Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি XI • Political Science • অধ্যায় 2
আনুমানিক সময়: ৪৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

রাষ্ট্র: সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ

রাষ্ট্র হলো মানব সভ্যতার সর্বোচ্চ, সার্বভৌম ও সর্বজনীন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ল্যাটিন শব্দ 'Status' এবং প্রাচীন গ্রিসের নগর-রাষ্ট্রের 'পলিস' ধারণা থেকে বিবর্তিত হয়ে আধুনিক রেনেসাঁ যুগে নিকোলো মেকিয়াভেলির রচনায় রাষ্ট্র শব্দটি প্রথম বিজ্ঞানসম্মত রাজনৈতিক রূপ লাভ করে। পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের (WBCHSE) একাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠ্যক্রমের দ্বিতীয় অধ্যায়ে রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক সংজ্ঞা, বিশেষত অধ্যাপক জে. ডব্লিউ. গার্নারের বিশ্বজনীন সংজ্ঞা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এখানে রাষ্ট্রের চারটি অবিচ্ছেদ্য মূল উপাদান—স্থায়ী জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক ভূখণ্ড, সুসংগঠিত সরকার এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব—নিখুঁতভাবে আলোচিত হয়েছে। পাশাপাশি সমাজ, সরকার, জাতি এবং অন্যান্য মানবীয় সংঘের সাথে রাষ্ট্রের সূক্ষ্ম কাঠামোগত ও আইনগত পার্থক্য এই অধ্যায়ে প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপিত হয়েছে।

অধ্যায়টির গুরুত্ব

রাষ্ট্রের স্বরূপ ও উপাদানসমূহের সঠিক উপলব্ধি একজন শিক্ষার্থীকে গণতন্ত্র, আইনগত আনুগত্য এবং নাগরিক অধিকারের বাস্তব তাৎপর্য অনুধাবন করতে সাহায্য করে। স্থায়ী রাষ্ট্র এবং সাময়িক সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নিরূপণের মাধ্যমেই নাগরিকেরা রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বাস্থ্যকর সীমারেখা অনুধাবন করতে পারে। উচ্চমাধ্যমিক একাদশ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা, সার্বভৌমত্বের দ্বৈত রূপ এবং রাষ্ট্র ও সরকারের তুলনামূলক পার্থক্যের ওপর ৮ নম্বরের বর্ণনামূলক প্রশ্ন এবং একাধিক বহুবিকল্পভিত্তিক (MCQ) প্রশ্ন প্রতি বছরই আসে। তাছাড়া আইনবিদ্যা (LLB/LLM), সংবিধান চর্চা এবং ডব্লিউবিসিএস (WBCS) ও ইউপিএসসি (UPSC) সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ের প্রস্তুতিতে এই অধ্যায়টি অপরিহার্য ভিত্তি স্থাপন করে।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. 'রাষ্ট্র' শব্দের উৎপত্তি, ব্যুৎপ...
2 ২. রাষ্ট্রের সংজ্ঞা: ভাববাদী, আইনগত...
3 ৩. রাষ্ট্রের চারটি অপরিহার্য উপাদান...
4 ৪. রাষ্ট্রের চারটি অপরিহার্য উপাদান...
5 ৫. রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য মানব সংগ...
6 ৬. আনুষঙ্গিক উপাদান (আন্তর্জাতিক স্...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. 'রাষ্ট্র' শব্দের উৎপত্তি, ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও ঐতিহাসিক বিবর্তন

ব্যুৎপত্তিগত উৎস ও ধ্রুপদী যুগের পরিভাষা

ইংরেজি 'State' শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ 'Status' থেকে। মধ্যযুগে রোমান আইনের অধীনে 'স্ট্যাটাস' বলতে কোনো ব্যক্তি বা সমষ্টির সামাজিক প্রতিপত্তি, মর্যাদা বা অধিকারের বিশেষ অবস্থাকে বোঝানো হতো। পরবর্তীকালে ল্যাটিন বাক্যাংশ 'status rei publicae' বলতে জনসাধারণের সামাজিক ও রাজনৈতিক সার্বিক শৃঙ্খলার অবস্থাকে নির্দেশ করা শুরু হয়, যা কালক্রমে সার্বভৌম রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে 'রাষ্ট্র' অর্থে রূপ পরিগ্রহ করে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বিভিন্ন সভ্যতায় রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝাতে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হতো:

  • প্রাচীন গ্রিস: গ্রিক দার্শনিকগণ রাষ্ট্র বোঝাতে ব্যবহার করতেন 'পলিস' (Polis) বা ক্ষুদ্র 'নগর-রাষ্ট্র' (City-State)। গ্রিকদের কাছে পলিস কেবল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল নাগরিকদের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সৎ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য ধর্মীয়-সামাজিক মিলনক্ষেত্র।
  • প্রাচীন রোম: রোমানরা ব্যবহার করত 'সিভিতাস' (Civitas - নাগরিক সমাজ) এবং 'রেস পাবলিকা' (Res Publica - সাধারণ সম্পত্তি বা কমনওয়েলথ)। রোমান চিন্তায় আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক অধিকারের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • মধ্যযুগীয় ইউরোপ: টিউটনীয় উপজাতি ও সামন্ত প্রভুরা ব্যবহার করতেন 'ল্যান্ড' (Land), 'রিলম' (Realm) বা 'কিংডম' (Kingdom)—যেখানে সার্বভৌম সার্বজনীন আধুনিক রাষ্ট্রের কোনো ধারণাই ছিল না।
নিকোলো মেকিয়াভেলি ও আধুনিক 'লো স্তাতো' (Lo Stato):

ইতালির রেনেসাঁস যুগের রাষ্ট্রদার্শনিক নিকোলো মেকিয়াভেলি (Niccolò Machiavelli) তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য প্রিন্স' (The Prince, ১৫১৩)-এর প্রথম লাইনেই আধুনিক অর্থে ইতালীয় শব্দ 'lo stato' (রাষ্ট্র) সর্বপ্রথম প্রয়োগ করেন। তিনি লিখেছিলেন—"মানবজাতি অতীতে এবং বর্তমানে যেসব সর্বময় কর্তৃত্বে বাস করেছে এবং করছে, সেগুলি হলো রাষ্ট্র; যা হয় প্রজাতন্ত্র, না হয় রাজতন্ত্র।" মেকিয়াভেলিই রাষ্ট্রকে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় ও নৈতিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে এক সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

২. রাষ্ট্রের সংজ্ঞা: ভাববাদী, আইনগত, মার্কসীয় এবং অধ্যাপক গার্নারের প্রামাণ্য তত্ত্ব

রাষ্ট্রের বিভিন্ন তাত্ত্বিক সংজ্ঞা

রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও লক্ষ্য নিয়ে যুগে যুগে দার্শনিক ও আইনবিদগণ বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রয়াস পেয়েছেন:

তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রধান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রদত্ত সংজ্ঞা ও মূল তাৎপর্য
১. প্রাচীন নীতিবাদী সংজ্ঞা অ্যারিস্টটল (Aristotle) "রাষ্ট্র হলো পরিবার ও গ্রামের এমন এক সম্মেলন যার উদ্দেশ্য হলো একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন যাপন—যার দ্বারা আমরা একটি সুখী ও সম্মানজনক জীবনকে বুঝি।"
২. চরম ভাববাদী সংজ্ঞা জি. ডব্লিউ. এফ. হেগেল (Hegel) "রাষ্ট্র হলো মর্তে ঈশ্বরের পদক্ষেপ" (The State is the march of God on earth)। রাষ্ট্র নিজেই পরম নৈতিক সত্তা ও উদ্দেশ্য, ব্যক্তি রাষ্ট্রের চরণে আত্মবিসর্জন দিতে বাধ্য।
৩. আইনগত সংজ্ঞা উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson) "কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে আইনের মাধ্যমে সংগঠিত জনসমাজকে রাষ্ট্র বলে।" (A people organized for law within a definite territory)।
৪. সমাজতাত্ত্বিক বহুত্ববাদী সংজ্ঞা হ্যারল্ড ল্যাস্কি / ম্যাকাইভার ল্যাস্কি: "রাষ্ট্র হলো একটি আঞ্চলিক জনসমাজ যা শাসক ও শাসিতে বিভক্ত এবং যা তার নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠানের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে।"
৫. মার্কসীয় শ্রেণি সংজ্ঞা কার্ল মার্কস / ভি. আই. লেনিন রাষ্ট্র হলো সংখ্যালঘু পুঁজিপতি শোষক শ্রেণি কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক শ্রেণিকে দাবিয়ে রাখার একটি সুসংগঠিত বলপ্রয়োগকারী শ্রেণিযন্ত্র।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সর্বাধিক প্রামাণ্য সংজ্ঞা: অধ্যাপক জে. ডব্লিউ. গার্নার

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক জেমস উইলফোর্ড গার্নার (J.W. Garner)-এর 'Political Science and Government' গ্রন্থে প্রদত্ত সংজ্ঞাটিকে সর্বাধিক নিখুঁত, সর্বাঙ্গীন ও বিজ্ঞানসম্মত বলে গণ্য করা হয়:

অধ্যাপক গার্নারের ঐতিহাসিক সংজ্ঞা:

"রাষ্ট্র হলো বহুসংখ্যক ব্যক্তিবর্গের এমন এক জনসমাজ (Population), যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করে (Territory), যা বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ বা প্রায় মুক্ত (External Sovereignty) এবং যার একটি সুসংগঠিত সরকার আছে (Government), যাঁর প্রতি অধিকাংশ অধিবাসী স্বভাববশত আনুগত্য প্রদর্শন করে (Internal Sovereignty)।"

গার্নারের এই যুগান্তকারী সংজ্ঞার মধ্যেই রাষ্ট্রের চারটি অপরিহার্য মৌল উপাদান এক সূত্রে গ্রথিত রয়েছে।

৩. রাষ্ট্রের চারটি অপরিহার্য উপাদান: ১. জনসংখ্যা ও ২. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড

রাষ্ট্রের ভৌগোলিক ও মানবীয় ভিত্তি

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুসারে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনকে 'রাষ্ট্র' হতে গেলে চারটি উপাদান একসঙ্গে থাকা বাধ্যতামূলক। এর একটিও অনুপস্থিত থাকলে রাষ্ট্র গঠন অসম্ভব।

১. জনসংখ্যা (Population) — রাষ্ট্রের মানবীয় উপাদান

রাষ্ট্র মূলত মানুষেরই সংগঠন। মানুষবিহীন কোনো ভূখণ্ড, তা যত বড় বা সম্পদশালীই হোক না কেন, কখনোই রাষ্ট্র হতে পারে না। তবে রাষ্ট্রের জনসংখ্যা কত হওয়া উচিত, তা নিয়ে বিভিন্ন যুগে তাত্ত্বিকদের মধ্যে বিতর্ক চলেছে:

  • প্লেটো (Plato): তাঁর 'লজ' (The Laws) গ্রন্থে একটি আদর্শ রাষ্ট্রের জনসংখ্যা নির্দিষ্ট করেছিলেন ঠিক ৫০৪০ জন। কারণ এই সংখ্যাটি ১ থেকে ১০ পর্যন্ত সমস্ত পূর্ণসংখ্যা দ্বারা বিভাজ্য, যা প্রশাসনিক বণ্টনে সুবিধা দেয়।
  • অ্যারিস্টটল (Aristotle): কোনো গাণিতিক সংখ্যা নির্ধারণ না করে তিনি বলেন—জনসংখ্যা "খুব বেশিও হওয়া উচিত নয়, আবার খুব কমও হওয়া উচিত নয়।" জনসংখ্যা এমন হওয়া প্রয়োজন যাতে রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও প্রতিরক্ষায় সক্ষম হয়, আবার সুশাসনের স্বার্থে নাগরিকেরা পরস্পরের পরিচিত হতে পারে।
  • জাঁ জাক রুশো (Rousseau): তাঁর 'সামাজিক চুক্তি' গ্রন্থে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের উপযোগী আদর্শ জনসংখ্যা বলেছিলেন ১০,০০০ জন।
  • আধুনিক বাস্তব রূপ: আধুনিক যুগে জনসংখ্যার কোনো নির্দিষ্ট ঊর্ধ্বসীমা বা নিম্নসীমা নেই। ভ্যাটিকান সিটির জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ জন, নাউরুর ১২,০০০ জন, মোনাকোর ৩৮,০০০ জন; অপরদিকে ভারত ও চীনের জনসংখ্যা ১৪০ কোটিরও অধিক। আধুনিককালে জনসংখ্যা রাষ্ট্রের উৎপাদন ও প্রতিরক্ষার এক বিরাট শক্তি।
  • জনসংখ্যার রূপভেদ: রাষ্ট্রের জনসংখ্যার মধ্যে থাকেন: (ক) নাগরিক (যাঁরা রাষ্ট্রপ্রদত্ত সমস্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করেন এবং আনুগত্য প্রদর্শন করেন); (খ) বিদেশি (যাঁরা সামাজিক অধিকার পেলেও ভোটাধিকার পান না); এবং (গ) উদ্বাস্তু ও রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি।
২. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড (Territory) — রাষ্ট্রের ভৌগোলিক উপাদান

স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক ক্ষেত্র বা ভূখণ্ড রাষ্ট্রের দ্বিতীয় অপরিহার্য শর্ত। যাযাবর জাতি বা জিপসিরা জনসংখ্যা ও নেতা থাকলেও নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের অভাবে রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ইহুদিদের স্বজাত্যবোধ থাকলেও নিজস্ব ভূখণ্ড না থাকায় তারা রাষ্ট্র ছিল না (১৯৪৮ সালে ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তা সম্ভব হয়)।

রাষ্ট্রের সার্বভৌম ভূখণ্ড কেবল মাটির উপরিভাগ নয়; এটি একটি ত্রিমাত্রিক ভৌগোলিক বিস্তার:

