Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Science • অধ্যায় 9
আনুমানিক সময়: ৫৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও বয়ঃসন্ধি

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অনুমোদিত অষ্টম শ্রেণির "পরিবেশ ও বিজ্ঞান" পাঠ্যসূচির নবম অধ্যায় "অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও বয়ঃসন্ধি" (Endocrine System and Adolescence)-এর পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য ডিজিটাল স্টাডি মেটেরিয়াল। মানবদেহ এক অনন্য জৈব কারখানা, যেখানে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কোশ এক অভূতপূর্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে বেঁচে থাকে। স্নায়ুতন্ত্র যেখানে বিদ্যুতের গতিতে তাৎক্ষণিক বার্তা পাঠায়, অন্তঃক্ষরা তন্ত্র সেখানে রক্তের মাধ্যমে ধীর কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক বার্তাবাহক "হরমোন" ক্ষরণ করে দেহের বৃদ্ধি, বিপাক, জল-লবণের ভারসাম্য এবং প্রজনন চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। খুলির নিচে সুরক্ষিত পিটুইটারি বা "প্রভু গ্রন্থি" থেকে শুরু করে গলার থাইরয়েড, রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রক অগ্ন্যাশয়, এবং আপৎকালীন সংকট মোকাবিলার অ্যাড্রিনালিন—প্রতিটি হরমোনের ভূমিকা মানবজীবনের জন্য অপরিহার্য। জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় ও সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণ হলো "বয়ঃসন্ধিকাল" (Adolescence, ১০ থেকে ১৯ বছর)। যৌন হরমোনের (টেস্টোস্টেরন ও ইস্ট্রোজেন) প্রভাবে এই সময়ে উচ্চতার আকস্মিক স্ফুরণ, ছেলেদের কণ্ঠমণি (Adam's Apple) গঠন ও গলার স্বর ভাঙা, মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তন ও রজঃচক্রের সূচনা, ত্বকে তেলের ক্ষরণ বৃদ্ধি পেয়ে ব্রণ হওয়া এবং মস্তিষ্কের আবেগীয় রূপান্তর ঘটে। এই মাস্টার গাইডটি ৫টি সুসংহত শিক্ষণ এককে বিভক্ত: (১) অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির ধারণা, হরমোনের বৈশিষ্ট্য ও প্রভু গ্রন্থি পিটুইটারি; (২) বিপাকীয় ও সংকটকালীন নিয়ন্ত্রক: থাইরয়েড, অগ্ন্যাশয় ও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি; (৩) জনন গ্রন্থি, যৌন হরমোন ও বয়ঃসন্ধির শারীরবৃত্ত; (৪) বয়ঃসন্ধির শারীরিক বৃদ্ধি, গৌণ যৌন লক্ষণ ও মানসিক পরিবর্তন; এবং (৫) কিশোর স্বাস্থ্য, সুষম পুষ্টি, রক্তাল্পতা (WIFS), রজঃস্রাবকালীন স্বাস্থ্যবিধি ও জীবনদক্ষতা শিক্ষা। ২৫টি উপ-অনুচ্ছেদ, ভেক্টর এসভিজি কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি বৈজ্ঞানিক নীতি ও সূত্র কার্ড, ৮টি আদর্শ সমাধানকৃত উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষকের ফাঁদ ও সাধারণ ভুলত্রুটি, ৮টি সারসংক্ষেপ, ৮টি মূল শিক্ষণীয় পয়েন্ট, ৫টি আত্মমূল্যায়ন প্রশ্ন ও ৫টি সিবিটি ডায়াগনস্টিক মক প্রশ্ন সহকারে নির্মিত।

⚡ রাসায়নিক অর্কেস্ট্রা: আণুবীক্ষণিক অণু কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের জীবন ও বয়ঃসন্ধির রূপান্তর?

কখনো ভেবে দেখেছো, অন্ধকারে হঠাৎ কোনো বিপদের মুখে পড়লে কেন নিজের অজান্তেই বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড হাতুড়ির মতো পিটতে থাকে, দম বন্ধ হয়ে আসে আর চোখের মণি বড় হয়ে যায়?

কিংবা ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সে পৌঁছাতেই হঠাৎ করে কেন জুতো আর জামাকাপড় ছোট হয়ে যায়, গলার আওয়াজ কর্কশ হয়ে ভারী শোনায়, আর কপালে-গালে জেদি ব্রণ ফুটে ওঠে? তুমি নিজে তো সচেতনভাবে এমন কোনো নির্দেশ দাওনি!

তোমার দেহের ভেতরে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা রক্তে ভেসে বেড়াচ্ছে একদল অদৃশ্য রাসায়নিক দূত: হরমোন এবং অন্তঃক্ষরা তন্ত্র! এসো, মানবজীবনের এই রোমাঞ্চকর রাসায়নিক অর্কেস্ট্রা এবং নিজের জীবনের বয়ঃসন্ধি-র গোপন বিজ্ঞানকে জেনে নিই!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অনুমোদিত অষ্টম শ্রেণির "পরিবেশ ও বিজ্ঞান" পাঠ্যসূচির নবম অধ্যায় "অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও বয়ঃসন্ধি" (Endocrine System and Adolescence)-এর পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণ্য ডিজিটাল স্টাডি মেটেরিয়াল। মানবদেহ এক অনন্য জৈব কারখানা, যেখানে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কোশ এক অভূতপূর্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে বেঁচে থাকে। স্নায়ুতন্ত্র যেখানে বিদ্যুতের গতিতে তাৎক্ষণিক বার্তা পাঠায়, অন্তঃক্ষরা তন্ত্র সেখানে রক্তের মাধ্যমে ধীর কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক বার্তাবাহক "হরমোন" ক্ষরণ করে দেহের বৃদ্ধি, বিপাক, জল-লবণের ভারসাম্য এবং প্রজনন চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। খুলির নিচে সুরক্ষিত পিটুইটারি বা "প্রভু গ্রন্থি" থেকে শুরু করে গলার থাইরয়েড, রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রক অগ্ন্যাশয়, এবং আপৎকালীন সংকট মোকাবিলার অ্যাড্রিনালিন—প্রতিটি হরমোনের ভূমিকা মানবজীবনের জন্য অপরিহার্য। জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় ও সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণ হলো "বয়ঃসন্ধিকাল" (Adolescence, ১০ থেকে ১৯ বছর)। যৌন হরমোনের (টেস্টোস্টেরন ও ইস্ট্রোজেন) প্রভাবে এই সময়ে উচ্চতার আকস্মিক স্ফুরণ, ছেলেদের কণ্ঠমণি (Adam's Apple) গঠন ও গলার স্বর ভাঙা, মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তন ও রজঃচক্রের সূচনা, ত্বকে তেলের ক্ষরণ বৃদ্ধি পেয়ে ব্রণ হওয়া এবং মস্তিষ্কের আবেগীয় রূপান্তর ঘটে। এই মাস্টার গাইডটি ৫টি সুসংহত শিক্ষণ এককে বিভক্ত: (১) অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির ধারণা, হরমোনের বৈশিষ্ট্য ও প্রভু গ্রন্থি পিটুইটারি; (২) বিপাকীয় ও সংকটকালীন নিয়ন্ত্রক: থাইরয়েড, অগ্ন্যাশয় ও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি; (৩) জনন গ্রন্থি, যৌন হরমোন ও বয়ঃসন্ধির শারীরবৃত্ত; (৪) বয়ঃসন্ধির শারীরিক বৃদ্ধি, গৌণ যৌন লক্ষণ ও মানসিক পরিবর্তন; এবং (৫) কিশোর স্বাস্থ্য, সুষম পুষ্টি, রক্তাল্পতা (WIFS), রজঃস্রাবকালীন স্বাস্থ্যবিধি ও জীবনদক্ষতা শিক্ষা। ২৫টি উপ-অনুচ্ছেদ, ভেক্টর এসভিজি কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি বৈজ্ঞানিক নীতি ও সূত্র কার্ড, ৮টি আদর্শ সমাধানকৃত উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষকের ফাঁদ ও সাধারণ ভুলত্রুটি, ৮টি সারসংক্ষেপ, ৮টি মূল শিক্ষণীয় পয়েন্ট, ৫টি আত্মমূল্যায়ন প্রশ্ন ও ৫টি সিবিটি ডায়াগনস্টিক মক প্রশ্ন সহকারে নির্মিত।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ ও তন্ত্র (যেমন সংবহনতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র) সম্পর্কিত প্রাথমিক ধারণা।
  • স্নায়ুতন্ত্র কীভাবে সংবেদন বহন করে তার সাধারণ পরিচয়।
  • মানুষের বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায় (শৈশব, কৈশোর, যৌবন) সম্পর্কে ধারণা।
  • সুষম খাদ্যের উপাদানসমূহ (প্রোটিন, শর্করা, ফ্যাট, ভিটামিন ও খনিজ লবণ) সম্পর্কিত প্রাথমিক জ্ঞান।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • অনাল (অন্তঃক্ষরা), সনাল (বহিঃক্ষরা) এবং মিশ্র গ্রন্থির পার্থক্য উদাহরণসহ নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • হরমোনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য এবং হোমিওস্ট্যাসিস রক্ষায় নেগেটিভ ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণের ক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে পারবে।
  • পিটুইটারি, থাইরয়েড, অগ্ন্যাশয় ও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির অবস্থান, নিঃসৃত হরমোন, কাজ এবং ক্ষরণজনিত রোগসমূহ শনাক্ত করতে পারবে।
  • মুখ্য ও গৌণ যৌন লক্ষণের পার্থক্য নিরূপণ করতে পারবে এবং বয়ঃসন্ধিতে টেস্টোস্টেরন, ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের ভূমিকা মূল্যায়ন করতে পারবে।
  • বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক বৃদ্ধি, ল্যারিংসের প্রসারণ (কণ্ঠমণি), স্বরভঙ্গ, ত্বকের ব্রণ এবং মস্তিষ্কের আবেগীয় পরিবর্তন বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • কৈশোরকালীন সুষম পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা, রক্তাল্পতা (Anemia) প্রতিরোধে সরকারি WIFS কর্মসূচির গুরুত্ব, রজঃস্রাবকালীন স্বাস্থ্যবিধি এবং মাদকাসক্তি প্রতিরোধের জীবনদক্ষতা প্রয়োগ করতে পারবে।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির ধারণা, হরমোন...
2 ২. বিপাকীয় ও সংকটকালীন নিয়ন্ত্রক:...
3 ৩. জনন গ্রন্থি, যৌন হরমোন ও বয়ঃসন্ধ...
4 ৪. বয়ঃসন্ধির শারীরিক বৃদ্ধি, গৌণ যৌ...
5 ৫. কিশোর স্বাস্থ্য, সুষম পুষ্টি, রক...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির ধারণা, হরমোনের ক্রিয়া ও পিটুইটারি গ্রন্থি

