্ক বা কিডনি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যেত এবং শরীরের ভেতরের অঙ্গে সাদা ইউরিক অ্যাসিড জমা হয়ে ভিসেরাল গাউট (Visceral Gout) রোগে ভুগে শকুনের ঝাঁকের পর ঝাঁক মারা যেত।

    প্রতিকার: ভারত সরকার ২০০৬ সালে পশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে শকুনের জন্য নিরাপদ বিকল্প ওষুধ মেলোক্সিক্যাম (Meloxicam) চালু করে এবং উত্তরবঙ্গের বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের রাজাভাতখাওয়ায় শকুন প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলে।

৪. পরিবেশ সংকটের চালিকাশক্তি: HIPPO রূপরেখা

৪.১ জীববৈচিত্র্য হ্রাসের HIPPO রূপরেখা

প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী এডওয়ার্ড ও. উইলসন জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মূল পাঁচটি কারণকে সংক্ষেপে HIPPO অক্ষরে প্রকাশ করেছেন:

অক্ষর সংকটের উৎস বাস্তুতান্ত্রিক কার্যকারণ ও প্রভাব পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের প্রেক্ষাপট
H আবাসস্থল ধ্বংস ও খণ্ডীকরণ (Habitat Destruction) বসবাসের স্বাভাবিক অরণ্য কেটে ফেলা এবং রাস্তাঘাট ও রেললাইনের মাধ্যমে অখণ্ড জঙ্গলকে ছোট ছোট টুকরোয় ভাগ করে ফেলা। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সে বনের মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্রডগেজ রেললাইনে দ্রুতগামী ট্রেনের ধাক্কায় হাতির মৃত্যু।
I আগ্রাসী বহিরাগত প্রজাতি (Invasive Alien Species) বাইরে থেকে আসা প্রজাতি যাদের প্রাকৃতিক কোনো শত্রু থাকে না, ফলে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে স্থানীয় দেশি জীবকে উৎখাত করে। জমির ঘাস নষ্টকারী বিষাক্ত পার্থেনিয়াম, এবং দেশি মাছ গিলে ফেলা রাক্ষুসে আফ্রিকান মাগুর।
P পরিবেশ দূষণ (Pollution) জলে, স্থলে ও বাতাসে বিষাক্ত রাসায়নিক, কীটনাশক, ভারী ধাতু ও প্লাস্টিক বর্জ্যের নিঃসরণ। দক্ষিণবঙ্গের ৮টি জেলায় ভূগর্ভস্থ জলে আর্সেনিক বিষক্রিয়া এবং গঙ্গায় কারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্য ফেলা।
P জনসংখ্যা বিস্ফোরণ (Population Growth) অতিরিক্ত মানুষের বাসস্থানের জন্য জঙ্গল ও জলাভূমি ভরাট করা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অতি-ব্যবহার। বনের সীমানা ঘেঁষে ঘরবাড়ি তৈরি হওয়ায় দলছুট হাতির সাথে গ্রামবাসীর সংঘাত বৃদ্ধি।
O অতি-শোষণ ও চোরাশিকার (Overexploitation) লোভের বশে প্রকৃতি থেকে পুনরুৎপাদনের চেয়ে দ্রুত গতিতে প্রাণী ও উদ্ভিদ মেরে ফেলা বা পাচার করা। বাঘের চামড়া ও হাড়, গণ্ডারের খড়্গ, প্যাঙ্গোলিনের আঁশ পাচার এবং বর্ষায় ডিমভর্তি কচি ইলিশ ধরা।

৪.২ খাদ্যশৃঙ্খলে কীটনাশকের জৈব বিবর্ধন (Biomagnification)

জৈব বিবর্ধন হলো এমন একটি ক্ষতিকর প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো অপচ্য, জলে অদ্রবণীয় কিন্তু চর্বিতে দ্রবণীয় বিষাক্ত রাসায়নিক (যেমন—DDT) খাদ্যশৃঙ্খলের নিম্ন পুষ্টিস্তর থেকে ধাপে ধাপে শীর্ষ খাদক স্তরে মারাত্মকভাবে ঘনীভূত ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়:

