Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি XI • Biology • অধ্যায় 16
আনুমানিক সময়: ৪৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

দেহ তরল ও সংবহন

দেহ তরল ও সংবহন হলো WBCHSE একাদশ শ্রেণি জীববিদ্যার মানব শারীরবিদ্যা এককের তৃতীয় অপরিহার্য অধ্যায়। এই মাস্টার পাঠ্যক্রমে রক্তের উপাদান ও রক্তকণিকার কলাস্থান, সিরাম বনাম প্লাজমা, ABO ও Rh রক্ত শ্রেণি, এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস ও RhoGAM প্রতিরোধ, রক্ত তঞ্চনের এনজাইম ক্যাসকেড বিক্রিয়া, লসিকা ও কলা তরলের শারীরবৃত্তীয় গতিবিদ্যা, হৃৎপিণ্ডের গঠন, মায়োজেনিক নোডাল সংবহন তন্ত্র, ০.৮ সেকেন্ডের কার্ডিয়াক চক্র, হৃদশব্দ (LUB ও DUB), সম্পূর্ণ দ্বি-সংবহন ও হেপাটিক পোর্টাল তন্ত্র, ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রামের (ECG) তরঙ্গমালা, সংবহনের স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস, অ্যানজাইনা ও হার্ট ফেইলিওরের মতো রোগব্যাধি বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

অধ্যায়টির গুরুত্ব

সংবহনতন্ত্র ও রক্ত সংবহন গতিবিদ্যার জৈবভৌত নীতি অনুধাবন করা কোষীয় বিপাক রক্ষা, অক্সিজেন সরবরাহ, অনাক্রম্যতা এবং অ্যাসিড-বেস ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য। এটি কার্ডিওলজি, হেমাটোলজি, অ্যানেস্থেসিওলজি, ব্লাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন এবং ক্রিটিক্যাল কেয়ার থেরাপিউটিকসের ভিত্তিমূল।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 মডিউল ১: রক্তের উপাদান, রক্তকণিকা ও...
2 মডিউল ২: ABO রক্ত শ্রেণি, Rh ফ্যাক্...
3 মডিউল ৩: রক্ত তঞ্চন কৌশল (ক্লটিং ক্...
4 মডিউল ৪: মানব হৃৎপিণ্ডের অঙ্গসংস্থা...
5 মডিউল ৫: কার্ডিয়াক নোডাল সংবহন তন্...
6 মডিউল ৬: ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

মডিউল ১: রক্তের উপাদান, রক্তকণিকা ও রক্তরস প্রোটিন

রক্ত হলো একটি বিশেষ তরল সংযোজক কলা যা তরল ধাত্র বা রক্তরস বা প্লাজমা (~৫৫%) এবং ভাসমান রক্তকণিকা বা ফর্মড এলিমেন্টস (~৪৫%) নিয়ে গঠিত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের দেহে মোট রক্তের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৫.৫ লিটার, যা মোট দৈহিক ওজনের প্রায় ৭–৮% এবং এর pH সামান্য ক্ষারীয় (৭.৩৫ থেকে ৭.৪৫)।

রক্তের উপাদান অনুপাত / পরিমাণ উপাদানসমূহ ও শারীরবৃত্তীয় ভূমিকা
১. রক্তরস (Plasma) রক্তের মোট আয়তনের প্রায় ৫৫% ঈষৎ হলুদ বর্ণের সান্দ্র তরল। এর মধ্যে ৯০–৯২% জল এবং ৬–৮% কঠিন পদার্থ থাকে:
  • অ্যালবুমিন (৪–৪.৫%): প্রধান প্লাজমা প্রোটিন; যকৃতে তৈরি হয়। কৈশিক নালিকায় রক্তরসের কলয়েড অভিস্রবণ চাপ (~২৫ mmHg) বজায় রেখে কলায় তরল জমা রোধ করে।
  • গ্লোবিউলিন (২–২.৫%): $\alpha$, $\beta$ এবং $\gamma$-গ্লোবিউলিন। গামা ($\gamma$) গ্লোবিউলিন (অ্যান্টিবডি বা ইমিউনোগ্লোবুলিন) প্লাজমা B-কোষ দ্বারা অনাক্রম্যতার জন্য ক্ষরিত হয়।
  • ফাইব্রিনোজেন (০.৩%): রক্ত তঞ্চনের জন্য অপরিহার্য দ্রবণীয় প্লাজমা প্রোটিন।
  • অন্যান্য: খনিজ আয়ন ($\text{Na}^+, \text{Ca}^{2+}, \text{Mg}^{2+}, \text{HCO}_3^-, \text{Cl}^-$), পুষ্টি উপাদান (গ্লুকোজ, অ্যামিনো অ্যাসিড) ও রেচন পদার্থ (ইউরিয়া)।
২. রক্তকণিকা (Formed Elements) রক্তের মোট আয়তনের প্রায় ৪৫% (হেমাটোক্রিট) অস্থিমজ্জার হেমাটোপয়েটিক কলা থেকে উৎপন্ন তিন প্রকার কোষীয় উপাদান:
  • লোহিত রক্তকণিকা (RBC): ৫০–৫৫ লক্ষ/ঘন মিমি; দ্বি-অবতল, নিউক্লিয়াসবিহীন; হিমোগ্লোবিন দ্বারা গ্যাস পরিবহন করে।
  • শ্বেত রক্তকণিকা (WBC): ৬,০০০–৮,০০০/ঘন মিমি; নিউক্লিয়াসযুক্ত; দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করে।
  • অণুচক্রিকা (Platelets): ১.৫–৩.৫ লক্ষ/ঘন মিমি; মেগাক্যারিওসাইট থেকে সৃষ্ট কোষ খণ্ডাংশ যা রক্ত তঞ্চন ঘটায়।
সিরামের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা: রক্ত তঞ্চন ঘটে যাওয়ার পর রক্তপিণ্ড বা ক্লট সংকুচিত হলে যে স্বচ্ছ হলুদ তরল বেরিয়ে আসে তাকে সিরাম (Serum) বলে। রক্তরস থেকে ফাইব্রিনোজেন ও অন্যান্য তঞ্চন উপাদান বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে তা-ই সিরাম:
$$\mathbf{\text{সিরাম}} = \mathbf{\text{রক্তরস (প্লাজমা)}} - \mathbf{\text{তঞ্চনকারী উপাদানসমূহ}}$$ সিরাম কখনোই জমাট বাঁধে না এবং ক্লিনিক্যাল টেস্টে অ্যান্টিবডি বা হরমোন পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়।

লোহিত রক্তকণিকা (RBC বা এরিথ্রোসাইট): গঠন ও হিমোগ্লোবিন

পুরুষদের রক্তে লোহিত কণিকার সংখ্যা গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ লক্ষ প্রতি ঘন মিলিমিটার (মহিলাদের ক্ষেত্রে ৪৫ থেকে ৫০ লক্ষ প্রতি ঘন মিলিমিটার)।

  • আকার ও আকৃতি: বৃত্তাকার এবং দ্বি-অবতল (Biconcave disc) চাকতির মতো (ব্যাস ~৭.২ $\mu\text{m}$)। এই বিশেষ আকারের জন্য এর পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল বৃদ্ধি পায় যা দ্রুত গ্যাসীয় ব্যাপনে সহায়তা করে এবং সংকীর্ণ রক্তজালকের মধ্য দিয়ে সহজে যাতায়াত করতে পারে।
  • নিউক্লিয়াসহীনতা: স্তন্যপায়ী প্রাণীর পরিণত লোহিত কণিকায় কোনো নিউক্লিয়াস, মাইটোকনড্রিয়া বা গলগি বডি থাকে না (ব্যতিক্রম: উট ও লামা)। মাইটোকনড্রিয়া না থাকার কারণে RBC অবাত শ্বসনে (অ্যানেরোবিক গ্লাইকোলাইসিস) শক্তি উৎপন্ন করে, ফলে এটি নিজে পরিবাহিত অক্সিজেনকে ব্যবহার করে ফেলে না।
  • হিমোগ্লোবিন: প্রতি ১০০ মিলি রক্তে প্রায় ১২ থেকে ১৬ গ্রাম হিমোগ্লোবিন থাকে। এটি একটি লোহাঘটিত সংযুক্ত প্রোটিন, যাতে গ্লোবিন প্রোটিন (দুটি $\alpha$ ও দুটি $\beta$ শৃঙ্খল) এবং ৪টি হিম (Heme) গ্রুপ থাকে। প্রতিটি হিমোগ্লোবিন অণু ৪টি $\text{O}_2$ অণুকে যুক্ত করে পরিবহন করতে পারে।
  • জীবনকাল ও ধ্বংস: লোহিত কণিকার গড় আয়ুষ্কাল ১২০ দিন। পরিণত ও দুর্বল RBC মূলত প্লীহায় (Spleen - "RBC-র কবরখানা") এবং যকৃতে ম্যাক্রোফেজ দ্বারা বিনষ্ট হয়। হিমের লোহা পুনরায় সংরক্ষিত হয় এবং অবশিষ্টাংশ পিত্তরঞ্জক (বিলিরুবিন ও বিলিভার্ডিন)-এ পরিণত হয়।

শ্বেত রক্তকণিকা (WBC বা লিউকোসাইট): প্রকারভেদ ও কার্যকারিতা

শ্বেত রক্তকণিকা হলো নিউক্লিয়াসযুক্ত, বর্ণহীন কোষ (স্বাভাবিক সংখ্যা ৬,০০০–৮,০০০/ঘন মিমি)। সাইটোপ্লাজমে দানার উপস্থিতির ভিত্তিতে এদের দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:

ক. দানাদার শ্বেতকণিকা (Granulocytes - খণ্ডিত নিউক্লিয়াসযুক্ত)
  • নিউট্রোফিল (৬০–৬৫%): সর্বাধিক সংখ্যক; ৩–৫টি খণ্ডকযুক্ত নিউক্লিয়াস (PMNL); নিরপেক্ষ রঞ্জকে রঞ্জিত। ফ্যাগোসাইটোসিস পদ্ধতিতে ব্যাকটেরিয়াসহ বহিরাগত জীবাণু ভক্ষণ করে ধ্বংস করে।
  • ইওসিনোফিল (২–৩%): দ্বি-খণ্ডকযুক্ত হেডফোনের মতো নিউক্লিয়াস; আম্লিক রঞ্জকে (ইওসিন) উজ্জ্বল লাল-কমলা বর্ণ ধারণ করে। হিস্টামিনেজ ক্ষরণ করে অ্যালার্জি প্রতিরোধ করে এবং কৃমি ধ্বংস করে।
  • বেসোফিল (০.৫–১%): সর্বনিম্ন সংখ্যক; 'S'-আকৃতির নিউক্লিয়াস; ক্ষারীয় রঞ্জকে গাঢ় নীল বর্ণ ধারণ করে। হিস্টামিন (প্রদাহ সৃষ্টিকারী), সেরোটোনিন এবং হেপারিন (প্রাকৃতিক রক্ত তঞ্চনরোধক) ক্ষরণ করে।
খ. অদানাদার শ্বেতকণিকা (Agranulocytes - অখণ্ডিত নিউক্লিয়াসযুক্ত)
  • মনোসাইট (৬–৮%): সর্ববৃহৎ শ্বেতকণিকা; বৃক্কাকার বা শিমের বীজের মতো নিউক্লিয়াস। রক্তজালক ভেদ করে (ডায়াপেডিসিস) কলায় প্রবেশ করে এবং অ্যামিবয়েড গতিতে সক্রিয় ম্যাক্রোফেজে রূপান্তরিত হয়ে ফ্যাগোসাইটোসিস চালায়।
  • লিম্ফোসাইট (২০–২৫%): দ্বিতীয় প্রধান শ্বেতকণিকা; বৃহৎ গোলাকার গাঢ় নিউক্লিয়াসযুক্ত। B-লিম্ফোসাইট (অ্যান্টিবডি তৈরি করে হিউমোরাল অনাক্রম্যতা) এবং T-লিম্ফোসাইট (কোষ-ভিত্তিক অনাক্রম্যতা) গঠন করে রোগ প্রতিরোধ করে।

