Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি XI • Biology • অধ্যায় 13
আনুমানিক সময়: ৪৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও পরিবর্ধন

উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও পরিবর্ধন হলো বীজ অঙ্কুরোদ্গম থেকে বার্ধক্য ও মৃত্যু পর্যন্ত সমগ্র জীবনচক্র জুড়ে সংঘটিত জটিল, সুসংহত ও বহু-পর্যায়ী অঙ্গসংস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় রূপান্তরের সামগ্রিক প্রকাশ। বৃদ্ধি হলো সজীব কোষ, কলা বা সমগ্র অঙ্গের আকার, আয়তন, পৃষ্ঠকাল বা শুষ্ক ওজনের চিরস্থায়ী, অপ্রত্যাবর্তক প্রসারণ, যা বিপাকীয় শক্তির বিনিময়ে সম্পন্ন হয়। প্রাণীদের মতো উদ্ভিদের বৃদ্ধি নির্দিষ্ট সীমায় আবদ্ধ নয়; উদ্ভিদের বৃদ্ধি মুক্ত বা সীমাহীন (Indeterminate open growth), যা মূলত মূল ও বিটপের অগ্রস্থ ভাজক কলা (RAM ও SAM) এবং ব্যাস বৃদ্ধিকারী পার্শ্বস্থ ভাজক কলা (সংবহন ক্যাম্বিয়াম ও কর্ক ক্যাম্বিয়াম) দ্বারা পরিচালিত হয়। এই অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে বৃদ্ধির তিনটি ধারাবাহিক কোষীয় পর্যায় (ভাজক কলা পর্যায়, দীর্ঘীকরণ পর্যায় এবং পরিণমন পর্যায়), পাটিগাণিতিক সরলরৈখিক বৃদ্ধি (Lt = L0 + rt) বনাম জ্যামিতিক সিগময়েড এস-আকৃতির বক্ররেখা (W1 = W0·e^rt), পরম বৃদ্ধি হার (AGR) ও আপেক্ষিক বৃদ্ধি হার (RGR) বা দক্ষতা সূচক। একইসাথে ব্যাখ্যা করা হয়েছে উদ্ভিদের বিভেদন, ডি-ডিফারেনসিয়েশন, রি-ডিফারেনসিয়েশন এবং পরিবেশগত ও দশাগত নমনীয়তা বা প্লাস্টিসিটি (যেমন রানানকুলুসের হেটারোফিলি)। অধ্যায়টির প্রধান স্তম্ভ হলো পাঁচটি প্রধান উদ্ভিদ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক বা ফাইটোহরমোন: বৃদ্ধি উদ্দীপক হরমোন হিসেবে অক্সিন (অগ্রস্থ প্রকটতা, কলমে মূল উৎপাদন ও 2,4-D আগাছানাশক), জিব্বেরেলিন (বোল্টিং, আখের পর্বমধ্য দীর্ঘীকরণ ও বার্লির মল্টিং), এবং সাইটোকাইনিন (কোষ বিভাজন ও রিচমন্ড-ল্যাং বার্ধক্য বিলম্বন); এবং বৃদ্ধি সংদমক হিসেবে ইথিলিন (ক্লাইম্যাকটেরিক ফল পাকা ও ট্রিপল রেসপন্স) এবং অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (স্ট্রেস হরমোন, পত্ররন্ধ্র বন্ধকরণ ও সুপ্তাবস্থা)। সবশেষে আলোককালবৃত্তি (ফাইটোক্রোম ও ফ্লোরিজেন তত্ত্ব) এবং শৈত্য চিকিৎসা বা ভার্নালাইজেশনের মাধ্যমে প্রস্ফুটন নিয়ন্ত্রণ ও বীজ সুপ্তিভঙ্গের কৌশল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অধ্যায়টির গুরুত্ব

উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও পরিবর্ধনের সঠিক জৈব-রাসায়নিক জ্ঞান অর্জন করা আধুনিক উন্নত কৃষিকার্য, উদ্যানবিদ্যা, বনসৃজন এবং বায়োটেকনোলজির সাফল্যের চাবিকাঠি। কৃষিক্ষেত্রে কৃত্রিম অক্সিন (NAA, IBA) স্প্রে করে ফলের অকাল মোচন রোধ ও কাণ্ড কলমে দ্রুত শিকড় গজানো হয়, আবার নির্বাচিত আগাছানাশক 2,4-D প্রয়োগ করে ধান ও গমের কোনো ক্ষতি না করেই দ্বিবীজপত্রী ক্ষতিকর আগাছা সম্পূর্ণ নির্মূল করা হয়। বাণিজ্যিক ফল ও পানীয় শিল্পে জিব্বেরেলিক অ্যাসিড (GA3) প্রয়োগে বীজহীন আঙুরের থোকায় ডাঁটা লম্বা করে পচন রোধ করা হয়, আখের কাণ্ডের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে প্রতি একরে ২০ টন পর্যন্ত বাড়তি ফলন পাওয়া যায় এবং মদ তৈরিতে বার্লির মল্টিং প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। কলা ও আমের মতো ক্লাইম্যাকটেরিক ফল কৃত্রিমভাবে সমভাবে পাকাতে ইথিলিন গ্যাসের (ইথেফন) বাণিজ্যিক ব্যবহার বিশ্বজুড়ে বহুল প্রচলিত। অন্যদিকে অ্যাবসিসিক অ্যাসিডের জলকষ্ট প্রতিরোধী কার্যপদ্ধতি জেনে বিজ্ঞানীরা বর্তমানে অনাবৃষ্টি ও লবণাক্ততা প্রতিরোধী জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন করছেন।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • উদ্ভিদের কলাস্থান (ভাজক কলা বনাম স্থায়ী কলা, প্যারেনকাইমা, কোলেনকাইমা, জাইলেম ও ফ্লোয়েম) সংক্রান্ত একাদশ শ্রেণির মৌলিক ধারণা।
  • কোষ বিভাজন ও কোষ চক্রের পর্যায়সমূহ (মাইটোসিস ও সাইটোকাইনেসিস) সম্পর্কিত সম্যক জ্ঞান।
  • উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গের বাহ্যিক অঙ্গসংস্থান (মূল, কাণ্ড, পাতা ও ফুল)।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 উদ্ভিদের বৃদ্ধির বৈশিষ্ট্য, পর্যায়...
2 কোষীয় রূপান্তর: বিভেদন, ডি-ডিফারেন...
3 উদ্ভিদ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক বা ফাইটোহর...
4 বৃদ্ধি সংদমক হরমোন: ইথিলিন (গ্যাসীয...
5 আলোককালবৃত্তি (Photoperiodism), ফাই...
6 শৈত্য চিকিৎসা বা ভার্নালাইজেশন, সুপ...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

উদ্ভিদের বৃদ্ধির বৈশিষ্ট্য, পর্যায়সমূহ ও বৃদ্ধির গতিবিদ্যা (পাটিগাণিতিক বনাম জ্যামিতিক)

১. বৃদ্ধির সংজ্ঞা ও উদ্ভিদের মুক্ত বা সীমাহীন বৃদ্ধি (Indeterminate Growth)

বৃদ্ধি (Growth) হলো কোনো সজীব কোষ, কলা, অঙ্গ বা সমগ্র জীবের শুষ্ক ওজন, আকার, আয়তন বা পৃষ্ঠতলের স্থায়ী এবং অপ্রত্যাবর্তক (Irreversible) প্রসারণ, যা বিপাকীয় শক্তির ব্যয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়:

  • মুক্ত বা সীমাহীন বৃদ্ধি (Open / Indeterminate Form): প্রাণীদের বৃদ্ধি একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর থেমে গেলেও উদ্ভিদরা তাদের সমগ্র জীবনকাল ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। এর কারণ হলো উদ্ভিদের নির্দিষ্ট স্থানে আজীবন বিভাজনক্ষম ভাজক কলা (Meristems) উপস্থিত থাকে।
  • প্রাথমিক বনাম গৌণ ভাজক কলা:
    • মূল ও বিটপ অগ্রস্থ ভাজক কলা (RAM ও SAM): উদ্ভিদের প্রাথমিক দৈর্ঘ্যের বৃদ্ধি ঘটায় (অক্ষ বরাবর দীর্ঘীকরণ)।
    • পার্শ্বস্থ ভাজক কলা (সংবহন ক্যাম্বিয়াম ও কর্ক ক্যাম্বিয়াম / ফেলোজেন): দ্বিবীজপত্রী ও ব্যক্তবীজী উদ্ভিদে কাণ্ড ও মূলের পরিধি বা ব্যাস বৃদ্ধি করে (গৌণ বৃদ্ধি)।
  • বৃদ্ধির পরিমাপযোগ্য সূচক: কোষীয় স্তরে বৃদ্ধি হলো মূলত প্রোটোপ্লাজমের বৃদ্ধি। প্রোটোপ্লাজম সরাসরি মাপা কঠিন হওয়ায় অন্যান্য বাহ্যিক সূচকের সাহায্যে বৃদ্ধি মাপা হয়: শুষ্ক ওজন বৃদ্ধি (সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য), তাজা ওজন, দৈর্ঘ্য, ক্ষেত্রফল, আয়তন বা কোষ সংখ্যার বৃদ্ধি।
    • ভুট্টার একটি মূল শীর্ষ ভাজক কলা প্রতি ঘণ্টায় ১৭,৫০০টিরও বেশি নতুন কোষ তৈরি করতে পারে (কোষ সংখ্যার বৃদ্ধি)।
    • তরমুজের একটি কোষ তার প্রাথমিক আকারের চেয়ে প্রায় ৩,৫০,০০০ গুণ পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে (কোষ আকারের বৃদ্ধি)।
২. বৃদ্ধির তিনটি ধারাবাহিক কোষীয় পর্যায়

মূল ও কাণ্ডের অগ্রভাগে বৃদ্ধির তিনটি স্পষ্ট অনুদৈর্ঘ্য অঞ্চল পরিলক্ষিত হয়:

বৃদ্ধির পর্যায় কোষীয় বৈশিষ্ট্য ও গঠন কোষপ্রাচীর ও অঙ্গাণুর অবস্থা শারীরবৃত্তীয় কার্যকারিতা
১. ভাজক কলা পর্যায় (কোষ বিভাজন) কোষগুলো সমব্যাসীয়, ঘন সাইটোপ্লাজমে পূর্ণ এবং সুস্পষ্ট বড় নিউক্লিয়াসযুক্ত। প্রাথমিক কোষপ্রাচীর পাতলা, সেলুলোজ নির্মিত ও প্রচুর প্লাজমোডেসমাটা সংযোগযুক্ত; কোনো কেন্দ্রীয় গহ্বর থাকে না। মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় অনবরত দ্রুত বিভাজিত হয়ে অক্ষের সাথে নতুন কোষ যুক্ত করে।
২. দীর্ঘীকরণ পর্যায় (কোষ প্রসারণ) ভাজক কলা অঞ্চলের ঠিক পিছনে (প্রক্সিমাল দিকে) অবস্থিত। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গহ্বর সৃষ্টি হয়ে একত্রিত হয় (ভ্যাকুওলাইজেশন); রসস্ফীতি চাপ বৃদ্ধি পায়; নতুন প্রাচীর উপাদান জমা হয়। কোষগুলো অনুদৈর্ঘ্যভাবে দ্রুত প্রসারিত হয়ে মূল ও কাণ্ডের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ঘটায়।
৩. পরিণমন পর্যায় (কোষ বিভেদন) দীর্ঘীকরণ অঞ্চলের আরও পেছনের অংশ। কোষগুলো তাদের চূড়ান্ত আকার লাভ করে; গৌণ কোষপ্রাচীর গঠিত হয় (লিগনিন ও সুবেরিন জমা হয়)। কোষগুলো নির্দিষ্ট কাজের জন্য কাঠামোগত ও শারীরবৃত্তীয় রূপান্তর (বিভেদন) লাভ করে (যেমন মূলরোম, জাইলেম ও ফ্লোয়েম)।
৩. বৃদ্ধির হার ও গাণিতিক গতিবিদ্যা (পাটিগাণিতিক বনাম জ্যামিতিক বৃদ্ধি)

একক সময়ে যে পরিমাণ বৃদ্ধি ঘটে তাকে বৃদ্ধির হার (Growth rate) বলে। উদ্ভিদে দুটি পৃথক বৃদ্ধির ধারা দেখা যায়:

বৈশিষ্ট্য পাটিগাণিতিক বৃদ্ধি (Arithmetic Growth) জ্যামিতিক বৃদ্ধি (Geometric Growth)
কোষ বিভাজনের প্রকৃতি মাইটোসিস বিভাজনের পর কেবল একটি অপত্য কোষ বিভাজন ক্ষমতা বজায় রাখে এবং অন্যটি স্থায়ী কোষে পরিণত হয়। উভয় অপত্য কোষই অবিরাম বিভাজন ক্ষমতা বজায় রাখে ($১ \to ২ \to ৪ \to ৮ \to ১৬ \dots$ হারে)।
গাণিতিক সমীকরণ $$L_t = L_0 + rt$$ $$W_1 = W_0 e^{rt}$$
চলকসমূহের অর্থ $L_t$: $t$ সময় পর দৈর্ঘ্য; $L_0$: প্রাথমিক দৈর্ঘ্য; $r$: বৃদ্ধির হার বা ঢাল। $W_1$: চূড়ান্ত আকার/ওজন; $W_0$: প্রাথমিক আকার; $r$: আপেক্ষিক বৃদ্ধি হার / দক্ষতা সূচক; $t$: সময়; $e$: স্বাভাবিক লগারিদমের ভিত্তি ($2.718$)।
লেখচিত্রের প্রকৃতি একটি সরলরৈখিক গ্রাফ (Linear plot) যার নতি বা ঢাল ($r$) ধ্রুবক। একটি এস-আকৃতির সিগময়েড বক্ররেখা (Sigmoid S-curve)।
বাস্তব উদাহরণ ধ্রুবক হারে মূল বা বিটপ শীর্ষের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি। বীজের ভ্রূণ বিকাশ, অঙ্কুরিত চারাগাছের ওজন বৃদ্ধি, ব্যাকটিরিয়া কালচার।
৪. সিগময়েড বৃদ্ধি বক্ররেখা ও বৃদ্ধির পরিমাণগত তুলনা

একটি প্রাকৃতিক সিগময়েড বক্ররেখায় তিনটি স্পষ্ট দশা থাকে:

  1. প্রারম্ভিক বা ল্যাগ পর্যায় (Lag Phase): বৃদ্ধির প্রাথমিক ধীরগতি পর্যায়, যখন কোষগুলো পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয় ও প্রয়োজনীয় উৎসেচক তৈরি করে।
  2. তাত্বিক বা লগ পর্যায় (Log / Exponential Phase): সর্বাধিক দ্রুত বৃদ্ধির পর্যায়, যেখানে পর্যাপ্ত পুষ্টি ও স্থানের উপস্থিতিতে কোষ বিভাজন ও প্রসারণ চরমে পৌঁছায়।
  3. স্থির পর্যায় (Stationary Phase): পুষ্টি উপাদান ও স্থানের সীমাবদ্ধতা অথবা বার্ধক্যের কারণে বৃদ্ধির হার কমে যায় ও সমান্তরাল হয়।
পরম বৃদ্ধি হার বনাম আপেক্ষিক বৃদ্ধি হার:
  • পরম বৃদ্ধি হার (Absolute Growth Rate - AGR): একক সময়ে মোট বৃদ্ধির পরিমাণ ($AGR = \frac{\Delta W}{\Delta t}$)।
  • আপেক্ষিক বৃদ্ধি হার (Relative Growth Rate - RGR) বা দক্ষতা সূচক: প্রাথমিক পরিমাণের সাপেক্ষে একক সময়ে বৃদ্ধির হার ($RGR = \frac{W_1 - W_0}{W_0 \cdot \Delta t}$)। এটি উদ্ভিদের নতুন জৈবপদার্থ তৈরির অন্তর্নিহিত সক্ষমতা পরিমাপ করে।

কোষীয় রূপান্তর: বিভেদন, ডি-ডিফারেনসিয়েশন, রি-ডিফারেনসিয়েশন ও প্লাস্টিসিটি

১. বিভেদন, ডি-ডিফারেনসিয়েশন ও রি-ডিফারেনসিয়েশন

উদ্ভিদের বিকাশকালে শীর্ষ ভাজক কলা থেকে উৎপন্ন কোষগুলো তিনটি সুনির্দিষ্ট রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে:

  • বিভেদন (Differentiation): ভাজক কলার কোষগুলো নির্দিষ্ট স্থায়ী কাজ সম্পন্ন করার জন্য তাদের কোষপ্রাচীর ও প্রোটোপ্লাজমে কাঠামোগত ও রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থায়ী কোষে রূপান্তরিত হওয়াকে বিভেদন বলে।
    • উদাহরণ: জাইলেম ট্র্যাকি উপাদানের গঠন। ভাজক কোষগুলো তাদের সমস্ত প্রোটোপ্লাজম হারায় এবং জলের তীব্র ঋণাত্মক চাপ সহ্য করার জন্য পুরু, স্থিতিস্থাপক ও লিগনিনযুক্ত গৌণ কোষপ্রাচীর গঠন করে।
  • ডি-ডিফারেনসিয়েশন (Dedifferentiation): যে প্রক্রিয়ায় কোনো সম্পূর্ণ বিভেদিত ও বিভাজন ক্ষমতাহীন সজীব স্থায়ী কোষ বিশেষ শারীরবৃত্তীয় পরিস্থিতিতে পুনরায় মাইটোসিস বিভাজন ক্ষমতা ফিরে পায়, তাকে ডি-ডিফারেনসিয়েশন বলে।
    • উদাহরণ: স্থায়ী কর্টেক্স ও মজ্জার প্যারেনকাইমা কোষগুলো বিভাজন ক্ষমতা ফিরে পেয়ে ইন্টারফ্যাসিকুলার ক্যাম্বিয়াম এবং কর্ক ক্যাম্বিয়াম (ফেলোজেন) গঠন করে।
  • রি-ডিফারেনসিয়েশন (Redifferentiation): ডি-ডিফারেনসিয়েশনের ফলে গঠিত ভাজক কলার কোষগুলো বিভাজিত হয়ে পুনরায় যখন তাদের বিভাজন ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলে নির্দিষ্ট স্থায়ী কলায় পরিণত হয়, তাকে রি-ডিফারেনসিয়েশন বলে।
    • উদাহরণ: ইন্টারফ্যাসিকুলার ক্যাম্বিয়াম থেকে গৌণ জাইলেম ও গৌণ ফ্লোয়েম সৃষ্টি; এবং কর্ক ক্যাম্বিয়াম থেকে কর্ক (ফেলেম) ও গৌণ কর্টেক্স (ফেলোডার্ম) সৃষ্টি।
২. উদ্ভিদের পরিবর্ধন ও প্লাস্টিসিটি (হেটারোফিলি)

পরিবর্ধন (Development) হলো একটি জীবের সমগ্র জীবনচক্রে ঘটা সমস্ত গঠনগত, শারীরবৃত্তীয় ও অঙ্গসংস্থানিক পরিবর্তনের সামগ্রিক সমষ্টি, যা বীজ অঙ্কুরোদ্গম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত বিস্তৃত ($পরিবর্ধন = বৃদ্ধি + বিভেদন$)।

প্লাস্টিসিটি (Plasticity) বা নমনীয়তা: পরিবেশের পরিবর্তনের প্রভাবে বা জীবনচক্রের বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন রূপের অঙ্গ বা কাঠামো তৈরি করার সহজাত ক্ষমতাকে প্লাস্টিসিটি বলে। উদ্ভিদে প্লাস্টিসিটির প্রধান প্রকাশ হলো হেটারোফিলি (Heterophylly) বা অসমপর্ণতা (একই গাছে একাধিক ভিন্ন আকৃতির পাতা তৈরি হওয়া):

  • ১. পরিবেশগত হেটারোফিলি: পরিবেশগত মাধ্যমের পার্থক্যের কারণে পাতার গঠনে ভিন্নতা।
    • উদাহরণ: রানানকুলুস বা বাটারকাপ (Ranunculus flabellaris)। জলের তলায় নিমজ্জিত পাতাগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম, ফিতার মতো খণ্ডিত (যা জলের স্রোতের ধাক্কা কমায় ও গ্যাস শোষণ সহজ করে); কিন্তু একই উদ্ভিদের যে পাতাগুলো জলের ওপরে বাতাসে থাকে সেগুলো চওড়া, অখণ্ড ও খণ্ডযুক্ত হয়।
  • ২. বিকাশজনিত বা দশাগত হেটারোফিলি: উদ্ভিদের তরুণ দশা এবং পরিণত প্রাপ্তবয়স্ক দশার মধ্যে পাতার আকৃতির পরিবর্তন।
    • উদাহরণ: কার্পাস (তুলা), ধনে (Coriandrum) এবং লার্কস্পার (Delphinium)-এ চারাগাছের পাতাগুলোর আকৃতি পরিণত গাছের পাতার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হয়।

উদ্ভিদ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক বা ফাইটোহরমোন: বৃদ্ধি উদ্দীপক হরমোন (অক্সিন, জিব্বেরেলিন, সাইটোকাইনিন)

