Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি XI • Geography • অধ্যায় 6
আনুমানিক সময়: ৪৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

বারিমণ্ডল

বারিমণ্ডল (Hydrosphere) পৃথিবীর সামগ্রিক জলরাশির সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশাল প্রাকৃতিক পরিমণ্ডল, যা ভূত্বকের প্রায় ৭১ শতাংশ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত এবং ভূপৃষ্ঠের পরিবেশ ও জীবমণ্ডল পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে। পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের একাদশ শ্রেণির প্রাকৃতিক ভূগোল পাঠ্যক্রমের অন্তর্গত এই অধ্যায়ে সমুদ্রবিজ্ঞান বা সমুদ্রবিদ্যার মূল বিষয়বস্তু নিখুঁতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। পৃথিবীর মোট জলের প্রায় ৯৭.২ শতাংশ লবণাক্ত জল মহাসাগরে সঞ্চিত রয়েছে, যা সুবিশাল সমুদ্র অববাহিকায় মহীসোপান, খাড়া মহীঢাল, সাবমেরিন ক্যানিয়ন, গভীর সমভূমি, মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরা এবং ১১ কিলোমিটারেরও বেশি গভীর সমুদ্রখাত জুড়ে বিন্যস্ত। সমুদ্রজলের উষ্ণতা ও লবণতার অনুভূমিক ও উল্লম্ব স্তরায়ণ সৃষ্টি করে থার্মোক্লাইন ও হ্যালোস্কেলাইন স্তর। এছাড়া বায়ুপ্রবাহ ও কোরিওলিস বলের দ্বারা উপসাগরীয় স্রোত এবং ভারত মহাসাগরের মৌসুমি স্রোতের মতো মহাসাগরীয় আবর্তন পরিচালিত হয়। চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় টানে সৃষ্ট জোয়ার-ভাটা এবং পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর ঐতিহাসিক বান ডাকার প্রাকৃতিক মেকানিজম এই পরিমণ্ডলের অন্যতম প্রধান গতিশীল বৈশিষ্ট্য।

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য বারিমণ্ডলের অধ্যয়ন কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি রাজ্য ও দেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। মহাসাগর হলো বিশ্বের সর্বপ্রধান তাপ নিয়ন্ত্রক, যা ক্রান্তীয় অঞ্চল থেকে মেরু অঞ্চলের দিকে তাপ পুনর্বণ্টন করে বিশ্ব জলবায়ুকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর একদিকে যেমন রাজ্যের আবহাওয়া ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতকে নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি এটি ঘন ঘন বিধ্বংসী ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের উৎসস্থল। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র মোহনায় অবস্থিত বিশ্বখ্যাত সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড নামক সাবমেরিন ক্যানিয়ন এই সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ, দুর্গাদুয়ানি ক্রিকের জোয়ার শক্তি প্রকল্প, সামুদ্রিক লবণ ও খনিজ সম্পদ আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবনের দ্বীপগুলির নিমজ্জনের মতো বাস্তব সংকট মোকাবিলায় বারিমণ্ডলের বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি অপরিহার্য।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. জলচক্র ও সমুদ্রতলের রূপতাত্ত্বিক...
2 ২. সমুদ্রজলের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম:...
3 ৩. সমুদ্রজলের গতিশীলতা: সমুদ্রস্রোত...
4 ৪. জোয়ার-ভাটা: উৎপত্তির কারণ, তিথি...
5 ৫. সমুদ্রতলের অবক্ষেপণ: স্থলজাত, জৈ...
6 ৬. সামুদ্রিক সম্পদ, ব্লু ইকোনমি ও প...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. জলচক্র ও সমুদ্রতলের রূপতাত্ত্বিক ভূপ্রকৃতি (Ocean Floor Morphology)

বৈশ্বিক জল বাজেট ও জলচক্র

বারিমণ্ডল একটি মুক্ত ও গতিশীল ব্যবস্থা, যা সৌরশক্তি চালিত জলচক্রের (Hydrological Cycle) মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল, অশ্মমণ্ডল ও জীবমণ্ডলের সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত। পৃথিবীতে মোট জলের পরিমাণ প্রায় ১৩৮ কোটি ৬০ লক্ষ ঘনকিলোমিটার ($১.৩৮৬ \times ১০^৯ \text{ কিমি}^৩$):

জলভাণ্ডারের প্রকৃতি মোট আয়তন (ঘন কিমি) মোট জলের শতকরা হার (%) মিষ্টি জলের শতকরা হার (%)
বিশ্বের মহাসাগরসমূহ (লবণাক্ত) $১,৩৩৮,০০০,০০০$ $৯৬.৫৪\%$ —
হিমবাহ ও মেরু বরফছত্র $২৪,০৬৪,০০০$ $১.৭৪\%$ $৬৮.৭\%$
ভূগর্ভস্থ জল (মিষ্টি ও লবণাক্ত) $২৩,৪০০,০০০$ $১.৬৯\%$ $৩০.১\%$
হ্রদ, নদী ও বায়ুমণ্ডলীয় জলীয় বাষ্প $১৮০,০০০$ $০.০৩\%$ $১.২\%$
সমুদ্রবক্ষের প্রধান রূপতাত্ত্বিক বিভাগসমূহ

সমুদ্রের তলদেশ কোনো সমতল অববাহিকা নয়; এতে রয়েছে স্থলভাগের চেয়েও বৈচিত্র্যময় গিরিখাত, মালভূমি ও পর্বতমালা। সমুদ্রবক্ষকে চারটি প্রধান ধ্রুপদী বিভাগে বিভক্ত করা হয়:

