১.১ সনাল (বহিঃক্ষরা), অনাল (অন্তঃক্ষরা) ও মিশ্র গ্রন্থির তুলনা
মানবদেহের বিভিন্ন শারীরিক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ প্রকার নিঃসরণকারী অঙ্গ থাকে, যাদের গ্রন্থি (Glands) বলে। নিঃসরণের পরিবহন পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে গ্রন্থি তিন প্রকার:
| গ্রন্থির শ্রেণি | গঠনগত বৈশিষ্ট্য | নিঃসরণের প্রকৃতি | পরিবহন মাধ্যম | মানবদেহের বাস্তব উদাহরণ |
|---|---|---|---|---|
| সনাল বা বহিঃক্ষরা গ্রন্থি (Exocrine Glands) | নির্দিষ্ট ক্ষরণ নালী (Duct) উপস্থিত। | উৎসেচক (Enzyme), লালা, ঘাম, সিবাম, শ্লেষ্মা। | নালীর মাধ্যমে সরাসরি কার্যকারী অঙ্গে বা দেহতলে পৌঁছায়। | লালাগ্রন্থি (প্যারোটিড, সাবম্যান্ডিবুলার), ঘর্মগ্রন্থি, সিবেসিয়াস (তৈল) গ্রন্থি, যকৃত, অশ্রুগ্রন্থি। |
| অনাল বা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি (Endocrine Glands) | নালীবিহীন (Ductless); কোনো ক্ষরণ নালী থাকে না। | হরমোন (রাসায়নিক বার্তাবাহক)। | সরাসরি রক্তজালকের রক্ত ও লসিকায় মিশে রক্তস্রোতের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। | পিটুইটারি গ্রন্থি, থাইরয়েড গ্রন্থি, প্যারাথাইরয়েড, অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি, পিনিয়াল গ্রন্থি। |
| মিশ্র গ্রন্থি (Heterocrine / Mixed Glands) | সনাল ও অনাল—উভয় প্রকার কলা দিয়ে গঠিত। | উৎসেচক এবং হরমোন উভয়ই নিঃসৃত হয়। | উৎসেচক নালীর মাধ্যমে এবং হরমোন রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। | অগ্ন্যাশয় (বহিঃক্ষরা অংশ পাচক রস ক্ষরণ করে; অন্তঃক্ষরা অংশ ইনসুলিন ও গ্লুকাগন ক্ষরণ করে), শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয়। |
১.২ হরমোন কী? রাসায়নিক দূতের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
১৯০৫ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী উইলিয়াম বেলিস এবং আর্নেস্ট স্টার্লিং গ্রিক শব্দ Horman (যার অর্থ "জাগ্রত করা" বা "উত্তেজিত করা") থেকে হরমোন (Hormone) শব্দটি প্রবর্তন করেন। রাসায়নিকভাবে হরমোন হলো অনাল গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন বিশেষ জৈব-রাসায়নিক বার্তাবাহক।
- ১. রাসায়নিক বার্তাবাহক (Chemical Messenger): হরমোন শরীরের এক প্রান্তের উৎস কোশ থেকে উৎপন্ন হয়ে সংকেত বা বার্তা বহন করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য কোশ বা লক্ষ্য অঙ্গে (Target Organ) পৌঁছে দেয়।
- ২. রক্তবাহিত পরিবহন: নালী না থাকায় হরমোন সরাসরি রক্তস্রোতে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
- ৩. নির্দিষ্ট গ্রাহক নির্ভরতা (Receptor Specificity): রক্তে ভেসে সারা শরীরে গেলেও হরমোন কেবল সেই সমস্ত কোশেই কাজ করতে পারে যাদের কোশপর্দায় বা নিউক্লিয়াসে সেই হরমোনের জন্য নির্দিষ্ট গ্রাহক প্রোটিন (Receptor) থাকে (যেমন নির্দিষ্ট তালার জন্য নির্দিষ্ট চাবি)। অন্যান্য কোশ একে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে।
- ৪. অতি-আণুবীক্ষণিক মাত্রায় কার্যকারিতা: হরমোন রক্তে অতি সূক্ষ্ম মাত্রায় (মাইক্রোগ্রাম বা পিকোbergram) কাজ করে। স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য কম ক্ষরণ (Hyposecretion) বা বেশি ক্ষরণ (Hypersecretion)—উভয়ই মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করে।
- ৫. ক্রিয়ার পর ধ্বংসপ্রাপ্তি: উৎসেচকের মতো হরমোন শরীরে জমা থাকে না বা অপরিবর্তিত থাকে না। কাজ শেষ হওয়ামাত্রই হরমোন ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়, যকৃতে পরিবর্তিত হয় এবং বৃক্কের মাধ্যমে মূত্রের সাথে নির্গত হয়।
১.৩ নেগেটিভ ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণ: দেহের হোমিওস্ট্যাসিস বজায় রাখা
শরীরে হরমোনের মাত্রা যেন কখনোই অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে বা কমে না যায়, তার জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় জৈবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ করে, যাকে নেগেটিভ ফিডব্যাক ব্যবস্থা (Negative Feedback Mechanism) বলে:
রক্তে যখন কোনো নির্দিষ্ট হরমোনের ঘনত্ব স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়ে যায়, তখন সেই বাড়তি ঘনত্বের উপস্থিতি সংকেত পাঠিয়ে উৎস গ্রন্থি বা নিয়ন্ত্রক পিটুইটারি থেকে হরমোন উৎপাদন বন্ধ বা হ্রাস করে দেয়।
আবার রক্তে হরমোনের মাত্রা কমে গেলে সেই বাধার প্রভাব সরে যায় এবং গ্রন্থিটি পুনরায় হরমোন ক্ষরণ শুরু করে। এই বিপরীতমুখী নিয়ন্ত্রণ শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বা হোমিওস্ট্যাসিস (Homeostasis) বজায় রাখে।
- থাইরক্সিন ও TSH-এর উদাহরণ: রক্তে থাইরক্সিন কমে গেলে পিটুইটারি TSH হরমোন বাড়িয়ে থাইরয়েডকে উদ্দীপিত করে। আবার রক্তে থাইরক্সিন বেড়ে গেলে তা পিটুইটারিতে গিয়ে TSH ক্ষরণ বন্ধ করে দেয়।
১.৪ পিটুইটারি গ্রন্থি: শরীরের "প্রভু গ্রন্থি" (Master Gland)
পিটুইটারি গ্রন্থি হলো একটি মটরদানার মতো ক্ষুদ্র অথচ অত্যন্ত ক্ষমতাশালী অনাল গ্রন্থি, যা মস্তিষ্কের গোড়ায় করোটির স্ফেনয়েড অস্থির সেলা টারসিকা (Sella Turcica) নামক গহ্বরে সুরক্ষিত থাকে। এটি সরু বৃন্ত বা ইনফান্ডিবুলাম দিয়ে হাইপোথ্যালামাসের সাথে যুক্ত থাকে।
অন্যান্য অধিকাংশ অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির (থাইরয়েড, অ্যাড্রিনাল কর্টেক্স, জনন গ্রন্থি) বৃদ্ধি ও হরমোন ক্ষরণকে নিজ হরমোনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে বলে পিটুইটারিকে "প্রভু গ্রন্থি" (Master Gland) বলা হয়। (তবে পিটুইটারি স্বয়ং হাইপোথ্যালামাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাই হাইপোথ্যালামাসকে "মাস্টার অফ মাস্টার গ্ল্যান্ড" বা সুপ্রিম কমান্ডার বলা হয়)।
| পিটুইটারির অংশ | প্রধান হরমোন | কার্যকারী অঙ্গ | প্রধান শারীরবৃত্তীয় কাজ |
|---|---|---|---|
| অগ্র পিটুইটারি (Anterior Lobe) | বৃদ্ধি হরমোন (GH বা STH) | অস্থি, পেশি ও দেহতন্তু | অস্থির এপিফাইসিয়াল তরুণাস্থির কোশ বিভাজন ঘটিয়ে দেহের সামগ্রিক দৈহিক বৃদ্ধি ও উচ্চতা বৃদ্ধি ঘটায়। |
| থাইরয়েড উদ্দীপক হরমোন (TSH) | থাইরয়েড গ্রন্থি | থাইরয়েড গ্রন্থির বৃদ্ধি ঘটায় এবং থাইরক্সিন হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে। | |
| অ্যাড্রিনোকোর্টিকোট্রপিক হরমোন (ACTH) | অ্যাড্রিনাল কর্টেক্স | অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির কর্টেক্স অংশের বৃদ্ধি ও হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে। | |
| গোনাডোট্রপিক হরমোন (FSH ও LH) | শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয় | শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উৎপাদন এবং যৌন হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে। | |
| পশ্চাৎ পিটুইটারি (Posterior Lobe) | অ্যান্টিডাইইউরেটিক হরমোন (ADH / ভেসোপ্রেসিন) ও অক্সিটোসিন | বৃক্কের নেফ্রন ও জরায়ু | ADH বৃক্কে জলের পুনঃশোষণ বাড়িয়ে মূত্রের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে; অক্সিটোসিন প্রসবের সময় জরায়ুর সংকোচন ঘটায়। |
১.৫ বৃদ্ধি হরমোনের অস্বাভাবিক ক্ষরণজনিত রোগসমূহ
- বামনত্ব (Dwarfism / পিটুইটারি ডোয়ার্ফিজম): শৈশবকালে গ্রোথ হরমোনের (GH) স্বল্প ক্ষরণের (ঘাটতির) কারণে অস্থির অনুদৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এর ফলে মানুষটির উচ্চতা বৃদ্ধি পায় না এবং প্রাপ্তবয়সেও উচ্চতা মাত্র ৩ থেকে ৪ ফুট থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, পিটুইটারি বামনদের বুদ্ধিমত্তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকে এবং দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অনুপাত সঠিক থাকে।
- দৈত্যাকারত্ব (Gigantism): শৈশবকালে গ্রোথ প্লেট জোড়া লাগার পূর্বে GH-এর অত্যধিক ক্ষরণের ফলে অস্থিগুলো অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে যায়, ফলে ব্যক্তিটি ৭ থেকে ৮.৫ ফুট পর্যন্ত অস্বাভাবিক দীর্ঘাকৃতি দানবের মতো চেহারা পায়।
- অ্যাক্রোমেগালি (Acromegaly): প্রাপ্তবয়সে অস্থির বৃদ্ধি বন্ধ হওয়ার পর GH অতিরিক্ত ক্ষরিত হলে অস্থি লম্বায় বাড়তে পারে না, তবে চওড়ায় মোটা হয়। ফলে নিচের চোয়াল অস্বাভাবিক বড় হয়ে সামনে বেরিয়ে আসে (গরিলা মুখাবয়ব), হাত-পা ভারী ও স্থূল হয়ে যায়।