১.১ আবিষ্কার, উপস্থিতি ও ভৌত ধর্ম
শুষ্ক বায়ুতে আয়তন হিসেবে প্রায় ২০.৯৫% এবং ভর হিসেবে প্রায় ২৩% অক্সিজেন ($\text{O}_2$) গ্যাস থাকে। জলে ভর হিসেবে প্রায় ৮৯% অক্সিজেন বিদ্যমান। বিজ্ঞানী কার্ল উইলহেম শিলে (১৭৭২) এবং জোসেফ প্রিস্টলে (১৭৭৪) স্বতন্ত্রভাবে এই গ্যাস আবিষ্কার করেন। বিজ্ঞানী ল্যাভয়সিয়ে ১৭৭৭ সালে এর নাম দেন "অক্সিজেন" (যার অর্থ অম্ল উৎপাদক)।
ভৌত ধর্ম: অক্সিজেন বর্ণহীন, গন্ধহীন ও স্বাদহীন গ্যাস। এটি বাতাসের চেয়ে সামান্য ভারী (বাষ্প ঘনত্ব ১৬, বায়ুর বাষ্প ঘনত্ব ১৪.৪)। এটি জলে সামান্য পরিমাণে দ্রবীভূত হয় (২০°সে উষ্ণতায় ১০০ সেমি³ জলে প্রায় ৩ সেমি³ অক্সিজেন দ্রবীভূত থাকে), যা জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। এটি -১৮৩°সে উষ্ণতায় হালকা নীল তরলে এবং -২১৮.৮°সে উষ্ণতায় নীলাভ কঠিনে পরিণত হয়।
১.২ পরীক্ষাগার প্রস্তুতি: পটাশিয়াম ক্লোরেটের তাপীয় বিয়োজন
পরীক্ষাগারে অক্সিজেন প্রস্তুত করতে কঠিন ও শুষ্ক পটাশিয়াম ক্লোরেট ($\text{KClO}_3$) এবং ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড ($\text{MnO}_2$) কে ৪:১ ভর অনুপাতে মিশিয়ে একটি শক্ত কাচের টেস্টটিউবে ২০০°সে - ২৪০°সে উষ্ণতায় উত্তপ্ত করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক যুক্তি: শুধু পটাশিয়াম ক্লোরেটকে উত্তপ্ত করলে প্রায় ৬৫০°সে উষ্ণতার প্রয়োজন হয় এবং এতে টেস্টটিউব গলে যাওয়ার বা বিস্ফোরণ ঘটার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু মিশ্রণে $\text{MnO}_2$ যোগ করলে বিয়োজন তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ২০০°-২৪০°সে-এ নেমে আসে এবং দ্রুত অক্সিজেন নির্গত হয়।
১.৩ অনুঘটক ও সাধারণ উষ্ণতায় বিকল্প প্রস্তুতি
অনুঘটকের সংজ্ঞা (Catalyst): যে পদার্থ কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সামান্য পরিমাণে উপস্থিত থেকে বিক্রিয়ার বেগ বাড়ায় বা কমায়, কিন্তু বিক্রিয়া শেষে নিজে ভরে ও রাসায়নিক গঠনে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকে, তাকে অনুঘটক বলে। এখানে $\text{MnO}_2$ হলো একটি ধন্যাত্মক অনুঘটক (Positive Catalyst)।
উত্তাপহীন প্রস্তুতি: কোনো তাপপ্রয়োগ ছাড়াই সাধারণ উষ্ণতায় হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড দ্রবণে ম্যাঙ্গানিজ ডাইঅক্সাইড যোগ করলে দ্রুত অক্সিজেন তৈরি হয়:
গ্যাস সংগ্রহ পদ্ধতি: অক্সিজেন গ্যাস জলের নিম্নমুখী অপসারণ দ্বারা (Downward displacement of water) গ্যাসজারে সংগ্রহ করা হয়, কারণ এটি জলে খুব সামান্য দ্রাব্য এবং জলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না। বাতাসের সঙ্গে এর ঘনত্বের পার্থক্য কম হওয়ায় বাতাসের অপসারণ দ্বারা সংগ্রহ করা হয় না।
১.৪ রাসায়নিক ধর্ম ও বিভিন্ন মৌলের দহন
