Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Science • অধ্যায় 7
আনুমানিক সময়: ৫৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

অণুজীবের জগৎ

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণি বিজ্ঞান পাঠ্যক্রম "পরিবেশ ও বিজ্ঞান"-এর অন্তর্গত সপ্তম অধ্যায় "অণুজীবের জগৎ" (World of Microbes)-এর প্রামাণ্য ও সামগ্রিক স্টাডি ম্যাটেরিয়ালে আপনাকে স্বাগতম। প্রাতরাশের এক বাটি দই ও পাউরুটির ফ্লাফি স্পঞ্জি গঠন থেকে শুরু করে জীবনদায়ী অ্যান্টিবায়োটিক, এবং কৃষিক্ষেত্রে নাইট্রোজেন সংবন্ধন থেকে শুরু করে কলেরা, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর মতো ভয়াবহ মহামারী—আণুবীক্ষণিক জীবজগৎ মানবজীবন ও পরিবেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই বিশদ নির্দেশিকাটি ৫টি প্রধান পাঠ্যক্রম মডিউলে বিন্যস্ত: (১) অণুজীবের মহাবিশ্ব: আবিষ্কার, ইতিহাস ও বাসস্থান—অ্যান্টনি ভন লিউয়েনহুক, লুই পাস্তুরের জীবাণুতত্ত্ব, রবার্ট কখের স্বীকার্য, আলেকজান্ডার ফ্লেমিং-এর পেনিসিলিন, এডওয়ার্ড জেনারের টিকা এবং সর্বব্যাপী এক্সট্রিমোফাইল (থার্মোফাইল, হ্যালোফাইল, সাইক্রোফাইল); (২) অণুজীবের ৫টি প্রধান দল—ব্যাকটেরিয়ার পরাগঠন ও আকার (পেপটিডোগ্লাইক্যান, প্লাজমিড, এন্ডোস্পোর), ছত্রাক (কাইটিন, ইস্টের কোরকোদ্গম ও সন্ধান, মোল্ড), আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়া (অ্যামিবা, প্যারামিসিয়াম, প্লাজমোডিয়াম), শৈবাল (ক্ল্যামাইডোমোনাস, স্পাইরোগাইরা, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন) এবং অকোষীয় ভাইরাস (ক্যাপসিড, DNA/RNA, ব্যাকটিরিওফায); (৩) উপকারী ভূমিকা ও মানবকল্যাণ—ল্যাকটোব্যাসিলাস দ্বারা দই তৈরি, ইস্ট দ্বারা পাউরুটি ও অ্যালকোহল সন্ধান, রাইজোবিয়াম ও নীলাভ-সবুজ শৈবাল দ্বারা নাইট্রোজেন সংবন্ধন, খনিজ চক্রায়ন, অ্যান্টিবায়োটিক, প্রতিষেধক টিকা, রিকম্বিন্যান্ট ইনসুলিন, মিথেন বায়োগ্যাস ও তেলের প্রতিকারে সুপারবাগ; (৪) ক্ষতিকারক অণুজীব ও সংক্রামক রোগ—সংক্রমণের পথ (বায়ুবাহিত ড্রপলেট, জলবাহিত, রোগবাহক: অ্যানোফিলিস, এডিস ও মাছি), ব্যাকটিরিয়া ঘটিত রোগ (যক্ষ্মা, কলেরা, টাইফয়েড, ধনুষ্টঙ্কার), ভাইরাস ঘটিত রোগ (পোলিও, ডেঙ্গু, জলাতঙ্ক, এইডস), আদ্যপ্রাণী ও ছত্রাক ঘটিত রোগ (ম্যালেরিয়া, আমাশয়, দাদ) এবং উদ্ভিদ ও গবাদিপশুর রোগ; এবং (৫) খাদ্য বিনষ্টকরণ ও খাদ্য সংরক্ষণ বিজ্ঞান—খাদ্য নষ্টের প্রক্রিয়া, খাদ্য বিষক্রিয়া (ক্লস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনামের নিউরোটক্সিন, স্ট্যাফাইলোকক্কাস, আফলাটক্সিন) এবং সংরক্ষণের আধুনিক নীতিসমূহ যেমন লুই পাস্তুরের পাস্তুরাইজেশন (HTST ৭২°সে), শুষ্ককরণ, লবণ ও চিনি দ্বারা প্লাজমোলাইসিস, রাসায়নিক সংরক্ষক (সোডিয়াম বেনজোয়েট, KMS), ডিপ ফ্রিজিং ও কৌটাজাতকরণ (ক্যানিং)। এই অধ্যায়ে রয়েছে ২৫টি শিক্ষণীয় উপবিভাগ, প্রতিক্রিয়াশীল ভেক্টর SVG কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি বৈজ্ঞানিক নীতি কার্ড, ৮টি আদর্শ পাঠ্যপুস্তক উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষক ফাঁদ সতর্কতা, ৮টি মূল শিক্ষণীয় দিক, সমাধানসহ ৫টি স্ব-মূল্যায়ন প্রশ্ন এবং ৫টি সিবিটি ডায়াগনস্টিক এমসিকিউ।

🦠 অদৃশ্য রণক্ষেত্র: আপনার চারপাশের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অণুজীব বন্ধু ও ঘাতকের গল্প

একটি গভীর শ্বাস নিন: এই একক নিশ্বাসের সাথে আপনি বাতাসে ভাসমান হাজার হাজার অদৃশ্য জীবন্ত প্রাণীকে আপনার ফুসফুসে টেনে নিয়েছেন!

একটি মিলিমিটারের হাজার ভাগের এক ভাগের চেয়েও ছোট এই অতিক্ষুদ্র প্রাণীরা কীভাবে একদিকে খাদ্য তৈরি করে, মাটিতে অমূল্য নাইট্রোজেন যোগায় এবং জীবনদায়ী অ্যান্টিবায়োটিক বানিয়ে মানবজাতিকে রক্ষা করে—আবার অন্যদিকে কলেরা, প্লেগ ও মহামারীতে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ সংহার করে?

আর ১৮৬৪ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের আবিষ্কৃত এক চিমটি গরম ও দ্রুত বরফ-শীতল করার কৌশল কীভাবে দুধকে না ফুটিয়েও দিনের পর দিন সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখে? আসুন, অণুবীক্ষণ যন্ত্রের চোখে এই রহস্যময় অণুজীবের জগৎ প্রত্যক্ষ করি!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণি বিজ্ঞান পাঠ্যক্রম "পরিবেশ ও বিজ্ঞান"-এর অন্তর্গত সপ্তম অধ্যায় "অণুজীবের জগৎ" (World of Microbes)-এর প্রামাণ্য ও সামগ্রিক স্টাডি ম্যাটেরিয়ালে আপনাকে স্বাগতম। প্রাতরাশের এক বাটি দই ও পাউরুটির ফ্লাফি স্পঞ্জি গঠন থেকে শুরু করে জীবনদায়ী অ্যান্টিবায়োটিক, এবং কৃষিক্ষেত্রে নাইট্রোজেন সংবন্ধন থেকে শুরু করে কলেরা, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর মতো ভয়াবহ মহামারী—আণুবীক্ষণিক জীবজগৎ মানবজীবন ও পরিবেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই বিশদ নির্দেশিকাটি ৫টি প্রধান পাঠ্যক্রম মডিউলে বিন্যস্ত: (১) অণুজীবের মহাবিশ্ব: আবিষ্কার, ইতিহাস ও বাসস্থান—অ্যান্টনি ভন লিউয়েনহুক, লুই পাস্তুরের জীবাণুতত্ত্ব, রবার্ট কখের স্বীকার্য, আলেকজান্ডার ফ্লেমিং-এর পেনিসিলিন, এডওয়ার্ড জেনারের টিকা এবং সর্বব্যাপী এক্সট্রিমোফাইল (থার্মোফাইল, হ্যালোফাইল, সাইক্রোফাইল); (২) অণুজীবের ৫টি প্রধান দল—ব্যাকটেরিয়ার পরাগঠন ও আকার (পেপটিডোগ্লাইক্যান, প্লাজমিড, এন্ডোস্পোর), ছত্রাক (কাইটিন, ইস্টের কোরকোদ্গম ও সন্ধান, মোল্ড), আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়া (অ্যামিবা, প্যারামিসিয়াম, প্লাজমোডিয়াম), শৈবাল (ক্ল্যামাইডোমোনাস, স্পাইরোগাইরা, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন) এবং অকোষীয় ভাইরাস (ক্যাপসিড, DNA/RNA, ব্যাকটিরিওফায); (৩) উপকারী ভূমিকা ও মানবকল্যাণ—ল্যাকটোব্যাসিলাস দ্বারা দই তৈরি, ইস্ট দ্বারা পাউরুটি ও অ্যালকোহল সন্ধান, রাইজোবিয়াম ও নীলাভ-সবুজ শৈবাল দ্বারা নাইট্রোজেন সংবন্ধন, খনিজ চক্রায়ন, অ্যান্টিবায়োটিক, প্রতিষেধক টিকা, রিকম্বিন্যান্ট ইনসুলিন, মিথেন বায়োগ্যাস ও তেলের প্রতিকারে সুপারবাগ; (৪) ক্ষতিকারক অণুজীব ও সংক্রামক রোগ—সংক্রমণের পথ (বায়ুবাহিত ড্রপলেট, জলবাহিত, রোগবাহক: অ্যানোফিলিস, এডিস ও মাছি), ব্যাকটিরিয়া ঘটিত রোগ (যক্ষ্মা, কলেরা, টাইফয়েড, ধনুষ্টঙ্কার), ভাইরাস ঘটিত রোগ (পোলিও, ডেঙ্গু, জলাতঙ্ক, এইডস), আদ্যপ্রাণী ও ছত্রাক ঘটিত রোগ (ম্যালেরিয়া, আমাশয়, দাদ) এবং উদ্ভিদ ও গবাদিপশুর রোগ; এবং (৫) খাদ্য বিনষ্টকরণ ও খাদ্য সংরক্ষণ বিজ্ঞান—খাদ্য নষ্টের প্রক্রিয়া, খাদ্য বিষক্রিয়া (ক্লস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনামের নিউরোটক্সিন, স্ট্যাফাইলোকক্কাস, আফলাটক্সিন) এবং সংরক্ষণের আধুনিক নীতিসমূহ যেমন লুই পাস্তুরের পাস্তুরাইজেশন (HTST ৭২°সে), শুষ্ককরণ, লবণ ও চিনি দ্বারা প্লাজমোলাইসিস, রাসায়নিক সংরক্ষক (সোডিয়াম বেনজোয়েট, KMS), ডিপ ফ্রিজিং ও কৌটাজাতকরণ (ক্যানিং)। এই অধ্যায়ে রয়েছে ২৫টি শিক্ষণীয় উপবিভাগ, প্রতিক্রিয়াশীল ভেক্টর SVG কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি বৈজ্ঞানিক নীতি কার্ড, ৮টি আদর্শ পাঠ্যপুস্তক উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষক ফাঁদ সতর্কতা, ৮টি মূল শিক্ষণীয় দিক, সমাধানসহ ৫টি স্ব-মূল্যায়ন প্রশ্ন এবং ৫টি সিবিটি ডায়াগনস্টিক এমসিকিউ।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • ষষ্ঠ অধ্যায়ে (দেহের গঠন) আলোচিত কোষের গঠন, কোষপ্রাচীর, প্লাজমামেমব্রেন ও অঙ্গাণু সংক্রান্ত প্রাথমিক ধারণা।
  • অণুবীক্ষণ যন্ত্রের লেন্স, বিবর্ধন ক্ষমতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান।
  • মানবদেহের বিভিন্ন তন্ত্র (পরিপাক, শ্বসন, সংবহন, অনাক্রম্যতন্ত্র) সম্পর্কিত প্রাথমিক ধারণা।
  • দ্রবণের ঘনত্ব, অভিস্রবণ এবং কোষে প্লাজমোলাইসিসের মৌলিক ভৌত ধারণা।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • অণুজীববিজ্ঞানের ঐতিহাসিক মাইলফলকসমূহ—লিউয়েনহুক, পাস্তুর, কখ, জেনার ও ফ্লেমিং-এর অবদান ব্যাখ্যা করা।
  • অণুজীবসমূহকে ৫টি প্রধান শ্রেণিতে (ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, আদ্যপ্রাণী, শৈবাল ও ভাইরাস) বিভক্ত করে তাদের বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা।
  • খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে অণুজীবের ভূমিকা—দই তৈরিতে ল্যাকটোব্যাসিলাস এবং বেকিং ও মদ্যশিল্পে ইস্টের সন্ধান ক্রিয়া বিশ্লেষণ করা।
  • প্রকৃতির নাইট্রোজেন চক্রে রাইজোবিয়াম ও সায়ানোব্যাকটেরিয়া কর্তৃক জৈবিক নাইট্রোজেন সংবন্ধনের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা।
  • ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, প্রোটোজোয়া ও ছত্রাক ঘটিত রোগের লক্ষণ, জীবাণু ও বাহকের ভূমিকা পৃথক করা।
  • পাস্তুরাইজেশন (HTST) এবং অভিস্রবণীয় প্লাজমোলাইসিসসহ খাদ্য সংরক্ষণের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মূল নীতি বিশ্লেষণ করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. অণুজীবের মহাবিশ্ব: আবিষ্কার, ইতি...
2 ২. অণুজীবের ৫টি প্রধান দল: পরাগঠন ও...
3 ৩. উপকারী ভূমিকা ও মানবকল্যাণ
4 ৪. ক্ষতিকারক অণুজীব, রোগবাহক ও সংক্...
5 ৫. খাদ্য বিনষ্টকরণ ও খাদ্য সংরক্ষণ...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. অণুজীবের মহাবিশ্ব: আবিষ্কার, ইতিহাস ও বাসস্থান

১.১ অণুজীব কী? পরিমাপের একক ও অদৃশ্য জগৎ

যেসব অতিক্ষুদ্র জীবদের খালি চোখে দেখা যায় না এবং যাদের প্রত্যক্ষ করার জন্য অণুবীক্ষণ যন্ত্রের (আলোক বা ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ) সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তাদের অণুজীব (Microorganisms বা Microbes) বলে। মানুষের চোখের বিশ্লেষণ ক্ষমতা প্রায় $০.১\text{ মিমি} = ১০০\ \mu\text{m}$, তাই এর চেয়ে ছোট জীবেরা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অদৃশ্য থাকে।