অণুচক্রিকা বা থ্রম্বোসাইট (Platelets): অস্থিমজ্জার বিশালাকার মেগাক্যারিওসাইট কোষ ভেঙে উৎপন্ন নিউক্লিয়াসবিহীন ক্ষুদ্র কোষীয় চাকতি (সংখ্যা ১.৫–৩.৫ লক্ষ/ঘন মিমি)। আয়ু ৭–১০ দিন। রক্তবাহিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে থ্রম্বোপ্লাস্টিন ক্ষরণ করে রক্ত তঞ্চন ঘটায়। অণুচক্রিকা কমে গেলে (থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া) রক্তক্ষরণ বন্ধ হতে চায় না।

মডিউল ২: ABO রক্ত শ্রেণি, Rh ফ্যাক্টর ও এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস

নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের জন্য দাতা ও গ্রহীতার রক্তের অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডির সামঞ্জস্যতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অসামঞ্জস্য রক্ত দিলে অ্যান্টিবডির প্রতিক্রিয়ায় দাতার লোহিত কণিকাগুলো পুঞ্জীভূত (Agglutination) হয়ে জমাট বেঁধে যায় এবং বিদীর্ণ (Hemolysis) হয়ে রোগীর মৃত্যু ঘটাতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ব্যবস্থা হলো ABO রক্ত গ্রুপ এবং Rh রক্ত গ্রুপ।

রক্তের গ্রুপ RBC ঝিল্লির অ্যান্টিজেন (অ্যাগ্লুটিনোজেন) রক্তরসের অ্যান্টিবডি (অ্যাগ্লুটিনিন) কাকে রক্ত দান করতে পারে কার কাছ থেকে রক্ত গ্রহণ করতে পারে
A অ্যান্টিজেন A অ্যান্টি-B (b) A, AB A, O
B অ্যান্টিজেন B অ্যান্টি-A (a) B, AB B, O
AB অ্যান্টিজেন A ও অ্যান্টিজেন B উভয়ই কোনো অ্যান্টিবডি নেই শুধুমাত্র AB A, B, AB, O (সর্বজনীন গ্রহীতা)
O কোনো অ্যান্টিজেন নেই অ্যান্টি-A এবং অ্যান্টি-B উভয়ই A, B, AB, O (সর্বজনীন দাতা) শুধুমাত্র O

Rh ফ্যাক্টর (Rh Factor / Rhesus Antigen)

বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার এবং আলেকজান্ডার উইনার (১৯৪০) রেসাস বানরের লোহিত কণিকায় প্রথম এই অ্যান্টিজেনটি আবিষ্কার করেন। মানুষের ক্ষেত্রে প্রায় ৮০% ব্যক্তির লোহিত রক্তকণিকায় Rh অ্যান্টিজেন (D-অ্যান্টিজেন) থাকে ($\text{Rh}^+$), এবং বাকি ২০% ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত থাকে ($\text{Rh}^-$)।

  • ABO সিস্টেমের মতো Rh অ্যান্টিবডি রক্তরসে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি থাকে না। কেবল কোনো $\text{Rh}^-$ ব্যক্তি $\text{Rh}^+$ রক্তের সংস্পর্শে আসলেই রক্তরসে অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি উৎপন্ন হয়।
  • কোনো $\text{Rh}^-$ ব্যক্তিকে প্রথমবারের মতো $\text{Rh}^+$ রক্ত দিলে তাৎক্ষণিক তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় না, তবে তার রক্তে প্রচুর অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যায়। পরবর্তীতে পুনরায় $\text{Rh}^+$ রক্ত দিলে প্রচণ্ড রক্ত বিশ্লেষণ ঘটে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।

এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস (Erythroblastosis Fetalis / নবজাতকের রক্তবিশ্লেষণ রোগ)

এটি একটি মারাত্মক ক্লিনিক্যাল অবস্থা যা $\text{Rh}^-$ মাতা এবং তার গর্ভস্থ $\text{Rh}^+$ ভ্রূণের (বাবার থেকে প্রাপ্ত) মধ্যে Rh অসামঞ্জস্যতার কারণে ঘটে:

  1. প্রথম গর্ভধারণ (সংবেদনশীলতা সৃষ্টি): প্রথম গর্ভাবস্থায় অমরা বা প্লাসেন্টার বাধার কারণে ভ্রূণ ও মায়ের রক্ত মিশ্রিত হয় না। তবে সন্তান প্রসবের সময় অমরা ছিঁড়ে গেলে কিছু $\text{Rh}^+$ ভ্রূণীয় লোহিত কণিকা মায়ের রক্তে প্রবেশ করে। মায়ের অনাক্রম্যতন্ত্র একে বহিরাগত অ্যান্টিজেন হিসেবে চিনে অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি (IgG প্রকৃতির) তৈরি করে। প্রথম সন্তান অক্ষত অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে জন্মায়।
  2. পরবর্তী $\text{Rh}^+$ গর্ভধারণ (মারাত্মক আক্রমণ): দ্বিতীয় বা পরবর্তীকালে মাতা পুনরায় $\text{Rh}^+$ ভ্রূণ ধারণ করলে, মায়ের রক্তে থাকা ক্ষুদ্র IgG অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি সহজে অমরা অতিক্রম করে ভ্রূণের সংবহনে প্রবেশ করে। এই অ্যান্টিবডিগুলো ভ্রূণের $\text{Rh}^+$ লোহিত কণিকাকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে ফেলে।
  3. লক্ষণ ও পরিণতি: ভ্রূণের তীব্র রক্তাল্পতা (Anemia), অতিরিক্ত বিলিরুবিন জমার কারণে মারাত্মক জন্ডিস (যা মস্তিষ্কে জমে কার্নিকটেরাস পক্ষাঘাত ঘটায়), অপরিণত নিউক্লিয়াসযুক্ত এরিথ্রোব্লাস্ট কণার উপস্থিতি এবং সারা দেহে জল জমে মারাত্মক ফোলা (Hydrops fetalis), যার ফলে গর্ভেই ভ্রূণের মৃত্যু হতে পারে।
  4. চিকিৎসা ও প্রতিরোধ: প্রথম $\text{Rh}^+$ সন্তান প্রসবের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে $\text{Rh}^-$ মাতাকে কৃত্রিমভাবে তৈরি অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি (RhoGAM / অ্যান্টি-D ইমিউনোগ্লোবুলিন) ইনজেকশন দিতে হয়। এটি মায়ের রক্তে প্রবেশ করা ভ্রূণীয় লোহিত কণিকাকে নষ্ট করে দেয় যাতে মায়ের শরীরে স্বাভাবিক অ্যান্টিবডি ও মেমরি কোষ তৈরি হতে না পারে।

মডিউল ৩: রক্ত তঞ্চন কৌশল (ক্লটিং ক্যাসকেড) ও লসিকা তরল

রক্তক্ষরণ নিবারণ বা হেমোস্ট্যাসিস হলো এমন একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে রক্তবাহিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে রক্তপাত বন্ধ করা হয়। এর প্রধান ধাপ হলো রক্ত তঞ্চন (Blood Coagulation), যার মাধ্যমে তরল রক্ত একটি জেলি সদৃশ অদ্রবণীয় ফাইব্রিন জালকে পরিণত হয়ে রক্তক্ষরণ রোধ করে।

রক্ত তঞ্চনের এনজাইম ক্যাসকেড তত্ত্ব (Enzyme Cascade Theory)

রক্তে ১৩টি তঞ্চন উপাদান (ফ্যাক্টর I থেকে XIII) নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে। রক্তবাহিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়া বা ক্যাসকেড শুরু হয়, যা মূলত তিনটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হয়:

ধাপ ১: থ্রম্বোকাইনেজ বা প্রোথ্রম্বিনেজ কমপ্লেক্স গঠন
আঘাতপ্রাপ্ত স্থান দুটি পথ দিয়ে উদ্দীপিত হয়:
  • বহিঃস্থ পথ (Extrinsic pathway): ক্ষতিগ্রস্ত কলাকোষ থেকে নিঃসৃত কলা থ্রম্বোপ্লাস্টিন (ফ্যাক্টর III) দ্বারা দ্রুত শুরু হয় (১৫ সেকেন্ড)।
  • অন্তঃস্থ পথ (Intrinsic pathway): রক্তবাহিকার এন্ডোথেলিয়াম ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কোলাজেন উন্মুক্ত হলে ফ্যাক্টর XII এবং ভেঙে যাওয়া অণুচক্রিকা থেকে নিঃসৃত প্লেটলেট ফ্যাক্টর 3 (PF3) দ্বারা শুরু হয় (১–৬ মিনিট)।
  • উভয় পথ সম্মিলিতভাবে ক্যালসিয়াম আয়ন ($\text{Ca}^{2+}$, ফ্যাক্টর IV) এবং ফ্যাক্টর V-এর উপস্থিতিতে সক্রিয় থ্রম্বোকাইনেজ (প্রোথ্রম্বিনেজ) উৎসেচক যৌগ গঠন করে।
ধাপ ২: প্রোথ্রম্বিন থেকে সক্রিয় থ্রম্বিনে রূপান্তর
সক্রিয় থ্রম্বোকাইনেজ এনজাইম $\text{Ca}^{2+}$ আয়নের সহায়তায় রক্তরসের নিষ্ক্রিয় প্লাজমা প্রোটিন প্রোথ্রম্বিনকে (ফ্যাক্টর II) সক্রিয় প্রোটিওলাইটিক এনজাইম থ্রম্বিনে রূপান্তরিত করে:
$$\text{প্রোথ্রম্বিন (নিষ্ক্রিয়)} \xrightarrow[\text{Ca}^{2+}]{\text{থ্রম্বোকাইনেজ}} \text{থ্রম্বিন (সক্রিয়)}$$
ধাপ ৩: ফাইব্রিনোজেন থেকে অদ্রবণীয় ফাইব্রিন জালক গঠন
সক্রিয় থ্রম্বিন রক্তরসে দ্রবীভূত ফাইব্রিনোজেনকে (ফ্যাক্টর I) ভেঙে অদ্রবণীয় ফাইব্রিন মনোমারে পরিণত করে। এই মনোমারগুলো দীর্ঘ ফাইব্রিন তন্তুতে পলিমারাইজড হয়। পরবর্তীতে $\text{Ca}^{2+}$ এবং ফ্যাক্টর XIII (ফাইব্রিন স্থিতিশীলকারী ফ্যাক্টর)-এর প্রভাবে ফাইব্রিন তন্তুগুলো পরস্পর সমযোজী বন্ধনে যুক্ত হয়ে এক দুর্ভেদ্য ত্রিমাত্রিক জালক তৈরি করে:
$$\text{ফাইব্রিনোজেন (দ্রবণীয়)} \xrightarrow{\text{থ্রম্বিন}} \text{ফাইব্রিন মনোমার} \xrightarrow[\text{ফ্যাক্টর XIII}]{\text{Ca}^{2+}} \text{ফাইব্রিন জালক (অদ্রবণীয় ক্লট)}$$ এই আঠালো ফাইব্রিন তন্তুর ফাঁকে লোহিত কণিকা ও অণুচক্রিকা আটকে গিয়ে রক্তপিণ্ড বা ক্লট (Thrombus) গঠিত হয় এবং রক্তপাত বন্ধ হয়।