  • ক. স্থলভাগ ও ভূগর্ভ: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের ভেতরের সমগ্র সমভূমি, পাহাড়, বনভূমি এবং মাটির নিচে কেন্দ্র পর্যন্ত সমস্ত খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ।
  • খ. রাষ্ট্রীয় জলসীমা (Territorial Waters): অভ্যন্তরীণ নদ-নদী, হ্রদ, খাড়ি ছাড়াও উপকূলবর্তী সমুদ্র। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (UNCLOS, ১৯৮২) অনুসারে উপকূলরেখা থেকে সমুদ্রের দিকে ১২ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২২.২ কিমি) পর্যন্ত উপকূলবর্তী রাষ্ট্রের পূর্ণ সার্বভৌম জলসীমা হিসেবে গণ্য হয়। এর বাইরে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত থাকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ)।
  • গ. আকাশসীমা (Airspace): স্থলভাগ ও রাষ্ট্রীয় জলসীমার ঠিক উপরিভাগের সমগ্র বায়ুমণ্ডল রাষ্ট্রের একচেটিয়া সার্বভৌম আকাশসীমা (১৯৪৪ সালের শিকাগো সনদ অনুযায়ী)। অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশি বিমান এই আকাশসীমায় প্রবেশ করতে পারে না।
  • আয়তন: ভূখণ্ডের আয়তন কত হবে তার কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। ভ্যাটিকান সিটি (০.৪৯ বর্গকিমি) বা মোনাকোর (২.০২ বর্গকিমি) মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্র যেমন রয়েছে, তেমনই রাশিয়া (১ কোটি ৭১ লক্ষ বর্গকিমি), কানাডা ও ভারতের (৩২ লক্ষ ৮৭ হাজার বর্গকিমি) মতো বিশাল আয়তনের রাষ্ট্রও রয়েছে।

৪. রাষ্ট্রের চারটি অপরিহার্য উপাদান: ৩. সরকার ও ৪. সার্বভৌমত্ব

রাষ্ট্রের পরিচালন কাঠামো ও প্রাণভোমরা
৩. সরকার (Government) — রাষ্ট্রের কার্যনির্বাহী মাধ্যম

জনসংখ্যা ও ভূখণ্ড থাকলেও সমাজকে নিয়ন্ত্রণের সুসংগঠিত কর্তৃপক্ষ না থাকলে সেখানে অরাজকতা (মৎস্যন্যায়) দেখা দেয়। সরকার হলো রাষ্ট্রের বাস্তব মুখপাত্র ও কার্যনির্বাহী সংস্থা, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সামগ্রিক ইচ্ছা রূপায়িত ও কার্যকর হয়। রাষ্ট্র যদি বিমূর্ত দেহ হয়, সরকার হলো তার কর্মক্ষম মস্তিষ্ক।

  • সরকারের তিনটি মূল অঙ্গ:
    1. আইন বিভাগ (Legislature): আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করে।
    2. শাসন বিভাগ (Executive): আইন কার্যকর করে এবং দেশ শাসন পরিচালনা করে।
    3. বিচার বিভাগ (Judiciary): সংবিধান ও আইনের ব্যাখ্যা দেয় এবং অপরাধীদের দণ্ড প্রদান করে।
  • সরকারের রূপভেদ: রাষ্ট্র গঠনের জন্য সরকার থাকা বাধ্যতামূলক, তবে সরকারের রূপ কী হবে (গণতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক, একনায়কতন্ত্রী, সংসদীয় বা রাষ্ট্রপতিশাসিত) তা নির্দিষ্ট নয়। মূল কথা হলো সরকারকে কার্যকর ও জনসমর্থনপুষ্ট হতে হবে।
৪. সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) — রাষ্ট্রের প্রাণভোমরা ও চরম বৈশিষ্ট্য

সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, কেন্দ্রীয় ও অনন্য উপাদান। এটি সেই চরম, চূড়ান্ত ও অবিভাজ্য ক্ষমতা যা রাষ্ট্রকে মানব সমাজের অন্যান্য সমস্ত সংঘ ও প্রতিষ্ঠান থেকে পৃথক করে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসায়। ফরাসি দার্শনিক জাঁ বোঁদা (Jean Bodin) ১৫৭৬ সালে তাঁর 'সিক্স বুকস অফ দ্য কমনওয়েলথ' গ্রন্থে সর্বপ্রথম আধুনিক সার্বভৌমত্বের তত্ত্ব প্রদান করেন।

সার্বভৌমত্বের দুটি অপরিহার্য রূপ
সার্বভৌমত্বের রূপ সংজ্ঞা ও ক্ষমতা বাস্তব প্রয়োগ
ক. অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব (Internal Sovereignty) দেশের সীমানার মধ্যে অবস্থিত সমস্ত ব্যক্তি, নাগরিক, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় সংস্থা ও ক্লাবের ওপর রাষ্ট্রের চরম, চূড়ান্ত ও অপ্রতিহত আদেশদানের ক্ষমতা। ম্যাক্স ওয়েবারের মতে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের একচেটিয়া বৈধ অধিকার রাষ্ট্রেরই আছে। কোনো নাগরিক বা সমিতি রাষ্ট্রের আইন অমান্য করলে রাষ্ট্র তাকে কারাদণ্ড বা শাস্তি দিতে পারে।
খ. বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব (External Sovereignty) বিদেশি শক্তির আধিপত্য, নিয়ন্ত্রণ, হুকুম ও হস্তক্ষেপ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা বা জাতীয় স্বাধীনতা। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ, আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন এবং জাতিসংঘ সনদের ২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিশ্বের যেকোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে সমমর্যাদা ভোগ করা। ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টের পূর্বে ভারত পরাধীন ছিল বলেই রাষ্ট্র ছিল না।

৫. রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য মানব সংগঠনের তুলনামূলক পার্থক্য

রাষ্ট্র বনাম সমাজ, সরকার, জাতি ও অন্যান্য সংঘ

দৈনন্দিন আলোচনায় অনেকে রাষ্ট্র, সরকার, সমাজ ও জাতিকে একাকার করে ফেলেন। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এদের প্রাতিষ্ঠানিক সীমানা সম্পূর্ণ পৃথক:

১. রাষ্ট্র বনাম সমাজ (State vs Society)
  • প্রাচীনত্ব: সমাজ রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক প্রাচীন। রাষ্ট্র সৃষ্টির হাজার হাজার বছর আগে থেকেই আদিম মানুষ পরিবার ও সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করত।
  • পরিধি: সমাজের পরিধি বিশাল—মানুষের অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, পারিবারিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক জীবনের সমস্ত সম্পর্ক নিয়ে সমাজ গঠিত। রাষ্ট্র হলো সমাজের ভেতরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার একটি বিশেষায়িত রাজনৈতিক সংগঠন মাত্র।
  • বলপ্রয়োগের ক্ষমতা: সমাজ নীতিবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক বয়কটের মাধ্যমে নিয়ম বজায় রাখে, কিন্তু বলপ্রয়োগ করতে পারে না। রাষ্ট্রের পেছনে সার্বভৌম আইনের বলপ্রয়োগের ক্ষমতা ও পুলিশ-প্রশাসন থাকে।
  • ভূখণ্ড: সমাজের জন্য নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বাধ্যতামূলক নয় (যেমন বিশ্ব মুসলিম বা হিন্দু সমাজ); কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য নির্দিষ্ট ভূখণ্ড অপরিহার্য।
২. রাষ্ট্র বনাম সরকার (State vs Government)
  • মূল সত্তা বনাম প্রতিনিধি: রাষ্ট্র হলো মূল প্রভু বা মূল রাজনৈতিক সত্তা; সরকার হলো রাষ্ট্রের একজন ক্ষণস্থায়ী কার্যনির্বাহী প্রতিনিধি বা ট্রাস্টি।
  • স্থায়িত্ব: রাষ্ট্র চিরস্থায়ী ও অবিচল (ভারত রাষ্ট্র স্থায়ী); কিন্তু সরকার পরিবর্তনশীল (নির্বাচন বা অনাস্থার মাধ্যমে সরকার প্রতিনিয়ত বদলে যায়)।
  • সদস্যপদ: দেশের সমস্ত নাগরিক রাষ্ট্রের সদস্য; কিন্তু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও সরকারি আমলারা কেবল সরকারের সদস্য।
  • বিরোধিতা: রাষ্ট্রের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা বা ধ্বংস কামনা করা রাষ্ট্রদ্রোহিতা (Treason); কিন্তু গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকারের নীতির সমালোচনা করা ও নির্বাচনে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা নাগরিকের বৈধ অধিকার।
৩. রাষ্ট্র বনাম জাতি (State vs Nation)
  • ধারণাগত পার্থক্য: জাতি হলো একটি মনস্তাত্ত্বিক, আত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের অনুভূতি (একই ভাষা, ধর্ম বা ঐতিহ্যভিত্তিক জনসমাজ); আর রাষ্ট্র হলো একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও সার্বভৌম রাজনৈতিক কাঠামো।
  • রাষ্ট্রহীন জাতি: রাষ্ট্র ছাড়াও জাতি টিকে থাকতে পারে। যেমন—১৯৪৮ সালে ইজরায়েল সৃষ্টির আগে ইহুদি জাতি প্রায় দু'হাজার বছর ধরে রাষ্ট্রহীন ছিল; বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৩ কোটি কুর্দি জনগণের জাতিসত্তা থাকলেও কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র নেই।
  • বহুজাতিক রাষ্ট্র: একটি রাষ্ট্রের মধ্যে একাধিক জাতি থাকতে পারে (যেমন যুক্তরাজ্যে ইংরেজ, স্কটিশ, আইরিশ ও ওয়েলশ জাতি; কিংবা ভারতে বহুভাষিক জনগোষ্ঠীর সমাবেশ)। যখন জাতি ও রাষ্ট্রের সীমান্ত মিলে যায়, তখন জন্ম নেয় জাতি-রাষ্ট্র (Nation-State)।
৪. রাষ্ট্র বনাম সমিতি বা সংঘ (State vs Associations)
  • সদস্যপদ: রাষ্ট্রের সদস্যপদ বাধ্যতামূলক (জন্মসূত্রে মানুষ কোনো না কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক হয়); কিন্তু কোনো ক্লাব, ট্রেড ইউনিয়ন বা সমিতির সদস্যপদ সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক।
  • সংখ্যা: একজন মানুষ একই সাথে বহু সমিতির সদস্য হতে পারে, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে একই সাথে কেবল একটি রাষ্ট্রেরই নাগরিক হতে পারে।
  • দণ্ডদান: কোনো সমিতি অমান্যকারী সদস্যকে বড়জোর বহিষ্কার করতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্র নাগরিকের জীবন ও স্বাধীনতার ওপর বলপ্রয়োগ করতে পারে।

৬. আনুষঙ্গিক উপাদান (আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি) ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার কৌশল

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কি রাষ্ট্রের পঞ্চম উপাদান?

আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো—আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি (International Recognition) কি রাষ্ট্রের একটি অপরিহার্য উপাদান? এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনবিদদের মধ্যে দুটি মতবাদ প্রচলিত:

তত্ত্ব প্রধান প্রবক্তাগণ মূল বক্তব্য
১. গঠনমূলক মতবাদ (Constitutive Theory) হেগেল, ওপেনহাইম, অ্যানজিলোত্তি চারটি উপাদান থাকলেই রাষ্ট্র হওয়া যায় না; বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ স্বীকৃতি দিলেই একটি নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি বা গঠন সম্পন্ন হয়।
২. ঘোষণামূলক মতবাদ (Declaratory Theory) হল, ব্রায়ারলি, মন্টেভিডিও কনভেনশন (১৯৩৩) চারটি উপাদান উপস্থিত থাকলে বস্তুগতভাবে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কায়েম হয়ে যায়। স্বীকৃতি নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করে না, কেবল বিদ্যমান সত্যকে ঘোষণা করে।
একাদশ শ্রেণি পরীক্ষায় পূর্ণমান অর্জনের কৌশল
  • গার্নারের সংজ্ঞা উদ্ধৃতি: রাষ্ট্রের সংজ্ঞা সংক্রান্ত প্রশ্নে শুরুতেই অধ্যাপক গার্নারের সংজ্ঞা হুবহু উদ্ধৃত করবে।
  • চারটি উপাদানের সমানুপাতিক বর্ণনা: জনসংখ্যা, ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব—চারটি উপাদানকে পৃথক উপশিরোনামে লিখবে। সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভাজন দেখাতে ভুলবে না।
  • ছকের ব্যবহার: রাষ্ট্র ও সরকারের পার্থক্য অথবা রাষ্ট্র ও সমাজের পার্থক্য লেখার সময় অনুচ্ছেদের বদলে ছক আকারে তুলনামূলক ভিত্তি উল্লেখ করে লিখলে সর্বোচ্চ নম্বর নিশ্চিত হয়।

গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ধারা, রাজনৈতিক তত্ত্ব ও সূত্র

অধ্যাপক গার্নারের রাষ্ট্র গঠনের মূল সূত্র
রাষ্ট্র = [১. জনসংখ্যা] + [২. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড] + [৩. সুসংগঠিত সরকার] + [৪. সার্বভৌমত্ব]
সার্বভৌমত্বের দ্বিমুখী রূপের সূত্র (জাঁ বোঁদা ও জন অস্টিন)
সার্বভৌমত্ব = অভ্যন্তরীণ সর্বময় কর্তৃত্ব (আইনগত একচেটিয়া বলপ্রয়োগ) + বাহ্যিক স্বাধীনতা (বিদেশি নিয়ন্ত্রণহীনতা)
রাষ্ট্রের ত্রিমাত্রিক ভূখণ্ড সূত্র
ভূখণ্ড = স্থলভাগ ও ভূগর্ভস্থ সম্পদ + রাষ্ট্রীয় জলসীমা (১২ নটিক্যাল মাইল) + উপরিভাগের আকাশসীমা
রাষ্ট্র বনাম সরকার সূত্র
রাষ্ট্র (প্রভু + স্থায়ী + সার্বভৌম + সমগ্র নাগরিক) ➔ সরকার (এজেন্ট + ক্ষণস্থায়ী + অর্পিত ক্ষমতা + কয়েকজন প্রতিনিধি)