১. ফাইটোহরমোনের পরিচয় ও রাসায়নিক শ্রেণিবিভাগ

উদ্ভিদ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক (PGRs) বা ফাইটোহরমোন হলো স্বল্প আণবিক গুরুত্ববিশিষ্ট বিভিন্ন রাসায়নিক প্রকৃতির জৈব পদার্থ, যা উদ্ভিদের নির্দিষ্ট কোষে অতি স্বল্প মাত্রায় উৎপন্ন হয়ে অন্যত্র পরিবাহিত হয় এবং শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।

রাসায়নিক প্রকৃতি নির্দিষ্ট হরমোনের নাম শারীরবৃত্তীয় ভূমিকা
ইন্ডোল জাতক ইন্ডোল-৩-অ্যাসিটিক অ্যাসিড (IAA), ইন্ডোল বিউটাইরিক অ্যাসিড (IBA) বৃদ্ধি উদ্দীপক (অক্সিন)
তারপিনয়েড জাতক জিব্বেরেলিক অ্যাসিড ($\text{GA}_3$, ent-gibberellane রিং) বৃদ্ধি উদ্দীপক (জিব্বেরেলিন)
অ্যাডেনিন পিউরিন জাতক কাইনেটিন ($N^6$-furfurylaminopurine), জিয়াটিন বৃদ্ধি উদ্দীপক (সাইটোকাইনিন)
গ্যাসীয় হাইড্রোকার্বন ইথিলিন ($\text{C}_2\text{H}_4$) বৃদ্ধি সংদমক / পাকা ত্বরান্বিতকারী
ক্যারোটিনয়েড জাতক অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (ABA, সেসকুইটারপিন) বৃদ্ধি সংদমক (স্ট্রেস হরমোন)
২. অক্সিন: আবিষ্কার, শারীরবৃত্তীয় কাজ ও কৃষি প্রয়োগ
  • আবিষ্কার: চার্লস ডারউইন ও তাঁর পুত্র ফ্রান্সিস ডারউইন (১৮৮০) ক্যানারি ঘাসের (Phalaris canariensis) ভ্রূণমুকুলাবরণীতে একমুখী আলোর প্রভাবে আলোকবৃত্তি চলন পর্যবেক্ষণ করেন। বয়েসেন-জেনসেন (১৯১০) প্রমাণ করেন যে শীর্ষ থেকে সংকেতটি জেলাটিনের মধ্য দিয়ে ব্যাপিত হতে পারে কিন্তু অভেদ্য মাইকা পাতে আটকে যায়। ফ্রিটস ওয়েন্ট (F.W. Went, 1928) জই (Avena sativa) উদ্ভিদের মুকুলাবরণীর শীর্ষ থেকে অ্যাগার ব্লকে অক্সিন পৃথক করেন এবং বিখ্যাত অ্যাভেনা বক্রতা পরীক্ষা (Avena curvature test) সম্পন্ন করেন। কগ্ল ও হাগেন-স্মিট (১৯৩১) মানুষের মূত্র থেকে প্রথম হেটারোঅক্সিন (IAA) পৃথক করেন।
  • প্রকারভেদ: প্রাকৃতিক অক্সিন: IAA ও IBA। কৃত্রিম অক্সিন: NAA ($\alpha$-ন্যাপথালিন অ্যাসিটিক অ্যাসিড) এবং 2,4-D (2,4-ডাইক্লোরোফেনক্সিঅ্যাসিটিক অ্যাসিড)।
  • প্রধান শারীরবৃত্তীয় কাজ ও প্রয়োগ:
    • অগ্রস্থ প্রকটতা (Apical Dominance): অগ্রমুকুলের উপস্থিতিতে কাক্ষিক মুকুলের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। অগ্রমুকুল কেটে বাদ দিলে (ছাঁটাই বা Decapitation) কাক্ষিক মুকুলগুলোর বৃদ্ধি ঘটে গাছ ঝোপালো হয় (চা বাগান ও বাগানের বেড়া তৈরিতে ব্যবহৃত)।
    • কোষ দীর্ঘীকরণ: কোষপ্রাচীরে প্রোটন ($\text{H}^+$) পাম্প করে পিএইচ কমিয়ে এক্সপ্যানসিন উৎসেচক সক্রিয় করে কোষপ্রাচীর শিথিল ও প্রসারিত করে।
    • কলমে মূল উৎপাদন: কাণ্ড কলমের গোড়ায় কৃত্রিম অক্সিন (IBA, NAA) প্রয়োগ করলে দ্রুত অস্থানিক মূল সৃষ্টি হয়।
    • মোচন রোধ ও ত্বরণ: কচি পাতা ও কচি ফলের অকাল ঝরে পড়া রোধ করে; কিন্তু পরিণত বয়স্ক পাতার মোচন ত্বরান্বিত করে।
    • পার্থেনোকার্পি: পরাগযোগ ও নিষেক ছাড়াই বীজহীন ফল (যেমন বীজহীন টমেটো) উৎপাদনে সাহায্য করে।
    • নির্বাচিত আগাছানাশক: কৃত্রিম 2,4-D স্প্রে করে একবীজপত্রী ফসলের (ধান, গম) কোনো ক্ষতি না করেই ক্ষতিকর দ্বিবীজপত্রী আগাছা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা যায়।
৩. জিব্বেরেলিন: আবিষ্কার ও বাণিজ্যিক প্রয়োগ
  • আবিষ্কার: জাপানি উদ্ভিদবিজ্ঞানী ইইচি কুরোশাওয়া (Eiichi Kurosawa, 1926) ধানের 'বোকানে' (Foolish seedling) রোগ নিয়ে গবেষণাকালে জিব্বেরেলিন আবিষ্কার করেন। এই রোগটি Gibberella fujikuroi (অসম্পূর্ণ রূপ Fusarium moniliforme) নামক ছত্রাকের সংক্রমণের ফলে ঘটত। রোগাক্রান্ত চারাগাছগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিক লম্বা ও দুর্বল হতো। ইয়াবুতা ও সুমিকি (১৯৩৮) এই ছত্রাক থেকে ক্রিস্টালাইন জিব্বেরেলিন পৃথক করেন। বর্তমানে ১০০টিরও বেশি জিব্বেরেলিন ($\text{GA}_1$ থেকে $\text{GA}_{100+}$) আবিষ্কৃত হয়েছে, যার মধ্যে $\text{GA}_3$ সর্বাধিক গবেষণাপ্রাপ্ত।
  • প্রধান শারীরবৃত্তীয় কাজ ও প্রয়োগ:
    • পর্বমধ্যের দীর্ঘীকরণ ও বোল্টিং (Bolting): রোজেট উদ্ভিদে (যেমন বাঁধাকপি, বিট) ফুল ফোটার ঠিক পূর্বে কাণ্ডের পর্বমধ্যের অস্বাভাবিক দ্রুত বৃদ্ধি ঘটিয়ে কাণ্ড লম্বা করাকে বোল্টিং বলে, যা জিব্বেরেলিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
    • আখের ফলন বৃদ্ধি: আখের ক্ষেতে $\text{GA}_3$ স্প্রে করলে পর্বমধ্যের দৈর্ঘ্য ব্যাপক বৃদ্ধি পায়, যা প্রতি একরে আখের ফলন প্রায় ২০ টন পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
    • আঙুরের ডাঁটা দীর্ঘীকরণ: বীজহীন আঙুরের থোকার ডাঁটা লম্বা করে, যাতে ফলগুলো গাদাগাদি না হয়ে ছত্রাক সংক্রমণ মুক্ত থাকে ও বড় আকারের হয়।
    • মল্টিং প্রক্রিয়া ত্বরান্বিতকরণ: মদ বা ব্রিউয়িং শিল্পে বার্লি বীজের অ্যালুরন স্তরে $\alpha$-অ্যামাইলেজ উৎসেচক সংশ্লেষ উদ্দীপিত করে এন্ডোস্পার্মের শ্বেতসার ভেঙে শর্করায় পরিণত করে।
    • বার্ধক্য বিলম্বন: গাছে ফলের স্থায়িত্ব বাড়িয়ে ফসল তোলার সময়সীমা দীর্ঘায়িত করে।
৪. সাইটোকাইনিন: কোষ বিভাজন, বার্ধক্য বিলম্বন ও কলার অঙ্গজনি
  • আবিষ্কার: ফোক স্কুগ ও কার্লোস মিলার (১৯৫৫) তামাক কাণ্ডের মজ্জা কলার কালচারে অটোক্লেভ করা হেরিং মাছের শুক্রাণুর ডিএনএ যোগ করে দ্রুত কোষ বিভাজন পর্যবেক্ষণ করেন এবং সক্রিয় পদার্থটি পৃথক করে নাম দেন কাইনেটিন। কাইনেটিন কৃত্রিম; লেথাম (১৯৬৩) কচি ভুট্টার দানা থেকে প্রথম প্রাকৃতিক সাইটোকাইনিন পৃথক করে নাম দেন জিয়াটিন (Zeatin)।
  • প্রধান শারীরবৃত্তীয় কাজ ও প্রয়োগ:
    • কোষ বিভাজন ও সাইটোকাইনেসিস: বিটপ শীর্ষ, মূলের অগ্রভাগ ও উন্নয়নশীল ফলের কোষে দ্রুত মাইটোসিস ঘটায়।
    • অগ্রস্থ প্রকটতা বিনাশ: অক্সিনের বিপরীত ক্রিয়া প্রদর্শন করে কাক্ষিক মুকুলের বৃদ্ধি উদ্দীপিত করে।
    • বার্ধক্য বিলম্বন (রিচমন্ড-ল্যাং প্রভাব / Richmond-Lang Effect): সাইটোকাইনিন পাতায় ক্লোরোফিল বিনষ্ট হওয়া রোধ করে, প্রোটিন সংশ্লেষ বজায় রাখে এবং দূরবর্তী অঞ্চল থেকে পুষ্টি উপাদান আকর্ষণ করে বিচ্ছিন্ন পাতাকে দীর্ঘদিন সবুজ রাখে।
    • টিস্যু কালচারে অঙ্গজনি (Organogenesis): স্কুগ ও মিলারের আবিষ্কার অনুযায়ী টিস্যু কালচারে অক্সিন ও সাইটোকাইনিনের অনুপাত অঙ্গ গঠন নিয়ন্ত্রণ করে:
      • উচ্চ অক্সিন : নিম্ন সাইটোকাইনিন $\implies$ মূল বিভেদন (Rhizogenesis)।
      • উচ্চ সাইটোকাইনিন : নিম্ন অক্সিন $\implies$ বিটপ মুকুল বিভেদন (Caulogenesis)।
      • সমান অনুপাত $\implies$ অসংগঠিত ক্যালাস (Callus) বৃদ্ধি।