ক্যালসিয়াম আয়ন, ভিটামিন K ও তঞ্চনরোধকের ভূমিকা

  • ক্যালসিয়াম আয়নের ($\text{Ca}^{2+}$) অপরিহার্যতা: ক্যালসিয়াম (ফ্যাক্টর IV) রক্ত তঞ্চন ক্যাসকেডের প্রতিটি প্রধান ধাপে এনজাইম কমপ্লেক্স তৈরিতে ও ফাইব্রিন তন্তু দৃঢ়ীকরণে অপরিহার্য। রক্তে ক্যালসিয়াম অপসারিত হলে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না।
  • ভিটামিন K-এর ভূমিকা: যকৃতে রক্ত তঞ্চনকারী চারটি প্রধান ফ্যাক্টর—ফ্যাক্টর II (প্রোথ্রম্বিন), ফ্যাক্টর VII, ফ্যাক্টর IX এবং ফ্যাক্টর X তৈরিতে গ্লুটামিক অ্যাসিডের কার্বক্সিলেশনের জন্য ভিটামিন K অপরিহার্য কো-ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। ভিটামিন K-এর অভাবে রক্ত তঞ্চনকাল বৃদ্ধি পেয়ে মারাত্মক রক্তক্ষরণ ঘটে।
  • রক্ত তঞ্চনরোধক (Anticoagulants):
    • দেহের ভেতরে স্বাভাবিক তঞ্চনরোধক: হেপারিন (Heparin), যা বেসোফিল ও মাস্ট কোষ ক্ষরণ করে এবং থ্রম্বিন গঠনে বাধা দেয়।
    • ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম তঞ্চনরোধক: সোডিয়াম সাইট্রেট, পটাশিয়াম অক্সালেট এবং EDTA, যা রক্তের $\text{Ca}^{2+}$ আয়নের সাথে যুক্ত হয়ে বা অধঃক্ষিপ্ত করে রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না।

লসিকা বা কলা রস (Lymph / Tissue Fluid): মধ্যবর্তী পরিবেশ

রক্ত যখন ধমনী থেকে সূক্ষ্ম কৈশিক জালকের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন উচ্চ হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপের প্রভাবে জল এবং ক্ষুদ্র দ্রবীভূত উপাদান জালকের প্রাচীর ভেদ করে কোষের অন্তর্বর্তী স্থানে নিঃসৃত হয়। একে কলা রস বা ইন্টারস্টিশিয়াল ফ্লুইড বলে। এই তরল যখন বিশেষ লসিকা নালীতে প্রবেশ করে, তখন তাকে লসিকা (Lymph) বলা হয়।

  • গঠন: লসিকা হলো একটি বর্ণহীন, ঈষৎ ক্ষারীয় তরল। এটি রক্তরসের অনুরূপ হলেও এতে প্রোটিনের ঘনত্ব অনেক কম থাকে, কোনো লোহিত কণিকা ও অণুচক্রিকা থাকে না, তবে প্রচুর পরিমাণে লিম্ফোসাইট শ্বেতকণিকা থাকে।
  • শারীরবৃত্তীয় গুরুত্ব:
    • মধ্যবর্তী পরিবেশ: রক্ত ও কলাকোষের মধ্যে পুষ্টি, গ্যাস ও হরমোন বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
    • ফ্যাট পরিবহন: ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাই-তে অবস্থিত কেন্দ্রীয় লসিকা নালী অর্থাৎ ল্যাকটিয়েল (Lacteal)-এর মাধ্যমে পাচিত চর্বি কাইলোমাইক্রন রূপে শোষিত হয়ে সংবহনে পৌঁছায়।
    • অনাক্রম্যতা: লসিকা গ্রন্থিতে (Lymph node) উপস্থিত ম্যাক্রোফেজ ও লিম্ফোসাইট ব্যাক্টেরিয়া ও ক্ষতিকারক কণিকা ধ্বংস করে।
    • তরল ভারসাম্য: প্রতিদিন প্রায় ২–৪ লিটার অতিরিক্ত কলা রস লসিকা নালী হয়ে থোরাসিক ডাক্টের মাধ্যমে পুনরায় রক্তে ফিরে আসে। লসিকা নালী অবরুদ্ধ হলে কলায় তরল জমে মারাত্মক ফোলা বা ইডেমা (Edema / ফাইলেরিয়াসিস) হয়।

মডিউল ৪: মানব হৃৎপিণ্ডের অঙ্গসংস্থান, কপাটিকা ও দ্বি-সংবহন

মানব হৃৎপিণ্ড হলো মেসোডার্ম থেকে উদ্ভূত, ফাঁপা, পেশিময় একটি পাম্পকারী অঙ্গ যা বক্ষ গহ্বরের মিডিয়াস্টিনাম অংশে দুই ফুসফুসের মাঝে সামান্য বাম দিকে হেলে অবস্থান করে। এটি প্রায় মানুষের একটি বন্ধ মুষ্টির সমান (~১২ সেমি লম্বা, ৯ সেমি চওড়া, ওজন প্রায় ২৫০–৩০০ গ্রাম) এবং প্রতিদিন প্রায় ৭,০০০ লিটার রক্ত পাম্প করে।

পেরিকার্ডিয়াম ও হৃৎ-প্রাচীরের স্তরসমূহ

হৃৎপিণ্ড দ্বিস্তরবিশিষ্ট তন্তুময় ও সেরাস পর্দা পেরিকার্ডিয়াম (Pericardium) দ্বারা সুরক্ষিত থাকে:

  • ফাইব্রাস পেরিকার্ডিয়াম: বাইরের শক্ত তন্তুময় স্তর যা হৃৎপিণ্ডকে স্টার্নাম ও ডায়াফ্রামের সাথে ধরে রাখে।
  • সেরাস পেরিকার্ডিয়াম: দুটি স্তর নিয়ে গঠিত—বাইরের প্যারাইটাল স্তর এবং ভেতরের ভিসেরাল স্তর (এপিকার্ডিয়াম)।
  • পেরিকার্ডিয়াল গহ্বর ও তরল: এই দুই স্তরের মধ্যবর্তী স্থানে ১৫ থেকে ৫০ মিলি পেরিকার্ডিয়াল রস থাকে যা স্পন্দনের সময় ঘর্ষণ রোধ করে।
  • হৃৎ-প্রাচীরের ত্রিস্তর:
    • এপিকার্ডিয়াম: বাইরের পাতলা প্রতিরক্ষামূলক স্তর।
    • মায়োকার্ডিয়াম: মধ্যবর্তী পুরু পেশী স্তর যা শাখা-প্রশাখা যুক্ত কার্ডিয়াক পেশীতন্তু দ্বারা গঠিত। কোষগুলো ইন্টারক্যালেটেড ডিস্ক (গ্যাপ জংশন) দিয়ে যুক্ত থেকে সম্মিলিত একক (Syncytium) হিসেবে কাজ করে।
    • এন্ডোকার্ডিয়াম: ভেতরের মসৃণ এন্ডোথেলিয়াল স্তর যা রক্তবাহের অন্তঃআস্তরণের সাথে অবিচ্ছিন্ন থাকে।
হৃৎ-প্রকোষ্ঠ রক্ত গ্রহণকারী রক্তবাহ (ইনফ্লো) রক্ত প্রেরণকারী রক্তবাহ (আউটফ্লো) গঠনগত ও চাপীয় বৈশিষ্ট্য
ডান অলিন্দ (Right Atrium) ঊর্ধ্ব ও নিম্ন মহ শিরা (SVC & IVC) এবং করোনারি সাইনাস। ডান নিলয়ে (ত্রিপত্রক কপাটিকা দিয়ে)। সারা দেহ থেকে অনক্সিজেনযুক্ত রক্ত গ্রহণ করে। প্রাচীর পাতলা; আন্তঃঅলিন্দ পর্দায় ভ্রূণীয় ফোরামেন ওভালের অবশেষ ফোসা ওভালিস থাকে।
ডান নিলয় (Right Ventricle) ডান অলিন্দ থেকে। ফুসফুসীয় ধমনী (Pulmonary trunk)। ফুসফুসে কম চাপে (২৫ mmHg) রক্ত পাঠায়। প্রাচীরের পুরুত্ব প্রায় ৪–৫ মিমি।
বাম অলিন্দ (Left Atrium) ৪টি ফুসফুসীয় শিরা (অক্সিজেনযুক্ত রক্ত বহন করে; কপাটিকাহীন)। বাম নিলয়ে (দ্বিপত্রক কপাটিকা দিয়ে)। ফুসফুস থেকে তাজা অক্সিজেনযুক্ত রক্ত গ্রহণ করে। মসৃণ প্রাচীরযুক্ত।
বাম নিলয় (Left Ventricle) বাম অলিন্দ থেকে। সিস্টেমিক মহাধমনী (Aorta)। সমগ্র দেহে উচ্চ চাপে (১২০ mmHg) রক্ত পাম্প করে। এর মায়োকার্ডিয়াম প্রাচীর ডান নিলয়ের চেয়ে ৩ গুণ বেশি পুরু (১২–১৫ মিমি)।

কপাটিকাসমূহ ও কর্ডি টেন্ডিনির ভূমিকা

  • অলিন্দ-নিলয় কপাটিকা (AV Valves):
    • ত্রিপত্রক কপাটিকা (Tricuspid Valve): ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের সংযোগস্থলে অবস্থিত ৩টি পাতবিশিষ্ট কপাটিকা।
    • দ্বিপত্রক বা মাইট্রাল কপাটিকা (Bicuspid / Mitral Valve): বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের সংযোগস্থলে অবস্থিত ২টি পাতবিশিষ্ট কপাটিকা।
    • কর্ডি টেন্ডিনি (Chordae Tendineae): কপাটিকার মুক্ত প্রান্তগুলো শক্তিশালী অস্থিতিস্থাপক তন্তুময় রজ্জু কর্ডি টেন্ডিনি দ্বারা নিলয় প্রাচীরের প্যাপিলারি পেশীর (Papillary muscles) সাথে আবদ্ধ থাকে। নিলয় সংকোচনের সময় প্যাপিলারি পেশী টান টান হয়ে কপাটিকাকে অলিন্দের দিকে উল্টে যাওয়া (Eversion) রোধ করে।
  • অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপাটিকা (Semilunar Valves): ফুসফুসীয় ধমনী ও মহাধমনীর সংযোগস্থলে ৩টি করে পকেট সদৃশ অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপাটিকা থাকে। নিলয় প্রসারণের সময় রক্ত যাতে ধমনী থেকে পুনরায় নিলয়ে ফিরে না আসে তা নিশ্চিত করে।

দ্বি-সংবহন ও বিশেষ পোর্টাল সংবহন

মানুষের সংবহনতন্ত্র হলো সম্পূর্ণ দ্বি-সংবহন (Double Circulation), অর্থাৎ রক্ত সারা দেহে একবার পরিভ্রমণ করতে হৃৎপিণ্ডের মধ্য দিয়ে দুবার প্রবাহিত হয়, ফলে অক্সিজেনযুক্ত ও অনক্সিজেনযুক্ত রক্ত কখনো মিশ্রিত হয় না:

  • ১. ফুসফুসীয় সংবহন (Pulmonary Circulation): ডান নিলয় $\to$ ফুসফুসীয় ধমনী $\to$ ফুসফুস (অক্সিজেন সংযোজন) $\to$ ৪টি ফুসফুসীয় শিরা $\to$ বাম অলিন্দ।
  • ২. সিস্টেমিক সংবহন (Systemic Circulation): বাম নিলয় $\to$ মহাধমনী $\to$ ধমনী ও কৈশিক জালক $\to$ কলাকোষ $\to$ শিরা ও মহাশিরা $\to$ ডান অলিন্দ।
  • ৩. হেপাটিক পোর্টাল তন্ত্র (Hepatic Portal System): পাকস্থলী, অন্ত্র, প্লীহা ও অগ্ন্যাশয় থেকে রক্ত সরাসরি হৃৎপিণ্ডে না গিয়ে হেপাটিক পোর্টাল শিরা দিয়ে প্রথমে যকৃতে (Liver) প্রবেশ করে এবং সেখানে সাইনুসয়েড নামক গৌণ জালক সৃষ্টি করে। এর ফলে পাচিত খাদ্য সরাসরি যকৃতে সঞ্চিত ও বিষমুক্ত হতে পারে।
  • ৪. করোনারি সংবহন (Coronary Circulation): মহাধমনীর গোড়া থেকে ডান ও বাম করোনারি ধমনী উৎপন্ন হয়ে স্বয়ং হৃৎপিণ্ডের পেশীকে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহ করে এবং করোনারি সাইনাস দিয়ে ডান অলিন্দে রক্ত ফিরিয়ে আনে।

