মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থই অসংখ্য অতিসূক্ষ্ম অবিভাজ্য বা বিভাজ্য কণা—পরমাণু ও অণু দ্বারা গঠিত। পদার্থের যেকোনো ভৌত অবস্থা (কঠিন, তরল বা গ্যাস) দুটি বিপরীতধর্মী উপাদানের প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভর করে:
- আন্তঃআণবিক আকর্ষণ বল ($F_{\text{inter}}$): পাশাপাশি অবস্থিত কণাগুলির মধ্যকার পারস্পরিক আকর্ষণ বল যা তাদের কাছাকাছি বেঁধে রাখে।
- আন্তঃআণবিক স্থান ও তাপীয় গতিশক্তি ($r_{\text{inter}}$): উষ্ণতার কারণে কণাগুলির মধ্যকার কম্পন ও গতিবেগ যা তাদের পরস্পর থেকে দূরে ঠেলে দিতে চায়।
- কঠিন পদার্থ: আকর্ষণ বল সর্বাধিক, কণাগুলি সুসংবদ্ধ ল্যাটিসে কেবল নিজ স্থানে কাঁপে; ফলে নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন থাকে।
- তরল পদার্থ: আকর্ষণ বল মাঝারি; কণাগুলি স্থান পরিবর্তন করতে পারে, তাই নির্দিষ্ট আয়তন থাকলেও নির্দিষ্ট আকার থাকে না।
- গ্যাসীয় পদার্থ: আকর্ষণ বল নেই বললেই চলে; কণাগুলি তীব্র গতিতে ইতস্তত ছোটাছুটি করে এবং যে পাত্রেই রাখা হোক তার সম্পূর্ণ আয়তন দখল করে।
যে বিশুদ্ধ পদার্থকে কোনো সাধারণ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ভেঙে একাধিক ভিন্ন ধর্মবিশিষ্ট নতুন পদার্থে পরিণত করা যায় না, তাকে মৌল (Element) বলে।
- ধাতু (Metals): সাধারণত উচ্চ ঘনত্বযুক্ত, চকচকে, বিদ্যুৎ ও তাপের সুপরিবাহী এবং ধনাত্মক আয়ন (ক্যাটায়ন) গঠনকারী মৌল (যেমন তামা, লোহা, সোনা)।
- অধাতু (Non-metals): ঋণাত্মক আয়ন (অ্যানায়ন) গঠনকারী, ভঙ্গুর, বিদ্যুৎ ও তাপের অপরিবাহী মৌল (যেমন অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, সালফার)।
- ধাতুকল্প (Metalloids): যে মৌলগুলির মধ্যে ধাতু ও অধাতু উভয়েরই কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য বর্তমান থাকে, তাদের ধাতুকল্প বলে। উদাহরণ: আর্সেনিক (As), অ্যান্টিমনি (Sb), সিলিকন (Si) ও জার্মেনিয়াম (Ge)।
- নিষ্ক্রিয় গ্যাস (Noble Gases): যেসব গ্যাসের পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ কক্ষ ইলেকট্রন দ্বারা সম্পূর্ণ পূর্ণ থাকে এবং যারা সাধারণ অবস্থায় কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয় না: হিলিয়াম (He), নিয়ন (Ne), আর্গন (Ar), ক্রিপ্টন (Kr), জেনন (Xe) ও রেডন (Rn)।
ধাতুসমূহ চারটি স্বতন্ত্র যান্ত্রিক ও ভৌত ধর্ম প্রদর্শন করে:
- ধাতব দ্যুতি (Metallic Luster): মুক্ত ইলেকট্রনগুলির আলোর সাথে মিথস্ক্রিয়ার কারণে ধাতুর সদ্য কাটা পৃষ্ঠ উজ্জ্বল চকচকে দেখায়।
- ঘাতসহনশীলতা (Malleability): আঘাত করে ধাতুকে গুঁড়িয়ে না ফেলে পিটিয়ে পাতলা পাতে বা ফয়েলে পরিণত করার ক্ষমতা। সোনা (Au) এবং রুপো (Ag) পৃথিবীর সবচেয়ে ঘাতসহনশীল ধাতু (সোনার পাতকে মাত্র ০.০০০০০১ মিমি পর্যন্ত পাতলা করা সম্ভব)।
