উদ্ভিদদেহে সম-উৎপত্তিবিশিষ্ট এবং একই ধরণের কার্য সম্পাদনে নিয়োজিত নির্দিষ্ট কোশসমষ্টিকে কলা (Tissue) বলে। বিভাজন ক্ষমতার ভিত্তিতে উদ্ভিদ কলাকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়: ভাজক কলা (Meristematic tissue) এবং স্থায়ী কলা (Permanent tissue)।
ভাজক কলার কোশগুলি অপরিণত, সর্বদা সক্রিয় মাইটোসিস বিভাজনে সক্ষম, পাতলা সেলুলোজ নির্মিত কোশপ্রাচীরযুক্ত, ঘন দানাদার প্রোটোপ্লাজম ও সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াসযুক্ত, ভ্যাকুওলহীন এবং আন্তঃকোশীয় স্থানহীনভাবে নিবিড়ভাবে সন্নিবিষ্ট থাকে।
- অবস্থান অনুসারে শ্রেণিবিভাগ:
- শীর্ষস্থ ভাজক কলা (Apical Meristem): মূল ও কাণ্ডের ক্রমবর্ধমান অগ্রভাগে অবস্থিত (Root Apical Meristem - RAM এবং Shoot Apical Meristem - SAM)। এটি উদ্ভিদের প্রাথমিক কলা গঠন করে এবং দৈর্ঘ্য বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
- নিবেশিত ভাজক কলা (Intercalary Meristem): দুটি স্থায়ী কলার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত, বিশেষত একবীজপত্রী ঘাস, বাঁশ ও পুদিনার পর্বমধ্যের গোড়ায় থাকে। এটি তৃণভোজী প্রাণীদের দ্বারা ভক্ষিত অংশ দ্রুত পুনরুৎপাদনে সহায়তা করে।
- পার্শ্বীয় ভাজক কলা (Lateral Meristem): কাণ্ড ও মূলের পার্শ্বদেশে অনুদৈর্ঘ্যভাবে অবস্থিত বেলনাকার ভাজক কলা। এটি পরিক্লিনাল বিভাজনের মাধ্যমে গৌণ কলা সৃষ্টি করে উদ্ভিদের স্থূলতা বা বেধ বৃদ্ধি করে (যেমন সংবহন ক্যাম্বিয়াম ও কর্ক ক্যাম্বিয়াম / ফেলোজেন)।
- উৎপত্তি অনুসারে শ্রেণিবিভাগ:
- প্রাথমিক ভাজক কলা (Primary Meristem): ভ্রূণাবস্থা থেকে সারাজীবন সক্রিয় থাকে (শীর্ষস্থ ও নিবেশিত ভাজক কলা)।
- গৌণ ভাজক কলা (Secondary Meristem): স্থায়ী কোশগুলির পুনরায় বিভাজন ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে (Dedifferentiation) পরবর্তী জীবনে গঠিত হয় (যেমন মজ্জাংশু থেকে গঠিত ইন্টারফ্যাসিকুলার ক্যাম্বিয়াম এবং কর্টেক্স থেকে গঠিত কর্ক ক্যাম্বিয়াম / ফেলোজেন)।
যে স্থায়ী কলা কেবলমাত্র এক প্রকার সমআকৃতির ও সমপ্রকৃতির কোশ দ্বারা গঠিত, তাকে সরল স্থায়ী কলা বলে:
- প্যারেনকাইমা (Parenchyma):
- গঠন: সজীব, সমব্যাসীয়, গোলাকার বা ডিম্বাকার কোশ; পাতলা সেলুলোজ কোশপ্রাচীর ও সুস্পষ্ট কেন্দ্রস্থ ভ্যাকুওলযুক্ত। কোশগুলির মধ্যে সুস্পষ্ট আন্তঃকোশীয় স্থান থাকে।
- রূপান্তর ও কাজ: খাদ্য সংশ্লেষ ও সঞ্চয় এর প্রধান কাজ। ক্লোরোপ্লাস্টযুক্ত প্যারেনকাইমাকে ক্লোরেনকাইমা (সালোকসংশ্লেষকারী) এবং জলজ উদ্ভিদে (কচুরিপানা, পদ্ম) বড় বড় বায়ুপূর্ণ গহ্বরযুক্ত প্যারেনকাইমাকে অ্যারেনকাইমা (প্লবতা ও গ্যাস বিনিময়ে সহায়ক) বলে।
- কোলেনকাইমা (Collenchyma):
- গঠন: সজীব, দীর্ঘাকার কোশ। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কোশগুলির সংযোগস্থলে বা কোণে পেক্টিন, সেলুলোজ ও হেমিসেলুলোজের অসম স্থূলীভবন ঘটে। কোশগুলির মধ্যে কোনো আন্তঃকোশীয় স্থান থাকে না।
- অবস্থান ও কাজ: দ্বিবীজপত্রী কচি কাণ্ড ও পত্রবৃন্তের অধস্ত্বকে (hypodermis) থাকে। এটি উদ্ভিদের নমনীয় যান্ত্রিক শক্তি ও স্থিতিস্থাপকতা প্রদান করে, যার ফলে তীব্র বাতাসে কচি ডালপালা না ভেঙে সহজে বেঁকে যেতে পারে। (একবীজপত্রী কাণ্ড এবং মূলে কোলেনকাইমা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত)।
- স্ক্লেরেনকাইমা (Sclerenchyma):
- গঠন: পরিণত অবস্থায় সম্পূর্ণ মৃত ও প্রোটোপ্লাজমবিহীন। কোশপ্রাচীর অত্যন্ত পুরু এবং শক্ত লিগনিন দ্বারা স্থূলীকৃত। কোশগহ্বর (lumen) অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং প্রাচীরে কুপ (pits) থাকে।
- প্রকারভেদ:
- স্ক্লেরেনকাইমা তন্তু (Fibres): সুতোর মতো দীর্ঘ, দুই প্রান্ত ছুঁচলো কোশ, যা গুচ্ছাকারে থাকে (যেমন পাটের বাস্ট তন্তু)।
- স্ক্লেরাইড বা অশ্মকোশ (Sclereids / Stone Cells): প্রায় গোলাকার বা ডিম্বাকার অত্যন্ত স্থূলপ্রাচীরযুক্ত কোশ। পেয়ারা, নাসপাতি, সফেদা ফলের শাঁসের খসখসে দানা, বাদামের খোসা এবং ডালশস্যের বীজত্বকে পাওয়া যায়।