পৃথিবী ও সৌরজগতের সৃষ্টি কীভাবে হয়েছিল—এই প্রশ্নের উত্তরে জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞগণ বিভিন্ন মতবাদ উপস্থাপন করেছেন, যা প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত:
ভিত্তি: নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট অনুমান করেন যে মহাশূন্যে আদিতে শীতল, স্থির ও কঠিন আদিম কণা (Primordial matter / Urstoff) বিক্ষিপ্ত ছিল। পারস্পরিক মহাকর্ষীয় আকর্ষণের ফলে কণাগুলি একে অপরের সাথে ধাক্কা খেতে শুরু করে। কান্টের মতে, এই সংঘর্ষের ফলে তাপ ও ঘূর্ণন গতির সৃষ্টি হয় এবং শীতল কণাগুলি একটি উত্তপ্ত, দ্রুত ঘূর্ণায়মান গ্যাসীয় নীহারিকায় রূপান্তরিত হয়, যা থেকে বলয় আকারে গ্রহসমূহ নির্গত হয়।
ত্রুটি: এই মতবাদ পদার্থবিজ্ঞানের কৌণিক ভরবেগ সংরক্ষণ নীতি (Law of Conservation of Angular Momentum) লঙ্ঘন করে। স্থির কণার সংঘর্ষ থেকে কখনো স্বতঃস্ফূর্ত ঘূর্ণন সৃষ্টি হতে পারে না।
মূল বক্তব্য: ফরাসি গণিতবিদ পিয়ের-সাইমন লাপ্লাস কান্টের ত্রুটি সংশোধন করে বলেন যে মহাকাশে আদি থেকেই একটি অতি উত্তপ্ত এবং ঘূর্ণায়মান আদিম গ্যাসীয় নীহারিকা বিদ্যমান ছিল। মহাশূন্যে বিকিরণের মাধ্যমে তাপ হারিয়ে নীহারিকাটি সংকুচিত হতে থাকে। কৌণিক ভরবেগের নিত্যতা অনুযায়ী ব্যাসার্ধ কমায় এর ঘূর্ণন গতি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ঘূর্ণন বৃদ্ধির ফলে নিরক্ষীয় অঞ্চলে কেন্দ্রাতিগ বল (Centrifugal Force) মধ্যাকর্ষণকে অতিক্রম করে যায় এবং পরপর কয়েকটি বৃত্তাকার গ্যাসীয় বলয় ছিটকে বেরিয়ে আসে। এই বলয়গুলি শীতল ও ঘনীভূত হয়ে একেকটি গ্রহে পরিণত হয় এবং কেন্দ্রীয় অবশিষ্ট অংশটি আজকের সূর্যে রূপ নেয়।
দ্বিতারকা মতবাদ: স্যার জেমস জিন্স ও হ্যারল্ড জেফ্রিস প্রস্তাব করেন যে আমাদের আদি সূর্যের নিকট দিয়ে মহাশূন্যে একটি বিশালাকার 'আগন্তুক নক্ষত্র' (Intruding Star) অগ্রসর হয়েছিল। সেই ভারী নক্ষত্রের প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় জোয়ারি টানে সূর্যের দেহ থেকে একটি বিশালাকার চুরুট বা মাকু আকৃতির (Spindle-shaped / Cigar-shaped) গ্যাসীয় শিখা (Filament) বেরিয়ে আসে। নক্ষত্রটি দূরে চলে গেলে এই শিখাটি সূর্যের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মাকু আকৃতির শিখাটির মাঝের অংশ মোটা এবং দুই প্রান্ত সরু ছিল। তাই শিখাটি ঘনীভূত হয়ে বৃহস্পতি ও শনির মতো বিশালাকার কেন্দ্রীয় গ্রহ এবং বুধ, মঙ্গল, ইউরেনাস ও নেপচুনের মতো ক্ষুদ্রাকার প্রান্তীয় গ্রহের সৃষ্টি করেছে।
বেলজিয়ান বিজ্ঞানী জর্জেস লেমেত্র (Georges Lemaître, ১৯২৭) এবং পরবর্তীতে এডউইন হাবল (Edwin Hubble, ১৯২৯)-এর পর্যবেক্ষণমূলক আবিষ্কার। প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্বের সমস্ত ভর ও শক্তি একটি অসীম ঘন ও উত্তপ্ত বিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল। সেখানে এক প্রচণ্ড মহাবিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে মহাবিশ্বের প্রসারণ শুরু হয়। প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে সৌর নীহারিকার সংকুচিত কুণ্ডলী থেকে আমাদের সূর্য ও পৃথিবীর সৃষ্টি হয়।