Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি XI • Biology • অধ্যায় 19
আনুমানিক সময়: ৪৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়

স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় হলো মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ ও তন্ত্রের শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপের মধ্যে দ্রুত ও সুসংহত তড়িৎ-রাসায়নিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। যেখানে হরমোনঘটিত অন্তঃক্ষরা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত ধীর ও দীর্ঘস্থায়ী, সেখানে স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মিলি-সেকেন্ডের মধ্যে পরিবেশের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। শারীরস্থানিকভাবে স্নায়ুতন্ত্র দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত: কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (CNS - মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জু) এবং প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (PNS - ১২ জোড়া করোটিক স্নায়ু ও ৩১ জোড়া সুষুম্না স্নায়ু)। স্নায়ুতন্ত্রের মূল গঠনগত ও কার্যগত একক হলো নিউরোন, যা নিউরোগ্লিয়া নামক সহায়ক কোষ দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। বিশ্রামাবস্থায় নিউরোনের পর্দায় -৭০ মিলিভোল্ট বিশ্রাম বিভব (RMP) বজায় থাকে, যা সোডিয়াম-পটাশিয়াম পাম্প এবং আয়নের অসম ভেদ্যতার উপর নির্ভরশীল। উদ্দীপনার ফলে ভোল্টেজ-নিয়ন্ত্রিত সোডিয়াম চ্যানেল খুলে গেলে +৩০ মিলিভোল্টের অ্যাকশন পটেনশিয়াল তৈরি হয় এবং মায়েলিনযুক্ত তন্তুতে র‍্যানভিয়ারের পর্ব বরাবর লম্ফ সঞ্চালন (Saltatory Conduction)-এর মাধ্যমে দ্রুত পরিবাহিত হয়। সাইন্যাপটিক ক্লেফটে রাসায়নিক নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণের মাধ্যমে এই স্পন্দন পরবর্তী কোষে সংবাহিত হয়। এছাড়া মস্তিষ্ক, প্রতিবর্ত চাপ এবং বিশেষ সংবেদী অঙ্গ হিসেবে চোখ ও কানের গঠন ও কার্যকারিতা মানব স্নায়বিক সমন্বয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অধ্যায়টির গুরুত্ব

স্নায়ুতন্ত্রের শারীরবৃত্তীয় জ্ঞান ক্লিনিকাল নিউরোলজি, সাইকিয়াট্রি এবং চক্ষুরোগ ও কর্ণরোগের চিকিৎসার ভিত্তি স্থাপন করে। এটি এপিলেপ্সি (মৃগীরোগ), মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, পারকিনসন্স ডিজিজ, অ্যালঝেইমার্স ডিজিজ, গ্লুকোমা, ছানি (ক্যাটারাক্ট) এবং স্নায়বিক বধিরতার মতো জটিল রোগের উৎস বুঝতে সহায়তা করে। পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক (WBCHSE) এবং নিট (NEET) পরীক্ষায় স্নায়ু স্পন্দন পরিবহনের বিভিন্ন দশা, সোডিয়াম-পটাশিয়াম পাম্পের কার্যপদ্ধতি, সাইন্যাপ্সের মেকানিজম, মস্তিষ্কের বিভিন্ন খণ্ডের কাজ, প্রতিবর্ত চাপ, দৃষ্টির আলোক-রাসায়নিক চক্র এবং কর্ণের ককলিয়া ও ওটোলিথ অঙ্গ থেকে প্রতি বছর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 মানব স্নায়ুতন্ত্রের সংগঠন ও নিউরোন...
2 স্নায়ু স্পন্দন পরিবহন ও অ্যাকশন পট...
3 সাইন্যাপটিক সঞ্চালন ও নিউরোট্রান্সম...
4 কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র: মস্তিষ্ক,...
5 প্রতিবর্ত ক্রিয়া, প্রতিবর্ত চাপ ও...
6 সংবেদী অঙ্গ: মানব নেত্রগোলক ও কর্ণে...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

মানব স্নায়ুতন্ত্রের সংগঠন ও নিউরোনের কলাস্থানিক গঠন

১. মানব স্নায়ুতন্ত্রের গঠনগত ও কার্যগত শ্রেণিবিভাগ

মানব স্নায়ুতন্ত্রকে শারীরস্থানিক এবং শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:

  • ১. কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (Central Nervous System - CNS): স্নায়বিক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও নির্দেশক কেন্দ্র, যা মস্তিষ্ক (Brain) এবং মেরুরজ্জু (Spinal Cord) নিয়ে গঠিত।
  • ২. প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (Peripheral Nervous System - PNS): কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের সাথে দেহের অন্যান্য অংশের সংযোগ স্থাপনকারী সমস্ত স্নায়ু নিয়ে গঠিত। এতে রয়েছে মস্তিষ্ক থেকে উৎপন্ন ১২ জোড়া করোটিক স্নায়ু (Cranial Nerves) এবং মেরুরজ্জু থেকে উৎপন্ন ৩১ জোড়া সুষুম্না স্নায়ু (Spinal Nerves)।
PNS-এর কার্যকরী বিভাজন:
• সোম্যাটিক স্নায়ুতন্ত্র (SNS): কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে ঐচ্ছিক কঙ্কাল পেশিতে উদ্দীপনা প্রেরণ করে আমাদের সচেতন নড়াচড়া পরিচালনা করে।
• স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র (ANS): অনৈচ্ছিক পেশি (মসৃণ ও হৃদপেশি) এবং গ্রন্থিসমূহের ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এটি দুটি বিপরীতধর্মী ভাগে বিভক্ত:
- সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র (Sympathetic System): সুষুম্নাকাণ্ডের থোরাসিক ও লাম্বার অঞ্চল (T1–L2) থেকে উৎপন্ন। এটি জরুরি অবস্থায় দেহের "লড়াই অথবা পলায়ন" (Fight-or-Flight) প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে: হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, পিউপিল প্রসারণ, ব্রঙ্কিওল প্রসারণ এবং পৌষ্টিকনালীর ক্রিয়া নিবৃত্ত করে।
- প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র (Parasympathetic System): করোটিক স্নায়ু (III, VII, IX, X) এবং স্যাক্রাল মেরুরজ্জু (S2–S4) থেকে উৎপন্ন। এটি স্বাভাবিক শান্ত অবস্থায় দেহের "বিশ্রাম ও পরিপাক" (Rest-and-Digest) বজায় রাখে: হৃদস্পন্দন হ্রাস, খাদ্য পরিপাক ও রেচন উদ্দীপিত করে।
২. আদর্শ নিউরোনের সাইটোপ্লাজমীয় গঠন ও বিভিন্ন অংশ

নিউরোন হলো স্নায়ুতন্ত্রের গঠনগত ও কার্যগত একক। এটি বিভাজনহীন (সেন্ট্রোজোম নিষ্ক্রিয়) এবং প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত:

অংশগঠনগত ও কোষীয় বৈশিষ্ট্যশারীরবৃত্তীয় কাজ
কোষদেহ (Cell Body / Soma)গোলাকার বা নক্ষত্রাকার অংশ যাতে সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস, মাইটোকনড্রিয়া, গলগি বস্তু, নিউরোফাইব্রিল এবং গাঢ় রঙের নিসল দানা (Nissl's Granules) থাকে। নিসল দানা মূলত রাইবোজোমযুক্ত অমসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম।নিউরোনের বিপাকীয় কেন্দ্র; নিউরোনের প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও উৎসেচক সংশ্লেষ করে।
ডেনড্রাইট (Dendrites)কোষদেহ থেকে নির্গত ক্ষুদ্র, বহুশাখাযুক্ত সংবেদী প্রবর্ধক। এর সাইটোপ্লাজমে নিসল দানা ও নিউরোফাইব্রিল বর্তমান।বাহ্যিক পরিবেশ বা অন্য নিউরোন থেকে স্নায়ু উদ্দীপনা গ্রহণ করে কোষদেহের দিকে প্রেরণ করে (অন্তর্মুখী বা সেন্সরি গ্রাহক)।
অ্যাক্সন (Axon)কোষদেহের একটি শঙ্কু আকৃতির অঞ্চল অ্যাক্সন হিলক (Axon Hillock) থেকে নির্গত দীর্ঘ, একক বেলনাকার প্রবর্ধক। এর পর্দাকে অ্যাক্সোলেমা ও সাইটোপ্লাজমকে অ্যাক্সোপ্লাজম বলে। অ্যাক্সনে কোনো নিসল দানা বা গলগি বস্তু থাকে না। শেষপ্রান্তে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে টেলোডেনড্রিয়া ও সাইন্যাপটিক নব গঠন করে।কোষদেহ থেকে অ্যাকশন পটেনশিয়ালকে দূরবর্তী লক্ষ্য কোষে বা পরবর্তী নিউরোনে পরিবহন করে (বহির্মুখী পথ)। সাইন্যাপটিক নবে নিউরোট্রান্সমিটার থলি থাকে।
৩. মায়েলিনেশন ও নিউরোনের প্রকারভেদ

অ্যাক্সনের চারপাশে মায়েলিন আবরণীর উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে স্নায়ুতন্তু দুই প্রকার:

  • মায়েলিনযুক্ত (Medullated) স্নায়ুতন্তু: অ্যাক্সনের চারপাশে সোয়ান কোষ (PNS-এ) অথবা অলিগোডেনড্রোসাইট (CNS-এ) পেঁচিয়ে ফ্যাটি পদার্থের চকচকে সাদা মায়েলিন সিথ গঠন করে। নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর মায়েলিন আবরণহীন খাঁজগুলিকে র‍্যানভিয়ারের পর্ব (Nodes of Ranvier) বলে। এর মধ্য দিয়ে অতি দ্রুত লম্ফ সঞ্চালন পদ্ধতিতে উদ্দীপনা যায়।
  • মায়েলিনবিহীন (Non-medullated) স্নায়ুতন্তু: এতে কোনো ঘন মায়েলিন আবরণ থাকে না; সোয়ান কোষ সাধারণ আবরণ হিসেবে থাকে। এটি ধূসর বর্ণের এবং এতে উদ্দীপনা ধীরগতিতে অবিচ্ছিন্নভাবে পরিবাহিত হয় (স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রে বেশি দেখা যায়)।
প্রবর্ধকের সংখ্যার ভিত্তিতে নিউরোনের প্রকারভেদ:
• ইউনিপোলার (Unipolar): মাত্র একটি প্রবর্ধক থাকে (ভ্রূণাবস্থায় পাওয়া যায়)।
• বাইপোলার (Bipolar): একটি অ্যাক্সন ও একটি ডেনড্রাইট বিপরীত মেরু থেকে বের হয় (চোখের রেটিনা, নাসিকার ঘ্রাণ উপবিন্দু এবং কর্ণের গ্যাংলিয়নে থাকে)।
• মাল্টিপোলার (Multipolar): একটি অ্যাক্সন এবং বহু ডেনড্রাইট থাকে (সেরিব্রাল কর্টেক্স ও সাধারণ মোটর নিউরোন)।
• সিউডো-ইউনিপোলার (Pseudounipolar): কোষদেহ থেকে একক প্রবর্ধক বেরিয়ে T-আকারে দুটি শাখায় বিভক্ত হয় (মেরুরজ্জুর পৃষ্ঠদেশীয় মূলের গ্যাংলিয়ন বা DRG-তে থাকে)।
৪. সহায়ক নিউরোগ্লিয়া (Glial Cells) কোষ

মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জুর প্রায় ৫০% আয়তন রক্ষাকারী অ-উত্তেজক কোষসমূহ হলো নিউরোগ্লিয়া:

