Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Science • অধ্যায় 6
আনুমানিক সময়: ৫৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

দেহের গঠন

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণি বিজ্ঞান পাঠ্যক্রম "পরিবেশ ও বিজ্ঞান"-এর অন্তর্গত ষষ্ঠ অধ্যায় "দেহের গঠন" (Structure of Living Organism)-এর প্রামাণ্য ও সামগ্রিক স্টাডি ম্যাটেরিয়ালে আপনাকে স্বাগতম। এককোষী অ্যামিবা ও অতিক্ষুদ্র ব্যাকটিরিয়া থেকে শুরু করে বিশাল বটবৃক্ষ এবং জটিল মানবদেহ—পৃথিবীর প্রতিটি জীবদেহের মৌলিক গঠনগত ও কার্যগত একক হলো "কোষ"। এই বিশদ নির্দেশিকাটি ৫টি প্রধান পাঠ্যক্রম মডিউলে বিন্যস্ত: (১) কোষের আবিষ্কার, অণুবীক্ষণ ও আকার-আকৃতির বৈচিত্র্য—রবার্ট হুক, অ্যান্টনি ভন লিউয়েনহুক, স্লাইডেন-সোয়ান-ভিরশাও-এর কোষতত্ত্ব, যৌগিক আলোক ও ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র, রঞ্জন পদ্ধতি এবং কোষীয় বিস্তার; (২) কোষের আবরণী ও প্রোটোপ্লাজমের গতিশীলতা—কোষপ্রাচীর, মধ্যপর্দা, প্লাজমোডেসমাটা, সিঙ্গার ও নিকলসনের ফ্লুইড মোজাইক মডেল, প্রভেদক ভেদ্য পর্দা, ব্যাপন, অভিস্রবণ, প্লাজমোলাইসিস, রসস্ফীতি চাপ ও সল-জেল রূপান্তর; (৩) কোষ অঙ্গাণু ও শ্রমবণ্টন—নিউক্লিয়াস (নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র), মাইটোকনড্রিয়া (শক্তিঘর ও ATP সংশ্লেষ), প্লাস্টিড (ক্লোরোপ্লাস্ট, ক্রোমোপ্লাস্ট, লিউকোপ্লাস্ট), এন্ডোমেমব্রেন তন্ত্র (অমসৃণ ও মসৃণ ER, গলগি বস্তু, লাইসোজোম বা আত্মঘাতী থলি), রাইবোজোম, সেন্ট্রোজোম ও ভ্যাকুওল; (৪) তুলনামূলক কোষতত্ত্ব ও কোষীয় বিশেষায়ন—প্রোক্যারিওটিক বনাম ইউক্যারিওটিক কোষ, উদ্ভিদকোষ বনাম প্রাণীকোষ, লোহিত কণিকা ও স্নায়ুকোষের বিশেষায়িত অভিযোজন এবং কোষের আকারের ক্ষেত্রে ক্ষেত্রফল ও আয়তনের অনুপাত ($A/V$); এবং (৫) কলার স্তরবিন্যাস ও শারীরিক পদানুক্রম—জৈব অণু থেকে জীবদেহের স্তরবিন্যাস, উদ্ভিদ কলা (ভাজক কলা ও সরল/জটিল স্থায়ী কলা: প্যারেনকাইমা, কোলেনকাইমা, স্ক্লেরেনকাইমা, জাইলেম ও ফ্লোয়েম) এবং প্রাণী কলা (আবরণী, যোগকলা, পেশিকলা ও স্নায়ুকলা)। এই অধ্যায়ে রয়েছে ২৫টি শিক্ষণীয় উপবিভাগ, প্রতিক্রিয়াশীল ভেক্টর SVG কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি বৈজ্ঞানিক নীতি কার্ড, ৮টি আদর্শ পাঠ্যপুস্তক উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষক ফাঁদ সতর্কতা, ৮টি মূল শিক্ষণীয় দিক, সমাধানসহ ৫টি স্ব-মূল্যায়ন প্রশ্ন এবং ৫টি সিবিটি ডায়াগনস্টিক এমসিকিউ।

🔬 অণুজগতের বিস্ময়: ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন জীবন্ত ইটের সমন্বয়ে কীভাবে গড়ে উঠল আপনার শরীর?

নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখুন: আপনার ত্বকের নিচে কাজ করছে ৩৭ ট্রিলিয়নেরও বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন্ত কোষের এক অবিশ্বাস্য মহাজাগতিক মহানগরী, যার প্রতিটি কোষে চলছে অবিরাম রাসায়নিক কারখানা, পরিবহন মহাসড়ক এবং অতিক্ষুদ্র বিদ্যুৎকেন্দ্র!

১৬৬৫ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী রবার্ট হুক কীভাবে এক টুকরো সাধারণ কর্কের নিচে কাঁচের লেন্সের সাহায্যে মৌমাছির চাকের মতো ছোট ছোট প্রকোষ্ঠ প্রত্যক্ষ করে আধুনিক জীববিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এবং তাদের নাম দিয়েছিলেন "কোষ" (Cell)?

আর আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়েও ক্ষুদ্র কোষ অঙ্গাণুগুলি কীভাবে দলবদ্ধভাবে সূর্যালোককে গ্লুকোজে পরিণত করে, পুষ্টি উপাদান পুড়িয়ে সার্বজনীন ATP শক্তি মুদ্রা তৈরি করে এবং প্রতি সেকেন্ডে ১০০ মিটার গতিতে স্নায়ু সংকেত পাঠায়? আসুন, জীবদেহের এই চমকপ্রদ কোষীয় সাম্রাজ্য আবিষ্কারে যাত্রা শুরু করি!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণি বিজ্ঞান পাঠ্যক্রম "পরিবেশ ও বিজ্ঞান"-এর অন্তর্গত ষষ্ঠ অধ্যায় "দেহের গঠন" (Structure of Living Organism)-এর প্রামাণ্য ও সামগ্রিক স্টাডি ম্যাটেরিয়ালে আপনাকে স্বাগতম। এককোষী অ্যামিবা ও অতিক্ষুদ্র ব্যাকটিরিয়া থেকে শুরু করে বিশাল বটবৃক্ষ এবং জটিল মানবদেহ—পৃথিবীর প্রতিটি জীবদেহের মৌলিক গঠনগত ও কার্যগত একক হলো "কোষ"। এই বিশদ নির্দেশিকাটি ৫টি প্রধান পাঠ্যক্রম মডিউলে বিন্যস্ত: (১) কোষের আবিষ্কার, অণুবীক্ষণ ও আকার-আকৃতির বৈচিত্র্য—রবার্ট হুক, অ্যান্টনি ভন লিউয়েনহুক, স্লাইডেন-সোয়ান-ভিরশাও-এর কোষতত্ত্ব, যৌগিক আলোক ও ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্র, রঞ্জন পদ্ধতি এবং কোষীয় বিস্তার; (২) কোষের আবরণী ও প্রোটোপ্লাজমের গতিশীলতা—কোষপ্রাচীর, মধ্যপর্দা, প্লাজমোডেসমাটা, সিঙ্গার ও নিকলসনের ফ্লুইড মোজাইক মডেল, প্রভেদক ভেদ্য পর্দা, ব্যাপন, অভিস্রবণ, প্লাজমোলাইসিস, রসস্ফীতি চাপ ও সল-জেল রূপান্তর; (৩) কোষ অঙ্গাণু ও শ্রমবণ্টন—নিউক্লিয়াস (নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র), মাইটোকনড্রিয়া (শক্তিঘর ও ATP সংশ্লেষ), প্লাস্টিড (ক্লোরোপ্লাস্ট, ক্রোমোপ্লাস্ট, লিউকোপ্লাস্ট), এন্ডোমেমব্রেন তন্ত্র (অমসৃণ ও মসৃণ ER, গলগি বস্তু, লাইসোজোম বা আত্মঘাতী থলি), রাইবোজোম, সেন্ট্রোজোম ও ভ্যাকুওল; (৪) তুলনামূলক কোষতত্ত্ব ও কোষীয় বিশেষায়ন—প্রোক্যারিওটিক বনাম ইউক্যারিওটিক কোষ, উদ্ভিদকোষ বনাম প্রাণীকোষ, লোহিত কণিকা ও স্নায়ুকোষের বিশেষায়িত অভিযোজন এবং কোষের আকারের ক্ষেত্রে ক্ষেত্রফল ও আয়তনের অনুপাত ($A/V$); এবং (৫) কলার স্তরবিন্যাস ও শারীরিক পদানুক্রম—জৈব অণু থেকে জীবদেহের স্তরবিন্যাস, উদ্ভিদ কলা (ভাজক কলা ও সরল/জটিল স্থায়ী কলা: প্যারেনকাইমা, কোলেনকাইমা, স্ক্লেরেনকাইমা, জাইলেম ও ফ্লোয়েম) এবং প্রাণী কলা (আবরণী, যোগকলা, পেশিকলা ও স্নায়ুকলা)। এই অধ্যায়ে রয়েছে ২৫টি শিক্ষণীয় উপবিভাগ, প্রতিক্রিয়াশীল ভেক্টর SVG কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি বৈজ্ঞানিক নীতি কার্ড, ৮টি আদর্শ পাঠ্যপুস্তক উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষক ফাঁদ সতর্কতা, ৮টি মূল শিক্ষণীয় দিক, সমাধানসহ ৫টি স্ব-মূল্যায়ন প্রশ্ন এবং ৫টি সিবিটি ডায়াগনস্টিক এমসিকিউ।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • সজীব ও নির্জীব বস্তুর প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য এবং জীবনক্রিয়া সম্পর্কিত ধারণা (ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান)।
  • পদার্থের ভৌত অবস্থা, কণার গতি, দ্রবণ ও ব্যাপনের প্রাথমিক জ্ঞান।
  • উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গ (মূল, কাণ্ড, পাতা) এবং প্রাণীর বিভিন্ন তন্ত্র (পরিপাকতন্ত্র, সংবহনতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র) সম্পর্কিত প্রাথমিক ধারণা।
  • জীবদেহে শক্তি উৎপাদন, পুষ্টি গ্রহণ ও বর্জ্য অপসারণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ ধারণা।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • কোষ আবিষ্কারের ঐতিহাসিক পটভূমি ব্যাখ্যা করা এবং আধুনিক কোষতত্ত্বের তিনটি মূল নীতি বিবৃত করা।
  • যৌগিক আলোক অণুবীক্ষণ ও ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের বিবর্ধন ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার (Resolution) তুলনা করা।
  • উদ্ভিদ কোষপ্রাচীরের গঠন এবং কোষপর্দার ফ্লুইড মোজাইক মডেলের রাসায়নিক সজ্জা বিশ্লেষণ করা।
  • কোষীয় পরিবহন প্রক্রিয়া—ব্যাপন, অন্তঃঅভিস্রবণ, বহিঃঅভিস্রবণ, প্লাজমোলাইসিস এবং রসস্ফীতি চাপের গতিশীলতা ব্যাখ্যা করা।
  • কোষ অঙ্গাণুসমূহের (নিউক্লিয়াস, মাইটোকনড্রিয়া, প্লাস্টিড, ER, গলগি বডি, লাইসোজোম, রাইবোজোম) পরাগঠন ও কাজের সম্পর্ক নিরূপণ করা।
  • প্রোক্যারিওটিক ও ইউক্যারিওটিক কোষ এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীকোষের তুলনামূলক পার্থক্য নির্ণয় করে উদ্ভিদ ও প্রাণী কলার শ্রেণিবিভাগ করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. কোষের আবিষ্কার, অণুবীক্ষণ ও কোষী...
2 ২. কোষের আবরণী ও প্রোটোপ্লাজমের গতি...
3 ৩. কোষ অঙ্গাণু ও কোষীয় শ্রমবণ্টন
4 ৪. তুলনামূলক কোষতত্ত্ব ও কোষীয় বিশ...
5 ৫. কলার স্তরবিন্যাস ও শারীরিক পদানু...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. কোষের আবিষ্কার, অণুবীক্ষণ ও কোষীয় বৈচিত্র্য

১.১ কোষের আবিষ্কার: রবার্ট হুক ও লিউয়েনহুক

জীবদেহের গঠনগত ও কার্যগত মৌলিক একক হলো কোষ (Cell)। ল্যাটিন শব্দ Cellula (যার অর্থ "ক্ষুদ্র কুঠুরি বা প্রকোষ্ঠ") থেকে "Cell" শব্দটির উৎপত্তি। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ বিজ্ঞানী রবার্ট হুক (Robert Hooke, 1635–1703) প্রথম কোষ আবিষ্কার করেন।

  • রবার্ট হুকের পর্যবেক্ষণ (১৬৬৫): কর্ক গাছের (স্প্যানিশ ওক গাছ, Quercus suber) ছালের পাতলা অংশ কেটে নিজের তৈরি যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পর্যবেক্ষণ করে হুক অসংখ্য মৌমাছির চাকের মতো সারি সারি ফাঁপা প্রকোষ্ঠ দেখতে পান। তিনি এই কুঠুরিগুলির নাম দেন "Cell" এবং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Micrographia-তে এই চিত্রগুলি প্রকাশ করেন। প্রকৃতপক্ষে হুক যা প্রত্যক্ষ করেছিলেন তা ছিল মৃত কোষের সেলুলোজ নির্মিত কোষপ্রাচীর, যেখানে কোনো সজীব প্রোটোপ্লাজম ছিল না।
  • অ্যান্টনি ভন লিউয়েনহুক (১৬৭৪): ওলন্দাজ বিজ্ঞানী লিউয়েনহুক উন্নতমানের একক লেন্সযুক্ত সরল অণুবীক্ষণ যন্ত্রের (বিবর্ধন ক্ষমতা প্রায় ২৭০-৩০০ গুণ) সাহায্যে পুকুরের জল, বৃষ্টির জল এবং দাঁতের ময়লা থেকে প্রথম সচল মুক্ত সজীব কোষ প্রত্যক্ষ করেন। তিনি এদের "Animalcules" (ক্ষুদ্র জীবকণা) নাম দিয়েছিলেন, যা আধুনিক বিজ্ঞানে ব্যাকটিরিয়া, প্রোটোজোয়া (যেমন প্যারামিসিয়াম ও ভর্টিসেলা), স্পাইরোগাইরা শৈবাল, মানব লোহিত রক্তকণিকা ও শুক্রাণু হিসেবে পরিচিত।

১.২ কোষতত্ত্ব ও ভিরশাও-এর যুগান্তকারী নীতি

ঊনবিংশ শতাব্দীতে দুই জার্মান বিজ্ঞানীর দীর্ঘদিনের হিস্টোলজিক্যাল গবেষণার ফসল হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত কোষতত্ত্ব (Cell Theory) প্রতিষ্ঠিত হয়:

  • ম্যাথিয়াস জ্যাকব স্লাইডেন (১৮৩৮): জার্মান উদ্ভিদবিদ স্লাইডেন বহুসংখ্যক উদ্ভিদকলার নমুনা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেন যে—সমস্ত উদ্ভিদের দেহই এক বা একাধিক কোষ ও কোষীয় উপাদান দিয়ে গঠিত।
  • থিওডোর সোয়ান (১৮৩৯): জার্মান প্রাণীবিদ সোয়ান বিভিন্ন প্রাণীকলা পরীক্ষা করে দেখেন যে সমস্ত প্রাণীর দেহই কোষ দ্বারা নির্মিত। তিনি লক্ষ্য করেন যে প্রাণীকোষ পাতলা বহিঃপর্দা (কোষপর্দা) দ্বারা আবৃত থাকে এবং উদ্ভিদকোষে অতিরিক্ত একটি বহিঃআবরণ হিসেবে কোষপ্রাচীর উপস্থিত। উদ্ভিদ ও প্রাণীবিজ্ঞানকে একত্রিত করে তিনি যৌথভাবে কোষতত্ত্ব ঘোষণা করেন: "সমস্ত সজীব বস্তু (উদ্ভিদ ও প্রাণী) এক বা একাধিক কোষ এবং তাদের দ্বারা উৎপাদিত পদার্থ নিয়ে গঠিত।"
  • রুডলফ ভিরশাও (১৮৫৫): প্রাথমিক কোষতত্ত্বে নতুন কোষ কীভাবে সৃষ্টি হয় তার ব্যাখ্যা ছিল না। জার্মান প্যাথলজিস্ট রুডলফ ভিরশাও ল্যাটিন ভাষায় তাঁর অমর নীতি ঘোষণা করেন: $$\mathbf{\text{Omnis cellula e cellula}}$$ যার অর্থ: "পূর্ববর্তী জীবন্ত কোষের বিভাজনের মাধ্যমেই সর্বদা নতুন কোষের উৎপত্তি ঘটে।"

আধুনিক কোষতত্ত্বের মূল নীতিসমূহ:

  1. সমস্ত সজীব উপাদান কোষ এবং কোষজাত পদার্থ দ্বারা নির্মিত।
  2. কোষ হলো জীবনের সর্বাপেক্ষা মৌলিক গঠনগত ও কার্যগত একক।
  3. নতুন কোষ সর্বদা পূর্ববর্তী জীবন্ত কোষের বিভাজনের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়।
  4. বহুকোষী জীবে প্রতিটি কোষ নিজস্ব বিপাকীয় ক্রিয়া সম্পাদন করার পাশাপাশি সামগ্রিক সমন্বয় রক্ষা করে।

