Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি XI • Biology • অধ্যায় 2
আনুমানিক সময়: ৪৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

জীবের শ্রেণিবিন্যাস

জীবের শ্রেণিবিন্যাস হলো পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ (WBCHSE) একাদশ শ্রেণির জীববিদ্যার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্কোরিং দ্বিতীয় অধ্যায়। এই অধ্যায়ে পৃথিবীর ১৭ থেকে ১৮ লক্ষ প্রজাতির সুবিশাল জীববৈচিত্র্যকে জৈব বিবর্তন, কোষীয় জটিলতা, পুষ্টির ধরন ও শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচিত হয়েছে। অ্যারিস্টটল ও ক্যারোলাস লিনিয়াসের দ্বি-রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসের ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা দূর করে ১৯৬৯ সালে বিজ্ঞানী আর. এইচ. হুইটেকার প্রবর্তিত ঐতিহাসিক পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাস (মনেরা, প্রোটিস্টা, ছত্রাক, প্ল্যান্টি ও অ্যানিম্যালিয়া) এই অধ্যায়ের কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু। পাশাপাশি ব্যাকটেরিয়ার কোষীয় রূপরেখা, নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী হেটারোসিস্টযুক্ত সায়ানোব্যাকটেরিয়া, চরম পরিবেশসহিষ্ণু আর্কিব্যাকটেরিয়া, কোষপ্রাচীরবিহীন মাইকোপ্লাজমা, এককোষী ইউক্যারিওট প্রোটিস্টা, ছত্রাকের যৌন জনন ও ডাইক্যারিওন দশা এবং হুইটেকারের পদ্ধতির বহির্ভূত অকোষীয় সত্ত্বা ভাইরাস, ভিরয়েড, প্রিয়ন ও লাইকেনের ভূমিকা বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।

কখনও কি ভেবে দেখেছেন?

অধ্যায়টির গুরুত্ব

রোগজীবাণু শনাক্তকরণ, চিকিৎসা বিজ্ঞানে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক নির্বাচন এবং শিল্প ও কৃষিতে অণুজীবের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করতে জীবজগতের বিজ্ঞানভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস জানা আবশ্যক। উদাহরণস্বরূপ, মাইকোপ্লাজমায় পেপটিডোগ্লাইক্যান কোষপ্রাচীর না থাকার কারণেই এটি পেনিসিলিন জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী—যা শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যার প্রত্যক্ষ চিকিৎসাগত অবদান। এছাড়া কৃষিক্ষেত্রে ফসলের ক্ষতিকর মরিচা রোগ (Puccinia) ও কান্ড পচা রোগ দমন এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রোটিস্টা ও মনেরার জ্ঞান অপরিহার্য।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • প্রোক্যারিওটিক বনাম ইউক্যারিওটিক কোষের পার্থক্য (নিউক্লিওয়েড বনাম পর্দাঘেরা নিউক্লিয়াস)।
  • স্বভোজী (সালোকসংশ্লেষী) ও পরভোজী (মৃতজীবী/পরজীবী) পুষ্টির মৌলিক ধারণা।
  • অধ্যায় ১-এ পঠিত ট্যাক্সোনমি, দ্বিপদ নামকরণ ও শ্রেণিবিন্যাসের ক্রমপর্যায়ের প্রাথমিক জ্ঞান।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 শ্রেণিবিন্যাসের ইতিহাস ও হুইটেকারের...
2 মনেরা রাজ্য: আর্কিব্যাকটেরিয়া, ইউব...
3 প্রোটিস্টা রাজ্য: এককোষী ইউক্যারিওট...
4 ছত্রাক রাজ্য: গঠন, যৌন জনন ও ৪টি প্...
5 প্ল্যান্টি ও অ্যানিম্যালিয়া রাজ্যে...
6 অকোষীয় সত্ত্বা: ভাইরাস, ভিরয়েড, প...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

শ্রেণিবিন্যাসের ইতিহাস ও হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য পদ্ধতি

সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ নিজের প্রয়োজনে জীবজগৎকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে এসেছে। কিন্তু জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস করেন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল। তিনি বাহ্যিক গঠনগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে উদ্ভিদকে বৃক্ষ (Trees), গুল্ম (Shrubs) ও বীরুৎ (Herbs)—এই তিন ভাগে এবং প্রাণীদের লোহিত রক্তযুক্ত (এনেমা বা Enaima) ও লোহিত রক্তবিহীন (অ্যানেমা বা Anaima)—এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছিলেন।

১. লিনিয়াসের দ্বি-রাজ্য শ্রেণিবিন্যাস ও তার ত্রুটিসমূহ

অষ্টাদশ শতকে সুইডিশ প্রকৃতিবিদ ক্যারোলাস লিনিয়াস (Carolus Linnaeus) সমগ্র জীবজগৎকে দুটি রাজ্যে বিভক্ত করেন:

  1. প্ল্যান্টি বা উদ্ভিদ রাজ্য (Plantae): কোষপ্রাচীরযুক্ত সমস্ত জীব, যেমন—ব্যাকটেরিয়া, নীলাভ-সবুজ শৈবাল, ছত্রাক, মস, ফার্ন, ব্যক্তবীজী ও গুপ্তবীজী উদ্ভিদ।
  2. অ্যানিম্যালিয়া বা প্রাণী রাজ্য (Animalia): কোষপ্রাচীরবিহীন, গমনশীল ও হলোজোয়িক পুষ্টিযুক্ত বহুকোষী প্রাণীসমূহ।

দ্বি-রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসের মারাত্মক ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা:

  • প্রোক্যারিওট ও ইউক্যারিওটের সংমিশ্রণ: সুগঠিত নিউক্লিয়াসবিহীন প্রোক্যারিওটিক অণুজীব (যেমন ব্যাকটেরিয়া, সায়ানোব্যাকটেরিয়া)-কে সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত ইউক্যারিওটদের সাথে একই রাজ্যে রাখা হয়েছিল।
  • এককোষী ও বহুকোষী জীবের সংমিশ্রণ: এককোষী Chlamydomonas ও Amoeba-কে জটিল বহুকোষী শৈবাল ও প্রাণীদের সাথে একত্রে রাখা হয়েছিল।
  • স্বভোজী ও পরভোজী জীবের অযৌক্তিক অন্তর্ভুক্তি: সালোকসংশ্লেষকারী সবুজ শৈবাল এবং ক্লোরোফিলবিহীন, কাইটিন প্রাচীরযুক্ত মৃতজীবী ছত্রাক উভয়কেই উদ্ভিদ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
২. আর. এইচ. হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাস (১৯৬৯)

এই সমস্ত অসংগতি ও দ্বন্দ্ব নিরসন করতে মার্কিন বাস্তুবিদ রবার্ট এইচ. হুইটেকার (Robert H. Whittaker, 1969) সমগ্র জীবজগৎকে পাঁচটি রাজ্যে বিভক্ত করেন: মনেরা, প্রোটিস্টা, ছত্রাক (Fungi), প্ল্যান্টি ও অ্যানিম্যালিয়া।

বৈশিষ্ট্য মনেরা (Monera) প্রোটিস্টা (Protista) ছত্রাক (Fungi) প্ল্যান্টি (Plantae) অ্যানিম্যালিয়া (Animalia)
কোষের প্রকার প্রোক্যারিওটিক ইউক্যারিওটিক ইউক্যারিওটিক ইউক্যারিওটিক ইউক্যারিওটিক
কোষপ্রাচীর অ-সেলুলোজীয় (পেপটিডোগ্লাইক্যান) কোনো কোনোটিতে উপস্থিত (ডায়াটম), কোনোটিতে অনুপস্থিত উপস্থিত (কাইটিন ও পলিস্যাকারাইড) উপস্থিত (সেলুলোজ, পেকটিন) অনুপস্থিত
নিউক্লিয়ার পর্দা অনুপস্থিত উপস্থিত উপস্থিত উপস্থিত উপস্থিত
দেহ সংগঠন এককোষী (কোষীয় স্তর) এককোষী (কোষীয় স্তর) বহুকোষী / শিথিল কলা (মাইসেলিয়াম) কলা / অঙ্গ স্তর কলা / অঙ্গ / তন্ত্র স্তর
পুষ্টির ধরন স্বভোজী (সালোকসংশ্লেষী ও রাসায়নিক সংশ্লেষী) এবং পরভোজী (মৃতজীবী / পরজীবী) স্বভোজী (সালোকসংশ্লেষী) এবং পরভোজী / মিক্সোট্রফিক পরভোজী (মৃতজীবী / পরজীবী / বিশোষণমূলক) স্বভোজী (সালোকসংশ্লেষকারী) পরভোজী (হলোজোয়িক / প্রাণীসদৃশ)
৩. হুইটেকারের শ্রেণিবিন্যাসের পাঁচটি মূল মানদণ্ড
  1. কোষীয় সংগঠনের জটিলতা: প্রোক্যারিওটিক নাকি ইউক্যারিওটিক কোষ।
  2. দেহ গঠনের জটিলতা: এককোষী নাকি বহুকোষী/কলা/অঙ্গ স্তরের সংগঠন।
  3. পুষ্টির পদ্ধতি: খাদ্য সংশ্লেষ (প্ল্যান্টি), বিশোষণ (ছত্রাক) নাকি গ্রাসমূলক হলোজোয়িক (অ্যানিম্যালিয়া)।
  4. প্রজনন পদ্ধতি: অঙ্গজ, অযৌন ও যৌন জনন চক্রের উপস্থিতি।
  5. জাতিজনি বা বিবর্তনীয় সম্পর্ক (Phylogenetic relationships): পূর্বপুরুষ থেকে আধুনিক জীবের বিবর্তনীয় ধারা।

মনেরা রাজ্য: আর্কিব্যাকটেরিয়া, ইউব্যাকটেরিয়া ও মাইকোপ্লাজমা

মনেরা (Kingdom Monera) রাজ্যের একমাত্র এবং সর্বপ্রধান সদস্য হলো ব্যাকটেরিয়া। এরা পৃথিবীর সর্বাধিক প্রাচুর্যপূর্ণ অণুজীব, যা তুষারাবৃত মেরু অঞ্চল থেকে শুরু করে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ফুটন্ত উষ্ণ প্রস্রবণ পর্যন্ত সর্বত্র বিরাজমান। আকারের ভিত্তিতে ব্যাকটেরিয়া চার প্রকার: গোলাকার কক্কাস (Coccus), দণ্ডাকার ব্যাসিলাস (Bacillus), কমা-আকৃতির ভিব্রিও (Vibrio) এবং সর্পিলাকার স্পাইরিলাম (Spirillum)।