  • অণুজীববিজ্ঞানে পরিমাপের এককসমূহ:
    • মাইক্রোমিটার ($\mu\text{m}$): $১\ \mu\text{m} = ১০^{-৬}\text{ মিটার} = ১০^{-৩}\text{ মিলিমিটার}$। অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া ($১–১০\ \mu\text{m}$), ছত্রাকের রেণু ($৫–২০\ \mu\text{m}$) এবং আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়া ($১০–১০০\ \mu\text{m}$) মাইক্রোমিটার এককে মাপা হয়।
    • ন্যানোমিটার ($\text{nm}$): $১\text{ nm} = ১০^{-৯}\text{ মিটার} = ১০^{-৩}\ \mu\text{m}$। ইলেকট্রন অণুবীক্ষণযোগ্য অতি-আণুবীক্ষণিক ভাইরাস ($২০–৩০০\text{ nm}$) এবং প্রোটিন অণু ন্যানোমিটারে পরিমাপ করা হয়।
  • অণুজীববিজ্ঞান (Microbiology): জীববিজ্ঞানের যে শাখায় অণুজীবদের শ্রেণিবিন্যাস, অঙ্গসংস্থান, শারীরবৃত্ত, বংশগতি এবং মানবকল্যাণ ও রোগ সৃষ্টিতে তাদের ভূমিকা নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করা হয়, তাকে অণুজীববিজ্ঞান বলে।

১.২ অণুজীববিজ্ঞানের ঐতিহাসিক মাইলফলক

অণুজীবের আবিষ্কার ও গবেষণার ইতিহাস চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মানব সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছে:

  • অ্যান্টনি ভন লিউয়েনহুক (১৬৭৪): ওলন্দাজ বিজ্ঞানী লিউয়েনহুককে "অণুজীববিজ্ঞানের জনক" বলা হয়। তিনি নিজের হাতে তৈরি একক উত্তল লেন্সের সরল অণুবীক্ষণে বৃষ্টির জল, পুকুরের জল ও দাঁতের ময়লা পরীক্ষা করে প্রথম জীবন্ত সচল অণুজীব প্রত্যক্ষ করেন এবং তাদের "Animalcules" (ক্ষুদ্র জীয়ন্ত প্রাণী) নাম দেন।
  • লুই পাস্তুর (১৮২২–১৮৯৫): ফরাসি অণুজীববিজ্ঞানী, যাঁকে "আধুনিক অণুজীববিজ্ঞানের জনক" বলা হয়:
    • স্বতঃজনন মতবাদ খণ্ডন: তাঁর বিখ্যাত হাঁসের গলার মতো বাঁকানো ফ্লাস্ক পরীক্ষার (Swan-neck flask experiment) সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেন যে নির্জীব বস্তু থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জীব সৃষ্টি হতে পারে না; বাতাস থেকে আগত জীবাণুর মাধ্যমেই কেবল খাদ্য পচে যায়।
    • রোগের জীবাণুতত্ত্ব (Germ Theory of Disease): তিনিই প্রথম প্রতিষ্ঠিত করেন যে নির্দিষ্ট সংক্রামক রোগ নির্দিষ্ট জীবাণুর সংক্রমণের ফলেই ঘটে।
    • পাস্তুরাইজেশন (Pasteurization): নিয়ন্ত্রিত উত্তাপ ও দ্রুত শীতলীকরণের মাধ্যমে পানীয়ের রোগজীবাণু ধ্বংস করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।
    • প্রতিষেধক টিকা: অ্যানথ্রাক্স, মুরগির কলেরা এবং মারাত্মক জলাতঙ্ক (Rabies) রোগের প্রথম সফল প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার করেন।
  • রবার্ট কখ (১৮৪৩–১৯১০): জার্মান চিকিৎসক যিনি নির্দিষ্ট রোগের সাথে নির্দিষ্ট জীবাণুর সম্পর্ক প্রমাণের জন্য বিশ্ববিখ্যাত "কখের স্বীকার্য" (Koch's Postulates) প্রণয়ন করেন। তিনি অ্যানথ্রাক্স (Bacillus anthracis, ১৮৭৬), যক্ষ্মা (Mycobacterium tuberculosis, ১৮৮২) এবং কলেরা (Vibrio cholerae, ১৮৮৩)-র জীবাণু আবিষ্কার করেন।
  • আলেকজান্ডার ফ্লেমিং (১৯২৮): স্কটিশ বিজ্ঞানী যিনি প্রথম বিশ্ববিখ্যাত বিস্ময়কর অ্যান্টিবায়োটিক পেনিসিলিন (Penicillin) আবিষ্কার করেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে পেনিসিলিয়াম নটেটাম নামক একটি সবুজ ছত্রাক থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ তার সংলগ্ন স্ট্যাফাইলোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ও কোষপ্রাচীর ধ্বংস করে দিচ্ছে।
  • এডওয়ার্ড জেনার (১৭৯৬): ইংরেজ চিকিৎসক যিনি গোবসন্তের (Cowpox) পুঁজ থেকে মানবদেহে গুটিবসন্তের (Smallpox) প্রথম সফল টিকা আবিষ্কার করে অনাক্রম্যতাতত্ত্বের (Immunology) ভিত্তি স্থাপন করেন।

১.৩ সর্বব্যাপী উপস্থিতি ও চরমপोषী অণুজীব (Extremophiles)

অণুজীবরা পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা প্রাচীন, সফল ও সর্বব্যাপী (Ubiquitous) জীবগোষ্ঠী। এরা বাতাস, মাটি, পানীয় জল, মহাসমুদ্র এবং জীবদেহের অভ্যন্তরে বসবাস করে। চরম বৈরী পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে এমন বিশেষ অণুজীবদের এক্সট্রিমোফাইল বা চরমপोषী অণুজীব বলে:

  • থার্মোফাইল (তাপপ্রিয় অণুজীব): ফুটন্ত গরম জলের উষ্ণপ্রস্রবণ এবং সমুদ্রের তলদেশের আগ্নেয় ভেন্টে $৮০^\circ\text{সে} \text{ থেকে } ১০৫^\circ\text{সে}$ তাপমাত্রায় বসবাস করে (যেমন Thermus aquaticus, যার তাপসহনশীল Taq পলিমারেজ PCR প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়)।
  • সাইক্রোফাইল (শীতপ্রিয় অণুজীব): মেরু অঞ্চলের বরফের চাদর ও হিমায়িত পারমাফ্রস্টে $০^\circ\text{সে} \text{ থেকে } ৫^\circ\text{সে}$ বা তারও কম তাপমাত্রায় বেঁচে থাকে।
  • হ্যালোফাইল (লবণপ্রিয় অণুজীব): মৃত সাগর (Dead Sea) বা অত্যন্ত লবণাক্ত হ্রদে যেখানে লবণের ঘনত্ব ২০% থেকে ৩০% ছাড়িয়ে যায়, সেখানে স্বাভাবিকভাবে জীবনধারণ করে (যেমন Halobacterium)।
  • মিথেনোজেন (Methanogens): অক্সিজেনহীন পাঁকযুক্ত জলাভূমি ও গবাদিপশুর পাকস্থলীতে (রুমেন) বসবাসকারী অবাত আর্কিওব্যাকটেরিয়া যা মিথেন গ্যাস ($\text{CH}_4$) উৎপন্ন করে।

১.৪ অণুজীবের পুষ্টিগত বৈচিত্র্য

  • ১. স্বভোজী অণুজীব (Autotrophic): পরিবেশের অজৈব উপাদান ($CO_2$ ও জল) থেকে নিজেদের খাদ্য নিজেরাই সংশ্লেষ করে:
    • আলোক-স্বভোজী: সৌরশক্তি শোষণ করে খাদ্য বানায়। উদাহরণ: নীলাভ-সবুজ শৈবাল বা সায়ানোব্যাকটেরিয়া (নস্টক, অ্যানাবিনা) এবং সবুজ ও রক্তবর্ণ সালফার ব্যাকটেরিয়া (যা জলের বদলে $\text{H}_2\text{S}$ ব্যবহার করে সালফার মুক্ত করে)।
    • রাসায়নিক-স্বভোজী: অজৈব রাসায়নিক পদার্থের জারণ ঘটিয়ে শক্তি পায়। উদাহরণ: নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া (নাইট্রোসোমোনাস অ্যামোনিয়া জারিত করে নাইট্রাইট এবং নাইট্রোব্যাকটর নাইট্রাইটকে নাইট্রেটে পরিণত করে)।
  • ২. পরভোজী অণুজীব (Heterotrophic): শক্তির জন্য প্রস্তুত জৈব খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল:
    • মৃতজীবী (Saprophytic): মৃত গলিত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহে পরিপাককারী বহিঃকোষীয় উৎসেচক ক্ষরণ করে জটিল খাদ্যকে তরলে ভেঙে শোষণ করে। উদাহরণ: পাউরুটির ছত্রাক (মিউকর, রাইজোপাস), বহু মাটির ব্যাকটেরিয়া।
    • পরজীবী (Parasitic): পোষকের দেহে বসবাস করে পুষ্টি শোষণ করে এবং রোগ সৃষ্টি করে। উদাহরণ: ভিব্রিও কলেরি, প্লাজমোডিয়াম।
    • মিথোজীবী (Symbiotic): অন্য জীবের সাথে পারস্পরিক সহযোগিতায় বসবাস করে। উদাহরণ: শিম্বী গোত্রীয় উদ্ভিদের শিকড়ের অর্বুদে রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া; লাইকেন (ছত্রাক + শৈবাল)।

১.৫ অণুজীবের শ্বসন ও অন্তঃরেণু (Endospore) দ্বারা প্রতিকূলতা জয়

  • শ্বসনের প্রকারভেদ:
    • বাধ্যতামূলক সবাতজীবী: যাদের বাঁচার জন্য মুক্ত অক্সিজেন অপরিহার্য (যেমন Mycobacterium tuberculosis)।
    • বাধ্যতামূলক অবাতজীবী: অক্সিজেনের উপস্থিতিতে মারা যায়; কেবল অক্সিজেনহীন মাধ্যমে বাঁচে (যেমন Clostridium botulinum, Clostridium tetani)।
    • ঐচ্ছিক অবাতজীবী: মূলত অক্সিজেনের উপস্থিতিতে শ্বসন চালায়, তবে অক্সিজেনের অভাব হলে সন্ধান বা অবাত শ্বসনে রূপ নেয় (যেমন E. coli, ইস্ট)।
  • অন্তঃরেণু বা এন্ডোস্পোর গঠন: তীব্র প্রতিকূল পরিবেশে (চরম শুষ্কতা, খাদ্য সংকট, মারাত্মক তাপ বা রাসায়নিক নির্বীজকের প্রভাবে) নির্দিষ্ট কিছু গ্রাম-পজিটিভ দণ্ডাকার ব্যাকটেরিয়া (যেমন Bacillus ও Clostridium) কোষের ভেতরে একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত, নির্জীব সুপ্ত দশা তৈরি করে যাকে এন্ডোস্পোর (Endospore) বলে।
    • এন্ডোস্পোরের কেন্দ্রভাগ অত্যন্ত শুষ্ক ($১০–২৫\%$ জল) থাকে এবং তাতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম-ডিপিকোলিনিক অ্যাসিড ($\text{Ca}^{2+}-\text{DPA}$) জমা থাকে, যা তাপের হাত থেকে DNA-কে অবিকৃত রাখে।
    • বাইরে থাকে পুরু পেপটিডোগ্লাইক্যান কর্টেক্স ও কেরাটিনের মতো দুর্ভেদ্য প্রোটিন আবরণী।
    • এন্ডোস্পোর ফুটন্ত জলেও ($১০০^\circ\text{সে}$) ঘণ্টার পর ঘণ্টা অক্ষত থাকে এবং বহু দশক বা শতাব্দী ধরে সুপ্ত থাকার পর অনুকূল পরিবেশ পেলে পুনরায় সক্রিয় ব্যাকটেরিয়ায় অঙ্কুরিত হয়।

২. অণুজীবের ৫টি প্রধান দল: পরাগঠন ও বৈশিষ্ট্য

২.১ ব্যাকটেরিয়া: আকার, পরাগঠন ও দ্বি-বিভাজন

ব্যাকটেরিয়া (Bacteria) হলো এককোষী, প্রোক্যারিওটিক আণুবীক্ষণিক জীব ($০.২–১০\ \mu\text{m}$), যাদের সুগঠিত নিউক্লিয়াস ও পর্দাবৃত কোনো কোষ অঙ্গাণু থাকে না।

  • আকৃতি অনুসারে শ্রেণিবিভাগ:
    • কক্কাস (Coccus / গোলীয়): গোলাকার ব্যাকটেরিয়া। একক, জোড়ায় (ডিপ্লোকক্কাস নিউমোনি), শৃঙ্খলে (স্ট্রেপ্টোকক্কাস ল্যাকটিস) বা আঙুরের থোকার মতো (স্ট্যাফাইলোকক্কাস) থাকে।
    • ব্যাসিলাস (Bacillus / দণ্ডাকার): রডের মতো লম্বাটে সিলিন্ড্রিক্যাল ব্যাকটেরিয়া (যেমন ল্যাকটোব্যাসিলাস, ইশেরিকিয়া কোলাই, ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস)।
    • স্পাইরিলাম (Spirillum / সর্পিলাকার): স্প্রিং বা কর্কস্ক্রুর মতো পেঁচানো অনমনীয় ব্যাকটেরিয়া (যেমন স্পাইরিলাম ভলুটানস)।
    • ভিব্রিও (Vibrio / কমা-আকৃতি): বাঁকানো কমার মতো দেখতে ব্যাকটেরিয়া (যেমন ভিব্রিও কলেরি)।
  • ব্যাকটেরিয়ার পরাগঠন:
    • ক্যাপসুল বা স্লাইম স্তর: সবচেয়ে বাইরের চটচটে পলিস্যাকারাইড স্তর, যা ফ্যাগোসাইটোসিস ও শুষ্কতা থেকে সুরক্ষা দেয়।
    • কোষপ্রাচীর: পেপটিডোগ্লাইক্যান বা মিউরিন (Peptidoglycan) দিয়ে তৈরি দৃঢ় কাঠামো। (গ্রাম-পজিটিভ ব্যাকটেরিয়ায় পেপটিডোগ্লাইক্যান স্তর পুরু; গ্রাম-নেগেটিভে এটি পাতলা এবং বাইরে একটি অতিরিক্ত লিপোপলিস্যাকারাইড পর্দা থাকে)।
    • প্লাজমামেমব্রেন ও মেসোজোম: ফসফোলিপিড দ্বিস্তর। ভেতরের দিকে খাঁজ সৃষ্টি করে মেসোজোম তৈরি করে যা শ্বসন ও কোষ বিভাজনে সাহায্য করে।
    • নিউক্লয়েড (Nucleoid): কোনো নিউক্লীয় পর্দা থাকে না; সাইটোপ্লাজমে নগ্ন অবস্থায় থাকা একক, বৃত্তাকার, দ্বি-তন্ত্রী DNA।
    • প্লাজমিড (Plasmid): প্রধান ক্রোমোজোমীয় DNA ছাড়াও সাইটোপ্লাজমে ভাসমান অতিরিক্ত ক্ষুদ্র, বৃত্তাকার, স্ব-প্রতিলিপিকরণে সক্ষম DNA অণু। এতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিন থাকে এবং জৈবপ্রযুক্তিতে জিন স্থানান্তরের বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
    • ফ্ল্যাজেলা ও পিলি: ফ্ল্যাজেলিন প্রোটিন নির্মিত চাবুকের মতো ফ্ল্যাজেলা চলাচলে এবং পিলি সংলগ্ন থাকা ও ব্যাকটিরিয়াল কনজুগেশনে অংশ নেয়।
  • জনন: ব্যাকটেরিয়া প্রধানত অযৌন পদ্ধতিতে দ্বি-বিভাজন (Binary Fission) দ্বারা বংশবৃদ্ধি করে। অনুকূল পরিবেশে মাত্র ২০ মিনিটে একবার বিভাজিত হতে পারে ($N_t = N_0 \times 2^n$)।