  • অ্যাস্ট্রোসাইট (Astrocytes): তারকাকার কোষ যা রক্তবাহের এন্ডোথেলিয়ামের সাথে যুক্ত হয়ে ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার (BBB) তৈরি করে এবং ক্ষতিকর পদার্থ মস্তিষ্কে প্রবেশে বাধা দেয়।
  • অলিগোডেনড্রোসাইট (Oligodendrocytes): কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের (CNS) অ্যাক্সনের চারপাশে মায়েলিন আবরণ তৈরি করে।
  • মাইক্রোগ্লিয়া (Microglia): মেসোডার্ম-উদ্ভূত ক্ষুদ্র ফ্যাগোসাইটিক কোষ যা মস্তিষ্কের ম্যাক্রোফাজ হিসেবে মৃত কোষ ও জীবাণু ভক্ষণ করে।
  • এপেনডাইমাল কোষ (Ependymal Cells): মস্তিষ্কের নিলয় এবং সুষুম্নাকাণ্ডের কেন্দ্রীয় নালীকে আবৃতকারী সিলিয়াযুক্ত কোষ যা CSF ক্ষরণ ও সঞ্চালনে সহায়তা করে।
  • সোয়ান কোষ (Schwann Cells): প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রে (PNS) মায়েলিন সিথ ও নিউরিলেমা গঠন করে।

স্নায়ু স্পন্দন পরিবহন ও অ্যাকশন পটেনশিয়ালের জৈবপদার্থবিজ্ঞান

১. বিশ্রাম বিভব (Resting Membrane Potential - RMP)-এর আয়নীয় ভিত্তি

একটি উদ্দীপনাহীন স্বাভাবিক স্নায়ুতন্তুর অ্যাক্সোলেমার ভেতরের ও বাইরের তলের মধ্যে বজায় থাকা স্থির বিভব পার্থক্যকে বিশ্রাম বিভব (RMP) বলে। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের নিউরোনে এর মান প্রায় -৭০ মিলিভোল্ট (-70 mV) (বাইরের সাপেক্ষে ভেতরের দিক ঋণাত্মক)। এটি তিনটি প্রধান বিষয়ের উপর নির্ভরশীল:

১. অ্যাক্সোলেমার দুই পাশে আয়নের অসম বণ্টন:
• কোষবহিঃস্থ তরলে (ECF): সোডিয়াম (Na+) আয়নের ঘনত্ব অত্যধিক (প্রায় ১৪৫ mM) এবং ক্লোরাইড (Cl-) বেশি থাকে।
• অ্যাক্সোপ্লাজমে (ICF): পটাশিয়াম (K+) আয়নের ঘনত্ব অত্যধিক (প্রায় ১৪০ mM) এবং প্রচুর পরিমাণে ঋণাত্মক আধানযুক্ত জৈব প্রোটিন ও ফসফেট থাকে।

২. পর্দার অসম পারগম্যতা (Differential Permeability):
• বিশ্রামাবস্থায় অ্যাক্সোলেমাতে খোলা K+ লিক চ্যানেল থাকার কারণে এটি Na+-এর তুলনায় K+-এর জন্য ২০ থেকে ৩০ গুণ বেশি ভেদ্য।
• ফলে ভেতরের K+ দ্রুত ব্যাপন প্রক্রিয়ায় বাইরে বেরিয়ে যায়, কিন্তু বাইরের Na+ সহজে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না।
• তাছাড়া বৃহদাকার ঋণাত্মক প্রোটিন অণুগুলি পর্দা ভেদ করে বাইরে বেরোতে পারে না, ফলে অ্যাক্সোপ্লাজমের ভেতরের দিকে ঋণাত্মক আধিক্য তৈরি হয়।

৩. সোডিয়াম-পটাশিয়াম এটিপিয়েজ পাম্প (Na+/K+ ATPase Pump):
• লিক চ্যানেল দিয়ে বের হওয়া বা ঢোকা আয়নগুলির সমতা বজায় রাখতে এটিপি-র শক্তিতে প্রতি চক্রে ৩টি Na+ আয়নকে বাইরে বের করে এবং ২টি K+ আয়নকে ভেতরে প্রবেশ করায়।
• বাইরে ৩টি ধনাত্মক আয়ন গিয়ে ভেতরে ২টি ধনাত্মক আয়ন আসায় ভেতরের ঋণাত্মক মেরুকরণ (-৭০ mV) অক্ষুণ্ণ থাকে।
২. অ্যাকশন পটেনশিয়াল সৃষ্টি ও স্নায়ু স্পন্দনের বিভিন্ন পর্যায়

স্নায়ুতন্তুতে উদ্দীপনা প্রয়োগ করলে অ্যাক্সোলেমার তড়িৎ মেরুকরণে যে দ্রুত, ক্ষণস্থায়ী ও উল্টোমুখী পরিবর্তন ঘটে, তাকে অ্যাকশন পটেনশিয়াল (Action Potential) বলে। এর পর্যায়গুলি হলো:

পর্যায়বিভব সীমাআয়ন চ্যানেলের অবস্থা ও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া
প্রারম্ভিক থ্রেশহোল্ড (Threshold)-৭০ mV থেকে -৫৫ mVউদ্দীপনা প্রয়োগের ফলে কিছু ভোল্টেজ-গেটেড Na+ চ্যানেল খোলে। স্থানীয় ডিপোলারাইজেশন যখন সংকটজনক থ্রেশহোল্ড বিভব (-৫৫ mV)-এ পৌঁছায়, তখন অল-অর-নান (All-or-None) নিয়মে পূর্ণ অ্যাকশন পটেনশিয়াল শুরু হয়।
ডিপোলারাইজেশন (Depolarization)-৫৫ mV থেকে +৩০ mVথ্রেশহোল্ডে পৌঁছানোর সাথে সাথে হাজার হাজার ভোল্টেজ-গেটেড Na+ চ্যানেল একসাথে উন্মুক্ত হয়ে যায়। বহিঃস্থ তরল থেকে বিদ্যুৎ গতিতে বিপুল পরিমাণ Na+ কোষের ভেতরে প্রবেশ করে। পর্দার ভেতরের তল ধনাত্মক হয়ে ওঠে এবং বিভব +৩০ mV (ওভারশুট)-এ পৌঁছায়।
রিপোলারাইজেশন (Repolarization)+৩০ mV থেকে -৭০ mV+৩০ mV-তে Na+ চ্যানেলের নিষ্ক্রিয়করণ গেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সাথে সাথে ভোল্টেজ-গেটেড K+ চ্যানেলগুলি খুলে যায়। ফলে K+ আয়নগুলি তীব্র বেগে কোষ থেকে বাইরে বেরিয়ে যায়। পর্দার অভ্যন্তরীণ তল পুনরায় দ্রুত ঋণাত্মক হয়ে -৭০ mV-তে ফিরে আসে।
হাইপারপোলারাইজেশন (Undershoot)-৭০ mV থেকে -৮৫ mVK+ চ্যানেলগুলি অত্যন্ত ধীরগতিতে বন্ধ হওয়ায় অতিরিক্ত K+ বাইরে চলে যায়, যার ফলে বিভব সাময়িকভাবে -৭০ mV-এর চেয়েও নিচে নেমে প্রায় -৮৫ mV হয়। এরপর Na+/K+ পাম্প পুনরায় আয়নীয় ঘনত্ব ঠিক করে -৭০ mV বিভব ফিরিয়ে আনে।
৩. রিফ্র্যাক্টরি পিরিয়ড ও লম্ফ সঞ্চালন (Saltatory Conduction)
  • অনমনীয় কাল বা রিফ্র্যাক্টরি পিরিয়ড: ডিপোলারাইজেশনের সময় Na+ চ্যানেল উন্মুক্ত বা নিষ্ক্রিয় থাকায় কোনো নতুন উদ্দীপনা দিলে আর কোনো স্পন্দন সৃষ্টি হয় না (Absolute Refractory Period)। এর ফলে স্নায়ু স্পন্দন কেবল একদিকেই সম্মুখমুখে অগ্রসর হয়, পশ্চাৎমুখে ফিরে যেতে পারে না।
  • লম্ফ সঞ্চালন (Saltatory Conduction): মায়েলিন সিথ একটি চমৎকার তড়িৎ-অন্তরক যা আয়ন চলাচল সম্পূর্ণ আটকে রাখে। শুধুমাত্র র‍্যানভিয়ারের পর্বে প্রচুর পরিমাণে ভোল্টেজ-গেটেড Na+ চ্যানেল কেন্দ্রীভূত থাকে। ফলে ডিপোলারাইজেশন সমগ্র অ্যাক্সন জুড়ে না ঘটে এক পর্ব থেকে পরবর্তী পর্বে লাফিয়ে লাফিয়ে (Saltatory) পরিবাহিত হয়।
    • সুবিধা: মায়েলিনবিহীন তন্তুর (০.৫–২ মি/সে) তুলনায় মায়েলিনযুক্ত তন্তুতে স্পন্দনের গতিবেগ প্রায় ৫০ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১০০–১২০ মিটার/সেকেন্ড পর্যন্ত পৌঁছায় এবং Na+/K+ পাম্পের এটিপি খরচ ৯০% হ্রাস পায়।

সাইন্যাপটিক সঞ্চালন ও নিউরোট্রান্সমিটারের ভূমিকা

১. সাইন্যাপ্সের শ্রেণিবিভাগ: তড়িৎ সাইন্যাপ্স বনাম রাসায়নিক সাইন্যাপ্স

একটি নিউরোন থেকে পরবর্তী নিউরোন বা পেশিকোষে উদ্দীপনা প্রেরণের সংযোগস্থলকে সাইন্যাপ্স (Synapse) বলে। এটি দুই প্রকার:

বৈশিষ্ট্যতড়িৎ সাইন্যাপ্স (Electrical Synapse)রাসায়নিক সাইন্যাপ্স (Chemical Synapse)
সাইন্যাপটিক ক্লেফটের ব্যবধানখুবই কম (প্রায় ২–৪ nm); কোনো দৃশ্যমান ফাঁক থাকে নাসুস্পষ্ট তরলপূর্ণ ফাঁক বর্তমান (প্রায় ২০–৩০ nm)
পর্দার সংযোগপ্রিসাইনাপটিক ও পোস্টসাইনাপটিক পর্দা গ্যাপ জংশন (কনেক্সন প্রোটিন) দ্বারা সরাসরি যুক্তসরাসরি কোনো সংযোগ থাকে না; রাসায়নিক দূত দ্বারা সংবাহিত হয়
পরিবহন কৌশলআয়নসমূহ সরাসরি গ্যাপ জংশনের ছিদ্র দিয়ে প্রবাহিত হয়ভেসিকল থেকে নিউরোট্রান্সমিটার ক্ষরণ ও ব্যাপন দ্বারা ঘটে
সাইন্যাপটিক বিলম্ব ও দিকবিলম্ব প্রায় শূন্য (<০.১ ms); দ্বিমুখী পরিবহন সম্ভববিলম্ব প্রায় ০.৫–১.০ ms; সর্বদা একমুখী (Unidirectional)
মানবদেহে উপস্থিতিবিরল; হৃদপেশির ইন্টারক্যালেটেড ডিস্ক ও আত্মরক্ষা স্নায়ুপথে থাকেমানব স্নায়ুতন্ত্রের সর্বাধিক প্রচলিত সাইন্যাপ্স
২. রাসায়নিক সাইন্যাপ্সে উদ্দীপনা সঞ্চালনের আণবিক কৌশল

রাসায়নিক সাইন্যাপ্সে স্নায়ু স্পন্দন সঞ্চালন চারটি সুনির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হয়:

ধাপ ১: অ্যাকশন পটেনশিয়াল আগমন ও ক্যালসিয়াম আয়নের অন্তঃপ্রবেশ:
স্নায়ু স্পন্দন প্রিসাইনাপটিক নবে পৌঁছালে সেখানকার ভোল্টেজ-গেটেড ক্যালসিয়াম চ্যানেল (VGCC) উন্মুক্ত হয়। বহিঃকোষীয় তরল থেকে দ্রুত Ca2+ আয়ন নবের ভেতরে প্রবেশ করে।

ধাপ ২: সাইন্যাপটিক ভেসিকলের সংযুক্তি ও নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ:
Ca2+ সাইনাপটিক ভেসিকলের সাইন্যাপ্টোট্যাগমিন প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয়। এতে SNARE প্রোটিন কমপ্লেক্স সক্রিয় হয়ে ভেসিকলগুলিকে প্রিসাইনাপটিক পর্দার সাথে সংবদ্ধ করে। এক্সোসাইটোসিস পদ্ধতিতে ভেসিকল ফেটে গিয়ে নিউরোট্রান্সমিটার (যেমন অ্যাসিটাইলকোলিন) সাইন্যাপটিক ক্লেফটে মুক্ত হয়।

ধাপ ৩: পোস্টসাইনাপটিক রিসেপ্টরে সংযুক্তি ও বিভব সৃষ্টি:
মুক্ত নিউরোট্রান্সমিটার অণুগুলি ২০ nm ক্লেফট ব্যাপিত হয়ে পোস্টসাইনাপটিক পর্দার নির্দিষ্ট গ্রাহকে (Receptor) আবদ্ধ হয়:
• উত্তেজক বিভব (EPSP - Excitatory Postsynaptic Potential): লিগ্যান্ড-গেটেড Na+ চ্যানেল খুলে গেলে Na+ প্রবেশ করে স্থানীয় ডিপোলারাইজেশন সৃষ্টি করে (যেমন: অ্যাসিটাইলকোলিন, গ্লুটামেট)। একাধিক EPSP যোগ হয়ে অ্যাক্সন হিলকে নতুন অ্যাকশন পটেনশিয়াল সৃষ্টি করে।
• নিবারক বিভব (IPSP - Inhibitory Postsynaptic Potential): লিগ্যান্ড-গেটেড Cl- চ্যানেল বা K+ চ্যানেল খুলে গেলে Cl- ভেতরে আসে বা K+ বাইরে যায়। ফলে পর্দা হাইপারপোলারাইজড হয়ে উদ্দীপনা সৃষ্টি বন্ধ রাখে (যেমন: GABA, গ্লাইসিন)।

ধাপ ৪: নিউরোট্রান্সমিটার অপসারণ:
সংকেত প্রদান শেষ হলে সাইন্যাপটিক ক্লেফটে অবস্থিত উৎসেচক (যেমন অ্যাসিটাইলকোলিন এস্টারেজ - AChE) অ্যাসিটাইলকোলিনকে ভেঙে অ্যাসিটেট ও কোলিনে পরিণত করে, অথবা প্রিসাইনাপটিক পাম্পের মাধ্যমে পুনরায় শোষিত হয়।

কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র: মস্তিষ্ক, মেরুরজ্জু ও মস্তিষ্কের নিলয়

১. মস্তিষ্কের সুরক্ষামূলক পর্দা (মেনিনজেস) ও সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF)

মানব মস্তিষ্ক করোটিকার অস্থিময় খুলির মধ্যে এবং মেরুরজ্জু কশেরুকার সুষুম্না নালীর মধ্যে তিনটি স্তরযুক্ত পর্দা দ্বারা সুরক্ষিত থাকে, যাদের একত্রে মেনিনজেস (Meninges) বলে:

  • ১. ডুরা মেটার (Dura Mater): সবচেয়ে বাইরের পুরু, শক্ত, তন্তুময় কোলাজেন নির্মিত স্তর।
  • ২. অ্যারাকনয়েড মেটার (Arachnoid Mater): মধ্যবর্তী অতি পাতলা, মাকড়সার জালের মতো রক্তবাহহীন স্তর। ডুরা ও অ্যারাকনয়েডের মাঝে সাবডিউরাল স্পেস থাকে।
  • ৩. পিয়া মেটার (Pia Mater): সবচেয়ে ভেতরের সূক্ষ্ম, স্বচ্ছ ও অত্যন্ত রক্তজালকসমৃদ্ধ স্তর যা মস্তিষ্কের প্রতিটি খাঁজে ও ভাঁজে দৃঢ়ভাবে সংলগ্ন থাকে।
সাব-অ্যারাকনয়েড স্থান ও সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF):
• অ্যারাকনয়েড ও পিয়া মেটারের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানটিকে সাব-অ্যারাকনয়েড স্পেস বলে, যা বর্ণহীন, স্বচ্ছ ক্ষারীয় সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF) দ্বারা পূর্ণ থাকে (মোট পরিমাণ প্রায় ১৫০ মিলি)।
• উৎপত্তি: মস্তিষ্কের চারটি নিলয়ে অবস্থিত কৈশিকনালীর বিশেষ জালক কোরয়েড প্লেক্সাস (Choroid Plexus) থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলি CSF ক্ষরিত হয়।
• প্রবাহ: পার্শ্বীয় নিলয় → মনরোর ছিদ্র → তৃতীয় নিলয় → সিলভিয়াসের নালী → চতুর্থ নিলয় → লুশকা ও ম্যাগেন্ডির ছিদ্র → সাব-অ্যারাকনয়েড স্পেস → অ্যারাকনয়েড ভিলি দ্বারা ভেনাস সাইনাসে পুনঃশোষিত হয়।
• কাজ: প্লাবতা প্রদান করে মস্তিষ্কের কার্যকর ওজনকে ১৪০০ গ্রাম থেকে কমিয়ে মাত্র ৫০ গ্রামে নামিয়ে আনে, যান্ত্রিক আঘাত থেকে রক্ষা করে এবং পুষ্টি সরবরাহ ও বর্জ্য অপসারণ করে।
২. মানব মস্তিষ্কের (Brain / Encephalon) প্রধান অংশ ও তাদের কাজ
মস্তিষ্কের প্রধান খণ্ডঅন্তর্ভুক্ত অংশসমূহপ্রধান শারীরবৃত্তীয় কাজসমূহ
১. অগ্রমস্তিষ্ক (Prosencephalon)• গুরুমস্তিষ্ক (Cerebrum): মস্তিষ্কের বৃহত্তম অংশ (প্রায় ৮০% আয়তন)। এটি একটি গভীর অনুদৈর্ঘ্য খাঁজ দ্বারা দুটি সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ারে বিভক্ত, যা সুদৃঢ় স্নায়ুতন্তুর যোজক কর্পাস ক্যালোসাম (Corpus Callosum) দ্বারা যুক্ত থাকে। বাইরের ধূসর অংশকে সেরিব্রাল কর্টেক্স বলে যাতে ভাঁজ (জাইরাস) ও খাঁজ (সালকাস) থাকে। চারটি খণ্ডে বিভক্ত:
- ফ্রন্টাল লোব: ঐচ্ছিক পেশির সঞ্চালন কেন্দ্র (মোটর কর্টেক্স), ব্রোকার বাক-কেন্দ্র (কথা বলার মোটর এলাকা), চিন্তা, স্মৃতি, বুদ্ধি ও ব্যক্তিত্ব।
- প্যারাইটাল লোব: সংজ্ঞাবহ কর্টেক্স (স্পর্শ, চাপ, উষ্ণতা ও ব্যথার অনুভূতি গ্রহণ), স্বাদ গ্রহণ।
- টেম্পোরাল লোব: প্রাথমিক শ্রবণ কেন্দ্র, ঘ্রাণ কেন্দ্র এবং ভার্নিকের কথা বোঝার অনুভূতি অঞ্চল।
- অক্সিপিটাল লোব: প্রাথমিক দর্শন কেন্দ্র এবং দৃশ্য সংকেত বিশ্লেষণ।
• থ্যালামাস (Thalamus): ডিম্বাকার ধূসর অংশ; ঘ্রাণ ব্যতীত সমস্ত সংজ্ঞাবহ সংকেতের জন্য রিলে স্টেশন (Relay Station) হিসেবে কাজ করে।
• হাইপোথ্যালামাস (Hypothalamus): থ্যালামাসের নিচে অবস্থিত। দেহের অভ্যন্তরীণ থার্মোস্ট্যাট (তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ), ক্ষুধা ও তৃষ্ণা কেন্দ্র, ঘুম-জাগরণ ছন্দ এবং পিটুইটারি গ্রন্থির হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
• লিম্বিক তন্ত্র (Limbic System): হিপ্পোক্যাম্পাস (স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিকে দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিতে রূপান্তর) এবং অ্যামিগডালা (ভয়, রাগ, আনন্দ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ) নিয়ে গঠিত।
উচ্চতর চেতনা, স্মৃতি, বিচারবুদ্ধি, ঐচ্ছিক সঞ্চালন, সংবেদন গ্রহণ, আবেগ ও সমতাপূর্ণ দেহের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ।
২. মধ্যমস্তিষ্ক (Mesencephalon)থ্যালামাস ও পনসের মধ্যবর্তী অংশ। এর মধ্য দিয়ে সরু সেরিব্রাল অ্যাকুইডাক্ট বা সিলভিয়াসের নালী অতিক্রম করে। পৃষ্ঠদেশে চারটি গোলাকার স্ফীতি থাকে যাদের একত্রে কর্পোরা কোয়াড্রিজেমিনা (Corpora Quadrigemina) বলে:
- উর্ধ্বস্থ দুটি (Superior Colliculi): দৃষ্টি প্রতিবর্ত কেন্দ্র (চোখ ও মাথার দৃষ্টির দিকে সঞ্চালন)।
- নিম্নস্থ দুটি (Inferior Colliculi): শ্রবণ প্রতিবর্ত কেন্দ্র (শব্দের দিকে মাথা ঘোরানো)।
দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবর্ত ক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং অগ্র ও পশ্চাৎমস্তিষ্কের মধ্যে সংযোগ সেতু।
৩. পশ্চাৎমস্তিষ্ক (Rhombencephalon)• পনস বা যোজক (Pons Varolii): বিভিন্ন অংশের স্নায়ুতন্তুর সেতু; এতে অবস্থিত নিউমোট্যাক্সিক কেন্দ্র (Pneumotaxic center) শ্বাসক্রিয়ার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে।
• লঘুমস্তিষ্ক (Cerebellum): দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশ; এর সাদা স্নায়ুতন্তু গাছের শাখার মতো বিন্যস্ত থাকে যাকে আর্বোর ভিটি (Arbor Vitae) বলে। কাজ: ঐচ্ছিক পেশির সূক্ষ্ম সমন্বয়, চলাফেরার ভারসাম্য রক্ষা এবং পেশির টান নিয়ন্ত্রণ করে (অ্যালকোহল পানে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে হাঁটাচলায় অসঙ্গতি ঘটে)।
• সুষুম্নাশীর্ষক (Medulla Oblongata): মস্তিষ্কের সর্বনিম্ন শঙ্কু আকৃতির অংশ যা ফোরামেন ম্যাগনাম দিয়ে মেরুরজ্জুতে প্রবেশ করে। এতে গুরুত্বপূর্ণ অনৈচ্ছিক কেন্দ্র থাকে:
- শ্বাসক্রিয়া কেন্দ্র: স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ তৈরি করে।
- কার্ডিওভাসকুলার কেন্দ্র: হৃদস্পন্দনের হার ও সংকোচন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ।
- ভ্যাসোমোটর কেন্দ্র: রক্তনালীর ব্যাস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ।
- প্রতিবর্ত কেন্দ্র: গিলন, বমি, কাশি, হাঁচি ও লাক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ।
অনৈচ্ছিক জৈবিক ক্রিয়া (শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন), রক্তচাপ, লালাক্ষরণ এবং দেহের ভারসাম্য রক্ষা।
ব্রেনস্টেম (Brainstem): মধ্যমস্তিষ্ক + পনস + মেডুলা অবলংগাটা একত্রে ব্রেনস্টেম গঠন করে, যা চেতনা ও জাগ্রত অবস্থা বজায় রাখে।
৩. মেরুরজ্জু (Spinal Cord)-এর অভ্যন্তরীণ গঠন