১. আর্কিব্যাকটেরিয়া (Archaebacteria - প্রাচীনতম ব্যাকটেরিয়া)

আর্কিব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত চরম ও প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে। এদের এই অনন্য প্রতিকূলতা-সহনশীলতার কারণ এদের কোষপ্রাচীর সিউডোমিউরিন দ্বারা গঠিত (প্রকৃত পেপটিডোগ্লাইক্যান নেই) এবং এদের কোষপর্দায় এস্টার বন্ধনের পরিবর্তে ইথার বন্ধনযুক্ত শাখান্বিত হাইড্রোকার্বন শৃঙ্খল বর্তমান। এই শাখান্বিত লিপিড স্তর ফুটন্ত তাপে পর্দা গলে যাওয়া বা অতিরিক্ত লবণে কোষ ফেটে যাওয়া প্রতিরোধ করে।

  • মিথেনোজেন (Methanogens): অবাধ অবাতজীবী জীব, যারা জলাভূমি এবং রোমন্থক প্রাণীদের (গরু, মহিষ) পাকস্থলীতে বাস করে এবং মিথেন গ্যাস ($CH_4$) বা গোবর গ্যাস উৎপাদন করে। যেমন: Methanobacterium।
  • হ্যালোফাইল (Halophiles): অতি লবণাক্ত পরিবেশ বা লবণাক্ত হ্রদে (Dead Sea) বাস করে। এদের পর্দায় ব্যাক্টেরিওরোডপসিন রঞ্জক থাকে যা সূর্যালোক থেকে সরাসরি এটিপি তৈরিতে সাহায্য করে। যেমন: Halobacterium।
  • থার্মোঅ্যাসিডোফাইল (Thermoacidophiles): অত্যন্ত উষ্ণ ও অম্লীয় গন্ধকযুক্ত প্রস্রবণে (তাপমাত্রা ৮০-১০০° সে, pH 2) বাস করে। এরা গন্ধককে জারিত করে সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরি করে। যেমন: Thermoplasma, Sulfolobus।
২. ইউব্যাকটেরিয়া (Eubacteria - প্রকৃত ব্যাকটেরিয়া)

ইউব্যাকটেরিয়ার বৈশিষ্ট্য হলো এদের দৃঢ় কোষপ্রাচীর পেপটিডোগ্লাইক্যান বা মিউরিন দ্বারা গঠিত, যা এন-অ্যাসিটাইল গ্লুকোসামিন (NAG) ও এন-অ্যাসিটাইল মিউরামিক অ্যাসিড (NAM)-এর টেট্রাপেপটাইড বন্ধন দ্বারা গঠিত পলিমার।

৩. সায়ানোব্যাকটেরিয়া (Cyanobacteria বা নীলাভ-সবুজ শৈবাল)

এরা গ্রাম-নেগেটিভ সালোকসংশ্লেষকারী প্রোক্যারিওট। এদের কোষে উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদের ন্যায় ক্লোরোফিল-এ, ক্যারোটিনয়েড এবং ফাইকোসায়ানিন রঞ্জক থাকে। এরা এককোষী, কলোনিযুক্ত বা সূত্রাকার হতে পারে এবং বাইরে মিউসিলেজের পিচ্ছিল আবরণ থাকে।

  • হেটারোসিস্ট (Heterocyst): Nostoc ও Anabaena-এর মতো সূত্রাকার সায়ানোব্যাকটেরিয়ায় নাইট্রোজেন সংবন্ধনের জন্য বিশেষায়িত, হালকা রঙের, পুরু প্রাচীরযুক্ত কোষ থাকে যাকে হেটারোসিস্ট বলে।
  • নাইট্রোজিনেজ (Nitrogenase) উৎসেচক অক্সিজেনের উপস্থিতিতে নষ্ট হয়ে যায়। হেটারোসিস্ট কোষে ফটোসিস্টেম-২ (PS-II) অনুপস্থিত থাকায় সেখানে কোনো অক্সিজেন উৎপন্ন হয় না; ফলে অবাত পরিবেশে নাইট্রোজিনেজ বায়বীয় $N_2$-কে অ্যামোনিয়ায় রূপান্তর করতে পারে।
  • ওয়াটার ব্লুম (Water Bloom): ইউট্রোফিকেশনের ফলে জলাশয়ে সায়ানোব্যাকটেরিয়ার অত্যধিক বংশবৃদ্ধিকে ওয়াটার ব্লুম বলে, যা ক্ষতিকর মাইক্রোসিস্টিন টক্সিন নিঃসরণ করে জলজ প্রাণীদের হত্যা করে।
৪. মাইকোপ্লাজমা (Mycoplasma বা PPLO)

মাইকোপ্লাজমা হলো এমন এক শ্রেণির অণুজীব যাদের কোনো কোষপ্রাচীর থাকে না। এরা জীবজগতের ক্ষুদ্রতম স্বাধীন সজীব কোষ (ব্যাস ০.১ থেকে ০.৩ মাইক্রোমিটার)।

  • এরা অক্সিজেন ছাড়াই পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে (ঐচ্ছিক অবাতজীবী)।
  • চিকিৎসা বিজ্ঞানে গুরুত্ব: যেহেতু পেনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিক শুধুমাত্র ব্যাকটিরিয়ার কোষপ্রাচীর তৈরিতে বাধা দিয়ে ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে, তাই মাইকোপ্লাজমার ওপর পেনিসিলিনের কোনো কার্যকারিতা নেই! এদের দমনে টেট্রাসাইক্লিন ব্যবহার করা হয়।
  • এরা উদ্ভিদের লিটল লিফ এবং প্রাণীদের প্লিউরোপনিউমোনিয়া রোগ সৃষ্টি করে।

প্রোটিস্টা রাজ্য: এককোষী ইউক্যারিওটদের বৈচিত্র্য

প্রোটিস্টা (Kingdom Protista) রাজ্যের সমস্ত সদস্য এককোষী ইউক্যারিওটিক জীব। ইউক্যারিওট হওয়ার কারণে এদের কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস এবং পর্দাঘেরা অঙ্গাণু (মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগি বস্তু, প্লাস্টিড) বর্তমান। এরা মূলত জলজ পরিবেশে বাস করে এবং প্রোক্যারিওট ও জটিল বহুকোষী জীবের মধ্যে বিবর্তনীয় সংযোগ রক্ষা করে।

১. ক্রিসোফাইট (Chrysophytes - ডায়াটম ও গোল্ডেন অ্যালগি)

মিষ্টি ও সামুদ্রিক জলের আণুবীক্ষণিক জীব, যারা জলের ওপর প্ল্যাঙ্কটনের ন্যায় নিষ্ক্রিয়ভাবে ভেসে বেড়ায়।

  • সাবান বাক্সের ন্যায় কপাটিকা (Frustule): ডায়াটমের কোষপ্রাচীর দুটি পাতলা কপাটিকা বা খোলক দ্বারা গঠিত যা সাবানের বাক্সের মতো একটির ওপর অপরটি খাঁজে খাঁজে বসে থাকে (এপিথিকা ও হাইপোথিকা)।
  • সিলিকাময় প্রাচীর: প্রাচীরে অকেলাসিত সিলিকা ($SiO_2$) জমা থাকে, যা অত্যন্ত শক্ত এবং সহজে অবিনশ্বর।
  • ডায়াটোমাইট বা ডায়াটোমেসিয়াস আর্থ: ডায়াটম মারা গেলে সমুদ্রের তলদেশে কোটি কোটি বছর ধরে এদের সিলিকাময় প্রাচীর স্তূপীকৃত হয়ে ডায়াটোমেসিয়াস মৃত্তিকা গঠন করে। এটি ওষুধ, সিরাপ ও তেল পরিস্রাবণে এবং ধাতু পালিশের কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • ডায়াটমদের "সমুদ্রের প্রধান উৎপাদক" (Chief Producers in the Oceans) বলা হয়।
২. ডাইনোফ্ল্যাজেলেট (Dinoflagellates)

অধিকাংশই সামুদ্রিক ও সালোকসংশ্লেষকারী। কোষের বাইরে শক্ত সেলুলোজ নির্মিত পাতের বর্ম থাকে।

  • এদের দুটি ফ্ল্যাজেলা থাকে: একটি অনুদৈর্ঘ্য খাঁজে এবং অপরটি অনুপ্রস্থ খাঁজে অবস্থান করে, যা এদের ঘূর্ণনশীল চলন প্রদান করে।
  • লাল জোয়ার (Red Tide): পুষ্টিসমৃদ্ধ সাগরে Gonyaulax-এর মতো লাল ডাইনোফ্ল্যাজেলেটের আকস্মিক ও বিস্ফোরণমূলক বংশবৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের জল রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। এরা মারাত্মক স্নায়ুবিষ স্যাক্সিটক্সিন (Saxitoxin) নিঃসরণ করে, যা প্রচুর মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীকে মেরে ফেলে।
৩. ইউগ্লেনয়েড (Euglenoids - ইউগ্লিনা)

বেশিরভাগই বদ্ধ মিষ্টি জলের জীব (যেমন Euglena)।

  • এদের সেলুলোজের তৈরি কোনো কোষপ্রাচীর থাকে না। কোষপর্দার নিচে প্রোটিনসমৃদ্ধ নমনীয় স্তর থাকে যাকে পেলিকল (Pellicle) বলে।
  • এদের দুটি অসমান ফ্ল্যাজেলা থাকে—একটি দীর্ঘ ও অন্যটি খাটো।
  • মিক্সোট্রফিক পুষ্টি (Mixotrophic Nutrition): সূর্যালোকের উপস্থিতিতে এরা উদ্ভিদের ন্যায় সালোকসংশ্লেষ করে (ক্লোরোফিল-এ ও বি উপস্থিত), কিন্তু অন্ধকারে সূর্যালোক না পেলে এরা পরভোজীর মতো ক্ষুদ্র জীব শিকার করে বেঁচে থাকে!
৪. শ্লেষ্মা ছত্রাক বা স্লাইম মোল্ড (Slime Moulds)