  1. মহীসোপান (Continental Shelf):
    • উপকূলের সংলগ্ন সমুদ্রের নিচে নিমজ্জিত মহাদেশের মৃদু ঢালু প্রান্তীয় অংশ।
    • গড় ঢাল অত্যন্ত মৃদু—প্রায় ১° (প্রতি কিলোমিটারে ১ থেকে ২ মিটার পতন)।
    • মহীসোপানের প্রান্তদেশের (Shelf-Break) গড় গভীরতা প্রায় ১৩০ থেকে ২০০ মিটার।
    • প্রস্থের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈচিত্র্য দেখা যায়: চিলির উপকূলে মাত্র কয়েক কিমি, কিন্তু সাইবেরিয়ার সুমেরু উপকূলে প্রায় ১৫০০ কিমি। বঙ্গোপসাগরের সুন্দরবন সংলগ্ন মহীসোপান প্রায় ১৬০ কিমি চওড়া।
    • অর্থনৈতিক গুরুত্ব: সূর্যালোক পৌঁছানোর কারণে এটি 'ফোটিক জোন' (Photic Zone); বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মৎস্যক্ষেত্র (ডগার্স ব্যাংক, গ্র্যান্ড ব্যাংকস), তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস ভাণ্ডার (বোম্বে হাই) এবং সমুদ্র উপকূলীয় বালিতে মোনাজাইট-ইলমেনাইট খনিজ পাওয়া যায়।
  2. মহীঢাল (Continental Slope):
    • মহীসোপানের প্রান্ত থেকে হঠাৎ খাড়াভাবে নেমে যাওয়া সমুদ্রের ঢালু অংশ।
    • ঢালের পরিমাণ খাড়া—প্রায় ২° থেকে ৫° (কিছু টেকটনিক অঞ্চলে ২০° পর্যন্ত)।
    • গভীরতা ২০০ মিটার থেকে শুরু হয়ে ৩০০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
    • এটি মহাদেশীয় হালকা সিয়াল (SIAL) ভূত্বক এবং মহাসাগরীয় ভারী সাইমা (SIMA) ভূত্বকের মধ্যকার প্রধান ভূতাত্ত্বিক সীমানা।
    • সাবমেরিন ক্যানিয়ন (Submarine Canyon): মহীঢাল বরাবর গভীর V-আকৃতির উপত্যকা দেখা যায়, যা মূলত কর্দমাক্ত ঘোলা জলের তীব্র স্রোতের (Turbidity Current) ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্টি হয়। সুন্দরবনের দক্ষিণে অবস্থিত 'সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড' (Swatch of No Ground) বঙ্গোপসাগরের একটি বিখ্যাত সাবমেরিন ক্যানিয়ন, যা গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের পলি গভীর সমুদ্রে পরিবাহিত করে বিশ্বের বৃহত্তম 'বেঙ্গল ফ্যান' গড়ে তুলেছে।
  3. মহী-উত্থান (Continental Rise):
    • মহীঢালের পাদদেশে টার্বিডিটি স্রোতের দ্বারা বাহিত পলি সঞ্চিত হয়ে গড়ে ওঠা মৃদু ঢালু ($০.৫^\circ - ১^\circ$) পলল মঞ্চ, যা ৩০০০ থেকে ৪০০০ মিটার গভীরতায় গভীর সমুদ্রের সমভূমির সাথে মিলিত হয়।
  4. গভীর সমুদ্রের সমভূমি (Abyssal Plain):
    • ৩০০০ থেকে ৬০০০ মিটার গভীরতায় অবস্থিত অত্যন্ত বিস্তৃত ও প্রায় সমতল তলদেশ, যা সমুদ্রবক্ষের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা জুড়ে অবস্থান করছে।
    • এখানে সূক্ষ্ম জৈব সিন্ধুমল (Ooze) ও লাল কাদার সমতল স্তর জমে আগ্নেয় পর্বতমালা ঢাকা পড়ে থাকে।
শৈলশিরা, সমুদ্রখাত ও গায়ট
  • মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরা (Mid-Oceanic Ridge): অপসারী পাত সীমানা বরাবর ভূ-অভ্যন্তরীণ ম্যাগমার উদগীরণে গড়ে ওঠা ৬৫,০০০ কিমি দীর্ঘ নিমজ্জিত পর্বতশ্রেণী। আটলান্টিক মহাসাগরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এস-আকৃতির মিড-আটলান্টিক শৈলশিরা ১৬,০০০ কিমি দীর্ঘ। এর মাঝখানে চ্যুতি উপত্যকা এবং কালো ধোঁয়া উদগীরণকারী হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট দেখা যায়।
  • সমুদ্রখাত (Ocean Trenches): অভিসারী পাত সীমানায় মহাসাগরীয় পাত অন্য পাতের নিচে প্রবেশ করলে অত্যন্ত গভীর, খাড়া V-আকৃতির সমুদ্রখাত তৈরি হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা খাতের চ্যালেঞ্জার ডিপ (১১,০২২ মিটার) পৃথিবীর গভীরতম স্থান। ভারত মহাসাগরের গভীরতম খাত হলো সুন্দা বা জাভা খাত (৭,৪৫০ মিটার)।
  • গায়ট (Guyot): সমুদ্রগর্ভের যে সকল আগ্নেয় পর্বতের চূড়া এককালে সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে তরঙ্গ ক্ষয়ের ফলে সমতল হয়ে গিয়েছিল এবং পরে ভূত্বকের অবনমনে সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে গেছে, তাদের সমতল-শীর্ষ গায়ট বলে।

২. সমুদ্রজলের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম: উষ্ণতা, লবণতা ও ঘনত্ব স্তরায়ণ

সমুদ্রজলের উষ্ণতা বণ্টন

সমুদ্রের জলভাগের উষ্ণতা মূলত সৌর বিকিরণ, অক্ষাংশীয় অবস্থান, সমুদ্রস্রোত এবং পরিচলন মিশ্রণের ওপর নির্ভর করে। একে অনুভূমিক ও উল্লম্ব—দুটি ভাগে আলোচনা করা হয়:

১. অনুভূমিক উষ্ণতা বণ্টন:

  • নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের জলের উষ্ণতা ক্রমাগত কমতে থাকে: নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রায় $২৬^\circ - ২৮^\circ\text{C}$ থেকে মেরু অঞ্চলে $০^\circ\text{C}$ বা তার নিচে পৌঁছায়।
  • স্থলবেষ্টিত প্রান্তীয় সাগরে গ্রীষ্মকালে উষ্ণতা চরম আকার ধারণ করে: পারস্য উপসাগরে প্রায় $৩৮^\circ\text{C}$ এবং লোহিত সাগরে $৩২^\circ\text{C}$ উষ্ণতা রেকর্ড করা হয়।
  • সমউষ্ণরেখাগুলি (Isotherms) উষ্ণ স্রোতের প্রভাবে মেরুর দিকে এবং শীতল স্রোতের প্রভাবে নিরক্ষরেখার দিকে বেঁকে যায়।

২. উল্লম্ব উষ্ণতা স্তরবিন্যাস (The Three-Tier Ocean):

  • উপরি পৃষ্ঠীয় মিশ্র স্তর (Surface Mixed Layer) ($০ - ২০০ \text{ মিটার}$): সূর্যালোকিত ও উষ্ণ স্তর ($২০^\circ - ২৫^\circ\text{C}$), যা বায়ুপ্রবাহ ও তরঙ্গের আন্দোলনে সর্বদা মিশ্রিত থাকে।
  • থার্মোক্লাইন স্তর (Thermocline) ($২০০ - ১০০০ \text{ মিটার}$): এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ স্তর, যেখানে গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সমুদ্রজলের উষ্ণতা অত্যন্ত দ্রুত হারে হ্রাস পায়। মাত্র ৮০০ মিটার গভীরতার ব্যবধানে তাপমাত্রা $২০^\circ\text{C}$ থেকে নেমে $৪^\circ\text{C}$-এ দাঁড়ায়। এই স্তরটি উপরের হালকা উষ্ণ জল এবং নিচের ভারী শীতল জলের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করে।
  • গভীর সমতাপ সমুদ্র স্তর (Deep Ocean Layer) ($>১০০০ \text{ মিটার}$ থেকে তলদেশ): সমুদ্রের প্রায় ৮০% জল এই স্তরে অবস্থান করে। মেরু অঞ্চল থেকে নেমে আসা অতি-শীতল জলের কারণে এই স্তরের তাপমাত্রা সারা বছর প্রায় ১°C থেকে ৩°C-এর মধ্যে স্থির থাকে।
সমুদ্রজলের লবণতা ও ডিটমারের স্থির অনুপাত নীতি

লবণতা (Salinity) হলো ১০০০ গ্রাম বা ১ কিলোগ্রাম সমুদ্রজলে দ্রবীভূত কঠিন খনিজ পদার্থের মোট ভর (গ্রামে প্রকাশিত), যাকে প্রতি হাজার বা Parts Per Thousand (‰) এককে প্রকাশ করা হয়। বিশ্বের সমুদ্রজলের গড় লবণতা হলো ৩৫‰ (অর্থাৎ ১ কেজি জলে ৩৫ গ্রাম লবণ)।

১৮৮৪ সালে স্কটিশ রসায়নবিদ উইলিয়াম ডিটমার (William Dittmar) এইচএমএস চ্যালেঞ্জার অভিযানের ৭৭টি বিশ্বজনীন জলের নমুনা বিশ্লেষণ করে তাঁর বিখ্যাত স্থির অনুপাত নীতি (Dittmar's Principle of Constant Proportions) প্রকাশ করেন: "সমুদ্রের সামগ্রিক লবণতার পরিমাণ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবর্তিত হলেও, সমুদ্রজলে দ্রবীভূত প্রধান লবণগুলির পারস্পরিক শতকরা অনুপাত সর্বত্র অপরিবর্তিত ও ধ্রুবক থাকে।"

