বারিমণ্ডল একটি মুক্ত ও গতিশীল ব্যবস্থা, যা সৌরশক্তি চালিত জলচক্রের (Hydrological Cycle) মাধ্যমে বায়ুমণ্ডল, অশ্মমণ্ডল ও জীবমণ্ডলের সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত। পৃথিবীতে মোট জলের পরিমাণ প্রায় ১৩৮ কোটি ৬০ লক্ষ ঘনকিলোমিটার ($১.৩৮৬ \times ১০^৯ \text{ কিমি}^৩$):
সমুদ্রের তলদেশ কোনো সমতল অববাহিকা নয়; এতে রয়েছে স্থলভাগের চেয়েও বৈচিত্র্যময় গিরিখাত, মালভূমি ও পর্বতমালা। সমুদ্রবক্ষকে চারটি প্রধান ধ্রুপদী বিভাগে বিভক্ত করা হয়:
- মহীসোপান (Continental Shelf):
- উপকূলের সংলগ্ন সমুদ্রের নিচে নিমজ্জিত মহাদেশের মৃদু ঢালু প্রান্তীয় অংশ।
- গড় ঢাল অত্যন্ত মৃদু—প্রায় ১° (প্রতি কিলোমিটারে ১ থেকে ২ মিটার পতন)।
- মহীসোপানের প্রান্তদেশের (Shelf-Break) গড় গভীরতা প্রায় ১৩০ থেকে ২০০ মিটার।
- প্রস্থের ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈচিত্র্য দেখা যায়: চিলির উপকূলে মাত্র কয়েক কিমি, কিন্তু সাইবেরিয়ার সুমেরু উপকূলে প্রায় ১৫০০ কিমি। বঙ্গোপসাগরের সুন্দরবন সংলগ্ন মহীসোপান প্রায় ১৬০ কিমি চওড়া।
- অর্থনৈতিক গুরুত্ব: সূর্যালোক পৌঁছানোর কারণে এটি 'ফোটিক জোন' (Photic Zone); বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মৎস্যক্ষেত্র (ডগার্স ব্যাংক, গ্র্যান্ড ব্যাংকস), তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস ভাণ্ডার (বোম্বে হাই) এবং সমুদ্র উপকূলীয় বালিতে মোনাজাইট-ইলমেনাইট খনিজ পাওয়া যায়।
- মহীঢাল (Continental Slope):
- মহীসোপানের প্রান্ত থেকে হঠাৎ খাড়াভাবে নেমে যাওয়া সমুদ্রের ঢালু অংশ।
- ঢালের পরিমাণ খাড়া—প্রায় ২° থেকে ৫° (কিছু টেকটনিক অঞ্চলে ২০° পর্যন্ত)।
- গভীরতা ২০০ মিটার থেকে শুরু হয়ে ৩০০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
- এটি মহাদেশীয় হালকা সিয়াল (SIAL) ভূত্বক এবং মহাসাগরীয় ভারী সাইমা (SIMA) ভূত্বকের মধ্যকার প্রধান ভূতাত্ত্বিক সীমানা।
- সাবমেরিন ক্যানিয়ন (Submarine Canyon): মহীঢাল বরাবর গভীর V-আকৃতির উপত্যকা দেখা যায়, যা মূলত কর্দমাক্ত ঘোলা জলের তীব্র স্রোতের (Turbidity Current) ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্টি হয়। সুন্দরবনের দক্ষিণে অবস্থিত 'সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড' (Swatch of No Ground) বঙ্গোপসাগরের একটি বিখ্যাত সাবমেরিন ক্যানিয়ন, যা গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের পলি গভীর সমুদ্রে পরিবাহিত করে বিশ্বের বৃহত্তম 'বেঙ্গল ফ্যান' গড়ে তুলেছে।
- মহী-উত্থান (Continental Rise):
- মহীঢালের পাদদেশে টার্বিডিটি স্রোতের দ্বারা বাহিত পলি সঞ্চিত হয়ে গড়ে ওঠা মৃদু ঢালু ($০.৫^\circ - ১^\circ$) পলল মঞ্চ, যা ৩০০০ থেকে ৪০০০ মিটার গভীরতায় গভীর সমুদ্রের সমভূমির সাথে মিলিত হয়।
- গভীর সমুদ্রের সমভূমি (Abyssal Plain):
- ৩০০০ থেকে ৬০০০ মিটার গভীরতায় অবস্থিত অত্যন্ত বিস্তৃত ও প্রায় সমতল তলদেশ, যা সমুদ্রবক্ষের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা জুড়ে অবস্থান করছে।
- এখানে সূক্ষ্ম জৈব সিন্ধুমল (Ooze) ও লাল কাদার সমতল স্তর জমে আগ্নেয় পর্বতমালা ঢাকা পড়ে থাকে।
- মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরা (Mid-Oceanic Ridge): অপসারী পাত সীমানা বরাবর ভূ-অভ্যন্তরীণ ম্যাগমার উদগীরণে গড়ে ওঠা ৬৫,০০০ কিমি দীর্ঘ নিমজ্জিত পর্বতশ্রেণী। আটলান্টিক মহাসাগরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এস-আকৃতির মিড-আটলান্টিক শৈলশিরা ১৬,০০০ কিমি দীর্ঘ। এর মাঝখানে চ্যুতি উপত্যকা এবং কালো ধোঁয়া উদগীরণকারী হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট দেখা যায়।
- সমুদ্রখাত (Ocean Trenches): অভিসারী পাত সীমানায় মহাসাগরীয় পাত অন্য পাতের নিচে প্রবেশ করলে অত্যন্ত গভীর, খাড়া V-আকৃতির সমুদ্রখাত তৈরি হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা খাতের চ্যালেঞ্জার ডিপ (১১,০২২ মিটার) পৃথিবীর গভীরতম স্থান। ভারত মহাসাগরের গভীরতম খাত হলো সুন্দা বা জাভা খাত (৭,৪৫০ মিটার)।
- গায়ট (Guyot): সমুদ্রগর্ভের যে সকল আগ্নেয় পর্বতের চূড়া এককালে সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে তরঙ্গ ক্ষয়ের ফলে সমতল হয়ে গিয়েছিল এবং পরে ভূত্বকের অবনমনে সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে গেছে, তাদের সমতল-শীর্ষ গায়ট বলে।