রক্ত হলো একটি বিশেষ তরল সংযোজক কলা যা তরল ধাত্র বা রক্তরস বা প্লাজমা (~৫৫%) এবং ভাসমান রক্তকণিকা বা ফর্মড এলিমেন্টস (~৪৫%) নিয়ে গঠিত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের দেহে মোট রক্তের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৫.৫ লিটার, যা মোট দৈহিক ওজনের প্রায় ৭–৮% এবং এর pH সামান্য ক্ষারীয় (৭.৩৫ থেকে ৭.৪৫)।
| রক্তের উপাদান | অনুপাত / পরিমাণ | উপাদানসমূহ ও শারীরবৃত্তীয় ভূমিকা |
|---|---|---|
| ১. রক্তরস (Plasma) | রক্তের মোট আয়তনের প্রায় ৫৫% | ঈষৎ হলুদ বর্ণের সান্দ্র তরল। এর মধ্যে ৯০–৯২% জল এবং ৬–৮% কঠিন পদার্থ থাকে:
|
| ২. রক্তকণিকা (Formed Elements) | রক্তের মোট আয়তনের প্রায় ৪৫% (হেমাটোক্রিট) | অস্থিমজ্জার হেমাটোপয়েটিক কলা থেকে উৎপন্ন তিন প্রকার কোষীয় উপাদান:
|
$$\mathbf{\text{সিরাম}} = \mathbf{\text{রক্তরস (প্লাজমা)}} - \mathbf{\text{তঞ্চনকারী উপাদানসমূহ}}$$ সিরাম কখনোই জমাট বাঁধে না এবং ক্লিনিক্যাল টেস্টে অ্যান্টিবডি বা হরমোন পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়।
লোহিত রক্তকণিকা (RBC বা এরিথ্রোসাইট): গঠন ও হিমোগ্লোবিন
পুরুষদের রক্তে লোহিত কণিকার সংখ্যা গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ লক্ষ প্রতি ঘন মিলিমিটার (মহিলাদের ক্ষেত্রে ৪৫ থেকে ৫০ লক্ষ প্রতি ঘন মিলিমিটার)।
- আকার ও আকৃতি: বৃত্তাকার এবং দ্বি-অবতল (Biconcave disc) চাকতির মতো (ব্যাস ~৭.২ $\mu\text{m}$)। এই বিশেষ আকারের জন্য এর পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি পায় যা দ্রুত গ্যাসীয় ব্যাপনে সহায়তা করে এবং সংকীর্ণ রক্তজালকের মধ্য দিয়ে সহজে যাতায়াত করতে পারে।
- নিউক্লিয়াসহীনতা: স্তন্যপায়ী প্রাণীর পরিণত লোহিত কণিকায় কোনো নিউক্লিয়াস, মাইটোকনড্রিয়া বা গলগি বডি থাকে না (ব্যতিক্রম: উট ও লামা)। মাইটোকনড্রিয়া না থাকার কারণে RBC অবাত শ্বসনে (অ্যানেরোবিক গ্লাইকোলাইসিস) শক্তি উৎপন্ন করে, ফলে এটি নিজে পরিবাহিত অক্সিজেনকে ব্যবহার করে ফেলে না।
- হিমোগ্লোবিন: প্রতি ১০০ মিলি রক্তে প্রায় ১২ থেকে ১৬ গ্রাম হিমোগ্লোবিন থাকে। এটি একটি লোহাঘটিত সংযুক্ত প্রোটিন, যাতে গ্লোবিন প্রোটিন (দুটি $\alpha$ ও দুটি $\beta$ শৃঙ্খল) এবং ৪টি হিম (Heme) গ্রুপ থাকে। প্রতিটি হিমোগ্লোবিন অণু ৪টি $\text{O}_2$ অণুকে যুক্ত করে পরিবহন করতে পারে।