কোষতত্ত্বের ব্যতিক্রম: ভাইরাস (Virus), ভিরয়েড ও প্রিয়ন-এর কোনো কোষীয় সংগঠন নেই (সাইটোপ্লাজম, কোষপর্দা বা বিপাকীয় উৎসেচক অনুপস্থিত; এরা পোষক কোষের বাইরে নির্জীব কেলাসাকার অবস্থায় থাকে)। এ ছাড়া একাধিক নিউক্লিয়াসযুক্ত সিনোসাইটিক শৈবাল (যেমন ভাউচেরিয়া) বা সিনোসাইটিক ছত্রাক (যেমন রাইজোপাস) সাধারণ এককোষীয় সংজ্ঞার ব্যতিক্রম।

১.৩ অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রকারভেদ: যৌগিক আলোক বনাম ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ

যেহেতু মানব চক্ষুর বিশ্লেষণ ক্ষমতা (Resolving Power) মাত্র $০.১\text{ মিমি} = ১০০\ \mu\text{m}$, তাই খালি চোখে কোষ ও তার ভিতরের অঙ্গাণু প্রত্যক্ষ করা অসম্ভব। কোষীয় গবেষণার প্রধান হাতিয়ার হলো বিভিন্ন প্রকার অণুবীক্ষণ যন্ত্র:

বৈশিষ্ট্য যৌগিক আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্র ট্রান্সমিশন ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ (TEM) স্ক্যানিং ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ (SEM)
আলোক / রশ্মি উৎস দৃশ্যমান আলোক রশ্মি ($\lambda = ৪০০–৭০০\text{ nm}$) উচ্চগতির ইলেকট্রন রশ্মি প্রবাহ ($\lambda \approx ০.০০৫\text{ nm}$) কেন্দ্রীভূত স্ক্যানিং ইলেকট্রন রশ্মি
লেন্স ব্যবস্থা কাঁচের আলোকীয় লেন্স (আইপিস, অবজেক্টিভ) তড়িৎচৌম্বকীয় লেন্স (Electromagnetic Lenses) তড়িৎচৌম্বকীয় লেন্স ও ডিফ্লেক্টর কয়েল
নমুনার অবস্থা সজীব বা সংরক্ষিত পাতলা রঞ্জিত ছেদ উচ্চ ভ্যাকুয়ামে অতি-পাতলা মৃত ছেদ ($৫০–১০০\text{ nm}$) ভারী ধাতু (স্বর্ণ/প্ল্যাটিনাম) প্রলেপযুক্ত নমুনা
সর্বোচ্চ বিবর্ধন ১,০০০ গুণ থেকে ২,০০০ গুণ ৫,০০,০০০ গুণ থেকে ১০,০০,০০০ গুণ ১,০০,০০০ গুণ থেকে ৩,০০,০০০ গুণ
বিশ্লেষণ ক্ষমতা ($d$) প্রায় $০.২\ \mu\text{m}$ ($২০০\text{ nm}$) প্রায় $০.১–০.২\text{ nm}$ ($১–২\ \text{Å}$) প্রায় $১–২\text{ nm}$
প্রতিবিম্বের রূপ আইপিসের মাধ্যমে সরাসরি রঙিন দ্বিমাত্রিক চিত্র ফ্লুরোসেন্ট পর্দায় অভ্যন্তরীণ পরাগঠন (2D) কম্পিউটার পর্দায় ত্রিমাত্রিক তলের রূপরেখা (3D)

বিবর্ধন বনাম বিশ্লেষণ ক্ষমতা: বিবর্ধন ক্ষমতা (Magnification) হলো কোনো বস্তুকে তার মূল আকারের তুলনায় কত গুণ বড় দেখানো যায় ($M_{\text{মোট}} = M_{\text{আইপিস}} \times M_{\text{অবজেক্টিভ}}$)। আর বিশ্লেষণ ক্ষমতা (Resolving Power) হলো পাশাপাশি অবস্থিত দুটি অতি সন্নিকটস্থ বিন্দুকে পৃথকভাবে স্পষ্টভাবে দেখার ক্ষমতা। ইলেকট্রন রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য অত্যন্ত ক্ষুদ্র হওয়ায় ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের বিশ্লেষণ ক্ষমতা আলোক অণুবীক্ষণের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি।

১.৪ নমুনা প্রস্তুতি ও রঞ্জন পদ্ধতি (Staining Protocols)

জীবন্ত সজীব কোষের সাইটোপ্লাজম ও অঙ্গাণুগুলি অত্যন্ত স্বচ্ছ, বর্ণহীন এবং তাদের প্রতিসরাঙ্ক প্রায় জলের কাছাকাছি হওয়ায় সাধারণ আলোক অণুবীক্ষণে তাদের অভ্যন্তরীণ গঠন দেখা যায় না। রঞ্জক পদার্থ (Dyes) প্রয়োগ করে অঙ্গাণুগুলিকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়:

  • মিথিলিন ব্লু (Methylene Blue): ক্ষারীয় রঞ্জক, যা কোষের অম্লীয় উপাদান বিশেষ করে নিউক্লিয়াস ও ক্রোমাটিন জালিকা-র সাথে যুক্ত হয়ে তাদের গাঢ় নীল বর্ণে রঞ্জিত করে (মানুষের গালের ভেতরের আবরণী কোষ পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হয়)।
  • স্যাফ্রানিন (Safranin): ক্ষারীয় লাল রঞ্জক, যা উদ্ভিদের কাণ্ডের ছেদে লিগনিনযুক্ত কোষপ্রাচীর ও নিউক্লিয়াসকে উজ্জ্বল লাল/গোলাপি বর্ণ দেয় (পেঁয়াজের শল্কপত্রের এপিডার্মিস পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত)।
  • অ্যাসিটোক্যারমিন (Acetocarmine): কোষ বিভাজনরত ক্রোমোজোম ও ক্রোমাটিন তন্তুকে গাঢ় লাল বর্ণে রঞ্জিত করে।
  • আয়োডিন দ্রবণ (Lugol's Iodine): উদ্ভিদের শ্বেতসার বা স্টার্চ দানার অ্যামাইলোজের সাথে বিক্রিয়া করে তাদের গাঢ় নীল-কালো বর্ণে রূপান্তরিত করে।
  • গ্লিসারিনের ভূমিকা (Mountant): অস্থায়ী স্লাইড তৈরির সময় নমুনাকে আর্দ্র রাখতে, শুকিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করতে এবং কাঁচের কভারস্লিপের প্রতিসরাঙ্কের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আলোর বিচ্ছুরণ কমাতে গ্লিসারিন ব্যবহার করা হয়।

১.৫ কোষের আকার ও আকৃতির বৈচিত্র্য

জীবজগতে কোষের আকার ও আকৃতির মধ্যে অপার বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়, যা কোষের নির্দিষ্ট কাজের সাথে নিখুঁতভাবে অভিযোজিত:

  • আকারের বৈচিত্র্য:
    • ক্ষুদ্রতম কোষ: মাইকোপ্লাজমা গ্যালিসেপটিকাম (Mycoplasma gallisepticum / PPLO), যার ব্যাস মাত্র $০.১\ \mu\text{m} = ১০০\text{ nm}$।
    • সাধারণ ব্যাকটিরিয়া: দৈর্ঘ্য প্রায় $১\ \mu\text{m} \text{ থেকে } ৫\ \mu\text{m}$।
    • মানবদেহের লোহিত রক্তকণিকা (RBC): ব্যাস প্রায় $৭.০–৭.৫\ \mu\text{m}$।
    • মানবদেহের ডিম্বাণু (Ovum): ব্যাস প্রায় $১০০–১২০\ \mu\text{m}$ ($০.১\text{ মিমি}$), যা তীক্ষ্ণ খালি চোখে দেখা সম্ভব।
    • দীর্ঘতম প্রাণীকোষ: মোটর নিউরোন (স্নায়ুকোষ), যার অ্যাক্সন মানুষের ক্ষেত্রে $১\text{ মিটারেরও}$ বেশি দীর্ঘ হতে পারে।
    • বৃহত্তম এককোষী গঠন: উটপাখির ডিম, যার মাপ প্রায় $১৭\text{ সেমি} \times ১৩\text{ সেমি}$ এবং ওজন প্রায় দেড় কিলোগ্রাম ($১.৫\text{ কেজি}$)।
    • বৃহত্তম এককোষী শৈবাল: অ্যাসিটাবুলারিয়া (Acetabularia), যার দৈর্ঘ্য প্রায় $১০\text{ সেমি}$ পর্যন্ত হতে পারে।
  • আকৃতির বৈচিত্র্য ও কাজের সম্পর্ক:
    • দ্বি-অবতল গোলীয় RBC: অবতল গোলীয় আকৃতি পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি করে দ্রুত $O_2$ ব্যাপনে সাহায্য করে এবং সরু কৈশিক নালী দিয়ে সহজে চলাচল করতে পারে।
    • শাখান্বিত দীর্ঘ স্নায়ুকোষ: দূরবর্তী অঙ্গ থেকে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে দ্রুত তড়িৎ-রাসায়নিক সংকেত পরিবহনের উপযোগী।
    • মাকু আকৃতির মসৃণ পেশিকোষ: প্রান্তভাগ সূঁচালো হওয়ায় সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ অঙ্গের চলন ঘটায়।
    • অনির্দিষ্ট আকারের শ্বেত রক্তকণিকা (WBC) ও অ্যামিবা: ক্ষণপদ গঠনের মাধ্যমে রক্তজালকের প্রাচীর ভেদ করা (ডায়াপেডিসিস) এবং ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে জীবাণু ধ্বংস করা।
    • বৃক্কাকার রক্ষীকোষ (Guard Cells): পত্ররন্ধ্র খোলা ও বন্ধের মাধ্যমে বাষ্পমোচন ও গ্যাসীয় বিনিময় নিয়ন্ত্রণ করে।
    • নলাকার জাইলেম ভেসেল ও ট্র্যাকইড: দীর্ঘ ফাঁপা নলের মতো সজ্জা মূল থেকে পাতায় জল ও খনিজ লবণ ঊর্ধ্বমুখী সংবহনে সহায়তা করে।

২. কোষের আবরণী ও প্রোটোপ্লাজমের গতিশীলতা

২.১ উদ্ভিদ কোষপ্রাচীর: রাসায়নিক গঠন ও স্তরবিন্যাস

উদ্ভিদকোষ, ছত্রাক, ব্যাকটিরিয়া ও শৈবালের কোষপর্দার বাইরে যে শক্ত, নির্জীব, স্থিতিস্থাপক ও সম্পূর্ণ ভেদ্য প্রতিরক্ষামূলক বহিঃআবরণ থাকে, তাকে কোষপ্রাচীর (Cell Wall) বলে। প্রাণীকোষে কোষপ্রাচীর সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

  • রাসায়নিক উপাদান:
    • উদ্ভিদ: প্রধান উপাদান হলো সেলুলোজ (Cellulose) মাইক্রোফাইব্রিল, যা হেমিসেলুলোজ ও পেকটিন-এর ম্যাট্রিক্সে গ্রথিত থাকে। পরিণত কোষে লিগনিন (দৃঢ়তা ও জলরোধক), সুবারিন (কর্ফে) এবং কিউটিন সঞ্চিত হয়।
    • ছত্রাক: প্রধানত কাইটিন (Chitin) দ্বারা গঠিত।
    • ব্যাকটিরিয়া: পেপটিডোগ্লাইক্যান বা মিউরিন (Peptidoglycan) দ্বারা গঠিত।
  • কোষপ্রাচীরের বিভিন্ন স্তর:
    1. মধ্যপর্দা (Middle Lamella): দুটি পাশাপাশি অবস্থিত কোষের সংযোগকারী স্তর। এটি চটচটে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম পেকটেট ("উদ্ভিদ সিমেন্ট") দিয়ে গঠিত। ফল পাকার সময় পেকটিনেজ উৎসেচক মধ্যপর্দা গলিয়ে দেয়, ফলে ফল নরম হয়।
    2. প্রাথমিক প্রাচীর (Primary Wall): মধ্যপর্দার উভয় পাশে গঠিত প্রথম প্রাচীর। এটি পাতলা, নমনীয় এবং সেলুলোজ ও পেকটিন দিয়ে তৈরি, যা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত কোষে সম্প্রসারিত হতে পারে।
    3. গৌণ প্রাচীর (Secondary Wall): পরিণত ও অপেশি কোষে (যেমন জাইলেম ভেসেল) প্রাথমিক প্রাচীরের ভেতরের দিকে ঘন লিগনিনযুক্ত দৃঢ় স্তর হিসেবে জমা হয়।
  • প্লাজমোডেসমাটা (Plasmodesmata): পাশাপাশি অবস্থিত দুটি উদ্ভিদকোষের প্রাচীরের কূপের (Pits) মধ্য দিয়ে বিস্তৃত আণুবীক্ষণিক সাইটোপ্লাজমীয় সংযোগকারী নালী, যার মাধ্যমে সংলগ্ন কোষের মধ্যে তথ্য ও পুষ্টির সিমপ্লাস্টিক পরিবহন সম্পন্ন হয়।

২.২ কোষপর্দা ও সিঙ্গার-নিকলসনের ফ্লুইড মোজাইক মডেল

প্রতিটি সজীব কোষের প্রোটোপ্লাজমকে ঘিরে যে অতি-পাতলা ($৭.৫–১০\text{ nm}$), স্থিতিস্থাপক, সজীব, প্রভেদক ভেদ্য দ্বিস্তরীয় ঝিল্লি থাকে, তাকে কোষপর্দা বা প্লাজমামেমব্রেন (Plasma Membrane) বলে। ১৯৭২ সালে এস. জে. সিঙ্গার এবং জি. এল. নিকলসন কোষপর্দার সর্বাধুনিক "ফ্লুইড মোজাইক মডেল" (Fluid Mosaic Model) প্রস্তাব করেন:

  • ফসফোলিপিড দ্বিস্তর: কোষপর্দার মূল কাঠামো হলো ফসফোলিপিড অণুর একটি অবিচ্ছিন্ন দ্বিস্তর। প্রতিটি ফসফোলিপিড অণুর দুটি অংশ থাকে:
    • একটি জলাকর্ষী (Hydrophilic) পোলার ফসফেট "মস্তক", যা বাইরের ও ভেতরের জলীয় পরিবেশের দিকে মুখ করে থাকে।
    • দুটি জলবিদ্বেষী (Hydrophobic) অপোলার ফ্যাটি অ্যাসিড "পুচ্ছ", যা দ্বিস্তরের ভেতরের দিকে একে অপরের মুখোমুখি সংরক্ষিত থাকে।
  • ঝিল্লির তরলতা (Fluidity): ফসফোলিপিডের ফ্যাটি অ্যাসিড পুচ্ছগুলি অসম্পৃক্ত হওয়ায় ঘরের তাপমাত্রায় লিপিড স্তরটি সান্দ্র তেলের মতো তরল আচরণ করে, যার ফলে প্রোটিন ও লিপিডগুলি স্তরের মধ্যে পার্শ্বীয়ভাবে বিচরণ করতে পারে।
  • প্রোটিনের মোজাইক সজ্জা: সিঙ্গার ও নিকলসনের বিখ্যাত উক্তি অনুযায়ী—"ফসফোলিপিডের তরল সমুদ্রে ভাসমান প্রোটিনের হিমশৈল" (Protein icebergs floating in a sea of lipids)। প্রোটিন দুই প্রকার:
    • অন্তঃস্থ প্রোটিন (Integral / Intrinsic Proteins): লিপিড স্তরের গভীরে প্রথিত বা পুরো স্তর ভেদ করে বিস্তৃত থাকে (ট্রান্সমেমব্রেন চ্যানেল ও বাহক প্রোটিন)।
    • বহিঃস্থ প্রোটিন (Peripheral / Extrinsic Proteins): লিপিড স্তরের উপরিভাগে আলগাভাবে যুক্ত থাকে, যা সহজেই পৃথক করা যায়।
  • গ্লাইকোক্যালিক্স: লিপিড বা প্রোটিনের সাথে যুক্ত কার্বোহাইড্রেট শৃঙ্খল (গ্লাইকোলিপিড ও গ্লাইকোপ্রোটিন), যা বহিকোষীয় পৃষ্ঠে কোষ চেনার সংকেত ও অ্যান্টিজেন হিসেবে কাজ করে।

২.৩ ঝিল্লি পরিবহন: ব্যাপন, অভিস্রবণ ও প্লাজমোলাইসিস

কোষপর্দা হলো প্রভেদক ভেদ্য পর্দা (Selectively Permeable Membrane)—এটি দ্রাবক অণুকে সহজে চলাচল করতে দিলেও দ্রাব অণুর চলাচলকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।