  • জলের অতি সামান্য DDT (০.০০০0০৩ পিপিএম) প্ল্যাঙ্কটনে পৌঁছায় ০.০৪ পিপিএম হিসেবে।
  • ছোট মাছ ও বড় মাছ হয়ে যখন এটি মাছখেকো ঈগল বা মাছরাঙা পাখির শরীরে পৌঁছায়, তখন এর মাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৫ পিপিএম (কয়েক লক্ষ গুণ বৃদ্ধি!)।
  • পাখির দেহে অতিরিক্ত DDT এদের ক্যালসিয়াম তৈরির এনজাইম নষ্ট করে দেয়, ফলে ডিমের খোসা অত্যন্ত পাতলা হয়ে যায় এবং তা দেওয়ার সময় বাবা-মায়ের শরীরেই ডিম ভেঙে ছানা নষ্ট হয়ে পাখির সংখ্যা ধ্বংস হয়ে যায়।

৫. সংরক্ষণ পদ্ধতি, সুরক্ষিত বনাঞ্চল ও আইন

৫.১ IUCN রেড ডাটা বুক ও বিপদাপন্নতার শ্রেণিবিভাগ

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা IUCN বিভিন্ন বিপন্ন জীবের ওপর নজর রেখে তাদের বিপদাপন্নতার মাত্রা অনুযায়ী রেড ডাটা বুক (Red Data Book) প্রকাশ করে:

  • বিলুপ্ত (Extinct - EX): যে প্রজাতির শেষ সদস্যও পৃথিবী থেকে মারা গেছে। উদাহরণ: ডোডো পাখি, তাসমানিয়ান বাঘ।
  • চরম বিপন্ন (Critically Endangered - CR): নিকট ভবিষ্যতে বন্য পরিবেশে বিলুপ্ত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতি। উদাহরণ: ঘড়িয়াল, পিগমি হগ, শকুন।
  • বিপন্ন (Endangered - EN): অদূর ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতি। উদাহরণ: রয়েল বেঙ্গল টাইগার, রেড পান্ডা, গঙ্গার শুশুক।
  • সংকটাসন্ন (Vulnerable - VU): যাদের সংখ্যা কমছে এবং সুরক্ষা না দিলে শীঘ্রই বিপন্ন হবে। उदाहरण: একশৃঙ্গ গণ্ডার, অলিভ রিডলে কচ্ছপ।

৫.২ স্ব-স্থানে (In-situ) সংরক্ষণ: পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জাতীয় উদ্যান

ইন-সিটু সংরক্ষণ: জীবকে তার নিজস্ব প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে সুরক্ষিত রেখে বাঁচানো। পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জাতীয় উদ্যান হলো:

জাতীয় উদ্যান অবস্থিত জেলা প্রধান সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী
১. সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান দক্ষিণ ২৪ পরগনা রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মোহনার কুমির, চিত্রল হরিণ, বাটাগুর কচ্ছপ।
২. জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান আলিপুরদুয়ার একশৃঙ্গ গণ্ডার (রাজ্যের বৃহত্তম দল), বুনো হাতি, বেঙ্গল ফ্লোরিকান পাখি।
৩. গরুমারা জাতীয় উদ্যান জলপাইগুড়ি একশৃঙ্গ গণ্ডার, ভারতীয় বাইসন (গৌর), হাতি, চিতাবাঘ।
৪. সিঙ্গালীলা জাতীয় উদ্যান দার্জিলিং রেড পান্ডা, হিমালয়ান কালো ভাল্লুক, রক্তিম ট্র্যাঙ্গোপান পাখি।
৫. নেওড়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যান কালিম্পং রেড পান্ডা, ক্লাউডেড লেপার্ড, পাহাড়ি চিতা, বিরল অর্কিড।
৬. বক্সা জাতীয় উদ্যান আলিপুরদুয়ার (ডুয়ার্স) হাতি, চিতাবাঘ, রাজাভাতখাওয়া শকুন প্রজনন কেন্দ্র।

৫.৩ বন্যপ্রাণী আইন ও ঐতিহাসিক আড়াবাড়ি মডেল (JFM)

  • বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, ১৯৭২ (WPA 1972): বাঘ, গণ্ডার, হাতি সহ বন্যপ্রাণী শিকার ও তাদের দেহাংশ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধানযুক্ত ভারতের মূল আইন।
  • যৌথ বন পরিচালন ব্যবস্থা (JFM) ও আড়াবাড়ি বিপ্লব (১৯৭১-৭২):

