Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Science • অধ্যায় 2
আনুমানিক সময়: ৫০ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

পদার্থের প্রকৃতি

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অনুমোদিত অষ্টম শ্রেণির "পরিবেশ ও বিজ্ঞান" পাঠ্যপুস্তকের দ্বিতীয় অধ্যায় "পদার্থের প্রকৃতি" (Nature of Matter)-র এই পূর্ণাঙ্গ এবং পাঠ্যক্রম-ভিত্তিক অধ্যয়ন নির্দেশিকায় আপনাকে স্বাগত। রসায়ন ও বস্তুবিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে রচিত এই অধ্যায়ে পাঁচটি মূল স্তম্ভ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে: (১) পদার্থের কণাভিত্তিক গতিতত্ত্ব, ধাতু-অধাতু-ধাতুকল্পের বৈশিষ্ট্য ও রসায়নের গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমসমূহ (তরল পারদ ও ব্রোমিন, নরম সোডিয়াম, পরিবাহী গ্রাফাইট ও কঠিনতম হিরে); (২) ভৌত বনাম রাসায়নিক পরিবর্তন, মোমবাতির দ্বৈত পরিবর্তন এবং মিশ্রণ পৃথকীকরণ পদ্ধতি (ঊর্ধ্বপাতন, পাতন, আংশিক পাতন ও বিয়োজী ফানেল); (৩) রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রকারভেদ—প্রত্যক্ষ সংযোগ, বিয়োজন, প্রতিস্থাপন, দ্বি-বিয়োজন ও অধঃক্ষেপণ এবং কপার সালফেটে লোহার পেরেক নিমজ্জনের বিজ্ঞান; (৪) তাপমোচী ও তাপগ্রাহী বিক্রিয়ার শক্তির রূপান্তর, অজৈব অনুঘটক (MnO₂) এবং জীবদেহের উৎসেচক (লালারসের টায়ালিন ও পাকস্থলীর পেপসিন); এবং (৫) দ্রবণ ও দ্রাব্যতা (S = w/W × ১০০), তরলে গ্যাসের দ্রাব্যতায় হেনরির সূত্র ও তাপমাত্রার ভূমিকা, এবং প্রকৃত দ্রবণ, কলয়েড ও প্রলম্বনের তুলনা সহ টিন্ডাল প্রভাব ও ব্রাউনীয় গতি। ২৫টি শিক্ষণ ধাপ, ধারণাগত SVG মানচিত্র, ৮টি মূল সূত্র, সমাধানকৃত পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ, পরীক্ষকের সতর্কবার্তা এবং স্ব-मूल্যায়ন অভীক্ষায় সমৃদ্ধ এই নির্দেশিকা বোর্ড পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের পূর্ণ প্রস্তুতি ও সর্বোচ্চ নম্বর সুনিশ্চিত করে।

🧪 পদার্থের রাসায়নিক রূপান্তর: প্রাণঘাতী বিষ ও ক্ষারীয় ধাতু মিলে কীভাবে তৈরি হয় জীবনদায়ী খাদ্যলবণ?

জলে ফেললে আগুন ধরে যায় এমন অতি-সক্রিয় বিপজ্জনক নরম ধাতু সোডিয়াম ($Na$) এবং শ্বাস নিলে দম আটকে মারা যায় এমন বিষাক্ত সবজেটে-হলুদ গ্যাস ক্লোরিন ($Cl_২$)—পরস্পর যুক্ত হয়ে কীভাবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের পরম প্রয়োজনীয় সুস্বাদু খাদ্যলবণ ($NaCl$) তৈরি করে?

পেন্সিলের নরম কালো গ্রাফাইট আর পৃথিবীর কঠিনতম মহামূল্যবান হিরে—উভয়েই একই উপাদান কার্বন দ্বারা গঠিত হওয়া সত্ত্বেও তাদের আচরণে কেন আকাশ-পাতাল পার্থক্য? নীল কপার সালফেটে লোহার পেরেক দিলে দ্রবণ কেন সবুজ হয়ে যায়, আর নুন-জলে লেজার আলো দেখা না গেলেও দুধের মধ্য দিয়ে আলো কেন উজ্জ্বলভাবে জ্বলে ওঠে?

এই সমস্ত আকর্ষণীয় রহস্যের সমাধান লুকিয়ে রয়েছে রসায়ন বিজ্ঞানের মূল স্তম্ভ পদার্থের প্রকৃতি (Nature of Matter)-র মধ্যে: পারমাণবিক বন্ধন, রাসায়নিক রূপান্তর, শক্তির আদান-প্রদান এবং কলয়েডীয় অবস্থা। আসুন ধাপে ধাপে পদার্থের অভ্যন্তরীণ বিশ্বকে উন্মোচন করি!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অনুমোদিত অষ্টম শ্রেণির "পরিবেশ ও বিজ্ঞান" পাঠ্যপুস্তকের দ্বিতীয় অধ্যায় "পদার্থের প্রকৃতি" (Nature of Matter)-র এই পূর্ণাঙ্গ এবং পাঠ্যক্রম-ভিত্তিক অধ্যয়ন নির্দেশিকায় আপনাকে স্বাগত। রসায়ন ও বস্তুবিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে রচিত এই অধ্যায়ে পাঁচটি মূল স্তম্ভ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে: (১) পদার্থের কণাভিত্তিক গতিতত্ত্ব, ধাতু-অধাতু-ধাতুকল্পের বৈশিষ্ট্য ও রসায়নের গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমসমূহ (তরল পারদ ও ব্রোমিন, নরম সোডিয়াম, পরিবাহী গ্রাফাইট ও কঠিনতম হিরে); (২) ভৌত বনাম রাসায়নিক পরিবর্তন, মোমবাতির দ্বৈত পরিবর্তন এবং মিশ্রণ পৃথকীকরণ পদ্ধতি (ঊর্ধ্বপাতন, পাতন, আংশিক পাতন ও বিয়োজী ফানেল); (৩) রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রকারভেদ—প্রত্যক্ষ সংযোগ, বিয়োজন, প্রতিস্থাপন, দ্বি-বিয়োজন ও অধঃক্ষেপণ এবং কপার সালফেটে লোহার পেরেক নিমজ্জনের বিজ্ঞান; (৪) তাপমোচী ও তাপগ্রাহী বিক্রিয়ার শক্তির রূপান্তর, অজৈব অনুঘটক (MnO₂) এবং জীবদেহের উৎসেচক (লালারসের টায়ালিন ও পাকস্থলীর পেপসিন); এবং (৫) দ্রবণ ও দ্রাব্যতা (S = w/W × ১০০), তরলে গ্যাসের দ্রাব্যতায় হেনরির সূত্র ও তাপমাত্রার ভূমিকা, এবং প্রকৃত দ্রবণ, কলয়েড ও প্রলম্বনের তুলনা সহ টিন্ডাল প্রভাব ও ব্রাউনীয় গতি। ২৫টি শিক্ষণ ধাপ, ধারণাগত SVG মানচিত্র, ৮টি মূল সূত্র, সমাধানকৃত পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ, পরীক্ষকের সতর্কবার্তা এবং স্ব-मूल্যায়ন অভীক্ষায় সমৃদ্ধ এই নির্দেশিকা বোর্ড পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের পূর্ণ প্রস্তুতি ও সর্বোচ্চ নম্বর সুনিশ্চিত করে।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • পরমাণু, অণু ও পদার্থের কণাভিত্তিক গঠনের প্রাথমিক ধারণা।
  • পদার্থের তিন অবস্থা: কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় অবস্থার রূপান্তর।
  • মৌল ও যৌগের রাসায়নিক সংকেত এবং ভরের নিত্যতা সূত্রের সাধারণ জ্ঞান।
  • বিশুদ্ধ পদার্থ ও অপরিশোধিত মিশ্রণের পার্থক্য।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • গতিতত্ত্বের সাহায্যে পদার্থের তিন অবস্থা ব্যাখ্যা করা এবং ধাতু, অধাতু ও ধাতুকল্পের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যসমূহ (Hg, Br₂, Na, গ্রাফাইট, হিরে) বিশ্লেষণ করা।
  • ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তনের পার্থক্য চিহ্নিত করা এবং ঊর্ধ্বপাতন, পাতন ও বিয়োজী ফানেলের সাহায্যে মিশ্রণ পৃথকীকরণের নকশা তৈরি করা।
  • চার প্রকার মৌলিক রাসায়নিক বিক্রিয়া (সংশ্লেষ, বিয়োজন, প্রতিস্থাপন, দ্বি-বিয়োজন) চিহ্নিত ও সমতাযুক্ত সমীকরণ লেখা।
  • তাপমোচী ও তাপগ্রাহী বিক্রিয়া পৃথক করা এবং অজৈব অনুঘটক ও উৎসেচকের (টায়ালিন, পেপসিন) কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করা।
  • গাণিতিক দ্রাব্যতা (S = w/W × ১০০) হিসাব করা এবং দ্রাব্যতার ওপর উষ্ণতা ও চাপের (হেনরির সূত্র) প্রভাব বিশ্লেষণ করা।
  • প্রকৃত দ্রবণ, কলয়েড ও প্রলম্বনের কণার ব্যাসের তুলনা করা এবং টিন্ডাল প্রভাব ও ব্রাউনীয় গতির কারণ নিরূপণ করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. পদার্থের ভৌত অবস্থা, মৌল, যৌগ ও...
2 ২. ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তন এবং মিশ...
3 ৩. রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রকারভেদ ও...
4 ৪. বিক্রিয়ায় শক্তির রূপান্তর ও অন...
5 ৫. দ্রবণ, দ্রাব্যতা ও কলয়েডীয় দ্র...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. পদার্থের ভৌত অবস্থা, মৌল, যৌগ ও ধাতু-অধাতুর প্রকৃতি (Elements, Metals & Compounds)