২.২ ছত্রাক: ইস্ট, মোল্ড ও সন্ধান প্রক্রিয়া

ছত্রাক (Fungi) হলো ক্লোরোফিলবিহীন, পরভোজী ইউক্যারিওটিক জীবগোষ্ঠী। এদের কোষপ্রাচীর কাইটিন (Chitin) দিয়ে তৈরি এবং সঞ্চিত খাদ্য হলো গ্লাইকোজেন ও তেলবিন্দু।

  • এককোষী ছত্রাক — ইস্ট (Yeast):
    • স্যাকারোমাইসিস সেরিভিসি (Saccharomyces cerevisiae) হলো ডিম্বাকার বা গোল এককোষী ছত্রাক (বেকার্স ও ব্রিউয়ার্স ইস্ট)।
    • কোরকোদ্গম (Budding): মাতৃকোষের উপরিভাগে একটি ক্ষুদ্র কুঁড়ি বা কোরক সৃষ্টি হয়। নিউক্লিয়াসটি বিভাজিত হয়ে একটি অপত্য নিউক্লিয়াস কোরকে প্রবেশ করে। কোরকটি পৃথক হয়ে নতুন ইস্ট গঠন করে অথবা ক্ষণস্থায়ী শৃঙ্খল গঠন করে যাকে সিউডোমাইসেলিয়াম বলে।
    • অ্যালকোহল সন্ধান (Alcoholic Fermentation): অক্সিজেনহীন অবস্থায় ইস্টের নিঃসৃত জাইমেজ (Zymase) উৎসেচক গ্লুকোজকে ভেঙে ইথাইল অ্যালকোহল ও কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসে পরিণত করে: $$\text{C}_৬\text{H}_{১২}\text{O}_৬ \xrightarrow{\text{Zymase}} ২\text{C}_২\text{H}_৫\text{OH} + ২\text{CO}_২ + ২\text{ ATP}$$ এই বিক্রিয়াটি পাউরুটি তৈরি ও মদ্যশিল্পের মূল বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
  • বহুকোষী সূত্রাকার মোল্ড (Molds):
    • মিউকর ও রাইজোপাস (পাউরুটির কালো ছাতা): দেহটি তুলোর মতো অসংখ্য সূক্ষ্ম শাখান্বিত সুতোর ন্যায় নলাকার তন্তু নিয়ে গঠিত, যাদের হাইফি বা ছত্রাকসূত্র (Hyphae) বলে। হাইফিগুলির সমগ্র জটিল জালককে মাইসেলিয়াম (Mycelium) বলে।
    • পেনিসিলিয়াম (Penicillium): নীলচে-সবুজ মোল্ড যার হাইফির মাথায় ব্রাশ বা তুলির মতো কনিডিয়োফোর থাকে এবং তাতে কনিডিয়া নামক গোল গোল অযৌন রেণু সজ্জিত থাকে। পেনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিকের প্রধান প্রাকৃতিক উৎস।
    • অ্যাসপারগিলাস (Aspergillus): কালো ছাতা যা স্যাঁতসেঁতে চাল, গম ও চিনাবাদামে বাসা বাঁধে এবং বিষাক্ত ক্যান্সার সৃষ্টিকারী আফলাটক্সিন নির্গত করে।

২.৩ প্রোটোজোয়া বা আদ্যপ্রাণী: প্রাণীর মতো এককোষী প্রটিস্ট

প্রোটোজোয়া (Protozoa) হলো এককোষী, পরভোজী ইউক্যারিওটিক আণুবীক্ষণিক জীব যাদের কোনো কোষপ্রাচীর থাকে না। গমন অঙ্গের ওপর ভিত্তি করে এদের শ্রেণিবিভাগ করা হয়:

শ্রেণি চলন অঙ্গাণু প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য
অ্যামিবয়েড (Amoeboid) ক্ষণপদ বা পাদাভ (Pseudopodia) Amoeba proteus, Entamoeba histolytica অনির্দিষ্ট পরিবর্তনশীল আকার; ফ্যাগোসাইটোসিস দ্বারা খাদ্য গ্রহণ; এন্টঅ্যামিবা মানব অন্ত্রে ক্ষত সৃষ্টি করে আমাশয় ঘটায়।
সিলিয়াযুক্ত (Ciliated) হাজার হাজার সূক্ষ্ম সিলিয়া (Cilia) Paramecium caudatum ("চটি জুতো আকৃতির") মুখবিবর বা সাইটোস্টোম থাকে; জল নিয়ন্ত্রণের জন্য সংকোচনশীল ভ্যাকুওল; দুটি নিউক্লিয়াস (ম্যাক্রো ও মাইক্রোনিউক্লিয়াস)।
ফ্ল্যাজেলাযুক্ত (Flagellated) চাবুকের মতো ফ্ল্যাজেলা (Flagella) Euglena, Trypanosoma, Giardia ইউগ্লিনা আলোতে সালোকসংশ্লেষ ও অন্ধকারে পরভোজী (মিশ্রভোজী); ট্রাইপ্যানোসোমা ঘুমরোগ (Sleeping sickness) ঘটায়।
স্পোরোজোয়া (Sporozoa) কোনো চলন অঙ্গ নেই (সম্পূর্ণ পরজীবী) Plasmodium vivax, Plasmodium falciparum ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু; স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা ও মানবদেহে জটিল জীবনচক্র সম্পন্ন করে।

২.৪ শৈবাল: সালোকসংশ্লেষকারী জলজ অণুজীব

শৈবাল (Algae) হলো ক্লোরোফিলযুক্ত, স্বভোজী, ইউক্যারিওটিক থ্যালোফাইটা উদ্ভিদ যাদের দেহ মূল, কাণ্ড বা পাতায় বিভক্ত নয় এবং কোষে সেলুলোজ প্রাচীর থাকে:

  • এককোষী শৈবাল:
    • ক্ল্যামাইডোমোনাস (Chlamydomonas): নাশপাতি আকৃতির সচল সবুজ শৈবাল যার দুটি ফ্ল্যাজেলা, একটি পেয়ালার মতো ক্লোরোপ্লাস্ট, পাইরিনয়েড এবং আলো সংবেদী চক্ষুস্পট (আইস্পট) থাকে।
    • ডায়াটম (Diatoms): সোনালী-বাদামী রঙের এককোষী শৈবাল যার কোষপ্রাচীরে সিলিকা জমা হয়ে সাবানের বাক্সের মতো দুটি ঢাকনা তৈরি করে (ফ্রুস্টিউল)। কোটি কোটি বছরের সঞ্চিত মৃত ডায়াটমের খোলস থেকে ডায়াটোমাসিয়াস মৃত্তিকা তৈরি হয়।
  • উপনিবেশ গঠনকারী ও সূত্রাকার শৈবাল:
    • ভলভক্স (Volvox): মিষ্টি জলে ঘূর্ণায়মান ফাঁপা গোল বলের মতো কলোনি (সিনোবিয়াম), যাতে হাজার হাজার ফ্ল্যাজেলাযুক্ত কোষ দলবদ্ধভাবে থাকে।
    • স্পাইরোগাইরা (Spirogyra / জলজ রেশম): অশাখ সূত্রাকার সবুজ শৈবাল যার কোষে ফিতার মতো সর্পিলাকার ক্লোরোপ্লাস্ট সাজানো থাকে।
  • বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্ব: সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন শৈবাল পৃথিবীর ৫০%-এরও বেশি সালোকসংশ্লেষ সম্পাদন করে এবং বায়ুমণ্ডলের প্রধান অক্সিজেন যোগানদার হিসেবে কাজ করে।

২.৫ ভাইরাস: জীবনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা অকোষীয় সত্তা

ভাইরাস (Virus) হলো এমন এক অনন্য অতি-আণুবীক্ষণিক জৈব সত্তা যা সজীব ও নির্জীব জগতের সংযোগকারী সেতু হিসেবে কাজ করে। ১৮৯৮ সালে বেইজেরিঙ্ক একে Contagium vivum fluidum বলেন এবং ১৯৩৫ সালে স্ট্যানলি তামাকের মোজাইক ভাইরাস (TMV) কেলাসিত করেন।

  • নির্জীব বৈশিষ্ট্য:
    • অকোষীয় (Acellular); এতে কোনো সাইটোপ্লাজম, কোষপর্দা, কোষ অঙ্গাণু বা রাইবোজোম নেই।
    • কোনো নিজস্ব শ্বসন, পুষ্টি, বৃদ্ধি বা স্বাধীন বিপাকীয় ক্রিয়া নেই।
    • পোষক কোষের বাইরে এটি চিনির বা লবণের স্ফটিকের মতো সম্পূর্ণ নির্জীব কেলাস আকারে শত শত বছর পড়ে থাকতে পারে।
  • সজীব বৈশিষ্ট্য:
    • এদের নির্দিষ্ট বংশগত উপাদান (DNA অথবা RNA) থাকে।
    • জীবন্ত পোষক কোষে প্রবেশ করে পোষকের প্রোটিন সংশ্লেষ কলকব্জা দখল করে নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে।
    • এদের জিনগত পরিব্যক্তি (Mutation) ঘটে এবং ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী রূপ নিতে পারে।
  • ভাইরাসের গঠন:
    • কেন্দ্রীয় জিনোম: কেন্দ্রে থাকে হয় DNA নতুবা RNA (একই ভাইরাসে কখনোই DNA ও RNA একসাথে থাকে না)।
    • ক্যাপসিড (Capsid): নিউক্লিক অ্যাসিডকে ঘিরে থাকা প্রোটিন আবরণী, যা অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রোটিন উপ-একক ক্যাপসোমিয়ার (Capsomeres) দিয়ে গঠিত।
    • এনভেলপ: কিছু ভাইরাসের বাইরে লিপিড-প্রোটিনের আস্তরণ থাকে (যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা, HIV, করোনাভাইরাস)।
    • ব্যাকটিরিওফায (Bacteriophage): যে সমস্ত ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া কোষকে আক্রমণ করে মেরে ফেলে (যেমন T2, T4 ফায)।

৩. উপকারী ভূমিকা ও মানবকল্যাণ

৩.১ খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও দুগ্ধশিল্পে অণুজীব

মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই খাদ্য উৎপাদন ও সংরক্ষণে উপকারী অণুজীবদের ব্যবহার করে আসছে:

  • দই প্রস্তুতি ও ল্যাকটিক অ্যাসিড সন্ধান:
    • হালকা গরম দুধে ($৩৭–৪০^\circ\text{সে}$) সামান্য পরিমাণ পুরনো দই (সাঁজা বা Inoculum) মেশালে তাতে উপস্থিত লক্ষ লক্ষ ল্যাকটোব্যাসিলাস (Lactobacillus acidophilus) ব্যাকটিরিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে।
    • ব্যাকটেরিয়াগুলি দুধের শর্করা ল্যাকটোজ ($\text{C}_{১২}\text{H}_{২২}\text{O}_{১১}$)-কে গেঁজে ফেলে ল্যাকটিক অ্যাসিড ($\text{CH}_৩\text{CH(OH)COOH}$)-এ পরিণত করে: $$\text{C}_{১২}\text{H}_{২২}\text{O}_{১১} + \text{H}_২\text{O} \xrightarrow{\text{LAB}} ৪\text{CH}_৩\text{CH(OH)COOH}$$
    • ল্যাকটিক অ্যাসিড দুধের pH কমিয়ে দেয়, যার ফলে দুধের দ্রবণীয় প্রোটিন কেসিন (Casein) জমাট বেঁধে শক্ত থকথকে দইয়ে রূপান্তরিত হয়।
    • দই অত্যন্ত পুষ্টিকর কারণ ল্যাকটোব্যাসিলাস প্রচুর ভিটামিন $B_{১২}$ তৈরি করে এবং মানুষের অন্ত্রে ক্ষতিকারক জীবাণুর বৃদ্ধি রোধ করে।
  • পাউরুটি তৈরি ও বেকিং শিল্প:
    • ময়দার তালের সাথে জল, চিনি ও বেকার্স ইস্ট (Saccharomyces cerevisiae) মাখিয়ে উষ্ণ স্থানে রেখে দিলে ইস্ট দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
    • ইস্ট অবাত শ্বসন দ্বারা ময়দার শর্করা ভেঙে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড ($\text{CO}_২$) গ্যাস উৎপন্ন করে।
    • এই $\text{CO}_২$ গ্যাসের বুদ্বুদ ময়দার মধ্যে থাকা আঠালো প্রোটিন গ্লুটেন (Gluten)-এর খাঁচায় আটকে পড়ে ময়দার তালটিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ করে দেয়।
    • যখন এই ফাঁপা তাল ওভেনে ($১৮০–২২০^\circ\text{সে}$) বেক করা হয়, তখন উত্তাপে গ্যাস বুদ্বুদগুলি আরও প্রসারিত হয়ে বেরিয়ে যায় এবং পাউরুটি নরম, হালকা ও অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত স্পঞ্জের মতো হয়। উৎপন্ন অ্যালকোহল তাপে সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত হয়ে উবে যায়।
  • এককোষী প্রোটিন (SCP): প্রোটিনসমৃদ্ধ শৈবাল স্পাইরুলিনা (Spirulina) ও ক্লোরেল্লা (Chlorella) মানবদেহের বিকল্প পুষ্টিকর খাদ্য ও মহাকাশচারীদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৩.২ কৃষিকাজ, মাটির উর্বরতা ও নাইট্রোজেন সংবন্ধন

বায়ুমণ্ডলে প্রায় ৭৮% নাইট্রোজেন গ্যাস ($\text{N}_২$) থাকা সত্ত্বেও উদ্ভিদ তা সরাসরি গ্রহণ করতে পারে না, কারণ দুটি নাইট্রোজেন পরমাণু অত্যন্ত শক্তিশালী ত্রিবন্ধন ($N \equiv N$) দ্বারা আবদ্ধ। কেবল নির্দিষ্ট কিছু অণুজীবের নাইট্রোজিনেজ (Nitrogenase) উৎসেচক থাকে যা এই নাইট্রোজেনকে আবদ্ধ করতে পারে:

  • ১. জৈবিক নাইট্রোজেন সংবন্ধন (Biological Nitrogen Fixation): $$\text{N}_২ + ৮\text{H}^+ + ৮e^- + ১৬\text{ ATP} \xrightarrow{\text{Nitrogenase}} ২\text{NH}_৩ + \text{H}_২ + ১৬\text{ ADP} + ১৬\text{ P}_i$$
    • মিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া: রাইজোবিয়াম (Rhizobium leguminosarum) শিম্বী গোত্রীয় উদ্ভিদের (মটর, ছোলা, মসুর) মূলের রোম দিয়ে প্রবেশ করে এবং মূলে গোলাকার মূল অর্বুদ (Root Nodule) গঠন করে।
      উদ্ভিদ ব্যাকটেরিয়াকে আশ্রয় ও শর্করা দেয়; বিনিময়ে রাইজোবিয়াম বায়ুর নাইট্রোজেনকে অ্যামোনিয়াতে রূপান্তরিত করে উদ্ভিদকে যোগায়।
      লেগহিমোগ্লোবিন (Leghemoglobin): সক্রিয় অর্বুদের ভেতরের অংশ লালচে-গোলাপি হয় কারণ তাতে লেগহিমোগ্লোবিন নামক অক্সিজেন সংগ্রাহক রঞ্জক থাকে। এটি নাইট্রোজিনেজ উৎসেচককে অক্সিজেনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে সম্পূর্ণ অক্সিজেনহীন পরিবেশ বজায় রাখে।
    • স্বাধীনজীবী ব্যাকটেরিয়া: মাটিতে মুক্তভাবে বাস করে বাতাস থেকে নাইট্রোজেন বাঁধে—সবাতজীবী অ্যাজোটোব্যাকটর ও অবাতজীবী ক্লস্ট্রিডিয়াম।
    • নীলাভ-সবুজ শৈবাল: অ্যানাবিনা (Anabaena) ও নস্টক (Nostoc)-এর দেহে হেটারোসিস্ট (Heterocyst) নামক বিশেষায়িত প্রাচীরযুক্ত কোষে নাইট্রোজেন সংবন্ধন ঘটে। ধানক্ষেতে এদের প্রয়োগ করলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছাড়াই জমির উর্বরতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।
  • ২. নাইট্রিফিকেশন ও ডিনাইট্রিফিকেশন:
    • নাইট্রিফিকেশন: মৃতদেহ থেকে উৎপন্ন অ্যামোনিয়াকে নাইট্রোসোমোনাস ব্যাকটেরিয়া নাইট্রাইটে ($\text{NO}_২^-$) এবং নাইট্রোব্যাকটর নাইট্রেটে ($\text{NO}_৩^-$) রূপান্তরিত করে, যা উদ্ভিদের শিকড় সহজে শোষণ করে।
    • ডিনাইট্রিফিকেশন: জলবদ্ধ অক্সিজেনহীন মাটিতে সিউডোমোনাস ডিনাইট্রিফিকানস মাটির নাইট্রেটকে পুনরায় নাইট্রোজেন গ্যাসে ($\text{N}_২$) পরিণত করে বায়ুমণ্ডলে ফেরত পাঠায়।
  • ৩. জৈবসার ও জৈব কীটনাশক: মৃতজীবী অণুজীবেরা বর্জ্য পচিয়ে মাটিতে হিউমাস তৈরি করে। ব্যাকটিরিয়া ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস (Bt)-এর ক্ষরিত প্রোটিন স্ফটিক ফসলের ক্ষতিকারক শুঁয়োপোকা ও কীটপতঙ্গ দমন করতে জৈব কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৩.৩ চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ঔষধ শিল্পে অণুজীব

  • অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotics): অণুজীব (ছত্রাক বা অ্যাকটিনোমাইসিটিস ব্যাকটেরিয়া) থেকে উৎপন্ন যে সমস্ত জৈব রাসায়নিক পদার্থ অতি অল্প ঘনমাত্রায় অন্যান্য ক্ষতিকারক রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটিরিয়াকে ধ্বংস করে বা তাদের বৃদ্ধি চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়:
    অ্যান্টিবায়োটিক উৎস অণুজীব অণুজীবের শ্রেণি কার্যপ্রণালী
    পেনিসিলিন Penicillium notatum ছত্রাক (মোল্ড) ব্যাকটেরিয়ার পেপটিডোগ্লাইক্যান কোষপ্রাচীর তৈরি আটকে দেয়, ফলে ব্যাকটেরিয়া ফেটে মরে।
    স্ট্রেপ্টোমাইসিন Streptomyces griseus অ্যাকটিনোমাইসিটিস (ব্যাকটেরিয়া) ব্যাকটেরিয়ার 70S রাইবোজোমে প্রোটিন সংশ্লেষ বন্ধ করে (যক্ষ্মার বিরুদ্ধে কার্যকরী)।
    টেট্রাসাইক্লিন Streptomyces aureofaciens অ্যাকটিনোমাইসিটিস ব্যাপক পরিসরের (Broad spectrum) ব্যাকটেরিয়া দমনকারী ওষুধ।

    অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের বিপদ: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অপ্রয়োজনে বা কোর্স অসম্পূর্ণ রেখে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে প্রতিরোধী ক্ষতিকারক সুপারবাগ (Superbugs) সৃষ্টি হয়। মনে রাখা জরুরি: ভাইরাস ঘটিত রোগ যেমন সাধারণ সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ডেঙ্গুতে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজ করে না।

  • প্রতিষেধক টিকা ও অনাক্রম্যতা (Vaccines): মৃত বা দুর্বল করে রাখা রোগজীবাণু অথবা তাদের নিষ্ক্রিয় বিষাক্ত পদার্থ যা সুস্থ ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করালে কোনো রোগ সৃষ্টি না করে দেহের অনাক্রম্যতন্ত্রকে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি এবং দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিকোষ (Memory cells) তৈরি করতে উদ্দীপিত করে:
    • BCG টিকা: যক্ষ্মা রোগ প্রতিরোধের জন্য শিশুদের জন্মের পরপরই দেওয়া হয়।
    • পোলিও টিকা: ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন (OPV / সাবিন) ও ইনজেকশন পোলিও (IPV / সাল্ক)।
    • DPT টিকা: ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি (পারটুসিস) ও ধনুষ্টঙ্কার (টিটেনাস) প্রতিরোধের ত্রিপল অ্যান্টিজেন।
  • রিকম্বিন্যান্ট মানব ইনসুলিন (Humulin): জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতিতে মানুষের ইনসুলিন তৈরির জিন E. coli ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমিডে যুক্ত করে শিল্প কারখানায় ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খাঁটি মানব ইনসুলিন তৈরি করা হয়।

৩.৪ শিল্পজাত রাসায়নিক পদার্থ ও উৎসেচক উৎপাদন

  • জৈব অ্যাসিড:
    • সাইট্রিক অ্যাসিড: ছত্রাক অ্যাসপারগিলাস নাইজার থেকে উৎপন্ন হয় (কোমল পানীয় ও ঔষধে ব্যবহৃত)।
    • অ্যাসিটিক অ্যাসিড (ভিনিগার): ব্যাকটেরিয়া অ্যাসিটোব্যাকটর অ্যাসিটি অ্যালকোহল জারিত করে তৈরি করে।
  • শিল্পজাত উৎসেচক: ফলের রস পরিষ্কার করতে পেকটিনেজ, ডিটারজেন্টে তেল-কালি দূর করতে লাইপেজ এবং হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর রক্তনালীর রক্ত জমাট গলিয়ে দিতে ব্যাকটিরিয়া ঘটিত স্ট্রেপ্টোকাইনেজ (Streptokinase) উৎসেচক ব্যবহৃত হয়।

৩.৫ বর্জ্য পরিশোধন, বায়োগ্যাস ও বায়োরিমেডিয়েশন

  • নর্দমার জল শোধন (Sewage Treatment): নর্দমার জলকে বায়ুযুক্ত ট্যাঙ্কে সবাত ব্যাকটেরিয়া দ্বারা জৈব দূষক অপচিত করিয়ে পরিশোধিত করা হয়।
  • বায়োগ্যাস উৎপাদন: অবাত মিথেনোজেন ব্যাকটেরিয়া (Methanobacterium) গোবর ও আবর্জনাকে পচিয়ে মিথেন ($\text{CH}_৪, ৫৫–৭০\%$) ও কার্বন ডাই-অক্সাইড যুক্ত ধোঁয়াহীন চমৎকার রান্নার বায়োগ্যাস উৎপন্ন করে।
  • তেল দূষণ রোধে বায়োরিমেডিয়েশন: ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী ড. আনন্দমোহন চক্রবর্তী জিন প্রযুক্তির সাহায্যে Pseudomonas putida ("সুপারবাগ") তৈরি করেন, যা সমুদ্রে তেলের জাহাজের দুর্ঘটনাস্থলে হাইড্রোকার্বন তেল খেয়ে সমুদ্রের জলকে পরিষ্কার করতে পারে।

৪. ক্ষতিকারক অণুজীব, রোগবাহক ও সংক্রামক রোগ

৪.১ রোগজনক অণুজীব ও সংক্রমণের পথ

যে সমস্ত অণুজীব মানবদেহে, গৃহপালিত পশুতে বা উদ্ভিদে রোগ সৃষ্টি করে, তাদের প্যাথোজেন বা রোগজনক জীবাণু (Pathogen) বলে। সংক্রামক রোগ বিভিন্ন উপায়ে ছড়ায়:

  • ১. বায়ুবাহিত ড্রপলেট সংক্রমণ: রোগী হাঁচি বা কাশি দিলে বাতাসে নির্গত কোটি কোটি সূক্ষ্ম জলবিন্দু বা অ্যারোসল নিঃশ্বাসের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তির ফুসফুসে প্রবেশ করে (যেমন যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, সর্দি-কাশি, হাম, করোনা)।
  • ২. দূষিত জল ও খাদ্যের মাধ্যমে (Fecal-Oral Route): মলমূত্র দ্বারা দূষিত জল পান করলে বা খোলা বাজারের মাছি বসা দূষিত খাবার খেলে (যেমন কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস A, আমাশয়, পোলিও)।
  • ৩. রোগবাহকের মাধ্যমে (Vectors):
    • স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা: ম্যালেরিয়ার আদ্যপ্রাণী প্লাজমোডিয়াম বহন করে। মশার ডিমের পুষ্টির জন্য উষ্ণ রক্তের প্রোটিন দরকার হয়, তাই কেবল স্ত্রী মশা কামড়ায় (পুরুষ মশা ফলের রস খায়)।
    • স্ত্রী এডিস মশা (Aedes aegypti): ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের বাহক। এর পায়ে ও পিঠে সাদা-কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে এবং এটি মূলত দিনের বেলায় কামড়ায়।
    • সাধারণ মাছি (Musca domestica): আবর্জনা ও মলের ওপর বসে তার লোমশ পায়ে ও আঠালো প্যাডে কলেরা ও টাইফয়েডের জীবাণু মেখে খোলা খাবারে গিয়ে বসে।
    • ইঁদুরের মাছি (Rat Flea): প্লেগ রোগের জীবাণু ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস ছড়ায়।
  • ৪. প্রত্যক্ষ স্পর্শ ও ফোমাইট: রোগীর ত্বকের সংস্পর্শে এলে বা তার ব্যবহৃত গামছা, তোয়ালে, চিরুনি বা পোশাক ব্যবহার করলে (যেমন দাদ, খোসপাঁচড়া)।

৪.২ মানবদেহে ব্যাকটিরিয়া ঘটিত প্রধান রোগসমূহ

  • যক্ষ্মা (Tuberculosis / TB):
    • রোগের জীবাণু: Mycobacterium tuberculosis (দণ্ডাকার অ্যাসিড-ফাস্ট ব্যাসিলাস)।
    • আক্রান্ত অঙ্গ: প্রধানত ফুসফুস, তবে হাড় ও লসিকাগ্রন্থিও হতে পারে।
    • লক্ষণ: ৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী দীর্ঘস্থায়ী কাশি, কাশির সাথে রক্ত পড়া, বুকে ব্যথা, সন্ধ্যার দিকে অল্প জ্বর ও রাতে ঘাম হওয়া, দ্রুত ওজন হ্রাস।
    • সংক্রমণ: রোগীর থুতু ও হাঁচি-কাশির ড্রপলেট দ্বারা বায়ুবাহিত সংক্রমণ।
    • প্রতিরোধ ও চিকিৎসা: জন্মের সময় BCG টিকা; চিকিৎসা হিসেবে DOTS পদ্ধতিতে ৬-৯ মাস ধরে নিয়মিত একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক সেবন।
  • কলেরা (Cholera):
    • রোগের জীবাণু: Vibrio cholerae (কমা আকৃতির ব্যাকটেরিয়া)।
    • লক্ষণ: হঠাৎ করে ঘন ঘন চাল ধোয়া জলের মতো পাতলা পায়খানা (Rice-water stool), তীব্র বমি, শরীরে জলের চরম ঘাটতি (Dehydration), চোখ বসে যাওয়া, নাড়ি ক্ষীণ হওয়া ও পেশির টান। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু ঘটে।
    • সংক্রমণ: মাছি ও মল দ্বারা দূষিত জল ও খাবার।
    • জরুরি চিকিৎসা: অবিলম্বে ঘন ঘন ORS (ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন) পান করানো এবং প্রয়োজনে স্যালাইন দেওয়া।
  • টাইফয়েড (Typhoid Fever):
    • রোগের জীবাণু: Salmonella typhi।
    • লক্ষণ: ধাপে ধাপে বাড়তে থাকা একটানা প্রচণ্ড জ্বর ($১০৩–১০৪^\circ\text{F}$), তীব্র মাথাব্যথা, পেটে ব্যথা, পেটে লালচে ফুসকুড়ি (Rose spots), গুরুতর অবস্থায় অন্ত্র ফুটো হয়ে রক্তপাত।
    • শনাক্তকরণ: রক্তের ওয়াইডাল পরীক্ষা (Widal Test)।
  • ধনুষ্টঙ্কার (Tetanus):
    • রোগের জীবাণু: Clostridium tetani (অবাত মৃতজীবী ব্যাকটেরিয়া)।
    • সংক্রমণ: মরচে ধরা লোহা, পেরেক, কাঁচ বা গোবর-মাটি মাখা ক্ষতস্থান দিয়ে জীবাণুর এন্ডোস্পোর শরীরে ঢোকে। ক্ষরিত টিটানোস্প্যাজমিন নিউরোটক্সিন স্নায়ু অবশ করে চোয়াল শক্ত করে দেয় (Lockjaw) এবং পিঠ ধনুকের মতো বেঁকে যায়। প্রতিষেধক: টিটেনাস টক্সয়েড (TT)।