    পশ্চিম মেদিনীপুরের আড়াবাড়ি বনাঞ্চলে ডিএফও ড. অজিত কুমার ব্যানার্জি স্থানীয় বনবাসীদের শত্রু না ভেবে বন সুরক্ষায় যুক্ত করে গঠন করেন \'বনরক্ষা কমিটি\' (FPC)। চুক্তি অনুযায়ী গ্রামবাসীরা শালবনের কাঠ চুরি ও আগুন রোধ করবে, আর সরকার তাদের বনজ কাঁচামাল সংগ্রহের অধিকার ও কাঠ বিক্রির ২৫% রাজস্ব অংশীদারিত্ব দেবে। গ্রামবাসীদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণে ১,২৭০ হেক্টর ধ্বংসপ্রাপ্ত জঙ্গল পুনরায় ঘন শালবনে পরিণত হয় এবং এই আড়াবাড়ি মডেলই সারা ভারতের সরকারি \'যৌথ বন পরিচালন\' (JFM) ব্যবস্থার আদর্শ ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সমীকরণ, বিক্রিয়া ও সূত্র

প্রজাতি বৈচিত্র্য ও সিম্পসন সূচক সমীকরণ
$$জীববৈচিত্র্য = প্রজাতির প্রাচুর্য (S) + আপেক্ষিক সমতা (E); D = 1 - ≤ft({n_i}{N})^2$$
নরম্যান মায়ার্সের হটস্পট নির্ধারণ শর্ত
$$এন্ডেমিক উদ্ভিদ ≥ ১,৫০০ এবং বাসস্থান ধ্বংস ≥ ৭০\% (অবশিষ্ট ≤ ৩০\%)$$
সমুদ্রের অম্লীকরণ ও খোলস ক্ষয়ের বিক্রিয়া
$$\text{CO}_2 + \text{H}_2\text{O} \rightleftharpoons \text{H}_2\text{CO}_3 \rightleftharpoons \text{H}^+ + \text{HCO}_3^-; \quad \text{H}^+ + \text{CO}_3^{2-} \rightleftharpoons \text{HCO}_3^-$$
কোরাল ব্লিচিং তাপমাত্রা সীমা নীতি
$$ T ≥ +১.০^ থেকে +২.০^ ⇒ ROS বিষক্রিয়া ⇒ জুওক্সানথেলি বিতাড়ন (ব্লিচিং)$$
পুষ্টিস্তরে জৈব বিবর্ধন গুণক (BMF)
$$BMF = {C_{খাদক}}{C_{খাদ্য}} > ১; C_n = C_0 × (BMF)^n$$
ডাইক্লোফেনাক ভিসেরাল গাউট সমীকরণ (শকুন)
$$ডাইক্লোফেনাক শোষণ →{ইউরিক অ্যাসিড নিঃসরণ স্তব্ধ} বৃক্ক বিকল ভিসেরাল গাউট$$
গঙ্গার শুশুকের বায়োসোনার ইকোলোকেশন দূরত্ব সূত্র
$$d = {v_{শব্দ} × t}{২} (v_{জল} ≈ ১,৫০০ মি/সে)$$
আড়াবাড়ি JFM রাজস্ব অংশীদারিত্ব অনুপাত
$$গ্রামবাসীর লভ্যাংশ = ০.২৫ × কাঠের মোট রাজস্ব + ১০০% অপ্রধান বনজ সম্পদ$$