বৃদ্ধি সংদমক হরমোন: ইথিলিন (গ্যাসীয় ফল পাকানোর হরমোন) ও অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (স্ট্রেস হরমোন)

১. ইথিলিন: গ্যাসীয় উদ্ভিদ হরমোন ও ক্লাইম্যাকটেরিক ফল পাকা

ইথিলিন ($\text{H}_2\text{C}=\text{CH}_2$) হলো উদ্ভিদের একমাত্র প্রাকৃতিক গ্যাসীয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক। ১৯১০ সালে এইচ.এইচ. কাজিন্স লক্ষ্য করেন যে পাকা কমলালেবু থেকে নির্গত উদ্বায়ী গ্যাস সাথে রাখা কাঁচা কলাকে দ্রুত পাকিয়ে দেয়। আর. গেন (১৯৩৪) প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদ নিজেই এই গ্যাস তৈরি করে।

  • ক্লাইম্যাকটেরিক বৃদ্ধি (Climacteric Rise): ফল পাকার সময় ইথিলিন এক অভাবনীয় শ্বসন বিস্ফোরণ ঘটায়, যাকে রেসপিরেটরি ক্লাইম্যাকটেরিক বলে। এর সাথে সাথে পেকটিন ভেঙে ফল নরম হয় এবং শ্বেতসার মিষ্টি শর্করায় রূপান্তরিত হয়।
  • চারাগাছে ট্রিপল রেসপন্স (Triple Response): ইথিলিন গ্যাসের প্রভাবে দ্বিবীজপত্রী চারাগাছে তিনটি বৈশিষ্ট্যমূলক অঙ্গসংস্থানিক রূপান্তর ঘটে:
    1. অনুদৈর্ঘ্য কাণ্ডের বৃদ্ধি সংদমিত হওয়া।
    2. অক্ষের পার্শ্বীয় বা অনুভূমিক স্ফীতি (মোটা হওয়া)।
    3. অগ্রস্থ বাঁক (Apical hook) অধিকতর সংকুচিত হওয়া।
  • কৃষি প্রয়োগ ও ইথেফন (Ethephon): যেহেতু গ্যাসীয় ইথিলিন মাঠে ছিটানো কঠিন, তাই জলীয় দ্রবণে ইথেফন (2-ক্লোরোইথাইলফসফোনিক অ্যাসিড) ব্যবহৃত হয়। এটি উদ্ভিদে শোষিত হয়ে ধীরে ধীরে গ্যাসীয় ইথিলিন মুক্ত করে:
    • টমেটো, আপেল ও কলার দ্রুত পরিপক্বতা ঘটায়।
    • আনারসে ফুল ফোটানো ও ফল ধরায় সমতা আনে।
    • শসা জাতীয় ফসলে স্ত্রী ফুলের সংখ্যা বৃদ্ধি করে ফলন বাড়ায়।
    • মূলরোম গঠন ব্যাপকভাবে উদ্দীপিত করে উদ্ভিদের জল ও খনিজ শোষণ তল বৃদ্ধি করে।
২. অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (ABA): উদ্ভিদের সর্বজনীন স্ট্রেস হরমোন

১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি তিনটি পৃথক বিজ্ঞানী দল তিনটি সংদমক পদার্থ আবিষ্কার করেন: ইনহিবিটর-$\beta$, অ্যাবসিসিন II (অ্যাডিকট), এবং ডরমিন (ওয়ারিং)। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয় যে তিনটি যৌগই অভিন্ন এবং এদের যৌথ নাম দেওয়া হয় অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (ABA)।

  • স্ট্রেস হরমোনের ক্রিয়া কৌশল (খরায় পত্ররন্ধ্র বন্ধকরণ): তীব্র জলকষ্টের সময় মেসোফিল কোষগুলো প্রচুর পরিমাণে ABA সংশ্লেষ করে। ABA রক্ষীকোষের প্লাজমা পর্দার গ্রাহকে যুক্ত হয়ে ক্যালসিয়াম আয়ন প্রবেশ করায় এবং পটাসিয়াম ($\text{K}^+$) ও ম্যালেট আয়ন দ্রুত কোষের বাইরে বের করে দেয়। ফলে বহিঃঅভিস্রবণের মাধ্যমে জল বেরিয়ে রক্ষীকোষ শিথিল হয় এবং পত্ররন্ধ্র তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যা বাষ্পমোচন রোধ করে উদ্ভিদের প্রাণ বাঁচায়।
  • বীজের সুপ্তাবস্থা বজায় রাখা: ABA ভ্রূণের বৃদ্ধি অবদমিত রেখে বীজের সুপ্তাবস্থা বজায় রাখে, যা মাতৃউদ্ভিদে অকাল অঙ্কুরোদ্গম (Vivipary) প্রতিহত করে।
  • জিব্বেরেলিনের বিপরীত ধর্মিতা: অঙ্কুরিত শস্যদানায় জিব্বেরেলিন দ্বারা $\alpha$-অ্যামাইলেজ উৎসেচক তৈরির পথকে ABA সরাসরি অবদমিত করে।
  • মোচন ও বার্ধক্য: পাতা ও ফলের বার্ধক্য ত্বরান্বিত করে ঝরে পড়তে বাধ্য করে।

আলোককালবৃত্তি (Photoperiodism), ফাইটোক্রোম ব্যবস্থা (Pr / Pfr) ও ফ্লোরিজেন তত্ত্ব

১. আলোককালবৃত্তির আবিষ্কার ও ধারণা

আলোককালবৃত্তি (Photoperiodism) হলো দিবার দৈর্ঘ্য (আলোককাল) এবং রাত্রির দৈর্ঘ্যের (অন্ধকারকাল) আপেক্ষিক অনুপাতের ওপর উদ্ভিদের শারীরিক রূপান্তর, বিশেষত ফুল ফোটার (Flowering) প্রতিক্রিয়া। ডব্লিউ. ডব্লিউ. গার্নার এবং এইচ. এ. অ্যালার্ড (১৯২০) তামাকের 'মেরিল্যান্ড ম্যামথ' জাত এবং সয়াবিনে এই ঘটনাটি প্রথম আবিষ্কার করেন।

২. সংকট আলোককালের ভিত্তিতে উদ্ভিদের শ্রেণিবিভাগ

প্রতিটি উদ্ভিদের ফুল ফোটার জন্য একটি নির্দিষ্ট সংকট আলোককাল (Critical Photoperiod) থাকে:

বিভাগ আলোককালের প্রয়োজনীয়তা অন্ধকারকালের চূড়ান্ত গুরুত্ব প্রতিনিধি উদ্ভিদ
স্বল্পদিবা উদ্ভিদ (SDP) / দীর্ঘনিশি উদ্ভিদ দিবালোকের দৈর্ঘ্য সংকট কালের কম হলে ফুল ফোটে ($Light < Critical$)। একটি নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘ অন্ধকার কাল প্রয়োজন। অন্ধকারের মাঝে সামান্য আলোর ঝলকানি দিলে ফুল ফোটা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় (Night-break effect)! তামাক, সয়াবিন, ধান, চন্দ্রমল্লিকা, ক্যাকটাস, জ্যান্থিয়াম।
দীর্ঘদিবা উদ্ভিদ (LDP) / স্বল্পনিশি উদ্ভিদ দিবালোকের দৈর্ঘ্য সংকট কালের বেশি হলে ফুল ফোটে ($Light > Critical$)। রাত্রির দৈর্ঘ্য সংকট অন্ধকারকালের চেয়ে কম হতে হয়। রাত্রিকালে আলোর ঝলকানি দিলে এদের ফুল ফোটা ত্বরান্বিত হয়। গম, মূলো, পালং শাক, বিট, হেনবেন।
দিবানিরপেক্ষ উদ্ভিদ (DNP) ফুল ফোটা আলোককালের ওপর নির্ভরশীল নয়; নির্দিষ্ট বৃদ্ধির পর আপনা হতেই ফুল ফোটে। আলোক বা অন্ধকারের কোনো প্রভাব নেই। টমেটো, ভুট্টা, সূর্যমুখী, শসা, কার্পাস।
৩. ফাইটোক্রোম: আলোক-উৎক্রমণীয় রঞ্জক তন্ত্র

আলোক সংকেত গ্রহণের জন্য উদ্ভিদে উপস্থিত নীল-সবুজ বিলিপ্রোটিন রঞ্জককে ফাইটোক্রোম (Phytochrome) বলে। আবিষ্কারক: এইচ. এ. বার্থউইক এবং এস. বি. হেন্ড্রিকস (১৯৫২)। এটি দুটি পরস্পর রূপান্তরযোগ্য রূপে অবস্থান করে:

$$P_r \ (660\text{ nm, লোহিত আলো}) \underset{\text{দূর-লোহিত (730 nm) / অন্ধকার}}{\overset{\text{লোহিত আলো (660 nm)}}{\rightleftharpoons}} P_{fr} \ (730\text{ nm, দূর-লোহিত আলো})$$
  • $P_r$ (Phytochrome Red): ৬৬০ ন্যানোমিটার লোহিত আলো শোষণ করে। এটি নিষ্ক্রিয় রূপ।
  • $P_{fr}$ (Phytochrome Far-Red): ৭৩০ ন্যানোমিটার দূর-লোহিত আলো শোষণ করে। এটি শারীরবৃত্তীয়ভাবে সক্রিয় রূপ, যা ফুল ফোটা ও বীজের অঙ্কুরোদ্গম নিয়ন্ত্রণ করে।
  • সূর্যালোকের উপস্থিতিতে নিষ্ক্রিয় $P_r$ দ্রুত সক্রিয় $P_{fr}$-এ রূপান্তরিত হয়; অন্ধকারে $P_{fr}$ ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় $P_r$-এ ফিরে আসে।
৪. আলো অনুভূতির স্থান ও ফ্লোরিজেন হাইপোথিসিস

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ফুল বিটপ শীর্ষে ফুটলেও আলোক উদ্দীপনা গ্রহণ করে উদ্ভিদের পাতা। মিখাইল চাইলাখিয়ান (১৯৩৭) প্রমাণ করেন যে উপযুক্ত আলোককালে পাতায় একটি ভ্রাম্যমাণ হরমোন তৈরি হয় যার নাম ফ্লোরিজেন (Florigen)। এই সংকেত ফ্লোয়েম কলার মাধ্যমে বিটপ শীর্ষে পরিবাহিত হয়ে ফুলের মুকুল তৈরি করে। আধুনিক আণবিক জীববিদ্যায় প্রমাণিত হয়েছে যে ফ্লোরিজেন হলো মূলত FT (Flowering Locus T) প্রোটিন।

শৈত্য চিকিৎসা বা ভার্নালাইজেশন, সুপ্তাবস্থা ও সুপ্তিভঙ্গের বৈজ্ঞানিক কৌশল

১. ভার্নালাইজেশন বা বাসন্তীকরণ (Vernalization)

