১.১ ঘর্ষণে তড়িৎ উৎপত্তি ও দুই প্রকার আধান
দুটি উপযুক্ত অন্তরক পদার্থকে পরস্পরের সঙ্গে ঘষলে দেখা যায় যে তারা কাগজের ছোট টুকরো, চুল বা শোলার বলের মতো হালকা বস্তুকে আকর্ষণ করার বিশেষ ক্ষমতা লাভ করে। বস্তুর এই দশাকে আহিত অবস্থা এবং ঘর্ষণের ফলে উৎপন্ন এই বিদ্যুৎকে স্থির তড়িৎ (Static Electricity) বলে, কারণ উৎপন্ন আধান পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত না হয়ে উৎপত্তিস্থলেই স্থির থাকে।
বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন (Benjamin Franklin) পরীক্ষার মাধ্যমে স্থির তড়িৎ আধানকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেন:
- ধনাত্মক আধান (+): কাচদণ্ডকে পরিষ্কার খাঁটি রেশম (Silk) দিয়ে ঘষলে কাচদণ্ডে যে আধান উৎপন্ন হয়। (রেশমে সমপরিমাণ ঋণাত্মক আধান উৎপন্ন হয়)।
- ঋণাত্মক আধান (-): এবোনাইট বা গালা বা অ্যাম্বার দণ্ডকে পশম বা ফ্লানেল (Flannel/Wool) দিয়ে ঘষলে দণ্ডে যে আধান সৃষ্টি হয়। (পশমে সমপরিমাণ ধনাত্মক আধান জন্মায়)।
তড়িৎ আধানের মৌলিক সূত্র: সমজাতীয় আধান পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীত জাতীয় আধান পরস্পরকে আকর্ষণ করে।
১.২ আহিতকরণের ইলেকট্রনীয় তত্ত্ব ও আধানের নিত্যতা সূত্র
আধুনিক পরমাণু বিজ্ঞানের ভিত্তি অনুযায়ী প্রতিটি পরমাণু নিস্তড়িৎ, কারণ পরমাণুর কেন্দ্রে অবস্থিত ধনাত্মক প্রোটন সংখ্যা এবং বাইরে বিভিন্ন কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান ঋণাত্মক ইলেকট্রন সংখ্যা হুবহু সমান:
$$\text{মোট প্রোটন সংখ্যা } (+) = \text{মোট ইলেকট্রন সংখ্যা } (-)$$ঘর্ষণে আহিতকরণের কারণ: পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আবদ্ধ ভারী প্রোটনগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী নিউক্লীয় বল দ্বারা আবদ্ধ থাকায় কখনো স্থানান্তরিত হতে পারে না। কিন্তু পরমাণুর সর্ববহিস্থ কক্ষের আলগা যোজ্যতা ইলেকট্রনগুলো ঘর্ষণের ফলে এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে স্থানান্তরিত হয়:
- যে বস্তু ইলেকট্রন বর্জন করে: ইলেকট্রনের ঘাটতি ঘটে এবং বস্তুটি সামগ্রিকভাবে ধনাত্মক আধানে (+Q) আহিত হয়।
- যে বস্তু ইলেকট্রন গ্রহণ করে: অতিরিক্ত ইলেকট্রন সঞ্চিত হয় এবং বস্তুটি সমপরিমাণ ঋণাত্মক আধানে (-Q) আহিত হয়।
আধানের নিত্যতা সূত্র (Conservation of Charge): আধান সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না; একটি বিচ্ছিন্ন সংস্থায় ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আধানের বীজগাণিতিক সমষ্টি সর্বদা ধ্রুবক থাকে। আহিতকরণ কেবল ইলেকট্রনের স্থানান্তর মাত্র।
আধানের কোয়ান্টায়ন (Quantization of Charge): যেকোনো বস্তুতে সঞ্চিত মোট আধান $Q$ সর্বদা মৌলিক ইলেকট্রনীয় আধান $e$-এর ($1.602 \times 10^{-19}\text{ C}$) পূর্ণসংখ্যার গুণিতক হয়:
$$Q = \pm n \cdot e \quad (n = 1, 2, 3, \dots)$$১.৩ স্থির তড়িৎ আবেশ (মুক্ত ও বদ্ধ আধান)
স্থির তড়িৎ আবেশ (Electrostatic Induction): কোনো আহিত বস্তুকে কোনো অনাহিত পরিবাহীর কাছে স্পর্শ না করিয়ে আনলে, আহিত বস্তুটির উপস্থিতির প্রভাবে পরিবাহীটির দুই প্রান্তে সাময়িকভাবে বিপরীত জাতীয় আধানের সমাবেশ ঘটার ঘটনাকে স্থির তড়িৎ আবেশ বলে।
পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণ:
- একটি অন্তরক কাচের হাতলযুক্ত অনাহিত ধাতব চোঙের কাছে একটি ধনাত্মক কাচদণ্ড আনা হলো (স্পর্শ না করিয়ে)।
- কাচদণ্ডের আকর্ষণে ধাতব পরিবাহীর মুক্ত ইলেকট্রনগুলো কাছের প্রান্তে ($A$) ছুটে আসে, ফলে $A$ প্রান্তে ঋণাত্মক আধান সঞ্চিত হয়। দূরবর্তী প্রান্তে ($B$) ইলেকট্রন ঘাটতি হওয়ায় সেখানে সমপরিমাণ ধনাত্মক আধানের সৃষ্টি হয়।
আবিষ্ট আধানের শ্রেণিবিভাগ:
- বদ্ধ আধান (Bound Charge): পরিবাহীর নিকটবর্তী প্রান্তে ($A$) উৎপন্ন বিপরীত জাতীয় আধান। আবেশী দণ্ডের তীব্র আকর্ষণ বলের কারণে এটি আবদ্ধ থাকে এবং পরিবাহীটিকে ভূ-সংযুক্ত করলেও এটি মাটিতে চলে যেতে পারে না।
- মুক্ত আধান (Free Charge): পরিবাহীর দূরবর্তী প্রান্তে ($B$) উৎপন্ন সমজাতীয় আধান। আবেশী দণ্ড দ্বারা বিকর্ষিত হওয়ায় এটি স্বাধীন থাকে। পরিবাহীটিতে আঙুল দিয়ে স্পর্শ (ভূ-সংযুক্তি বা Earthing) করলেই মুক্ত আধান মাটিতে চলে যায় বা মাটি থেকে ইলেকট্রন এসে একে প্রশমিত করে।
স্বর্ণালী নিয়ম: আকর্ষণের পূর্বে সর্বদা আবেশ ঘটে। যখন একটি চিরুনি কাগজের টুকরোকে আকর্ষণ করে, তখন চিরুনিটি প্রথমে কাগজের কাছের তলে আবেশের মাধ্যমে বিপরীত আধান তৈরি করে এবং তারপর তাকে আকর্ষণ করে।
১.৪ স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র (Gold-Leaf Electroscope)
স্বর্ণপত্র তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র হলো এমন একটি সংবেদনশীল বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম যার সাহায্যে কোনো বস্তুতে তড়িৎ আধানের অস্তিত্ব, তার পরিমাণ এবং প্রকৃতি (ধনাত্মক না ঋণাত্মক) নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা যায়।
যন্ত্রের মূল অংশসমূহ:
- পিতলের চাকতি (Brass Disc): যন্ত্রের শীর্ষে অবস্থিত ধাতব চাকতি যা আধান গ্রহণ বা আবেশ সৃষ্টির কাজ করে।
- পিতলের দণ্ড: একটি অন্তরক ছিপির মধ্য দিয়ে কাচের বাক্সের ভেতরে প্রবেশ করা দণ্ড।
- স্বর্ণপত্র (Gold Leaves): দণ্ডের নিচের প্রান্তে মুখোমুখি ঝোলানো দুটি অতি সূক্ষ্ম স্বর্ণপাত বা অ্যালুমিনিয়াম পাত।
- কাচের আবরণ ও টিনের পাত: বায়ুর প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য স্বচ্ছ কাচের বাক্স এবং বাক্সের ভেতরের দেয়ালে ভূ-সংযুক্ত টিনের পাত লাগানো থাকে যা যন্ত্রের সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করে।
কার্যপ্রণালী ও আধানের প্রকৃতি নির্ণয়:
- আধানের অস্তিত্ব নির্ণয়: অনাহিত যন্ত্রের চাকতিতে কোনো বস্তু স্পর্শ করালে বা কাছে আনলে যদি স্বর্ণপত্র দুটি ফাঁক হয়ে যায় (বিকর্ষিত হয়), তবে বস্তুটি আহিত। ফাঁক না হলে বস্তুটি নিস্তড়িৎ।
- আধানের প্রকৃতি নির্ণয়: প্রথমে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রটিকে একটি নির্দিষ্ট জানা আধানে (যেমন ধনাত্মক) আহিত করা হলো। ফলে পত্র দুটি ফাঁক হয়ে থাকে। এবার অজ্ঞাত বস্তুটি চাকতির কাছে আনা হলে:
- যদি পত্র দুটির ফাঁক আরও বৃদ্ধি পায়, তবে অজ্ঞাত বস্তুটি তড়িৎবীক্ষণের অনুরূপ আধানে অর্থাৎ ধনাত্মক আধানে আহিত।
- যদি পত্র দুটির ফাঁক হ্রাস পায়, তবে বস্তুটি হয় বিপরীত আধানযুক্ত (ঋণাত্মক) অথবা সম্পূর্ণ নিস্তড়িৎ।
পরীক্ষার পরম সত্য: আকর্ষণ নয়, বিকর্ষণই হলো আহিতকরণের একমাত্র নিশ্চিত প্রমাণ, কারণ আবেশের কারণে একটি নিস্তড়িৎ বস্তুও আহিত বস্তু দ্বারা আকর্ষিত হতে পারে।
১.৫ স্থির তড়িতে কুলম্বের সূত্র (Coulomb's Law)
১৭৮৫ সালে ফরাসি পদার্থবিদ শার্ল-অগাস্টিন দ্য কুলম্ব দুটি বিন্দু আধানের পারস্পরিক আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল সংক্রান্ত একটি মৌলিক সূত্র প্রণয়ন করেন:
কুলম্বের সূত্র: দুটি স্থির বিন্দু আধানের মধ্যে কার্যকর আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বল আধানদ্বয়ের পরিমাণের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
$$\mathbf{F = k \cdot \frac{|q_1 \cdot q_2|}{r^2}}$$যেখানে:
- $q_1, q_2$ হলো আধানদ্বয়ের পরিমাণ (কুলম্ব এককে)।
- $r$ হলো আধানদ্বয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব (মিটার এককে)।
- $k$ হলো তড়িৎ মাধ্যম ধ্রুবক (বায়ু বা শূন্য মাধ্যমে $k \approx 9 \times 10^9\text{ N}\cdot\text{m}^2/\text{C}^2$)।