মানব ভূগোল (Human Geography) হলো ভূগোলের সেই মৌলিক শাখা যা পৃথিবীর পরিবর্তনশীল পৃষ্ঠতলের ওপর মানব সমাজ, সাংস্কৃতিক আচার-আচরণ, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং ভৌগোলিক পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্কের স্থানিক ও কালানুক্রমিক বিশ্লেষণ করে। এটি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সমন্বয়মূলক সেতু হিসেবে কাজ করে।
- ফ্রেডরিখ রাটজেল (Friedrich Ratzel, ১৮৪৪–১৯০৪) — আধুনিক মানব ভূগোলের জনক: তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Anthropogeographie-তে (প্রথম খণ্ড ১৮৮২, দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৯১) তিনি বলেন: "মানব ভূগোল হলো ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে মানব সমাজের সম্পর্কের সংশ্লেষণমূলক অধ্যয়ন।" তিনি রাষ্ট্রকে জীবদেহের সঙ্গে তুলনা করে লেবেনসরুম (Lebensraum / Living Space) তত্ত্বের অবতারণা করেন।
- এলেন চার্চিল সেম্পল (Ellen Churchill Semple, ১৮৬৩–১৯৩২): রাটজেলের একনিষ্ঠ শিষ্যা তাঁর Influences of Geographic Environment (১৯১১) গ্রন্থে সংজ্ঞা দেন: "মানব ভূগোল হলো গতিশীল মানুষ ও অস্থির পৃথিবীর পরিবর্তনশীল সম্পর্কের পাঠ।" তাঁর মতে, মানুষ হলো ভূপৃষ্ঠের সন্তান ও তার মাটি থেকে তৈরি।
- পল ভিদাল দে লা ব্লাশ (Paul Vidal de la Blache, ১৮৪৫–১৯১৮): ফরাসি সম্ভাবনাবাদের জনক তাঁর Principles of Human Geography (১৯২২) গ্রন্থে বলেন: "মানব ভূগোল হলো ভূপৃষ্ঠকে পরিচালনাকারী প্রাকৃতিক নিয়মাবলি এবং তাতে বসবাসকারী জীবের পারস্পরিক সম্পর্কের সমন্বিত জ্ঞানের ফলশ্রুতি।"
- জাঁ ব্রুনস (Jean Brunhes, ১৮৬৯–১৯৩০): তাঁর মতে, মানব ভূগোলের কাজ হলো ভূপৃষ্ঠে মানুষের অনাবশ্যক মাটির দখল (বাড়িঘর, রাস্তাঘাট), উদ্ভিদ ও প্রাণীর বশ্যতা স্বীকার (কৃষি ও পশুপালন) এবং ধ্বংসাত্মক লুণ্ঠনমূলক ক্রিয়াকলাপের (économie destructrice বা লুণ্ঠনমূলক অর্থনীতি) অনুশীলন করা।
- প্রাচীন ও ধ্রুপদী যুগ: প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল, স্ট্র্যাবো এবং রোমান ভৌগোলিকরা বিভিন্ন মানব গোষ্ঠী ও তাদের ওপর জলবায়ুর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেন। আরব পণ্ডিত ইবন বতুতা ও আল-ইদ্রিসির ভ্রমণবৃত্তান্ত আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের প্রাথমিক দলিল রচনা করে।
- আবিষ্কার ও অনুসন্ধান যুগ (১৫শ–১৮শ শতক): কলম্বাস, ভাস্কো দা গামা, ম্যাগেলান প্রমুখের সমুদ্রযাত্রা বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য, উপনিবেশ স্থাপন এবং বিভিন্ন মহাদেশের অজানা জাতি ও তাদের ভৌগোলিক পরিবেশের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ নথিভুক্ত করে।
- প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের যুগ (১৯শ–২০শ শতকের প্রথমার্ধ): আলেকজান্ডার ফন হামবোল্ট ও কার্ল রিটার ভূগোলে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে রাটজেল ও ভিদাল দে লা ব্লাশের হাত ধরে মানব ভূগোল বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে একটি স্বতন্ত্র অনুশাসন রূপে আত্মপ্রকাশ করে।
- আধুনিক যুগ (১৯৫০-এর পরবর্তী কাল): বর্ণনামূলক আঞ্চলিক ভূগোলের স্থান দখল করে পরিমাণগত বিপ্লব (গাণিতিক মডেল ও জিআইএস), আচরণগত ভূগোল, মানবতাবাদী ভূগোল এবং সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক র্যাডিক্যাল ভূগোল।