১.১ কোষের আবিষ্কার: রবার্ট হুক ও লিউয়েনহুক
জীবদেহের গঠনগত ও কার্যগত মৌলিক একক হলো কোষ (Cell)। ল্যাটিন শব্দ Cellula (যার অর্থ "ক্ষুদ্র কুঠুরি বা প্রকোষ্ঠ") থেকে "Cell" শব্দটির উৎপত্তি। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ বিজ্ঞানী রবার্ট হুক (Robert Hooke, 1635–1703) প্রথম কোষ আবিষ্কার করেন।
- রবার্ট হুকের পর্যবেক্ষণ (১৬৬৫): কর্ক গাছের (স্প্যানিশ ওক গাছ, Quercus suber) ছালের পাতলা অংশ কেটে নিজের তৈরি যৌগিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে পর্যবেক্ষণ করে হুক অসংখ্য মৌমাছির চাকের মতো সারি সারি ফাঁপা প্রকোষ্ঠ দেখতে পান। তিনি এই কুঠুরিগুলির নাম দেন "Cell" এবং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Micrographia-তে এই চিত্রগুলি প্রকাশ করেন। প্রকৃতপক্ষে হুক যা প্রত্যক্ষ করেছিলেন তা ছিল মৃত কোষের সেলুলোজ নির্মিত কোষপ্রাচীর, যেখানে কোনো সজীব প্রোটোপ্লাজম ছিল না।
- অ্যান্টনি ভন লিউয়েনহুক (১৬৭৪): ওলন্দাজ বিজ্ঞানী লিউয়েনহুক উন্নতমানের একক লেন্সযুক্ত সরল অণুবীক্ষণ যন্ত্রের (বিবর্ধন ক্ষমতা প্রায় ২৭০-৩০০ গুণ) সাহায্যে পুকুরের জল, বৃষ্টির জল এবং দাঁতের ময়লা থেকে প্রথম সচল মুক্ত সজীব কোষ প্রত্যক্ষ করেন। তিনি এদের "Animalcules" (ক্ষুদ্র জীবকণা) নাম দিয়েছিলেন, যা আধুনিক বিজ্ঞানে ব্যাকটিরিয়া, প্রোটোজোয়া (যেমন প্যারামিসিয়াম ও ভর্টিসেলা), স্পাইরোগাইরা শৈবাল, মানব লোহিত রক্তকণিকা ও শুক্রাণু হিসেবে পরিচিত।
১.২ কোষতত্ত্ব ও ভিরশাও-এর যুগান্তকারী নীতি
ঊনবিংশ শতাব্দীতে দুই জার্মান বিজ্ঞানীর দীর্ঘদিনের হিস্টোলজিক্যাল গবেষণার ফসল হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত কোষতত্ত্ব (Cell Theory) প্রতিষ্ঠিত হয়:
- ম্যাথিয়াস জ্যাকব স্লাইডেন (১৮৩৮): জার্মান উদ্ভিদবিদ স্লাইডেন বহুসংখ্যক উদ্ভিদকলার নমুনা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেন যে—সমস্ত উদ্ভিদের দেহই এক বা একাধিক কোষ ও কোষীয় উপাদান দিয়ে গঠিত।
- থিওডোর সোয়ান (১৮৩৯): জার্মান প্রাণীবিদ সোয়ান বিভিন্ন প্রাণীকলা পরীক্ষা করে দেখেন যে সমস্ত প্রাণীর দেহই কোষ দ্বারা নির্মিত। তিনি লক্ষ্য করেন যে প্রাণীকোষ পাতলা বহিঃপর্দা (কোষপর্দা) দ্বারা আবৃত থাকে এবং উদ্ভিদকোষে অতিরিক্ত একটি বহিঃআবরণ হিসেবে কোষপ্রাচীর উপস্থিত। উদ্ভিদ ও প্রাণীবিজ্ঞানকে একত্রিত করে তিনি যৌথভাবে কোষতত্ত্ব ঘোষণা করেন: "সমস্ত সজীব বস্তু (উদ্ভিদ ও প্রাণী) এক বা একাধিক কোষ এবং তাদের দ্বারা উৎপাদিত পদার্থ নিয়ে গঠিত।"
