আইসোস্ট্যাসি বা সমস্থিতি শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ—'Iso' (সমান বা সদৃশ) এবং 'Stasis' (স্থিতি বা সমভারসাম্য)—থেকে গৃহীত হয়েছে। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকান ভূতত্ত্ববিদ ক্ল্যারেন্স এডওয়ার্ড ডাটন (Clarence Edward Dutton) ভূত্বকীয় ভারসাম্যের এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি বোঝাতে সর্বপ্রথম 'আইসোস্ট্যাসি' শব্দটি ব্যবহার করেন।
ডাটনের মতে: "ভূত্বকের উপরিতলের বিভিন্ন উচ্চতাবিশিষ্ট ভূমিরূপগুলি (যেমন—উচ্চ পর্বত, মালভূমি, সমভূমি ও সমুদ্রতলদেশ) ভূঅভ্যন্তরের অপেক্ষাকৃত অধিক ঘন ও সান্দ্র ম্যাগমা বা অ্যাসথেনোস্ফিয়ারের ওপর অভিকর্ষীয় সাম্যাবস্থা বজায় রেখে অবস্থান করার সামগ্রিক প্রক্রিয়াকেই সমস্থিতি বলে।"
সমস্থিতি ধারণার উৎপত্তি ঘটেছিল ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক জরিপ কাজের সময়। ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে ভারতের তৎকালীন সার্ভেয়ার জেনারেল স্যার জর্জ এভারেস্ট (Sir George Everest) এবং পরবর্তীকালে অ্যান্ড্রু ওয়াহ (Andrew Waugh)-এর তত্ত্বাবধানে মধ্যাহ্নরেখার চাপ (Arc of the Meridian) পরিমাপ করার জন্য একটি মহা-জরিপ কার্য পরিচালিত হয়। এই জরিপের অধীনে দুটি প্রধান ভূ-স্থানিক কেন্দ্র নির্বাচন করা হয়েছিল:
- কালিয়ানা (Kaliana): অক্ষাংশ $29^\circ 30' 48'' \text{ N}$—হিমালয়ের পাদদেশের নিকটে (দেরাদুন ও সিমলা পাহাড়ের কাছাকাছি) অবস্থিত।
- কালিয়ানপুর (Kalianpur): অক্ষাংশ $24^\circ 07' 11'' \text{ N}$—কালিয়ানা থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় ৩৭০ মাইল (৫৯৫ কিমি) দূরে গাঙ্গেয় মধ্য সমভূমিতে অবস্থিত।
এই দুটি স্থানের পারস্পরিক দূরত্ব দুটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিমাপ করা হয়:
- ভূ-ত্রিকোণমিতিক পদ্ধতি (Triangulation Method): ইনভার টেপ ও থিওডোলাইটের সাহায্যে ভূপৃষ্ঠের সরাসরি সরলরৈখিক দূরত্বের জ্যামিতিক পরিমাপ।
- জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (Astronomical Method): জেনিথ টেলিস্কোপ ও ওলন দড়ি (Plumb-line)-এর সাহায্যে তারার অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে অক্ষাংশ নির্ণয়।
কলকাতার তৎকালীন আর্চডিকন এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ জন হেনরি প্র্যাট (Archdeacon John Henry Pratt) এই পার্থক্যের কারণ অনুসন্ধানে নামেন। তিনি হিমালয় পর্বতের দৃশ্যমান আয়তন ও শিলার গড় ঘনত্ব ($২.৭৫ \text{ গ্রাম/সেমি}^৩$) হিসাব করে দেখান যে, সুবিশাল হিমালয়ের অতিরিক্ত ভরের কারণে কালিয়ানা কেন্দ্রে ওলন দড়িটি উত্তর দিকে $১৫.৮৮৫''$ আকৃষ্ট হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ওলন দড়ি মাত্র $৫.২৩৬''$ বিচ্যুত হয়েছে! অর্থাৎ:
$$\text{প্রকৃত পরিলক্ষিত বিচ্যুতি} = ৫.২৩৬''$$
$$\text{অনুপস্থিত বিচ্যুতি বা ভরের ঘাটতি} = ১৫.৮৮৫'' - ৫.২৩৬'' = ১০.৬৪৯''$$
প্র্যাট অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন যে, হিমালয় পর্বত তার বিপুল বাহ্যিক ভর সত্ত্বেও ওলন দড়িকে প্রত্যাশার এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও কম আকর্ষণ করছে। এর থেকে প্রমাণিত হলো যে হিমালয় পর্বতের নিচে কোনো অদৃশ্য হালকা শিলার অভাব বা ভূগর্ভস্থ ভরের ঘাটতি (Mass Deficiency) রয়েছে। এই অমীমাংসিত ধাঁধাই জন্ম দিল এয়ারি ও প্র্যাটের যুগান্তকারী তত্ত্বের।