৪.৩ মানবদেহে ভাইরাস ঘটিত প্রধান রোগসমূহ

  • পোলিও (Poliomyelitis):
    • জীবাণু: পোলিওভাইরাস (RNA ভাইরাস)। দূষিত জলের মাধ্যমে প্রবেশ করে সুষুম্নাকাণ্ডের মোটর স্নায়ুকে ধ্বংস করে দেয়, ফলে অঙ্গের (বিশেষ করে পায়ের) পেশি অসাড় ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত (Paralysis) হয়ে যায়। প্রতিরোধ: ওরাল পোলিও ড্রপ (OPV)।
  • ডেঙ্গু (Dengue Fever):
    • জীবাণু: ডেঙ্গু ভাইরাস (Flavivirus)। বাহক: দিনের বেলা কামড়ানো স্ত্রী এডিস মশা।
    • লক্ষণ: প্রচণ্ড জ্বর, চোখের পেছনের অংশে অসহ্য ব্যথা, হাড় ও গাঁটে তীব্র যন্ত্রণা ("হাড়ভাঙা জ্বর" বা Breakbone fever)।
    • মারাত্মক অবস্থা (DHF): রক্তে অণুচক্রিকা বা প্লেটলেটের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়া (৫০,০০০-এর নিচে নামা), মাড়ি ও নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ। প্রতিরোধ: জমা জল পরিষ্কার রাখা।
  • জলাতঙ্ক (Rabies / Hydrophobia):
    • জীবাণু: র‍্যাবিস ভাইরাস। পাগল কুকুর, শেয়াল, বাদুড় বা বিড়ালের লালার মাধ্যমে কামড় বা আঁচড় থেকে ছড়ায়।
    • লক্ষণ: স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয়ে গলায় আক্ষেপ হয়, জল গিলতে তীব্র যন্ত্রণা হওয়ায় জল দেখে ভয় পায় (হাইড্রোফোবিয়া)। লক্ষণ প্রকাশ পেলে মৃত্যু প্রায় ১০০% নিশ্চিত।
    • প্রতিরোধ: কামড়ানোর সাথে সাথে ক্ষতস্থানটি অন্তত ১৫ মিনিট সাবান ও রানিং জলে ধোয়া এবং অবিলম্বে অ্যান্টি-র‍্যাবিস ইনজেকশন নেওয়া।
  • এইডস (AIDS): হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (HIV) দ্বারা ঘটে। এটি রক্তের সহায়ক CD4+ T-লিম্ফোসাইট ধ্বংস করে অনাক্রম্যতন্ত্র নষ্ট করে দেয়। অসুরক্ষিত যৌনমিলন, সংক্রমিত রক্তগ্রহণ ও জীবাণুমুক্ত না করা সুঁচের মাধ্যমে ছড়ায়। শনাক্তকরণ: ELISA পরীক্ষা।

৪.৪ আদ্যপ্রাণী ও ছত্রাক ঘটিত রোগ

  • ম্যালেরিয়া (Malaria):
    • জীবাণু: প্রোটোজোয়া পরজীবী প্লাজমোডিয়াম (Plasmodium vivax ও ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ার P. falciparum)। ১৮৯৭ সালে সেকেন্দ্রাবাদে স্যার রোনাল্ড রস প্রমাণ করেন যে স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা এই রোগের বাহক।
    • লক্ষণ ও প্রক্রিয়া: জীবাণু প্রথমে যকৃতে এবং পরে লোহিত রক্তকণিকায় (RBC) বংশবৃদ্ধি করে। প্রতি ৪৮ বা ৭২ ঘণ্টা অন্তর লক্ষ লক্ষ RBC একসাথে ফেটে গিয়ে রক্তে হিমোজোয়েন (Hemozoin) নামক বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ মুক্ত করে।
    • তিনটি পর্যায়: তীব্র কাঁপুনির শীতের পর্যায় $\to$ প্রচণ্ড উত্তাপের জ্বরের পর্যায় ($১০৪–১০৫^\circ\text{ফে}$) $\to$ ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার পর্যায়। রোগী রক্তাল্পতায় ভোগে ও প্লীহা বড় হয়ে যায়। ওষুধ: সিঙ্কোনা গাছের ছাল থেকে প্রাপ্ত কুইনাইন বা আর্টেমিসিনিন। মশা দমনে গাপ্পি ও গ্যাম্বুসিয়া মাছ ব্যবহার করা হয়।
  • অ্যামিবিক আমাশয় (Amoebiasis): আদ্যপ্রাণী Entamoeba histolytica বৃহদন্ত্রে ঘা সৃষ্টি করে পেটে কামড়ানি ও মলের সাথে প্রচুর আম ও রক্তপাত ঘটায়।
  • দাদ (Ringworm / Tinea): ছত্রাক (Trichophyton, Microsporum) দ্বারা ত্বকে গোল চাকার মতো লালচে চুলকানিযুক্ত ক্ষতের সৃষ্টি হয়। স্যাঁতসেঁতে ঘামযুক্ত স্থানে এটি বাড়ে এবং ত্বকের কেরাটিন প্রোটিন খেয়ে বেঁচে থাকে।

৪.৫ উদ্ভিদ ও গবাদিপশুর রোগ

  • উদ্ভিদের রোগ:
    • লেবুর ক্যাঙ্কার (Citrus Canker): ব্যাকটিরিয়া Xanthomonas citri দ্বারা ঘটে; বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়; লেবুর পাতা ও ফলে খসখসে বাদামী দাগ হয়।
    • গমের মরচে রোগ (Rust of Wheat): ছত্রাক Puccinia graminis দ্বারা বায়ুবাহিত রেণুর মাধ্যমে ঘটে; পাতায় মরচের মতো দাগ হয়।
    • ঢ্যাঁড়শের হলুদ শিরা মোজাইক: সাদা মাছি বাহিত ভাইরাস দ্বারা পাতার শিরা হলুদ হয়ে যায়।
  • গবাদিপশুর রোগ: অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটিরিয়া ঘটিত রোগ যাতে গবাদিপশুর মুখ ও মলদ্বার দিয়ে কালো জমাট না বাঁধা রক্ত বেরোয়। এছাড়া ভাইরাস ঘটিত খুরারোগ (Foot and mouth disease) যাতে খুরে ও মুখে ঘা হয়।

৫. খাদ্য বিনষ্টকরণ ও খাদ্য সংরক্ষণ বিজ্ঞান

৫.১ খাদ্য নষ্ট হওয়ার কারণ ও খাদ্য বিষক্রিয়া (Food Poisoning)

খাদ্য নষ্ট হওয়া হলো এমন এক ক্ষতিকর প্রক্রিয়া যাতে অণুজীবের ক্রিয়ায় খাদ্যের স্বাভাবিক বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ ও পুষ্টিগুণ বিনষ্ট হয়ে খাদ্যটি খাওয়ার অনুপযুক্ত ও বিষাক্ত হয়ে ওঠে:

  • খাদ্য পচনের জৈব-রাসায়নিক কারণ:
    • শর্করার সন্ধান: ব্যাকটেরিয়া ও ইস্ট কার্বোহাইড্রেট ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করায় খাদ্য টক হয়ে ওঠে এবং গ্যাস নির্গত হয়।
    • প্রোটিনের পচন (Putrefaction): ব্যাকটিরিয়া প্রোটিন ভেঙে হাইড্রোজেন সালফাইড ($\text{H}_২\text{S}$ পচা ডিমের গন্ধ), অ্যামোনিয়া ইত্যাদি দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস তৈরি করে।
    • স্নেহপদার্থের জারণ (Rancidity): তেল ও চর্বি জারিত হয়ে তীব্র ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে।
  • প্রাণঘাতী খাদ্য বিষক্রিয়া (Food Poisoning):
    • বোটুলিজম (Botulism): অবাত স্পোর গঠনকারী ব্যাকটেরিয়া Clostridium botulinum অক্সিজেনহীন কৌটাজাত খাবার বা টিনের মাংসে বংশবৃদ্ধি করে বোটুলিনাম নিউরোটক্সিন তৈরি করে। এটি পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী বিষ যার মাত্র ১ মাইক্রোগ্রাম একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে মেরে ফেলতে পারে। এটি স্নায়ুর সংকেত বন্ধ করে পেশি অসাড় করে দেয় ও শ্বাসরোধে মৃত্যু ঘটায়।
    • স্ট্যাফাইলোকক্কাল বিষক্রিয়া: Staphylococcus aureus সাধারণ তাপমাত্রায় রাখা মিষ্টি, মাংস ও দুধে তাপসহনশীল এন্টারোটক্সিন তৈরি করে যার প্রভাবে ২-৬ ঘণ্টার মধ্যে তীব্র বমি ও পেটের রোগ হয়।
    • আফলাটক্সিকোসিস: স্যাঁতসেঁতে বাদামে জন্মানো ছত্রাক Aspergillus flavus নিঃসৃত আফলাটক্সিন যকৃতে ক্যান্সার সৃষ্টি করে।

৫.২ খাদ্য সংরক্ষণের বৈজ্ঞানিক মূলনীতি

খাদ্য সংরক্ষণের মূল লক্ষ্য হলো অণুজীবের বৃদ্ধি বন্ধ করা বা তাদের ধ্বংস করা:

  1. জলের অভাব সৃষ্টি করা: অণুজীবের বিপাকের জন্য মুক্ত জলের প্রয়োজন হয়। জলের সক্রিয়তা কমিয়ে দিলে ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করতে পারে না।
  2. তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণ: উচ্চতাপে ($>৬০–১০০^\circ\text{সে}$) উৎসেচক ও কোষপর্দা ধ্বংস হয়; নিম্নতাপে ($<৪^\circ\text{সে}$) অণুজীবের বিপাকীয় কাজ অসাড় হয়ে যায়।
  3. অভিস্রবণীয় প্লাজমোলাইসিস: তীব্র লবণ বা চিনির দ্রবণে রাখলে বহিঃঅভিস্রবণে জীবাণুর কোষ থেকে জল বেরিয়ে গিয়ে তাদের জীবদ্রব্য সংকুচিত হয়ে যায়, ফলে জীবাণু মারা যায়।

৫.৩ পাস্তুরাইজেশন: পদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য

১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর পানীয় থেকে রোগজীবাণু দূর করার জন্য পাস্তুরাইজেশন (Pasteurization) পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এটি এমন এক নিয়ন্ত্রিত তাপীয় পদ্ধতি যা দুধের পুষ্টিগুণ ও স্বাদ নষ্ট না করে যক্ষ্মা, সালমোনেলা ইত্যাদির সমস্ত ক্ষতিকারক ব্যাকটিরিয়াকে ধ্বংস করে দেয়।

পদ্ধতি উত্তাপের মাত্রা স্থায়িত্বকাল শীতলীকরণ ও প্যাকেজিং
HTST (উচ্চ তাপমাত্রা স্বল্প সময়) $৭১.৭^\circ\text{সে} \approx ৭২^\circ\text{সে}$ ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড মুহূর্তের মধ্যে বরফ-শীতল করে $< ১০^\circ\text{সে}$ (সাধারণত ৪°সে) তাপমাত্রায় নামিয়ে জীবাণুমুক্ত প্যাকেটে ভরা।
হোল্ডার বা ব্যাচ পদ্ধতি $৬২.৮^\circ\text{সে} \approx ৬৩^\circ\text{সে}$ ৩০ মিনিট ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা করে সংরক্ষণ।
UHT (অতি-উচ্চ তাপমাত্রা) $১৩৫^\circ\text{সে} \text{ থেকে } ১৪০^\circ\text{সে}$ ১ থেকে ৩ সেকেন্ড টেট্রাপ্যাকে ভরে সাধারণ ঘরের তাপমাত্রাতেও কয়েক মাস রাখা যায়।

ফোটানো বনাম পাস্তুরাইজেশন: সাধারণ বাড়িতে দুধকে ১০০°সে তাপমাত্রায় দীর্ঘক্ষণ ফোটালে দুধের ভিটামিন নষ্ট হয় ও প্রোটিন জমাট বাঁধে। কিন্তু পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতিতে সঠিক তাপমাত্রা ও দ্রুত শীতলীকরণের ফলে দুধের ভিটামিন ও পুষ্টি অবিকৃত থাকে এবং রোগজীবাণুও নির্মূল হয়।

৫.৪ সনাতন খাদ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি

  • রোদে শুকানো বা শুষ্ককরণ (Dehydration): চাল, ডাল, গম, শুকনো লঙ্কা ও শুঁটকি মাছ রোদে শুকিয়ে তাদের জল বাষ্পীভূত করে দেওয়া হয়। জলের অভাবে ছত্রাক ও ব্যাকটিরিয়া জন্মাতে পারে না।
  • লবণ দ্বারা সংরক্ষণ (Salting): কাঁচা মাছ, মাংস, আম, তেঁতুল ও আমলকীতে ১৫-২০% খাবার লবণ ($\text{NaCl}$) মাখালে তা তীব্র অতিসারী মাধ্যম তৈরি করে। ব্যাকটিরিয়া বা ছত্রাকের কোষ থেকে বহিঃঅভিস্রবণ দ্বারা জল বেরিয়ে গিয়ে প্লাজমোলাইসিস ঘটে এবং জীবাণু মারা যায়।
  • চিনির গাঢ় দ্রবণ দ্বারা সংরক্ষণ: জ্যাম, জেলি, মোরব্বা ও স্কোয়াশে চিনির ঘনত্ব ৬৫% থেকে ৭০% রাখা হয়। চিনির অতিসারী গাঢ় দ্রবণে অভিস্রবণীয় টানে জীবাণু সংকুচিত হয়ে মারা যায়।
  • তেল ও ভিনিগার দ্বারা সংরক্ষণ: আচারের ওপর সরষের তেলের স্তর বাতাস ও অক্সিজেনের প্রবেশ বন্ধ করে অবাত পরিবেশ তৈরি করে যাতে ছত্রাক না জন্মায়। ভিনিগার (৪-৮% অ্যাসিটিক অ্যাসিড) খাদ্যের pH কমিয়ে অত্যন্ত অম্লীয় পরিবেশ তৈরি করে যা ব্যাকটিরিয়ার বৃদ্ধি পুরোপুরি রুখে দেয়।