ধাপ ১: পদার্থের কণাভিত্তিক গতিতত্ত্ব (Kinetic Molecular Theory)

মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থই অসংখ্য অতিসূক্ষ্ম অবিভাজ্য বা বিভাজ্য কণা—পরমাণু ও অণু দ্বারা গঠিত। পদার্থের যেকোনো ভৌত অবস্থা (কঠিন, তরল বা গ্যাস) দুটি বিপরীতধর্মী উপাদানের প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভর করে:

  • আন্তঃআণবিক আকর্ষণ বল ($F_{\text{inter}}$): পাশাপাশি অবস্থিত কণাগুলির মধ্যকার পারস্পরিক আকর্ষণ বল যা তাদের কাছাকাছি বেঁধে রাখে।
  • আন্তঃআণবিক স্থান ও তাপীয় গতিশক্তি ($r_{\text{inter}}$): উষ্ণতার কারণে কণাগুলির মধ্যকার কম্পন ও গতিবেগ যা তাদের পরস্পর থেকে দূরে ঠেলে দিতে চায়।
  • কঠিন পদার্থ: আকর্ষণ বল সর্বাধিক, কণাগুলি সুসংবদ্ধ ল্যাটিসে কেবল নিজ স্থানে কাঁপে; ফলে নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন থাকে।
  • তরল পদার্থ: আকর্ষণ বল মাঝারি; কণাগুলি স্থান পরিবর্তন করতে পারে, তাই নির্দিষ্ট আয়তন থাকলেও নির্দিষ্ট আকার থাকে না।
  • গ্যাসীয় পদার্থ: আকর্ষণ বল নেই বললেই চলে; কণাগুলি তীব্র গতিতে ইতস্তত ছোটাছুটি করে এবং যে পাত্রেই রাখা হোক তার সম্পূর্ণ আয়তন দখল করে।
ধাপ ২: মৌলিক পদার্থের শ্রেণিবিভাগ: ধাতু, অধাতু ও ধাতুকল্প

যে বিশুদ্ধ পদার্থকে কোনো সাধারণ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ভেঙে একাধিক ভিন্ন ধর্মবিশিষ্ট নতুন পদার্থে পরিণত করা যায় না, তাকে মৌল (Element) বলে।

  • ধাতু (Metals): সাধারণত উচ্চ ঘনত্বযুক্ত, চকচকে, বিদ্যুৎ ও তাপের সুপরিবাহী এবং ধনাত্মক আয়ন (ক্যাটায়ন) গঠনকারী মৌল (যেমন তামা, লোহা, সোনা)।
  • অধাতু (Non-metals): ঋণাত্মক আয়ন (অ্যানায়ন) গঠনকারী, ভঙ্গুর, বিদ্যুৎ ও তাপের অপরিবাহী মৌল (যেমন অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, সালফার)।
  • ধাতুকল্প (Metalloids): যে মৌলগুলির মধ্যে ধাতু ও অধাতু উভয়েরই কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য বর্তমান থাকে, তাদের ধাতুকল্প বলে। উদাহরণ: আর্সেনিক (As), অ্যান্টিমনি (Sb), সিলিকন (Si) ও জার্মেনিয়াম (Ge)।
  • নিষ্ক্রিয় গ্যাস (Noble Gases): যেসব গ্যাসের পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ কক্ষ ইলেকট্রন দ্বারা সম্পূর্ণ পূর্ণ থাকে এবং যারা সাধারণ অবস্থায় কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয় না: হিলিয়াম (He), নিয়ন (Ne), আর্গন (Ar), ক্রিপ্টন (Kr), জেনন (Xe) ও রেডন (Rn)।
ধাপ ৩: ধাতুর অনন্য চার প্রধান ভৌত বৈশিষ্ট্য

ধাতুসমূহ চারটি স্বতন্ত্র যান্ত্রিক ও ভৌত ধর্ম প্রদর্শন করে:

  1. ধাতব দ্যুতি (Metallic Luster): মুক্ত ইলেকট্রনগুলির আলোর সাথে মিথস্ক্রিয়ার কারণে ধাতুর সদ্য কাটা পৃষ্ঠ উজ্জ্বল চকচকে দেখায়।
  2. ঘাতসহনশীলতা (Malleability): আঘাত করে ধাতুকে গুঁড়িয়ে না ফেলে পিটিয়ে পাতলা পাতে বা ফয়েলে পরিণত করার ক্ষমতা। সোনা (Au) এবং রুপো (Ag) পৃথিবীর সবচেয়ে ঘাতসহনশীল ধাতু (সোনার পাতকে মাত্র ০.০০০০০১ মিমি পর্যন্ত পাতলা করা সম্ভব)।
  3. নমনীয়তা বা প্রসার্যতা (Ductility): টেনে লম্বা ও অতিসূক্ষ্ম তারে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা। প্ল্যাটিনাম (Pt) ও তামা (Cu) অত্যন্ত প্রসার্য ধাতু (মাত্র ১ গ্রাম প্ল্যাটিনাম থেকে প্রায় ২ কিমি দীর্ঘ সূক্ষ্ম তার তৈরি করা যায়)।
  4. নিনাদধর্মিতা ও সুপরিবাহিতা (Sonority & Conductivity): আঘাত করলে দীর্ঘস্থায়ী সুমিষ্ট ধ্বনি উৎপন্ন করে (ঘণ্টা ও বাদ্যযন্ত্রের তারে ব্যবহৃত) এবং মুক্ত ইলেকট্রন দ্বারা দ্রুত তাপ ও বিদ্যুৎ পরিবহন করে (রুপো সেরা পরিবাহী, তার পরেই তামা ও অ্যালুমিনিয়াম)।
ধাপ ৪: বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমসমূহ (Exceptions)

বোর্ড ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রমগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

ধর্মসাধারণ নিয়মঅনন্য ব্যতিক্রমী মৌলসমূহ
ধাতুর ভৌত অবস্থাসাধারণ উষ্ণতায় সমস্ত ধাতু কঠিনপারদ (Mercury, Hg) সাধারণ উষ্ণতায় একমাত্র তরল ধাতু; গ্যালিয়াম (Ga) ও সিজিয়াম (Cs) হাতের তালুর গরমে গলে যায় ($৩০^\circ\text{C}$)।
অধাতুর ভৌত অবস্থাঅধাতু কঠিন অথবা গ্যাসীয় হয়ব্রোমিন (Bromine, Br₂) সাধারণ উষ্ণতায় একমাত্র তরল অধাতু (লালচে-বাদামি রঙের)।
ধাতুর কাঠিন্যধাতু অত্যন্ত শক্ত ও ভারী হয়সোডিয়াম (Na) ও পটাশিয়াম (K) মাখনের মতো নরম ধাতু, সাধারণ ছুরি দিয়েই সহজে কাটা যায় এবং জলের চেয়ে হালকা।
অধাতুর বিদ্যুৎ পরিবাহিতাঅধাতু বিদ্যুতের কুপরিবাহীগ্রাফাইট ও গ্যাস কার্বন (কার্বনের রূপভেদ) মুক্ত ইলেকট্রনের উপস্থিতির কারণে চমৎকার বিদ্যুৎ পরিবাহী।
অধাতুর তাপ পরিবাহিতাঅধাতু তাপের কুপরিবাহীহিরে (কার্বনের রূপভেদ) তাপের অত্যন্ত উত্তম পরিবাহী (তামার চেয়েও ৫ গুণ বেশি পরিবাহী) এবং পৃথিবীর কঠিনতম প্রাকৃতিক পদার্থ।
অধাতুর উজ্জ্বলতাঅধাতু অনুজ্জ্বল ও দীপ্তিহীনআয়োডিন (I₂) ও গ্রাফাইট ধাতুর মতো ঝকঝকে উজ্জ্বল দ্যুতি প্রদর্শন করে।
ধাপ ৫: যৌগ বনাম মিশ্রণ (স্থিরানুপাত নিয়ম)

মৌলিক পদার্থের মিশ্রণ এবং তাদের রাসায়নিক মিলনের পার্থক্য অনুধাবন করা আবশ্যক:

  • যৌগিক পদার্থ (Compound): দুই বা ততোধিক মৌল নির্দিষ্ট ভরের অনুপাতে রাসায়নিকভাবে যুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট পদার্থ গঠন করে। উদাহরণ: জল ($H_2O$)-এ হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের ভরের অনুপাত সর্বদা $১:৮$ ($২\text{ g } H : ১৬\text{ g } O$)।
  • উদ্ভবের নতুন বৈশিষ্ট্য: যৌগের ধর্ম তার উপাদান মৌলগুলির ধর্মের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হাইড্রোজেন নিজে অতিমাত্রায় দাহ্য গ্যাস; অক্সিজেন নিজে জ্বলতে না পারলেও অন্যকে জ্বলতে সাহায্য করে। অথচ এদের মিলনে উৎপন্ন যৌগ 'জল' আগুন নেভাতে সাহায্য করে!
  • মিশ্রণ (Mixture): দুই বা ততোধিক পদার্থ যেকোনো অনুপাতে একত্রে মিশে থাকলে এবং তারা পরস্পরের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া না করে নিজ নিজ ধর্ম বজায় রাখলে তাকে মিশ্রণ বলে (যেমন বায়ু, নুন-জলের দ্রবণ, লোহা ও গন্ধকের গুঁড়োর মিশ্রণ)। এদের উপাদানগুলিকে সাধারণ ভৌত পদ্ধতিতে পৃথক করা যায়।

২. ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তন এবং মিশ্রণের উপাদান পৃথকীকরণ (Changes & Separation)

ধাপ ৬: ভৌত পরিবর্তন বনাম রাসায়নিক পরিবর্তনের বৈশিষ্ট্য

পদার্থের পরিবর্তনের প্রকৃতি অনুধাবনের তুলনামূলক সারণি:

তুলনার বিষয়ভৌত পরিবর্তন (Physical Change)রাসায়নিক পরিবর্তন (Chemical Change)
নতুন পদার্থের সৃষ্টিকোনো নতুন ধর্মবিশিষ্ট পদার্থের সৃষ্টি হয় না; কেবল রূপের পরিবর্তন ঘটেসম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট স্থায়ী পদার্থের সৃষ্টি হয়
প্রত্যাবর্তনশীলতাঅস্থায়ী এবং শর্ত অপসারণে সহজে উভমুখী (Reversible)স্থায়ী এবং সাধারণ ভৌত উপায়ে অপ্রত্যাবর্তনশীল (Irreversible)
ভরের পরিবর্তনপদার্থের মোট ভর সর্বদাই সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকেবিক্রিয়ক পদার্থ নতুন উৎপাদে পরিণত হওয়ায় মূল পদার্থের রূপান্তর ঘটে
শক্তির আদান-প্রদানখুব সামান্য তাপশক্তি শোষিত বা মুক্ত হয় (লীনতাপ)প্রচুর পরিমাণ তাপ, আলো বা বিদ্যুৎ শক্তির শোষণ বা মুক্তি ঘটে
আদর্শ উদাহরণবরফ গলে জল হওয়া, চিনি জলে মেশা, প্ল্যাটিনাম তার উত্তপ্ত করা, বাল্বের ফিলামেন্ট জ্বলালোহায় মরিচা ধরা, দুধ কেটে ছানা হওয়া, ম্যাগনেসিয়াম ফিতা পোড়ানো, কাগজের দহন
ধাপ ৭: মোমবাতির দহন: একই সাথে ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তনের মেলবন্ধন

একটি জ্বলন্ত মোমবাতিতে একই সঙ্গে ভৌত ও রাসায়নিক উভয় পরিবর্তনই ঘটে:

  • ভৌত পরিবর্তন: মোমের শিখার তাপে কঠিন মোম গলে তরল মোমে পরিণত হয়। তরল মোম গড়িয়ে নিচে নামলে ঠান্ডা হয়ে পুনরায় কঠিন মোমে রূপ নেয়। এতে মোমের রাসায়নিক গঠনের কোনো পরিবর্তন হয় না।
  • রাসায়নিক পরিবর্তন: সলতের মাধ্যমে তরল মোম কৈশিক ক্রিয়ায় ওপরে ওঠে এবং বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাসের অক্সিজেনের সাথে তীব্র বিক্রিয়ায় দগ্ধ হয়। এর ফলে কার্বন ডাইঅক্সাইড ($CO_2$), জলীয় বাষ্প ($H_2O$), আলো ও তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। উৎপন্ন বাষ্পকে ঠান্ডা করে আর মোম ফিরে পাওয়া যায় না।
ধাপ ৮: ঊর্ধ্বপাতন (Sublimation) ও উদ্বায়ী পদার্থ

ঊর্ধ্বপাতন: যেসব কঠিন পদার্থকে তাপ দিলে তরলে পরিণত না হয়ে সরাসরি বাষ্পে পরিণত হয় এবং সেই বাষ্পকে ঠান্ডা করলে পুনরায় সরাসরি কঠিন পদার্থে রূপান্তরিত হয়, সেই প্রক্রিয়াকে ঊর্ধ্বপাতন বলে।

$$\mathbf{\text{কঠিন পদার্থ} \xrightleftharpoons[\text{শীতলীকরণ}]{\text{উত্তাপন}} \text{বাষ্পীয় অবস্থা}}$$

অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যক্রমের চারটি প্রধান উদ্বায়ী পদার্থ:

  1. কর্পূর (Camphor)
  2. আয়োডিন (Iodine, $I_2$) — উত্তপ্ত করলে অপূর্ব গাঢ় বেগুনি রঙের বাষ্প নির্গত হয়।
  3. ন্যাপথালিন (Naphthalene) — পোকা তাড়াতে ব্যবহৃত সাদা গন্ধযুক্ত গুলি।
  4. নিশাদল বা অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড ($NH_4Cl$)

পৃথকীকরণ প্রয়োগ: খাদ্যলবণ ($NaCl$) ও নিশাদল ($NH_4Cl$)-এর মিশ্রণকে ফানেল চাপা দিয়ে গরম করলে নিশাদল বাষ্পীভূত হয়ে ফানেলের ঠান্ডা গায়ে কঠিন গুঁড়ো হিসেবে জমা হয়, আর লবণ পাত্রে থেকে যায়।

ধাপ ৯: পাতন ও আংশিক পাতনের বৈজ্ঞানিক পার্থক্য

মিশ্রণ থেকে তরল উপাদান পৃথকীকরণের দুটি প্রধান পদ্ধতি:

  • সরল পাতন (Simple Distillation): বাষ্পীভবন ও ঘনীভবনের যৌথ রূপ (পাতন = বাষ্পীভবন + ঘনীভবন)। যখন দুটি তরলের স্ফুটনাঙ্কের পার্থক্য ২৫°C-এর বেশি হয় (যেমন অ্যাসিটোন ৫৬°C ও জল ১০০°C), অথবা কোনো দ্রবণ থেকে বিশুদ্ধ দ্রাবক উদ্ধার করতে হয় (নোনা জল থেকে পাতিত জল তৈরি), তখন সরল পাতন ব্যবহার করা হয়।
  • আংশিক পাতন (Fractional Distillation): যখন দুটি বা ততোধিক পরস্পর দ্রবণীয় তরলের স্ফুটনাঙ্কের পার্থক্য ২৫°C-এর কম হয় (যেমন ইথাইল অ্যালকোহল ৭৮.৩°C ও জল ১০০°C, অথবা খনিজ তেল থেকে পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিন পৃথকীকরণ), তখন একটি দীর্ঘ আংশিক পাতন স্তম্ভ (Fractionating Column) ব্যবহার করে একাধিকবার বাষ্পীভবন ও ঘনীভবনের মাধ্যমে উপাদানগুলিকে আলাদা করা হয়।
ধাপ ১০: বিয়োজী ফানেলের সাহায্যে অমিশ্রণীয় তরল পৃথকীকরণ

পরস্পরের সাথে মেশে না এমন দুটি তরলকে (যেমন সর্ষের তেল বা কেরোসিন এবং জল) অমিশ্রণীয় তরল (Immiscible Liquids) বলে। ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে এদের সহজে পৃথক করা যায়:

  • ভারী বা বেশি ঘনত্বের তরল (জল, ঘনত্ব $১.০\text{ g/cm}^৩$) নিচের স্তরে থাকে।
  • হালকা বা কম ঘনত্বের তরল (তেল, ঘনত্ব $\approx ০.৮\text{ g/cm}^৩$) ওপরের স্তরে ভেসে থাকে।
  • বিয়োজী ফানেল (Separating Funnel): মিশ্রণটিকে স্টপককযুক্ত কাচের বিয়োজী ফানেলে কিছুক্ষণ স্থির রাখলে দুটি স্পষ্ট স্তর তৈরি হয়। নিচের নলটির স্টপকক সাবধানে খুলে প্রথমে সমস্ত জল আলাদা পাত্রে বের করে নেওয়া হয়। বিভেদতলটি ছিপির মুখে পৌঁছানো মাত্রই কক বন্ধ করে দিলে তেল ও জল সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়।

৩. রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রকারভেদ ও সমীকরণ (Chemical Reactions)

ধাপ ১১: প্রত্যক্ষ সংযোগ বা সংশ্লেষ বিক্রিয়া (Direct Combination / Synthesis)

যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় দুই বা ততোধিক মৌল বা যৌগ পরস্পর প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে একটিমাত্র নতুন যৌগিক পদার্থ উৎপন্ন করে, তাকে সংশ্লেষ বা প্রত্যক্ষ সংযোগ বিক্রিয়া বলে:

$$\mathbf{A + B \longrightarrow AB}$$

  • ম্যাগনেসিয়াম ফিতার দহন: উজ্জ্বল সাদা আলো সহকারে জ্বলে ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইডের সাদা গুঁড়ো উৎপন্ন করে:
    $$২Mg + O_২ \longrightarrow ২MgO$$
  • কার্বনের দহন: কয়লা বাতাসে পুড়ে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস তৈরি করে:
    $$C + O_২ \longrightarrow CO_২$$
  • পোড়াচুনে জল সংযোজন: পোড়াচুন জলের সাথে বিক্রিয়া করে কলিচুন উৎপন্ন করে:
    $$CaO + H_২O \longrightarrow Ca(OH)_২$$
ধাপ ১২: বিয়োজন বা বিশ্লেষণ বিক্রিয়া (Decomposition Reaction)

যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোনো একটিমাত্র যৌগিক পদার্থ তাপ, আলো বা তড়িৎ শক্তির প্রভাবে ভেঙে গিয়ে দুই বা ততোধিক সরলতর মৌল বা যৌগ গঠন করে, তাকে বিয়োজন বিক্রিয়া বলে:

$$\mathbf{AB \xrightarrow{\text{শক্তি}} A + B}$$

  • পটাশিয়াম ক্লোরেটের তাপীয় বিয়োজন: $MnO_২$ অনুঘটকের উপস্থিতিতে উত্তপ্ত করলে অক্সিজেন গ্যাস নির্গত হয়:
    $$২KClO_৩ \xrightarrow{\Delta, MnO_২} ২KCl + ৩O_২ \uparrow$$
  • চুনাপাথরের তাপীয় বিয়োজন: তীব্র উত্তাপে চুনাপাথর ভেঙে পোড়াচুন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড হয়:
    $$CaCO_৩ \xrightarrow{\Delta \approx ১০০০^\circ\text{C}} CaO + CO_২ \uparrow$$
  • জলের তড়িৎ বিশ্লেষণ: অ্যাসিডযুক্ত জলের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ পাঠালে আয়তনের হিসেবে $২:১$ অনুপাতে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন পাওয়া যায়:
    $$২H_২O \xrightarrow{\text{তড়িৎপ্রবাহ}} ২H_২ \uparrow (\text{ক্যাথোড}) + O_২ \uparrow (\text{অ্যানোড})$$
ধাপ ১৩: প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া ও সক্রিয়তা শ্রেণি (Displacement Reaction)

যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় কোনো যৌগের একটি উপাদানকে অপর একটি অধিকতর সক্রিয় মৌল অপসারিত করে নিজে সেই স্থান দখল করে, তাকে প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া বলে:

$$\mathbf{A + BC \longrightarrow AC + B}$$

  • কপার সালফেট দ্রবণে লোহার পেরেক নিমজ্জন: উজ্জ্বল নীল কপার সালফেট ($CuSO_৪$) দ্রবণে একটি পরিষ্কার লোহার পেরেক ডুবিয়ে রাখলে কিছুক্ষণ পর দ্রবণের নীল বর্ণ বিবর্ণ হয়ে হালকা সবুজ ফেরাস সালফেটে ($FeSO_৪$) পরিণত হয় এবং পেরেকের গায়ে লালচে-বাদামি তামার ($Cu$) আস্তরণ পড়ে:
    $$Fe + CuSO_৪ \longrightarrow FeSO_৪ + Cu \downarrow$$
  • জিঙ্ক ও লঘু সালফিউরিক অ্যাসিডের বিক্রিয়া: জিঙ্ক হাইড্রোজেনকে প্রতিস্থাপিত করে হাইড্রোজেন গ্যাস মুক্ত করে:
    $$Zn + H_২SO_৪ \longrightarrow ZnSO_৪ + H_২ \uparrow$$
  • সক্রিয়তা শ্রেণির ভিত্তি: তড়িৎ-রাসায়নিক সক্রিয়তা শ্রেণিতে লোহা ও জিঙ্ক তামার ও হাইড্রোজেনের ওপরে অবস্থান করায় ($Zn > Fe > H > Cu$) এরা কপার ও হাইড্রোজেনকে সহজে স্থানচ্যুত করতে পারে।
ধাপ ১৪: দ্বি-বিয়োজন বা অধঃক্ষেপণ বিক্রিয়া (Double Displacement & Precipitation)

যে বিক্রিয়ায় দুটি ভিন্ন যৌগের জলীয় দ্রবণ পরস্পর বিক্রিয়া করে তাদের মূলক বা আয়নগুলিকে পারস্পরিক বিনিময় ঘটিয়ে দুটি নতুন যৌগ গঠন করে, তাকে দ্বি-বিয়োজন বিক্রিয়া বলে। উৎপন্ন যৌগগুলির একটি অদ্রবণীয় কঠিন হিসেবে তলায় থিতিয়ে পড়লে তাকে অধঃক্ষেপণ বিক্রিয়া বলে:

$$\mathbf{AB + CD \longrightarrow AD + CB \downarrow}$$

  • সিলভার নাইট্রেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইড: দুটি বর্ণহীন দ্রবণ মেশালে সাথে সাথে সিলভার ক্লোরাইডের সাদা থকথকে অধঃক্ষেপ পড়ে:
    $$AgNO_৩ + NaCl \longrightarrow AgCl \downarrow (\text{সাদা অধঃক্ষেপ}) + NaNO_৩$$
  • বেরিয়াম ক্লোরাইড ও সালফিউরিক অ্যাসিড: বেরিয়াম সালফেটের ভারী সাদা অধঃক্ষেপ তৈরি হয়:
    $$BaCl_২ + H_২SO_৪ \longrightarrow BaSO_৪ \downarrow (\text{ভারী সাদা}) + ২HCl$$
  • লেড নাইট্রেট ও পটাশিয়াম আয়োডাইড: উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের লেড আয়োডাইডের অধঃক্ষেপ সৃষ্টি হয়:
    $$Pb(NO_৩)_২ + ২KI \longrightarrow PbI_২ \downarrow (\text{হলুদ অধঃক্ষেপ}) + ২KNO_৩$$
ধাপ ১৫: প্রশমন বিক্রিয়া (Neutralization Reaction)

একটি বিশেষ ধরনের দ্বি-বিয়োজন বিক্রিয়া যেখানে সমতুল্য পরিমাণ অ্যাসিড ও ক্ষার পরস্পর বিক্রিয়া করে তাদের নিজ নিজ ধর্ম সম্পূর্ণ লোপ ঘটিয়ে প্রশম লবণ ও জল তৈরি করে এবং তাপ উৎপন্ন করে:

$$\mathbf{\text{অ্যাসিড} + \text{ক্ষার} \longrightarrow \text{লবণ} + \text{জল} + \text{প্রশমন তাপ}}$$

$$HCl + NaOH \longrightarrow NaCl + H_২O$$

আয়নীয় তত্ত্বানুসারে প্রশমন হলো প্রকৃতপক্ষে অ্যাসিডের $H^+$ আয়ন ও ক্ষারের $OH^-$ আয়নের সংযোগে জলের অণু গঠন: $\mathbf{H^+ + OH^- \longrightarrow H_২O}$।

৪. বিক্রিয়ায় শক্তির রূপান্তর ও অনুঘটন (Energy Changes & Catalysis)

ধাপ ১৬: তাপমোচী বিক্রিয়া (Exothermic Reaction)

যেসব রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ফলে রাসায়নিক শক্তি তাপশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে পরিবেশে তাপ নির্গত হয় (বিক্রিয়া এনথ্যালপি $\Delta H < 0$), তাদের তাপমোচী বিক্রিয়া বলে। এতে পাত্রের উষ্ণতা বাড়ে।

  • পোড়াচুনে জল ঢালা: পোড়াচুন বা চুনকাম করার চুন পাথরে জল দিলে টগবগ করে ফোটে এবং তীব্র তাপ নির্গত হয়:
    $$CaO + H_২O \longrightarrow Ca(OH)_২ + \text{প্রচুর তাপ}$$
  • কার্বন বা প্রাকৃতিক গ্যাসের দহন: মিথেন গ্যাসের দহনে তাপ নির্গমন:
    $$CH_৪ + ২O_২ \longrightarrow CO_২ + ২H_২O + \text{তাপ}$$
  • জীবদেহে শ্বসন ক্রিয়া: কোশীয় গ্লুকোজ জারিত হয়ে তাপশক্তি ও এটিপি (ATP) তৈরি করে:
    $$C_৬H_{১২}O_৬ + ৬O_২ \longrightarrow ৬CO_২ + ৬H_২O + \text{শক্তি}$$
ধাপ ১৭: তাপগ্রাহী বিক্রিয়া (Endothermic Reaction)

যেসব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বাইরে থেকে তাপশক্তি শোষিত হয় (বিক্রিয়া এনথ্যালপি $\Delta H > 0$), তাদের তাপগ্রাহী বিক্রিয়া বলে। এতে বিক্রিয়া মিশ্রণ শীতল হয়ে পড়ে।

  • নাইট্রিক অক্সাইড গঠন: বজ্রপাতের সময় তীব্র তাপে বাতাসের নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন যুক্ত হয়ে নাইট্রিক অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন করে:
    $$N_২ + O_২ + \text{তাপ} \longrightarrow ২NO$$
  • জলে নিশাদল বা ইউরিয়া দ্রবীভূত হওয়া: জলে কঠিন অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড ($NH_৪Cl$) গুললে দ্রবণটি বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায় কারণ দ্রবীভবনে তাপ শোষিত হয়।
  • উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ: সৌরশক্তি শোষণ করে গ্লুকোজ সংশ্লেষ:
    $$৬CO_২ + ৬H_২O + \text{সৌরশক্তি} \xrightarrow{\text{ক্লোরোফিল}} C_৬H_{১২}O_৬ + ৬O_২$$
ধাপ ১৮: অনুঘটক ও অনুঘটনের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ

অনুঘটক (Catalyst): যে বহিরাগত পদার্থ কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার উপস্থিত থেকে বিক্রিয়ার বেগ বৃদ্ধি বা হ্রাস করে, কিন্তু বিক্রিয়া শেষে নিজে ভর ও রাসায়নিক গঠনে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকে, তাকে অনুঘটক বলে এবং এই ঘটনাকে অনুঘটন (Catalysis) বলে।

  • ধনাত্মক অনুঘটক (Positive Catalyst): যা বিক্রিয়ার সক্রিয়করণ শক্তি কমিয়ে বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। উদাহরণ: $KClO_৩$ থেকে অক্সিজেন তৈরিতে ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড ($MnO_২$) অনুঘটক বিক্রিয়ার উষ্ণতাকে ৬৫০°C থেকে কমিয়ে ২৫০°C-এ নামিয়ে আনে।
  • ঋণাত্মক অনুঘটক বা মন্থরক (Negative Catalyst / Inhibitor): যা বিক্রিয়ার বেগ কমিয়ে দেয়। উদাহরণ: হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ($H_২O_২$)-এর স্বতঃস্ফূর্ত বিয়োজন রোধ করতে সামান্য ফসফরিক অ্যাসিড বা অ্যাসিটানিলাইড মেশানো হয়।
  • অনুঘটক বিষ (Catalytic Poison): যা অনুঘটকের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয় (যেমন প্ল্যাটিনাম অনুঘটকের জন্য আর্সেনিক)।
ধাপ ১৯: অনুঘটকের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যসমূহ

অনুঘটকের গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ধর্মাবলি:

  1. ভর ও রাসায়নিক গঠনের অপরিবর্তনশীলতা: বিক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনুঘটকের মোট ভর এবং রাসায়নিক সংকেত ১০০% অপরিবর্তিত থাকে (তবে ভৌত অবস্থা বা কণার আকার চূর্ণবিচূর্ণ হতে পারে)।
  2. স্বল্প পরিমাণই যথেষ্ট: বিক্রিয়কের বিশাল পরিমাণের জন্য অতি সামান্য পরিমাণ অনুঘটকই কার্যকর হয়।
  3. বিক্রিয়া শুরু করতে অক্ষম: অনুঘটক নিজে কোনো বিক্রিয়া শুরু করতে পারে না; এটি কেবল চলমান বিক্রিয়ার বেগ দ্রুত বা ধীর করতে পারে।
  4. নির্দিষ্টতা (Specificity): একটি নির্দিষ্ট বিক্রিয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট অনুঘটকই কাজ করে; তা অন্য বিক্রিয়ায় কার্যকর হয় না।
ধাপ ২০: জীবদেহের অনুঘটক বা উৎসেচক (Enzymes)

উৎসেচক (Enzyme): সজীব কোশ দ্বারা উৎপাদিত জটিল প্রোটিনধর্মী জৈব অণু যা দেহের তাপমাত্রা ($৩৭^\circ\text{C}$)-তে জৈব-রাসায়নিক বিপাকীয় বিক্রিয়াগুলিকে বিদ্যুৎ গতিতে সম্পন্ন করে, তাদের জৈব অনুঘটক বা উৎসেচক বলে।

  • টায়ালিন (Ptyalin বা লালা-অ্যামাইলেজ): মানুষের লালারসে উপস্থিত উৎসেচক; যা চিবানোর সময় খাদ্যের অদ্রবণীয় জটিল শ্বেতসারকে মিষ্টি স্বাদযুক্ত দ্রবণীয় মল্টোজে রূপান্তরিত করে।
  • পেপসিন (Pepsin): পাকস্থলীর পাচক রসে উপস্থিত উৎসেচক; যা হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের অম্ল মাধ্যমে জটিল প্রোটিনকে পেপটনে ভেঙে পরিপাকে সাহায্য করে।
  • ইস্টের উৎসেচক (জাইমেজ ও ইনভার্টেজ): গ্লুকোজকে সন্ধান প্রক্রিয়ায় অ্যালকোহল ও কার্বন ডাইঅক্সাইডে পরিণত করে (পাউরুটি ও বেকিং শিল্পে ব্যবহৃত)।

৫. দ্রবণ, দ্রাব্যতা ও কলয়েডীয় দ্রবণ (Solutions & Colloidal Systems)

ধাপ ২১: দ্রবণের উপাদান ও সার্বজনীন দ্রাবক জল

দুই বা ততোধিক পদার্থের সমসত্ত্ব মিশ্রণ যার উপাদানগুলির আপেক্ষিক অনুপাত একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত পরিবর্তন করা যায়, তাকে দ্রবণ (Solution) বলে:

$$\mathbf{\text{দ্রবণ (Solution)} = \text{দ্রাব (Solute)} + \text{দ্রাবক (Solvent)}}$$

  • দ্রাব (Solute): দ্রবণে যে উপাদানটি সাধারণত কম পরিমাণে থাকে এবং দ্রবীভূত হয় (যেমন লবণ, চিনি)।
  • দ্রাবক (Solvent): দ্রবণে যে উপাদানটি বেশি পরিমাণে থাকে এবং যা দ্রবণের ভৌত অবস্থা নির্ধারণ করে (যেমন জল)।
  • জল কেন সার্বজনীন দ্রাবক? জলের উচ্চ পরাবৈদ্যুতিক ধ্রুবক (Dielectric Constant $\epsilon \approx ৮০$) এবং ধ্রুবীয় গঠন ($H_২O$) থাকে, যার ফলে এটি তড়িৎযোজী যৌগের আয়নগুলির মধ্যকার আকর্ষণ বলকে দুর্বল করে তাদের দ্রবীভূত করতে পারে। তাই পৃথিবীতে জল সর্বাধিক সংখ্যক পদার্থকে দ্রবীভূত করতে পারে।
ধাপ ২২: সম্পৃক্ত, অসম্পৃক্ত ও অতিপৃক্ত দ্রবণ

নির্দিষ্ট উষ্ণতায় দ্রাবের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে দ্রবণ তিন প্রকার:

  • অসম্পৃক্ত দ্রবণ (Unsaturated): যে দ্রবণে ওই নির্দিষ্ট উষ্ণতায় আরও অতিরিক্ত দ্রাব দ্রবীভূত করা সম্ভব।
  • সম্পৃক্ত দ্রবণ (Saturated): নির্দিষ্ট উষ্ণতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ দ্রাবকে সর্বাধিক পরিমাণ দ্রাব দ্রবীভূত থাকার পর যখন দ্রবণ এবং অদ্রবীভূত দ্রাবের মধ্যে একটি সাম্যাবস্থা বিরাজ করে।
  • অতিপৃক্ত দ্রবণ (Supersaturated): বিশেষ অবস্থায় সম্পৃক্ত দ্রবণের চেয়েও বেশি পরিমাণ দ্রাব দ্রবীভূত থাকা একটি অত্যন্ত অস্থির দ্রবণ (বাইরে থেকে দ্রাবের একটি ছোট্ট দানা ফেললেই অতিরিক্ত দ্রাব তৎক্ষণাৎ কেলাসিত হয়ে তলানিতে জমা হয়)।
ধাপ ২৩: দ্রাব্যতার গাণিতিক সংজ্ঞা ও উষ্ণতার প্রভাব

দ্রাব্যতা (Solubility, $S$): নির্দিষ্ট উষ্ণতায় ১০০ গ্রাম দ্রাবককে সম্পৃক্ত দ্রবণে পরিণত করতে যত গ্রাম দ্রাবের প্রয়োজন হয়, সেই সংখ্যাকে ওই উষ্ণতায় ওই দ্রাবের দ্রাব্যতা বলে।

$$\mathbf{S = \frac{\text{দ্রাবের ভর } (w)}{\text{দ্রাবকের ভর } (W)} \times ১০০}$$

এককহীন রাশি: দ্রাব্যতা দুটি একই জাতীয় রাশির (ভর/ভর) অনুপাত হওয়ায় এর কোনো একক থাকে না।

কঠিনের দ্রাব্যতার ওপর উষ্ণতার প্রভাব:

  • সাধারণত উষ্ণতা বাড়লে কঠিনের দ্রাব্যতা বাড়ে (যেমন পটাশিয়াম নাইট্রেট $KNO_৩$, তুঁতে $CuSO_৪$)।
  • কিছু পদার্থের ক্ষেত্রে উষ্ণতা বাড়লে দ্রাব্যতা হ্রাস পায় (যেমন কলিচুন $Ca(OH)_২$ বা ক্যালশিয়াম সালফেট)।
  • খাদ্যলবণের ($NaCl$) দ্রাব্যতা উষ্ণতার পরিবর্তনে প্রায় অপরিবর্তিত থাকে।
  • গ্লবার লবণের ($Na_২SO_৪ \cdot ১০H_২O$) দ্রাব্যতা ৩২.৪°C পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং তারপর হ্রাস পেতে থাকে।
ধাপ ২৪: তরলে গ্যাসের দ্রাব্যতা ও হেনরির সূত্র

তরলে গ্যাসের দ্রবীভবন চাপ ও তাপমাত্রার সুনির্দিষ্ট নীতি মেনে চলে:

  • চাপের প্রভাব (হেনরির সূত্র): স্থির উষ্ণতায় নির্দিষ্ট আয়তনের তরলে কোনো গ্যাসের দ্রাব্যতা তার ওপর প্রযুক্ত চাপের সমানুপাতিক ($C = k \cdot P$)।
    বাস্তব প্রয়োগ: সোডাওয়াটার বা কোল্ড ড্রিংকসের বোতলে ৩-৪ গুণ অতিরিক্ত চাপে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস দ্রবীভূত করে ছিপি আটকানো হয়। ছিপি খুললেই চাপ কমে স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ($১\text{ atm}$) হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত দ্রবীভূত গ্যাস তীব্র হিস-হিস শব্দে ফেনার আকারে বেরিয়ে আসে।
  • উষ্ণতার প্রভাব: তরলে গ্যাসের দ্রাব্যতা উষ্ণতা বাড়লে সর্বদাই দ্রুত হ্রাস পায়। জল ফোটালে দ্রবীভূত সমস্ত অক্সিজেন ও বাতাস বেরিয়ে যায়। তাই ফুটিয়ে ঠান্ডা করা জল পান করলে বিস্বাদ লাগে এবং অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছ সেই জলে রাখলে অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়!
ধাপ ২৫: প্রকৃত দ্রবণ, কলয়েড, প্রলম্বন এবং টিন্ডাল প্রভাব

কণার ব্যাসের আকারের ওপর ভিত্তি করে মিশ্রণের তুলনা:

ধর্মপ্রকৃত দ্রবণ (True Solution)কলয়েড (Colloid)প্রলম্বন (Suspension)
কণার ব্যাস$< ১০^{-৮}\text{ cm}$ ($< ০.১\text{ nm}$)$১০^{-৭}\text{ cm} - ১০^{-৫}\text{ cm}$ ($১ - ১০০\text{ nm}$)$> ১০^{-৫}\text{ cm}$ ($> ১০০\text{ nm}$)
স্বচ্ছতা ও সমসত্ত্বতাস্বচ্ছ ও সম্পূর্ণ সমসত্ত্বঈষৎ অস্বচ্ছ ও অসমসত্ত্ব (বিস্তার মাধ্যম + বিস্তৃত দশা)অস্বচ্ছ ও অসমসত্ত্ব
স্থায়িত্বসম্পূর্ণ স্থায়ী; কণা কখনোই নিচে থিতিয়ে পড়ে নাব্রাউনীয় গতি ও আধানের কারণে স্থায়ীঅস্থায়ী; কিছুক্ষণ রাখলে কণাগুলি নিচে থিতিয়ে পড়ে
টিন্ডাল প্রভাবদেখা যায় নাস্পষ্ট দেখা যায়কখনো কখনো দেখা যায়, তবে অস্বচ্ছ
বাস্তব উদাহরণজলে চিনি বা লবণের দ্রবণদুধ, রক্ত, আঠা, কুয়াশা, ধোঁয়া, স্টার্চের দ্রবণকাদাজল, চকের গুঁড়ো মেশানো জল