  • ১. সাধারণ ব্যাপন (Simple Diffusion): কোনো বাহক বা শক্তির সাহায্য ছাড়াই পদার্থের অণু বা আয়নগুলির তাদের নিজস্ব গতিশক্তি দ্বারা বেশি ঘনত্বের স্থান থেকে কম ঘনত্বের স্থানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া। শ্বাসবায়ু ($O_2, CO_2$) সরাসরি ফসফোলিপিড স্তর ভেদ করে ব্যাপিত হয়।
  • ২. অভিস্রবণ (Osmosis): একটি প্রভেদক ভেদ্য পর্দা দ্বারা পৃথক থাকা অবস্থায় বেশি জলীয় বিভবযুক্ত (কম ঘন দ্রবণ) স্থান থেকে কম জলীয় বিভবযুক্ত (বেশি ঘন দ্রবণ) স্থানের দিকে দ্রাবকের (জলের) অণুর স্বতঃস্ফূর্ত পরিগমনকে অভিস্রবণ বলে।
    • অল্পসারী দ্রবণ (Hypotonic Solution): বহিঃস্থ দ্রবণের ঘনত্ব কোষরসের ঘনত্বের চেয়ে কম $\implies$ অন্তঃঅভিস্রবণ (Endosmosis) দ্বারা জল কোষে প্রবেশ করে। প্রাণীকোষ ফুলে ফেটে যায় (Lysis); উদ্ভিদকোষ ফুলে দৃঢ় হয়।
    • অতিসারী দ্রবণ (Hypertonic Solution): বহিঃস্থ দ্রবণের ঘনত্ব কোষরসের ঘনত্বের চেয়ে বেশি $\implies$ বহিঃঅভিস্রবণ (Exosmosis) দ্বারা কোষ থেকে জল বেরিয়ে যায়। প্রাণীকোষ কুঁচকে যায়; উদ্ভিদকোষ প্লাজমোলাইসিস ঘটায়।
    • সমসারী দ্রবণ (Isotonic Solution): বহিঃস্থ দ্রবণ ও কোষরসের ঘনত্ব সমান $\implies$ জলের কোনো নিট স্থানান্তর ঘটে না।
  • প্লাজমোলাইসিস (Plasmolysis) ও ডি-প্লাজমোলাইসিস: সজীব উদ্ভিদকোষকে (যেমন রঙিন পেঁয়াজের শল্কপত্র) অতিসারী লবণ বা চিনির দ্রবণে রাখলে বহিঃঅভিস্রবণের ফলে কেন্দ্রীয় ভ্যাকুওল থেকে জল বেরিয়ে যায়। সাইটোপ্লাজমীয় প্রোটোপ্লাস্ট সংকুচিত হয়ে কোষপ্রাচীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একপাশে গোলকার পিণ্ডে পরিণত হয়। এই অবস্থাকে প্লাজমোলাইসিস বলে। এই কোষটিকে পুনরায় বিশুদ্ধ জলে (অল্পসারী দ্রবণ) রাখলে অন্তঃঅভিস্রবণ দ্বারা জল প্রবেশ করে কোষটি পূর্বের স্ফীত অবস্থায় ফিরে আসে, যাকে ডি-প্লাজমোলাইসিস বলে।
  • রসস্ফীতি চাপ ($TP$) ও প্রাচীর চাপ ($WP$): অন্তঃঅভিস্রবণে জল প্রবেশের ফলে প্রসারিত প্রোটোপ্লাস্ট কোষপ্রাচীরের উপর যে বহির্মুখী চাপ দেয় তাকে রসস্ফীতি চাপ (Turgor Pressure) বলে। এর প্রতিক্রিয়ায় দৃঢ় স্থিতিস্থাপক কোষপ্রাচীর প্রোটোপ্লাস্টের উপর বিপরীতমুখী যে অন্তর্মুখী চাপ প্রয়োগ করে তাকে প্রাচীর চাপ (Wall Pressure) বলে। পূর্ণ স্ফীত অবস্থায় $TP = WP$, যার ফলে বিরুৎজাতীয় কাণ্ড খাড়া থাকে ও পত্ররন্ধ্র উন্মুক্ত হয়।

২.৪ সক্রিয় পরিবহন ও বৃহৎ কণার পরিবহন (Bulk Transport)

কোষের প্রয়োজনে ঘনত্বের নতির বিপরীতে অণু বা আয়নের পরিবহন এবং বৃহৎ খাদ্যবস্তু গ্রহণের বিশেষ প্রক্রিয়া:

  • সক্রিয় পরিবহন (Active Transport): ঘনত্বের নতির বিপরীতে (কম ঘনত্ব থেকে বেশি ঘনত্বের দিকে) নির্দিষ্ট বাহক প্রোটিন বা পাম্পের সাহায্যে এবং ATP শক্তির প্রত্যক্ষ ব্যবহারে সংঘটিত পরিবহন। উদাহরণ: স্নায়ুকোষের $Na^+/K^+$ এটিপেজ পাম্প (প্রতিটি ATP ব্যয়ে ৩টি $Na^+$ বাইরে যায় এবং ২টি $K^+$ ভেতরে প্রবেশ করে)।
  • বৃহৎ কণার পরিবহন (Endocytosis & Exocytosis):
    • এন্ডোসাইটোসিস (Endocytosis): কোষপর্দা ভাঁজ হয়ে ভেসিকল সৃষ্টির মাধ্যমে বহিকোষীয় উপাদান কোষে গ্রহণ করা:
      • ফ্যাগোসাইটোসিস ("কোষীয় ভক্ষণ"): ক্ষণপদের সাহায্যে কঠিন খাদ্যবস্তু বা ব্যাকটিরিয়া গিলে ফেলা (যেমন অ্যামিবা এবং মানবদেহের নিউট্রোফিল ও ম্যাক্রোফাজ শ্বেত রক্তকণিকা)।
      • পিনোসাইটোসিস ("কোষীয় পান"): ক্ষুদ্র পুটিকা বা পিনোসাইটিক ভেসিকলের মাধ্যমে তরল পদার্থ গ্রহণ।
    • এক্সোসাইটোসিস (Exocytosis): গলগি বস্তু বা অন্যান্য ক্ষরণকারী ভেসিকল কোষপর্দার সাথে যুক্ত হয়ে পরিপাককারী উৎসেচক, হরমোন, মিউকাস বা বর্জ্য পদার্থ কোষের বাইরে নিক্ষেপ করার প্রক্রিয়া ("কোষীয় বমি")।

২.৫ প্রোটোপ্লাজম ও সাইটোপ্লাজমের ভৌত প্রকৃতি (সল-জেল রূপান্তর)

১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে চেক শারীরবিজ্ঞানী জে. ই. পুরকিঞ্জে (Jan Evangelista Purkinje) কোষের সমস্ত সজীব উপাদানকে বোঝাতে প্রোটোপ্লাজম (Protoplasm) শব্দটি ব্যবহার করেন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টমাস হেনরি হাক্সলি (১৮৬৮) প্রোটোপ্লাজমকে যথার্থই "জীবনের ভৌত ভিত্তি" (Physical Basis of Life) হিসেবে আখ্যায়িত করেন, কারণ জীবনের সমস্ত বিপাকীয় ক্রিয়া এই মাধ্যমেই ঘটে।

$$\mathbf{\text{প্রোটোপ্লাজম} = \text{সাইটোপ্লাজম} + \text{নিউক্লিয়াস}}$$
  • সাইটোপ্লাজম (Cytoplasm): কোষপর্দা ও নিউক্লীয় পর্দার মধ্যবর্তী অর্ধস্বচ্ছ, সান্দ্র, জেলির ন্যায় সজীব মাত্রিকা। এটি গঠিত হয়:
    • সাইটোসল (হায়ালোপ্লাজম): সাইটোপ্লাজমের তরল অংশ, যাতে ৭৫-৮৫% জল এবং দ্রবীভূত খনিজ লবণ, শর্করা, অ্যামিনো অ্যাসিড ও উৎসেচক থাকে।
    • কোষ অঙ্গাণু: সজীব বিপাকীয় কার্যকারী উপাদান (মাইটোকনড্রিয়া, প্লাস্টিড, গলগি বডি ইত্যাদি)।
    • কোষীয় নির্জীব বস্তু (Ergastic Substances): সঞ্চিত খাদ্য (স্টার্চ, ফ্যাট), ক্ষরিত পদার্থ এবং রেচন পদার্থ (ক্যালসিয়াম অক্সালেটের রেফাইড কেলাস)।
  • সাইটোপ্লাজমের কলয়েডীয় অবস্থা (সল-জেল পরিবর্তন): সাইটোপ্লাজম কোনো সাধারণ দ্রবণ নয়, এটি একটি বহুপর্যাযী কলয়েডীয় সিস্টেম। এটি তরল "সল" (Sol) অবস্থা এবং আধা-কঠিন জেলি "জেল" (Gel) অবস্থার মধ্যে ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে পারে। এই সল-জেল রূপান্তরের ফলেই অ্যামিবার ক্ষণপদীয় চলন এবং সাইক্লোসিস (Cyclosis / সাইটোপ্লাজমীয় আবর্তন) ঘটে—যেমন জলজ উদ্ভিদ ঝাঁঝি (Hydrilla) বা ভ্যালিসনেরিয়া-র পাতার কোষে ক্লোরোপ্লাস্টসহ সাইটোপ্লাজমের ঘড়ির কাঁটার মতো অবিরাম আবর্তন।

৩. কোষ অঙ্গাণু ও কোষীয় শ্রমবণ্টন

৩.১ নিউক্লিয়াস: কোষের মস্তিষ্ক ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র

১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে স্কটিশ উদ্ভিদবিদ রবার্ট ব্রাউন (Robert Brown) অর্কিড পাতার কোষে প্রথম নিউক্লিয়াস (Nucleus) আবিষ্কার করেন। এটি ইউক্যারিওটিক কোষের বৃহত্তম ও প্রধানতম অঙ্গাণু, যা কোষের সমস্ত বিপাকীয় ও বংশগত ক্রিয়া পরিচালনা করায় একে "কোষের মস্তিষ্ক বা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র" বলা হয়।

একটি আদর্শ নিউক্লিয়াসের পরাগঠন:

  1. নিউক্লীয় পর্দা (Nuclear Membrane): দ্বিস্তরীয় লাইপোপ্রোটিন নির্মিত আবরণী। বহিঃপর্দাটি এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকার সাথে যুক্ত থাকে এবং তাতে রাইবোজোম দানা থাকে। দুই পর্দার মাঝে পেরিনিউক্লীয় স্থান থাকে। পর্দায় অসংখ্য ক্ষুদ্র নিউক্লীয় রন্ধ্র (Nuclear Pores) থাকে, যা নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমের মধ্যে RNA ও প্রোটিনের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে।
  2. নিউক্লিওপ্লাজম বা নিউক্লীয় রস (Nucleoplasm): নিউক্লীয় পর্দা পরিবেষ্টিত স্বচ্ছ, অর্ধতরল ও দানাদার প্রোটিনসমৃদ্ধ জেলির মতো ধাত্র, যাতে নিউক্লিক অ্যাসিড, পলিমারেজ উৎসেচক ও খনিজ আয়ন থাকে।
  3. নিউক্লীয় জালিকা বা ক্রোমাটিন জালিকা (Chromatin Reticulum): নিউক্লিওপ্লাজমে ভাসমান সূক্ষ্ম সূত্রের ন্যায় পেঁচানো জালক। এটি মূলত DNA (প্রায় ৩৫%) এবং ক্ষারীয় হিস্টোন প্রোটিন (প্রায় ৬০%) দ্বারা গঠিত। কোষ বিভাজনের সময় এই জালিকা জলবিয়োজন ঘটিয়ে ঘনীভূত হয়ে রডের মতো নির্দিষ্ট সংখ্যক ক্রোমোজোম গঠন করে, যার মধ্যে জীবের বংশগতির ধারক ও বাহক জিন (Gene) অবস্থান করে।
    • ইউক্রোমাটিন: হালকা রঞ্জিত, শিথিলভাবে বিন্যস্ত, বংশগতভাবে সক্রিয় অংশ (ট্রান্সক্রিপশনে অংশ নেয়)।
    • হেটারোক্রোমাটিন: গাঢ় রঞ্জিত, ঘন সন্নিবিষ্ট, বংশগতভাবে নিষ্ক্রিয় অংশ।
  4. নিউক্লিওলাস (Nucleolus): ১৭৮১ সালে ফন্টানা কর্তৃক আবিষ্কৃত নিউক্লিওপ্লাজমে অবস্থিত সর্বাপেক্ষা ঘন, গোলাকার ও পর্দাবিহীন অংশ। এটি প্রধানত ribosomal RNA (rRNA) ও প্রোটিন সমৃদ্ধ এবং একে "রাইবোজোম তৈরির কারখানা" বলা হয়।

৩.২ মাইটোকনড্রিয়া: কোষের শক্তিঘর ও ATP সংশ্লেষ

১৮৫৭ সালে কলিকার কর্তৃক আবিষ্কৃত এবং ১৮৯৮ সালে কার্ল বেন্ডা কর্তৃক মাইটোকনড্রিয়া (Mitochondria) নামাঙ্কিত এই অঙ্গাণুকে "কোষের শক্তিঘর" (Powerhouse of the Cell) বলা হয়, কারণ এখানে সবাত শ্বসনের মাধ্যমে খাদ্যস্থ রাসায়নিক শক্তি মুক্ত হয়ে সার্বজনীন জৈব শক্তি মুদ্রা ATP (অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট) সংশ্লেষিত হয়।

মাইটোকনড্রিয়ার পরাগঠন:

  • দ্বিস্তরীয় পর্দা:
    • বহিঃপর্দা: মসৃণ, ছিদ্রযুক্ত এবং পোরিন প্রোটিন উপস্থিত থাকায় সহজেই ভেদ্য।
    • অন্তঃপর্দা: প্রভেদক ভেদ্য এবং ভেতরের দিকে অসংখ্য আঙুলের মতো বা পাতের মতো খাঁজ তৈরি করে প্রলম্বিত থাকে, যাদের ক্রিস্টি (Cristae) বলে। ক্রিস্টি ইলেকট্রন পরিবহন শৃঙ্খল ও ATP তৈরির জন্য অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
    • পেরিমাইটোকনড্রিয়াল স্থান: দুই পর্দার মধ্যবর্তী প্রকোষ্ঠ, যেখানে শ্বসনের সময় প্রোটন ($H^+$) জমা হয়ে ঘনত্ব নতি সৃষ্টি করে।
  • অক্সিজোম বা $F_0-F_1$ দানা: ক্রিস্টির গায়ে অভ্যন্তরীণ ধাত্রের দিকে মুখ করে অসংখ্য দেশলাই কাঠির মতো বৃন্তযুক্ত কণা থাকে। এতে বৃন্তহীন ভিত্তি ($F_0$) এবং গোল মস্তক ($F_1$) থাকে, যা ATP সিন্থেজ (ATP Synthase) উৎসেচক হিসেবে কাজ করে ADP ও অজৈব ফসফেট ($P_i$) যুক্ত করে ATP তৈরি করে: $$\text{ADP} + \text{P}_i + \text{শক্তি} \xrightarrow{\text{ATP Synthase}} \text{ATP}$$
  • মাইটোকনড্রিয়াল ধাত্র (Matrix): অন্তঃপর্দা পরিবেষ্টিত জেলির মতো পদার্থ, যাতে ক্রেবস চক্রের (Krebs Cycle) সমস্ত উৎসেচক, নিজস্ব বৃত্তাকার দ্বি-তন্ত্রী DNA এবং 70S রাইবোজোম উপস্থিত।
  • অর্ধ-স্বয়ংক্রিয় অঙ্গাণু (Semi-autonomous Organelle): নিজস্ব বৃত্তাকার DNA ও 70S রাইবোজোম থাকার কারণে মাইটোকনড্রিয়া নিজের প্রয়োজনীয় কিছু প্রোটিন নিজেই তৈরি করতে পারে এবং দ্বি-বিভাজনের মাধ্যমে নতুন মাইটোকনড্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে।

৩.৩ প্লাস্টিড: উদ্ভিদের খাদ্য কারখানা ও রঞ্জক ভাণ্ডার

১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মান প্রকৃতিবিদ আর্নস্ট হেকেল কর্তৃক আবিষ্কৃত প্লাস্টিড (Plastid) হলো উদ্ভিদকোষ ও ইউগ্লিনার সাইটোপ্লাজমে উপস্থিত বৃহত্তম দ্বিস্তরীয় অঙ্গাণু। প্রাণীকোষ ও ছত্রাকে প্লাস্টিড সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

রঞ্জক পদার্থের উপস্থিতি ও রঙের ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানী শিম্পার (১৮৮৩) প্লাস্টিডকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেন:

প্লাস্টিডের শ্রেণি রঞ্জক পদার্থ রং ও অবস্থান প্রধান শারীরবৃত্তীয় কাজ
লিউকোপ্লাস্ট (Leucoplast) রঞ্জকবিহীন (বর্ণহীন) আলোর সংস্পর্শহীন অঙ্গ: মূল, ভূনিম্নস্থ কাণ্ড (আলু), বীজ খাদ্য সঞ্চয় করা:
• অ্যামাইলোপ্লাস্ট: শ্বেতসার সঞ্চয় করে (আলু)
• এলাইওপ্লাস্ট: চর্বি ও তেল সঞ্চয় করে (রেড়ির বীজ)
• অ্যালিউরোপ্লাস্ট: প্রোটিন সঞ্চয় করে (ভুট্টা)
ক্রোমোপ্লাস্ট (Chromoplast) ক্যারোটিনয়েড (ক্যারোটিন: কমলা, জ্যান্থোফিল: হলুদ), লাইকোপিন (লাল) ফুলের পাপড়ি, পাকা ফল (টমেটো, লঙ্কা), গাজরের মূল উদ্ভিদাঙ্গে উজ্জ্বল বর্ণ সৃষ্টি করে পরাগায়নের জন্য কীট-পতঙ্গ এবং বীজ বিস্তারের জন্য প্রাণীদের আকৃষ্ট করা
ক্লোরোপ্লাস্ট (Chloroplast) ক্লোরোফিল a, ক্লোরোফিল b, ক্যারোটিনয়েড পাতার মেসোফিল কলা, কচি সবুজ কাণ্ড, কাঁচা ফলের ত্বক সালোকসংশ্লেষ: সৌরশক্তি শোষণ করে জল ও $CO_2$-কে গ্লুকোজে রূপান্তরিত করা — "কোষের রান্নাঘর"

