মানব স্নায়ুতন্ত্রকে শারীরস্থানিক এবং শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
- ১. কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (Central Nervous System - CNS): স্নায়বিক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও নির্দেশক কেন্দ্র, যা মস্তিষ্ক (Brain) এবং মেরুরজ্জু (Spinal Cord) নিয়ে গঠিত।
- ২. প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (Peripheral Nervous System - PNS): কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সাথে দেহের অন্যান্য অংশের সংযোগ স্থাপনকারী সমস্ত স্নায়ু নিয়ে গঠিত। এতে রয়েছে মস্তিষ্ক থেকে উৎপন্ন ১২ জোড়া করোটিক স্নায়ু (Cranial Nerves) এবং মেরুরজ্জু থেকে উৎপন্ন ৩১ জোড়া সুষুম্না স্নায়ু (Spinal Nerves)।
• সোম্যাটিক স্নায়ুতন্ত্র (SNS): কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে ঐচ্ছিক কঙ্কাল পেশিতে উদ্দীপনা প্রেরণ করে আমাদের সচেতন নড়াচড়া পরিচালনা করে।
• স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র (ANS): অনৈচ্ছিক পেশি (মসৃণ ও হৃদপেশি) এবং গ্রন্থিসমূহের ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এটি দুটি বিপরীতধর্মী ভাগে বিভক্ত:
- সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র (Sympathetic System): সুষুম্নাকাণ্ডের থোরাসিক ও লাম্বার অঞ্চল (T1–L2) থেকে উৎপন্ন। এটি জরুরি অবস্থায় দেহের "লড়াই অথবা পলায়ন" (Fight-or-Flight) প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে: হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, পিউপিল প্রসারণ, ব্রঙ্কিওল প্রসারণ এবং পৌষ্টিকনালীর ক্রিয়া নিবৃত্ত করে।
- প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র (Parasympathetic System): করোটিক স্নায়ু (III, VII, IX, X) এবং স্যাক্রাল মেরুরজ্জু (S2–S4) থেকে উৎপন্ন। এটি স্বাভাবিক শান্ত অবস্থায় দেহের "বিশ্রাম ও পরিপাক" (Rest-and-Digest) বজায় রাখে: হৃদস্পন্দন হ্রাস, খাদ্য পরিপাক ও রেচন উদ্দীপিত করে।
নিউরোন হলো স্নায়ুতন্ত্রের গঠনগত ও কার্যগত একক। এটি বিভাজনহীন (সেন্ট্রোজোম নিষ্ক্রিয়) এবং প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত:
| অংশ | গঠনগত ও কোষীয় বৈশিষ্ট্য | শারীরবৃত্তীয় কাজ |
|---|---|---|
| কোষদেহ (Cell Body / Soma) | গোলাকার বা নক্ষত্রাকার অংশ যাতে সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস, মাইটোকনড্রিয়া, গলগি বস্তু, নিউরোফাইব্রিল এবং গাঢ় রঙের নিসল দানা (Nissl's Granules) থাকে। নিসল দানা মূলত রাইবোজোমযুক্ত অমসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম। | নিউরোনের বিপাকীয় কেন্দ্র; নিউরোনের প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও উৎসেচক সংশ্লেষ করে। |
| ডেনড্রাইট (Dendrites) | কোষদেহ থেকে নির্গত ক্ষুদ্র, বহুশাখাযুক্ত সংবেদী প্রবর্ধক। এর সাইটোপ্লাজমে নিসল দানা ও নিউরোফাইব্রিল বর্তমান। | বাহ্যিক পরিবেশ বা অন্য নিউরোন থেকে স্নায়ু উদ্দীপনা গ্রহণ করে কোষদেহের দিকে প্রেরণ করে (অন্তর্মুখী বা সেন্সরি গ্রাহক)। |