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
জীববৈচিত্র্যের তিনটি প্রধান স্তর কী কী? পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের প্রেক্ষাপটে প্রতিটির একটি করে বাস্তব উদাহরণ দাও।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১. জিনগত বৈচিত্র্য: একই প্রজাতির বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে জিনের ভিন্নতা। উদাহরণ: ভারতে দেশি ধানের ৫০,০০০-এর বেশি জিনগত জাত। ২. প্রজাতিগত বৈচিত্র্য: একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির ভিন্নতা। উদাহরণ: সুন্দরবনে বাঘ, চিত্রল হরিণ, মোহনার কুমির ও গোসাপের সহাবস্থান। ৩. বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য: একাধিক ভিন্নধর্মী প্রাকৃতিক বাসস্থানের উপস্থিতি। উদাহরণ: পশ্চিমবঙ্গে সুন্দরবনের লবণাক্ত ম্যানগ্রোভ, গাঙ্গেয় সমভূমির পলিমাটি, জঙ্গলমহলের শুষ্ক শালবন এবং দার্জিলিংয়ের উচ্চ পাহাড়ি নাতিশীতোষ্ণ বনাঞ্চল।
উদাহরণ 2
বায়োডাইভার্সিটি হটস্পট ঘোষণার জন্য নরম্যান মায়ার্স কর্তৃক নির্ধারিত দুটি বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি কী কী? ভারতের ৪টি হটস্পটের নাম লেখো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
নরম্যান মায়ার্সের দুটি মাপকাঠি: ১. এন্ডেমিজম: অঞ্চলটিতে অন্তত ১,৫০০ প্রজাতির সংবাহী উদ্ভিদকে স্থানীয় বা এন্ডেমিক হতে হবে। ২. বিপদের মাত্রা: অঞ্চলটির আদিম বাসস্থানের অন্তত ৭০% অংশ মানুষের হাতে ধ্বংস হয়ে গেছে হতে হবে। ভারতের ৪টি হটস্পট: ১. পূর্ব হিমালয় ২. ইন্দো-বার্মা ৩. পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ও শ্রীলঙ্কা ৪. সুন্দাল্যান্ড (নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ)
উদাহরণ 3
কোরাল ব্লিচিং কী এবং কেন ঘটে? প্রবাল প্রাচীরকে "সমুদ্রের রেইনফরেস্ট" বলা হয় কেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১. সমুদ্রের রেইনফরেস্ট: প্রবাল প্রাচীর সাগরের মাত্র ০.১% অঞ্চল দখল করে থাকলেও সামুদ্রিক মোট প্রজাতির ২৫%-এর বেশি জীবকে খাদ্য, প্রজনন ও বাসস্থান জোগায়, তাই এদের সমুদ্রের রেইনফরেস্ট বলে। ২. কোরাল ব্লিচিং: প্রবাল পলিপের কলার ভেতর জুওক্সানথেলি নামক আণুবীক্ষণিক রঙিন শৈবাল বাস করে প্রবালকে ৯০% খাদ্য জোগায়। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্র ১-২°C বাড়লে শৈবাল বিষাক্ত রাসায়নিক তৈরি করে। ফলে প্রবাল পলিপ শৈবালকে শরীর থেকে বের করে দেয়। রঙিন শৈবাল না থাকায় প্রবালের নিচের সাদা চুনাপাথরের কঙ্কাল ফুটে ওঠে, একেই কোরাল ব্লিচিং বলে।
উদাহরণ 4
ভারতে শকুনের সংখ্যা ৯৯% হ্রাস পাওয়ার কারণ কী ছিল? এর প্রতিকারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
শকুনের মৃত্যুর কারণ: গবাদি পশুর ব্যথা উপশমে ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক (Diclofenac) ওষুধ। ওষুধ দেওয়া পশু মারা গেলে তার মৃতদেহ খেয়ে শকুনদের কিডনি সম্পূর্ণরূপে বিকল হয়ে যেত এবং অঙ্গে ইউরিক অ্যাসিড জমা হয়ে (ভিসেরাল গাউট) ৪৮ ঘণ্টায় ঝাঁকে ঝাঁকে শকুন মারা যেত। প্রতিকার: ২০০৬ সালে পশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করে শকুনের জন্য নিরাপদ মেলোক্সিক্যাম চালু করা হয় এবং বক্সার রাজাভাতখাওয়ায় কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়।
