শ্রীরামকৃষ্ণের প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩–১৯০২) অদ্বৈত বেদান্ত দর্শনকে অরণ্য বা মঠের সাধনা থেকে মুক্ত করে সমাজসেবা ও জাতীয় পুনরুজ্জীবনের হাতিয়ারে পরিণত করেন। ১৮৯৩ সালে শিকাগোর বিশ্বধর্ম সম্মেলনে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে পরাধীন ভারতবাসীর মনে অভূতপূর্ব আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করেছিল।
- ব্যবহারিক বেদান্ত (Practical Vedanta): প্রতিটি মানুষের মধ্যেই ব্রহ্ম বা আত্মার শুদ্ধ জ্যোতি বিদ্যমান। তাই মানুষকে ঘৃণা করা আত্মাকেই অস্বীকার করার শামিল। তিনি প্রচার করেন 'জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর'।
- দরিদ্র নারায়ণ তত্ত্ব: বিবেকানন্দ ঘোষণা করেছিলেন যে ক্ষুধার্ত, নিরক্ষর ও পদদলিত দরিদ্র মানুষের রূপেই ভগবান আমাদের সামনে উপস্থিত। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন—'খালি পেটে ধর্ম হয় না'; ক্ষুধার্ত জাতিকে আধ্যাত্মিকতার বাণী শোনানো এক নিষ্ঠুর উপহাস।
- শূদ্র জাগরণের ভবিষ্যদ্বাণী: সমাজতাত্ত্বিক বিবর্তনের বিশ্লেষণে বিবেকানন্দ দেখান যে মানবসমাজ পর্যায়ক্রমে চারটি বর্ণের প্রাধান্য দ্বারা পরিচালিত হয়েছে—ব্রাহ্মণ (পুরোহিত), ক্ষত্রিয় (যোদ্ধা), বৈশ্য (ব্যবসায়ী) এবং পরিশেষে শূদ্র (শ্রমজীবী বা সর্বহারা)। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে আগামী পৃথিবী হবে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের—যাকে তিনি 'শূদ্র জাগরণ' আখ্যা দিয়েছিলেন।
- মানুষ গড়ার শিক্ষা (Man-Making Education): তিনি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন যা মানুষের চরিত্র গঠন করে, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের সাথে পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয় ঘটায়।
বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদ কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক আধিপত্যকামী তত্ত্ব ছিল না। এটি ছিল নিপীড়িত ও পশ্চাৎপদ জনগণের প্রতি অকুণ্ঠ ভালোবাসা এবং ত্যাগের মাধ্যমে বিশ্বমানবতার নৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণের এক আহ্বান।