মডিউল ৫: কার্ডিয়াক নোডাল সংবহন তন্ত্র, কার্ডিয়াক চক্র ও হৃৎ-শব্দ

মানুষের হৃৎপিণ্ড হলো মায়োজেনিক (Myogenic), অর্থাৎ হৃদস্পন্দনের মূল সংকেত কোনো বহিঃস্থ স্নায়ু উদ্দীপনা ছাড়াই হৃৎপিণ্ডের নিজস্ব রূপান্তরিত পেশীকলা বা নোডাল টিস্যু থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎপন্ন হয়। এমনকি হৃৎপিণ্ড দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করলেও উপযুক্ত অক্সিজেনযুক্ত দ্রবণে নিজে থেকেই স্পন্দিত হতে থাকে।

নোডাল সংবহন তন্ত্র ও পেসমেকার ব্যবস্থা

নোডাল টিস্যু চারটি সুনির্দিষ্ট আন্তঃসংযুক্ত অংশের সমন্বয়ে গঠিত:

  • ১. সাইনো-অ্যাট্রিয়াল নোড (SA নোড - প্রাকৃতিক পেসমেকার): ডান অলিন্দের ঊর্ধ্ব প্রাচীরে ঊর্ধ্ব মহাশিরার উন্মুক্ত স্থানের নিচে অবস্থিত। এর কোষগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে সর্বাধিক হারে (মিনিটে ৭০ থেকে ৭৫ বার, গড়ে ৭২ বার) অ্যাকশন পোটেনশিয়াল তৈরি করতে পারে। এটি সমগ্র হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের গতি নির্ধারণ করে বলে একে পেসমেকার (Pacemaker) বলে।
  • ২. অ্যাট্রিও-ভেন্ট্রিকুলার নোড (AV নোড - পেসসেটার): ডান অলিন্দের নিম্ন-বাম প্রান্তে আন্তঃঅলিন্দ পর্দার কাছে অবস্থিত। এটি উদ্দীপনা গ্রহণ করে এবং প্রায় ০.১ সেকেন্ডের একটি অপরিহার্য বিলম্ব (AV nodal delay) ঘটায়। এই বিরতির ফলে অলিন্দদ্বয়ের রক্ত সম্পূর্ণরূপে নিলয়ে পৌঁছানোর পরই নিলয় সংকোচন শুরু হতে পারে।
  • ৩. হিজের বান্ডিল (Bundle of His): তন্তুময় বলয় ভেদ করে আন্তঃনিলয় পর্দার ওপর দিয়ে অগ্রসর হয়ে ডান ও বাম শাখায় বিভক্ত হয়।
  • ৪. পারকিনজি তন্তু (Purkinje Fibers): নিলয়ের মায়োকার্ডিয়াম প্রাচীরে বিস্তৃত বিশেষায়িত পেশীতন্তুর জালক। এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে (প্রায় ৪ মিটার/সেকেন্ড) উদ্দীপনা নিলয় প্রাচীরে ছড়িয়ে দেয়, যার ফলে উভয় নিলয় একসাথে সুসংগতভাবে সংকুচিত হয়।
SA নোড $\xrightarrow{}$ অলিন্দ মায়োকার্ডিয়াম $\xrightarrow{\text{০.১ সে বিলম্ব}}$ AV নোড $\xrightarrow{}$ হিজের বান্ডিল $\xrightarrow{}$ পারকিনজি তন্তু $\xrightarrow{}$ নিলয় মায়োকার্ডিয়াম

কার্ডিয়াক চক্র বা হৃৎ-চক্র (Cardiac Cycle: সময়কাল ০.৮ সেকেন্ড)

বিশ্রামকালে মিনিটে ৭২ বার হৃদস্পন্দন হলে একটি একক কার্ডিয়াক চক্র সম্পন্ন হতে ঠিক ০.৮ সেকেন্ড সময় লাগে ($\frac{৬০\text{ সেকেন্ড}}{৭২\text{ বার}} \approx ০.৮৩\text{ সে}$):

১. যৌথ ডায়াস্টোল (Joint Diastole - সময়কাল: ০.৪ সেকেন্ড)
হৃৎপিণ্ডের চারটি প্রকোষ্ঠই শিথিল অবস্থায় থাকে। ত্রিপত্রক ও দ্বিপত্রক কপাটিকা উন্মুক্ত থাকে; অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপাটিকা বন্ধ থাকে। শিরা থেকে রক্ত অলিন্দে এসে সরাসরি নিলয়ে প্রবেশ করে এবং নিলয়ের প্রায় ৭০% রক্ত নিষ্ক্রিয়ভাবে পূরণ হয়।
২. অলিন্দ সিস্টোল (Atrial Systole - সময়কাল: ০.১ সেকেন্ড)
SA নোড থেকে উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়লে উভয় অলিন্দ একসাথে সংকুচিত হয় এবং বাকি ৩০% রক্ত সজোরে নিলয়ে নিক্ষিপ্ত হয়। নিলয় প্রসারণ শেষে প্রতিটি নিলয়ে রক্তের মোট পরিমাণকে এন্ড-ডায়াস্টোলিক ভলিউম ($\text{EDV} \approx ১২০\text{ মিলি}$) বলে।
৩. নিলয় সিস্টোল (Ventricular Systole - সময়কাল: ০.৩ সেকেন্ড)
AV নোড থেকে পারকিনজি তন্তু দিয়ে উদ্দীপনা পৌঁছালে নিলয়দ্বয় তীব্রভাবে সংকুচিত হতে শুরু করে:
  • আইসোভলিউমেট্রিক সংকোচন: নিলয়ের চাপ অলিন্দের চেয়ে বেড়ে গেলে রক্ত উল্টো প্রবাহের চাপে ত্রিপত্রক ও দ্বিপত্রক কপাটিকা সশব্দে বন্ধ হয়ে যায় (১ম হৃৎ-শব্দ: 'LUB' তৈরি হয়)।
  • রক্ত নিক্ষেপণ: নিলয়ের চাপ মহাধমনী (৮০ mmHg) ও ফুসফুসীয় ধমনীর (১৫ mmHg) চেয়ে বেড়ে গেলে অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপাটিকা খুলে যায় এবং প্রতি নিলয় থেকে প্রায় ৭০ মিলি রক্ত ধমনীতে নিক্ষিপ্ত হয় (স্ট্রোক ভলিউম)। সিস্টোল শেষে নিলয়ে অবশিষ্ট রক্তকে এন্ড-সিস্টোলিক ভলিউম ($\text{ESV} \approx ৫০\text{ মিলি}$) বলে।
৪. নিলয় ডায়াস্টোল (Ventricular Diastole - সময়কাল: ০.৫ সেকেন্ড)
নিলয় শিথিল হয় এবং চাপ কমে যায়। ধমনীর রক্ত ফিরে আসতে চাইলে অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপাটিকাগুলো সশব্দে বন্ধ হয়ে যায় (২য় হৃৎ-শব্দ: 'DUB' তৈরি হয়)। এরপর পুনরায় যৌথ ডায়াস্টোল শুরু হয়।
হৃৎ-শব্দ শব্দ রূপ শব্দের বৈশিষ্ট্য উৎপত্তির কারণ চক্রের সময়কাল
প্রথম হৃৎ-শব্দ ($S_1$) "LUB" (লাব) গম্ভীর, দীর্ঘস্থায়ী (~০.১২ সেকেন্ড), নিম্ন কম্পাঙ্কযুক্ত (২৫–৪৫ Hz)। নিলয় সিস্টোলের শুরুতে অলিন্দ-নিলয় (ত্রিপত্রক ও দ্বিপত্রক) কপাটিকাদ্বয় বন্ধ হওয়ার কারণে। নিলয় সিস্টোলের শুরুতে (ECG-তে R-তরঙ্গের সাথে মেলে)।
দ্বিতীয় হৃৎ-শব্দ ($S_2$) "DUB" (ডাপ) তীক্ষ্ণ, সংক্ষিপ্ত (~০.০৮ সেকেন্ড), উচ্চ কম্পাঙ্কযুক্ত (৫০ Hz)। নিলয় ডায়াস্টোলের শুরুতে অর্ধচন্দ্রাকৃতি (মহাধমনী ও ফুসফুসীয়) কপাটিকা সশব্দে বন্ধ হওয়ার কারণে। নিলয় ডায়াস্টোলের শুরুতে (ECG-তে T-তরঙ্গের শেষে মেলে)।

মডিউল ৬: ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG), কার্ডিয়াক আউটপুট ও সংবহনতন্ত্রের রোগব্যাধি

একটি ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG) হলো হৃদস্পন্দনের সময় কার্ডিয়াক পেশীকোষের কার্যকলাপে সৃষ্ট সামগ্রিক বৈদ্যুতিক বিভব পার্থক্যের গ্রাফিক্যাল চিত্রায়ন, যা শরীরের বহিরাংশে ইলেকট্রোড স্থাপন করে ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাফ যন্ত্র দ্বারা লিপিবদ্ধ করা হয় (উইলিয়াম আইন্থোভেন কর্তৃক উদ্ভাবিত, নোবেল পুরস্কার ১৯২৪)।

আদর্শ ইসিজি তরঙ্গমালা ও ক্লিনিক্যাল তাৎপর্য

  • P-তরঙ্গ (P-Wave): একটি ক্ষুদ্র ঊর্ধ্বমুখী তরঙ্গ। এটি SA নোড থেকে উদ্দীপনা ছড়িয়ে উভয় অলিন্দের ডিপোলারাইজেশন (তড়িৎ উদ্দীপনা) নির্দেশ করে, যার ফলে অলিন্দদ্বয় সংকুচিত হয়।
  • QRS কমপ্লেক্স (QRS Complex): একটি জটিল ও তীক্ষ্ণ ত্রি-স্তরীয় তরঙ্গ। এটি উভয় নিলয়ের দ্রুত ডিপোলারাইজেশন নির্দেশ করে। Q তরঙ্গের ঠিক পরেই নিলয় সিস্টোল শুরু হয়। নির্দিষ্ট সময়ে QRS তরঙ্গের সংখ্যা গণনা করে রোগীর হৃদস্পন্দন হার (Heart Rate) নির্ণয় করা হয়।
  • T-তরঙ্গ (T-Wave): একটি মসৃণ গম্বুজাকৃতি ঊর্ধ্বমুখী তরঙ্গ। এটি নিলয়ের রিপোলারাইজেশন নির্দেশ করে, অর্থাৎ উত্তেজিত অবস্থা থেকে নিলয়ের স্বাভাবিক মেরুকরণ বা শিথিলতায় প্রত্যাবর্তন। T তরঙ্গের সমাপ্তি নিলয় সিস্টোলের শেষ নির্দেশ করে।
  • ক্লিনিক্যাল গুরুত্ব:
    • হৃদস্পন্দন নির্ণয়: মিনিটে QRS কমপ্লেক্সের সংখ্যা গণনা করে হৃদস্পন্দন হার জানা যায়।
    • P-R ব্যবধান বৃদ্ধি: ০.২০ সেকেন্ডের বেশি হলে AV নোডাল ব্লকের লক্ষণ।
    • ST-সেগমেন্টের উত্তোলন: তীব্র মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (হার্ট অ্যাটাক)-এর প্রধান নির্দেশক।
    • T-তরঙ্গ উল্টে যাওয়া: হৃৎপেশীতে দীর্ঘস্থায়ী রক্ত ও অক্সিজেনের অভাব (Ischemia) প্রকাশ করে।

কার্ডিয়াক আউটপুট ও সংবহনের স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ

কার্ডিয়াক আউটপুট বা হৃৎ-উৎপাদ (CO) হলো প্রতি মিনিটে প্রতিটি নিলয় দ্বারা নিক্ষিপ্ত রক্তের মোট পরিমাণ:

$$\mathbf{\text{কার্ডিয়াক আউটপুট (CO)}} = \mathbf{\text{স্ট্রোক ভলিউম (SV)}} \times \mathbf{\text{হৃদস্পন্দন হার (HR)}} = ৭০\text{ মিলি} \times ৭২/\text{মিনিট} \approx \mathbf{৫,০৪০\text{ মিলি/মিনিট}} \approx \mathbf{৫\text{ লিটার/মিনিট}}$$

ক্রীড়াবিদদের স্ট্রোক ভলিউম বেশি (~১০০ মিলি) এবং বিশ্রামকালীন হৃদস্পন্দন কম (~৫০ bpm) হওয়ায় কঠিন শারীরিক পরিশ্রমে তারা কার্ডিয়াক আউটপুট ২৫ থেকে ৩৫ লিটার/মিনিট পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে (কার্ডিয়াক রিজার্ভ)।

