Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি XI • Political Science • অধ্যায় 1
আনুমানিক সময়: ৪৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

একটি শাস্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান: প্রকৃতি ও পরিধি

রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো সমাজবিজ্ঞানের সেই সুসংবদ্ধ শাখা যা রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতা কাঠামো এবং রাজনৈতিক আচরণের তাত্ত্বিক ও প্রয়োগমূলক দিক নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত অনুসন্ধান পরিচালনা করে। প্রাচীন গ্রিসের নগর-রাষ্ট্রের 'পলিস' ধারণা থেকে উদ্ভূত হয়ে আধুনিক যুগে এটি কেবল সংবিধান বা আইনের শুকনো আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে ক্ষমতা বণ্টন, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক সুবিশাল শাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের (WBCHSE) একাদশ শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠ্যসূচির প্রথম অধ্যায়টিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উৎপত্তি, সনাতন রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, আধুনিক আচরণবাদী তত্ত্ব এবং মার্কসীয় শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গির বিশদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রকৃত বিজ্ঞান কিনা সেই ঐতিহাসিক বিতর্ক, ১৯৪৮ সালের ইউনেস্কো নির্দেশিত পরিধি এবং ইতিহাস, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের সঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আন্তঃসম্পর্ক অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

অধ্যায়টির গুরুত্ব

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সচেতন, যুক্তিবাদী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি ও পরিধির সম্যক জ্ঞান অপরিহার্য। কীভাবে ক্ষমতা অর্জিত হয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং রাষ্ট্রের নীতিমালা সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে—তা অনুধাবন করতে এই শাস্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। উচ্চমাধ্যমিক একাদশ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে বর্ণনামূলক ৮ নম্বরের প্রশ্ন এবং ১ নম্বরের বহুবিকল্পভিত্তিক (MCQ) প্রশ্ন নিয়মিত আসে। তাছাড়া ভবিষ্যতে সিভিল সার্ভিস (WBCS/UPSC), আইনচর্চা, কূটনীতি ও সাংবাদিকতার মতো সম্মানজনক পেশাগত ক্ষেত্রে এই অধ্যায়ের জ্ঞান এক সুদৃঢ় তাত্ত্বিক ভিত্তি রচনা করে।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উৎপত্তি, ব্যুৎপ...
2 ২. সনাতন বা ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিভঙ্গি...
3 ৩. আধুনিক ও আচরণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি (ক...
4 ৪. মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি: শ্রেণি দ্...
5 ৫. রাষ্ট্রবিজ্ঞান কি বিজ্ঞান? — ঐতি...
6 ৬. ইউনেস্কো নির্দেশিত রাষ্ট্রবিজ্ঞা...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উৎপত্তি, ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও প্রাথমিক ধারণা

ব্যুৎপত্তিগত উৎস ও প্রাচীন গ্রিক ঐতিহ্য

ইংরেজি 'Politics' শব্দটির ব্যুৎপত্তি ঘটেছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ 'Polis' থেকে। প্রাচীন গ্রিসে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড় ও নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন এক একটি স্বাধীন জনপদ বা 'নগর-রাষ্ট্র' (City-State)-কে বলা হতো 'পলিস' (যেমন এথেন্স, স্পার্টা)। এই নগর-রাষ্ট্রের নাগরিকদের বলা হতো 'Polites' (পলিটেস) এবং নগর-রাষ্ট্রের সংবিধান বা শাসনব্যবস্থাকে বলা হতো 'Politeia' (পলিটিয়া)। সেই যুগে নগর-রাষ্ট্রের শাসনকাজ ও সামগ্রিক নাগরিক জীবন পরিচালনা সংক্রান্ত কলা ও বিদ্যাকে বলা হতো 'Politike' (পলিটিকে)।

অ্যারিস্টটল — রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক:

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলকে সর্বসম্মতিক্রমে 'রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক' (Father of Political Science) বলা হয়। তাঁর রচিত যুগান্তকারী গ্রন্থটির নাম হলো 'পলিটিক্স' (Politics)। অ্যারিস্টটল তাঁর গ্রন্থে অমর উক্তি করেছিলেন: "মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই এক সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব" (Man is by nature a political animal)। যে মানুষ রাষ্ট্রে বাস করে না বা করতে পারে না, সে হয় পশু, না হয় দেবতা। অ্যারিস্টটল রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে "সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান" বা "Master Science" বলে অভিহিত করেছিলেন, কারণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানই নির্ধারণ করে মানুষ কীভাবে যৌথভাবে বাস করে পরম শুভ বা শ্রেষ্ঠ জীবন (Good Life) লাভ করবে।

রাজনীতি (Politics) ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science) এর পার্থক্য

সাধারণ কথাবার্তায় 'রাজনীতি' ও 'রাষ্ট্রবিজ্ঞান' শব্দ দুটি সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে এদের অর্থগত সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে:

  • রাজনীতি (বাস্তব কার্যকলাপ): রাজনীতি হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল, নির্বাচন, দলীয় সংঘাত, সরকার পরিচালনা এবং সরকারি নীতি নির্ধারণের ব্যবহারিক ও প্রত্যক্ষ ক্রিয়াকলাপ। এটি নিত্য পরিবর্তনশীল এবং সংঘাতবহুল।
  • রাষ্ট্রবিজ্ঞান (তাত্ত্বিক শাস্ত্র): রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো রাজনৈতিক ঘটনাবলী, রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনৈতিক আচরণের নিয়মবদ্ধ, বস্তুনিষ্ঠ ও তাত্ত্বিক আলোচনা। আধুনিককালে উইলিয়াম গডউইন, মেরি ওলস্টোনক্রাফট এবং পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ এই শাস্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।

২. সনাতন বা ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিভঙ্গি (রাষ্ট্র ও সরকারকেন্দ্রিক সংজ্ঞা)