ভার্নালাইজেশন হলো নির্দিষ্ট নিম্ন তাপমাত্রার (শৈত্য, ১°C থেকে ১০°C) প্রভাবে উদ্ভিদের ফুল ফোটার প্রস্তুতি অর্জন বা ফুল ফোটা ত্বরান্বিত করার শারীরবৃত্তীয় ঘটনা। বিজ্ঞানী টি. ডি. লিসেঙ্কো (T.D. Lysenko, 1928) প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন।

  • তাপমাত্রা সীমা: সর্বোত্তম তাপমাত্রা ১°C থেকে ১০°C এবং সময়কাল কয়েক সপ্তাহ (৩০ থেকে ৬০ দিন)।
  • অনুভূতির স্থান: আলোককালবৃত্তির মতো পাতায় নয়; শৈত্য সংকেত গৃহীত হয় সক্রিয়ভাবে বিভাজনরত ভাজক কলায়—প্রধানত বিটপ শীর্ষ ভাজক কলা এবং অঙ্কুরিত বীজের ভ্রূণে।
  • কৃষিগত গুরুত্ব ও উদাহরণ:
    • শীতকালীন খাদ্যশস্য (শীতকালীন গম, রাই): শরতে বপন করলে শীতের বরফের নিচে শৈত্য পেয়ে বসন্তে ফুল ফোটায়। বসন্তে বসালে এরা ফুল ফোটাতে পারে না। বীজে কৃত্রিম শৈত্য চিকিৎসা দিয়ে শীতকালীন গমকে বসন্তকালীন গমে রূপান্তর করা যায়।
    • দ্বিবর্ষজীবী উদ্ভিদ (বাঁধাকপি, গাজর, বিট): সাধারণত প্রথম বছর অঙ্গজ বৃদ্ধি ঘটায় এবং দ্বিতীয় বছর শীতের পর ফুল ফোটায়। কৃত্রিম শৈত্য চিকিৎসা দিয়ে প্রথম বছরেই এদের ফুল ফোটানো সম্ভব।
  • ডিভার্নালাইজেশন: শৈত্য চিকিৎসার পরপরই উচ্চ তাপমাত্রায় (৩৫°C-৪০°C) রাখলে ভার্নালাইজেশনের প্রভাব সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।
২. বীজের সুপ্তাবস্থা (Seed Dormancy) ও সুপ্তিভঙ্গের কৌশল

অনুকূল পরিবেশ (পর্যাপ্ত আর্দ্রতা, অনুকূল উষ্ণতা ও অক্সিজেন) থাকা সত্ত্বেও সজীব বীজের সাময়িকভাবে অঙ্কুরোদ্গমে অক্ষমতাকে বীজের সুপ্তাবস্থা (Seed Dormancy) বলে:

সুপ্তাবস্থার কারণ শারীরবৃত্তীয় কার্যপদ্ধতি সুপ্তিভঙ্গের বৈজ্ঞানিক কৌশল
শক্ত ও অভেদ্য বীজত্বক বীজত্বক জল ও গ্যাস প্রবেশে বাধা দেয় বা ভ্রূণের বৃদ্ধিতে যান্ত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। স্কার্টিফিকেশন (Scarification): স্যান্ডপেপার দিয়ে ঘষে, জোরে ঝাঁকিয়ে বা গাঢ় সালফিউরিক অ্যাসিডে ($\text{H}_2\text{SO}_4$) ভিজিয়ে বীজত্বক নরম ও ফুটো করা।
রাসায়নিক সংদমক বীজে অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (ABA), ফেনোলিক অ্যাসিড বা কুমারিনের আধিক্য। প্রচুর জলে ধুয়ে ফেলা (Leaching) অথবা জিব্বেরেলিন ($\text{GA}_3$) ও পটাসিয়াম নাইট্রেট ($\text{KNO}_3$) প্রয়োগ করা।
অপরিণত ভ্রূণ ফল পাকার সময় ভ্রূণের পূর্ণাঙ্গ শারীরিক বিকাশ না ঘটা। অনুকূল শুষ্ক পরিবেশে রেখে স্বাভাবিক পরিপক্বতা অর্জন (After-ripening)।
শৈত্যের প্রয়োজনীয়তা ভ্রূণে হরমোনের ভারসাম্য পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট নিম্ন তাপমাত্রা দরকার। স্ট্র্যাটিফিকেশন (Stratification): আর্দ্র বালিতে ১°C থেকে ৫°C তাপমাত্রায় বীজকে কয়েক সপ্তাহ সংরক্ষণ করা।
আলোকের অভাব (আলোকসংবেদী বীজ) কিছু বীজে অঙ্কুরোদ্গমের জন্য নিষ্ক্রিয় $P_r$-কে সক্রিয় $P_{fr}$-এ রূপান্তর আবশ্যক (যেমন লেটুস, তামাক)। লোহিত আলোর ($\lambda = 660\text{ nm}$) সংস্পর্শে আনা।

গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক তত্ত্ব, পথ ও সংজ্ঞাসমূহ

পাটিগাণিতিক বৃদ্ধির গাণিতিক সূত্র
Lt = t সময় পর দৈর্ঘ্য; L0 = প্রাথমিক দৈর্ঘ্য; r = বৃদ্ধির হার; t = সময়
লেখচিত্রে ধ্রুবক ধনাত্মক নতিযুক্ত সরলরেখা প্রদর্শন করে।
জ্যামিতিক বৃদ্ধির সিগময়েড সমীকরণ
W1 = চূড়ান্ত ওজন; W0 = প্রাথমিক ওজন; r = আপেক্ষিক বৃদ্ধি হার (দক্ষতা সূচক); e = 2.718
ল্যাগ, লগ এবং স্থির পর্যায়ের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ সিগময়েড বক্ররেখা তৈরি করে।
আপেক্ষিক বৃদ্ধি হার (RGR) বা দক্ষতা সূচকের সূত্র
একক: সময়^-1 (যেমন গ্রাম/গ্রাম/দিন)
বিভিন্ন প্রাথমিক আকারের উদ্ভিদের বৃদ্ধির দক্ষতার তুলনামূলক পরিমাপ।
টিস্যু কালচারে অক্সিন ও সাইটোকাইনিন অনুপাতের সূত্র
উচ্চ অক্সিন: মূল উৎপাদন; উচ্চ সাইটোকাইনিন: বিটপ উৎপাদন; সমান: ক্যালাস
বাণিজ্যিক মাইক্রোপ্রোপাগেশন বা অণুবিস্তারের মূল ভিত্তি।
ফাইটোক্রোমের আলোক-উৎক্রমণ সমীকরণ
Pfr হলো শারীরবৃত্তীয়ভাবে সক্রিয় রূপ; Pr হলো নিষ্ক্রিয় রূপ
রাত্রিকালে সামান্য লোহিত আলোর ঝলকানি Pr-কে Pfr-এ রূপান্তরিত করে স্বল্পদিবা উদ্ভিদে ফুল ফোটা স্তব্ধ করে দেয়।
সংকট আলোককালের শর্তাবলী
SDP-র জন্য নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকার এবং LDP-র জন্য দীর্ঘ আলোককাল আবশ্যক
পাতা আলোক সংকেত গ্রহণ করে ফ্লোরিজেন (FT প্রোটিন) তৈরি করে বিটপে পাঠায়।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
(ক) উদ্ভিদের পাটিগাণিতিক বৃদ্ধি ও জ্যামিতিক বৃদ্ধির মধ্যে তিনটি সুস্পষ্ট পার্থক্য সমীকরণ ও লেখচিত্রের সাহায্যে লেখো। (খ) জীবজগতে সিগময়েড বৃদ্ধি বক্ররেখা সর্বজনীন কেন? [৩ + ২ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক সংসদের নম্বর বিভাজন অনুযায়ী আদর্শ উত্তর:

(ক) পাটিগাণিতিক ও জ্যামিতিক বৃদ্ধির পার্থক্য [৩ নম্বর]: ১. কোষ বিভাজনের ধরণ:

  • পাটিগাণিতিক: মাইটোসিসের পর কেবল একটি অপত্য কোষ বিভাজন ক্ষমতা ধরে রাখে, অন্যটি স্থায়ী কোষে পরিণত হয়।
  • জ্যামিতিক: উভয় অপত্য কোষই অবিরাম বিভাজন ক্ষমতা বজায় রাখে ($১ o ২ o ৪ o ৮ \dots$)। ২. গাণিতিক সমীকরণ:
  • পাটিগাণিতিক: $L_t = L_0 + rt$ (যেখানে $L_t$ হলো $t$ সময় পর দৈর্ঘ্য, $L_0$ প্রাথমিক দৈর্ঘ্য, $r$ বৃদ্ধির হার)।
  • জ্যামিতিক: $W_1 = W_0 e^{rt}$ (যেখানে $W_1$ চূড়ান্ত আকার, $W_0$ প্রাথমিক আকার, $r$ আপেক্ষিক বৃদ্ধি হার, $t$ সময়)।
  1. লেখচিত্রের প্রকৃতি:
    • পাটিগাণিতিক বৃদ্ধির লেখচিত্রটি একটি ধনাত্মক ঢালযুক্ত সরলরেখা (Linear plot)।
    • জ্যামিতিক বৃদ্ধির লেখচিত্রটি প্রথমে সূচকীয় হয় এবং পরে সম্পদের সীমাবদ্ধতায় একটি এস-আকৃতির সিগময়েড বক্ররেখা (Sigmoid S-curve) ধারণ করে।

(খ) সিগময়েড বক্ররেখা সর্বজনীন হওয়ার কারণ [২ নম্বর]: ১. প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা: প্রকৃতিতে কোনো জীবের পক্ষেই অসীম পুষ্টি, স্থান বা জল পাওয়া সম্ভব নয়। বৃদ্ধি প্রথমে ধীরগতিতে শুরু হয় (ল্যাগ পর্যায়); এরপর অনুকূল পরিবেশে দ্রুত গতিতে বাড়ে (লগ পর্যায়); এবং শেষ পর্যন্ত পুষ্টি ও স্থানের ঘাটতি বা জেনেটিক বার্ধক্যের কারণে বৃদ্ধির হার মন্থর হয়ে স্থির পর্যায়ে পৌঁছায়। ২. সর্বজনীনতা: এই এস-আকৃতির বক্ররেখা একক কোষ, চারাগাছ, উদ্ভিদের যেকোনো অঙ্গ থেকে শুরু করে প্রাণীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের প্রতীক হিসেবে দেখা যায়।