সুষুম্নাশীর্ষকের কার্ডিয়াক কেন্দ্র দ্বারা নিয়ন্ত্রণ:

  • সিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র: কার্ডিয়াক ত্বরান্বিতকারী স্নায়ু নরঅ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ করে SA নোডকে উদ্দীপিত করে হৃদস্পন্দন হার, নিলয়ের সংকোচন ক্ষমতা এবং কার্ডিয়াক আউটপুট বৃদ্ধি করে।
  • প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র (ভেগাস স্নায়ু, X-তম করোটিক স্নায়ু): অ্যাসিটাইলকোলিন (ACh) ক্ষরণ করে SA নোডকে হাইপারপোলারাইজ করে হৃদস্পন্দনের হার এবং কার্ডিয়াক আউটপুট হ্রাস করে।
  • হরমোন নিয়ন্ত্রণ: অ্যাড্রিনাল মেডুলা থেকে ক্ষরিত অ্যাড্রেনালিন ও নরঅ্যাড্রেনালিন জরুরি অবস্থায় হৃদস্পন্দন এবং রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।

সংবহনতন্ত্র ও হৃৎপিণ্ডের রোগব্যাধিসমূহ

  • উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension): বিশ্রামকালে স্বাভাবিক রক্তচাপ ১২০/৮০ mmHg-এর তুলনায় রক্তচাপ ক্রমাগত ১৪০/৯০ mmHg বা তার বেশি থাকলে তাকে হাইপারটেনশন বলে। এর ফলে বাম নিলয় স্ফীত হয়, মস্তিষ্কে স্ট্রোক ঘটে এবং কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • করোনারি ধমনী রোগ (CAD) বা অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (Atherosclerosis): হৃৎপেশীতে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনীর অন্তঃপ্রাচীরে চর্বি, কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম ও তন্তুময় পদার্থ জমা হয়ে প্ল্যাক তৈরি করে। এতে ধমনীর রক্ত চলাচলের পথ সংকীর্ণ হয়ে যায়।
  • অ্যানজাইনা পেকটোরিস (Angina Pectoris): হৃৎপেশীতে রক্ত ও অক্সিজেনের সাময়িক ঘাটতির কারণে বুকের মাঝখানে প্রচণ্ড চাপ ও শ্বাসরোধকারী তীব্র ব্যথা অনুভূত হয় যা বাম বাহু ও কাঁধে ছড়িয়ে পড়ে। এতে হৃৎপেশীর স্থায়ী মৃত্যু ঘটে না। বিশ্রাম বা নাইট্রোগ্লিসারিন সেবনে ব্যথা দূর হয়।
  • মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা হার্ট অ্যাটাক (Myocardial Infarction): করোনারি ধমনীতে রক্তপিণ্ড আটকে রক্ত প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট হৃৎপেশীর অক্সিজেন অভাবে স্থায়ী মৃত্যু (Necrosis) ঘটে। তীব্র বুকে ব্যথা, ঘাম ও ইসিজিতে ST-সেগমেন্টের ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়।
  • হার্ট ফেইলিওর (Heart Failure): হৃৎপিণ্ডের এমন একটি দুর্বল অবস্থা যেখানে হৃৎপিণ্ড দেহের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে পারে না। ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধার কারণে একে কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিওর (CHF) বলা হয়।
পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পার্থক্য:
  • হার্ট ফেইলিওর: হৃৎপিণ্ড অকার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করে (পাম্পের দুর্বলতা)।
  • কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট: হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
  • হার্ট অ্যাটাক: করোনারি রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে হৃৎপেশীর কোষ বিনষ্ট হয়।

গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক তত্ত্ব, পথ ও সংজ্ঞাসমূহ

কার্ডিয়াক আউটপুট (হৃৎ-উৎপাদ) মৌলিক সমীকরণ
বিশ্রামরত সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কে ৫.০ থেকে ৫.৫ লিটার/মিনিট
প্রতি মিনিটে হৃৎপিণ্ডের প্রতিটি নিলয় দ্বারা সিস্টেমিক বা ফুসফুসীয় সংবহনে নিক্ষিপ্ত রক্তের মোট পরিমাণ।
স্ট্রোক ভলিউম (SV) সমীকরণ
প্রতি স্পন্দনে প্রতিটি নিলয় থেকে ৭০ মিলি রক্ত নির্গত হয়
একটি একক নিলয় সংকোচনের সময় নিলয় থেকে যে পরিমাণ রক্ত ধমনীতে নিক্ষিপ্ত হয়।
গড় ধমনী চাপ (Mean Arterial Pressure - MAP) সূত্র
৯৩.৩ mmHg (স্বাভাবিক পরিসীমা: ৭০–১০৫ mmHg)
সম্পূর্ণ কার্ডিয়াক চক্র জুড়ে কৈশিক জালকগুলোতে রক্ত সঞ্চালন পরিচালনাকারী গড় কার্যকরী চাপ।
পালস প্রেশার বা নাড়ি চাপ সমীকরণ
৪০ mmHg (সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক)
সিস্টোল ও ডায়াস্টোলের মধ্যে ধমনী রক্তচাপের পার্থক্যের বিস্তার বা বিস্তারমান।
রক্ত তঞ্চন ক্যাসকেডের রাসায়নিক সমীকরণ
মানুষের রক্ত তঞ্চনের স্বাভাবিক সময়কাল ৩ থেকে ৮ মিনিট
দ্রবণীয় ফাইব্রিনোজেনকে অদ্রবণীয় ফাইব্রিন জালকে রূপান্তরিত করার এনজাইম ক্যাসকেড বিক্রিয়া যা রক্তক্ষরণ বন্ধ করে।
সিরামের সমীকরণ
রক্ত জমাট বাঁধার পর নিঃসৃত স্বচ্ছ হলুদ তরল
তঞ্চন উপাদানবিহীন রক্তরস যা নিজে আর কখনোই জমাট বাঁধতে পারে না।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
মানব রক্তের কোষীয় উপাদানসমূহের বিবরণ দাও। উৎপত্তি, নিউক্লিয়াসের গঠন, রঞ্জন বৈশিষ্ট্য ও প্রতিরক্ষামূলক কাজের ভিত্তিতে দানাদার ও অদানাদার শ্বেতকণিকার পার্থক্য নিরূপণ করো। [২ + ৩ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
প্রথম অংশ: রক্তের কোষীয় উপাদানসমূহ (২ নম্বর):
রক্তের মোট আয়তনের প্রায় ৪৫% অংশ রক্তকণিকা নিয়ে গঠিত, যা তিন প্রকার কোষীয় উপাদান দ্বারা গঠিত:
১. লোহিত রক্তকণিকা (RBC): ৫০ থেকে ৫৫ লক্ষ/ঘন মিমি; দ্বি-অবতল, নিউক্লিয়াসহীন; হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড পরিবহন করে।
২. শ্বেত রক্তকণিকা (WBC): ৬,০০০ থেকে ৮,০০০/ঘন মিমি; নিউক্লিয়াসযুক্ত; ফ্যাগোসাইটোসিস ও অ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করে।
৩. অণুচক্রিকা (Platelets): ১.৫ থেকে ৩.৫ লক্ষ/ঘন মিমি; অস্থিমজ্জার মেগাক্যারিওসাইট থেকে সৃষ্ট কোষীয় খণ্ডাংশ যা রক্ত তঞ্চনে অংশ নেয়।

দ্বিতীয় অংশ: দানাদার ও অদানাদার শ্বেতকণিকার তুলনামূলক পার্থক্য (৩ নম্বর):
বৈশিষ্ট্য দানাদার শ্বেতকণিকা (Granulocytes) অদানাদার শ্বেতকণিকা (Agranulocytes)
সাইটোপ্লাজমীয় দানা সাইটোপ্লাজমে সুস্পষ্ট নির্দিষ্ট রঞ্জনযুক্ত দানা উপস্থিত থাকে। সাইটোপ্লাজমে কোনো নির্দিষ্ট দানা থাকে না (অদানাদার)।
নিউক্লিয়াসের আকৃতি নিউক্লিয়াস বহুরূপী এবং ২ থেকে ৫টি খণ্ডকে বিভক্ত (PMNL)। নিউক্লিয়াস অখণ্ড, একক এবং গোলাকার বা শিমের বীজের মতো।
প্রকারভেদ ও রঞ্জন • নিউট্রোফিল (৬০-৬৫%): নিরপেক্ষ রঞ্জক; ৩-৫ খণ্ডক।
• ইওসিনোফিল (২-৩%): আম্লিক রঞ্জক (ইওসিন); দ্বি-খণ্ডক।
• বেসোফিল (০.৫-১%): ক্ষারীয় রঞ্জক (মিথিলিন ব্লু); S-আকৃতি।
• লিম্ফোসাইট (২০-২৫%): বৃহৎ গোলাকার নিউক্লিয়াস।
• মনোসাইট (৬-৮%): শিমের মতো খাঁজযুক্ত নিউক্লিয়াস।
শারীরবৃত্তীয় ভূমিকা ব্যাকটেরিয়া ভক্ষণ (নিউট্রোফিল), অ্যালার্জি ও কৃমি প্রতিরোধ (ইওসিনোফিল), হিস্টামিন ও হেপারিন ক্ষরণ (বেসোফিল)। B ও T কোষ দ্বারা অ্যান্টিবডি তৈরি ও অনাক্রম্যতা রক্ষা (লিম্ফোসাইট); কলায় ম্যাক্রোফেজ রূপে ফ্যাগোসাইটোসিস (মনোসাইট)।
উদাহরণ 2
ABO রক্ত শ্রেণি এবং সর্বজনীন দাতা ও গ্রহীতার জৈবিক কারণ ব্যাখ্যা করো। এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস কী এবং কীভাবে এর প্রতিরোধ করা হয়? [২.৫ + ২.৫ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
প্রথম অংশ: ABO রক্ত শ্রেণি ও সর্বজনীন দাতা/গ্রহীতা (২.৫ নম্বর):
বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার (১৯০০) লোহিত কণিকার পৃষ্ঠের দুটি অ্যান্টিজেন (অ্যান্টিজেন A ও অ্যান্টিজেন B) এবং প্লাজমার দুটি অ্যান্টিবডির (অ্যান্টি-A ও অ্যান্টি-B অ্যাগ্লুটিনিন) ওপর ভিত্তি করে রক্তকে ৪টি গ্রুপে ভাগ করেন:
• A গ্রুপ: RBC-তে অ্যান্টিজেন A; প্লাজমায় অ্যান্টি-B।
• B গ্রুপ: RBC-তে অ্যান্টিজেন B; প্লাজমায় অ্যান্টি-A।
• AB গ্রুপ: RBC-তে অ্যান্টিজেন A ও B উভয়ই থাকে; কিন্তু প্লাজমায় কোনো অ্যান্টিবডি থাকে না। যেহেতু গ্রহীতার প্লাজমায় দাতার অ্যান্টিজেন ধ্বংসকারী কোনো অ্যান্টিবডি নেই, তাই AB ব্যক্তি যেকোনো ABO গ্রুপের রক্ত গ্রহণ করতে পারে, ফলে একে সর্বজনীন গ্রহীতা (Universal Recipient) বলে।
• O গ্রুপ: RBC-তে কোনো অ্যান্টিজেন থাকে না; প্লাজমায় অ্যান্টি-A ও অ্যান্টি-B উভয়ই থাকে। যেহেতু O গ্রুপের রক্তে কোনো বাহ্যিক অ্যান্টিজেন নেই যা গ্রহীতার অ্যান্টিবডি দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে, তাই O রক্ত যেকোনো ব্যক্তিকে দেওয়া যায়, ফলে একে সর্বজনীন দাতা (Universal Donor) বলে।