ক্লোরোপ্লাস্টের পরাগঠন: দ্বিস্তরীয় পর্দা পরিবেষ্টিত ক্লোরোপ্লাস্টের অভ্যন্তরে দুটি প্রধান অংশ থাকে:
১. গ্রানা (Grana): থাইলাকয়েড নামক কতগুলি চ্যাপ্টা থলির মতো পর্দাবেষ্টিত অংশের কয়েনের ন্যায় স্তূপ। থাইলাকয়েড পর্দায় ক্লোরোফিল থাকে। গ্রানা হলো সালোকসংশ্লেষের আলোক দশার (Light Reaction) স্থান (জলের আলোক বিশ্লেষণ ও ATP/NADPH উৎপাদন)। পাশাপাশি দুটি গ্রানা যুক্ত থাকে স্ট্রোমা ল্যামেলি দ্বারা।
২. স্ট্রোমা বা ধাত্র (Stroma): গ্রানার চারপাশের বর্ণহীন প্রোটিনসমৃদ্ধ তরল ধাত্র, যেখানে বৃত্তাকার DNA, 70S রাইবোজোম এবং RuBisCO উৎসেচক থাকে। স্ট্রোমা হলো সালোকসংশ্লেষের অন্ধকার দশার (Dark Reaction) স্থান ($CO_2$ সংবন্ধন ও শর্করা তৈরি)। ক্লোরোপ্লাস্টও একটি অর্ধ-স্বয়ংক্রিয় অঙ্গাণু।

৩.৪ এন্ডোমেমব্রেন সিস্টেম: ER, গলগি বডি ও লাইসোজোম

কোষের যে সমস্ত পর্দাবেষ্টিত অঙ্গাণু যৌথভাবে প্রোটিন ও লিপিড সংশ্লেষ, রূপান্তর, প্যাকেজিং, ক্ষরণ ও অন্তঃকোষীয় পরিপাকে সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাদের একত্রে এন্ডোমেমব্রেন তন্ত্র বলে:

  • এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা (ER): ১৯৪৫ সালে কিথ পোর্টার কর্তৃক বর্ণিত সাইটোপ্লাজমে জালের মতো বিস্তৃত নালী, সিস্টার্নি ও ভেসিকল দ্বারা গঠিত অঙ্গাণু:
    • অমসৃণ ER (RER): বহিঃপৃষ্ঠে 80S রাইবোজোম দানা সংলগ্ন থাকায় খসখসে দেখায়। প্রধান কাজ: প্রোটিন সংশ্লেষ ও রূপান্তর। ক্ষরণকারী কোষে (অগ্ন্যাশয়) প্রচুর থাকে।
    • মসৃণ ER (SER): গায়ে কোনো রাইবোজোম থাকে না; প্রধানত নলাকার। প্রধান কাজ: লিপিড, ফসফোলিপিড ও স্টেরয়েড হরমোন (টেস্টোস্টেরন, ইস্ট্রোজেন) সংশ্লেষ করা। যকৃতে ক্ষতিকর ওষুধ ও বিষাক্ত উপাদানের বিষমুক্তকরণ (Detoxification) ঘটায় এবং পেশিকোষে (সারকোপ্লাজমিক রেটিকুলাম) $\text{Ca}^{2+}$ আয়ন সঞ্চয় করে পেশি সংকোচনে সাহায্য করে।
  • গলগি বস্তু / গলগি বডি (Golgi Apparatus): ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে ইতালীয় স্নায়ুবিজ্ঞানী ক্যামিলো গলগি (Camillo Golgi) প্যাঁচার স্নায়ুকোষে রৌপ্য নাইট্রেট রঞ্জন পদ্ধতিতে এটি আবিষ্কার করেন।
    • গঠন: ৪ থেকে ৮টি সমান্তরাল চ্যাপ্টা বাঁকানো থলি (সিস্টার্নি), ক্ষুদ্র ভেসিকল ও ভ্যাকুওল নিয়ে গঠিত। এর দুটি তল থাকে: গঠনকারী উত্তল Cis-তল (যা ER-এর দিকে থাকে) এবং ক্ষরণকারী অবতল Trans-তল (যা কোষপর্দার দিকে থাকে)। উদ্ভিদকোষে অসংলগ্নভাবে ছড়ানো গলগি বস্তুকে ডিকটিওজোম (Dictyosome) বলে।
    • কাজ: একে "কোষের ট্রাফিক পুলিশ বা পোস্ট অফিস" বলা হয়। ER থেকে আগত প্রোটিন ও লিপিডের সাথে শর্করা যুক্ত করে গ্লাইকোপ্রোটিন ও গ্লাইকোলিপিড গঠন (গ্লাইকোসাইলেশন), তাদের প্যাকেজিং করে ক্ষরণকারী ভেসিকলে ভরে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠানো। এছাড়া প্রাথমিক লাইসোজোম, শুক্রাণুর অ্যাক্রোজোম এবং উদ্ভিদকোষ বিভাজনে কোষপাত (Cell Plate) গঠনে অংশ নেয়।
  • লাইসোজোম (Lysosome): ১৯৫৫ সালে বেলজিয়ান বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান দ্য দুভ (Christian de Duve) এটি আবিষ্কার করেন। গলগি বস্তু থেকে উৎপন্ন একক পর্দাঘেরা ক্ষুদ্র থলির মতো অঙ্গাণু, যার ভেতরে প্রায় ৫০ রকমের অম্লীয় হাইড্রোলাইটিক উৎসেচক (প্রোটিয়েজ, লাইপেজ, নিউক্লিয়েজ) থাকে ($pH \approx ৪.৫–৫.০$)।
    • অন্তঃকোষীয় পরিপাক: ক্ষণপদের মাধ্যমে গৃহীত বহিরাগত খাদ্যবস্তু বা ব্যাকটিরিয়াকে হজম করে বিনষ্ট করে।
    • অটোফ্যাগি বা স্বগ্রাস (Autophagy): অনাহারকালে বা শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজনে কোষের নিজস্ব পুরনো ও অকেজো অঙ্গাণুকে গ্রাস করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য অ্যামিনো অ্যাসিডে পরিণত করে।
    • অটোলাইসিস ও "আত্মঘাতী থলি" (Suicide Bags): তীব্র রোগাক্রান্ত অবস্থা বা কোষের চরম ক্ষতি হলে লাইসোজোমের পর্দা ফেটে যায় এবং মুক্ত উৎসেচক সম্পূর্ণ নিজের কোষটিকেই পরিপাক করে ধ্বংস করে দেয়। ব্যাঙাচির রূপান্তরের সময় লেজ বিলোপেও লাইসোজোম মুখ্য ভূমিকা নেয়।

৩.৫ রাইবোজোম, সেন্ট্রোজোম, ভ্যাকুওল ও পারঅক্সিজোম

  • রাইবোজোম (Ribosome): ১৯৫৫ সালে জর্জ প্যালাডে ইলেকট্রন অণুবীক্ষণে প্রথম প্রত্যক্ষ করেন। সাইটোপ্লাজমে মুক্ত বা RER-এর গায়ে যুক্ত পর্দাবিহীন রাইবোনিউক্লিওপ্রোটিন কণা। একে "কোষের প্রোটিন কারখানা" (Protein Factory of the Cell) বলে।
    • 70S রাইবোজোম: প্রোক্যারিওটিক কোষে এবং মাইটোকনড্রিয়া ও প্লাস্টিডের ধাত্রে থাকে। দুটি উপ-একক: 50S এবং 30S ($S = \text{ভেদবার্গ একক}$, অবক্ষেপণ গুণাঙ্ক)।
    • 80S রাইবোজোম: ইউক্যারিওটিক সাইটোপ্লাজমে ও RER-এর গায়ে থাকে। দুটি উপ-একক: 60S এবং 40S।
  • সেন্ট্রোজোম ও সেন্ট্রিওল (Centrosome & Centrioles): ১৮৮৮ সালে বোভেরি কর্তৃক বর্ণিত প্রাণীকোষের নিউক্লিয়াসের কাছে অবস্থিত পর্দাবিহীন অঙ্গাণু (উন্নত উদ্ভিদকোষে অনুপস্থিত)। এটি পরস্পরের সাথে সমকোণে ($৯০^\circ$) অবস্থিত দুটি পিপের মতো নলাকার সেন্ট্রিওল নিয়ে গঠিত। সেন্ট্রিওলের অনুপ্রস্থ ছেদে $৯+০$ বিন্যাসে ৯টি অনুদৈর্ঘ্য ট্রিপলেট অণুনালিকা (Microtubules) থাকে। প্রাণী কোষ বিভাজনের সময় এটি অ্যাস্টার রশ্মি ও বেমতন্তু (Spindle apparatus) গঠন করে এবং সিলিয়া ও ফ্ল্যাজেলার ভিত্তিদেহ (Basal body) তৈরি করে।
  • ভ্যাকুওল বা কোষগহ্বর (Vacuole): সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত তরলপূর্ণ নির্জীব গহ্বর, যা টোনোপ্লাস্ট (Tonoplast) নামক একটি প্রভেদক ভেদ্য একক পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে।
    • উদ্ভিদ ভ্যাকুওল: পরিণত উদ্ভিদকোষে অনেকগুলি ছোট ভ্যাকুওল যুক্ত হয়ে একটি বিশালাকার কেন্দ্রীয় ভ্যাকুওল গঠন করে যা কোষের আয়তনের ৭০-৯০% দখল করে এবং সাইটোপ্লাজম ও নিউক্লিয়াসকে প্রাচীরের দিকে ঠেলে দেয় (প্রাইমরডিয়াল ইউট্রিকল)। এর মধ্যে থাকে কোষরস (Cell Sap): জল, খনিজ লবণ, শর্করা, জৈব অ্যাসিড ও জলে দ্রাব্য অ্যান্থোসায়ানিন রঞ্জক। এটি কোষের রসস্ফীতি চাপ ও দৃঢ়তা বজায় রাখে।
    • প্রাণী ভ্যাকুওল: আকারে অত্যন্ত ছোট ও সংখ্যায় কম। উদাহরণ: অ্যামিবা-র জল নির্গমনের সংঙ্কোচনশীল ভ্যাকুওল (Contractile vacuole) এবং খাদ্য ভ্যাকুওল।
  • পারঅক্সিজোম (Peroxisome): একক পর্দাঘেরা গোলাকার মাইক্রোবডি, যাতে ক্যাটালিজ নামক উৎসেচক থাকে। এটি বিপাকে উৎপন্ন অত্যন্ত ক্ষতিকর হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডকে জল ও অক্সিজেনে ভেঙে নিষ্ক্রিয় করে: $$২\text{H}_২\text{O}_২ \xrightarrow{\text{Catalase}} ২\text{H}_২\text{O} + \text{O}_২$$

৪. তুলনামূলক কোষতত্ত্ব ও কোষীয় বিশেষায়ন

৪.১ প্রোক্যারিওটিক কোষ বনাম ইউক্যারিওটিক কোষ

কোষের নিউক্লিয়াসের সংগঠনের ওপর ভিত্তি করে জীবজগৎকে দুটি মূল ধারায় ভাগ করা হয়: প্রোক্যারিওট বা আদিকোষী জীব এবং ইউক্যারিওট বা প্রকৃত কোষী জীব।

তুলনার বিষয় প্রোক্যারিওটিক কোষ (আদিকোষ) ইউক্যারিওটিক কোষ (প্রকৃত কোষ)
১. নিউক্লিয়াসের গঠন অনগ্রসর বা আদিম নিউক্লিয়াস; কোনো নিউক্লীয় পর্দা ও নিউক্লিওলাস থাকে না। সাইটোপ্লাজমে নগ্ন DNA যুক্ত অঞ্চলকে নিউক্লয়েড (Nucleoid) বলে। সুগঠিত আদর্শ নিউক্লিয়াস; দ্বিস্তরীয় নিউক্লীয় পর্দা, নিউক্লিওপ্লাজম, নিউক্লিওলাস ও ক্রোমাটিন জালিকা বর্তমান।
২. জেনেটিক বস্তু (DNA) একক, বৃত্তাকার দ্বি-তন্ত্রী নগ্ন DNA; এতে হিস্টোন প্রোটিন থাকে না। প্রায়শই অতিরিক্ত প্লাজমিড DNA থাকে। একাধিক রৈখিক দ্বি-তন্ত্রী DNA ক্ষারীয় হিস্টোন প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয়ে ক্রোমোজোম গঠন করে।
৩. পর্দাবৃত কোষ অঙ্গাণু সম্পূর্ণ অনুপস্থিত (মাইটোকনড্রিয়া, ক্লোরোপ্লাস্ট, ER, গলগি বডি, লাইসোজোম নেই)। সুনির্দিষ্ট উপস্থিত (মাইটোকনড্রিয়া, প্লাস্টিড, ER, গলগি বডি ইত্যাদি দ্বারা প্রকোষ্ঠময়তা গঠিত)।
৪. রাইবোজোম ছোট প্রকৃতির 70S রাইবোজোম (উপ-একক: 50S + 30S) সাইটোপ্লাজমে মুক্ত থাকে। সাইটোপ্লাজমে বড় প্রকৃতির 80S (60S + 40S); অঙ্গাণুর (মাইটোকনড্রিয়া) ভেতরে 70S থাকে।
৫. শ্বসন স্থান কোষপর্দার বিশেষ অন্তর্বলন মেসোজোম (Mesosome)-এ শ্বসন উৎসেচক থাকে। সবাত শ্বসনের ক্রেবস চক্র ও অক্সিডেটিভ ফসফোরাইলেশন মাইটোকনড্রিয়ায় ঘটে।
৬. কোষপ্রাচীরের উপাদান অ-সেলুলোজীয়; মূলত পেপটিডোগ্লাইক্যান বা মিউরিন দিয়ে তৈরি। উদ্ভিদে সেলুলোজ, ছত্রাকে কাইটিন; প্রাণীকোষে প্রাচীর নেই।
৭. কোষ বিভাজন পদ্ধতি প্রত্যক্ষ বিভাজন বা অ্যামাইটোসিস (দ্বি-বিভাজন); কোনো বেমতন্তু গঠিত হয় না। পরোক্ষ সমবিভাজন (মাইটোসিস) বা হ্রাস বিভাজন (মায়োসিস); বেমতন্তু গঠিত হয়।
৮. সাধারণ উদাহরণ ব্যাকটিরিয়া (E. coli), নীলাভ-সবুজ শৈবাল (সায়ানোব্যাকটিরিয়া: নস্টক), মাইকোপ্লাজমা। উদ্ভিদকোষ, প্রাণীকোষ, ছত্রাক (ইস্ট, মিউকর), প্রোটোজোয়া (অ্যামিবা, প্যারামিসিয়াম)।

৪.২ উদ্ভিদকোষ বনাম প্রাণীকোষের গঠনগত তুলনা

উভয়ই ইউক্যারিওটিক হলেও উদ্ভিদের অচল স্বভোজী জীবনধারা এবং প্রাণীদের চলনশীল পরভোজী স্বভাবের কারণে তাদের কোষে স্পষ্ট কাঠামোগত পার্থক্য রয়েছে:

তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য উদ্ভিদকোষ (Plant Cell) প্রাণীকোষ (Animal Cell)
১. কোষপ্রাচীর কোষপর্দার বাইরে সেলুলোজ নির্মিত পুরু ও দৃঢ় কোষপ্রাচীর উপস্থিত। কোষপ্রাচীর সম্পূর্ণ অনুপস্থিত; কেবল স্থিতিস্থাপক কোষপর্দা দ্বারা বেষ্টিত।
২. প্লাস্টিড উপস্থিত (ক্লোরোপ্লাস্ট, ক্রোমোপ্লাস্ট ও লিউকোপ্লাস্ট থাকে)। সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
৩. সেন্ট্রোজোম ও সেন্ট্রিওল উন্নত উদ্ভিদে অনুপস্থিত (অ্যান্যাস্ট্রাল বেম গঠিত হয়)। নিউক্লিয়াসের কাছে সেন্ট্রিওলযুক্ত সেন্ট্রোজোম উপস্থিত (অ্যাম্ফিয়্যাস্ট্রাল বেম)।
৪. ভ্যাকুওল কোষের কেন্দ্রে একটি স্থায়ী সুবিশাল ভ্যাকুওল থাকে (৭০-৯০% স্থান জুড়ে)। ভ্যাকুওল সাধারণত অনুপস্থিত বা থাকলেও আকারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও অস্থায়ী।
৫. সঞ্চিত খাদ্য প্রধান সঞ্চিত খাদ্য হলো শ্বেতসার বা স্টার্চ ও উদ্ভিজ্জ তেল। প্রধান সঞ্চিত খাদ্য হলো গ্লাইকোজেন ("প্রাণী শ্বেতসার") ও চর্বি।
৬. সাইটোকাইনেসিস পদ্ধতি কেন্দ্র থেকে পরিধির দিকে কোষপাত (Cell Plate) গঠনের মাধ্যমে ঘটে। পরিধি থেকে ভেতরের দিকে কোষপর্দার খাঁজ সৃষ্টি (Furrowing) দ্বারা ঘটে।
৭. আকৃতি ও অবস্থান নির্দিষ্ট বহুভুজাকার/আয়তাকার; বৃহৎ ভ্যাকুওলের চাপে নিউক্লিয়াস পরিধিতে সরে যায়। নমনীয় পরিবর্তনশীল বা গোলীয়; নিউক্লিয়াস সাধারণত কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকে।