- রুডলফ ভিরশাও (১৮৫৫): প্রাথমিক কোষতত্ত্বে নতুন কোষ কীভাবে সৃষ্টি হয় তার ব্যাখ্যা ছিল না। জার্মান প্যাথলজিস্ট রুডলফ ভিরশাও ল্যাটিন ভাষায় তাঁর অমর নীতি ঘোষণা করেন: $$\mathbf{\text{Omnis cellula e cellula}}$$ যার অর্থ: "পূর্ববর্তী জীবন্ত কোষের বিভাজনের মাধ্যমেই সর্বদা নতুন কোষের উৎপত্তি ঘটে।"
আধুনিক কোষতত্ত্বের মূল নীতিসমূহ:
- সমস্ত সজীব উপাদান কোষ এবং কোষজাত পদার্থ দ্বারা নির্মিত।
- কোষ হলো জীবনের সর্বাপেক্ষা মৌলিক গঠনগত ও কার্যগত একক।
- নতুন কোষ সর্বদা পূর্ববর্তী জীবন্ত কোষের বিভাজনের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়।
- বহুকোষী জীবে প্রতিটি কোষ নিজস্ব বিপাকীয় ক্রিয়া সম্পাদন করার পাশাপাশি সামগ্রিক সমন্বয় রক্ষা করে।
কোষতত্ত্বের ব্যতিক্রম: ভাইরাস (Virus), ভিরয়েড ও প্রিয়ন-এর কোনো কোষীয় সংগঠন নেই (সাইটোপ্লাজম, কোষপর্দা বা বিপাকীয় উৎসেচক অনুপস্থিত; এরা পোষক কোষের বাইরে নির্জীব কেলাসাকার অবস্থায় থাকে)। এ ছাড়া একাধিক নিউক্লিয়াসযুক্ত সিনোসাইটিক শৈবাল (যেমন ভাউচেরিয়া) বা সিনোসাইটিক ছত্রাক (যেমন রাইজোপাস) সাধারণ এককোষীয় সংজ্ঞার ব্যতিক্রম।
১.৩ অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রকারভেদ: যৌগিক আলোক বনাম ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ
যেহেতু মানব চক্ষুর বিশ্লেষণ ক্ষমতা (Resolving Power) মাত্র $০.১\text{ মিমি} = ১০০\ \mu\text{m}$, তাই খালি চোখে কোষ ও তার ভিতরের অঙ্গাণু প্রত্যক্ষ করা অসম্ভব। কোষীয় গবেষণার প্রধান হাতিয়ার হলো বিভিন্ন প্রকার অণুবীক্ষণ যন্ত্র:
| বৈশিষ্ট্য | যৌগিক আলোক অণুবীক্ষণ যন্ত্র | ট্রান্সমিশন ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ (TEM) | স্ক্যানিং ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ (SEM) |
|---|---|---|---|
| আলোক / রশ্মি উৎস | দৃশ্যমান আলোক রশ্মি ($\lambda = ৪০০–৭০০\text{ nm}$) | উচ্চগতির ইলেকট্রন রশ্মি প্রবাহ ($\lambda \approx ০.০০৫\text{ nm}$) | কেন্দ্রীভূত স্ক্যানিং ইলেকট্রন রশ্মি |
| লেন্স ব্যবস্থা | কাঁচের আলোকীয় লেন্স (আইপিস, অবজেক্টিভ) | তড়িৎচৌম্বকীয় লেন্স (Electromagnetic Lenses) | তড়িৎচৌম্বকীয় লেন্স ও ডিফ্লেক্টর কয়েল |
| নমুনার অবস্থা | সজীব বা সংরক্ষিত পাতলা রঞ্জিত ছেদ | উচ্চ ভ্যাকুয়ামে অতি-পাতলা মৃত ছেদ ($৫০–১০০\text{ nm}$) | ভারী ধাতু (স্বর্ণ/প্ল্যাটিনাম) প্রলেপযুক্ত নমুনা |
