ইংরেজি 'Nationality' শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ 'Natio' (মূল শব্দ Nasci, যার অর্থ জন্ম বা বংশোদ্ভূত) থেকে। আক্ষরিক অর্থে রক্ত বা বংশের সম্পর্ক বোঝালেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে জাতীয় জনসমাজ মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক অনুভূতির নাম, যা একটি নির্দিষ্ট মানবগোষ্ঠীকে এক গভীর ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে এবং অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে তাদের স্বতন্ত্র করে তোলে:
- রক্ত বা বংশগত অভিন্নতা: এক পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভুত হওয়ার কাল্পনিক বা বাস্তব বিশ্বাস জনসমাজের মধ্যে একাত্মবোধ তৈরি করে; তবে আধুনিক নৃবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে বিশ্বে কোনো বিশুদ্ধ রক্তভিত্তিক জাতি নেই।
- ভাষাগত ঐক্য: ভাষা হলো চিন্তা ও অনুভূতির বিনিময়ের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তবে অভিন্ন ভাষা ছাড়াও জনসমাজ গঠিত হতে পারে; যেমন সুইজারল্যান্ডে চারটি সরকারি ভাষা (জার্মান, ফরাসি, ইতালীয়, রোমানশ) থাকা সত্ত্বেও সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য বর্তমান।
- ধর্মীয় ঐক্য: অতীতে ধর্ম জনসমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল; তবে একমাত্র ধর্ম ঐক্য ধরে রাখতে পারে না। ১৯৭১ সালে ধর্মীয় সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের শোষণ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল।
- ভৌগোলিক সান্নিধ্য: একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভূখণ্ডে দীর্ঘদিন বসবাসের ফলে মাতৃভূমির প্রতি সুগভীর মমত্ববোধ তৈরি হয়। তবে দীর্ঘদিন নিজ ভূখণ্ড ছাড়া থেকেও ইহুদি সম্প্রদায় তাদের জাতীয় জনসমাজ বাঁচিয়ে রেখেছিল।
- ঐতিহাসিক স্মৃতি ও ঐতিহ্য: অভিন্ন ঐতিহাসিক সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম, বিজয় এবং বীরগাথার স্মৃতি মানুষকে গভীরভাবে ঐক্যবদ্ধ করে।
- অর্থনৈতিক স্বার্থের সমতা: সুসংহত বাণিজ্য ও অর্থনীতি আঞ্চলিক সংকীর্ণতা দূর করে সামগ্রিক ঐক্যের জন্ম দেয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একমত যে কেবল বাহ্যিক উপাদান জনসমাজ তৈরি করতে পারে না; এর প্রকৃত প্রাণশক্তি হলো মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক একতাবোধ। ফরাসি চিন্তাবিদ আর্নেস্ট রেনাঁ তাঁর ১৮৮২ সালের বিখ্যাত বক্তৃতায় বলেন: 'একটি জাতি হলো একটি আত্মা, একটি আধ্যাত্মিক নীতি... এটি একটি প্রাত্যহিক গণভোট (Daily Plebiscite)।' অর্থাৎ অতীতের যৌথ ত্যাগ এবং ভবিষ্যতে একসঙ্গে বেঁচে থাকার গভীর মানসিক ইচ্ছাই জাতীয় জনসমাজের মূল চালিকাশক্তি।