Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি XI • Geography • অধ্যায় 18
আনুমানিক সময়: ৪৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

ভারতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়

ভারতের সুবিশাল উপমহাদেশ তার জটিল ভূপ্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত বৈচিত্র্যের কারণে নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। ভৌগোলিক বিজ্ঞানে দুর্যোগ (Hazard) এবং বিপর্যয়ের (Disaster) মধ্যে একটি স্পষ্ট মৌলিক পার্থক্য রয়েছে: দুর্যোগ হলো এমন এক চরম প্রাকৃতিক ঘটনা যা জানমালের ক্ষতি করার সম্ভাবনা রাখে; কিন্তু বিপর্যয় হলো কোনো অসহায় জনপদে দুর্যোগের এমন এক ভয়াবহ আঘাত যার ক্ষয়ক্ষতি সামলানো স্থানীয় সমাজের নিজস্ব ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। টেকটনিক দিক থেকে ভারতীয় পাত প্রতি বছর ৪-৫ সেমি গতিতে ইউরেশীয় পাতের নিচে প্রবেশ করায় দেশের প্রায় ৫৯% ভূখণ্ড মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার ভূমিকম্প প্রবণ, যা ভারতীয় মানক সংস্থা (BIS IS 1893) কর্তৃক জোন II থেকে জোন V-এ বিভক্ত। জলবায়ুগত দিক থেকে মৌসুমি বায়ুর অনিয়মিত প্রভাবে প্রতি বছর ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা, তিস্তা ও নিম্ন দামোদর অববাহিকার ৪ কোটি হেক্টরেরও বেশি এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়; অন্যদিকে দেশের প্রায় ৬৮% কৃষিজমি মারাঠওয়াড়া, রায়ালসীমা ও পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া-বাঁকুড়ার মতো বৃষ্টির ছায়া মালভূমিতে খরার কবলে পড়ে। প্রায় ৭,৫১৬ কিমি দীর্ঘ উপকূলভাগের মধ্যে বিশেষ করে ফানেল আকৃতির বঙ্গোপসাগরে বিধ্বংসী ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় (যেমন—আম্ফান, ইয়াস, রেমাল) সৃষ্টি হয়ে প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাস ঘটায়। উত্তরবঙ্গের হিমালয়ের নবীন ভঙ্গিল পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষ করে দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলায় ভারী বর্ষণে প্রায়শই জাতীয় সড়ক ১০ (NH-10) বরাবর বিধ্বংসী ভূমিধস নামে। ২০০৫ সালের জাতীয় বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা আইনের (DM Act) পর থেকে ভারতে ত্রাণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে জাতীয় বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (NDMA)-র নেতৃত্বে আধুনিক ঝুঁকি হ্রাসকরণ (DRR) এবং সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্ক (2015-2030) ভিত্তিক বহুস্তরীয় ব্যবস্থাপনা কার্যকর রয়েছে।

অধ্যায়টির গুরুত্ব

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের কারণ, চরিত্র এবং স্থানিক বিস্তার অনুধাবন করা মানবজীবন রক্ষা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার স্বার্থে অত্যন্ত অপরিহার্য। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়াগত ঘটনার তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তি ক্রমাগত বাড়ছে—যেমন বঙ্গোপসাগরে সুপার সাইক্লোন, হিমালয়ে মেঘভাঙা বৃষ্টি ও হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত হড়পা বান (GLOF)। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ যারা নদীর চর, পাহাড়ের খাড়া ঢাল বা কাঁচা ঘরে বসবাস করে, তারা এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ করে সুন্দরবনের উপকূলবর্তী দ্বীপসমূহ ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ত জলের প্লাবনে প্লাবিত হয়, আবার উত্তরের পাহাড়ে ধসের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আধুনিক উপগ্রহ চিত্র, ডপলার রাডার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্থানীয় মানুষের অংশীদারিত্বের সমন্বয়ে একটি কার্যকর বিপর্যয় প্রশমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা রাষ্ট্রসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG 11 ও 13) পূরণে সহায়ক।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের ধারণা, সুভেদ্য...
2 ভারতের ভূমিকম্প: পাত সংস্থান, বিআইএ...
3 ভারতের বন্যা ও খরা: স্থানিক বিস্তার...
4 ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস:...
5 ভূমিধস ও সুনামি: ভূরূপতাত্ত্বিক কার...
6 বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কাঠামো: ২০০৫ স...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের ধারণা, সুভেদ্যতা ও শ্রেণিবিভাগ

১. দুর্যোগ (Hazard), বিপর্যয় (Disaster) ও সুভেদ্যতার (Vulnerability) সংজ্ঞা

বিপর্যয় ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞানে তিনটি মূল ধারণার মধ্যে স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক পার্থক্য নির্দেশ করা হয়:

  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ (Natural Hazard): যে কোনো বিপজ্জনক প্রাকৃতিক বা ভৌত ঘটনা যা মানুষ ও জীবজগতের ওপর আঘাত হানার বা জীবনহানি ও সম্পত্তি ধ্বংস করার সম্ভাব্য ক্ষমতা রাখে (যেমন—জনমানবহীন সাগরের বুকে সৃষ্ট কোনো শক্তিশালী সাইক্লোন বা মরুভূমিতে সংঘটিত ভূমিকম্প)।
  • প্রাকৃতিক বিপর্যয় (Natural Disaster): কোনো বিপজ্জনক প্রাকৃতিক দুর্যোগ যখন জনবসতিপূর্ণ কোনো অঞ্চলে আঘাত হেনে ব্যাপক প্রাণহানি, বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ও সামগ্রিক পরিবেশ ধ্বংস সাধন করে, যার অভিঘাত সামলানো স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত সমাজের নিজস্ব ক্ষমতার অতীত হয়ে পড়ে।
  • সুভেদ্যতা বা ঝুঁকিগ্রাহ্যতা (Vulnerability): কোনো মানব সম্প্রদায় বা পরিকাঠামোর দুর্যোগের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা বা দুর্বলতা। সুভেদ্যতার প্রকারভেদ:
    • ভৌত সুভেদ্যতা (Physical Vulnerability): নদীর প্লাবনভূমিতে বসতি স্থাপন, খাড়া পাহাড়ি ঢালে বাড়ি তৈরি বা মাটির কাঁচা বাড়ি।
    • আর্থ-সামাজিক সুভেদ্যতা (Socio-Economic): দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, সতর্কবার্তা পাওয়ার অভাব ও সামাজিক সুরক্ষাহীনতা।
    • পরিবেশগত সুভেদ্যতা (Environmental): ম্যানগ্রোভ ধ্বংস, নির্বিচারে বন উজাড় ও জলাভূমি ভরাট।
বিপর্যয় ঝুঁকির মৌলিক সমীকরণ:
$$\text{বিপর্যয় ঝুঁকি (Risk)} = \frac{\text{দুর্যোগ (Hazard)} \times \text{সুভেদ্যতা (Vulnerability)}}{\text{মোকাবিলা করার ক্ষমতা (Capacity)}}$$ তাৎপর্য: চরম কোনো প্রাকৃতিক ঘটনাও মহা-বিপর্যয়ে পরিণত হবে না যদি স্থানীয় সমাজের দুর্বলতা কম থাকে এবং বৈজ্ঞানিক পূর্বসতর্কতা ও মোকাবিলার সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা যায়।
২. ভারতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রধান শ্রেণিবিন্যাস
বিপর্যয়ের শ্রেণি ভৌত কার্যকারণ ও প্রক্রিয়া ভারতে প্রধান উদাহরণসমূহ
১. ভূ-গাঠনিক / পার্থিব ভূত্বকীয় পাতের সংঘর্ষ, চ্যুতি বরাবর শিলার আকস্মিক স্থানচ্যুতি ও ভূকম্পীয় তরঙ্গের উৎপত্তি। ভূমিকম্প (লাতুর ১৯৯৩, ভুজ ২০০১, কাশ্মীর ২০০৫), সুনামি (২৬ ডিসেম্বর ২০০৪ ভারত মহাসাগরীয় সুনামি)।
২. জলবায়ু ও আবহাওয়াগত মৌসুমি বায়ুর অনিয়মিত রূপ, নিম্নচাপ বলয়, সাগরের উষ্ণতার স্থানান্তর ও আর্দ্রতার সংকট। ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় (আম্ফান ২০২০, ইয়াস ২০২১), বন্যা (গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা অববাহিকা), খরা (মারাঠওয়াড়া, পুরুলিয়া), তাপপ্রবাহ।
৩. ভূরূপতাত্ত্বিক / ঢালু ভূমির বিপর্যয় অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে পর্বতের খাড়া ঢাল বরাবর শিলা ও মাটির দ্রুত নিম্নাভিমুখী পতন বা স্খলন। হিমালয়ের ভূমিধস (দার্জিলিং-কালিম্পং জাতীয় সড়ক ১০), পশ্চিমঘাট পর্বতের ধস (ওয়েনাড়), কাদার স্রোত, হিমবাহের তুষারধস।

