Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Science • অধ্যায় 3
আনুমানিক সময়: ৫৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

কয়েকটি পরিচিত গ্যাস

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির "পরিবেশ ও বিজ্ঞান" পাঠ্যক্রমের অধ্যায়: "কয়েকটি পরিচিত গ্যাস"-এর সম্পূর্ণ প্রামাণ্য মাস্টার স্টাডি গাইড। এই অধ্যায়ে বায়ুমণ্ডলের ও মানবজীবনের চারটি অপরিহার্য গ্যাস—অক্সিজেন (O₂), হাইড্রোজেন (H₂), কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) এবং নাইট্রোজেন (N₂)—এর পরীক্ষাগার প্রস্তুতি, অনুঘটকের ভূমিকা, ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম, অক্সাইডের শ্রেণিবিভাগ, মরিচা নিবারণ, বিজারক ধর্ম, চুনজলের দুই পর্যায়ের বিক্রিয়া, মার্বেল কুচির সঙ্গে অ্যাসিডের বিক্রিয়া, নাইট্রোজেনের ত্রিবন্ধন ও রাসায়নিক নিষ্ক্রিয়তা, প্রাকৃতিক ও জীবাণুঘটিত নাইট্রোজেন সংবন্ধন, গ্রিনহাউস প্রভাব, পাথরের কুষ্ঠ সৃষ্টিকারী অ্যাসিড বৃষ্টি এবং সিএফসি (CFC) দ্বারা ওজোন স্তরের ক্ষয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। অধ্যায়টিতে রয়েছে ২৫টি শিক্ষণীয় ধাপ, ভেক্টর কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি সুষম রাসায়নিক সমীকরণ কার্ড, ৮টি আদর্শ সমাধানকৃত উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষক সতর্কবার্তা, ৮টি টেক-অ্যাওয়ে ও অনলাইন সিবিটি মক টেস্ট অনুশীলন।

💨 পরিবেশের অদৃশ্য কারিগর: জীবনদায়ী অক্সিজেন থেকে পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফুয়েল

একটি বর্ণহীন গন্ধহীন গ্যাসে শিখাহীন পাটকাঠি প্রবেশ করালে কেন তা দপ করে জ্বলে ওঠে, অন্য একটি গ্যাসে তীব্র "পপ" শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং তৃতীয়টিতে চুনজল দুধের মতো ঘোলা হয়ে যায়?

যে গ্যাস আমাদের প্রাণ বাঁচায়, সেই গ্যাসই কেন সুবিশাল লোহার সেতুতে মরিচা ধরিয়ে ধ্বংস করে দেয়? কঠিন কার্বন ডাইঅক্সাইড এক ফোঁটাও না ভিজে সরাসরি বাষ্পে পরিণত হয় কেন, আর বায়ুমণ্ডলের ৭৮% দখল করে থাকা একটি গ্যাস উদ্ভিদের প্রধান খাদ্যে পরিণত হয় কীভাবে?

এই সমস্ত রোমাঞ্চকর প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আমাদের কয়েকটি পরিচিত গ্যাস অধ্যায়ে: অক্সিজেন (O₂), হাইড্রোজেন (H₂), কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) এবং নাইট্রোজেন (N₂)। এসো, ধাপে ধাপে এদের বিজ্ঞান আমরা আয়ত্ত করি!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির "পরিবেশ ও বিজ্ঞান" পাঠ্যক্রমের অধ্যায়: "কয়েকটি পরিচিত গ্যাস"-এর সম্পূর্ণ প্রামাণ্য মাস্টার স্টাডি গাইড। এই অধ্যায়ে বায়ুমণ্ডলের ও মানবজীবনের চারটি অপরিহার্য গ্যাস—অক্সিজেন (O₂), হাইড্রোজেন (H₂), কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) এবং নাইট্রোজেন (N₂)—এর পরীক্ষাগার প্রস্তুতি, অনুঘটকের ভূমিকা, ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম, অক্সাইডের শ্রেণিবিভাগ, মরিচা নিবারণ, বিজারক ধর্ম, চুনজলের দুই পর্যায়ের বিক্রিয়া, মার্বেল কুচির সঙ্গে অ্যাসিডের বিক্রিয়া, নাইট্রোজেনের ত্রিবন্ধন ও রাসায়নিক নিষ্ক্রিয়তা, প্রাকৃতিক ও জীবাণুঘটিত নাইট্রোজেন সংবন্ধন, গ্রিনহাউস প্রভাব, পাথরের কুষ্ঠ সৃষ্টিকারী অ্যাসিড বৃষ্টি এবং সিএফসি (CFC) দ্বারা ওজোন স্তরের ক্ষয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। অধ্যায়টিতে রয়েছে ২৫টি শিক্ষণীয় ধাপ, ভেক্টর কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি সুষম রাসায়নিক সমীকরণ কার্ড, ৮টি আদর্শ সমাধানকৃত উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষক সতর্কবার্তা, ৮টি টেক-অ্যাওয়ে ও অনলাইন সিবিটি মক টেস্ট অনুশীলন।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • সপ্তম শ্রেণির ভৌত ও রাসায়নিক পরিবর্তন এবং পরমাণুর মৌলিক ধারণা।
  • মৌলের প্রতীক (O, H, C, N, Mn, K, Zn, Ca) ও সাধারণ সংকেতের পরিচয়।
  • পদার্থের ভৌত অবস্থা (কঠিন, তরল, গ্যাসীয়) ও দ্রবণ সম্পর্কে ধারণা।
  • অ্যাসিড, ক্ষারক ও নির্দেশক (লিটমাস পেপারের বর্ণ পরিবর্তন) সম্পর্কিত প্রাথমিক জ্ঞান।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • পটাশিয়াম ক্লোরেট ও হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড থেকে অক্সিজেন প্রস্তুতির সমীকরণ ও অনুঘটকের ক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • দানাযুক্ত দস্তা ও লঘু H₂SO₄ থেকে হাইড্রোজেন প্রস্তুতি ও এর বিজারক ধর্ম প্রমাণ করতে পারবে।
  • মার্বেল কুচি ও লঘু HCl থেকে CO₂ প্রস্তুতি এবং চুনজলের দুই পর্যায়ের সমীকরণ বিশ্লেষণ করতে পারবে।
  • নাইট্রোজেন অণুর ত্রিবন্ধন (N≡N) ও এর রাসায়নিক নিষ্ক্রিয়তার কারণ বুঝতে পারবে।
  • চারটি প্রধান গ্যাসের পরীক্ষাগার শনাক্তকরণ পার্থক্য সারণি প্রস্তুত করতে পারবে।
  • গ্রিনহাউস প্রভাব, বিশ্ব উষ্ণায়ন, অ্যাসিড বৃষ্টি ও ওজোন স্তর ক্ষয়ের কার্যকারণ ব্যাখ্যা করতে পারবে।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. অক্সিজেন (O₂) — পরীক্ষাগার প্রস্...
2 ২. হাইড্রোজেন (H₂) — পরীক্ষাগার প্র...
3 ৩. কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) — প্রস্ত...
4 ৪. নাইট্রোজেন (N₂) ও পরীক্ষাগারে গ্...
5 ৫. পরিবেশ রসায়ন — গ্রিনহাউস প্রভাব...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. অক্সিজেন (O₂) — পরীক্ষাগার প্রস্তুতি, অনুঘটক, অক্সাইডের রূপভেদ ও মরিচা

১.১ আবিষ্কার, উপস্থিতি ও ভৌত ধর্ম

শুষ্ক বায়ুতে আয়তন হিসেবে প্রায় ২০.৯৫% এবং ভর হিসেবে প্রায় ২৩% অক্সিজেন ($\text{O}_2$) গ্যাস থাকে। জলে ভর হিসেবে প্রায় ৮৯% অক্সিজেন বিদ্যমান। বিজ্ঞানী কার্ল উইলহেম শিলে (১৭৭২) এবং জোসেফ প্রিস্টলে (১৭৭৪) স্বতন্ত্রভাবে এই গ্যাস আবিষ্কার করেন। বিজ্ঞানী ল্যাভয়সিয়ে ১৭৭৭ সালে এর নাম দেন "অক্সিজেন" (যার অর্থ অম্ল উৎপাদক)।

ভৌত ধর্ম: অক্সিজেন বর্ণহীন, গন্ধহীন ও স্বাদহীন গ্যাস। এটি বাতাসের চেয়ে সামান্য ভারী (বাষ্প ঘনত্ব ১৬, বায়ুর বাষ্প ঘনত্ব ১৪.৪)। এটি জলে সামান্য পরিমাণে দ্রবীভূত হয় (২০°সে উষ্ণতায় ১০০ সেমি³ জলে প্রায় ৩ সেমি³ অক্সিজেন দ্রবীভূত থাকে), যা জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। এটি -১৮৩°সে উষ্ণতায় হালকা নীল তরলে এবং -২১৮.৮°সে উষ্ণতায় নীলাভ কঠিনে পরিণত হয়।

১.২ পরীক্ষাগার প্রস্তুতি: পটাশিয়াম ক্লোরেটের তাপীয় বিয়োজন

পরীক্ষাগারে অক্সিজেন প্রস্তুত করতে কঠিন ও শুষ্ক পটাশিয়াম ক্লোরেট ($\text{KClO}_3$) এবং ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড ($\text{MnO}_2$) কে ৪:১ ভর অনুপাতে মিশিয়ে একটি শক্ত কাচের টেস্টটিউবে ২০০°সে - ২৪০°সে উষ্ণতায় উত্তপ্ত করা হয়।

$$\mathbf{2\text{KClO}_3 \\xrightarrow[\text{MnO}_2]{200^\circ\text{C} - 240^\circ\text{C}} 2\text{KCl} + 3\text{O}_2\\uparrow}$$

গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক যুক্তি: শুধু পটাশিয়াম ক্লোরেটকে উত্তপ্ত করলে প্রায় ৬৫০°সে উষ্ণতার প্রয়োজন হয় এবং এতে টেস্টটিউব গলে যাওয়ার বা বিস্ফোরণ ঘটার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু মিশ্রণে $\text{MnO}_2$ যোগ করলে বিয়োজন তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ২০০°-২৪০°সে-এ নেমে আসে এবং দ্রুত অক্সিজেন নির্গত হয়।

১.৩ অনুঘটক ও সাধারণ উষ্ণতায় বিকল্প প্রস্তুতি

অনুঘটকের সংজ্ঞা (Catalyst): যে পদার্থ কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সামান্য পরিমাণে উপস্থিত থেকে বিক্রিয়ার বেগ বাড়ায় বা কমায়, কিন্তু বিক্রিয়া শেষে নিজে ভরে ও রাসায়নিক গঠনে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকে, তাকে অনুঘটক বলে। এখানে $\text{MnO}_2$ হলো একটি ধন্যাত্মক অনুঘটক (Positive Catalyst)।

উত্তাপহীন প্রস্তুতি: কোনো তাপপ্রয়োগ ছাড়াই সাধারণ উষ্ণতায় হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড দ্রবণে ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড যোগ করলে দ্রুত অক্সিজেন তৈরি হয়:

$$\mathbf{2\text{H}_2\text{O}_2 \\xrightarrow{\text{MnO}_2} 2\text{H}_2\text{O} + \text{O}_2\\uparrow}$$

গ্যাস সংগ্রহ পদ্ধতি: অক্সিজেন গ্যাস জলের নিম্নমুখী অপসারণ দ্বারা (Downward displacement of water) গ্যাসজারে সংগ্রহ করা হয়, কারণ এটি জলে খুব সামান্য দ্রাব্য এবং জলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না। বাতাসের সঙ্গে এর ঘনত্বের পার্থক্য কম হওয়ায় বাতাসের অপসারণ দ্বারা সংগ্রহ করা হয় না।

১.৪ রাসায়নিক ধর্ম ও বিভিন্ন মৌলের দহন

অক্সিজেন নিজে জ্বলে না, কিন্তু দহনে প্রবল সহায়তা করে। একটি শিখাহীন জ্বলন্ত পাটকাঠি অক্সিজেনভর্তি গ্যাসজারে প্রবেশ করালে তা উজ্জ্বল শিখাসহ জ্বলে ওঠে।

  • কার্বন (C): স্ফুলিঙ্গসহ জ্বলে আম্লিক কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস তৈরি করে: $\text{C} + \text{O}_2 \\to \text{CO}_2$।
  • সালফার (S): উজ্জ্বল নীল শিখায় জ্বলে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন করে: $\text{S} + \text{O}_2 \\to \text{SO}_2$।
  • ম্যাগনেসিয়াম (Mg): চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল সাদা আলোয় জ্বলে ক্ষারীয় ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইডের সাদা গুঁড়ো তৈরি করে: $2\text{Mg} + \text{O}_2 \\to 2\text{MgO}$।
  • সোডিয়াম (Na): সোনালী হলুদ শিখায় জ্বলে ক্ষারীয় সোডিয়াম অক্সাইড ও পারঅক্সাইড উৎপন্ন করে: $4\text{Na} + \text{O}_2 \\to 2\text{Na}_2\text{O}$।
  • লোহা (Fe): লোহিত তপ্ত লোহার তার অক্সিজেনে স্ফুলিঙ্গ ছিটকে জ্বলে কালো ফেরোসো-ফেরিক অক্সাইড গঠন করে: $3\text{Fe} + 2\text{O}_2 \\to \text{Fe}_3\text{O}_4$।

১.৫ অক্সাইডের শ্রেণিবিভাগ ও লোহায় মরিচা পড়ার বিজ্ঞান

অক্সিজেনের সঙ্গে বিভিন্ন মৌলের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন অক্সাইডগুলোকে চার ভাগে ভাগ করা হয়:

অক্সাইডের শ্রেণিগঠনকারী মৌলউদাহরণজলে দ্রবীভূত রূপ ও প্রকৃতি
আম্লিক অক্সাইডঅধাতুসমূহ$\text{CO}_2, \text{SO}_2, \text{P}_2\text{O}_5$অ্যাসিড উৎপন্ন করে ($\text{H}_2\text{SO}_3$), নীল লিটমাস লাল হয়
ক্ষারীয় অক্সাইডধাতুসমূহ$\text{Na}_2\text{O}, \text{K}_2\text{O}, \text{MgO}, \text{CaO}$ক্ষার উৎপন্ন করে ($\text{NaOH}$), লাল লিটমাস নীল হয়
উভধর্মী অক্সাইডনির্দিষ্ট ধাতু$\text{ZnO}, \text{Al}_2\text{O}_3, \text{PbO}$অ্যাসিড ও ক্ষার উভয়ের সাথে বিক্রিয়া করে লবণ ও জল গঠন করে
প্রশম অক্সাইডনির্দিষ্ট অধাতু$\text{CO}, \text{N}_2\text{O}, \text{NO}, \text{H}_2\text{O}$অ্যাসিড বা ক্ষার কারো সঙ্গেই বিক্রিয়া করে না; লিটমাসে নিরপেক্ষ

লোহায় মরিচা পড়ার রহস্য (Rusting of Iron): সাধারণ বায়ুমণ্ডলে লোহা রেখে দিলে তার ওপর যে বাদামি রঙের ভঙ্গুর আস্তরণ পড়ে তাকে মরিচা বলে। মরিচা আসলে আর্দ্র ফেরিক অক্সাইড। মরিচা পড়ার জন্য অক্সিজেন এবং তরল জল বা জলীয় বাষ্প উভয়ের যুগপৎ উপস্থিতি আবশ্যক। শুষ্ক অক্সিজেন বা বাতাসহীন ফুটানো জলে লোহা কখনোই মরিচাধরা হয় না।

$$\mathbf{4\text{Fe} + 3\text{O}_2 + 2x\text{H}_2\text{O} \\longrightarrow 2\text{Fe}_2\text{O}_3 \cdot x\text{H}_2\text{O}\quad\text{(আর্দ্র ফেরিক অক্সাইড / মরিচা)}}$$

মরিচা নিবারণের উপায়: (১) লোহার ওপর তেল, গ্রিজ বা রঙের প্রলেপ দেওয়া, (২) গ্যালভানাইজেশন (Galvanization) — গলিত দস্তার (Zinc) পাতলা আস্তরণ দেওয়া, (৩) ক্রোমিয়াম বা নিকেলের তড়িৎলেপন।

২. হাইড্রোজেন (H₂) — পরীক্ষাগার প্রস্তুতি, দানাযুক্ত দস্তা, পপ টেস্ট ও বিজারণ

২.১ উপস্থিতি, লঘুতম বৈশিষ্ট্য ও পরিচয়

হাইড্রোজেন ($\text{H}_2$) হলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে হালকা এবং সর্বাধিক প্রাচুর্যপূর্ণ মৌল (সূর্য ও নক্ষত্রের প্রধান জ্বালানি)। ১৭৬৬ সালে বিজ্ঞানী হেনরি ক্যাভেন্ডিশ এটি আবিষ্কার করেন এবং একে "দাহ্য বাতাস" (Inflammable air) নাম দেন। বিজ্ঞানী ল্যাভয়সিয়ে এর নাম দেন হাইড্রোজেন (যার অর্থ জল উৎপাদক)।

ভৌত ধর্ম: হাইড্রোজেন বর্ণহীন, গন্ধহীন ও স্বাদহীন গ্যাস। এটি সমস্ত পদার্থের মধ্যে সবচেয়ে হালকা (ঘনত্ব মাত্র ০.০৮৯৯ গ্রাম/লিটার, বাতাসের ভরের প্রায় ১/১৪.৪ ভাগ)। এটি জলে প্রায় অদ্রাব্য (২০°সে তাপমাত্রায় ১০০ সেমি³ জলে মাত্র ২ সেমি³ হাইড্রোজেন দ্রবীভূত হতে পারে) এবং গ্রাহামের ব্যাপন সূত্রানুযায়ী এটি দ্রুততম গতিতে ব্যাপিত হয়।

২.২ পরীক্ষাগার প্রস্তুতি: দানাযুক্ত দস্তা ও লঘু সালফিউরিক অ্যাসিড

পরীক্ষাগারে সাধারণ উষ্ণতায় একটি উল্ফ বোতলে দানাযুক্ত দস্তা (Granulated Zinc) নিয়ে তাতে দীর্ঘনল ফানেলের সাহায্যে লঘু সালফিউরিক অ্যাসিড ($\text{H}_2\text{SO}_4$) ঢাললে বুদবুদ আকারে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। এতে কোনো তাপপ্রয়োগের প্রয়োজন হয় না।

$$\mathbf{\text{Zn} + \text{H}_2\text{SO}_4\text{ (লঘু)} \\longrightarrow \text{ZnSO}_4 + \text{H}_2\\uparrow}$$

বিশুদ্ধ দস্তার পরিবর্তে দানাযুক্ত দস্তা ব্যবহারের কারণ:

  • কপার অশুদ্ধির অনুঘটন: দানাযুক্ত দস্তায় সামান্য পরিমাণে কপার ($\text{Cu}$) অশুদ্ধি হিসেবে মিশে থাকে। অ্যাসিডের সংস্পর্শে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তড়িৎকোষ ($\text{Zn-Cu}$ কাপল) তৈরি হয়, যা অনুঘটকের মতো কাজ করে বিক্রিয়ার গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশুদ্ধ দস্তা খুব ধীরগতিতে বিক্রিয়া করে।
  • অধিক কার্যকরী পৃষ্ঠতল: গলিত দস্তাকে ঠান্ডা জলে ফেলে দানাযুক্ত দস্তা তৈরি করা হয়, ফলে এটি অনিয়মিত, খাঁজকাটা ও ছিদ্রযুক্ত হয় এবং অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়ার জন্য অনেক বেশি ক্ষেত্রফল উন্মুক্ত রাখে।