| সর্বোচ্চ বিবর্ধন | ১,০০০ গুণ থেকে ২,০০০ গুণ | ৫,০০,০০০ গুণ থেকে ১০,০০,০০০ গুণ | ১,০০,০০০ গুণ থেকে ৩,০০,০০০ গুণ |
| বিশ্লেষণ ক্ষমতা ($d$) | প্রায় $০.২\ \mu\text{m}$ ($২০০\text{ nm}$) | প্রায় $০.১–০.২\text{ nm}$ ($১–২\ \text{Å}$) | প্রায় $১–২\text{ nm}$ |
| প্রতিবিম্বের রূপ | আইপিসের মাধ্যমে সরাসরি রঙিন দ্বিমাত্রিক চিত্র | ফ্লুরোসেন্ট পর্দায় অভ্যন্তরীণ পরাগঠন (2D) | কম্পিউটার পর্দায় ত্রিমাত্রিক তলের রূপরেখা (3D) |
বিবর্ধন বনাম বিশ্লেষণ ক্ষমতা: বিবর্ধন ক্ষমতা (Magnification) হলো কোনো বস্তুকে তার মূল আকারের তুলনায় কত গুণ বড় দেখানো যায় ($M_{\text{মোট}} = M_{\text{আইপিস}} \times M_{\text{অবজেক্টিভ}}$)। আর বিশ্লেষণ ক্ষমতা (Resolving Power) হলো পাশাপাশি অবস্থিত দুটি অতি সন্নিকটস্থ বিন্দুকে পৃথকভাবে স্পষ্টভাবে দেখার ক্ষমতা। ইলেকট্রন রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য অত্যন্ত ক্ষুদ্র হওয়ায় ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের বিশ্লেষণ ক্ষমতা আলোক অণুবীক্ষণের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি।
১.৪ নমুনা প্রস্তুতি ও রঞ্জন পদ্ধতি (Staining Protocols)
জীবন্ত সজীব কোষের সাইটোপ্লাজম ও অঙ্গাণুগুলি অত্যন্ত স্বচ্ছ, বর্ণহীন এবং তাদের প্রতিসরাঙ্ক প্রায় জলের কাছাকাছি হওয়ায় সাধারণ আলোক অণুবীক্ষণে তাদের অভ্যন্তরীণ গঠন দেখা যায় না। রঞ্জক পদার্থ (Dyes) প্রয়োগ করে অঙ্গাণুগুলিকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়:
- মিথিলিন ব্লু (Methylene Blue): ক্ষারীয় রঞ্জক, যা কোষের অম্লীয় উপাদান বিশেষ করে নিউক্লিয়াস ও ক্রোমাটিন জালিকা-র সাথে যুক্ত হয়ে তাদের গাঢ় নীল বর্ণে রঞ্জিত করে (মানুষের গালের ভেতরের আবরণী কোষ পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হয়)।
- স্যাফ্রানিন (Safranin): ক্ষারীয় লাল রঞ্জক, যা উদ্ভিদের কাণ্ডের ছেদে লিগনিনযুক্ত কোষপ্রাচীর ও নিউক্লিয়াসকে উজ্জ্বল লাল/গোলাপি বর্ণ দেয় (পেঁয়াজের শল্কপত্রের এপিডার্মিস পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত)।
- অ্যাসিটোক্যারমিন (Acetocarmine): কোষ বিভাজনরত ক্রোমোজোম ও ক্রোমাটিন তন্তুকে গাঢ় লাল বর্ণে রঞ্জিত করে।
- আয়োডিন দ্রবণ (Lugol's Iodine): উদ্ভিদের শ্বেতসার বা স্টার্চ দানার অ্যামাইলোজের সাথে বিক্রিয়া করে তাদের গাঢ় নীল-কালো বর্ণে রূপান্তরিত করে।