ভারতের ভূমিকম্প: পাত সংস্থান, বিআইএস (BIS) ভূমিকম্প বলয় ও ঐতিহাসিক ঘটনা

১. ভারতে ভূমিকম্পের ভূ-গাঠনিক কারণসমূহ

ভারতের উচ্চ ভূকম্পীয় সংবেদনশীলতা সরাসরি সচল পাত সংস্থান তত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত:

  • ভারতীয় ও ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষ: ভারতীয় টেকটনিক পাত প্রতি বছর প্রায় ৪ থেকে ৫ সেমি হারে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে বিশালাকার ইউরেশীয় পাতের তলায় প্রবিষ্ট হচ্ছে।
  • হিমালয়ের চ্যুতিরেখায় পীড়ন সঞ্চয়: প্রায় ২,৫০০ কিমি দীর্ঘ হিমালয় পর্বতমালার প্রধান চ্যুতিরেখা বরাবর—যেমন মেইন সেন্ট্রাল থ্রাস্ট (MCT), মেইন বাউন্ডারি থ্রাস্ট (MBT) এবং মেইন ফ্রন্টাল থ্রাস্ট (MFT)—শিলার মধ্যে ক্রমাগত বিপুল স্থিতিস্থাপক বিকৃতি বা পীড়ন সঞ্চিত হয়, যা আকস্মিক মুক্তি পেয়ে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প সৃষ্টি করে।
  • অন্তঃপাতীয় ভূমিকম্প (Intra-plate Seismicity): প্রাচীন ভারতীয় উপদ্বীপীয় শিল্ড অঞ্চলকে ভূতাত্ত্বিকভাবে নিষ্ক্রিয় মনে করা হলেও, সুপ্ত প্রাচীন গ্রস্ত উপত্যকা ও চ্যুতিরেখার পুনরুজ্জীবনের ফলে মারাত্মক অগভীর ভূমিকম্প ঘটে (যেমন—১৯৯৩ সালের লাতুর ও ১৯৯৭ সালের জবলপুর ভূমিকম্প)।
২. বিআইএস (BIS IS 1893: 2016) ভূমিকম্প বলয় মানচিত্র

ভারতের ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস (BIS) ভূকম্পন তীব্রতা এবং ঐতিহাসিক নথির ভিত্তিতে দেশকে চারটি প্রধান জোনে বিভক্ত করেছে (জোন I-কে জোন II-এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে):

ভূমিকম্প জোন এমএসকে (MSK) তীব্রতা ও ঝুঁকির মাত্রা জোন ফ্যাক্টর (Z) ভারতের অন্তর্গত ভৌগোলিক অঞ্চলসমূহ
জোন V (Zone V) তীব্রতা IX ও তদূর্ধ্ব
অতি উচ্চ ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি
০.৩৬ সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারত, জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, গুজরাটের কচ্ছের রণ, উত্তর বিহার, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।
জোন IV (Zone IV) তীব্রতা VIII
উচ্চ ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি
০.২৪ উত্তরবঙ্গ (দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি), দিল্লি ও জাতীয় রাজধানী অঞ্চল (NCR), উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের উত্তরের সমভূমি, জম্মু ও হিমাচলের অবশিষ্টাংশ।
জোন III (Zone III) তীব্রতা VII
মাঝারি ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি
০.১৬ দক্ষিণবঙ্গ (কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা), উপকূলীয় মহারাষ্ট্র (মুম্বাই), কেরালা, গোয়া, গুজরাটের মধ্যভাগ, ওড়িশা ও মধ্যপ্রদেশ।
জোন II (Zone II) তীব্রতা VI ও কম
নিম্ন ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি
০.১০ দাক্ষিণাত্যের প্রাচীন ও সুস্থির শিল্ডের অধিকাংশ অঞ্চল: কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু, মধ্য মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানের মরু অঞ্চল।
৩. ভারতের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ভূমিকম্প
  • ১৮৯৭ সালের মহা-আসাম ভূমিকম্প (Mw ৮.১-৮.৭): আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী মহাদেশীয় ভূমিকম্প যা শিলং মালভূমিকে আন্দোলিত করে ব্রহ্মপুত্র নদের জলপ্রবাহ বিপরীতমুখী করেছিল।
  • ১৯৩৪ সালের বিহার-নেপাল ভূমিকম্প (Mw ৮.৪): উত্তর বিহারের মুঙ্গের ও দ্বারভাঙা শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে এবং ভয়াবহ মাটির তরলীকরণ (Liquefaction) ঘটায়।
  • ১৯৯৩ সালের লাতুর ভূমিকম্প (Mw ৬.২): মহারাষ্ট্রের কিল্লারি গ্রামে অগভীর উৎসকেন্দ্রের ভূমিকম্পে ভারী পাথর ও মাটির বাড়ি ভেঙে প্রায় ১০,০০০ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
  • ২০০১ সালের ভুজ ভূমিকম্প (Mw ৭.৭): ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসে গুজরাটের কচ্ছে সংঘটিত হয়; প্রায় ২০,০০০ মানুষ প্রাণ হারায় এবং ভারতের ভবন নির্মাণ বিধিমালার সংস্কার সূচিত হয়।

ভারতের বন্যা ও খরা: স্থানিক বিস্তার, কারণ ও ব্যবস্থাপনা

১. ভারতের বন্যা: কারণ, রূপ ও প্রধান অববাহিকাসমূহ

ভারত বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক বন্যাপ্রবণ দেশ, যেখানে প্রতি বছর প্রায় ৪ কোটি হেক্টর জমি (মোট ভৌগোলিক এলাকার প্রায় ১২%) বন্যার জলে নিমজ্জিত হয়:

  • বন্যার প্রধান কারণসমূহ:
    • মৌসুমি বর্ষণের ঋতুভিত্তিক কেন্দ্রীভবন: মোট বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭৫-৮০% কেবল জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের ১০০ দিনের মধ্যে সংঘটিত হয়।
    • নদীখাতে অতিরিক্ত পলি সঞ্চয়: হিমালয় থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্র, কোশী ও তিস্তা নদী বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে নদীগর্ভ অগভীর করে তোলে; ফলে সামান্য জলেই নদী দুকূল উপচে পড়ে।
    • মেঘভাঙা বৃষ্টি ও জলধারার বাঁধভাঙা জল: পাহাড়ি এলাকায় মেঘভাঙা বৃষ্টি এবং অতিরিক্ত চাপে ব্যারাজ ও জলাধার থেকে আকস্মিক জল ছাড়া।
    • অপরিকল্পিত নগরায়ণ: প্রাকৃতিক জলাভূমি ভরাট ও নিকাশি নালা বন্ধ হওয়ায় কলকাতা, চেন্নাই, মুম্বাইয়ের মতো শহরে জলমগ্নতা বা শহুরে বন্যা।
  • প্রধান বন্যাপ্রবণ অববাহিকা:
    • ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা (আসাম উপত্যকা): প্রতি বছর বিধ্বংসী বন্যায় কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান সহ লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
    • গঙ্গা ও কোশী নদী: কোশী নদীকে 'বিহারের দুঃখ' বলা হয়; গত ২৫০ বছরে নদীটি গতিপথ পরিবর্তন করে পশ্চিম দিকে ১২০ কিমিরও বেশি সরে গেছে।
    • পশ্চিমবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি: উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স ও তরাইয়ে তিস্তা, তোরষা, জলঢাকা নদীর হড়পা বান; ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে নেমে আসা দামোদর, অজয়, ময়ূরাক্ষী, কংসাবতীর নিম্ন অববাহিকায় বর্ধমান, হুগলি ও হাওড়া জেলার বন্যা; এবং সুন্দরবনের নোনা জলের জোয়ারি প্লাবন।
২. ভারতের খরা: শ্রেণিবিভাগ ও খরাপ্রবণ অঞ্চল

খরা হলো বৃষ্টিপাতের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতিজনিত এক ধীরগতির অথচ বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ:

খরার প্রকারভেদ বৈজ্ঞানিক নির্ণায়ক (IMD মানদণ্ড) বাস্তুতান্ত্রিক ও সামাজিক প্রভাব
আবহাওয়াগত খরা (Meteorological) স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ২৫%-এর বেশি।
মাঝারি: ২৬-৫০% ঘাটতি।
চরম: >৫০% ঘাটতি।
দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতা, তাপপ্রবাহ এবং বায়ুমণ্ডলের আপেক্ষিক আর্দ্রতার চরম হ্রাস।
জলতাত্ত্বিক খরা (Hydrological) নদ-নদী, জলাশয়, খাল-বিলের জল শুকিয়ে যাওয়া এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তরের বিপজ্জনক পতন। তীব্র পানীয় জলের সংকট, সেচ খালের শুষ্কতা এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাঘাত।
কৃষি খরা (Agricultural) ফসলের বৃদ্ধির বিভিন্ন ধাপে (অঙ্কুরোদগম, ফুল ও দানা গঠন) মাটির প্রয়োজনীয় আর্দ্রতার চরম অভাব। ফসল ঝলসে যাওয়া, কৃষিকাজে ধস, খড় ও পশুখাদ্যের অভাব এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক বিপর্যয়।
আর্থ-সামাজিক খরা (Socio-Economic) জল ও খাদ্য সংকটের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়া এবং কর্মসংস্থানের সংকট। গ্রাম ছেড়ে মানুষের শহরে বাধ্যতামূলক পরিযান, ঋণগ্রস্ততা ও চরম দারিদ্র্য।
খরাপ্রবণ এলাকা ও মোকাবিলা কৌশল:
• ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল: পশ্চিমঘাট পর্বতের বৃষ্টির ছায়া অঞ্চল (মারাঠওয়াড়া, বিদর্ভ, রায়ালসীমা), রাজস্থানের থর মরুভূমি, বুন্দেলখণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের শুষ্ক রাঢ় অঞ্চল (পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া)।
• প্রযুক্তিগত সমাধান: জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনা (Watershed Management), বর্ষার জল সংরক্ষণ বা রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং (পশ্চিমবঙ্গের জমিতে 'হাপা' খনন), বিন্দু বা ড্রিপ সেচ ও স্প্রিংকলার পদ্ধতির ব্যবহার, এবং জলের অপচয়কারী বোরো ধানের পরিবর্তে কম জলের মিলেট বা বাজরা-জোয়ার চাষ।

ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস: বঙ্গোপসাগরের বিশেষ ভূমিকা

১. ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ ও কার্যপদ্ধতি

ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় হলো উষ্ণ সাগরের ওপর সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপ ঘূর্ণি, যার কেন্দ্রে প্রবল ঘূর্ণি বাতাস, মুষলধারে বৃষ্টি এবং জলোচ্ছ্বাস সংঘটিত হয়:

  • ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির অপরিহার্য শর্তসমূহ:
    1. সমুদ্রপৃষ্ঠের জলের তাপমাত্রা ক্রমাগত ২৬.৫° থেকে ২৭°C বা তদূর্ধ্ব হওয়া (৫০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত)।
    2. ঘূর্ণন সৃষ্টির জন্য পর্যাপ্ত কোরিওলিস বল (বিষুবরেখা থেকে অন্তত ৫° দূরে)।
    3. বায়ুমণ্ডলের নিম্ন ও উচ্চ স্তরের মধ্যে উল্লম্ব বায়ু প্রবাহের গতির পার্থক্য (Wind Shear) ন্যূনতম হওয়া।
    4. বায়ুমণ্ডলের মধ্যস্তরে উচ্চ আর্দ্রতা (>৬০%) থাকা।
  • বঙ্গোপসাগর বনাম আরব সাগরের অসমতা (৪:১ অনুপাত):
    • আরব সাগরের তুলনায় বঙ্গোপসাগরে প্রায় চার গুণ বেশি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়।
    • প্রধান কারণ: বঙ্গোপসাগরের জলের তাপমাত্রা বেশি; এর ত্রিভুজাকার বা ফানেল আকৃতি; গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র নদের বিশাল মিষ্টি জলের প্রবাহ যা সাগরের ওপর হালকা ও উষ্ণ জলের স্তর তৈরি করে উল্লম্ব আলোড়ন রোধ করে; এবং দক্ষিণ চীন সাগর থেকে আসা টাইফুনের ধ্বংসাবশেষ সহজে বঙ্গোপসাগরে ঢুকে পুনরুজ্জীবিত হয়।
  • ঋতুভিত্তিক পৌনঃপুনিকতা: ভারতে দুটি প্রধান মৌসুমে ঘূর্ণিঝড় আসে—প্রাক-বর্ষা (এপ্রিল-মে) এবং বর্ষোত্তর বা শরৎকাল (অক্টোবর-নভেম্বর)। এর মধ্যে বর্ষোত্তর ঘূর্ণিঝড় সর্বাধিক বিধ্বংসী হয়।
২. জলোচ্ছ্বাস (Storm Surge): উপকূল ধ্বংসকারী দানবীয় তরঙ্গ

জলোচ্ছ্বাস হলো স্বাভাবিক জোয়ারের মাত্রার চেয়ে সমুদ্রের জলতল আকস্মিক অস্বাভাবিক উচ্চতায় বৃদ্ধি পাওয়া। এটি দুটি প্রধান কারণে ঘটে:

  1. ঝড়ের বায়ুর ঘর্ষণ জনিত চাপ: ১৫০ থেকে ২৫০ কিমি/ঘণ্টা বেগের প্রলয়ঙ্করী বাতাস সাগরের বিপুল পরিমাণ জলকে ঠেলে অগভীর উপকূলের দিকে নিয়ে আসে।
  2. ইনভার্টেড ব্যারোমিটার প্রভাব: ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র বা চক্ষুতে বায়ুচাপ অত্যন্ত কমে যাওয়ায় (প্রতি ১ মিলিবার চাপ হ্রাসে জলতল ১ সেমি ফুলে ওঠে) সাগরের জল ফুলেফেঁপে গম্বুজের মতো উপরে উঠে আসে।
সুন্দরবন ও বাংলার উপকূল কেন সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
• বঙ্গোপসাগরের অগভীর মহীসোপান এবং ফানেল আকৃতির উপকূল জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতাকে ৫ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
• সুন্দরবনের দ্বীপগুলি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২-৩ মিটার উঁচু হওয়ায় মাটির বাঁধ ভেঙে নোনা জল ঢুকে মিষ্টি জলের পুকুর ও ধানি জমি চিরতরে লবণাক্ত করে ফেলে।
• ঐতিহাসিক বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়: ১৯৭০-এর ভোলা সাইক্লোন (প্রায় ৩-৫ লক্ষ মানুষের মৃত্যু); ১৯৯৯-এর ওড়িশা সুপার সাইক্লোন; ২০০৯-এর আয়লা; ২০২০-এর আম্ফান (সুপার সাইক্লোন); ২০২১-এর ইয়াস এবং ২০২৪-এর রেমাল।

ভূমিধস ও সুনামি: ভূরূপতাত্ত্বিক কারণ, প্রভাব ও প্রশমন

১. ভারতে ভূমিধসের কারণ ও অঞ্চলভিত্তিক বিস্তার

ভূমিধস হলো মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে শিলাখণ্ড, মাটি ও আবর্জনার স্তূপের দ্রুত বা ধীর নিম্নমুখী স্খলন:

  • ভারতের প্রধান ধসপ্রবণ অঞ্চলসমূহ:
    • হিমালয় পর্বতমালা (দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল): নবীন ভঙ্গিল পর্বত, পাললিক শিলার দুর্বল স্তর, সক্রিয় টেকটনিক ফাটল ও অতিবৃষ্টির কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম ধসপ্রবণ অঞ্চল।
    • পশ্চিমঘাট পর্বত (নীলগিরি, ওয়েনাড়, কোঙ্কণ): খাড়া পশ্চিমা ঢালে বর্ষায় প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতের কারণে ভয়াবহ কাদার স্রোত ও ধস নামে।
  • ভূমিধসের কার্যকারণ:
    • প্রাকৃতিক কারণ: বর্ষার একটানা প্রবল বৃষ্টিতে মাটির ছিদ্রের মধ্যে জলের চাপ (Pore-water pressure) অস্বাভাবিক বেড়ে শিলার ঘর্ষণ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়; ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি।
    • মনুষ্যসৃষ্ট কারণ: পাহাড়ি রাস্তার জন্য অবৈজ্ঞানিক পাহাড় কাটা (যেমন—শিলিগুড়ি থেকে সিকিমগামী জাতীয় সড়ক ১০ বা NH-10); যত্রতত্র বহুতল হোটেল নির্মাণ করে ঢালে অতিরিক্ত ভার চাপানো; এবং বন উজাড়।
  • প্রকৌশলগত ও জৈব-প্রকৌশলগত প্রশমন ব্যবস্থা:
    1. ছিদ্রযুক্ত রিটেইনিং ওয়াল (Retaining wall) ও তারের জালের গ্যাবিয়ন ওয়াল নির্মাণ যাতে জল আটকে না থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।
    2. পাহাড়ের ঝোরাগুলিকে পাকা নালা দিয়ে বাঁধাই করা (Jhora training) যাতে বৃষ্টির জল ঢালের ফাটলে না ঢোকে।
    3. পাহাড়ের খাড়া ঢালকে ধাপে ধাপে কাটা (Terraced Benching)।
    4. গভীর মূলযুক্ত ভেটিভার ঘাস (Vetiver grass) রোপণ এবং জিওটেক্সটাইল চট বিছিয়ে ধস ঠেকানো।
২. সুনামি (Tsunami) ও ভারত মহাসাগরীয় আগাম সতর্কীকরণ কেন্দ্র

সুনামি হলো সাগরের তলদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা বিশাল ধসের ফলে সমুদ্রের জলে সৃষ্ট দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও সুউচ্চ দানবীয় জলতরঙ্গ:

  • ২৬ ডিসেম্বর ২০০৪-এর ভারত মহাসাগরীয় সুনামি:
    • কারণ: ইন্দোনেশিয়ার উত্তর সুমাত্রার পশ্চিমে সুন্দা খাতের টেকটনিক ফাটলে উৎপন্ন Mw ৯.১-৯.৩ মাত্রার এক মহা-ভূমিকম্প।
    • ভারতে প্রভাব: আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং তামিলনাড়ুর নাগাপট্টিনম, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কেরালার উপকূলে ১০-১২ মিটার উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়ে প্রায় ১৬,০০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটায়।
  • ভারতীয় সুনামি আগাম সতর্কীকরণ কেন্দ্র (ITEWC):
    • ২০০৭ সালে হায়দ্রাবাদের INCOIS (Indian National Centre for Ocean Information Services)-এ অত্যাধুনিক সুনামি সতর্কতা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়।
    • সাগরের তলদেশের প্রেশার সেন্সর (BPR বা সুনামি বয়া), উপকূলীয় জোয়ার-ভাটা মাপক যন্ত্র এবং বিশ্ব ভূকম্পন নেটওয়ার্কের সাহায্যে সাগরে ভূমিকম্পের ১০ মিনিটের মধ্যে সতর্কতা জারি করতে সক্ষম।

বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কাঠামো: ২০০৫ সালের আইন, NDMA ও সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্ক

১. দৃষ্টিভঙ্গির ঐতিহাসিক পরিবর্তন: ত্রাণ থেকে ঝুঁকি হ্রাস (DRR)

ঐতিহাসিকভাবে ভারতে বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা ছিল মূলত প্রতিক্রিয়াশীল (Reactive)—অর্থাৎ বিপর্যয় ঘটার পর উদ্ধারকাজ চালানো, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া। কিন্তু ১৯৯৯-এর ওড়িশা সাইক্লোন, ২০০১-এর ভুজ ভূমিকম্প এবং ২০০৪-এর সুনামির পর ভারত সরকার ২০০৫ সালের জাতীয় বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা আইন (Disaster Management Act, 2005) পাস করে পূর্বপ্রস্তুতি, ঝুঁকি হ্রাস ও টেকসই প্রতিরক্ষার এক সমন্বিত নীতি গ্রহণ করে।

