পটল বিরূপণ আলোড়ন (Diastrophism)
ভূ-অভ্যন্তরীণ প্রবল চাপের প্রভাবে ভূত্বকের শিলাস্তরে যে অতি ধীর ও দীর্ঘমেয়াদী বক্রতা, অবনমন, উত্থান বা স্থানচ্যুতি ঘটে, তাকে সামগ্রিকভাবে পটল বিরূপণ (Diastrophism) বলে। আলোড়নের অভিমুখ অনুযায়ী এটি দুই প্রকার:
ক. মহীভাবক আলোড়ন (Epeirogenic Forces — মহাদেশ গঠনকারী)
গ্রিক শব্দ 'Epeiros' (মহাদেশ) থেকে উৎপন্ন। এটি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ বরাবর উল্লম্বভাবে (Vertical) কার্যকর হয়। এর ফলে শিলাস্তরে কোনো প্রবল ভাঁজ বা চ্যুতি ছাড়াই বিশাল মহাদেশীয় ভূভাগ গঠিত বা স্থানান্তরিত হয়:
- উত্থান (Emergence): মহাদেশীয় ভূভাগ বা সমুদ্রতট সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে উঠে আসা (যেমন—আন্দামান নিকোবর ও কাথিয়াওয়াড় উপকূলের উত্থিত প্রবাল প্রাচীর)।
- নিমজ্জন (Submergence): সমুদ্র উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ স্থলভাগ জলের নিচে বসে যাওয়া (যেমন—গুজরাটের দ্বারকা উপকূলের নিমজ্জিত প্রাচীন ভূখণ্ড ও সুন্দরবনের নিমজ্জিত বনভূমি)।
খ. গিরিজনি আলোড়ন (Orogenic Forces — পর্বত নির্মাণকারী)
গ্রিক শব্দ 'Oros' (পর্বত) থেকে উৎপন্ন। এটি ভূত্বকের স্পর্শক বরাবর অনুভূমিকভাবে (Horizontal / Tangential) কার্যকর হয়। এর দ্বারা দুটি প্রধান পীড়ন বল সৃষ্টি হয়:
- সংনমন বল (Compressional Force): পরস্পরের মুখোমুখি ক্রিয়াশীল অনুভূমিক চাপে শিলাস্তর সংকুচিত হয়ে ঢেউয়ের মতো বেঁকে ভঙ্গিল পর্বত (যেমন—হিমালয়, আল্পস, আন্দিজ, রকি) সৃষ্টি করে।
- টান বল (Tensional Force): বিপরীতমুখী অনুভূমিক টানের ফলে শিলাস্তরে টান ধরে ফাটল ও চ্যুতি (Fault) গঠিত হয়।
গ. ভাঁজের গঠন ও প্রকারভেদ (Folding)
পার্শ্বীয় সংনমন চাপের ফলে পাললিক শিলাস্তরে সৃষ্ট তরঙ্গায়িত ঢেউকে ভাঁজ (Fold) বলে। ভাঁজের প্রধান অঙ্গসমূহ:
- ঊর্ধ্বভঙ্গ (Anticline): উত্তল আকৃতির ভাঁজ যার বাহু দুটি মধ্যস্থ অক্ষীয় তল থেকে দুদিকে বিপরীত দিকে ঢালু হয়ে প্রসারিত হয়। এর কেন্দ্রে প্রাচীনতম শিলা উন্মুক্ত থাকে।
- অধোভঙ্গ (Syncline): অবতল আকৃতির দ্রোণীর মতো ভাঁজ যার বাহু দুটি কেন্দ্রমুখী ঢালু হয়ে মিলিত হয়। এর কেন্দ্রে নবীনতম শিলা অবস্থান করে।
- বাহু (Limbs): ভাঁজের শীর্ষ ও দ্রোণীর মধ্যবর্তী ঢালু শিলাস্তর।
- অক্ষতল (Axial Plane): যে কাল্পনিক তল ভাঁজটিকে প্রতিসম বা অপ্রতিসম দুটি অর্ধাংশে বিভক্ত করে।
| ভাঁজের প্রকার |
গঠনগত বৈশিষ্ট্য |
পীড়নের মাত্রা |
