কোষ হলো সমস্ত সজীব বস্তুর গঠনগত ও কার্যগত একক। কোষবিদ্যার প্রধান ঐতিহাসিক মাইলফলকগুলি হলো:
- রবার্ট হুক (১৬৬৫): কর্কের পাতলা ছেদ পর্যবেক্ষণ করে মৌচাকের মতো খোপ খোপ মৃত কোষ প্রাচীরের কাঠামো লক্ষ্য করেন এবং এদের 'কোষ' (Cell) নামকরণ করেন।
- অ্যান্টনি ভন লিউয়েনহুক (১৬৭৪): সর্বপ্রথম নিজস্ব উন্নত অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সচল জীবন্ত কোষ পর্যবেক্ষণ করেন (ব্যাকটিরিয়া, প্রোটোজোয়া, শুক্রাণু ও লোহিত রক্তকণিকা)।
- রবার্ট ব্রাউন (১৮৩১): অর্কিড পাতার কোষে সর্বপ্রথম সুগঠিত নিউক্লিয়াস আবিষ্কার ও নামকরণ করেন।
- ম্যাথিয়াস শ্লাইডেন (১৮৩৮) ও থিওডোর শ্যোয়ান (১৮৩৯): শ্লাইডেন (জার্মান উদ্ভিদবিদ) প্রমাণ করেন যে সমস্ত উদ্ভিদ বিভিন্ন প্রকার কোষ দ্বারা গঠিত। শ্যোয়ান (জার্মান প্রাণিবিদ) প্রাণীকলায় কোষপর্দা শনাক্ত করেন এবং উদ্ভিদকোষে কোষ প্রাচীর-এর অনন্য উপস্থিতি নির্দেশ করেন। তাঁরা যৌথভাবে ক্লাসিক্যাল কোষ তত্ত্ব (Cell Theory) প্রবর্তন করেন।
- রুডলফ ফিরশভ (১৮৫৫): ল্যাটিন নীতি 'Omnis cellula-e cellula' (পূর্ববর্তী জীবন্ত কোষের বিভাজনের মাধ্যমেই নতুন কোষ সৃষ্টি হয়) প্রস্তাব করে আধুনিক কোষ তত্ত্ব পূর্ণাঙ্গ করেন।
আধুনিক কোষ তত্ত্বের মূল সূত্রগুলি হলো: (১) সমস্ত সজীব জীব এক বা একাধিক কোষ এবং কোষজাত পদার্থ দ্বারা গঠিত। (২) কোষ হলো জীবনের গঠনগত, কার্যগত ও শারীরবৃত্তীয় মৌলিক একক। (৩) পূর্ববর্তী সজীব কোষের বিভাজনের মাধ্যমেই সমস্ত নতুন কোষ উৎপন্ন হয়। (৪) প্রতিটি কোষের মৌলিক রাসায়নিক গঠন এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়া অভিন্ন।
মনেরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত জীবদের (ব্যাকটিরিয়া, সায়ানোব্যাকটিরিয়া, মাইকোপ্লাজমা) প্রোক্যারিয়োটিক কোষ বলা হয়। এদের পর্দাঘেরা অঙ্গাণু ও সুগঠিত নিউক্লিয়াস থাকে না:
- কোষীয় আবরণী (Cell Envelope): একটি নিবিড় তিনস্তরীয় প্রতিরক্ষামূলক আবরণী:
- গ্লাইকোক্যালিক্স: সর্ববহিঃস্থ স্তর; এটি শিথিল মিউসিলেজ যুক্ত হলে স্লাইম স্তর এবং পুরু ও শক্ত হলে ক্যাপসুল গঠন করে (যা রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটিরিয়াকে ফ্যাগোসাইটোসিস থেকে রক্ষা করে)।
- কোষ প্রাচীর: মধ্যবর্তী দৃঢ় স্তর যা পেপটিডোগ্লাইক্যান (মিউরিন) দ্বারা গঠিত; এটি কোষের নির্দিষ্ট আকৃতি রক্ষা করে এবং অভিস্রবণজনিত ফেটে যাওয়া প্রতিরোধ করে।
- প্লাজমা পর্দা: অন্তঃস্থ পছন্দমাফিক ভেদ্য ফসফোলিপিড দ্বি-স্তর যা উপাদানের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে।
- মেসোজোম ও ক্রোমাটোফোর: প্লাজমা পর্দা সাইটোপ্লাজমের ভেতরে প্রবিষ্ট হয়ে থলি, নালিকা বা ল্যামেলা আকারে মেসোজোম গঠন করে। এটি ব্যাকটিরিয়ার কোষীয় শ্বসন, ডিএনএ প্রতিলিপিকরণ, ক্ষরণ এবং কোষ প্রাচীর গঠনে অংশ নেয়। সালোকসংশ্লেষকারী সায়ানোব্যাকটিরিয়ায় রঞ্জকবাহী পর্দার অন্তর্বলনকে ক্রোমাটোফোর বলে।
- জিনগত বস্তু (নিউক্লিঅয়েড): নিউক্লীয় পর্দা ও হিস্টোন প্রোটিনবিহীন একক নগ্ন বৃত্তাকার দ্বিসূত্রী ডিএনএ (dsDNA), যাকে নিউক্লিঅয়েড বা জিনোফোর বলে। এছাড়া বহু ব্যাকটিরিয়ায় মূল ক্রোমোজোমের বাইরে ছোট বৃত্তাকার স্ব-প্রজননশীল ডিএনএ থাকে যাকে প্লাজমিড বলে (যেমন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী R-প্লাজমিড, জনন সহায়ক F-প্লাজমিড)।
- রাইবোজোম: পর্দাশূন্য ৭০এস রাইবোজোম (৫০এস বৃহৎ সাবইউনিট এবং ৩০এস ক্ষুদ্র সাবইউনিট নিয়ে গঠিত)। একটি mRNA অণুর সাথে একাধিক রাইবোজোম যুক্ত হয়ে পলিজোম বা পলিরিবোজোম গঠন করে যা দ্রুত প্রোটিন অনুবাদ সম্পন্ন করে।
- ইনক্লুশন বডি: সঞ্চিত খাদ্য উপাদান ধারণকারী পর্দাশূন্য সাইটোপ্লাজমীয় দানা (যেমন ফসফেট গ্র্যানুল, সায়ানোফাইসিয়ান গ্র্যানুল, গ্লাইকোজেন গ্র্যানুল এবং জলজ ব্যাকটিরিয়ায় প্লবতা প্রদানকারী গ্যাস ভ্যাকিউল)।
- কোষীয় উপাঙ্গ: ফ্ল্যাজেলা (ফ্ল্যাজেলিন প্রোটিন নির্মিত সূত্র, হুক ও বেসাল বডি সমন্বিত চলন অঙ্গ), পিলি (পিলিন প্রোটিন নির্মিত নালিকা যা ব্যাকটিরিয়ার কনজুগেশনে যুক্ত হয়) এবং ফিম্ব্রি (দৃঢ় রোঁয়া যা কোনো তলে ব্যাকটিরিয়াকে আটকে থাকতে সাহায্য করে)।