সনাতন বা প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্য

প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞান চর্চায় যে ধারাটি আধিপত্য বিস্তার করেছিল, তাকে সনাতন বা ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিভঙ্গি (Traditional Approach) বলা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি প্রধানত আদর্শনিষ্ঠ (Normative), দার্শনিক, ঐতিহাসিক এবং আইনগত-প্রাতিষ্ঠানিক। সনাতন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে দুটি প্রধান স্তম্ভের ওপর সংজ্ঞায়িত করেছেন: রাষ্ট্র এবং সরকার।

সংজ্ঞার শ্রেণিবিভাগ প্রসিদ্ধ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রধান সংজ্ঞা ও মূল বক্তব্য
১. রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সংজ্ঞা জে. ডব্লিউ. গার্নার, জে. কে. ব্লুন্টশ্লি, পল জ্যানেট অধ্যাপক গার্নার (J.W. Garner): "রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্রকে নিয়েই শুরু এবং রাষ্ট্রেই তার সমাপ্তি ঘটে" (Political Science begins and ends with the State)।
ব্লুন্টশ্লি (Bluntschli): "রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো সেই শাস্ত্র যা রাষ্ট্র সম্পর্কিত মৌল শর্তাবলি, তার স্বরূপ ও রূপবিকাশ নিয়ে আলোচনা করে।"
২. সরকারকেন্দ্রিক সংজ্ঞা স্যার জন সিলি, স্টিফেন লিকক সিলি (Seeley): "অর্থনীতি যেমন সম্পদ নিয়ে, জীববিজ্ঞান জীবন নিয়ে, বীজগণিত সংখ্যা নিয়ে এবং জ্যামিতি স্থান নিয়ে কারবার করে—ঠিক তেমনই রাষ্ট্রবিজ্ঞান সরকার নিয়ে অনুসন্ধান পরিচালনা করে।"
লিকক (Leacock): "রাষ্ট্রবিজ্ঞান সরকারকে নিয়ে আলোচনা করে।"
৩. রাষ্ট্র ও সরকার উভয়কেন্দ্রিক আর. এন. গিলক্রাইস্ট, আর. জি. গেটেল, হ্যারল্ড ল্যাস্কি গিলক্রাইস্ট (Gilchrist): "রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো রাষ্ট্র ও সরকারের সাধারণ সমস্যাবলি সম্পর্কিত বিজ্ঞান।"
ল্যাস্কি (Laski): "সংগঠিত রাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে মানবজীবনের সম্পর্ক নিয়েই রাষ্ট্রবিজ্ঞান আলোচনা করে।"
সনাতন দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান সীমাবদ্ধতা
  • অতিমাত্রায় প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত: সংবিধান, আইনসভা, আদালত ইত্যাদির আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে যে অনানুষ্ঠানিক বাস্তব রাজনৈতিক শক্তি (যেমন চাপসৃষ্টিকারী দল, জনমত, জাতপাত, অর্থশক্তি) কাজ করে, তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিল।
  • বাস্তবতা বর্জিত ও আদর্শবাদী: রাষ্ট্র বাস্তবে কেমন চলছে তার চেয়ে রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত—এই কাল্পনিক নৈতিকতা নিয়ে বেশি মগ্ন ছিল।

৩. আধুনিক ও আচরণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি (ক্ষমতা, ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াভিত্তিক তত্ত্ব)

আচরণবাদী বিপ্লব ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী (যেমন চার্লস মেরিয়াম, হ্যারল্ড ল্যাসওয়েল) সনাতন প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতির বিরুদ্ধে এক বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, যা আচরণবাদী বিপ্লব (Behavioural Revolution) নামে খ্যাত। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রতিষ্ঠান বা সংবিধানের চেয়ে মানুষের বাস্তব রাজনৈতিক আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং ক্ষমতা (Power)-কে বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেন।

আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান স্তম্ভসমূহ

ক. হ্যারল্ড ল্যাসওয়েল: ক্ষমতা তত্ত্ব

১৯৩৬ সালে প্রকাশিত তাঁর সাড়াজাগানো গ্রন্থ 'Politics: Who Gets What, When, How'-এ ল্যাসওয়েল বলেন—রাজনীতি হলো ক্ষমতার গঠন ও অংশীদারিত্বের বিশ্লেষণ। সমাজে দুর্লভ সুযোগ-সুবিধা ও মূল্যবোধ কীভাবে বণ্টিত হয় এবং কে ক্ষমতা প্রয়োগ করে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান তা-ই অনুসন্ধান করে। আব্রাহাম কাপলানের সাথে রচিত 'Power and Society' (১৯৫০)-তে তিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার বিজ্ঞান বলে অভিহিত করেন।

খ. ডেভিড ইস্টন: রাজনৈতিক ব্যবস্থা তত্ত্ব

১৯৫৩ সালে প্রকাশিত 'The Political System' গ্রন্থে ডেভিড ইস্টন রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে সংজ্ঞায়িত করে বলেন: রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো "সমাজের জন্য মূল্যবোধের কর্তৃত্বপূর্ণ বরাদ্দ" (Authoritative Allocation of Values for a Society)। তিনি রাজনীতিকে একটি উন্মুক্ত ব্যবস্থারূপে দেখেন, যেখানে পরিবেশ থেকে ইনপুট (দাবি ও সমর্থন) প্রবেশ করে এবং রূপান্তর প্রক্রিয়ার পর আউটপুট (আইন ও নীতি) নির্গত হয়।

রবার্ট ডালের বহুত্ববাদী ক্ষমতা তত্ত্ব

রবার্ট ডাল (Robert A. Dahl) রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় বলেন: যে কোনো মানবীয় সম্পর্কের স্থায়ী কাঠামো যেখানে ক্ষমতা, শাসন বা কর্তৃত্বের উপস্থিতি রয়েছে—তা-ই রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্তর্গত। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান পরিসংখ্যান, জনমত সমীক্ষা ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজবিজ্ঞানের গবেষণাকে সমৃদ্ধ করেছে।