মৃতজীবী প্রোটিস্ট, যারা পচনশীল ডালপালা ও পাতার ওপর বাস করে জৈব পদার্থ ভক্ষণ করে।

  • অনুকূল পরিবেশে বহু কোষ একত্রিত হয়ে প্রাচীরবিহীন বহুকেন্দ্রিক প্রোটোপ্লাজমের পিণ্ড তৈরি করে যাকে প্লাজমোডিয়াম (Plasmodium) বলে।
  • প্রতিকূল পরিবেশে প্লাজমোডিয়াম থেকে ফ্রুটিং বডি বা রেণুধানী গঠিত হয়। রেণুগুলির চারপাশে প্রকৃত সেলুলোজ প্রাচীর থাকে যা তীব্র খরা ও তাপেও বহু বছর অক্ষত থেকে বায়ুর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
৫. প্রোটোজোয়া (Protozoans - আদ্যপ্রাণী)

প্রাণীদের প্রাচীনতম এককোষী পরভোজী পূর্বপুরুষ:

  1. অ্যামিবয়েড: ক্ষণপদ বা সিউডোপোডিয়ার সাহায্যে শিকার ধরে (যেমন Amoeba, এবং আমাশয় রোগ সৃষ্টিকারী পরজীবী Entamoeba histolytica)।
  2. ফ্ল্যাজেলেটেড: ফ্ল্যাজেলাযুক্ত পরজীবী; Trypanosoma gambiense যা সিসি মাছির কামড়ে আফ্রিকান স্লিপিং সিকনেস রোগ ঘটায়।
  3. সিলিয়েটেড: হাজার হাজার সিলিয়া দ্বারা দ্রুত সঞ্চালনশীল এবং গলবিলযুক্ত (যেমন Paramecium, যার ম্যাক্রো ও মাইক্রোনিউক্লিয়াস থাকে)।
  4. স্পোরোজোয়া: সংক্রামক স্পোরের মতো দশাযুক্ত অন্তঃপরজীবী; ম্যালেরিয়া রোগ সৃষ্টিকারী Plasmodium vivax।

ছত্রাক রাজ্য: গঠন, যৌন জনন ও ৪টি প্রধান শ্রেণি

ছত্রাক রাজ্য (Kingdom Fungi) হলো ক্লোরোফিলবিহীন, পরভোজী, অপুষ্পক ইউক্যারিওট জীবদের এক সুবিশাল দল। এককোষী ইস্ট (Saccharomyces) ব্যতীত সমস্ত ছত্রাকের দেহ বহুসংখ্যক শাখান্বিত সূক্ষ্ম সূত্রাকার অংশ নিয়ে গঠিত, যাদের হাইফি (Hyphae) বলে। হাইফির সামগ্রিক জালককে মাইসেলিয়াম (Mycelium) বলা হয়।

১. হাইফির প্রকৃতি ও কোষপ্রাচীর
  • কোয়েনোসাইটিক হাইফি: অনুপ্রস্থ প্রাচীরবিহীন (Aseptate) নলাকার হাইফি যার সাইটোপ্লাজমে অসংখ্য নিউক্লিয়াস ছড়ানো থাকে (যেমন ফাইকোমাইসিটিস)।
  • সেপ্টেট হাইফি: অনুপ্রস্থ প্রাচীর বা সেপটা দ্বারা বিভক্ত হাইফি, যার মধ্যে সরল বা ডলিপোর ছিদ্র থাকে।
  • কোষপ্রাচীর: উদ্ভিদের সেলুলোজের বিপরীতে ছত্রাকের কোষপ্রাচীর মূলত কাইটিন (Chitin - N-acetylglucosamine-এর পলিমার) এবং পলিস্যাকারাইড গ্লুকান দ্বারা গঠিত।
  • পুষ্টি: বহিঃকোষীয় উৎসেচক ক্ষরণ করে খাদ্য পরিপাক করে বিশোষণ পদ্ধতিতে গ্রহণ করে (মৃতজীবী, পরজীবী বা লাইকেন ও মাইকোরাইজার মতো মিথোজীবী)।
২. ছত্রাকের যৌন জনন ও ডাইক্যারিওন দশা

ছত্রাকের যৌন জনন চক্র তিনটি সুনির্দিষ্ট পর্যায়ে সম্পন্ন হয়:

  1. প্লাজমোগ্যামি (Plasmogamy): দুটি সংগতিপূর্ণ জননকোষ বা হাইফির সাইটোপ্লাজমের মিলন, কিন্তু নিউক্লিয়াসদ্বয় তখনই মিলিত হয় না।
  2. ক্যারিওগ্যামি (Karyogamy): দুটি হ্যাপ্লয়েড নিউক্লিয়াসের মিলন ঘটে একটি ডিপ্লয়েড ($2n$) জাইগোটিক নিউক্লিয়াস গঠিত হয়।
  3. মিয়োসিস (Meiosis): ডিপ্লয়েড জাইগোট নিউক্লিয়াসের হ্রাস বিভাজন ঘটে পুনরায় হ্যাপ্লয়েড ($n$) যৌন স্পোর তৈরি হয়।

ডাইক্যারিওন দশা ($n + n$): উন্নত ছত্রাক অর্থাৎ অ্যাসকোমাইসিটিস ও ব্যাসিডিওমাইসিটিস-এ প্লাজমোগ্যামির সঙ্গে সঙ্গেই ক্যারিওগ্যামি ঘটে না! ফলে প্রতিটি কোষে দুটি পৃথক হ্যাপ্লয়েড নিউক্লিয়াস পাশাপাশি অবস্থান করে ($n + n$)। এই বিশেষ দশাকে ডাইক্যারিওন (Dikaryon) এবং পর্যায়টিকে ডাইক্যারিওফেজ বলে।

৩. ছত্রাকের ৪টি প্রধান শ্রেণি
শ্রেণি মাইসেলিয়ামের প্রকৃতি অযৌন রেণু যৌন রেণু ও উৎপত্তিস্থল গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ
ফাইকোমাইসিটিস
(শৈবাল ছত্রাক)
অপ্রাচীরযুক্ত ও কোয়েনোসাইটিক রেণুধানীর অভ্যন্তরে অন্তঃজননজাত চলরেণু (জুস্পোর) বা নিশ্চলরেণু গ্যামেটের মিলনে গঠিত জাইগোস্পোর (Zygospore) Mucor, Rhizopus (পাউরুটির মোল্ড), Albugo candida (সরিষার সাদা মরিচা রোগ)
অ্যাসকোমাইসিটিস
(থলি ছত্রাক)
শাখান্বিত ও সেপ্টেটযুক্ত কনিডিওফোরের শীর্ষে বহির্জননজাত কনিডিয়া থলির ন্যায় অ্যাসকাসের (Ascus) ভেতরে অন্তঃজননজাত ৮টি অ্যাসকোস্পোর; ফ্রুটিং বডি অ্যাসকোকার্প Penicillium (অ্যান্টিবায়োটিক), Aspergillus, Claviceps (এরগট), জেনেটিক্স গবেষণার Neurospora crassa ("উদ্ভিদজগতের ড্রসোফিলা"), খাদ্যোপযোগী মোরেল ও ট্রাফেল
ব্যাসিডিওমাইসিটিস
(ক্লাব ছত্রাক)
শাখান্বিত ও সেপ্টেটযুক্ত (ডলিপোর ও ক্ল্যাম্প সংযোগযুক্ত) সাধারণত অনুপস্থিত; খণ্ডীভবন দ্বারা অঙ্গজ জনন ক্লাব-আকৃতির ব্যাসিডিয়ামের (Basidium) ওপর বহির্জননজাত ৪টি ব্যাসিডিওস্পোর; ফ্রুটিং বডি ব্যাসিডিওকার্প Agaricus bisporus (খাবার ব্যাঙের ছাতা), Puccinia graminis (গমের কালো মরিচা রোগ), Ustilago (স্মাট রোগ)
ডিউটেরোমাইসিটিস
(অসম্পূর্ণ ছত্রাক)
শাখান্বিত ও সেপ্টেটযুক্ত কনিডিয়া অনুপস্থিত বা অজ্ঞাত (যৌন দশা আবিষ্কৃত হলে এদের অ্যাসকো বা ব্যাসিডিওমাইসিটিসে স্থানান্তরিত করা হয়) Alternaria solani (আলুর আর্লি ব্লাইট), Colletotrichum falcatum (আখের লাল পচা রোগ), Trichoderma

প্ল্যান্টি ও অ্যানিম্যালিয়া রাজ্যের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

হুইটেকারের শ্রেণিবিন্যাসে বহুকোষী ইউক্যারিওটদের স্বভোজী ও পরভোজী পুষ্টির নিরিখে যথাক্রমে প্ল্যান্টি (উদ্ভিদ রাজ্য) ও অ্যানিম্যালিয়া (প্রাণী রাজ্য)-তে রাখা হয়েছে।

১. প্ল্যান্টি রাজ্য (Kingdom Plantae)
  • এরা ক্লোরোফিলযুক্ত বহুকোষী ইউক্যারিওটিক স্বভোজী জীব। কোষের বাইরে প্রধানত সেলুলোজ ও পেকটিন নির্মিত দৃঢ় কোষপ্রাচীর থাকে।
  • কিছু ব্যতিক্রমী পতঙ্গভুক উদ্ভিদ আংশিক পরভোজী পুষ্টি প্রদর্শন করে, যেমন—কলসীপত্রী (Nepenthes), সূর্যশিশির (Drosera) এবং ঝাঁঝি (Utricularia)। এছাড়া স্বর্ণলতা (Cuscuta) হলো সম্পূর্ণ পরজীবী উদ্ভিদ।
  • জনুক্রম (Alternation of Generations): উদ্ভিদের জীবনচক্রে ডিপ্লয়েড রেনুধর জনু ($2n$) এবং হ্যাপ্লয়েড লিঙ্গধর জনুর ($n$) পর্যায়ক্রমিক আবর্তনকে জনুক্রম বলে। শৈবাল, মস, ফার্ন, ব্যক্তবীজী ও গুপ্তবীজী উদ্ভিদে এই দুই জনুর বিস্তার বিভিন্ন।
২. অ্যানিম্যালিয়া রাজ্য (Kingdom Animalia)
  • এরা বহুকোষী, ইউক্যারিওটিক, সম্পূর্ণ কোষপ্রাচীরবিহীন পরভোজী জীব।
  • হলোজোয়িক পুষ্টি: খাদ্যবস্তু মুখবিবরের মাধ্যমে সরাসরি গহ্বরে গ্রহণ ও পাচনতন্ত্রে পরিপাক সম্পন্ন করে। অতিরিক্ত খাদ্যদেহে গ্লাইকোজেন বা চর্বি হিসেবে সঞ্চিত থাকে।
  • এদের উন্নত স্নায়ুতন্ত্র ও সংবেদী অঙ্গ থাকে যার মাধ্যমে এরা পরিবেশের উদ্দীপনায় দ্রুত সাড়া দেয় এবং সক্রিয়ভাবে গমনাঙ্গ দ্বারা লোকোমোশন সম্পন্ন করে।
  • জনন মূলত যৌন প্রকৃতির, যেখানে সচল শুক্রাণু ও নিশ্চল ডিম্বাণুর মিলনে গঠিত ডিপ্লয়েড জাইগোট বিভাজিত হয়ে ভ্রূণ সৃষ্টি করে।