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দাও। রাষ্ট্রের চারটি অপরিহার্য উপাদান বিশদভাবে আলোচনা করো। (মান: ৮)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর:
১. রাষ্ট্রের সংজ্ঞা: রাষ্ট্র হলো মানব সমাজের সর্বোচ্চ এবং সার্বভৌম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক জে. ডব্লিউ. গার্নার (J.W. Garner)-এর সংজ্ঞাটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সর্বাধিক প্রামাণ্য ও নিখুঁত:
"রাষ্ট্র হলো বহুসংখ্যক ব্যক্তিবর্গের এমন এক জনসমাজ, যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, যা বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ বা প্রায় মুক্ত এবং যার একটি সুসংগঠিত সরকার আছে, যাঁর প্রতি অধিকাংশ অধিবাসী স্বভাববশত আনুগত্য প্রদর্শন করে।"

২. রাষ্ট্রের চারটি অপরিহার্য উপাদান: রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ একমত যে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনকে রাষ্ট্র হতে গেলে নিম্নলিখিত চারটি উপাদান আবশ্যিকভাবে থাকতে হবে:

I. জনসংখ্যা (Population):
  • মানুষ ছাড়া রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। রাষ্ট্র মূলত একটি মানবীয় প্রতিষ্ঠান।
  • আদর্শ সংখ্যা: প্লেটো আদর্শ রাষ্ট্রের নাগরিক সংখ্যা বলেছিলেন ৫০৪০ জন, রুশো বলেছিলেন ১০,০০০ জন। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন জনসংখ্যা এমন হওয়া উচিত যা স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে আবার সুশাসনের পক্ষে উপযোগী হবে।
  • আধুনিক পরিস্থিতি: বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট জনসংখ্যা বাধ্যতামুলক নয়। ভ্যাটিকান সিটির জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ জন, আর ভারতের জনসংখ্যা ১৪০ কোটিরও বেশি। আধুনিক রাষ্ট্রে দক্ষ জনশক্তি উৎপাদন ও প্রতিরক্ষার এক মহা শক্তি।

II. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড (Territory):
  • রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত ভূখণ্ড অপরিহার্য। যাযাবরদের কোনো রাষ্ট্র হতে পারে না।
  • ত্রিমাত্রিক বিস্তার: ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত হলো: (ক) স্থলভাগ ও ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদ; (খ) রাষ্ট্রীয় জলসীমা (নদী, হ্রদ এবং উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সমুদ্রসীমা); এবং (গ) স্থল ও জলভাগের উপরিভাগের সমগ্র আকাশসীমা।
  • আয়তনের কোনো সীমা নেই; মোনাকোর মতো ক্ষুদ্র দেশও রাষ্ট্র, আবার রাশিয়ার মতো বিশাল দেশও রাষ্ট্র।

III. সরকার (Government):
  • সরকার হলো রাষ্ট্রের বাস্তব কার্যনির্বাহী মাধ্যম। সরকার ছাড়া রাষ্ট্র এক বিশৃঙ্খল অরাজক জনতার স্তূপে পরিণত হয়।
  • আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মাধ্যমে সরকার রাষ্ট্রের ইচ্ছাকে বিধিবদ্ধ ও কার্যকর করে।
  • সরকারের রূপ গণতান্ত্রিক, সংসদীয় বা অন্য যা-ই হোক না কেন, অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষা ও শাসন পরিচালনার কার্যকর ক্ষমতা সরকারের থাকতে হবে।

IV. সার্বভৌমত্ব (Sovereignty):
  • সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের প্রাণভোমরা ও সর্বোচ্চ চরম ক্ষমতা, যা রাষ্ট্রকে অন্যান্য সমস্ত সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে পৃথক ও শ্রেষ্ঠ করে। জাঁ বোঁদা ১৫৭৬ সালে এর আধুনিক তত্ত্ব দেন।
  • অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব: দেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরের সমস্ত ব্যক্তি ও সংগঠনের ওপর চরম ও চূড়ান্ত আইনগত আদেশদানের ক্ষমতা।
  • বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব: বিদেশি কোনো শক্তির নিয়ন্ত্রণ বা অধীনতা থেকে পূর্ণ জাতীয় স্বাধীনতা ও সমমর্যাদা ভোগ।

উপসংহার: এই চারটি উপাদানের যেকোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না। যেমন ১৯৪৭ সালের পূর্বে বিপুল জনসংখ্যা, ভূখণ্ড ও সরকার থাকা সত্ত্বেও সার্বভৌমত্ব না থাকায় ভারত রাষ্ট্র ছিল না, ছিল একটি ব্রিটিশ উপনিবেশ।
উদাহরণ 2
রাষ্ট্রের উপাদানগুলির মধ্যে কোন্টি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন? সার্বভৌমত্বের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রূপ আলোচনা করো। (মান: ৮)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর:
১. সার্বভৌমত্বই সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান: রাষ্ট্রের চারটি উপাদানের (জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব) মধ্যে সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) হলো সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, মৌলিক ও অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।
  • অন্যান্য উপাদানগুলি (যেমন জনসংখ্যা, ভূখণ্ড ও সরকার) কোনো পরাধীন দেশ বা প্রদেশের মধ্যেও থাকতে পারে, কিন্তু সার্বভৌমত্ব ছাড়া তাকে কখনো 'রাষ্ট্র' বলা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৪৭ সালের পূর্বে ভারতের বিশাল জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট মানচিত্র ও ব্রিটিশ সরকার ছিল, কিন্তু সার্বভৌমত্ব ব্রিটেনের পার্লামেন্টের হাতে থাকার কারণে ভারত রাষ্ট্র হতে পারেনি।
  • সমাজ, ক্লাব, পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক সংস্থার মতো অন্যান্য মানব সংগঠনের জনসংখ্যা ও পরিচালনা সমিতি থাকে, কিন্তু সার্বভৌম বলপ্রয়োগকারী ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রেরই থাকে। তাই সার্বভৌমত্বই রাষ্ট্রের অনন্য প্রাণশক্তি।

২. সার্বভৌমত্বের উৎপত্তি ও সংজ্ঞা: ল্যাটিন শব্দ 'Superanus' (অর্থ সর্বোচ্চ) থেকে উৎপন্ন সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের চরম, অবিভাজ্য ও চিরন্তন ক্ষমতা। ফরাসি দার্শনিক জাঁ বোঁদা (১৫৭৬) একে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন: "নাগরিক ও প্রজাবর্গের ওপর আইনের দ্বারা অনিয়ন্ত্রিত সর্বোচ্চ ক্ষমতা।"

৩. সার্বভৌমত্বের দ্বৈত রূপ:
ক. অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব (Internal Sovereignty):
  • সংজ্ঞা: রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার অভ্যন্তরে বসবাসকারী সমস্ত ব্যক্তি, নাগরিক, পরিবার, ধর্মীয় গোষ্ঠী, বণিক সভা ও রাজনৈতিক দলের ওপর রাষ্ট্রের চরম, সর্বময় ও অপ্রতিহত আদেশদানের অধিকারকে অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব বলে।
  • বৈশিষ্ট্যসমূহ:
    1. রাষ্ট্রের আদেশই আইন; কোনো সামাজিক ক্লাবের নিয়ম রাষ্ট্রের আইনের পরিপন্থী হতে পারে না।
    2. সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের মতে, রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে শারীরিক বলপ্রয়োগের বৈধ একচেটিয়া অধিকার কেবল রাষ্ট্রেরই রয়েছে।
    3. আইন অমান্যকারীকে বিচার করে কারাদণ্ড, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা কেবল অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের মাধ্যমেই রাষ্ট্র ভোগ করে।