উত্তর-আচরণবাদ (Post-Behaviouralism - ১৯৬৯):

পরবর্তীকালে অতিমাত্রায় সংখ্যাতত্ত্ব ও মূল্যবোধহীন গবেষণার ফলে রাষ্ট্রবিজ্ঞান যখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ, বর্ণবিদ্বেষ ও পারমাণবিক সংকটের মতো বাস্তব মানবিক সংকটে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন ডেভিড ইস্টন "প্রাসঙ্গিকতা ও কার্যসাধনের শপথ" (Credo of Relevance and Action) তুলে ধরে উত্তর-আচরণবাদ ঘোষণা করেন। এর মূল কথা: বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের অঙ্গীকার থাকতে হবে।

৪. মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি: শ্রেণি দ্বন্দ্ব, শ্রেণি শাসন ও রাষ্ট্রের স্বরূপ

দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আলোকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান

সনাতন উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আধুনিক আচরণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি—উভয়কেই তীব্র সমালোচনা করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এক বৈপ্লবিক রূপরেখা এনে দেন কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস। মার্কসীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান দাঁড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ভিত্তির ওপর। মার্কসবাদের মূল শিক্ষা হলো—রাজনৈতিক ঘটনাবলিকে সমাজ ও অর্থনীতির বাস্তব সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তিই (উৎপাদন পদ্ধতি) রাজনৈতিক উপরি-কাঠামোকে (আইন, রাষ্ট্র, সরকার) নির্ধারণ করে।

মার্কসীয় রাষ্ট্রতত্ত্বের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ
  • রাষ্ট্র হলো শ্রেণি শোষণের হাতিয়ার: উদারনীতিবিদরা রাষ্ট্রকে জনকল্যাণকামী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান বলে প্রচার করলেও মার্কসবাদীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। মার্কস ও এঙ্গেলস ১৮৪৮ সালে রচিত কমিউনিস্ট ইস্তেহার (The Communist Manifesto)-এ স্পষ্ট ঘোষণা করেন: "আধুনিক রাষ্ট্রের শাসন বিভাগ সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণির সাধারণ কার্যাবলি পরিচালনার কমিটি ছাড়া কিছু নয়।" ব্যক্তিগত সম্পত্তির আবির্ভাব এবং শ্রেণি বিভাজনের ফলেই সংখ্যালঘু শাসক শ্রেণির স্বার্থরক্ষা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী শ্রেণিকে শোষণের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের মতো বলপ্রয়োগকারী যন্ত্র তৈরি হয়েছে।
  • শ্রেণি সংগ্রামই ইতিহাসের চালিকাশক্তি: মানব সমাজের সমগ্র লিখিত ইতিহাস হলো শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস (দাস-মালিক, সামন্তপ্রভু-ভূমিদাস, পুঁজিপতি-শ্রমিক)। আইনসভা, বিচারালয়, পুলিশ ও সৈন্যবাহিনী সবই শাসক বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করার জন্য কাজ করে।
  • সর্বহারার একনায়কত্ব ও রাষ্ট্রের বিলোপসাধন: মার্কসীয় দর্শনে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে ফেলে অস্থায়ীভাবে 'সর্বহারার একনায়কত্ব' প্রতিষ্ঠিত হবে। পরবর্তীতে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উচ্ছেদ ঘটে শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ (Communist Society) গড়ে উঠলে শ্রেণিহীন সমাজে বলপ্রয়োগকারী রাষ্ট্রের কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। তখন রাষ্ট্র ধ্বংস করতে হবে না, লেনিনের ভাষায়—রাষ্ট্র নিজে থেকেই ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হবে (Withering Away of the State)।

৫. রাষ্ট্রবিজ্ঞান কি বিজ্ঞান? — ঐতিহাসিক বিতর্কের চুলচেরা বিশ্লেষণ

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিজ্ঞানধর্মিতা নিয়ে বিতর্ক

রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে কি পদার্থবিদ্যা বা রসায়নের মতো একটি যথার্থ বিজ্ঞান বলা যায়? এই মৌলিক প্রশ্নটি নিয়ে সুদীর্ঘকাল ধরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ চলেছে। তাত্ত্বিকগণ প্রধানত দুটি শিবিরে বিভক্ত:

ক. বিজ্ঞান না বলার পক্ষে যুক্তি (সংশয়বাদী পণ্ডিতগণ)

মেটল্যান্ড (F.W. Maitland), বাকল (Buckle), অগাস্ট কোঁত (Auguste Comte) এবং এডমন্ড বার্ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের মর্যাদা দিতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। মেটল্যান্ডের সেই সুবিখ্যাত উক্তিটি বিশেষভাবে স্মরণীয়:

"যখন আমি কোনো পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে 'রাষ্ট্রবিজ্ঞান' শিরোনামটি মুদ্রিত দেখি, তখন প্রশ্নগুলির জন্য নয়, বরং শিরোনামটির জন্যই আমার সবচেয়ে বেশি দুঃখ হয়।"
  • সর্বজনীন সূত্রের অভাব: পদার্থবিদ্যার মহাকর্ষ সূত্র বা রসায়নের সূত্রের মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানে কোনো অপরিবর্তনীয়, সার্বজনীন ও সুনির্দিষ্ট সূত্র নেই। এক দেশের কার্যকর ব্যবস্থা অন্য দেশে ব্যর্থ হতে পারে।
  • মানব আচরণের পরিবর্তনশীলতা: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষণার মূল বিষয় হলো মানুষের মন ও রাজনৈতিক ইচ্ছা—যা অত্যন্ত চঞ্চল, আবেগপ্রবণ ও অনিশ্চিত। মানুষের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আচরণ আগে থেকে নিখুঁতভাবে বলা যায় না।
  • গবেষণাগারে পরীক্ষার অসম্ভবতা: সমাজ বা রাষ্ট্র কোনো রসায়নাগারের টেস্টটিউব নয় যে সেখানে মানুষকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রেখে কৃত্রিম পরীক্ষা চালানো যাবে।
  • গবেষকের ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব: একজন গবেষক নিজেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্ম, শ্রেণি বা দলের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন, ফলে নিরপেক্ষতা রক্ষা করা কঠিন।
খ. বিজ্ঞান বলার পক্ষে যুক্তি (সমর্থক পণ্ডিতগণ)