অকোষীয় সত্ত্বা: ভাইরাস, ভিরয়েড, প্রিয়ন ও লাইকেন

হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসে অকোষীয় জৈব সত্ত্বা যেমন—ভাইরাস, ভিরয়েড ও প্রিয়ন এবং দ্বৈত জীব লাইকেন-এর কোনো স্থান নেই। যেহেতু এরা স্লাইডেন ও শোয়ানের কোষতত্ত্বের অনুসারী নয় এবং পোষকদেহের বাইরে জড় বস্তুর মতো আচরণ করে, তাই এদের পৃথকভাবে আলোচনা করা হয়।

১. ভাইরাস (Viruses - সজীব ও নির্জীবের মধ্যবর্তী সত্ত্বা)

ভাইরাস হলো বাধ্যতামূলক অন্তঃকোষীয় পরজীবী, যা পোষক কোষের বাইরে নিষ্ক্রিয় স্ফটিকসম অণু কিন্তু পোষক কোষে প্রবেশ করা মাত্র তার বিপাকীয় কলকব্জা দখল করে অপত্য সৃষ্টি করে।

আবিষ্কারের ইতিহাস:

  • ডি. জে. আইভানোভস্কি (D.J. Ivanowsky, 1892): তামাক গাছের মোজাইক রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু প্রমাণ করেন এবং দেখান যে এরা ব্যাকটিরিয়াল ফিল্টার অতিক্রম করতে পারে, অর্থাৎ এরা ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ক্ষুদ্র।
  • এম. ডব্লিউ. বেইজেরিঙ্ক (M.W. Beijerinck, 1898): সংক্রামিত তামাকের রস সুস্থ গাছে ছিটিয়ে সংক্রমণ ঘটিয়ে প্রমাণ করেন এবং এই সংক্রামক রসকে "Contagium vivum fluidum" (জীবন্ত সংক্রামক তরল) আখ্যা দেন।
  • ডব্লিউ. এম. স্ট্যানলি (W.M. Stanley, 1935): সর্বপ্রথম তামাকের মোজাইক ভাইরাস (TMV)-কে কেলাসিত (Crystallized) করেন এবং দেখান যে এই কেলাস মূলত প্রোটিন দ্বারা গঠিত।

ভাইরাসের গঠন ও জিনগত উপাদান:

  • ভাইরাস নিউক্লিওপ্রোটিন দ্বারা গঠিত: কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিক অ্যাসিড এবং বাইরে থাকে প্রোটিনের তৈরি আবরণ বা ক্যাপসিড (Capsid)।
  • ক্যাপসিডের ক্ষুদ্রতম এককগুলিকে ক্যাপসোমিয়ার (Capsomeres) বলে।
  • সার্বজনীন নিয়ম: কোনো ভাইরাসে একসঙ্গে DNA এবং RNA উভয়ই থাকতে পারে না; যেকোনো একটিই থাকবে।
    • উদ্ভিদ ভাইরাসে সাধারণত এক-তন্ত্রী আরএনএ (ssRNA) থাকে (যেমন TMV)।
    • প্রাণী ভাইরাসে এক-তন্ত্রী বা দ্বি-তন্ত্রী আরএনএ অথবা দ্বি-তন্ত্রী ডিএনএ থাকে (যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা, পোলিও, রেট্রোভাইরাস বা HIV, হেপাটাইটিস-বি)।
    • ব্যাকটেরিওফাজ (ব্যাকটেরিয়া সংক্রামক ভাইরাস)-এ সাধারণত দ্বি-তন্ত্রী ডিএনএ (dsDNA) থাকে।
২. ভিরয়েড (Viroids - আবরণহীন সংক্রামক আরএনএ)

১৯৭১ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানী টি. ও. ডাইনার (T.O. Diener) ভাইরাসের চেয়েও ক্ষুদ্রতর এক সংক্রামক সত্ত্বা আবিষ্কার করেন।

  • ক্যাপসিডহীন: ভিরয়েডে কোনো প্রোটিন আবরণ থাকে না; এটি মুক্ত স্বল্প আণবিক ভরের এক-তন্ত্রী বৃত্তাকার আরএনএ (Free low-molecular-weight ssRNA) দ্বারা গঠিত।
  • রোগ সৃষ্টি: এটি আলুর কন্দ রোগ বা পটেটো স্পিন্ডল টিউবার রোগ (PSTD) এবং চন্দ্রমল্লিকার রোগ সৃষ্টি করে।
৩. প্রিয়ন (Prions - সংক্রামক প্রোটিন)

প্রিয়ন হলো সংক্রামক, অস্বাভাবিকভাবে ভাঁজ হওয়া প্রোটিন অণু, যাতে কোনো প্রকার নিউক্লিক অ্যাসিড (DNA বা RNA) থাকে না।

  • এরা স্নায়ুতন্ত্রের প্রোটিনের স্বাভাবিক গঠন বিকৃত করে মারাত্মক স্নায়ুজনিত অবক্ষয় ঘটায়।
  • রোগ সৃষ্টি: গবাদি পশুর ম্যাড কাউ রোগ বা বোভাইন স্পঞ্জিফর্ম এনসেফালোপ্যাথি (BSE) এবং মানুষের ক্রুটজফেল্ড-জ্যাকব রোগ (CJD) ঘটায়।
৪. লাইকেন (Lichens - মিথোজীবী সহাবস্থান ও দূষণ নির্দেশক)

লাইকেন হলো শৈবাল (ফাইকোবায়োন্ট / Phycobiont) এবং ছত্রাকের (মাইকোবায়োন্ট / Mycobiont) স্থায়ী মিথোজীবী সহাবস্থান।

  • শ্রমবন্টন: শৈবাল সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে খাদ্য তৈরি করে ছত্রাককে দেয়; ছত্রাক আশ্রয় প্রদান করে এবং জল ও খনিজ লবণ শোষণ করে শৈবালকে সরবরাহ করে।
  • বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্ব: নগ্ন পাথরের ওপর এরা উসনিক অ্যাসিড ক্ষরণ করে শিলা চূর্ণবিচূর্ণ করে প্রাথমিক উদ্ভিদের জন্মের পথ সুগম করে (লিথোসের পথিকৃৎ)।
  • বায়ুদূষণের প্রাকৃতিক নির্দেশক: লাইকেনের কোনো কিউটিকল বা পত্ররন্ধ্র থাকে না। ফলে এরা বায়ুমণ্ডলের গ্যাস সরাসরি শোষণ করে। বাতাসে সালফার ডাইঅক্সাইড ($SO_2$) দূষণ বাড়লে এদের ক্লোরোফিল বিনষ্ট হয় এবং এরা দ্রুত মারা যায়। তাই কলকারখানা বা দূষিত শহরের বাতাসে লাইকেন জন্মায় না!

গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক তত্ত্ব, পথ ও সংজ্ঞাসমূহ

হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য মানদণ্ড মেট্রিক্স (Whittaker's 5 Kingdom Criteria)
৫টি ভিত্তি = কোষের প্রকার (প্রো/ইউ) + দেহসংগঠন (এক/বহু) + পুষ্টির ধরন + জনন পদ্ধতি + বিবর্তনীয় জাতিজনি
১৯৬৯ সালে আর. এইচ. হুইটেকার লিনিয়াসের কৃত্রিম দ্বি-রাজ্যের ত্রুটি দূর করতে এই সার্বিক পাঁচ স্তরীয় জৈবনীতি প্রবর্তন করেন।
আর্কিব্যাকটেরিয়ার চরম প্রতিকূলতা সহনশীলতার নিয়ম
ঝিল্লি গঠন = ইথার বন্ধনযুক্ত শাখান্বিত ফাইটেনাইল শৃঙ্খল (স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়ার এস্টার বন্ধনের বিপরীত) + সিউডোমিউরিন প্রাচীর
ইথার বন্ধন অম্লীয় আর্দ্রবিশ্লেষণ এবং ৮০-১০০° সেলসিয়াস তাপে ঝিল্লির গলন রোধ করে চরম উষ্ণতায় এদের টিকিয়ে রাখে।
ছত্রাকের যৌন জনন পর্যায়ের সমীকরণ
প্লাজমোগ্যামি (সাইটোপ্লাজমের মিলন) → ডাইক্যারিওফেজ (n + n) → ক্যারিওগ্যামি (2n জাইগোট) → মিয়োসিস → হ্যাপ্লয়েড রেণু (n)
অ্যাসকোমাইসিটিস ও ব্যাসিডিওমাইসিটিসে বিলম্বিত ক্যারিওগ্যামির ফলে ক্ষণস্থায়ী ডাইক্যারিওন দশা (n + n) সৃষ্টি হয়।
ডায়াটোমাইট মৃত্তিকা সঞ্চয়ন নীতি
ফ্রাস্টুল গঠন = এপিথিকা + হাইপোথিকা (অকেলাসিত হাইড্রেটেড সিলিকা SiO₂·nH₂O)
জৈব সিলিকা উৎসেচক দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত না হওয়ায় লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সমুদ্রের তলদেশে অবিকৃত ডায়াটোমেসিয়াস আর্থ রূপে সঞ্চিত হয়।
অকোষীয় রোগজীবাণুর তুলনামূলক জটিলতা বর্ণালী
ব্যাকটেরিয়া (কোষীয় + DNA ও RNA) > ভাইরাস (ক্যাপসিড + DNA বা RNA) > ভিরয়েড (কেবল মুক্ত RNA) > প্রিয়ন (কেবল সংক্রামক প্রোটিন)
স্বতন্ত্র কোষীয় জীবন থেকে সংক্রামক ক্ষুদ্রতম ম্যাক্রোমলিকিউলার রূপরেখার ক্রমাবনতির স্তর।
লাইকেনের SO₂ দূষণ সংবেদনশীলতা নীতি
লাইকেন হলোবায়োন্ট = ফাইকোবায়োন্ট (খাদ্য) + মাইকোবায়োন্ট (জল/আশ্রয়); কিউটিকলবিহীন হওয়ায় SO₂ সরাসরি ক্লোরোফিল ধ্বংস করে
বাতাসে সালফার ডাইঅক্সাইডের সামান্য বৃদ্ধি লাইকেনের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে; তাই এরা বায়ুদূষণের বিশ্বস্ত নির্দেশক।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
(ক) আর. এইচ. হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসের পাঁচটি প্রধান মানদণ্ড উল্লেখ করো। (খ) লিনিয়াসের দ্বি-রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসের তুলনায় হুইটেকারের পদ্ধতিকে কেন অধিক বিজ্ঞানসম্মত ও গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়? [নম্বর বিভাজন: ৩ + ২ = ৫]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসের পাঁচটি প্রধান মানদণ্ড (মান ৩)

