Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Science • অধ্যায় 5
আনুমানিক সময়: 55 Mins
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

প্রাকৃতিক ঘটনার বিশ্লেষণ

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যক্রম "পরিবেশ ও বিজ্ঞান"-এর পঞ্চম অধ্যায় "প্রাকৃতিক ঘটনার বিশ্লেষণ" (Analysis of Natural Phenomena)-এর জন্য এটি একটি প্রামাণ্য ও পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সহায়িকা। শীতকালে পশমের সোয়েটার খোলার সময় ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গের চটচট শব্দ থেকে শুরু করে আকাশে লক্ষ লক্ষ ভোল্টের বজ্রপাতের ভয়াল রূপ, কিংবা মাটির নিচে টেকটনিক পাতের ঘর্ষণে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প ও উত্তাল সমুদ্রের সুনামি—প্রকৃতির এই সব অদ্ভুত ও বিধ্বংসী ঘটনার বৈজ্ঞানিক কারণ উদঘাটন করা হয়েছে এই অধ্যায়ে। এই গাইডে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ৫টি প্রধান স্তম্ভ: (১) স্থির তড়িৎ, ঘর্ষণে আধানের উৎপত্তি, ইলেকট্রনীয় তত্ত্ব, তড়িৎ আবেশ ও স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র; (২) বায়ুমণ্ডলে তড়িৎ ক্ষরণ, মেঘে আধানের পৃথকীকরণ, বজ্রনাদ, ফ্র্যাঙ্কলিনের বজ্রনিবারক ও ফ্যারাডে খাঁচা সুরক্ষা; (৩) পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন (সিয়াল, সিমা, গুরুমণ্ডল, কেন্দ্রমণ্ডল), অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার ও পাত সংস্থান তত্ত্ব; (৪) ভূমিকম্পের কেন্দ্র ও উপকেন্দ্র, P/S/L ভূকম্পীয় তরঙ্গ, সিসমোগ্রাফ, রিখটার স্কেলের লগারিদমিক শক্তি ও সুনামির উৎপত্তি; এবং (৫) ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়, লীনতাপের ভূমিকা, করিওলিস বল এবং বিপর্যয় মোকাবিলায় "Drop, Cover, Hold On" সুরক্ষা পদ্ধতি। এতে রয়েছে ২৫টি বিশদ উপ-অনুচ্ছেদ, ভেক্টর কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি সূত্র কার্ড, ৮টি গাণিতিক ও ধারণাগত উদাহরণ, ৭টি সতর্কতামূলক ট্র্যাপ, ৮টি মূল নির্যাস, ৫টি স্ব-মূল্যায়ন প্রশ্ন ও ৫টি CBT ডায়াগনস্টিক মক টেস্ট।

⚡ প্রকৃতির উন্মত্ত শক্তি: আণুবীক্ষণিক ইলেকট্রন থেকে মহাদেশ-কাঁপানো ভূমিকম্প

শীতের সন্ধ্যায় অন্ধকার ঘরে পশমের সোয়েটার খোলার সময় কি কখনো পটপট শব্দ শুনেছো কিংবা নীলচে স্ফুলিঙ্গের আলো লক্ষ্য করেছো?

তুমি কি জানো, সেই একই ক্ষুদ্র ইলেকট্রন বিনিময়ের ঘটনা যখন আকাশে বিশালাকার মেঘের স্তূপের মধ্যে কোটি কোটি গুণ হারে ঘটে, তখন সৃষ্টি হয় ১০ কোটি ভোল্টেরও বেশি বিভবযুক্ত প্রলয়ঙ্করী বজ্রপাত—যার বিদ্যুৎরেখা চারপাশের বাতাসকে সূর্যের পৃষ্ঠতলের চেয়েও ৫ গুণ বেশি উত্তপ্ত করে তোলে?

আবার মাটির বহু কিলোমিটার গভীরে এমন কী নীরব ইঞ্জিন কাজ করে, যার টানে কঠিন শিলাস্তর স্প্রিং-এর মতো বেঁকে গিয়ে হঠাৎ ফেটে পড়ে এবং গোটা শহর কাঁপিয়ে তোলে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প ও সর্বগ্রাসী সুনামিতে? এসো, বিজ্ঞানের যুক্তিতে প্রকৃতির এই রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলোর পেছনের মূল নিয়মগুলো ধাপে ধাপে জেনে নেওয়া যাক!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যক্রম "পরিবেশ ও বিজ্ঞান"-এর পঞ্চম অধ্যায় "প্রাকৃতিক ঘটনার বিশ্লেষণ" (Analysis of Natural Phenomena)-এর জন্য এটি একটি প্রামাণ্য ও পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সহায়িকা। শীতকালে পশমের সোয়েটার খোলার সময় ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গের চটচট শব্দ থেকে শুরু করে আকাশে লক্ষ লক্ষ ভোল্টের বজ্রপাতের ভয়াল রূপ, কিংবা মাটির নিচে টেকটনিক পাতের ঘর্ষণে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প ও উত্তাল সমুদ্রের সুনামি—প্রকৃতির এই সব অদ্ভুত ও বিধ্বংসী ঘটনার বৈজ্ঞানিক কারণ উদঘাটন করা হয়েছে এই অধ্যায়ে। এই গাইডে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ৫টি প্রধান স্তম্ভ: (১) স্থির তড়িৎ, ঘর্ষণে আধানের উৎপত্তি, ইলেকট্রনীয় তত্ত্ব, তড়িৎ আবেশ ও স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র; (২) বায়ুমণ্ডলে তড়িৎ ক্ষরণ, মেঘে আধানের পৃথকীকরণ, বজ্রনাদ, ফ্র্যাঙ্কলিনের বজ্রনিবারক ও ফ্যারাডে খাঁচা সুরক্ষা; (৩) পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন (সিয়াল, সিমা, গুরুমণ্ডল, কেন্দ্রমণ্ডল), অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার ও পাত সংস্থান তত্ত্ব; (৪) ভূমিকম্পের কেন্দ্র ও উপকেন্দ্র, P/S/L ভূকম্পীয় তরঙ্গ, সিসমোগ্রাফ, রিখটার স্কেলের লগারিদমিক শক্তি ও সুনামির উৎপত্তি; এবং (৫) ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়, লীনতাপের ভূমিকা, করিওলিস বল এবং বিপর্যয় মোকাবিলায় "Drop, Cover, Hold On" সুরক্ষা পদ্ধতি। এতে রয়েছে ২৫টি বিশদ উপ-অনুচ্ছেদ, ভেক্টর কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি সূত্র কার্ড, ৮টি গাণিতিক ও ধারণাগত উদাহরণ, ৭টি সতর্কতামূলক ট্র্যাপ, ৮টি মূল নির্যাস, ৫টি স্ব-মূল্যায়ন প্রশ্ন ও ৫টি CBT ডায়াগনস্টিক মক টেস্ট।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • পরমাণুর গঠন সম্পর্কিত প্রাথমিক ধারণা (নিউক্লিয়াসে প্রোটন ও নিউট্রন, বাইরে ইলেকট্রন)।
  • সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান থেকে বল, চাপ ও শক্তির রূপান্তরের মূল সূত্রাবলী।
  • পদার্থের তিনটি ভৌত অবস্থা, ঘনত্ব এবং তাপীয় পরিচলন স্রোতের প্রাথমিক জ্ঞান।
  • পৃথিবীর ভূগোল, মহাদেশ, মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলীয় স্তরের প্রাথমিক পরিচিতি।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধানের পার্থক্য এবং ঘর্ষণে তড়িৎ উৎপত্তি ও স্থির তড়িৎ আবেশের বৈজ্ঞানিক কারণ ব্যাখ্যা করতে পারা।
  • স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের গঠন, কার্যপ্রণালী এবং আধান শনাক্তকরণ ও প্রকৃতি নির্ণয়ের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করা।
  • মেঘে তড়িৎ সঞ্চয়, বজ্রপাত ও বজ্রনাদ সৃষ্টির কার্যকারণ এবং বজ্রনিবারকের গঠন ও সুরক্ষাবিধি বর্ণনা করা।
  • পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ স্তরসমূহ (ভূত্বক, গুরুমণ্ডল, অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার ও কেন্দ্রমণ্ডল) এবং পাত সংস্থান তত্ত্ব চিত্রসহ বোঝা।
  • ভূকম্প কেন্দ্র বনাম উপকেন্দ্র এবং P, S, L ভূকম্পীয় তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য ও সিসমোগ্রাফ যন্ত্রের কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করা।
  • রিখটার স্কেলের লগারিদমিক শক্তি অনুপাত নির্ণয় করা এবং ভূমিকম্প ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় জীবনরক্ষাকারী সুরক্ষা প্রোটোকল প্রয়োগ করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. স্থির তড়িৎ, আধানের প্রকৃতি ও স্...
2 ২. বায়ুমণ্ডলে তড়িৎ ক্ষরণ, বজ্রপাত...
3 ৩. পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন ও পাত সংস...
4 ৪. ভূমিকম্প ও সুনামি: সিসমিক তরঙ্গ...
5 ৫. ঘূর্ণিঝড়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. স্থির তড়িৎ, আধানের প্রকৃতি ও স্থির তড়িৎ আবেশ

১.১ ঘর্ষণে তড়িৎ উৎপত্তি ও দুই প্রকার আধান

দুটি উপযুক্ত অন্তরক পদার্থকে পরস্পরের সঙ্গে ঘষলে দেখা যায় যে তারা কাগজের ছোট টুকরো, চুল বা শোলার বলের মতো হালকা বস্তুকে আকর্ষণ করার বিশেষ ক্ষমতা লাভ করে। বস্তুর এই দশাকে আহিত অবস্থা এবং ঘর্ষণের ফলে উৎপন্ন এই বিদ্যুৎকে স্থির তড়িৎ (Static Electricity) বলে, কারণ উৎপন্ন আধান পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত না হয়ে উৎপত্তিস্থলেই স্থির থাকে।

বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন (Benjamin Franklin) পরীক্ষার মাধ্যমে স্থির তড়িৎ আধানকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেন:

  • ধনাত্মক আধান (+): কাচদণ্ডকে পরিষ্কার খাঁটি রেশম (Silk) দিয়ে ঘষলে কাচদণ্ডে যে আধান উৎপন্ন হয়। (রেশমে সমপরিমাণ ঋণাত্মক আধান উৎপন্ন হয়)।
  • ঋণাত্মক আধান (-): এবোনাইট বা গালা বা অ্যাম্বার দণ্ডকে পশম বা ফ্লানেল (Flannel/Wool) দিয়ে ঘষলে দণ্ডে যে আধান সৃষ্টি হয়। (পশমে সমপরিমাণ ধনাত্মক আধান জন্মায়)।

তড়িৎ আধানের মৌলিক সূত্র: সমজাতীয় আধান পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীত জাতীয় আধান পরস্পরকে আকর্ষণ করে।

১.২ আহিতকরণের ইলেকট্রনীয় তত্ত্ব ও আধানের নিত্যতা সূত্র

আধুনিক পরমাণু বিজ্ঞানের ভিত্তি অনুযায়ী প্রতিটি পরমাণু নিস্তড়িৎ, কারণ পরমাণুর কেন্দ্রে অবস্থিত ধনাত্মক প্রোটন সংখ্যা এবং বাইরে বিভিন্ন কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান ঋণাত্মক ইলেকট্রন সংখ্যা হুবহু সমান:

$$\text{মোট প্রোটন সংখ্যা } (+) = \text{মোট ইলেকট্রন সংখ্যা } (-)$$

ঘর্ষণে আহিতকরণের কারণ: পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আবদ্ধ ভারী প্রোটনগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী নিউক্লীয় বল দ্বারা আবদ্ধ থাকায় কখনো স্থানান্তরিত হতে পারে না। কিন্তু পরমাণুর সর্ববহিস্থ কক্ষের আলগা যোজ্যতা ইলেকট্রনগুলো ঘর্ষণের ফলে এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে স্থানান্তরিত হয়:

  • যে বস্তু ইলেকট্রন বর্জন করে: ইলেকট্রনের ঘাটতি ঘটে এবং বস্তুটি সামগ্রিকভাবে ধনাত্মক আধানে (+Q) আহিত হয়।
  • যে বস্তু ইলেকট্রন গ্রহণ করে: অতিরিক্ত ইলেকট্রন সঞ্চিত হয় এবং বস্তুটি সমপরিমাণ ঋণাত্মক আধানে (-Q) আহিত হয়।

আধানের নিত্যতা সূত্র (Conservation of Charge): আধান সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না; একটি বিচ্ছিন্ন সংস্থায় ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধানের বীজগাণিতিক সমষ্টি সর্বদা ধ্রুবক থাকে। আহিতকরণ কেবল ইলেকট্রনের স্থানান্তর মাত্র।

আধানের কোয়ান্টায়ন (Quantization of Charge): যেকোনো বস্তুতে সঞ্চিত মোট আধান $Q$ সর্বদা মৌলিক ইলেকট্রনীয় আধান $e$-এর ($1.602 \times 10^{-19}\text{ C}$) পূর্ণসংখ্যার গুণিতক হয়:

$$Q = \pm n \cdot e \quad (n = 1, 2, 3, \dots)$$

১.৩ স্থির তড়িৎ আবেশ (মুক্ত ও বদ্ধ আধান)

স্থির তড়িৎ আবেশ (Electrostatic Induction): কোনো আহিত বস্তুকে কোনো অনাহিত পরিবাহীর কাছে স্পর্শ না করিয়ে আনলে, আহিত বস্তুটির উপস্থিতির প্রভাবে পরিবাহীটির দুই প্রান্তে সাময়িকভাবে বিপরীত জাতীয় আধানের সমাবেশ ঘটার ঘটনাকে স্থির তড়িৎ আবেশ বলে।

পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণ:

  1. একটি অন্তরক কাচের হাতলযুক্ত অনাহিত ধাতব চোঙের কাছে একটি ধনাত্মক কাচদণ্ড আনা হলো (স্পর্শ না করিয়ে)।
  2. কাচদণ্ডের আকর্ষণে ধাতব পরিবাহীর মুক্ত ইলেকট্রনগুলো কাছের প্রান্তে ($A$) ছুটে আসে, ফলে $A$ প্রান্তে ঋণাত্মক আধান সঞ্চিত হয়। দূরবর্তী প্রান্তে ($B$) ইলেকট্রন ঘাটতি হওয়ায় সেখানে সমপরিমাণ ধনাত্মক আধানের সৃষ্টি হয়।

আবিষ্ট আধানের শ্রেণিবিভাগ:

  • বদ্ধ আধান (Bound Charge): পরিবাহীর নিকটবর্তী প্রান্তে ($A$) উৎপন্ন বিপরীত জাতীয় আধান। আবেশী দণ্ডের তীব্র আকর্ষণ বলের কারণে এটি আবদ্ধ থাকে এবং পরিবাহীটিকে ভূ-সংযুক্ত করলেও এটি মাটিতে চলে যেতে পারে না।
  • মুক্ত আধান (Free Charge): পরিবাহীর দূরবর্তী প্রান্তে ($B$) উৎপন্ন সমজাতীয় আধান। আবেশী দণ্ড দ্বারা বিকর্ষিত হওয়ায় এটি স্বাধীন থাকে। পরিবাহীটিতে আঙুল দিয়ে স্পর্শ (ভূ-সংযুক্তি বা Earthing) করলেই মুক্ত আধান মাটিতে চলে যায় বা মাটি থেকে ইলেকট্রন এসে একে প্রশমিত করে।

স্বর্ণালী নিয়ম: আকর্ষণের পূর্বে সর্বদা আবেশ ঘটে। যখন একটি চিরুনি কাগজের টুকরোকে আকর্ষণ করে, তখন চিরুনিটি প্রথমে কাগজের কাছের তলে আবেশের মাধ্যমে বিপরীত আধান তৈরি করে এবং তারপর তাকে আকর্ষণ করে।

১.৪ স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র (Gold-Leaf Electroscope)

স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র হলো এমন একটি সংবেদনশীল বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম যার সাহায্যে কোনো বস্তুতে তড়িৎ আধানের অস্তিত্ব, তার পরিমাণ এবং প্রকৃতি (ধনাত্মক না ঋণাত্মক) নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা যায়।

যন্ত্রের মূল অংশসমূহ:

  • পিতলের চাকতি (Brass Disc): যন্ত্রের শীর্ষে অবস্থিত ধাতব চাকতি যা আধান গ্রহণ বা আবেশ সৃষ্টির কাজ করে।
  • পিতলের দণ্ড: একটি অন্তরক ছিপির মধ্য দিয়ে কাচের বাক্সের ভেতরে প্রবেশ করা দণ্ড।
  • স্বর্ণপত্র (Gold Leaves): দণ্ডের নিচের প্রান্তে মুখোমুখি ঝোলানো দুটি অতি সূক্ষ্ম স্বর্ণপাত বা অ্যালুমিনিয়াম পাত।
  • কাচের আবরণ ও টিনের পাত: বায়ুর প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য স্বচ্ছ কাচের বাক্স এবং বাক্সের ভেতরের দেয়ালে ভূ-সংযুক্ত টিনের পাত লাগানো থাকে যা যন্ত্রের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করে।

কার্যপ্রণালী ও আধানের প্রকৃতি নির্ণয়:

  1. আধানের অস্তিত্ব নির্ণয়: অনাহিত যন্ত্রের চাকতিতে কোনো বস্তু স্পর্শ করালে বা কাছে আনলে যদি স্বর্ণপত্র দুটি ফাঁক হয়ে যায় (বিকর্ষিত হয়), তবে বস্তুটি আহিত। ফাঁক না হলে বস্তুটি নিস্তড়িৎ।
  2. আধানের প্রকৃতি নির্ণয়: প্রথমে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রটিকে একটি নির্দিষ্ট জানা আধানে (যেমন ধনাত্মক) আহিত করা হলো। ফলে পত্র দুটি ফাঁক হয়ে থাকে। এবার অজ্ঞাত বস্তুটি চাকতির কাছে আনা হলে:
    • যদি পত্র দুটির ফাঁক আরও বৃদ্ধি পায়, তবে অজ্ঞাত বস্তুটি তড়িৎবীক্ষণের অনুরূপ আধানে অর্থাৎ ধনাত্মক আধানে আহিত।
    • যদি পত্র দুটির ফাঁক হ্রাস পায়, তবে বস্তুটি হয় বিপরীত আধানযুক্ত (ঋণাত্মক) অথবা সম্পূর্ণ নিস্তড়িৎ।

পরীক্ষার পরম সত্য: আকর্ষণ নয়, বিকর্ষণই হলো আহিতকরণের একমাত্র নিশ্চিত প্রমাণ, কারণ আবেশের কারণে একটি নিস্তড়িৎ বস্তুও আহিত বস্তু দ্বারা আকর্ষিত হতে পারে।

১.৫ স্থির তড়িতে কুলম্বের সূত্র (Coulomb's Law)

১৭৮৫ সালে ফরাসি পদার্থবিদ শার্ল-অগাস্টিন দ্য কুলম্ব দুটি বিন্দু আধানের পারস্পরিক আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল সংক্রান্ত একটি মৌলিক সূত্র প্রণয়ন করেন:

কুলম্বের সূত্র: দুটি স্থির বিন্দু আধানের মধ্যে কার্যকর আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল আধানদ্বয়ের পরিমাণের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।

$$\mathbf{F = k \cdot \frac{|q_1 \cdot q_2|}{r^2}}$$

যেখানে:

  • $q_1, q_2$ হলো আধানদ্বয়ের পরিমাণ (কুলম্ব এককে)।
  • $r$ হলো আধানদ্বয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব (মিটার এককে)।
  • $k$ হলো তড়িৎ মাধ্যম ধ্রুবক (বায়ু বা শূন্য মাধ্যমে $k \approx 9 \times 10^9\text{ N}\cdot\text{m}^2/\text{C}^2$)।

২. বায়ুমণ্ডলে তড়িৎ ক্ষরণ, বজ্রপাত ও বজ্রনিবারক

২.১ মেঘে আধানের সঞ্চয় ও মেঘের মেরুকরণ প্রক্রিয়া

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপে বা বর্ষাকালে সৃষ্ট বিশাল উল্লম্ব ঝড়মেঘে (Cumulonimbus Clouds) শক্তিশালী পরিচলন বায়ুপ্রবাহের ফলে জলকণা ও বরফকণার মধ্যে প্রচণ্ড ঘর্ষণ ঘটে। এই প্রবল ঘর্ষণের ফলে মেঘে বিপুল পরিমাণে তড়িৎ আধানের পৃথকীকরণ ঘটে:

  • ঊর্ধ্বভাগে ধনাত্মক আধানের সঞ্চয়: হালকা বরফের সূক্ষ্ম কণাগুলো ইলেকট্রন হারিয়ে ধনাত্মক আধানে আহিত হয়ে ঊর্ধ্বমুখী বায়ুস্রোতে মেঘের উপরের অংশে ($৮-১২\text{ কিমি}$ উচ্চতায়) জমা হয়।
  • নিম্নভাগে ঋণাত্মক আধানের সঞ্চয়: তুলনামূলক ভারী জলবিন্দু ও বরফপিণ্ড (Graupel) ইলেকট্রন গ্রহণ করে ঋণাত্মক আধানে আহিত হয়ে মেঘের নিচের স্তরে ($১-৩\text{ কিমি}$ উচ্চতায়) পুঞ্জীভূত হয়।
  • ভূ-পৃষ্ঠে আবেশ: মেঘের তলদেশের শক্তিশালী ঋণাত্মক আধান ভূ-পৃষ্ঠের ইলেকট্রনগুলোকে মাটির গভীরে ঠেলে দিয়ে ভূ-পৃষ্ঠ ও তার ওপরের উঁচু গাছপালা, বহুতল ভবন ও ধাতব টাওয়ারগুলোতে প্রবল ধনাত্মক আধানের আবেশ ঘটায়।

২.২ বায়ুর ডাই-ইলেকট্রিক ভাঙন ও বজ্রপাত

সাধারণ অবস্থায় বায়ুমণ্ডল একটি উত্তম তড়িৎ অপরিবাহী বা অন্তরক মাধ্যম। কিন্তু মেঘের নিচে এবং ভূ-পৃষ্ঠের মধ্যে যখন আধানের পরিমাণ বিপুল বেড়ে যায়, তখন তাদের মধ্যকার বিভবভেদ ১০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ভোল্ট ($10^8-10^9\text{ V}$) পর্যন্ত পৌঁছায়।

যখন এই বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের তীব্রতা বায়ুর সহ্যসীমা বা ডাই-ইলেকট্রিক ভাঙন সীমা ($~৩ \times ১০^৬\text{ V/m}$) অতিক্রম করে:

  1. বাতাসের অণু-পরমাণুগুলো তীব্র তড়িৎ ক্ষেত্রে আয়নিত হয়ে প্লাজমা পরিবাহী পথ তৈরি করে।
  2. মেঘ থেকে নিচের দিকে একটি অদৃশ্য ঋণাত্মক ইলেকট্রন স্রোত বা স্টেপড লিডার (Stepped Leader) ধাপ কেটে নেমে আসে।
  3. ভূ-পৃষ্ঠের উঁচু বিন্দু থেকে ধনাত্মক আধানের স্রোত উপরের দিকে উঠে তার সাথে সংযুক্ত হয়।
  4. সংযোগ ঘটামাত্রই ১০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ অ্যাম্পিয়ার তীব্রতার এক দানবীয় তড়িৎপ্রবাহ আলোর ঝলকানিসহ সেকেন্ডের ভগ্নাংশে প্রবাহিত হয়। এই প্রলয়ঙ্করী ঘটনাকেই বজ্রপাত (Lightning) বলে।

২.৩ বজ্রনাদ (Thunder) সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক কারণ

বজ্রপাতের সময় কেন বিকট শব্দে মেঘের গর্জন বা বজ্রনাদ শোনা যায়? এর কারণ সম্পূর্ণ তাপীয় ও বায়বীয়:

  • তাপমাত্রার প্রচণ্ড উল্লম্ফন: বজ্রপাতের সংকীর্ণ প্লাজমা নালীতে মাইক্রোসেকেন্ডের মধ্যে তাপমাত্রা প্রায় ৩০,০০০ কেলভিন ($30,000\text{ K}$) পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা সূর্যের বহিঃপৃষ্ঠের তাপমাত্রার চেয়েও পাঁচ গুণ বেশি তপ্ত!
  • বায়ুর আকস্মিক প্রসারণ ও শকওয়েভ: এই অত্যধিক উত্তাপে বায়ুর অণুগুলো চারদিকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের সাথে প্রসারিত হয়, যার ফলে একটি অতি-শব্দীয় শকওয়েভ (Supersonic Shockwave) তৈরি হয়। এই তরঙ্গই বায়ুমণ্ডলে ধাক্কা খেয়ে গভীর গর্জন বা বজ্রনাদ (Thunder) রূপে প্রতিধ্বনিত হয়।
  • আলোর আগে পৌঁছানোর কারণ: বাতাসে আলোর গতিবেগ প্রায় $৩ \times ১০^৮\text{ m/s}$ (মুহূর্তেই চোখে পড়ে), কিন্তু শব্দের গতিবেগ মাত্র প্রায় $৩৪০\text{ m/s}$। তাই পর্যবেক্ষক সর্বদা আগে আলোর ঝলকানি দেখেন এবং তার কয়েক সেকেন্ড পরে মেঘের গর্জন শোনেন।
  • বজ্রপাতের দূরত্ব পরিমাপ: আলো দেখার পর কত সেকেন্ড পর শব্দ শোনা গেল ($\Delta t$), সেই সময়কে ৩ দিয়ে ভাগ করলে বজ্রপাতটি কত কিলোমিটার দূরে ঘটেছে তা সরাসরি জানা যায় ($d \approx \frac{\Delta t}{3}\text{ কিমি}$)।

২.৪ বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের বজ্রনিবারক (Lightning Conductor)

১৭৫২ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন সুউচ্চ ভবন ও স্মৃতিসৌধকে বজ্রপাতের ধ্বংসলীলা থেকে রক্ষা করার জন্য বজ্রনিবারক (Lightning Conductor) আবিষ্কার করেন।

গঠন ও কার্যপ্রণালী:

  • তীক্ষ্ণ ধাতব শলাকা: ভবনের সর্বোচ্চ চূড়ায় তিনটি বা চারটি তীক্ষ্ণ তামার বা পিতলের শলাকা খাঁড়াভাবে বসানো থাকে। সূঁচিমুখের ক্রিয়া (Action of Points) অনুসারে তীক্ষ্ণ মুখে আধানের তলমাত্রিক ঘনত্ব সর্বাধিক হওয়ায় তা বাতাসে বিপরীত আয়ন নির্গমন করে মেঘের আধানকে ক্রমাগত আংশিক প্রশমিত করতে থাকে।
  • তামার মোটা পরিবাহী পাত: শলাকার গোড়া থেকে একটি চওড়া ও ভারী তামার পাত ভবনের দেয়াল বেয়ে সোজা মাটির নিচে চলে যায়।
  • মাটির আর্থিং পাত: তামার পাতের নিচের প্রান্তটি মাটির গভীরে আর্দ্র স্তরে কয়লা ও লবণের মিশ্রণে প্রোথিত একটি বড় তামার পাতের সঙ্গে ঝালাই করা থাকে যাতে মাটির সাথে রোধ সর্বনিম্ন ($< ৫\ \Omega$) হয়।
  • সুরক্ষা কৌশল: যদি কোনো কারণে ভবনের ওপর সরাসরি বজ্রপাত ঘটেও, তবে সেই লক্ষ লক্ষ অ্যাম্পিয়ার তড়িৎপ্রবাহ ভবনের ইট-কাঠের ভেতর দিয়ে না গিয়ে তামার পাতের সহজ পথ ধরে নিরাপদে সরাসরি ভূগর্ভে অপসৃত হয়, ফলে ভবনটি পুড়ে যাওয়া বা ফেটে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়।

২.৫ বজ্রপাতের সময় আত্মসুরক্ষা ও ফ্যারাডে খাঁচা প্রভাব

বজ্রপাত প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রাণঘাতী। বজ্রপাতের সময় জীবনরক্ষাকারী বৈজ্ঞানিক নিয়মাবলী মেনে চলা আবশ্যক:

  • খোলা আকাশের নিচে সুরক্ষা:
    • কখনো কোনো উঁচু বা একাকী গাছের নিচে দাঁড়াবে না, কারণ বজ্রপাত সর্বদা সবচেয়ে উঁচু পরিবাহী পথ খোঁজে।
    • ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা বা ধাতব দণ্ড ব্যবহার করবে না।
    • নদী, পুকুর বা জলাশয় থেকে অবিলম্বে উঠে আসবে, কারণ জল তড়িতের সুপরিবাহী।
    • খোলা প্রান্তরে উবু হয়ে বসা (Lightning Crouch): মাটির ওপর সমতল হয়ে শোবে না (কারণ মাটিতে বিপজ্জনক ভূ-তড়িৎপ্রবাহ ছড়ায়)। দুই পায়ের গোড়ালি পরস্পরের সাথে স্পর্শ করিয়ে, পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে উবু হয়ে মাথা নিচু করে কানে হাত দিয়ে বসবে। এতে ভূমির সাথে সংস্পর্শ ক্ষেত্রফল সর্বনিম্ন হয়।
  • বাড়ির ভেতরে সুরক্ষা:
    • জানালা-দরজা বন্ধ রাখবে; জলের পাইপ, কল ও ধাতব বেসিন স্পর্শ করবে না।
    • টিভি, কম্পিউটার ও ফ্রিজের বৈদ্যুতিক প্লাগ খুলে রাখবে; তারযুক্ত ল্যান্ডফোন ব্যবহার করবে না।
  • গাড়ির ভেতরে ফ্যারাডে খাঁচা প্রভাব (Faraday Cage): বন্ধ কাচের জানালাযুক্ত ধাতব গাড়ি বা বাসের ভেতরে থাকা বজ্রপাতের সময় সম্পূর্ণ নিরাপদ। মাইকেল ফ্যারাডের আবিষ্কার অনুযায়ী, যেকোনো ফাঁপা ধাতব খোলকের বাইরের তলে সমস্ত তড়িৎ আধান অবস্থান করে এবং খোলকের অভ্যন্তরে তড়িৎ ক্ষেত্র সর্বদা শূন্য হয় ($E = 0$)। ফলে বাইরের বিদ্যুৎ গাড়ির বডি দিয়ে মাটিতে নেমে যায়, কিন্তু ভেতরের যাত্রীদের কোনো ক্ষতি হয় না।

৩. পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন ও পাত সংস্থান তত্ত্ব

৩.১ পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ সমকেন্দ্রিক স্তরসমূহ: ভূত্বক, গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডল

ভূকম্পীয় তরঙ্গের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে ভূতত্ত্ববিদগণ জানতে পেরেছেন যে পৃথিবী মূলত তিনটি সমকেন্দ্রিক স্তরে গঠিত:

  1. ১. ভূত্বক (Crust): পৃথিবীর সবচেয়ে বাইরের পাতলা কঠিন শিলাস্তর ($৫-৭০\text{ কিমি}$ পুরু)।
    • মহাদেশীয় ভূত্বক (SIAL): গড়ে ৩০-৭০ কিমি পুরু; সিলিকা ($\text{Si}$) ও অ্যালুমিনিয়াম ($\text{Al}$) সমৃদ্ধ গ্রানাইট জাতীয় হালকা শিলা দ্বারা গঠিত। ঘনত্ব প্রায় $২.৭\text{ g/cm}^3$।
    • মহাসাগরীয় ভূত্বক (SIMA): গড়ে ৫-১০ কিমি পুরু; সিলিকা ($\text{Si}$) ও ম্যাগনেসিয়াম ($\text{Mg}$) সমৃদ্ধ ভারী ব্যাসল্ট শিলা দ্বারা গঠিত। ঘনত্ব প্রায় $৩.০\text{ g/cm}^3$।
  2. ২. গুরুমণ্ডল (Mantle): ভূত্বকের নিচ থেকে প্রায় $২,৯০০\text{ কিমি}$ গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি মূলত লোহা ও ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ ঘন সিলিকেট শিলা দ্বারা গঠিত। ঘনত্ব প্রায় $৩.৩-৫.৭\text{ g/cm}^3$।
  3. ৩. কেন্দ্রমণ্ডল (Core / NIFE): পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত ($২,৯০০-৬,৩৭১\text{ কিমি}$) বিস্তৃত স্তর। এটি নিকেল ($\text{Ni}$) ও লোহা ($\text{Fe}$) দ্বারা গঠিত বলে একে নিফে (NIFE) বলে।
    • বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল (Outer Core): তরল লোহা ও নিকেল স্তর ($২,৯০০-৫,১৫০\text{ কিমি}$)। এই গলিত ধাতুর ঘূর্ণন পৃথিবীর শক্তিশালী ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি করে।
    • অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল (Inner Core): কঠিন লোহা ও নিকেলের গোলক ($৫,১৫০-৬,৩৭১\text{ কিমি}$)। প্রায় $৬,০০০^\circ\text{C}$ তাপমাত্রা সত্ত্বেও প্রচণ্ড চাপের ($~৩৬\text{ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ}$) কারণে এটি কঠিন অবস্থায় থাকে।

৩.২ অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার ও পরিচলন স্রোতের ইঞ্জিন

ভূত্বক এবং গুরুমণ্ডলের একেবারে উপরের কঠিন অংশ মিলিতভাবে তৈরি করে প্রায় ১০০ কিমি পুরু শিলামণ্ডল (Lithosphere)।

শিলামণ্ডলের ঠিক নিচেই গুরুমণ্ডলের উপরিভাগে ($১০০-২৫০\text{ কিমি}$ গভীরতায়) অবস্থিত একটি অর্ধ-গলিত, নমনীয় ও সান্দ্র স্তরকে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার (Asthenosphere) বলে। তেজস্ক্রিয় পদার্থের ক্ষয়জাত তাপে এই স্তরের শিলা প্লাস্টিকের মতো নমনীয় অবস্থায় থাকে।