অ্যারিস্টটল, জাঁ বোঁদা, টমাস হবস, লর্ড ব্রাইস, জে. ডব্লিউ. গার্নার এবং হ্যারল্ড ল্যাস্কি দৃঢ়ভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের মর্যাদায় ভূষিত করেছেন:

  • পদ্ধতিগত ও সুশৃঙ্খল জ্ঞান: বিজ্ঞান মানে কেবল রসায়নাগারের রাসায়নিক পরীক্ষা নয়; কোনো বিষয় সম্পর্কে সুশৃঙ্খল, পর্যবেক্ষণভিত্তিক ও যুক্তিগ্রাহ্য জ্ঞানভাণ্ডারই বিজ্ঞান। রাষ্ট্রবিজ্ঞান এই শর্ত সম্পূর্ণ পূরণ করে।
  • ঐতিহাসিক ও সামাজিক পরীক্ষা: লর্ড ব্রাইস চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন যে আইন প্রণয়ন, নীতি পরিবর্তন বা সাংবিধানিক সংস্কার হলো সমাজজীবনের চলমান জীবন্ত পরীক্ষা। এর ফলাফল পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।
  • সাধারণীকরণের সম্ভাবনা: আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পরিসংখ্যান, ভোট বিশ্লেষণ ও তুলনামূলক পদ্ধতির মাধ্যমে রাজনৈতিক ঘটনা সম্পর্কে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
  • প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নয়, এটি একটি 'সামাজিক বিজ্ঞান': রাষ্ট্রবিজ্ঞান কখনোই জড় পদার্থের মতো নিখুঁত হতে পারে না; আবহাওয়াবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো এটি একটি বিকাশমান ও গতিশীল সামাজিক বিজ্ঞান (Social Science)।

৬. ইউনেস্কো নির্দেশিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধি (১৯৪৮) ও অন্যান্য সমাজবিজ্ঞানের সম্পর্ক

ইউনেস্কো সম্মেলন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চারমুখী পরিধি (প্যারিস, ১৯৪৮)

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফ্রান্সের প্যারিসে আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতি ইউনেস্কো (UNESCO)-র উদ্যোগে এক ঐতিহাসিক সম্মেলনে মিলিত হয়। সেখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু ও পরিধিকে চারটি প্রধান ক্ষেত্রে বিন্যস্ত করা হয়:

ইউনেস্কো পরিধির বিভাগ আলোচ্য বিষয় ও ক্ষেত্রসমূহ
১. রাজনৈতিক তত্ত্ব (Political Theory) সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, সাম্য, ন্যায়বিচার, অধিকার ও আইনের ধারণা; প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক চিন্তাধারার ইতিহাস (প্লেটো থেকে বর্তমান)।
২. রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান (Political Institutions) সংবিধান; কেন্দ্রীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় শাসনব্যবস্থা; সরকারি বিভাগসমূহ (শাসন, আইন ও বিচার বিভাগ); তুলনামূলক শাসনব্যবস্থা ও জনপ্রশাসন।
৩. রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী ও জনমত দলব্যবস্থা ও নির্বাচন; চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী ও স্বার্থান্বেষী লবি; নাগরিক অধিকার রক্ষা আন্দোলন; গণমাধ্যম ও জনমত গঠনের প্রক্রিয়া।
৪. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (International Relations) আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি; সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (UN) ও আঞ্চলিক জোট; আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্বশান্তি রক্ষা।
অন্যান্য সমাজবিজ্ঞানের সঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আন্তঃসম্পর্ক
  • ইতিহাসের সাথে সম্পর্ক: ইতিহাস রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে অতীত অভিজ্ঞতার তথ্যভাণ্ডার জোগায়। স্যার জন সিলি বিখ্যাত ছড়ায় বলেছিলেন: "ইতিহাস ছাড়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনো ফল নেই, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ছাড়া ইতিহাসের কোনো মূল নেই।" ঐতিহাসিক ফ্রিম্যান যোগ করেছিলেন: "ইতিহাস হলো অতীতের রাজনীতি, আর রাজনীতি হলো বর্তমানের ইতিহাস।"
  • অর্থনীতির সাথে সম্পর্ক: আর্থিক সম্পদ বণ্টন, কর ব্যবস্থা, ভূমি সংস্কার ও বাজেটের মতো মৌলিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই গৃহীত হয়। অতীতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি যৌথভাবে 'রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি' (Political Economy) নামে পরিচিত ছিল।
  • সমাজবিজ্ঞানের সাথে সম্পর্ক: সমাজবিজ্ঞান হলো সর্বজনীন জনক শাস্ত্র। সমাজবিজ্ঞান সমাজের যাবতীয় সামাজিক সংগঠন আলোচনা করে, আর রাষ্ট্রবিজ্ঞান তারই একটি বিশেষ অঙ্গ হিসেবে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান আলোচনা করে। উভয়ের মিলনে গড়ে উঠেছে আধুনিক রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান (Political Sociology)।

গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ধারা, রাজনৈতিক তত্ত্ব ও সূত্র

