ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূপ্রাকৃতিক গঠন এর জলবায়ুকে গভীরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে:
- অক্ষাংশগত বিস্তৃতি: কর্কটক্রান্তি রেখা (২৩°৩০' উঃ) ভারতের ঠিক মধ্যভাগ দিয়ে আটটি রাজ্যের ওপর দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে ভারতের দক্ষিণাংশ ক্রান্তীয় মণ্ডলে অবস্থান করে, যেখানে সারাবছর উচ্চ তাপমাত্রা ও স্বল্প বার্ষিক উষ্ণতার প্রসর দেখা যায়। উত্তরাংশ উপক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় চরমভাবাপন্ন মহাদেশীয় জলবায়ু অনুভূত হয় (গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরম ও শীতে তীব্র ঠান্ডা)।
- হিমালয় পর্বতমালার জলবায়ুগত ভূমিকা:
- হিমালয় মধ্য এশিয়া ও সাইবেরিয়া থেকে আগত প্রচণ্ড শুষ্ক ও শীতল মেরু বায়ুকে ভারতে প্রবেশে বাধা দিয়ে দেশকে এক মারাত্মক শৈত্যপ্রবাহ থেকে রক্ষা করে।
- ভারত মহাসাগর থেকে আগত আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে আটকে দিয়ে সমগ্র উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতে ব্যাপক শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘটায়।
- ভূপ্রকৃতি ও উচ্চতার প্রভাব: পশ্চিমঘাট পর্বতের খাড়া পশ্চিম ঢালে আর্দ্র মৌসুমি বায়ু বাধাপ্রাপ্ত হয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত (>২৫০-৪০০ সেমি) ঘটায়, কিন্তু পর্বতের পূর্ব ঢালে নেমে বায়ু উষ্ণ হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চলের সৃষ্টি হয় (যেমন দাক্ষিণাত্য মালভূমি)। আবার আরাবল্লী পর্বত মৌসুমি বায়ুর প্রবাহের সমান্তরালে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে কোনো বাধা সৃষ্টি হয় না, ফলে রাজস্থান বৃষ্টিহীন থেকে যায়।
- সমুদ্রের নৈকট্য (জলবায়ুর সমভাবাপন্নতা): উপদ্বীপীয় ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের প্রভাবের কারণে চরমভাবাপন্নতা দেখা যায় না; আবহাওয়া থাকে আর্দ্র ও আরামদায়ক (যেমন মুম্বই, কলকাতা, চেন্নাই)। বিপরীতে অভ্যন্তরভাগে সমুদ্রের প্রভাবহীনতার কারণে চরমভাবাপন্ন জলবায়ু পরিলক্ষিত হয় (যেমন দিল্লি, অমৃতসর)।
- উচ্চতা (স্বাভাবিক তাপ হ্রাস হার): প্রতি ১,০০০ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে তাপমাত্রা প্রায় ৬.৫° সে হারে হ্রাস পায়। তাই একই অক্ষাংশে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও শিলিগুড়ির তুলনায় দার্জিলিং (২,০৪২ মিটার) অনেক শীতল।
| প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া / ঘটনা | বায়ুপ্রবাহ ও মহাসাগরীয় প্রকৃতি | ভারতীয় জলবায়ুর ওপর প্রভাব |
|---|---|---|
| উপক্রান্তীয় পশ্চিমা জেট স্ট্রিম (Subtropical Westerly Jet) | উর্ধ্ব ট্রপোস্ফিয়ারে ৯-১২ কিমি উচ্চতায় পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রবাহিত তীব্র গতিসম্পন্ন সংকীর্ণ বায়ুপ্রবাহ। | শীতকালে হিমালয় দ্বারা দুটি শাখায় বিভক্ত হয়; দক্ষিণ শাখাটি উত্তর ভারতে পশ্চিমী ঝঞ্ঝাকে টেনে আনে। মে-জুনে এর আকস্মিক উত্তরমুখী স্থানান্তর বর্ষার বিস্ফোরণ ঘটায়। |
| ক্রান্তীয় পূর্বালী জেট স্ট্রিম (Tropical Easterly Jet) | গ্রীষ্মকালে তিব্বত মালভূমির অত্যধিক উষ্ণতার কারণে উপদ্বীপীয় ভারতের ওপর (১৪° উঃ অক্ষাংশে) গঠিত পূর্বালী জেট। | উপদ্বীপে উর্ধ্ব স্তরে বায়ুর অপসরণ ঘটিয়ে ভূপৃষ্ঠের নিম্নচাপকে শক্তিশালী করে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রবাহকে তীব্র করে তোলে। |
| এল নিনো (El Niño) | প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্যভাগে পেরু উপকূল সংলগ্ন সমুদ্রজলের অস্বাভাবিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। | ওয়াকার সঞ্চালনকে বিঘ্নিত করে ভারতীয় মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে দেয়, যার ফলে ভারতে প্রায়শই মারাত্মক খরা দেখা দেয়। |
| লা নিনা (La Niña) | প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রজলের অস্বাভাবিক শীতলতা। | মৌসুমি বায়ুর প্রবাহকে অত্যন্ত শক্তিশালী করে এবং ভারতে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যা ঘটায়। |
| ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরু (Indian Ocean Dipole - IOD) | পশ্চিম ভারত মহাসাগর (আরব সাগর) ও পূর্ব ভারত মহাসাগরের (সুমাত্রা সংলগ্ন) সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্য। | ধনাত্মক IOD: আরব সাগরের জল উষ্ণ থাকে, যা ভারতীয় বর্ষাকে শক্তিশালী করে এল নিনোর ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিহত করতে পারে। |