পরিচলন স্রোত: অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের উত্তপ্ত ম্যাগমা হালকা হয়ে উপরের দিকে ওঠে এবং শীতল হয়ে নিচে নামে। এই ধীরগতির পরিচলন স্রোতই তার ওপরে ভাসমান শিলামণ্ডলের বিশালাকার ভূ-গাঠনিক পাতগুলোকে বছরে কয়েক সেন্টিমিটার হারে টেনে নিয়ে চলে।

৩.৩ পাত সংস্থান তত্ত্ব ও তিন ধরনের পাত সীমানা

১৯৬০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত পাত সংস্থান তত্ত্ব (Plate Tectonics Theory) অনুসারে সমগ্র পৃথিবীর শিলামণ্ডল কতগুলো প্রধান ও অপ্রধান অনমনীয় খণ্ডে বিভক্ত, যাদের টেকটনিক পাত বলে। এই পাতগুলোর সংযোগস্থলেই অধিকাংশ ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে।

  • ১. অভিসারী পাত সীমানা (Convergent Boundary): দুটি পাত পরস্পরের মুখোমুখি অগ্রসর হয়ে ধাক্কা খায়।
    • মহাদেশ-মহাদেশ সংঘর্ষ: ভারতীয় পাত ও ইউরেশীয় পাতের অবিরাম সংঘর্ষের ফলে ভূত্বকে ভাঁজ পড়ে সৃষ্টি হয়েছে সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালা। এই অঞ্চলে আজও বিধ্বংসী ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
    • নিমজ্জন অঞ্চল (Subduction Zone): ভারী মহাসাগরীয় পাত হালকা মহাদেশীয় পাতের নিচে প্রবেশ করে গলে যায়।
  • ২. অপসারী পাত সীমানা (Divergent Boundary): দুটি পাত পরস্পরের বিপরীত দিকে সরে যায়। মধ্যবর্তী ফাটল দিয়ে ম্যাগমা উঠে নতুন সামুদ্রিক ভূত্বক গড়ে তোলে (যেমন: মধ্য-আটলান্টিক শৈলশিরা)।
  • ৩. রূপান্তর বা নিরপেক্ষ পাত সীমানা (Transform Boundary): দুটি পাত পরস্পরের পাশ কাটিয়ে অনুভূমিকভাবে ঘর্ষণ করতে করতে সরে যায় (যেমন: ক্যালিফোর্নিয়ার কুখ্যাত সান আন্দ্রেয়াস চ্যুতি)।

৩.৪ চ্যুতিরেখা ও স্মৃতিস্থাপক প্রত্যাবর্তনের তত্ত্ব (Elastic Rebound)

ভূত্বকের শিলাস্তরের যে গভীর ফাটল বরাবর শিলাখণ্ডগুলোর পারস্পরিক আপেক্ষিক স্থানচ্যুতি ঘটে, তাকে চ্যুতি বা ফল্ট (Fault) বলে।

স্মৃতিস্থাপক প্রত্যাবর্তন তত্ত্ব (এইচ. এফ. রিড, ১৯১০):

  1. টেকটনিক পাতের অবিরাম গতির মুখে চ্যুতিরেখার অমসৃণ শিলাতলগুলোর ঘর্ষণে আটকে থাকে।
  2. পাতগুলো ধাক্কা দিতে থাকায় চ্যুতির দুপাশের শিলা স্থিতিস্থাপক স্প্রিং-এর মতো বেঁকে যেতে থাকে এবং সেখানে বছরের পর বছর ধরে বিপুল স্থিতিস্থাপক বিকৃতি শক্তি (Elastic Strain Energy) জমা হয়।
  3. অবশেষে যখন পুঞ্জীভূত পীড়ন শিলার সহ্যক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখন চ্যুতি বরাবর শিলাস্তর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তীব্র ঝাঁকুনিতে ভেঙে গিয়ে আগের সোজা অবস্থানে ফিরে আসে।
  4. এই আকস্মিক ভাঙনে মুক্ত বিপুল শক্তি ভূত্বকের মধ্য দিয়ে তরঙ্গের আকারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প (Earthquake)।

৩.৫ বিশ্বের প্রধান ভূমিকম্প বলয়সমূহ

পৃথিবীর প্রায় ৯৫% ভূমিকম্প নির্দিষ্ট কয়েকটি টেকটনিক পাত সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে:

  • প্রশান্ত মহাসাগরীয় বলয় ("Ring of Fire"): প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল ধরে জাপান, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া, চিলি ও ক্যালিফোর্নিয়া জুড়ে বিস্তৃত। পৃথিবীর ৮০%-এর বেশি সর্ববৃহৎ ভূমিকম্প এই বলয়ে সংঘটিত হয়।
  • ভূমধ্যসাগরীয়-হিমালয় বলয় (Alpide Belt): ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তান, হিমালয় (উত্তর ভারত, নেপাল) হয়ে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্বের প্রায় ১৫% ভূমিকম্প এখানে ঘটে।

৪. ভূমিকম্প ও সুনামি: সিসমিক তরঙ্গ ও রিখটার স্কেল

৪.১ ভূকম্পের কেন্দ্র (Focus) ও উপকেন্দ্র (Epicenter)

ভূমিকম্পের উৎপত্তির জ্যামিতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্য দুটি পারিভাষিক শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

  • ভূকম্প কেন্দ্র বা ফোকাস (Hypocenter / Focus): ভূগর্ভের অভ্যন্তরে শিলাস্তরের যে নির্দিষ্ট বিন্দুতে ফাটল বা চ্যুতি ঘটে এবং প্রথম ভূকম্পীয় শক্তির মুক্তি হয়। গভীরতা অনুযায়ী কেন্দ্র অগভীর ($০-৭০\text{ কিমি}$), মধ্যম ($৭০-৩০০\text{ কিমি}$) বা গভীর ($>৩০০\text{ কিমি}$) হতে পারে। অগভীর ভূকম্পন ভূ-পৃষ্ঠে সর্বাধিক ধ্বংস ঘটায়।
  • ভূকম্প উপকেন্দ্র (Epicenter): ভূকম্প কেন্দ্রের ঠিক উল্লম্বভাবে ভূ-পৃষ্ঠের ওপরের বিন্দুটিকে উপকেন্দ্র বলে। কেন্দ্র থেকে উপকেন্দ্রের দূরত্ব সর্বনিম্ন হওয়ায় ভূকম্পীয় তরঙ্গ সর্বপ্রথম উপকেন্দ্রেই পৌঁছায় এবং এখানেই সর্বাধিক কম্পন ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটে।

৪.২ ভূকম্পীয় তরঙ্গসমূহ: P-তরঙ্গ, S-তরঙ্গ ও L-তরঙ্গ

ভূকম্পের কেন্দ্র থেকে মুক্ত শক্তি স্থিতিস্থাপক তরঙ্গের আকারে শিলার মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে, যাদের সিসমিক তরঙ্গ (Seismic Waves) বলে:

তরঙ্গের নাম কম্পনের প্রকৃতি গতিবেগ প্রবহন মাধ্যম ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা
প্রাথমিক বা P-তরঙ্গ
(Primary / Longitudinal)
অনুদৈর্ঘ্য সংকোচন-প্রসারণ তরঙ্গ (কণার কম্পন ও তরঙ্গের দিক একই; শব্দের মতো) দ্রুততম
($৬-৮\text{ কিমি/সেকেন্ড}$)
কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় (তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলের মধ্য দিয়ে যেতে পারে) কম (সিসমোগ্রাফে সর্বপ্রথম ধরা পড়ে)
গৌণ বা S-তরঙ্গ
(Secondary / Transverse)
তির্যক কৃন্তন তরঙ্গ (কণার কম্পন তরঙ্গের গতির সঙ্গে সমকোণে; আলোর মতো) মধ্যম
($৩.৫-৪.৫\text{ কিমি/সেকেন্ড}$)
কেবলমাত্র কঠিন মাধ্যম (তরল মাধ্যমে যেতে পারে না, ফলে S-তরঙ্গ ছায়াবলয় তৈরি হয়) মাঝারি থেকে উচ্চ
পৃষ্ঠ বা L-তরঙ্গ
(Rayleigh & Love Waves)
ভূ-পৃষ্ঠ বরাবর জটিল উপবৃত্তাকার ও অনুভূমিক মোচড় কম্পন ধীরতম
($২-৩\text{ কিমি/সেকেন্ড}$)
কেবলমাত্র ভূত্বকের ওপরের পৃষ্ঠতলে সর্বাধিক ধ্বংসাত্মক (বাড়িঘরের ভিত উপড়ে ফেলে ও ভূমি দোলায়)

৪.৩ সিসমোগ্রাফ যন্ত্র ও উপকেন্দ্র নির্ণয়

সিসমোগ্রাফ (Seismograph): যে সংবেদনশীল বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের সাহায্যে ভূকম্পীয় তরঙ্গের তীব্রতা ও বিস্তার নথিবদ্ধ করা হয়, তাকে সিসমোগ্রাফ বা ভূকম্পনমাপক যন্ত্র বলে। এর দ্বারা অঙ্কিত কম্পন লেখচিত্রকে সিসমোগ্রাম (Seismogram) বলে।

কার্যনীতি (জড়তার সূত্র):

  • যন্ত্রটিতে একটি ভারী ধাতব গোলক (দোলক) নরম স্প্রিং দিয়ে ঝুলানো থাকে এবং ফ্রেমটি মাটির সাথে শক্তভাবে যুক্ত থাকে।
  • ভূমিকম্পের সময় যখন ভূপৃষ্ঠ ও যন্ত্রের ফ্রেম কাঁপতে থাকে, তখন ভারী গোলকটি তার নিজস্ব স্থিতিজড়তার জন্য স্থির থাকার চেষ্টা করে।
  • গোলকের সাথে লাগানো লেখনীটি ফ্রেমের সাথে ঘুরতে থাকা ঘূর্ণায়মান ড্রামের ওপর আঁকাবাঁকা রেখাচিত্র অঙ্কন করে।
  • উপকেন্দ্র নির্ধারণ: দ্রুতগামী P-তরঙ্গ এবং ধীরগামী S-তরঙ্গের আগমন সময়ের ব্যবধান ($\Delta t = t_S - t_P$) থেকে কেন্দ্রটির দূরত্ব মাপা যায়। কমপক্ষে তিনটি পৃথক সিসমোগ্রাফ স্টেশনের দূরত্বের বৃত্তাংশ ছেদ করে উপকেন্দ্রের নিখুঁত অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।

৪.৪ রিখটার স্কেল বনাম মার্সালি স্কেল

ভূমিকম্পের শক্তি ও ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপের দুটি পৃথক স্কেল রয়েছে:

  • রিখটার স্কেল (Richter Scale - মাত্রা / Magnitude): ১৯৩৫ সালে চার্লস এফ. রিখটার কর্তৃক উদ্ভাবিত। এটি ভূকম্পের কেন্দ্র থেকে মুক্ত মোট শক্তির নিখুঁত গাণিতিক পরিমাপ।
    • লগারিদমিক স্কেল: রিখটার স্কেলে ১ একক মাত্রা বৃদ্ধি পেলে সিসমোগ্রামে তরঙ্গের বিস্তার বৃদ্ধি পায় ১০ গুণ এবং ভূকম্পের কেন্দ্র থেকে মুক্ত শক্তির পরিমাণ বৃদ্ধি পায় প্রায় ৩১.৬২ গুণ ($10^{1.5}$)!
    • ৭.০ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ৫.০ মাত্রার ভূমিকম্পের চেয়ে প্রায় $৩১.৬২ \times ৩১.৬২ \approx \mathbf{১,০০০\text{ গুণ বেশি শক্তি}}$ নির্গমন করে।
    • এই স্কেলের কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই; ৭.০-এর ওপরের ভূমিকম্প ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে।
  • মার্সালি স্কেল (Mercalli Scale - তীব্রতা / Intensity): কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় মানুষ, ঘরবাড়ি ও প্রকৃতির ওপর দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির ওপর ভিত্তি করে রোমান সংখ্যা $\text{I}$ থেকে $\text{XII}$ পর্যন্ত তীব্রতা মাপা হয়। উপকেন্দ্র থেকে দূরত্ব বাড়লে মার্সালি তীব্রতা হ্রাস পায়।