খ. বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব (External Sovereignty):
  • সংজ্ঞা: কোনো বিদেশি শক্তি, পরাশক্তি বা বহির্দেশীয় কর্তৃত্বের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, হুকুমদারি ও অধীনতা থেকে রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ মুক্তি ও জাতীয় স্বাধীনতাকে বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব বলে।
  • বৈশিষ্ট্যসমূহ:
    1. রাষ্ট্র সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ, অন্য রাষ্ট্রের সাথে মৈত্রী বা শান্তি স্থাপন এবং যুদ্ধ ঘোষণার অধিকার ভোগ করে।
    2. জাতিসংঘ সনদের ২(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে আন্তর্জাতিক আইনের চোখে প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্র সমান মর্যাদা (Sovereign Equality) লাভ করে।

উপসংহার: অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব একে অপরের পরিপূরক। অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে দেশের ভেতরের শান্তি ও আইনশৃঙ্খলা, আর বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও অস্তিত্ব।
উদাহরণ 3
রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে মূল পার্থক্যগুলি আলোচনা করো। (মান: ৮)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর: দৈনন্দিন আলোচনায় বা সংবাদমাধ্যমে অনেক সময় রাষ্ট্র ও সরকারকে সমার্থক মনে করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এদের মধ্যে গভীর ও সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান:

রাষ্ট্র ও সরকারের তুলনামূলক ছক:
পার্থক্যের ভিত্তি রাষ্ট্র (The State) সরকার (The Government)
১. স্বরূপগত প্রকৃতি রাষ্ট্র হলো একটি বিমূর্ত, অদৃশ্য ও ধারণাভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। সরকার হলো রাষ্ট্রের দৃশ্যমান, বাস্তব ও মূর্ত কার্যনির্বাহী সংস্থা।
২. প্রভু বনাম ভৃত্য সম্পর্ক রাষ্ট্র হলো মূল প্রভু (Principal); সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত আধার। সরকার হলো রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বা এজেন্ট (Agent); রাষ্ট্রের প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগকারী।
৩. স্থায়িত্ব রাষ্ট্র চিরস্থায়ী। সরকার পরিবর্তন হলেও ভারত রাষ্ট্রের কোনো পরিবর্তন হয় না। সরকার অস্থায়ী। নির্বাচন, অনাস্থা বা পদত্যাগের মাধ্যমে সরকার প্রতি পাঁচ বছর পর পর বদলে যায়।
৪. সদস্যপদ দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা সমগ্র জনগণ জন্মসূত্রে রাষ্ট্রের সদস্য বা নাগরিক। কেবলমাত্র নির্বাচিত মন্ত্রী, সাংসদ এবং সরকারি কর্মচারীদের নিয়ে সরকার গঠিত।
৫. সার্বভৌমত্ব সার্বভৌমত্ব কেবল রাষ্ট্রেরই নিজস্ব অবিভাজ্য সম্পদ। সরকারের কোনো সার্বভৌমত্ব নেই; এটি সংবিধানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ অর্পিত ক্ষমতা চর্চা করে।
৬. বিরোধিতার অধিকার রাষ্ট্রের অস্তিত্বের বিরোধিতা করা মারাত্মক অপরাধ বা রাষ্ট্রদ্রোহিতা (Treason)। গণতন্ত্রে সরকারের ত্রুটিপূর্ণ নীতি ও কার্যকলাপের সমালোচনা করা নাগরিকের পবিত্র মৌলিক অধিকার।

উপসংহার: সরকার হলো সেই কলকব্জা যার মাধ্যমে রাষ্ট্র কাজ করে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী প্রায়শই নিজেদের সরকারের সাথে রাষ্ট্রকে মিলিয়ে ফেলে অহংকার করে (যেমন চতুর্দশ লুইয়ের উক্তি: "আমিই রাষ্ট্র")। সুস্থ গণতন্ত্রে এই দুইয়ের পার্থক্য অক্ষুণ্ণ রাখা অপরিহার্য।
উদাহরণ 4
রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে পার্থক্যগুলি নির্দেশ করো। (মান: ৮)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর: মানুষ একই সঙ্গে সমাজে বাস করে এবং রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পালন করে। তবে সমাজবিজ্ঞানে রাষ্ট্র ও সমাজের পার্থক্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট:

১. সময়ের প্রাচীনত্ব: সমাজ রাষ্ট্রের তুলনায় বহু সহস্রাব্দ প্রাচীন। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার হাজার হাজার বছর আগে প্রাগৈতিহাসিক মানুষ গোত্র, পরিবার ও সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করত। রাষ্ট্র হলো মানব সভ্যতার অগ্রগতির একটি অপেক্ষাকৃত পরবর্তী রাজনৈতিক আবিষ্কার।

2. পরিধির ব্যাপ্তি:
  • সমাজ: মানবজীবনের সামগ্রিক সম্পর্কের জাল নিয়ে সমাজ বিস্তৃত—পারিবারিক বন্ধন, ধর্মীয় আচার, অর্থনৈতিক লেনদেন, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ক্রীড়া ইত্যাদি সবকিছুই সমাজের অঙ্গ।
  • রাষ্ট্র: সমাজের অভ্যন্তরে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও বহিঃশত্রুর হাত থেকে প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে গঠিত একটি বিশেষায়িত রাজনৈতিক সংগঠন। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভারের ভাষায়: রাষ্ট্র হলো "সমাজের ভেতরের একটি সংগঠন" (an association within society)।

৩. নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ও বলপ্রয়োগ:
  • সমাজ: সামাজিক অনুশাসন, নীতিবোধ, লোকলজ্জা এবং ধর্মীয় অনুভূতির মাধ্যমে আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। সমাজ কাউকে জেলে পাঠাতে পারে না, চরম শাস্তি হিসেবে সামাজিকভাবে একঘরে করতে পারে।
  • রাষ্ট্র: রাষ্ট্র লিখিত আইনের মাধ্যমে নাগরিকদের শাসন করে এবং আইন অমান্যকারীকে পুলিশ, কারাগার ও বিচারালয়ের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়ার আইনি সার্বভৌম বলপ্রয়োগের অধিকারী।

৪. ভূখণ্ডের বাধ্যবাধকতা: রাষ্ট্রের জন্য সুনির্দিষ্ট চিহ্নিত ভৌগোলিক এলাকা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সমাজের জন্য কোনো ভূখণ্ডের সীমানা লাগে না—যেমন বাঙালি সমাজ, মুসলিম সমাজ বা খ্রিস্টান সমাজ ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে রয়েছে।

৫. সদস্যপদ: রাষ্ট্রের সদস্যপদ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। সমাজে একজন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো সাহিত্য সভা বা ক্লাবে যোগ দিতে বা নাও দিতে পারে।