সনাতন রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ধারা (গার্নার ও ব্লুন্টশ্লি)
রাষ্ট্রবিজ্ঞান = রাষ্ট্রের উৎপত্তি + স্বরূপ + বিকাশ + আনুষ্ঠানিক আইনি কাঠামো
আধুনিক ব্যবস্থা ও ক্ষমতা তত্ত্ব (ইস্টন ও ল্যাসওয়েল)
রাজনৈতিক ব্যবস্থা = ইনপুট (দাবি + সমর্থন) ➔ রূপান্তর ➔ আউটপুট (নীতি/আইন) ➔ ফিডব্যাক
মার্কসীয় দ্বন্দ্বমূলক তত্ত্ব (মার্কস ও এঙ্গেলস)
অর্থনৈতিক ভিত্তি (উৎপাদন সম্পর্ক) ➔ রাজনৈতিক উপরি-কাঠামো (শ্রেণি শোষণের হাতিয়ার রাষ্ট্র)
ইউনেস্কো ১৯৪৮ চতুর্মুখী পরিধি সূত্র
পরিধি = [১. রাজনৈতিক তত্ত্ব] + [২. রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান] + [৩. রাজনৈতিক দল/গোষ্ঠী/জনমত] + [৪. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক]

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও। রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠের সনাতন ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য লেখো। (মান: ৮)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর:
১. রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা: রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো সমাজবিজ্ঞানের এমন একটি গতিশীল শাখা যা রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতার বণ্টন ও মানুষের রাজনৈতিক আচরণের সুশৃঙ্খল ও বিশ্লেষণাত্মক পাঠ পরিচালনা করে।

২. সনাতন ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির তুলনামূলক পার্থক্য:
তুলনার ভিত্তি সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি (Traditional) আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি (Modern)
মূল বিষয়বস্তু রাষ্ট্র, সরকার এবং সাংবিধানিক আইনসভা ও বিচারালয়ের মতো আনুষ্ঠানিক কাঠামো। ক্ষমতা, প্রভাব, কর্তৃত্ব, রাজনৈতিক আচরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া।
গবেষণা পদ্ধতি দার্শনিক, ঐতিহাসিক, আদর্শনিষ্ঠ ও আইনগত বিশ্লেষণ। অভিজ্ঞতালব্ধ, পর্যবেক্ষণমূলক, পরিসংখ্যানভিত্তিক ও আচরণবাদী।
মূল প্রবক্তাগণ গার্নার, ব্লুন্টশ্লি, সিলি, লিকক, গেটেল। হ্যারল্ড ল্যাসওয়েল, ডেভিড ইস্টন, রবার্ট ডাল, চার্লস মেরিয়াম।
দৃষ্টিভঙ্গির প্রকৃতি রাষ্ট্র 'কেমন হওয়া উচিত' (আদর্শবাদী)। বাস্তবে রাজনীতি 'কেমন চলছে' (বাস্তবধর্মী)।

৩. মূল্যায়ন: সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আইনি ও তাত্ত্বিক বুনিয়াদ রচনা করেছিল, আর আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি তাতে বাস্তবের প্রাণস্পন্দন সঞ্চারিত করেছে। সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উভয়ের সমন্বয়ই গ্রহণযোগ্য।
উদাহরণ 2
রাষ্ট্রবিজ্ঞান কি একটি বিজ্ঞান? পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে আলোচনা করো। (মান: ৮)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর: রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে কি অন্যান্য প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ 'বিজ্ঞান' বলা যায়? এই প্রশ্নটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জন্মলগ্ন থেকেই অত্যন্ত বিতর্কিত।

১. বিজ্ঞান না বলার পক্ষে যুক্তি (সংশয়বাদী পণ্ডিতদের অভিমত): মেটল্যান্ড, বাকল, অগাস্ট কোঁত প্রমুখ পণ্ডিত একে বিজ্ঞান মানতে অস্বীকার করেছেন:
  • মেটল্যান্ডের বিখ্যাত মন্তব্য: ঐতিহাসিক মেটল্যান্ড লিখেছিলেন—পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে 'রাষ্ট্রবিজ্ঞান' শিরোনামটি মুদ্রিত দেখলে তিনি শিরোনামটির জন্যই দুঃখ অনুভব করেন।
  • সার্বজনীন সূত্রের অভাব: মহাকর্ষ সূত্রের মতো কোনো স্থির ও অভ্রান্ত সূত্র রাষ্ট্রবিজ্ঞানে নেই। এক দেশের কার্যকর ব্যবস্থা অন্য দেশে ব্যর্থ হতে পারে।
  • মানব মনের অস্থিরতা ও অননুমেয়তা: মানুষের চিন্তা, রাজনৈতিক পছন্দ ও আবেগ সদা পরিবর্তনশীল। কারুর পক্ষে নিখুঁতভাবে বলা সম্ভব নয় মানুষ আগামী নির্বাচনে কাকে ভোট দেবে।
  • পরীক্ষাগারের অভাব: সমাজ কোনো গবেষণাগার নয়, নাগরিকদের ওপর টেস্টটিউবের মতো কৃত্রিম পরীক্ষা চালানো যায় না।
  • ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব: গবেষক নিজেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক মতের অনুসারী হতে পারেন, ফলে ১০০% নিরপেক্ষ থাকা অসম্ভব।

২. বিজ্ঞান বলার পক্ষে যুক্তি (সমর্থক পণ্ডিতদের অভিমত): অ্যারিস্টটল, বোঁদা, হবস, লর্ড ব্রাইস, গার্নার রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলেই স্বীকৃতি দিয়েছেন:
  • বিজ্ঞান হলো সুবিন্যস্ত জ্ঞান: বিজ্ঞান মানে কেবল ল্যাবরেটরি নয়; সুশৃঙ্খল, তথ্যনিষ্ঠ ও পর্যবেক্ষণমূলক যে কোনো পদ্ধতিগত জ্ঞানভাণ্ডারই বিজ্ঞান।
  • অ্যারিস্টটলের মূল্যায়ন: অ্যারিস্টটল রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে 'সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান' (Master Science) আখ্যা দিয়েছেন।
  • সামাজিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা: লর্ড ব্রাইসের মতে, সরকারের প্রতিটি নতুন আইন, করনীতি বা প্রশাসনিক সংস্কারই হলো একটি করে বাস্তব সামাজিক পরীক্ষা।
  • আধুনিক পূর্বাভাস ও সাধারণীকরণ: আধুনিক ভোটিং সমীক্ষা ও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে জনমত ও রাজনৈতিক প্রবণতা সম্পর্কে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য পূর্বানুমান করা সম্ভব হচ্ছে।