মেরুদণ্ডের নিউরাল ক্যানালের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত নলাকার অংশ। এর প্রস্থচ্ছেদে দেখা যায়:

  • অভ্যন্তরীণ ধূসর বস্তু (Grey Matter): কেন্দ্রে প্রজাপতির ডানা বা 'H' আকৃতির ধূসর বস্তু থাকে, যার মাঝখানে CSF পূর্ণ কেন্দ্রীয় নালী অবস্থিত। এতে থাকে: (১) পৃষ্ঠীয় শৃঙ্গ (Dorsal Horn - সংবেদী স্নায়ু গ্রহণ করে) এবং (২) অঙ্কীয় শৃঙ্গ (Ventral Horn - আজ্ঞাবহ মোটর নিউরোনের কোষদেহ থাকে)।
  • বহিঃস্থ শ্বেত বস্তু (White Matter): ধূসর বস্তুর চারপাশের মায়েলিনযুক্ত স্নায়ুতন্তুর অঞ্চল, যা ঊর্ধ্বগামী সংবেদী এবং নিম্নগামী আজ্ঞাবহ স্নায়ুপথ তৈরি করে।

প্রতিবর্ত ক্রিয়া, প্রতিবর্ত চাপ ও প্রাথমিক সংবেদ (ঘ্রাণ ও স্বাদ)

১. প্রতিবর্ত ক্রিয়া (Reflex Action) ও প্রতিবর্ত চাপ (Reflex Arc)

মস্তিষ্কের সচেতন চিন্তা বা ইচ্ছা ছাড়াই নির্দিষ্ট বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ উদ্দীপনার প্রভাবে দেহে যে দ্রুত, অনৈচ্ছিক, স্বয়ংক্রিয় এবং পূর্বনির্ধারিত মোটর প্রতিক্রিয়া ঘটে, তাকে প্রতিবর্ত ক্রিয়া বলে। প্রতিবর্ত ক্রিয়ার উদ্দীপনা যে নির্দিষ্ট স্নায়বিক পথ ধরে প্রবাহিত হয়, তাকে প্রতিবর্ত চাপ (Reflex Arc) বলে। একটি আদর্শ প্রতিবর্ত চাপের পাঁচটি প্রধান উপাদান রয়েছে:

প্রতিবর্ত চাপের পাঁচটি অপরিহার্য উপাদান:
১. গ্রাহক অঙ্গ (Receptor): পরিবেশের উদ্দীপনা গ্রহণ করে রিসেপ্টর পটেনশিয়াল তৈরি করে (যেমন: পেশির স্পিন্ডল, ত্বকের পেইন রিসেপ্টর)।
২. সংজ্ঞাবহ বা সেন্সরি নিউরোন (Afferent Neuron): সংগৃহীত স্পন্দনকে পৃষ্ঠদেশীয় স্নায়ুমূল দিয়ে মেরুরজ্জুর দিকে নিয়ে আসে; এর কোষদেহ থাকে ডরসাল রুট গ্যাংলিয়ন (DRG)-এ।
৩. স্নায়ুকেন্দ্র / সমন্বয়ক (Integration Center): মেরুরজ্জুর ধূসর বস্তুর মধ্যে অবস্থিত সিন্যাপটিক অঞ্চল। এটি দুই ধরনের হতে পারে:
- মনোসাইন্যাপটিক (Monosynaptic): সংবেদী নিউরোন সরাসরি মোটর নিউরোনের সাথে একটিমাত্র সাইন্যাপ্স তৈরি করে (যেমন: হাঁটু-ঝাঁকুনি বা নি-জার্ক প্রতিবর্ত)।
- পলিসাইন্যাপটিক (Polysynaptic): সংবেদী ও আজ্ঞাবহ নিউরোনের মাঝে এক বা একাধিক আন্তঃনিউরোন (Interneuron) থাকে (যেমন: আগুনে হাত লাগলে হাত টেনে নেওয়ার প্রতিবর্ত)।
৪. আজ্ঞাবহ বা মোটর নিউরোন (Efferent Neuron): মেরুরজ্জুর অঙ্কীয় শৃঙ্গ থেকে সংকেত গ্রহণ করে অঙ্কীয় মূল দিয়ে কারক অঙ্গে প্রেরণ করে।
৫. কারক অঙ্গ (Effector): যে পেশি বা গ্রন্থিটি সংকুচিত বা ক্ষরিত হয়ে চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া সম্পাদন করে।
২. ঘ্রাণ সংবেদন (Sense of Smell / Olfaction)

নাসাগহ্বরের ছাদ বরাবর অবস্থিত কেমোরিসেপ্টর দ্বারা ঘ্রাণ অনুভূত হয়:

  • অলফ্যাক্টরি উপবিন্দু (Olfactory Epithelium): সুপিরিয়র ন্যাসাল কঙ্কা এবং এথময়েড অস্থির চালুনির মতো ক্রিব্রিফর্ম প্লেটের নিচে অবস্থিত বিশেষায়িত সিউডোস্ট্র্যাটিফাইড আবরণী। এতে তিন প্রকার কোষ থাকে: (১) অলফ্যাক্টরি গ্রাহক কোষ (বাইপোলার নিউরোন যার সিলিয়াযুক্ত নব মিউকাসের মধ্যে প্রবিষ্ট থাকে), (২) সহায়ক কোষ (পুষ্টি ও গঠন প্রদানকারী), এবং (৩) ভিত্তি কোষ (স্টেম সেল যা প্রতি ৩০–৬০ দিনে নতুন ঘ্রাণ কোষ তৈরি করে)।
  • সংবেদন কৌশল: বাতাসে ভেসে আসা উদ্বায়ী রাসায়নিক পদার্থ মিউকাশে দ্রবীভূত হয়ে গ্রাহকের G-প্রোটিন (Golf)-কে উদ্দীপিত করে cAMP তৈরি করে Na+ ও Ca2+ চ্যানেল খুলে ডিপোলারাইজেশন ঘটায়।
  • স্নায়ুপথ: অ্যাক্সনগুলি ১ম করোটিক স্নায়ু (অলফ্যাক্টরি নার্ভ) হিসেবে ক্রিব্রিফর্ম প্লেট ভেদ করে অলফ্যাক্টরি বাল্বে প্রবেশ করে। সেখান থেকে সংকেত সরাসরি টেম্পোরাল লোবের ঘ্রাণ কর্টেক্স এবং লিম্বিক তন্ত্রে (অ্যামিগডালা/হিপ্পোক্যাম্পাস) যায়। লক্ষণীয় যে, ঘ্রাণ সংবেদন থ্যালামাসকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছায়, যার কারণে সুনির্দিষ্ট গন্ধ তীব্র স্মৃতি ও আবেগ জাগিয়ে তোলে।
৩. স্বাদ সংবেদন (Sense of Taste / Gustation)

জিহ্বার উপরিভাগে অবস্থিত স্বাদকোরক (Taste Buds) দ্বারা দ্রবীভূত রাসায়নিক স্বাদ অনুভূত হয়:

  • স্বাদকোরক ও প্যাপিলি: প্রাপ্তবয়স্ক জিহ্বায় প্রায় ১০,০০০ স্বাদকোরক থাকে যা জিহ্বার প্যাপিলির প্রাচীরে অবস্থিত: (১) সারকামভ্যালেট প্যাপিলি (জিহ্বার গোড়ায় V-আকারে সাজানো বৃহৎ প্যাপিলি), (২) ফাঞ্জিফর্ম প্যাপিলি (অগ্রভাগে ছাতার মতো লালচে), এবং (৩) ফলিয়েট প্যাপিলি। ফিলিফর্ম প্যাপিলিতে কোনো স্বাদকোরক থাকে না।
  • স্বাদ কোষের গঠন: প্রতিটি স্বাদকোরকে ৫০–১০০টি মাকু-আকৃতির স্বাদগ্রাহক কোষ থাকে যার অগ্রভাগে থাকা মাইক্রোভিলি বা টেস্ট হেয়ারগুলি টেস্ট পোর (স্বাদরন্ধ্র) দিয়ে বাইরে উন্মুক্ত থাকে।
  • পাঁচটি প্রাথমিক স্বাদ: মিষ্টি (Sweet), নোনতা (Salty - সরাসরি Na+ প্রবেশ), টক (Sour - H+ আয়ন দ্বারা), তিতো (Bitter - ক্ষারীয় বিষাক্ত পদার্থ শনাক্তকরণ, সবচেয়ে কম থ্রেশহোল্ড) এবং উমামি (Umami - গ্লুটামেটের লোভনীয় স্বাদ)।
  • স্নায়ু সংবহন: জিহ্বার অগ্র ২/৩ অংশের স্বাদ ৭ম করোটিক স্নায়ু (ফেসিয়াল নার্ভের কর্ডা টিম্প্যানি) এবং পশ্চাৎ ১/৩ অংশের স্বাদ ৯ম করোটিক স্নায়ু (গ্লসোফ্যারিঞ্জিয়াল) দ্বারা পরিবাহিত হয়ে প্যারাইটাল লোবের টেস্ট কর্টেক্সে পৌঁছায়।

সংবেদী অঙ্গ: মানব নেত্রগোলক ও কর্ণের পুঙ্খানুপুঙ্খ গঠন

১. মানব অক্ষিগোলকের (Eyeball) পুঙ্খানুপুঙ্খ কলাস্থানিক স্তরবিন্যাস

মানুষের চোখ অক্ষিকোটরের মধ্যে সুরক্ষিত একটি প্রায় গোলাকার (২৪ মিমি ব্যাস) অঙ্গ। এর প্রাচীর তিনটি সমকেন্দ্রিক স্তর বা টিউনিকা নিয়ে গঠিত:

স্তর / টিউনিকাঅন্তর্ভুক্ত অংশসমূহগঠন ও সুনির্দিষ্ট কাজ
১. বহিঃস্থ তন্তুময় স্তর (Fibrous Tunic)• শ্বেতমণ্ডল বা স্ক্লেরা (Sclera): পেছনের ৫/৬ অংশ জুড়ে অবস্থিত সাদা, অস্বচ্ছ, শক্ত কোলাজেন তন্তুর স্তর; চোখের গোলকাকার রূপ বজায় রাখে এবং অক্ষিপেশি যুক্ত থাকে।
• স্বচ্ছমণ্ডল বা কর্নিয়া (Cornea): সামনের ১/৬ অংশ জুড়ে থাকা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, উত্তল ও রক্তনালীহীন অংশ। কাজ: চোখে প্রবেশকারী আলোকরশ্মির প্রধান প্রতিসরণ (প্রায় ৭০% প্রতিসরণ ক্ষমতা) সম্পন্ন করে।
চোখের সুরক্ষা এবং প্রধান আলোক প্রতিসরণ মাধ্যম।
২. মধ্যবর্তী রক্তক স্তর (Vascular Uvea)• কোরয়েড (Choroid): পেছনের রক্তজালক ও মেলানিন রঞ্জকসমৃদ্ধ গাঢ় স্তর; চোখে পুষ্টি জোগায় এবং আলোর অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন রোধ করে।
• সিলিয়ারি বডি (Ciliary Body): কোরয়েডের সামনের পুরু অংশ যাতে সিলিয়ারি পেশি (লেন্সের বক্রতা নিয়ন্ত্রণ করে উপযোজন ঘটায়) এবং সিলিয়ারি প্রসেস থাকে যা পুষ্টিকর অ্যাকুয়াস হিউমার ক্ষরণ করে।
• কনীনিকা বা আইরিশ (Iris): কর্নিয়া ও লেন্সের মাঝে ঝুলন্ত রঙিন পর্দাবিশেষ, যার কেন্দ্রের গোল ছিদ্রটিকে তারা বা পিউপিল (Pupil) বলে। আইরিশের বৃত্তাকার পেশি পিউপিলকে সংকুচিত (উজ্জ্বল আলোয়) এবং অরিও পেশি পিউপিলকে প্রসারিত (মৃদু আলোয়) করে আলো প্রবেশের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
রক্ত সংবহন, আলোর প্রতিফলন রোধ, লেন্সের উপযোজন এবং চোখের আলো নিয়ন্ত্রণ।
৩. অভ্যন্তরীণ রেটিনা (Retina)চোখের সবচেয়ে ভেতরের সংবেদী স্নায়বিক পর্দা। বাইরে থেকে ভেতরের দিকে তিনটি কোষীয় স্তরে বিন্যস্ত:
১. ফটোরিসেপ্টর স্তর: এতে প্রায় ১২ কোটি রড কোষ (রডপসিন রঞ্জকযুক্ত, মৃদু আলোয় ধূসর অস্পষ্ট দর্শনে সহায়ক) এবং ৬০ লক্ষ কোন কোষ (আইওডপসিনযুক্ত, উজ্জ্বল আলোয় স্পষ্ট বর্ণ দর্শনে সহায়ক) থাকে।
২. দ্বিমেরু বা বাইপোলার কোষ স্তর: ফটোরিসেপ্টর থেকে সংকেত গ্রহণকারী মধ্যবর্তী আন্তঃনিউরোন।
৩. গ্যাংলিয়ন কোষ স্তর: এর অ্যাক্সনগুলি একত্রিত হয়ে অপ্টিক নার্ভ গঠন করে।
• বিশেষ স্থানসমূহ:
- পীতবিন্দু (Macula Lutea & Fovea Centralis): অক্ষিগোলকের পেছনের কেন্দ্রে অবস্থিত হলুদ বিন্দু যার কেন্দ্রে ফোভিয়া অবস্থিত। এখানে শুধুমাত্র ঘন সন্নিবিষ্ট কোন কোষ থাকে; এটি চোখের সর্বাধিক স্পষ্ট প্রতিবিম্ব ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির স্থান।
- অন্ধবিন্দু (Blind Spot / Optic Disc): পীতবিন্দুর সামান্য পাশে যেখান দিয়ে অপ্টিক স্নায়ু চোখ থেকে বের হয়। এখানে কোনো রড বা কোন কোষ থাকে না, ফলে কোনো প্রতিবিম্ব গঠিত হয় না।
আলোক সংবেদ গ্রহণ, তড়িৎ সংকেতে রূপান্তর এবং অপ্টিক স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রেরণ।
২. অক্ষিকক্ষ ও দৃষ্টির আলোক-রাসায়নিক মেকানিজম (Wald's Visual Cycle)
  • অ্যাকুয়াস ও ভিট্রিয়াস হিউমার: লেন্সের সামনের প্রকোষ্ঠে জলীয় অ্যাকুয়াস হিউমার থাকে যা ক্যানাল অব শ্লেম দিয়ে শিরায় নিষ্কাশিত হয় (এটি অবরুদ্ধ হলে ইন্ট্রাঅকুলার চাপ বেড়ে গ্লুকোমা রোগ হয়)। লেন্সের পেছনের বৃহত্ প্রকোষ্ঠে জেলির মতো স্বচ্ছ ভিট্রিয়াস হিউমার থাকে যা রেটিনাকে যথাস্থানে চেপে রাখে।
দৃষ্টির রাসায়নিক কৌশল:
১. রডপসিন রঞ্জক মূলত অপসিন (Opsin) প্রোটিন এবং ভিটামিন A-এর অ্যালডিহাইড জাতক ১১-সিস রেটিন্যাল (11-cis Retinal) নিয়ে গঠিত।
২. আলোকরশ্মি রেটিনায় আপতিত হলে ১১-সিস রেটিন্যাল রূপান্তরিত হয়ে অল-ট্রান্স রেটিন্যাল (all-trans retinal)-এ পরিণত হয় এবং অপসিন থেকে আলাদা হয়ে যায় (ব্লিচিং)।
৩. অপসিনের গঠনে পরিবর্তন ঘটে, যা ট্রান্সডিউসিন G-প্রোটিনকে সক্রিয় করে cGMP ফসফোডাইএস্টারেজ চালু করে।
৪. সাইটোপ্লাজমে cGMP ভেঙে গেলে Na+ চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায়, ফলে ফটোরিসেপ্টর পর্দা হাইপারপোলারাইজড (-৭০ mV) হয়।
৫. এর ফলে অবদমক গ্লুটামেট ক্ষরণ বন্ধ হয় এবং বাইপোলার ও গ্যাংলিয়ন কোষে অ্যাকশন পটেনশিয়াল তৈরি হয়ে ২য় করোটিক স্নায়ু (অপ্টিক নার্ভ) দিয়ে অক্সিপিটাল লোবের দর্শন কেন্দ্রে পৌঁছালে আমরা দেখতে পাই।
৩. মানব কর্ণের (Human Ear) পুঙ্খানুপুঙ্খ শারীরস্থান ও শ্রবণ কৌশল

মানব কর্ণ শ্রবণ এবং দেহের ভারসাম্য রক্ষার যুগল কাজ সম্পাদন করে। এটি তিনটি অংশে গঠিত:

১. বহিঃকর্ণ (External Ear):
• পিনা বা কর্ণছত্র: স্থিতিস্থাপক তরুণাস্থির তৈরি অংশ যা শব্দতরঙ্গ সংগ্রহ করে।
• বহিঃকর্ণকুহর (External Auditory Meatus): এস-আকৃতির নালী যাতে মোম ক্ষরণকারী সেরুমিনাস গ্রন্থি থাকে যা ধূলিকণা আটকায়।
• কর্ণপটহ (Tympanic Membrane): মধ্যকর্ণ ও বহিঃকর্ণের সংযোগস্থলে অবস্থিত টানটান পর্দা যা শব্দতরঙ্গে কেঁপে ওঠে।
২. মধ্যকর্ণ (Middle Ear):
বায়ুপূর্ণ প্রকোষ্ঠ যা ইউস্টেশিয়ান নালী দ্বারা গলবিলের সাথে যুক্ত থেকে কানের ভেতরের ও বাইরের বায়ুচাপ সমান রাখে।
• তিনটি ক্ষুদ্র কর্ণাস্থি (Ear Ossicles): এরা লিভারের মতো কাজ করে শব্দতরঙ্গকে প্রায় ২০–২২ গুণ বিবর্ধিত করে:
- ম্যালিয়াস (Malleus - হাতুড়ি আকৃতি): কর্ণপটহের সাথে যুক্ত থাকে।
- ইনকাস (Incus - নেহাই আকৃতি): ম্যালিয়াস ও স্টেপিসের মাঝে থাকে।
- স্টেপিস (Stapes - রেকাব আকৃতি): মানবদেহের ক্ষুদ্রতম অস্থি, যার পাদদেশ অন্তকর্ণের ডিম্বাকার গবাক্ষ (Oval Window / Fenestra Ovalis)-এর পর্দায় আটকানো থাকে। নিচে অতিরিক্ত চাপ মুক্ত করার জন্য গোলাকার গবাক্ষ (Round Window) থাকে।
৩. অন্তকর্ণ বা ল্যাবিরিন্থ (Internal Ear):
বাইরে অস্থিময় ল্যাবিরিন্থ (যাতে পেরিলিম্ফ থাকে) এবং ভেতরে ঝিল্লিময় ল্যাবিরিন্থ (যাতে K+ সমৃদ্ধ এন্ডোলিম্ফ থাকে)। দুটি অংশে বিভক্ত:

ক. ককলিয়া (শ্রবণাঙ্গ):
• শামুকের খোলের মতো পেঁচানো (২¾ পাক) নালী যা রাইসনার্স ও বেসিলার পর্দা দ্বারা তিনটি নালীতে বিভক্ত: স্কালা ভেস্টিবুলি (উপরে, পেরিলিম্ফ), স্কালা মিডিয়া (মাঝে, এন্ডোলিম্ফ) এবং স্কালা টিম্প্যানি (নিচে, পেরিলিম্ফ)।
• অর্গান অব কর্টি (Organ of Corti): বেসিলার পর্দার উপর অবস্থিত শ্রবণের মূল সংবেদী অঙ্গ। এতে সারিবদ্ধ রোমযুক্ত সংবেদী কোষ (Hair cells) থাকে যার রোমগুলি উপরের জেলি সদৃশ টেকটোরিয়াল পর্দা (Tectorial Membrane)-কে স্পর্শ করে থাকে।
• শ্রবণ পদ্ধতি: শব্দতরঙ্গ → কর্ণপটহ কম্পন → কর্ণাস্থি দ্বারা বিবর্ধন → ডিম্বাকার গবাক্ষ দিয়ে পেরিলিম্ফে ঢেউ → বেসিলার পর্দার আলোড়ন → রোম কোষের রোমগুলি টেকটোরিয়াল পর্দায় ঘষা খায় → রোম কোষ ডিপোলারাইজড হয়ে গ্লুটামেট ক্ষরণ করে → ৮ম করোটিক স্নায়ু (অডিটরি নার্ভ) দিয়ে টেম্পোরাল লোবের শ্রবণ কেন্দ্রে পৌঁছায়।

খ. ভেস্টিবুলার অ্যাপারেটাস (ভারসাম্য অঙ্গ):
১. অর্ধবৃত্তাকার নালী (Semicircular Canals - গতিশীল ভারসাম্য): তিনটি পরস্পর সমকোণে অবস্থিত নালী। এদের স্ফীত গোড়া বা অ্যাম্পুলা-তে থাকে ক্রিস্টা অ্যাম্পুলারিস যার রোমগুলি জেলাটিনের কিউপোলা-তে গাঁথা থাকে। এটি মাথার ঘূর্ণন ও কৌণিক গতি শনাক্ত করে।
২. ওটোলিথ অঙ্গ - ইউট্রিকল ও স্যাকুল (স্থিতিশীল ভারসাম্য): এদের মধ্যে থাকে ম্যাকুলা নামক সংবেদী খাঁজ, যার উপর ক্যালসিয়াম কার্বনেটের দানাদার ওটোলিথ (Otoliths / Statoconia) থাকে। এটি মাধ্যাকর্ষণ ও সরলরৈখিক ত্বরণ শনাক্ত করে দেহের খাড়া ভঙ্গি বজায় রাখে।

গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক তত্ত্ব, পথ ও সংজ্ঞাসমূহ

নার্নস্ট সাম্যাবস্থা বিভব সমীকরণ
$$E_{K^+} ≈ -৯০ mV, E_{Na^+} ≈ +৬০ mV$$
বিশ্রামাবস্থায় অ্যাক্সোলেমা K+ এর জন্য সর্বাধিক ভেদ্য হওয়ায় বিশ্রাম বিভব (-৭০ mV) EK (-৯০ mV)-এর খুব কাছাকাছি থাকে।
অ্যাকশন পটেনশিয়াল ভোল্টেজ গতিপ্রকৃতি সংকেত
$$ V_{spike} = ১০০ mV (-৭০ mV থেকে +৩০ mV)$$
সম্পূর্ণ একটি অ্যাকশন পটেনশিয়াল সম্পন্ন হতে মাত্র ১ থেকে ২ মিলি-সেকেন্ড সময় লাগে।
সোডিয়াম-পটাশিয়াম পাম্পের স্টোইকিওমেট্রি
$$৩ Na^+_{বহির্গমন} : ২ K^+_{অন্তঃপ্রবেশ} : ১ ATP$$
মানব মস্তিষ্কে উৎপন্ন মোট শক্তির প্রায় ৪০% ব্যয় হয় এই সোডিয়াম-পটাশিয়াম পাম্প পরিচালনায়।
মায়েলিনযুক্ত স্নায়ুতন্তুর বেগ বৃদ্ধির সূত্র
$$v_{সর্বোচ্চ} ≈ ১২০ মিটার/সেকেন্ড (২০\ ব্যাসের স্নায়ুতন্তুতে)$$
মায়েলিনবিহীন তন্তুতে বেগ ব্যাসের বর্গমূলের সমানুপাতিক হওয়ায় গতিবেগ ২ মি/সেকেন্ডের নিচে সীমাবদ্ধ থাকে।
মধ্যকর্ণের শব্দ বিবর্ধন গুণক অনুপাত
$$বিবর্ধন গুণক ≈ ২০ থেকে ২২ গুণ$$
এই বিবর্ধন না থাকলে বায়বীয় শব্দতরঙ্গের ৯৯.৯% শক্তি অন্তকর্ণের তরলের পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়ে নষ্ট হতো।
মস্তিষ্ক-সুষুম্না রস (CSF) আয়তনিক ভারসাম্য
$$দৈনিক নবীকরণ = {৫০০ মিলি দৈনিক ক্ষরণ}{১৫০ মিলি ধারণক্ষমতা} ≈ ৩.৩ থেকে ৩.৫ বার প্রতি দিন$$
স্বাভাবিক বিশ্রামাবস্থায় সাব-অ্যারাকনয়েড স্থানে CSF-এর চাপ থাকে ৭০ থেকে ১৮০ মিমি জলস্তম্ভ।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
(ক) স্নায়ুতন্তুর বিশ্রাম বিভব (-৭০ mV) এবং অ্যাকশন পটেনশিয়ালের ডিপোলারাইজেশন সৃষ্টির আয়নীয় কারণগুলি ব্যাখ্যা করো। (খ) রাসায়নিক সাইন্যাপ্সে স্নায়ু স্পন্দন পরিবহন সর্বদা একমুখী হয় কেন? [৩ + ২ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) বিশ্রাম বিভব ও ডিপোলারাইজেশনের আয়নীয় কারণ: [৩ নম্বর]
১. বিশ্রাম বিভব (-৭০ mV) সৃষ্টি:
- বিশ্রামাবস্থায় অ্যাক্সোপ্লাজমে K+-এর ঘনত্ব বেশি (~১৪০ mM) এবং বহিঃস্থ তরলে Na+-এর ঘনত্ব বেশি (~১৪৫ mM) থাকে।
- অ্যাক্সোলেমায় K+ লিক চ্যানেল খোলা থাকায় পর্দা Na+-এর তুলনায় K+-এর জন্য ২০–৩০ গুণ বেশি ভেদ্য হয়, ফলে K+ বাইরে বেরিয়ে যায়।
- অ্যাক্সোপ্লাজমের বৃহৎ ঋণাত্মক প্রোটিন পর্দা ভেদ করতে পারে না, ফলে ভেতরে ঋণাত্মক আধান বাড়ে।
- Na+/K+ পাম্প ৩টি Na+ বাইরে বের করে এবং ২টি K+ ভেতরে এনে -৭০ mV বিভব স্থির রাখে।
২. ডিপোলারাইজেশন (+৩০ mV) সৃষ্টি:
- উদ্দীপনা থ্রেশহোল্ড বিভব (-৫৫ mV)-এ পৌঁছালে ভোল্টেজ-গেটেড Na+ চ্যানেলগুলি দ্রুত খুলে যায়।
- বিদ্যুৎ গতিতে বিপুল পরিমাণ Na+ আয়ন কোষের ভেতরে প্রবেশ করে K+ নির্গমনকে ছাপিয়ে যায়, ফলে অভ্যন্তরীণ বিভব দ্রুত ধনাত্মক হয়ে +৩০ mV-এ পৌঁছায়।

(খ) রাসায়নিক সাইন্যাপ্সে একমুখী পরিবহনের কারণ: [২ নম্বর]
১. নিউরোট্রান্সমিটার পূর্ণ সাইন্যাপটিক ভেসিকল এবং Ca2+ চ্যানেল কেবলমাত্র প্রিসাইনাপটিক নবে উপস্থিত থাকে।
২. অন্যদিকে, নির্দিষ্ট নিউরোট্রান্সমিটারের সাথে যুক্ত হওয়ার গ্রাহক বা রিসেপ্টর প্রোটিনগুলি কেবলমাত্র পোস্টসাইনাপটিক পর্দায় থাকে।
৩. তাই সংকেত কেবল প্রিসাইনাপটিক নব থেকে ভেসিকল ক্ষরণ → ক্লেফট অতিক্রম → পোস্টসাইনাপটিক গ্রাহকে বন্ধন—এই নির্দিষ্ট পথেই একমুখীভাবে প্রবাহিত হতে পারে।
উদাহরণ 2
(ক) তড়িৎ সাইন্যাপ্স এবং রাসায়নিক সাইন্যাপ্সের মধ্যে তিনটি প্রধান গঠনগত ও শারীরবৃত্তীয় পার্থক্য সারণিবদ্ধ করো। (খ) সাইন্যাপ্সে উদ্দীপনা প্রেরণে ক্যালসিয়াম আয়ন (Ca2+) এবং ভেসিকল নিঃসরণের ভূমিকা আলোচনা করো। [৩ + ২ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) তড়িৎ বনাম রাসায়নিক সাইন্যাপ্স: [৩ নম্বর]
বৈশিষ্ট্যতড়িৎ সাইন্যাপ্স (Electrical)রাসায়নিক সাইন্যাপ্স (Chemical)
ক্লেফটের দূরত্বপ্রায় নেই বললেই চলে (২–৪ nm); গ্যাপ জংশন দ্বারা সরাসরি যুক্তসুস্পষ্ট তরলপূর্ণ সাইন্যাপটিক ক্লেফট থাকে (২০–৩০ nm)
সঞ্চালন মাধ্যমআয়নসমূহ সরাসরি ছিদ্র দিয়ে প্রবাহিত হয়রাসায়নিক নিউরোট্রান্সমিটার (ACh, GABA) দ্বারা পরিবাহিত হয়
বিলম্ব ও দিকমুখিতাবিলম্ব নেই (<০.১ ms); দ্বিমুখী পরিবহন হতে পারেসাইন্যাপটিক বিলম্ব থাকে (০.৫–১.০ ms); কঠোরভাবে একমুখী

(খ) Ca2+ এবং ভেসিকল নিঃসরণের ভূমিকা: [২ নম্বর]
১. ক্যালসিয়াম প্রবেশ: অ্যাকশন পটেনশিয়াল প্রিসাইনাপটিক নবে পৌঁছালে ডিপোলারাইজেশনের ফলে ভোল্টেজ-গেটেড Ca2+ চ্যানেল খুলে যায় এবং Ca2+ নবের ভেতরে ঢোকে।
২. ভেসিকল নিঃসরণ: Ca2+ ভেসিকলের সাইন্যাপ্টোট্যাগমিনের সাথে যুক্ত হয়ে SNARE কমপ্লেক্স সক্রিয় করে। ফলে ভেসিকলগুলি প্রিসাইনাপটিক পর্দার সাথে মিশে গিয়ে এক্সোসাইটোসিস পদ্ধতিতে নিউরোট্রান্সমিটার ক্লেফটে মুক্ত করে।
উদাহরণ 3
(ক) জানু-ঝাঁকুনি বা নি-জার্ক (Knee-jerk) প্রতিবর্ত চাপের বিভিন্ন উপাদান ক্রমানুসারে লেখো। (খ) নি-জার্ক প্রতিবর্তকে কেন মনোসাইন্যাপটিক বলা হয় এবং আগুনে হাত লাগলে হাত সরানোর প্রতিবর্ত কেন পলিসাইন্যাপটিক? [৩ + ২ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) নি-জার্ক প্রতিবর্ত চাপের উপাদানসমূহ: [৩ নম্বর]
হাঁটুর প্যাজেলার টেন্ডনে আলতো আঘাত করলে নিম্নোক্ত পথে প্রতিবর্ত সম্পন্ন হয়:
১. গ্রাহক: কোয়াড্রিসেপ্স পেশির মধ্যে থাকা পেশি স্পিন্ডল (Muscle Spindle) টান অনুভব করে সংকেত তৈরি করে।
২. সংজ্ঞাবহ নিউরোন (Afferent): সংবেদী স্নায়ুতন্তু স্পন্দনকে মেরুরজ্জুর ডরসাল রুট গ্যাংলিয়ন (L3–L4) হয়ে ধূসর বস্তুতে নিয়ে আসে।
৩. সমন্বয় কেন্দ্র: মেরুরজ্জুর পৃষ্ঠীয় শৃঙ্গে সংবেদী নিউরোন সরাসরি মোটর নিউরোনের সাথে সাইন্যাপ্স তৈরি করে।
৪. আজ্ঞাবহ নিউরোন (Efferent): সুষুম্নাকাণ্ডের অঙ্কীয় শৃঙ্গের মোটর নিউরোন ফিমোরাল স্নায়ু দিয়ে সংকেত পাঠায়।
৫. কারক: কোয়াড্রিসেপ্স ফিমোরিস পেশি সংকুচিত হয়ে পা সামনের দিকে ছিটকে ওঠে।

(খ) মনোসাইন্যাপটিক বনাম পলিসাইন্যাপটিক: [২ নম্বর]
১. নি-জার্ক (মনোসাইন্যাপটিক): সংজ্ঞাবহ সেন্সরি নিউরোন এবং আজ্ঞাবহ মোটর নিউরোনের মাঝে কোনো আন্তঃনিউরোন (Interneuron) থাকে না; একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সাইন্যাপ্স জড়িত থাকে।
২. হাত সরানোর প্রতিবর্ত (পলিসাইন্যাপটিক): ব্যথাদায়ক উদ্দীপনায় সংজ্ঞাবহ নিউরোন ও মোটর নিউরোনের মাঝে এক বা একাধিক আন্তঃনিউরোন যুক্ত থাকে, যা ফ্লেক্সর পেশিকে সংকুচিত এবং এক্সটেনসরকে শিথিল (পারস্পরিক নিবারণ) করে একাধিক সাইন্যাপ্স তৈরি করে।
উদাহরণ 4
(ক) মানব মস্তিষ্কের তিনটি প্রধান খণ্ডের নাম লেখো এবং গুরুমস্তিষ্ক, হাইপোথ্যালামাস, লঘুমস্তিষ্ক ও সুষুম্নাশীর্ষকের একটি করে প্রধান কাজ উল্লেখ করো। (খ) লিম্বিক তন্ত্র কী কী অংশ নিয়ে গঠিত এবং এর প্রধান ভূমিকা কী? [৩ + ২ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) মস্তিষ্কের খণ্ড ও নির্দিষ্ট কাজ: [৩ নম্বর]
মস্তিষ্কের তিনটি প্রধান খণ্ড: অগ্রমস্তিষ্ক (Forebrain), মধ্যমস্তিষ্ক (Midbrain), এবং পশ্চাৎমস্তিষ্ক (Hindbrain)।
১. গুরুমস্তিষ্ক (Cerebrum): চিন্তা, বুদ্ধি, স্মৃতি, সচেতন সংবেদন গ্রহণ ও ঐচ্ছিক পেশির সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করে।
২. হাইপোথ্যালামাস: দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী থার্মোস্ট্যাট, ক্ষুধা ও তৃষ্ণা কেন্দ্র এবং পিটুইটারি গ্রন্থির হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে।
৩. লঘুমস্তিষ্ক (Cerebellum): দেহের ভারসাম্য ও সমতা রক্ষা, হাঁটাচলার সমন্বয় এবং পেশির টান নিয়ন্ত্রণ করে।
৪. সুষুম্নাশীর্ষক (Medulla Oblongata): শ্বাসক্রিয়ার ছন্দ, হৃদস্পন্দনের হার, রক্তচাপ এবং কাশি, বমি ও গিলন প্রতিবর্ত নিয়ন্ত্রণ করে।