| সমপ্রতিসম ভাঁজ (Symmetrical) |
উভয় বাহুর নতি কোণ সমান এবং অক্ষতল সম্পূর্ণ উল্লম্ব ($90^\circ$)। |
উভয় পাশ থেকে সমান ও সুষম সংনমন বল। |
| অপ্রতিসম ভাঁজ (Asymmetrical) |
একটি বাহুর নতি মৃদু এবং অপর বাহুর নতি খাড়া; অক্ষতল তির্যকভাবে হেলে থাকে। |
একপাশের সংনমন বল অপেক্ষাকৃত বেশি শক্তিশালী। |
| সমপ্রবণ ভাঁজ (Isoclinal) |
উভয় বাহু একই দিকে সমকোণে বা প্রায় সমান্তরালভাবে হেলে থাকে। |
অত্যধিক তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী একমুখী সংকোচন। |
| শায়িত ভাঁজ (Recumbent) |
অক্ষতল এবং উভয় বাহু উল্টে গিয়ে অনুভূমিক সমতলের প্রায় সমান্তরালে শায়িত থাকে। |
চরম মাত্রার একমুখী পার্শ্বীয় ধাক্কা। |
| ন্যাপ (Nappe / Overthrust) |
শায়িত ভাঁজের নিচের বাহু চরম টানে ছিঁড়ে গিয়ে থ্রাস্ট তল বরাবর কয়েক কিলোমিটার দূরে নবীন শিলার উপর চড়ে যায়। |
হিমালয় ও আল্পস পর্বতের মতো চরম গিরিজনি আলোড়ন (যেমন—গাড়োয়াল হিমালয়ের ক্রোল ন্যাপ)। |
ঘ. চ্যুতি ও সংশ্লিষ্ট ভূমিরূপ (Faulting)
ভূত্বকীয় টানের বা সংকোচনের ফলে শিলাস্তরে ফাটল সৃষ্টির পর যখন ফাটলের দুপাশের শিলাখণ্ড পরস্পর আপেক্ষিকভাবে স্থানচ্যুত হয়, তাকে চ্যুতি (Fault) বলে। চ্যুতির প্রধান উপাদান: চ্যুতি তল (Fault Plane), ঝুলন্ত প্রাচীর (Hanging Wall), পদ প্রাচীর (Footwall), উল্লম্ব চ্যুতি (Throw) এবং অনুভূমিক চ্যুতি (Heave)।
- সাধারণ চ্যুতি (Normal Fault): টান বলের প্রভাবে গঠিত হয়; ঝুলন্ত প্রাচীর পদ প্রাচীরের সাপেক্ষে নিচের দিকে নেমে যায়।
- বিপরীত চ্যুতি (Reverse / Thrust Fault): সংনমন বলের প্রভাবে গঠিত হয়; ঝুলন্ত প্রাচীর পদ প্রাচীরের উপর উঠে যায়। চ্যুতি কোণ ৪৫ ডিগ্রির কম হলে তাকে নতি চ্যুতি বা থ্রাস্ট (Thrust) বলে।
- স্তূপ পর্বত (Horst / Block Mountain): দুটি সমান্তরাল চ্যুতির মধ্যবর্তী ভূখণ্ড ভূ-আলোড়নের চাপে উপরে উঠে গেলে অথবা পাশের ভূখণ্ড নিচে বসে গেলে মধ্যবর্তী খাড়া ঢালযুক্ত উঁচু ভূভাগকে স্তূপ পর্বত বলে (যেমন—ভারতের সাতপুরা পর্বত, জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্ট ও ফ্রান্সের ভোজ পর্বত)।
- গ্রস্ত উপত্যকা (Graben / Rift Valley): দুটি সমান্তরাল চ্যুতির মধ্যবর্তী অংশ ভূ-ত্বকীয় টানের ফলে নিচে বসে গিয়ে যে দীর্ঘ, সংকীর্ণ খাড়া দেওয়ালযুক্ত উপত্যকা গড়ে তোলে, তাকে গ্রস্ত উপত্যকা বলে (যেমন—আফ্রিকার গ্রেট রিফ্ট ভ্যালি, ইউরোপের রাইন নদী উপত্যকা এবং ভারতের নর্মদা ও তাপ্তি নদী উপত্যকা)।