- গ্লিসারিনের ভূমিকা (Mountant): অস্থায়ী স্লাইড তৈরির সময় নমুনাকে আর্দ্র রাখতে, শুকিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করতে এবং কাঁচের কভারস্লিপের প্রতিসরাঙ্কের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আলোর বিচ্ছুরণ কমাতে গ্লিসারিন ব্যবহার করা হয়।
১.৫ কোষের আকার ও আকৃতির বৈচিত্র্য
জীবজগতে কোষের আকার ও আকৃতির মধ্যে অপার বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়, যা কোষের নির্দিষ্ট কাজের সাথে নিখুঁতভাবে অভিযোজিত:
- আকারের বৈচিত্র্য:
- ক্ষুদ্রতম কোষ: মাইকোপ্লাজমা গ্যালিসেপটিকাম (Mycoplasma gallisepticum / PPLO), যার ব্যাস মাত্র $০.১\ \mu\text{m} = ১০০\text{ nm}$।
- সাধারণ ব্যাকটিরিয়া: দৈর্ঘ্য প্রায় $১\ \mu\text{m} \text{ থেকে } ৫\ \mu\text{m}$।
- মানবদেহের লোহিত রক্তকণিকা (RBC): ব্যাস প্রায় $৭.০–৭.৫\ \mu\text{m}$।
- মানবদেহের ডিম্বাণু (Ovum): ব্যাস প্রায় $১০০–১২০\ \mu\text{m}$ ($০.১\text{ মিমি}$), যা তীক্ষ্ণ খালি চোখে দেখা সম্ভব।
- দীর্ঘতম প্রাণীকোষ: মোটর নিউরোন (স্নায়ুকোষ), যার অ্যাক্সন মানুষের ক্ষেত্রে $১\text{ মিটারেরও}$ বেশি দীর্ঘ হতে পারে।
- বৃহত্তম এককোষী গঠন: উটপাখির ডিম, যার মাপ প্রায় $১৭\text{ সেমি} \times ১৩\text{ সেমি}$ এবং ওজন প্রায় দেড় কিলোগ্রাম ($১.৫\text{ কেজি}$)।
- বৃহত্তম এককোষী শৈবাল: অ্যাসিটাবুলারিয়া (Acetabularia), যার দৈর্ঘ্য প্রায় $১০\text{ সেমি}$ পর্যন্ত হতে পারে।
- আকৃতির বৈচিত্র্য ও কাজের সম্পর্ক:
- দ্বি-অবতল গোলীয় RBC: অবতল গোলীয় আকৃতি পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি করে দ্রুত $O_2$ ব্যাপনে সাহায্য করে এবং সরু কৈশিক নালী দিয়ে সহজে চলাচল করতে পারে।
- শাখান্বিত দীর্ঘ স্নায়ুকোষ: দূরবর্তী অঙ্গ থেকে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে দ্রুত তড়িৎ-রাসায়নিক সংকেত পরিবহনের উপযোগী।
- মাকু আকৃতির মসৃণ পেশিকোষ: প্রান্তভাগ সূঁচালো হওয়ায় সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ অঙ্গের চলন ঘটায়।
- অনির্দিষ্ট আকারের শ্বেত রক্তকণিকা (WBC) ও অ্যামিবা: ক্ষণপদ গঠনের মাধ্যমে রক্তজালকের প্রাচীর ভেদ করা (ডায়াপেডিসিস) এবং ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে জীবাণু ধ্বংস করা।
- বৃক্কাকার রক্ষীকোষ (Guard Cells): পত্ররন্ধ্র খোলা ও বন্ধের মাধ্যমে বাষ্পমোচন ও গ্যাসীয় বিনিময় নিয়ন্ত্রণ করে।
- নলাকার জাইলেম ভেসেল ও ট্র্যাকইড: দীর্ঘ ফাঁপা নলের মতো সজ্জা মূল থেকে পাতায় জল ও খনিজ লবণ ঊর্ধ্বমুখী সংবহনে সহায়তা করে।