৪.৫ সমুদ্রতলে ভূকম্পন ও সুনামির উৎপত্তি

সুনামি (Tsunami): জাপানি শব্দ ‘সু’ (Tsu = বন্দর) এবং ‘নামি’ (Nami = ঢেউ) থেকে এসেছে, যার অর্থ "পোতাশ্রয়ের দানবাকৃতির ঢেউ"। সমুদ্রের তলদেশে শক্তিশালী টেকটনিক ভূকম্পনের ফলে উৎপন্ন বিধ্বংসী সামুদ্রিক ঢেউকে সুনামি বলে।

সুনামি সৃষ্টির ধাপসমূহ:

  1. সমুদ্রগর্ভে সাবডাকশন অঞ্চলে ৭.৫ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পে সমুদ্রের তলদেশ হঠাৎ উল্লম্বভাবে উপরে উঠে যায় বা নিচে ধসে পড়ে।
  2. এর ফলে তার ওপরের বিপুল জলস্তম্ভ অকস্মাৎ সজোরে স্থানচ্যুত হয়ে বৃত্তাকারে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
  3. গভীর সমুদ্রে সুনামির গতিবেগ থাকে জেট বিমানের মতো ($>৭০০-৮০০\text{ কিমি/ঘণ্টা}$), কিন্তু সেখানে এর উচ্চতা থাকে মাত্র ১ মিটারেরও কম এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকে বিশাল ($১০০-২০০\text{ কিমি}$), ফলে জাহাজের যাত্রীরা তা টেরই পান না।
  4. সোয়ালিং প্রভাব (Shoaling Effect): ঢেউ যখন অগভীর উপকূলের দিকে আসে, তখন সমুদ্রতলের ঘর্ষণে তরঙ্গের গতিবেগ কমে যায় ($v = \sqrt{gd}$), কিন্তু শক্তির নিত্যতার কারণে তরঙ্গদৈর্ঘ্য সংকুচিত হয়ে জলের উচ্চতা ১০ থেকে ৩০ মিটার (বহুতল ভবনের সমান) দানবীয় প্রাচীরে পরিণত হয়ে উপকূলে আছড়ে পড়ে (যেমন: ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ভারত মহাসাগরের প্রলয়ঙ্করী সুনামি)।

৫. ঘূর্ণিঝড়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও সুরক্ষা ব্যবস্থাপনা

৫.১ ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির শর্ত ও লীনতাপের ইঞ্জিন

ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় (Tropical Cyclone): ক্রান্তীয় অঞ্চলের উষ্ণ সাগরের ওপর সৃষ্ট তীব্র ঘূর্ণায়মান নিম্নচাপযুক্ত বায়ুমণ্ডলীয় ঝড়, যার কেন্দ্রে প্রবল বেগে বাতাস কুণ্ডলাকারে ঘোরে এবং মুষলধারে বৃষ্টিপাত ঘটায়।

ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির অপরিহার্য শর্তাবলী:

  • উষ্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠ: সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা অন্তত ৫০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত $২৭^\circ\text{C}$ বা তার বেশি হতে হবে।
  • তীব্র বাষ্পীভবন ও নিম্নচাপ: উষ্ণ জল থেকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প দ্রুত উপরে উঠে বায়ুমণ্ডলে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি করে।
  • ঘনীভবনের লীনতাপ নির্গমন: উপরে উঠে জলীয় বাষ্প যখন মেঘে ঘনীভূত হয়, তখন প্রতি কেজিতে প্রায় $২.২৬ \times ১০^৬\text{ জুল}$ লীনতাপ নির্গত হয়। এই নির্গত লীনতাপ চারপাশের বাতাসকে আরও উত্তপ্ত ও হালকা করে দ্রুত উপরে ঠেলে দেয়, ফলে নিম্নচাপ আরও গভীর হয়—যা ঘূর্ণিঝড়ের তাপীয় ইঞ্জিনের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
  • করিওলিস বল (Coriolis Force): পৃথিবীর আবর্তন গতির কারণে বাতাস সোজাসুজি নিম্নচাপের কেন্দ্রে না ঢুকে কুণ্ডলাকারে পাক খেতে থাকে (উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে)। নিরক্ষরেখার কাছাকাছি ($০^\circ-৫^\circ\text{ অক্ষাংশে}$) করিওলিস বল শূন্য হওয়ায় সেখানে কখনো ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে না।

৫.২ ঘূর্ণিঝড়ের গঠন: ঝড়ের চোখ ও মেঘের দেওয়াল

উপগ্রহ ও রাডার চিত্রে একটি পরিণত ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের তিনটি প্রধান অংশ দেখা যায়:

  • ১. ঘূর্ণিঝড়ের চোখ (Eye of the Cyclone): ঝড়ের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত ২০ থেকে ৫০ কিমি ব্যাসযুক্ত শান্ত, বৃত্তাকার এলাকা। এখানে বায়ুর চাপ সর্বনিম্ন হলেও উপর থেকে শুষ্ক বাতাস নিচে নামার কারণে আকাশ পরিষ্কার থাকে, মৃদু বাতাস বয় এবং কোনো বৃষ্টি হয় না।
  • ২. মেঘের দেওয়াল বা চক্ষু প্রাচীর (Eye Wall): শান্ত চোখের ঠিক চারপাশ ঘিরে থাকা সুবিশাল কিউমুলোনিম্বাস মেঘের বৃত্তাকার প্রাচীর। এটিই ঘূর্ণিঝড়ের সবচেয়ে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক অংশ, যেখানে বাতাসের বেগ ঘণ্টায় ১৫০ থেকে ২৫০ কিমি বা তার বেশি হতে পারে এবং প্রচণ্ড বজ্রবিদ্যুৎসহ মুষলধারে বৃষ্টি হয়।
  • ৩. সর্পিলাকার বৃষ্টিবলয় (Spiral Rainbands): কেন্দ্র থেকে শত শত কিলোমিটার বাইরে পর্যন্ত প্রসারিত মেঘের বলয়, যা প্রবল দমকা হাওয়া ও জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে।

৫.৩ ভূমিকম্পের সময় আত্মরক্ষা: "Drop, Cover, and Hold On"

যেহেতু ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস পাওয়া যায় না, তাই ভূকম্পন শুরু হওয়া মাত্রই তাৎক্ষণিক সুরক্ষা অভ্যাস জীবন বাঁচাতে পারে:

  • ঘরের ভেতরে থাকলে:
    • DROP (নিচু হও): কম্পন অনুভব করামাত্রই মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ো, যাতে ছিটকে পড়ে চোট না লাগে।
    • COVER (আড়াল নাও): কোনো শক্ত কাঠের টেবিল, ডেস্ক বা খাটের নিচে আশ্রয় নাও এবং দুই হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখো।
    • HOLD ON (শক্ত করে ধরো): কম্পন না থামা পর্যন্ত টেবিলের পায়া শক্ত করে ধরে থাকো। টেবিল সরলে তার সঙ্গে সরো।
    • সতর্কতা: কাচের জানালা, ঝুলন্ত পাখা, ভারী আলমারি থেকে দূরে থাকবে। কখনো লিফট ব্যবহার করবে না (বিদ্যুৎ সংযোগ ছিন্ন হয়ে আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে); কম্পন চলাকালীন সিঁড়ি দিয়ে হুড়োহুড়ি করে নামবে না।
  • খোলা আকাশের নিচে থাকলে: বহুতল ভবন, বিদ্যুতের খুঁটি, ওভারহেড তার ও উড়ালপুল থেকে দূরে কোনো ফাঁকা খোলা মাঠ বা পার্কে সরে যাবে।
  • চলন্ত গাড়িতে থাকলে: গাড়িটি সাবধানে রাস্তার একপাশে দাঁড় করাবে (ব্রিজ বা ওভারপাসের নিচে নয়) এবং কম্পন থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই থাকবে।

৫.৪ ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থাপনা

ভূমিকম্পের পূর্বাভাস অসম্ভব হলেও কৃত্রিম উপগ্রহ ও ডপলার রাডারের সাহায্যে ঘূর্ণিঝড়ের গতিবিধি বহু আগে থেকেই নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা যায়:

  • ভারত আবহাওয়া দপ্তর (IMD)-এর চার স্তরের সতর্কতা:
    • Cyclone Watch: ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা সম্পর্কে ৭২ ঘণ্টা আগে জারি করা হয়।
    • Cyclone Alert (হলুদ সতর্কতা): উপকূলের দিকে এগিয়ে আসার ৪৮ ঘণ্টা আগে সতর্কতা।
    • Cyclone Warning (কমলা/লাল সতর্কতা): সম্ভাব্য আঘাত হানার ২৪ ঘণ্টা আগে নির্দিষ্ট জেলায় জারি।
    • Post-Landfall Outlook: স্থলভাগ অতিক্রমের ১২ ঘণ্টা আগে ক্ষয়ক্ষতি ও বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস।
  • জনসাধারণের প্রস্তুতি: উপকূলীয় নিম্নাঞ্চলের মানুষদের অবিলম্বে শক্তপোক্ত পাকা সাইক্লোন শেল্টারে স্থানান্তরিত করা, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানীয় জল মজুত রাখা, ব্যাটারিচালিত রেডিওতে নিয়মিত সরকারি বুলেটিন শোনা।

৫.৫ প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর তুলনামূলক পর্যালোচনা সারণি

প্রাকৃতিক ঘটনা মূল বৈজ্ঞানিক কারণ পূর্বাভাসযোগ্যতা প্রধান প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা
বজ্রপাত (Lightning) মেঘে ঘর্ষণে আধান সঞ্চয় ও বায়ুর ডাই-ইলেকট্রিক ভাঙন ঝড়বৃষ্টির স্বল্পমেয়াদী পূর্বাভাস (কয়েক ঘণ্টা) বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের তীক্ষ্ণ শলাকাযুক্ত বজ্রনিবারক ও উত্তম আর্থিং
ভূমিকম্প (Earthquake) টেকটনিক পাতের গতি ও চ্যুতিতে পুঞ্জীভূত স্থিতিস্থাপক বিকৃতি শক্তির মুক্তি নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ আগে থেকে জানা অসম্ভব; ভূকম্পপ্রবণ মানচিত্র তৈরি ভূমিকম্প-নিরোধক বাড়ি নির্মাণ, "Drop, Cover, Hold On" কৌশল
সুনামি (Tsunami) সমুদ্রগর্ভে সাবডাকশন অঞ্চলে শক্তিশালী ভূকম্পীয় চ্যুতি ও জলস্তম্ভের উত্থান ভূমিকম্পের পর উপকূলবর্তী অঞ্চলে পূর্বাভাস সম্ভব (কয়েক মিনিট থেকে ঘণ্টা) গভীর সমুদ্রের DART বয়া সেন্সর, উপকূলীয় বাঁধ ও আগাম সাইরেন
ঘূর্ণিঝড় (Cyclone) উষ্ণ সাগরে গভীর নিম্নচাপ, বাষ্পীভবনজাত লীনতাপ ও করিওলিস বলের ঘূর্ণন সম্পূর্ণরূপে পূর্বাভাসযোগ্য (৩ থেকে ৫ দিন আগে) উপগ্রহের মাধ্যমে ডপলার ওয়েদার রাডার, উপকূলীয় সাইক্লোন সেন্টার ও নিরাপদ স্থানান্তর

গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সমীকরণ, বিক্রিয়া ও সূত্র

আধানের কোয়ান্টায়ন সূত্র
$$Q = \pm n \cdot e\quad (e = 1.602 \times 10^{-19}\text{ C})$$
যেকোনো পরিমাপযোগ্য আধান সর্বদা মৌলিক ইলেকট্রনীয় আধানের পূর্ণসংখ্যার গুণিতক হয়।
স্থির তড়িতে কুলম্বের সূত্র
$$F = k \cdot \frac{|q_1 \cdot q_2|}{r^2}\quad (k \approx 9 \times 10^9\text{ N}\cdot\text{m}^2/\text{C}^2)$$
দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক নিয়ম; দূরত্ব দ্বিগুণ হলে পারস্পরিক বল এক-চতুর্থাংশে নেমে আসে।
বজ্রপাতের দূরত্ব নির্ণয়ের সূত্র (Flash-to-Bang)
$$d = v_{sound} × t ≈ 340 × t মিটার ≈ { t}{3} কিমি$$
আলো ও শব্দের গতিবেগের পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে বজ্রপাতের ভৌগোলিক দূরত্ব নির্ণয়।
রিখটার শক্তির মাত্রা সম্পর্ক (গুটেনবার্গ-রিখটার সূত্র)
$$_{10} E = 4.8 + 1.5 M (E জুল এককে)$$
রিখটার মাত্রার সাথে ভূকম্পের কেন্দ্র থেকে মুক্ত শক্তির নিখুঁত লগারিদমিক সম্পর্ক।
রিখটার স্কেলের শক্তি বৃদ্ধির অনুপাত
$$\frac{E_{M+1}}{E_M} = 10^{1.5} = \sqrt{10^3} = 10\sqrt{10} \approx 31.62$$
রিখটার স্কেলে মাত্রা ১ একক বাড়লে মুক্ত শক্তির পরিমাণ প্রায় ৩১.৬২ গুণ বৃদ্ধি পায়।
ভূকম্পীয় তরঙ্গের গতিবেগের ক্রমবিন্যাস
$$v_P > v_S > v_L (v_P ≈ ৬-৮ km/s,\ v_S ≈ ৩.৫-৪.৫ km/s,\ v_L ≈ ২-৩ km/s)$$
সংকোচনধর্মী P-তরঙ্গ সবার আগে পৌঁছায়, এরপর তীর্যক S-তরঙ্গ ও ধ্বংসাত্মক L-পৃষ্ঠতরঙ্গ।
অগভীর সমুদ্রে সুনামির গতিবেগ সূত্র
$$v = \sqrt{g \cdot d}$$
সুনামির গতিবেগ অভিকর্ষজ ত্বরণ (g) এবং সমুদ্রের জলের গভীরতা (d)-এর ওপর নির্ভরশীল।
ঘূর্ণিঝড়ের ঘনীভবনের লীনতাপ ইঞ্জিন
$$Q = m \cdot L_v\quad (L_v = 2.26 \times 10^6\text{ J/kg})$$
জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হওয়ার সময় বিপুল লীনতাপ নির্গত করে নিম্নচাপকে ক্রমাগত শক্তিশালী রাখে।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
রেশম দিয়ে ঘষার ফলে একটি কাচদণ্ড থেকে $২.৫ \times ১০^{১২}$ সংখ্যক ইলেকট্রন স্থানান্তরিত হলো। কাচদণ্ডে উৎপন্ন আধানের প্রকৃতি ও মান নির্ণয় করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ধাপে ধাপে সমাধান:

১. আধানের প্রকৃতি: কাচদণ্ড থেকে ঋণাত্মক ইলেকট্রন অপসারিত হওয়ায় কাচদণ্ডে ইলেকট্রনের ঘাটতি ঘটেছে, ফলে কাচদণ্ডটি ধনাত্মক আধানে (+) আহিত হবে।

২. আধানের মান গণনা (কোয়ান্টায়ন সূত্রানুসারে):

$$Q = n \times e$$

দেওয়া আছে:
বর্জিত ইলেকট্রন সংখ্যা $n = ২.৫ \times ১০^{১২}$
একটি ইলেকট্রনের আধান $e = ১.৬০২ \times ১০^{-১৯}\text{ C}$

$$Q = (২.৫ \times ১০^{১২}) \times (১.৬০২ \times ১০^{-১৯}\text{ C}) = ৪.০০৫ \times ১০^{-৭}\text{ C} = \mathbf{+০.৪০\ \mu\text{C}}$$

উত্তর: কাচদণ্ডটিতে $+৪.০০৫ \times ১০^{-৭}\text{ কুলম্ব}$ (বা $+০.৪০\ \mu\text{C}$) ধনাত্মক আধান সঞ্চিত হবে।

উদাহরণ 2
আকাশে বিদ্যুৎ চমক দেখার ৮ সেকেন্ড পর মেঘের গর্জন শোনা গেল। বায়ুতে শব্দের গতিবেগ ৩৪০ মিটার/সেকেন্ড হলে বজ্রপাতটি কত দূরে ঘটেছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ধাপে ধাপে সমাধান:

বায়ুতে আলোর গতিবেগ ($৩ \times ১০^৮\text{ m/s}$) অত্যন্ত বেশি হওয়ায় বিদ্যুৎ চমকের আলো প্রায় মুহূর্তের মধ্যেই (০ সেকেন্ডে) চোখে পৌঁছায়। তাই ৮ সেকেন্ড সময়ের ব্যবধানটি সম্পূর্ণভাবে শব্দের অতিক্রান্ত সময়।

$$\text{দূরত্ব } (d) = \text{শব্দের গতিবেগ } (v) \times \text{সময় } (\Delta t)$$

দেওয়া আছে:
শব্দের বেগ $v = ৩৪০\text{ m/s}$
সময় $\Delta t = ৮\text{ সেকেন্ড}$

$$d = ৩৪০\text{ m/s} \times ৮\text{ s} = \mathbf{২৭২০\text{ মিটার}} = \mathbf{২.৭২\text{ কিমি}}$$

উত্তর: বজ্রপাতটি পর্যবেক্ষক থেকে ২৭২০ মিটার (বা ২.৭২ কিলোমিটার) দূরে সংঘটিত হয়েছিল।

উদাহরণ 3
রিখটার স্কেলে ৮.০ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে নির্গত শক্তি ৬.০ মাত্রার ভূমিকম্পের নির্গত শক্তির তুলনায় কত গুণ বেশি? গাণিতিক ব্যাখ্যা দাও।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

গাণিতিক ব্যাখ্যা ও গণনা:

গুটেনবার্গ-রিখটার শক্তি সূত্রানুসারে:

$$\log_{10} E = ৪.৮ + ১.৫ M$$

মাত্রার পার্থক্য $\Delta M = M_২ - M_১ = ৮.০ - ৬.০ = ২.০$ একক।

$$\log_{10}\left(\frac{E_২}{E_১}\right) = ১.৫ \times (M_২ - M_১) = ১.৫ \times ২.০ = ৩.০$$

$$\frac{E_২}{E_১} = ১০^{৩.০} = \mathbf{১,০০০}$$

বিকল্পভাবে, রিখটার স্কেলে ১ একক বৃদ্ধিতে শক্তি বাড়ে $১০^{১.৫} \approx ৩১.৬২$ গুণ। সুতরাং ২ একক বৃদ্ধিতে শক্তি বাড়বে:

$$\text{অনুপাত} = ৩১.৬২ \times ৩১.৬২ \approx \mathbf{১,০০০\text{ গুণ}}$$

উত্তর: ৮.০ মাত্রার ভূমিকম্পে ৬.০ মাত্রার ভূমিকম্পের তুলনায় ১,০০০ গুণ বেশি শক্তি নির্গত হয়।

উদাহরণ 4
তড়িৎ পরীক্ষার ক্ষেত্রে কেন আকর্ষণ নয়, বিকর্ষণই আহিতকরণের একমাত্র সুনিশ্চিত প্রমাণ? যুক্তি দাও।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

বিজ্ঞানসম্মত কারণ:

  1. আকর্ষণের ক্ষেত্র: দুটি বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ দুটি ভিন্ন কারণে ঘটতে পারে:
    • উভয় বস্তু পরস্পরের বিপরীত আধানে আহিত থাকলে ($+$ ও $-$)।
    • একটি আহিত বস্তু এবং একটি সম্পূর্ণ নিস্তড়িৎ পরিবাহী বস্তুর মধ্যে। কারণ আহিত বস্তুর প্রভাবে নিস্তড়িৎ পরিবাহীর কাছে স্থির তড়িৎ আবেশ ঘটে এবং কাছের প্রান্তে বিপরীত আধানের সৃষ্টি হয়ে আকর্ষণ ঘটে। অতএব, কেবল আকর্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না যে অপর বস্তুটি আদৌ আগে থেকে আহিত ছিল কি না।
  2. বিকর্ষণের ক্ষেত্র: বিকর্ষণ কেবল এবং কেবলমাত্র তখনই ঘটে যখন দুটি বস্তুই একই জাতীয় সম-আধানে আহিত থাকে ($+$ এর সাথে $+$ অথবা $-$ এর সাথে $-$)। কোনো আহিত বস্তু কখনোই একটি নিস্তড়িৎ বস্তুকে বিকর্ষণ করতে পারে না।

উপসংহার: অতএব, কোনো বস্তু নিশ্চিতভাবে আহিত কি না তা জানার একমাত্র অভ্রান্ত পরীক্ষা হলো বিকর্ষণ।

উদাহরণ 5
বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের বজ্রনিবারকের শীর্ষদেশ কেন সূঁচালো করা হয়? ভোঁতা বা গোলকাকার করলে কী অসুবিধা হতো?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

সূঁচিমুখের ক্রিয়া ও সুরক্ষা বিশ্লেষণ:

  1. সূঁচিমুখের ক্রিয়া (Action of Points): কোনো পরিবাহীর বক্রতা ব্যাসার্ধ যত কম হয়, তার আধানের তলমাত্রিক ঘনত্ব তত বৃদ্ধি পায় ($\sigma \propto 1/r$)। বজ্রনিবারকের অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ সূঁচালো হওয়ায় সেখানে তীব্র বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়, যা চারপাশের বায়ুকণাকে আয়নিত করে। নির্গত বিপরীত আয়ন মেঘের দিকে ধাবিত হয়ে মেঘের আধানকে ক্রমাগত আংশিক প্রশমিত করে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমায়।
  2. সহজ তড়িৎ ক্ষরণ পথ: ভবনের ওপর সরাসরি বজ্রপাত ঘটলেও সূঁচালো প্রান্তটি সহজেই মেঘের তড়িৎপ্রবাহকে গ্রহণ করে মোটা তামার পাতের মাধ্যমে মাটির গভীরে নিরাপদে পাঠিয়ে দেয়।
  3. ভোঁতা প্রান্তের অসুবিধা: যদি অগ্রভাগ ভোঁতা বা গোলকাকার হতো, তবে আধানের তলমাত্রিক ঘনত্ব কম থাকায় সূঁচিমুখের করোনা ক্ষরণ ঘটত না। ফলে মেঘ প্রশমিত না হয়ে সরাসরি ভবনের কাঠামোতে আছড়ে পড়ে অগ্নিকাণ্ড ও মারাত্মক যান্ত্রিক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাত।
উদাহরণ 6
একটি সিসমোগ্রাফ স্টেশনে P-তরঙ্গ পৌঁছানোর ৪০ সেকেন্ড পর S-তরঙ্গ এসে পৌঁছাল। P-তরঙ্গের গতিবেগ ৮ কিমি/সেকেন্ড এবং S-তরঙ্গের গতিবেগ ৪.৮ কিমি/সেকেন্ড হলে স্টেশনটি থেকে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের দূরত্ব কত?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ধাপে ধাপে সমাধান:

ধরি, স্টেশনটি থেকে ভূকম্প কেন্দ্রের দূরত্ব $d\text{ কিমি}$।

P-তরঙ্গের প্রয়োজনীয় সময়: $t_P = \frac{d}{v_P} = \frac{d}{৮}$ সেকেন্ড

S-তরঙ্গের প্রয়োজনীয় সময়: $t_S = \frac{d}{v_S} = \frac{d}{৪.৮}$ সেকেন্ড

তরঙ্গদ্বয়ের পৌঁছানোর সময়ের ব্যবধান: $\Delta t = t_S - t_P = ৪০\text{ সেকেন্ড}$

$$\frac{d}{৪.৮} - \frac{d}{৮} = ৪০$$

লঘিষ্ঠ সাধারণ গুণিতক ($২৪$) নিয়ে পাই:

$$\frac{৫d - ৩d}{২৪} = ৪০ \implies \frac{২d}{২৪} = ৪০ \implies \frac{d}{১২} = ৪০$$

$$d = ৪০ \times ১২ = \mathbf{৪৮০\text{ কিমি}}$$

উত্তর: সিসমোগ্রাফ স্টেশনটি থেকে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের দূরত্ব ৪৮০ কিলোমিটার।

উদাহরণ 7
বজ্রপাতের সময় ধাতব গাড়ি বা বাসের ভেতরে বসে থাকা সম্পূর্ণ নিরাপদ কেন? রবারের টায়ার কি এর আসল কারণ?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ (ফ্যারাডে খাঁচা প্রভাব):

  1. প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা: অনেকে মনে করেন গাড়ির রবারের টায়ার বিদ্যুৎ অপরিবাহী হওয়ায় যাত্রীরা রক্ষা পান। কিন্তু যে বজ্রপাত আকাশের কয়েক কিলোমিটার বাতাস ভেদ করে নেমে আসে, তার কাছে কয়েক সেন্টিমিটার রবারের টায়ার কোনো বাধাই নয়।
  2. ফ্যারাডে খাঁচার বৈজ্ঞানিক নীতি: মোটরগাড়ি বা বাসের বাইরের কাঠামো সম্পূর্ণ নিরেট ধাতব পাত দিয়ে তৈরি। স্থির তড়িৎ বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো আবদ্ধ ফাঁপা ধাতব খোলকে আধান প্রয়োগ করলে সমস্ত আধান কেবল তার বাইরের তলেই অবস্থান করে।
  3. অভ্যন্তরে শূন্য তড়িৎ ক্ষেত্র: পরিবাহীর ভেতরে কোনো তড়িৎ ক্ষেত্র বা বিভবভেদ থাকে না ($E = ০$)। বজ্রপাত গাড়ির ছাদে পড়লে বিপুল তড়িৎপ্রবাহ কেবল বাইরের বডি বেয়ে টায়ার বা বাতাসের মধ্য দিয়ে মাটিতে চলে যায়, ফলে গাড়ির ভেতরের যাত্রীরা সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকেন।
উদাহরণ 8
৪০০০ মিটার গভীর মহাসাগরে সৃষ্ট একটি সুনামির গতিবেগ ঘণ্টায় কত কিমি হবে তা নির্ণয় করো। ($g = ৯.৮\text{ m/s}^2$ ধরো)।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

গাণিতিক সমাধান:

অগভীর জলের মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গতিবেগ সূত্র:

$$v = \sqrt{g \cdot d}$$

দেওয়া আছে:
মহাসাগরের গভীরতা $d = ৪০০০\text{ মিটার}$
অভিকর্ষজ ত্বরণ $g = ৯.৮\text{ m/s}^2$

$$v = \sqrt{৯.৮ \times ৪০০০} = \sqrt{৩৯২০০} \approx \mathbf{১৯৭.৯৯\text{ মিটার/সেকেন্ড}}$$

কিলোমিটার/ঘণ্টায় রূপান্তর করে পাই:

$$v = ১৯৭.৯৯ \times \frac{৩৬০০}{১০০০} \approx \mathbf{৭১২.৮\text{ কিমি/ঘণ্টা}}$$

উত্তর: গভীর সমুদ্রে সুনামিটি প্রায় ১৯৮ মিটার/সেকেন্ড (বা প্রায় ৭১৩ কিমি/ঘণ্টা) দ্রুতবেগে ধাবিত হবে, যা একটি যাত্রীবাহী জেট বিমানের গতির সমতুল্য।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

পরীক্ষায় লেখা যে "ঘর্ষণের ফলে বস্তু থেকে প্রোটন বেরিয়ে অন্য বস্তুতে যায়"।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

নিউক্লিয়াসের ভেতর আবদ্ধ প্রোটন অত্যন্ত শক্তিশালী নিউক্লীয় বলের কারণে কখনো চলাচল করতে পারে না। কেবল পরমাণুর বাইরের কক্ষের ইলেকট্রন স্থানান্তরিত হয়। ইলেকট্রনের ঘাটতিই হলো ধনাত্মক আধান।

সাধারণ ভুল ধারণা

চিরুনি কাগজের টুকরোকে আকর্ষণ করে বলে কাগজটিকে আহিত মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

একটি আহিত বস্তু স্থির তড়িৎ আবেশের কারণে যেকোনো অনাহিত নিস্তড়িৎ বস্তুকেও আকর্ষণ করতে পারে। তাই আকর্ষণ নয়, বিকর্ষণই আহিতকরণের একমাত্র নিশ্চিত প্রমাণ।

সাধারণ ভুল ধারণা

গাড়ির সুরক্ষার কারণ হিসেবে "রবারের অপরিবাহী ধর্ম"-কে দায়ী করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

আকাশের ৩ কিলোমিটার বাতাস ভেদ করে আসা বজ্রপাতের কাছে চাকার কয়েক ইঞ্চি রবার তুচ্ছ। আসল কারণ হলো গাড়ির ধাতব বডি একটি "ফ্যারাডে খাঁচা" হিসেবে কাজ করে ভেতরের তড়িৎ ক্ষেত্র শূন্য রাখে।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে ৭.০ মাত্রার ভূমিকম্প ৬.০ মাত্রার চেয়ে সামান্য বেশি শক্তিশালী।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

রিখটার স্কেল হলো একটি লগারিদমিক স্কেল। প্রতি ১ একক বৃদ্ধির অর্থ তরঙ্গের বিস্তার ১০ গুণ এবং নির্গত শক্তির পরিমাণ প্রায় ৩১.৬২ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া। ৭.০ মাত্রা ৬.০ মাত্রার চেয়ে ৩১.৬ গুণ এবং ৫.০ মাত্রার চেয়ে ১০০০ গুণ বেশি শক্তিশালী।

সাধারণ ভুল ধারণা

উপকেন্দ্রকে ভূগর্ভস্থ উৎপত্তি কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ভূকম্প কেন্দ্র (Focus) থাকে ভূগর্ভের গভীরে যেখানে প্রথম শিলা ভাঙে। আর উপকেন্দ্র (Epicenter) হলো ভূ-পৃষ্ঠের ওপর কেন্দ্রের ঠিক সোজা উল্লম্ব বিন্দু।

সাধারণ ভুল ধারণা

উঁচু থেকে নিচু হতে গিয়ে মাটিতে টানটান হয়ে শোয়ার পরামর্শ দেওয়া।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

মাটিতে শুয়ে পড়লে শরীরের অনেকখানি অংশ মাটির সংস্পর্শে আসে, ফলে আশেপাশে বজ্রপাত হলে মাটির মধ্যে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী গ্রাউন্ড কারেন্টে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়। সঠিক নিয়ম হলো পায়ের আঙুলে উবু হয়ে বসা।

সাধারণ ভুল ধারণা

S-তরঙ্গ পৃথিবীর বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল ভেদ করে যায় বলে দাবি করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

S-তরঙ্গ হলো একটি তীর্যক কৃন্তন তরঙ্গ (Shear wave), যা কেবল কঠিন মাধ্যমে চলাচল করতে পারে কারণ তরল ও গ্যাসের কৃন্তন স্থিতিস্থাপকতা শূন্য। এই কারণেই তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলে S-তরঙ্গ ঢুকতে পারে না।

প্রাকৃতিক ঘটনার বিশ্লেষণ — ৪-কোয়াড্র্যান্ট কনসেপ্ট ম্যাপ

⚡ ১. স্থির তড়িৎ ও বৈদ্যুতিক আধান ঘর্ষণে তড়িৎ • আবেশ • স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র • ঘর্ষণে তড়িৎ: কাচ-রেশম (+), এবোনাইট-পশম (-) • মৌলিক নিয়ম: সমজাতীয় আধান বিকর্ষণ, বিপরীত আকর্ষণ করে • ইলেকট্রন তত্ত্ব: বহিস্থ কক্ষের ইলেকট্রন স্থানান্তর দ্বারা আহিতকরণ • তড়িৎ আবেশ: স্পর্শহীনভাবে বিপরীত বদ্ধ ও সম মুক্ত আধান সৃষ্টি • স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ: আধানের অস্তিত্ব ও প্রকৃতি নির্ণয়কারী যন্ত্র • মোক্ষম নীতি: আকর্ষণের পূর্বে সর্বদা আবেশ ঘটে 🌩️ ২. বায়ুমণ্ডলে তড়িৎ ক্ষরণ ও বজ্রপাত মেঘের আধান সঞ্চয় • বজ্রনিবারক • সুরক্ষাবিধি • মেঘের আধান: ঊর্ধ্বে ধনাত্মক (+) এবং তলদেশে ঋণাত্মক (-) সঞ্চয় • ডাই-ইলেকট্রিক ক্ষরণ: বিভবভেদে বায়ুর অপরিবাহী ধর্ম নষ্ট ও স্ফুলিঙ্গ • বজ্রনাদ: বায়ুপথ ৩০,০০০ K তাপে অকস্মাৎ প্রসারিত হয়ে শব্দতরঙ্গ • বজ্রনিবারক: ফ্র্যাঙ্কলিনের তীক্ষ্ণ ধাতব শলাকা ও তামার আর্থিং পাত • ফ্যারাডে খাঁচা প্রভাব: ধাতুনির্মিত গাড়ি/বাসের অভ্যন্তর সম্পূর্ণ নিরাপদ • খোলা প্রান্তরে সুরক্ষা: পায়ের আঙুলে উবু হয়ে বসা; গাছের নিচে নয় 🌋 ৩. ভূ-অভ্যন্তরীণ গঠন ও টেকটনিক পাত সমকেন্দ্রিক স্তর • অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার • চ্যুতিরেখা • ভূত্বক: পাতলা কঠিন শিলামণ্ডল; সিয়াল (SIAL) ও সিমা (SIMA) • গুরুমণ্ডল ও অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার: অর্ধ-তরল পরিচলন স্রোতের প্রবাহ • কেন্দ্রমণ্ডল: তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল (চৌম্বক ক্ষেত্র) ও কঠিন অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল • পাত সীমানা: অভিসারী (হিমালয় সৃষ্টি), অপসারী ও নিরপেক্ষ সীমানা • চ্যুতিরেখা (Faults): টেকটনিক প্রান্তে স্থিতিস্থাপক বিকৃতির পুঞ্জীভবন • শক্তি মুক্তি: শিলাস্তরের ভঙ্গুরে সঞ্চিত স্মৃতিস্থাপক শক্তি মুক্তি পায় 🌊 ৪. ভূমিকম্প, সুনামি ও ঘূর্ণিঝড় সিসমোলজি • রিখটার স্কেল • দুর্যোগ প্রস্তুতি • কেন্দ্র বনাম উপকেন্দ্র: ভূগর্ভস্থ উৎস (Focus) ও ঠিক ওপরের বিন্দু • তরঙ্গ: দ্রুতগামী প্রাথমিক P, তির্যক গৌণ S এবং ধ্বংসাত্মক পৃষ্ঠ L তরঙ্গ • রিখটার স্কেল: লগারিদমিক; ১ একক বৃদ্ধিতে শক্তি বাড়ে ~৩১.৬ গুণ • সিসমোগ্রাফ: ভারী পেন্ডুলাম দ্বারা ড্রামে ভূকম্পলেখ (Seismogram) অঙ্কন • সুনামি: সমুদ্রতলে ভূকম্পীয় চ্যুতিতে বিপুল জলরাশির উল্লম্ব উত্থান • নিরাপত্তা প্রোটোকল: "Drop, Cover, Hold On" • ফাঁকা মাঠে আশ্রয় প্রাকৃতিক ঘটনার বিশ্লেষণ WBBSE অষ্টম শ্রেণি