১.১ সনাল (বহিঃক্ষরা), অনাল (অন্তঃক্ষরা) ও মিশ্র গ্রন্থির তুলনা

মানবদেহের বিভিন্ন শারীরিক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ প্রকার নিঃসরণকারী অঙ্গ থাকে, যাদের গ্রন্থি (Glands) বলে। নিঃসরণের পরিবহন পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে গ্রন্থি তিন প্রকার:

গ্রন্থির শ্রেণি গঠনগত বৈশিষ্ট্য নিঃসরণের প্রকৃতি পরিবহন মাধ্যম মানবদেহের বাস্তব উদাহরণ
সনাল বা বহিঃক্ষরা গ্রন্থি (Exocrine Glands) নির্দিষ্ট ক্ষরণ নালী (Duct) উপস্থিত। উৎসেচক (Enzyme), লালা, ঘাম, সিবাম, শ্লেষ্মা। নালীর মাধ্যমে সরাসরি কার্যকারী অঙ্গে বা দেহতলে পৌঁছায়। লালাগ্রন্থি (প্যারোটিড, সাবম্যান্ডিবুলার), ঘর্মগ্রন্থি, সিবেসিয়াস (তৈল) গ্রন্থি, যকৃত, অশ্রুগ্রন্থি।
অনাল বা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি (Endocrine Glands) নালীবিহীন (Ductless); কোনো ক্ষরণ নালী থাকে না। হরমোন (রাসায়নিক বার্তাবাহক)। সরাসরি রক্তজালকের রক্ত ও লসিকায় মিশে রক্তস্রোতের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। পিটুইটারি গ্রন্থি, থাইরয়েড গ্রন্থি, প্যারাথাইরয়েড, অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি, পিনিয়াল গ্রন্থি।
মিশ্র গ্রন্থি (Heterocrine / Mixed Glands) সনাল ও অনাল—উভয় প্রকার কলা দিয়ে গঠিত। উৎসেচক এবং হরমোন উভয়ই নিঃসৃত হয়। উৎসেচক নালীর মাধ্যমে এবং হরমোন রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। অগ্ন্যাশয় (বহিঃক্ষরা অংশ পাচক রস ক্ষরণ করে; অন্তঃক্ষরা অংশ ইনসুলিন ও গ্লুকাগন ক্ষরণ করে), শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয়।

১.২ হরমোন কী? রাসায়নিক দূতের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

১৯০৫ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী উইলিয়াম বেলিস এবং আর্নেস্ট স্টার্লিং গ্রিক শব্দ Horman (যার অর্থ "জাগ্রত করা" বা "উত্তেজিত করা") থেকে হরমোন (Hormone) শব্দটি প্রবর্তন করেন। রাসায়নিকভাবে হরমোন হলো অনাল গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন বিশেষ জৈব-রাসায়নিক বার্তাবাহক।

  • ১. রাসায়নিক বার্তাবাহক (Chemical Messenger): হরমোন শরীরের এক প্রান্তের উৎস কোশ থেকে উৎপন্ন হয়ে সংকেত বা বার্তা বহন করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য কোশ বা লক্ষ্য অঙ্গে (Target Organ) পৌঁছে দেয়।
  • ২. রক্তবাহিত পরিবহন: নালী না থাকায় হরমোন সরাসরি রক্তস্রোতে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
  • ৩. নির্দিষ্ট গ্রাহক নির্ভরতা (Receptor Specificity): রক্তে ভেসে সারা শরীরে গেলেও হরমোন কেবল সেই সমস্ত কোশেই কাজ করতে পারে যাদের কোশপর্দায় বা নিউক্লিয়াসে সেই হরমোনের জন্য নির্দিষ্ট গ্রাহক প্রোটিন (Receptor) থাকে (যেমন নির্দিষ্ট তালার জন্য নির্দিষ্ট চাবি)। অন্যান্য কোশ একে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে।
  • ৪. অতি-আণুবীক্ষণিক মাত্রায় কার্যকারিতা: হরমোন রক্তে অতি সূক্ষ্ম মাত্রায় (মাইক্রোগ্রাম বা পিকোbergram) কাজ করে। স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য কম ক্ষরণ (Hyposecretion) বা বেশি ক্ষরণ (Hypersecretion)—উভয়ই মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করে।
  • ৫. ক্রিয়ার পর ধ্বংসপ্রাপ্তি: উৎসেচকের মতো হরমোন শরীরে জমা থাকে না বা অপরিবর্তিত থাকে না। কাজ শেষ হওয়ামাত্রই হরমোন ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়, যকৃতে পরিবর্তিত হয় এবং বৃক্কের মাধ্যমে মূত্রের সাথে নির্গত হয়।

১.৩ নেগেটিভ ফিডব্যাক নিয়ন্ত্রণ: দেহের হোমিওস্ট্যাসিস বজায় রাখা

শরীরে হরমোনের মাত্রা যেন কখনোই অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে বা কমে না যায়, তার জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় জৈবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ করে, যাকে নেগেটিভ ফিডব্যাক ব্যবস্থা (Negative Feedback Mechanism) বলে:

কীভাবে নেগেটিভ ফিডব্যাক কাজ করে?

রক্তে যখন কোনো নির্দিষ্ট হরমোনের ঘনত্ব স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়ে যায়, তখন সেই বাড়তি ঘনত্বের উপস্থিতি সংকেত পাঠিয়ে উৎস গ্রন্থি বা নিয়ন্ত্রক পিটুইটারি থেকে হরমোন উৎপাদন বন্ধ বা হ্রাস করে দেয়।

আবার রক্তে হরমোনের মাত্রা কমে গেলে সেই বাধার প্রভাব সরে যায় এবং গ্রন্থিটি পুনরায় হরমোন ক্ষরণ শুরু করে। এই বিপরীতমুখী নিয়ন্ত্রণ শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বা হোমিওস্ট্যাসিস (Homeostasis) বজায় রাখে।

  • থাইরক্সিন ও TSH-এর উদাহরণ: রক্তে থাইরক্সিন কমে গেলে পিটুইটারি TSH হরমোন বাড়িয়ে থাইরয়েডকে উদ্দীপিত করে। আবার রক্তে থাইরক্সিন বেড়ে গেলে তা পিটুইটারিতে গিয়ে TSH ক্ষরণ বন্ধ করে দেয়।

১.৪ পিটুইটারি গ্রন্থি: শরীরের "প্রভু গ্রন্থি" (Master Gland)

পিটুইটারি গ্রন্থি হলো একটি মটরদানার মতো ক্ষুদ্র অথচ অত্যন্ত ক্ষমতাশালী অনাল গ্রন্থি, যা মস্তিষ্কের গোড়ায় করোটির স্ফেনয়েড অস্থির সেলা টারসিকা (Sella Turcica) নামক গহ্বরে সুরক্ষিত থাকে। এটি সরু বৃন্ত বা ইনফান্ডিবুলাম দিয়ে হাইপোথ্যালামাসের সাথে যুক্ত থাকে।

অন্যান্য অধিকাংশ অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির (থাইরয়েড, অ্যাড্রিনাল কর্টেক্স, জনন গ্রন্থি) বৃদ্ধি ও হরমোন ক্ষরণকে নিজ হরমোনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে বলে পিটুইটারিকে "প্রভু গ্রন্থি" (Master Gland) বলা হয়। (তবে পিটুইটারি স্বয়ং হাইপোথ্যালামাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাই হাইপোথ্যালামাসকে "মাস্টার অফ মাস্টার গ্ল্যান্ড" বা সুপ্রিম কমান্ডার বলা হয়)।

পিটুইটারির অংশ প্রধান হরমোন কার্যকারী অঙ্গ প্রধান শারীরবৃত্তীয় কাজ
অগ্র পিটুইটারি (Anterior Lobe) বৃদ্ধি হরমোন (GH বা STH) অস্থি, পেশি ও দেহতন্তু অস্থির এপিফাইসিয়াল তরুণাস্থির কোশ বিভাজন ঘটিয়ে দেহের সামগ্রিক দৈহিক বৃদ্ধি ও উচ্চতা বৃদ্ধি ঘটায়।
থাইরয়েড উদ্দীপক হরমোন (TSH) থাইরয়েড গ্রন্থি থাইরয়েড গ্রন্থির বৃদ্ধি ঘটায় এবং থাইরক্সিন হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
অ্যাড্রিনোকোর্টিকোট্রপিক হরমোন (ACTH) অ্যাড্রিনাল কর্টেক্স অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির কর্টেক্স অংশের বৃদ্ধি ও হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
গোনাডোট্রপিক হরমোন (FSH ও LH) শুক্রাশয় ও ডিম্বাশয় শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উৎপাদন এবং যৌন হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
পশ্চাৎ পিটুইটারি (Posterior Lobe) অ্যান্টিডাইইউরেটিক হরমোন (ADH / ভেসোপ্রেসিন) ও অক্সিটোসিন বৃক্কের নেফ্রন ও জরায়ু ADH বৃক্কে জলের পুনঃশোষণ বাড়িয়ে মূত্রের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে; অক্সিটোসিন প্রসবের সময় জরায়ুর সংকোচন ঘটায়।

১.৫ বৃদ্ধি হরমোনের অস্বাভাবিক ক্ষরণজনিত রোগসমূহ

  • বামনত্ব (Dwarfism / পিটুইটারি ডোয়ার্ফিজম): শৈশবকালে গ্রোথ হরমোনের (GH) স্বল্প ক্ষরণের (ঘাটতির) কারণে অস্থির অনুদৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এর ফলে মানুষটির উচ্চতা বৃদ্ধি পায় না এবং প্রাপ্তবয়সেও উচ্চতা মাত্র ৩ থেকে ৪ ফুট থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, পিটুইটারি বামনদের বুদ্ধিমত্তা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকে এবং দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অনুপাত সঠিক থাকে।
  • দৈত্যাকারত্ব (Gigantism): শৈশবকালে গ্রোথ প্লেট জোড়া লাগার পূর্বে GH-এর অত্যধিক ক্ষরণের ফলে অস্থিগুলো অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে যায়, ফলে ব্যক্তিটি ৭ থেকে ৮.৫ ফুট পর্যন্ত অস্বাভাবিক দীর্ঘাকৃতি দানবের মতো চেহারা পায়।
  • অ্যাক্রোমেগালি (Acromegaly): প্রাপ্তবয়সে অস্থির বৃদ্ধি বন্ধ হওয়ার পর GH অতিরিক্ত ক্ষরিত হলে অস্থি লম্বায় বাড়তে পারে না, তবে চওড়ায় মোটা হয়। ফলে নিচের চোয়াল অস্বাভাবিক বড় হয়ে সামনে বেরিয়ে আসে (গরিলা মুখাবয়ব), হাত-পা ভারী ও স্থূল হয়ে যায়।

২. বিপাকীয় ও সংকটকালীন নিয়ন্ত্রক: থাইরয়েড, অগ্ন্যাশয় ও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি

২.১ থাইরয়েড গ্রন্থি: দেহের বিপাকীয় থার্মোস্ট্যাট

থাইরয়েড গ্রন্থি (Thyroid Gland) হলো গলার শ্বাসনালী বা ট্র্যাকিয়ার ওপর ল্যারিংসের ঠিক নিচে অবস্থিত প্রজাপতি আকৃতির এক জোড়া খণ্ডকযুক্ত লালচে-বাদামি অনাল গ্রন্থি। খণ্ডক দুটি একটি পাতলা যোজক কলা ইস্থমাস (Isthmus) দিয়ে যুক্ত থাকে।

  • থাইরক্সিন হরমোন ($T_4$): থাইরয়েডের ফলিকল কোশ থেকে নিঃসৃত প্রধান হরমোন।
  • আয়োডিনের অপরিহার্যতা: থাইরক্সিন হরমোন তৈরির মূল রাসায়নিক কাঁচামাল হলো খাদ্যের আয়োডিন (Iodine) খনিজ। প্রতিটি থাইরক্সিন অণুতে ৪টি আয়োডিন পরমাণু থাকে। খাদ্যে বা জলে আয়োডিন না থাকলে থাইরক্সিন তৈরি হতে পারে না!
  • থাইরক্সিনের শারীরবৃত্তীয় কাজ:
    • মৌল বিপাকীয় হার (BMR) নিয়ন্ত্রণ: থাইরক্সিন শরীরের সমস্ত কোশে মাইটোকন্ড্রিয়ার অক্সিজেন গ্রহণ ও কোশীয় শ্বসন বৃদ্ধি করে।
    • ক্যালোরিজেনিক ক্রিয়া (Calorigenic Effect): বিপাক বাড়িয়ে কোশে তাপ শক্তি উৎপন্ন করে এবং দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখে, তাই একে "ক্যালোরিজেনিক হরমোন" বলে।
    • দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি: শিশুদের অস্থির বিকাশ ও মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্তুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য থাইরক্সিন অপরিহার্য। ব্যাঙাচির রূপান্তর (Metamorphosis) ঘটিয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙে রূপান্তরে থাইরক্সিন সরাসরি কাজ করে।

২.২ থাইরয়েড গ্রন্থির ক্ষরণজনিত রোগসমূহ

  • গলগণ্ড বা সরল গয়টার (Simple Goitre): খাবারে বা পানীয় জলে আয়োডিনের অভাব ঘটলে থাইরয়েড পর্যাপ্ত থাইরক্সিন বানাতে পারে না। রক্তে থাইরক্সিন কমে যাওয়ায় পিটুইটারি গ্রন্থি অতিরিক্ত মাত্রায় TSH ক্ষরণ করে থাইরয়েডকে অনবরত উদ্দীপিত করতে থাকে। লাগাতার উদ্দীপনার চাপে থাইরয়েডের কোশগুলো ফুলে-ফেঁপে আয়তনে বহুগুণ বেড়ে যায়, ফলে গলার গোড়া মারাত্মকভাবে ফুলে ওঠে। এটি প্রতিরোধের জন্য আয়োডিনযুক্ত খাদ্য লবণ (Iodized Salt) ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
  • ক্রেটিনিজম (Cretinism): শৈশবে থাইরক্সিনের মারাত্মক ঘাটতির ফলে শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি থমকে যায় এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—শিশুটি স্থায়ীভাবে মারাত্মক মানসিক প্রতিবন্ধী (জড়বুদ্ধিসম্পন্ন) হয়ে পড়ে।
  • মিক্সিডিমা (Myxoedema): প্রাপ্তবয়স্কদের থাইরক্সিনের ঘাটতি হলে BMR কমে যায়, হৃদস্পন্দন ধীর হয়, শীত সহ্য করার ক্ষমতা কমে এবং চোখের নিচে ও মুখে চর্বি ও জল জমে মুখমণ্ডল ফুলে যায়।
  • বহির্চক্ষু গলগণ্ড (Exophthalmic Goitre / গ্রেভস ডিজিজ): থাইরক্সিনের অত্যধিক ক্ষরণে BMR সাংঘাতিক বেড়ে যায়, ওজন দ্রুত কমে, বুক ধড়ফড় করে এবং চোখের পেছনের চর্বি ফুলে চোখের মণি কোটর থেকে বাইরে ঠেলে বেরিয়ে আসে।

২.৩ অগ্ন্যাশয় (ল্যাঙ্গারহ্যান্সের দ্বীপপুঞ্জ): রক্তে শর্করার সাম্যাবস্থা

পাকস্থলীর নিচে ডুওডেনামের খাঁজে অবস্থিত অগ্ন্যাশয় (Pancreas) একটি মিশ্র গ্রন্থি। অগ্ন্যাশয়ের পাচক উৎসেচক ক্ষরণকারী কলার মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্তভাবে প্রায় ১০ থেকে ২০ লক্ষ আণুবীক্ষণিক অন্তঃক্ষরা কোশপুঞ্জ থাকে, যাদের ল্যাঙ্গারহ্যান্সের দ্বীপপুঞ্জ (Islets of Langerhans) বলে।

দ্বীপপুঞ্জের কোশ নিঃসৃত হরমোন রক্তের শর্করার ওপর প্রভাব জৈব-রাসায়নিক কার্যপদ্ধতি
বিটা কোশ ($\beta$-cells) — প্রায় ৭০% ইনসুলিন (Insulin) রক্তের গ্লুকোজ কমায় (Hypoglycemic)
  • কলাকোশে রক্তের গ্লুকোজ প্রবেশ ও দহন বৃদ্ধি করে।
  • গ্লাইকোজেনেসিস (Glycogenesis): অতিরিক্ত রক্তশর্করাকে অদ্রবণীয় গ্লাইকোজেনে রূপান্তরিত করে যকৃৎ ও পেশিতে সঞ্চয় করে।
  • প্রোটিন ও ফ্যাট থেকে নতুন গ্লুকোজ তৈরিতে বাধা দেয়।
আলফা কোশ ($\alpha$-cells) — প্রায় ২০% গ্লুকাগন (Glucagon) রক্তের গ্লুকোজ বাড়ায় (Hyperglycemic)
  • গ্লাইকোজেনোলাইসিস (Glycogenolysis): যকৃতে সঞ্চিত গ্লাইকোজেনকে ভেঙে পুনরায় গ্লুকোজে পরিণত করে রক্তে পাঠায়।
  • উপবাস বা ক্ষুধার সময় রক্তের শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া রোধ করে।

ইনসুলিন ও গ্লুকাগন পরস্পরের বিপরীতমুখী (Antagonistic) কাজ করে সুস্থ মানুষের রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মাত্রা প্রতি ১০০ মিলিলিটার রক্তে ৮০–১২০ মিলিগ্রাম-এর মধ্যে নিখুঁতভাবে স্থির রাখে।

২.৪ মধুমেহ রোগ (Diabetes Mellitus): লক্ষণ ও প্রতিকার

অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা ইনসুলিনের ক্ষরণ ও কার্যকারিতা কমে গেলে রক্তে শর্করা কোশের ভেতর ঢুকতে পারে না, ফলে রক্তে গ্লুকোজ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। এই অবস্থাকে মধুমেহ বা ডায়াবেটিস মেলিটাস (Diabetes Mellitus) বলে:

  • হাইপারগ্লাইসেমিয়া (Hyperglycemia): রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পায় (১৮০ থেকে ৩০০ mg/dL বা তার বেশি)।
  • গ্লুকোসুরিয়া (Glycosuria): রক্তে অতিরিক্ত শর্করা বৃক্কের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে মূত্রের সাথে অবিরাম গ্লুকোজ নির্গত হতে থাকে।
  • ডায়াবেটিসের ৩টি প্রধান লক্ষণ (Three Polys):
    • পলিইউরিয়া (Polyuria): মূত্রের সাথে গ্লুকোজ বের হওয়ার সময় প্রচুর জল টেনে নেয়, ফলে ঘন ঘন অতিরিক্ত প্রস্রাব পায়।
    • পলিডিপসিয়া (Polydipsia): শরীর থেকে অতিরিক্ত জল বের হয়ে যাওয়ায় তীব্র জলতৃষ্ণা পায় ও গলা শুকিয়ে যায়।
    • পলিফ্যাজিয়া (Polyphagia): কোশগুলো রক্তে গ্লুকোজ থাকা সত্ত্বেও অনাহারে থাকে, ফলে মস্তিষ্কের ক্ষুধা কেন্দ্র অনবরত তীব্র ক্ষুধার অনুভূতি তৈরি করে।
  • নিয়ন্ত্রণ: চিনি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার পরিহার, নিয়মিত ব্যায়াম, ডাক্তারের পরামর্শমতো ওষুধ এবং প্রয়োজনে চামড়ার নিচে ইনসুলিন ইনজেকশন গ্রহণ। (ইনসুলিন মুখে খাওয়া যায় না কারণ পাকস্থলীর পেপসিন একে প্রোটিন হিসেবে হজম করে ফেলে)।

২.৫ অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি ও সংকটকালীন হরমোন অ্যাড্রিনালিন

প্রতিটি বৃক্ক বা কিডনির ওপর টুপির মতো বসে থাকা ত্রিকোণাকার গ্রন্থিকে অ্যাড্রিনাল বা সুপ্রারেনাল গ্রন্থি (Adrenal Gland) বলে। এর ভেতরের অংশকে মেডালা বলে, যেখান থেকে নিঃসৃত হয় বিখ্যাত হরমোন অ্যাড্রিনালিন (Adrenaline / Epinephrine)।

কেন অ্যাড্রিনালিনকে "জরুরিকালীন বা সংকটকালীন হরমোন" (Fight-or-Flight Hormone) বলে?