টিন্ডাল প্রভাব (Tyndall Effect): কলয়েডীয় দ্রবণের মধ্য দিয়ে তীব্র আলোক রশ্মি পাঠালে কলয়েড কণাগুলি দ্বারা আলো চারদিকে বিচ্ছুরিত হয়, যার ফলে আলোর গতিপথ স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ঘন জঙ্গলের গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বা ধুলোময় সিনেমা হলের প্রজেক্টর থেকে আসা আলোর উজ্জ্বল পথ হলো এর প্রত্যক্ষ প্রাকৃতিক রূপ।

গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সমীকরণ, বিক্রিয়া ও সূত্র

দ্রাব্যতার গাণিতিক সূত্র
S = {w}{W} × ১০০ = {দ্রাবের ভর (g)}{দ্রাবকের ভর (g)} × ১০০
১০০ গ্রাম দ্রাবককে সম্পৃক্ত করতে প্রয়োজনীয় দ্রাবের ভর। এটি এককহীন রাশি।
প্রত্যক্ষ সংযোগ বা সংশ্লেষ বিক্রিয়া
A + B AB (যেমন: ২Mg + O_২ → ২MgO)
দুই বা ততোধিক উপাদান যুক্ত হয়ে একটিমাত্র যৌগ উৎপন্ন করে।
পটাশিয়াম ক্লোরেটের তাপীয় বিয়োজন
২KClO_৩ →{, MnO_২} ২KCl + ৩O_২
ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড (MnO₂) অনুঘটকের উপস্থিতিতে অক্সিজেন প্রস্তুতি।
একক প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ার সমীকরণ
Fe + CuSO_৪ FeSO_৪ + Cu
লোহা তামা অপেক্ষা অধিক সক্রিয় হওয়ায় কপারকে প্রতিস্থাপিত করে।
দ্বি-বিয়োজন ও অধঃক্ষেপণ বিক্রিয়া
AgNO_৩ + NaCl AgCl (সাদা) + NaNO_৩
মূলক বিনিময়ের মাধ্যমে অদ্রবণীয় সিলভার ক্লোরাইডের অধঃক্ষেপ তৈরি।
তাপমোচী বিক্রিয়ার সমীকরণ
CaO + H_২O Ca(OH)_২ + তাপ ( H < ০)
পোড়াচুনে জল দিলে প্রচুর তাপশক্তি পরিবেশে মুক্ত হয়।
তাপগ্রাহী বিক্রিয়ার সমীকরণ
N_২ + O_২ + তাপ ২NO ( H > ০)
বজ্রপাতের উচ্চ তাপে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন যুক্ত হয়ে নাইট্রিক অক্সাইড গঠন।
তরলে গ্যাসের দ্রাব্যতায় হেনরির সূত্র
C = k · P (দ্রাব্যতা প্রযুক্ত চাপ)
চাপ বাড়লে তরলে গ্যাসের দ্রাব্যতা সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
৩০°C উষ্ণতায় ৫০ গ্রাম জলে ১৫ গ্রাম কপার সালফেট দ্রবীভূত হয়ে একটি সম্পৃক্ত দ্রবণ তৈরি করে। ওই উষ্ণতায় কপার সালফেটের দ্রাব্যতা কত হবে নির্ণয় করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

প্রদত্ত:
দ্রাবের ভর (কপার সালফেট) $w = ১৫\text{ গ্রাম}$।
দ্রাবকের ভর (জল) $W = ৫০\text{ গ্রাম}$।
উষ্ণতা $T = ৩০^\circ\text{C}$।

সূত্র:
$$\text{দ্রাব্যতা } (S) = \frac{\text{দ্রাবের ভর } (w)}{\text{দ্রাবকের ভর } (W)} \times ১০০$$

$$S = \frac{১৫}{৫০} \times ১০০ = ১৫ \times ২ = \mathbf{৩০}$$

উত্তর: ৩০°C উষ্ণতায় কপার সালফেটের দ্রাব্যতা হলো ৩০ (দ্রাব্যতা দুটি একই এককের ভরের অনুপাত হওয়ায় এর কোনো একক নেই)।

উদাহরণ 2
একটি পরিষ্কার লোহার পেরেক নীল রঙের কপার সালফেট দ্রবণে ৩০ মিনিট ডুবিয়ে রাখলে কী কী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে? সমীকরণ সহ ব্যাখ্যা করো এবং বিক্রিয়ার ধরন উল্লেখ করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

পর্যবেক্ষণ:

  1. কপার সালফেট ($CuSO_৪$) দ্রবণের মূল উজ্জ্বল নীল বর্ণ ক্রমশ ফিকে হয়ে হালকা সবুজ বর্ণে রূপান্তরিত হয়, কারণ দ্রবণে ফেরাস সালফেট ($FeSO_৪$) উৎপন্ন হয়।
  2. লোহার পেরেকের ওপর লালচে-বাদামি রঙের ধাতব তামার ($Cu$) একটি স্পঞ্জের মতো আস্তরণ জমা হয়।

সমীকরণ:
$$\mathbf{Fe (s) + CuSO_৪ (aq) \longrightarrow FeSO_৪ (aq) + Cu (s) \downarrow}$$

বিক্রিয়ার প্রকৃতি: এটি একটি প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া (Displacement Reaction)। তড়িৎ-রাসায়নিক সক্রিয়তা শ্রেণিতে লোহা ($Fe$) তামার ($Cu$) ওপরে অবস্থান করায় লোহা তামার চেয়ে বেশি সক্রিয়। ফলে লোহা কপার সালফেট থেকে কপারকে স্থানচ্যুত করে নিজে ফেরাস সালফেট তৈরি করে।

উদাহরণ 3
নিচের পরিবর্তনগুলিকে ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তনে শ্রেণিভুক্ত করো এবং প্রত্যেকের কারণ লেখো: (ক) মোমের গলন, (খ) মোমের দহন, (গ) লোহায় মরিচা ধরা, (ঘ) জলে খাদ্যলবণ দ্রবীভূত করা, (ঙ) দুধ কেটে ছানা হওয়া।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

শ্রেণিবিভাগ ও কারণ:

  • (ক) মোমের গলন: ভৌত পরিবর্তন। কঠিন মোম গলে তরল হয়, কোনো নতুন পদার্থ সৃষ্টি হয় না এবং ঠান্ডা করলে পূর্বের কঠিন মোম ফিরে পাওয়া যায়।
  • (খ) মোমের দহন: রাসায়নিক পরিবর্তন। মোম অক্সিজেনে পুড়ে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জলীয় বাষ্পে পরিণত হয়, যা থেকে পুনরায় মোম তৈরি করা অসম্ভব।
  • (গ) লোহায় মরিচা ধরা: রাসায়নিক পরিবর্তন। লোহা বাতাসের অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া করে নতুন পদার্থ শমিত ফেরিক অক্সাইড ($Fe_২O_৩ \cdot xH_২O$) তৈরি করে।
  • (ঘ) জলে খাদ্যলবণ দ্রবীভূত করা: ভৌত পরিবর্তন। লবণের অণুগুলি আয়নিত হয়ে জলে ছড়িয়ে পড়ে, জল বাষ্পীভূত করলে পুনরায় ১০০% মূল লবণ ফিরে পাওয়া যায়।
  • (ঙ) দুধ কেটে ছানা হওয়া: রাসায়নিক পরিবর্তন। ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে ল্যাকটোজ ল্যাকটিক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়ে দুধের প্রোটিন কেসিনকে জমাট বাঁধায়; ছানা থেকে আর দুধ পাওয়া যায় না।
উদাহরণ 4
খাদ্যলবণ (NaCl), নিশাদল (NH₄Cl) এবং বালির একটি মিশ্রণ থেকে উপাদানগুলিকে তুমি কীভাবে পরীক্ষাগারে পৃথক করবে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ধাপে ধাপে পৃথকীকরণ পদ্ধতি:

  1. ১ম ধাপ: ঊর্ধ্বপাতন দ্বারা নিশাদল পৃথকীকরণ:
    মিশ্রণটিকে একটি চিনামাটির বেসিনে রেখে তার ওপর একটি উল্টানো কাচের ফানেল বসিয়ে ফানেলের নলের মুখ তুলো দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বেসিনে বুনসেন বার্নারের সাহায্যে মৃদু উত্তাপ দিলে নিশাদল ($NH_৪Cl$) ঊর্ধ্বপাতিত হয়ে বাষ্পে পরিণত হয় এবং ফানেলের ঠান্ডা গায়ে কঠিন সাদা গুঁড়ো হিসেবে জমা হয়। ফানেলটি সরিয়ে নিলেই বিশুদ্ধ নিশাদল আলাদা হয়ে যায়। পাত্রে পড়ে থাকে লবণ ও বালি।
  2. ২য় ধাপ: দ্রবণ তৈরি ও পরিস্রাবণ দ্বারা বালি পৃথকীকরণ:
    অবশিষ্ট লবণ ও বালির মিশ্রণে পর্যাপ্ত জল যোগ করে ভালো করে নাড়ানো হয়। লবণ সম্পূর্ণ জলে দ্রবীভূত হয় কিন্তু বালি অদ্রবণীয় থেকে যায়। এবার ফিল্টার পেপার যুক্ত ফানেলের মধ্য দিয়ে মিশ্রণটি ঢাললে অদ্রবণীয় বালি ফিল্টার পেপারের ওপর অবশেষ (Residue) হিসেবে জমা হয়।
  3. ৩য় ধাপ: বাষ্পীভবন দ্বারা লবণ পুনরুদ্ধার:
    নিচে সংগৃহীত পরিষ্কার দ্রবণটিকে উত্তপ্ত করে জল সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত করে উড়িয়ে দিলে পাত্রের তলায় বিশুদ্ধ কঠিন খাদ্যলবণের সাদা কেলাস পড়ে থাকে।
উদাহরণ 5
ফুটিয়ে ঠান্ডা করা জল পান করলে বিস্বাদ লাগে কেন এবং ওই জলে অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছ বাঁচতে পারে না কেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