মার্কিন বাস্তুবিদ রবার্ট এইচ. হুইটেকার (১৯৬৯) জীবজগতকে মনেরা, প্রোটিস্টা, ছত্রাক, প্ল্যান্টি ও অ্যানিম্যালিয়া—এই পাঁচটি রাজ্যে বিভক্ত করার জন্য নিম্নলিখিত পাঁচটি মূল ভিত্তি ব্যবহার করেছিলেন:

  1. কোষীয় সংগঠনের জটিলতা (Complexity of Cell Structure): প্রোক্যারিওটিক কোষ (সুগঠিত নিউক্লিয়াস ও পর্দাঘেরা অঙ্গাণুবিহীন—মনেরা) বনাম ইউক্যারিওটিক কোষের (সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত—প্রোটিস্টা, ছত্রাক, প্ল্যান্টি, অ্যানিম্যালিয়া) সুস্পষ্ট বিভাজন।
  2. দেহ গঠনের জটিলতা (Complexity of Body Organization): এককোষী সংগঠন (মনেরা ও প্রোটিস্টা) বনাম বহুকোষী বা শিথিল মাইসেলিয়াল কলাস্তর (ছত্রাক) এবং জটিল কলা/অঙ্গ/তন্ত্র স্তর (প্ল্যান্টি ও অ্যানিম্যালিয়া)।
  3. পুষ্টির পদ্ধতি (Mode of Nutrition): খাদ্য সংশ্লেষণকারী স্বভোজী (সালোকসংশ্লেষী উদ্ভিদ), উৎসেচক ক্ষরণকারী বিশোষণমূলক মৃতজীবী পরভোজী (ছত্রাক) এবং খাদ্য গলাধঃকরণকারী হলোজোয়িক পরভোজী (প্রাণী)।
  4. প্রজননের ধরন (Mode of Reproduction): প্রজনন অঙ্গজ, অযৌন নাকি যৌন এবং ভ্রূণ গঠনের স্তর উপস্থিত কি না।
  5. জাতিজনি বা বিবর্তনীয় সম্পর্ক (Phylogenetic Relationships): সরল পূর্বপুরুষ প্রোক্যারিওট মনেরা থেকে এককোষী ইউক্যারিওট প্রোটিস্টা এবং প্রোটিস্টা থেকে স্বতন্ত্র ধারায় ছত্রাক, উদ্ভিদ ও প্রাণীর উৎপত্তির বিবর্তনীয় রূপরেখা।
(খ) দ্বি-রাজ্য পদ্ধতির তুলনায় হুইটেকারের পদ্ধতির শ্রেষ্ঠত্ব (মান ২)

ক্যারোলাস লিনিয়াসের দ্বি-রাজ্য (উদ্ভিদ ও প্রাণী) পদ্ধতির তুলনায় হুইটেকারের পদ্ধতি নিম্নলিখিত কারণে শ্রেষ্ঠ:

  • প্রোক্যারিওটদের পৃথকীকরণ: লিনিয়াস শুধুমাত্র কোষপ্রাচীর থাকার কারণে ব্যাকটেরিয়া ও নীলাভ-সবুজ শৈবালকে উদ্ভিদের সাথে রেখেছিলেন। হুইটেকার সমস্ত প্রোক্যারিওটকে আলাদা করে মনেরা রাজ্যে স্থান দেন।
  • ছত্রাককে স্বতন্ত্র রাজ্যের মর্যাদা: ছত্রাক ক্লোরোফিলবিহীন, কাইটিন প্রাচীরযুক্ত মৃতজীবী জীব। এদের স্বভোজী সেলুলোজযুক্ত সবুজ উদ্ভিদের সাথে রাখা জৈবিকভাবে সম্পূর্ণ ভুল ছিল। হুইটেকার ছত্রাককে পৃথক রাজ্য দেন।
  • এককোষী ইউক্যারিওটদের একত্রীকরণ: লিনিয়াসের পদ্ধতিতে এককোষী শৈবাল ছিল উদ্ভিদে এবং এককোষী প্রোটোজোয়া ছিল প্রাণীতে। হুইটেকার সমস্ত এককোষী ইউক্যারিওটকে প্রোটিস্টা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।
উদাহরণ 2
(ক) সায়ানোব্যাকটেরিয়ার গঠনগত বৈশিষ্ট্য লেখো। এদের 'হেটারোসিস্ট' কীভাবে নাইট্রোজেন সংবন্ধন সম্পন্ন করে? (খ) চরম প্রতিকূল পরিবেশে আর্কিব্যাকটেরিয়া কীভাবে বেঁচে থাকে? [নম্বর বিভাজন: ৩ + ২ = ৫]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) সায়ানোব্যাকটেরিয়ার গঠন ও হেটারোসিস্টের নাইট্রোজেন সংবন্ধন (মান ৩)

১. সায়ানোব্যাকটেরিয়ার গঠনগত বৈশিষ্ট্য:

  • এরা সালোকসংশ্লেষকারী প্রোক্যারিওট, যাদের কোষে উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদের মতো ক্লোরোফিল-এ, ক্যারোটিনয়েড এবং ফাইকোবিলিন (ফাইকোসায়ানিন ও ফাইকোইরিথ্রিন) রঞ্জক মুক্ত থাইলাকয়েডে অবস্থান করে।
  • এদের দেহ এককোষী, কলোনিযুক্ত বা অশাখ সূত্রাকার (ট্রাইকোম) হতে পারে এবং দেহটি বাইরে জেলির মতো পিচ্ছিল মিউসিলেজের আবরণ দ্বারা আবৃত থাকে।

২. হেটারোসিস্টের ভূমিকা ও কৌশল:

  • Nostoc ও Anabaena-র মতো সূত্রাকার সায়ানোব্যাকটেরিয়ায় বায়বীয় নাইট্রোজেন সংবন্ধনের জন্য বিশেষায়িত, বড় আকারের, বর্ণহীন ও পুরু প্রাচীরযুক্ত কোষ থাকে যাকে হেটারোসিস্ট বলে।
  • নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী উৎসেচক নাইট্রোজিনেজ (Nitrogenase) অক্সিজেনের উপস্থিতিতে স্থায়ীভাবে বিনষ্ট হয়। হেটারোসিস্ট অক্সিজেনমুক্ত অবাত পরিবেশ বজায় রাখে কারণ:
    1. এদের কোষপ্রাচীর অত্যন্ত পুরু ও অক্সিজেনের জন্য অপ্রবেশ্য।
    2. এদের কোষে ফটোসিস্টেম-২ (PS-II) অনুপস্থিত; ফলে জলের আলোক-বিশ্লেষণ বা অক্সিজেন উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে (কেবলমাত্র PS-I দ্বারা এটিপি উৎপন্ন হয়)।
  • এই অবাত পরিবেশে নাইট্রোজিনেজ উৎসেচক বায়ুমণ্ডলের মুক্ত নাইট্রোজেনকে অ্যামোনিয়াতে ($NH_3$) পরিণত করে।
(খ) চরম পরিবেশে আর্কিব্যাকটেরিয়ার টিকে থাকার কারণ (মান ২)

আর্কিব্যাকটেরিয়া ফুটন্ত তাপে (থার্মোঅ্যাসিডোফাইল), অতিরিক্ত লবণে (হ্যালোফাইল) ও অবাত জলাভূমিতে (মিথেনোজেন) টিকে থাকে দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের কারণে:

  1. ইথার বন্ধনযুক্ত শাখান্বিত লিপিড পর্দা: সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার কোষপর্দায় ফ্যাটি অ্যাসিড এস্টার বন্ধনযুক্ত থাকে। কিন্তু আর্কিব্যাকটেরিয়ার পর্দায় শাখান্বিত ফাইটেনাইল শৃঙ্খল ইথার বন্ধন দ্বারা গ্লিসারলের সাথে যুক্ত থাকে। ইথার বন্ধন রাসায়নিকভাবে অত্যন্ত সুস্থিত হওয়ায় অ্যাসিডে ভাঙে না এবং শাখান্বিত লিপিডের একস্তর (Monolayer) ৮০-১০০° সেলসিয়াসেও পর্দাকে গলে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।
  2. সিউডোমিউরিন প্রাচীর: এদের কোষপ্রাচীরে সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার পেপটিডোগ্লাইক্যান থাকে না; পরিবর্তে সিউডোমিউরিন বা বিশেষ গ্লাইকোপ্রোটিন থাকে যা লাইসোজাইম উৎসেচক বা চরম অভিস্রবণ চাপে অক্ষত থাকে।
উদাহরণ 3
(ক) ডায়াটমের কোষপ্রাচীরের গঠন বর্ণনা করো। 'ডায়াটোমেসিয়াস আর্থ' কী এবং এর দুটি ব্যবহার লেখো? (খ) সমুদ্রে 'লাল জোয়ার' (Red Tide) সৃষ্টির কারণ কী? এর ক্ষতিকর প্রভাব উল্লেখ করো। [নম্বর বিভাজন: ৩ + ২ = ৫]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) ডায়াটমের ফ্রাস্টুল ও ডায়াটোমেসিয়াস আর্থ (মান ৩)

১. ডায়াটমের কোষপ্রাচীরের গঠন:

  • ডায়াটমের কোষপ্রাচীর বা ফ্রাস্টুল (Frustule) দুটি পাতলা কপাটিকা নিয়ে গঠিত যা সাবানের বাক্সের খাপের মতো একটির ওপর অপরটি নিখুঁতভাবে বসে থাকে। উপরের বড় ঢাকনাকে এপিথিকা (Epitheca) এবং নিচের অপেক্ষাকৃত ছোট তলদেশকে হাইপোথিকা (Hypotheca) বলে।
  • প্রাচীরটি অকেলাসিত সিলিকা ($SiO_2$) দ্বারা গঠিত হওয়ায় এটি কাঁচের মতো শক্ত, অবিনশ্বর এবং পচন-প্রতিরোধী।