হঠাৎ কোনো বিপদ, ভয়, রাগ, চরম দুশ্চিন্তা বা উত্তেজনার মুহূর্তে সহানুভূতিশীল স্নায়ুতন্ত্রের নির্দেশে অ্যাড্রিনালিন রক্তে বিপুল মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে।

এটি তাৎক্ষণিকভাবে দেহের সমস্ত শক্তি সংহত করে বিপদের সাথে যুদ্ধ করা (Fight) অথবা দৌড়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোর (Flight) জন্য শরীরকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে তোলে:

  • হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ বৃদ্ধি: হৃদপিণ্ডের সংকোচন ক্ষমতা ও স্পন্দন বাড়িয়ে পেশি ও মস্তিষ্কে বিদ্যুতের গতিতে রক্ত সংবহন করায়।
  • শ্বাসনালী প্রসারণ (Bronchodilation): ফুসফুসের ব্রঙ্কিওল নালী প্রসারিত করে দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস চালায়, যাতে বেশি অক্সিজেন রক্তে ঢোকে।
  • রক্তের পুনঃবণ্টন: ত্বক ও পরিপাকতন্ত্রের রক্তজালক সংকুচিত করে (যার ফলে ভয়ে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়) সেই রক্ত কঙ্কালপেশি, হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কে পাঠিয়ে দেয়!
  • গ্লুকোজ মুক্তকরণ: যকৃতের গ্লাইকোজেন ভেঙে রক্তে প্রচুর গ্লুকোজ ঢেলে দেয়, যাতে পেশি তাৎক্ষণিক তীব্র শক্তি পায়।
  • চোখের মণি প্রসারণ: বিপদের দিকে পরিষ্কার দৃষ্টি রাখার জন্য চোখের তারা বা পিউপিল প্রসারিত করে।

৩. জনন গ্রন্থি, যৌন হরমোন ও বয়ঃসন্ধির শারীরবৃত্ত

৩.১ পুরুষ জনন গ্রন্থি: শুক্রাশয় ও টেস্টোস্টেরন হরমোন

পুরুষদের প্রধান জনন অঙ্গ হলো একজোড়া শুক্রাশয় (Testes), যা দেহের বাইরে স্ক্রোটাম (Scrotum) নামক চামড়ার থলিতে অবস্থান করে (দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে ২-৩ ডিগ্রি কম তাপমাত্রা শুক্রাণু তৈরির জন্য জরুরি)।

  • লেডিগের আন্তরকোশ (Interstitial Cells of Leydig): শুক্রাশয়ের শুক্রোৎপাদক নালিকাগুলোর মাঝে অবস্থিত এই বিশেষ অন্তঃক্ষরা কোশ থেকে প্রধান পুরুষ হরমোন টেস্টোস্টেরন (Testosterone) নিঃসৃত হয়।
  • টেস্টোস্টেরনের কাজ:
    • পুরুষ জননাঙ্গের বৃদ্ধি ও পূর্ণতা দান করা।
    • শুক্রোৎপাদক নালিকায় শুক্রাণু উৎপাদন (Spermatogenesis) প্রক্রিয়া শুরু ও সচল রাখা।
    • বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেদের গৌণ যৌন লক্ষণসমূহের প্রকাশ ঘটানো (দাড়ি-গোঁফ, পেশিবহুল বলিষ্ঠ শরীর, কণ্ঠমণি গঠন)।

৩.২ স্ত্রী জনন গ্রন্থি: ডিম্বাশয়, ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন

নারীদের শ্রোণী গহ্বরে জরায়ুর দুপাশে একজোড়া বাদাম আকৃতির অঙ্গ থাকে, যাদের ডিম্বাশয় (Ovaries) বলে। ডিম্বাশয় ডিম্বাণু তৈরির পাশাপাশি দুটি প্রধান স্টেরয়েড হরমোন ক্ষরণ করে:

  • ১. ইস্ট্রোজেন (Estrogen): ডিম্বাশয়ের পরিণত ডিম্বথলি (গ্রাফিয়ান ফলিকল) থেকে নিঃসৃত হয়:
    • মেয়েদের জননাঙ্গের (জরায়ু, ফেলোপিয়ান নালী, যোনি) বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে।
    • বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের গৌণ যৌন লক্ষণসমূহের বিকাশ ঘটায়: স্তনগ্রন্থির বৃদ্ধি, নিতম্ব ও কোমরের হাড় চওড়া হওয়া, ত্বকের নিচে কোমল চর্বির বিন্যাস।
    • রজঃচক্রের শুরুতে জরায়ুর এন্ডোমেট্রিয়াম প্রাচীর পুনর্গঠন ও মেরামত করে।
  • ২. প্রোজেস্টেরন (Progesterone): ডিম্বাণু নিঃসরণের পর ডিম্বথলির অবশিষ্টাংশ থেকে গঠিত পীতগ্রন্থি (Corpus Luteum) থেকে নিঃসৃত হয়:
    • একে "গর্ভাবস্থা রক্ষাকারী হরমোন" (Pregnancy Hormone) বলা হয়।
    • জরায়ুর অভ্যন্তরীণ এন্ডোমেট্রিয়াম স্তরকে পুরু, রসালো ও রক্তজালকসমৃদ্ধ করে নিষিক্ত ভ্রূণ রোপণের (Implantation) উপযোগী করে তোলে।
    • গর্ভাবস্থায় জরায়ুর সংকোচন বন্ধ রেখে গর্ভপাত রোধ করে এবং প্লাসেন্টা বা অমরা গঠনে সাহায্য করে।

৩.৩ বয়ঃসন্ধির ধারণা ও HPG অক্ষের জাগরণ

বয়ঃসন্ধি (Puberty) হলো মানবজীবনের শৈশব ও যৌবনের মধ্যবর্তী শারীরিক, শারীরবৃত্তীয় ও মানসিক রূপান্তরের সেই পর্ব, যার মাধ্যমে শরীর প্রজনন ক্ষমতায় পূর্ণতা লাভ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সসীমাকে বয়ঃসন্ধিকাল (Adolescence) হিসেবে গণ্য করা হয়।

  • বয়ঃসন্ধি কীভাবে শুরু হয়? (HPG Axis):
    1. নির্দিষ্ট বয়সে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস সক্রিয় হয়ে GnRH হরমোন ক্ষরণ শুরু করে।
    2. GnRH সংকেত পেয়ে অগ্র পিটুইটারি গ্রন্থি দুটি গোনাডোট্রপিন হরমোন—FSH ও LH রক্তে ছেড়ে দেয়।
    3. FSH ও LH রক্তের মাধ্যমে জনন গ্রন্থিতে (শুক্রাশয়/ডিম্বাশয়) পৌঁছে সেগুলোকে জাগিয়ে তোলে এবং পুরুষে টেস্টোস্টেরন ও নারীতে ইস্ট্রোজেন হরমোন ক্ষরণ নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেয়।
    4. এই যৌন হরমোনগুলো সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে কৈশোরের শারীরিক ও মানসিক বিপ্লব ঘটায়!

৩.৪ মুখ্য যৌন লক্ষণ বনাম গৌণ যৌন লক্ষণ

শ্রেণিবিভাগ সংজ্ঞা ছেলেদের ক্ষেত্রে মেয়েদের ক্ষেত্রে
মুখ্য যৌন লক্ষণ (Primary Sexual Characteristics) যেসব প্রজনন অঙ্গ সরাসরি জননকোশ (গ্যামেট) উৎপাদন ও প্রজনন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকে; এরা জন্মের সময় থেকেই দেহে উপস্থিত থাকে এবং বয়ঃসন্ধিতে পরিণত হয়। শুক্রাশয়, এপিডিডাইমিস, শুক্রনালী, শিশ্ন; সক্রিয় শুক্রাণু উৎপাদন শুরু হওয়া। ডিম্বাশয়, ফেলোপিয়ান নালী, জরায়ু, যোনি; ডিম্বাণু উৎপাদন ও প্রথম রজঃচক্র শুরু হওয়া।
গৌণ যৌন লক্ষণ (Secondary Sexual Characteristics) যেসব বাহ্যিক শারীরিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে পুরুষ ও স্ত্রী দেহকে স্পষ্টভাবে আলাদা করা যায়, কিন্তু এরা সরাসরি সন্তান উৎপাদনে অংশ নেয় না; বয়ঃসন্ধিতে হরমোনের প্রভাবে এদের বিকাশ ঘটে। দাড়ি-গোঁফ গজানো, ল্যারিংস ফুলে কণ্ঠমণি (Adam's Apple) হওয়া, গলার স্বর ভারী ও গম্ভীর হওয়া, চওড়া ও পেশিবহুল কাঁধ। স্তনগ্রন্থির বিকাশ, কোমর ও নিতম্ব চওড়া হওয়া, গলার স্বর তীক্ষ্ণ ও মিহি থাকা, ত্বকের নিচে চর্বি জমে শরীর পেলব হওয়া, রজঃস্রাব শুরু হওয়া।

৩.৫ রজঃচক্র (Menstrual Cycle): নারীদেহের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ছন্দ

বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের ডিম্বাশয় সক্রিয় হওয়ার পর প্রতি ২৮ দিন পর পর (সাধারণত ২১ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে) জরায়ু ও ডিম্বাশয়ে চক্রাকার পরিবর্তন ঘটে, যাকে রজঃচক্র বা মাসিক চক্র বলে:

  • মেনার্কি (Menarche): একজন কিশোরীর জীবনে প্রথম যে দিন রজঃস্রাব শুরু হয় (সাধারণত ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সে), তাকে মেনার্কি বা প্রথম রজঃদর্শন বলে। এটি নারীদেহের প্রজনন ক্ষমতার শুভ সূচনার প্রাকৃতিক প্রমাণ।
  • মেনোপজ (Menopause): ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সে পৌঁছে নারীদের ডিম্বাণু উৎপাদন ও মাসিক চক্র চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়াকে মেনোপজ বা রজঃনিবৃত্তি বলে।
  • রজঃচক্রের পর্যায়সমূহ:
    1. রজঃস্রাবীয় পর্যায় (১ম থেকে ৫ম দিন): ডিম্বাণু নিষিক্ত না হলে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন কমে যায়। ফলে জরায়ুর রক্তজালকযুক্ত এন্ডোমেট্রিয়াম স্তর ভেঙে রক্ত, শ্লেষ্মা ও অনিষিক্ত ডিম্বাণু যোনিপথ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে (সাধারণত ৩৫-৫০ মিলি রক্তক্ষরণ)।
    2. ফলিকুলার পর্যায় (৬ষ্ঠ থেকে ১৩শ দিন): পিটুইটারির FSH-এর প্রভাবে নতুন ডিম্বথলি বাড়ে এবং ইস্ট্রোজেন ক্ষরণ করে জরায়ুর প্রাচীর মেরামত করে।
    3. ডিম্বাণু নিঃসরণ বা ওভিউলেশন (১৪তম দিন): পিটুইটারির LH হরমোনের আকস্মিক বৃদ্ধিতে ডিম্বথলি ফেটে পরিণত ডিম্বাণু ফেলোপিয়ান নালীতে মুক্ত হয়।
    4. লুটিয়াল পর্যায় (১৫শ থেকে ২৮তম দিন): পীতগ্রন্থি থেকে প্রোজেস্টেরন ক্ষরিত হয়ে জরায়ুকে গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত রাখে। নিষেক না হলে চক্রটি পুনরায় ঘুরে ১ম দিনে ফিরে আসে।

৪. বয়ঃসন্ধির শারীরিক বৃদ্ধি, গৌণ যৌন লক্ষণ ও মানসিক পরিবর্তন

৪.১ উচ্চতার আকস্মিক স্ফুরণ (Adolescent Growth Spurt)

বয়ঃসন্ধিকালে গ্রোথ হরমোন এবং যৌন হরমোনের সম্মিলিত প্রভাবে দেহের হাড়গুলোর দৈর্ঘ্য হঠাৎ অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে, একে গ্রোথ স্পার্ট (Growth Spurt) বলে:

  • মেয়েদের দ্রুত বৃদ্ধি: মেয়েদের ক্ষেত্রে গ্রোথ স্পার্ট ছেলেদের চেয়ে প্রায় ২ বছর আগে শুরু হয় (১০-১২ বছর বয়সে)। তাই সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে অনেক সময় মেয়েরা তাদের সমবয়সী ছেলেদের চেয়েও বেশি লম্বা দেখায়!
  • ছেলেদের দীর্ঘস্থায়ী বৃদ্ধি: ছেলেদের বৃদ্ধি শুরু হয় ১২-১৪ বছর বয়সে, কিন্তু তাদের বৃদ্ধির গতিবেগ বেশি থাকে এবং তা দীর্ঘকাল চলে (বছরে ১০-১১ সেমি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে)। ফলে শেষপর্যন্ত ছেলেদের গড় উচ্চতা বেশি হয়।
  • বৃদ্ধির সমাপ্তি: প্রায় ১৮-১৯ বছর বয়সে (মেয়েদের ক্ষেত্রে) এবং ১৯-২১ বছর বয়সে (ছেলেদের ক্ষেত্রে) যৌন হরমোনের প্রভাবে অস্থির প্রান্তীয় এপিফাইসিয়াল তরুণাস্থি সম্পূর্ণ অস্থিতে পরিণত হয়ে জোড়া লেগে যায়। এর পর মানুষের উচ্চতা আর এক মিলিমিটারও বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব নয়!