- নমনীয়তা বা প্রসার্যতা (Ductility): টেনে লম্বা ও অতিসূক্ষ্ম তারে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা। প্ল্যাটিনাম (Pt) ও তামা (Cu) অত্যন্ত প্রসার্য ধাতু (মাত্র ১ গ্রাম প্ল্যাটিনাম থেকে প্রায় ২ কিমি দীর্ঘ সূক্ষ্ম তার তৈরি করা যায়)।
- নিনাদধর্মিতা ও সুপরিবাহিতা (Sonority & Conductivity): আঘাত করলে দীর্ঘস্থায়ী সুমিষ্ট ধ্বনি উৎপন্ন করে (ঘণ্টা ও বাদ্যযন্ত্রের তারে ব্যবহৃত) এবং মুক্ত ইলেকট্রন দ্বারা দ্রুত তাপ ও বিদ্যুৎ পরিবহন করে (রুপো সেরা পরিবাহী, তার পরেই তামা ও অ্যালুমিনিয়াম)।
বোর্ড ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রমগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
| ধর্ম | সাধারণ নিয়ম | অনন্য ব্যতিক্রমী মৌলসমূহ |
|---|---|---|
| ধাতুর ভৌত অবস্থা | সাধারণ উষ্ণতায় সমস্ত ধাতু কঠিন | পারদ (Mercury, Hg) সাধারণ উষ্ণতায় একমাত্র তরল ধাতু; গ্যালিয়াম (Ga) ও সিজিয়াম (Cs) হাতের তালুর গরমে গলে যায় ($৩০^\circ\text{C}$)। |
| অধাতুর ভৌত অবস্থা | অধাতু কঠিন অথবা গ্যাসীয় হয় | ব্রোমিন (Bromine, Br₂) সাধারণ উষ্ণতায় একমাত্র তরল অধাতু (লালচে-বাদামি রঙের)। |
| ধাতুর কাঠিন্য | ধাতু অত্যন্ত শক্ত ও ভারী হয় | সোডিয়াম (Na) ও পটাশিয়াম (K) মাখনের মতো নরম ধাতু, সাধারণ ছুরি দিয়েই সহজে কাটা যায় এবং জলের চেয়ে হালকা। |
| অধাতুর বিদ্যুৎ পরিবাহিতা | অধাতু বিদ্যুতের কুপরিবাহী | গ্রাফাইট ও গ্যাস কার্বন (কার্বনের রূপভেদ) মুক্ত ইলেকট্রনের উপস্থিতির কারণে চমৎকার বিদ্যুৎ পরিবাহী। |
| অধাতুর তাপ পরিবাহিতা | অধাতু তাপের কুপরিবাহী | হিরে (কার্বনের রূপভেদ) তাপের অত্যন্ত উত্তম পরিবাহী (তামার চেয়েও ৫ গুণ বেশি পরিবাহী) এবং পৃথিবীর কঠিনতম প্রাকৃতিক পদার্থ। |
| অধাতুর উজ্জ্বলতা | অধাতু অনুজ্জ্বল ও দীপ্তিহীন | আয়োডিন (I₂) ও গ্রাফাইট ধাতুর মতো ঝকঝকে উজ্জ্বল দ্যুতি প্রদর্শন করে। |
মৌলিক পদার্থের মিশ্রণ এবং তাদের রাসায়নিক মিলনের পার্থক্য অনুধাবন করা আবশ্যক:
- যৌগিক পদার্থ (Compound): দুই বা ততোধিক মৌল নির্দিষ্ট ভরের অনুপাতে রাসায়নিকভাবে যুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট পদার্থ গঠন করে। উদাহরণ: জল ($H_2O$)-এ হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের ভরের অনুপাত সর্বদা $১:৮$ ($২\text{ g } H : ১৬\text{ g } O$)।
- উদ্ভবের নতুন বৈশিষ্ট্য: যৌগের ধর্ম তার উপাদান মৌলগুলির ধর্মের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হাইড্রোজেন নিজে অতিমাত্রায় দাহ্য গ্যাস; অক্সিজেন নিজে জ্বলতে না পারলেও অন্যকে জ্বলতে সাহায্য করে। অথচ এদের মিলনে উৎপন্ন যৌগ 'জল' আগুন নেভাতে সাহায্য করে!
- মিশ্রণ (Mixture): দুই বা ততোধিক পদার্থ যেকোনো অনুপাতে একত্রে মিশে থাকলে এবং তারা পরস্পরের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া না করে নিজ নিজ ধর্ম বজায় রাখলে তাকে মিশ্রণ বলে (যেমন বায়ু, নুন-জলের দ্রবণ, লোহা ও গন্ধকের গুঁড়োর মিশ্রণ)। এদের উপাদানগুলিকে সাধারণ ভৌত পদ্ধতিতে পৃথক করা যায়।