২. ২০০৫ সালের আইনের ত্রিস্তরীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
প্রশাসনিক স্তর আইনগত কর্তৃপক্ষ প্রধান / সভাপতি মূল দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ
জাতীয় স্তর (Apex) NDMA
(জাতীয় বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ)
ভারতের প্রধানমন্ত্রী জাতীয় বিপর্যয় নীতি প্রণয়ন, বিভিন্ন মন্ত্রকের মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং জাতীয় নির্দেশিকা জারি করা।
রাজ্য স্তর SDMA
(রাজ্য বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ)
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য বিপর্যয় পরিকল্পনা অনুমোদন ও রাজ্য দপ্তরের মধ্যে উদ্ধার ও প্রশমন সমন্বয় (যেমন—পশ্চিমবঙ্গ SDMA)।
জেলা স্তর (Frontline) DDMA
(জেলা বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ)
জেলাশাসক (DM / Collector)
সহ-সভাপতি: জেলা পরিষদ সভাধিপতি
মাঠপর্যায়ে তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজ পরিচালনা, কন্ট্রোল রুম খোলা, ত্রাণ বিতরণ ও আশ্রয় শিবির ব্যবস্থাপনা।
৩. উদ্ধারকারী বাহিনী ও সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্ক (2015-2030)
  • জাতীয় ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF & SDRF): আধাসামরিক বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বাহিনী, যারা আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট যেকোনো বিপর্যয়ে দ্রুত অবতীর্ণ হয়।
  • সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্ক (Sendai Framework 2015-2030): ২০১৫ সালে জাপানের সেন্ডাই শহরে গৃহীত রাষ্ট্রসংঘের সনদ, যার ৪টি মূল অগ্রাধিকার রয়েছে:
    1. ১ম অগ্রাধিকার: বৈজ্ঞানিক মানচিত্র ও গবেষণার মাধ্যমে বিপর্যয়ের ঝুঁকি সঠিকভাবে উপলব্ধি করা।
    2. ২য় অগ্রাধিকার: প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব শক্তিশালী করা।
    3. ৩য় অগ্রাধিকার: পরিকাঠামো মজবুত করার জন্য বিপর্যয় ঝুঁকি হ্রাসে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
    4. ৪র্থ অগ্রাধিকার: জরুরি মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং "Build Back Better" (পূর্বের চেয়েও আরও উন্নত ও সুরক্ষিত পুনর্নির্মাণ) নীতি অনুসরণ করা।
  • সমাজভিত্তিক বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা (CBDRM): স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য, যুবক-যুবতী ও মৎস্যজীবীদের প্রাথমিক উদ্ধারকাজ, প্রাথমিক চিকিৎসা ও সতর্কবার্তা প্রচারের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলা।

গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক পরিভাষা, সূত্র ও পরিমাপক

বিপর্যয় ঝুঁকির মৌলিক সূত্র
Disaster Risk = {Hazard (দুর্যোগ) × Vulnerability (সুভেদ্যতা)}{Capacity (মোকাবিলার ক্ষমতা)}
গুটেনবার্গ-রিখটার শক্তি ও মাত্রা সম্পর্ক
$$\log_{10}(E) = 4.8 + 1.5 M_w$$
বন্যার পুনরাবৃত্তি কাল (Weibull Formula)
$$T = \frac{N + 1}{m}$$

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
দুর্যোগ (Hazard) এবং বিপর্যয়ের (Disaster) মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নির্দেশ করো। বিপর্যয় ঝুঁকি সমীকরণটি (Disaster Risk Equation) ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের মধ্যে পার্থক্য:

  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ (Natural Hazard):
    • দুর্যোগ হলো একটি প্রাকৃতিক চরম অবস্থা, প্রক্রিয়া বা সম্ভাব্য ক্ষতিকারক ঘটনা যা মানবজীবন, পরিবেশ বা সম্পদের ক্ষতিসাধনের সুপ্ত আশঙ্কা তৈরি করে।
    • এটি কোনো জনমানবহীন অঞ্চলে ঘটলে তা কেবল দুর্যোগ হিসেবেই গণ্য হয়, বিপর্যয় হয় না।
    • উদাহরণ: বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে জনশূন্য অঞ্চলে অবস্থানকারী একটি শক্তিশালী ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়।
  • প্রাকৃতিক বিপর্যয় (Natural Disaster):
    • কোনো বিপজ্জনক প্রাকৃতিক দুর্যোগ যখন জনবসতিপূর্ণ কোনো অঞ্চলে আছড়ে পড়ে ব্যাপক প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ও সম্পত্তির বিনাশ ঘটায়, যার তীব্রতা স্থানীয় সমাজের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করে দেয় এবং মোকাবিলার ক্ষমতাকে অতিক্রম করে যায়।
    • উদাহরণ: সেই একই ঘূর্ণিঝড় যখন জনবহুল সুন্দরবনের উপকূলে আছড়ে পড়ে হাজার হাজার মাটির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়, নদীবাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত করে এবং প্রাণহানি ঘটায়।

২. বিপর্যয় ঝুঁকি সমীকরণ (Disaster Risk Equation):

$$\text{বিপর্যয় ঝুঁকি (Risk)} = \frac{\text{দুর্যোগ (Hazard)} \times \text{সুভেদ্যতা (Vulnerability)}}{\text{মোকাবিলা করার সক্ষমতা (Capacity)}}$$

  • দুর্যোগ (H): প্রাকৃতিক চরম ঘটনার তীব্রতা, স্থায়িত্ব ও বিস্তার।
  • সুভেদ্যতা (V): বিপদের মুখে মানবসমাজ ও পরিকাঠামোর অরক্ষিত বা দুর্বল থাকার মাত্রা (যেমন—প্লাবনভূমিতে মাটির বাড়ি, সতর্কবার্তা না পাওয়া)।
  • মোকাবিলা করার সক্ষমতা (C): প্রশাসনিক পূর্বপ্রস্তুতি, মজবুত সাইক্লোন শেল্টার, ডপলার রাডারের আগাম সতর্কবার্তা ও দ্রুত উদ্ধারকারী দলের দক্ষতা।
  • সিদ্ধান্ত: চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলেও যদি সমাজের সুভেদ্যতা কমিয়ে সক্ষমতা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে সামগ্রিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বা ক্ষয়ক্ষতি শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা সম্ভব।
উদাহরণ 2
ভারতে ভূমিকম্প সংঘটনের প্রধান ভূ-গাঠনিক কারণসমূহ বিশ্লেষণ করো। ভারতীয় মানক সংস্থা (BIS IS 1893) অনুসারে দেশের চারটি ভূমিকম্প বলয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. ভারতে ভূমিকম্পের ভূ-গাঠনিক কারণ:

  • মহাদেশীয় পাতের সংঘর্ষ: ভারতীয় ভূত্বকীয় পাত প্রতি বছর প্রায় ৪-৫ সেমি গতিতে উত্তর দিকে চলমান এবং স্থির ইউরেশীয় পাতের নিচে প্রবিষ্ট হচ্ছে।
  • চ্যুতি বরাবর শক্তির মুক্তি: হিমালয়ের ২,৫০০ কিমি দীর্ঘ সংঘর্ষ সীমানা বরাবর প্রধান থ্রাস্ট বা চ্যুতিগুলিতে (MCT, MBT, MFT) শত শত বছর ধরে শিলার মধ্যে স্থিতিস্থাপক পীড়ন সঞ্চিত হয়। শিলার স্থিতিস্থাপক সীমা অতিক্রান্ত হলে চ্যুতি হঠাৎ ফেটে গিয়ে বিধ্বংসী ভূমিকম্প তরঙ্গের সৃষ্টি করে।
  • উপদ্বীপীয় ভারতের অন্তঃপাতীয় ফাটল: দাক্ষিণাত্যের প্রাচীন গ্রস্ত উপত্যকা (নর্মদা-শোন-তাপ্তি ফাটল বা কুরদুভাদি চ্যুতি) বরাবর ভূগর্ভস্থ চাপ পুনর্বণ্টনের ফলে লাতুর ও জবলপুরের মতো মারাত্মক অগভীর ভূমিকম্প ঘটে।

