ব্যাকটিরিয়া থেকে শুরু করে উদ্ভিদ ও মানুষ পর্যন্ত সমস্ত সজীব বস্তুর শরীর প্রধানত কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও সালফার সমৃদ্ধ জৈব যৌগ দ্বারা গঠিত। সজীব কলার রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণের পদ্ধতি হলো:
- ট্রাইক্লোরোঅ্যাসিটিক অ্যাসিড ($ ext{Cl}_3 ext{C-COOH}$) দ্বারা পেষণ: একটি সজীব কলা (যেমন পাতার টুকরো বা প্রাণীর যকৃৎ) নিয়ে হামানদিস্তায় ট্রাইক্লোরোঅ্যাসিটিক অ্যাসিড সহকারে ভালোভাবে পেষণ করে একটি ঘন মিশ্রণ বা স্লারি তৈরি করা হয়।
- ছাঁকন ও পৃথকীকরণ: স্লারিটিকে পাতলা সুতি কাপড়ের মধ্য দিয়ে ফিল্টার করলে দুটি স্পষ্ট রাসায়নিক অংশ পাওয়া যায়:
- অ্যাসিড-দ্রাব্য অংশ (Filtrate): ছাঁকনি গলে টেস্টটিউবে জমা তরল। এতে ১৮ থেকে ৮০০ ডাল্টন আণবিক ভরবিশিষ্ট দ্রবীভূত যৌগ থাকে, যাদের ক্ষুদ্র জৈব অণু (Biomicromolecules) বলে (যেমন মনোস্যাকারাইড, অ্যামিনো অ্যাসিড, নাইট্রোজেন ক্ষারক, নিউক্লিওটাইড)। এটি সাইটোপ্লাজমের জলীয় উপাদানকে নির্দেশ করে।
- অ্যাসিড-অদ্রাব্য অংশ (Retentate): ছাঁকনির ওপরে তলানি হিসেবে আটকে থাকা অংশ। এতে ১০,০০০ ডাল্টনের বেশি আণবিক ভরবিশিষ্ট পলিমার থাকে, যাদের বৃহৎ জৈব অণু (Biomacromolecules) বলে (যেমন প্রোটিন, পলিস্যাকারাইড এবং নিউক্লিক অ্যাসিড)।
- লিপিডের ব্যতিক্রমী অবস্থান: লিপিডের আণবিক ভর কখনোই ৮০০ ডাল্টনের বেশি নয় (পামিটিক অ্যাসিড ২৫৬ Da, লেসিথিন ৭৩৪ Da); তাই এটি প্রকৃতপক্ষে একটি ক্ষুদ্র অণু। কিন্তু লিপিড কোষপর্দা ও অঙ্গাণুর আবরণে সাজানো থাকে। পেষণের সময় পর্দাগুলি ছিঁড়ে গিয়ে গোলকাকার জল-অদ্রাব্য ভেসিকল (Liposomes) গঠন করে। অ্যাসিড দ্রবণে অদ্রাব্য এই ভেসিকলগুলি ছাঁকনির কাপড়ের ছিদ্র গলে যেতে পারে না, ফলে এরা রিটেনটেটে বৃহৎ অণুর সাথে আটকে থাকে।
- ভস্ম বিশ্লেষণ (Ash Analysis): কলার তাজা ওজন মেপে তাকে শুকিয়ে জল বাষ্পীভূত করে শুষ্ক ওজন নেওয়া হয়। এরপর উচ্চ তাপে সম্পূর্ণরূপে দহন করলে সমস্ত কার্বন ও নাইট্রোজেন যৌগ গ্যাস ($ ext{CO}_2, ext{H}_2 ext{O}$) হয়ে উড়ে যায়। অবশিষ্ট অজৈব ছাই বা ভস্মে ক্যালসিয়াম ($ ext{Ca}^{2+}$), ম্যাগনেসিয়াম ($ ext{Mg}^{2+}$), পটাসিয়াম ($ ext{K}^+$), ফসফেট ($ ext{PO}_4^{3-}$), সালফেট ($ ext{SO}_4^{2-}$) ইত্যাদি খনিজ মৌল শনাক্ত করা হয়।
মেটাবলিজমের মধ্যবর্তী ও অন্তিম পদার্থগুলিকে মেটাবোলাইটস বলে:
- প্রাথমিক মেটাবোলাইটস: কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিকাশ ও মূল শারীরবৃত্তীয় কাজের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত যৌগ (যেমন গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড, ফ্যাটি অ্যাসিড, নিউক্লিওটাইড, ATP)। সমস্ত সজীব কোষে এদের উপস্থিতি সার্বজনীন।
- গৌণ মেটাবোলাইটস: প্রধানত উদ্ভিদ, ছত্রাক ও অণুজীব দ্বারা তৈরি যৌগ যা তাদের প্রত্যক্ষ প্রাথমিক বৃদ্ধিতে অংশ না নিলেও আত্মরক্ষা, ক্ষত নিরাময় ও পরিবেশীয় ভূমিকা পালন করে। মানুষের চিকিৎসা ও বাণিজ্যে এদের গুরুত্ব অপরিসীম:
| শ্রেণি | উদাহরণ | অর্থনৈতিক ও জৈবিক তাৎপর্য |
|---|---|---|
| অ্যালকালয়েড (Alkaloids) | মরফিন, কোডিন | আফিম গাছ থেকে প্রাপ্ত তীব্র বেদনানাশক ও নারকোটিক ওষুধ। |
| টারপিনয়েড (Terpenoids) | মনোটারপিন, ডাইটারপিন | উদ্ভিদের সুগন্ধি ও কীট-পতঙ্গ প্রতিরোধক উদ্বায়ী যৌগ। |
| উদ্বায়ী তেল (Essential Oils) | লেমন গ্রাস তেল, ইউক্যালিপটাস তেল | জীবাণুনাশক ও প্রসাধন শিল্পে ব্যবহৃত সুগন্ধি যৌগ। |
| বিষাক্ত পদার্থ (Toxins) | অ্যাব্রিন (কুঁচ বীজ), রিসিন (রেড়ি বীজ) | রাইবোজোম নিষ্ক্রিয়কারী অত্যন্ত মারাত্মক উদ্ভিদ প্রোটিন। |
| লেকটিন (Lectins) | কনকানাভালিন A (Concanavalin A) | শর্করা আবদ্ধকারী প্রোটিন; রক্তকণিকা পুঞ্জীকরণ পরীক্ষায় ব্যবহৃত। |
| ওষুধ বা ড্রাগ (Drugs) | ভিনব্লাস্টিন, কারকিউমিন | ভিনব্লাস্টিন (নয়নতারা থেকে প্রাপ্ত অ্যান্টি-ক্যান্সার ওষুধ); কারকিউমিন (হলুদের প্রদাহরোধী উপাদান)। |
| পলিমারিক পদার্থ | প্রাকৃতিক রবার, গঁদ, সেলুলোজ | উদ্ভিদের ক্ষরণ ও শিল্প কারখানায় বহুল ব্যবহৃত উপাদান। |