৫.৫ রাসায়নিক সংরক্ষক, হিমায়ন ও কৌটাজাতকরণ

  • রাসায়নিক সংরক্ষক (Chemical Preservatives):
    • সোডিয়াম বেনজোয়েট ($\text{C}_৭\text{H}_৫\text{NaO}_২$): অম্লীয় খাদ্য যেমন টমেটো সস, ফলের জ্যাম ও স্কোয়াশে ০.০৬-০.১% মাত্রায় মেশালে এটি জীবাণুর শ্বাস উৎসেচক স্তব্ধ করে দেয়।
    • পটাসিয়াম মেটাবাইসালফাইট (KMS - $\text{K}_২\text{S}_২\text{O}_৫$): ফলের রসের অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করে সালফার ডাই-অক্সাইড ($\text{SO}_২$) গ্যাস নির্গত করে, যা অণুজীবের বৃদ্ধি আটকায় ও বর্ণ নষ্ট হতে দেয় না: $$\text{K}_২\text{S}_২\text{O}_৫ + ২\text{H}^+ \to ২\text{K}^+ + \text{H}_২\text{O} + ২\mathbf{\text{SO}_২} \uparrow$$
  • নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ (হিমায়ন ও ডিপ ফ্রিজিং): গৃহস্থালির ফ্রিজের তাপমাত্রা ৪°সে এবং ডিপ ফ্রিজের তাপমাত্রা $-১৮^\circ\text{সে}$ হয়। ঠাণ্ডায় অণুজীব মরে যায় না, তাদের বৃদ্ধি ও উৎসেচকের ক্রিয়া সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ স্থগিত থাকে (Microbiostatic)। খাবার ফ্রিজ থেকে বের করে রাখলে জীবাণু পুনরায় দ্রুত বাড়ে।
  • কৌটাজাতকরণ বা ক্যানিং (Canning): ১৮১০ সালে নিকোলাস অ্যাপার্ট উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে খাবারকে টিনের কৌটোয় ভরে অটোক্লেভে উচ্চ বাষ্পীয় চাপে ১২১°সে তাপমাত্রায় ১৫-২০ মিনিট উত্তপ্ত করে ক্লস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম-এর এন্ডোস্পোরসহ সমস্ত জীবাণু ধ্বংস করে সম্পূর্ণ বাতাসহীন অবস্থায় সিল করা হয়।

গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সমীকরণ, বিক্রিয়া ও সূত্র

ব্যাকটেরিয়ার দ্বি-বিভাজন বৃদ্ধির সূচকীয় সূত্র
N_t = N_0 · 2^n (যেখানে n = t / t_d)
প্রাথমিক ব্যাকটিরিয়া সংখ্যা (N0) এবং n সংখ্যক দ্বি-বিভাজন চক্রের পর মোট ব্যাকটিরিয়া সংখ্যা (Nt) নির্ণয় করা যায়।
ইস্টের অ্যালকোহল সন্ধান বিক্রিয়া (জাইমেজ)
C₆H₁₂O₆ —(Zymase)→ 2C₂H₅OH + 2CO₂ + 2 ATP
ইস্ট গ্লুকোজকে অবাতভাবে ভেঙে ইথাইল অ্যালকোহল ও কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি করে (পাউরুটি ফোলা ও মদ্যশিল্পের ভিত্তি)।
জৈবিক নাইট্রোজেন সংবন্ধন সমীকরণ (নাইট্রোজিনেজ)
$$N₂ + 8H⁺ + 8e⁻ + 16 ATP —(Nitrogenase)→ 2NH₃ + H₂ + 16 ADP + 16 P_i$$
রাইজোবিয়াম ও সায়ানোব্যাকটেরিয়া নাইট্রোজিনেজ উৎসেচকের সাহায্যে ১৬ ATP ব্যয়ে বায়ুর N2-কে অ্যামোনিয়াতে রূপান্তরিত করে।
দুধের পাস্তুরাইজেশনের আধুনিক মানক (HTST)
৭২°সে তাপমাত্রায় ১৫-৩০ সেকেন্ড → দ্রুত বরফ-শীতলীকরণ < ১০°সে
দুধের ভিটামিন ও পুষ্টি অক্ষত রেখে যক্ষ্মা ও সালমোনেলা ইত্যাদি সমস্ত ক্ষতিকর রোগজীবাণুকে ১০০% ধ্বংস করার নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
অবাত মিথেনোজেনেসিস (বায়োগ্যাস উৎপাদন)
4H₂ + CO₂ → CH₄ + 2H₂O এবং CH₃COOH → CH₄ + CO₂
অবাত মিথেনোজেন ব্যাকটিরিয়া গোবর ও বর্জ্য পচিয়ে ৫৫-৭০% মিথেন সমৃদ্ধ উৎকৃষ্ট ধোঁয়াহীন জ্বালানি গ্যাস তৈরি করে।
ল্যাকটিক অ্যাসিড সন্ধান (দই তৈরি)
C₁₂H₂₂O₁₁ (ল্যাকটোজ) + H₂O —(LAB)→ 4CH₃CH(OH)COOH (ল্যাকটিক অ্যাসিড)
ল্যাকটোব্যাসিলাস দুধের শর্করাকে ল্যাকটিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত করে কেসিন প্রোটিন জমাট বাঁধিয়ে দই তৈরি করে।
অভিস্রবণীয় প্লাজমোলাইসিস খাদ্য সংরক্ষণ নীতি
Ψ_বহিঃস্থ << Ψ_কোষীয় ⟹ তীব্র বহিঃঅভিস্রবণ ⟹ প্লাজমোলাইসিস
লবণ (>১৫%) বা চিনি (>৬৫%) মাধ্যমে জলের অভাব সৃষ্টি করে ক্ষতিকর জীবাণুর কোষ সংকুচিত করে তাদের ধ্বংস করা হয়।
KMS রাসায়নিক সংরক্ষকের antimicrobial বিক্রিয়া
K₂S₂O₅ + 2H⁺ → 2K⁺ + H₂O + 2SO₂ ↑
পটাসিয়াম মেটাবাইসালফাইট ফলের রসের অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করে সালফার ডাই-অক্সাইড গ্যাস তৈরি করে পচন রোধ করে।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
একটি পুষ্টি মাধ্যমে শুরুতে ৫০০টি ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। অনুকূল গবেষণাগার পরিবেশে ব্যাকটেরিয়াগুলি প্রতি ২০ মিনিটে একবার দ্বি-বিভাজিত হলে, ২ ঘণ্টা (১২০ মিনিট) পর ঐ মাধ্যমে মোট কতগুলি ব্যাকটেরিয়া উপস্থিত থাকবে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ধাপ ১: মোট বংশবৃদ্ধি চক্রের সংখ্যা ($n$) নির্ণয়:

$$\text{মোট সময় } (t) = ২\text{ ঘণ্টা} = ১২০\text{ মিনিট}$$ $$\text{বিভাজনের কাল } (t_d) = ২০\text{ মিনিট}$$ $$n = \frac{t}{t_d} = \frac{১২০}{২০} = \mathbf{৬\text{ টি চক্র}}$$

ধাপ ২: দ্বি-বিভাজন বৃদ্ধির সূত্র প্রয়োগ:

$$N_t = N_0 \times 2^n$$ $$\text{যেখানে } N_0 = ৫০০ \quad \text{এবং} \quad n = ৬$$ $$২^৬ = ৬৪$$ $$N_t = ৫০০ \times ৬৪ = \mathbf{৩২,০০০\text{ টি ব্যাকটেরিয়া}}$$

উত্তর: ২ ঘণ্টা পর ঐ মাধ্যমে মোট ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা হবে ৩২,০০০টি।

উদাহরণ 2
তাপমাত্রার মাত্রা, স্থায়িত্বকাল, জৈব প্রক্রিয়া এবং পুষ্টিগুণের ওপর প্রভাবের নিরিখে সাধারণ ফুটানো এবং আধুনিক HTST পাস্তুরাইজেশনের মধ্যে একটি বৈজ্ঞানিক তুলনা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
তুলনার বিষয় সাধারণ ফুটানো (Boiling) শিল্পজাত HTST পাস্তুরাইজেশন
তাপমাত্রার মাত্রা $১০০^\circ\text{সে}$ (জলের স্ফুটনাঙ্ক) $৭১.৭^\circ\text{সে} \approx ৭২^\circ\text{সে}$
স্থায়িত্বকাল টগবগ করে ৫ থেকে ১০ মিনিট ফোটানো হয় সুনির্দিষ্টভাবে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড
উত্তাপ পরবর্তী ক্রিয়া ধীরে ধীরে সাধারণ ঘরের তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা হয় মুহূর্তের মধ্যে দ্রুত বরফ-শীতল করে $< ১০^\circ\text{সে}$ করা হয়
পুষ্টিগুণের ওপর প্রভাব দুধের প্রোটিন জমাট বাঁধে; ভিটামিন C ও B নষ্ট হয়; স্বাদ বদলায়। দুধের ভিটামিন, সক্রিয় উৎসেচক ও প্রাকৃতিক স্বাদ অবিকৃত থাকে।
জীবাণু ধ্বংসের মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত; সব ক্ষতিকর জীবাণু নির্মূল নাও হতে পারে। যক্ষ্মা, সালমোনেলা ইত্যাদি সমস্ত মানব রোগজীবাণু ১০০% নির্মূল হয়।
উদাহরণ 3
ঘন চিনির সিরায় তৈরি জ্যাম (৬৮% চিনি) এবং লবণ মাখানো আমের আচার (১৮% লবণ) ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দিলেও না ফুটিয়ে মাসের পর মাস ব্যাকটিরিয়া বা ছত্রাক দ্বারা নষ্ট হয় না কেন? অভিস্রবণীয় কারণ ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. তীব্র অতিসারী পরিবেশ:

জ্যামের ৬৮% চিনির দ্রবণ এবং আচারের ১৮% লবণ জল অত্যন্ত ঘন দ্রবণ হওয়ায় এদের জলীয় বিভব ($\Psi_{\text{বহিঃস্থ}}$) যেকোনো সংক্রামক ব্যাকটিরিয়া বা ছত্রাকের কোষের অভ্যন্তরীণ জলীয় বিভবের ($\Psi_{\text{কোষীয়}}$) চেয়ে বহুগুণ কম হয়:

$$\Psi_{\text{বহিঃস্থ}} \ll \Psi_{\text{কোষীয়}}$$

২. তীব্র প্লাজমোলাইসিস (বহিঃঅভিস্রবণ):

বাতাসে ভাসমান কোনো ব্যাকটিরিয়া বা ছত্রাকের রেণু যখন এই ঘন দ্রবণের ওপর পড়ে, তখন তাদের কোষপর্দা ভেদ করে কোষের সমস্ত জল তীব্র বহিঃঅভিস্রবণ (Exosmosis) প্রক্রিয়ায় বাইরে বেরিয়ে আসে।

৩. বিপাকীয় মৃত্যু:

জলের অভাবে অণুজীবগুলির প্রোটোপ্লাস্ট সংকুচিত হয়ে প্লাজমোলাইজড (Plasmolysed) হয়ে যায়। জলের অভাবে তাদের সমস্ত উৎসেচকের ক্রিয়া চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, কোষীয় পরিবহন স্তব্ধ হয় এবং অণুজীবগুলি শুকিয়ে মারা যায়। ফলে খাবার পচে না।

উদাহরণ 4
ম্যালেরিয়া রোগীর কেন নির্দিষ্ট ৪৮ ঘণ্টা পর পর তীব্র কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে? লোহিত রক্তকণিকায় সংঘটিত পরজীবীর দশা বিশ্লেষণ করো এবং দায়ী বিষাক্ত পদার্থের নাম লেখো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. লোহিত রক্তকণিকায় এরিথ্রোসাইটিক সাইজোগনি:

মানবদেহে Plasmodium vivax পরজীবী যকৃতে প্রাথমিক বৃদ্ধির পর রক্তের লোহিত রক্তকণিকায় (RBC) প্রবেশ করে। RBC-র ভেতরে ট্রফোজয়েট ও সাইজন্ট দশার মাধ্যমে প্রতিটি পরজীবী ১২ থেকে ২৪টি অপত্য মেরোজয়েটে বিভক্ত হয়। এই পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে ঠিক ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে।

২. হিমোজোয়েন বিষ নির্গমন:

পরজীবীটি বেঁচে থাকার জন্য RBC-র হিমোগ্লোবিন প্রোটিনকে খাদ্য হিসেবে খায় এবং লোহাযুক্ত বর্জ্য পদার্থ হিসেবে হিমোজোয়েন (Hemozoin) নামক একটি বিষাক্ত কেলাসাকার উপাদান জমায়। ঠিক ৪৮ ঘণ্টার মাথায় লক্ষ লক্ষ আক্রান্ত RBC একসাথে ফেটে যায় এবং নতুন মেরোজয়েট ও প্রচুর হিমোজোয়েন বিষ রক্তস্রোতে একযোগে নিক্ষিপ্ত হয়।

৩. জ্বরের লক্ষণ প্রকাশ:

রক্তে হিমোজোয়েন মুক্ত হওয়া মাত্রই মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস উত্তেজিত হয় এবং রোগীর প্রচণ্ড কাঁপুনি দিয়ে শীত করতে থাকে (শীতের পর্যায়)। এরপর তীব্র জ্বর ($১০৪–১০৫^\circ\text{ফে}$) ওঠে এবং শেষে প্রচুর ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে যায়। যেহেতু এই সাইকেলটি ঠিক ৪৮ ঘণ্টা অন্তর ঘটে, তাই নির্দিষ্ট সময় পর পর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর ফিরে আসে।

উদাহরণ 5
পাউরুটি তৈরির সময় ময়দার সাথে ইস্ট (Saccharomyces cerevisiae) মেশালে ময়দার তালটি ফুলে ওঠে কেন? বেক করার পর উৎপন্ন অ্যালকোহলের কী পরিণতি হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. সন্ধান ও ময়দা ফোলা (Proofing):

ময়দার সাথে জল, চিনি ও বেকার্স ইস্ট মেখে গরম জায়গায় রাখলে ইস্টের জাইমেজ উৎসেচক শর্করার সন্ধান ঘটায়:

$$\text{C}_৬\text{H}_{১২}\text{O}_৬ \xrightarrow{\text{Zymase}} ২\text{C}_২\text{H}_৫\text{OH} + ২\mathbf{\text{CO}_২} \uparrow + ২\text{ ATP}$$

ময়দায় গ্লুটেন (Gluten) নামক একটি স্থিতিস্থাপক আঠালো প্রোটিন থাকে। সন্ধান প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র কার্বন ডাই-অক্সাইড ($\text{CO}_২$) গ্যাসের বুদ্বুদ এই আঠালো গ্লুটেনের জালে আটকা পড়ে যায়। গ্যাস বের হতে না পেরে ময়দার তালটিকে ভেতর থেকে ঠেলে ফুলিয়ে তোলে।

২. বেক করা ও অ্যালকোহলের পরিণতি:

ময়দার তালটিকে যখন ওভেনে ১৮০°সে থেকে ২২০°সে তাপমাত্রায় বেক করা হয়, তখন তাপে $\text{CO}_২$ গ্যাস আরও প্রসারিত হয়ে ছিদ্রযুক্ত স্পঞ্জ গঠন করে এবং অতিরিক্ত তাপে ইস্ট মরে যায়।

ইথাইল অ্যালকোহলের স্ফুটনাঙ্ক মাত্র ৭৮.৩৭°সে। ওভেনের প্রচণ্ড উত্তাপে ($>১৮০^\circ\text{সে}$) সমস্ত অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত হয়ে উবে যায়। ফলে প্রস্তুত পাউরুটি সম্পূর্ণ অ্যালকোহলমুক্ত, সুস্বাদু ও নরম হয়।