- জীবনকাল ও ধ্বংস: লোহিত কণিকার গড় আয়ুষ্কাল ১২০ দিন। পরিণত ও দুর্বল RBC মূলত প্লীহায় (Spleen - "RBC-র কবরখানা") এবং যকৃতে ম্যাক্রোফেজ দ্বারা বিনষ্ট হয়। হিমের লোহা পুনরায় সংরক্ষিত হয় এবং অবশিষ্টাংশ পিত্তরঞ্জক (বিলিরুবিন ও বিলিভার্ডিন)-এ পরিণত হয়।
শ্বেত রক্তকণিকা (WBC বা লিউকোসাইট): প্রকারভেদ ও কার্যকারিতা
শ্বেত রক্তকণিকা হলো নিউক্লিয়াসযুক্ত, বর্ণহীন কোষ (স্বাভাবিক সংখ্যা ৬,০০০–৮,০০০/ঘন মিমি)। সাইটোপ্লাজমে দানার উপস্থিতির ভিত্তিতে এদের দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
ক. দানাদার শ্বেতকণিকা (Granulocytes - খণ্ডিত নিউক্লিয়াসযুক্ত)
- নিউট্রোফিল (৬০–৬৫%): সর্বাধিক সংখ্যক; ৩–৫টি খণ্ডকযুক্ত নিউক্লিয়াস (PMNL); নিরপেক্ষ রঞ্জকে রঞ্জিত। ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে ব্যাকটেরিয়াসহ বহিরাগত জীবাণু ভক্ষণ করে ধ্বংস করে।
- ইওসিনোফিল (২–৩%): দ্বি-খণ্ডকযুক্ত হেডফোনের মতো নিউক্লিয়াস; আম্লিক রঞ্জকে (ইওসিন) উজ্জ্বল লাল-কমলা বর্ণ ধারণ করে। হিস্টামিনেজ ক্ষরণ করে অ্যালার্জি প্রতিরোধ করে এবং কৃমি ধ্বংস করে।
- বেসোফিল (০.৫–১%): সর্বনিম্ন সংখ্যক; 'S'-আকৃতির নিউক্লিয়াস; ক্ষারীয় রঞ্জকে গাঢ় নীল বর্ণ ধারণ করে। হিস্টামিন (প্রদাহ সৃষ্টিকারী), সেরোটোনিন এবং হেপারিন (প্রাকৃতিক রক্ত তঞ্চনরোধক) ক্ষরণ করে।
খ. অদানাদার শ্বেতকণিকা (Agranulocytes - অখণ্ডিত নিউক্লিয়াসযুক্ত)
- মনোসাইট (৬–৮%): সর্ববৃহৎ শ্বেতকণিকা; বৃক্কাকার বা শিমের বীজের মতো নিউক্লিয়াস। রক্তজালক ভেদ করে (ডায়াপেডিসিস) কলায় প্রবেশ করে এবং অ্যামিবয়েড গতিতে সক্রিয় ম্যাক্রোফেজে রূপান্তরিত হয়ে ফ্যাগোসাইটোসিস চালায়।
- লিম্ফোসাইট (২০–২৫%): দ্বিতীয় প্রধান শ্বেতকণিকা; বৃহৎ গোলাকার গাঢ় নিউক্লিয়াসযুক্ত। B-লিম্ফোসাইট (অ্যান্টিবডি তৈরি করে হিউমোরাল অনাক্রম্যতা) এবং T-লিম্ফোসাইট (কোষ-ভিত্তিক অনাক্রম্যতা) গঠন করে রোগ প্রতিরোধ করে।
অণুচক্রিকা বা থ্রম্বোসাইট (Platelets): অস্থিমজ্জার বিশালাকার মেগাক্যারিওসাইট কোষ ভেঙে উৎপন্ন নিউক্লিয়াসবিহীন ক্ষুদ্র কোষীয় চাকতি (সংখ্যা ১.৫–৩.৫ লক্ষ/ঘন মিমি)। আয়ু ৭–১০ দিন। রক্তবাহিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে থ্রম্বোপ্লাস্টিন ক্ষরণ করে রক্ত তঞ্চন ঘটায়। অণুচক্রিকা কমে গেলে (থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া) রক্তক্ষরণ বন্ধ হতে চায় না।