সতর্কতা: হাইড্রোজেন প্রস্তুতিতে কখনোই নাইট্রিক অ্যাসিড ($\text{HNO}_3$) ব্যবহার করা হয় না, কারণ নাইট্রিক অ্যাসিড তীব্র জারক পদার্থ; এটি উৎপন্ন হাইড্রোজেনকে জারিত করে সঙ্গে সঙ্গে জলে পরিণত করে এবং নিজে নাইট্রোজেনের অক্সাইডে ($\text{NO}_2, \text{NO}$) বিজারিত হয়।

২.৩ গ্যাস সংগ্রহ ও পরীক্ষাগারের সতর্কতা

হাইড্রোজেন গ্যাসকে জলের নিম্নমুখী অপসারণ দ্বারা গ্যাসজারে সংগ্রহ করা হয়। এটি বাতাসের চেয়ে হালকা হলেও বাতাসের নিম্নমুখী অপসারণ দ্বারা সংগ্রহ করা বিপজ্জনক, কারণ বাতাস ও হাইড্রোজেনের মিশ্রণ অত্যন্ত বিস্ফোরক।

জরুরি সতর্কতা: উল্ফ বোতলে দীর্ঘনল ফানেলের নিচের প্রান্তটি যেন সর্বদা অ্যাসিডের মধ্যে নিমজ্জিত থাকে। ফানেলের মুখ অ্যাসিডের ওপরে থাকলে উৎপন্ন হাইড্রোজেন গ্যাস ফানেল দিয়ে বাইরে বেরিয়ে ঘরে ছড়িয়ে পড়বে এবং মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।

২.৪ রাসায়নিক ধর্ম, পপ শব্দ পরীক্ষা ও দহন

হাইড্রোজেন একটি দাহ্য গ্যাস। এটি বাতাসে বা অক্সিজেনে হালকা নীল শিখায় জ্বলে জলীয় বাষ্প তৈরি করে এবং প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে:

$$\mathbf{2\text{H}_2 + \text{O}_2 \\longrightarrow 2\text{H}_2\text{O} + \text{প্রচুর তাপ}}$$

দহনে সহায়ক নয়: হাইড্রোজেনভর্তি উল্টানো গ্যাসজারের ভেতরে জ্বলন্ত মোমবাতি প্রবেশ করালে মোমবাতিটি নিভে যায়, কিন্তু গ্যাসজারের মুখে বাতাস পাওয়ার কারণে হাইড্রোজেন গ্যাস হালকা নীল শিখায় জ্বলতে থাকে।

শনাক্তকারী পপ পরীক্ষা (Pop Sound Test): টেস্টটিউবে সংগৃহীত হাইড্রোজেন গ্যাসের মুখে জ্বলন্ত কাঠি ধরলে এটি একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তীব্র "পপ" (Pop) শব্দ করে বিস্ফোরিত হয়ে জ্বলে ওঠে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে হাইড্রোজেন গ্যাস নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা হয়।

২.৫ বিজারণ ধর্ম ও শিল্পক্ষেত্রের তাৎপর্য

হাইড্রোজেন একটি শক্তিশালী বিজারক পদার্থ (Reducing Agent)। উত্তপ্ত কালো কপার অক্সাইডের ($\text{CuO}$) ওপর দিয়ে শুষ্ক হাইড্রোজেন গ্যাস চালনা করলে হাইড্রোজেন কপার অক্সাইড থেকে অক্সিজেন কেড়ে নিয়ে তাকে লালচে-বাদামি ধাতব তামায় বিজারিত করে, এবং নিজে জারিত হয়ে জলে পরিণত হয়:

$$\mathbf{\text{CuO}\text{ (কালো)} + \text{H}_2 \\xrightarrow{\Delta} \text{Cu}\text{ (লালচে-বাদামি তামা)} + \text{H}_2\text{O}}$$

প্রধান ব্যবহারসমূহ:

  • হেবার পদ্ধতিতে অ্যামোনিয়া তৈরি: $\text{N}_2 + 3\text{H}_2 \\xrightleftharpoons[\text{Fe / Mo}]{450^\circ\text{C}, 200\text{ atm}} 2\text{NH}_3$, যা ইউরিয়া ও সার উৎপাদনে প্রধান কাঁচামাল।
  • বনস্পতি ঘি প্রস্তুত (হাইড্রোজিনেশন): তরল উদ্ভিজ্জ তেলের সাথে নিকেল অনুঘটকের উপস্থিতিতে হাইড্রোজেন যোগ করে কঠিন বনস্পতি ঘি তৈরি করা হয়।
  • ভবিষ্যতের গ্রিন ফুয়েল: তরল হাইড্রোজেন রকেটের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর দহনে শুধুমাত্র জল উৎপন্ন হয়, কোনো কার্বন নির্গমন ঘটে না।

৩. কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) — প্রস্তুতি, চুনজলের বিক্রিয়া, অগ্নিনির্বাপক ও শুষ্ক বরফ

৩.১ বায়ুমণ্ডলীয় উপস্থিতি ও সাধারণ ধর্ম

বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড ($\text{CO}_2$) গ্যাসের পরিমাণ আয়তন হিসেবে মাত্র প্রায় ০.০৪% (প্রায় ৪২০ পিপিএম)। কম পরিমাণে থাকলেও সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের শর্করা তৈরিতে এবং পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভৌত ধর্ম: বর্ণহীন গ্যাস, মৃদু ঝাঁঝালো অম্লীয় গন্ধ ও স্বাদযুক্ত। এটি বাতাসের চেয়ে ১.৫৩ গুণ ভারী (বাষ্প ঘনত্ব ২২, বাতাসের ১৪.৪)। এটি জলে দ্রবণীয় (২০°সে তাপমাত্রায় ১ আয়তন জলে প্রায় ১ আয়তন $\text{CO}_2$ দ্রবীভূত হয়) এবং মৃদু কার্বনিক অ্যাসিড ($\text{H}_2\text{CO}_3$) গঠন করে।

৩.২ পরীক্ষাগার প্রস্তুতি: মার্বেল কুচি ও লঘু হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড

পরীক্ষাগারে উত্তাপ ছাড়াই সাধারণ উষ্ণতায় উল্ফ বোতলে বা কিপস যন্ত্রে মার্বেল কুচি (ক্যালসিয়াম কার্বনেট, $\text{CaCO}_3$) নিয়ে তাতে দীর্ঘনল ফানেল দিয়ে লঘু হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ($\text{HCl}$) ঢাললে তীব্র বুদবুদসহ কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়।

$$\mathbf{\text{CaCO}_3 + 2\text{HCl}\text{ (লঘু)} \\longrightarrow \text{CaCl}_2 + \text{H}_2\text{O} + \text{CO}_2\\uparrow}$$

পরীক্ষকের বিশেষ প্রশ্ন — লঘু সালফিউরিক অ্যাসিড কেন ব্যবহার করা হয় না?

মার্বেল কুচির ওপর লঘু $\text{H}_2\text{SO}_4$ ঢাললে প্রথমে সামান্য গ্যাস বের হয়েই বিক্রিয়াটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ বিক্রিয়ায় উৎপন্ন উপজাত ক্যালসিয়াম সালফেট ($\text{CaSO}_4$) জলে অত্যন্ত অদ্রাব্য। এটি মার্বেল কুচির ওপর একটি কঠিন, দুর্ভেদ্য আস্তরণ তৈরি করে অ্যাসিডের সাথে কার্বনেটের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়:

$$\text{CaCO}_3 + \text{H}_2\text{SO}_4 \\longrightarrow \mathbf{\text{CaSO}_4\\downarrow}\text{ (অদ্রবণীয় আস্তরণ)} + \text{H}_2\text{O} + \text{CO}_2\\uparrow$$

গ্যাস সংগ্রহ পদ্ধতি: $\text{CO}_2$ বাতাসের চেয়ে দেড়গুণ ভারী এবং জলে বেশ দ্রাব্য হওয়ায় একে বাতাসের ঊর্ধ্বমুখী অপসারণ দ্বারা (Upward displacement of air) সোজা গ্যাসজারে সংগ্রহ করা হয়।

৩.৩ স্বচ্ছ চুনজলের পরীক্ষা (দুই পর্যায়ের সুনির্দিষ্ট বিক্রিয়া)

কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস শনাক্তকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা হলো সদ্য প্রস্তুত স্বচ্ছ চুনজল [ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইড দ্রবণ, $\text{Ca(OH)}_2$]-এর মধ্য দিয়ে গ্যাসটি চালনা করা:

প্রথম পর্যায় (স্বল্প সময় গ্যাস চালনা): চুনজলের মধ্য দিয়ে অল্প সময় $\text{CO}_2$ চালনা করলে জলে অদ্রাব্য ক্যালসিয়াম কার্বনেটের সাদা অধঃক্ষেপ তৈরি হওয়ায় দ্রবণটি দুধের মতো ঘোলা হয়ে যায়:

$$\mathbf{\text{Ca(OH)}_2\text{ (aq)} + \text{CO}_2\text{ (g)} \\longrightarrow \text{CaCO}_3\\downarrow\text{ (সাদা অধঃক্ষেপ, ঘোলা)} + \text{H}_2\text{O}\text{ (l)}}$$

দ্বিতীয় পর্যায় (অতিরিক্ত সময় গ্যাস চালনা): ঘোলা দ্রবণের মধ্য দিয়ে একটানা অতিরিক্ত $\text{CO}_2$ চালনা করতে থাকলে অদ্রবণীয় ক্যালসিয়াম কার্বনেট দ্রাব্য ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটে রূপান্তরিত হয়, ফলে দ্রবণটি আবার সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও বর্ণহীন হয়ে যায়:

$$\mathbf{\text{CaCO}_3\\downarrow + \text{H}_2\text{O} + \text{CO}_2\text{ (অতিরিক্ত)} \\longrightarrow \text{Ca(HCO}_3)_2\text{ (জলে দ্রবণীয়, স্বচ্ছ)}}$$