৪.৩ বহুভোজী জীবে কোষীয় বিশেষায়ন ও শ্রমবণ্টন

এককোষী জীবে একটিমাত্র কোষের ভেতরেই সমস্ত কাজ সম্পন্ন হয়। কিন্তু জটিল বহুকোষী জীবে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সম্পাদনের জন্য কোষগুলির গঠন ও কাজের বিশেষ রূপান্তর ঘটে, যাকে কোষীয় বিশেষায়ন ও শ্রমবণ্টন (Division of Labor) বলে:

  • পরিণত মানব লোহিত রক্তকণিকা (RBC): অস্থিমজ্জায় উৎপত্তির সময় প্রাথমিক অবস্থায় নিউক্লিয়াস থাকলেও পরিণতি লাভের সময় নিউক্লিয়াস, মাইটোকনড্রিয়া ও ER পরিত্যক্ত হয়।
    • সুবিধা ১: কোষের সমস্ত অভ্যন্তরীণ স্থান হিমোগ্লোবিন অণু ($\approx ২৮ কোটি$) দিয়ে পূর্ণ থাকে, ফলে অক্সিজেন ধারণক্ষমতা সর্বাধিক হয়।
    • সুবিধা ২: মাইটোকনড্রিয়া না থাকায় সংবহনকারী RBC নিজে কোনো অক্সিজেন খরচ করে না (অবাত গ্লাইকোলাইসিসে ATP বানায়)।
    • সুবিধা ৩: দ্বি-অবতল গোলীয় হওয়ায় এর ক্ষেত্রফল বাড়ে এবং সরু রক্তজালক ($৪\ \mu\text{m}$) দিয়ে সহজে বাঁকা হয়ে অতিক্রম করতে পারে।
  • স্নায়ুকোষ (Neuron): দীর্ঘ অ্যাক্সন ও শাখান্বিত ডেনড্রন থাকার ফলে দেহের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ মিটার পর্যন্ত তীব্র গতিতে তড়িৎ-রাসায়নিক স্নায়ু সংকেত পাঠাতে পারে।
  • পেশিকোষ (Muscle Cells): অ্যাক্টিন ও মায়োসিন প্রোটিন সমৃদ্ধ পেশিতন্তু দিয়ে গঠিত হওয়ায় দ্রুত সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে প্রাণীর গমন ও অঙ্গ সঞ্চালন ঘটায়।
  • মূলরোম কোষ (Root Hair Cells): মূলের ত্বক থেকে দীর্ঘ সূক্ষ্ম প্রবর্ধক সৃষ্টি করে মাটির কণার সাথে সংস্পর্শ তল বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, ফলে অভিস্রবণের মাধ্যমে সহজে জল শোষিত হয়।
  • জাইলেম ভেসেল ও ট্র্যাকইড: কোষের ভেতরের প্রোটোপ্লাজম নষ্ট হয়ে দীর্ঘ ফাঁপা কাষ্ঠল নলে পরিণত হয়, যা মাটির কয়েক শত ফুট উঁচুতে জল স্তম্ভকে ধরে রেখে ঊর্ধ্বমুখী পরিবহনে সাহায্য করে।

৪.৪ কোষের আকারের জ্যামিতিক সীমা: ক্ষেত্রফল ও আয়তনের অনুপাত ($A/V$)

কেন একটি জীবন্ত কোষ অনির্দিষ্টভাবে বড় হতে পারে না? কেন অধিকাংশ কোষ অণুবীক্ষণযোগ্য হয়? এর মূল ভৌত কারণ হলো কোষের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল ও আয়তনের অনুপাত ($A/V$ Ratio):

যদি একটি গোলকাকার কোষের ব্যাসার্ধ $r$ হয়, তবে:

$$\text{ক্ষেত্রফল } (A) = ৪\pi r^২ \quad \text{এবং} \quad \text{আয়তন } (V) = \frac{৪}{৩}\pi r^৩$$ $$\frac{A}{V} = \frac{৪\pi r^২}{\frac{৪}{৩}\pi r^৩} = \mathbf{\frac{৩}{r}}$$
  • যদি কোষের ব্যাসার্ধ $n$ গুণ বৃদ্ধি পায়:
    • কোষপর্দার পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল (যার মাধ্যমে পুষ্টি ঢোকে ও বর্জ্য বেরোয়) বাড়ে বর্গের হারে: $n^২$।
    • কোষের অভ্যন্তরীণ সাইটোপ্লাজমের আয়তন (যার পুষ্টি দরকার ও বর্জ্য তৈরি হয়) বাড়ে ঘনের হারে: $n^৩$।
  • শারীরবৃত্তীয় সংকট: কোষ অতিরিক্ত বড় হয়ে গেলে তার $A/V$ অনুপাত মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে বাইরের পাতলা পর্দা দিয়ে পুরো বৃহদাকার সাইটোপ্লাজমের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও গ্লুকোজ ব্যাপন প্রক্রিয়ায় সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং বিষাক্ত বর্জ্য জমা হতে থাকে।
  • নিউক্লিও-সাইটোপ্লাজমিক সূচক: একটি নিউক্লিয়াসের নির্দিষ্ট পরিমাণ সাইটোপ্লাজমকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকে। কোষ অতিরিক্ত বড় হলে নিউক্লিয়াস নিয়ন্ত্রণ হারায়। তাই বিপাকীয় ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে কোষ বিভাজিত হয়ে দুটি ক্ষুদ্র কোষে বিভক্ত হয়।

৪.৫ কোষ বিভাজনের মূল ধারা: অ্যামাইটোসিস, মাইটোসিস ও মায়োসিস

কোষ বিভাজন হলো সেই জৈব প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি মাতৃকোষ বিভাজিত হয়ে দুটি বা চারটি অপত্য কোষ সৃষ্টি করে, যা জীবের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ ও প্রজননের মূল চালিকাশক্তি:

  1. অ্যামাইটোসিস (প্রত্যক্ষ বিভাজন): ক্রোমোজোম ও বেমতন্তু গঠন ছাড়াই মাতৃকোষের নিউক্লিয়াসটি সরাসরি মাঝখানে ডাম্বেলের মতো খাঁজ সৃষ্টি করে দুটি ভাগে বিভক্ত হয় এবং পরে সাইটোপ্লাজম বিভক্ত হয়। এককোষী ব্যাকটিরিয়া, ইস্ট ও অ্যামিবার দ্বি-বিভাজনে দেখা যায়।
  2. মাইটোসিস (সমবিভাজন): দেহকোষে (Somatic cells) সংঘটিত পরোক্ষ বিভাজন, যেখানে একটি ডিপ্লয়েড ($2n$) মাতৃকোষের জটিল পরিবর্তনের মাধ্যমে সমগুণ, সমআকার ও সমান সংখ্যক ক্রোমোজোমযুক্ত দুটি ডিপ্লয়েড ($2n$) অপত্য কোষ সৃষ্টি হয়।
    • প্রোফেজ: ক্রোমাটিন জলবিয়োজন ঘটিয়ে স্পষ্ট ক্রোমোজোমে পরিণত হয়; নিউক্লীয় পর্দা ও নিউক্লিওলাস অদৃশ্য হতে থাকে; বেমতন্তু গঠিত হয়।
    • মেটাফেজ: ক্রোমোজোমগুলি কোষের বিষুবীয় বা নিরক্ষীয় অঞ্চলে সজ্জিত হয়; সেন্ট্রোমিয়ারে বেমতন্তু যুক্ত হয়।
    • অ্যানাফেজ: সেন্ট্রোমিয়ার বিভক্ত হয়ে সিস্টার ক্রোমাটিড দুটি পৃথক অপত্য ক্রোমোজোম হিসেবে বিপরীত মেরুর দিকে চলতে থাকে (V, L, J, I আকৃতি)।
    • টেলোফেজ: অপত্য ক্রোমোজোম মেরুতে পৌঁছে জলযোজন ঘটিয়ে পুনরায় ক্রোমাটিন জালিকা গঠন করে; নিউক্লীয় পর্দা ও নিউক্লিওলাস পুনর্গঠিত হয়। এরপর সাইটোকাইনেসিস দ্বারা সাইটোপ্লাজম বিভক্ত হয়।
  3. মায়োসিস (হ্রাস বিভাজন): জনন মাতৃকোষে (গ্যামেট উৎপাদনে) সংঘটিত বিশেষ বিভাজন, যেখানে নিউক্লিয়াস দুবার কিন্তু ক্রোমোজোম মাত্র একবার বিভাজিত হয়ে মাতৃকোষের অর্ধেক সংখ্যক ক্রোমোজোম বিশিষ্ট চারটি হ্যাপ্লয়েড ($n$) অপত্য কোষ তৈরি করে। প্রথম প্রোফেজে ক্রসিং ওভারের মাধ্যমে নতুন জিনগত প্রকরণ সৃষ্টি হয়।

৫. কলার স্তরবিন্যাস ও শারীরিক পদানুক্রম

৫.১ জীবদেহের গঠনগত পদানুক্রম (Structural Hierarchy)

জীবজগতে সরলতম উপাদান থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে জটিলতর রূপ ধারণ করে সামগ্রিক জীবদেহের সৃষ্টি হয়:

উপ-পারমাণবিক কণা $\to$ পরমাণু $\to$ জৈব অণু (DNA, প্রোটিন) $\to$ কোষ অঙ্গাণু $\to$ কোষ $\to$ কলা $\to$ অঙ্গ $\to$ তন্ত্র $\to$ পূর্ণাঙ্গ জীবদেহ

কলার সংজ্ঞা (Tissue): উৎপত্তিগতভাবে এক এবং একই ধরনের বা বিভিন্ন ধরনের কতগুলি কোষ যখন দলবদ্ধ হয়ে কোনো নির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় কার্য সম্পাদন করে, তখন সেই কোষসমষ্টিকে কলা (Tissue) বলে। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে কলার গঠন সংক্রান্ত বিজ্ঞানসম্মত চর্চাকে কলাস্থানবিদ্যা বা হিস্টোলজি (Histology) বলে।

৫.২ উদ্ভিদ কলা: ভাজক কলা (Meristematic Tissues)

বিভাজন ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে উদ্ভিদ কলাকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়: ভাজক কলা এবং স্থায়ী কলা।

ভাজক কলা (Meristematic Tissue): যে কলার অপরিণত কোষগুলি সর্বদা মাইটোসিস পদ্ধতিতে বিভাজিত হয়ে নতুন অপত্য কোষ সৃষ্টি করতে সক্ষম, তাকে ভাজক কলা বলে।
বৈশিষ্ট্য: কোষগুলি আকারে ছোট, সমব্যাসীয়; পাতলা সেলুলোজ প্রাচীরযুক্ত; ঘন সাইটোপ্লাজম ও বড় সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াসযুক্ত; কোনো কোষান্তর রন্ধ্র থাকে না; কোষে ভ্যাকুওল সাধারণত অনুপস্থিত বা অত্যন্ত ছোট; বিপাকীয় হার অত্যন্ত উচ্চ।

অবস্থান অনুসারে ভাজক কলার শ্রেণিবিভাগ:

  • অগ্রস্থ ভাজক কলা (Apical Meristem): মূল ও কাণ্ডের বর্ধনশীল অগ্রভাগে অবস্থিত (Root Apical Meristem ও Shoot Apical Meristem)। কাজ: প্রাথমিক বৃদ্ধির মাধ্যমে উদ্ভিদের দৈর্ঘ্য বা উচ্চতা বৃদ্ধি করা।
  • নিবেশিত ভাজক কলা (Intercalary Meristem): অগ্রস্থ ভাজক কলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্থায়ী কলার মাঝে বিশেষ করে একবীজপত্রী উদ্ভিদের (ঘাস, বাঁশ, আখ) পর্ব ও পর্বমধ্যের গোড়ায় অবস্থান করে। কাজ: পর্বমধ্যের দৈর্ঘ্য দ্রুত বৃদ্ধি করা এবং তৃণভোজী প্রাণীরা অগ্রভাগ খেয়ে ফেললে পুনরায় বৃদ্ধি ঘটানো।
  • পার্শ্বীয় ভাজক কলা (Lateral Meristem): কাণ্ড ও মূলের পার্শ্ব বরাবর অনুদৈর্ঘ্যভাবে বিস্তৃত থাকে (যেমন সংবহন ক্যাম্বিয়াম ও কর্ক ক্যাম্বিয়াম)। কাজ: গৌণ বৃদ্ধির মাধ্যমে উদ্ভিদের বেধ বা পরিধি (Girth / Diameter) বৃদ্ধি করা।

৫.৩ উদ্ভিদ কলা: স্থায়ী কলা (সরল ও জটিল)

স্থায়ী কলা (Permanent Tissue): ভাজক কলা থেকে উৎপন্ন যে কলার কোষগুলি বিভাজন ক্ষমতা হারিয়ে নির্দিষ্ট আকার, আয়তন ও কাজ সম্পাদনে রূপান্তরিত হয়েছে, তাকে স্থায়ী কলা বলে।

ক. সরল স্থায়ী কলা (Simple Permanent Tissues): কেবলমাত্র একই প্রকার কোষ দ্বারা গঠিত কলা:

সরল কলা গঠনগত বৈশিষ্ট্য অবস্থান প্রধান কাজ
প্যারেনকাইমা (Parenchyma) সজীব, পাতলা সেলুলোজ প্রাচীরযুক্ত, সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস ও ভ্যাকুওলযুক্ত, স্পষ্ট কোষান্তর রন্ধ্র বর্তমান। উদ্ভিদের নরম অংশ: কর্টেক্স, মজ্জা, পাতার মেসোফিল কলা। খাদ্য ও জল সঞ্চয়; ক্লোরোপ্লাস্টযুক্ত হলে খাদ্য তৈরি (ক্লোরেনকাইমা); জলজ উদ্ভিদে বাতাসপূর্ণ হলে ভাসিয়ে রাখা (অ্যারেনকাইমা)।
কোলেনকাইমা (Collenchyma) সজীব, দীর্ঘাকার কোষ; কোষের কোণে কোণে পেকটিন ও হেমিসেলুলোজের অসম স্থূলতা থাকে; কোনো কোষান্তর রন্ধ্র থাকে না। দ্বিবীজপত্রী কাণ্ডের ত্বক-অধস্ত্বকে (Hypodermis), পাতার বোঁটায় ও পুষ্পবৃন্তে। নমনীয় যান্ত্রিক দৃঢ়তা প্রদান করা, ফলে প্রবল বাতাসে কাণ্ড বা পাতা না ভেঙে সহজে বেঁকে যেতে পারে; ক্লোরোপ্লাস্ট থাকলে খাদ্য তৈরি।
স্ক্লেরেনকাইমা (Sclerenchyma) পরিণত অবস্থায় মৃত; অত্যন্ত পুরু ও লিগনিনযুক্ত গৌণ প্রাচীর; সংকীর্ণ কোষগহ্বর (Lumen); সাইটোপ্লাজম থাকে না। সংবহন কলার চারপাশে, ফলের কঠিন ত্বক (নাশপাতি), নারকেলের ছোবড়া। উদ্ভিদাঙ্গে চরম যান্ত্রিক দৃঢ়তা ও সুরক্ষা প্রদান করা। রূপভেদ: দীর্ঘ তন্তু বা ফাইবার (পাট, শণ) এবং পাথর কোষ (স্ক্লেরাইড)।

খ. জটিল স্থায়ী কলা (সংবহন কলা - Vascular Tissues): একাধিক ভিন্ন প্রকার কোষ একত্রে একটি দল হিসেবে উদ্ভিদে জল, খনিজ ও খাদ্যের পরিবহন সম্পাদন করে:

  • জাইলেম (Xylem / কাঠ): মূল দ্বারা শোষিত জল ও খনিজ লবণকে কাণ্ডের মাধ্যমে পাতায় ঊর্ধ্বমুখী পরিবহন (Ascent of Sap) ঘটায়। এটি একমুখী পরিবাহী কলা। চারটি উপাদান:
    1. ট্র্যাকইড (Tracheid): মৃত, দীর্ঘ নলাকার কোষ, যার প্রান্তভাগ সরু ও চওড়াভাবে ব্লেডের মতো কাটা; গায়ে কূপযুক্ত লিগনিন প্রাচীর।
    2. ট্রাকিয়া বা ভেসেল (Vessels): মৃত, ফাঁপা পিপের মতো কোষগুলি পরপর প্রান্তদেশে জোড়া লেগে দীর্ঘ পাইপের মতো অবিচ্ছিন্ন নালী তৈরি করে; উন্নত গুপ্তবীজী উদ্ভিদের প্রধান পরিবাহী নল।
    3. জাইলেম প্যারেনকাইমা: জাইলেমের একমাত্র সজীব উপাদান; সেলুলোজ প্রাচীরযুক্ত; খাদ্য সঞ্চয় ও পাশাপাশি জল সংবহনে সাহায্য করে।
    4. জাইলেম তন্তু বা কাষ্ঠ তন্তু: মৃত স্ক্লেরেনকাইমা তন্তু, যা উদ্ভিদাঙ্গে দৃঢ়তা দেয়।
  • ফ্লোয়েম (Phloem / বাস্ট): পাতায় প্রস্তুত দ্রবীভূত জৈব খাদ্যকে (সুক্রোজ) উদ্ভিদের বিভিন্ন সঞ্চয় অঙ্গ ও বর্ধনশীল অঙ্গে উভমুখী বা বহুমুখী পরিবহন ঘটায়। চারটি উপাদান:
    1. সিভনল (Sieve Tube): সজীব, দীর্ঘ নলাকার কোষ যার প্রান্তপ্রাচীর চালুনির মতো ছিদ্রযুক্ত (সিভপ্লেট)। পরিণত অবস্থায় এদের কোনো নিউক্লিয়াস থাকে না, তবুও সঙ্গীকোষের নিয়ন্ত্রণে সজীব থাকে।
    2. সঙ্গীকোষ (Companion Cell): ঘন সাইটোপ্লাজম ও বড় সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াসযুক্ত সজীব প্যারেনকাইমা কোষ, যা প্লাজমোডেসমাটা দ্বারা সিভনলের সাথে যুক্ত থেকে তার কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
    3. ফ্লোয়েম প্যারেনকাইমা: সজীব কোষ; খাদ্য, রজন ও ল্যাটেক্স সঞ্চয় করে (একবীজপত্রীতে অনুপস্থিত)।
    4. ফ্লোয়েম তন্তু বা বাস্ট তন্তু: ফ্লোয়েমের একমাত্র মৃত উপাদান; অত্যন্ত শক্ত ও স্থিতিস্থাপক (বাণিজ্যিক পাট ও শণের আঁশ)।

৫.৪ প্রাণী কলা: আবরণী কলা ও যোগকলা

প্রাণী কলাকে উৎপত্তি, গঠন ও কাজের ওপর ভিত্তি করে ৪টি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়: আবরণী কলা, যোগকলা, পেশিকলা ও স্নায়ুকলা।

  • ১. আবরণী কলা (Epithelial Tissue): যা দেহের বহিরাবরণ গঠন করে এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ও গহ্বরের মুক্ত তলকে আবৃত রাখে।
    • বৈশিষ্ট্য: কোষগুলি একটি নির্জীব কোলাজেন নির্মিত ভিত্তিপর্দা (Basement Membrane)-র ওপর ঘনভাবে সাজানো থাকে; কোষান্তর ধাত্র প্রায় থাকে না বললেই চলে; রক্তজালকহীন (Avascular)।
    • প্রকারভেদ:
      • আইঁশাকার (Squamous): চ্যাপ্টা মেঝের টালির মতো কোষ। ফুসফুসের অ্যালভিওলাই, রক্তজালকের প্রাচীর (এন্ডোথেলিয়াম)-এ ব্যাপনে সাহায্য করে।
      • ঘনকাকার (Cuboidal): কিউব বা ছক্কার মতো কোষ। বৃক্কীয় নালী ও লালাগ্রন্থির নালীতে ক্ষরণ ও শোষণে কাজ করে।
      • স্তম্ভাকার (Columnar): স্তম্ভ বা পিলারের মতো দীর্ঘ কোষ। পাকস্থলী ও অন্ত্রের মিউকোসায় খাদ্য শোষণে কাজ করে।
      • রোমশ বা সিলিয়াযুক্ত (Ciliated): কোষের মুক্ত প্রান্তে সূক্ষ্ম চুলের মতো সিলিয়া থাকে। শ্বাসনালী (Trachea) ও ডিম্বনালীতে মিউকাস বা ডিম্বাণুকে নির্দিষ্ট দিকে চালনা করে।
  • ২. যোগকলা (Connective Tissue): ভূণীয় মেসোডার্ম থেকে উৎপন্ন এবং দেহের বিভিন্ন অঙ্গ ও তন্ত্রের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ, ভারবহন ও সুরক্ষা প্রদানকারী কলা। এতে কোষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম এবং প্রচুর পরিমাণে নির্জীব বহিকোষীয় ধাত্র (Matrix) ও প্রোটিন তন্তু থাকে।
    • প্রকৃত যোগকলা: অ্যারিওলার কলা (বিভিন্ন অঙ্গকে যথাস্থানে ধরে রাখে) এবং মেদকলা বা অ্যাডিপোজ কলা (ত্বকের নিচে চর্বি সঞ্চয় করে তাপ নিরোধক ও শক-অ্যাবজর্বার হিসেবে কাজ করে)। এছাড়া টেন্ডন (পেশিকে অস্থির সাথে যুক্ত করে) এবং লিগামেন্ট (অস্থিকে অস্থির সাথে যুক্ত করে)।
    • কঙ্কাল যোগকলা (Skeletal Tissue):
      • অস্থি (Bone): কঠিন, অনমনীয়, রক্তজালকপূর্ণ কঙ্কাল কলা। এর ধাত্র ওসিন প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম ফসফেট সমৃদ্ধ শক্ত হেভারসিয়ান তন্ত্র গঠন করে, যাতে সজীব অস্থিকোষ বা অস্টিওসাইট থাকে।
      • তরুণাস্থি (Cartilage): স্থিতিস্থাপক, নমনীয় ও রক্তজালকহীন কলা। এর কনড্রিন ধাত্রের ল্যাকুনায় সজীব তরুণাস্থিকোষ বা কনড্রোসাইট থাকে। অবস্থান: কানের লতি, নাকের ডগা, শ্বাসনালীর বলয়।
    • সংবহন বা তরল যোগকলা (Fluid Connective Tissue):
      • রক্ত (Blood): তরল ধাত্র বা রক্তরস (Plasma, ৫৫%) এবং তাতে ভাসমান রক্তকণিকা (৪৫%) নিয়ে গঠিত। লোহিত রক্তকণিকা (RBC, $O_2$ ও $CO_2$ পরিবহন), শ্বেত রক্তকণিকা (WBC, ফ্যাগোসাইটোসিস ও অ্যান্টিবডি তৈরি করে রোগ প্রতিরোধ) এবং অণুচক্রিকা (Platelets, রক্ত তঞ্চন ঘটায়)।
      • লসিকা (Lymph): রক্তজালক থেকে পরিশ্রুত ঈষৎ হলুদ স্বচ্ছ তরল, যাতে RBC থাকে না, প্রচুর লিম্ফোসাইট থাকে; এটি কলাকোষে পুষ্টি যোগায় ও ফ্যাট পরিবহন করে।

৫.৫ প্রাণী কলা: পেশিকলা ও স্নায়ুকলা

  • ৩. পেশিকলা (Muscular Tissue): ভ্রূণীয় মেসোডার্ম থেকে উৎপন্ন সংকোচন-প্রসারণশীল দীর্ঘায়িত পেশিতন্তু দ্বারা গঠিত কলা, যা দেহের গতি ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গের সঞ্চালন ঘটায়।
    তুলনার বিষয় রেখিত বা কঙ্কাল পেশি (ঐচ্ছিক পেশি) অরেখিত বা মসৃণ পেশি (অনৈচ্ছিক পেশি) হৃৎপেশি (Cardiac Muscle)
    আকার ও বিন্যাস দীর্ঘ, নলাকার, শাখাহীন তন্তু। ক্ষুদ্র, মাকু আকৃতির তন্তু (দুই প্রান্ত সূঁচালো)। স্বল্পদৈর্ঘ্য, নলাকার, শাখান্বিত তন্তুর জালক।
    রেখা বা দাগ স্পষ্ট অনুপ্রস্থ গাঢ় ও হালকা রেখা (স্ট্রায়েশন) থাকে। কোনো রেখা থাকে না; মসৃণ রূপ। অস্পষ্ট রেখা এবং বিশেষ ইন্টারক্যালেটেড ডিস্ক থাকে।
    নিউক্লিয়াসের অবস্থা বহু-নিউক্লিয়াসযুক্ত (Syncytial); পরিধিতে অবস্থিত। এক-নিউক্লিয়াসযুক্ত; কেন্দ্রে অবস্থিত। এক বা দ্বি-নিউক্লিয়াসযুক্ত; কেন্দ্রে অবস্থিত।
    নিয়ন্ত্রণ ও ক্রিয়া ঐচ্ছিক (প্রাণীর ইচ্ছাধীন নিয়ন্ত্রিত)। অনৈচ্ছিক (স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত)। অনৈচ্ছিক (মায়োজেনিক; নিজস্ব পেসমেকার নিয়ন্ত্রিত)।
    ক্লান্তি তীব্র গতিতে সংকুচিত হয়; দ্রুত ক্লান্ত হয় (ল্যাকটিক অ্যাসিড জমে)। ধীর গতিতে ছন্দবদ্ধভাবে সংকুচিত হয়; সহজে ক্লান্ত হয় না। বিরামহীন ছন্দবদ্ধ দ্রুত সংকোচন; কখনোই ক্লান্ত হয় না।
    অবস্থান অস্থির সাথে যুক্ত: হাত, পা, ঘাড়, জিহ্বা। অভ্যন্তরীণ অঙ্গের প্রাচীর: পাকস্থলী, অন্ত্র, রক্তনালী, মূত্রাশয়। কেবলমাত্র হৃৎপিণ্ডের প্রাচীরে (Myocardium)।
  • ৪. স্নায়ুকলা (Nervous Tissue): ভ্রূণীয় এক্টোডার্ম থেকে উৎপন্ন পরিবেশ থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ এবং তাকে স্নায়ুস্পন্দনের মাধ্যমে দ্রুত সংবাহিত করার কাজে বিশেষায়িত কলা। দুটি উপাদান:
    1. নিউরোন বা স্নায়ুকোষ (Neuron): স্নায়ুতন্ত্রের গঠনগত ও কার্যগত একক। এটি গঠিত হয়:
      • কোষদেহ (Cyton): গোলাকার বা তারকাকার অংশ, যাতে নিউক্লিয়াস, নিউরোপ্লাজম এবং প্রোটিন সংশ্লেষকারী নিসল দানা (Nissl's granules) থাকে। সেন্ট্রোজোম নিষ্ক্রিয় থাকায় পরিণত নিউরোন বিভাজিত হতে পারে না।
      • ডেনড্রন (Dendron): কোষদেহ থেকে নির্গত ক্ষুদ্র শাখান্বিত শাখা-প্রশাখা (ডেনড্রাইট), যা পূর্ববর্তী নিউরোন বা গ্রাহক থেকে উদ্দীপনা গ্রহণ করে কোষদেহে পাঠায় (অন্তর্মুখী বা সেন্সরি)।
      • অ্যাক্সন (Axon): কোষদেহ থেকে উৎপন্ন একটিমাত্র দীর্ঘতম সিলিন্ডারের মতো প্রবর্ধক। এটি মায়েলিন আবরণী দ্বারা আবৃত থাকে এবং নিয়মিত ব্যবধানে র‍্যানভিয়ারের পর্ব (Nodes of Ranvier) থাকে যা দ্রুত লম্ফন পরিবহনে সাহায্য করে। অ্যাক্সনের প্রান্তভাগ শাখান্বিত হয়ে প্রান্তবুরুশ গঠন করে যার শেষ প্রান্তে থাকা সাইন্যাপটিক নব থেকে নিউরোট্রান্সমিটার (যেমন অ্যাসিটাইলকোলিন) ক্ষরিত হয়। অ্যাক্সন উদ্দীপনাকে কোষদেহ থেকে দূরে নিয়ে যায় (বহির্মুখী বা মোটর)।
    2. নিউরোগ্লিয়া (Neuroglia): স্নায়ুতন্ত্রের অ-স্নায়বিক ধারক কোষ, যা নিউরোনকে পুষ্টি যোগায়, সুরক্ষা দেয় ও জীবাণু ধ্বংস করে (যেমন অ্যাস্ট্রোসাইট, মাইক্রোগ্লিয়া, সোয়ান কোষ)। মস্তিষ্কের ৫০%-এরও বেশি অংশ নিউরোগ্লিয়া এবং এরা সারাজীবন বিভাজিত হতে সক্ষম।

গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সমীকরণ, বিক্রিয়া ও সূত্র

কোষতত্ত্ব ও ভিরশাও-এর মূল নীতি
Omnis cellula e cellula (Virchow, 1855)
সমস্ত জীবদেহ কোষ দ্বারা নির্মিত; পূর্ববর্তী জীবন্ত কোষের বিভাজনের মাধ্যমেই নতুন কোষের সৃষ্টি হয়।
যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মোট বিবর্ধন সূত্র
M_মোট = M_আইপিস × M_অবজেক্টিভ
যৌগিক অণুবীক্ষণের মোট বিবর্ধন হলো আইপিস লেন্সের বিবর্ধন এবং অবজেক্টিভ লেন্সের বিবর্ধনের গুণফল।
অণুবীক্ষণ যন্ত্রের বিশ্লেষণ সীমা (রেলে নীতি)
d = (০.৬১ · λ) / NA
বিশ্লেষণ দূরত্ব (d) আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (λ) সমানুপাতিক। ইলেকট্রন রশ্মির λ অতি ক্ষুদ্র হওয়ায় এর বিশ্লেষণ ক্ষমতা অসাধারণ।
গোলকাকার কোষের ক্ষেত্রফল ও আয়তনের অনুপাত
A / V = (৪πr²) / (৪/৩ πr³) = ৩ / r
কোষের ব্যাসার্ধ (r) বাড়লে ক্ষেত্রফল ও আয়তনের অনুপাত ৩/r হারে হ্রাস পায়, যা কোষের আকারের প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করে।
উদ্ভিদকোষের রসস্ফীতি ও অভিস্রবণীয় ভারসাম্য
DPD = OP - TP (বা Ψw = Ψs + Ψp)
ব্যাপন চাপ ঘাটতি (DPD) = অভিস্রবণ চাপ (OP) - রসস্ফীতি চাপ (TP)। পূর্ণ স্ফীত অবস্থায় TP = OP হওয়ায় কোষে অতিরিক্ত জল প্রবেশ বন্ধ হয়।
সবাত শ্বসন ও ATP উৎপাদনের সামগ্রিক সমীকরণ
C₆H₁₂O₆ + 6O₂ → 6CO₂ + 6H₂O + ৩৬-৩৮ ATP
মাইটোকনড্রিয়ায় গ্লুকোজ জারিত হয়ে সার্বজনীন জৈব শক্তি মুদ্রা হিসেবে ৩৬ থেকে ৩৮ অণু ATP সংশ্লেষিত হয়।
পারঅক্সিজোমে ক্যাটালিজ উৎসেচকের বিষমুক্তকরণ
২H₂O₂ —(Catalase)→ ২H₂O + O₂
পারঅক্সিজোমে থাকা ক্যাটালিজ কোষের বিষাক্ত হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডকে জল ও অক্সিজেনে ভেঙে নিরাপদ করে।
নিউক্লিও-সাইটোপ্লাজমিক সূচক (Kernplasma Ratio)
NP = Vn / (Vc - Vn)
নিউক্লিয়াসের আয়তন (Vn) এবং কার্যকর সাইটোপ্লাজমের আয়তনের (Vc - Vn) অনুপাত। এই সূচক কমে গেলে কোষ বিভাজিত হতে বাধ্য হয়।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
একটি ছাত্র যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ১০× আইপিস এবং ৪০× হাই-পাওয়ার অবজেক্টিভ লেন্স ব্যবহার করে একটি পেঁয়াজের শল্কপত্রের কোষ পর্যবেক্ষণ করল। মোট বিবর্ধন কত? যদি অণুবীক্ষণে গঠিত প্রতিবিম্বের আপাত দৈর্ঘ্য ৮.০ মিমি মাপা হয়, তবে কোষটির প্রকৃত আণুবীক্ষণিক দৈর্ঘ্য মাইক্রোমিটারে (µm) নির্ণয় করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ধাপ ১: মোট বিবর্ধন ক্ষমতা ($M_{\text{মোট}}$) নির্ণয়:

$$M_{\text{মোট}} = M_{\text{আইপিস}} \times M_{\text{অবজেক্টিভ}} = ১০ \times ৪০ = \mathbf{৪০০\times}$$

ধাপ ২: প্রতিবিম্বের আকার থেকে কোষের প্রকৃত আকার নির্ণয়:

$$\text{প্রকৃত আকার} = \frac{\text{প্রতিবিম্বের আপাত আকার}}{M_{\text{মোট}}}$$ $$\text{প্রতিবিম্বের আকার} = ৮.০\text{ মিমি} = ৮.০ \times ১,০০০\ \mu\text{m} = ৮,০০০\ \mu\text{m}$$ $$\text{প্রকৃত আকার} = \frac{৮,০০০\ \mu\text{m}}{৪০০} = \mathbf{২০\ \mu\text{m}}$$