উদাহরণ 6
অ্যান্টিবায়োটিকের "নির্বাচনী বিষাক্ততা" (Selective Toxicity) নীতিটি ব্যাখ্যা করো—পেনিসিলিন কীভাবে মানুষের কোষের ক্ষতি না করে কেবল ব্যাকটিরিয়াকে ধ্বংস করে? ভাইরাস ঘটিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক সম্পূর্ণ অকার্যকর কেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. নির্বাচনী বিষাক্ততার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি:

অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের ইউক্যারিওটিক কোষ এবং ব্যাকটেরিয়ার প্রোক্যারিওটিক কোষের কাঠামোগত পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে:

  • কোষপ্রাচীর আক্রমণ: পেনিসিলিন ব্যাকটেরিয়ার পেপটিডোগ্লাইক্যান কোষপ্রাচীর তৈরির উৎসেচককে বিকল করে দেয়। যেহেতু মানবদেহের কোনো কোষে কোষপ্রাচীর থাকেই না (কেবল নমনীয় কোষপর্দা থাকে), তাই পেনিসিলিন মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে না কিন্তু প্রাচীরহীন ব্যাকটিরিয়া অভিস্রবণীয় চাপে ফেটে মরে।
  • রাইবোজোম আক্রমণ: স্ট্রেপ্টোমাইসিন ব্যাকটেরিয়ার 70S রাইবোজোমকে অকেজো করে, যা মানুষের 80S সাইটোপ্লাজমীয় রাইবোজোমকে কোনো বাধা দেয় না।

২. ভাইরাসে অকার্যকর হওয়ার কারণ:

ভাইরাস হলো অকোষীয় সত্তা। ভাইরাসের কোনো পেপটিডোগ্লাইক্যান প্রাচীর নেই, কোনো নিজস্ব 70S রাইবোজোম নেই এবং কোনো স্বাধীন উৎসেচক নেই। এরা পোষক মানবকোষের সাহায্যেই বংশবৃদ্ধি করে। যেহেতু অ্যান্টিবায়োটিকের আক্রমণ করার মতো কোনো ব্যাকটিরিয়াল লক্ষ্যবস্তু ভাইরাসে থাকে না, তাই সর্দি, ফ্লু বা ডেঙ্গুর মতো ভাইরাস ঘটিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক সম্পূর্ণ মূল্যহীন ও অকার্যকর।

উদাহরণ 7
নীচের ৫টি অণুজীবকে তাদের সঠিক গোষ্ঠীতে ভাগ করো, এদের কোষীয় প্রকৃতি (প্রোক্যারিওট, ইউক্যারিওট বা অকোষীয়) উল্লেখ করো এবং একটি করে প্রধান শনাক্তকারী কাজ লেখো: (১) ল্যাকটোব্যাসিলাস, (২) স্যাকারোমাইসিস (ইস্ট), (৩) অ্যামিবা, (৪) ক্ল্যামাইডোমোনাস, (৫) ব্যাকটিরিওফায।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
অণুজীব অণুজীবের দল কোষীয় সংগঠন প্রধান শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য ও কাজ
১. ল্যাকটোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়া (মনেরা) প্রোক্যারিওটিক (এককোষী) দণ্ডাকার উপকারী ব্যাকটিরিয়া; দুধের ল্যাকটোজ গেঁজে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে দুধকে দইয়ে পরিণত করে।
২. স্যাকারোমাইসিস ছত্রাক (Fungi) ইউক্যারিওটিক (এককোষী) বেকার্স ইস্ট; কাইটিন প্রাচীরযুক্ত; কোরকোদ্গমে বংশবৃদ্ধি করে; শর্করা ভেঙে অ্যালকোহল ও $\text{CO}_২$ তৈরি করে।
৩. অ্যামিবা আদ্যপ্রাণী (প্রটিস্টা) ইউক্যারিওটিক (এককোষী) কোষপ্রাচীরহীন; ক্ষণপদের সাহায্যে খাদ্য গ্রহণ (ফ্যাগোসাইটোসিস) ও অ্যামিবয়েড চলন সম্পন্ন করে।
৪. ক্ল্যামাইডোমোনাস শৈবাল (প্ল্যান্টি) ইউক্যারিওটিক (এককোষী) দুটি ফ্ল্যাজেলাযুক্ত সচল সবুজ শৈবাল; পেয়ালাকৃতি ক্লোরোপ্লাস্ট দিয়ে সালোকসংশ্লেষ করে।
৫. ব্যাকটিরিওফায ভাইরাস অকোষীয় (Acellular) প্রোটিন ক্যাপসিড ও DNA যুক্ত ক্ষতিকারক সত্তা যা নির্দিষ্ট ব্যাকটিরিয়াকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে।
উদাহরণ 8
প্রকৃতির নাইট্রোজেন চক্রের প্রধান ধাপগুলি উল্লেখ করো এবং নীচের কাজগুলির জন্য দায়ী নির্দিষ্ট অণুজীবের নাম লেখো: (ক) শিম্বী গোত্রের মূলের অর্বুদে মিথোজীবী সংবন্ধন, (খ) মাটিতে স্বাধীনজীবী সংবন্ধন, (গ) নাইট্রিফিকেশন এবং (ঘ) ডিনাইট্রিফিকেশন।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

প্রকৃতির নাইট্রোজেন চক্রে বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় নাইট্রোজেনের ভারসাম্য রক্ষায় চারটি ধাপে নির্দিষ্ট অণুজীব কাজ করে:

  1. (ক) শিম্বী উদ্ভিদের মূলে মিথোজীবী সংবন্ধন:
    রাইজোবিয়াম (Rhizobium leguminosarum) ব্যাকটিরিয়া মটর ও ছোলার মূলের অর্বুদে লেগহিমোগ্লোবিনের উপস্থিতিতে বাতাসের $\text{N}_২$-কে সরাসরি অ্যামোনিয়াতে রূপান্তরিত করে।
  2. (খ) মাটিতে স্বাধীনজীবী নাইট্রোজেন সংবন্ধন:
    মাটিতে মুক্তভাবে বাস করে সবাত ব্যাকটিরিয়া অ্যাজোটোব্যাকটর (Azotobacter), অবাত ব্যাকটিরিয়া ক্লস্ট্রিডিয়াম এবং ধানক্ষেতের জলে নীলাভ-সবুজ শৈবাল অ্যানাবিনা ও নস্টক।
  3. (গ) নাইট্রিফিকেশন (অ্যামোনিয়া থেকে নাইট্রেট গঠন):
    • ধাপ ১: নাইট্রোসোমোনাস (Nitrosomonas) ব্যাকটিরিয়া অ্যামোনিয়াকে জারিত করে নাইট্রাইট ($\text{NO}_২^-$) বানায়।
    • ধাপ ২: নাইট্রোব্যাকটর (Nitrobacter) ব্যাকটিরিয়া নাইট্রাইটকে জারিত করে দ্রবণীয় নাইট্রেট ($\text{NO}_৩^-$) বানায় যা উদ্ভিদের শিকড় শোষণ করে।
  4. (ঘ) ডিনাইট্রিফিকেশন (মাটির নাইট্রেট থেকে নাইট্রোজেন গ্যাস মুক্তি):
    অক্সিজেনহীন মাটিতে সিউডোমোনাস ডিনাইট্রিফিকানস (Pseudomonas denitrificans) ব্যাকটিরিয়া মাটির ক্ষতিকারক জমে থাকা নাইট্রেট লবণকে ভেঙে পুনরায় মুক্ত নাইট্রোজেন গ্যাস ($\text{N}_২$) হিসেবে বায়ুমণ্ডলে ফেরত পাঠিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

ভাইরাস ঘটিত রোগের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অ্যান্টিবায়োটিক কেবল ব্যাকটিরিয়ার কোষপ্রাচীর বা 70S রাইবোজোম আক্রমণ করে। ভাইরাসের কোনো কোষপ্রাচীর বা বিপাক না থাকায় অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

পাস্তুরিত দুধ কখনোই নষ্ট হবে না বলে বিশ্বাস করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

পাস্তুরাইজেশনে সমস্ত ক্ষতিকারক সজীব প্যাথোজেন ধ্বংস হলেও তাপসহনশীল ব্যাকটিরিয়াল এন্ডোস্পোর বেঁচে থাকে। ঘরের উষ্ণতায় রাখলে এরা বংশবৃদ্ধি করে দুধ নষ্ট করে দেবে।

সাধারণ ভুল ধারণা

অণুজীব মানেই রোগ ও জীবাণু বলে ধরে নেওয়া।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

প্রকৃতির ৯৫%-এরও বেশি অণুজীব হয় সম্পূর্ণ নিরীহ নতুবা মানবকল্যাণে অপরিহার্য। অণুজীব না থাকলে দই, পাউরুটি, অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হতো না এবং বর্জ্য পচে পুষ্টি পুনর্ব্যবহার হতো না।

সাধারণ ভুল ধারণা

ইস্টের এককোষী আকারের কারণে তাকে ব্যাকটিরিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ইস্ট (স্যাকারোমাইসিস) হলো একটি এককোষী ইউক্যারিওটিক ছত্রাক। এতে সুগঠিত নিউক্লিয়াস ও কাইটিন কোষপ্রাচীর থাকে।

সাধারণ ভুল ধারণা

রেফ্রিজারেশন খাদ্যকে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করে বলে ধারণা করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ঠাণ্ডা তাপমাত্রা জীবাণুকে মারে না; কেবল তাদের বিপাক ও বংশবৃদ্ধি সাময়িকভাবে থামিয়ে রাখে (Microbiostatic)। খাবার বের করে আনলেই জীবাণু আবার সক্রিয় হয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

মশাকে রোগের আসল জীবাণু মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ম্যালেরিয়ার আসল জীবাণু হলো এককোষী আদ্যপ্রাণী প্লাজমোডিয়াম। স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা কেবল রোগের বাহক (Vector) হিসেবে কাজ করে।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভাইরাসকে এককোষী প্রোক্যারিওট ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ভাইরাস হলো অকোষীয় (Acellular) জীব ও নির্জীবের মধ্যবর্তী সত্তা। পোষকের বাইরে এর কোনো জীবন নেই।

অণুজীবের জগৎ — ৪-চতুর্ভুজ কনসেপ্ট ম্যাপ (Vector Concept Map)