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই স্বচ্ছ দ্রবণটিকে ফোটালে $\text{Ca(HCO}_3)_2$ বিয়োজিত হয়ে পুনরায় অদ্রাব্য $\text{CaCO}_3$ গঠন করে এবং দ্রবণটি আবার ঘোলা হয়ে যায়।

৩.৪ আগুন নেভানোর ভূমিকা ও জ্বলন্ত ম্যাগনেসিয়াম ফিতার ব্যতিক্রম

কার্বন ডাইঅক্সাইড নিজে দাহ্য নয় এবং দহনে সহায়তাও করে না। বাতাসের চেয়ে দেড়গুণ ভারী হওয়ায় এটি জ্বলন্ত বস্তুর ওপর বাতাসের কম্বলের মতো চেপে বসে অক্সিজেনের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এই কারণে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রে কার্বন ডাইঅক্সাইড ব্যবহৃত হয়।

জ্বলন্ত ম্যাগনেসিয়াম ফিতার ব্যতিক্রমী ঘটনা: $\text{CO}_2$ গ্যাসে জ্বলন্ত পাটকাঠি বা মোমবাতি সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেলেও একটি জ্বলন্ত ম্যাগনেসিয়াম ফিতা প্রবেশ করালে তা উজ্জ্বল আলো সহকারে জ্বলতেই থাকে এবং জারের গায়ে সাদা গুঁড়ো ও কালো দাগ পড়ে:

$$\mathbf{2\text{Mg} + \text{CO}_2 \\longrightarrow 2\text{MgO}\text{ (সাদা গুঁড়ো)} + \text{C}\text{ (কালো কার্বন কণা)}}$$

ম্যাগনেসিয়ামের অক্সিজেনের প্রতি তীব্র আকর্ষণ থাকে এবং এর জ্বলন উষ্ণতা ২০০০°সে-এর বেশি হওয়ায় এটি $\text{CO}_2$ অণুকে ভেঙে অক্সিজেন গ্রহণ করে ও মুক্ত কার্বন তৈরি করে।

৩.৫ শুষ্ক বরফ (Dry Ice) ও বাস্তব প্রয়োগ

উচ্চ চাপে ($>৫০\text{ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ}$) তরল কার্বন ডাইঅক্সাইডকে সরু ছিদ্র দিয়ে দ্রুত প্রসারিত করলে উষ্ণতা দ্রুত হ্রাস পেয়ে এটি বরফের মতো সাদা কঠিনে পরিণত হয়। একে শুষ্ক বরফ (Dry Ice) বলে।

  • ঊর্ধ্বপাতন (-৭৮.৫°সে): সাধারণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপে কঠিন $\text{CO}_2$ তরলে পরিণত না হয়ে সরাসরি বাষ্পে রূপান্তরিত হয় (ঊর্ধ্বপাতন ঘটে)। এটি কোনো বস্তুকে বা হাতকে ভেজায় না বলেই এর নাম "শুষ্ক" বরফ।
  • ব্যবহার: ওষুধ, প্রতিষেধক ও মাংস সংরক্ষণে হিমাঙ্ককারী হিসেবে, থিয়েটার বা মঞ্চে কৃত্রিম ঘন কুয়াশা সৃষ্টিতে, সোডা ওয়াটার ও কোমল পানীয় তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

৪. নাইট্রোজেন (N₂) ও পরীক্ষাগারে গ্যাস শনাক্তকরণের তুলনামূলক সারণি

৪.১ প্রাচুর্য ও ত্রিবন্ধনের সুদৃঢ় রাসায়নিক নিষ্ক্রিয়তা

বায়ুমণ্ডলে আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি থাকে নাইট্রোজেন ($\text{N}_2$) গ্যাস — প্রায় ৭৮.০৮%। ১৭৭২ সালে বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল রাদারফোর্ড এটি আবিষ্কার করেন। এর বাষ্প ঘনত্ব ১৪, অর্থাৎ বাতাসের (১৪.৪) চেয়ে সামান্য হালকা।

সাধারণ উষ্ণতায় নাইট্রোজেনের রাসায়নিক নিষ্ক্রিয়তার কারণ:

নাইট্রোজেনের অণুতে দুটি নাইট্রোজেন পরমাণু পরস্পরের সাথে তিনটি ইলেকট্রন জোড় শেয়ার করে একটি অত্যন্ত সুদৃঢ় সমযোজী ত্রিবন্ধন ($\mathbf{N \equiv N}$) গঠন করে। এই ত্রিবন্ধনটিকে ভাঙতে বিপুল পরিমাণ শক্তির (বন্ধন বিয়োজন শক্তি প্রায় ৯৪৫.৩ কিলোজুল/মোল) প্রয়োজন হয়। সাধারণ ঘরের উষ্ণতায় এই বিপুল শক্তি পাওয়া সম্ভব হয় না বলে নাইট্রোজেন প্রায় কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয় না এবং বাতাসের তীব্র অক্সিজেন দহনকে প্রশমিত করে রাখে।

৪.২ উচ্চ উষ্ণতায় বিক্রিয়া ও তড়িৎমোক্ষণ সংবন্ধন

প্রচণ্ড উচ্চ উষ্ণতায় ($৩০০০^\circ\text{সে}$) বা আকাশে মেঘে মেঘে যখন বিদ্যুৎ চমকায় (বজ্রপাত ঘটে), তখন নাইট্রোজেন অণুর ত্রিবন্ধন ভেঙে গিয়ে অক্সিজেনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়:

$$\mathbf{\text{N}_2 + \text{O}_2 \\xrightarrow{\text{বজ্রপাত} / ৩০০০^\circ\text{সে}} 2\text{NO}\text{ (নাইট্রিক অক্সাইড)}}$$ $$2\text{NO} + \text{O}_2 \\longrightarrow 2\text{NO}_2\text{ (নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড, বাদামি গ্যাস)}$$ $$4\text{NO}_2 + 2\text{H}_2\text{O} + \text{O}_2 \\longrightarrow 4\text{HNO}_3\text{ (বৃষ্টির জলে দ্রবীভূত নাইট্রিক অ্যাসিড)}$$

বৃষ্টির জলের সঙ্গে এই নাইট্রিক অ্যাসিড মাটিতে নেমে এসে মাটির ক্যালসিয়াম যৌগের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নাইট্রেট লবণে ($\text{Ca(NO}_3)_2$) পরিণত হয়, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধির পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান।

৪.৩ জীবাণুঘটিত নাইট্রোজেন সংবন্ধন ও নাইট্রোজেন চক্র

উদ্ভিদ সরাসরি বাতাস থেকে গ্যাসীয় নাইট্রোজেন গ্রহণ করতে পারে না। তারা নির্ভর করে:

  • মিথোজীবী ব্যাকটিরিয়া: শিম্বীগোত্রীয় উদ্ভিদের (মটর, ছোলা, ডাল) মূলের অর্বুদে বসবাসকারী রাইজোবিয়াম (Rhizobium) ব্যাকটিরিয়া বাতাস থেকে সরাসরি নাইট্রোজেন শোষণ করে নাইট্রেট যৌগে রূপান্তর করে।
  • স্বাধীনজীবী ব্যাকটিরিয়া: মাটির অ্যাজোটোব্যাকটর ও ক্লসট্রিডিয়াম এবং নীলচে-সবুজ শৈবাল যেমন অ্যানাবিনা ও নস্টক।
  • ডি-নাইট্রিফাইং ব্যাকটিরিয়া: সিউডোমোনাস ব্যাকটিরিয়া মাটির ক্ষয়িষ্ণু জৈব নাইট্রেট যৌগকে পুনরায় গ্যাসীয় নাইট্রোজেনে পরিণত করে বায়ুমণ্ডলে ফেরত পাঠায়, ফলে নাইট্রোজেন চক্রের ভারসাম্য রক্ষা পায়।

৪.৪ চারটি প্রধান গ্যাস শনাক্তকরণের মাস্টার সারণি

পরীক্ষাগারে চারটি আলাদা গ্যাসজারে রাখা অজানা গ্যাস শনাক্ত করার সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক সারণি নিচে দেওয়া হলো:

পরীক্ষাঅক্সিজেন ($\text{O}_2$)হাইড্রোজেন ($\text{H}_2$)কার্বন ডাইঅক্সাইড ($\text{CO}_2$)নাইট্রোজেন ($\text{N}_2$)
১. শিখাহীন জ্বলন্ত পাটকাঠি দপ করে জ্বলে ওঠে তীব্র 'পপ' শব্দে গ্যাসে বিস্ফোরণ, কাঠি নেভে তৎক্ষণাৎ নিভে যায় তৎক্ষণাৎ নিভে যায়
২. জারের মুখে মোমবাতি আরও উজ্জ্বলভাবে জ্বলে জারের মুখে গ্যাসটি হালকা নীল শিখায় জ্বলে মোমবাতি তৎক্ষণাৎ নিভে যায় নিঃশব্দে মোমবাতি নিভে যায়
৩. স্বচ্ছ চুনজল পরীক্ষা কোনো পরিবর্তন হয় না কোনো পরিবর্তন হয় না প্রথমে দুধের মতো ঘোলা, অতিরিক্ত গ্যাসে স্বচ্ছ কোনো পরিবর্তন হয় না
৪. আর্দ্র লিটমাস পরীক্ষা প্রশম (বর্ণ অপরিবর্তিত) প্রশম (বর্ণ অপরিবর্তিত) মৃদু আম্লিক (নীল লিটমাস সামান্য লাল হয়) প্রশম (বর্ণ অপরিবর্তিত)
৫. ক্ষারীয় পাইরোগ্যালেট দ্রবণ দ্রুত দ্রবণটিকে গাঢ় বাদামি করে কোনো পরিবর্তন নেই কোনো বর্ণ পরিবর্তন ছাড়াই শোষিত হয় কোনো বিক্রিয়া বা পরিবর্তন নেই

৫. পরিবেশ রসায়ন — গ্রিনহাউস প্রভাব, বিশ্ব উষ্ণায়ন, অ্যাসিড বৃষ্টি ও ওজোন স্তর ক্ষয়