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
স্থির তড়িৎ ও আধান: ঘর্ষণের ফলে যোজ্যতা ইলেকট্রন স্থানান্তরের মাধ্যমে বস্তুতে আধান উৎপন্ন হয় (ইলেকট্রন ঘাটতি = ধনাত্মক, আধিক্য = ঋণাত্মক)।
মূল বিষয় 2
আধানের সংরক্ষণ ও কোয়ান্টায়ন: আধান অবিনশ্বর এবং যে কোনো আধান সর্বদা মৌলিক ইলেকট্রনীয় আধানের পূর্ণসংখ্যার গুণিতক ($Q = \pm n \cdot e$)।
মূল বিষয় 3
স্থির তড়িৎ আবেশ: আহিত বস্তুর উপস্থিতিতে অনাহিত পরিবাহীতে সাময়িক আধান সমাবেশ; আকর্ষণের পূর্বে সর্বদা আবেশ ঘটে।
মূল বিষয় 4
স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র: আধানের অস্তিত্ব ও প্রকৃতি নির্ণয়কারী যন্ত্র; বিকর্ষণই হলো আহিতকরণের একমাত্র অভ্রান্ত প্রমাণ।
মূল বিষয় 5
বজ্রপাত ও বজ্রনাদ: ঝড়মেঘে ঘর্ষণে আধানের মেরুকরণ; বায়ুর ডাই-ইলেকট্রিক ভাঙনে বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ। ৩০,০০০ K তাপে বায়ুর বিস্ফোরণমূলক প্রসারণে বজ্রনাদ সৃষ্টি হয়।
মূল বিষয় 6
বজ্রনিবারক ও ফ্যারাডে খাঁচা: ফ্র্যাঙ্কলিনের তীক্ষ্ণ শলাকাযুক্ত বজ্রনিবারক ভবনের সুরক্ষা দেয়; ধাতব যানবাহনের ভেতরে ফ্যারাডে খাঁচা প্রভাবে তড়িৎ ক্ষেত্র শূন্য থাকে।
মূল বিষয় 7
পৃথিবীর গঠন ও পাত সংস্থান: ভূত্বক (সিয়াল ও সিমা), গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডল (নিফে)। অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের পরিচলন স্রোত টেকটনিক পাত ও চ্যুতিরেখায় পীড়ন তৈরি করে।
মূল বিষয় 8
ভূমিকম্প, রিখটার স্কেল ও আত্মরক্ষা: ভূকম্প কেন্দ্র বনাম উপকেন্দ্র; P, S, L সিসমিক তরঙ্গ। রিখটার স্কেল লগারিদমিক ($+১\text{ একক} \approx ৩১.৬২\times\text{ শক্তি}$)। সুরক্ষা বিধি: "Drop, Cover, Hold On"।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
স্থির তড়িতে কুলম্বের সূত্রটি বিবৃত করো। দুটি আধানের মধ্যবর্তী দূরত্ব দ্বিগুণ করা হলে তাদের মধ্যকার বলের কী পরিবর্তন ঘটবে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

কুলম্বের সূত্র: দুটি স্থির বিন্দু আধানের মধ্যে কার্যকর আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল আধানদ্বয়ের পরিমাণের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক:

$$F = k \cdot \frac{|q_1 \cdot q_2|}{r^2}$$

দূরত্ব দ্বিগুণ করার প্রভাব: যদি দূরত্ব দ্বিগুণ করা হয় ($r' = 2r$):

$$F' = k \cdot \frac{|q_1 \cdot q_2|}{(2r)^2} = \frac{1}{4} \left(k \cdot \frac{|q_1 \cdot q_2|}{r^2}\right) = \mathbf{\frac{F}{4}}$$

অর্থাৎ, আধানদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থির তড়িৎ বল পূর্বের বলের এক-চতুর্থাংশ (বা ২৫%) হয়ে যাবে।


2
স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে কীভাবে কোনো অজ্ঞাত বস্তুর আধান ধনাত্মক না ঋণাত্মক তা শনাক্ত করা যায়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

প্রথমে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রটিকে একটি জানা আধানে (যেমন ধনাত্মক আধানে) আহিত করা হয়, ফলে তার সোনার পাত দুটি ফাঁক হয়ে থাকে। এবার অজ্ঞাত আহিত বস্তুটিকে চাকতির কাছে আনা হলে:

  1. যদি স্বর্ণপত্র দুটির ফাঁক আরও বৃদ্ধি পায়: অজ্ঞাত বস্তুটি তড়িৎবীক্ষণের অনুরূপ অর্থাৎ ধনাত্মক আধানে আহিত। কারণ সমজাতীয় আধান চাকতি থেকে আরও ধনাত্মক আধানকে বিকর্ষণ করে নিচে পাতের দিকে পাঠিয়ে দেয়।
  2. যদি স্বর্ণপত্র দুটির ফাঁক হ্রাস পায়: অজ্ঞাত বস্তুটি বিপরীত আধানে (ঋণাত্মক) আহিত অথবা নিস্তড়িৎ। কারণ এটি ধনাত্মক আধানকে চাকতির দিকে টেনে নেয়, ফলে পাতে আধানের পরিমাণ কমে যায়।

3
ভূমিকম্পের কেন্দ্র (Focus) এবং উপকেন্দ্র (Epicenter)-এর মধ্যে পার্থক্য লেখো। ভূ-পৃষ্ঠে কোন ধরনের ভূকম্পীয় তরঙ্গ সর্বাধিক ধ্বংস ঘটায় এবং কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

কেন্দ্র বনাম উপকেন্দ্র: ভূকম্প কেন্দ্র (Focus) হলো ভূগর্ভের ভেতরের সেই নির্দিষ্ট বিন্দু যেখানে শিলার প্রথম ফাটল ধরে এবং সিসমিক শক্তির নির্গমন ঘটে। আর উপকেন্দ্র (Epicenter) হলো ভূকম্প কেন্দ্রের ঠিক সোজা উপরে ভূ-পৃষ্ঠের ওপরের ভৌগোলিক স্থান।

সর্বাধিক ধ্বংসাত্মক তরঙ্গ: পৃষ্ঠ তরঙ্গ বা L-তরঙ্গ (Rayleigh ও Love waves) ভূ-পৃষ্ঠে সর্বাধিক ধ্বংসলীলা চালায়। কারণ দেহ-তরঙ্গের ($P$ ও $S$) মতো এরা ভূগর্ভের গভীরে মিলিয়ে না গিয়ে ভূপৃষ্ঠের উপরিতল বরাবর ভ্রমণ করে এবং এদের তরঙ্গের বিস্তার সবচেয়ে বেশি থাকে, যা বাড়িঘরের ভিত নাড়িয়ে দিয়ে মারাত্মক অনুভূমিক মোচড় সৃষ্টি করে।


4
বজ্রপাতের পর কেন বজ্রনাদ বা মেঘের গর্জন শোনা যায়? বায়ুর আকস্মিক তাপীয় প্রসারণ কীভাবে শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

বজ্রপাতের সময় সরু বায়ু নালীর মধ্য দিয়ে প্রায় ২ লক্ষ অ্যাম্পিয়ার পর্যন্ত বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডের মধ্যে বায়ুর তাপমাত্রা প্রায় ৩০,০০০ কেলভিনে ($30,000 ext{ K}$) পৌঁছে যায়।

এই প্রচণ্ড উত্তাপে বাতাস শব্দাতীত গতিতে আকস্মিক বিস্ফোরক আকারে প্রসারিত হয়, যার ফলে বায়ুমণ্ডলে তীব্র অভিঘাত তরঙ্গ (Shockwave) তৈরি হয়। এই তরঙ্গই বহু দূর পর্যন্ত গমগম শব্দে প্রতিধ্বনিত হয়ে বজ্রনাদ (Thunder) সৃষ্টি করে। আলোর গতিবেগ ($৩ imes ১০^৮ ext{ m/s}$) শব্দের চেয়ে ($৩৪০ ext{ m/s}$) বহুগুণ বেশি হওয়ায় আলো আগে দেখা যায় ও গর্জন পরে শোনা যায়।


5
ভূমিকম্পের সময় প্রস্তাবিত "Drop, Cover, and Hold On" কৌশলটি ব্যাখ্যা করো। এই সময় দরজার নিচে দাঁড়ানো বা লিফট ব্যবহার করা কেন অনুচিত?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

"Drop, Cover, Hold On" পদ্ধতি:

  1. Drop (নিচু হও): কম্পন শুরু হলেই হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসো যাতে পড়ে না যাও।
  2. Cover (আড়াল নাও): কোনো শক্ত কাঠের টেবিল বা খাটের নিচে ঢুকে হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখো।
  3. Hold On (শক্ত করে ধরো): টেবিলের পায়া শক্ত করে ধরে থাকো যতক্ষণ না কম্পন থামে।

দরজার নিচে না দাঁড়ানোর কারণ: আধুনিক বাড়ির দরজার ফ্রেম দেয়ালের অন্য অংশের চেয়ে আলাদা শক্তিশালী নয় এবং তা ভেঙে পড়ার ধ্বংসাবশেষ থেকে মাথা বাঁচাতে পারে না।

লিফট ব্যবহার না করার কারণ: ভূমিকম্পের সময় বিদ্যুৎ সংযোগ তাৎক্ষণিক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ফলে লিফটের ভেতরে আটকা পড়ে শ্বাসরোধ ও অগ্নিকাণ্ডের প্রাণঘাতী ঝুঁকি থাকে।


অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

প্রাকৃতিক ঘটনার বিশ্লেষণ অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।