২. ডায়াটোমেসিয়াস আর্থ ও এর ব্যবহার:

  • কোটি কোটি বছর ধরে সমুদ্রে মৃত ডায়াটমের সিলিকাময় খোলক তলদেশে জমা হয়ে যে বিপুল বালুকাময় খনিজ স্তর সৃষ্টি করে, তাকে ডায়াটোমেসিয়াস আর্থ (Diatomaceous Earth বা ডায়াটোমাইট) বলে।
  • বাণিজ্যিক ব্যবহার:
    1. শিল্প পরিস্রাবণ: ছিদ্রযুক্ত ও রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় হওয়ায় তেল, সিরাপ, অ্যালকোহল ও অ্যান্টিবায়োটিক দ্রবণের সূক্ষ্ম পরিস্রাবণে ব্যবহৃত হয়।
    2. পালিশ ও ঘর্ষণ পদার্থ: টুথপেস্ট ও ধাতব পালিশে সূক্ষ্ম ঘষাকারী উপাদান (Abrasive) হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
(খ) লাল জোয়ারের কারণ ও ক্ষতিকর প্রভাব (মান ২)

১. লাল জোয়ারের কারণ:

  • পুষ্টিসমৃদ্ধ সামুদ্রিক জলে লাল রঞ্জকযুক্ত ডাইনোফ্ল্যাজেলেট, বিশেষ করে Gonyaulax polyedra-এর দ্রুত ও বিপুল বংশবৃদ্ধি (অ্যালগাল ব্লুম) ঘটলে সমুদ্রের জল রক্তিম লাল বর্ণ ধারণ করে। একে লাল জোয়ার (Red Tide) বলে।

২. ক্ষতিকর প্রভাব:

  • এই ডাইনোফ্ল্যাজেলেটগুলি জলে মারাত্মক নিউরোটক্সিন বিষ স্যাক্সিটক্সিন (Saxitoxin) ক্ষরণ করে।
  • এই বিষাক্ত উপাদান জলজ মাছ ও অন্যান্য প্রাণীদের স্নায়ুতন্ত্র অবশ করে বিপুল সংখ্যায় মৃত্যু ঘটায়। ঝিনুক ও শামুক এই বিষ দেহে জমিয়ে রাখে, যা মানুষ ভক্ষণ করলে মারাত্মক প্যারালাইটিক শেলফিশ পয়জনিং (PSP) ঘটে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
উদাহরণ 4
(ক) ছত্রাকের যৌন জননের তিনটি পর্যায় সংক্ষেপে লেখো। (খ) 'ডাইক্যারিওন' কী এবং কোন দুটি শ্রেণিতে এটি দেখা যায়? (গ) অ্যাসকোমাইসিটিস ও ব্যাসিডিওমাইসিটিসের মধ্যে রেণু উৎপাদনের দুটি পার্থক্য লেখো। [নম্বর বিভাজন: ২ + ১ + ২ = ৫]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) ছত্রাকের যৌন জনন চক্রের তিনটি পর্যায় (মান ২)

ছত্রাকের যৌন জনন ধারাবাহিকভাবে তিনটি সুনির্দিষ্ট কোষীয় ধাপে সম্পন্ন হয়:

  1. প্লাজমোগ্যামি (Plasmogamy): দুটি সংগতিপূর্ণ জননকোষ বা সোমাটিক হাইফির প্রোটোপ্লাজমের মিলন, কিন্তু নিউক্লিয়াস দুটি তখনও পরস্পরের সাথে যুক্ত হয় না।
  2. ক্যারিওগ্যামি (Karyogamy): দুটি হ্যাপ্লয়েড নিউক্লিয়াসের সংমিশ্রণ ($n + n ightarrow 2n$) ঘটে একটি ডিপ্লয়েড জাইগোট নিউক্লিয়াস গঠিত হয়।
  3. মিয়োসিস (Meiosis): ডিপ্লয়েড জাইগোটিক নিউক্লিয়াসটির হ্রাস বিভাজন ঘটে হ্যাপ্লয়েড ($n$) যৌন স্পোর উৎপন্ন হয় যা পুনরায় নতুন মাইসেলিয়াম গঠন করে।
(খ) ডাইক্যারিওন দশা ও উপস্থিতি (মান ১)

যে বিশেষ দশায় প্লাজমোগ্যামির পর অবিলম্বে নিউক্লিয়াসের মিলন (ক্যারিওগ্যামি) ঘটে না, বরং প্রতিটি কোষের সাইটোপ্লাজমে দুটি পৃথক হ্যাপ্লয়েড নিউক্লিয়াস জোড়ায় জোড়ায় ($n + n$) অবস্থান করে, তাকে ডাইক্যারিওন (Dikaryon) বলে। এটি অ্যাসকোমাইসিটিস ও ব্যাসিডিওমাইসিটিস ছত্রাকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

(গ) অ্যাসকোমাইসিটিস ও ব্যাসিডিওমাইসিটিসের রেণু উৎপাদন পার্থক্য (মান ২)
বৈশিষ্ট্য অ্যাসকোমাইসিটিস (থলি ছত্রাক) ব্যাসিডিওমাইসিটিস (ক্লাব ছত্রাক)
যৌন রেণুর প্রকৃতি ও সংখ্যা অ্যাসকোস্পোর; সাধারণত প্রতি অ্যাসকাসে ৮টি করে উৎপন্ন হয়। ব্যাসিডিওস্পোর; সাধারণত প্রতি ব্যাসিডিয়ামে ৪টি করে উৎপন্ন হয়।
উৎপত্তির পদ্ধতি থলির মতো অ্যাসকাসের (Ascus) ভেতরে অন্তঃজননজাত (Endogenous) ভাবে গঠিত হয়। ক্লাব-আকৃতির ব্যাসিডিয়ামের (Basidium) শীর্ষে বহির্জননজাত (Exogenous) ভাবে গঠিত হয়।
উদাহরণ 5
(ক) ভাইরাস আবিষ্কারে আইভানোভস্কি, বেইজেরিঙ্ক ও স্ট্যানলির অবদান সংক্ষেপে লেখো। (খ) TMV এবং ব্যাকটেরিওফাজের গঠনগত উপাদান বিশ্লেষণ করো। (গ) ভাইরাসকে কেন হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসে স্থান দেওয়া হয়নি? [নম্বর বিভাজন: ২ + ২ + ১ = ৫]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) ভাইরাস আবিষ্কারে বিজ্ঞানীদের অবদান (মান ২)
  • ডি. জে. আইভানোভস্কি (১৮৯২): তামাক গাছের মোজাইক রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ব্যাকটেরিয়াল ফিল্টার অতিক্রম করতে পারে তা প্রমাণ করে দেখান যে এরা ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র।
  • এম. ডব্লিউ. বেইজেরিঙ্ক (১৮৯৮): ফিল্টার করা সংক্রামক রস সুস্থ তামাক গাছে সংক্রমণ ঘটায় তা প্রমাণ করেন এবং এই রসকে "Contagium vivum fluidum" (জীবন্ত সংক্রামক তরল) আখ্যা দেন।
  • ডব্লিউ. এম. স্ট্যানলি (১৯৩৫): তামাকের মোজাইক ভাইরাস (TMV)-কে সর্বপ্রথম কেলাসিত (Crystallized) করতে সক্ষম হন এবং দেখান যে এর কেলাস মূলত নিষ্ক্রিয় প্রোটিন দ্বারা গঠিত।
(খ) TMV ও ব্যাকটেরিওফাজের গঠনগত উপাদান (মান ২)

১. তামাকের মোজাইক ভাইরাস (TMV):

  • এটি রডের মতো দেখতে সর্পিলাকার ভাইরাস। এর কেন্দ্রে থাকে একটিমাত্র এক-তন্ত্রী আরএনএ (ssRNA) শৃঙ্খল (প্রায় ৬,৪০০ নিউক্লিওটাইডযুক্ত)।
  • আরএনএ-এর বাইরে প্রোটিনের তৈরি ক্যাপসিড আবরণ থাকে, যা ঠিক ২,১৩০টি অভিন্ন ক্যাপসোমিয়ার নিয়ে গঠিত।

২. টি-৪ ব্যাকটেরিওফাজ (Bacteriophage):

  • এটি দেখতে ব্যাঙাচির ন্যায়, যার দেহ মাথা, কলার ও লেজ—এই তিনটি অংশে বিভক্ত।
  • প্রিজমাকৃতির ষড়ভুজাকার মাথার মধ্যে শক্তভাবে পাকানো দ্বি-তন্ত্রী ডিএনএ (dsDNA) থাকে। লেজের প্রান্তে ষড়ভুজ বেসপ্লেট ও ৬টি স্পর্শক তন্তু (Tail fibers) থাকে যা দিয়ে এরা ব্যাকটেরিয়া কোষে নোঙর ফেলে।
(গ) পাঁচ রাজ্যে ভাইরাসের স্থান না পাওয়ার কারণ (মান ১)

হুইটেকারের শ্রেণিবিন্যাস মূলত কোষতত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ভাইরাস সম্পূর্ণ অকোষীয় (Acellular); এদের সাইটোপ্লাজম, রাইবোজোম ও নিজস্ব শ্বসন বা বিপাকীয় উৎসেচক নেই। পোষক কোষের বাইরে এরা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রাসায়নিক স্ফটিকের মতো অবস্থান করে। তাই এদের কোনো জীবন্ত রাজ্যে স্থান দেওয়া হয়নি।