৪.২ কণ্ঠমণি (Adam\'s Apple) ও ছেলেদের গলার স্বরভঙ্গ

বয়ঃসন্ধিতে ছেলেদের গলার স্বর এবং কণ্ঠনালীতে এক নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়:

  • কণ্ঠমণি (Adam\'s Apple / অ্যাডামস অ্যাপেল): টেস্টোস্টেরন হরমোনের প্রভাবে ছেলেদের গলার স্বরযন্ত্র বা ল্যারিংসের (Larynx) থাইরয়েড তরুণাস্থি খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং গলার সামনের দিকে একটি স্পষ্ট উঁচু ঢিবির মতো বাইরে বেরিয়ে আসে। একেই কণ্ঠমণি বা অ্যাডামস অ্যাপেল বলে। মেয়েদের ক্ষেত্রে ল্যারিংস অপেক্ষাকৃত ছোট থাকে বলে বাইরে থেকে তা দৃশ্যমান হয় না।
  • স্বরভঙ্গ (Voice Cracking):
    • ল্যারিংসের ভেতরে থাকা শব্দ সৃষ্টিকারী ভোকাল কর্ডগুলো (Vocal Cords) লম্বায় ও চওড়ায় অনেক পুরু হয়ে যায়।
    • পুরু ও দীর্ঘ তার অপেক্ষাকৃত কম কম্পাঙ্কে কাঁপে, তাই ছেলেদের গলার স্বর প্রায় এক অষ্টক নেমে গিয়ে পুরুষালী ও গম্ভীর হয়।
    • এই দ্রুত পরিবর্তনের দিনগুলোতে ভোকাল কর্ডের পেশির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তৈরি না হওয়ায় হঠাৎ হঠাৎ কর্কশ আওয়াজ বের হয় বা গলার স্বর ভেঙে যায় (Voice Cracking), যা কিছুদিনের মধ্যেই স্বাভাবিক ও গম্ভীর হয়ে স্থির হয়।

৪.৩ ত্বকের গ্রন্থির সক্রিয়তা ও ব্রণ (Acne): সঠিক বিজ্ঞান ও যত্ন

বয়ঃসন্ধিকালে যৌন হরমোনের প্রভাবে ত্বকের বহিঃক্ষরা গ্রন্থিগুলোর ক্ষরণ বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়:

  • সিবেসিয়াস গ্রন্থি (Sebaceous Glands): ত্বক ও চুলের গোড়ায় থাকা এই তৈলগ্রন্থিগুলো থেকে তেলের মতো সিবাম (Sebum) নিঃসৃত হয়। অতিরিক্ত সিবামের কারণে কিশোর-কিশোরীদের মুখমণ্ডল ও নাক তেলতেলে হয়ে পড়ে।
  • ব্রণ বা অ্যাকনে (Acne / Pimples): অতিরিক্ত সিবাম যখন ত্বকের মরা চামড়া ও ধুলোবালির সাথে মিশে লোমকূপের মুখ বন্ধ করে দেয়, তখন লোমকূপের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়ার (Cutibacterium acnes) আক্রমণে প্রদাহ ও পুঁজ সৃষ্টি হয়, যা লালচে ফুসকুড়ি বা ব্রণ রূপে দেখা দেয়।
    ব্রণ সংক্রান্ত জরুরি পরামর্শ: ব্রণ কোনো রক্তের দোষ বা ছোঁয়াচে রোগ নয়; এটি বয়ঃসন্ধির হরমোনীয় ঝড়ের এক সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও ক্ষণস্থায়ী প্রতিক্রিয়া। ব্রণ কখনোই হাত দিয়ে খুঁটবে বা টিপবে না, কারণ এতে মুখে স্থায়ী গর্ত বা কালো দাগ তৈরি হয় এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। দিনে ২-৩ বার হালকা সাবান ও জল দিয়ে মুখ ধোয়া এবং তৈলাক্ত খাবার কমানোই এর মূল সমাধান।
  • ঘর্মগ্রন্থির সক্রিয়তা: বগল ও কুঁচকির ঘর্মগ্রন্থি সক্রিয় হওয়ায় ঘামের সাথে দুর্গন্ধ তৈরি হয়, যার জন্য নিয়মিত স্নান ও সাবান ব্যবহার জরুরি।

৪.৪ মস্তিষ্কের আবেগীয় পরিবর্তন ও মানসিক টানাপোড়েন

বয়ঃসন্ধি কেবল দেহের পরিবর্তন নয়, কিশোর-কিশোরীদের মনের মধ্যেও এক মহা বিপ্লব ঘটে:

  • মস্তিষ্কের অমিল বিকাশ: মস্তিষ্কের আবেগ ও অনুভূতির কেন্দ্র অ্যামিগডালা (Amygdala) বয়ঃসন্ধিতে দ্রুত উদ্দীপিত হয়, কিন্তু যুক্তি, ধৈর্য ও দূরদর্শিতার কেন্দ্র প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex) পূর্ণ বিকশিত হতে ২৩-২৪ বছর পর্যন্ত সময় নেয়। এই কারণে কিশোর বয়সে তীব্র রাগ, হঠাৎ উচ্ছ্বাস, জেদ, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের প্রতি আকর্ষণ এবং মেজাজের ঘন ঘন ওঠানামা (Mood Swings) দেখা যায়।
  • স্বাতন্ত্র্য ও সহপাঠীদের প্রভাব (Peer Pressure): কিশোর-কিশোরীরা মা-বাবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে নিজের আলাদা ব্যক্তিত্ব গড়তে চায় এবং বন্ধুদের গ্রহণযোগ্যতাকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দেয়। ফলে সহপাঠীদের অসৎ প্ররোচনায় (Peer Pressure) ভুল পথে পরিচালিত হওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়।
  • রূপ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব (Body Image Issue): শরীরের আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে নিজের রূপ ও চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত খুঁতখুঁতে মনোভাব, হীনমন্যতা বা অস্বস্তিবোধ তৈরি হতে পারে, যা স্নেহ ও সঠিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব।

৫. কিশোর স্বাস্থ্য, সুষম পুষ্টি, রক্তাল্পতা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও জীবনদক্ষতা

৫.১ কিশোর বয়সের সুষম পুষ্টি: বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি

যেহেতু বয়ঃসন্ধিকালে শরীরে হাড়, পেশি ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দ্রুততম বৃদ্ধি ঘটে, তাই জীবনের এই পর্বে সুষম পুষ্টির চাহিদা থাকে সর্বোচ্চ:

অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান বয়ঃসন্ধিতে শারীরিক গুরুত্ব প্রধান সহজলভ্য খাদ্য উৎস
প্রোটিন (Protein) পেশি গঠন, কোশের বিভাজন, উৎসেচক ও হরমোন সংশ্লেষ। ডিম, মাছ, মাংস, দুধ, ছানা, ডাল, সয়াবিন, ছোলা, বাদাম।
ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন D অস্থির গঠন ও কাঠিন্য বৃদ্ধি; প্রাপ্তবয়স্কের মোট অস্থির খনিজের ৪৫% এই বয়সেই সঞ্চিত হয়। দুধ, দই, ছোট চুনো মাছ (কাঁটাসহ), তিল, সবুজ শাক, সূর্যের আলো।
আয়রন (Iron বা লৌহ) রক্তে লোহিত রক্তকণিকা ও হিমোগ্লোবিন তৈরি; পেশির মায়োগ্লোবিন বৃদ্ধি। পালং শাক, কুলেখাড়া, নটে শাক, গুড়, ডাল, কাঁচকলা, যকৃৎ, বেদানা।
জিঙ্ক, ভিটামিন A ও C রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ত্বকের সুস্থতা, কোলাজেন প্রোটিন তৈরি ও ক্ষত নিরাময়। লেবু, আমলকী, পেয়ারা, গাজর, হলুদ ফল, বাদাম ও পূর্ণ শস্যদানা।
ফাস্ট ফুড ও জাঙ্ক ফুডের ক্ষতিকর প্রভাব: চিপস, কোল্ড ড্রিঙ্কস, চাউমিন, পিৎজা ও অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবারে কেবল ক্ষতিকর চর্বি ও অতিরিক্ত লবণ থাকে ("Empty Calories"), কিন্তু কোনো ভিটামিন বা খনিজ থাকে না। এর ফলে স্থূলতা, কিশোর বয়সেই উচ্চ রক্তচাপ এবং অপুষ্টি দেখা দেয়।

৫.২ রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া (Nutritional Anemia) ও সরকারি WIFS কর্মসূচি

রক্তে লোহিত রক্তকণিকা বা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যাওয়াকে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া (Anemia) বলে। ভারতে প্রায় ৫০% এর বেশি কিশোরী এবং ৩০% কিশোর রক্তাল্পতায় ভোগে:

  • কিশোরীরা কেন বেশি আক্রান্ত হয়?
    1. গ্রোথ স্পার্টের কারণে রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় আয়রনের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়।
    2. প্রতি মাসে নিয়মিত রজঃস্রাবের কারণে শরীর থেকে প্রচুর আয়রন রক্তক্ষরণের সাথে বেরিয়ে যায় (প্রতি চক্রে প্রায় ১৫-২৫ মিলিগ্রাম আয়রন নষ্ট হয়)।
    3. দৈনন্দিন খাবারে পর্যাপ্ত আয়রন সমৃদ্ধ শাকসবজির অভাব এবং পেটে কৃমির সংক্রমণ।
  • লক্ষণ: চরম ক্লান্তি ও দুর্বলতা, ফ্যাকাশে ত্বক ও চোখের কোণ সাদা হয়ে যাওয়া, অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা, মাথা ঘোরা এবং পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি।
  • জাতীয় WIFS কর্মসূচি (Weekly Iron and Folic Acid Supplementation): কিশোর-কিশোরীদের রক্তাল্পতামুক্ত করতে সরকার বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে উইফস কর্মসূচি চালায়:
    • প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে খাবারের পর ১টি করে নীল রঙের আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট (১০০ মিগ্রা আয়রন ও ৫০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড) খাওয়ানো হয়।
    • কৃমি নাশ করার জন্য বছরে দুবার কৃমিনাশক ওষুধ (অ্যালবেন্ডাজল ৪০০ মিগ্রা) প্রদান করা হয়।