দ্বিতীয় অংশ: এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস ও এর প্রতিকার (২.৫ নম্বর):
• রোগের কারণ: $\text{Rh}^-$ মাতা যখন $\text{Rh}^+$ ভ্রূণ ধারণ করেন, তখন প্রসবের সময় প্লাসেন্টা ছিঁড়ে কিছু ভ্রূণীয় $\text{Rh}^+$ লোহিত কণিকা মায়ের রক্তে মেশে। মায়ের অনাক্রম্যতন্ত্র এর বিরুদ্ধে অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি (IgG গোত্রের) তৈরি করে। প্রথম সন্তান সুস্থভাবে জন্মায়।
• কিন্তু দ্বিতীয় বা পরবর্তী $\text{Rh}^+$ গর্ভধারণের সময় মায়ের রক্ত থেকে ক্ষুদ্র IgG অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি প্লাসেন্টা ভেদ করে ভ্রূণের রক্তে প্রবেশ করে এবং ভ্রূণের লোহিত কণিকাকে ব্যাপক হারে ধ্বংস করে দেয়।
• লক্ষণ: মারাত্মক অ্যানিমিয়া, জন্ডিস (কার্নিকটেরাস মস্তিষ্ক রোগ), অপরিনত নিউক্লিয়াসযুক্ত এরিথ্রোব্লাস্ট কণার বৃদ্ধি এবং গর্ভেই ভ্রূণের মৃত্যু (Hydrops fetalis)।
• প্রতিরোধ: প্রথম $\text{Rh}^+$ সন্তান প্রসবের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে $\text{Rh}^-$ মাতাকে পেশীতে অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি (RhoGAM / অ্যান্টি-D) ইনজেকশন দিতে হয়। এটি মায়ের রক্তে প্রবেশকারী ভ্রূণীয় RBC-কে দ্রুত ধ্বংস করে দেয়, ফলে মায়ের শরীরে নিজস্ব অ্যান্টিবডি বা মেমরি সেল তৈরি হতে পারে না।
উদাহরণ 3
বেস্ট ও টেলরের মতবাদ অনুসারে মানবদেহে রক্ত তঞ্চনের এনজাইম ক্যাসকেড বিক্রিয়ার ধাপসমূহ বর্ণনা করো। ক্যালসিয়াম আয়ন ও ভিটামিন K-এর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী? [৩ + ২ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
প্রথম অংশ: রক্ত তঞ্চনের তিনটি প্রধান ধাপ (৩ নম্বর):
রক্তবাহিকা আঘাতপ্রাপ্ত হলে একটি শৃঙ্খল উৎসেচক বিক্রিয়ার মাধ্যমে রক্ত তঞ্চন ঘটে:
১. ধাপ ১: থ্রম্বোকাইনেজ বা প্রোথ্রম্বিনেজ কমপ্লেক্স গঠন:
ক্ষতিগ্রস্ত কলা থেকে নিঃসৃত কলা থ্রম্বোপ্লাস্টিন (ফ্যাক্টর III) এবং ভেঙে যাওয়া অণুচক্রিকা থেকে নিঃসৃত প্লেটলেট ফ্যাক্টর 3 (PF3) প্লাজমার ফ্যাক্টর XII, X, V ও ক্যালসিয়াম আয়নের ($\text{Ca}^{2+}$, ফ্যাক্টর IV) সাথে মিলিত হয়ে সক্রিয় এনজাইম যৌগ থ্রম্বোকাইনেজ (প্রোথ্রম্বিনেজ) গঠন করে।
২. ধাপ ২: প্রোথ্রম্বিন থেকে থ্রম্বিন গঠন:
থ্রম্বোকাইনেজ উৎসেচক $\text{Ca}^{2+}$ আয়নের সহায়তায় রক্তরসের নিষ্ক্রিয় প্লাজমা প্রোটিন প্রোথ্রম্বিনকে (ফ্যাক্টর II) ভেঙে সক্রিয় থ্রম্বিনে পরিণত করে:
$$\text{প্রোথ্রম্বিন} \xrightarrow[\text{Ca}^{2+}]{\text{থ্রম্বোকাইনেজ}} \text{থ্রম্বিন}$$
৩. ধাপ ৩: ফাইব্রিনোজেন থেকে অদ্রবণীয় ফাইব্রিন জালক গঠন:
সক্রিয় থ্রম্বিন রক্তরসের দ্রবণীয় ফাইব্রিনোজেনকে (ফ্যাক্টর I) হাইড্রোলাইসিস করে অদ্রবণীয় ফাইব্রিন মনোমারে রূপান্তর করে। এই ফাইব্রিন মনোমারগুলো পলিমারাইজড হয়ে সুতোর মতো তন্তুতে পরিণত হয়। এরপর ফ্যাক্টর XIII (ফাইব্রিন স্ট্যাবিলাইজিং ফ্যাক্টর) ও $\text{Ca}^{2+}$-এর প্রভাবে ফাইব্রিন তন্তুগুলো সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একটি দুর্ভেদ্য ত্রিমাত্রিক জালক তৈরি করে:
$$\text{ফাইব্রিনোজেন (দ্রবণীয়)} \xrightarrow{\text{থ্রম্বিন}} \text{ফাইব্রিন মনোমার} \xrightarrow[\text{ফ্যাক্টর XIII}]{\text{Ca}^{2+}} \text{ফাইব্রিন জালক (অদ্রবণীয় ক্লট)}$$
এই ফাইব্রিন জালকের ফাঁকে রক্তকণিকা আটকে গিয়ে রক্ত তঞ্চন বা ক্লট তৈরি করে রক্তপাত বন্ধ করে।

দ্বিতীয় অংশ: ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন K-এর ভূমিকা (২ নম্বর):
• ক্যালসিয়াম আয়নের ($\text{Ca}^{2+}$) ভূমিকা: ক্যালসিয়াম (ফ্যাক্টর IV) রক্ত তঞ্চনের প্রতিটি ধাপে অপরিহার্য অজৈব কো-ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। এটি প্রোথ্রম্বিনেজ কমপ্লেক্সকে অণুচক্রিকার ফসফোলিপিডের সাথে যুক্ত করে এবং ফ্যাক্টর XIII দ্বারা ফাইব্রিন তন্তুর দৃঢ় জালক গঠনে সরাসরি অংশ নেয়।
• ভিটামিন K-এর ভূমিকা: ভিটামিন K যকৃতে হেপাটোসাইট কোষে চারটি প্রধান তঞ্চন ফ্যাক্টর—ফ্যাক্টর II (প্রোথ্রম্বিন), ফ্যাক্টর VII, ফ্যাক্টর IX এবং ফ্যাক্টর X সংশ্লেষের সময় গ্লুটামিক অ্যাসিডের কার্বক্সিলেশনের জন্য আবশ্যক কো-এনজাইম। ভিটামিন K-এর ঘাটতি হলে এই ফ্যাক্টরগুলো অকার্যকর থাকে এবং রক্তপাত বন্ধ হতে চায় না।
উদাহরণ 4
প্রকোষ্ঠ, কপাটিকা এবং নোডাল সংবহন কলার উল্লেখপূর্বক মানব হৃৎপিণ্ডের অন্তর্গঠন বর্ণনা করো। সাইনো-অ্যাট্রিয়াল নোডকে (SAN) পেসমেকার বলা হয় কেন? [৩ + ২ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
প্রথম অংশ: মানব হৃৎপিণ্ডের অন্তর্গঠন (৩ নম্বর):
মানুষের হৃৎপিণ্ড ৪টি প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট একটি পেশিময় অঙ্গ যা অনুদৈর্ঘ্য ও অনুপ্রস্থ পর্দা দ্বারা ডান ও বাম অংশে বিভক্ত:
১. প্রকোষ্ঠসমূহ:
• দুটি অলিন্দ (ডান ও বাম): পাতলা প্রাচীরযুক্ত রক্ত গ্রহণকারী প্রকোষ্ঠ। আন্তঃঅলিন্দ পর্দায় ফোসা ওভালিস থাকে। ডান অলিন্দ মহাশিরা থেকে দূষিত রক্ত এবং বাম অলিন্দ ৪টি ফুসফুসীয় শিরা থেকে বিশুদ্ধ রক্ত পায়।
• দুটি নিলয় (ডান ও বাম): পুরু প্রাচীরযুক্ত রক্ত নিক্ষেপণকারী প্রকোষ্ঠ। এতে ট্র্যাবিকিউলি কার্নি ও প্যাপিলারি পেশী থাকে। বাম নিলয়ের প্রাচীর ডান নিলয়ের চেয়ে ৩ গুণ বেশি পুরু, কারণ এটিকে সারা দেহে উচ্চ চাপে (১২০ mmHg) রক্ত পাম্প করতে হয়।
২. কপাটিকাসমূহ:
• ত্রিপত্রক কপাটিকা: ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের মাঝে ৩টি পত্রবিশিষ্ট।
• দ্বিপত্রক (মাইট্রাল) কপাটিকা: বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের মাঝে ২টি পত্রবিশিষ্ট।
• কর্ডি টেন্ডিনি: কপাটিকার পত্রগুলোকে নিলয়ের প্যাপিলারি পেশীর সাথে যুক্ত রেখে নিলয় সিস্টোলে কপাটিকা উল্টে যাওয়া রোধ করে।
• অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপাটিকা: ফুসফুসীয় ধমনী ও মহাধমনীর মুখে অবস্থিত ३টি করে পকেট সদৃশ কপাটিকা যা ডায়াস্টোলে রক্তের প্রত্যাবর্তন ঠেকায়।

দ্বিতীয় অংশ: নোডাল কলা ও SAN-কে পেসমেকার বলার কারণ (২ নম্বর):
• নোডাল সংবহন পথ: SA নোড $\to$ অলিন্দ পেশী $\to$ AV নোড (০.১ সে বিলম্ব) $\to$ হিজের বান্ডিল $\to$ পারকিনজি তন্তু $\to$ নিলয় পেশী।
• কেন SAN পেসমেকার: কার্ডিয়াক নোডাল পেশীকোষগুলোর নিজস্ব স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দময় অ্যাকশন পোটেনশিয়াল তৈরির ক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে SA নোড সর্বাধিক হারে (মিনিটে ৭০ থেকে ৭৫ বার) স্পন্দন তৈরি করতে সক্ষম (যেখানে AV নোড ৪০-৬০ বার ও পারকিনজি তন্তু ২০-৪০ বার তৈরি করতে পারে)। SA নোড থেকে উৎপন্ন দ্রুতগতির স্পন্দন অন্য সব অংশের স্পন্দনকে চালনা করে সমগ্র হৃৎপিণ্ডের প্রাথমিক গতি বা ছন্দ নির্ধারণ করে। তাই একে হৃৎপিণ্ডের প্রাকৃতিক পেসমেকার বলে।
উদাহরণ 5
মানব কার্ডিয়াক চক্রের বিভিন্ন পর্যায় সময়কালসহ আলোচনা করো। স্ট্রোক ভলিউম ও হৃদস্পন্দন হার থেকে কার্ডিয়াক আউটপুট নির্ণয় করো এবং হৃৎ-শব্দদ্বয়ের (LUB ও DUB) উৎপত্তি বুঝিয়ে দাও। [২.৫ + ২.৫ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
প্রথম অংশ: কার্ডিয়াক চক্রের পর্যায়সমূহ (সময়কাল: ০.৮ সেকেন্ড) (২.৫ নম্বর):
প্রতি মিনিটে ৭২ বার স্পন্দিত হলে একটি কার্ডিয়াক চক্রের সময়কাল হয় ০.৮ সেকেন্ড:
১. যৌথ ডায়াস্টোল (০.৪ সেকেন্ড): চারটি প্রকোষ্ঠই শিথিল। অলিন্দ-নিলয় কপাটিকা খোলা থাকে। শিরা থেকে আসা রক্তের প্রায় ৭০% নিষ্ক্রিয়ভাবে নিলয়ে প্রবেশ করে।
২. অলিন্দ সিস্টোল (০.১ সেকেন্ড): SA নোড উদ্দীপ্ত হলে উভয় অলিন্দ সংকুচিত হয় এবং বাকি ৩০% রক্ত নিলয়ে নিক্ষিপ্ত হয়। এর ফলে নিলয় পূর্ণ হয়ে এন্ড-ডায়াস্টোলিক ভলিউম ($\text{EDV} \approx ১২০\text{ মিলি}$) হয়।
৩. নিলয় সিস্টোল (০.৩ সেকেন্ড): নিলয়দ্বয় তীব্রভাবে সংকুচিত হয়:
• চাপ বৃদ্ধির সাথে সাথে অলিন্দ-নিলয় কপাটিকা সশব্দে বন্ধ হয় (১ম শব্দ, LUB)।
• চাপ আরও বেড়ে মহাধমনী ও ফুসফুসীয় ধমনীর চাপ অতিক্রম করলে অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপাটিকা খুলে যায় এবং প্রতিটি নিলয় থেকে ৭০ মিলি রক্ত নিক্ষিপ্ত হয় (স্ট্রোক ভলিউম)। সিস্টোল শেষে নিলয়ে এন্ড-সিস্টোলিক ভলিউম ($\text{ESV} \approx ৫০\text{ মিলি}$) রক্ত অবশিষ্ট থাকে।
৪. নিলয় ডায়াস্টোল: নিলয় শিথিল হলে চাপ কমে এবং ধমনীর রক্ত ফিরে আসতে চাইলে অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপাটিকা সশব্দে বন্ধ হয় (২য় শব্দ, DUB)।