🔬 ১. আবিষ্কার, ইতিহাস ও বাসস্থান লিউয়েনহুক • পাস্তুর • কখ • ফ্লেমিং • এক্সট্রিমোফাইল • লিউয়েনহুক (১৬৭৪): প্রথম সজীব অণুজীব প্রত্যক্ষকরণ • লুই পাস্তুর: স্বতঃজনন মতবাদ খণ্ডন, জীবাণুতত্ত্ব ও জলাতঙ্কের টিকা • রবার্ট কখ: কখের স্বীকার্য; অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা ও কলেরার জীবাণু আবিষ্কার • আলেকজান্ডার ফ্লেমিং (১৯২৮): পেনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার • এডওয়ার্ড জেনার (১৭৯৬): গুটিবসন্তের প্রথম সফল টিকা আবিষ্কার • সর্বব্যাপী বাসস্থান: উষ্ণপ্রস্রবণ, লবণাক্ত হ্রদ ও বরফে বসবাস 🦠 ২. অণুজীবের ৫টি প্রধান শ্রেণি ব্যাকটিরিয়া • ছত্রাক • প্রোটোজোয়া • শৈবাল • ভাইরাস • ব্যাকটিরিয়া: প্রোক্যারিওট, পেপটিডোগ্লাইক্যান প্রাচীর, প্লাজমিড • আকার: কক্কাস (গোল), ব্যাসিলাস (দণ্ডাকার), স্পাইরিলাম, ভিব্রিও • ছত্রাক: কাইটিন প্রাচীর, পরভোজী; ইস্টের কোরকোদ্গম ও মোল্ড • প্রোটোজোয়া: আদ্যপ্রাণী; অ্যামিবা, প্যারামিসিয়াম, প্লাজমোডিয়াম • শৈবাল: ক্লোরোফিলযুক্ত স্বভোজী থ্যালোফাইটা (ক্ল্যামাইডোমোনাস) • ভাইরাস: সজীব ও নির্জীবের মধ্যবর্তী অকোষীয় সত্তা; ক্যাপসিড ও DNA/RNA 🌱 ৩. উপকারী ভূমিকা ও মানবকল্যাণ খাদ্য • নাইট্রোজেন সংবন্ধন • ওষুধ • পরিবেশ সুরক্ষা • খাদ্য ও দুগ্ধ: দই তৈরিতে ল্যাকটোব্যাসিলাস, পাউরুটি তৈরিতে ইস্ট • নাইট্রোজেন সংবন্ধন: রাইজোবিয়াম শিম্বী অর্বুদ, অ্যাজোটোব্যাকটর • খনিজ চক্রায়ন: মৃতজীবী দ্বারা জৈব বর্জ্যের পচন ও হিউমাস গঠন • ওষুধ ও চিকিৎসা: অ্যান্টিবায়োটিক (পেনিসিলিন) ও প্রতিষেধক টিকা • জৈবপ্রযুক্তি: ই. কোলাই-তে রিকম্বিন্যান্ট মানব ইনসুলিন তৈরি • পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা: নর্দমার মিথেন বায়োগ্যাস ও তেলের প্রতিকার ⚠️ ৪. ক্ষতিকারক অণুজীব ও খাদ্য সংরক্ষণ সংক্রমণ • রোগবাহক • বিষক্রিয়া • পাস্তুরাইজেশন • রোগবাহক: অ্যানোফিলিস (ম্যালেরিয়া), এডিস (ডেঙ্গু), মাছি (কলেরা) • ব্যাকটিরিয়া ও ভাইরাস ঘটিত রোগ: যক্ষ্মা, কলেরা, পোলিও, এইডস • আদ্যপ্রাণী ও ছত্রাক ঘটিত রোগ: ম্যালেরিয়া (প্লাজমোডিয়াম), দাদ • খাদ্য বিষক্রিয়া: ক্লস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম প্রাণঘাতী নিউরোটক্সিন • পাস্তুরাইজেশন: HTST ৭২°সে (১৫ সে.) / ৬৩°সে (৩০ মি.) + দ্রুত শীতল • খাদ্য সংরক্ষণ: শুষ্ককরণ, লবণ/চিনি (প্লাজমোলাইসিস), KMS ও ক্যানিং WBBSE অষ্টম শ্রেণি অণুজীবের জগৎ অণুজীববিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
অণুজীব হলো খালি চোখে অদৃশ্য অতি-ক্ষুদ্র জীবগোষ্ঠী (< ০.১ মিমি)। লিউয়েনহুক প্রথম সচল জীব প্রত্যক্ষ করেন; লুই পাস্তুর স্বতঃজনন মতবাদ খণ্ডন করে জীবাণুতত্ত্ব ও পাস্তুরাইজেশন উদ্ভাবন করেন; রবার্ট কখ কখের স্বীকার্য দেন; আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন এবং এডওয়ার্ড জেনার প্রথম টিকা আবিষ্কার করেন।
মূল বিষয় 2
অণুজীব জগৎ ৫টি প্রধান ভাগে বিভক্ত: ব্যাকটিরিয়া (প্রোক্যারিওটিক, পেপটিডোগ্লাইক্যান প্রাচীর, প্লাজমিড), ছত্রাক (কাইটিন প্রাচীর, পরভোজী মোল্ড ও ইস্ট), প্রোটোজোয়া (প্রাণীর মতো কোষপ্রাচীরহীন অ্যামিবা, প্যারামিসিয়াম), শৈবাল (সালোকসংশ্লেষকারী থ্যালোফাইটা) এবং অকোষীয় ভাইরাস (ক্যাপসিড ও DNA/RNA)।
মূল বিষয় 3
চরমপोषী এক্সট্রিমোফাইল অণুজীবেরা ফুটন্ত প্রস্রবণ (থার্মোফাইল), বরফ (সাইক্রোফাইল) এবং অতিরিক্ত লবণে (হ্যালোফাইল) বেঁচে থাকে। প্রতিকূলতায় ব্যাকটিরিয়া ক্যালসিয়াম-ডিপিকোলিনেট যুক্ত এন্ডোস্পোর তৈরি করে।
মূল বিষয় 4
উপকারী অণুজীবেরা মানবকল্যাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে: ল্যাকটোব্যাসিলাস দুধের ল্যাকটোজকে ল্যাকটিক অ্যাসিডে গেঁজে কেসিন জমাট বাঁধিয়ে দই তৈরি করে; ইস্ট (স্যাকারোমাইসিস) CO2 গ্যাস ছেড়ে পাউরুটি ফাঁপায় এবং অ্যালকোহল তৈরি করে।
মূল বিষয় 5
প্রকৃতির নাইট্রোজেন চক্রে শিম্বী উদ্ভিদের মূলের অর্বুদে রাইজোবিয়াম ব্যাকটিরিয়া লেগহিমোগ্লোবিনের উপস্থিতিতে বায়ুর N2 সংবন্ধন করে। মাটিতে মুক্তজীবী অ্যাজোটোব্যাকটর ও নীলাভ-সবুজ শৈবাল জমি উর্বর করে।
মূল বিষয় 6
চিকিৎসায় পেনিসিলিয়াম থেকে পেনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিক এবং বিভিন্ন প্রতিষেধক টিকা (BCG, OPV, DPT) ব্যবহৃত হয়। জিন প্রযুক্তিতে E. coli থেকে রিকম্বিন্যান্ট মানব ইনসুলিন তৈরি হয়। মিথেনোজেন দিয়ে বায়োগ্যাস ও সিউডোমোনাস দিয়ে সমুদ্রে তেলের দূষণ রোধ করা হয়।
মূল বিষয় 7
ক্ষতিকারক অণুজীবেরা বায়ুবাহিত ড্রপলেট (যক্ষ্মা, ইনফ্লুয়েঞ্জা), দূষিত জল/খাদ্য (কলেরা, টাইফয়েড), বাহক মশা (অ্যানোফিলিস দ্বারা ম্যালেরিয়া, এডিস দ্বারা ডেঙ্গু) এবং স্পর্শের মাধ্যমে (দাদ) সংক্রামক ব্যাধি ছড়ায়।
মূল বিষয় 8
খাদ্য নষ্টের জন্য শর্করার সন্ধান, প্রোটিনের পচন ও বিষক্রিয়া দায়ী। ক্লস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম প্রাণঘাতী বোটুলিজম সৃষ্টি করে। খাদ্য সংরক্ষণে HTST পাস্তুরাইজেশন (৭২°সে ১৫-৩০ সেকেন্ড + দ্রুত শীতলীকরণ), লবণ ও চিনি দ্বারা অভিস্রবণীয় প্লাজমোলাইসিস, রাসায়নিক KMS/সোডিয়াম বেনজোয়েট এবং ক্যানিং কার্যকর।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
জৈবিক নাইট্রোজেন সংবন্ধন কী? শিম্বী গোত্রীয় উদ্ভিদের সাথে রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়ার মিথোজীবী সম্পর্ক বর্ণনা করো এবং মূল অর্বুদ ও লেগহিমোগ্লোবিনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

১. জৈবিক নাইট্রোজেন সংবন্ধন (BNF):

নির্দিষ্ট কিছু অণুজীবের দেহে উপস্থিত নাইট্রোজিনেজ (Nitrogenase) উৎসেচকের সাহায্যে বায়ুমণ্ডলের নিষ্ক্রিয় গ্যাসীয় নাইট্রোজেনকে ($\text{N}_২$) জীবদেহের গ্রহণোপযোগী অ্যামোনিয়াতে ($\text{NH}_৩$) রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়াকে জৈবিক নাইট্রোজেন সংবন্ধন বলে।

২. রাইজোবিয়ামের মিথোজীবী সম্পর্ক:

Rhizobium leguminosarum ব্যাকটিরিয়া শিম্বী গোত্রীয় উদ্ভিদের (মটর, ছোলা, মসুর) মূলরোম দিয়ে প্রবেশ করে এবং মূলের কর্টেক্স অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন ঘটিয়ে মূল অর্বুদ (Root Nodule) গঠন করে। উদ্ভিদ ব্যাকটিরিয়াকে আশ্রয় ও সালোকসংশ্লেষে তৈরি শর্করা যোগায়; আর ব্যাকটিরিয়া বাতাস থেকে নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে উদ্ভিদকে অ্যামোনিয়াম লবণ দেয়।

৩. লেগহিমোগ্লোবিনের গুরুত্ব:

নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী মূল উৎসেচক নাইট্রোজিনেজ অত্যন্ত অক্সিজেন-সংবেদনশীল এবং মুক্ত অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে নষ্ট হয়ে যায়। সক্রিয় অর্বুদে উপস্থিত লালচে-গোলাপি লেগহিমোগ্লোবিন অতিরিক্ত মুক্ত অক্সিজেন শোষণ করে অর্বুদের ভেতরে সম্পূর্ণ অক্সিজেন-শূন্য পরিবেশ তৈরি করে নাইট্রোজিনেজ উৎসেচককে কার্যক্ষম রাখে।


2
উৎপত্তি, শারীরবৃত্তীয় কার্যপ্রণালী, প্রয়োগের সময় এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকারিতার ভিত্তিতে অ্যান্টিবায়োটিক ও প্রতিষেধক টিকার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
তুলনার বিষয় অ্যান্টিবায়োটিক (Antibiotic) প্রতিষেধক টিকা (Vaccine)
জৈব উৎস ছত্রাক (যেমন পেনিসিলিয়াম) বা অ্যাকটিনোমাইসিটিস ব্যাকটিরিয়া থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক বিপাকীয় পদার্থ। মৃত বা নিষ্ক্রিয় জীবাণু, দুর্বল করা জীবিত জীবাণু অথবা তাদের ক্ষরিত টক্সয়েড।
কার্যপ্রণালী সরাসরি ব্যাকটিরিয়ার কোষপ্রাচীর বা 70S রাইবোজোমে আঘাত করে ব্যাকটিরিয়াকে ধ্বংস বা অকেজো করে। দেহের অনাক্রম্যতন্ত্রকে উত্তেজিত করে সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি ও দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিকোষ গঠন করে।
প্রয়োগের সময় রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর নিরাময়ের উদ্দেশ্যে চিকিৎসামূলকভাবে দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে রোগ আক্রমণ প্রতিহত করতে আগে থেকেই প্রতিরোধমূলকভাবে দেওয়া হয়।
ভাইরাসে কার্যকারিতা ভাইরাস ঘটিত রোগে সম্পূর্ণ অকার্যকর (ভাইরাসে কোনো আক্রমণযোগ্য ব্যাকটিরিয়াল লক্ষ্যবস্তু নেই)। নির্দিষ্ট ভাইরাল রোগের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সফল (যেমন পোলিও, হাম, হেপাটাইটিস, জলাতঙ্ক)।

3
দুধের পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক মূলনীতি বর্ণনা করো। সাধারণ ফোটানোর চেয়ে উচ্চ তাপমাত্রা স্বল্প সময় (HTST) পদ্ধতি কেন শ্রেষ্ঠ?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

১. HTST পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতি:

কাঁচা তরল দুধকে নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রে $৭১.৭^\circ\text{সে} \approx ৭২^\circ\text{সে}$ তাপমাত্রায় ঠিক ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড ধরে উত্তপ্ত করা হয় এবং উত্তপ্ত করার সাথে সাথেই মুহূর্তের মধ্যে দ্রুত বরফ-শীতল করে ১০°সে-এর নিচে (সাধারণত ৪°সে) নামিয়ে এনে জীবাণুমুক্ত প্যাকেটে সিল করা হয়।

২. বৈজ্ঞানিক মূলনীতি:

৭২°সে তাপমাত্রার আকস্মিক উত্তাপে দুধের সমস্ত ক্ষতিকারক সজীব ব্যাকটিরিয়ার (যেমন যক্ষ্মা, সালমোনেলা, ব্রুসেলা ও লিস্টেরিয়া) কোষপর্দা ও বিপাকীয় উৎসেচক নষ্ট হয়ে যায়। এর ঠিক পরমুহূর্তে বরফ-শীতল করায় বেঁচে থাকা তাপসহনশীল ব্যাকটিরিয়াও ধাক্কা খেয়ে বংশবৃদ্ধি বা মেরামত করার সুযোগ পায় না।

৩. ফোটানোর চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব:

দুধকে ১০০°সে তাপমাত্রায় ফোটালে দুধের উপকারী প্রোটিন তাপে বিকৃত হয়, ভিটামিন C ও B-কমপ্লেক্স বিনষ্ট হয় এবং প্রাকৃতিক স্বাদ বদলে যায়। HTST পদ্ধতিতে সুনির্দিষ্ট তাপ ও দ্রুত শীতলীকরণের ফলে দুধের সমস্ত পুষ্টি উপাদান অবিকৃত থাকে অথচ ক্ষতিকারক রোগজীবাণু ১০০% নির্মূল হয়।


4
ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু (প্লাজমোডিয়াম) কীভাবে একজন রোগী থেকে সুস্থ ব্যক্তিতে সংবাহিত হয়? কেবল স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশাই কেন মানুষকে কামড়ায়, পুরুষ মশা কেন কামড়ায় না?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

১. সংবহন প্রক্রিয়া:

  1. স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা কোনো ম্যালেরিয়া রোগীকে কামড়ালে রক্তের সাথে প্লাজমোডিয়ামের গ্যামেটোসাইট দশা মশার পেটে প্রবেশ করে।
  2. মশার পাকস্থলীতে যৌন জনন সম্পন্ন হয়ে উওসিস্ট থেকে লক্ষ লক্ষ সংক্রামক স্পোরোজয়েট উৎপন্ন হয় এবং সেগুলি মশার লালাগ্রন্থিতে এসে জমা হয়।
  3. মশাটি যখন কোনো সুস্থ মানুষকে কামড়ায়, তখন রক্ত জমাট না বাঁধার জন্য তার লালা নিঃসরণ করে এবং লালার সাথে স্পোরোজয়েট মানবদেহে প্রবেশ করে।
  4. এই স্পোরোজয়েট রক্তস্রোতে ভেসে যকৃতে যায়, সেখানে বৃদ্ধি পেয়ে লোহিত রক্তকণিকাকে আক্রমণ করে ম্যালেরিয়া ঘটায়।

২. স্ত্রী মশার কামড়ানোর কারণ:

স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার পেটে ডিম তৈরি ও ডিমের পরিপক্কতার জন্য উষ্ণ রক্তের প্রাণীদের রক্তের প্রোটিন ও লৌহ উপাদানের অপরিহার্য প্রয়োজন হয়। পুরুষ মশার ডিম পাড়ার প্রয়োজন নেই এবং তাদের মুখোপাঙ্গ চামড়া ফুটো করার মতো শক্ত নয়; তারা কেবল গাছের রস ও ফুলের মধু খেয়ে বাঁচে। তাই কেবল স্ত্রী মশাই রক্ত চোষে।


5
বোটুলিজম খাদ্য বিষক্রিয়া কী কারণে ঘটে? ক্লস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম-কে কেন সবচেয়ে বিপজ্জনক খাদ্যজনিত বিষক্রিয়া বলা হয় এবং টিনের কৌটাজাত খাবারে কীভাবে এটি প্রতিরোধ করা যায়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

১. বোটুলিজমের কারণ:

বাতাসহীন অপরিচ্ছন্ন কৌটাজাত মাংস বা খাবারে অবাত ব্যাকটিরিয়া Clostridium botulinum বংশবৃদ্ধি করে এবং বোটুলিনাম নিউরোটক্সিন নিঃসরণ করে। এই বিষাক্ত খাবার খেলে বোটুলিজম হয়।

২. সর্বাপেক্ষা বিপজ্জনক হওয়ার কারণ:

বোটুলিনাম টক্সিন হলো বিজ্ঞানের জানা সর্বাপেক্ষা মারাত্মক জৈব বিষ (মাত্র ১ মাইক্রোগ্রাম একজন মানুষকে মারতে যথেষ্ট)। এই বিষ স্নায়ু ও পেশির সংযোগস্থলে অ্যাসিটাইলকোলিন হরমোন নিঃসরণ চিরতরে আটকে দেয়। ফলে মানুষের ঐচ্ছিক পেশি অবশ হয়ে যায়, দুটি করে দৃষ্টি দেখা দেয়, খাবার গিলতে পারে না এবং ফুসফুসের শ্বাসপেশি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শ্বাসরোধে দ্রুত মৃত্যু ঘটে।

৩. কৌটাজাতকরণে প্রতিরোধ ব্যবস্থা:

  • বাণিজ্যিক ক্যানিংয়ে অটোক্লেভ যন্ত্রে বাষ্পীয় চাপে ১২১°সে তাপমাত্রায় অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট উত্তপ্ত করা হয় যাতে ব্যাকটিরিয়ার তাপসহনশীল এন্ডোস্পোর সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়।
  • যেসব টিনের কৌটো ফুলে উঠেছে বা বাতাস ঢোকার শব্দ হয়, সেগুলি কখনোই না খাওয়া ও ফেলে দেওয়া।
  • খাওয়ার আগে সন্দেহজনক সংরক্ষিত খাবারকে অন্তত ১০ মিনিট টগবগ করে ফোটানো (যেহেতু টক্সিনটি তাপে নষ্ট হয়ে যায়)।

অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

অণুজীবের জগৎ অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।