৩. সিদ্ধান্ত: রাষ্ট্রবিজ্ঞান পদার্থবিদ্যার মতো চরম নিখুঁত বিজ্ঞান নয়; এটি আবহাওয়াবিদ্যা বা অর্থনীতির মতো একটি গতিশীল সামাজিক বিজ্ঞান (Social Science)।
উদাহরণ 3
রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করো। (মান: ৮)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর: কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস প্রতিষ্ঠিত মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রবিজ্ঞান চর্চায় প্রচলিত বুর্জোয়া ও সনাতন ভাবাদর্শকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে এক বিপ্লবী বাস্তববাদী তত্ত্ব উপস্থাপন করেছে।

১. ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও উপরি-কাঠামো: মার্কসবাদের মতে সমাজকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—অর্থনৈতিক ভিত্তি (উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্ক) এবং উপরি-কাঠামো (রাষ্ট্র, আইন, ধর্ম, দর্শন)। অর্থনৈতিক ভিত্তিই রাষ্ট্র ও রাজনীতির চরিত্র নির্ধারণ করে।

২. রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও শোষকের হাতিয়ার রূপ:
  • রাষ্ট্র কোনো সনাতন বা ঐশ্বরিক প্রতিষ্ঠান নয়। সমাজে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব হলো এবং সমাজ শোষক ও শোষিত—এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত হলো, তখনই সংখ্যালঘু শোষক শ্রেণির সম্পত্তি ও প্রভুত্ব রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের জন্ম হলো।
  • কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো (১৮৪৮)-এ মার্কস ও এঙ্গেলস স্পষ্ট লিখেছেন: "আধুনিক রাষ্ট্রের শাসন বিভাগ সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণির সাধারণ কার্যাবলি পরিচালনার কমিটি ছাড়া কিছু নয়।"
  • আইনসভা, আদালত, পুলিশ, সেনাবাহিনী সবই বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থরক্ষা ও শ্রমিক শ্রেণিকে শায়েস্তা করার বলপ্রয়োগকারী অস্ত্র।

৩. শ্রেণি সংগ্রাম ও বৈপ্লবিক রূপান্তর: ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে শোষক ও শোষিত শ্রেণির মধ্যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। পুঁজিবাদী সমাজে এই দ্বন্দ্ব বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতের (শ্রমিক) মধ্যে চরম রূপ ধারণ করে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হলো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব।

৪. সর্বহারার একনায়কত্ব ও রাষ্ট্রের বিলোপসাধন: বিপ্লবের পর সাময়িকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে 'সর্বহারার একনায়কত্ব', যার কাজ হবে পুঁজিবাদের অবশেষ নির্মূল করা। এরপর যখন শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন আর এক শ্রেণির ওপর অন্য শ্রেণির নিপীড়নের প্রয়োজন থাকবে না। ফলে লেনিনের ভাষায় রাষ্ট্র নিজে থেকেই ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হবে (Withering Away of the State)।
উদাহরণ 4
ইউনেস্কো (UNESCO) দ্বারা নির্দেশিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধি সংক্ষেপে বর্ণনা করো। (মান: ৮)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর: ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিসে ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে সমবেত আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির শীর্ষ সম্মেলনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধিকে চারটি প্রধান স্তম্ভে বিন্যস্ত করা হয়:

১. রাজনৈতিক তত্ত্ব (Political Theory):
  • মৌলিক ধারণাসমূহ: রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্ব, নাগরিকত্ব, স্বাধীনতা, সাম্য, ন্যায়বিচার, আইন ও অধিকারের গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
  • রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাস: প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো, অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের মেকিয়াভেলি, হবস, লক, রুশো, মিল, মার্কস প্রমুখের রাষ্ট্রদর্শনের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ।

২. রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান (Political Institutions):
  • সংবিধান ও শাসনব্যবস্থা: লিখিত ও অলিখিত সংবিধানের বৈশিষ্ট্য, মৌলিক অধিকার এবং বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনা।
  • সরকারের অঙ্গসমূহ: এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা এবং শাসন, আইন ও বিচার বিভাগের তুলনামূলক বিচার।
  • জনপ্রশাসন: আমলাতন্ত্র, প্রশাসনিক দক্ষতা, বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন (পঞ্চায়েত ও পুরসভা)।

৩. রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী ও জনমত:
  • দলীয় ব্যবস্থা: একদলীয়, দ্বিদলীয় ও বহুদলীয় ব্যবস্থা, নির্বাচন পদ্ধতি ও রাজনৈতিক মেরুকরণ।
  • চাপসৃষ্টিকারী দল: বণিক সভা, শ্রমিক সংগঠন, কৃষক সমিতি এবং বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী লবি কীভাবে সরকারি নীতিকে প্রভাবিত করে।
  • জনমত ও নাগরিক মাধ্যম: সংবাদমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে জনমত গঠনের প্রণালী।

৪. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (International Relations):
  • আন্তর্জাতিক রাজনীতি: বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ, শক্তির ভারসাম্য, কূটনীতি ও ভূ-রাজনীতি।
  • আন্তর্জাতিক সংগঠন ও আইন: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (UN) ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে দেশগুলির মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তি।
উদাহরণ 5
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাথে ইতিহাসের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করো। (মান: ৮)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর: রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, নিবিড় ও পরিপূরক। বহু তাত্ত্বিক এই দুই শাস্ত্রকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বলে গণ্য করেছেন।

১. পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (তাত্ত্বিকদের উক্তি):
  • স্যার জন সিলির অমর উক্তি: "ইতিহাস ছাড়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কোনো ফল নেই, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ছাড়া ইতিহাসের কোনো মূল নেই" (History without Political Science has no fruit; Political Science without History has no root)।
  • ফ্রিম্যানের মন্তব্য: "ইতিহাস হলো অতীতের রাজনীতি, আর রাজনীতি হলো বর্তমানের ইতিহাস।"

২. ইতিহাসের কাছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ঋণ:
  • উপাত্ত ও তথ্যভাণ্ডার: অতীত ইতিহাস রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থার উত্থান-পতনের বাস্তব উপাদান সরবরাহ করে।
  • প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: যেকোনো দেশের সংবিধান (যেমন ভারতের সংবিধান বা ব্রিটিশ সংসদীয় ব্যবস্থা) বুঝতে গেলে তার পেছনের ঐতিহাসিক আন্দোলন ও বিবর্তনকে জানতে হয়।
  • কাল্পনিক তত্ত্ব পরিহার: ইতিহাস বাস্তব দৃষ্টান্ত দেখিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অসম্ভব কল্পনাবিলাসী তত্ত্ব তৈরি থেকে বিরত রাখে।

৩. রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাছে ইতিহাসের ঋণ: ইতিহাস যদি কেবল সাল-তারিখ ও যুদ্ধের অন্ধ বিবরণী হয়, তবে তা প্রাণহীন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্র, সার্বভৌমত্ব, সাম্য ও ন্যায়ের মতো তাত্ত্বিক চোখ দিয়ে সেই ঘটনাগুলিকে বিচার করার বৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টি দান করে। ফরাসি বিপ্লব বা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামো ছাড়া বোঝা অসম্ভব।

৪. পার্থক্য: এত ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও ইতিহাস হলো অতীতের কালানুক্রমিক ও বর্ণনামূলক বিবরণ, আর রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো বিশ্লেষণাত্মক, তুলনামূলক ও ভবিষ্যতমুখী আদর্শনিষ্ঠ শাস্ত্র।
উদাহরণ 6
ডেভিড ইস্টনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা তত্ত্ব এবং হ্যারল্ড ল্যাসওয়েলের ক্ষমতা তত্ত্ব ব্যাখ্যা করো। (মান: ৮)
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আধুনিক আচরণবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দুই দিকপাল ডেভিড ইস্টন ও হ্যারল্ড ল্যাসওয়েল শাস্ত্রটিকে অভিনব বাস্তববাদী ভিত্তি দান করেন।

১. ডেভিড ইস্টনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা তত্ত্ব (Systems Theory): ১৯৫৩ সালে 'The Political System' গ্রন্থে ডেভিড ইস্টন রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে সংজ্ঞায়িত করেন "সমাজের জন্য মূল্যবোধের কর্তৃত্বপূর্ণ বরাদ্দ" (Authoritative Allocation of Values for a Society) হিসেবে।
  • ইনপুট (Input): সমাজ পরিবেশ থেকে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দুই ধরনের ইনপুট আসে—দাবি (জনগণের চাওয়া-পাওয়া) এবং সমর্থন (আইন মান্য করা, কর প্রদান)।
  • রূপান্তর প্রক্রিয়া (Conversion Process): সরকারের আইনসভা ও প্রশাসন এই দাবি ও সমর্থনগুলিকে পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
  • আউটপুট (Output): রূপান্তরের ফলে তৈরি হওয়া আইন, সরকারি আদেশ ও উন্নয়ন নীতি হলো আউটপুট।
  • ফিডব্যাক বা প্রতিক্রিয়া (Feedback Loop): সরকারি সিদ্ধান্তের ফলে সমাজে নতুন পরিবর্তন আসে, যা আবার নতুন দাবি ও সমর্থনের জন্ম দিয়ে ব্যবস্থাকে গতিশীল রাখে।

২. হ্যারল্ড ল্যাসওয়েলের ক্ষমতা তত্ত্ব: ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত 'Politics: Who Gets What, When, How' গ্রন্থে ল্যাসওয়েল রাজনীতিকে ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের বিজ্ঞানরূপে দেখিয়েছেন।
  • রাজনীতি হলো সমাজে মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সম্পদের অধিকার নির্ধারণের প্রক্রিয়া।
  • ল্যাসওয়েল ও কাপলানের মতে, ক্ষমতা হলো রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। সমাজে কার হাতে কতটা ক্ষমতা আছে এবং সেই ক্ষমতা কীভাবে অন্য মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে—রাষ্ট্রবিজ্ঞান তা-ই অধ্যয়ন করে।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

'রাজনীতি' ও 'রাষ্ট্রবিজ্ঞান'-কে একই ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

'রাজনীতি' হলো ক্ষমতা অর্জনের বাস্তব দৈনন্দিন ক্রিয়াকলাপ বা কৌশল; আর 'রাষ্ট্রবিজ্ঞান' হলো এই রাজনৈতিক ঘটনাবলি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানসম্মত নিয়মানুগ পাঠ।

সাধারণ ভুল ধারণা

রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে হয় পূর্ণাঙ্গ ল্যাবরেটরি বিজ্ঞান ভাবা অথবা সম্পূর্ণ বিজ্ঞানহীন ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

রাষ্ট্রবিজ্ঞান কোনো গবেষণাগারের পদার্থবিদ্যা নয়, আবার কাল্পনিক গল্পও নয়। এটি একটি নিয়মতান্ত্রিক 'সামাজিক বিজ্ঞান' (Social Science)।

সাধারণ ভুল ধারণা

মার্কসীয় তত্ত্বে রাষ্ট্রকে চিরন্তন সামাজিক প্রতিষ্ঠান মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