গ্যাসের দ্রাব্যতার ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:

  • প্রাকৃতিক পানীয় জলে বায়ুমণ্ডলের গ্যাস—বিশেষ করে অক্সিজেন ($O_২$) ও কার্বন ডাইঅক্সাইড ($CO_২$) দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে, যা জলকে সতেজ ও সুস্বাদু স্বাদ প্রদান করে।
  • তরলে গ্যাসের দ্রাব্যতা তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে দ্রুত কমে যায়। জল যখন ১০০°C-এ ফোটানো হয়, তখন জলের সমস্ত দ্রবীভূত অক্সিজেন ও বাতাস বুদবুদ আকারে বের হয়ে বায়ুমণ্ডলে চলে যায়।
  • ফলে ফোটানো জল ঠান্ডা করার পরও তাতে দ্রবীভূত গ্যাস না থাকায় তা পান করতে অত্যন্ত বিস্বাদ ও অস্বস্তিকর লাগে।
  • অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছ শ্বাসকার্যের জন্য জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। ফুটানো ঠান্ডা জলে কোনো দ্রবীভূত অক্সিজেন না থাকায় মাছ ফুলকার সাহায্যে শ্বাস নিতে পারে না এবং অক্সিজেনের অভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যায়।
উদাহরণ 6
পটাশিয়াম ক্লোরেট (KClO₃) থেকে পরীক্ষাগারে অক্সিজেন প্রস্তুতিতে ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড (MnO₂)-এর ভূমিকা কী? বিক্রিয়ায় এটি কি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

$MnO_২$-এর ভূমিকা:

  • বিশুদ্ধ পটাশিয়াম ক্লোরেটকে একা উত্তপ্ত করলে অক্সিজেন পেতে প্রায় ৬৫০°C উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয় এবং বিক্রিয়া অত্যন্ত ধীর গতিতে চলে।
  • কিন্তু ৪ ভাগ $KClO_৩$-এর সাথে ১ ভাগ ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড ($MnO_২$) গুঁড়ো মিশিয়ে উত্তপ্ত করলে এটি একটি শক্তিশালী ধনাত্মক অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এটি বিক্রিয়ার সক্রিয়করণ শক্তি কমিয়ে মাত্র ২৫০°C তাপমাত্রাতেই দ্রুত গতিতে প্রচুর অক্সিজেন নির্গত করতে সাহায্য করে।
  • $$২KClO_৩ \xrightarrow{২৫০^\circ\text{C}, MnO_২} ২KCl + ৩O_২ \uparrow$$
  • এটি কি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়? না। বিক্রিয়া শেষে অনুঘটক $MnO_২$-এর ভর এবং রাসায়নিক সংকেতে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। বিক্রিয়া শেষে সম্পূর্ণ $MnO_২$ অপরিবর্তিত অবস্থায় উদ্ধার করা যায়।
উদাহরণ 7
টিন্ডাল প্রভাব কী? ঘন বনের পাতার ফাঁক দিয়ে বা ধূলিময় সিনেমা হলে আলোর পথ কেন স্পষ্ট দেখা যায়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

সংজ্ঞা: কোনো কলয়েডীয় দ্রবণের মধ্য দিয়ে আলোক রশ্মি পাঠালে কলয়েড কণাগুলি দ্বারা আলোকরশ্মির বিচ্ছুরণ ঘটে এবং সেই কারণে দর্শকের চোখে আলোর গতিপথ একটি উজ্জ্বল আলোকিত শঙ্কুর আকারে স্পষ্ট দেখা যায়; একে টিন্ডাল প্রভাব (Tyndall Effect) বলে।

কারণ:

  • সাধারণ নুন-জলের মতো প্রকৃত দ্রবণে কণার ব্যাস $< ০.১\text{ nm}$ হওয়ায় তারা দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তুলনায় অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং আলো বিচ্ছুরিত করতে পারে না।
  • কিন্তু ধূলিময় ঘরে বা বনের কুয়াশায় বাতাসে ভেসে থাকা ধূলিকণা বা জলকণাগুলির ব্যাস কলয়েডীয় পরিসীমায় (১ nm থেকে ১০০ nm) থাকে।
  • যখন এদের মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো বা প্রজেক্টরের তীব্র আলো প্রবেশ করে, কণাগুলি সেই আলোকে চারদিকে ছড়িয়ে দেয় (Scattering of Light), ফলে পুরো আলোর পথটি উজ্জ্বলভাবে চোখে ধরা পড়ে।
উদাহরণ 8
জৈব অনুঘটক বা উৎসেচক কাকে বলে? মানুষের লালারসে উপস্থিত উৎসেচকের নাম কী এবং পরিপাকে এর ভূমিকা কী?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

উৎসেচক (Enzyme): সজীব কোশ দ্বারা উৎপাদিত নাইট্রোজেনঘটিত জটিল প্রোটিনধর্মী জৈব যৌগ যা দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় জীবদেহের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি করে, তাদের জৈব অনুঘটক বা উৎসেচক বলে।

লালারসের উৎসেচক: মানুষের লালারসে উপস্থিত প্রধান উৎসেচকটির নাম হলো টায়ালিন (Ptyalin বা Salivary Amylase)।

পরিপাকে ভূমিকা: মুখগহ্বরে খাদ্য চর্বণ করার সময় টায়ালিন অদ্রবণীয় জটিল শ্বেতসার জাতীয় খাদ্যকে ভেঙে সহজ দ্রবণীয় ডাইস্যাকারাইড শর্করা মল্টোজে রূপান্তরিত করে:
$$\text{অদ্রবণীয় শ্বেতসার} + H_২O \xrightarrow{\text{টায়ালিন}} \text{দ্রবণীয় মল্টোজ}$$
এই কারণেই শুকনো ভাত বা রুটি কিছুক্ষণ মুখে দিয়ে চিবোলে মুখে বেশ মিষ্টি স্বাদ অনুভূত হয়!

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

সমস্ত ধাতুকে শক্ত কঠিন পদার্থ এবং সমস্ত অধাতুকে গ্যাস বা কঠিন মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

পারদ (Hg) সাধারণ উষ্ণতায় তরল ধাতু; ব্রোমিন (Br₂) সাধারণ উষ্ণতায় তরল অধাতু। সোডিয়াম ও পটাশিয়াম নরম ধাতু যা ছুরি দিয়ে কাটা যায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

অধাতু কখনোই তাপ বা বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে না বলে ধরে নেওয়া।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

গ্রাফাইট ও গ্যাস কার্বন অধাতু হওয়া সত্ত্বেও মুক্ত ইলেকট্রনের কারণে বিদ্যুতের চমৎকার সুপরিবাহী। হিরে অধাতু হয়েও তাপের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পরিবাহী।

সাধারণ ভুল ধারণা

দ্রাব্যতার কোনো একক লেখা (যেমন 'গ্রাম' বা 'গ্রাম/লিটার')।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

দ্রাব্যতা হলো ১০০ গ্রাম দ্রাবকে দ্রবীভূত দ্রাবের ভর: $S = (w/W) \times ১০০$। এটি একই রাশির (ভরের) অনুপাত হওয়ায় এটি একটি এককহীন সংখ্যা।

সাধারণ ভুল ধারণা

মোমবাতির দহনকে কেবল ভৌত পরিবর্তন অথবা কেবল রাসায়নিক পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

মোমবাতি জ্বললে একই সাথে দুটি পরিবর্তনই ঘটে: মোম গলে যাওয়া হলো ভৌত পরিবর্তন, আর মোমের বাষ্প পুড়ে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও জলীয় বাষ্প হওয়া হলো স্থায়ী রাসায়নিক পরিবর্তন।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে অনুঘটক এমন বিক্রিয়া শুরু করতে পারে যা নিজে থেকে ঘটে না।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অনুঘটক নিজে কোনো বিক্রিয়া শুরু করতে পারে না ($\Delta G > ০$ বিক্রিয়া ঘটতে পারে না)। এটি কেবল একটি সম্ভাব্য স্বতঃস্ফূর্ত বিক্রিয়ার গতিবেগ বৃদ্ধি বা হ্রাস করতে পারে।

সাধারণ ভুল ধারণা

জল গরম করলে তাতে গ্যাসের দ্রাব্যতা বৃদ্ধি পায় বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

উষ্ণতা বাড়লে তরলে গ্যাসের দ্রাব্যতা দ্রুত হ্রাস পায়। এই কারণেই ফোটানো জলে কোনো গ্যাস থাকে না।

সাধারণ ভুল ধারণা

নুন-জলের মতো স্বচ্ছ প্রকৃত দ্রবণেও টিন্ডাল প্রভাব দেখা যাবে বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

প্রকৃত দ্রবণের কণা ($< ০.১\text{ nm}$) আলোর চেয়ে ছোট হওয়ায় আলো বিচ্ছুরণ করতে পারে না। শুধুমাত্র কলয়েডীয় দ্রবণেই (১-১০০ nm) টিন্ডাল প্রভাব দেখা যায়।