উপসংহার: রাষ্ট্র ও সমাজকে এক করে দেখার প্রবণতাই ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়—যেখানে রাষ্ট্র সমাজের সংস্কৃতি, ধর্ম ও পারিবারিক জীবনে অন্যায় হস্তক্ষেপ করে স্বৈরাচার কায়েম করে।
উদাহরণ 5
রাষ্ট্র ও জাতির মধ্যে পার্থক্য কী? কোনো জাতি কি রাষ্ট্র ছাড়া টিকে থাকতে পারে? (মান: ৮)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর:
১. রাষ্ট্র ও জাতির ধারণাগত পার্থক্য:
তুলনামূলক দিক রাষ্ট্র (State) জাতি (Nation)
মূল প্রকৃতি আইনি, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার সংগঠন। একটি আত্মিক, মানসিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অনুভূতি।
উপাদানসমূহ জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব। একই ভাষা, ঐতিহ্য, সুখ-দুঃখের স্মৃতি ও জাতীয় চেতনা।
সার্বভৌমত্ব সার্বভৌম ক্ষমতা রাষ্ট্রের প্রাণ; সার্বভৌমত্ব ছাড়া রাষ্ট্র হয় না। জাতির নিজস্ব কোনো সার্বভৌম আইনি ক্ষমতা থাকে না।

২. কোনো জাতি কি রাষ্ট্র ছাড়া টিকে থাকতে পারে? হ্যাঁ, রাষ্ট্র ছাড়াও কোনো একটি জাতি দীর্ঘকাল অত্যন্ত সগৌরবে টিকে থাকতে পারে।
  • ইহুদি জাতির ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা জেরুজালেম ধ্বংস করার পর ইহুদি জাতি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে (Diaspora)। নিজস্ব ভূখণ্ড, সরকার বা রাষ্ট্র না থাকা সত্ত্বেও তারা তাদের ধর্ম, ঐতিহ্য ও জাতীয় চেতনা অক্ষুণ্ণ রেখে প্রায় দু'হাজার বছর ধরে ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে টিকে ছিল এবং অবশেষে ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল রাষ্ট্র গঠন করে।
  • পোলিশ জাতির ইতিহাস: অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে রাশিয়া, প্রুশিয়া ও অস্ট্রিয়া পোল্যান্ডকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলে ইউরোপের মানচিত্র থেকে পোল্যান্ড রাষ্ট্র মুছে যায়। কিন্তু পোলিশ জাতি তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির জোরে বেঁচে থাকে এবং ১৯১৮ সালে পুনরায় স্বাধীন রাষ্ট্র লাভ করে।
  • বর্তমান কুর্দি জাতি: মধ্যপ্রাচ্যের তুরস্ক, ইরাক, ইরান ও সিরিয়ায় প্রায় ৩ কোটি কুর্দি জনগোষ্ঠী বসবাস করছে। তাদের নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক সত্তা রয়েছে, কিন্তু কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র নেই।

৩. বহুজাতিক রাষ্ট্র ও জাতি-রাষ্ট্র: একই রাষ্ট্রে বহু জাতির বাস থাকতে পারে (যেমন যুক্তরাজ্যে ইংরেজ, স্কটিশ ও ওয়েলশ জাতি; কিংবা বহুজাতিক ভারত)। আর যখন কোনো একটি একক জাতির সাথে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সীমানা একাত্ম হয়ে যায়, তাকে বলে জাতি-রাষ্ট্র (Nation-State)।
উদাহরণ 6
রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ভূখণ্ডের গুরুত্ব এবং এর ত্রিমাত্রিক পরিধি ব্যাখ্যা করো। (মান: ৮)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর:
১. ভূখণ্ডের অপরিহার্যতা: নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভূখণ্ড ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্রে মানুষের রাজনৈতিক সংগঠন অসম্ভব। স্যার জন সিলি বা দেগুইতের মতো কোনো কোনো সমাজতাত্ত্বিক একে গৌণ বললেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সর্বসম্মত মত হলো—ভূখণ্ড একটি অমোঘ অপরিহার্য উপাদান। যাযাবর জাতি বা ভবঘুরে সম্প্রদায়ের মানুষ ও সর্দার থাকলেও ভূখণ্ডের অভাবে তারা রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না।

২. রাষ্ট্রের ত্রিমাত্রিক ভৌগোলিক পরিধি: সার্বভৌম ভূখণ্ড কেবল মাটির উপরিভাগ বোঝায় না; এটি মূলত একটি ত্রিমাত্রিক সার্বভৌম স্থান:
  • ক. স্থলভাগ ও ভূগর্ভ (Terrestrial Domain): আন্তর্জাতিক সীমানার ভেতরে থাকা সমগ্র সমভূমি, পাহাড়, নদী উপত্যকা এবং ভূগর্ভের সব ধরনের মূল্যবান খনিজ পদার্থ (কয়লা, পেট্রোলিয়াম, লোহা), যা উল্লম্বভাবে পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত।
  • খ. রাষ্ট্রীয় জলসীমা (Maritime & Fluvial Domain):
    1. অভ্যন্তরীণ জলসম্পদ: সমস্ত অভ্যন্তরীণ হ্রদ, নদী ও খাঁড়ি।
    2. টেরিটোরিয়াল সী বা রাষ্ট্রীয় সমুদ্রসীমা: আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (UNCLOS, ১৯৮২) অনুসারে উপকূলীয় দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে সমুদ্রের দিকে ১২ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২২.২ কিলোমিটার) পর্যন্ত জলভাগকে রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ মনে করা হয়।
    3. এর বাইরে ২৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত শুল্ক নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) থাকে।
  • গ. আকাশসীমা (Aerial Domain): ১৯৪৪ সালের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংক্রান্ত শিকাগো সনদ অনুসারে প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্র তার স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমার ঠিক উপরিভাগের সমগ্র বায়ুমণ্ডলের ওপর একচেটিয়া সার্বভৌম অধিকার ভোগ করে। পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে কোনো বিদেশি সামরিক বা বেসামরিক বিমান রাষ্ট্রের আকাশসীমা লঙ্ঘন করতে পারে না।

৩. ভূখণ্ডের আয়তনের আধুনিক তাৎপর্য: আইনগতভাবে রাষ্ট্রের আয়তন কত হবে তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে ভূ-রাজনীতিতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদ, খাদ্য উৎপাদন এবং সামরিক নিরাপত্তার গভীরতা অর্জনের জন্য ভূখণ্ডের আয়তন ও কৌশলগত অবস্থান এক মহাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

রাষ্ট্র এবং সরকারকে একই জিনিস মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

রাষ্ট্র হলো স্থায়ী সার্বভৌম প্রধান রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যার সদস্য সমস্ত জনগণ। সরকার হলো রাষ্ট্রের অস্থায়ী কার্যনির্বাহী সংস্থা, যা মাত্র কয়েকজন প্রতিনিধি ও আমলা নিয়ে গঠিত।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভাবা যে নির্দিষ্ট একটি জনসংখ্যা না হলে রাষ্ট্র হতে পারে না।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