দ্রবীভূত রাসায়নিক লবণ প্রতি কেজি জলে পরিমাণ (গ্রাম) মোট লবণের শতকরা হার (%)
সোডিয়াম ক্লোরাইড ($NaCl$) $২৭.২১৩$ $৭৭.৭\%$
ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড ($MgCl_2$) $৩.৮০৭$ $১০.৯\%$
ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ($MgSO_4$) $১.৬৫৮$ $৪.৭\%$
ক্যালসিয়াম সালফেট ($CaSO_4$) $১.২৬০$ $৩.৬\%$
পটাশিয়াম সালফেট ($K_2SO_4$) $০.৮৬৩$ $২.৫\%$
ক্যালসিয়াম কার্বনেট ($CaCO_3$) $০.১২৩$ $০.৩\%$
ম্যাগনেসিয়াম ব্রোমাইড ($MgBr_2$) $০.০৭৬$ $০.২\%$
আঞ্চলিক বৈষম্য: বঙ্গোপসাগর বনাম আরব সাগর
  • বঙ্গোপসাগর বনাম আরব সাগরের বৈপরীত্য:
    • বঙ্গোপসাগর (৩০‰ থেকে ৩২‰): এখানে লবণতার মাত্রা অস্বাভাবিক কম, সুন্দরবনের কাছে তা ২৮‰-এর নিচে নেমে যায়। কারণ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, গোদাবরী ও মহানদী নদীর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মিষ্টি জল সাগরে মেশে এবং বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
    • আরব সাগর (৩৬‰ থেকে ৩৭‰): থর মরুভূমি ও আরব উপদ্বীপের শুষ্ক বাতাসের কারণে বাষ্পীভবন অত্যধিক হয় এবং নর্মদা-তাপ্তি ও সিন্ধু ছাড়া বড় কোনো নদী না থাকায় মিষ্টি জলের জোগান কম, ফলে লবণতা খুব বেশি।
  • সর্বাধিক লবণাক্ত জলাশয়: তুরস্কের ভ্যান হ্রদ (Lake Van - ৩৩০‰), জর্ডনের মৃত সাগর (Dead Sea - ২৩৮‰) এবং আমেরিকার গ্রেট সল্ট লেক (২২০‰)।
  • হ্যালোস্কেলাইন ও পিকনোক্লাইন:
    • হ্যালোস্কেলাইন (Halocline): ৩০০ থেকে ১০০০ মিটার গভীরতার স্তর, যেখানে লবণতার মাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হয়।
    • পিকনোক্লাইন (Pycnocline): উষ্ণতা হ্রাস ও লবণতার প্রভাবে গভীরতার সাথে সাথে জলের ঘনত্বের দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার স্তর।

৩. সমুদ্রজলের গতিশীলতা: সমুদ্রস্রোত ও আবর্তন (Gyres)

সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির কারণসমূহ

সমুদ্রের জলরাশির এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়মিত ও নির্দিষ্ট দিকে অনুভূমিক প্রবাহকে সমুদ্রস্রোত (Ocean Current) বলে। এটি মূলত চারটি কারণে নিয়ন্ত্রিত হয়:

  1. নিয়ত বায়ুপ্রবাহের ঘর্ষণ: আয়ন বায়ু ক্রান্তীয় জলরাশিকে পশ্চিম দিকে এবং পশ্চিমা বায়ু মধ্য-অক্ষাংশে জলরাশিকে পূর্ব দিকে ঠেলে নিয়ে যায়।
  2. কোরিওওলিস বল ও ফেরেলের সূত্র: পৃথিবীর আবর্তনজনিত কোরিওলিস বলের প্রভাবে সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাঁদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়।
  3. ঘনত্ব ও উষ্ণতার পার্থক্য: ক্রান্তীয় অঞ্চলের উষ্ণ হালকা জল বহিঃস্রোত রূপে মেরুর দিকে এবং মেরুর শীতল ভারী জল অন্তঃস্রোত রূপে নিরক্ষরেখার দিকে চলে।
  4. উপকূলের আকৃতি: মহাদেশীয় ভূখণ্ডের বাধা সমুদ্রস্রোতের পথ পরিবর্তন করে বিশালাকার চক্রাকার আবর্তন বা জায়ার (Gyre) সৃষ্টি করে।
প্রধান মহাসাগরীয় স্রোতের বিন্যাস

উষ্ণতার ভিত্তিতে স্রোত দুই প্রকার: উষ্ণ স্রোত (নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে) এবং শীতল স্রোত (মেরু থেকে নিরক্ষরেখার দিকে):

মহাসাগর প্রধান উষ্ণ স্রোত প্রধান শীতল স্রোত বিশেষ ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য
আটলান্টিক মহাসাগর উত্তর ও দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত, উপসাগরীয় স্রোত (Gulf Stream), উত্তর আটলান্টিক ড্র drift, ব্রাজিল স্রোত। ল্যাব্রাডর স্রোত (Labrador), ক্যানারি স্রোত, বেঙ্গুয়েলা স্রোত, ফকল্যান্ড স্রোত। সারগাসো সাগর (Sargasso Sea): উত্তর আটলান্টিক জায়ারের কেন্দ্রস্থলে স্রোতহীন শান্ত অঞ্চল, যেখানে আগাছা (সারগাসাম শৈবাল) ভাসে।
গ্র্যান্ড ব্যাংকস: উষ্ণ উপসাগরীয় ও শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের মিলনস্থলে ঘন কুয়াশা ও বিখ্যাত কড মাছের চারণভূমি।
প্রশান্ত মহাসাগর কুয়োরোশিও স্রোত (জাপান স্রোত), উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্রোত, পূর্ব অস্ট্রেলীয় স্রোত। ওয়ায়াশিও বা কুরিল স্রোত, ক্যালিফোর্নিয়া স্রোত, পেরু বা হামবোল্ট স্রোত। এল নিনো (El Niño): পেরু উপকূলে উষ্ণ জলের আগমনে হামবোল্ট স্রোত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক জলবায়ু বিঘ্নিত হয়।
ভারত মহাসাগর দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত, মোজাম্বিক স্রোত, আগুলহাস স্রোত। পশ্চিম অস্ট্রেলীয় স্রোত, পশ্চিম বায়ু প্রবাহ। মৌসুমি স্রোতের দ্বিবার্ষিক দিক পরিবর্তন: গ্রীষ্ম ও শীতকালে মৌসুমি বায়ুর সাথে স্রোতের দিক ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যায়!
ভারত মহাসাগরের মৌসুমি স্রোত ও একম্যান আপওয়েলিং
  • মৌসুমি স্রোতের রূপবদল: গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উত্তর ভারত মহাসাগরে জলপ্রবাহ ঘড়ির কাঁটার দিকে (পূর্বাভিমুখে) প্রবাহিত হয় এবং সোমালি স্রোত শক্তিশালী হয়। শীতকালে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই প্রবাহ উল্টোদিকে অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে (পশ্চিমাভিমুখে) প্রবাহিত হয়।
  • একম্যান প্রবাহ ও আপওয়েলিং (Upwelling): বায়ুপ্রবাহ ও কোরিওলিস বলের যৌথ ক্রিয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের জল যখন উপকূল থেকে দূরে অপসারিত হয় (Ekman Transport), তখন গভীর সমুদ্রের পুষ্টিসমৃদ্ধ অতি-শীতল জল উপরে উঠে আসে (আপওয়েলিং)। পেরু ও ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে এই প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি ডায়াটম ও মাছ জন্মায়, আবার উপকূলের শুষ্ক মরুভূমি (আটাকামা মরুভূমি) গঠনে ভূমিকা রাখে।