৫.১ প্রাকৃতিক গ্রিনহাউস প্রভাব ও কৃত্রিম বিশ্ব উষ্ণায়ন

প্রাকৃতিক গ্রিনহাউস প্রভাব: সূর্য থেকে আসা ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকরশ্মি বায়ুমণ্ডল ভেদ করে সহজেই ভূ-পৃষ্ঠে আপতিত হয় এবং পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে। উত্তপ্ত ভূ-পৃষ্ঠ থেকে এই তাপ দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অবলোহিত বিকিরণ (ইনফ্রারেড রশ্মি) রূপে মহাশূন্যে ফিরে যেতে চায়। বায়ুমণ্ডলের নির্দিষ্ট কিছু গ্যাস এই অবলোহিত রশ্মি শোষণ করে পুনরায় ভূ-পৃষ্ঠের দিকে বিকিরিত করে। ফলে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা মানুষের বসবাসের উপযোগী ১৫°সে-এ স্থির থাকে (এই প্রভাব না থাকলে পৃথিবীর উষ্ণতা মাইনাস ১৮°সে হতো)।

প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাসসমূহ: কার্বন ডাইঅক্সাইড ($\text{CO}_2$), মিথেন ($\text{CH}_4$), নাইট্রাস অক্সাইড ($\text{N}_2\text{O}$), ক্লোরোফ্লুরোকার্বন ($\text{CFC}$) এবং জলীয় বাষ্প ($\text{H}_2\text{O}$)।

বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming): অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি দহন ও অরণ্য ধ্বংসের ফলে বায়ুমণ্ডলে $\text{CO}_2$-এর মাত্রা প্রাক-শিল্পযুগের ২৮০ পিপিএম থেকে বেড়ে বর্তমানে ৪২০ পিপিএম ছাড়িয়ে গেছে। ফলে অতিরিক্ত তাপ আটকে গিয়ে পৃথিবীর সামগ্রিক উষ্ণতা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এর ফলস্বরূপ মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চল প্লাবিত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

৫.২ অ্যাসিড বৃষ্টি (Acid Rain) ও পাথরের কুষ্ঠ

স্বাভাবিক বৃষ্টির জলের $\text{pH}$ বায়ুমণ্ডলের $\text{CO}_2$ দ্রবীভূত থাকার কারণে সামান্য আম্লিক (প্রায় ৫.৬) হয়। কিন্তু যখন বৃষ্টির জলের $\text{pH}$ ৫.৬-এর কম হয়ে যায়, তখন তাকে অ্যাসিড বৃষ্টি বলে।

দূষক উৎস ও রাসায়নিক রূপান্তর:

  • সালফার ডাইঅক্সাইড ($\text{SO}_2$): তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও তেল শোধনাগারের ধোঁয়া থেকে নির্গত হয়ে জারিত হয়ে সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরি করে: $$2\text{SO}_2 + \text{O}_2 + 2\text{H}_2\text{O} \\longrightarrow 2\mathbf{\text{H}_2\text{SO}_4}\text{ (সালফিউরিক অ্যাসিড)}$$
  • নাইট্রোজেনের অক্সাইড ($\text{NO}_x$): দ্রুতগামী মোটরযান ও বিমানের ধোঁয়া থেকে নির্গত হয়ে নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে: $$4\text{NO}_2 + 2\text{H}_2\text{O} + \text{O}_2 \\longrightarrow 4\mathbf{\text{HNO}_3}\text{ (নাইট্রিক অ্যাসিড)}$$

মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব:

  • পাথরের কুষ্ঠ (Stone Leprosy): অ্যাসিড বৃষ্টির সালফিউরিক অ্যাসিড মার্বেল পাথরের তৈরি প্রাচীন স্থাপত্যের (তাজমহল, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল) ক্যালসিয়াম কার্বনেটকে গলিয়ে ভঙ্গুর ক্যালসিয়াম সালফেটে রূপান্তরিত করে: $$\text{CaCO}_3 + \text{H}_2\text{SO}_4 \\longrightarrow \text{CaSO}_4 + \text{H}_2\text{O} + \text{CO}_2\\uparrow$$
  • জলজ বাস্তুতন্ত্রের বিনাশ: হ্রদ ও নদীর জলের $\text{pH}$ কমে গেলে মাটি থেকে বিষাক্ত অ্যালুমিনিয়াম আয়ন মুক্ত হয়ে মাছের ফুলকা বন্ধ করে দেয়।
  • মাটির উর্বরতা হ্রাস: উদ্ভিদের পাতার ক্লোরোফিল নষ্ট করে এবং মাটির প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান ধুয়ে বের করে দেয়।

৫.৩ স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ওজোন স্তর ($\text{O}_3$) ও অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধ

ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ১৫ থেকে ৩৫ কিমি ওপরে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ওজোন গ্যাসের একটি ঘন প্রাকৃতিক আবরণ রয়েছে, যাকে ওজোন স্তর (Ozone Layer) বলে। এটি সূর্যের অতি ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি (UV-B ও UV-C) শোষণ করে জীবজগৎকে ত্বকের ক্যান্সার ও অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করে।

ওজোন সৃষ্টি ও ভাঙনের প্রাকৃতিক গতিশীল সাম্যাবস্থা:

$$\text{O}_2 \\xrightarrow{\text{UV রশ্মি}} \text{O} + \text{O}\quad\text{(আলোকবিয়োজন)}$$ $$\text{O} + \text{O}_2 \\longrightarrow \mathbf{\text{O}_3}\text{ (ওজোন)}$$ $$\text{O}_3 \\xrightarrow{\text{UV-B}} \text{O}_2 + \text{O}\quad\text{(প্রাকৃতিক সাম্যাবস্থা)}$$

৫.৪ ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) দ্বারা ওজোন স্তর ধ্বংস

রেফ্রিজারেটর, এসি ও স্প্রে ক্যানে ব্যবহৃত ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC বা ফ্রিয়ন) রাসায়নিকভাবে অত্যন্ত সুস্থির হওয়ায় সহজে ভাঙে না এবং স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছে যায়। সেখানে তীব্র অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ভেঙে গিয়ে অত্যন্ত সক্রিয় ক্লোরিন মুক্ত মূলক ($\text{Cl}^\bullet$) উৎপন্ন করে:

$$\text{CF}_2\text{Cl}_2 \\xrightarrow{h\nu} \text{CF}_2\text{Cl}^\bullet + \mathbf{\text{Cl}^\bullet}$$ $$\mathbf{\text{Cl}^\bullet + \text{O}_3 \\longrightarrow \text{ClO}^\bullet + \text{O}_2}$$ $$\mathbf{\text{ClO}^\bullet + \text{O} \\longrightarrow \text{Cl}^\bullet + \text{O}_2}$$

অনুঘটনীয় ধ্বংসচক্র: তৃতীয় ধাপে ক্লোরিন মূলকটি ($\text{Cl}^\bullet$) আবার অবিকৃত অবস্থায় ফিরে আসে! ফলে একটিমাত্র ক্লোরিন পরমাণু লক্ষাধিক ওজোন অণুকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এর ফলেই আন্টার্কটিকার আকাশে বিশালাকার ওজোন গহ্বরের সৃষ্টি হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক চুক্তি: ১৯৮৭ সালের ঐতিহাসিক মন্ট্রিল প্রোটোকল (Montreal Protocol) অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে CFC-এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সমীকরণ, বিক্রিয়া ও সূত্র

পটাশিয়াম ক্লোরেট থেকে অক্সিজেন প্রস্তুতি
$$2\text{KClO}_3 \xrightarrow[\text{MnO}_2]{200-240^\circ\text{C}} 2\text{KCl} + 3\text{O}_2\uparrow$$
KClO₃ ও MnO₂ অনুঘটকের ভর অনুপাত ৪:১; তাপমাত্রা ৬৫০°সে থেকে কমে ২৪০°সে হয়।
হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড থেকে সাধারণ উষ্ণতায় প্রস্তুতি
$$2\text{H}_2\text{O}_2 \xrightarrow{\text{MnO}_2} 2\text{H}_2\text{O} + \text{O}_2\uparrow$$
উত্তাপহীন শীতল প্রক্রিয়ায় MnO₂ অনুঘটকের উপস্থিতিতে বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
দানাযুক্ত দস্তা থেকে হাইড্রোজেন প্রস্তুতি
$$Zn + H_2SO_4 (লঘু) ZnSO_4 + H_2$$
দানাযুক্ত দস্তার কপার অশুদ্ধি অটো-ক্যাটালিস্টের মতো কাজ করে; লঘু HNO₃ ব্যবহার নিষিদ্ধ।
কপার অক্সাইডের বিজারণ (হাইড্রোজেনের বিজারক ধর্ম)
$$CuO (কালো) + H_2 → Cu (লালচে-বাদামি) + H_2O$$
উত্তপ্ত কালো কিউপ্রিক অক্সাইড লালচে তামায় বিজারিত হয় ও জল উৎপন্ন হয়।
মার্বেল কুচি থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড প্রস্তুতি
$$CaCO_3 + 2HCl (লঘু) CaCl_2 + H_2O + CO_2$$
লঘু H₂SO₄ ব্যবহার করা যায় না কারণ অদ্রবণীয় CaSO₄-এর আস্তরণ বিক্রিয়া থামিয়ে দেয়।
স্বচ্ছ চুনজলের দুই পর্যায়ের বিক্রিয়া
$$Ca(OH)_2 + CO_2 → CaCO_3 + H_2O →{+CO_2 অতিরিক্ত} Ca(HCO_3)_2 (স্বচ্ছ)$$
অদ্রবণীয় CaCO₃-এর জন্য দুধের মতো ঘোলা; অতিরিক্ত গ্যাসে দ্রবণীয় ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেট উৎপন্ন হয়ে স্বচ্ছ হয়।
লোহায় মরিচা পড়ার সামগ্রিক সমীকরণ
$$4\text{Fe} + 3\text{O}_2 + 2x\text{H}_2\text{O} \longrightarrow 2\text{Fe}_2\text{O}_3 \cdot x\text{H}_2\text{O}$$
অক্সিজেন ও তরল জলীয় বাষ্প উভয়ের যুগপৎ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক; গ্যালভানাইজেশন দ্বারা নিবারিত হয়।
পাথরের কুষ্ঠ (মার্বেল পাথরে অ্যাসিড বৃষ্টি)
$$\text{CaCO}_3 + \text{H}_2\text{SO}_4 \longrightarrow \text{CaSO}_4 + \text{H}_2\text{O} + \text{CO}_2\uparrow$$
অ্যাসিড বৃষ্টির H₂SO₄ মার্বেলের ক্যালসিয়াম কার্বনেটকে ক্ষয় করে ভঙ্গুর জিপসাম ও সালফেটে পরিণত করে।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
পটাশিয়াম ক্লোরেট থেকে অক্সিজেন প্রস্তুতিতে ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড (MnO₂) মেশানো হয় কেন? এটি কোন শ্রেণির অনুঘটক?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ধাপে ধাপে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:

  1. বিয়োজন উষ্ণতা হ্রাস: বিশুদ্ধ পটাশিয়াম ক্লোরেটকে ($ ext{KClO}_3$) একা উত্তপ্ত করলে অক্সিজেন গ্যাস নির্গত হতে প্রায় ৬৫০°সে উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। এতে কাচের টেস্টটিউব গলে যাওয়া ও আকস্মিক বিস্ফোরণের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু মিশ্রণে ১ ভাগ $ ext{MnO}_2$ গুঁড়ো মিশিয়ে দিলে প্রয়োজনীয় বিয়োজন উষ্ণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ২০০°সে - ২৪০°সে-এ নেমে আসে।
  2. বিক্রিয়ার বেগ বৃদ্ধি: এটি দ্রুত হারে অক্সিজেন নির্গমন ঘটায় অথচ বিক্রিয়ার শেষে নিজের গঠন বা ভরের কোনো পরিবর্তন হয় না।
  3. শ্রেণিবিভাগ: যেহেতু এটি বিক্রিয়ার বেগ বৃদ্ধি করে, তাই $ ext{MnO}_2$ হলো একটি ধন্যাত্মক অনুঘটক (Positive Catalyst)।
উদাহরণ 2
পরীক্ষাগারে হাইড্রোজেন গ্যাস প্রস্তুতিতে বিশুদ্ধ দস্তার বদলে দানাযুক্ত দস্তা (Granulated Zinc) ব্যবহার করা হয় কেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

উত্তর:

পরীক্ষাগারে বিশুদ্ধ দস্তার পরিবর্তে দানাযুক্ত দস্তা ব্যবহারের দুটি প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে:

  1. তড়িৎরাসায়নিক অনুঘটন: দানাযুক্ত দস্তায় সামান্য পরিমাণে তামা ($ ext{Cu}$) অশুদ্ধি হিসেবে থাকে। লঘু সালফিউরিক অ্যাসিডের সংস্পর্শে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্যালভানিক কোষ ($ ext{Zn-Cu}$ কাপল) গঠিত হয়, যা ধনাত্মক অনুঘটকের মতো কাজ করে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে হাইড্রোজেন মুক্ত হতে সাহায্য করে। বিশুদ্ধ দস্তা খুব ধীরগতিতে বিক্রিয়া করে।
  2. অধিক ক্ষেত্রফল: গলিত দস্তাকে ঠান্ডা জলে ফেলে দানাযুক্ত দস্তা তৈরি করা হয়, ফলে এর বহিরাবরণ অসমান, খাঁজকাটা ও ছিদ্রযুক্ত হয়। এই বর্ধিত পৃষ্ঠতলের কারণে অ্যাসিড দ্রুত ধাতুর সংস্পর্শে এসে সুষম ও তীব্র বিক্রিয়া ঘটায়।
উদাহরণ 3
মার্বেল কুচি থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস প্রস্তুতিতে লঘু সালফিউরিক অ্যাসিড (H₂SO₄) ব্যবহার করা যায় না কেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

রাসায়নিক বিক্রিয়া ও কারণ:

মার্বেল কুচির ($ ext{CaCO}_3$) ওপর লঘু সালফিউরিক অ্যাসিড ঢাললে প্রাথমিকভাবে যে বিক্রিয়া ঘটে তা হলো:

$$ ext{CaCO}_3 + ext{H}_2 ext{SO}_4 \longrightarrow \mathbf{ ext{CaSO}_4\downarrow} + ext{H}_2 ext{O} + ext{CO}_2\uparrow$$

কিন্তু উৎপন্ন উপজাত ক্যালসিয়াম সালফেট ($ ext{CaSO}_4$) জলে অত্যন্ত অদ্রাব্য। ফলে এটি অধঃক্ষিপ্ত হয়ে মার্বেল কুচির ওপর একটি কঠিন, নিরেট আস্তরণ তৈরি করে ফেলে। এই আস্তরণ মার্বেল পাথরের ভেতরের অংশের সাথে অ্যাসিডের সরাসরি সংস্পর্শ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্যাস তৈরি চিরতরে থেমে যায়। তাই এর পরিবর্তে লঘু হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ($ ext{HCl}$) ব্যবহার করা হয়, যার উপজাত ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড ($ ext{CaCl}_2$) জলে সম্পূর্ণ দ্রবণীয়।

উদাহরণ 4
স্বচ্ছ চুনজলের মধ্য দিয়ে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস (ক) অল্প সময় এবং (খ) একটানা অতিরিক্ত সময় চালনা করলে কী ঘটবে? সমীকরণসহ লেখো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ধাপে ধাপে সমাধান:

(ক) অল্প সময় চালনা করলে: স্বচ্ছ চুনজলের [$ ext{Ca(OH)}_2$] মধ্য দিয়ে অল্প সময় $ ext{CO}_2$ চালনা করলে জলে অদ্রাব্য ক্যালসিয়াম কার্বনেটের সাদা অধঃক্ষেপ তৈরি হওয়ায় দ্রবণটি দুধের মতো ঘোলা হয়ে যায়:

$$ ext{Ca(OH)}_2 + ext{CO}_2 \longrightarrow \mathbf{ ext{CaCO}_3\downarrow} ext{ (সাদা অধঃক্ষেপ, ঘোলা)} + ext{H}_2 ext{O}$$

(খ) অতিরিক্ত সময় চালনা করলে: ঘোলা দ্রবণের মধ্য দিয়ে একটানা অতিরিক্ত $ ext{CO}_2$ পাঠাতে থাকলে অদ্রবণীয় ক্যালসিয়াম কার্বনেট দ্রাব্য ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটে পরিণত হয়, ফলে দ্রবণটি আবার সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও কাচের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়:

$$ ext{CaCO}_3 + ext{H}_2 ext{O} + ext{CO}_2 ext{ (অতিরিক্ত)} \longrightarrow \mathbf{ ext{Ca(HCO}_3)_2} ext{ (জলে দ্রবণীয়, স্বচ্ছ)}$$

উদাহরণ 5
কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসে জ্বলন্ত মোমবাতি নিভে যায়, কিন্তু জ্বলন্ত ম্যাগনেসিয়াম ফিতা জ্বলতেই থাকে কেন? সমীকরণ দাও।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

বিজ্ঞানসম্মত কারণ:

মোমবাতির শিখার তাপমাত্রা (প্রায় ৮০০°সে) $ ext{CO}_2$ অণুকে ভাঙার জন্য পর্যাপ্ত নয়। কার্বন ডাইঅক্সাইড নিজে দহনে সহায়তা করে না এবং বাতাসের চেয়ে ভারী হওয়ায় এটি শিখার চারপাশ থেকে অক্সিজেন সরিয়ে মোমবাতিটিকে নিভিয়ে দেয়।

কিন্তু জ্বলন্ত ম্যাগনেসিয়াম ফিতার তাপমাত্রা ২০০০°সে-এর চেয়েও বেশি থাকে এবং ম্যাগনেসিয়ামের অক্সিজেনের প্রতি তীব্র রাসায়নিক আসক্তি রয়েছে। এই প্রচণ্ড তাপে $ ext{CO}_2$ অণুর কার্বন-অক্সিজেন বন্ধন ভেঙে যায় এবং ম্যাগনেসিয়াম সেই অক্সিজেন গ্রহণ করে সাদা ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড ($ ext{MgO}$) গঠন করে ও কালো কার্বন কণা ($ ext{C}$) অধঃক্ষিপ্ত করে:

$$\mathbf{2 ext{Mg} + ext{CO}_2 \longrightarrow 2 ext{MgO} ext{ (সাদা গুঁড়ো)} + ext{C} ext{ (কালো কার্বন দাগ)}}$$

উদাহরণ 6
সাধারণ উষ্ণতায় নাইট্রোজেন গ্যাস রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয়, কিন্তু মেঘে বিদ্যুৎ চমকালে এটি অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয় কেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

আণবিক গঠনগত ব্যাখ্যা:

নাইট্রোজেনের অণুতে দুটি নাইট্রোজেন পরমাণু পরস্পরের সাথে তিনটি ইলেকট্রন জোড় শেয়ার করে একটি অত্যন্ত সুদৃঢ় সমযোজী ত্রিবন্ধন ($ ext{N}\equiv ext{N}$) তৈরি করে। এই ত্রিবন্ধন ভাঙতে বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয় (বন্ধন বিয়োজন শক্তি প্রায় ৯৪৫.৩ কিলোজুল/মোল)। সাধারণ তাপমাত্রায় অণুগুলোর মধ্যে এই পরিমাণ গতিশক্তি না থাকায় নাইট্রোজেন নিষ্ক্রিয় থাকে।