(খ) লিম্বিক তন্ত্রের গঠন ও ভূমিকা: [২ নম্বর]
১. গঠন: এটি মস্তিষ্কের গভীরে অবস্থিত সেরিব্রাম ও ডায়েনসেফালনের সংযোগকারী বলয়, যা প্রধানত হিপ্পোক্যাম্পাস, অ্যামিগডালা এবং হাইপোথ্যালামাসের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত।
২. ভূমিকা: একে "আবেগী মস্তিষ্ক" (Emotional Brain) বলা হয়; এটি রাগ, ভয়, আনন্দ, যৌন অনুভূতি ও প্রেরণা নিয়ন্ত্রণ করে এবং হিপ্পোক্যাম্পাসের মাধ্যমে নতুন স্মৃতিকে স্থায়ী স্মৃতিতে রূপান্তরিত করে।
উদাহরণ 5
(ক) মানব রেটিনার তিনটি কোষীয় স্তরের নাম বাইরে থেকে ভেতরের দিকে সাজিয়ে লেখো। (খ) আলোকের উপস্থিতিতে রড কোষে দৃষ্টির আলোক-রাসায়নিক চক্রটি (Wald's Visual Cycle) ব্যাখ্যা করো। [৩ + ২ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) রেটিনার তিনটি কোষীয় স্তর: [৩ নম্বর]
রেটিনার কলাস্থানিক স্তরগুলি বাইরে (কোরয়েডের দিক) থেকে ভেতরের (ভিট্রিয়াসের দিক) দিকে সাজালে নিম্নরূপ:
১. ফটোরিসেপ্টর স্তর (Photoreceptors): রড কোষ (রডপসিনযুক্ত, মৃদু আলোয় দৃষ্টি) এবং কোন কোষ (আইওডপসিনযুক্ত, উজ্জ্বল আলো ও বর্ণ দর্শন)।
২. দ্বিমেরু বা বাইপোলার কোষ স্তর (Bipolar Cells): মধ্যবর্তী সংবেদী নিউরোন যা ফটোরিসেপ্টর ও গ্যাংলিয়নের মাঝে সংকেত বিনিময় করে।
৩. গ্যাংলিয়ন কোষ স্তর (Ganglion Cells): সবচেয়ে ভেতরের স্তর যার দীর্ঘ অ্যাক্সনগুলি একত্রিত হয়ে অপ্টিক নার্ভ গঠন করে।

(খ) দৃষ্টির আলোক-রাসায়নিক কৌশল: [২ নম্বর]
১. ব্লিচিং: রডপসিন গঠিত হয় অপসিন প্রোটিন ও ১১-সিস রেটিন্যাল দিয়ে। আলো পড়লে ১১-সিস রেটিন্যাল পরিবর্তিত হয়ে অল-ট্রান্স রেটিন্যালে পরিণত হয় এবং অপসিন থেকে আলাদা হয়ে যায়।
২. হাইপারপোলারাইজেশন: মুক্ত অপসিন ট্রান্সডিউসিন ও cGMP ফসফোডাইএস্টারেজ উৎসেচক সক্রিয় করে। কোষের cGMP ভেঙে যাওয়ায় Na+ চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায় এবং কোষপর্দা হাইপারপোলারাইজড (-৭০ mV) হয়।
৩. সংকেত প্রেরণ: অবদমক গ্লুটামেট ক্ষরণ বন্ধ হওয়ায় বাইপোলার ও গ্যাংলিয়ন কোষে অ্যাকশন পটেনশিয়াল তৈরি হয় যা অপ্টিক স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কের দর্শন কেন্দ্রে যায়।
উদাহরণ 6
(ক) পিনা থেকে শুরু করে মস্তিষ্কের শ্রবণ কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত শব্দতরঙ্গ পরিবহনের সম্পূর্ণ পথটি লেখো। (খ) অন্তকর্ণের গতিশীল ভারসাম্য ও স্থিতিশীল ভারসাম্য অঙ্গের মধ্যকার দুটি প্রধান পার্থক্য লেখো। [২.৫ + ২.৫ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) শব্দতরঙ্গ পরিবহনের সম্পূর্ণ গতিপথ: [২.৫ নম্বর]
১. শব্দ সংগ্রহ: পিনা শব্দ সংগ্রহ করে বহিঃকর্ণকুহর দিয়ে পাঠায় এবং কর্ণপটহ কেঁপে ওঠে।
২. বিবর্ধন: কর্ণাস্থি ত্রয়ী (ম্যালিয়াস → ইনকাস → স্টেপিস) কম্পনকে প্রায় ২০ গুণ বিবর্ধিত করে।
৩. তরলে আলোড়ন: স্টেপিস ডিম্বাকার গবাক্ষ-এ আঘাত করে ককলিয়ার স্কালা ভেস্টিবুলির পেরিলিম্ফে তরল তরঙ্গ সৃষ্টি করে।
৪. রোম কোষ উদ্দীপনা: পেরিলিম্ফের ঢেউ বেসিলার পর্দাকে আলোড়িত করে, ফলে অর্গান অব কর্টি-র রোম কোষগুলি টেকটোরিয়াল পর্দায় ঘষা খায় এবং ডিপোলারাইজড হয়ে গ্লুটামেট ক্ষরণ করে।
৫. মস্তিষ্কে পৌঁছানো: অডিটরি স্নায়ু (৮ম করোটিক স্নায়ু) দিয়ে স্পন্দন মস্তিষ্কের টেম্পোরাল লোবের শ্রবণ কেন্দ্রে পৌঁছালে শ্রবণ অনুভূত হয়।

(খ) গতিশীল বনাম স্থিতিশীল ভারসাম্য অঙ্গ: [২.৫ নম্বর]
বৈশিষ্ট্যগতিশীল ভারসাম্য অঙ্গস্থিতিশীল ভারসাম্য অঙ্গ
সংবেদী অঙ্গের নামতিনটি অর্ধবৃত্তাকার নালীর অ্যাম্পুলায় অবস্থিত ক্রিস্টা অ্যাম্পুলারিসওটোলিথ অঙ্গের (ইউট্রিকল ও স্যাকুল) মধ্যে অবস্থিত ম্যাকুলা
গঠনগত বৈশিষ্ট্যরোম কোষগুলি জেলি সদৃশ কিউপোলা-তে গাঁথা থাকে; ওটোলিথ থাকে নারোম কোষগুলির উপর ক্যালসিয়াম কার্বনেটযুক্ত ওটোলিথ বা স্ট্যাটোকনিয়া স্ফটিক থাকে
শনাক্তকরণ কাজমাথার ঘূর্ণন ও কৌণিক গতি শনাক্ত করে চলাফেরায় ভারসাম্য রাখেমাধ্যাকর্ষণ ও সরলরৈখিক গতি শনাক্ত করে দেহের স্থির ভঙ্গি বজায় রাখে

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

অ্যাবসলিউট রিফ্র্যাক্টরি পিরিয়ডের সময় অ্যাক্সন হাইপারপোলারাইজড থাকে বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অ্যাবসলিউট রিফ্র্যাক্টরি পিরিয়ড ঘটে ডিপোলারাইজেশন ও আর্লি রিপোলারাইজেশনের সময় যখন Na+ চ্যানেলগুলি ইতিমধ্যেই খোলা বা নিষ্ক্রিয় ও লকড থাকে। হাইপারপোলারাইজেশন (-৮৫ mV) ঘটে রিলেটিভ রিফ্র্যাক্টরি পিরিয়ডের সময়, যখন অতি-তীব্র উদ্দীপনায় দ্বিতীয় স্পন্দন সৃষ্টি সম্ভব।

সাধারণ ভুল ধারণা

অলিগোডেনড্রোসাইট এবং সোয়ান কোষের অবস্থান গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

দুটি কোষই মায়েলিন সিথ তৈরি করে, কিন্তু অলিগোডেনড্রোসাইট তৈরি করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে (CNS - মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ড) এবং সোয়ান কোষ তৈরি করে প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রে (PNS - প্রান্তীয় স্নায়ু)।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে চোখের অন্ধবিন্দুতে কেবল রড কোষ থাকে।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অন্ধবিন্দু বা অপ্টিক ডিস্কে কোনো ফটোরিসেপ্টর কোষই থাকে না—না রড, না কোন। এখান দিয়ে অপ্টিক স্নায়ু বের হয় ও রক্তনালী ঢোকে, তাই এটি সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন।

সাধারণ ভুল ধারণা

বিশ্বাস করা যে শব্দতরঙ্গ ককলিয়ার ভেতরে বিবর্ধিত হয়।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

শব্দচাপের ভৌত বিবর্ধন (২০–২২ গুণ) ঘটে মধ্যকর্ণে কর্ণাস্থি ত্রয়ীর লিভার ক্রিয়ার মাধ্যমে। ককলিয়া বিবর্ধন করে না, এটি তরঙ্গের কম্পাঙ্ক বিশ্লেষণ ও যান্ত্রিক সংকেতকে স্নায়ু তাড়নায় রূপান্তর করে।

সাধারণ ভুল ধারণা

কর্পোরা কোয়াড্রিজেমিনার সুপিরিয়র ও ইনফিরিয়র কলিকুলির কাজ গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

উর্ধ্বস্থ সুপিরিয়র কলিকুলি দুটি দৃষ্টি প্রতিবর্ত (Visual reflex) নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিম্নস্থ ইনফিরিয়র কলিকুলি দুটি শ্রবণ প্রতিবর্ত (Auditory reflex) নিয়ন্ত্রণ করে।