৪. জোয়ার-ভাটা: উৎপত্তির কারণ, তিথিভিত্তিক প্রকারভেদ ও হুগলি নদীর বান ডাকা

জোয়ার-ভাটা সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক কারণ

চন্দ্র ও সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এবং পৃথিবীর আবর্তনের ফলে সৃষ্ট কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবে সমুদ্রের জলরাশির নির্দিষ্ট সময় অন্তর পর্যায়ক্রমিক উত্থানকে জোয়ার (Tide) এবং পতনকে ভাটা (Ebb) বলে।

চন্দ্র ও সূর্যের মহাকর্ষীয় প্রভাবের তুলনা:

$$\text{জোয়ার উৎপাদক বল (TGF)} \propto \frac{\text{মহাজাগতিক বস্তুর ভর}}{(\text{দূরত্ব})^৩}$$
  • জোয়ার উৎপাদক বল দূরত্বের ঘনফলের (Cube of Distance) ব্যস্তানুপাতিক।
  • সূর্যের ভর চাঁদের চেয়ে ২ কোটি ৭০ লক্ষ গুণ বেশি হলেও, পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব (১৫ কোটি কিমি) চাঁদের দূরত্বের (৩ লক্ষ ৮৪ হাজার কিমি) তুলনায় প্রায় ৩৯০ গুণ বেশি।
  • গাণিতিক হিসাবে: $$\frac{TGF_{Moon}}{TGF_{Sun}} = \frac{১}{২,৭০,০০,০০০} \times (৩৯০)^৩ \approx ২.১৭$$
  • অতএব, পৃথিবীতে জোয়ার সৃষ্টিতে চাঁদের আকর্ষণ ক্ষমতা সূর্যের তুলনায় প্রায় ২.১৭ গুণ (বা দ্বিগুণেরও বেশি) শক্তিশালী!
ভরা কোটাল বনাম মরা কোটাল: সিজিগি অবস্থান
জোয়ারের প্রকারভেদ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বিন্যাস বৈশিষ্ট্য ও জোয়ারের বিস্তার
ভরা কোটাল / তেজ কটাল (Spring Tide) সিজিগি (Syzygy): সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী যখন একই সরলরেখায় ($১৮০^\circ$) অবস্থান করে। মাসে দুবার ঘটে:
  • অমাবস্যা (Conjunction / সংযোগ): চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে থাকে।
  • পূর্ণিমা (Opposition / প্রতিসংযোগ): পৃথিবী চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে থাকে।
সর্বোচ্চ জোয়ারের বিস্তার: চাঁদ ও সূর্যের যুগ্ম আকর্ষণে জোয়ারের জল সর্বাধিক উঁচুতে ওঠে এবং ভাটার জল সর্বাধিক নিচে নামে (স্বাভাবিকের চেয়ে ২০% বেশি বিস্তার)।
মরা কোটাল (Neap Tide) সমকোণীয় অবস্থান (Quadrature): শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ পরস্পর সমকোণে ($৯০^\circ$) থাকে। সর্বনিম্ন জোয়ারের বিস্তার: সূর্যের আকর্ষণ চাঁদের আকর্ষণকে আংশিক প্রশমিত করে, ফলে জোয়ারের জল খুব বেশি ওঠে না এবং ভাটায় খুব বেশি নামে না (স্বাভাবিকের চেয়ে ২০% কম বিস্তার)।
দৈনিক ৫০ মিনিট বিলম্ব ও পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর বান ডাকা
  • জোয়ারের দৈনিক ৫০ মিনিট দেরি হওয়ার কারণ: একটি মুখ্য জোয়ারের পর পরবর্তী মুখ্য জোয়ার আসতে সময় লাগে ২৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট (এবং দুটি জোয়ারের মধ্যবর্তী ব্যবধান ১২ ঘণ্টা ২৬ মিনিট)। পৃথিবী ২৪ ঘণ্টায় ৩৬০° ঘুরলেও চাঁদ তার কক্ষপথে প্রায় ১২.২° এগিয়ে যায়। ফলে চাঁদের ঠিক মুখোমুখি হতে পৃথিবীর আরও অতিরিক্ত ৫০ মিনিট সময় লাগে।
  • বান ডাকা (Tidal Bore):
    • সমুদ্রের জোয়ারের জল যখন নদীমুখ দিয়ে প্রবেশ করে খাড়া জলপ্রাচীর সৃষ্টি করে প্রচণ্ড গর্জনে উজানের দিকে ধাবিত হয়, তখন তাকে বান ডাকা বলে।
    • শর্তসমূহ: (১) নদীমোহনা ফানেল আকৃতির হতে হবে, (২) মোহনায় জোয়ারের বিস্তার খুব বেশি হতে হবে, এবং (৩) নদীখাত অগভীর ও নদীতে তীব্র বিপরীত মিষ্টি জলের স্রোত থাকতে হবে।
    • বিশ্বের বৃহত্তম জোয়ার বিস্তার ঘটে কানাডার ফান্ডি উপসাগরে (Bay of Fundy - ১৬ মিটার)।
    • হুগলি নদীর বান ডাকা: পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর মোহনায় ফানেল আকৃতির বদ্বীপীয় রূপ এবং অগভীর বালুচরের কারণে আশ্বিন-কার্তিক ও ফাল্গুন-চৈত্র মাসের ভরা কোটালে বঙ্গোপসাগর থেকে জোয়ারের জল প্রবল বেগে প্রবেশ করে। জলরাশি ২ থেকে ৩ মিটার উঁচু সাদা ফেনার জলপ্রাচীর তৈরি করে উল্টোদিকে কলকাতার দিকে ছুটে আসে (একে স্থানীয় ভাষায় 'সাঁড়ের বান' বলে), যা নৌযান চলাচলের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

৫. সমুদ্রতলের অবক্ষেপণ: স্থলজাত, জৈব সিন্ধুমল ও লোহিত কর্দম

সমুদ্রের তলদেশের অবক্ষেপের শ্রেণিবিভাগ

উৎস ও সঞ্চয়ন অঞ্চলের ভিত্তিতে সমুদ্রবক্ষের পলল অবক্ষেপকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়:

  1. স্থলজাত অবক্ষেপ (Terrigenous Deposits):
    • স্থলভাগ থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাচূর্ণ নদী, বায়ু ও তরঙ্গের মাধ্যমে বাহিত হয়ে মহীসোপান ও মহীঢালে জমা হয়।
    • উপকূল থেকে গভীর সমুদ্রের দিকে এদের কণার আকার ক্রমশ ছোট হয় (কাঁকর $\to$ বালি $\to$ পলি $\to$ কাদা)।
    • রঙিন কাদার প্রকারভেদ:
      • নীল কাদা (Blue Mud): জৈব পদার্থ ও আয়রন সালফাইডের ($FeS$) উপস্থিতিতে অক্সিজেনহীন অবস্থায় সৃষ্টি হয়।
      • লাল কাদা (Red Mud): লোহাঘটিত ফেরিক অক্সাইডের জারণের ফলে লাল বর্ণ ধারণ করে (ক্রান্তীয় নদীমুখের কাছে)।
      • সবুজ কাদা (Green Mud): পটাসিয়াম-লোহা সমৃদ্ধ খনিজ গ্লুকোনাইট (Glauconite)-এর উপস্থিতিতে সবুজ দেখায়।
  2. জৈব অবক্ষেপ বা সিন্ধুমল (Biogenous Pelagic Oozes):
    • সামুদ্রিক আণুবীক্ষণিক জীব ও প্লাঙ্কটনের মৃতদেহের খোলস ও কঙ্কালের অন্তত ৩০ শতাংশ সঞ্চয়ে সৃষ্ট সূক্ষ্ম কাদা।
    • রাসায়নিক গঠনের ভিত্তিতে এটি দুই প্রকার:
      সিন্ধুমলের নাম উৎস জীব রাসায়নিক উপাদান ও গভীরতা
      গ্লোবিজেরিনা সিন্ধুমল ফোরামিনিফেরা প্রোটোজোয়া খোলস চুনজাতীয় ($CaCO_৩$); ২০০০ থেকে ৪০০০ মিটার গভীরতায় ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ণ সমুদ্রে সর্বাধিক দেখা যায়।
      টেরোপড সিন্ধুমল মোলাস্কা পর্বের সামুদ্রিক প্রজাপতি চুনজাতীয় ($CaCO_৩$); অগভীর ক্রান্তীয় জলে (১০০০-২০০০ মি)।
      ডায়াটম সিন্ধুমল এককোষী আণুবীক্ষণিক শৈবাল সিলিকা প্রধান ($SiO_২$); মেরু ও উপমেরুর শীতল সমুদ্রে বিস্তৃত।
      রেডিওলারিয়ান সিন্ধুমল রেডিওলারিয়া প্রোটোজোয়া খোলক সিলিকা প্রধান ($SiO_২$); ক্রান্তীয় অঞ্চলের গভীর তলদেশে (>৪৫০০ মি)।
    • কার্বনেট ক্ষতিপূরণ তল (Carbonate Compensation Depth - CCD): ৪০০০ থেকে ৪৫০০ মিটার গভীরে সমুদ্রজলের উচ্চ চাপ ও নিম্ন তাপমাত্রার কারণে জলে দ্রবীভূত কার্বনিক অ্যাসিড চুনজাতীয় খোলস সম্পূর্ণ গলিয়ে দেয়। ফলে CCD-এর নিচে চুনজাতীয় সিন্ধুমল জমা হতে পারে না, কেবল সিলিকাযুক্ত উয ও লাল কাদা জমে।
  3. লোহিত কর্দম (Red Clay):
    • ৪৫০০ মিটারের বেশি গভীর সমুদ্রের সমভূমিতে বিস্তৃত, যা গভীর সমুদ্রের মোট অবক্ষেপের প্রায় ৩৮%।
    • আগ্নেয়গিরির সূক্ষ্ম ছাই, মরুভূমির ধূলিকণা ও উল্কাপাতের কণা লোহা দ্বারা জারিত হয়ে এই অত্যন্ত সূক্ষ্ম লাল কাদা গঠন করে। এর সঞ্চয়ন অত্যন্ত ধীর (প্রতি ১০০০ বছরে মাত্র ১ মিলিমিটার)।
  4. রাসায়নিক অবক্ষেপ: পলিম্যাটালিক ম্যাঙ্গানিজ নডিউল (Manganese Nodules):
    • সমুদ্রবক্ষে জমা হওয়া আলুর মতো আকৃতির খনিজ গুটি, যার মধ্যে ম্যাঙ্গানিজ (২৪%), লোহা (১৪%), নিকেল, তামা ও কোবাল্ট থাকে। ভারত মহাসাগরের কেন্দ্রীয় অববাহিকায় ভারত আন্তর্জাতিক সমুদ্র তলদেশ কর্তৃপক্ষের (ISA) অধীনে এর গবেষণার একচেটিয়া অধিকার লাভ করেছে।

৬. সামুদ্রিক সম্পদ, ব্লু ইকোনমি ও পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র

সামুদ্রিক সম্পদের শ্রেণিবিভাগ ও ব্লু ইকোনমি

সমুদ্রের অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পরিবেশবান্ধব উপায়ে কাজে লাগানোর ধারণাকে ব্লু ইকোনমি (Blue Economy) বলে:

  • জৈব ও খাদ্য সম্পদ:
    • বাণিজ্যিক মৎস্য শিকার (সার্ডিন, টুনা, ইলিশ, পমফ্রেট, ভেটকি)। নিউফাউন্ডল্যান্ডের গ্র্যান্ড ব্যাংকস অঞ্চলে শীতল ল্যাব্রাডর ও উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের মিলনে সৃষ্ট শৈবাল সমৃদ্ধ অঞ্চলে পৃথিবীর বিখ্যাত মৎস্য বাণিজ্য গড়ে উঠেছে।
    • মারিকালচার ও শৈবাল চাষ (অ্যালজিনেট ওষুধ ও প্রসাধনী তৈরিতে ব্যবহৃত হয়)।
  • খনিজ ও শক্তি সম্পদ:
    • অফশোর খনিজ তেল ও গ্যাস (ভারতের বোম্বে হাই ও কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকা)।
    • উপকূলীয় ভারী বালুকারাশি (কেরল ও ওড়িশা উপকূলে মোনাজাইট—পারমাণবিক শক্তির থোরিয়াম উৎস, ইলমেনাইট ও জিরকন)।
    • অপ্রচলিত সামুদ্রিক শক্তি: জোয়ারভাটা শক্তি (Tidal Energy), তরঙ্গ শক্তি ও সামুদ্রিক তাপীয় শক্তি রূপান্তর (OTEC)। পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের দুর্গাদুয়ানি ক্রিক জোয়ারভাটা শক্তি প্রকল্পের একটি সম্ভাবনাময় কেন্দ্র।
পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র: সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বায়োম

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ প্রান্তে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপে অবস্থিত সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম অবিচ্ছিন্ন লবণাম্বু ম্যানগ্রোভ অরণ্য (ভারতে ৪,২৬০ বর্গকিমি এলাকা):

  • উদ্ভিদের অভিযোজন: সুন্দরী (Heritiera fomes), গরান (Rhizophora), গেঁওয়া ও বাইন উদ্ভিদে রয়েছে বিশেষ শারীরবৃত্তীয় অভিযোজন:
    • শ্বাসমূল (Pneumatophore): কর্দমাক্ত অক্সিজেনহীন মাটি ভেদ করে মাটির ওপরে খাড়াভাবে উঠে আসা মূল, যার গায়ে বাতাস টানার ছিদ্র (Lenticel) থাকে।
    • ঠেস মূল (Stilt Root): কাণ্ডকে জোয়ারের প্রবল টান ও নরম মাটিতে সোজা রাখার জন্য তির্যকভাবে বের হওয়া মজবুত মূল।
    • জরায়ুজ অঙ্কুরোদ্গম (Viviparous Germination): ফল গাছে থাকা অবস্থাতেই বীজের অঙ্কুরোদ্গম ঘটে, যাতে লবণাক্ত জলে বীজ নষ্ট না হয়ে মাটিতে গেঁথে যেতে পারে।
  • প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষামূলক ঢাল: সুন্দরবনের ঘন ম্যানগ্রোভ আবরণ বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের (আমফান, ইয়াস, রেমাল) প্রবল জলোচ্ছ্বাস ও বাতাসের গতিবেগ প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শোষণ করে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গকে চরম বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে।
পরিবেশগত সংকট ও সমুদ্র সংরক্ষণ
  • প্রবাল প্রাচীরের ব্লিচিং ও সমুদ্রের অম্লীকরণ: সমুদ্রজলের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে প্রবালের দেহ থেকে মিথোজীবী শৈবাল জুজ্যানথেলি বিতাড়িত হওয়ায় প্রবাল সাদা হয়ে মারা যায় (Coral Bleaching)। এছাড়া বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত $CO_২$ শোষণের ফলে জলের পিএইচ (pH) কমে জল আম্লিক হয়ে পড়ছে, যা সামুদ্রিক খোলসযুক্ত প্রাণীদের অস্তিত্ব বিপন্ন করছে।
  • সুন্দরবনের দ্বীপের ক্ষয় ও নিমজ্জন: বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার বিশ্ব গড়ের চেয়ে বেশি (বছরে প্রায় ৩.৯ মিমি)। ফলে ঘোড়ামারা ও মৌসুনি দ্বীপের বিস্তীর্ণ অংশ তলিয়ে গেছে এবং হাজার হাজার মানুষ 'জলবায়ু উদ্বাস্তু'তে পরিণত হচ্ছেন।
  • মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ: সমুদ্রে নিক্ষেপ করা প্লাস্টিক ভেঙে ৫ মিমি-র কম আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে মাছের মাধ্যমে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে।

গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক পরিভাষা, সূত্র ও পরিমাপক

ডিটমারের লবণতা নির্ণয়ের সূত্র
S (‰) = ১.৮০৬৫৫ × Cl (‰)
জোয়ার উৎপাদক বলের সূত্র
TGF {G · M · r}{d^৩}
সমুদ্রের জল বাজেট ও লবণতা সম্পর্ক
$$\Delta S \propto (E - P) - R$$
অগভীর জলে জোয়ার তরঙ্গের গতিবেগ
$$c = \sqrt{g \cdot h}$$

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
ঢাল, গভীরতা এবং অর্থনৈতিক তাৎপর্যের ভিত্তিতে মহীসোপান ও মহীঢালের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি আলোচনা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

মহীসোপান ও মহীঢালের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যসমূহ নিম্নরূপ: ১. নতিমাত্রা বা ঢাল:

  • মহীসোপান: অত্যন্ত মৃদু ঢালবিশিষ্ট, গড় ঢাল প্রায় ১° (বা প্রতি কিলোমিটারে ১ থেকে ২ মিটার)।
  • মহীঢাল: খাড়া ঢালবিশিষ্ট, গড় ঢাল ২° থেকে ৫° (টেকটনিক অঞ্চলে ২০° পর্যন্ত হতে পারে)। ২. গভীরতা ও সীমানা:
  • মহীসোপান: উপকূল থেকে মহীসোপানের প্রান্ত বা শেল্ফ-ব্রেক পর্যন্ত বিস্তৃত, যার গভীরতা প্রায় ১৩০ থেকে ২০০ মিটার। এটি মহাদেশের সিয়াল দ্বারা গঠিত।
  • মহীঢাল: ২০০ মিটার থেকে প্রায় ৩০০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত, যা মহাদেশীয় সিয়াল ও মহাসাগরীয় সাইমার সংযোগস্থল। ৩. অর্থনৈতিক তাৎপর্য:
  • মহীসোপান: সূর্যরশ্মি প্রবেশ করায় এটি ফোটিক জোন; এখানে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মৎস্যক্ষেত্র (যেমন গ্র্যান্ড ব্যাংকস), তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র (বোম্বে হাই) এবং মোনাজাইট বালুকা সঞ্চিত থাকে।
  • মহীঢাল: সূর্যালোকহীন; এখানে গভীর সাবমেরিন ক্যানিয়ন (যেমন সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড) গড়ে ওঠে যা নদীঘটিত পলিকে গভীর সমুদ্রবক্ষে প্রেরণ করে।
উদাহরণ 2
সূর্য চাঁদের তুলনায় ২ কোটি ৭০ লক্ষ গুণ ভারী হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবীতে জোয়ার সৃষ্টিতে চাঁদের আকর্ষণ ক্ষমতা কেন সূর্যের চেয়ে প্রায় ২.১৭ গুণ বেশি?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

জোয়ার উৎপাদক বল (Tide-Generating Force বা TGF) দূরত্বের বর্গের নয়, বরং দূরত্বের ঘনফলের (Cube of Distance) ব্যস্তানুপাতিক:

$$TGF \propto \frac{M}{d^৩}$$

এখানে:

  • সূর্যের ভর ($M_S$) চাঁদের ভরের ($M_M$) প্রায় ২,৭০,০০,০০০ গুণ।
  • পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ($d_S = ১৫,০০,০০,০০০\text{ কিমি}$) চাঁদের দূরত্বের ($d_M = ৩,৮৪,৪০০\text{ কিমি}$) প্রায় ৩৯০ গুণ।

চন্দ্র ও সূর্যের জোয়ার উৎপাদক বলের অনুপাত:

$$\frac{TGF_{Moon}}{TGF_{Sun}} = \frac{M_M}{M_S} \times \left(\frac{d_S}{d_M}\right)^৩ = \frac{১}{২,৭০,০০,০০০} \times (৩৯০)^৩ = \frac{৫,৯৩,১৯,০০০}{২,৭০,০০,০০০} \approx ২.১৭$$

দূরত্বের ঘনফলের প্রভাবে চাঁদ পৃথিবীর অত্যন্ত কাছে অবস্থিত হওয়ায় তার আকর্ষণ ক্ষমতা সূর্যের বিশাল ভরের প্রভাবকে অতিক্রম করে প্রায় ২.১৭ গুণ বা দ্বিগুণ শক্তিশালী জোয়ার বল সৃষ্টি করে।

উদাহরণ 3
থার্মোক্লাইন (Thermocline) স্তর কী এবং এটি কীভাবে সমুদ্রজলের উল্লম্ব মিশ্রণকে প্রতিরোধ করে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

থার্মোক্লাইন হলো সমুদ্রের উপরিপৃষ্ঠীয় উষ্ণ মিশ্র স্তরের নিচে ২০০ মিটার থেকে ১০০০ মিটার গভীরতার মধ্যবর্তী একটি ক্রান্তীয় জলস্তর, যেখানে গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সমুদ্রজলের উষ্ণতা অত্যন্ত খাড়াভাবে হ্রাস পায় (প্রায় ২০°C থেকে ৪°C-এ নেমে আসে)। উল্লম্ব মিশ্রণ প্রতিরোধের কারণ: ঠান্ডা জল উষ্ণ জলের তুলনায় অনেক বেশি ঘন ও ভারী। থার্মোক্লাইনে দ্রুত তাপমাত্রা কমার ফলে সেখানে জলের ঘনত্বেরও এক খাড়া উল্লম্ব বৃদ্ধি ঘটে (যাকে পিকনোক্লাইন বলে)। নিচের এই অতি-ঘন ও ভারী জলরাশি একটি শক্তিশালী অভিকর্ষীয় বাধা সৃষ্টি করে। ফলে ঝোড়ো বাতাস বা তরঙ্গের আন্দোলন উপরিভাগের অক্সিজেন সমৃদ্ধ জলকে নিচে পাঠাতে পারে না এবং নিচের পুষ্টিসমৃদ্ধ ভারী জল উপরে উঠতে পারে না, যা সমুদ্রের ওপর ও নিচতলের মিশ্রণকে আটকে রাখে।

উদাহরণ 4
একই অক্ষাংশে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গোপসাগরের (৩০‰-৩২‰) তুলনায় আরব সাগরের (৩৬‰-৩৭‰) পৃষ্ঠদেশীয় লবণতা অনেক বেশি কেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

উভয় সাগর উত্তর ভারত মহাসাগরে অবস্থিত হলেও এদের লবণতার পার্থক্যের কারণ হলো বাষ্পীভবন ও মিষ্টি জলের জোগানের বৈষম্য: ১. বঙ্গোপসাগরের কম লবণতা ($৩০‰ - ৩২‰$):

  • গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, গোদাবরী, কৃষ্ণা ও মহানদীর মতো বিশাল নদীগুলি প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ মিষ্টি জল সাগরে ফেলে।
  • মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাষ্পীভবনের চেয়ে বেশি ($P > E$), ফলে জল পাতলা হয়ে লবণতা কমে যায় (সুন্দরবনের কাছে <২৮‰)। ২. আরব সাগরের উচ্চ লবণতা ($৩৬‰ - ৩৭‰$):
  • সংলগ্ন থর ও আরব মরুভূমির শুষ্ক ও তপ্ত বাতাসের প্রভাবে তীব্র বাষ্পীভবন ঘটে।
  • বৃষ্টিপাত অত্যন্ত কম এবং সিন্ধু ও নর্মদা ছাড়া বড় কোনো নদী মিষ্টি জলের জোগান দেয় না, ফলে বাষ্পীভবন বৃষ্টিপাতের চেয়ে অনেক বেশি ($E > P$) হওয়ায় লবণ ঘনীভূত হয়।
উদাহরণ 5
বান ডাকা (Tidal Bore) কী? পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীতে বান ডাকার অনুকূল ভৌগোলিক শর্তগুলি ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

সমুদ্রের জোয়ারের জল যখন নদীমুখ দিয়ে প্রবেশ করে খাড়া জলপ্রাচীর সৃষ্টি করে প্রচণ্ড গর্জনে উজানের দিকে ধাবিত হয়, তখন তাকে বান ডাকা বলে। হুগলি নদীতে বান ডাকার অনুকূল শর্তসমূহ: ১. ফানেল আকৃতির মোহনা: হুগলি নদীর মোহনা বঙ্গোপসাগরের মুখে অত্যন্ত চওড়া কিন্তু কলকাতার দিকে ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে গেছে, যার ফলে জোয়ারের শক্তি সংকুচিত হয়ে উঁচু হয়ে ওঠে। ২. উচ্চ জোয়ারের বিস্তার: আশ্বিন-কার্তিক ও ফাল্গুন-চৈত্র মাসের পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় (ভরা কোটালে) মোহনায় জোয়ারের বিস্তার ৪ থেকে ৫ মিটার ছাড়িয়ে যায়। ৩. অগভীর নদীগর্ভ ও বালুচর: হুগলি নদীর তলদেশ অগভীর হওয়ায় তলদেশের ঘর্ষণে তরঙ্গের পাদদেশ বাধা পায় এবং চূড়াটি খাড়া হয়ে ২ থেকে ৩ মিটার উঁচু সাদা ফেনার গর্জনশীল জলপ্রাচীর বা 'সাঁড়ের বান' রূপে উজানের দিকে ধেয়ে যায়।

উদাহরণ 6
কার্বনেট ক্ষতিপূরণ তল (CCD) কী এবং ৪৫০০ মিটারের বেশি গভীরে কেন চুনজাতীয় সিন্ধুমল পাওয়া যায় না?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

কার্বনেট ক্ষতিপূরণ তল বা CCD (Carbonate Compensation Depth) হলো সমুদ্রের প্রায় ৪০০০ থেকে ৪৫০০ মিটার গভীরতার একটি কাল্পনিক তল, যেখানে ক্যালসিয়াম কার্বনেট খোলস দ্রবীভূত হওয়ার হার উপর থেকে খোলস পতনের হারের সমান হয়। ৪৫০০ মিটারের নিচে অনুপস্থিতির কারণ: ৪৫০০ মিটারের বেশি গভীরতায় সমুদ্রের জল চরম শীতল (১°-২°C) এবং সেখানে কয়েকশ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের কারণে জলে দ্রবীভূত কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা খুব বেশি থাকে, যা জলে কার্বনিক অ্যাসিড ($H_2CO_3$) তৈরি করে। এই আম্লিক জল মৃত জীবের ক্যালসিয়াম কার্বনেট ($CaCO_3$) খোলসকে সম্পূর্ণরূপে গলিয়ে ফেলে। ফলে চুনজাতীয় গ্লোবিজেরিনা বা টেরোপড খোলস তলদেশে পৌঁছানোর আগেই বিনষ্ট হয়ে যায়। তাই এই গভীরতায় কেবল অদ্রবণীয় সিলিকাযুক্ত উয এবং অজৈব লোহিত কর্দম (Red Clay) সঞ্চিত হতে পারে।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

সমুদ্রের ঢেউ বা তরঙ্গ এবং সমুদ্রস্রোতকে একই মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সাধারণ ভুল ধারণা

ভরা কোটাল বা স্প্রিং টাইড কেবল বসন্তকালেই হয় মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সাধারণ ভুল ধারণা

চাঁদ কাছে বলে সূর্যের জোয়ার তৈরিতে কোনো ভূমিকা নেই মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

চিত্রগত ব্যাখ্যা ও মডেল

বারিমণ্ডলীয় ভূ-সংস্থান ও সমুদ্রবিজ্ঞান মডেল WBCHSE শ্রেণি ১১ ভূগোল • সমুদ্রতলের ভূপ্রকৃতি, থার্মোক্লাইন, লবণতা ও জোয়ার-ভাটা সমুদ্রতলের ভূপ্রকৃতি ও রূপতাত্ত্বিক বিভাগ (Ocean Floor Morphology) মহীসোপান • মহীঢাল • গভীর সমভূমি • মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরা • সমুদ্রখাত Sea Level (০ মি / 0 m) ফাটল উপত্যকা ও ম্যাগমা মহীসোপান (০-২০০ মি) মহীঢাল (২০০-৩০০০ মি) সাবমেরিন ক্যানিয়ন (সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড) মহী-উত্থান গভীর সমুদ্রের সমভূমি (৩০০০-৬০০০ মি) Pelagic Oozes & Red Clay মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরা গায়ট (Guyot) সমুদ্রখাত (মারিয়ানা / জাভা) উল্লম্ব জলীয় স্তরবিন্যাস (Thermocline & Halocline) উষ্ণতা, লবণতা ও ঘনত্ব পরিবর্তনের উল্লম্ব লেখচিত্র 0 m 200 m 1000 m 4000 m 0°C 10°C 25°C উপরি পৃষ্ঠীয় মিশ্র স্তর (০-২০০ মি: ২০°-২৫°C) থার্মোক্লাইন স্তর (২০০-১০০০ মি: দ্রুত তাপমাত্রা হ্রাস) Rapid Drop ~ 20°C → 4°C গভীর সমুদ্র স্তর (>১০০০ মি: ১°-৩°C) কার্বনেট ক্ষতিপূরণ তল (CCD ~ ৪৫০০ মি) Calcareous oozes dissolve below CCD ↺ Planetary Ocean Currents উপসাগরীয় স্রোত ও সারগাসো সাগর Gulf Stream (warm) + Labrador (cold) → Grand Banks Indian Ocean semi-annual Monsoon Drift reversal ☽ Tidal Generating Mechanics ভরা কোটাল (সিজিগি) বনাম মরা কোটাল (অষ্টমী) Moon's gravitational attraction = 2.17 × Sun's tidal pull Tidal interval: 12 hrs 26 mins (daily lag: 50 mins) 🌊 Estuarine Dynamics & Bores হুগলি নদীর বান ডাকা (জোয়ারীয় ভিত) Funnel estuary + shallow riverbed → roaring tidal wall Equinoctial spring tides (আশ্বিন-কার্তিক / फालगुन-चैत्र)