কিন্তু আকাশে যখন বিদ্যুৎ চমকায় (বজ্রপাত ঘটে), তখন বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গে তাপমাত্রা ৩০০০°সে-এরও বেশি হয়ে যায়। এই প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক তাপশক্তিতে ত্রিবন্ধন ভেঙে যায় এবং নাইট্রোজেন পরমাণুগুলো অক্সিজেনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে নাইট্রিক অক্সাইড ($ ext{NO}$) গঠন করে:

$$ ext{N}_2 + ext{O}_2 \xrightarrow{ ext{বজ্রপাত} / ৩০০০^\circ ext{সে}} 2 ext{NO}$$

উদাহরণ 7
একটিমাত্র সিএফসি (CFC) অণু কীভাবে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে লক্ষাধিক ওজোন (O₃) অণুকে ধ্বংস করে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

অনুঘটনীয় ধ্বংসের ধাপসমূহ:

  1. স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে তীব্র অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে CFC অণু ভেঙে গিয়ে সক্রিয় ক্লোরিন মুক্ত মূলক ($ ext{Cl}^ullet$) তৈরি হয়: $ ext{CF}_2 ext{Cl}_2 \xrightarrow{h u} ext{CF}_2 ext{Cl}^ullet + ext{Cl}^ullet$।
  2. এই ক্লোরিন মূলকটি ওজোন অণুকে আক্রমণ করে ক্লোরিন মনোক্সাইড মূলক ও অক্সিজেন তৈরি করে: $ ext{Cl}^ullet + ext{O}_3 \longrightarrow ext{ClO}^ullet + ext{O}_2$।
  3. উৎপন্ন $ ext{ClO}^ullet$ মূলকটি বায়ুমণ্ডলের মুক্ত অক্সিজেন পরমাণুর সাথে বিক্রিয়া করে আবার সেই ক্লোরিন মুক্ত মূলকটিকে ($ ext{Cl}^ullet$) অক্ষত অবস্থায় মুক্ত করে দেয়: $ ext{ClO}^ullet + ext{O} \longrightarrow \mathbf{ ext{Cl}^ullet} + ext{O}_2$।
  4. যেহেতু ক্লোরিন মূলকটি বিক্রিয়া শেষে পুনরায় তৈরি হয়ে যায়, তাই এটি বারংবার একই বিক্রিয়া চালিয়ে যায়। একটিমাত্র $ ext{Cl}^ullet$ নিষ্ক্রিয় হওয়ার আগে ১ লক্ষেরও বেশি ওজোন অণুকে ধ্বংস করতে পারে।
উদাহরণ 8
অ্যাসিড বৃষ্টি কী? সালফার ডাইঅক্সাইড (SO₂) কীভাবে তাজমহলের মতো মার্বেল স্থাপত্যে "পাথরের কুষ্ঠ" সৃষ্টি করে সমীকরণসহ দেখাও।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

সংজ্ঞা ও রাসায়নিক ক্রিয়া:

বায়ুমণ্ডলের দূষক গ্যাস সালফার ডাইঅক্সাইড ও নাইট্রোজেনের অক্সাইড বৃষ্টির জলে দ্রবীভূত হয়ে যখন বৃষ্টির জলের $ ext{pH}$ মান ৫.৬-এর নিচে নামিয়ে দেয়, তখন তাকে অ্যাসিড বৃষ্টি বলে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কারখানা থেকে নির্গত $ ext{SO}_2$ বৃষ্টির জলে জারিত হয়ে সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরি করে:

$$2 ext{SO}_2 + ext{O}_2 + 2 ext{H}_2 ext{O} \longrightarrow 2 ext{H}_2 ext{SO}_4$$

এই অ্যাসিড বৃষ্টি তাজমহল বা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মতো মার্বেল পাথরের (ক্যালসিয়াম কার্বনেট, $ ext{CaCO}_3$) ওপর পড়লে মার্বেল ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ভঙ্গুর ক্যালসিয়াম সালফেটে পরিণত হয়:

$$\mathbf{ ext{CaCO}_3 + ext{H}_2 ext{SO}_4 \longrightarrow ext{CaSO}_4 + ext{H}_2 ext{O} + ext{CO}_2\uparrow}$$

মার্বেল পাথরের এই ক্ষয় ও বিবর্ণ হয়ে ফেটে যাওয়াকেই পাথরের কুষ্ঠ (Stone Leprosy) বলে।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

অক্সিজেন নিজে একটি দাহ্য গ্যাস—এই ভুল ধারণা পোষণ করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অক্সিজেন নিজে জ্বলে না, এটি অদাহ্য। এটি কেবলমাত্র অন্য বস্তুকে জ্বলতে সহায়তা করে (দহন সহায়ক)। শুধু অক্সিজেনভর্তি গ্যাসজারে কোনো জ্বালানি ছাড়া আগুন জ্বালানো অসম্ভব।

সাধারণ ভুল ধারণা

হাইড্রোজেন বাতাসের চেয়ে হালকা বলে পরীক্ষাগারে একে বাতাসের ঊর্ধ্বমুখী অপসারণে সংগ্রহ করা নিরাপদ মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

হাইড্রোজেন ও বাতাসের মিশ্রণ অত্যন্ত বিস্ফোরক। সামান্য স্ফুলিঙ্গেই মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তাই পরীক্ষাগারে হাইড্রোজেনকে সর্বদা জলের নিম্নমুখী অপসারণ দ্বারা সংগ্রহ করতে হয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

হাইড্রোজেন তৈরিতে লঘু H₂SO₄-এর বদলে লঘু নাইট্রিক অ্যাসিড (HNO₃) লেখা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

নাইট্রিক অ্যাসিড তীব্র জারক অ্যাসিড। এটি উৎপন্ন হাইড্রোজেনকে জারিত করে জল বানিয়ে দেয় এবং নিজে $ ext{NO}_2$ বা $ ext{NO}$ গ্যাসে পরিণত হয়। তাই হাইড্রোজেন তৈরিতে লঘু $ ext{H}_2 ext{SO}_4$ বা লঘু $ ext{HCl}$ ব্যবহার্য।

সাধারণ ভুল ধারণা

মরিচা ও সাধারণ আয়রন অক্সাইডকে (Fe₂O₃) একই ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

মরিচা কেবল $ ext{Fe}_2 ext{O}_3$ নয়; এটি হলো আর্দ্র ফেরিক অক্সাইড ($ ext{Fe}_2 ext{O}_3 \cdot x ext{H}_2 ext{O}$)। জলীয় বাষ্প বা জলের উপস্থিতি ছাড়া মরিচা কখনোই পড়তে পারে না।

সাধারণ ভুল ধারণা

শুষ্ক বরফকে বরফের সাথে কার্বন ডাইঅক্সাইড মেশানো জল ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

শুষ্ক বরফে এক ফোঁটাও জল থাকে না। এটি হলো ১০০% খাঁটি কঠিন কার্বন ডাইঅক্সাইড ($ ext{CO}_2$) যা -৭৮.৫°সে উষ্ণতায় থাকে এবং গলে তরল না হয়ে সরাসরি গ্যাসে পরিণত হয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

গ্রিনহাউস প্রভাবকে সামগ্রিকভাবে কেবল ক্ষতিকর ও কৃত্রিম মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

প্রাকৃতিক গ্রিনহাউস প্রভাব জীবের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য; এটি না থাকলে পৃথিবী -১৮°সে বরফের গ্রহে পরিণত হতো। মানুষের অতিরিক্ত দূষণের কারণে সৃষ্ট মাত্রাতিরিক্ত উষ্ণায়নই হলো মূল বিপদ।

সাধারণ ভুল ধারণা

চুনজলের বিক্রিয়ায় স্বল্প ও অতিরিক্ত সময়ের উৎপন্ন পদার্থের সংকেত ও বর্ণে ভুল করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

স্বল্প সময়ে উৎপন্ন হয় অদ্রবণীয় $ ext{CaCO}_3$ (দুধের মতো ঘোলা)। অতিরিক্ত গ্যাসে উৎপন্ন হয় দ্রবণীয় $ ext{Ca(HCO}_3)_2$ (স্বচ্ছ ও পরিষ্কার)।