উদাহরণ 2
(ক) উপযুক্ত উদ্ভিজ্জ উদাহরণসহ বিভেদন (Differentiation), ডি-ডিফারেনসিয়েশন (Dedifferentiation) এবং রি-ডিফারেনসিয়েশনের (Redifferentiation) সংজ্ঞা দাও। (খ) উদ্ভিদের প্লাস্টিসিটি বা নমনীয়তা কী? রানানকুলুসের হেটারোফিলি দ্বারা এটি ব্যাখ্যা করো। [৩ + ২ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) কোষীয় রূপান্তরসমূহ [৩ নম্বর]: ১. বিভেদন: ভাজক কলার কোষগুলো নির্দিষ্ট স্থায়ী কাজ সম্পাদনের জন্য তাদের কোষপ্রাচীর ও প্রোটোপ্লাজমে স্থায়ী কাঠামোগত ও রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটানোকে বিভেদন বলে। উদাহরণ: ভাজক কলা থেকে জাইলেম বাহিকা ও ট্র্যাকিড সৃষ্টি (প্রোটোপ্লাজম নষ্ট হওয়া ও লিগনিনযুক্ত পুরু প্রাচীর গঠন)। ২. ডি-ডিফারেনসিয়েশন: যে প্রক্রিয়ায় কোনো স্থায়ী পরিণত সজীব কোষ পুনরায় মাইটোসিস বিভাজন ক্ষমতা ফিরে পায়, তাকে ডি-ডিফারেনসিয়েশন বলে। উদাহরণ: স্থায়ী প্যারেনকাইমা কোষ বিভাজন ক্ষমতা ফিরে পেয়ে ইন্টারফ্যাসিকুলার ক্যাম্বিয়াম ও কর্ক ক্যাম্বিয়াম গঠন করা। ৩. রি-ডিফারেনসিয়েশন: ডি-ডিফারেনসিয়েশনের মাধ্যমে গঠিত ভাজক কলা থেকে উৎপন্ন কোষগুলো পুনরায় বিভাজন ক্ষমতা হারিয়ে স্থায়ী কলায় রূপান্তরিত হওয়া। উদাহরণ: ইন্টারফ্যাসিকুলার ক্যাম্বিয়াম বিভাজিত হয়ে গৌণ জাইলেম ও গৌণ ফ্লোয়েম গঠন করা। (খ) প্লাস্টিসিটি ও রানানকুলুসের হেটারোফিলি [২ নম্বর]: ১. প্লাস্টিসিটি: পরিবেশের ভিন্নতা বা জীবনের বিভিন্ন দশার সাপেক্ষে উদ্ভিদের ভিন্ন ভিন্ন রূপের অঙ্গসংস্থানিক কাঠামো গঠন করার ক্ষমতাকে প্লাস্টিসিটি বলে। ২. বাটারকাপ বা রানানকুলুসের হেটারোফিলি: রানানকুলুস উদ্ভিদে যখন পাতাগুলো জলের নিচে থাকে, তখন তারা জলের স্রোতের সাথে মানিয়ে নিতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ফিতার মতো খণ্ডিত হয়; কিন্তু সেই একই গাছের যে পাতাগুলো জলের উপরে বাতাসে থাকে, সেগুলো চওড়া ও অখণ্ড ফলকযুক্ত হয়। এটি পরিবেশগত প্লাস্টিসিটির চমৎকার প্রমাণ।
উদাহরণ 3
(ক) চার্লস ডারউইন ও ফ্রিটস ওয়েন্টের পরীক্ষার উল্লেখ করে অক্সিন আবিষ্কারের ইতিহাস সংক্ষেপে লেখো। (খ) কৃষিকার্য ও উদ্যানবিদ্যায় অক্সিনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার উল্লেখ করো। [৩ + ২ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) অক্সিন আবিষ্কারের ইতিহাস [৩ নম্বর]: ১. চার্লস ও ফ্রান্সিস ডারউইন (১৮৮০): ক্যানারি ঘাসের ভ্রূণমুকুলাবরণীতে আলোকবৃত্তি পরীক্ষা করে দেখান যে অগ্রভাগ একমুখী আলো অনুভব করে এবং সেখান থেকে কোনো প্রভাব নিচে প্রেরিত হয়ে বাঁক সৃষ্টি করে। ২. বয়েসেন-জেনসেন (১৯১০): দেখান যে কাটা অগ্রভাগের নিচে জেলাটিন রাখলে আলোকবৃত্তি ঘটে, কিন্তু অভেদ্য মাইকা পাত রাখলে তা ঘটে না; যা প্রমাণ করে উদ্দীপনাটি একটি ব্যাপনযোগ্য রাসায়নিক পদার্থ। ৩. ফ্রিটস ওয়েন্ট (১৯২৮): জই (Avena) উদ্ভিদের মুকুলাবরণীর অগ্রভাগ কেটে অ্যাগার ব্লকে রেখে হরমোনটি সংগ্রহ করেন এবং অ্যাভেনা বক্রতা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে এই রাসায়নিক পদার্থটি অসমান বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তিনি এর নাম দেন 'অক্সিন'। (খ) অক্সিনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপ্রয়োগ [২ নম্বর]: ১. কাণ্ড কলমে মূল উৎপাদন: কৃত্রিম অক্সিন (IBA, NAA) প্রয়োগে কলমে দ্রুত অস্থানিক মূল গজিয়ে চারা তৈরি করা হয়। ২. নির্বাচিত আগাছানাশক: কৃত্রিম অক্সিন 2,4-D স্প্রে করে ধান-গমের মতো একবীজপত্রী ফসলের জমিতে ক্ষতিকর দ্বিবীজপত্রী আগাছা ধ্বংস করা হয়। ৩. অগ্রস্থ প্রকটতা বিনাশ: চা বাগানে অগ্রমুকুল ছাঁটাই করে অক্সিনের প্রভাব কমিয়ে কাক্ষিক মুকুল বৃদ্ধি ঘটিয়ে ঝোপালো গাছ তৈরি করা হয়। ৪. পার্থেনোকার্পি: অক্সিন স্প্রে করে পরাগযোগ ছাড়াই বীজহীন টমেটো উৎপন্ন করা হয়।
উদাহরণ 4
(ক) আধুনিক কৃষিতে জিব্বেরেলিনের (GA3) তিনটি প্রধান বাণিজ্যিক উপযোগিতা উল্লেখ করো। (খ) সাইটোকাইনিনের 'রিচমন্ড-ল্যাং প্রভাব' কী এবং টিস্যু কালচারে অক্সিন-সাইটোকাইনিন অনুপাতের ভূমিকা লেখো। [৩ + ২ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

(ক) জিব্বেরেলিনের তিনটি বাণিজ্যিক উপযোগিতা [৩ নম্বর]: ১. আখের ফলন বৃদ্ধি: আখের ক্ষেতে GA3 স্প্রে করলে পর্বমধ্যের দৈর্ঘ্য দ্রুত প্রসারিত হয়, যার ফলে প্রতি একরে আখের ফলন ২০ টন পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ২. ব্রিউয়িং বা মদ শিল্পে মল্টিং ত্বরান্বিতকরণ: অঙ্কুরিত বার্লি বীজের অ্যালুরন স্তরে GA3 আলফা-অ্যামাইলেজ উৎসেচক উৎপাদন উদ্দীপিত করে দ্রুত শ্বেতসার ভেঙে গাঁজনযোগ্য শর্করা তৈরি করে। ৩. আঙুরের ডাঁটা বৃদ্ধি ও ফল সংরক্ষণ: বীজহীন আঙুরের থোকায় ডাঁটার দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে ফলের আকার বৃদ্ধি করে ও পচন রোধ করে; এবং গাছে সাইট্রাস ফলের বার্ধক্য পিছিয়ে সংগ্রহের সময় বৃদ্ধি করে।

(খ) রিচমন্ড-ল্যাং প্রভাব ও টিস্যু কালচারে ভূমিকা [২ নম্বর]: ১. রিচমন্ড-ল্যাং প্রভাব: বিচ্ছিন্ন পাতায় সাইটোকাইনিন প্রয়োগ করলে তা ক্লোরোফিল ও প্রোটিন নষ্ট হওয়া রোধ করে এবং অন্যান্য অংশ থেকে পুষ্টি উপাদান আকর্ষণ করে পাতার বার্ধক্য অনেকদিন পিছিয়ে দেয়; একে রিচমন্ড-ল্যাং প্রভাব বলে। ২. টিস্যু কালচারে অনুপাত (স্কুগ ও মিলার):

  • উচ্চ অক্সিন : নিম্ন সাইটোকাইনিন $\implies$ মূল সৃষ্টি (Rhizogenesis)।
  • উচ্চ সাইটোকাইনিন : নিম্ন অক্সিন $\implies$ বিটপ মুকুল সৃষ্টি (Caulogenesis)।
  • সমপরিমাণ অনুপাত $\implies$ অবিভেদিত ক্যালাস বৃদ্ধি।
উদাহরণ 5
(ক) ইথিলিন দ্বারা চারাগাছে সৃষ্ট 'ট্রিপল রেসপন্স' (Triple Response) কী? (খ) অ্যাবসিসিক অ্যাসিডকে (ABA) কেন উদ্ভিদের 'স্ট্রেস হরমোন' বলা হয়? খরা পরিস্থিতিতে এটি কীভাবে পত্ররন্ধ্র বন্ধ করে? [২ + ৩ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

(ক) ইথিলিনের ট্রিপল রেসপন্স [২ নম্বর]: অন্ধকারে রাখা দ্বিবীজপত্রী চারাগাছে ইথিলিন গ্যাস প্রয়োগ করলে তিনটি সুনির্দিষ্ট রূপান্তর ঘটে, যাকে ট্রিপল রেসপন্স বলে: ১. কাণ্ডের অনুদৈর্ঘ্য বৃদ্ধি হ্রাস পাওয়া। ২. কাণ্ডের অক্ষ বা ব্যাসের অস্বাভাবিক স্ফীতি (মোটা হওয়া)। ৩. অগ্রস্থ বাঁকের (Apical hook) তীব্র সংকোচন ও অনুভূমিক বৃদ্ধি।

(খ) স্ট্রেস হরমোন হিসেবে ABA ও পত্ররন্ধ্র বন্ধের কৌশল [৩ নম্বর]: ১. কারণ: প্রতিকূল পরিবেশগত চাপ যেমন তীব্র অনাবৃষ্টি, খরা, অতিরিক্ত লবণাক্ততা বা শৈত্যের সময় উদ্ভিদে ABA-র মাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়ে উদ্ভিদে সহনশীলতা গড়ে তোলে বলে একে স্ট্রেস হরমোন বলে। ২. পত্ররন্ধ্র বন্ধ করার কৌশল:

  • মাটিতে জলের ঘাটতি হলে মূল থেকে সংকেত পেয়ে পাতায় দ্রুত ABA সংশ্লেষিত হয়।
  • ABA রক্ষীকোষের প্লাজমা পর্দার নির্দিষ্ট গ্রাহকে আবদ্ধ হয়।
  • এর ফলে রক্ষীকোষ থেকে পটাসিয়াম আয়ন (K+) এবং ম্যালেট আয়ন দ্রুত কোষের বাইরে (অ্যাপোপ্লাস্টে) বেরিয়ে যায়।
  • দ্রাব কমে যাওয়ায় বহিঃঅভিস্রবণের মাধ্যমে জল বাইরে বেরিয়ে যায় এবং রক্ষীকোষের রসস্ফীতি নষ্ট হয়ে তা শিথিল (Flaccid) হয়ে পড়ে।
  • শিথিল রক্ষীকোষের কারণে পত্ররন্ধ্র তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে যায় এবং বাষ্পমোচন বন্ধ হয়ে উদ্ভিদ জলের অপচয় থেকে রক্ষা পায়।
উদাহরণ 6
(ক) সংকট আলোককাল ও অন্ধকারকালের ভিত্তিতে স্বল্পদিবা উদ্ভিদ (SDP) ও দীর্ঘদিবা উদ্ভিদের (LDP) পার্থক্য নির্দেশ করো। (খ) ভার্নালাইজেশন কাকে বলে? এর উদ্দীপনা কোন্ অঙ্গে গৃহীত হয় এবং এর দুটি কৃষিগত গুরুত্ব লেখো। [৩ + ২ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

(ক) SDP ও LDP-র তুলনা [৩ নম্বর]: ১. আলোককালের শর্ত:

  • স্বল্পদিবা উদ্ভিদ (SDP): দিবার দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট সংকট আলোককালের কম হলে ফুল ফোটে (যেমন তামাক, সয়াবিন)।
  • দীর্ঘদিবা উদ্ভিদ (LDP): দিবার দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট সংকট আলোককালের বেশি হলে ফুল ফোটে (যেমন গম, মূলো)। ২. অন্ধকারকালের ভূমিকা (Night Length):
  • SDP হলো প্রকৃতপক্ষে 'দীর্ঘনিশি উদ্ভিদ'; এদের একটি নির্দিষ্ট সংকট অন্ধকারকালের চেয়ে দীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকার প্রয়োজন।
  • LDP হলো 'স্বল্পনিশি উদ্ভিদ'; এদের অন্ধকারকাল সংকট কালের চেয়ে কম হতে হয়। ৩. রাত্রে আলোর ঝলকানির প্রভাব (Night-break effect):
  • SDP-তে দীর্ঘ অন্ধকারকালের মাঝে ক্ষণিকের জন্য লোহিত আলোর ঝলকানি দিলে এদের ফুল ফোটা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
  • LDP-তে রাত্রে আলোর ঝলকানি দিলে এদের ফুল ফোটা ত্বরান্বিত হয়।

(খ) ভার্নালাইজেশন ও এর গুরুত্ব [২ নম্বর]: ১. সংজ্ঞা: নির্দিষ্ট নিম্ন তাপমাত্রার (১°C থেকে ১০°C) শৈত্য চিকিৎসার মাধ্যমে উদ্ভিদের ফুল ফোটার যোগ্যতা অর্জন বা ফুল ফোটা ত্বরান্বিত করার প্রক্রিয়াকে ভার্নালাইজেশন বলে। ২. অনুভূতির স্থান: সক্রিয়ভাবে বিভাজনরত ভাজক কলার কোষে—প্রধানত বিটপ শীর্ষ ভাজক কলা এবং বীজের ভ্রূণে (পাতায় নয়)। ৩. দুটি কৃষিগত গুরুত্ব:

  • শীতকালীন খাদ্যশস্যের (শীতকালীন গম) বীজকে শৈত্য চিকিৎসা দিয়ে বসন্তকালেই চাষ করা যায়।
  • দ্বিবর্ষজীবী উদ্ভিদে (বাঁধাকপি, বিট) শৈত্য চিকিৎসা দিয়ে প্রথম বছরেই অকাল প্রস্ফুটন ঘটিয়ে বীজ সংগ্রহ করা যায়।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

আলোককালবৃত্তির আলোক সংকেত বিটপ শীর্ষে সরাসরি গৃহীত হয় বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

আলোককালবৃত্তির আলোক সংকেত গৃহীত হয় উদ্ভিদের পাতায়; সেখান থেকে ফ্লোরিজেন সংকেত ফ্লোয়েম দিয়ে বিটপ শীর্ষে পৌঁছায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

স্বল্পদিবা উদ্ভিদ (SDP) দিবার দৈর্ঘ্য মাপে বলে ধারণা করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

SDP প্রকৃতপক্ষে রাতের দৈর্ঘ্য মাপে; এদের ফুল ফোটার জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘ অন্ধকার কাল অত্যাবশ্যক।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভার্নালাইজেশনের শৈত্য সংকেত আলোককালবৃত্তির মতো পাতায় গৃহীত হয় বলে ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ভার্নালাইজেশনের নিম্ন তাপমাত্রা গৃহীত হয় বিভাজনক্ষম ভাজক কলায় (বিটপ শীর্ষ ও বীজের ভ্রূণ), পাতায় নয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

অগ্রস্থ প্রকটতায় অক্সিন ও সাইটোকাইনিনের ভূমিকাকে গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অক্সিন অগ্রস্থ প্রকটতা সৃষ্টি করে (কাক্ষিক মুকুল অবদমিত রাখে); আর সাইটোকাইনিন অগ্রস্থ প্রকটতা দূর করে (কাক্ষিক মুকুল বাড়ায়)।

সাধারণ ভুল ধারণা

অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (ABA) জিব্বেরেলিনের সাথে মিলে কাজ করে বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ABA জিব্বেরেলিনের সম্পূর্ণ বিপরীত (Antagonistic) ধর্মী হরমোন।

চিত্রগত ব্যাখ্যা ও মডেল

WBCHSE একাদশ শ্রেণি জীববিজ্ঞান • একক ৪: উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও পরিবর্ধন: বৃদ্ধি গতিবিদ্যা, হরমোন (PGR), আলোককালবৃত্তি ও ভার্নালাইজেশন অধ্যায় ১৩ / টপিক ১৭৯ ১. বৃদ্ধির গতিবিদ্যা ও ধারাবাহিক পর্যায় বৃদ্ধির তিনটি ধারাবাহিক পর্যায়: • ১. ভাজক কলা পর্যায়: ঘন প্রোটোপ্লাজম, পাতলা প্রাচীর • ২. দীর্ঘীকরণ পর্যায়: ভ্যাকুওল সৃষ্টি, কোষীয় প্রসারণ • ৩. পরিণমন পর্যায়: প্রাচীর স্থূলীকরণ, কলা বিশেষীকরণ পাটিগাণিতিক বনাম জ্যামিতিক বৃদ্ধি সময় (t) ➔ বৃদ্ধি/ওজন Lt = L0 + rt (রৈখিক) W1 = W0·e^rt (সিগময়েড) ল্যাগ লগ/তাত্বিক স্থির পর্যায় কোষীয় রূপান্তর ও নমনীয়তা (প্লাস্টিসিটি): • বিভেদন: ভাজক কলা $ o$ ট্র্যাকি উপাদান (স্থায়ী) • ডি-ডিফারেনসিয়েশন: প্যারেনকাইমা $ o$ ক্যাম্বিয়াম • রি-ডিফারেনসিয়েশন: গৌণ জাইলেম ও ফ্লোয়েম গঠন • প্লাস্টিসিটি (হেটারোফিলি): কার্পাস, ধনে এবং র‍্যানানকুলাস (জলে খণ্ডিত ও বায়ুতে অখণ্ড পাতা) আপেক্ষিক বৃদ্ধি হার (RGR) = (W1 - W0) / (W0 · Δt) ২. উদ্ভিদ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক (PGRs) অক্সিন (IAA, IBA, NAA, 2,4-D): • ডারউইন (১৮৮০), ওয়েন্ট অভীক্ষা; অগ্রস্থ প্রকটতা সৃষ্টি • কলমে মূল উৎপাদন, টমেটোয় পার্থেনোকার্পি ফল সৃষ্টি • 2,4-D: দ্বিবীজপত্রী আগাছানাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয় জিব্বেরেলিন (GA3 / তারপিনয়েড): • কুরোশাওয়া (১৯২৬) বোকানে রোগ; বোল্টিং (পর্বমধ্য দীর্ঘীকরণ) • আঙুরের ডাঁটা বৃদ্ধি; বার্লি শস্যে মল্টিং প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত • আখের কাণ্ডের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি (+২০ টন/একর ফলন বৃদ্ধি) সাইটোকাইনিন (জিয়াটিন, কাইনেটিন / অ্যাডেনিন জাতক): • স্কুগ ও মিলার (১৯৫৫); দ্রুত কোষ বিভাজন উদ্দীপনা • অগ্রস্থ প্রকটতা বিনাশ; বার্ধক্য বিলম্বিতকরণ (রিচমন্ড-ল্যাং প্রভাব) • কলায় অঙ্গজনি: উচ্চ অক্সিন ➔ মূল; উচ্চ সাইটোকাইনিন ➔ কাণ্ড ইথিলিন (C2H4 / গ্যাসীয় হরমোন - ইথেফন): • কাজিন্স (১৯১০); ক্লাইম্যাকটেরিক ফল পাকা ত্বরান্বিত করে • ট্রিপল রেসপন্স: অনুভূমিক বৃদ্ধি, অক্ষের স্ফীতি, অগ্রস্থ বাঁক • সুপ্তিভঙ্গ; মূলরোম সৃষ্টি বাড়িয়ে শোষণ তল বৃদ্ধি করে অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (ABA / স্ট্রেস হরমোন): • ইনহিবিটর-বি / ডরমিন; জলকষ্ট বা খরায় তৈরি হয় • পত্ররন্ধ্র বন্ধ করে (রক্ষীকোষ থেকে K+ নির্গমন) বাষ্পমোচন রোধ • বীজের সুপ্তাবস্থা বজায় রাখে; জিব্বেরেলিনের সম্পূর্ণ বিপরীত বৃদ্ধি, অঙ্কুরোদগম ও সামগ্রিক বিপাকের সাধারণ সংদমক ৩. আলোককালবৃত্তি ও ভার্নালাইজেশন গার্নার ও অ্যালার্ড: সংকট আলোককাল স্বল্পদিবা (SDP): রাত্রি > সংকট কাল (তামাক, সয়াবিন, ধান) দীর্ঘদিবা (LDP): দিবালোক > সংকট কাল (গম, মূলো, বিট) দিবানিরপেক্ষ (DNP): আলোর ওপর স্বাধীন (টমেটো, ভুট্টা, সূর্যমুখী) রাতে সামান্য আলোর ঝলকানি দিলে SDP-তে ফুল ফোটে না! ফাইটোক্রোম প্রত্যাবর্তী রঞ্জক তন্ত্র: Pr (660nm) লোহিত আলো (660nm) দূর-লোহিত আলো (730nm) Pfr (730nm) Pfr সক্রিয় রূপ; অন্ধকারে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় Pr-এ পরিণত হয় ভার্নালাইজেশন ও ফ্লোরিজেন সংকেত: • ভার্নালাইজেশন: শৈত্য চিকিৎসার (১–১০°C) মাধ্যমে শীতকালীন গম এবং দ্বিবর্ষজীবী উদ্ভিদে (বাঁধাকপি, বিট, গাজর) ফুল ফোটা ত্বরান্বিত করার প্রক্রিয়া। • অনুভূতির স্থান: বিটপ শীর্ষ ভাজক কলা ও ভ্রূণ। • ফ্লোরিজেন (FT প্রোটিন): আলোক সংকেত পাতায় গৃহীত হয় এবং ফ্লোয়েম মারফত বিটপ শীর্ষে পরিবাহিত হয়ে ফুল ফোটায়। সুপ্তিভঙ্গ: স্কার্টিফিকেশন, শৈত্য আর্দ্রীকরণ (স্ট্র্যাটিফিকেশন), GA3