চিত্রগত ব্যাখ্যা ও মডেল

WBCHSE একাদশ শ্রেণি • জীববিজ্ঞান একক ৫: মানব শারীরবিদ্যা • অধ্যায় ১৯ স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় — নিউরোন, মস্তিষ্ক ও জ্ঞানেন্দ্রিয়ের শারীরস্থান ১. নিউরোন গঠন ও নার্ভ স্পন্দন পরিবহন সoma, অ্যাক্সন, মায়েলিন ও অ্যাকশন পটেনশিয়াল কোষদেহ (সোমা) + নিসল দানা র‍্যানভিয়ারের পর্ব (লম্ফ সঞ্চালন) মায়েলিন সিথ (সোয়ান কোষ) প্রান্তীয় নব (নিউরোট্রান্সমিটার) Saltatory Direction (100 m/s) অ্যাক্সন হিলক (উদ্দীপনা কেন্দ্র) অ্যাকশন পটেনশিয়াল ভোল্টেজ ট্রেস: +30 mV 0 mV -55 mV -70 mV -90 mV • বিশ্রাম বিভব (-৭০ mV) • ডিপোলারাইজেশন (+৩০ mV) [Na+ প্রবেশ] • রিপোলারাইজেশন [K+ নির্গমন] • Na+/K+ পাম্প: ৩ Na+ বাইরে : ২ K+ ভেতরে ২. সাইন্যাপ্স ও মানব মস্তিষ্কের গঠন নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র রাসায়নিক সাইন্যাপটিক জাংশন (২০ nm ফাঁক) Ca2+ Ca2+ 20 nm Cleft Ca2+ প্রবেশ ও ভেসিকল নিঃসরণ নিউরোট্রান্সমিটার (ACh) গ্রাহকে বন্ধন মানব মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জু (CNS): • অগ্রমস্তিষ্ক: গুরুমস্তিষ্ক (Cerebrum) • কর্পাস ক্যালোসাম (যোজক স্নায়ুরজ্জু) • থ্যালামাস (রিলে কেন্দ্র) + হাইপোথ্যালামাস • মধ্যমস্তিষ্ক: কর্পোরা কোয়াড্রিজেমিনা • পনস (শ্বসন কেন্দ্র) + সুষুম্নাশীর্ষক (Medulla) & লঘুমস্তিষ্ক (Cerebellum - ভারসাম্য) ৩. দৃষ্টি ও শ্রবণ সংবেদী অঙ্গের গঠন অক্ষিগোলক ও কর্ণের অভ্যন্তরীণ গঠন মানব নেত্রগোলকের লম্বচ্ছেদ: Cornea Lens Fovea Optic Nerve রেটিনা (রড ও কোন কোষ স্তর) মানব কর্ণের অন্তর্বিন্যাস ও ককলিয়া: CN VIII • Tympanum (Eardrum) • কর্ণাস্থি: ম্যালিয়াস, ইনকাস, স্টেপিস • ককলিয়া (অর্গান অব কর্টি - শ্রবণ) • অর্ধবৃত্তাকার নালী (স্থিতি ও ভারসাম্য) TargetExams • WBCHSE একাদশ জীববিজ্ঞান

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
মানব স্নায়ুতন্ত্র কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জু) এবং প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্র (১২ জোড়া করোটিক ও ৩১ জোড়া সুষুম্না স্নায়ু)-এ বিভক্ত; কার্যকরীভাবে সোম্যাটিক ও অটোনমিক (সিমপ্যাথেটিক ও প্যারাসিমপ্যাথেটিক)।
মূল বিষয় 2
নিউরোনের মূল অংশ: কোষদেহ (নিসল দানাযুক্ত), গ্রাহক ডেনড্রাইট এবং পরিবাহক অ্যাক্সন যা অ্যাক্সন হিলক থেকে শুরু হয়ে সাইন্যাপটিক নবে শেষ হয়।
মূল বিষয় 3
বিশ্রাম বিভব (-৭০ mV) পর্দার অসম ভেদ্যতা (K+ >> Na+) এবং সক্রিয় Na+/K+ এটিপিয়েজ পাম্প (৩টি Na+ বাইরে : ২টি K+ ভেতরে) দ্বারা সার্বক্ষণিক বজায় থাকে।
মূল বিষয় 4
অ্যাকশন পটেনশিয়াল সৃষ্টি: থ্রেশহোল্ড বিভব (-৫৫ mV)-এ ভোল্টেজ-গেটেড Na+ চ্যানেল খুলে তীব্র Na+ প্রবেশে ডিপোলারাইজেশন (+৩০ mV) ঘটে; এরপর K+ নির্গমনে রিপোলারাইজেশন হয়।
মূল বিষয় 5
মায়েলিনযুক্ত স্নায়ুতন্তুতে মায়েলিনের অন্তরক ক্ষমতার জন্য এক র‍্যানভিয়ারের পর্ব থেকে অন্য পর্বে লাফিয়ে অতি দ্রুত (১০০–১২০ মি/সে) লম্ফ সঞ্চালন (Saltatory conduction) ঘটে।
মূল বিষয় 6
রাসায়নিক সাইন্যাপ্সে ২০ nm ক্লেফট থাকে; Ca2+ প্রবেশের ফলে ভেসিকল থেকে নিউরোট্রান্সমিটার (ACh, GABA) মুক্ত হয়ে পরবর্তী পর্দায় EPSP বা IPSP সৃষ্টি করে।
মূল বিষয় 7
মস্তিষ্ক তিন খণ্ডে বিভক্ত: অগ্রমস্তিষ্ক (গুরুমস্তিষ্ক, কর্পাস ক্যালোসাম, থ্যালামাস, হাইপোথ্যালামাস, লিম্বিক তন্ত্র), মধ্যমস্তিষ্ক (কর্পোরা কোয়াড্রিজেমিনা), এবং পশ্চাৎমস্তিষ্ক (পনস, লঘুমস্তিষ্ক, সুষুম্নাশীর্ষক)।
মূল বিষয় 8
প্রতিবর্ত চাপ হলো স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়ার পথ: গ্রাহক -> সংজ্ঞাবহ নিউরোন -> মেরুরজ্জুর কেন্দ্র -> আজ্ঞাবহ মোটর নিউরোন -> কারক অঙ্গ।
মূল বিষয় 9
চক্ষুর তিনটি স্তর: তন্তুময়, রক্তক ও রেটিনা; রেটিনায় রড ও কোন কোষ থাকে; আলো পড়লে ১১-সিস রেটিন্যাল ও অপসিন আলাদা হয়ে হাইপারপোলারাইজেশনের মাধ্যমে দর্শন অনুভূতি জাগায়।
মূল বিষয় 10
কর্ণের মধ্যকর্ণের অস্থি ত্রয়ী শব্দ ২০ গুণ বিবর্ধিত করে, ককলিয়ার অর্গান অব কর্টি শব্দতরঙ্গ বিশ্লেষণ করে, এবং অর্ধবৃত্তাকার নালীর ক্রিস্টা (গতিশীল) ও ওটোলিথ ম্যাকুলা (স্থিতিশীল) ভারসাম্য রাখে।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
নিসল দানা কী, নিউরোনের কোথায় এদের পাওয়া যায় এবং কোথায় এরা সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত থাকে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: নিসল দানা হলো রাইবোজোম সংলগ্ন অমসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলামের ঘন ক্ষারাকর্ষী দানা যা সক্রিয়ভাবে প্রোটিন সংশ্লেষ করে। এরা নিউরোনের কোষদেহ (সোমা) এবং ডেনড্রাইটে প্রচুর পরিমাণে উপস্থিত থাকে, কিন্তু অ্যাক্সন এবং অ্যাক্সনের উৎপত্তিস্থল অ্যাক্সন হিলকে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত থাকে।
2
সোডিয়াম-পটাশিয়াম এটিপিয়েজ পাম্পের পরিবহন অনুপাত কত এবং এটি কীভাবে বিশ্রাম বিভব বজায় রাখে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: Na+/K+ এটিপিয়েজ পাম্প প্রতি অণু এটিপি খরচে ৩টি Na+ আয়নকে অ্যাক্সোপ্লাজম থেকে বাইরে বের করে এবং ২টি K+ আয়নকে ভেতরে প্রবেশ করায় (৩ Na+ বাইরে : ২ K+ ভেতরে)। বাইরে বেশি ধনাত্মক আয়ন পাঠানোয় এটি ভেতরে ঋণাত্মক পরিবেশ বজায় রাখে এবং আয়নের ঘনত্বের নতিমাত্রা স্থিতিশীল রেখে -৭০ mV বিশ্রাম বিভব নিশ্চিত করে।
3
লম্ফ সঞ্চালন বা সল্টেটরি কন্ডাকশন কাকে বলে এবং এর জৈবিক সুবিধা কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: মায়েলিনযুক্ত স্নায়ুতন্তুতে মায়েলিন সিথের অন্তরক ধর্মের কারণে উদ্দীপনার এক র‍্যানভিয়ারের পর্ব থেকে পরবর্তী পর্বে লাফিয়ে লাফিয়ে চলার দ্রুত পদ্ধতিকে লম্ফ সঞ্চালন বলে। এর সুবিধা হলো: এটি স্পন্দনের গতিবেগ ৫০ গুণ বৃদ্ধি করে (১০০–১২০ মি/সেকেন্ড পর্যন্ত) এবং শুধুমাত্র পর্বগুলিতে আয়ন বিনিময় হওয়ায় এটিপি ও বিপাকীয় শক্তির অপচয় ৯০% কমিয়ে দেয়।
4
লিম্বিক তন্ত্র মস্তিষ্কের কোন কোন অংশ নিয়ে গঠিত এবং এটি মানুষের কোন আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: লিম্বিক তন্ত্র মূলত হিপ্পোক্যাম্পাস, অ্যামিগডালা, সিঙ্গুলেট জাইরাস এবং হাইপোথ্যালামাসের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত। একে "আবেগী মস্তিষ্ক" বলে; এটি মানুষের প্রাথমিক আবেগ (ভয়, রাগ, আনন্দ, আক্রমণাত্মক মনোভাব, যৌন অনুভূতি) নিয়ন্ত্রণ করে এবং হিপ্পোক্যাম্পাসের সাহায্যে স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিকে স্থায়ী দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিতে সঞ্চিত করে।
5
রেটিনার পীতবিন্দু (ফোভিয়া) এবং অন্ধবিন্দু (অপ্টিক ডিস্ক)-এর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: পীতবিন্দুর কেন্দ্রে থাকা ফোভিয়া সেন্ট্রালিসে কেবল ঘনসন্নিবিষ্ট কোন কোষ থাকে এবং কোনো রড কোষ থাকে না; এটি চোখের সর্বোচ্চ দৃষ্টি তীক্ষ্ণতা ও সবচেয়ে স্পষ্ট বর্ণ দর্শনের স্থান। অন্যদিকে অন্ধবিন্দু হলো যেখান দিয়ে অপ্টিক স্নায়ু চোখ থেকে বের হয়; এতে রড বা কোন—কোনো ফটোরিসেপ্টরই থাকে না, ফলে এটি সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন স্থান।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 11 Biology — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: সজীব বিশ্ব অধ্যায় 2: জীবের শ্রেণিবিন্যাস অধ্যায় 3: উদ্ভিদ রাজ্য অধ্যায় 4: প্রাণী রাজ্য অধ্যায় 5: সপুষ্পক উদ্ভিদের অঙ্গসংস্থান অধ্যায় 6: সপুষ্পক উদ্ভিদের অন্তর্গঠন অধ্যায় 7: প্রাণীদের গঠনগত সংগঠন অধ্যায় 8: কোষ: জীবনের একক অধ্যায় 9: জৈব অণুসমূহ অধ্যায় 10: কোষ চক্র ও কোষ বিভাজন অধ্যায় 11: উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদে সালোকসংশ্লেষ অধ্যায় 12: উদ্ভিদে শ্বসন অধ্যায় 13: উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও পরিবর্ধন অধ্যায় 14: পরিপাক ও শোষণ অধ্যায় 15: শ্বাসকার্য ও গ্যাসীয় বিনিময় অধ্যায় 16: দেহ তরল ও সংবহন অধ্যায় 17: রেচন পদার্থ ও তাদের নিষ্কাশন অধ্যায় 18: চলন ও গমন অধ্যায় 19: স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় অধ্যায় 20: রাসায়নিক সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।