কয়েকটি পরিচিত গ্যাস — ৪-কোয়াড্র্যান্ট কনসেপ্ট ম্যাপ

কয়েকটি পরিচিত গ্যাস (Know About Some Common Gases) – WBBSE Class 8 Science চারটি প্রধান গ্যাস: অক্সিজেন (O₂) • হাইড্রোজেন (H₂) • কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) • নাইট্রোজেন (N₂) ও পরিবেশ ১. অক্সিজেন (O₂) — প্রাণধারণ ও দহনের প্রধান সহায়ক পরীক্ষাগার প্রস্তুতি: 2KClO₃ ➔ 2KCl + 3O₂↑ (MnO₂ অনুঘটক, ২০০-২৪০°C) সংগ্রহ ও শনাক্তকরণ: জলের নিম্নমুখী অপসারণ দ্বারা • শিখাহীন পাটকাঠি প্রজ্জ্বলন অক্সাইড ও মরিচা: আম্লিক (SO₂), ক্ষারীয় (MgO), মরিচা: Fe₂O₃·xH₂O ★ MnO₂ অনুঘটক বিক্রিয়ার বেগ বাড়ায়, নিজে ধর্মে ও ভরে অপরিবর্তিত থাকে ২. হাইড্রোজেন (H₂) — লঘুতম গ্যাস ও শক্তিশালী বিজারক পরীক্ষাগার প্রস্তুতি: Zn + লঘু H₂SO₄ ➔ ZnSO₄ + H₂↑ (উত্তাপহীন শীতল বিক্রিয়া) দানাযুক্ত দস্তা: অশুদ্ধির কপার ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করে, পৃষ্ঠতল বৃদ্ধি পায় বিজারণ ধর্ম: CuO + H₂ ➔ Cu + H₂O (কালো অক্সাইড লালচে-বাদামি তামা) ★ পপ শব্দসহ হালকা নীল শিখায় জ্বলে • ভবিষ্যৎ দূষণমুক্ত গ্রিন ফুয়েল ৩. কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) — ভারী ও দহনরোধক গ্যাস পরীক্ষাগার প্রস্তুতি: CaCO₃ (মার্বেল) + 2HCl ➔ CaCl₂ + H₂O + CO₂↑ চুনজলের বিক্রিয়া: প্রথমে ঘোলা (CaCO₃↓); অতিরিক্ত গ্যাসে স্বচ্ছ (Ca(HCO₃)₂) অনন্য বৈশিষ্ট্য: বায়ুর চেয়ে ১.৫ গুণ ভারী • আগুন নেভায় • শুষ্ক বরফ (-৭৮.৫°C) ★ লঘু H₂SO₄ ব্যবহার অনুচিত: অদ্রবণীয় CaSO₄ আস্তরণ বিক্রিয়া থামায় ৪. নাইট্রোজেন (N₂) ও পরিবেশীয় ভারসাম্য রাসায়নিক নিষ্ক্রিয়তা: দৃঢ় N≡N ত্রিবন্ধন ভাঙতে উচ্চ শক্তির প্রয়োজন হয় নাইট্রোজেন সংবন্ধন: বজ্রপাত (NO, HNO₃) • রাইজোবিয়াম ব্যাকটিরিয়া বিশ্ব পরিবেশ প্রভাব: গ্রিনহাউস প্রভাব (CO₂, CH₄) • অ্যাসিড বৃষ্টি (SO₂, NO₂) ★ স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ওজোন স্তর (O₃) ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
অক্সিজেন (O₂): বায়ুর ২০.৯৫%; ল্যাবে KClO₃ ও MnO₂ (৪:১) ২০০-২৪০°সে-এ উত্তপ্ত করে বা সাধারণ তাপমাত্রায় H₂O₂ ও MnO₂ মিশিয়ে প্রস্তুত করা হয়।
মূল বিষয় 2
অনুঘটক: MnO₂ বিক্রিয়ার বেগ বাড়ায় কিন্তু বিক্রিয়া শেষে ধর্মে ও ভরে অপরিবর্তিত থাকে।
মূল বিষয় 3
অক্সাইড: অধাতুর অক্সাইড আম্লিক (SO₂, CO₂); ধাতুর অক্সাইড ক্ষারীয় (Na₂O, MgO); উভয় ধর্মযুক্ত উভধর্মী (ZnO, Al₂O₃); নিরপেক্ষ প্রশম অক্সাইড (CO, NO, H₂O)।
মূল বিষয় 4
হাইড্রোজেন (H₂): লঘুতম গ্যাস; দানাযুক্ত দস্তা ও লঘু H₂SO₄ থেকে প্রস্তুত; কপার অশুদ্ধি অটো-ক্যাটালিস্টের মতো কাজ করে; পপ শব্দসহ জ্বলে; তীব্র বিজারক (CuO + H₂ ➔ Cu + H₂O)।
মূল বিষয় 5
কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂): বাতাসের চেয়ে দেড়গুণ ভারী; মার্বেল কুচি (CaCO₃) ও লঘু HCl থেকে প্রস্তুত; লঘু H₂SO₄ ব্যবহারে অদ্রাব্য CaSO₄ তৈরি হয়ে বিক্রিয়া বন্ধ হয়।
মূল বিষয় 6
চুনজল পরীক্ষা: প্রথমে অদ্রাব্য CaCO₃ তৈরির জন্য ঘোলা হয়; অতিরিক্ত CO₂ চালনায় দ্রাব্য Ca(HCO₃)₂ তৈরি হয়ে দ্রবণটি স্বচ্ছ হয়।
মূল বিষয় 7
নাইট্রোজেন (N₂): N≡N ত্রিবন্ধনের উচ্চ বন্ধনশক্তির (৯৪৫ kJ/mol) জন্য সাধারণ উষ্ণতায় নিষ্ক্রিয়; বজ্রপাত ও রাইজোবিয়াম ব্যাকটিরিয়ার সাহায্যে মাটিতে আবদ্ধ হয়।
মূল বিষয় 8
পরিবেশ রসায়ন: গ্রিনহাউস গ্যাস (CO₂, CH₄) অবলোহিত রশ্মি ধরে রেখে উষ্ণায়ন ঘটায়; অ্যাসিড বৃষ্টি (pH < ৫.৬) পাথরের কুষ্ঠ সৃষ্টি করে; স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ওজোন (O₃) ক্ষতিকর UV রশ্মি ঠেকায়, যা CFC দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
পরীক্ষাগারে অক্সিজেন গ্যাস বাতাসের নিম্নমুখী অপসারণের পরিবর্তে জলের নিম্নমুখী অপসারণ দ্বারা সংগ্রহ করা হয় কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

অক্সিজেন জলে অত্যন্ত স্বল্প দ্রাব্য (২০°সে উষ্ণতায় ১০০ সেমি³ জলে মাত্র প্রায় ৩ সেমি³ গ্যাস দ্রবীভূত হয়)। ফলে জলের মধ্য দিয়ে সংগ্রহ করলে গ্যাসের অপচয় হয় না বললেই চলে। অন্যদিকে বাতাসের বাষ্প ঘনত্ব ১৪.৪ এবং অক্সিজেনের বাষ্প ঘনত্ব ১৬, অর্থাৎ এদের ঘনত্বের পার্থক্য খুবই সামান্য। বাতাসে সংগ্রহ করতে গেলে বায়ুমণ্ডলের অন্যান্য গ্যাস মিশে অক্সিজেন অশুদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই বিশুদ্ধ অক্সিজেন সংগ্রহ করতে এবং গ্যাসজারে গ্যাসের পূর্ণতা স্পষ্ট দেখতে জলের নিম্নমুখী অপসারণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।


2
লোহায় মরিচা পড়ার জন্য কোন দুটি উপাদান যুগপৎ উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক? গ্যালভানাইজেশন কীভাবে মরিচা রোধ করে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

আবশ্যক শর্ত: লোহায় মরিচা পড়ার জন্য অক্সিজেন ($ ext{O}_2$) এবং তরল জল বা জলীয় বাষ্প ($ ext{H}_2 ext{O}$) উভয়ের যুগপৎ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। এর যেকোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে লোহায় মরিচা পড়ে না।

গ্যালভানাইজেশন প্রক্রিয়া: লোহার ওপর গলিত দস্তার (Zinc) প্রলেপ দেওয়াকে গ্যালভানাইজেশন বলে। দস্তা বায়ুর সংস্পর্শে ক্ষয়রোধক জিংক কার্বনেট আস্তরণ তৈরি করে লোহাকে বাতাস ও জলের স্পর্শ থেকে রক্ষা করে। কোনো কারণে দস্তার আস্তরণ কেটে গেলেও তড়িৎরাসায়নিক শ্রেণিতে দস্তা লোহার চেয়ে বেশি সক্রিয় হওয়ায় দস্তা নিজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে লোহাকে অবিকৃত রাখে।


3
একটি বর্ণহীন গন্ধহীন গ্যাস X জ্বলন্ত পাটকাঠিকে নিভিয়ে দেয় এবং স্বচ্ছ চুনজলের মধ্য দিয়ে চালনা করলে দ্রবণটি দুধের মতো ঘোলা হয়ে যায়। গ্যাস X-এর নাম কী এবং ঘোলা হওয়ার সমীকরণটি লেখো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

গ্যাস X: কার্বন ডাইঅক্সাইড ($ ext{CO}_2$)।

সমীকরণ:

$$\mathbf{ ext{Ca(OH)}_2 ext{ (aq)} + ext{CO}_2 ext{ (g)} \longrightarrow ext{CaCO}_3\downarrow ext{ (সাদা অধঃক্ষেপ, ঘোলা)} + ext{H}_2 ext{O} ext{ (l)}}$$

জলে অদ্রবণীয় ক্যালসিয়াম কার্বনেট ($ ext{CaCO}_3$) অধঃক্ষিপ্ত হওয়ার কারণেই দ্রবণটি দুধের মতো ঘোলা হয়।


4
শুধুমাত্র একটি জ্বলন্ত কাঠের কাঠি দিয়ে তুমি কীভাবে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন গ্যাসের জারের মধ্যে পার্থক্য করবে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

জ্বলন্ত কাঠের কাঠিটিকে প্রতিটি গ্যাসজারের মুখে আনলে:

  • অক্সিজেনের জারে: কাঠিটি আরও অনেক বেশি উজ্জ্বল ও তীব্র শিখায় জ্বলতে থাকবে, কারণ অক্সিজেন দহনে প্রবল সাহায্য করে।
  • হাইড্রোজেনের জারে: জারের মুখে গ্যাসটি একটি তীব্র "পপ" শব্দ করে হালকা নীল শিখায় জ্বলে উঠবে এবং কাঠিটিকে জারের ভেতরে ঢোকালে কাঠিটি সঙ্গে সঙ্গে নিভে যাবে, কারণ হাইড্রোজেন নিজে দাহ্য কিন্তু দহনে সহায়ক নয়।

5
নাইট্রোজেন সংবন্ধনে রাইজোবিয়াম (Rhizobium) ব্যাকটিরিয়ার ভূমিকা কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

মটর, ছোলা, ডাল প্রভৃতি শিম্বীগোত্রীয় উদ্ভিদের মূলের অর্বুদে রাইজোবিয়াম নামক মিথোজীবী ব্যাকটিরিয়া বসবাস করে। এই ব্যাকটিরিয়া বায়ুমণ্ডলের মুক্ত গ্যাসীয় নাইট্রোজেনকে সরাসরি গ্রহণ করে নাইট্রেট যৌগে রূপান্তর করতে সক্ষম। উদ্ভিদ এই নাইট্রেট যৌগ মূলের সাহায্যে শোষণ করে অত্যাবশ্যকীয় প্রোটিন তৈরি করে এবং এর বিনিময়ে ব্যাকটিরিয়াকে শর্করাজাতীয় খাদ্য ও আশ্রয় প্রদান করে।


অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

কয়েকটি পরিচিত গ্যাস অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।