১.১ অণুজীব কী? পরিমাপের একক ও অদৃশ্য জগৎ
যেসব অতিক্ষুদ্র জীবদের খালি চোখে দেখা যায় না এবং যাদের প্রত্যক্ষ করার জন্য অণুবীক্ষণ যন্ত্রের (আলোক বা ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ) সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তাদের অণুজীব (Microorganisms বা Microbes) বলে। মানুষের চোখের বিশ্লেষণ ক্ষমতা প্রায় $০.১\text{ মিমি} = ১০০\ \mu\text{m}$, তাই এর চেয়ে ছোট জীবেরা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অদৃশ্য থাকে।
- অণুজীববিজ্ঞানে পরিমাপের এককসমূহ:
- মাইক্রোমিটার ($\mu\text{m}$): $১\ \mu\text{m} = ১০^{-৬}\text{ মিটার} = ১০^{-৩}\text{ মিলিমিটার}$। অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া ($১–১০\ \mu\text{m}$), ছত্রাকের রেণু ($৫–২০\ \mu\text{m}$) এবং আদ্যপ্রাণী বা প্রোটোজোয়া ($১০–১০০\ \mu\text{m}$) মাইক্রোমিটার এককে মাপা হয়।
- ন্যানোমিটার ($\text{nm}$): $১\text{ nm} = ১০^{-৯}\text{ মিটার} = ১০^{-৩}\ \mu\text{m}$। ইলেকট্রন অণুবীক্ষণযোগ্য অতি-আণুবীক্ষণিক ভাইরাস ($২০–৩০০\text{ nm}$) এবং প্রোটিন অণু ন্যানোমিটারে পরিমাপ করা হয়।
- অণুজীববিজ্ঞান (Microbiology): জীববিজ্ঞানের যে শাখায় অণুজীবদের শ্রেণিবিন্যাস, অঙ্গসংস্থান, শারীরবৃত্ত, বংশগতি এবং মানবকল্যাণ ও রোগ সৃষ্টিতে তাদের ভূমিকা নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করা হয়, তাকে অণুজীববিজ্ঞান বলে।
১.২ অণুজীববিজ্ঞানের ঐতিহাসিক মাইলফলক
অণুজীবের আবিষ্কার ও গবেষণার ইতিহাস চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মানব সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছে:
- অ্যান্টনি ভন লিউয়েনহুক (১৬৭৪): ওলন্দাজ বিজ্ঞানী লিউয়েনহুককে "অণুজীববিজ্ঞানের জনক" বলা হয়। তিনি নিজের হাতে তৈরি একক উত্তল লেন্সের সরল অণুবীক্ষণে বৃষ্টির জল, পুকুরের জল ও দাঁতের ময়লা পরীক্ষা করে প্রথম জীবন্ত সচল অণুজীব প্রত্যক্ষ করেন এবং তাদের "Animalcules" (ক্ষুদ্র জীয়ন্ত প্রাণী) নাম দেন।
- লুই পাস্তুর (১৮২২–১৮৯৫): ফরাসি অণুজীববিজ্ঞানী, যাঁকে "আধুনিক অণুজীববিজ্ঞানের জনক" বলা হয়:
- স্বতঃজনন মতবাদ খণ্ডন: তাঁর বিখ্যাত হাঁসের গলার মতো বাঁকানো ফ্লাস্ক পরীক্ষার (Swan-neck flask experiment) সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেন যে নির্জীব বস্তু থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জীব সৃষ্টি হতে পারে না; বাতাস থেকে আগত জীবাণুর মাধ্যমেই কেবল খাদ্য পচে যায়।
- রোগের জীবাণুতত্ত্ব (Germ Theory of Disease): তিনিই প্রথম প্রতিষ্ঠিত করেন যে নির্দিষ্ট সংক্রামক রোগ নির্দিষ্ট জীবাণুর সংক্রমণের ফলেই ঘটে।
- পাস্তুরাইজেশন (Pasteurization): নিয়ন্ত্রিত উত্তাপ ও দ্রুত শীতলীকরণের মাধ্যমে পানীয়ের রোগজীবাণু ধ্বংস করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।