উদাহরণ 6
(ক) ভাইরাস, ভিরয়েড ও প্রিয়নের মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য ছকের মাধ্যমে লেখো। (খ) লাইকেনকে কেন 'দ্বৈত জীব' বলা হয়? বায়ুদূষণের সূচক হিসেবে লাইকেনের ভূমিকা ব্যাখ্যা করো। [নম্বর বিভাজন: ৩ + ২ = ৫]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
(ক) ভাইরাস, ভিরয়েড ও প্রিয়নের তুলনামূলক পার্থক্য (মান ৩)
বৈশিষ্ট্য ভাইরাস (Virus) ভিরয়েড (Viroid) প্রিয়ন (Prion)
আবিষ্কর্তা আইভানোভস্কি (১৮৯২) ও বেইজেরিঙ্ক (১৮৯৮) টি. ও. ডাইনার (১৯৭১) স্ট্যানলি প্রুসিনার (১৯৮২)
রাসায়নিক প্রকৃতি নিউক্লিওপ্রোটিন (নিউক্লিক অ্যাসিড + প্রোটিন ক্যাপসিড) কেবলমাত্র মুক্ত আরএনএ (RNA); কোনো প্রোটিন আবরণ নেই কেবলমাত্র সংক্রামক প্রোটিন; কোনো নিউক্লিক অ্যাসিড নেই
জিনগত উপাদান DNA অথবা RNA (উভয়টি নয়) স্বল্প আণবিক ভরের একক সূত্রাকার বৃত্তাকার RNA অনুপস্থিত
আকার অতি আণুবীক্ষণিক (২০-৩০০ ন্যানোমিটার) ভাইরাসের চেয়েও ক্ষুদ্রতর (~১০ ন্যানোমিটার) ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাসের সমতুল্য
সৃষ্ট রোগ এইডস (HIV), পোলিও, জলাতঙ্ক, TMV আলুর স্পিন্ডল টিউবার রোগ (PSTD) ম্যাড কাউ রোগ (BSE), মানুষের CJD রোগ
(খ) লাইকেন: দ্বৈত জীব ও বায়ুদূষণের সূচক (মান ২)

১. কেন লাইকেন দ্বৈত জীব:

  • লাইকেন কোনো একক জীব নয়; এটি একটি শৈবাল (ফাইকোবায়োন্ট) এবং একটি ছত্রাকের (মাইকোবায়োন্ট) পারস্পরিক অবিচ্ছেদ্য মিথোজীবী সহাবস্থান।
  • শৈবাল সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে খাদ্য তৈরি করে উভয়কে পুষ্টি জোগায়; ছত্রাক তার মাইসেলিয়াম দিয়ে শৈবালকে প্রখর রোদ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং পরিবেশ থেকে জল ও খনিজ লবণ শোষণ করে সরবরাহ করে।

২. বায়ুদূষণের জৈব সূচক হিসেবে ভূমিকা:

  • লাইকেনের কোনো সুরক্ষামূলক কিউটিকল পর্দা বা পত্ররন্ধ্র থাকে না; এরা চারপাশের বাতাস থেকে সরাসরি জল ও খনিজ শোষণ করে।
  • বাতাসে ক্ষতিকর সালফার ডাইঅক্সাইড ($SO_2$) গ্যাসের সামান্য উপস্থিতি লাইকেনের শৈবাল অংশের ক্লোরোফিল বিনষ্ট করে এদের দ্রুত ধ্বংস করে দেয়।
  • সুতরাং, যে অঞ্চলে শিল্পদূষণ বা ধোঁয়াশা বেশি, সেখানে লাইকেন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকে ("লাইকেন মরুভূমি")। কোনো অঞ্চলে লাইকেনের প্রাচুর্য নির্দেশ করে যেখানকার বাতাস দূষণমুক্ত ও বিশুদ্ধ।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

মাইকোপ্লাজমা দ্বারা সৃষ্ট ফুসফুসের সংক্রমণে পেনিসিলিন ইনজেকশন কার্যকর মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

পেনিসিলিন শুধুমাত্র পেপটিডোগ্লাইক্যান কোষপ্রাচীর গঠনে বাধা দিয়ে কাজ করে। যেহেতু মাইকোপ্লাজমার কোনো কোষপ্রাচীরই নেই, তাই এটি পেনিসিলিনে সম্পূর্ণ অপ্রভাবিত থাকে।

সাধারণ ভুল ধারণা

অ্যাসকোস্পোর এবং ব্যাসিডিওস্পোরের উৎপত্তি সংক্রান্ত বিভ্রান্তি (কোনটি অন্তর্জাত আর কোনটি বহির্জাত)।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অ্যাসকোস্পোর অ্যাসকাস থলির ভেতরে অন্তঃজননজাত (Endogenous)ভাবে এবং ব্যাসিডিওস্পোর ব্যাসিডিয়াম ক্লাবের বাইরে বহির্জননজাত (Exogenous)ভাবে উৎপন্ন হয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভাইরাসে একই সঙ্গে DNA এবং RNA উভয় নিউক্লিক অ্যাসিড থাকে বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

একটি ভাইরাসের কোরে কেবলমাত্র DNA অথবা কেবলমাত্র RNA থাকে; কোনো ভাইরাসে কখনই উভয় উপাদান একসাথে থাকতে পারে না।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভিরয়েডকে ক্ষুদ্রাকৃতির ভাইরাস মনে করে এর চারপাশে প্রোটিন ক্যাপসিড কল্পনা করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ভিরয়েডে কোনো প্রোটিন ক্যাপসিড থাকে না; এটি কেবল মুক্ত, কম আণবিক ওজনের বৃত্তাকার এক-তন্ত্রী আরএনএ।

সাধারণ ভুল ধারণা

'মোল্ড' নাম দেখে শ্লেষ্মা ছত্রাক (Slime Moulds)-কে ছত্রাক রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

শ্লেষ্মা ছত্রাক মূলত এককোষী ইউক্যারিওট এবং এদের অঙ্গজ দশা প্রাচীরবিহীন অ্যামিবয়েড প্লাজমোডিয়াম হওয়ায় এরা প্রোটিস্টা রাজ্যের অন্তর্গত।

চিত্রগত ব্যাখ্যা ও মডেল

5K জীবের শ্রেণিবিন্যাস: হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য ও অকোষীয় সত্ত্বা ডব্লিউবিসিএইচএসই একাদশ শ্রেণি জীববিদ্যা — একক ১: জীবজগতের বৈচিত্র্য (অধ্যায় ২) ১. আর. এইচ. হুইটেকারের ৫-রাজ্য শ্রেণিবিন্যাস (১৯৬৯) • Monera: প্রোক্যারিওটিক, এককোষী, পেপটিডোগ্লাইক্যান প্রাচীর (ব্যাকটেরিয়া, নস্টক) • Protista: ইউক্যারিওটিক, এককোষী, সিলিকা/পেলিকল (ডায়াটম, অ্যামিবা, ইউগ্লিনা) • Fungi: ইউক্যারিওটিক, কাইটিন প্রাচীর, বিশোষণকারী মৃতজীবী (মিউকর, অ্যাগারিকাস) • Plantae: ইউক্যারিওটিক, বহুকোষী, সেলুলোজ প্রাচীর, স্বভোজী সালোকসংশ্লেষকারী • Animalia: ইউক্যারিওটিক, বহুকোষী, প্রাচীরবিহীন, প্রাণীসদৃশ পরভোজী ২. ছত্রাকের ৪টি শ্রেণি ও যৌন জনন চক্র • Phycomycetes: অপ্রাচীরযুক্ত কোয়েনোসাইটিক সূত্রাকার দেহ (মিউকর, রাইজোপাস) • Ascomycetes: থলি ছত্রাক, অন্তঃজননজাত অ্যাসকোস্পোর (পেনিসিলিয়াম, নিউরোস্পোরা) • Basidiomycetes: ক্লাব ছত্রাক, বহির্জননজাত ব্যাসিডিওস্পোর (ব্যাঙের ছাতা, পাকসিনিয়া) • Deuteromycetes: যৌন জননহীন 'অসম্পূর্ণ ছত্রাক' (অল্টারনারিয়া, ট্রাইকোডার্মা) যৌনচক্র: প্লাজমোগ্যামি → ডাইক্যারিওন (n + n) → ক্যারিওগ্যামি (2n) → মিয়োসিস (n) ৩. মনেরা ও প্রোটিস্টার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য • Archaebacteria: শাখান্বিত লিপিড পর্দা; মিথেনোজেন ও থার্মোঅ্যাসিডোফাইল • Cyanobacteria: নাইট্রোজেন সংবন্ধ্যনে বিশেষায়িত 'হেটারোসিস্ট' (Heterocyst) • Mycoplasma: ক্ষুদ্রতম প্রাচীরবিহীন সজীব কোষ (০.১-০.৩ µm), পেনিসিলিন প্রতিরোধী • Diatoms: সাবান বাক্সের ন্যায় সিলিকা প্রাচীর → ডায়াটোমাইট মৃত্তিকা • Protists: স্যাক্সিটক্সিন ও লাল জোয়ার; মিক্সোট্রফিক পুষ্টি ৪. অকোষীয় জৈব সত্ত্বা (হুইটেকারের পদ্ধতির বহির্ভূত) • Viruses: প্রোটিন ক্যাপসিড + DNA অথবা RNA; 'Contagium vivum fluidum' • Viroids: মুক্ত স্বল্প আণবিক ভরের RNA, কোনো প্রোটিন আবরণ নেই • Prions: সংক্রামক ত্রুটিযুক্ত প্রোটিন; ম্যাড কাউ ডিজিজ (BSE) ও CJD রোগের কারণ • Lichens: শৈবাল (ফাইকোবায়োন্ট) + ছত্রাক (মাইকোবায়োন্ট) মিথোজীবী; SO₂ দূষণের সূচক Whittaker (1969) excluded viruses & viroids due to their acellular nature.