৫.৩ রজঃস্রাবকালীন স্বাস্থ্যবিধি ও ভ্রান্ত কুসংস্কার বর্জন

রজঃস্রাব নারীদেহের একটি সম্পূর্ণ পবিত্র, প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। এই সময়ে পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখলে মারাত্মক জীবাণু সংক্রমণ (RTI ও PID) হতে পারে:

  • ১. স্বাস্থ্যকর প্যাড ব্যবহার: সর্বদা পরিষ্কার স্যানিটারি ন্যাপকিন (Sanitary Pad) ব্যবহার করা উচিত। সুতির কাপড় ব্যবহার করলে তা সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে অবশ্যই খোলা কড়া রোদে শুকাতে হবে (সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি কাপড়ের জীবাণু ও ছত্রাক ধ্বংস করে)। স্যাঁতসেঁতে কাপড় ব্যবহার করলে মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে।
  • ২. নিয়মিত বদলানো: রক্তস্রাব কম হোক বা বেশি, প্রতি ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পর পর প্যাড বদলানো আবশ্যক, যাতে ব্যাক্টেরিয়ার বংশবৃদ্ধি না ঘটে।
  • ৩. নিরাপদ বর্জ্য নিষ্কাশন: ব্যবহৃত প্যাড কখনো টয়লেটের কমোডে ফেলা উচিত নয় (পাইপলাইন আটকে যায়)। কাগজে সুন্দর করে মুড়ে ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিনে বা ইনসিনেরাটরে ফেলতে হবে।
  • ৪. কুসংস্কার দূরীকরণ: সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারের কারণে মেয়েদের এই সময়ে অপবিত্র ভাবা, আলাদা ঘরে বন্দি রাখা, পুষ্টিকর খাবার (যেমন ডিম, মাছ, টক) খেতে না দেওয়া বা স্নান বন্ধ রাখা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও ক্ষতিকর। রজঃস্রাবের রক্ত কোনো বিষাক্ত বা অপবিত্র জিনিস নয়; এটি জরায়ুর সাধারণ রক্ত ও কলা। এই সময়ে স্বাভাবিক স্নান ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া অত্যন্ত জরুরি।

৫.৪ মাদকাসক্তি (Substance Abuse) ও অসৎ সঙ্গের বিপদ

কৈশোরের চরম কৌতূহল, নতুন অভিজ্ঞতার লোভ, মানসিক হতাশা বা বন্ধুদের কাছে নিজেকে "স্মার্ট" দেখানোর প্রবণতা কিশোরদের মারাত্মক নেশার ফাঁদে ফেলে দেয়:

  • নিকোটিন ও তামাক (বিড়ি, সিগারেট, খৈনি): ফুসফুসের সিলিয়া নষ্ট করে, শ্বাসযন্ত্রে আলকাতরা জমায় এবং মুখ, গলা ও ফুসফুসের প্রাণঘাতী ক্যানসার ঘটায়।
  • অ্যালকোহল (মদ): স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট করে, মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করে এবং যকৃৎকে ধ্বংস করে লিভার সিরোসিস ঘটায়।
  • মাদকদ্রব্য (হেরোইন, গাঁজা, ঘুমের ওষুধ): মস্তিষ্কের স্বাভাবিক রাসায়নিক ডোপামিন পথ ধ্বংস করে মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক নির্ভরতা (Addiction) তৈরি করে। এক সুচ অনেকে মিলে ব্যবহার করায় ছড়ায় মারণরোগ HIV/AIDS এবং হেপাটাইটিস বি ও সি।
  • সর্বনাশা চক্র: ক্ষণিকের কৌতূহল দিয়ে শুরু হলেও খুব দ্রুত এটি দাসত্বে পরিণত হয় এবং মানুষের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, মেধা ও পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়।

৫.৫ জীবনদক্ষতা শিক্ষা (Life Skills Education): WHO নির্দেশিত পথ

জীবনের সমস্ত সংকট ও চাপকে সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১০টি মৌলিক জীবনদক্ষতা অর্জনের পরামর্শ দেয়:

জীবনদক্ষতার দিক মূল সামর্থ্য কিশোর জীবনের বাস্তব প্রয়োগ
দৃঢ়ভাবে 'না' বলার দক্ষতা (Refusal Skills) অসৎ প্ররোচনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের স্পষ্ট অবস্থান প্রকাশ। সহপাঠীরা যখন কোনো নেশা, তামাক বা অনৈতিক কাজে প্ররোচিত করে, তখন চোখের দিকে তাকিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে "না!" বলা।
মানসিক চাপ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ রাগ, ভয় ও হতাশা চিনে সুস্থ উপায়ে তাকে সামলানো। পরীক্ষার চাপ বা মন খারাপের সময় নেশার দিকে না গিয়ে খেলাধুলা, গান, ছবি আঁকা, প্রাণায়াম বা বন্ধুদের সাথে সৎ আলোচনা করা।
যোগাযোগ ও আত্মপ্রকাশ দক্ষতা মনের কথা পরিষ্কারভাবে সঠিক মানুষের কাছে তুলে ধরা। শরীরের কোনো পরিবর্তন বা মানসিক বিভ্রান্তি নিয়ে লজ্জা না পেয়ে মা-বাবা, শিক্ষক বা চিকিৎসকের সাথে খোলামেলা কথা বলা।
সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমস্যা সমাধান যেকোনো কাজের লাভ-ক্ষতি ও ভবিষ্যৎ পরিণাম বিবেচনা করা। ভবিষ্যতের ক্যারিয়ার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখার মতো সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সমীকরণ, বিক্রিয়া ও সূত্র

রাসায়নিক বার্তাবাহক ও লক্ষ্য কোশ গ্রাহক নীতি
$$অন্তঃক্ষরা কোশ →{ক্ষরণ [H]} রক্ত সংবহন লক্ষ্য কোশ [R] ⇒ [H-R যৌগ] শারীরবৃত্তীয় সাড়া$$
নেগেটিভ ফিডব্যাক হোমিওস্ট্যাসিস সমীকরণ
$$ [থাইরক্সিন]_{রক্ত} ⇒ নেগেটিভ ফিডব্যাক (হাইপোথ্যালামাস TRH + পিটুইটারি TSH) ⇒ থাইরয়েড ক্ষরণ$$
মৌল বিপাকীয় হার (BMR) ও থাইরক্সিন ক্যালোরিজেনিক ক্রিয়া
$$BMR [থাইরক্সিন] ⇒ মাইটোকন্ড্রিয়ায় O_2 দহন + তাপশক্তি উৎপাদন (ক্যালোরিজেনেসিস) $$
রক্তে গ্লুকোজের সাম্যাবস্থা দ্বৈত-হরমোন গতিবিদ্যা
$$স্বাভাবিক মাত্রা: ৮০-১২০ mg/dL; গ্লুকোজ →{ইনসুলিন} গ্লাইকোজেন (যকৃৎ); গ্লুকোজ →{গ্লুকাগন} গ্লুকোজ$$
অ্যাড্রিনালিন সংকটকালীন আপৎকালীন বিক্রিয়া সমীকরণ
$$চরম ভয় / সংকট →{স্নায়ু সংকেত} অ্যাড্রিনাল মেডালা →{অ্যাড্রিনালিন ঝড়} হৃৎস্পন্দন + ব্রঙ্কোডাইলেশন + রক্তে গ্লুকোজ $$
পিটুইটারি-জনন গ্রন্থি অক্ষ (HPG Axis)
$$হাইপোথ্যালামাস (GnRH) পিটুইটারি (FSH + LH) জনন গ্রন্থি {cases} শুক্রাশয় → টেস্টোস্টেরন → শুক্রাণু উৎপাদন ডিম্বাশয় → ইস্ট্রোজেন/প্রোজেস্টেরন → রজঃচক্র {cases}$$
কৈশোরকালীন উচ্চতার সর্বোচ্চ বৃদ্ধিবেগ সমীকরণ
$$বৃদ্ধির বেগ = { উচ্চতা}{ t}; PHV_{মেয়ে} ≈ ৮-৯ সেমি/বছর (১০-১২ বছর), PHV_{ছেলে} ≈ ১০-১১ সেমি/বছর (১২-১৪ বছর)$$
খাদ্যের আয়রন শোষণ ও হিমোগ্লোবিন সংশ্লেষ সমীকরণ
$$খাদ্যের Fe^{3+} →[ভিটামিন C]{পাকস্থলীর অম্ল} শোষণযোগ্য Fe^{2+} →{অস্থিমজ্জা} হিম + গ্লোবিন হিমোগ্লোবিন (Hb)$$

