পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে ভূপৃষ্ঠকে চাদরের মতো বেষ্টন করে থাকা বর্ণহীন, গন্ধহীন ও স্বাদহীন বায়বীয় আবরণকে বায়ুমণ্ডল (Atmosphere) বলে। সমুদ্রপৃষ্ঠে শুষ্ক বায়ুর প্রধান রাসায়নিক উপাদানসমূহ নিম্নরূপ:
উষ্ণতার পরিবর্তন এবং ভৌত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বায়ুমণ্ডলকে উল্লম্বভাবে পাঁচটি প্রধান স্তরে ভাগ করা হয়:
- ১. ট্রপোস্ফিয়ার বা ক্ষুব্ধমণ্ডল (Troposphere): বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন ও ঘন স্তর। নিরক্ষরেখায় এর উচ্চতা প্রায় ১৮ কিমি এবং মেরু অঞ্চলে প্রায় ৮ কিমি (গড় উচ্চতা ১২ কিমি)। সমগ্র বায়ুমণ্ডলের ভরের ৭৫% এবং জলীয় বাষ্পের প্রায় ৯৯% এই স্তরে থাকে। এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে উষ্ণতা কমতে থাকে, যাকে স্বাভাবিক উষ্ণতা হ্রাসের হার (Normal Lapse Rate) বলে; এর মান প্রতি ১,০০০ মিটার উচ্চতায় ৬.৫°C (বা প্রতি ১৬৫ মিটারে ১°C)। মেঘ, ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত সমস্ত আবহাওয়াগত গোলযোগ এই স্তরে ঘটে বলে একে ক্ষুব্ধমণ্ডল বলে। এর ঊর্ধ্বসীমাকে ট্রপোপজ (Tropopause) বলে (উষ্ণতা প্রায় -৮০°C)।
- ২. স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার বা শান্তমণ্ডল (Stratosphere): ট্রপোপজের ওপর থেকে ৫০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। নিচের অংশে উষ্ণতা স্থির (-৫৬°C) থাকে, কিন্তু ওপরের দিকে বৃদ্ধি পেয়ে স্ট্র্যাটোপজে ০°C হয়। এই স্তরের ১৫ থেকে ৩৫ কিমির মধ্যে ওজোন স্তর (Ozonosphere) অবস্থিত, যা সূর্যের অতিবেগুনি ক্ষতিকারক রশ্মি (UV-B, UV-C) শোষণ করে জীবজগৎকে রক্ষা করে। জলীয় বাষ্প ও ধূলিকণাহীন শান্ত পরিবেশের কারণে এই স্তর দিয়ে দ্রুতগামী জেট বিমান চলাচল করে।
- ৩. মেসোস্ফিয়ার (Mesosphere): স্ট্র্যাটোপজের ওপর ৫০ কিমি থেকে ৮০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে উষ্ণতা দ্রুত হ্রাস পায় এবং এর শীর্ষে অবস্থিত মেসোপজে বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা -১০০°C নথিবদ্ধ হয়। মহাকাশ থেকে ছুটে আসা উল্কাপিণ্ড এই স্তরের ঘর্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। গ্রীষ্মকালে মেরু অঞ্চলে নৈশদ্যুতি মেঘ (Noctilucent clouds) গঠিত হয়।
- ৪. থার্মোস্ফিয়ার বা আয়নোস্ফিয়ার (Thermosphere / Ionosphere): ৮০ কিমি থেকে ৪০০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। অতিবেগুনি রশ্মি ও এক্স-রশ্মির প্রভাবে গ্যাসীয় অণুগুলো আয়নে বিশ্লিষ্ট থাকে। উষ্ণতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ১,৫০০°C ছাড়িয়ে যায়। আয়নিত স্তরের বিভিন্ন স্তর (D, E ও F বা অ্যাপেলটন স্তর) ভূপৃষ্ঠের বেতার তরঙ্গকে প্রতিফলিত করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেয়। সৌরবায়ুর সাথে সংঘর্ষে এখানে আকাশে চমৎকার আলোকচ্ছটা বা মেরুপ্রভা (সুমেরু প্রভা ও কুমেরু প্রভা) সৃষ্টি হয়।
- ৫. এক্সোস্ফিয়ার ও ম্যাগনেটোস্ফিয়ার (Exosphere): ৪০০ কিমি থেকে ১০,০০০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত বায়ুমণ্ডলের প্রান্তিক স্তর, যেখানে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম প্রাধান্য পায় এবং গ্যাসীয় অণু মহাশূন্যে বিলীন হয়। এর ওপরে ভ্যান অ্যালেন বিকিরণ বলয়যুক্ত চৌম্বকমণ্ডল অবস্থান করে।