২. BIS IS 1893: 2016 অনুসারে ভারতের ৪টি সিসমিক জোন:

  • জোন V (অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, Z = ০.৩৬):
    • এখানে ভূকম্পন তীব্রতা ৯ বা তার বেশি (MSK স্কেল)।
    • অন্তর্ভুক্ত এলাকা: সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারত (আসাম, মেঘালয় ইত্যাদি), জম্মু-কাশ্মীর, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশের একাংশ, উত্তর বিহার, গুজরাটের কচ্ছ এবং আন্দামান-নিকোবর।
  • জোন IV (উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, Z = ০.২৪):
    • তীব্রতা ৮ মাত্রার ভূকম্পন অনুভব হয়।
    • অন্তর্ভুক্ত এলাকা: উত্তরবঙ্গ (দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি), দিল্লি ও এনসিআর, উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের উত্তরের সমভূমি এবং পশ্চিম হিমালয়ের বাকি অংশ।
  • জোন III (মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, Z = ০.১৬):
    • তীব্রতা ৭ মাত্রার ভূকম্পন হতে পারে।
    • অন্তর্ভুক্ত এলাকা: দক্ষিণবঙ্গ (কলকাতা, হাওড়া ও ২৪ পরগনা), উপকূলীয় মহারাষ্ট্র (মুম্বাই), কেরালা, গুজরাটের মধ্যভাগ ও ওড়িশা।
  • জোন II (নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, Z = ০.১০):
    • তীব্রতা ৬ বা তার কম।
    • অন্তর্ভুক্ত এলাকা: দাক্ষিণাত্যের প্রাচীন ও শক্ত উপদ্বীপীয় শিল্ড অঞ্চল (কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, মধ্য মহারাষ্ট্র ও তেলেঙ্গানা)।
উদাহরণ 3
আরব সাগরের তুলনায় বঙ্গোপসাগরে বহু গুণ বেশি শক্তিশালী ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির প্রধান ভৌগোলিক কারণগুলি কী কী? জলোচ্ছ্বাসের (Storm Surge) প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের আধিক্যের কারণ (৪:১ অনুপাত): উত্তর ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের প্রায় ৮০% বঙ্গোপসাগরে গঠিত হওয়ার পেছনে চারটি প্রধান ভৌত কারণ রয়েছে:

  • সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চ তাপমাত্রা: বঙ্গোপসাগরের জলের তাপমাত্রা অধিকাংশ সময় ২৮° থেকে ৩০°C থাকে, যা নিম্নচাপকে শক্তি জোগানোর জন্য প্রচুর বাষ্পীভবনের লীনতাপ সরবরাহ করে। পক্ষান্তরে আরব সাগরে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর টানে গভীর থেকে ঠান্ডা জল উপরে উঠে আসে (Upwelling), ফলে তাপমাত্রা কম থাকে।
  • মিষ্টি জলের হালকা স্তর: গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মহানদী ও ইরাবতী নদীর বিপুল পরিমাণ মিষ্টি জল সাগরে পড়ে একটি পাতলা ও কম লবণাক্ত ওপরের স্তর তৈরি করে। এটি সাগরের জলের উল্লম্ব মিশ্রণ আটকে দেয়, ফলে সূর্যের তাপে ওপরের জল দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
  • ফানেল আকৃতির উপকূল: বঙ্গোপসাগরের উত্তল ও ত্রিভুজাকার আকৃতির কারণে সাইক্লোন সহজেই শক্তি সঞ্চয় করে সোজা উপকূলের দিকে ধাবিত হয়।
  • টাইফুনের প্রভাব: দক্ষিণ চীন সাগরে উৎপন্ন টাইফুনের অবশিষ্টাংশ মায়ানমার ও মালয় উপদ্বীপ পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরে এসে নতুন করে গভীর নিম্নচাপে রূপ নেয়।

২. জলোচ্ছ্বাসের (Storm Surge) প্রক্রিয়া: ঘূর্ণিঝড়ের সময় সমুদ্রের জল অস্বাভাবিক ফুলে উঠে উপকূলে আছড়ে পড়াকে জলোচ্ছ্বাস বলে:

  • বায়ুর প্রচণ্ড ঘর্ষণ: ঝড়ের ১৫০-২৫০ কিমি বেগের প্রবল বাতাস সাগরের জলকে সামনের দিকে ঠেলে অগভীর মহীসোপানের ওপর স্তূপাকার করে তোলে।
  • ব্যারোমিটার প্রভাব: ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে বায়ুর চাপ অস্বাভাবিক কমে যায় (প্রায় ৯২০-৯৫০ মিলিবার)। প্রতি ১ মিলিবার চাপ কমলে সমুদ্রের জলতল প্রায় ১ সেমি উঁচুতে উঠে যায়।
  • বদ্বীপীয় ফানেলিং প্রভাব: বঙ্গোপসাগরের অগভীর তলদেশ ও ত্রিকোণাকার মোহনায় জল সংকীর্ণ স্থানে এসে ৫ থেকে ১০ মিটার উঁচু প্রাচীরের মতো ফুলে ওঠে এবং নদীবাঁধ ভেঙে মিষ্টি জলের জমি প্লাবিত করে।
উদাহরণ 4
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চল এবং দক্ষিণের রাঢ় ও সুন্দরবন অঞ্চলের প্রধান প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলির কারণ তুলনামূলকভাবে আলোচনা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

পশ্চিমবঙ্গে ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে উত্তর ও দক্ষিণ ভাগে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা যায়:

১. উত্তরবঙ্গের পার্বত্য ও ডুয়ার্স অঞ্চল (দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি):

  • প্রধান বিপর্যয়: ভয়াবহ ভূমিধস এবং নদীগুলির আকস্মিক হড়পা বান (Flash Flood)।
  • কারণসমূহ:
    • নবীন ভঙ্গিল ভূগঠন: হিমালয়ের এই অংশে পাললিক শিলা অত্যন্ত চূর্ণ-বিচূর্ণ ও চ্যুতিযুক্ত।
    • মেঘভাঙা অতিবৃষ্টি: বর্ষাকালে ২৪ ঘণ্টায় ২০০-৩০০ মিমি বৃষ্টি হলে মাটির রন্ধ্রে জলের চাপ বেড়ে পাহাড়ের ঢাল আলগা হয়ে ধস নামে (বিশেষ করে জাতীয় সড়ক ১০ বা NH-10 বরাবর)।
    • অবৈজ্ঞানিক নির্মাণ: রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে খাড়া পাহাড়ের পাদদেশ কাটা এবং পাহাড়ের ঝোরা বন্ধ করা।
    • নদী উপত্যকার প্লাবন: তিস্তা, তোরষা, জলঢাকা নদী পাহাড় ছেড়ে ডুয়ার্সের সমতলে আসতেই পলি জমার কারণে নদীখাত ভরাট হয়ে হঠাৎ তীব্র বন্যা ঘটায়।

২. পশ্চিমের রাঢ় অঞ্চল ও দক্ষিণের সুন্দরবন বদ্বীপ:

  • প্রধান বিপর্যয়: রাঢ়ের বাঁধভাঙা আকস্মিক বন্যা এবং সুন্দরবনের সাইক্লোনজনিত জলোচ্ছ্বাস।
  • কারণসমূহ:
    • জলাধারের জলমুক্তি: ঝাড়খণ্ডের ছোটনাগপুর মালভূমিতে প্রবল বৃষ্টি হলে ডিভিসি (DVC)-র মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধার থেকে বিপুল জল ছাড়ার ফলে নিম্ন দামোদর অববাহিকা (হাওড়া, হুগলি) প্লাবিত হয়।
    • নদীর নাব্যতা হ্রাস: হুগলি ও ভাগীরথী নদীখাতে পলি জমে জলধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া।
    • সুন্দরবনের জলোচ্ছ্বাস: পূর্ণিমা বা অমাবস্যার ভরা কোটালের সাথে বঙ্গোপসাগরের সাইক্লোন যুক্ত হয়ে মাটির বাঁধ ভেঙে দেয়; নোনা জল ঢুকে সুন্দরবনের হাজার হাজার একর ধানি জমি অনাবাদী করে তোলে।
উদাহরণ 5
২০০৫ সালের জাতীয় বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা আইনের অধীনে গঠিত ত্রিস্তরীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার কাঠামো বর্ণনা করো। সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্কের (2015-2030) চারটি মূল অগ্রাধিকার কী কী?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. ২০০৫ সালের বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা আইনের অধীন ত্রিস্তরীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো:

  • ১. জাতীয় স্তর: NDMA (National Disaster Management Authority):
    • নেতৃত্ব: পদাধিকারবলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এর চেয়ারপারসন বা সভাপতি।
    • কাজ: জাতীয় বিপর্যয় নীতি ও রূপরেখা তৈরি করা, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের কাজের সমন্বয় করা এবং সশস্ত্র বাহিনী ও NDRF পরিচালনা করা।
  • ২. রাজ্য স্তর: SDMA (State Disaster Management Authority):
    • নেতৃত্ব: পদাধিকারবলে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এর সভাপতি (যেমন—পশ্চিমবঙ্গ SDMA)।
    • কাজ: রাজ্যের ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রস্তুত করা এবং বিভিন্ন দপ্তরের তহবিল ও ত্রাণের সমন্বয় করা।
  • ৩. জেলা স্তর: DDMA (District Disaster Management Authority):
    • নেতৃত্ব: জেলাশাসক (DM বা District Magistrate) এর সভাপতি, এবং জেলা পরিষদ সভাধিপতি সহ-সভাপতি।
    • কাজ: তৃণমূল স্তরে সরাসরি উদ্ধারকাজ পরিচালনা, কন্ট্রোল রুম স্থাপন, আশ্রয় শিবির নিয়ন্ত্রণ ও তাৎক্ষণিক ত্রাণ বণ্টন।
  • বিশেষায়িত বাহিনী: কেন্দ্রে NDRF এবং রাজ্যে SDRF আধুনিক সাজসরঞ্জাম নিয়ে উদ্ধারকাজে নেতৃত্ব দেয়।

২. সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্কের (Sendai Framework 2015-2030) চারটি মূল অগ্রাধিকার:

  • ১ম অগ্রাধিকার: বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে বিপর্যয়ের ঝুঁকি সম্যকভাবে বোঝা।
  • ২য় অগ্রাধিকার: বিপর্যয় ঝুঁকি পরিচালনার জন্য সরকারি ও সামাজিক শাসনব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করা।
  • ৩য় অগ্রাধিকার: ক্ষয়ক্ষতি রোধ করতে স্থিতিস্থাপক ও টেকসই পরিকাঠামো নির্মাণে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক বিনিয়োগ করা।
  • ৪র্থ অগ্রাধিকার: জরুরি উদ্ধার প্রস্তুতি বৃদ্ধি করা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে "Build Back Better" (আরও উন্নত ও নিরাপদ পুনর্গঠন) নীতি অনুসরণ করা।
উদাহরণ 6
মৌসম ভবন (IMD) স্বীকৃত প্রধান প্রকারের খরাগুলি কী কী? পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার মতো খরাপ্রবণ জেলায় দীর্ঘমেয়াদী জলসংরক্ষণ ও কৃষিব্যবস্থার সমাধান আলোচনা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. ভারতের মৌসম ভবন (IMD) অনুযায়ী খরার শ্রেণিবিভাগ:

  • আবহাওয়াগত খরা (Meteorological Drought): কোনো অঞ্চলে বার্ষিক বা ঋতুভিত্তিক বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে ২৫% বা তার বেশি কম হলে আবহাওয়াগত খরা হয় (২৬-৫০% ঘাটতি হলে মাঝারি, ৫০%-এর বেশি হলে তীব্র খরা)।
  • জলতাত্ত্বিক খরা (Hydrological Drought): বৃষ্টিপাতের অভাবে নদী, নালা, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ জলস্তর বিপজ্জনকভাবে নেমে গেলে জলতাত্ত্বিক খরা দেখা দেয়।
  • কৃষি খরা (Agricultural Drought): মাটির আর্দ্রতা কমে গিয়ে উদ্ভিদের শিকড়ে জল না পৌঁছালে ফসলের বৃদ্ধি থেমে যায় এবং ফসল নষ্ট হয়।
  • আর্থ-সামাজিক খরা (Socio-Economic Drought): জল ও খাদ্যের অভাবে গ্রামীণ সমাজে দারিদ্র্য, অনাহার, বেকারত্ব ও পরিযান বৃদ্ধি পেলে তাকে আর্থ-সামাজিক খরা বলে।

২. পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া জেলায় খরার টেকসই সমাধান:

  • জলবিভাজিকা ও হাপা প্রকল্প (Hapa Model):
    • মাঠের সবচেয়ে নিচু কোণে পুকুর বা 'হাপা' খনন করে বর্ষার অতিরিক্ত জল ধরে রাখা, যা বর্ষার শেষে ফসলের জীবনদায়ী সেচ হিসেবে কাজ করে।
    • ছোট পাহাড়ি ঝোরাগুলিতে চেক ড্যাম (Check Dam) ও গালি প্লাগ তৈরি করে ভূমিক্ষয় রোধ ও ভূগর্ভস্থ জলস্তর বৃদ্ধি করা।
  • বিন্দু (Drip) ও স্প্রিংকলার সেচ: সনাতন প্লাবন সেচ বন্ধ করে ড্রিপ সেচ চালু করা, যা সরাসরি গাছের গোড়ায় ফোঁটা ফোঁটা জল দিয়ে ৬০-৭০% জল সাশ্রয় করে।
  • মিলেট ও খরাসহনশীল শস্য চাষ: গ্রীষ্মকালে মাত্রাতিরিক্ত জলখেকো বোরো ধান চাষের পরিবর্তে জোয়ার, বাজরা, রাগি (মিলেট) এবং অড়হর ও ভুট্টার মতো শুষ্ক অঞ্চলের ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা।
  • সামাজিক বনসৃজন: পতিত ল্যাটেরাইট জমিতে নিম, পলাশ, মহুয়া ও সিরিশ গাছ লাগিয়ে মাটির আর্দ্রতা রক্ষা ও বাষ্পীভবন হ্রাস করা।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

দুর্যোগ (Hazard) এবং বিপর্যয়কে (Disaster) একই অর্থবোধক শব্দ মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