মার্কসবাদের মতে রাষ্ট্র একটি অস্থায়ী ঐতিহাসিক সৃষ্টি; শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রের কোনো প্রয়োজন থাকবে না এবং তা বিলুপ্ত হবে।

সাধারণ ভুল ধারণা

ডেভিড ইস্টনের ব্যবস্থা তত্ত্বকে সাধারণ সনাতন সংবিধানের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ইস্টনের ব্যবস্থাতত্ত্ব একটি আধুনিক আচরণবাদী ইনপুট-আউটপুট মডেল, যা আনুষ্ঠানিক আইনের বাইরে গিয়ে সামাজিক চাপ ও দাবির পর্যালোচনা করে।

চিত্রগত ব্যাখ্যা ও মডেল

একটি শাস্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান: প্রকৃতি, পরিধি ও দৃষ্টিভঙ্গির রূপরেখা WBCHSE একাদশ শ্রেণি • রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠের সনাতন, আধুনিক ও মার্কসীয় ধারা এবং বৈজ্ঞানিক স্বরূপ ১. উৎপত্তি ও মূল সংজ্ঞা • গ্রিক শব্দ 'Polis' (নগর-রাষ্ট্র) থেকে Politics • অ্যারিস্টটল: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক ('Master Science') • গার্নার: 'রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্রকে নিয়েই শুরু ও শেষ' • ল্যাসওয়েল: ক্ষমতা ও তার বণ্টনের বিজ্ঞান ২. প্রধান তিন দৃষ্টিভঙ্গি • সনাতন: রাষ্ট্র ও সরকারকেন্দ্রিক (গার্নার, ব্লুন্টশ্লি) • আধুনিক: ক্ষমতা, প্রভাব ও ব্যবস্থা (ইস্টন, ডাল) • মার্কসীয়: শ্রেণি দ্বন্দ্ব ও শোষণের যন্ত্র (মার্কস, এঙ্গেলস) • আচরণবাদ: তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ও মূল্যবোধ নিরপেক্ষতা ৩. পরিধি (ইউনেস্কো ১৯৪৮) • ১. রাজনৈতিক তত্ত্ব ও রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাস • ২. রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান (সংবিধান, সরকার, প্রশাসন) • ৩. রাজনৈতিক দল, চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী ও জনমত • ৪. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি ও বিশ্বব্যবস্থা ৪. রাষ্ট্রবিজ্ঞান কি বিজ্ঞান? — যুক্তির দ্বৈরথ ★ বিজ্ঞান না বলার পক্ষে যুক্তি (মেটল্যান্ড, বাকল):

সর্বজনীন সূত্রের অভাব, মানুষের আচরণ পরিবর্তনশীল ও অননুমেয়, গবেষণাগারে পরীক্ষা অসম্ভব, গবেষকের ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব।

★ বিজ্ঞান বলার পক্ষে যুক্তি (অ্যারিস্টটল, বোঁদা, গার্নার):

পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণ, তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও সুবিন্যস্ত জ্ঞানভাণ্ডার; এটি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নয়, বরং একটি গতিশীল সামাজিক বিজ্ঞান।

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
ইংরেজি 'Politics' শব্দটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ 'Polis' (নগর-রাষ্ট্র) থেকে উদ্ভূত হয়েছে।
মূল বিষয় 2
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয় এবং তিনি একে 'Master Science' আখ্যা দেন।
মূল বিষয় 3
অধ্যাপক জে. ডব্লিউ. গার্নার সনাতন সংজ্ঞা দেন: 'রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্রকে নিয়েই শুরু এবং রাষ্ট্রেই তার সমাপ্তি ঘটে'।
মূল বিষয় 4
সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রধানত আদর্শবাদী, ঐতিহাসিক এবং সংবিধান ও সরকারের মতো আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক।
মূল বিষয় 5
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আচরণবাদী বিপ্লবের ফলে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ক্ষমতা, প্রভাব ও বাস্তব রাজনৈতিক আচরণের অধ্যয়নে পরিণত হয়।
মূল বিষয় 6
ডেভিড ইস্টন তাঁর ব্যবস্থাতত্ত্বে রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে 'সমাজের জন্য মূল্যবোধের কর্তৃত্বপূর্ণ বরাদ্দ' বলে অভিহিত করেছেন।
মূল বিষয় 7
হ্যারল্ড ল্যাসওয়েলের মতে রাজনীতি হলো সমাজে 'কে কী পায়, কখন পায়, কীভাবে পায়' এবং ক্ষমতার গঠন ও বণ্টন।
মূল বিষয় 8
মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্র হলো অর্থনৈতিকভাবে বলীয়ান শাসক শ্রেণির শোষণ ও বলপ্রয়োগের হাতিয়ার, যা সাম্যবাদে বিলুপ্ত হবে।
মূল বিষয় 9
মেটল্যান্ডের মতো পণ্ডিতেরা একে বিজ্ঞান মানতে নারাজ হলেও এটি পদ্ধতিগত অনুসন্ধানের কারণে একটি গতিশীল সামাজিক বিজ্ঞান।
মূল বিষয় 10
১৯৪৮ সালের প্যারিস ইউনেস্কো সম্মেলনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধিকে তত্ত্ব, প্রতিষ্ঠান, দল/জনমত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ভাগ করা হয়।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
"মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব" — কার অমর উক্তি?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল, তাঁর রচিত 'পলিটিক্স' গ্রন্থে।
2
ডেভিড ইস্টনের মতে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান কাজ কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: সমাজের জন্য মূল্যবোধের কর্তৃত্বপূর্ণ বরাদ্দ নিশ্চিত করা (Authoritative allocation of values)।
3
১৯৪৮ সালে ইউনেস্কো নির্দেশিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চারটি পরিধি কী কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ১. রাজনৈতিক তত্ত্ব; ২. রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান; ৩. রাজনৈতিক দল, চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী ও জনমত; ৪. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

একটি শাস্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান: প্রকৃতি ও পরিধি অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।