উদাহরণ 5
গঙ্গার শুশুক বা নদী ডলফিন চোখে দেখতে না পেয়েও কীভাবে ঘোলা জলে শিকার ধরে ও সাঁতার কাটে? এদের প্রধান বিপদ কী?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
শিকার পদ্ধতি: গঙ্গার ঘোলা পলিমাটিযুক্ত জলে বিবর্তনের কারণে শুশুকের চোখের লেন্স নষ্ট হয়ে গেছে, এরা প্রায় দৃষ্টিহীন। শুশুক কপাল থেকে উচ্চ কম্পাঙ্কের আল্ট্রাসনিক শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠায় এবং মাছ বা বাধার গায়ে লেগে ফিরে আসা প্রতিধ্বনি বিশ্লেষণ করে (বায়োসোনার ইকোলোকেশন) নিখুঁতভাবে শিকার ধরে। প্রধান বিপদ: ফারাক্কা বাঁধের কারণে নদীপথ খণ্ডিত হওয়া, বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য দূষণ এবং মাছ ধরার নাইলনের কারেন্ট জালে জড়িয়ে শ্বাস নিতে না পেরে জলে ডুবে মৃত্যু।
উদাহরণ 6
জলজ খাদ্যশৃঙ্খলে DDT-র মতো কীটনাশকের মাধ্যমে কীভাবে জৈব বিবর্ধন (Biomagnification) ঘটে তা উদাহরণসহ লেখো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
জৈব বিবর্ধন হলো অপচ্য ক্ষতিকর রাসায়নিক খাদ্যশৃঙ্খলের ধাপে ধাপে উচ্চ পুষ্টিস্তরে বহু লক্ষ গুণ ঘনীভূত হওয়া। উদাহরণ: জলের DDT (০.০০০0০৩ পিপিএম) $\to$ ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন (০.০৪ পিপিএম) $\to$ জুপ্ল্যাঙ্কটন (০.২ পিপিএম) $\to$ ছোট মাছ (০.৫ পিপিএম) $\to$ বড় মাছ (২.০ পিপিএম) $\to$ মাছখেকো বাজপাখি/ঈগল (২৫ পিপিএম)। প্রভাব: পাখির শরীরে ক্যালসিয়াম তৈরির উৎসেচক নষ্ট হয়ে ডিমের খোসা পাতলা হয়ে যায় এবং তা দেওয়ার সময় ভেঙে ছানা নষ্ট হয়ে যায়।
উদাহরণ 7
১৯৭১-৭২ সালে পশ্চিম মেদিনীপুরের আড়াবাড়িতে ড. এ. কে. ব্যানার্জি পরিচালিত বন সংরক্ষণ আন্দোলনটি কেন স্মরণীয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ডিএফও ড. অজিত কুমার ব্যানার্জি বুঝতে পারেন বলপ্রয়োগ করে জঙ্গল বাঁচানো সম্ভব নয়। তিনি ৬১২টি আদিবাসী পরিবারকে নিয়ে 'বনরক্ষা কমিটি' (FPC) গঠন করেন। চুক্তি: গ্রামবাসীরা ১,২৭০ হেক্টর শালবনকে কাঠচোর ও আগুন থেকে পাহারা দেবে, আর সরকার তাদের শুকনো পাতা ও ডাল সংগ্রহের অধিকার দেবে এবং পরবর্তীতে কাঠ বিক্রির নিট আয়ের ২৫% লভ্যাংশ গ্রামবাসীদের দেবে। এই সফল অংশীদারিত্ব ধ্বংসপ্রাপ্ত বনকে পুনরায় ঘন শালবনে ফিরিয়ে আনে এবং ভারতের জাতীয় যৌথ বন পরিচালন (JFM) ব্যবস্থার জন্ম দেয়।
উদাহরণ 8
পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জাতীয় উদ্যানের নাম এবং প্রতিটির একটি করে প্রধান বন্যপ্রাণীর নাম লেখো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১. সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান (দক্ষিণ ২৪ পরগনা) — রয়েল বেঙ্গল টাইগার ২. জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান (আলিপুরদুয়ার) — ভারতীয় একশৃঙ্গ গণ্ডার ৩. গরুমারা জাতীয় উদ্যান (জলপাইগুড়ি) — একশৃঙ্গ গণ্ডার ও ভারতীয় গৌর ৪. সিঙ্গালীলা জাতীয় উদ্যান (দার্জিলিং) — রেড পান্ডা ৫. নেওড়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যান (কালিম্পং) — রেড পান্ডা ও ক্লাউডেড লেপার্ড ৬. বক্সা জাতীয় উদ্যান (আলিপুরদুয়ার) — বুনো হাতি ও শকুন