অক্সিজেন নিজে জ্বলে না, কিন্তু দহনে প্রবল সহায়তা করে। একটি শিখাহীন জ্বলন্ত পাটকাঠি অক্সিজেনভর্তি গ্যাসজারে প্রবেশ করালে তা উজ্জ্বল শিখাসহ জ্বলে ওঠে।
- কার্বন (C): স্ফুলিঙ্গসহ জ্বলে আম্লিক কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস তৈরি করে: $\text{C} + \text{O}_2 \\to \text{CO}_2$।
- সালফার (S): উজ্জ্বল নীল শিখায় জ্বলে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড উৎপন্ন করে: $\text{S} + \text{O}_2 \\to \text{SO}_2$।
- ম্যাগনেসিয়াম (Mg): চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল সাদা আলোয় জ্বলে ক্ষারীয় ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইডের সাদা গুঁড়ো তৈরি করে: $2\text{Mg} + \text{O}_2 \\to 2\text{MgO}$।
- সোডিয়াম (Na): সোনালী হলুদ শিখায় জ্বলে ক্ষারীয় সোডিয়াম অক্সাইড ও পারঅক্সাইড উৎপন্ন করে: $4\text{Na} + \text{O}_2 \\to 2\text{Na}_2\text{O}$।
- লোহা (Fe): লোহিত তপ্ত লোহার তার অক্সিজেনে স্ফুলিঙ্গ ছিটকে জ্বলে কালো ফেরোসো-ফেরিক অক্সাইড গঠন করে: $3\text{Fe} + 2\text{O}_2 \\to \text{Fe}_3\text{O}_4$।
১.৫ অক্সাইডের শ্রেণিবিভাগ ও লোহায় মরিচা পড়ার বিজ্ঞান
অক্সিজেনের সঙ্গে বিভিন্ন মৌলের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন অক্সাইডগুলোকে চার ভাগে ভাগ করা হয়:
| অক্সাইডের শ্রেণি | গঠনকারী মৌল | উদাহরণ | জলে দ্রবীভূত রূপ ও প্রকৃতি |
|---|---|---|---|
| আম্লিক অক্সাইড | অধাতুসমূহ | $\text{CO}_2, \text{SO}_2, \text{P}_2\text{O}_5$ | অ্যাসিড উৎপন্ন করে ($\text{H}_2\text{SO}_3$), নীল লিটমাস লাল হয় |
| ক্ষারীয় অক্সাইড | ধাতুসমূহ | $\text{Na}_2\text{O}, \text{K}_2\text{O}, \text{MgO}, \text{CaO}$ | ক্ষার উৎপন্ন করে ($\text{NaOH}$), লাল লিটমাস নীল হয় |
| উভধর্মী অক্সাইড | নির্দিষ্ট ধাতু | $\text{ZnO}, \text{Al}_2\text{O}_3, \text{PbO}$ | অ্যাসিড ও ক্ষার উভয়ের সাথে বিক্রিয়া করে লবণ ও জল গঠন করে |
| প্রশম অক্সাইড | নির্দিষ্ট অধাতু | $\text{CO}, \text{N}_2\text{O}, \text{NO}, \text{H}_2\text{O}$ | অ্যাসিড বা ক্ষার কারো সঙ্গেই বিক্রিয়া করে না; লিটমাসে নিরপেক্ষ |
লোহায় মরিচা পড়ার রহস্য (Rusting of Iron): সাধারণ বায়ুমণ্ডলে লোহা রেখে দিলে তার ওপর যে বাদামি রঙের ভঙ্গুর আস্তরণ পড়ে তাকে মরিচা বলে। মরিচা আসলে আর্দ্র ফেরিক অক্সাইড। মরিচা পড়ার জন্য অক্সিজেন এবং তরল জল বা জলীয় বাষ্প উভয়ের যুগপৎ উপস্থিতি আবশ্যক। শুষ্ক অক্সিজেন বা বাতাসহীন ফুটানো জলে লোহা কখনোই মরিচাধরা হয় না।
মরিচা নিবারণের উপায়: (১) লোহার ওপর তেল, গ্রিজ বা রঙের প্রলেপ দেওয়া, (২) গ্যালভানাইজেশন (Galvanization) — গলিত দস্তার (Zinc) পাতলা আস্তরণ দেওয়া, (৩) ক্রোমিয়াম বা নিকেলের তড়িৎলেপন।