উত্তর: অণুবীক্ষণ যন্ত্রে কোষটি ৪০০ গুণ বিবর্ধিত হয়েছে এবং পেঁয়াজের কোষটির প্রকৃত দৈর্ঘ্য হলো $২০\ \mu\text{m}$ (বা ০.০২ মিমি)।

উদাহরণ 2
বিশুদ্ধ পাতিত জলে (০% লবণ) নিমজ্জিত করলে: (ক) মানুষের লোহিত রক্তকণিকা (RBC), এবং (খ) পেঁয়াজের ত্বকের কোষে কী ঘটবে? তাদের ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার কারণ ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

(ক) পাতিত জলে লোহিত রক্তকণিকার প্রতিক্রিয়া:

পাতিত জল হলো লোহিত রক্তকণিকার সাইটোপ্লাজমের (০.৯% সমতুল্য) তুলনায় তীব্র অল্পসারী দ্রবণ (Hypotonic medium)। ফলে অন্তঃঅভিস্রবণ (Endosmosis) প্রক্রিয়ায় দ্রুত জল RBC-র ভেতরে প্রবেশ করে। প্রাণীকোষে কোনো শক্ত কোষপ্রাচীর না থাকায় অতিরিক্ত জলের চাপে পাতলা প্লাজমামেমব্রেন ফেটে যায়, যাকে হিমোলাইসিস (Hemolysis) বলে।

(খ) পাতিত জলে পেঁয়াজের ত্বকের কোষের প্রতিক্রিয়া:

অন্তঃঅভিস্রবণের মাধ্যমে জল কোষে প্রবেশ করে কেন্দ্রীয় ভ্যাকুওলকে পূর্ণ করে এবং ভেতরের দিক থেকে কোষপ্রাচীরের ওপর রসস্ফীতি চাপ ($TP$) প্রয়োগ করে। কিন্তু উদ্ভিদকোষে সেলুলোজ নির্মিত শক্ত, স্থিতিস্থাপক কোষপ্রাচীর থাকায় তা সমান ও বিপরীতমুখী প্রাচীর চাপ ($WP$) দেয়। যখন $TP = WP$ হয়, অতিরিক্ত জল ঢোকা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে উদ্ভিদকোষটি ফুলে টানটান ও স্ফীত হয়, কিন্তু কখনোই ফাটে না।

মূল সিদ্ধান্ত: সেলুলোজ কোষপ্রাচীরের উপস্থিতির কারণেই উদ্ভিদকোষ অল্পসারী দ্রবণে ফেটে যাওয়া থেকে সুরক্ষিত থাকে।

উদাহরণ 3
একটি গোলাকার ব্যাকটিরিয়ার ব্যাসার্ধ r₁ = ১ µm এবং একটি অতিকায় অপত্য কোষের ব্যাসার্ধ r₂ = ১০ µm। উভয়ের পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল ও আয়তনের অনুপাত (A/V) নির্ণয় করে তুলনা করো। কেন সরল ব্যাপনের মাধ্যমে অতিকায় কোষটি বেঁচে থাকতে পারে না?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ধাপ ১: গোলকাকার কোষের ক্ষেত্রফল ও আয়তনের অনুপাতের সূত্র:

$$\frac{A}{V} = \frac{৪\pi r^২}{\frac{৪}{৩}\pi r^৩} = \frac{৩}{r}$$

ধাপ ২: ব্যাকটিরিয়ার ক্ষেত্রে ($r_১ = ১\ \mu\text{m}$):

$$\left(\frac{A}{V}\right)_১ = \frac{৩}{১\ \mu\text{m}} = \mathbf{৩\ \mu\text{m}^{-১}}$$

ধাপ ৩: অতিকায় কোষের ক্ষেত্রে ($r_২ = ১০\ \mu\text{m}$):

$$\left(\frac{A}{V}\right)_২ = \frac{৩}{১০\ \mu\text{m}} = \mathbf{০.৩\ \mu\text{m}^{-১}}$$

শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যা:

ছোট ব্যাকটিরিয়াটির $A/V$ অনুপাত বড় কোষটির চেয়ে ১০ গুণ বেশি। বড় কোষটিতে ব্যাসার্ধ ১০ গুণ বাড়ায় পুষ্টি ও বর্জ্যের বিপাকীয় চাহিদা (আয়তন) বেড়েছে $১০^৩ = ১,০০০$ গুণ, কিন্তু কোষপর্দার গ্রহণকারী তল (ক্ষেত্রফল) বেড়েছে মাত্র $১০^২ = ১০০$ গুণ। ফলে কোষপর্দা ভেদ করে বাইরের অক্সিজেন ও খাদ্য ব্যাপনের মাধ্যমে ১০ মাইক্রোমিটার গভীরের সাইটোপ্লাজমে সময়মতো পৌঁছাতে পারবে না এবং কোষটি অনাহারে ও বিষাক্ত বর্জ্যে মারা যাবে। এজন্যই কোষকে আণুবীক্ষণিক হতে হয়।

উদাহরণ 4
৫টি প্রধান কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে প্রোক্যারিওটিক কোষ ও ইউক্যারিওটিক কোষের মধ্যে একটি স্পষ্ট তুলনামূলক সারণি তৈরি করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য প্রোক্যারিওটিক কোষ (আদিকোষ) ইউক্যারিওটিক কোষ (প্রকৃত কোষ)
১. নিউক্লিয়াসের সংগঠন অনগ্রসর; নিউক্লীয় পর্দা ও নিউক্লিওলাসবিহীন নগ্ন DNA নিয়ে গঠিত নিউক্লয়েড থাকে। সুগঠিত; দ্বিস্তরীয় নিউক্লীয় পর্দা, নিউক্লিওপ্লাজম ও নিউক্লিওলাসযুক্ত আদর্শ নিউক্লিয়াস থাকে।
২. হিস্টোন প্রোটিন অনুপস্থিত; DNA নগ্ন অবস্থায় থাকে। উপস্থিত; ক্ষারীয় হিস্টোন প্রোটিন ও DNA মিলে ক্রোমোজোম গঠিত হয়।
৩. পর্দাবৃত অঙ্গাণু সম্পূর্ণ অনুপস্থিত (মাইটোকনড্রিয়া, প্লাস্টিড, ER, গলগি নেই)। সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত (মাইটোকনড্রিয়া, প্লাস্টিড, ER, গলগি বডি ইত্যাদি বর্তমান)।
৪. রাইবোজোম প্রকার ক্ষুদ্র 70S প্রকৃতির (উপ-একক: 50S + 30S)। সাইটোপ্লাজমে 80S (উপ-একক: 60S + 40S); অঙ্গাণুর ভেতরে 70S থাকে।
৫. কোষ বিভাজন প্রত্যক্ষ বিভাজন বা অ্যামাইটোসিস (বেমতন্তু গঠিত হয় না)। মাইটোসিস বা মায়োসিস পদ্ধতিতে পরোক্ষ বিভাজন (বেমতন্তু গঠিত হয়)।
উদাহরণ 5
৫টি প্রধান বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে উদ্ভিদকোষ ও প্রাণীকোষের মধ্যে একটি স্পষ্ট তুলনামূলক সারণি রচনা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য উদ্ভিদকোষ (Plant Cell) প্রাণীকোষ (Animal Cell)
১. কোষপ্রাচীর কোষপর্দার বাইরে সেলুলোজ নির্মিত শক্ত কোষপ্রাচীর উপস্থিত। কোষপ্রাচীর অনুপস্থিত; কেবল নমনীয় কোষপর্দা থাকে।
২. প্লাস্টিড উপস্থিত (ক্লোরোপ্লাস্ট, ক্রোমোপ্লাস্ট, লিউকোপ্লাস্ট)। সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
৩. সেন্ট্রোজোম ও সেন্ট্রিওল উন্নত উদ্ভিদে অনুপস্থিত (অ্যান্যাস্ট্রাল বেম গঠিত হয়)। নিউক্লিয়াসের কাছে উপস্থিত; কোষ বিভাজনে অ্যাস্টার রশ্মি তৈরি করে।
৪. ভ্যাকুওল কোষের কেন্দ্রে একটি স্থায়ী সুবিশাল ভ্যাকুওল থাকে (৭০-৯০% স্থান জুড়ে)। ভ্যাকুওল সাধারণত অনুপস্থিত অথবা অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও অস্থায়ী।
৫. সাইটোকাইনেসিস কোষের কেন্দ্র থেকে পরিধির দিকে কোষপাত (Cell plate) গঠনের মাধ্যমে ঘটে। পরিধি থেকে ভেতরের দিকে কোষপর্দার খাঁজ সৃষ্টি (Furrowing) দ্বারা ঘটে।
উদাহরণ 6
একটি উদ্ভিদের হিস্টোলজিক্যাল ছেদ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল যে, তার দীর্ঘাকার সজীব কোষগুলির কোণে কোণে পেকটিনের অসম স্থূলতা রয়েছে এবং কোনো কোষান্তর রন্ধ্র নেই। কলাটি শনাক্ত করো, উদ্ভিদে এর যান্ত্রিক গুরুত্ব লেখো এবং স্ক্লেরেনকাইমার সাথে এর পার্থক্য নির্দেশ করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. কলা শনাক্তকরণ: বর্ণিত কলাটি হলো কোলেনকাইমা (Collenchyma), যা উদ্ভিদের একটি সরল সজীব যান্ত্রিক স্থায়ী কলা।

২. যান্ত্রিক গুরুত্ব: কোলেনকাইমা উদ্ভিদের বর্ধনশীল নরম অঙ্গকে (যেমন কচি কাণ্ড, পাতার বোঁটা ও পুষ্পবৃন্ত) নমনীয় যান্ত্রিক দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতা প্রদান করে। এর ফলে প্রবল বাতাসের ঝাপটায় পাতা বা কাণ্ড মচকে বা ভেঙে না গিয়ে নিরাপদে দুলতে পারে।

৩. স্ক্লেরেনকাইমার সাথে পার্থক্য:

  • সজীবতা: কোলেনকাইমা পরিণত অবস্থায় সজীব এবং এতে সাইটোপ্লাজম ও ভ্যাকুওল থাকে। অপরদিকে স্ক্লেরেনকাইমা পরিণত অবস্থায় মৃত এবং কোনো জীবন্ত প্রোটোপ্লাজম থাকে না।
  • প্রাচীরের উপাদান: কোলেনকাইমার প্রাচীরের কোণে পেকটিন ও হেমিসেলুলোজের অসম স্থূলতা থাকে এবং তা নমনীয়। কিন্তু স্ক্লেরেনকাইমার প্রাচীর পুরু ও অপ্রবেশ্য লিগনিন দ্বারা দৃঢ়ীভূত হওয়ায় অত্যন্ত শক্ত ও অনমনীয় হয়।
উদাহরণ 7
৪.০ মোল গ্লুকোজের সম্পূর্ণ সবাত জারণের ফলে মোট কত অণু ATP উৎপন্ন হবে (প্রতি মোল গ্লুকোজে ৩৮ ATP ধরে)? কোষে ক্রেবস চক্র এবং অক্সিডেটিভ ফসফোরাইলেশন কোথায় সংঘটিত হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ধাপ ১: সবাত শ্বসনের স্টয়কিওমেট্রি সমীকরণ:

$$\text{C}_৬\text{H}_{১২}\text{O}_৬ + ৬\text{O}_২ \to ৬\text{CO}_২ + ৬\text{H}_২\text{O} + ৩৮\text{ ATP}$$

১ মোল গ্লুকোজের সম্পূর্ণ সবাত জারণে $৩৮\text{ মোল ATP}$ তৈরি হয়।

ধাপ ২: ৪.০ মোলের জন্য গণনা:

$$\text{মোট ATP} = ৪.০ \times ৩৮ = \mathbf{১৫২\text{ মোল ATP}}$$

ধাপ ৩: কোষীয় সংঘটন স্থান:

  • ক্রেবস চক্র (Krebs Cycle): মাইটোকনড্রিয়ার অভ্যন্তরীণ দানাদার ধাত্রে (Matrix) সংঘটিত হয়।
  • অক্সিডেটিভ ফসফোরাইলেশন ও ইলেকট্রন পরিবহন শৃঙ্খল (ETC): মাইটোকনড্রিয়ার ভাঁজযুক্ত অন্তঃপর্দার ক্রিস্টি (Cristae) এবং $F_০-F_১$ এটিপি সিন্থেজ কণিকায় ঘটে।
উদাহরণ 8
একটি পরিণত মানব লোহিত রক্তকণিকায় (RBC) কেন নিউক্লিয়াস, মাইটোকনড্রিয়া ও এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা থাকে না? এই চরম কাঠামোগত বিশেষায়নের ৩টি সুস্পষ্ট শারীরবৃত্তীয় সুবিধা বিশ্লেষণ করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

মানব অস্থিমজ্জায় লোহিত রক্তকণিকার পরিণতি প্রাপ্তির (Erythropoiesis) সময় কোষটি পরিকল্পিতভাবে তার নিউক্লিয়াস, মাইটোকনড্রিয়া, গলগি বডি ও ER বর্জন করে। এই বিশেষায়নের তিনটি যুগান্তকারী শারীরবৃত্তীয় সুবিধা হলো:

  1. হিমোগ্লোবিন ধারণক্ষমতা সর্বোচ্চকরণ: নিউক্লিয়াস ও বৃহৎ অঙ্গাণু না থাকায় কোষের অভ্যন্তরের ৯০-৯৫% স্থান প্রায় ২৮ কোটি হিমোগ্লোবিন অণু দ্বারা পূর্ণ থাকে, যা রক্তে অক্সিজেন বহন ক্ষমতা চরম মাত্রায় বৃদ্ধি করে।
  2. অক্সিজেনের অপচয় রোধ: মাইটোকনড্রিয়া সবাত শ্বসনে অক্সিজেন ব্যবহার করে। মাইটোকনড্রিয়া না থাকায় RBC নিজে অবাত গ্লাইকোলাইসিসে শক্তি পায় এবং ফুসফুস থেকে গৃহীত অক্সিজেনের ১০০%-ই অক্ষত অবস্থায় দূরবর্তী কলাকোষে পৌঁছে দিতে পারে।
  3. দ্বি-অবতল নমনীয়তা ও দ্রুত ব্যাপন: নিউক্লিয়াস না থাকায় কোষটি মাঝখানে অবতল হয়ে দ্বি-অবতল চাকতির রূপ নেয়। এতে ক্ষেত্রফল ও আয়তনের অনুপাত বৃদ্ধি পেয়ে দ্রুত গ্যাসীয় বিনিময় ঘটে এবং সরু রক্তজালকের ($৪\ \mu\text{m}$) মধ্য দিয়ে বেঁকে সহজে চলাচল করতে পারে।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

রবার্ট হুককে সজীব কোষের আবিষ্কারক হিসেবে চিহ্নিত করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

রবার্ট হুক (১৬৬৫) কর্কের মৃত, ফাঁপা সেলুলোজ কোষপ্রাচীর দেখেছিলেন। লিউয়েনহুক (১৬৭৪) প্রথম সচল সজীব কোষ (ব্যাকটিরিয়া, প্রোটোজোয়া) প্রত্যক্ষ করেন।

সাধারণ ভুল ধারণা

কোষপ্রাচীর ও কোষপর্দার ভেদ্যতার প্রকৃতি গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

উদ্ভিদ কোষপ্রাচীর নির্জীব এবং জল ও দ্রাবের জন্য সম্পূর্ণ মুক্ত বা সম্পূর্ণ ভেদ্য। কেবল সজীব কোষপর্দা হলো প্রভেদক ভেদ্য (Selectively Permeable)।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভাইরাসের দ্বারা রোগ সৃষ্টির কারণে তাকে কোষীয় জীব মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ভাইরাস হলো অকোষীয় (Acellular) জীব ও নির্জীবের মধ্যবর্তী জৈব সত্তা; এতে সাইটোপ্লাজম ও কোষপর্দা নেই। এটি কোষতত্ত্বের মূল ব্যতিক্রম।

সাধারণ ভুল ধারণা

ক্লোরোপ্লাস্ট ও মাইটোকনড্রিয়াকে পরস্পরের বিকল্প মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

উদ্ভিদকোষে ক্লোরোপ্লাস্ট ও মাইটোকনড্রিয়া উভয়ই থাকে। ক্লোরোপ্লাস্ট সূর্যালোক দিয়ে গ্লুকোজ বানায়, আর মাইটোকনড্রিয়া দিন-রাত সেই গ্লুকোজ পুড়িয়ে ATP শক্তি উৎপন্ন করে।

সাধারণ ভুল ধারণা

উভয় অঙ্গাণুর নামের মিলের কারণে তাদের শারীরবৃত্তীয় ভূমিকা অদলবদল করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

রাইবোজোম হলো পর্দাবিহীন কণা যা প্রোটিন সংশ্লেষ করে। লাইসোজোম হলো পর্দাঘেরা থলি যাতে পরিপাককারী অ্যাসিড উৎসেচক থাকে যা কোষের স্বগ্রাস ঘটায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

প্রাণীকোষের মতো উন্নত উদ্ভিদকোষেও সেন্ট্রিওল দ্বারা বেমতন্তু গঠন ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

গুপ্তবীজী ও ব্যক্তবীজী উন্নত উদ্ভিদকোষে সেন্ট্রোজোম ও সেন্ট্রিওল থাকে না। তাদের বেমতন্তু মাইক্রোটিউবিউল কেন্দ্র থেকে অ্যান্যাস্ট্রাল পদ্ধতিতে তৈরি হয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

