সালোকসংশ্লেষ হলো একটি জটিল উপচিতিমূলক ভৌত-রাসায়নিক প্রক্রিয়া যার দ্বারা সবুজ উদ্ভিদ সূর্যালোকের উপস্থিতিতে অজৈব উপাদান ($\text{CO}_2$ ও জল) থেকে শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি করে এবং উপজাত হিসেবে অক্সিজেন নির্গত করে। আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরীক্ষাগুলি নিম্নরূপ:
- যোসেফ প্রিস্টলে (১৭৭০): আবদ্ধ বেলজার, জ্বলন্ত মোমবাতি, একটি জীবন্ত ইঁদুর এবং একটি সতেজ পুদিনা গাছ (Mentha) নিয়ে বিখ্যাত পরীক্ষা করেন। তিনি লক্ষ্য করেন বদ্ধ বেলজারে মোমবাতি দ্রুত নিভে যায় এবং ইঁদুরটি শ্বাসকষ্টে মারা যায়; কিন্তু সতেজ পুদিনা গাছ রাখলে মোমবাতি জ্বলতে থাকে এবং ইঁদুরটি সুস্থভাবে বেঁচে থাকে। প্রিস্টলে সিদ্ধান্তে আসেন যে শ্বসনকারী প্রাণী ও জ্বলন্ত মোমবাতি বায়ুকে যে কারণে দূষিত বা বিনষ্ট করে, সবুজ উদ্ভিদ তা পুনরুদ্ধার ও বিশোধন করে। ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে প্রিস্টলে অক্সিজেন গ্যাস আবিষ্কার করেন।
- জান ইনগেনহাউস (১৭৭৯): প্রমাণ করেন যে উদ্ভিদের বায়ু বিশোধনের জন্য সূর্যালোকের উপস্থিতি একান্ত আবশ্যক। তিনি জলজ উদ্ভিদ (Hydrilla) নিয়ে দেখান যে উজ্জ্বল আলোতে উদ্ভিদের সবুজ অংশের চারপাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্যাসের বুদবুদ সৃষ্টি হয়, কিন্তু অন্ধকারে কোনো বুদবুদ তৈরি হয় না। পরবর্তীতে তিনি প্রমাণ করেন এই বুদবুদগুলি হলো অক্সিজেন গ্যাস।
- জুলিয়াস ফন স্যাক্স (১৮৫৪): প্রমাণ করেন উদ্ভিদের বৃদ্ধির সময় গ্লুকোজ উৎপন্ন হয় এবং তা শ্বেতসার (স্টার্চ) হিসেবে সঞ্চিত হয়। তিনি আরও প্রদর্শন করেন যে ক্লোরোফিল উদ্ভিদের কোষের বিশেষ অঙ্গাণুতে (ক্লোরোপ্লাস্ট) অবস্থিত।
- টি. ডব্লিউ. এঙ্গেলম্যান (১৮৮৮): প্রিজমের সাহায্যে সাদা আলোকে বিভিন্ন বর্ণালীতে বিভক্ত করে ফিলামেন্টাস সবুজ শৈবাল Cladophora-র উপর আপতিত করেন এবং শৈবালটিকে বায়বীয় ব্যাকটেরিয়ার (অক্সিজেন প্রিয় ব্যাক্টেরিয়া) দ্রবণে নিমজ্জিত করেন। তিনি দেখতে পান ব্যাক্টেরিয়াগুলি মূলত নীল ও লাল আলোর অঞ্চলে পুঞ্জীভূত হয়। এটিই ছিল সালোকসংশ্লেষের প্রথম কার্য বর্ণালী (Action Spectrum)।
- কর্নেলিয়াস ভ্যান নিল (১৯৩০-এর দশক): বেগুনী ও সবুজ সালফার ব্যাক্টেরিয়ার তুলনামূলক শারীরবৃত্তীয় গবেষণা থেকে দেখান যে সালোকসংশ্লেষ মূলত একটি আলোক-নির্ভর জারণ-বিজারণ বিক্রিয়া, যেখানে একটি জারণযোগ্য যৌগ থেকে হাইড্রোজেন এসে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে বিজারিত করে:
$$2\text{H}_2\text{A} + \text{CO}_2 \xrightarrow{\text{আলোক}} 2\text{A} + \text{CH}_2\text{O} + \text{H}_2\text{O}$$সবুজ উদ্ভিদে জল হলো হাইড্রোজেন দাতা এবং তা জারিত হয়ে $\text{O}_2$ উৎপন্ন করে। সালফার ব্যাকটেরিয়ায় $\text{H}_2\text{S}$ হাইড্রোজেন দাতা হওয়ায় সালফার উৎপন্ন হয়। ভ্যান নিল তত্ত্ব দেন যে উদ্ভিদের নির্গত অক্সিজেন জল ($\text{H}_2\text{O}$) থেকে আসে, $\text{CO}_2$ থেকে নয়। ১৯৪১ সালে রূবেন, রান্ডাল ও কামেন ভারী আইসোটোপ $^{18}\text{O}$ ব্যবহার করে এটি চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করেন:$$6\text{CO}_2^{16} + 12\text{H}_2\text{O}^{18} \xrightarrow{\text{আলোক, ক্লোরোফিল}} \text{C}_6\text{H}_{12}\text{O}_6^{16} + 6\text{H}_2\text{O}^{16} + 6\text{O}_2^{18}$$
পাতার মেসোফিল কলার কোষে গড়ে ২০ থেকে ১০০টি ক্লোরোপ্লাস্ট থাকে। ক্লোরোপ্লাস্টের অভ্যন্তরে সুনির্দিষ্ট কার্যগত শ্রমবণ্টন পরিলক্ষিত হয়:
| ক্লোরোপ্লাস্টের অংশ | গঠনগত রূপরেখা | শারীরবৃত্তীয় কার্য ও বিক্রিয়া দশা |
|---|---|---|
| গ্রানা ও থাইলাকয়েড পর্দা | চ্যাপ্টা দ্বিস্তরীয় থাইলাকয়েড থলি পরপর স্তূপীকৃত হয়ে গ্রানা গঠন করে। এতে PS I, PS II, সাইটোক্রোম $b_6f$ ও এটিপি সিন্থেজ প্রোথিত থাকে। | আলোক বিক্রিয়া (আলোক-রাসায়নিক দশা): সৌরশক্তি শোষণ, জলের সালোক-বিভাজন (ফটোলাইসিস), আত্তীকরণ শক্তি (ATP ও NADPH) উৎপাদন এবং অক্সিজেন নির্গমন। |
| থাইলাকয়েড লুমেন | থাইলাকয়েড পর্দার অভ্যন্তরস্থ জলীয় গহ্বর। আলোক দশায় উচ্চ প্রোটন সঞ্চয়ের কারণে এর pH আম্লিক (~৫.০) হয়। | জলের বিভাজন (OEC দ্বারা) এবং উচ্চমাত্রায় $H^+$ সঞ্চয় করে কেমিওসমোটিক নতিমাত্রা তৈরি করা। |
| স্ট্রোমা বা ধাত্র | ক্লোরোপ্লাস্টের অর্ধতরল ধাত্র; এতে বৃত্তাকার dsDNA, 70S রাইবোজোম, দ্রবণীয় উৎসেচক এবং ম্যাগনেসিয়াম আয়ন থাকে। | অন্ধকার দশা (জৈব-সংশ্লেষ দশা): রুবিসকো এনজাইমের উপস্থিতিতে ক্যালভিন চক্রের মাধ্যমে $\text{CO}_2$ বিজারণ ঘটিয়ে গ্লুকোজ সংশ্লেষ। |
| স্ট্রোমা ল্যামেলি (ফ্রেট নালী) | দুটি গ্রানার মধ্যে সংযোগকারী সমান্তরাল নালিকা। এতে PS II ও NADP রিডাকটেজ উৎসেচক থাকে না। | চক্রীয় ফটোফসফোরাইলেশন সম্পন্ন করে; কেবলমাত্র PS I ($P_{700}$) সক্রিয় থাকে এবং অতিরিক্ত ATP সংশ্লেষ করে। |