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

হরিণ বা গরুর শিংয়ের মতো এতে হাড়ের মজ্জা আছে বলে ধরে নেওয়া।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

গণ্ডারের খড়্গে কোনো হাড় থাকে না; এটি মানুষের চুল ও নখের মতো কেরাটিন (Keratin) প্রোটিনের ঘন তন্তু দিয়ে গঠিত।

সাধারণ ভুল ধারণা

রঙিন শৈবাল হারানো আর কঙ্কাল ধ্বংসের মধ্যে পার্থক্য না বোঝা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সাদা রঙটি হলো প্রবালের স্বচ্ছ চামড়ার নিচে থাকা চুনাপাথরের কঙ্কাল, কারণ তাপমাত্রা বাড়ায় ভেতর থেকে রঙিন জুওক্সানথেলি শৈবাল বেরিয়ে গেছে।

সাধারণ ভুল ধারণা

খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে পরোক্ষ বিষক্রিয়ার ভূমিকা অস্বীকার করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

শকুনদের কেউ সরাসরি বিষ দেয়নি। গরুর চিকিৎসার ব্যথানাশক ডাইক্লোফেনাক ওষুধ মৃত গরুর মাংসের মাধ্যমে শকুনের পেটে গিয়ে কিডনি বিকল করেছিল।

সাধারণ ভুল ধারণা

জলজ রূপ দেখে মাছ ও স্তন্যপায়ীর শ্রেণিবিভাগ গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

শুশুক হলো উষ্ণরক্তের স্তন্যপায়ী প্রাণী (Mammal)। এরা সন্তান প্রসব করে এবং ফুসফুস দিয়ে শ্বাস নেওয়ার জন্য বারবার জলের ওপরে ভেসে ওঠে।

সাধারণ ভুল ধারণা

উভয় পদ্ধতিই প্রাণী বাঁচায় বলে কোনটিতে প্রাকৃতিক বাসস্থান ব্যবহৃত হয় তা ভুলে যাওয়া।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ইন-সিটু হলো প্রাণীর নিজস্ব প্রাকৃতিক বনে সংরক্ষণ (জাতীয় উদ্যান)। এক্স-সিটু হলো বন থেকে বাইরে এনে মানুষের ঘেরা জায়গায় কৃত্রিম প্রজনন (চিড়িয়াখানা)।

সাধারণ ভুল ধারণা

জলের ভৌত দূষণ আর খাদ্যশৃঙ্খলের ট্রফিক স্তরের জৈব ঘনীভবনকে এক ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

জৈব বিবর্ধন মানে খাদ্যের মাধ্যমে নিম্ন পুষ্টিস্তর থেকে উচ্চ খাদক স্তরে চর্বিতে দ্রবণীয় বিষের ঘনত্ব লক্ষ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া।

সাধারণ ভুল ধারণা

দক্ষিণবঙ্গের সুন্দরবন জাতীয় উদ্যানের কথা ভুলে যাওয়া।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম ও বিশ্ববিখ্যাত জাতীয় উদ্যান হলো সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান, যা দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় অবস্থিত।

জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ সংকট ও বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণ — ৪-চতুর্থাংশ ধারণচিত্র

জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ সংকট ও বিপন্ন প্রাণীদের সংরক্ষণ — সামগ্রিক ধারণচিত্র অষ্টম শ্রেণি বিজ্ঞান জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ৫টি মূল একক ১. জীববৈচিত্র্যের স্তর ও বিশ্ব পরিবেশ সংকট ৩টি স্তর: জিনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য মেরু সংকট: বরফ গলন, মেরু ভাল্লুক ও পেঙ্গুইনের আবাস ধ্বংস প্রবাল প্রাচীর: জুওক্সানথেলি ব্লিচিং, সমুদ্রের অম্লীকরণ মৌমাছি সংকট: কলোনি পতন (CCD) ও ক্ষতিকর কীটনাশক ২. আঞ্চলিক বিপন্ন প্রাণী (পশ্চিমবঙ্গ ও ভারত) রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার: সুন্দরবনের শীর্ষ শিকারি, প্রজেক্ট টাইগার ১৯৭৩ একশৃঙ্গ গণ্ডার: জলদাপাড়া ও গরুমারা; খড়্গ চোরাশিকার রেড পান্ডা ও শুশুক: সিঙ্গালীলার বাঁশবন; গঙ্গার অন্ধ ডলফিনের সোনার শকুন ও কচ্ছপ: ডাইক্লোফেনাক গাউট মড়ক; অলিভ রিডলে অরিবাডা ৩. পরিবেশ সংকটের কারণ: HIPPO রূপরেখা আবাস বিনাশ (H): অরণ্য নিধন ও ডুয়ার্সে রৈখিক খণ্ডীকরণ আগ্রাসী প্রজাতি (I): পার্থেনিয়াম, ল্যান্টানা, আফ্রিকান মাগুর দূষণ (P): জৈব বিবর্ধন (DDT), মাইক্রোপ্লাস্টিক, ভারী ধাতু অতি-শোষণ (O): চোরাশিকার, বন্যপ্রাণীর অঙ্গ পাচার, জলবায়ু সংকট ৪. সংরক্ষণ পদ্ধতি ও সুরক্ষিত বনাঞ্চল ইন-সিটু অভয়ারণ্য: পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জাতীয় উদ্যান, সুন্দরবন রিজার্ভ এক্স-সিটু কেন্দ্র: পদ্মজা নাইডু চিড়িয়াখানা (রেড পান্ডা), আলিপুর বন্যপ্রাণী আইন: ১৯৭২ সালের আইন, IUCN রেড লিস্ট (CR, EN) যৌথ বন পরিচালন: আড়াবাড়ি JFM মডেল ১৯৭১, জাহের থান টার্গেট এক্সামস • পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ অষ্টম শ্রেণি পরিবেশ ও বিজ্ঞান পাঠ্যক্রম

