সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ নিজের প্রয়োজনে জীবজগৎকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে এসেছে। কিন্তু জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস করেন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল। তিনি বাহ্যিক গঠনগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে উদ্ভিদকে বৃক্ষ (Trees), গুল্ম (Shrubs) ও বীরুৎ (Herbs)—এই তিন ভাগে এবং প্রাণীদের লোহিত রক্তযুক্ত (এনেমা বা Enaima) ও লোহিত রক্তবিহীন (অ্যানেমা বা Anaima)—এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছিলেন।
অষ্টাদশ শতকে সুইডিশ প্রকৃতিবিদ ক্যারোলাস লিনিয়াস (Carolus Linnaeus) সমগ্র জীবজগৎকে দুটি রাজ্যে বিভক্ত করেন:
- প্ল্যান্টি বা উদ্ভিদ রাজ্য (Plantae): কোষপ্রাচীরযুক্ত সমস্ত জীব, যেমন—ব্যাকটেরিয়া, নীলাভ-সবুজ শৈবাল, ছত্রাক, মস, ফার্ন, ব্যক্তবীজী ও গুপ্তবীজী উদ্ভিদ।
- অ্যানিম্যালিয়া বা প্রাণী রাজ্য (Animalia): কোষপ্রাচীরবিহীন, গমনশীল ও হলোজোয়িক পুষ্টিযুক্ত বহুকোষী প্রাণীসমূহ।
দ্বি-রাজ্য শ্রেণিবিন্যাসের মারাত্মক ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা:
- প্রোক্যারিওট ও ইউক্যারিওটের সংমিশ্রণ: সুগঠিত নিউক্লিয়াসবিহীন প্রোক্যারিওটিক অণুজীব (যেমন ব্যাকটেরিয়া, সায়ানোব্যাকটেরিয়া)-কে সুগঠিত নিউক্লিয়াসযুক্ত ইউক্যারিওটদের সাথে একই রাজ্যে রাখা হয়েছিল।
- এককোষী ও বহুকোষী জীবের সংমিশ্রণ: এককোষী Chlamydomonas ও Amoeba-কে জটিল বহুকোষী শৈবাল ও প্রাণীদের সাথে একত্রে রাখা হয়েছিল।
- স্বভোজী ও পরভোজী জীবের অযৌক্তিক অন্তর্ভুক্তি: সালোকসংশ্লেষকারী সবুজ শৈবাল এবং ক্লোরোফিলবিহীন, কাইটিন প্রাচীরযুক্ত মৃতজীবী ছত্রাক উভয়কেই উদ্ভিদ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
এই সমস্ত অসংগতি ও দ্বন্দ্ব নিরসন করতে মার্কিন বাস্তুবিদ রবার্ট এইচ. হুইটেকার (Robert H. Whittaker, 1969) সমগ্র জীবজগৎকে পাঁচটি রাজ্যে বিভক্ত করেন: মনেরা, প্রোটিস্টা, ছত্রাক (Fungi), প্ল্যান্টি ও অ্যানিম্যালিয়া।
| বৈশিষ্ট্য | মনেরা (Monera) | প্রোটিস্টা (Protista) | ছত্রাক (Fungi) | প্ল্যান্টি (Plantae) | অ্যানিম্যালিয়া (Animalia) |
|---|---|---|---|---|---|
| কোষের প্রকার | প্রোক্যারিওটিক | ইউক্যারিওটিক | ইউক্যারিওটিক | ইউক্যারিওটিক | ইউক্যারিওটিক |
| কোষপ্রাচীর | অ-সেলুলোজীয় (পেপটিডোগ্লাইক্যান) | কোনো কোনোটিতে উপস্থিত (ডায়াটম), কোনোটিতে অনুপস্থিত | উপস্থিত (কাইটিন ও পলিস্যাকারাইড) | উপস্থিত (সেলুলোজ, পেকটিন) | অনুপস্থিত |
| নিউক্লিয়ার পর্দা | অনুপস্থিত | উপস্থিত | উপস্থিত | উপস্থিত | উপস্থিত |
| দেহ সংগঠন | এককোষী (কোষীয় স্তর) | এককোষী (কোষীয় স্তর) | বহুকোষী / শিথিল কলা (মাইসেলিয়াম) | কলা / অঙ্গ স্তর | কলা / অঙ্গ / তন্ত্র স্তর |
| পুষ্টির ধরন | স্বভোজী (সালোকসংশ্লেষী ও রাসায়নিক সংশ্লেষী) এবং পরভোজী (মৃতজীবী / পরজীবী) | স্বভোজী (সালোকসংশ্লেষী) এবং পরভোজী / মিক্সোট্রফিক | পরভোজী (মৃতজীবী / পরজীবী / বিশোষণমূলক) | স্বভোজী (সালোকসংশ্লেষকারী) | পরভোজী (হলোজোয়িক / প্রাণীসদৃশ) |
- কোষীয় সংগঠনের জটিলতা: প্রোক্যারিওটিক নাকি ইউক্যারিওটিক কোষ।
- দেহ গঠনের জটিলতা: এককোষী নাকি বহুকোষী/কলা/অঙ্গ স্তরের সংগঠন।
- পুষ্টির পদ্ধতি: খাদ্য সংশ্লেষ (প্ল্যান্টি), বিশোষণ (ছত্রাক) নাকি গ্রাসমূলক হলোজোয়িক (অ্যানিম্যালিয়া)।
- প্রজনন পদ্ধতি: অঙ্গজ, অযৌন ও যৌন জনন চক্রের উপস্থিতি।
- জাতিজনি বা বিবর্তনীয় সম্পর্ক (Phylogenetic relationships): পূর্বপুরুষ থেকে আধুনিক জীবের বিবর্তনীয় ধারা।