দ্বিতীয় অংশ: কার্ডিয়াক আউটপুট ও হৃৎ-শব্দ (২.৫ নম্বর):
• কার্ডিয়াক আউটপুট (CO) নির্ণয়: প্রতি মিনিটে নিলয় কর্তৃক নিক্ষিপ্ত মোট রক্ত:
$$\text{CO} = \text{স্ট্রোক ভলিউম (SV)} \times \text{হৃদস্পন্দন হার (HR)} = ৭০\text{ মিলি} \times ৭২/\text{মিনিট} = \mathbf{৫,০৪০\text{ মিলি/মিনিট}} \approx \mathbf{৫.০\text{ লিটার/মিনিট}}$$
• প্রথম হৃৎ-শব্দ ("LUB" বা $S_1$): নিলয় সিস্টোলের শুরুতে রক্তচাপের ধাক্কায় অলিন্দ-নিলয় (ত্রিপত্রক ও দ্বিপত্রক) কপাটিকা সশব্দে বন্ধ হওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়। এটি দীর্ঘস্থায়ী (~০.১২ সে) ও গম্ভীর শব্দ।
• দ্বিতীয় হৃৎ-শব্দ ("DUB" বা $S_2$): নিলয় ডায়াস্টোলের শুরুতে ধমনীর রক্ত উল্টো ফিরতে চাইলে অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপাটিকাদ্বয় বন্ধ হওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়। এটি তীক্ষ্ণ ও সংক্ষিপ্ত (~০.০৮ সে) শব্দ।
উদাহরণ 6
একটি আদর্শ ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রামের (ECG) চিত্র অঙ্কন করো। P তরঙ্গ, QRS কমপ্লেক্স ও T তরঙ্গের তাৎপর্য আলোচনা করো। উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস ও অ্যানজাইনা পেকটোরিস রোগ সংক্ষেপে বর্ণনা করো। [২.৫ + ২.৫ = ৫ নম্বর]
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
প্রথম অংশ: আদর্শ ইসিজি তরঙ্গমালার তাৎপর্য (২.৫ নম্বর):
ইসিজি হলো হৃৎপেশীর বৈদ্যুতিক উদ্দীপনার গ্রাফচিত্র:
১. P-তরঙ্গ (P-Wave): একটি ক্ষুদ্র ঊর্ধ্বমুখী তরঙ্গ। এটি SA নোড থেকে উদ্দীপনা ছড়িয়ে উভয় অলিন্দের ডিপোলারাইজেশন (তড়িৎ সক্রিয়করণ) নির্দেশ করে, যার ফলে অলিন্দদ্বয় সংকুচিত হয়।
২. QRS কমপ্লেক্স: একটি তীক্ষ্ণ ও বৃহৎ তরঙ্গ। এটি উভয় নিলয়ের দ্রুত ডিপোলারাইজেশন নির্দেশ করে। Q তরঙ্গের ঠিক পরেই নিলয় সিস্টোল শুরু হয়। নির্দিষ্ট সময়ে QRS তরঙ্গের সংখ্যা গণনা করে রোগীর হৃদস্পন্দন হার নির্ণয় করা হয়।
৩. T-তরঙ্গ (T-Wave): একটি মসৃণ গম্বুজাকৃতি ঊর্ধ্বমুখী তরঙ্গ। এটি নিলয়ের রিপোলারাইজেশন (উত্তেজিত অবস্থা থেকে নিলয়ের শিথিলতায় প্রত্যাবর্তন) নির্দেশ করে। এর সমাপ্তি নিলয় সিস্টোলের শেষ চিহ্নিত করে।
• ক্লিনিক্যাল গুরুত্ব: ইসিজিতে ST-সেগমেন্টের ঊর্ধ্বমুখী পরিবর্তন দেখলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে রোগীর তীব্র মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (হার্ট অ্যাটাক) হয়েছে।

দ্বিতীয় অংশ: সংবহনতন্ত্রের রোগব্যাধি (২.৫ নম্বর):
১. উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension): রক্তচাপ ক্রমাগত ১৪০/৯০ mmHg বা তার বেশি থাকলে তাকে হাইপারটেনশন বলে (স্বাভাবিক ১২০/৮০ mmHg)। এর ফলে মস্তিষ্কে স্ট্রোক, বাম নিলয় বিকল ও কিডনি নষ্ট হতে পারে।
২. করোনারি ধমনী রোগ (CAD) বা অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস: করোনারি ধমনীর অন্তঃপ্রাচীরে লিপিড, কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম ও ফাইব্রাস কলা জমে প্ল্যাক তৈরি করে রক্ত চলাচলের পথ সংকীর্ণ করে দেয়, ফলে হৃৎপেশীতে রক্তস্বল্পতা হয়।
৩. অ্যানজাইনা পেকটোরিস (Angina Pectoris): হৃৎপেশীতে সাময়িক রক্ত ও অক্সিজেনের মারাত্মক ঘাটতির কারণে বুকের মাঝখানে প্রচণ্ড চাপ ও শ্বাসরোধকারী তীব্র ব্যথা অনুভূত হয় যা বাম কাঁধ ও বাহুতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে হৃৎপেশীর স্থায়ী মৃত্যু ঘটে না। বিশ্রাম নিলে ব্যথা কমে যায়।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

হার্ট ফেইলিওর, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এবং হার্ট অ্যাটাককে (মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন) একই রোগ মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে রক্তের সিরামের মধ্যেও ফাইব্রিনোজেন বা অন্যান্য তঞ্চন ফ্যাক্টর বিদ্যমান থাকে।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সাধারণ ভুল ধারণা

এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস রোগে মাতা Rh+ এবং ভ্রূণ Rh- বলে ভুল ধারণা করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সাধারণ ভুল ধারণা

প্রথম হৃৎ-শব্দ (LUB) নিলয়ে রক্তের দ্রুত প্রবেশের কারণে উৎপন্ন হয় বলে ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সাধারণ ভুল ধারণা

AV নোডকে হৃৎপিণ্ডের প্রাথমিক পেসমেকার হিসেবে চিহ্নিত করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

চিত্রগত ব্যাখ্যা ও মডেল

১৬ দেহ তরল ও সংবহন: রক্ত উপাদান, নোডাল সংবহন ও কার্ডিয়াক চক্র WBCHSE একাদশ শ্রেণি জীববিজ্ঞান • একক ৫: মানব শারীরবিদ্যা • সম্পূর্ণ সংবহনতন্ত্রের রূপরেখা ১. রক্তের উপাদান ও রক্ত তঞ্চন রক্তরস (৫৫%) এবং রক্তকণিকা (৪৫%) • প্লাজমা (৯০-৯২% জল): অ্যালবুমিন (কলয়েড চাপ), গ্লোবিউলিন, ফাইব্রিনোজেন • সিরাম = প্লাজমা − তঞ্চনকারী উপাদান • RBC (৫০-৫৫ লক্ষ) | WBC (৬-৮ হাজার) | অণুচক্রিকা (১.৫-৩.৫ লক্ষ) দানাদার (নিউট্রোফিল, ইওসিনোফিল, বেসোফিল) বনাম অদানাদার (লিম্ফোসাইট, মনোসাইট) ABO রক্ত শ্রেণি ও এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস • O গ্রুপ: সর্বজনীন দাতা | AB গ্রুপ: সর্বজনীন গ্রহীতা • এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস: Rh⁻ মা + Rh⁺ ভ্রূণ মায়ের অ্যান্টি-Rh অ্যান্টিবডি ভ্রূণের RBC ধ্বংস করে → RhoGAM দিয়ে প্রতিরোধ রক্ত তঞ্চন ক্যাসকেড (Ca²⁺ আয়ন) আহত কলা / অণুচক্রিকা থ্রম্বোপ্লাস্টিন → থ্রম্বোকাইনেজ প্রোথ্রম্বিন (নিষ্ক্রিয়) → থ্রম্বিন (সক্রিয়) (Ca²⁺ দ্বারা) ফাইব্রিনোজেন (দ্রবণীয়) → ফাইব্রিন জালক (অদ্রবণীয়) ফাইব্রিন তন্তু + আবদ্ধ রক্তকণিকা = তঞ্চন পিণ্ড (Thrombus) যকৃতে ফ্যাক্টর II, VII, IX, X সংশ্লেষে ভিটামিন K অপরিহার্য লসিকা বা কলা রস (মধ্যবর্তী তরল) • কৈশিক জালক থেকে নিঃসৃত আন্তঃকোষীয় কলা রস • RBC ও অণুচক্রিকাহীন, প্রোটিন কম, লিম্ফোসাইটে সমৃদ্ধ • অন্ত্রের ল্যাকটিয়েল দিয়ে কাইলোমাইক্রন রূপে ফ্যাট শোষণ • লসিকা নালী → থোরাসিক ডাক্ট → সাবক্ল্যাভিয়ান শিরায় মেশে লসিকা গ্রন্থির মাধ্যমে অনাক্রম্যতা রক্ষা ও জীবাণু ধ্বংস করে ২. নোডাল তন্ত্র ও হৃৎ-চক্র প্রকোষ্ঠ ও কপাটিকার গঠন বিন্যাস • ৪টি প্রকোষ্ঠ: ডান/বাম অলিন্দ, ডান/বাম নিলয় (বাম নিলয় ৩ গুণ পুরু) • ত্রিপত্রক: ডান অলিন্দ-নিলয় | দ্বিপত্রক (মাইট্রাল): বাম অলিন্দ-নিলয় • কর্ডি টেন্ডিনি কপাটিকাকে প্যাপিলারি পেশীর সাথে যুক্ত রাখে • অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপাটিকা: ফুসফুসীয় ধমনী ও মহাধমনীর মুখে পেরিকার্ডিয়াম: প্যারাইটাল ও ভিসেরাল স্তর এবং পেরিকার্ডিয়াল তরল স্বয়ংক্রিয় নোডাল সংবহন পথ • SA নোড (পেসমেকার): ডান অলিন্দে, মিনিটে ৭০-৭৫টি স্পন্দন • AV নোড (পেসসেটার): অলিন্দ-নিলয় প্রাচীরে, ০.১ সেকেন্ড বিলম্ব • হিজের বান্ডিল: আন্তঃনিলয় পর্দায় ডান ও বাম শাখায় বিভক্ত • পারকিনজি তন্তু: দ্রুতগতিতে (৪ মি/সে) নিলয়ের দেয়ালে সংকেত ছড়ায় সংকেত পথ: SAN → অলিন্দ → AVN → হিজের বান্ডিল → পারকিনজি → নিলয় মায়োজেনিক হৃৎপিণ্ড: বিশেষ পেশীকলার স্বতঃস্ফূর্ত উদ্দীপনা কার্ডিয়াক চক্র বা হৃৎ-চক্র (সময়কাল = ০.৮ সেকেন্ড) • যৌথ ডায়াস্টোল (০.৪ সে): অলিন্দ-নিলয় শিথিল; ৭০% রক্ত প্রবেশ • অলিন্দ সিস্টোল (০.১ সে): অলিন্দের সংকোচন; বাকি ৩০% রক্ত নিলয়ে • নিলয় সিস্টোল (০.৩ সে): নিলয় সংকোচন → মহাধমনীতে রক্ত নিক্ষেপ স্ট্রোক ভলিউম (SV) = EDV (১২০ মিলি) − ESV (৫০ মিলি) = ৭০ মিলি/স্পন্দন হৃৎ-শব্দ (Heart Sounds): • LUB (S₁): কাসপিড কপাটিকা (ত্রিপত্রক/দ্বিপত্রক) বন্ধে দীর্ঘ ও গম্ভীর শব্দ • DUB (S₂): অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপাটিকা বন্ধে সংক্ষিপ্ত ও তীক্ষ্ণ শব্দ কপাটিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে অস্বাভাবিক হৃৎ-গুঞ্জন (Heart Murmur) শোনা যায় ৩. ইসিজি, দ্বি-সংবহন ও হৃদরোগ ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (ECG তরঙ্গমালা) P R Q S T • P: অলিন্দ ডিপোলারাইজেশন | QRS: নিলয় সিস্টোল | T: নিলয় রিপোলারাইজেশন QRS সংখ্যা = হৃদস্পন্দন হার | ST উত্তোলনে মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন দ্বি-সংবহন ও কার্ডিয়াক আউটপুট • ফুসফুসীয়: ডান নিলয় → ফুসফুসীয় ধমনী → ফুসফুস → শিরা → বাম অলিন্দ • সিস্টেমিক: বাম নিলয় → মহাধমনী → কলাকোষ → শিরা → ডান অলিন্দ • হেপাটিক পোর্টাল তন্ত্র: পৌষ্টিকনালী → পোর্টাল শিরা → যকৃৎ কার্ডিয়াক আউটপুট = স্ট্রোক ভলিউম × হৃদস্পন্দন হার = ৭০ মিলি × ৭২/মিনিট = ৫,০৪০ মিলি/মিনিট (~৫ লিটার/মিনিট) সিমপ্যাথেটিক (নরঅ্যাড্রেনালিন ↑) বনাম প্যারাসিমপ্যাথেটিক (ভেগাস ACh ↓) সংবহনতন্ত্রের রোগব্যাধি • উচ্চ রক্তচাপ (Hypertension): রক্তচাপ > ১৪০/৯০ mmHg • CAD (অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস): কোলেস্টেরল জমে করোনারি ধমনী সংকীর্ণ • অ্যানজাইনা পেকটোরিস: তীব্র বুকে ব্যথা (অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি) • মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন: হার্ট অ্যাটাক; হৃদপেশীর মৃত্যু • হার্ট ফেইলিওর: পাম্পিং ক্ষমতা লোপ পাওয়া (ফুসফুসে রক্ত জমা) হার্ট ফেইলিওর ≠ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট (স্পন্দন স্তব্ধ) ≠ হার্ট অ্যাটাক স্বাভাবিক রক্তচাপ = ১২০/৮০ mmHg (সিস্টোলিক/ডায়াস্টোলিক) পালস প্রেশার = সিস্টোলিক − ডায়াস্টোলিক = ১২০ − ৮০ = ৪০ mmHg