রক্তের তরল প্রকৃতির কারণে তাকে কলা হিসেবে শনাক্ত না করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

রক্ত হলো ভ্রূণীয় মেসোডার্ম থেকে উৎপন্ন একটি বিশেষায়িত তরল সংবহন যোগকলা (Fluid Connective Tissue), যার তরল ধাত্রে রক্তকণিকা ভাসমান থাকে।

দেহের গঠন — ৪-চতুর্ভুজ কনসেপ্ট ম্যাপ (Vector Concept Map)

🔬 ১. কোষের আবিষ্কার ও অণুবীক্ষণ হুক • কোষতত্ত্ব • আকার ও আকৃতির বৈচিত্র্য • রবার্ট হুক (১৬৬৫): কর্কে প্রথম মৃত প্রকোষ্ঠ প্রত্যক্ষ • লিউয়েনহুক: প্রথম সচল মুক্ত সজীব কোষ ও জীবাণু পর্যবেক্ষণ • কোষতত্ত্ব: স্লাইডেন, সোয়ান ও রুডলফ ভিরশাও (১৮৫৫) • অণুবীক্ষণ: যৌগিক আলোক (২০০০×) বনাম ইলেকট্রন (৫ লক্ষ×) • আকার বিস্তার: মাইকোপ্লাজমা (০.১ µm) থেকে উটপাখির ডিম (১৭ সেমি) • আকৃতি: দ্বি-অবতল লোহিত কণিকা, শাখান্বিত স্নায়ুকোষ 🛡️ ২. কোষের আবরণী ও প্রোটোপ্লাজম কোষপ্রাচীর • ফ্লুইড মোজাইক পর্দা • অভিস্রবণ • কোষপ্রাচীর: সেলুলোজ কাঠামো, মধ্যপর্দা ও প্লাজমোডেসমাটা • কোষপর্দা: ফসফোলিপিড দ্বিস্তর ও প্রোটিনের মোজাইক সজ্জা • প্রভেদক ভেদ্য পর্দা: নির্বাচিত আয়ন ও দ্রাবকের পরিগমন • অভিস্রবণ ও প্লাজমোলাইসিস: আইসো, হাইপো ও হাইপারটনিক দ্রবণ • স্ফীতি ও প্রাচীর চাপ: উদ্ভিদাঙ্গের দৃঢ়তা ও রসস্ফীতি সংরক্ষণ • প্রোটোপ্লাজম = সাইটোপ্লাজম (সল-জেল দশা) + নিউক্লিওপ্লাজম ⚙️ ৩. কোষ অঙ্গাণু ও শ্রমবণ্টন নিউক্লিয়াস • মাইটোকনড্রিয়া • প্লাস্টিড • এন্ডোমেমব্রেন • নিউক্লিয়াস: পর্দা, রস, জালিকা ও নিউক্লিওলাস (নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র) • মাইটোকনড্রিয়া: দ্বিপর্দা, ক্রিস্টি, F0-F1 দানা, ATP শক্তিঘর • প্লাস্টিড: ক্লোরোপ্লাস্ট (গ্রানা/স্ট্রোমা), ক্রোমোপ্লাস্ট ও লিউকোপ্লাস্ট • এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা: অমসৃণ RER (প্রোটিন) ও মসৃণ SER (লিপিড) • গলগি বডি: প্যাকেজিং, নিঃসরণ ও লাইসোজোম গঠন (ট্রাফিক পুলিশ) • লাইসোজোম (আত্মঘাতী থলি) ও রাইবোজোম (প্রোটিন কারখানা) 🌿 ৪. কোষের প্রকারভেদ ও কলার স্তরবিন্যাস প্রোক্যারিওট/ইউক্যারিওট • উদ্ভিদ/প্রাণী • কলাবিন্যাস • প্রোক্যারিওট (নিউক্লয়েড, 70S) বনাম ইউক্যারিওট (আদর্শ নিউক্লিয়াস, 80S) • উদ্ভিদ ও প্রাণী কোষ: কোষপ্রাচীর, প্লাস্টিড, ভ্যাকুওল ও সেন্ট্রোজোম • সাংগঠনিক স্তর: অঙ্গাণু → কোষ → কলা → অঙ্গ → তন্ত্র → জীবদেহ • উদ্ভিদ কলা: ভাজক কলা (বৃদ্ধি) ও স্থায়ী কলা (জাইলেম ও ফ্লোয়েম) • প্রাণী কলা: আবরণী কলা, যোগকলা, পেশিকলা ও স্নায়ুকলা • সেন্ট্রিওল: প্রাণী কোষে কোষ বিভাজনের বেমতন্তু সংগঠন WBBSE অষ্টম শ্রেণি দেহের গঠন কোষীয় গঠন ও কলা

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
কোষ হলো সমস্ত সজীব বস্তুর গঠনগত, কার্যগত ও জৈবিক মৌলিক একক; রবার্ট হুক (১৬৬৫) কর্কে মৃত কোষপ্রাচীর এবং লিউয়েনহুক (১৬৭৪) প্রথম সজীব মুক্ত কোষ প্রত্যক্ষ করেন।
মূল বিষয় 2
স্লাইডেন ও সোয়ান (১৮৩৮-১৮৩৯) প্রণীত এবং রুডলফ ভিরশাও (১৮৫৫, Omnis cellula e cellula) সম্প্রসারিত কোষতত্ত্ব অনুযায়ী সমস্ত জীবদেহ পূর্ববর্তী কোষ বিভাজনের মাধ্যমে সৃষ্ট কোষ দিয়ে তৈরি।
মূল বিষয় 3
কোষের বহিঃআবরণীর মধ্যে উদ্ভিদের কোষপ্রাচীর নির্জীব ও সম্পূর্ণ মুক্ত ভেদ্য; প্লাজমামেমব্রেন সজীব এবং ফসফোলিপিড-প্রোটিনের ফ্লুইড মোজাইক মডেল অনুযায়ী প্রভেদক ভেদ্য।
মূল বিষয় 4
ঝিল্লি পরিবহন সাধারণ ব্যাপন, অভিস্রবণ (অল্পসারীতে রসস্ফীতি, অতিসারীতে প্লাজমোলাইসিস), শক্তিচালিত সক্রিয় পরিবহন এবং বৃহৎ কণা গ্রহণ (ফ্যাগোসাইটোসিস) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
মূল বিষয় 5
কোষ অঙ্গাণুসমূহে শ্রমবণ্টন দৃশ্যমান: নিউক্লিয়াস (নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র), মাইটোকনড্রিয়া (ATP শক্তিঘর), প্লাস্টিড (ক্লোরোপ্লাস্ট খাদ্য কারখানা), ER (প্রোটিন/লিপিড), গলগি বডি (প্যাকেজিং/ক্ষরণ), লাইসোজোম (আত্মঘাতী থলি) ও রাইবোজোম (প্রোটিন কারখানা)।
মূল বিষয় 6
প্রোক্যারিওটিক কোষে (ব্যাকটিরিয়া) নিউক্লীয় পর্দা ও পর্দাবৃত অঙ্গাণু অনুপস্থিত থাকে এবং 70S রাইবোজোম থাকে; ইউক্যারিওটিক কোষে আদর্শ নিউক্লিয়াস ও 80S রাইবোজোম বর্তমান।
মূল বিষয় 7
পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল ও আয়তনের অনুপাত (A/V = ৩/r) কোষের আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে মারাত্মকভাবে কমে যায়, যা কোষ বিভাজনকে ত্বরান্বিত করে বিপাকীয় ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করে।
মূল বিষয় 8
শারীরিক পদানুক্রম অণু থেকে তন্ত্রে বিস্তৃত। উদ্ভিদ কলা ভাজক ও স্থায়ী কলায় (প্যারেনকাইমা, কোলেনকাইমা, স্ক্লেরেনকাইমা, জাইলেম ও ফ্লোয়েম) এবং প্রাণী কলা আবরণী, যোগকলা, পেশিকলা ও স্নায়ুকলায় বিভক্ত।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
আধুনিক কোষতত্ত্বের তিনটি মূল নীতি উল্লেখ করো। ভাইরাসকে কেন কোষতত্ত্বের ব্যতিক্রম বলা হয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

আধুনিক কোষতত্ত্বের তিনটি মূল নীতি:

  1. সমস্ত সজীব বস্তু এক বা একাধিক কোষ এবং কোষজাত পদার্থ নিয়ে গঠিত (স্লাইডেন ও সোয়ান)।
  2. কোষ হলো সমস্ত জীবের মৌলিক গঠনগত, কার্যগত ও শারীরবৃত্তীয় একক।
  3. সমস্ত জীবন্ত কোষ সর্বদা পূর্ববর্তী জীবন্ত কোষের বিভাজনের মাধ্যমেই উৎপন্ন হয় (রুডলফ ভিরশাও: Omnis cellula e cellula)।

ভাইরাস কেন ব্যতিক্রম:

ভাইরাসের কোনো নিজস্ব কোষীয় সংগঠন নেই—এতে কোনো সাইটোপ্লাজম, কোষপর্দা বা কোষ অঙ্গাণু থাকে না। পোষক কোষের বাইরে এটি সম্পূর্ণ নির্জীব কেলাসাকার রাসায়নিক কণা এবং কোনো স্বাধীন বিপাকীয় ক্রিয়া সম্পাদন করতে পারে না। কেবল পোষক কোষের অভ্যন্তরীণ জৈব সংশ্লেষ যন্ত্রকে দখল করে এটি সংখ্যাবৃদ্ধি করে। তাই ভাইরাস কোষতত্ত্বের স্পষ্ট ব্যতিক্রম।


2
গঠন, সংলগ্ন রাইবোজোম এবং শারীরবৃত্তীয় কাজের ভিত্তিতে অমসৃণ এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা (RER) ও মসৃণ এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকার (SER) মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
তুলনার বিষয় অমসৃণ এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা (RER) মসৃণ এন্ডোপ্লাজমীয় জালিকা (SER)
রাইবোজোমের উপস্থিতি বহিঃপৃষ্ঠে 80S রাইবোজোম দানা দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে। গায়ে কোনো রাইবোজোম থাকে না; পৃষ্ঠভাগ সম্পূর্ণ মসৃণ।
কাঠামোগত উপাদান প্রধানত সমান্তরাল চ্যাপ্টা সিস্টার্নি ও ভেসিকল নিয়ে গঠিত। প্রধানত পরস্পরের সাথে যুক্ত নলাকার টিউবিউল দ্বারা গঠিত।
প্রধান কাজ ক্ষরণকারী প্রোটিন সংশ্লেষ, ভাঁজকরণ ও প্রাথমিক রূপান্তর। লিপিড, ফসফোলিপিড, কোলেস্টেরল ও স্টেরয়েড হরমোন সংশ্লেষ।
বিশেষায়িত ভূমিকা নিউক্লীয় বহিঃপর্দার সাথে অবিচ্ছিন্ন; অগ্ন্যাশয়ে প্রচুর থাকে। যকৃতে ক্ষতিকর ওষুধ ও বিষের বিষমুক্তকরণ; পেশিতে Ca²⁺ সঞ্চয়।

3
প্লাজমোলাইসিস কী? একটি পেঁয়াজের শল্কপত্রের কোষকে ১০% গাঢ় চিনির দ্রবণে রাখলে কী কী পরিবর্তন দেখা যাবে এবং কীভাবে ডি-প্লাজমোলাইসিস ঘটানো যায়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

প্লাজমোলাইসিস (Plasmolysis): সজীব উদ্ভিদকোষকে অতিসারী দ্রবণে নিমজ্জিত করলে বহিঃঅভিস্রবণের মাধ্যমে কোষের জল বেরিয়ে গিয়ে কোষপ্রাচীর থেকে প্রোটোপ্লাস্টের সংকুচিত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে প্লাজমোলাইসিস বলে।

১০% চিনির দ্রবণে ধারাবাহিক পরিবর্তন:

  1. ১০% চিনির দ্রবণ হলো পেঁয়াজের কোষরসের তুলনায় বেশি ঘন অর্থাৎ অতিসারী দ্রবণ (Hypertonic)।
  2. বহিঃঅভিস্রবণ (Exosmosis) প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ভ্যাকুওল থেকে জল বাইরে বেরিয়ে যায়।
  3. ভ্যাকুওল সংকুচিত হওয়ায় রসস্ফীতি চাপ ($TP$) শূন্য হয়ে যায়।
  4. অবিরাম বহিঃঅভিস্রবণে সাইটোপ্লাজমীয় প্রোটোপ্লাস্টটি সেলুলোজ কোষপ্রাচীরের কোণা ছেড়ে সংকুচিত হয়ে কোষের একপাশে গোল পিণ্ডে পরিণত হয়। কোষপ্রাচীর ও সংকুচিত প্রোটোপ্লাস্টের মাঝের ফাঁকা স্থানটি বাইরের গাঢ় চিনির দ্রবণ দিয়ে পূর্ণ হয়।

ডি-প্লাজমোলাইসিস ঘটানোর উপায়: প্লাজমোলাইজড পেঁয়াজের কোষটিকে অবিলম্বে তুলে বিশুদ্ধ পাতিত জলে (অল্পসারী দ্রবণ) রাখলে অন্তঃঅভিস্রবণ প্রক্রিয়ায় পুনরায় জল ভ্যাকুওলে প্রবেশ করবে এবং প্রোটোপ্লাস্ট প্রসারিত হয়ে কোষপ্রাচীর স্পর্শ করে পূর্বের স্ফীত অবস্থায় ফিরে আসবে।


4
পরিবাহী উপাদান, সজীব-নির্জীব অবস্থা এবং সংবহনের অভিমুখের নিরিখে জাইলেম ও ফ্লোয়েম কলার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
তুলনার মাপকাঠি জাইলেম কলা (Xylem) ফ্লোয়েম কলা (Phloem)
মূল পরিবাহী উপাদান ট্র্যাকইড এবং জাইলেম ভেসেল (ট্রাকিয়া)। সিভনল এবং সঙ্গীকোষ।
সজীব ও মৃত অবস্থা অধিকাংশই মৃত (ট্র্যাকইড, ভেসেল ও তন্তু মৃত; কেবল জাইলেম প্যারেনকাইমা সজীব)। অধিকাংশই সজীব (সিভনল, সঙ্গীকোষ ও প্যারেনকাইমা সজীব; কেবল ফ্লোয়েম তন্তু মৃত)।
পরিবাহিত পদার্থ মূলরোম দ্বারা শোষিত জল ও জলে দ্রবীভূত খনিজ লবণ। সবুজ পাতায় সালোকসংশ্লেষে তৈরি জৈব খাদ্য (সুক্রোজ দ্রবণ)।
সংবহনের দিক সর্বদা একমুখী (মূল থেকে কাণ্ডের মাধ্যমে পাতায় ঊর্ধ্বমুখী পরিবহন)। উভমুখী বা বহুমুখী (উৎপাদনকারী পাতা থেকে সঞ্চয়ী মূল/ফল এবং কাণ্ডের অগ্রভাগে সংবহন)।

5
লাইসোজোমকে কেন "আত্মঘাতী থলি" (Suicide Bags) বলা হয়? অটোফ্যাগি, অটোলাইসিস এবং ব্যাঙাচির রূপান্তরে এর ভূমিকা কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

১. "আত্মঘাতী থলি" নামকরণের কারণ: লাইসোজোম হলো একক পর্দাঘেরা এমন একটি অঙ্গাণু যাতে প্রায় ৫০ রকমের শক্তিশালী অম্লীয় হাইড্রোলাইটিক পাচক উৎসেচক থাকে যা সমস্ত জৈব অণুকে ভেঙে ফেলতে সক্ষম। কোনো কারণে কোষটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত বা অক্সিজেনের অভাবে মৃতপ্রায় হলে লাইসোজোমের পর্দা ফেটে যায় এবং মুক্ত উৎসেচক সম্পূর্ণ নিজের কোষটিকেই পরিপাক করে ধ্বংস করে দেয়। নিজের কোষকে নিজে ধ্বংস করার এই আত্মঘাতী ক্ষমতার জন্য একে "আত্মঘাতী থলি" বলে।

২. অটোফ্যাগি (স্বগ্রাস): স্বাভাবিক অবস্থায় বা অনাহারকালে কোষের অকেজো ও পুরনো অঙ্গাণুগুলিকে (যেমন পুরানো মাইটোকনড্রিয়া) লাইসোজোম গ্রাস করে পাচিত করে, যার ফলে উৎপন্ন অ্যামিনো অ্যাসিড নতুন উপাদান তৈরিতে পুনর্ব্যবহৃত হয়।

৩. ব্যাঙাচির রূপান্তর: জলজ ব্যাঙাচি যখন পূর্ণাঙ্গ স্থলচর ব্যাঙে রূপান্তরিত হয়, তখন তার লেজটির আর প্রয়োজন থাকে না। তীব্র লাইসোজোমীয় অটোলাইসিসের মাধ্যমে লেজের কলা সম্পূর্ণ পরিপাক হয়ে বিলুপ্ত হয় এবং তার পুষ্টি উপাদান পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙের অঙ্গ বিকাশে কাজে লাগে।


অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

দেহের গঠন অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।