দুর্যোগ হলো কেবল চরম ভৌত ঘটনা বা সম্ভাবনা; কিন্তু এটি যখন দুর্বল মানবসমাজে আঘাত হেনে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে, তখনই তাকে বিপর্যয় বলে।

সাধারণ ভুল ধারণা

ধারণা করা যে দক্ষিণ ভারত বা উপদ্বীপীয় ভারতে কখনো ভূমিকম্প হতে পারে না।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

দাক্ষিণাত্য অঞ্চল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হলেও এটি সম্পূর্ণ নিশ্চল নয়; প্রাচীন চ্যুতি পুনরুজ্জীবিত হয়ে লাতুর (১৯৯৩) ও জবলপুরে (১৯৯৭) মারাত্মক ভূমিকম্প ঘটিয়েছে।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে কেবল স্থানীয় বৃষ্টির কারণেই দক্ষিণবঙ্গে বন্যা হয়।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

দক্ষিণবঙ্গের (নিম্ন দামোদর অববাহিকার) বন্যার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ঝাড়খণ্ডের মালভূমিতে অতিবৃষ্টি এবং সেখানকার ডিভিসি জলাধারগুলি থেকে অতিরিক্ত জল ছাড়া।

চিত্রগত ব্যাখ্যা ও মডেল

ভারতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিপর্যয় ও ব্যবস্থাপনা মানচিত্র ভূমিকম্প অঞ্চল (BIS জোন), সাইক্লোন, বন্যা-খরা ও NDMA প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ১. দুর্যোগ বনাম বিপর্যয় • দুর্যোগ (Hazard): প্রাকৃতিক চরম ঘটনা (ঝুঁকি) • বিপর্যয় (Disaster): দুর্যোগ × চরম অসহায়তা • সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্ক (Sendai 2015-30) লক্ষ্য Disaster = (Hazard × Vulnerability) / Capacity ২. ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চল (BIS জোন) • জোন V (অতি উচ্চ ঝুঁকি): উত্তর-পূর্ব ও হিমালয় • জোন IV (উচ্চ ঝুঁকি): উত্তরবঙ্গ (দার্জিলিং, ডুয়ার্স) • জোন III (মাঝারি): কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গ • জোন II (নিম্ন ঝুঁকি): দাক্ষিণাত্য প্রাচীন শিল্ড বিপর্যয় ঝুঁকি হ্রাস চক্র (DRR) ১. প্রতিরোধ ও প্রশমন ২. পূর্বপ্রস্তুতি ও সতর্কতা ৩. দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ ৪. পুনর্বাসন ও পুনর্নির্মাণ ৩. আবহাওয়াগত চরম বিপর্যয় • সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস: বঙ্গোপসাগর (আম্ফান/রেমাল) • বন্যা: তিস্তা, তোরষা, নিম্ন দামোদর অববাহিকা • খরা: পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও বৃষ্টির ছায়া অঞ্চল • পাহাড়ে ধস (Landslide): NH-10 ও কালিম্পং ৪. বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কাঠামো • NDMA: কেন্দ্রীয় স্তর (সভাপতি: প্রধানমন্ত্রী) • SDMA: রাজ্য স্তর (সভাপতি: মুখ্যমন্ত্রী) • DDMA: জেলা স্তর (সভাপতি: জেলাশাসক) • NDRF / SDRF: বিশেষ উদ্ধার ও ত্রাণ বাহিনী WBCHSE Class 11 Geography • Natural Hazards & Disasters of India • TargetExams Academic Standard

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
দুর্যোগ হলো জানমালের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিসম্পন্ন একটি চরম ভৌত ঘটনা, আর বিপর্যয় হলো কোনো অসহায় জনপদে আঘাত হেনে ব্যাপক ধ্বংস সাধন।
মূল বিষয় 2
বিপর্যয় ঝুঁকি দুর্যোগের মাত্রা ও সামাজিক সুভেদ্যতার গুণফলের সমান এবং মোকাবিলার ক্ষমতার ব্যস্তানুপাতিক: ঝুঁকি = (দুর্যোগ x সুভেদ্যতা) / সক্ষমতা।
মূল বিষয় 3
ভারতীয় ও ইউরেশীয় পাতের সংঘর্ষের কারণে দেশের ৫৯% ভূখণ্ড ভূমিকম্পপ্রবণ; BIS IS 1893 মানচিত্র দেশকে জোন II থেকে V-এ ভাগ করেছে।
মূল বিষয় 4
জোন V সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ (উত্তর-পূর্ব ভারত, কচ্ছ, হিমালয়); উত্তরবঙ্গ জোন IV এবং দক্ষিণবঙ্গ/কলকাতা জোন III-এর অন্তর্গত।
মূল বিষয় 5
বর্ষার কেন্দ্রীভবন ও নদীখাতে পলির আধিক্যের কারণে ভারতে বার্ষিক ৪ কোটি হেক্টর জমি প্লাবিত হয় (কোশী 'বিহারের দুঃখ' ও ব্রহ্মপুত্র)।
মূল বিষয় 6
পশ্চিমবঙ্গে উত্তরের তিস্তা-তোরষার হড়পা বান, পশ্চিমে নিম্ন দামোদরের বন্যা এবং দক্ষিণে সুন্দরবনের নোনা জলের প্লাবন ঘটে।
মূল বিষয় 7
উষ্ণ জল (>২৮°C), নদীর মিষ্টি জলের আস্তরণ ও ফানেল উপকূলের কারণে বঙ্গোপসাগরে আরব সাগরের চেয়ে ৪ গুণ বেশি ঘূর্ণিঝড় হয়।
মূল বিষয় 8
সুন্দরবনের নিচু বদ্বীপে ৫-১০ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস নদীবাঁধ ভেঙে হাজার হাজার একর কৃষিজমি নোনা জলে অনাবাদী করে তোলে।
মূল বিষয় 9
দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ে (NH-10) অতিবৃষ্টি ও অবৈজ্ঞানিক পাহাড় কাটার ফলে ঘন ঘন বিধ্বংসী ভূমিধস সংঘটিত হয়।
মূল বিষয় 10
২০০৫ সালের বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা আইনের মাধ্যমে ভারত NDMA, SDMA, DDMA এবং সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্কভিত্তিক আধুনিক ঝুঁকি হ্রাস নীতি গ্রহণ করেছে।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
2
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
3
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
4
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
5
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 11 Geography — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: শাস্ত্র রূপে ভূগোল অধ্যায় 2: পৃথিবীর উৎপত্তি ও অভ্যন্তরীণ গঠন অধ্যায় 3: ভূরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়া অধ্যায় 4: আবহাওয়া ও জলবায়ু অধ্যায় 5: সমস্থিতি তত্ত্ব অধ্যায় 6: বারিমণ্ডল অধ্যায় 7: মানব ভূগোলের পরিধি ও বিষয়বস্তু অধ্যায় 8: অর্থনৈতিক ভূগোল অধ্যায় 9: Secondary Activities - Industry অধ্যায় 10: তৃতীয় স্তরের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ অধ্যায় 11: চতুর্থ স্তরের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ অধ্যায় 12: পঞ্চম স্তরের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ অধ্যায় 13: এক নজরে ভারত অধ্যায় 14: ভারতের ভূতাত্ত্বিক গঠন ও ভূপ্রকৃতি অধ্যায় 15: ভারতের নদনদী ও জলনির্গম প্রণালী অধ্যায় 16: ভারতের জলবায়ু অধ্যায় 17: ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদ ও অরণ্য অধ্যায় 18: ভারতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

ভারতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয় অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।