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
রক্ত ৫৫% রক্তরস (প্লাজমা) এবং ৪৫% রক্তকণিকা নিয়ে গঠিত তরল সংযোজক কলা।
মূল বিষয় 2
সিরাম হলো তঞ্চন উপাদানবিহীন রক্তরস (সিরাম = প্লাজমা - তঞ্চন ফ্যাক্টর)।
মূল বিষয় 3
লোহিত রক্তকণিকা (৫০-৫৫ লক্ষ/ঘন মিমি) দ্বি-অবতল ও নিউক্লিয়াসবিহীন; জীবনকাল ১২০ দিন; এতে হিমোগ্লোবিন থাকে (১২-১৬ গ্রাম/dL)।
মূল বিষয় 4
শ্বেতকণিকা (৬,০০০-৮,০০০/ঘন মিমি) দুই প্রকার: দানাদার (নিউট্রোফিল, ইওসিনোফিল, বেসোফিল) এবং অদানাদার (লিম্ফোসাইট, মনোসাইট); অণুচক্রিকা রক্ত তঞ্চনে অংশ নেয়।
মূল বিষয় 5
ABO রক্ত শ্রেণি অ্যান্টিজেন A ও B-এর ওপর নির্ভরশীল; O গ্রুপ সর্বজনীন দাতা এবং AB গ্রুপ সর্বজনীন গ্রহীতা।
মূল বিষয় 6
Rh- মাতার গর্ভে Rh+ ভ্রূণ থাকলে এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস দেখা দেয়; প্রথম সন্তান প্রসবের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে RhoGAM (অ্যান্টি-D) দিয়ে এটি প্রতিরোধ করা হয়।
মূল বিষয় 7
রক্ত তঞ্চন একটি ৩-ধাপের ক্যাসকেড: থ্রম্বোপ্লাস্টিন -> থ্রম্বোকাইনেজ -> প্রোথ্রম্বিন থেকে থ্রম্বিন (Ca²⁺ দ্বারা) -> ফাইব্রিনোজেন থেকে অদ্রবণীয় ফাইব্রিন জালক।
মূল বিষয় 8
মানব হৃৎপিণ্ড ৪টি প্রকোষ্ঠযুক্ত (বাম নিলয়ের প্রাচীর ৩ গুণ পুরু), ত্রিপত্রক ও দ্বিপত্রক কপাটিকাসমূহ কর্ডি টেন্ডিনি দিয়ে প্যাপিলারি পেশীর সাথে যুক্ত থাকে।
মূল বিষয় 9
কার্ডিয়াক চক্র (০.৮ সে): যৌথ ডায়াস্টোল (০.৪ সে), অলিন্দ সিস্টোল (০.১ সে), নিলয় সিস্টোল (০.৩ সে); স্ট্রোক ভলিউম = ৭০ মিলি; কার্ডিয়াক আউটপুট = প্রায় ৫ লিটার/মিনিট।
মূল বিষয় 10
ECG-তে P তরঙ্গ অলিন্দ ডিপোলারাইজেশন, QRS কমপ্লেক্স নিলয় ডিপোলারাইজেশন এবং T তরঙ্গ নিলয় রিপোলারাইজেশন নির্দেশ করে; LUB তৈরি হয় AV কপাটিকা বন্ধে, DUB তৈরি হয় অর্ধচন্দ্রাকৃতি কপাটিকা বন্ধে।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
ডান নিলয়ের তুলনায় বাম নিলয়ের মায়োকার্ডিয়াম প্রাচীর ৩ গুণ বেশি পুরু কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ডান নিলয় রক্তকে স্বল্প দূরত্বের নিম্ন-প্রতিরোধ ফুসফুসীয় সংবহনে পাম্প করে (স্বাভাবিক সিস্টোলিক চাপ ~২৫ mmHg)। কিন্তু বাম নিলয়কে সমগ্র দেহের উচ্চ-প্রতিরোধ সিস্টেমিক সংবহনে রক্ত পাঠাতে হয় (স্বাভাবিক সিস্টোলিক চাপ ~১২০ mmHg)। এই বিশাল রক্তনালীজনিত প্রতিরোধ কাটিয়ে রক্ত পাম্প করার জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত শক্তি উৎপাদনে বাম নিলয়ের প্রাচীর ৩ গুণ বেশি পুরু হয়।
2
হৃৎপিণ্ডের সাইনো-অ্যাট্রিয়াল নোড (SAN) নষ্ট হয়ে গেলে হৃৎস্পন্দনের কী পরিণতি হবে?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: SA নোড নষ্ট হলে দ্বিতীয় নোডাল অংশ অর্থাৎ AV নোড পেসমেকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে (নোডাল রিদম)। তবে AV নোডের নিজস্ব স্পন্দন তৈরির হার অনেক কম (মিনিটে ৪০–৬০ বার, যেখানে SA নোডের হার ৭০–৭৫ বার)। এর ফলে রোগীর চরম ব্র্যাডিকার্ডিয়া বা মন্দ স্পন্দন দেখা দেবে এবং জীবন রক্ষায় কৃত্রিম ইলেকট্রনিক পেসমেকার বসাতে হবে।
3
Rh-নেগেটিভ মায়ের প্রথম গর্ভে Rh-পজিটিভ সন্তান থাকলে এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস হয় না কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: প্রথম গর্ভধারণের সময় অমরা বা প্লাসেন্টার অভেদ্যতার কারণে ভ্রূণের রক্ত মায়ের রক্তের সংস্পর্শে আসতে পারে না। সন্তান প্রসবের সময় অমরা ছিন্ন হলেই কেবল কিছু ভ্রূণীয় লোহিত কণিকা মায়ের রক্তে প্রবেশ করে। মায়ের দেহে প্রাথমিক অ্যান্টিবডি তৈরি হতে যে সময় লাগে তার আগেই শিশুটি নিরাপদে জন্ম নিয়ে ফেলে।
4
AV নোড কর্তৃক সৃষ্ট ০.১ সেকেন্ডের বিলম্ব কার্ডিয়াক পাম্পিং-এর ক্ষেত্রে কী সুবিধা দেয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: ০.১ সেকেন্ডের এই বিলম্ব উদ্দীপনাকে নিলয়ে পৌঁছানোর আগে কিছু সময় থামিয়ে রাখে, ফলে অলিন্দ সিস্টোল সম্পূর্ণভাবে শেষ হওয়ার সুযোগ পায়। এর মাধ্যমে অলিন্দের বাকি ৩০% রক্ত নিলয়ে প্রবেশ করে নিলয়কে সর্বোচ্চ রক্তপূর্ণ (EDV) করতে পারে। যদি এই বিলম্ব না থাকত, তবে অলিন্দ ও নিলয় একসাথে সংকুচিত হতো এবং পাম্পিং ব্যর্থ হতো।
5
লিভার সিরোসিস বা মারাত্মক যকৃৎ রোগে আক্রান্ত রোগীর দেহে একই সাথে শরীরে জল জমা (ইডেমা) এবং রক্তক্ষরণ দেখা দেয় কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: যকৃৎ সমস্ত প্রধান রক্তরস প্রোটিন তৈরি করে। সিরোসিসে যকৃৎ অ্যালবুমিন তৈরি করতে পারে না, ফলে রক্তরসের কলয়েড অভিস্রবণ চাপ কমে গিয়ে তরল রক্তনালী থেকে কলায় বের হয়ে ইডেমা ঘটায়। একই সাথে যকৃৎ তঞ্চন ফ্যাক্টর (ফাইব্রিনোজেন, প্রোথ্রম্বিন ইত্যাদি) তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ায় রক্ত তঞ্চন ব্যাহত হয় এবং মারাত্মক রক্তক্ষরণ ঘটে।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 11 Biology — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: সজীব বিশ্ব অধ্যায় 2: জীবের শ্রেণিবিন্যাস অধ্যায় 3: উদ্ভিদ রাজ্য অধ্যায় 4: প্রাণী রাজ্য অধ্যায় 5: সপুষ্পক উদ্ভিদের অঙ্গসংস্থান অধ্যায় 6: সপুষ্পক উদ্ভিদের অন্তর্গঠন অধ্যায় 7: প্রাণীদের গঠনগত সংগঠন অধ্যায় 8: কোষ: জীবনের একক অধ্যায় 9: জৈব অণুসমূহ অধ্যায় 10: কোষ চক্র ও কোষ বিভাজন অধ্যায় 11: উচ্চশ্রেণির উদ্ভিদে সালোকসংশ্লেষ অধ্যায় 12: উদ্ভিদে শ্বসন অধ্যায় 13: উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও পরিবর্ধন অধ্যায় 14: পরিপাক ও শোষণ অধ্যায় 15: শ্বাসকার্য ও গ্যাসীয় বিনিময় অধ্যায় 16: দেহ তরল ও সংবহন অধ্যায় 17: রেচন পদার্থ ও তাদের নিষ্কাশন অধ্যায় 18: চলন ও গমন অধ্যায় 19: স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় অধ্যায় 20: রাসায়নিক সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

দেহ তরল ও সংবহন অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।