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
১. জলবণ্টন: বারিমণ্ডলে ১৩৮.৬ কোটি ঘনকিমি জল রয়েছে; এর ৯৭.২% সমুদ্রের লবণাক্ত জল এবং মাত্র ২.৮% মিষ্টি জল (যার ৬৮.৭% বরফ আকারে আবদ্ধ)।
মূল বিষয় 2
  1. সমুদ্রতলের প্রধান রূপরেখা: মহীসোপান (মৃদু ১° ঢাল, ফোটিক জোন, মৎস্য ও খনিজ তেল), মহীঢাল (খাড়া ২°-৫° ঢাল, সিয়াল-সাইমার সীমানা), মহী-উত্থান ও গভীর সমুদ্রের সমভূমি (৩০০০-৬০০০ মি)।
মূল বিষয় 3
৩. সমুদ্রবক্ষের বিশেষ ভূমিরূপ: মধ্য-আটলান্টিক শৈলশিরা (১৬,০০০ কিমি দীর্ঘ), মারিয়ানা খাতের চ্যালেঞ্জার ডিপ (১১,০২২ মি) এবং সমতল-শীর্ষ নিমজ্জিত আগ্নেয় গিরি গায়ট।
মূল বিষয় 4
৪. উষ্ণতার উল্লম্ব স্তর: উপরিভাগের মিশ্র স্তর (০-২০০ মি: ২০°-২৫°C), থার্মোক্লাইন স্তর (২০০-১০০০ মি: দ্রুত তাপমাত্রা পতন) এবং গভীর সমুদ্রের সমতাপ জল (১°-৩°C)।
মূল বিষয় 5
৫. লবণতার নিয়ম: সমুদ্রজলের গড় লবণতা ৩৫‰; ডিটমারের নীতি অনুযায়ী লবণের শতকরা অনুপাত সর্বত্র ধ্রুবক (সোডিয়াম ক্লোরাইড ৭৭.৭%)। বঙ্গোপসাগরে নদীজলের জন্য লবণতা কম (৩০-৩২‰), কিন্তু আরব সাগরে বাষ্পীভবনে বেশি (৩৬-৩৭‰)।
মূল বিষয় 6
৬. মহাসাগরীয় আবর্তন: বায়ুপ্রবাহ, কোরিওলিস বল ও দূরত্বের পার্থক্যে চক্রাকার জায়ার গঠিত হয়; উত্তর আটলান্টিক জায়ারের মাঝে স্রোতহীন সারগাসো সাগর অবস্থিত।
মূল বিষয় 7
৭. ভারত মহাসাগরের মৌসুমি স্রোত: মৌসুমি বায়ুর দিক পরিবর্তনের কারণে গ্রীষ্মকালে ঘড়ির কাঁটার দিকে এবং শীতকালে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে স্রোত প্রবাহিত হয়।
মূল বিষয় 8
৮. জোয়ার-ভাটার বলবিজ্ঞান: দূরত্বের ঘনফলের প্রভাবের কারণে চাঁদের জোয়ার বল সূর্যের চেয়ে ২.১৭ গুণ শক্তিশালী। সিজিগিতে ভরা কোটাল এবং অষ্টমী তিথিতে মরা কোটাল হয়; জোয়ার প্রতিদিন ৫০ মিনিট পিছিয়ে যায়।
মূল বিষয় 9
৯. হুগলি নদীর বান ডাকা: ফানেল আকৃতির অগভীর মোহনা ও উচ্চ জোয়ার বিস্তারের কারণে আশ্বিন-কার্তিক ও ফাল্গুন-চৈত্র মাসে হুগলি নদীতে ২-৩ মিটার উঁচু সাঁড়ের বান সৃষ্টি হয়।
মূল বিষয় 10
১০. সামুদ্রিক পলল: মহীসোপানে স্থলজাত কাদা; ২০০০-৪০০০ মিটারে চুনজাতীয় সিন্ধুমল (গ্লোবিজেরিনা), যা CCD-র (৪৫০০ মি) নিচে দ্রবীভূত হয়ে যায় এবং গভীর তলদেশে লোহিত কর্দম ও ম্যাঙ্গানিজ নডিউল অবশিষ্ট থাকে।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
ভূতাত্ত্বিক সীমানা হিসেবে মহীঢালের তাৎপর্য কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: মহীঢাল হলো সেই সুনির্দিষ্ট ভূতাত্ত্বিক সন্ধিস্থল যেখানে মহাদেশের হালকা গ্র্যানাইটীয় সিয়াল ভূত্বক শেষ হয়ে সমুদ্রের ভারী ব্যাসাল্টীয় সাইমা ভূত্বক শুরু হয়।
2
উইলিয়াম ডিটমারের স্থির অনুপাত নীতির মূল প্রতিপাদ্য কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: সমুদ্রের জলের মোট লবণতা বিভিন্ন সাগরে কম-বেশি হলেও, জলে দ্রবীভূত প্রধান লবণগুলির (যেমন সোডিয়াম ক্লোরাইড ৭৭.৭% ও ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইড ১০.৯%) পারস্পরিক শতকরা অনুপাত বিশ্বজুড়ে সর্বদা অপরিবর্তিত থাকে।
3
ভারত মহাসাগরে সমুদ্রস্রোতের ঋতুভিত্তিক দিক পরিবর্তনের কারণ কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ভারত মহাসাগরে মৌসুমি বায়ুর দ্বিবার্ষিক দিক পরিবর্তন—গ্রীষ্মের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু জলকে ঘড়ির কাঁটার দিকে এবং শীতের উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু জলকে বিপরীত দিকে চালিত করে।
4
ভরা কোটালে কেন জোয়ারের জলের উচ্চতা সর্বাধিক বৃদ্ধি পায়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: কারণ সিজিগি অবস্থানে (অমাবস্যায় সংযোগ ও পূর্ণিমায় প্রতিসংযোগ) সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একই সরলরেখায় (১৮০°) থাকায় সূর্য ও চাঁদের মহাকর্ষীয় টান পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে শক্তিশালী জোয়ার সৃষ্টি করে।
5
কার্বনেট ক্ষতিপূরণ তল (CCD) কী এবং এর নিচে কোন অবক্ষেপ পাওয়া যায়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: CCD হলো সমুদ্রের প্রায় ৪০০০-৪৫০০ মিটার গভীরতার তল যেখানে চুন সম্পূর্ণ দ্রবীভূত হয়ে যায়; এর নিচে কেবল অদ্রবণীয় লোহিত কর্দম ও সিলিকাযুক্ত ডায়াটম উয পাওয়া যায়।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 11 Geography — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: শাস্ত্র রূপে ভূগোল অধ্যায় 2: পৃথিবীর উৎপত্তি ও অভ্যন্তরীণ গঠন অধ্যায় 3: ভূরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়া অধ্যায় 4: আবহাওয়া ও জলবায়ু অধ্যায় 5: সমস্থিতি তত্ত্ব অধ্যায় 6: বারিমণ্ডল অধ্যায় 7: মানব ভূগোলের পরিধি ও বিষয়বস্তু অধ্যায় 8: অর্থনৈতিক ভূগোল অধ্যায় 9: Secondary Activities - Industry অধ্যায় 10: তৃতীয় স্তরের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ অধ্যায় 11: চতুর্থ স্তরের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ অধ্যায় 12: পঞ্চম স্তরের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ অধ্যায় 13: এক নজরে ভারত অধ্যায় 14: ভারতের ভূতাত্ত্বিক গঠন ও ভূপ্রকৃতি অধ্যায় 15: ভারতের নদনদী ও জলনির্গম প্রণালী অধ্যায় 16: ভারতের জলবায়ু অধ্যায় 17: ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদ ও অরণ্য অধ্যায় 18: ভারতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

বারিমণ্ডল অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।