| অ্যাক্সন (Axon) | কোষদেহের একটি শঙ্কু আকৃতির অঞ্চল অ্যাক্সন হিলক (Axon Hillock) থেকে নির্গত দীর্ঘ, একক বেলনাকার প্রবর্ধক। এর পর্দাকে অ্যাক্সোলেমা ও সাইটোপ্লাজমকে অ্যাক্সোপ্লাজম বলে। অ্যাক্সনে কোনো নিসল দানা বা গলগি বস্তু থাকে না। শেষপ্রান্তে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে টেলোডেনড্রিয়া ও সাইন্যাপটিক নব গঠন করে। | কোষদেহ থেকে অ্যাকশন পটেনশিয়ালকে দূরবর্তী লক্ষ্য কোষে বা পরবর্তী নিউরোনে পরিবহন করে (বহির্মুখী পথ)। সাইন্যাপটিক নবে নিউরোট্রান্সমিটার থলি থাকে। |
অ্যাক্সনের চারপাশে মায়েলিন আবরণীর উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে স্নায়ুতন্তু দুই প্রকার:
- মায়েলিনযুক্ত (Medullated) স্নায়ুতন্তু: অ্যাক্সনের চারপাশে সোয়ান কোষ (PNS-এ) অথবা অলিগোডেনড্রোসাইট (CNS-এ) পেঁচিয়ে ফ্যাটি পদার্থের চকচকে সাদা মায়েলিন সিথ গঠন করে। নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর মায়েলিন আবরণহীন খাঁজগুলিকে র্যানভিয়ারের পর্ব (Nodes of Ranvier) বলে। এর মধ্য দিয়ে অতি দ্রুত লম্ফ সঞ্চালন পদ্ধতিতে উদ্দীপনা যায়।
- মায়েলিনবিহীন (Non-medullated) স্নায়ুতন্তু: এতে কোনো ঘন মায়েলিন আবরণ থাকে না; সোয়ান কোষ সাধারণ আবরণ হিসেবে থাকে। এটি ধূসর বর্ণের এবং এতে উদ্দীপনা ধীরগতিতে অবিচ্ছিন্নভাবে পরিবাহিত হয় (স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রে বেশি দেখা যায়)।
• ইউনিপোলার (Unipolar): মাত্র একটি প্রবর্ধক থাকে (ভ্রূণাবস্থায় পাওয়া যায়)।
• বাইপোলার (Bipolar): একটি অ্যাক্সন ও একটি ডেনড্রাইট বিপরীত মেরু থেকে বের হয় (চোখের রেটিনা, নাসিকার ঘ্রাণ উপবিন্দু এবং কর্ণের গ্যাংলিয়নে থাকে)।
• মাল্টিপোলার (Multipolar): একটি অ্যাক্সন এবং বহু ডেনড্রাইট থাকে (সেরিব্রাল কর্টেক্স ও সাধারণ মোটর নিউরোন)।
• সিউডো-ইউনিপোলার (Pseudounipolar): কোষদেহ থেকে একক প্রবর্ধক বেরিয়ে T-আকারে দুটি শাখায় বিভক্ত হয় (মেরুরজ্জুর পৃষ্ঠদেশীয় মূলের গ্যাংলিয়ন বা DRG-তে থাকে)।
মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জুর প্রায় ৫০% আয়তন রক্ষাকারী অ-উত্তেজক কোষসমূহ হলো নিউরোগ্লিয়া:
- অ্যাস্ট্রোসাইট (Astrocytes): তারকাকার কোষ যা রক্তবাহের এন্ডোথেলিয়ামের সাথে যুক্ত হয়ে ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার (BBB) তৈরি করে এবং ক্ষতিকর পদার্থ মস্তিষ্কে প্রবেশে বাধা দেয়।
- অলিগোডেনড্রোসাইট (Oligodendrocytes): কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের (CNS) অ্যাক্সনের চারপাশে মায়েলিন আবরণ তৈরি করে।
- মাইক্রোগ্লিয়া (Microglia): মেসোডার্ম-উদ্ভূত ক্ষুদ্র ফ্যাগোসাইটিক কোষ যা মস্তিষ্কের ম্যাক্রোফাজ হিসেবে মৃত কোষ ও জীবাণু ভক্ষণ করে।
- এপেনডাইমাল কোষ (Ependymal Cells): মস্তিষ্কের নিলয় এবং সুষুম্নাকাণ্ডের কেন্দ্রীয় নালীকে আবৃতকারী সিলিয়াযুক্ত কোষ যা CSF ক্ষরণ ও সঞ্চালনে সহায়তা করে।
- সোয়ান কোষ (Schwann Cells): প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রে (PNS) মায়েলিন সিথ ও নিউরিলেমা গঠন করে।