প্রাচীন দার্শনিকরা সংখ্যা প্রস্তাব করলেও আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে কোনো বাঁধাধরা জনসংখ্যার নিয়ম নেই (ভ্যাটিকান সিটির ৮০০ জন যেমন রাষ্ট্র, তেমনই ভারতের ১৪০ কোটি মানুষও রাষ্ট্র)।

সাধারণ ভুল ধারণা

রাষ্ট্র এবং জাতিকে একাকার করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

রাষ্ট্র একটি আইনি ও রাজনৈতিক সংগঠন যা সার্বভৌমত্ব দাবি করে; জাতি হলো ভাষা, সংস্কৃতি বা ঐতিহাসিক চেতনায় ঐক্যবদ্ধ একটি মানসিক আত্মিক অনুভূতি।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভূখণ্ড বলতে কেবল মাটির ওপরের জমি বোঝানো।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

রাষ্ট্রের ভূখণ্ড ত্রিমাত্রিক: এর মধ্যে স্থলভাগ ও মাটির নিচের খনিজ, ১২ নটিক্যাল মাইল জলসীমা এবং উপরিভাগের সমগ্র আকাশসীমা অন্তর্ভুক্ত।

চিত্রগত ব্যাখ্যা ও মডেল

রাষ্ট্রের চারটি অপরিহার্য উপাদান ও অন্যান্য সংগঠনের সাথে পার্থক্য WBCHSE একাদশ শ্রেণি • রাষ্ট্রবিজ্ঞান • অধ্যাপক গার্নারের প্রামাণ্য তত্ত্ব ও সার্বভৌমত্বের দ্বিমুখী রূপ ১. জনসংখ্যা (Population) • মানব সমাজ ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অসম্ভব • প্লেটো: ৫০৪০ জন | রুশো: ১০,০০০ জন • অ্যারিস্টটল: স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সুশাসনোপযোগী • নাগরিক, প্রজা ও বিদেশি বাসিন্দাদের শ্রেণি ২. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড (Territory) • যাযাবর সম্প্রদায় রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না • স্থলভাগ, ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদ ও বনাঞ্চল • রাষ্ট্রীয় জলসীমা (১২ নটিক্যাল মাইল/UNCLOS) • ভূখণ্ড ও জলভাগের উপরিভাগের আকাশসীমা ৩. সরকার (Government) • রাষ্ট্রের বাস্তব কার্যনির্বাহী মাধ্যম ও মস্তিষ্ক • শাসন, আইন ও বিচার বিভাগের সমন্বিত রূপ • রাষ্ট্র বিমূর্ত ও স্থায়ী; সরকার মূর্ত ও পরিবর্তনশীল • সংসদীয়, রাষ্ট্রপতিশাসিত, যুক্তরাষ্ট্রীয় রূপভেদ ৪. সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) • রাষ্ট্রের প্রাণভোমরা ও অবিভাজ্য চরম ক্ষমতা • জাঁ বোঁদা (১৫৭৬): সার্বভৌমত্বের জনক • অভ্যন্তরীণ: দেশের ভেতর চূড়ান্ত আইনগত কর্তৃত্ব • বাহ্যিক: বিদেশের নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য সামাজিক সংগঠনের মৌলিক তুলনামূলক পার্থক্য রাষ্ট্র বনাম সমাজ (Society)

সমাজ প্রাচীনতর ও সর্বজনীন; রাষ্ট্র পরবর্তী রাজনৈতিক সৃষ্টি। সমাজের নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা সার্বভৌমিক বলপ্রয়োগের ক্ষমতা নেই; রাষ্ট্রের তা আছে।

রাষ্ট্র বনাম সরকার (Govt)

রাষ্ট্র মূল সত্তা ও স্থায়ী; সরকার রাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল প্রতিনিধি ও মুখপাত্র। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিরোধিতা রাষ্ট্রদ্রোহিতা, কিন্তু সরকারের বিরোধিতা বৈধ গণতান্ত্রিক অধিকার।

রাষ্ট্র বনাম জাতি (Nation)

জাতি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক অনুভূতি; রাষ্ট্র হলো আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তব সংগঠন। রাষ্ট্রহীন জাতি থাকতে পারে (যেমন ১৯৪৮-এর পূর্বে ইহুদি জাতি)।

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
ইংরেজি 'State' শব্দটি ল্যাটিন 'Status' থেকে এসেছে এবং মেকিয়াভেলি ১৫১৩ সালে আধুনিক অর্থে 'lo stato' ব্যবহার করেন।
মূল বিষয় 2
অধ্যাপক জে. ডব্লিউ. গার্নারের প্রদত্ত সংজ্ঞাটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সর্বাধিক প্রামাণ্য ও বিজ্ঞানসম্মত বলে স্বীকৃত।
মূল বিষয় 3
রাষ্ট্রের চারটি অপরিহার্য উপাদান হলো: জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার এবং সার্বভৌমত্ব।
মূল বিষয় 4
প্লেটো আদর্শ জনসংখ্যা ৫০৪০ এবং রুশো ১০,০০০ জন বলেছিলেন; কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে জনসংখ্যার কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই।
মূল বিষয় 5
রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট ভূখণ্ড একটি ত্রিমাত্রিক ধারণা—স্থলভাগ ও ভূগর্ভ, ১২ নটিক্যাল মাইল জলসীমা এবং উপরিভাগের আকাশসীমা।
মূল বিষয় 6
সরকার হলো রাষ্ট্রের দৃশ্যমান কার্যনির্বাহী মাধ্যম, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সামগ্রিক ইচ্ছা ও নীতি বাস্তবায়িত হয়।
মূল বিষয় 7
জাঁ বোঁদা ১৫৭৬ সালে সার্বভৌমত্বের তত্ত্ব দেন; সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চরম ও অবিভাজ্য কর্তৃত্ব।
মূল বিষয় 8
অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব দেশের ভেতরের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব এবং বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।
মূল বিষয় 9
রাষ্ট্র স্থায়ী ও সার্বভৌম সত্তা, আর সরকার তার ক্ষণস্থায়ী প্রতিনিধি; সরকারের সমালোচনা করা নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার।
মূল বিষয় 10
সমাজ রাষ্ট্রের চেয়ে প্রাচীন ও ব্যাপক; জাতি একটি সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক চেতনা, আর রাষ্ট্র হলো একটি আইনি-রাজনৈতিক সংগঠন।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
১৫১৩ সালে কোন্ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রথম আধুনিক অর্থে 'lo stato' (রাষ্ট্র) শব্দটি ব্যবহার করেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ইতালির রাষ্ট্রদার্শনিক নিকোলো মেকিয়াভেলি, তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য প্রিন্স'-এ।
2
অধ্যাপক গার্নারের মতে রাষ্ট্রের চারটি উপাদান কী কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ১. জনসংখ্যা; ২. নির্দিষ্ট ভূখণ্ড; ৩. সুসংগঠিত সরকার; ৪. সার্বভৌমত্ব।
3
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন (UNCLOS) অনুসারে রাষ্ট্রীয় জলসীমা কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: উপকূলরেখা থেকে সমুদ্রের দিকে ১২ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ২২.২ কিলোমিটার) পর্যন্ত।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

রাষ্ট্র: সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।