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
জীববৈচিত্র্যের স্তর ও হটস্পট: জিনগত, প্রজাতিগত ও বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য; নরম্যান মায়ার্সের হটস্পট শর্ত হলো অন্তত ১,৫০০ এন্ডেমিক উদ্ভিদ ও ৭০% বাসস্থান ধ্বংস (ভারতে ৪টি হটস্পট রয়েছে)।
মূল বিষয় 2
মেরু ও সামুদ্রিক সংকট: উষ্ণায়নে বরফ গলে মেরু ভাল্লুক ও সম্রাট পেঙ্গুইনের আবাস ধ্বংস; সমুদ্রের অম্লীকরণে খোলস দ্রবীভবন; তাপমাত্রা ১-২°C বাড়লে জুওক্সানথেলি বের হয়ে কোরাল ব্লিচিং; কীটনাশকে মৌমাছির কলোনি ধ্বংস (CCD)।
মূল বিষয় 3
আঞ্চলিক বিপন্ন বন্যপ্রাণী: সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার (শীর্ষ খাদক, প্রজেক্ট টাইগার ১৯৭৩); ডুয়ার্সের একশৃঙ্গ গণ্ডার (কেরাটিন খড়্গ চোরাশিকার); সিঙ্গালীলার রেড পান্ডা (বাঁশ পাতা নির্ভরতা, দার্জিলিং চিড়িয়াখানায় প্রজনন); গঙ্গার দৃষ্টিহীন শুশুক (শব্দোত্তর তরঙ্গে ইকোলোকেশন)।
মূল বিষয় 4
শকুনের ডাইক্লোফেনাক মড়ক: গবাদি পশুর ব্যথানাশক ডাইক্লোফেনাক খেয়ে বৃক্ক বিকল ও ভিসেরাল গাউটে শকুনের সংখ্যা ৯৯.৯% হ্রাস; ২০০৬ সালে নিষিদ্ধকরণ ও মেলোক্সিক্যাম প্রতিস্থাপন; বক্সায় শকুন প্রজনন কেন্দ্র।
মূল বিষয় 5
HIPPO রূপরেখা: আবাস বিনাশ (H: ডুয়ার্সে রেলে হাতির মৃত্যু), আগ্রাসী প্রজাতি (I: পার্থেনিয়াম, আফ্রিকান মাগুর), দূষণ (P: খাদ্যশৃঙ্খলে DDT-র ক্ষতিকর জৈব বিবর্ধন), জনসংখ্যা বৃদ্ধি (P) এবং অতি-শোষণ ও চোরাশিকার (O)।
মূল বিষয় 6
IUCN রেড লিস্ট: জীব প্রজাতির অবলুপ্তির ঝুঁকির ভিত্তিতে রেড ডাটা বুক প্রকাশ—বিলুপ্ত (EX), চরম বিপন্ন (CR), বিপন্ন (EN) ও সংকটাসন্ন (VU)।
মূল বিষয় 7
ইন-সিটু সংরক্ষণ ও জাতীয় উদ্যান: প্রাকৃতিক বাসস্থানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ; পশ্চিমবঙ্গের ৬টি জাতীয় উদ্যান—সুন্দরবন, জলদাপাড়া, গরুমারা, সিঙ্গালীলা, নেওড়া ভ্যালি ও বক্সা।
মূল বিষয় 8
বন্যপ্রাণী আইন ও আড়াবাড়ি JFM: বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ১৯৭২; ১৯৭১-৭২ সালে পশ্চিম মেদিনীপুরের আড়াবাড়িতে ড. অজিত কুমার ব্যানার্জির নেতৃত্বে স্থানীয় গ্রামবাসীদের ২৫% রাজস্ব দিয়ে যৌথ বন পরিচালন (JFM)-এর সফল রূপায়ণ।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা মাত্র ১° থেকে ২° সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলেই কীভাবে কোরাল ব্লিচিং ঘটে এবং প্রবালের বেঁচে থাকার জন্য জুওক্সানথেলির ভূমিকা কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: জুওক্সানথেলি শৈবাল সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে প্রবালকে ৯০% শক্তি ও রঙ দেয়। অতিরিক্ত গরমে শৈবাল বিষাক্ত রাসায়নিক তৈরি করায় প্রবাল তাকে বের করে দেয়, ফলে সাদা চুনাপাথরের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ে।
2
পশু চিকিৎসার ওষুধ ডাইক্লোফেনাক কীভাবে ভারতীয় শকুনের বিলুপ্তির কারণ হয়ে উঠেছিল এবং এর প্রতিকারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ডাইক্লোফেনাক দেওয়া মৃত গরুর মাংস খেয়ে শকুনের কিডনি নষ্ট হয়ে ভিসেরাল গাউটে মৃত্যু হয়। সরকার ২০০৬ সালে এটি পশু চিকিৎসায় নিষিদ্ধ করে মেলোক্সিক্যাম চালু করেছে এবং প্রজনন কেন্দ্র গড়েছে।
3
গঙ্গার শুশুক (Platanista gangetica) কার্যত অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে নদীর জলে পথ চলে ও খাদ্য শিকার করে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: গঙ্গার পলিযুক্ত ঘোলা জলে দৃষ্টিশক্তি অপ্রয়োজনীয় হওয়ায় লেন্স নষ্ট হয়ে গেছে; এরা কপাল থেকে উচ্চ কম্পাঙ্কের আল্ট্রাসনিক শব্দের প্রতিধ্বনি শুনে (ইকোলোকেশন) চলাচল ও শিকার করে।
4
ই. ও. উইলসন প্রস্তাবিত HIPPO রূপরেখার প্রতিটি অক্ষরের অর্থ কী? এর মধ্যে "H"-এর একটি স্থানীয় উদাহরণ দাও।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: HIPPO হলো Habitat loss, Invasive species, Pollution, Population growth, Overexploitation। "H"-এর স্থানীয় উদাহরণ হলো ডুয়ার্সের বনের মধ্য দিয়ে যাওয়া রেললাইনে ট্রেনের ধাক্কায় হাতির মৃত্যু।
5
১৯৭১-৭২ সালে পশ্চিম মেদিনীপুরের আড়াবাড়িতে শুরু হওয়া যৌথ বন পরিচালন (JFM) ব্যবস্থার মূল বৈপ্লবিক দিকটি কী ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: বন সুরক্ষায় স্থানীয় গ্রামবাসীদের অংশীদার বানিয়ে তাদের শুকনো বনজ সম্পদ ব্যবহারের অধিকার দেওয়া এবং কাঠ বিক্রির ২৫% সরকারি রাজস্ব ভাগ করে দেওয়া।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ সংকট ও বিপন্ন প্রাণীদের সংরক্ষণ অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।