- প্রতিষেধক টিকা: অ্যানথ্রাক্স, মুরগির কলেরা এবং মারাত্মক জলাতঙ্ক (Rabies) রোগের প্রথম সফল প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার করেন।
- রবার্ট কখ (১৮৪৩–১৯১০): জার্মান চিকিৎসক যিনি নির্দিষ্ট রোগের সাথে নির্দিষ্ট জীবাণুর সম্পর্ক প্রমাণের জন্য বিশ্ববিখ্যাত "কখের স্বীকার্য" (Koch's Postulates) প্রণয়ন করেন। তিনি অ্যানথ্রাক্স (Bacillus anthracis, ১৮৭৬), যক্ষ্মা (Mycobacterium tuberculosis, ১৮৮২) এবং কলেরা (Vibrio cholerae, ১৮৮৩)-র জীবাণু আবিষ্কার করেন।
- আলেকজান্ডার ফ্লেমিং (১৯২৮): স্কটিশ বিজ্ঞানী যিনি প্রথম বিশ্ববিখ্যাত বিস্ময়কর অ্যান্টিবায়োটিক পেনিসিলিন (Penicillin) আবিষ্কার করেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে পেনিসিলিয়াম নটেটাম নামক একটি সবুজ ছত্রাক থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ তার সংলগ্ন স্ট্যাফাইলোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ও কোষপ্রাচীর ধ্বংস করে দিচ্ছে।
- এডওয়ার্ড জেনার (১৭৯৬): ইংরেজ চিকিৎসক যিনি গোবসন্তের (Cowpox) পুঁজ থেকে মানবদেহে গুটিবসন্তের (Smallpox) প্রথম সফল টিকা আবিষ্কার করে অনাক্রম্যতাতত্ত্বের (Immunology) ভিত্তি স্থাপন করেন।
১.৩ সর্বব্যাপী উপস্থিতি ও চরমপोषী অণুজীব (Extremophiles)
অণুজীবরা পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা প্রাচীন, সফল ও সর্বব্যাপী (Ubiquitous) জীবগোষ্ঠী। এরা বাতাস, মাটি, পানীয় জল, মহাসমুদ্র এবং জীবদেহের অভ্যন্তরে বসবাস করে। চরম বৈরী পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে এমন বিশেষ অণুজীবদের এক্সট্রিমোফাইল বা চরমপोषী অণুজীব বলে:
- থার্মোফাইল (তাপপ্রিয় অণুজীব): ফুটন্ত গরম জলের উষ্ণপ্রস্রবণ এবং সমুদ্রের তলদেশের আগ্নেয় ভেন্টে $৮০^\circ\text{সে} \text{ থেকে } ১০৫^\circ\text{সে}$ তাপমাত্রায় বসবাস করে (যেমন Thermus aquaticus, যার তাপসহনশীল Taq পলিমারেজ PCR প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়)।
- সাইক্রোফাইল (শীতপ্রিয় অণুজীব): মেরু অঞ্চলের বরফের চাদর ও হিমায়িত পারমাফ্রস্টে $০^\circ\text{সে} \text{ থেকে } ৫^\circ\text{সে}$ বা তারও কম তাপমাত্রায় বেঁচে থাকে।
- হ্যালোফাইল (লবণপ্রিয় অণুজীব): মৃত সাগর (Dead Sea) বা অত্যন্ত লবণাক্ত হ্রদে যেখানে লবণের ঘনত্ব ২০% থেকে ৩০% ছাড়িয়ে যায়, সেখানে স্বাভাবিকভাবে জীবনধারণ করে (যেমন Halobacterium)।
- মিথেনোজেন (Methanogens): অক্সিজেনহীন পাঁকযুক্ত জলাভূমি ও গবাদিপশুর পাকস্থলীতে (রুমেন) বসবাসকারী অবাত আর্কিওব্যাকটেরিয়া যা মিথেন গ্যাস ($\text{CH}_4$) উৎপন্ন করে।
১.৪ অণুজীবের পুষ্টিগত বৈচিত্র্য
- ১. স্বভোজী অণুজীব (Autotrophic): পরিবেশের অজৈব উপাদান ($CO_2$ ও জল) থেকে নিজেদের খাদ্য নিজেরাই সংশ্লেষ করে:
- আলোক-স্বভোজী: সৌরশক্তি শোষণ করে খাদ্য বানায়। উদাহরণ: নীলাভ-সবুজ শৈবাল বা সায়ানোব্যাকটেরিয়া (নস্টক, অ্যানাবিনা) এবং সবুজ ও রক্তবর্ণ সালফার ব্যাকটেরিয়া (যা জলের বদলে $\text{H}_2\text{S}$ ব্যবহার করে সালফার মুক্ত করে)।
- রাসায়নিক-স্বভোজী: অজৈব রাসায়নিক পদার্থের জারণ ঘটিয়ে শক্তি পায়। উদাহরণ: নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া (নাইট্রোসোমোনাস অ্যামোনিয়া জারিত করে নাইট্রাইট এবং নাইট্রোব্যাকটর নাইট্রাইটকে নাইট্রেটে পরিণত করে)।
- ২. পরভোজী অণুজীব (Heterotrophic): শক্তির জন্য প্রস্তুত জৈব খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল:
- মৃতজীবী (Saprophytic): মৃত গলিত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহে পরিপাককারী বহিঃকোষীয় উৎসেচক ক্ষরণ করে জটিল খাদ্যকে তরলে ভেঙে শোষণ করে। উদাহরণ: পাউরুটির ছত্রাক (মিউকর, রাইজোপাস), বহু মাটির ব্যাকটেরিয়া।
- পরজীবী (Parasitic): পোষকের দেহে বসবাস করে পুষ্টি শোষণ করে এবং রোগ সৃষ্টি করে। উদাহরণ: ভিব্রিও কলেরি, প্লাজমোডিয়াম।
- মিথোজীবী (Symbiotic): অন্য জীবের সাথে পারস্পরিক সহযোগিতায় বসবাস করে। উদাহরণ: শিম্বী গোত্রীয় উদ্ভিদের শিকড়ের অর্বুদে রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া; লাইকেন (ছত্রাক + শৈবাল)।
১.৫ অণুজীবের শ্বসন ও অন্তঃরেণু (Endospore) দ্বারা প্রতিকূলতা জয়
- শ্বসনের প্রকারভেদ:
- বাধ্যতামূলক সবাতজীবী: যাদের বাঁচার জন্য মুক্ত অক্সিজেন অপরিহার্য (যেমন Mycobacterium tuberculosis)।
- বাধ্যতামূলক অবাতজীবী: অক্সিজেনের উপস্থিতিতে মারা যায়; কেবল অক্সিজেনহীন মাধ্যমে বাঁচে (যেমন Clostridium botulinum, Clostridium tetani)।
- ঐচ্ছিক অবাতজীবী: মূলত অক্সিজেনের উপস্থিতিতে শ্বসন চালায়, তবে অক্সিজেনের অভাব হলে সন্ধান বা অবাত শ্বসনে রূপ নেয় (যেমন E. coli, ইস্ট)।
- অন্তঃরেণু বা এন্ডোস্পোর গঠন: তীব্র প্রতিকূল পরিবেশে (চরম শুষ্কতা, খাদ্য সংকট, মারাত্মক তাপ বা রাসায়নিক নির্বীজকের প্রভাবে) নির্দিষ্ট কিছু গ্রাম-পজিটিভ দণ্ডাকার ব্যাকটেরিয়া (যেমন Bacillus ও Clostridium) কোষের ভেতরে একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত, নির্জীব সুপ্ত দশা তৈরি করে যাকে এন্ডোস্পোর (Endospore) বলে।
- এন্ডোস্পোরের কেন্দ্রভাগ অত্যন্ত শুষ্ক ($১০–২৫\%$ জল) থাকে এবং তাতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম-ডিপিকোলিনিক অ্যাসিড ($\text{Ca}^{2+}-\text{DPA}$) জমা থাকে, যা তাপের হাত থেকে DNA-কে অবিকৃত রাখে।
- বাইরে থাকে পুরু পেপটিডোগ্লাইক্যান কর্টেক্স ও কেরাটিনের মতো দুর্ভেদ্য প্রোটিন আবরণী।
- এন্ডোস্পোর ফুটন্ত জলেও ($১০০^\circ\text{সে}$) ঘণ্টার পর ঘণ্টা অক্ষত থাকে এবং বহু দশক বা শতাব্দী ধরে সুপ্ত থাকার পর অনুকূল পরিবেশ পেলে পুনরায় সক্রিয় ব্যাকটেরিয়ায় অঙ্কুরিত হয়।