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
জীবের শ্রেণিবিন্যাস হলো জীবজগতের গঠনগত, শারীরবৃত্তীয় ও বিবর্তনীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে জীবসমূহকে নির্দিষ্ট ট্যাক্সোনমিক শ্রেণিতে সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত করার পদ্ধতি।
মূল বিষয় 2
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল প্রথম আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে উদ্ভিদকে বৃক্ষ, গুল্ম ও বীরুৎ এবং প্রাণীদের লোহিত রক্তযুক্ত (এনেমা) ও লোহিত রক্তবিহীন (অ্যানেমা) দুটি দলে বিভক্ত করেন।
মূল বিষয় 3
ক্যারোলাস লিনিয়াস জীবজগৎকে উদ্ভিদ ও প্রাণী—এই দুটি রাজ্যে ভাগ করেন; কিন্তু এটি প্রোক্যারিওট-ইউক্যারিওট এবং স্বভোজী শৈবাল ও মৃতজীবী ছত্রাকের মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়।
মূল বিষয় 4
বিজ্ঞানী আর. এইচ. হুইটেকার (১৯৬৯) পাঁচটি মূল নীতির ওপর ভিত্তি করে পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাস প্রবর্তন করেন: মনেরা, প্রোটিস্টা, ছত্রাক (ফাংগি), প্ল্যান্টি ও অ্যানিম্যালিয়া।
মূল বিষয় 5
হুইটেকারের পাঁচটি মানদণ্ড হলো: (১) কোষীয় সংগঠনের জটিলতা, (২) দেহ গঠনের জটিলতা, (৩) পুষ্টির পদ্ধতি, (৪) প্রজনন পদ্ধতি এবং (৫) জাতিজনি বা বিবর্তনীয় সম্পর্ক।
মূল বিষয় 6
মনেরা রাজ্যের অন্তর্গত সমস্ত জীব প্রোক্যারিওটিক এককোষী এবং পেপটিডোগ্লাইক্যান প্রাচীরযুক্ত; এদের মধ্যে রয়েছে আর্কিব্যাকটেরিয়া, ইউব্যাকটেরিয়া, সায়ানোব্যাকটেরিয়া ও মাইকোপ্লাজমা।
মূল বিষয় 7
আর্কিব্যাকটেরিয়ার কোষপর্দায় ইথার বন্ধনযুক্ত শাখান্বিত হাইড্রোকার্বন শৃঙ্খল থাকায় এরা উষ্ণ প্রস্রবণ ও অতি লবণাক্ত চরম প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে।
মূল বিষয় 8
সায়ানোব্যাকটেরিয়াতে উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদের মতো ক্লোরোফিল-এ থাকে এবং এদের বিশেষ পুরু প্রাচীরযুক্ত 'হেটারোসিস্ট' কোষে নাইট্রোজিনেজ উৎসেচকের সাহায্যে বায়বীয় নাইট্রোজেন সংবন্ধিত হয়।
মূল বিষয় 9
মাইকোপ্লাজমা হলো প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম (০.১-০.৩ মাইক্রোমিটার) প্রাচীরবিহীন স্বাধীন সজীব কোষ, যা স্বাভাবিকভাবেই পেনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী।
মূল বিষয় 10
প্রোটিস্টা রাজ্য হলো এককোষী ইউক্যারিওটদের গোষ্ঠী; এর প্রধান উপবিভাগ: ক্রিসোফাইট (ডায়াটম), ডাইনোফ্ল্যাজেলেট (লাল জোয়ার ও স্যাক্সিটক্সিন), ইউগ্লেনয়েড (পেলিকল ও মিক্সোট্রফিক পুষ্টি), শ্লেষ্মা ছত্রাক (প্লাজমোডিয়াম) ও প্রোটোজোয়া।
মূল বিষয় 11
ডায়াটমের কোষপ্রাচীর সাবান বাক্সের ন্যায় দুটি কপাটিকা দ্বারা গঠিত এবং অবিকৃত সিলিকা সমৃদ্ধ, যা সমুদ্রের তলদেশে জমা হয়ে বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান ডায়াটোমাইট মৃত্তিকা তৈরি করে।
মূল বিষয় 12
ছত্রাক রাজ্যের সদস্যরা ক্লোরোফিলবিহীন, বিশোষণকারী পরভোজী ইউক্যারিওট, যাদের কোষপ্রাচীর কাইটিন ও গ্লুকান দ্বারা নির্মিত।
মূল বিষয় 13
ছত্রাকের যৌন জননের ৩টি ধাপ: প্লাজমোগ্যামি, ক্যারিওগ্যামি ও মিয়োসিস; অ্যাসকোমাইসিটিস ও ব্যাসিডিওমাইসিটিস শ্রেণিতে বিলম্বিত ক্যারিওগ্যামির ফলে ডাইক্যারিওন (n + n) দশা সৃষ্টি হয়।
মূল বিষয় 14
ছত্রাকের ৪টি শ্রেণি: ফাইকোমাইসিটিস (কোয়েনোসাইটিক, জাইগোস্পোর), অ্যাসকোমাইসিটিস (থলি ছত্রাক, অন্তঃজননজাত অ্যাসকোস্পোর), ব্যাসিডিওমাইসিটিস (ক্লাব ছত্রাক, বহির্জননজাত ব্যাসিডিওস্পোর), এবং ডিউটেরোমাইসিটিস (যৌন জননহীন অসম্পূর্ণ ছত্রাক)।
মূল বিষয় 15
ভাইরাস, ভিরয়েড ও প্রিয়ন হলো অকোষীয় সত্ত্বা, তাই এরা হুইটেকারের পাঁচ রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসে স্থান পায়নি।
মূল বিষয় 16
ভাইরাস নিউক্লিওপ্রোটিন দ্বারা গঠিত (ডিএনএ অথবা আরএনএ + প্রোটিন ক্যাপসিড); ১৯৩৫ সালে ডব্লিউ. এম. স্ট্যানলি সর্বপ্রথম TMV ভাইরাস কেলাসিত করেন।
মূল বিষয় 17
ভিরয়েড (টি. ও. ডাইনার, ১৯৭১) হলো ক্যাপসিড বা প্রোটিন আবরণহীন মুক্ত স্বল্প আণবিক ওজনের একক সূত্রাকার বৃত্তাকার আরএনএ, যা আলুর স্পিন্ডল টিউবার রোগ সৃষ্টি করে।
মূল বিষয় 18
প্রিয়ন হলো অস্বাভাবিকভাবে ভাঁজ হওয়া সংক্রামক প্রোটিন অণু, যাতে কোনো নিউক্লিক অ্যাসিড থাকে না এবং এটি গবাদি পশুর ম্যাড কাউ রোগ ও মানুষের সিজেডি রোগ সৃষ্টি করে।
মূল বিষয় 19
লাইকেন হলো শৈবাল (ফাইকোবায়োন্ট) ও ছত্রাকের (মাইকোবায়োন্ট) পারস্পরিক মিথোজীবী সহাবস্থান, যা নগ্ন শিলায় বাস্তুতান্ত্রিক উত্তরাধিকারের পথিকৃৎ এবং বাতাসের SO₂ দূষণের উৎকৃষ্ট জৈব সূচক।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
ইউগ্লিনায় ক্লোরোফিল-এ থাকা সত্ত্বেও হুইটেকার কেন একে উদ্ভিদে না রেখে প্রোটিস্টায় রাখলেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ইউগ্লিনা এককোষী জীব, এর কোনো সেলুলোজ প্রাচীর নেই (পরিবর্তে প্রোটিনের পেলিকল থাকে) এবং অন্ধকারে এরা উদ্ভিদের মতো খাদ্য তৈরি না করে ক্ষুদ্র জীব শিকার করে (মিক্সোট্রফিক পুষ্টি)। হুইটেকার সমস্ত এককোষী ইউক্যারিওটকে প্রোটিস্টায় স্থান দেন।
2
ব্যাসিডিওমাইসিটিস ছত্রাকের ডলিপোর সেপ্টামের (Dolipore Septum) গুরুত্ব কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ডলিপোর সেপ্টাম হলো একটি পিপার মতো স্ফীত ছিদ্রযুক্ত অনুপ্রস্থ প্রাচীর, যা সাইটোপ্লাজম ও পুষ্টির আদান-প্রদান অব্যাহত রাখে কিন্তু নিউক্লিয়াসের অনাকাঙ্ক্ষিত চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ডাইক্যারিওন দশার স্থায়িত্ব রক্ষা করে।
3
ডিউটেরোমাইসিটিসকে কেন 'অসম্পূর্ণ ছত্রাক' (Fungi Imperfecti) বলা হয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: কারণ এই শ্রেণির ছত্রাকদের শুধুমাত্র অঙ্গজ বা অযৌন দশা আবিষ্কৃত হয়েছে; কোনো যৌন জনন দশা জানা যায়নি। এদের যৌন দশা শনাক্ত হওয়ামাত্র এদের অ্যাসকোমাইসিটিস বা ব্যাসিডিওমাইসিটিসে স্থানান্তরিত করা হয়।
4
গবেষণাগারে কৃত্রিম অ্যাগার-পেপটন পুষ্টি মাধ্যমে কি ভাইরাসকে একা বংশবৃদ্ধি করানো সম্ভব?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: না। ভাইরাস বাধ্যতামূলক অন্তঃকোষীয় পরজীবী। এদের নিজস্ব রাইবোজোম, টি-আরএনএ বা এটিপি তৈরির কোনো বিপাকীয় উৎসেচক নেই। এরা একমাত্র জীবিত পোষক কোষের জৈব সংশ্লেষী ব্যবস্থা দখল করলেই রেপ্লিকেশন সম্পন্ন করতে পারে।
5
নগ্ন শিলায় বাস্তুতান্ত্রিক উত্তরাধিকারের সূচনায় লাইকেনকে পথিকৃৎ (Pioneer) বলা হয় কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: লাইকেন চরম শুষ্ক ও মাটিশূন্য পাথরের ওপর প্রথম জন্ম নিতে সক্ষম। এরা উসনিক অ্যাসিডের মতো জৈব অ্যাসিড ক্ষরণ করে কঠিন শিলাস্তরকে চূর্ণ করে মাটিতে রূপান্তরিত করে, যা পরবর্তীতে মস ও উদ্ভিদের জন্মানোর ভিত্তি রচনা করে।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 11 Biology — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: সজীব বিশ্ব অধ্যায় 2: জীবের শ্রেণিবিন্যাস অধ্যায় 3: উদ্ভিদ রাজ্য অধ্যায় 4: প্রাণী রাজ্য অধ্যায় 5: সপুষ্পক উদ্ভিদের অঙ্গসংস্থান অধ্যায় 6: সপুষ্পক উদ্ভিদের অন্তর্গঠন অধ্যায় 7: প্রাণীদের গঠনগত সংগঠন অধ্যায় 8: কোষ: জীবনের একক অধ্যায় 9: জৈব অণুসমূহ অধ্যায় 10: কোষ চক্র ও কোষ বিভাজন অধ্যায় 11: উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদে সালোকসংশ্লেষ অধ্যায় 12: উদ্ভিদে শ্বসন অধ্যায় 13: উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও পরিবর্ধন অধ্যায় 14: পরিপাক ও শোষণ অধ্যায় 15: শ্বাসকার্য ও গ্যাসীয় বিনিময় অধ্যায় 16: দেহ তরল ও সংবহন অধ্যায় 17: রেচন পদার্থ ও তাদের নিষ্কাশন অধ্যায় 18: চলন ও গমন অধ্যায় 19: স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় অধ্যায় 20: রাসায়নিক সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

জীবের শ্রেণিবিন্যাস অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।