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
অনাল গ্রন্থি ও সনাল গ্রন্থির মধ্যে দুটি প্রধান পার্থক্য লেখো এবং মানবদেহ থেকে প্রতিটির দুটি করে উদাহরণ দাও।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১. সনাল গ্রন্থি (Exocrine Glands): নির্দিষ্ট ক্ষরণ নালী থাকে। এদের ক্ষরণ (উৎসেচক, ঘাম, লালা) নালীর মাধ্যমে সরাসরি কার্যকারী অঙ্গে পৌঁছায়। উদাহরণ: লালাগ্রন্থি ও ঘর্মগ্রন্থি। ২. অনাল গ্রন্থি (Endocrine Glands): কোনো ক্ষরণ নালী থাকে না (নালীবিহীন)। এদের ক্ষরণ (হরমোন) সরাসরি রক্তে মিশে রক্তস্রোতের মাধ্যমে দূরবর্তী লক্ষ্য অঙ্গে পৌঁছায়। উদাহরণ: থাইরয়েড গ্রন্থি ও পিটুইটারি গ্রন্থি।
উদাহরণ 2
পিটুইটারি গ্রন্থিকে কেন মানবদেহের "প্রভু গ্রন্থি" বলা হয়? শৈশবে গ্রোথ হরমোনের কম ও বেশি ক্ষরণে কী কী রোগ হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
প্রভু গ্রন্থি বলার কারণ: পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত একাধিক ট্রপিক হরমোন (যেমন TSH, ACTH, গোনাডোট্রপিন) দেহের অন্যান্য সমস্ত প্রধান অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির (থাইরয়েড, অ্যাড্রিনাল কর্টেক্স, শুক্রাশয়, ডিম্বাশয়) বৃদ্ধি ও ক্ষরণ ক্রিয়াকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে। শৈশবের রোগসমূহ: ১. কম ক্ষরণে — বামনত্ব (Dwarfism): অস্থির বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে মানুষটি মাত্র ৩-৪ ফুট লম্বা হয়, তবে বুদ্ধিমত্তা স্বাভাবিক থাকে। ২. বেশি ক্ষরণে — দৈত্যাকারত্ব (Gigantism): অস্থির অতিবৃদ্ধির ফলে ব্যক্তিটি ৭ থেকে ৮.৫ ফুট পর্যন্ত অস্বাভাবিক দীর্ঘাকৃতি দানবের মতো চেহারা পায়।
উদাহরণ 3
থাইরক্সিন হরমোন তৈরিতে খাদ্যের আয়োডিনের ভূমিকা কী? আয়োডিনের অভাবে কীভাবে গলগণ্ড রোগ সৃষ্টি হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
আয়োডিনের ভূমিকা: থাইরয়েড গ্রন্থির থাইরক্সিন হরমোন সংশ্লেষের প্রধান রাসায়নিক উপাদান হলো আয়োডিন। প্রতিটি থাইরক্সিন অণুর জন্য ৪টি আয়োডিন পরমাণু আবশ্যক। গলগণ্ডের সৃষ্টিপদ্ধতি: ১. খাদ্যে আয়োডিনের ঘাটতি হলে থাইরয়েড পর্যাপ্ত থাইরক্সিন তৈরি করতে পারে না। ২. রক্তে থাইরক্সিন কমে যাওয়ায় নেগেটিভ ফিডব্যাকের মাধ্যমে পিটুইটারি গ্রন্থি অতিরিক্ত TSH হরমোন ক্ষরণ করে। ৩. এই অতিরিক্ত TSH লাগাতার থাইরয়েডকে উদ্দীপিত করায় থাইরয়েডের কোশগুলো দ্রুত বিভাজিত হয়ে আকারে বহুগুণ বড় হয়ে যায়। ৪. এর ফলে গলার গোড়া মারাত্মক ফুলে ঢাউস আকার ধারণ করে, যাকে গলগণ্ড (Goitre) বলে।
উদাহরণ 4
ইনসুলিন ও গ্লুকাগন কীভাবে রক্তে শর্করার স্বাভাবিক মাত্রা রক্ষা করে? ডায়াবেটিস মেলিটাসের তিনটি প্রধান লক্ষণ লেখো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
রক্তশর্করার নিয়ন্ত্রণ: ১. খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজ বাড়লে অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোশ থেকে ইনসুলিন ক্ষরিত হয়। ইনসুলিন কোশে গ্লুকোজের ব্যবহার বাড়ায় এবং অতিরিক্ত গ্লুকোজকে গ্লাইকোজেনে রূপান্তর করে যকৃতে জমা রাখে (গ্লাইকোজেনেসিস), ফলে রক্তে শর্করা কমে স্বাভাবিক হয়। ২. উপবাসে রক্তে শর্করা কমলে আলফা কোশ থেকে গ্লুকাগন ক্ষরিত হয়ে যকৃতের গ্লাইকোজেন ভেঙে রক্তে গ্লুকোজ মুক্ত করে (গ্লাইকোজেনোলাইসিস)। ডায়াবেটিসের ৩টি লক্ষণ: ১. পলিইউরিয়া: ঘন ঘন অতিরিক্ত প্রস্রাব ত্যাগ। ২. পলিডিপসিয়া: তীব্র ও অবিরাম জলতৃষ্ণা পাওয়া। ৩. পলিফ্যাজিয়া: কোশ পুষ্টি না পাওয়ায় অনবরত অতিরিক্ত ক্ষুধা পাওয়া।
উদাহরণ 5
অ্যাড্রিনালিনকে কেন "সংকটকালীন বা আপৎকালীন হরমোন" বলা হয়? চরম ভয়ের মুহূর্তে এর তিনটি শারীরিক ক্রিয়া ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
সংকটকালীন হরমোন বলার কারণ: ভয়, রাগ, বিপদ বা উত্তেজনার মুহূর্তে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরিত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শরীরকে বিপদ মোকাবিলার (Fight) বা পালিয়ে আত্মরক্ষার (Flight) উপযোগী করে তোলে। তিনটি শারীরিক ক্রিয়া: ১. হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ বৃদ্ধি: রক্ত দ্রুত সঞ্চালিত করে কঙ্কালপেশি ও মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়ায়। ২. শ্বাসনালী প্রসারণ (Bronchodilation): ফুসফুসের ব্রঙ্কিওল প্রসারিত করে শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি ও অক্সিজেন গ্রহণ দ্রুত বাড়ায়। ৩. গ্লুকোজের জোগান: যকৃতের গ্লাইকোজেন ভেঙে রক্তে প্রচুর গ্লুকোজ মুক্ত করে পেশির কাজের জন্য তাৎক্ষণিক শক্তির জোগান দেয়।
উদাহরণ 6
বয়ঃসন্ধি কী? বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেদের মুখ্য ও গৌণ যৌন লক্ষণের পার্থক্য উদাহরণসহ লেখো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
বয়ঃসন্ধি: মানবজীবনের শৈশব থেকে যৌবনে পদার্পণের সেই সন্ধিক্ষণ (১০-১৯ বছর), যখন যৌন হরমোনের প্রভাবে শরীর প্রজনন সক্ষমতা লাভ করে। ছেলেদের মুখ্য ও গৌণ যৌন লক্ষণের পার্থক্য: ১. মুখ্য যৌন লক্ষণ: প্রজনন অঙ্গ যা সরাসরি জননকোশ তৈরিতে অংশ নেয় এবং জন্মের সময় থেকেই উপস্থিত থাকে (যেমন—শুক্রাশয়ের পরিণতি এবং সক্রিয় শুক্রাণু উৎপাদন শুরু হওয়া)। ২. গৌণ যৌন লক্ষণ: বাহ্যিক শারীরিক লক্ষণ যা পুরুষকে আলাদা করে চেনা যায় কিন্তু প্রজননে সরাসরি যুক্ত নয় (যেমন—কণ্ঠমণি তৈরি হয়ে গলার স্বর ভারী হওয়া, দাড়ি-গোঁফ গজানো, কাঁধ চওড়া ও পেশিবহুল হওয়া)।
উদাহরণ 7
বয়ঃসন্ধিতে ছেলেদের গলার স্বর ভাঙে কেন এবং কণ্ঠমণি (Adam's Apple) কীভাবে গঠিত হয়? কিশোরদের মুখে ব্রণ হওয়ার কারণ কী?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
কণ্ঠমণি ও স্বরভঙ্গ: ১. টেস্টোস্টেরনের প্রভাবে ছেলেদের ল্যারিংসের থাইরয়েড তরুণাস্থি খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে গলার সামনে উঁচু হয়ে বেরিয়ে আসে, একে কণ্ঠমণি বলে। ২. ল্যারিংসের ভেতরের ভোকাল কর্ড মোটা ও লম্বা হয়ে যাওয়ায় স্বর গম্ভীর হয় এবং পেশির সমন্বয় না হওয়ায় সাময়িকভাবে স্বরভঙ্গ (Voice Cracking) ঘটে। মুখে ব্রণ হওয়ার কারণ: যৌন হরমোনের প্রভাবে ত্বকের সিবেসিয়াস (তৈল) গ্রন্থি অতিরিক্ত সিবাম ক্ষরণ করে। এই অতিরিক্ত তেল ও মরা চামড়া লোমকূপের মুখ বন্ধ করে দিলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে প্রদাহ হয়ে মুখে ব্রণ ও ফুসকুড়ি সৃষ্টি হয়।
উদাহরণ 8
কিশোরীরা কেন রক্তাল্পতায় (Anemia) বেশি আক্রান্ত হয়? বিদ্যালয়ে সরকারি WIFS কর্মসূচির মাধ্যমে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
কিশোরীদের রক্তাল্পতার কারণ: ১. দ্রুত দৈহিক বৃদ্ধির কারণে শরীরে রক্ত ও পেশির চাহিদা অনুযায়ী আয়রনের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়। ২. প্রতি মাসে নিয়মিত রজঃস্রাবের কারণে শরীর থেকে প্রচুর আয়রন রক্তক্ষরণের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। ৩. খাদ্যে আয়রনসমৃদ্ধ শাকসবজির অভাব এবং পেটে কৃমির সংক্রমণ। WIFS কর্মসূচি: সাপ্তাহিক আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড সম্পূরক (WIFS) কর্মসূচির আওতায় বিদ্যালয়ে প্রতি সপ্তাহে কিশোর-কিশোরীদের ১০০ মিগ্রা আয়রন ও ৫০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিডযুক্ত ১টি করে নীল ট্যাবলেট খাওয়ানো হয় এবং বছরে দুবার কৃমিনাশক ওষুধ (অ্যালবেন্ডাজল) দেওয়া হয়।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

সনাল (নালীযুক্ত) এবং অনাল (নালীহীন) গ্রন্থির কাজের পার্থক্য গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি হলো নালীহীন এবং এরা সরাসরি রক্তে হরমোন ক্ষরণ করে; বহিঃক্ষরা গ্রন্থির নালী থাকে এবং এরা নালীর মাধ্যমে উৎসেচক, ঘাম ও লালা ক্ষরণ করে।

সাধারণ ভুল ধারণা

অগ্ন্যাশয়ের পাচক কাজ আর রক্তের হরমোনীয় কাজকে এক করে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ইনসুলিন কোনো পাচক রস নয়; এটি রক্তে বাহিত একটি হরমোন যা যকৃৎ ও পেশির কোশপর্দায় যুক্ত হয়ে রক্ত থেকে গ্লুকোজ কোশের ভেতরে প্রবেশ করায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

গলার সামনে শক্ত উঁচু অংশ দেখে একে হাড় ভেবে বসা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

কণ্ঠমণিতে কোনো হাড় থাকে না; এটি ল্যারিংসের (স্বরযন্ত্রের) থাইরয়েড তরুণাস্থি, যা টেস্টোস্টেরনের প্রভাবে বৃদ্ধি পেয়ে স্বাভাবিকভাবে বাইরে বেরিয়ে আসে।

সাধারণ ভুল ধারণা

স্বাভাবিক বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক পরিবর্তনকে রোগ ভেবে ভুল চিকিৎসা করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

স্বরভঙ্গ এবং ব্রণ কোনো রোগ নয়; এগুলো বয়ঃসন্ধির হরমোনীয় প্লাবনের ফলে ভোকাল কর্ড ও সিবেসিয়াস গ্রন্থির সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও অস্থায়ী প্রতিক্রিয়া।

সাধারণ ভুল ধারণা

রক্তে গ্লুকোজ বৃদ্ধি পাওয়া আর সাধারণ খাদ্যশর্করার মধ্যে কারণ ও লক্ষণের গোলমাল করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ডায়াবেটিস হলো ইনসুলিনের ঘাটতি বা অকার্যকারিতাজনিত অন্তঃখরা বিপাকীয় রোগ; কেবল মিষ্টি খেলেই সুস্থ মানুষের ডায়াবেটিস হয় না।

সাধারণ ভুল ধারণা

উভয় লক্ষণই বয়ঃসন্ধিতে স্পষ্ট হয় বলে কোনটি প্রজনন অঙ্গ তা মনে না রাখা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

মুখ্য লক্ষণ হলো প্রকৃত প্রজনন অঙ্গ যা গ্যামেট তৈরি করে (শুক্রাশয়, ডিম্বাশয়); আর গৌণ লক্ষণ হলো বাইরের চেনার লক্ষণ (দাড়ি, স্তন, কণ্ঠমণি)।

সাধারণ ভুল ধারণা

সামাজিক কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ট্যাবুকে বিজ্ঞানের সত্য বলে ধরে নেওয়া।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

রজঃস্রাবের রক্ত কোনো বিষাক্ত জিনিস নয়; এটি জরায়ুর সাধারণ রক্ত এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ রক্তজালকযুক্ত এন্ডোমেট্রিয়ামের ভাঙা অংশ মাত্র।

অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও বয়ঃসন্ধি — ৪-চতুর্থাংশ ধারণচিত্র

অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও বয়ঃসন্ধি — ৪-চতুর্থাংশ ধারণচিত্র (CONCEPT MAP) ১. প্রধান অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও হরমোনসমূহ পিটুইটারি (প্রভু গ্রন্থি): বৃদ্ধি হরমোন (GH/STH), TSH, ACTH, গোনাডোট্রপিন থাইরয়েড গ্রন্থি: থাইরক্সিন (T4) — BMR নিয়ন্ত্রণ, ক্যালোরিজেনিক, আয়োডিন নির্ভর অগ্ন্যাশয় (ল্যাঙ্গারহ্যান্সের দ্বীপপুঞ্জ): বিটা: ইনসুলিন; আলফা: গ্লুকাগন হরমোন অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি: অ্যাড্রিনালিন — জরুরি/সংকটকালীন আপৎকালীন প্রতিক্রিয়া ক্ষরণজনিত ত্রুটি: বামনত্ব, দৈত্যাকারত্ব, গলগণ্ড ও মধুমেহ (Diabetes) ২. হরমোনীয় নিয়ন্ত্রণ ও বিপাকীয় কার্যপদ্ধতি নেগেটিভ ফিডব্যাক ব্যবস্থা: স্বয়ংক্রিয় ভারসাম্য ও হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ: ইনসুলিন শর্করা কমায় vs গ্লুকাগন শর্করা বাড়ায় অ্যাড্রিনালিন ঝড়: হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, ব্রঙ্কোডাইলেশন, রক্তচাপ ও গ্লুকোজ বৃদ্ধি ক্যালোরিজেনিক ক্রিয়া: থাইরক্সিন কলাকোষে অক্সিজেন গ্রহণ ও BMR বাড়ায় অনাল বনাম সনাল গ্রন্থি: সনাল (নালীযুক্ত উৎসেচক) বনাম অনাল (রক্তবাহিত হরমোন) ৩. বয়ঃসন্ধি ও গৌণ যৌন বৈশিষ্ট্যের বিকাশ জনন গ্রন্থি অক্ষ: শুক্রাশয় (টেস্টোস্টেরন) ও ডিম্বাশয় (ইস্ট্রোজেন/প্রোজেস্টেরন) ছেলেদের পরিবর্তন: কণ্ঠমণি (Adam's Apple), গলার স্বর ভাঙা, দাড়ি-গোঁফ গজানো মেয়েদের পরিবর্তন: শ্রোণীদেশ প্রশস্ত হওয়া, স্তনগ্রন্থি বিকাশ, রজঃচক্র সূচনা ত্বকের গ্রন্থির সক্রিয়তা: সিবেসিয়াস ও ঘর্মগ্রন্থির ক্ষরণ বৃদ্ধি $ o$ ব্রণ (Acne) মানসিক রূপান্তর: মস্তিষ্কের আবেগীয় পরিবর্তন, স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয় খোঁজা ৪. কিশোর স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা ও জীবনদক্ষতা সুষম পুষ্টির গুরুত্ব: দ্রুত বৃদ্ধির জন্য প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাদ্য রক্তাল্পতা (Anemia) রোধ: আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড (WIFS), সবুজ শাক ও গুড় রজঃস্রাবকালীন স্বাস্থ্যবিধি: স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার, কুসংস্কার ও ভ্রান্তি দূরীকরণ মাদকাসক্তি প্রতিরোধ: অসৎ সঙ্গ ও কৌতূহল এড়ানো, তামাক-মাদককে 'না' বলা জীবনদক্ষতা শিক্ষা: মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আত্মবিশ্বাস

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
গ্রন্থির শ্রেণিবিভাগ ও হরমোন: নালীযুক্ত বহিঃক্ষরা গ্রন্থি (লালা, ঘাম); নালীহীন অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি (হরমোন); মিশ্র গ্রন্থি (অগ্ন্যাশয়); হরমোন হলো রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত অতি সূক্ষ্ম মাত্রায় কার্যকারী রাসায়নিক বার্তাবাহক, যা নেগেটিভ ফিডব্যাকের মাধ্যমে হোমিওস্ট্যাসিস বজায় রাখে।
মূল বিষয় 2
প্রভু গ্রন্থি পিটুইটারি: করোটির সেলা টারসিকায় অবস্থিত; TSH, ACTH, গোনাডোট্রপিনের মাধ্যমে অন্যান্য গ্রন্থি নিয়ন্ত্রণ করে; গ্রোথ হরমোনের ঘাটতিতে বামনত্ব (Dwarfism), অতিরিক্ত ক্ষরণে দৈত্যাকারত্ব (Gigantism) এবং প্রাপ্তবয়সে অ্যাক্রোমেগালি রোগ হয়।
মূল বিষয় 3
থাইরয়েড ও বিপাকীয় নিয়ন্ত্রণ: গলায় অবস্থিত থাইরয়েড গ্রন্থি আয়োডিনের সাহায্যে থাইরক্সিন হরমোন ক্ষরণ করে BMR ও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে; আয়োডিনের অভাবে থাইরয়েড ফুলে গলগণ্ড (Goitre), শৈশবে জড়বুদ্ধি ক্রেটিনিজম এবং প্রাপ্তবয়সে মিক্সিডিমা হয়।
মূল বিষয় 4
অগ্ন্যাশয়ের শর্করা নিয়ন্ত্রণ: ল্যাঙ্গারহ্যান্সের দ্বীপপুঞ্জের বিটা কোশ ক্ষরণ করে ইনসুলিন (রক্তশর্করা কমায়) এবং আলফা কোশ ক্ষরণ করে গ্লুকাগন (রক্তশর্করা বাড়ায়); ইনসুলিনের অভাবে মধুমেহ বা ডায়াবেটিস মেলিটাস (হাইপারগ্লাইসেমিয়া, গ্লুকোসুরিয়া, পলিইউরিয়া, পলিডিপসিয়া, পলিফ্যাজিয়া) রোগ হয়।
মূল বিষয় 5
অ্যাড্রিনালিন ও সংকটকালীন প্রতিক্রিয়া: অ্যাড্রিনাল মেডালা থেকে ক্ষরিত অ্যাড্রিনালিন হলো "Fight-or-Flight" সংকটকালীন হরমোন, যা আপৎকালীন মুহূর্তে হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ ও শ্বাসনালী প্রসারিত করে বিপদের বিরুদ্ধে লড়াই বা পালানোর প্রস্তুতি দেয়।
মূল বিষয় 6
জনন গ্রন্থি ও বয়ঃসন্ধি: শুক্রাশয়ের টেস্টোস্টেরন শুক্রাণু উৎপাদন ও পুরুষালী লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করে; ডিম্বাশয়ের ইস্ট্রোজেন নারী লক্ষণ ও প্রোজেস্টেরন গর্ভাবস্থা বজায় রাখে; HPG অক্ষের (GnRH $ o$ FSH/LH $ o$ যৌন হরমোন) সক্রিয়তায় বয়ঃসন্ধির (১০-১৯ বছর) সূচনা হয়।
মূল বিষয় 7
কৈশোরের পরিবর্তন: দ্রুত উচ্চতার বৃদ্ধিবেগ (Growth Spurt) ও এপিফাইসিয়াল জোড়া লাগা; ছেলেদের ল্যারিংসের কণ্ঠমণি (Adam's Apple) ও স্বরভঙ্গ; মেয়েদের স্তন ও শ্রোণী বিস্তার; সিবেসিয়াস গ্রন্থির অতিসক্রিয়তায় মুখে ব্রণ ও ফুসকুড়ি; অ্যামিগডালা ও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের অমিল বিকাশে মেজাজের ওঠানামা।
মূল বিষয় 8
কিশোর স্বাস্থ্য ও জীবনদক্ষতা: সুষম প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ; রক্তাল্পতা (Anemia) রোধে বিদ্যালয়ে সাপ্তাহিক নীল আয়রন বড়ি (WIFS) ও কৃমিনাশক প্রদান; পরিচ্ছন্ন স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার ও সামাজিক কুসংস্কার বর্জন; ক্ষতিকর মাদকাসক্তি প্রতিরোধে দৃঢ়ভাবে "না" বলার জীবনদক্ষতা অর্জন।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
নেগেটিভ ফিডব্যাক ব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে অন্তঃক্ষরা তন্ত্রের ভারসাম্য বজায় থাকে? পিটুইটারি ও থাইরয়েড গ্রন্থির উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: রক্তে হরমোন বাড়লে তা পূর্ববর্তী গ্রন্থির ক্ষরণ বন্ধ করে দেয়। রক্তে থাইরক্সিন কমলে পিটুইটারি TSH বাড়ায়, আবার থাইরক্সিন স্বাভাবিকের বেশি বাড়লে তা পিটুইটারির TSH ক্ষরণ বন্ধ করে দেয়।
2
অগ্ন্যাশয়কে কেন "মিশ্র গ্রন্থি" বলা হয় এবং এর দুটি প্রধান হরমোন কীভাবে রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: এর সনাল অংশ পাচক রস নালীতে ক্ষরণ করে এবং অনাল অংশ (ল্যাঙ্গারহ্যান্সের দ্বীপপুঞ্জ) রক্তে ইনসুলিন ও গ্লুকাগন ক্ষরণ করে। ইনসুলিন শর্করা কমায় এবং গ্লুকাগন শর্করা বাড়ায়।
3
চরম ভয়ের মুহূর্তে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরিত হলে মানবদেহে কী কী তাৎক্ষণিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: অ্যাড্রিনালিন আপৎকালীন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে: হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়, ফুসফুসের ব্রঙ্কিওল প্রসারিত হয়, রক্ত ত্বক থেকে পেশিতে চলে যায় এবং রক্তে গ্লুকোজ বৃদ্ধি পায়।
4
বয়ঃসন্ধিতে ছেলেদের গলার স্বর ভেঙে ভারী হয় কেন এবং কণ্ঠমণি (Adam's Apple) কীভাবে গঠিত হয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: টেস্টোস্টেরন ল্যারিংসকে বড় করে কণ্ঠমণি তৈরি করে এবং ভোকাল কর্ড মোটা ও লম্বা করায় স্বর গম্ভীর হয়। পেশির সাময়িক অসমন্বয়ের কারণে স্বরভঙ্গ ঘটে।
5
কিশোরীরা কেন রক্তাল্পতায় (Anemia) বেশি আক্রান্ত হয় এবং সরকারি WIFS কর্মসূচির মাধ্যমে এর কী প্রতিকার করা হয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: দ্রুত দৈহিক বৃদ্ধি এবং প্রতি মাসের রজঃস্রাবে আয়রন ক্ষয়ের জন্য কিশোরীরা বেশি আক্রান্ত হয়। WIFS কর্মসূচিতে প্রতি সপ্তাহে ১টি নীল আয়রন ট্যাবলেট ও কৃমিনাশক দেওয়া হয়।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ও বয়ঃসন্ধি অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।