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
উদ্ভিদের বৃদ্ধি হলো সজীব কোষ বা অঙ্গের আকার, আয়তন ও শুষ্ক ওজনের অপ্রত্যাবর্তক স্থায়ী বৃদ্ধি, যা শীর্ষস্থ ও পার্শ্বস্থ ভাজক কলা দ্বারা পরিচালিত সীমাহীন বৃদ্ধি।
মূল বিষয় 2
বৃদ্ধির তিনটি স্পষ্ট কোষীয় পর্যায় রয়েছে: ভাজক কলা পর্যায় (দ্রুত বিভাজন), দীর্ঘীকরণ পর্যায় (কোষের দৈর্ঘ্য প্রসারণ), এবং পরিণমন পর্যায় (কোষ বিভেদন ও প্রাচীর স্থূলীকরণ)।
মূল বিষয় 3
পাটিগাণিতিক বৃদ্ধিতে একটি কোষ বিভাজনক্ষম থাকে এবং সরলরৈখিক গ্রাফ দেয় (Lt = L0 + rt); জ্যামিতিক বৃদ্ধিতে উভয় কোষ বিভাজিত হয়ে সিগময়েড এস-আকৃতির বক্ররেখা তৈরি করে (W1 = W0·e^rt)।
মূল বিষয় 4
কোষীয় রূপান্তরের মধ্যে রয়েছে বিভেদন (জাইলেম গঠন), ডি-ডিফারেনসিয়েশন (ক্যাম্বিয়াম গঠন), এবং রি-ডিফারেনসিয়েশন (গৌণ সংবহন কলা গঠন)।
মূল বিষয় 5
প্লাস্টিসিটির কারণে উদ্ভিদ পরিবেশের সাপেক্ষে ভিন্ন রূপের পাতা তৈরি করে, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো রানানকুলুস উদ্ভিদের জলজ ও বায়বীয় হেটারোফিলি।
মূল বিষয় 6
অক্সিন অগ্রস্থ প্রকটতা সৃষ্টি করে, কলমে মূল গজাতে সাহায্য করে এবং কৃত্রিম 2,4-D দ্বিবীজপত্রী আগাছানাশক হিসেবে একবীজপত্রী ফসলে ব্যবহৃত হয়।
মূল বিষয় 7
জিব্বেরেলিন (GA3) রোজেট উদ্ভিদে বোল্টিং ঘটায়, আখের পর্বমধ্য লম্বা করে ফলন বাড়ায়, বার্লির মল্টিং ত্বরান্বিত করে এবং আঙুরের ডাঁটা দীর্ঘ করে।
মূল বিষয় 8
সাইটোকাইনিন দ্রুত কোষ বিভাজন ঘটায়, অগ্রস্থ প্রকটতা দূর করে, রিচমন্ড-ল্যাং প্রভাবে বার্ধক্য পিছিয়ে দেয় এবং টিস্যু কালচারে অক্সিনের সাথে মিলে অঙ্গজনি নিয়ন্ত্রণ করে।
মূল বিষয় 9
ইথিলিন হলো গ্যাসীয় হরমোন যা ফলে ক্লাইম্যাকটেরিক পরিপক্বতা ও চারাগাছে ট্রিপল রেসপন্স ঘটায়; অপরদিকে অ্যাবসিসিক অ্যাসিড হলো স্ট্রেস হরমোন যা পত্ররন্ধ্র বন্ধ করে ও সুপ্তাবস্থা আনে।
মূল বিষয় 10
আলোককালবৃত্তির সংকেত পাতা দ্বারা ফাইটোক্রোম রঞ্জকের মাধ্যমে গৃহীত হয়ে ফ্লোরিজেন হরমোন বিটপে পাঠায় এবং ভার্নালাইজেশনে ভাজক কলা শৈত্য সংকেত গ্রহণ করে ফুল ফোটায়।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
তাজা ওজনের তুলনায় উদ্ভিদের শুষ্ক ওজনকে বৃদ্ধির অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য পরিমাপক গণ্য করা হয় কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: তাজা ওজনে উপস্থিত জলের পরিমাণ পরিবেশের আর্দ্রতা, বাষ্পমোচনের হার এবং কোষের সাময়িক রসস্ফীতি চাপের ওপর ভিত্তি করে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। অপরদিকে, ওভেনে সম্পূর্ণ জল বাষ্পীভূত করার পর প্রাপ্ত শুষ্ক ওজন উদ্ভিদের কোষে স্থায়ীভাবে সংশ্লেষিত জৈব পদার্থ, প্রোটোপ্লাজম ও সেলুলোজের প্রকৃত পরিমাণ নির্দেশ করে।
2
একটি স্বল্পদিবা উদ্ভিদকে (যেমন জ্যান্থিয়াম) ১০ ঘণ্টা আলো ও ১৪ ঘণ্টা অন্ধকারে রাখা হলো, কিন্তু অন্ধকারের মাঝে ৫ মিনিটের জন্য লোহিত আলোর ঝলকানি দিলে কী ঘটবে এবং কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: উদ্ভিদটিতে ফুল ফুটবে না। কারণ স্বল্পদিবা উদ্ভিদ প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘনিশি উদ্ভিদ, যাদের ফুল ফোটার জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘ অন্ধকার সময় আবশ্যক। লোহিত আলোর সামান্য ঝলকানি নিষ্ক্রিয় Pr-কে সক্রিয় Pfr-এ রূপান্তর করে ফেলে, যা উদ্ভিদের অন্ধকার পরিমাপক জৈব ঘড়িকে বিঘ্নিত করে ফ্লোরিজেন সংশ্লেষ বন্ধ করে দেয়।
3
বাণিজ্যিক চা বাগানে শ্রমিকরা কেন নিয়মিত বিরতিতে চা গাছের বিটপ শীর্ষ ছাঁটাই (Pruning) করে থাকেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: বিটপ শীর্ষে প্রচুর অক্সিন তৈরি হয় যা নিচের দিকে নেমে কাক্ষিক মুকুলের বৃদ্ধি আটকে রাখে (অগ্রস্থ প্রকটতা)। বিটপ শীর্ষ কেটে বাদ দিলে অক্সিনের উৎস দূর হয়, ফলে উদ্ভিদের সাইটোকাইনিন সুপ্ত কাক্ষিক মুকুলগুলোকে দ্রুত বিকশিত করে অজস্র নতুন কোমল পাতার ঝোপ তৈরি করে, যা চা তোলার ফলন বহুগুণ বাড়ায়।
4
টাটকা তোলা আলুকে আর্দ্র ও উপযুক্ত উষ্ণ মাটিতে রাখলেও তা থেকে সহজে চারা গজায় না কেন, এবং কীভাবে এই সুপ্তাবস্থা দূর করা যায়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: সদ্য তোলা আলুর কন্দগুলোতে উচ্চ মাত্রায় অ্যাবসিসিক অ্যাসিড (ABA) থাকে, যা মুকুলের বিপাকীয় কাজ অবদমিত রেখে গভীর সুপ্তাবস্থা বজায় রাখে। আলুর কন্দে জিব্বেরেলিক অ্যাসিড (GA3) বা ইথিলিন ক্লোরোহাইড্রিন প্রয়োগ করলে তা ABA-র কার্যকারিতা নষ্ট করে অ্যামাইলেজ সক্রিয় করে এবং দ্রুত সুপ্তিভঙ্গ ঘটিয়ে চোখ থেকে চারা গজাতে সাহায্য করে।
5
গম ক্ষেতে কৃত্রিম অক্সিন 2,4-D স্প্রে করলে গমের কোনো ক্ষতি না হয়ে আগাছা কীভাবে ধ্বংস হয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: 2,4-D হলো একটি নির্বাচিত বা সিলেক্টিভ আগাছানাশক যা কেবল চওড়া পাতাযুক্ত দ্বিবীজপত্রী উদ্ভিদের ওপর তীব্র বিষক্রিয়া ঘটায়। একবীজপত্রী খাদ্যশস্য যেমন গম বা ধানের সংবহনতন্ত্রের গঠন ভিন্ন হওয়ায় এবং তারা 2,4-D-কে দ্রুত বিপাকীয়ভাবে নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে পারায় তাদের কোনো ক্ষতি হয় না।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 11 Biology — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: সজীব বিশ্ব অধ্যায় 2: জীবের শ্রেণিবিন্যাস অধ্যায় 3: উদ্ভিদ রাজ্য অধ্যায় 4: প্রাণী রাজ্য অধ্যায় 5: সপুষ্পক উদ্ভিদের অঙ্গসংস্থান অধ্যায় 6: সপুষ্পক উদ্ভিদের অন্তর্গঠন অধ্যায় 7: প্রাণীদের গঠনগত সংগঠন অধ্যায় 8: কোষ: জীবনের একক অধ্যায় 9: জৈব অণুসমূহ অধ্যায় 10: কোষ চক্র ও কোষ বিভাজন অধ্যায় 11: উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদে সালোকসংশ্লেষ অধ্যায় 12: উদ্ভিদে শ্বসন অধ্যায় 13: উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও পরিবর্ধন অধ্যায় 14: পরিপাক ও শোষণ অধ্যায় 15: শ্বাসকার্য ও গ্যাসীয় বিনিময় অধ্যায় 16: দেহ তরল ও সংবহন অধ্যায় 17: রেচন পদার্থ ও তাদের নিষ্কাশন অধ্যায় 18: চলন ও গমন অধ্যায় 19: স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় অধ্যায় 20: রাসায়নিক সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও পরিবর্ধন অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।