১.১ কৃষি ও ফসল কী?
ল্যাটিন শব্দ Ager (মাঠ বা জমি) এবং Cultura (চাষাবাদ) থেকে Agriculture বা কৃষিবিজ্ঞান শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। যে ফলিত জৈববিজ্ঞানের শাখায় মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণের জন্য শস্য চাষ, মাটি ব্যবস্থাপনা এবং গৃহপালিত পশুপালন নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা করা হয়, তাকে কৃষিবিজ্ঞান বলে।
- ফসল (Crop): যখন কোনো নির্দিষ্ট বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে অর্থনৈতিক লাভ বা খাদ্য উৎপাদনের উদ্দেশ্যে একই প্রজাতির বহুসংখ্যক উদ্ভিদ একত্রে বড় আকারে চাষ করা হয়, তখন তাদের সামগ্রিকভাবে ফসল বলে। উদাহরণস্বরূপ, "গম ফসল" বলতে বোঝায় সেই জমির প্রতিটি চারাগাছই গম (Triticum aestivum)।
- শস্যবিজ্ঞান (Agronomy): কৃষিবিজ্ঞানের যে শাখায় মাঠের খাদ্যশস্যের উৎপাদন, জাত উন্নয়ন এবং সার্বিক মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা আলোচিত হয়, তাকে শস্যবিজ্ঞান বা অ্যাগ্রোনমি বলে।
১.২ ঋতুভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ: খারিফ, রবি ও জায়েদ ফসল
ভারত ও পশ্চিমবঙ্গে জলবায়ুর বিভিন্ন উপাদান—যেমন তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত এবং সূর্যালোকের স্থিতিকালের (ফোটোপিরিয়ড) ওপর ভিত্তি করে ফসলকে মূলত ৩টি ঋতুভিত্তিক ভাগে ভাগ করা হয়:
| ফসলের ঋতু | বপন ও ফসল তোলার সময় | জলবায়ুগত শর্তাবলী | প্রধান ফসলের উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| খারিফ ফসল (Kharif Crops) | বপন: জুন–জুলাই (দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর আগমনকাল) ফসল তোলা: সেপ্টেম্বর–অক্টোবর / নভেম্বর |
উষ্ণ, আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া; প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘ সূর্যালোক। | ধান (Paddy), ভুট্টা (Maize), জোয়ার, বাজরা, সয়াবিন, চীনাবাদাম, তুলা (Cotton), পাট (Jute)। |
| রবি ফসল (Rabi Crops) | বপন: অক্টোবর–নভেম্বর (শীতের প্রারম্ভে) ফসল তোলা: মার্চ–এপ্রিল (বসন্তের শেষে) |
বৃদ্ধির শুরুতে শীতল ও শুষ্ক আবহাওয়া; দানা পাকার সময় শুষ্ক, রৌদ্রোজ্জ্বল উষ্ণ দিন। | গম (Wheat), ছোলা (Gram), মটর (Pea), সর্ষে (Mustard), তিসি (Linseed), যব (Barley)। |
| জায়েদ ফসল (Zaid Crops) | বপন: মার্চ–এপ্রিল (গ্রীষ্মের প্রারম্ভে) ফসল তোলা: মে–জুন |
উষ্ণ ও শুষ্ক দিন; দীর্ঘ সূর্যালোক এবং পর্যাপ্ত সেচের ওপর নির্ভরশীল। দ্রুত বর্ধনশীল। | তরমুজ, শসা, খরমুজ, করলা, ঝিঙে, পটোল, মুগ ডাল। |
১.৩ অর্থনৈতিক ও পুষ্টিগত শ্রেণিবিভাগ
উৎপাদিত পণ্যের পুষ্টিগুণ ও ব্যবহারের ভিত্তিতে ফসলের শ্রেণিবিভাগ:
- দানাশস্য (Cereals): মূলত কার্বোহাইড্রেট বা শর্করার প্রধান উৎস, যা আমাদের শক্তির যোগান দেয়। যথা: ধান (চাল), গম, ভুট্টা, জোয়ার, বার্লি।
- ডালশস্য বা লেগিউম (Pulses): উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের প্রধান উৎস; এদের মূলে রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে। যথা: ছোলা, মুসুর, অড়হর, মুগ, বিউলি বা কলাই।
- তৈলবীজ ফসল (Oilseeds): রান্নার ভোজ্য তেল ও ফ্যাট সমৃদ্ধ ফসল। যথা: সর্ষে, তিল, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, সয়াবিন।
- তন্তু ফসল (Fiber crops): বস্ত্র ও প্যাকিং শিল্পে ব্যবহৃত আঁশ উৎপন্নকারী ফসল। যথা: পাট (বাংলার সোনালী আঁশ) এবং তুলা।
- অর্থকরী ও মসলা ফসল (Cash & Spice crops): বাজারে সরাসরি বিক্রির জন্য চাষ করা হয়। যথা: চা, আখ (চিনি), তামাক, হলুদ, আদা, লঙ্কা।
১.৪ উদ্যানপালন ও বাগিচা ফসল (Horticulture)
ল্যাটিন শব্দ Hortus (বাগান) এবং Cultura (চাষ) থেকে হর্টিকালচার বা উদ্যানপালন এসেছে:
- শাকসবজি চাষ (Olericulture): আলুর চাষ, টমেটো, বেগুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি ও শাকসবজির নিবিড় চাষ।
- ফল চাষ (Pomology): আম, পেয়ারা, কলা, লিচু, লেবু জাতীয় ফলের বাগান পরিচালনা ও ফল উৎপাদন।
- ফুল চাষ (Floriculture): রজনীগন্ধা, গাঁদা, গোলাপ, গ্ল্যাডিওলাস প্রভৃতি বাণিজ্যিক ও শোভাবর্ধক ফুলের চাষ।
- বাগিচা ফসল (Plantation Crops): পাহাড়ি বা বিস্তীর্ণ এস্টেটে দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক ফসল চাষ; যেমন দার্জিলিং ও ডুয়ার্সের চা (Tea) বাগান এবং সুপারি বাগান।
১.৫ ভারতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক কৃষি বিপ্লব
বিংশ শতাব্দীতে বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতে কয়েকটি বৈজ্ঞানিক বিপ্লব সংগঠিত হয়:
- সবুজ বিপ্লব (Green Revolution - ১৯৬০-এর দশক): বিজ্ঞানী ড. এম. এস. স্বামীনাথন ও নরম্যান বোরলোগের নেতৃত্বে গম ও ধানের মেক্সিকান ও আন্তর্জাতিক খর্বাকার উচ্চফলনশীল জাত (HYV যেমন কল্যাণ সোনা, সোনালীকা, IR-8, জয়া), রাসায়নিক সার ও সেচের প্রবর্তন। এর ফলে ভারত খাদ্য আমদানিকারক দেশ থেকে খাদ্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়।
- শ্বেত বিপ্লব বা অপারেশন ফ্লাড (White Revolution - ১৯৭০): ড. ভার্গিস কুরিয়েন ("মিল্কম্যান অফ ইন্ডিয়া")-এর নেতৃত্বে আমুল (AMUL) সমবায় মডেল এবং সংকর গাভীর মাধ্যমে দুগ্ধ উৎপাদনে ভারতকে বিশ্বের শীর্ষস্থানে উন্নীত করা।
- নীল বিপ্লব (Blue Revolution): প্রণোদিত প্রজনন, উন্নত হ্যাচারি ও মিশ্র মৎস্য চাষের মাধ্যমে অন্তর্দেশীয় সুস্বাদু জলের মাছ ও চিংড়ি উৎপাদনে বিপুল বৃদ্ধি।
- হলুদ বিপ্লব (Yellow Revolution): আশির দশকের শেষে স্যাম পিত্রোদার নেতৃত্বে সর্ষে, সূর্যমুখী ও সয়াবিন তৈলবীজ উৎপাদনে ভারতকে আত্মনির্ভরশীল করার অভিযান।