পদার্থের প্রকৃতি – রসায়নের চার স্তম্ভের ধারণাগত মানচিত্র (Concept Map)

পদার্থের প্রকৃতি (Nature of Matter) – অষ্টম শ্রেণি পরিবেশ ও বিজ্ঞান (WBBSE) চারটি মূল রসায়ন স্তম্ভ: মৌল ও যৌগ • ভৌত/রাসায়নিক পরিবর্তন • বিক্রিয়ার প্রকারভেদ • দ্রবণ ও কলয়েড ১. মৌলিক ও যৌগিক পদার্থ এবং ধাতু-অধাতু ধাতুর অনন্য ধর্মাবলি: ধাতব দ্যুতি • ঘাতসহনশীলতা • নমনীয়তা • সুপরিবাহিতা গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমসমূহ: তরল ধাতু: পারদ (Hg) • তরল অধাতু: ব্রোমিন (Br₂) যৌগ বনাম মিশ্রণ: নির্দিষ্ট ভর অনুপাত (H₂O) বনাম অনির্দিষ্ট অনুপাত (বায়ু) ★ তড়িৎ পরিবাহী অধাতু: গ্রাফাইট ও গ্যাস কার্বন • কঠিনতম: হিরে ২. ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তন এবং উপাদান পৃথকীকরণ ভৌত বনাম রাসায়নিক: উভমুখী (বরফ গলা) বনাম একমুখী চিরস্থায়ী (মরিচা ধরা) ঊর্ধ্বপাতন (Sublimation): কর্পূর • আয়োডিন • ন্যাপথালিন • নিশাদল (NH₄Cl) পৃথকীকরণ পদ্ধতিসমূহ: পরিস্রাবণ • বাষ্পীভবন • পাতন • বিয়োজী ফানেল ★ বিয়োজী ফানেলের সাহায্যে অমিশ্রণীয় তরল পৃথকীকরণ (তেল ও জল) ৩. রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রকারভেদ ও অনুঘটন চার প্রকার বিক্রিয়া: সংশ্লেষ • বিয়োজন • প্রতিস্থাপন • দ্বি-বিয়োজন প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া: Fe + CuSO₄ → FeSO₄ + Cu (নীল দ্রবণ সবুজ হয়) শক্তির পরিবর্তন: তাপমোচী (চুনে জল CaO+H₂O) বনাম তাপগ্রাহী (N₂+O₂) অনুঘটক ও উৎসেচক: O₂ প্রস্তুতিতে MnO₂ • লালারসের টায়ালিন (Ptyalin) ৪. দ্রবণ, দ্রাব্যতা ও কলয়েডীয় দ্রবণ দ্রাব্যতার সূত্র: দ্রাব্যতা S = (দ্রাবের ভর / দ্রাবকের ভর) × ১০০ তরলে গ্যাসের দ্রাব্যতা: চাপ বাড়লে দ্রাব্যতা বাড়ে (হেনরির সূত্র, সোডাওয়াটার) কণার ব্যাসের মাত্রা: প্রকৃত দ্রবণ (<০.১ nm) • কলয়েড (১-১০০ nm) • প্রলম্বন টিন্ডাল প্রভাব: কলয়েড কণা কর্তৃক আলো বিচ্ছুরণ • ব্রাউনীয় গতি

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
পদার্থের ভৌত অবস্থা অণুগুলির মধ্যকার আন্তঃআণবিক আকর্ষণ বল ও তাপীয় দূরত্বের ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল।
মূল বিষয় 2
ধাতুসমূহ ঘাতসহনশীল, নমনীয় ও পরিবাহী। প্রধান ব্যতিক্রম: তরল পারদ ও ব্রোমিন, নরম সোডিয়াম ও পটাশিয়াম, পরিবাহী গ্রাফাইট এবং কঠিনতম হিরে।
মূল বিষয় 3
যৌগে উপাদানসমূহ নির্দিষ্ট ভরের অনুপাতে যুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্মের সৃষ্টি করে (জল আগুন নেভায়); মিশ্রণে উপাদান নিজ নিজ ধর্ম অক্ষুণ্ণ রাখে।
মূল বিষয় 4
ভৌত পরিবর্তন অস্থায়ী ও উভমুখী; রাসায়নিক পরিবর্তন স্থায়ী ও নতুন পদার্থ গঠনকারী।
মূল বিষয় 5
চার প্রকার বিক্রিয়া: প্রত্যক্ষ সংযোগ (A+B→AB), বিয়োজন (AB→A+B), প্রতিস্থাপন (Fe+CuSO₄→FeSO₄+Cu) এবং দ্বি-বিয়োজন (AgNO₃+NaCl→AgCl↓+NaNO₃)।
মূল বিষয় 6
তাপমোচী বিক্রিয়ায় তাপ মুক্ত হয় (পোড়াচুনে জল); তাপগ্রাহী বিক্রিয়ায় তাপ শোষিত হয় (বজ্রপাতে NO)। অনুঘটক নিজে অপরিবর্তিত থেকে বিক্রিয়ার বেগ নিয়ন্ত্রণ করে।
মূল বিষয় 7
দ্রাব্যতা S = (w/W) × ১০০ একটি এককহীন রাশি। চাপ বাড়লে গ্যাসের দ্রাব্যতা বাড়ে (হেনরির সূত্র) এবং উষ্ণতা বাড়লে কমে।
মূল বিষয় 8
কলয়েড কণা (১-১০০ nm) আলো বিচ্ছুরণ করে টিন্ডাল প্রভাব সৃষ্টি করে; প্রকৃত দ্রবণে (<০.১ nm) টিন্ডাল প্রভাব দেখা যায় না।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
২৫°C উষ্ণতায় ৪০ গ্রাম জলে ১২ গ্রাম পটাশিয়াম নাইট্রেট দ্রবীভূত হয়ে একটি সম্পৃক্ত দ্রবণ তৈরি করে। ২৫°C উষ্ণতায় পটাশিয়াম নাইট্রেটের দ্রাব্যতা কত?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

$$S = \frac{w}{W} \times ১০০ = \frac{১২}{৪০} \times ১০০ = \frac{৩}{১০} \times ১০০ = \mathbf{৩০}$$

২৫°C উষ্ণতায় পটাশিয়াম নাইট্রেটের দ্রাব্যতা হলো ৩০।


2
প্রতিটি ক্ষেত্রে বিক্রিয়ার ধরন চিহ্নিত করো: (ক) 2Mg + O₂ → 2MgO, (খ) CaCO₃ → CaO + CO₂, (গ) Zn + 2HCl → ZnCl₂ + H₂, (ঘ) BaCl₂ + Na₂SO₄ → BaSO₄↓ + 2NaCl।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

(ক) প্রত্যক্ষ সংযোগ বা সংশ্লেষ বিক্রিয়া (দুটি মৌল যুক্ত হয়ে একটি যৌগ)।
(খ) তাপীয় বিয়োজন বিক্রিয়া (একটি যৌগ ভেঙে দুটি পদার্থ)।
(গ) একক প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া (জিঙ্ক হাইড্রোজেনকে স্থানচ্যুত করেছে)।
(ঘ) দ্বি-বিয়োজন বা অধঃক্ষেপণ বিক্রিয়া (আয়ন বিনিময়ে অদ্রবণীয় BaSO₄-এর সাদা অধঃক্ষেপ)।


3
ঊর্ধ্বপাতন ঘটে এমন দুটি কঠিন পদার্থের নাম লেখো। ঊর্ধ্বপাতনের সাথে সাধারণ বাষ্পীভবনের মূল পার্থক্য কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

১. পদার্থ: কর্পূর ও নিশাদল ($NH_৪Cl$) [অথবা আয়োডিন, ন্যাপথালিন]।
২. পার্থক্য: ঊর্ধ্বপাতনে কঠিন পদার্থ সরাসরি কঠিন থেকে বাষ্পে রূপান্তরিত হয় তরল না হয়ে; বাষ্পীভবনে তরল পদার্থ বাষ্পে পরিণত হয়।


4
দুধকে প্রকৃত দ্রবণ না বলে কলয়েডীয় ইমালশন বলা হয় কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

দুধে তরল চর্বির কণাগুলি (বিস্তৃত দশা) জলে (বিস্তার মাধ্যম) এমনভাবে ছড়িয়ে থাকে যার ব্যাস ১ nm থেকে ১০০ nm-এর মধ্যে থাকে। এই কণাগুলি আলো বিচ্ছুরণ করে টিন্ডাল প্রভাব দেখায় এবং পার্চমেন্ট কাগজের মধ্য দিয়ে যেতে পারে না। তাই দুধ একটি কলয়েডীয় ইমালশন (তরলে তরল)।


5
সোডাওয়াটার বোতলের ছিপি খুললে হিস-হিস শব্দ করে প্রচুর গ্যাস বেরিয়ে আসে কেন? কোন সূত্রের সাহায্যে এটি ব্যাখ্যা করা যায়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

সূত্র: হেনরির সূত্র, যা অনুসারে তরলে গ্যাসের দ্রাব্যতা প্রযুক্ত চাপের সমানুপাতিক ($C = kP$)।

ব্যাখ্যা: বোতল তৈরির সময় ৩-৪ গুণ উচ্চ চাপে $CO_২$ দ্রবীভূত করা থাকে। ছিপি খোলামাত্র চাপ কমে স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ($১\text{ atm}$) হয়ে যায়। ফলে দ্রাব্যতা হঠাৎ কমে গিয়ে অতিরিক্ত গ্যাস হিস-হিস শব্দ সহকারে তীব্র ফেনায় বের হয়ে আসে।


অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

পদার্থের প্রকৃতি অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।